📄 যুদ্ধ ফরয হওয়ার ঘোষণা
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাক্বারা- ১৯০)
এখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কাজে তোমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়, আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান অনুযায়ী তোমরা জীবনব্যবস্থার সংস্কার ও সংশোধন করতে চাও বলে যারা তোমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তোমাদের সংশোধন ও সংস্কার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য যুলুম-অত্যাচার চালাচ্ছে, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। এর আগে মুসলমানরা যতদিন দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত ছিল, ততদিন তাদেরকে কেবলমাত্র ইসলাম প্রচারের হুকুম দেয়া হয়েছিল এবং বিপক্ষের যুলুম-নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করার তাকীদ করা হয়েছিল। এখন মদিনায় তাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, যারাই এ সংস্কারমূলক দাওয়াতের পথে সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করছে অস্ত্র দিয়েই তাদের জবাব দাও। এরপরই অনুষ্ঠিত হয় বদরের যুদ্ধ। তারপর একের পর এক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতেই থাকে।
📄 বদর যুদ্ধ
বদর হচ্ছে মক্কা এবং মদিনার মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম। এটি মদিনা থেকে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ এর জীবনে এটিই ছিল কুরাইশদের সাথে সর্বপ্রথম বড় যুদ্ধ। নিম্নে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
প্রেক্ষাপট:
মক্কাবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল সিরিয়া। আর এ উভয় শহরের যোগাযোগ পথেই মদিনার অবস্থান। সুতরাং সিরিয়া যাতায়াত করার জন্য মক্কাবাসীকে মদিনা অতিক্রম করেই যেতে হয়। একদা রাসূলুল্লাহ সংবাদ পেলেন যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় আগমন করছে। অতঃপর তিনি এও সংবাদ পেলেন যে, সে কাফেলায় মক্কাবাসীদের প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। তাতে রয়েছে, এক হাজার উট এবং প্রতিটি উট কমপক্ষে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা মূল্যের মালপত্র বহন করছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য কাফেলার সাথে ৪০ জন কর্মীও রয়েছে।
অতএব মদিনাবাসীদের জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ। যদি এগুলো ছিনিয়ে নিতে পারে তাহলে তারা সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে যেতে পারবে। পক্ষান্তরে কুরাইশদের জন্য ছিল এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। কেননা এ কাফেলার সমস্ত মালপত্রের সাথে মক্কাবাসী সবাই অংশীদার ছিল। এসব বিভিন্ন দিক চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দেন যে, সিরিয়া থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তনকারী একটি কুরাইশ কাফেলার সাথে প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। সুতরাং তোমরা এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ো। হয়তো আল্লাহ তা'আলা গনীমত হিসেবে এসকল মালপত্র তোমাদের হাতে দিয়ে দেবেন।
এ ঘোষণার পরপরই মুসলিমগণ নিজ নিজ ইচ্ছানুযায়ী প্রস্তুতি নিতে থাকে। এদিকে মক্কার কুরাইশরা যখন এ সংবাদ পেল যে, মুসলিমরা তাদের বাণিজ্য কাফলাকে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তারাও সাথে সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিল এবং মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এ দলটিকেই মুসলিমদের মুখোমুখি করে দিলেন।
এ যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। তাদের মধ্যে ৮২ জন, মতান্তরে ৮৩ অথবা ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির। আর অন্যরা ছিলেন আনসার। তাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্বয়ং নবী
পক্ষান্তরে কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৩০০। তাদের কাছে ছিল ১০০ ঘোড়া এবং ৬০০ লৌহবর্ম। তাছাড়া অসংখ্য উটও ছিল। তাদের সর্বাধিনায়ক ছিল আবু জাহেল ইবনে হিশাম।
বদর অভিমুখে যাত্রা : এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ যুদ্ধের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ছাড়াই মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করেন। পক্ষান্তরে কুরাইশরা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বিশাল শক্তিশালী একটি বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে রওয়ানা হয়।
কুরাইশদের মতভেদ : যখন আবু সুফিয়ান তার বাণিজ্য কাফেলাকে নিরাপদে মুসলিম বাহিনী থেকে এড়িয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো, তখন পথিমধ্যে যুদ্ধের জন্য আগত কুরাইশ বাহিনীর সাথে তার সাক্ষাত হয়ে যায়। তখন কুরাইশদের অনেকেই মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু কুরাইশদের নেতা আবু জাহেল যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেয়। যার ফলে কুরাইশদের সফরসূচী পূর্বের অবস্থাতেই বহাল থাকে এবং তারা মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য যাত্রা অব্যাহত রাখে।
মুসলিম বাহিনীর বিব্রতকর অবস্থা : পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কে এবং কুরাইশদের সেনাবাহিনী সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত হন। এতে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণও অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েন। কিন্তু পরক্ষণেই এর ফলাফলের কথা চিন্তা করে আল্লাহর বিশেষ রহমতে যুদ্ধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে যান। কেননা এ পরিস্থিতিতে যদি কুরাইশ বাহিনীকে ছেড়ে দেয়া হয় অথবা তাদের হাতে পরাজয় বরণ করা হয়, তাহলে মদিনায় মুসলিমদের আধিপত্য অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যাবে এবং রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতী কাজকর্মও স্তিমিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কুরাইশদের সাথে লড়াই করে তাদের উপর বিজয়ী হওয়া যায়, তাহলে আরব ভূমিতে মুসলিমদের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রও অনেক গুণ প্রশস্ত হবে। এসব বিভিন্ন দিক চিন্তা করে মুসলিমদের উপর এ যুদ্ধ করাটা একেবারেই আবশ্যক হয়ে উঠে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য সাহাবীদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে সকলেই রাসূলুল্লাহ এর সিদ্ধান্তের প্রতি একমত পোষণ করেন এবং এতে দৃঢ় থাকার জন্য অঙ্গীকার প্রদান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ আল্লাহর উপর ভরসা করে তাদেরকে নিয়ে বদর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
মুসলিম বাহিনীর অবস্থান : অতঃপর রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে বদর অভিমুখে খুব দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। যাতে করে সেখানে সর্বপ্রথম তাঁরাই অবস্থান নিতে পারেন এবং সেখানে অবস্থিত ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। কেননা সেখানকার পানি সংগ্রহের একমাত্র ব্যবস্থা ছিল ঝর্ণা। সুতরাং যদি ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নেয়া যায়, তাহলে শত্রু পক্ষকে অনেকটা সংকটে ফেলা সম্ভব হবে। তারপর দেখা গেল যে, মুসলিম বাহিনীই সেখানে সর্বাগ্রে গমন করে শিবির স্থাপন করেন এবং ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তারপর তারা সেখানে নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে রাসূলুল্লাহ এর জন্য এমন একটি জায়গায় ছাউনী নির্মাণ করেন, যেখান থেকে সম্পূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান : পক্ষান্তরে কুরাইশ বাহিনী উপত্যকার বাইরের দিকে শিবির স্থাপন করে। ফলে তারা উক্ত উপত্যকার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ : উভয় পক্ষ নিজ নিজ শিবিরে অবস্থান নেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা উক্ত রাতেই মুষল ধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। যা ছিল মুসলিমদের জন্য রহমতস্বরূপ এবং কুরাইশদের জন্য আযাবস্বরূপ। কেননা এর কারণে মুসলিমরা আরো অতিরিক্ত সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। আর তা হলো, মুসলিম বাহিনী যেখানে অবস্থান করছিল, সে স্থানটি ছিল বালুময় এবং উঁচুভূমি। সেখানে বৃষ্টি হওয়ার ফলে বালুর স্তরগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং মুসলিম বাহিনীর চলাচলের ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়।
পক্ষান্তরে কুরাইশ বাহিনী যেখানে অবস্থান করছিল সেটি ছিল নিচুভূমি। বৃষ্টি বর্ষণের কারণে সেখানে কাদা জমে যায় এবং তাদের চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়।
চূড়ান্ত যুদ্ধ : অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উভয় বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হয়। দিনটি ছিল হিজরী ২য় বর্ষের ১৭ই রমাযান শুক্রবার সকাল। এর আগে রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে যথাযথভাবে কাতারবন্দী করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। তারপর যখন উভয় দল পরস্পর মুখোমুখি হলো, তখন নিয়মানুযায়ী উভয় দলের পক্ষ থেকে তিনজন করে এগিয়ে আসলো। প্রথমে কুরাইশদের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসলো- উতবা, শায়বা এবং তার পুত্র ওয়ালীদ। তারপর তারা মুসলিমদের মধ্য থেকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানালে প্রথমে আউফ ইবনে হারিস (রাঃ), মু'আব্বির ইবনে হারিস (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এগিয়ে আসলেন। কিন্তু কুরাইশরা এদেরকে বাদ দিয়ে তাদের সমগোত্রিয় কাউকে এগিয়ে আসতে বলল। তখন রাসূলুল্লাহ এর অনুমতিক্রমে হামযা (রাঃ), উবাদা ইবনে হারিস (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) এগিয়ে আসলেন। অতঃপর তাদের মধ্যে মুখোমুখি যুদ্ধ বেধে গেল। এতে মুসলিমগণ তিন প্রতিপক্ষকেই হত্যা করে ফেলেন এবং তাঁরা জয় লাভ করেন।
এরপর শুরু হয় যুদ্ধের মূল পর্ব। যখন কুরাইশরা দেখল যে, তাদের নেতাগণ পরাজিত হয়েছে তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে একযোগে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফলে তাদের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ এর দু'আ: এদিকে রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দী করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন যে, হে আল্লাহ! তুমি আমার সাথে যে অঙ্গীকার করেছ, তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার পূর্ণ করার জন্য প্রার্থনা করছি।
তারপর যখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ পুনরায় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ মর্মে প্রার্থনা করলেন যে, হে আল্লাহ! এ দলটিকে যদি আজ তুমি ধ্বংস করে দাও, তাহলে আর তোমার উপাসনা করা হবে না। হে আল্লাহ! তুমি যদি এটাই চাও, তাহলে আজকের পর আর কখনো তোমার ইবাদাত করা হবে না।
ফেরেশতাদের অবতরণ : অতঃপর রাসূলুল্লাহ এর একটু তন্দ্রা আসলো। ফলে তিনি মাথা হেলিয়ে দিলেন। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আবু বকর! খুশি হয়ে যাও। ইনি হলেন জিবরাঈল, তার দেহ ধুলো-বালিতে ভরপুর। অর্থাৎ জিবরাঈল (আঃ) ফেরেশতাদের নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তারপর রাসূলুল্লাহ লৌহ বর্ম পরিহিত অবস্থায় ছাউনী থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদেরকে উৎসাহ দিতে লাগলেন।
ইবলিসের পলায়ন : যুদ্ধ শুরুর পূর্বে অভিশপ্ত ইবলিস সোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জুশুম মুদলিজীর আকৃতিতে উপস্থিত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তারপর যখন সে ফেরেশতাদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করল তখন পেছনে ফিরে পলায়ন করতে থাকল। তখন মুশরিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমি যা দেখছি, তোমরা তা দেখছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করি; তিনি কঠিন শাস্তিদাতা।
কুরাইশ দলের বিশৃঙ্খলতা : এরপর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কুরাইশ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল এবং তাদের পরাজয়ের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকল। তারপর এক সময় তারা পিছু হটতে থাকল, এমনকি দৌড়ে পালাতে লাগল। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে হত্যা, জখম ও বন্দী করতে করতে পিছু ধাওয়া করে চলতে লাগলেন।
ফলাফল : অবশেষে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। মুসলিমরা কুরাইশদের সকল গর্ব ও অহংকার ভেঙ্গে দিয়ে তাদের উপর বিজয়ী হলেন। ফলে কুরাইশরা চরমভাবে লাঞ্ছিত হলো। এ যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। তার মধ্যে ৬ জন ছিলেন মুহাজির এবং ৮ জন ছিলেন আনসার। পক্ষান্তরে কুরাইশরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে আবু জাহেল, উতবা ও শায়বা প্রভৃতি নেতৃবৃন্দরা ছিল অন্যতম।
গনীমতের সম্পদ বণ্টন : সে সময়ের নিয়মানুযায়ী রাসূলুল্লাহ যুদ্ধ শেষ করে তিনদিন পর্যন্ত বদরের প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন এবং তখনও তিনি মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেননি, এমন সময় রাসূলুল্লাহ গনীমতের সম্পদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন যে, যার কাছে যা আছে সে যেন তা তাঁর কাছে জমা দেয়। তখন সাহাবীগণ তা-ই করলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা এর সামাধানে এ আয়াত নাযিল করেন-
يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّসُوْلِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ ۚ وَأَطِيْعُوا اللَّهَ وَرَسُوْلَهٗ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ﴾ লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তাদেরকে বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূলের জন্য। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারস্পরিক বিষয় সংশোধন করে নাও। আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হও। (সূরা আনফাল- ১)
রাসূলুল্লাহ এর কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যু: রাসূলুল্লাহ যখন এ যুদ্ধে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন রুকাইয়া (রাঃ) অসুস্থ ছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ তার স্বামী উসমান (রাঃ)-কে সেবা-শুশ্রূষার জন্য মদিনায় রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ যখন যুদ্ধে বিজয় লাভ করে মদিনায় ফিরছিলেন তখন তাঁর নিকট কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে। তারপর মদিনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ তার দাফন কার্য সম্পাদন করেন।
টিকাঃ
৯ বায়হাকী, হা/১৮৩৬৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৯৫৯।
📄 বদর যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের তৎপরতা
বদর যুদ্ধ হচ্ছে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে সর্বপ্রথম অস্ত্রের লড়াই। এর মাধ্যমে কারা সত্যের পথে এবং কারা বাতিলের পথে রয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে কুরাইশরা চরমভাবে অপমানিত হয়। চারদিক থেকে সবাই তাদেরকে ধিক্কার দিতে থাকে। ফলে কুরাইশরা মুসলিমদের উপর আরো ক্রোধান্বিত হতে থাকে। অপরদিকে মুসলিমদের মধ্যে বয়ে যায় প্রশান্তির বাতাস। মদিনার আকাশ-বাতাস তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হতে থাকে।
এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার দল মদিনায় মুসলিমদের মধ্যে নানা ধরনের অপবাদ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখন তাদের কাছে বদর যুদ্ধের বিজয়ের সংবাদ এসে গেল তখন তারা নিজেদের মান-মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য কোন পথ খুঁজে পেল না। ফলে তারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের অন্তরের মধ্যে কুফর লুকিয়ে রেখেছিল।
মদিনা ও মদিনার আশপাশে বসবাসরত কিছু গোত্র তখনও রাসূলুল্লাহ এর নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছিল না। ফলে যখন তারা মুসলিমদের এ বিজয়ের সংবাদ শ্রবণ করে তখন খুবই ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়ে। যার কারণে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে খুবই তৎপর হয়ে উঠে। এদিকে রাসূলুল্লাহ -ও তাদের এসব অবস্থা খুবই সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং তাদের যে কোন চক্রান্ত ধূলিস্যাৎ করে দিতে সদা প্রস্তুত ছিলেন। নিম্নে এরই কয়েকটি চিত্র তুলে ধরা হলো :
১. বনু সুলাইম অভিযান : বদর যুদ্ধের পর মুসলিমরা সর্বপ্রথম যে সংবাদটি পান সেটি হচ্ছে, গাতফান গোত্রের শাখা বনু সুলাইমের লোকেরা মদিনার উপর চড়াও হওয়ার জন্য সৈন্য সমাবেশ করছে। ফলে রাসূলুল্লাহ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০০ জন উষ্ট্রারোহীকে সাথে নিয়ে তাদের উপর আকস্মিকভাবে ধাওয়া করেন। এতে বনু সুলাইম গোত্র হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ফেলে রেখে পলায়ন করে।
এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ২য় বর্ষের শাওয়াল মাসে এবং বদর হতে প্রত্যাবর্তনের মাত্র সাত দিন পর।
২. রাসূলুল্লাহ -কে হত্যার ষড়যন্ত্র : বদর যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে মক্কার কুরাইশরা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের অনেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানাভাবে চক্রান্ত করতে লাগল। তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল উমায়ের ইবনে ওহাব। তার ছেলে বদর যুদ্ধে মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়েছিল। একদা সে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এর সাথে বদর যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনাকালে রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় এবং একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। আর এটি ছিল খুবই গোপনীয়। তারপর সে পরিকল্পনা অনুযায়ী মদিনায় আগমন করে রাসূলুল্লাহ এর সাথে দেখা করে। কিন্তু তার এ চক্রান্ত রাসূলুল্লাহ ওহীর মাধ্যমে ইতিপূর্বেই জেনে গিয়েছিলেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ তার এসব পরিকল্পনা তার কাছে বলে দেন, তখন সে আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ে এবং সত্যকে চিনতে পারে। যার কারণে সে তখনই ইসলাম গ্রহণ করে।
৩. বনু কাইনুকার অভিযান : বনু কাইনুকা ছিল মদিনায় বসবাসরত একটি ইয়াহুদি গোত্র। মদিনা সনদ প্রণয়নের সময় তারাও এতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু যেহেতু তারা পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহ-কে সহ্য করতে পারত না, তাই বদর যুদ্ধে বিজয়ের ফলে তারা মুসলিমদের উপর আরো ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ে এবং সেটা তাদের আচার-আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকে। ফলে রাসূলুল্লাহ -ও তাদেরকে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরও তাদের হিংসা যেন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
তারা যে এলাকায় বসবাস করত, সেটা তাদের গোত্রের নামেই পরিচিত ছিল। আর তাদের মধ্যে একটি বাজার ছিল। সেখানে তারা ক্রয়-বিক্রয় করত। যখনই কোন মুসলিম সেখানে যেতেন তখন তারা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত এবং তাকে নানা ভাবে কষ্ট দিত। একদা এক মুসলিম মহিলা বিশেষ কোন প্রয়োজনে তাদের বাজারে গেলেন। তখন এক ইয়াহুদি উক্ত মুসলিম মহিলাকে চরমভাবে অপমানিত করে এবং তাকে নিয়ে হাসি-তামাশায় মেতে উঠে। তখন এক মুসলিম ব্যক্তি এর প্রতিবাদ করলে ইয়াহুদিরা তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং তাকে হত্যা করে ফেলে।
এ ঘটনা জানতে পেরে মুসলিমগণ খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাথে সাথেই সেনাবাহিনী নিয়ে বনু কাইনুকার দিকে অগ্রসর হন। তখন ইয়াহুদিরা মুসলিম বাহিনীকে দেখামাত্রই দুর্গের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের দুর্গ অবরোধ করেন। দিনটি ছিল হিজরী ২য় বর্ষের শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ শুক্রবার। তারপর রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ১৫ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন। অবশেষে বনু কাইনুকার ইয়াহুদিরা রাসূলুল্লাহ এর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল তাদেরই একজন মিত্র। বনু কাইনুকার এ অবস্থা দেখে সে রাসূলুল্লাহ এর কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে তাদেরকে হত্যা করা হতে অব্যাহতি দিলেন এবং মদিনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
৪. সাভীক অভিযান: বদর যুদ্ধের পর থেকে ইসলামের শত্রুরা নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছিল। একদিকে যেমন মক্কার কুরাইশরা, অন্যদিকে মদিনা ও মদিনার আশেপাশে বসবাসরত ইয়াহুদিরা- সকলেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল। সুতরাং তারা যেভাবেই পারত, মুসলিমদের ক্ষতি করার চেষ্টা করত। এদিকে আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত অপবিত্রতার কারণে মাথায় পানি দেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে বসেছিল। ফলে একদিন সে ২০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে মদিনায় গুপ্ত হামলা করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে এবং মদিনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসরত বনু নাযীর গোত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর তারা সকাল বেলা আবু সুফিয়ানের নির্দেশে সেখানকার একটি এলাকায় আক্রমণ করে খেজুর গাছ কর্তন করে তা জ্বালিয়ে দেয়। পাশাপাশি তারা একজন আনসারী সাহাবী ও তার মিত্রকেও হত্যা করে ফেলে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এ সংবাদ শুনতে পেয়ে তাদের পেছনে দ্রুত ধাওয়া করেন। কিন্তু এর আগেই তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ঘটনাটি ঘটেছিল বদর যুদ্ধের মাত্র ২ মাস পর অর্থাৎ ২য় হিজরী সনের জিলহজ্জ মাসে।
৫. যী আমর অভিযান: বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নেতৃত্বে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এটা সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৩য় বর্ষের মুহাররম মাসে। একদা রাসূলুল্লাহ সংবাদ পেলেন যে, বনু সা'লাবা ও বনু মুহারিব গোত্রের এক বিরাট বাহিনী মদিনার উপর আক্রমণ করার জন্য একত্রিত হচ্ছে। এ সংবাদ শোনার সাথে সাথেই রাসূলুল্লাহ ৪০০ জন সৈন্য নিয়ে তাদেরকে ধাওয়া করার জন্য যাত্রা করেন। পথিমধ্যে সাহাবীগণ বনু সা'লাবা গোত্রের 'জার' নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ধরে নিয়ে আসেন। অতঃপর তাকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হলে সে তা গ্রহণ করে নেয়। তারপর মুসলিমরা তার তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত গমন করেন। কিন্তু এর আগেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করেছিল। তারপর রাসূলুল্লাহ সেখানে নিজেদের শক্তি সামর্থ প্রকাশ করার জন্য পূর্ণ সফর মাসটি অতিবাহিত করে মদিনায় ফেরত আসেন।
৬. কা'ব ইবনে আশরাফকে হত্যা: কা'ব ইবনে আশরাফ ছিল একজন ইয়াহুদি নেতা। সে ছিল ইয়াহুদিদের মধ্যে খুবই প্রভাবশালী ও ধনী। তার সৌন্দর্যের খুবই সুনাম ছিল। তাছাড়া সে কবিতাও রচনা করত। সে শুরু থেকেই ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আসছিল। তারপর যখন সে মুসলিমদের বদর বিজয়ের সংবাদ শুনতে পেল তখন সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে গেল। ফলে বারবার কুরাইশদের নিকট গিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিশোধের আগুন প্রজ্বলিত করতে লাগল। উপরন্তু সে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীদের নিয়ে খুব বাজে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল। এতে রাসূলুল্লাহ তার উপর একেবারেই অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন। ফলে একদিন রাসূলুল্লাহ বললেন, কা'ব ইবনে আশরাফের (নিধনের) জন্য কে আছ? কেননা সে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। তখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর সাহাবী বললেন, তাহলে আমাকে প্রয়োজন মতো যা ইচ্ছা বলার অনুমতি দিন। তিনি বললেন, ঠিক আছে- অনুমতি দেয়া হলো।
অতঃপর মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রাঃ) কা'ব ইবনে আশরাফের কাছে এলেন। তারপর তিনি বললেন, এ ব্যক্তি {মুহাম্মাদ} তো সাদাকা উসূল করতে চায় এবং সে আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সে (কা'ব) যখন এ কথাগুলো শুনতে পেল, তখন বলল, আরো অপেক্ষা করো। আল্লাহর কসম, সে তোমাদেরকে কষ্ট দেবেই। তখন সাহাবী বললেন, আমরা সবেমাত্র তাঁর অনুসারী হয়েছি। তাই ব্যাপারটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা না দেখে এ মুহূর্তেই তাকে ছেড়ে যাওয়াটা ঠিক মনে করছি না। এখন আমি চাই তুমি আমাকে কিছু ধার দাও। কা'ব ইবনে আশরাফ বলল, তুমি আমার কাছে কিছু বন্ধক রাখবে? মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রাঃ) বললেন, তুমি কী চাও? সে বলল, তোমাদের মহিলাদেরকে আমার কাছে বন্ধক রাখো। তিনি বললেন, তুমি হলে আরবের সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ; তোমার কাছে বন্ধক রাখব আমাদের মহিলাদের? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের সন্তানদেরকে আমার কাছে বন্ধক রাখো। জবাবে তিনি বললেন, আমাদের কারো সন্তানকে এ বলে গালি দেয়া হবে যে, তাকে মাত্র দু'ওসাক (৫ মণ আড়াই সের পরিমাণ) খেজুরের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছিল। আমরা বরং তোমার কাছে যুদ্ধাস্ত্র বন্ধক রাখব। সে বলল, ঠিক আছে। তখন তিনি তার সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন যে, হারিস, আবু আবস ইবনে জার ও আব্বাদ ইবনে বিশরসহ তার কাছে আসবেন।
তারপর তাঁরা রাতের বেলা তার কাছে আসলেন এবং তাকে ডাকলেন। তখন সে তাদের কাছে আসল। এ সময় তার স্ত্রী তাকে বলল, আপনি এ সময় কোথায় যাচ্ছেন? আমি এমন একটি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি যে, কোন স্থান হতে যেন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝড়ছে। সে বলল, এ হচ্ছে মুহাম্মাদ এবং তার দুধভাই আবু নায়িলা। সম্ভ্রান্ত লোককে যদি রাতের বেলা বর্শাবিদ্ধ হওয়ার দিকে ডাকা হয়, তবুও তার ডাকে সাড়া দেয়া উচিত।
এদিকে আবু নায়েলা (রাঃ) তার সঙ্গীদেরকে বলে রেখেছিলেন যে, সে যখন আসবে, তখন আমি তার মাথা লক্ষ্য করে আমার হাত বাড়াব। যখন আমি তা ভালোভাবে ধরে নেব, তখন তোমরা তোমাদের কাজ সেরে নেবে। তারপর যখন সে গায়ে চাদর জড়িয়ে নিচে নেমে এল, তখন নায়েলা (রাঃ) বললেন, আমি তোমার কাছ থেকে খুবই সুঘ্রাণ পাচ্ছি। সে বলল, হ্যাঁ-আমার স্ত্রী অমুক হচ্ছে আরবের সর্বাধিক ঘ্রাণবিশিষ্ট সুগন্ধী ব্যবহারকারিণী মহিলা। তখন তিনি বললেন, আমাকে তা থেকে একটু সুবাস নিতে অনুমতি দেবেন? তখন সে বলল- হ্যাঁ। তখন তিনি তার মাথা শুঁকলেন। কিছুক্ষণ পর আবার শুঁকলেন। এরপর পুনরায় বললেন, আমাকে কি আবারও একটু ঘ্রাণ নিতে দেবে? তখন সে বলল, অবশ্যই। অতঃপর যখন তিনি মাথা শুঁকার ভান করে তার মাথা ধরলেন তখন সাথিদেরকে বললেন, তোমরা সেরে ফেলো। তখন তারা তাকে হত্যা করে ফেললেন।৭০
৭. বাহরানের অভিযান: এটি সংঘটিত হয়েছিল তৃতীয় হিজরীর রবিউস সানি মাসে। এ সময় রাসূলুল্লাহ ৩০০ সদস্যের একটি সেনাবাহিনী নিয়ে বাহরান নামক একটি অঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করেন। তারপর তিনি সেখানে দুই মাস যাবত অবস্থান করে কোন যুদ্ধ ছাড়াই মদিনায় ফিরে আসেন।
৮. যায়েদ ইবনে হারিসার অভিযান: এ অভিযানটি সংঘটিত হয়েছিল ৩য় হিজরীর জুমাদিউস সানি মাসে। মক্কাবাসীদের জীবিকা নির্বাহ ছিল তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। ফলে এতদিন তারা গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় এবং শীতকালে আবিসিনিয়ায় ব্যবসা পরিচালনা করত। এদিকে আবিসিনিয়ার পথটি আশঙ্কামুক্ত থাকলেও বদর যুদ্ধের পর থেকে সিরিয়াগামী পথটি বন্ধ হয়ে যায়। কেননা মক্কার সাথে সিরিয়ার যোগাযোগের একমাত্র পথটির মাঝখানেই ছিল মদিনার অবস্থান, যা মুসলিমরা মক্কাবাসীদের জন্য অবরোধ করে দেয়। এতে মক্কাবাসীরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। অতঃপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া একটি বিকল্প পথে মদিনাকে পাশ কাটিয়ে সিরিয়ার পথে গমন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ তাদের এ বিষয়টি জেনে ফেলেন এবং সাথে সাথেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি যায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে ১০০ জন অশ্বারোহীর একটি বাহিনীকে তাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। ফলে যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ) তার বাহিনী নিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলেন এবং তাদের মালপত্র গনীমত হিসেবে নিয়ে নেন।
টিকাঃ
৭০ সহীহ মুসলিম, হা/৪৭৬৫।
📄 উহুদ যুদ্ধ
প্রেক্ষাপট: উহুদ মদিনা হতে চার মাইল উত্তরে বিস্তৃত একটি পাহাড়ি এলাকা। মক্কার কুরাইশরা বদর যুদ্ধের পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। প্রতিটি মুহূর্তে তারা ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছিল। এমনকি তারা এ প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করেই ছাড়বে। উপরন্তু মদিনা ও মদিনার আশেপাশে বসবাসরত ইয়াহুদিদের কুমন্ত্রণা তো রয়েছেই। তারা অনবরত কুরাইশদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছিল। তাছাড়া উহুদ যুদ্ধের বেশ কিছু দিন পূর্বে মুসলিমদের দ্বারা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা আক্রান্ত হওয়াটা তাদেরকে আরো বিষাদময় করে তুলেছিল। যার পরিণতিতে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে আরো একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ আবশ্যক হয়ে উঠে।
কুরাইশদের যাত্রা: অবশেষে কুরাইশরা মুসলিমদের উপর চরম রাগ ও উত্তেজনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এরপর মক্কা থেকে উহুদের দিকে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাকালে তারা নানা ধরনের ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নাচ-গান করে আনন্দ-ফূর্তি করছিল।
মদিনায় সংবাদ : এদিকে আব্বাস (রাঃ) কুরাইশদের সকল তৎপরতা লক্ষ্য করছিলেন। কুরাইশদের এ ধরনের যাত্রার কারণে তিনি বিচলিত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত সংবাদ সম্বলিত একটি পত্র দিয়ে মদিনায় প্রেরণ করেন। অতঃপর পত্র বাহক মক্কা হতে মদিনা পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিঃমিঃ পথ মাত্র তিন দিনে অতিক্রম করে রাসূলুল্লাহ এর দরবারে উপস্থিত হন।
মুসলিম বাহিনীর যাত্রা : রাসূলুল্লাহ এ পত্রটি পাওয়ার সাথে সাথেই আনসার ও মুহাজিরদের নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে পরামর্শ সভায় বসেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সকলকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনী সাথে সাথেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ নেতৃস্থানীয় সাহাবীদেরকে নিয়ে আবারো পরামর্শ সভায় বসেন এবং এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তারা কুরাইশ বাহিনীকে মদিনার বাইরে গিয়েই প্রতিরোধ করবেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিয়ে জুমু'আর নামায আদায় করেন। খুতবা দানের সময় তিনি সাহাবীদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ প্রদান করেন। তারপর সকলেই একত্রে কুরাইশদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য যাত্রা শুরু করেন।
উভয় পক্ষের সৈন্য সংখ্যা : এ যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১০০০ জন। তাদের মধ্যে ২০ জন ছিলেন অশ্বারোহী, ১০০ জন ছিলেন বর্মধারী, ৫০ জন ছিলেন তীরন্দাজ এবং বাকিরা ছিলেন সাধারণ সৈন্য। রাসূলুল্লাহ এ বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে উহুদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে যখন 'শাওত' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন তাঁরা কুরাইশ বাহিনীর দেখা পেলেন। এতে কুরাইশদের সৈন্যের আধিক্য দেখে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা খুবই ভীত হয়ে গেল। এমনকি তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। অবশেষে সে তার ৩০০ জন অনুসারীকে নিয়ে পিছু হটে গেল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ ৭০০ জন সৈন্য নিয়েই যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হন।
অপর দিকে কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মুসলিমদের থেকে তিন ডাবল অর্থাৎ ৩০০০। তাদের মধ্যে ৭০০ জন ছিল বর্মধারী, ৩০০ জন ছিল উষ্ট্রারোহী, ২০০ জন ছিল অশ্বারোহী এবং বাকি সবাই সাধারণ সৈন্য। সৈনিকদেরকে উৎসাহিত করার জন্য অনেক কুরাইশ নারী ও কবিও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
রাসূলুল্লাহ এর সেনা বিন্যাস : যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ মুনাফিকদের কাছ থেকে এমন হঠকারিতার শিকার হয়েও অবশেষে উহুদের ময়দানে গিয়ে নিজেদের শিবির স্থাপন করেন। প্রথমে তিনি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ইবনে নুমান আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজকে মুসলিমদের শিবির থেকে পূর্ব-দক্ষিণে ১৫০ মিটার দূরত্বে 'জাবালে রুমাত' নামক একটি ছোট পাহাড়ের কাছে অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেন। কেননা ঐ পাহাড়ের মধ্যে একটি গিরিপথ ছিল। যদি শত্রুরা ঐদিক থেকে কোন আক্রমণ করার সুযোগ পায়, তাহলে তারা মুসলিম বাহিনীকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলবে। সুতরাং এ দিক থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন ছিল। সেজন্য রাসূলুল্লাহ এ দলটিকে বলে দিলেন যে, তোমরা আমাদের পেছনের দিকটি রক্ষা করবে। যদি তোমরা দেখতে পাও যে, আমরা গনীমতের মাল একত্রিত করছি, তারপরও তোমরা আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করবে না। আর যদি এও দেখ যে, আমরা মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছি, তবুও তোমরা এই স্থান ত্যাগ করবে না।"৭১
এরপর তিনি দক্ষিণ বাহুর উপর মুনযির ইবনে আমর (রাঃ)-কে এবং বাম বাহুর উপর যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ)-কে নিযুক্ত করেন। তারপর তিনি মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ)-কে তার সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ তাঁর সেনাবাহিনী বিন্যাস করেন। আর এজন্য অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাটি বেছে নেন এবং কুরাইশ বাহিনীকে নিচু জায়গাতে অবস্থান করতে বাধ্য করেন। যাতে তারা মুসলিমদের উপর তেমন একটা সুবিধা করতে না পারে।
আসাল্লাম অতঃপর রাসূলুল্লাহ নয়জন দেহরক্ষী নিয়ে পেছনে অবস্থান নেন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি অবলোকন করতে থাকেন। তাদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন আনসার এবং ২ জন ছিলেন মুহাজির। ৭২
কুরাইশদের সেনাবাহিনী : এদিকে কুরাইশরাও তাদের সেনাবাহিনী বিন্যাস করছিল। তাদের সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান। সে নিজের কেন্দ্র স্থাপন করেছিল সেনাবাহিনীর ঠিক মধ্যস্থলে। তার দক্ষিণ বাহুর উপর ছিল খালিদ ইবনে ওয়ালীদ এবং বাম বাহুর উপর ছিল ইকরামা ইবনে আবু জাহেল। পদাতিক বাহিনীর সেনাপতি ছিল সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া। আর তীরন্দাজদের নেতা ছিল আবদুল্লাহ ইবনে রাবীয়া। এটা ছিল একটি অতি সাধারণ সেনা বিন্যাস, যা মুসলিমদের মতো ততটা কৌশলপূর্ণ নয়।
চূড়ান্ত যুদ্ধ : দিনটি ছিল হিজরী ৩য় বর্ষের শাওয়াল মাসের ৭ তারিখ শনিবার। উভয় দল কাতারবন্দী হয়ে একে অপরের মুখোমুখি হলেন। এমন সময় মুশরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বীরপুরুষ তালহা ইবনে আবু তালহা আবদারী নামক এক ব্যক্তি উষ্ট্রের উপর আরোহণ করে হুংকার দিয়ে তার মোকাবেলা করার জন্য একজনকে আহ্বান জানাল। তখন তার অত্যধিক বীরত্বের কারণে সাধারণ সাহাবীগণ তার সাথে মোকাবেলা করার সাহস করলেন না। কিন্তু হঠাৎ যুবায়ের (রাঃ) তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাকে সামান্য সময়ের অবকাশ না দিয়েই লাফ দিয়ে তার উষ্ট্রের উপর চড়ে বসলেন এবং তাকে নিজের আয়ত্বের মধ্যে নিয়ে নিলেন। অতঃপর তাকে ভূমিতে ফেলে দিয়ে তরবারি দিয়ে দু'টুকরো করে ফেললেন। এতে রাসূলুল্লাহ খুবই আনন্দিত হলেন এবং সকলেই তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলেন। এর পরপরই শুরু হয় একযোগে আক্রমণ। মুসলিমগণ খুবই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে মুশরিকদের মধ্যে যে ব্যক্তিই পতাকা উত্তোলন করার চেষ্টা করছিল, মুসলিমরা তাকেই হত্যা করে ফেলছিলেন। এমনকি এক সময় তাদের পতাকা উত্তোলন করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকল না। এভাবে যুদ্ধের শুরু থেকেই মুশরিকরা মুসলিমদের আক্রমণের শিকার হচ্ছিল এবং ক্রমেই পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
রাসূলুল্লাহ এর তরবারি প্রদান: যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে আহ্বান করে বললেন, কে আছ আমার এই তরবারি গ্রহণ করবে? তখন সাহাবীগণ তা গ্রহণ করার জন্য একত্রিত হলেন। এ সময় আবু দুজানা সিমাক বিন খারাশা (রাঃ) বলে উঠলেন, আমি একে তার হকসহ গ্রহণ করব। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে তরবারিটি প্রদান করলেন। অতঃপর তিনি উক্ত তরবারি দ্বারা মুশরিকদের মাথা বিদীর্ণ করতে লাগলেন। ৭৩
হামযা (রাঃ) এর শাহাদাত : হামযা (রাঃ) ছিলেন মুশরিকদের জন্য ভীতির অন্যতম কারণ। এ যুদ্ধে তিনিও বেশ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এবং বড় বড় মুশরিককে হত্যা করে যাচ্ছিলেন। এক সময় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তবে তার শাহাদাতটি অন্যান্য মুসলিমের শাহাদাতের মতো ছিল না; বরং তাকে কাপুরুষের মতো মারা হয়েছিল। তাকে হত্যা করেছিল ওয়াহশী নামে এক হাবশী ক্রীতদাস। কিন্তু পরবর্তীতে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ঘটনাটি ছিল এই যে, ওয়াহশী ছিল জুবাইর ইবনে মুতইমের ক্রীতদাস। বদর যুদ্ধে হামযা (রাঃ) যখন জুবাইর ইবনে মুতইমের চাচা উমাইয়া ইবনে আদী ইবনে খিয়ারকে হত্যা করেন তখন সে ওয়াহশীকে বলে, যদি তুমি আমার চাচার বিনিময়ে মুহাম্মাদ এর চাচা হামযাকে হত্যা করতে পার, তাহলে তুমি মুক্ত। অতঃপর মক্কাবাসীরা যখন উহুদ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হয়, তখন ওয়াহশীও তাদের সাথে যাত্রা শুরু করে। তারপর যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তখন ওয়াহশী হামযা (রাঃ)-কে হত্যা করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে এবং এ উদ্দেশ্যে সে একটি পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে। অতঃপর হামযা (রাঃ) যখন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ওয়াহশীর নিকটবর্তী হন, তখন ওয়াহশী তাকে পেছন দিক থেকে বর্শা দ্বারা এত জোরে আঘাত করে যে, বর্শাটি তার মূত্রথলি ভেদ করে দু'নিতম্বের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর এতেই হামযা (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন। ৭৪
মুশরিকদের পরাজয় : এভাবে কিছুক্ষণ ভয়ানক যুদ্ধ চলতে থাকে এবং মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। মুশরিকরা তাদের মনোবল হারাতে থাকে, এমনকি এক সময় তারা পলায়ন করতে শুরু করে। ফলে মুসলিমরা তাদের ফেলে যাওয়া ধনসম্পদ তথা গনীমত সংগ্রহ করতে থাকে।
তীরন্দাজ বাহিনীর ভুল : এতক্ষণ পর্যন্ত পাহাড়ের উপর দায়িত্বরত তীরন্দাজগণ ভালোভাবেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। এমনকি তারা তিন বার খালিদ বিন ওয়ালীদের আক্রমণের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। কিন্তু যখনই তারা অন্যান্য মুসলিমদেরকে গনীমত সংগ্রহের জন্য ছুটাছুটি করতে দেখলেন তখন তারাও রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশকে ভুলে গিয়ে গনীমত সংগ্রহ করার জন্য চলে গেলেন। আর এ কারণেই পরবর্তীতে তাদেরকে বিরাট খেসারত দিতে হয়েছিল।
খালিদ বিন ওয়ালীদের পাল্টা আক্রমণ : যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ এবং মুশরিকরা যখন পরাজয় বরণ করার অপেক্ষায়, ঠিক এমন সময় খালিদ বিন ওয়ালীদ গিরিপথে অবস্থানরত মুসলিম তীরন্দাজদের এ ভুলের সুযোগ গ্রহণ করেন। আর খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) তখনও মুশরিকদের দলভুক্ত ছিলেন। তিনি এ সুযোগে ঐ গিরিপথ দিয়ে অতর্কিতভাবে হামলা চালিয়ে মুসলিমদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। এতে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এদিকে আমরাহ বিনতে আলকামা নামে এক কুরাইশ মহিলা এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করে তাদের পতাকাটি আবার তুলে ধরে। এতে মুশরিকরা সে পতাকাতলে একত্রিত হয়ে আবার শক্তি সঞ্চয় করে মুসলিমদের উপর আক্রমণ চালায়। ফলে মুসলিমরা সামনে এবং পেছনে দুই দিক থেকেই আক্রমণের শিকার হয়ে মহাবিপদের মধ্যে পড়ে যান।
মুসলিম বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা : মুশরিকদের এ ধরনের পাল্টা আক্রমণের কারণে মুসলিমরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরক্ষণেই তারা দিশেহারা হয়ে এদিক সেদিক ছুটতে থাকেন। অনেকে আবার মুশরিকদের কাতারে ঢুকে পড়েন। এতে মুসলিম অথবা মুশরিক নির্ণয় করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মুশরিকরা আক্রমণ করে অনেক মুসলিমকে শহীদ করে ফেলে। এ সময় বিশৃঙ্খলা এতই বেশি হয়ে গিয়েছিল যে, এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ এর সাথে কেবল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ এবং সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) ছাড়া আর কেউই অবশিষ্ট ছিলেন না। ফলে এই সুযোগে মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ-কে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং তারা তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এটা লক্ষ্য করে কয়েকজন সাহাবী এগিয়ে আসেন এবং একে একে শহীদ হতে থাকেন। এ সময় উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহ এর উপর পাথর নিক্ষেপ করেছিল। এতে রাসূলুল্লাহ এর ডান দিকের রুবাঈ দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। অবশেষে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ) এর বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে রাসূলুল্লাহ সে পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পান।
সাহাবীগণের একত্রিত হওয়া: যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রধান প্রধান সাহাবীগণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তাঁরা প্রথম কাতারে লড়াই করার কারণে পেছনে রাসূলুল্লাহ এর সংবাদ জানা সম্ভব হচ্ছিল না। তারপর যখনই তাঁরা রাসূলুল্লাহ এর এমন সংকটময় অবস্থার কথা অবগত হলেন, তখনই তাঁরা রাসূলুল্লাহ এর নিকট একত্রিত হতে শুরু করলেন।
রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যুর গুজব : এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ একটি গর্তে পড়ে যান। এতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে অনেক সাহাবী মনোবল হারিয়ে ফেলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ * وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ)
মুহাম্মাদ একজন রাসূল ব্যতীত কিছুই নয়, নিশ্চয় তার পূর্বেও অনেক রাসূল গত হয়ে গেছে। অনন্তর যদি সে মৃত্যুবরণ করে অথবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, তাতে সে আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারবে না। অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কার প্রদান করবেন। (সূরা আলে ইমরান- ১৪৪) অবশেষে যখন এহেন চরম পরিস্থিতির অবসান ঘটে তখন মুশরিকরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
এদিকে রাসূলুল্লাহ মুশরিকদের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখছিলেন যে, তারা আবার মদিনায় আক্রমণ করে কি না। অতঃপর যখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, তারা আর মদিনার দিকে আসছে না, তখন তিনি সাহাবীগণকে নিয়ে মদিনায় ফেরত আসলেন।
ফলাফল: এ যুদ্ধে কোন পক্ষই চূড়ান্তভাবে জয় লাভ করতে পারেনি। এ যুদ্ধে মুসলিমগণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। সে সময় তাদের মধ্য হতে ৭০ জন মতান্তরে ৭৪ জন শহীদ হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে কুরাইশদের মধ্য হতে ২২ জন মতান্তরে ২৭ জন লোক নিহত হয়েছিল।
টিকাঃ
৭১ সহীহ বুখারী, হা/৩০৩৯।
৭২ সহীহ মুসলিম, হা/১৭৮৯।
৭৩ সহীহ মুসলিম, হা/২৪৭০।
৭৪ সহীহ বুখারী, হা/৪০৭২।