📄 যুদ্ধের অনুমতি
কুরাইশদের পক্ষ থেকে যখন বারবার হুমকি আসতেই থাকল তখন মদিনাবাসী তথা মুসলিমদের নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও তাদের জিহাদ করার অনুমতি ছিল না। ফলে মুসলিমরা একটি যুদ্ধের অনুমতি কামনা করছিলেন। অবস্থার এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দিয়ে দিলেন। তিনি বলেন,
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ - الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ﴾
তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো, যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি হতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। (সূরা হাজ্জ- ৩৯, ৪০)
যুদ্ধের জন্য এ ধরনের অনুমতি পাওয়ার পরই রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মদিনার আশেপাশে বসবাসরত গোত্রগুলোর সাথে যুদ্ধে না জড়ানোর ব্যাপারে তাদের সাথে চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন এবং মদিনার রাজপথে টহলদারী দল প্রেরণ করেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রেরিত প্রথম সারিয়া
সারিয়া বলা হয় ঐসব অভিযানকে, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ নিজে অংশগ্রহণ করেননি; বরং অন্য কোন সাহাবীকে নেতৃত্ব প্রদান করে একটি দল প্রেরণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম এ ধরনের দল প্রেরণ করেন হিজরী ১ম বর্ষের রমাযান মাস মোতাবেক ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে। এ অভিযান পরিচালনার জন্য তিনি চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তাঁর অধীনে ৩০ জন মুহাজির সৈন্য প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া থেকে আগত কুরাইশ কাফেলার গতিবিধি লক্ষ্য রাখা। অপরদিকে কুরাইশ দলটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০০ জন। তাদের নেতা ছিল আবু জাহেল। অতঃপর ঈস নামক জায়গায় উভয় দলের সাক্ষাৎ ঘটে। অবশেষে উভয় দলের মিত্র জুহাইনা গোত্রের নেতা মাজদী ইবনে আমর এর মধ্যস্থতায় উত্তেজনার অবসান ঘটে।
📄 যুদ্ধ ফরয হওয়ার ঘোষণা
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাক্বারা- ১৯০)
এখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কাজে তোমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়, আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান অনুযায়ী তোমরা জীবনব্যবস্থার সংস্কার ও সংশোধন করতে চাও বলে যারা তোমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তোমাদের সংশোধন ও সংস্কার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য যুলুম-অত্যাচার চালাচ্ছে, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। এর আগে মুসলমানরা যতদিন দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত ছিল, ততদিন তাদেরকে কেবলমাত্র ইসলাম প্রচারের হুকুম দেয়া হয়েছিল এবং বিপক্ষের যুলুম-নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করার তাকীদ করা হয়েছিল। এখন মদিনায় তাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, যারাই এ সংস্কারমূলক দাওয়াতের পথে সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করছে অস্ত্র দিয়েই তাদের জবাব দাও। এরপরই অনুষ্ঠিত হয় বদরের যুদ্ধ। তারপর একের পর এক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতেই থাকে।
📄 বদর যুদ্ধ
বদর হচ্ছে মক্কা এবং মদিনার মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম। এটি মদিনা থেকে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ এর জীবনে এটিই ছিল কুরাইশদের সাথে সর্বপ্রথম বড় যুদ্ধ। নিম্নে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
প্রেক্ষাপট:
মক্কাবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল সিরিয়া। আর এ উভয় শহরের যোগাযোগ পথেই মদিনার অবস্থান। সুতরাং সিরিয়া যাতায়াত করার জন্য মক্কাবাসীকে মদিনা অতিক্রম করেই যেতে হয়। একদা রাসূলুল্লাহ সংবাদ পেলেন যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় আগমন করছে। অতঃপর তিনি এও সংবাদ পেলেন যে, সে কাফেলায় মক্কাবাসীদের প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। তাতে রয়েছে, এক হাজার উট এবং প্রতিটি উট কমপক্ষে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা মূল্যের মালপত্র বহন করছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য কাফেলার সাথে ৪০ জন কর্মীও রয়েছে।
অতএব মদিনাবাসীদের জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ। যদি এগুলো ছিনিয়ে নিতে পারে তাহলে তারা সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে যেতে পারবে। পক্ষান্তরে কুরাইশদের জন্য ছিল এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। কেননা এ কাফেলার সমস্ত মালপত্রের সাথে মক্কাবাসী সবাই অংশীদার ছিল। এসব বিভিন্ন দিক চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দেন যে, সিরিয়া থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তনকারী একটি কুরাইশ কাফেলার সাথে প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। সুতরাং তোমরা এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ো। হয়তো আল্লাহ তা'আলা গনীমত হিসেবে এসকল মালপত্র তোমাদের হাতে দিয়ে দেবেন।
এ ঘোষণার পরপরই মুসলিমগণ নিজ নিজ ইচ্ছানুযায়ী প্রস্তুতি নিতে থাকে। এদিকে মক্কার কুরাইশরা যখন এ সংবাদ পেল যে, মুসলিমরা তাদের বাণিজ্য কাফলাকে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তারাও সাথে সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিল এবং মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এ দলটিকেই মুসলিমদের মুখোমুখি করে দিলেন।
এ যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। তাদের মধ্যে ৮২ জন, মতান্তরে ৮৩ অথবা ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির। আর অন্যরা ছিলেন আনসার। তাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্বয়ং নবী
পক্ষান্তরে কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৩০০। তাদের কাছে ছিল ১০০ ঘোড়া এবং ৬০০ লৌহবর্ম। তাছাড়া অসংখ্য উটও ছিল। তাদের সর্বাধিনায়ক ছিল আবু জাহেল ইবনে হিশাম।
বদর অভিমুখে যাত্রা : এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ যুদ্ধের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ছাড়াই মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করেন। পক্ষান্তরে কুরাইশরা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বিশাল শক্তিশালী একটি বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে রওয়ানা হয়।
কুরাইশদের মতভেদ : যখন আবু সুফিয়ান তার বাণিজ্য কাফেলাকে নিরাপদে মুসলিম বাহিনী থেকে এড়িয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো, তখন পথিমধ্যে যুদ্ধের জন্য আগত কুরাইশ বাহিনীর সাথে তার সাক্ষাত হয়ে যায়। তখন কুরাইশদের অনেকেই মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু কুরাইশদের নেতা আবু জাহেল যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেয়। যার ফলে কুরাইশদের সফরসূচী পূর্বের অবস্থাতেই বহাল থাকে এবং তারা মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য যাত্রা অব্যাহত রাখে।
মুসলিম বাহিনীর বিব্রতকর অবস্থা : পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কে এবং কুরাইশদের সেনাবাহিনী সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত হন। এতে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণও অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েন। কিন্তু পরক্ষণেই এর ফলাফলের কথা চিন্তা করে আল্লাহর বিশেষ রহমতে যুদ্ধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে যান। কেননা এ পরিস্থিতিতে যদি কুরাইশ বাহিনীকে ছেড়ে দেয়া হয় অথবা তাদের হাতে পরাজয় বরণ করা হয়, তাহলে মদিনায় মুসলিমদের আধিপত্য অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যাবে এবং রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতী কাজকর্মও স্তিমিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কুরাইশদের সাথে লড়াই করে তাদের উপর বিজয়ী হওয়া যায়, তাহলে আরব ভূমিতে মুসলিমদের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রও অনেক গুণ প্রশস্ত হবে। এসব বিভিন্ন দিক চিন্তা করে মুসলিমদের উপর এ যুদ্ধ করাটা একেবারেই আবশ্যক হয়ে উঠে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য সাহাবীদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে সকলেই রাসূলুল্লাহ এর সিদ্ধান্তের প্রতি একমত পোষণ করেন এবং এতে দৃঢ় থাকার জন্য অঙ্গীকার প্রদান করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ আল্লাহর উপর ভরসা করে তাদেরকে নিয়ে বদর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
মুসলিম বাহিনীর অবস্থান : অতঃপর রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে বদর অভিমুখে খুব দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। যাতে করে সেখানে সর্বপ্রথম তাঁরাই অবস্থান নিতে পারেন এবং সেখানে অবস্থিত ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। কেননা সেখানকার পানি সংগ্রহের একমাত্র ব্যবস্থা ছিল ঝর্ণা। সুতরাং যদি ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নেয়া যায়, তাহলে শত্রু পক্ষকে অনেকটা সংকটে ফেলা সম্ভব হবে। তারপর দেখা গেল যে, মুসলিম বাহিনীই সেখানে সর্বাগ্রে গমন করে শিবির স্থাপন করেন এবং ঝর্ণা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তারপর তারা সেখানে নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে রাসূলুল্লাহ এর জন্য এমন একটি জায়গায় ছাউনী নির্মাণ করেন, যেখান থেকে সম্পূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান : পক্ষান্তরে কুরাইশ বাহিনী উপত্যকার বাইরের দিকে শিবির স্থাপন করে। ফলে তারা উক্ত উপত্যকার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ : উভয় পক্ষ নিজ নিজ শিবিরে অবস্থান নেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা উক্ত রাতেই মুষল ধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। যা ছিল মুসলিমদের জন্য রহমতস্বরূপ এবং কুরাইশদের জন্য আযাবস্বরূপ। কেননা এর কারণে মুসলিমরা আরো অতিরিক্ত সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। আর তা হলো, মুসলিম বাহিনী যেখানে অবস্থান করছিল, সে স্থানটি ছিল বালুময় এবং উঁচুভূমি। সেখানে বৃষ্টি হওয়ার ফলে বালুর স্তরগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং মুসলিম বাহিনীর চলাচলের ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়।
পক্ষান্তরে কুরাইশ বাহিনী যেখানে অবস্থান করছিল সেটি ছিল নিচুভূমি। বৃষ্টি বর্ষণের কারণে সেখানে কাদা জমে যায় এবং তাদের চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়।
চূড়ান্ত যুদ্ধ : অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উভয় বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হয়। দিনটি ছিল হিজরী ২য় বর্ষের ১৭ই রমাযান শুক্রবার সকাল। এর আগে রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে যথাযথভাবে কাতারবন্দী করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। তারপর যখন উভয় দল পরস্পর মুখোমুখি হলো, তখন নিয়মানুযায়ী উভয় দলের পক্ষ থেকে তিনজন করে এগিয়ে আসলো। প্রথমে কুরাইশদের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসলো- উতবা, শায়বা এবং তার পুত্র ওয়ালীদ। তারপর তারা মুসলিমদের মধ্য থেকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানালে প্রথমে আউফ ইবনে হারিস (রাঃ), মু'আব্বির ইবনে হারিস (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এগিয়ে আসলেন। কিন্তু কুরাইশরা এদেরকে বাদ দিয়ে তাদের সমগোত্রিয় কাউকে এগিয়ে আসতে বলল। তখন রাসূলুল্লাহ এর অনুমতিক্রমে হামযা (রাঃ), উবাদা ইবনে হারিস (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) এগিয়ে আসলেন। অতঃপর তাদের মধ্যে মুখোমুখি যুদ্ধ বেধে গেল। এতে মুসলিমগণ তিন প্রতিপক্ষকেই হত্যা করে ফেলেন এবং তাঁরা জয় লাভ করেন।
এরপর শুরু হয় যুদ্ধের মূল পর্ব। যখন কুরাইশরা দেখল যে, তাদের নেতাগণ পরাজিত হয়েছে তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে একযোগে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফলে তাদের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ এর দু'আ: এদিকে রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দী করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন যে, হে আল্লাহ! তুমি আমার সাথে যে অঙ্গীকার করেছ, তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার পূর্ণ করার জন্য প্রার্থনা করছি।
তারপর যখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ পুনরায় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ মর্মে প্রার্থনা করলেন যে, হে আল্লাহ! এ দলটিকে যদি আজ তুমি ধ্বংস করে দাও, তাহলে আর তোমার উপাসনা করা হবে না। হে আল্লাহ! তুমি যদি এটাই চাও, তাহলে আজকের পর আর কখনো তোমার ইবাদাত করা হবে না।
ফেরেশতাদের অবতরণ : অতঃপর রাসূলুল্লাহ এর একটু তন্দ্রা আসলো। ফলে তিনি মাথা হেলিয়ে দিলেন। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আবু বকর! খুশি হয়ে যাও। ইনি হলেন জিবরাঈল, তার দেহ ধুলো-বালিতে ভরপুর। অর্থাৎ জিবরাঈল (আঃ) ফেরেশতাদের নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তারপর রাসূলুল্লাহ লৌহ বর্ম পরিহিত অবস্থায় ছাউনী থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদেরকে উৎসাহ দিতে লাগলেন।
ইবলিসের পলায়ন : যুদ্ধ শুরুর পূর্বে অভিশপ্ত ইবলিস সোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জুশুম মুদলিজীর আকৃতিতে উপস্থিত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তারপর যখন সে ফেরেশতাদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করল তখন পেছনে ফিরে পলায়ন করতে থাকল। তখন মুশরিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমি যা দেখছি, তোমরা তা দেখছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করি; তিনি কঠিন শাস্তিদাতা।
কুরাইশ দলের বিশৃঙ্খলতা : এরপর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কুরাইশ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল এবং তাদের পরাজয়ের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকল। তারপর এক সময় তারা পিছু হটতে থাকল, এমনকি দৌড়ে পালাতে লাগল। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে হত্যা, জখম ও বন্দী করতে করতে পিছু ধাওয়া করে চলতে লাগলেন।
ফলাফল : অবশেষে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। মুসলিমরা কুরাইশদের সকল গর্ব ও অহংকার ভেঙ্গে দিয়ে তাদের উপর বিজয়ী হলেন। ফলে কুরাইশরা চরমভাবে লাঞ্ছিত হলো। এ যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। তার মধ্যে ৬ জন ছিলেন মুহাজির এবং ৮ জন ছিলেন আনসার। পক্ষান্তরে কুরাইশরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে আবু জাহেল, উতবা ও শায়বা প্রভৃতি নেতৃবৃন্দরা ছিল অন্যতম।
গনীমতের সম্পদ বণ্টন : সে সময়ের নিয়মানুযায়ী রাসূলুল্লাহ যুদ্ধ শেষ করে তিনদিন পর্যন্ত বদরের প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন এবং তখনও তিনি মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেননি, এমন সময় রাসূলুল্লাহ গনীমতের সম্পদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন যে, যার কাছে যা আছে সে যেন তা তাঁর কাছে জমা দেয়। তখন সাহাবীগণ তা-ই করলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা এর সামাধানে এ আয়াত নাযিল করেন-
يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّসُوْلِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ ۚ وَأَطِيْعُوا اللَّهَ وَرَسُوْلَهٗ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ﴾ লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তাদেরকে বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূলের জন্য। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারস্পরিক বিষয় সংশোধন করে নাও। আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হও। (সূরা আনফাল- ১)
রাসূলুল্লাহ এর কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যু: রাসূলুল্লাহ যখন এ যুদ্ধে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন রুকাইয়া (রাঃ) অসুস্থ ছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ তার স্বামী উসমান (রাঃ)-কে সেবা-শুশ্রূষার জন্য মদিনায় রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ যখন যুদ্ধে বিজয় লাভ করে মদিনায় ফিরছিলেন তখন তাঁর নিকট কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে। তারপর মদিনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ তার দাফন কার্য সম্পাদন করেন।
টিকাঃ
৯ বায়হাকী, হা/১৮৩৬৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৯৫৯।