📄 মদিনা সনদ
রাসূলুল্লাহ আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপনের পর আরো একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, যা ছিল মদিনায় বসবাসকারী মুসলিম ও অমুসলিম সকলের জন্য প্রযোজ্য। আর এ চুক্তিটিই ইতিহাসে মদিনা সনদ হিসেবে খ্যাত। এ সনদের ধারা ছিল সর্বমোট ৫১টি। নিম্নে বিশেষ বিশেষ কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো :
১. মদিনায় বসবাসকারী সকলেই অন্যদের মোকাবেলায় এক উম্মত হিসেবে গণ্য হবে।
২. কুরাইশ মুহাজিরগণ পূর্বের মতো নিজেদের মধ্যে রক্তপণ আদায় করবে ও তাদের বন্দীদের মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাদেরকে মুক্ত করবে এবং আনসারদের সকল গোত্রও পূর্বের মতো নিজেদের মধ্যে রক্তপণ আদায় করে পরস্পর দোষমুক্ত হবে।
৩. ঈমানদারগণ কোন সহায় সম্পদহীনকে মুক্তিপণ ও দিয়াত প্রদানের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন এবং সম্মান করা থেকে বিমুখ হবে না।
৪. সকল ধর্মপ্রাণ মুমিন ঐ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ করবে, যারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে অন্যায়, অত্যাচার, পাপাচার ও গণ্ডগোলের পথ বেছে নেবে।
৫. মুমিনগণ তাদের বিরুদ্ধে কাজ করবে, যদিও তাদের মধ্যে কেউ আপন পুত্রও হয়।
৬. কোন কাফিরের পরিবর্তে কোন মুমিনকে হত্যা করা যাবে না।
৭. যেসকল ইয়াহুদি মুসলিমদের অনুগামী হবে, তাদেরকে প্রয়োজনে সাহায্য করতে হবে এবং তারা অন্য মুসলিমদের মতো হয়ে যাবে। তাদের প্রতি কোন অন্যায় করা যাবে না কিংবা তাদের বিরুদ্ধে অন্যকে সাহায্যও করা যাবে না।
৮. মুসলিমদের সম্পাদিত সন্ধি হবে একই। কোন মুসলিম কোন মুসলিমকে বাদ দিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধের ব্যাপারে কোন সন্ধি করবে না; বরং সকলে সমতা ও ন্যায়ের উপর ভিত্তি করেই তা করবে।
৯. মুসলিমরা ঐ রক্তপাতের ব্যাপারে সমান অধিকার রক্ষা করবে, যা আল্লাহর পথে প্রবাহিত হবে।
১০. কোন কুরাইশ মুশরিককে আশ্রয় দেবে না, তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে সাহায্য করবে না। আর কোন মুমিনের হেফাযতের ব্যাপারে মুশরিকদেরকে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড় করাবে না।
১১. যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে হত্যা করে এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার নিকট থেকে হত্যার বদলা গ্রহণ করা হবে, যদি নিহতের অভিভাবক তাতে রাজি থাকে।
১২. কোন মুমিনের জন্য এটি সঙ্গত হবে না যে, যারা গণ্ডগোল সৃষ্টি করে তাদের কার্যকলাপে সাহায্য করবে অথবা তাকে আশ্রয় দেবে কিংবা যে তাকে সাহায্য করে তাকে আশ্রয় দেবে। যে এরূপ করবে কিয়ামতের দিন সে অভিশাপ ও গযবে পতিত হবে এবং তার ফরয ও নফল কোন ইবাদাতই কবুল হবে না।
১৩. তোমাদের মধ্যে যখনই কোন মতভেদ পরিলক্ষিত হবে, তখনই তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিধিবিধান মতো ফায়সালার ব্যবস্থা করবে।
১৪. কেউ কারো উপর যুলুম করলে মাযলুমকে সাহায্য করা হবে।
১৫. চুক্তি চলাকালীন সময় চুক্তিবদ্ধ কোন পক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সকলকেই এর খরচ বহন করতে হবে।
এ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মদিনায় বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের উপর নেমে আসে কেবল শান্তি আর শান্তি। তাদের মাঝে চলমান সকল ধরনের ঝগড়া-বিবাদের বিলুপ্তি ঘটে এবং মদিনা একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যার পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ।
📄 যুদ্ধের অনুমতি
কুরাইশদের পক্ষ থেকে যখন বারবার হুমকি আসতেই থাকল তখন মদিনাবাসী তথা মুসলিমদের নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও তাদের জিহাদ করার অনুমতি ছিল না। ফলে মুসলিমরা একটি যুদ্ধের অনুমতি কামনা করছিলেন। অবস্থার এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দিয়ে দিলেন। তিনি বলেন,
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ - الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ﴾
তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো, যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি হতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। (সূরা হাজ্জ- ৩৯, ৪০)
যুদ্ধের জন্য এ ধরনের অনুমতি পাওয়ার পরই রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মদিনার আশেপাশে বসবাসরত গোত্রগুলোর সাথে যুদ্ধে না জড়ানোর ব্যাপারে তাদের সাথে চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন এবং মদিনার রাজপথে টহলদারী দল প্রেরণ করেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রেরিত প্রথম সারিয়া
সারিয়া বলা হয় ঐসব অভিযানকে, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ নিজে অংশগ্রহণ করেননি; বরং অন্য কোন সাহাবীকে নেতৃত্ব প্রদান করে একটি দল প্রেরণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম এ ধরনের দল প্রেরণ করেন হিজরী ১ম বর্ষের রমাযান মাস মোতাবেক ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে। এ অভিযান পরিচালনার জন্য তিনি চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তাঁর অধীনে ৩০ জন মুহাজির সৈন্য প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া থেকে আগত কুরাইশ কাফেলার গতিবিধি লক্ষ্য রাখা। অপরদিকে কুরাইশ দলটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০০ জন। তাদের নেতা ছিল আবু জাহেল। অতঃপর ঈস নামক জায়গায় উভয় দলের সাক্ষাৎ ঘটে। অবশেষে উভয় দলের মিত্র জুহাইনা গোত্রের নেতা মাজদী ইবনে আমর এর মধ্যস্থতায় উত্তেজনার অবসান ঘটে।
📄 যুদ্ধ ফরয হওয়ার ঘোষণা
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাক্বারা- ১৯০)
এখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কাজে তোমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়, আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান অনুযায়ী তোমরা জীবনব্যবস্থার সংস্কার ও সংশোধন করতে চাও বলে যারা তোমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তোমাদের সংশোধন ও সংস্কার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য যুলুম-অত্যাচার চালাচ্ছে, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। এর আগে মুসলমানরা যতদিন দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত ছিল, ততদিন তাদেরকে কেবলমাত্র ইসলাম প্রচারের হুকুম দেয়া হয়েছিল এবং বিপক্ষের যুলুম-নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করার তাকীদ করা হয়েছিল। এখন মদিনায় তাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, যারাই এ সংস্কারমূলক দাওয়াতের পথে সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করছে অস্ত্র দিয়েই তাদের জবাব দাও। এরপরই অনুষ্ঠিত হয় বদরের যুদ্ধ। তারপর একের পর এক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতেই থাকে।