📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মসজিদে নববী নির্মাণ

📄 মসজিদে নববী নির্মাণ


রাসূলুল্লাহ মদিনায় হিজরত করার পর সর্বপ্রথম যে কাজটি করলেন সেটি হচ্ছে, মসজিদ নির্মাণ। আর এজন্য তিনি ঐ জায়গাটিকেই বেছে নিলেন, যেখানে তাঁর উটনী সর্বপ্রথম বসেছিল। ঐ স্থানটির মালিক ছিল দুজন ইয়াতীম বালক। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ স্থানটি তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ক্রয় করে নিলেন।
ঐ জায়গায় মুশরিকদের কয়েকটি কবর ছিল এবং কিছু অংশ পতিতও ছিল। তাছাড়া এতে খেজুর ও গারকাদ নামক গাছও ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ মুশরিকদের কবরগুলো পরিষ্কার করে নিলেন এবং পতিত জায়গাটি সমতল করলেন। অতঃপর খেজুর ও অন্যান্য গাছগুলো কেটে মসজিদ নির্মাণের জন্য খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেন। এ মসজিদের দরজার দুই বাহুর স্তম্ভগুলো ছিল পাথর দ্বারা এবং দেয়ালগুলো ছিল কাঁচা ইট দ্বারা নির্মিত। আর এর ছাদ তৈরি করা হয়েছিল খেজুর গাছের ডালপালা দ্বারা এবং মেঝেতে বিছানো হয়েছিল বালি ও ছোট ছোট কাঁকর। এতে তিনটি দরজা লাগানো হয়েছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি মসজিদ এর পাশ দিয়ে আরো কিছু ঘর নির্মাণ করলেন। আর এগুলোই ছিল রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রীদের আবাসগৃহ। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ এসব নির্মাণ কাজে নিজেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 আযানের প্রবর্তন

📄 আযানের প্রবর্তন


মসজিদ নির্মাণের পর সাহাবীগণ নিজ নিজ দায়িত্বে নামাযের সময় হলে মসজিদে চলে আসতেন। কিন্তু এতে তাদেরকে বেশ সমস্যায় ভুগতে হতো। ফলে একদিন তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আহ্বানের জন্য পরামর্শসভায় একত্র হন। তখন সাহাবীগণ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেন। কেউবা খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা বাজাতে বলেন, কেউবা ইয়াহুদিদের মতো শিঙ্গা ব্যবহার করতে বলেন, আবার কেউবা ঝাণ্ডা উড়াতে বলেন। কিন্তু কোন পরামর্শই রাসূলুল্লাহ এর মনঃপুত না হওয়ায় ঐ দিনের মতো পরামর্শসভা স্থগিত রাখা হয়।
অতঃপর সে রাতেই আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ) স্বপ্নে দেখেন যে, এক ব্যক্তি একটি “নাকূশ” হাতে নিয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি এটি আমার কাছে বিক্রি করবে? লোকটি প্রশ্ন করল, এটা নিয়ে তুমি কী করবে? জবাবে তিনি বললেন, ওটা দিয়ে আমরা লোকদেরকে সালাতের দিকে আহ্বান জানাব। তখন লোকটি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম পন্থা বলে দেব? আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। তখন ঐ ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ)-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিল এবং কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, যখন লোকজন জামা'আতে সমবেত হয়ে যাবে তখন এই বাক্যগুলো ইকামত হিসেবে বলবে।
এভাবে ঐ ব্যক্তিটি আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ)-কে আলাদা-আলাদাভাবে “আযান” এবং “ইকামত” এর বাক্যসমূহ শিখিয়ে দিয়েছিল।
অতঃপর সকাল হওয়া মাত্র, আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কাছে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। সব শুনে নবী বললেন, এটা সত্য স্বপ্ন; ইনশা-আল্লাহ্- এখন তুমি বিলাল এর কাছে যাও এবং স্বপ্নে যেভাবে শুনেছ, ঠিক সেভাবে তাকে শিখিয়ে দাও। যাতে সে ঐ বাক্যগুলো ব্যবহার করে সবাইকে সালাতের জন্য একত্রিত করে। কেননা বিলাল এর কণ্ঠস্বর তোমার চেয়েও উচ্চ।
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ) স্বপ্নে প্রাপ্ত আযানের বাক্যগুলো বিলাল (রাঃ)-কে শিখালেন এবং বিলাল (রাঃ) উচ্চৈঃস্বরে সর্বপ্রথম আযান শুরু করলেন। এদিকে উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) নিজের বাড়িতে থাকা অবস্থায় আযানের ঐ বাক্যগুলো শুনতে পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট পৌঁছে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই সত্তার কসম, যিনি আপনার মাধ্যমে সত্যকে পাঠিয়েছেন, আমিও ঐ বাক্যগুলো কিছুদিন আগে স্বপ্নে শুনেছি, যা এখন শুনতে পাচ্ছি। । এ কথা শুনে নবী বললেন, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই। ৬৮ আলাইছি তারপর সেই দিন থেকে এখন পর্যন্ত আযানের মধ্য দিয়ে মুসলিমগণকে জামা'আতে ফরয সালাত আদায়ের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

টিকাঃ
* ইবনে মাজাহ, হা/৭০৬; তিরমিযী, হা/১৮৯; আবু দাউদ, হা/৪৯৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/৩৬৩।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন

📄 মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন


ইসলাম হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। তাই রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। ফলে মাত্র কয়েকদিন পূর্বেও যারা একে অপরকে চিনত না, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাদের মাঝেই এমন সম্পর্ক তৈরি হয়, যেন তারা একই মায়ের ঔরসজাত ভাই। আনসাররা মুহাজিরদেরকে এতই গুরুত্ব দিতেন যে, তাদের নিজেদের অভাব ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মুহাজির ভাইদেরকে সর্ব ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতেন। তাদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে বলেন,
وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ * وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
আর মুহাজিরদের (আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) ভালোবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। তারা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়। আর যারা নিজেদেরকে কৃপণতা হতে মুক্ত করেছে, তারাই সফলকাম। (সূরা হাশর- ৯)

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মদিনা সনদ

📄 মদিনা সনদ


রাসূলুল্লাহ আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপনের পর আরো একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, যা ছিল মদিনায় বসবাসকারী মুসলিম ও অমুসলিম সকলের জন্য প্রযোজ্য। আর এ চুক্তিটিই ইতিহাসে মদিনা সনদ হিসেবে খ্যাত। এ সনদের ধারা ছিল সর্বমোট ৫১টি। নিম্নে বিশেষ বিশেষ কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো :
১. মদিনায় বসবাসকারী সকলেই অন্যদের মোকাবেলায় এক উম্মত হিসেবে গণ্য হবে।
২. কুরাইশ মুহাজিরগণ পূর্বের মতো নিজেদের মধ্যে রক্তপণ আদায় করবে ও তাদের বন্দীদের মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাদেরকে মুক্ত করবে এবং আনসারদের সকল গোত্রও পূর্বের মতো নিজেদের মধ্যে রক্তপণ আদায় করে পরস্পর দোষমুক্ত হবে।
৩. ঈমানদারগণ কোন সহায় সম্পদহীনকে মুক্তিপণ ও দিয়াত প্রদানের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন এবং সম্মান করা থেকে বিমুখ হবে না।
৪. সকল ধর্মপ্রাণ মুমিন ঐ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ করবে, যারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে অন্যায়, অত্যাচার, পাপাচার ও গণ্ডগোলের পথ বেছে নেবে।
৫. মুমিনগণ তাদের বিরুদ্ধে কাজ করবে, যদিও তাদের মধ্যে কেউ আপন পুত্রও হয়।
৬. কোন কাফিরের পরিবর্তে কোন মুমিনকে হত্যা করা যাবে না।
৭. যেসকল ইয়াহুদি মুসলিমদের অনুগামী হবে, তাদেরকে প্রয়োজনে সাহায্য করতে হবে এবং তারা অন্য মুসলিমদের মতো হয়ে যাবে। তাদের প্রতি কোন অন্যায় করা যাবে না কিংবা তাদের বিরুদ্ধে অন্যকে সাহায্যও করা যাবে না।
৮. মুসলিমদের সম্পাদিত সন্ধি হবে একই। কোন মুসলিম কোন মুসলিমকে বাদ দিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধের ব্যাপারে কোন সন্ধি করবে না; বরং সকলে সমতা ও ন্যায়ের উপর ভিত্তি করেই তা করবে।
৯. মুসলিমরা ঐ রক্তপাতের ব্যাপারে সমান অধিকার রক্ষা করবে, যা আল্লাহর পথে প্রবাহিত হবে।
১০. কোন কুরাইশ মুশরিককে আশ্রয় দেবে না, তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে সাহায্য করবে না। আর কোন মুমিনের হেফাযতের ব্যাপারে মুশরিকদেরকে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড় করাবে না।
১১. যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে হত্যা করে এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার নিকট থেকে হত্যার বদলা গ্রহণ করা হবে, যদি নিহতের অভিভাবক তাতে রাজি থাকে।
১২. কোন মুমিনের জন্য এটি সঙ্গত হবে না যে, যারা গণ্ডগোল সৃষ্টি করে তাদের কার্যকলাপে সাহায্য করবে অথবা তাকে আশ্রয় দেবে কিংবা যে তাকে সাহায্য করে তাকে আশ্রয় দেবে। যে এরূপ করবে কিয়ামতের দিন সে অভিশাপ ও গযবে পতিত হবে এবং তার ফরয ও নফল কোন ইবাদাতই কবুল হবে না।
১৩. তোমাদের মধ্যে যখনই কোন মতভেদ পরিলক্ষিত হবে, তখনই তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিধিবিধান মতো ফায়সালার ব্যবস্থা করবে।
১৪. কেউ কারো উপর যুলুম করলে মাযলুমকে সাহায্য করা হবে।
১৫. চুক্তি চলাকালীন সময় চুক্তিবদ্ধ কোন পক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সকলকেই এর খরচ বহন করতে হবে।
এ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মদিনায় বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের উপর নেমে আসে কেবল শান্তি আর শান্তি। তাদের মাঝে চলমান সকল ধরনের ঝগড়া-বিবাদের বিলুপ্তি ঘটে এবং মদিনা একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যার পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00