📄 গুহা থেকে মদিনার পথে
রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর (রাঃ) এ অবস্থায় তিন দিন কাটিয়ে দিলেন। এদিকে কুরাইশদের খোঁজাখুঁজিও কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেল। হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার দিন আবু বকর (রাঃ) তার প্রস্তুতকৃত উট দুটি কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আবদুল্লাহ ইবনে আরীকত নামক এক ব্যক্তির কাছে রেখে এসেছিলেন। কথা ছিল যে, ঠিক তিন দিন পর চতুর্থ রাত্রিতে সওর পর্বতের গুহায় নিয়ে আসবে। ফলে সে কথামতো তাই করল। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর (রাঃ)-কে পথ প্রদর্শন করে মদিনায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও সে-ই পালন করল। সে প্রথমে তাঁদেরকে নিয়ে ইয়ামেনের পথে অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়ার পর সমুদ্র তীরের দিকে মোড় নিয়ে খুবই বিচক্ষণতার সাথে একটি অপরিচিত পথ দিয়ে মদিনায় পৌঁছে দিল।
গুহা থেকে বের হয়ে মদিনার পথে যাত্রা শুরু করার রাতে আসমা (রাঃ) তাঁদের পাথেয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু পাথেয় বেঁধে রাখার মতো কোন রশি না পেয়ে তিনি নিজের কোমরবন্ধনী খুলে দুই ভাগ করে এক ভাগ দিয়ে পাথেয় বেঁধে দিয়েছিলেন এবং অপরটি দিয়ে নিজের কোমর বেঁধেছিলেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ তাকে 'যাতুন নিতাকাইন' উপাধীতে ভূষিত করেছিলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কুবায় আগমন
সর্বপ্রথম নবী মদিনার পার্শ্ববর্তী এলাকা কুবা নামক স্থানে অবতরণ করেন। সে দিনটি ছিল নবুওয়াতের ১৪তম বর্ষের ৮ই রবিউল আওয়াল মোতাবেক ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। সেখানে তিনি একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনো মসজিদে কুবা নামে খ্যাত। এ সময় তিনি কুলসুম বিন হাদাম (রাঃ) এর বাড়িতে উঠলেন। অতঃপর সেখানে তিনি চার দিন তথা সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার এবং বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অবস্থান করেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মদিনায় প্রবেশ
এরপর রাসূলুল্লাহ শুক্রবার দিন সকালে মদিনায় প্রবেশ করেন। মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর (রাঃ) এর বের হয়ে যাওয়ার কথা মদিনাবাসীরা আগে থেকেই জানতে পেরেছিল। কাজেই তারা প্রতিদিনই তাঁদের আগমনের প্রতীক্ষায় থাকত। সেদিন একজন ইয়াহুদি কোন এক প্রয়োজনে বাড়ির ছাদে উঠল। এ সময় সে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর (রাঃ)-কে মদিনায় আগমন করতে দেখল। ফলে সে দেখামাত্রই উচ্চ কণ্ঠে বলে উঠল ওহে আরবের লোকেরা! তোমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে, তোমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত অতিথি এসে গেছেন। এ কথা শোনার পর মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ-কে এগিয়ে আনার জন্য ছুটে গেল। তারপর তারা তাঁকে অতি আনন্দের সাথে মুবারকবাদ জানিয়ে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে মদিনায় নিয়ে আসল।
যেহেতু সে দিনটি ছিল জুমু'আর দিন, কাজেই রাসূলুল্লাহ মদিনায় পৌঁছার পর বনু সালেম ইবনে আউফের আবাসস্থলে পৌঁছলে জুমু'আর নামাযের সময় হয়ে যায়। ফলে তিনি উক্ত স্থানে বাতনে ওয়াদীতে সাহাবীদেরকে নিয়ে জুমু'আর নামায আদায় করেন। সেই জামা'আতে সর্বমোট ১০০ জন লোক উপস্থিত ছিলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাসস্থান নির্ণয়
জুমু'আর নামাযের পর শুরু হয় আরেক প্রতিযোগিতা। সেটি হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ কার বাড়িতে অবস্থান করবেন? কেননা সবাই চাচ্ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের সাথেই থাকুক। অবশেষে এর সমাধান রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই করে নিলেন। তিনি নিজের উটনীর লাগাম ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন, এ উটনীটি যেখানে গিয়ে বসে পড়বে তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।
অতঃপর দেখা গেল যে, উটনীটি রাসূলুল্লাহ-কে নিয়ে বনু নাজ্জার গোত্রের মহল্লায় গিয়ে বসে পড়ল। ফলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সেখানেই অবতরণ করলেন। অতঃপর বনু নাজ্জার গোত্রের লোকেরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে নিজ নিজ ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন শুরু করল। তাদের মধ্যে আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) ও আসয়াদ বিন যুরারাহ (রাঃ) ছিলেন অন্যতম। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কার বাড়ি এখান থেকে সবচেয়ে নিকটে? আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাড়িই সবচেয়ে নিকটে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবু বকর (রাঃ) দুজনই সেখানে অবস্থান করলেন।
এর কিছু দিন পর রাসূলুল্লাহ এর পরিবার এবং আবু বকর (রাঃ) এর পরিবারও মদিনায় হিজরত করে চলে আসেন। তবে রাসূলুল্লাহ এর মেয়ে যয়নব (রাঃ) তাঁর স্বামী আবু আস এর নিকট থেকে গিয়েছিলেন। কেননা তার স্বামী তাকে আসতে বাধা দিয়েছিল। অতঃপর তিনি বদর যুদ্ধের পর মদিনায় চলে এসেছিলেন।