📄 কুরাইশদের ক্ষোভ
শয়তান কর্তৃক বাই'আতের কথা ফাঁস হওয়ার বিষয়টি কুরাইশদের কানে পৌঁছার সাথে সাথে তারা খুবই চিন্তিত হয়ে গিয়েছিল। ফলে তারা পরের দিন সকালে রাগান্বিত হয়ে মদিনাবাসীদের কাছে গমন করে তাদেরকে ধমকাতে থাকে। কিন্তু এসময় তারা যে কোনভাবেই হোক এটা বুঝাতে সচেষ্ট হয় যে, আসলে ওখানে কিছুই হয়নি এবং সে ব্যাপারে তারা কিছুই জানে না। ফলে এ পর্যায়ে কুরাইশরা শান্ত হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রাখে। অতঃপর যখন তারা নিশ্চিত হয় যে, আসলেই কিছু হয়েছিল, তখন তারা আবার মদিনাবাসীদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিমধ্যেই মদিনাবাসীরা মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিল। ফলে কুরাইশরা আর তাদের নাগাল পেল না। কিন্তু ঘটনাক্রমে সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-কে তারা ধরে ফেলেছিল। তারপর তারা মদিনার মধ্য দিয়ে নিজেদের বাণিজ্য কাফেলার যাতায়াতের কথা চিন্তা করে তাকে ছেড়ে দেয়।
এরপর থেকে কুরাইশরা মক্কায় অবস্থিত মুসলিমদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করে দেয়। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, মুসলিমদের পক্ষে মক্কায় বসবাস করা আর সম্ভব হচ্ছিল না।
📄 মুসলিমদের হিজরত
দ্বিতীয় বাই'আতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের জন্য মদিনাকে হিজরতের ভূমি হিসেবে নিশ্চিত করেন। ফলে এর কিছু দিন পর থেকেই মুসলিমরা একে একে আল্লাহর অনুমতিক্রমে নিজেদের ধনসম্পদ, পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি সবকিছু ছেড়ে হিজরত করে মদিনায় চলে যেতে থাকেন। সর্বপ্রথম যিনি মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করার জন্য যাত্রা করেছিলেন তিনি ছিলেন আবু সালামা (রাঃ)। তারপর উমর (রাঃ) সহ আরো অনেকেই। আবার মাঝে মধ্যে হিজরত করার ব্যাপারে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বাধা আসতে থাকে। এদিকে আবু বকর (রাঃ)-ও হিজরত করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। বাকি ছিল রাসূলুল্লাহ অনুমতি। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ এর কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, ধৈর্যধারণ করো। কেননা আমি আশা করছি যে, আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন, আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক। আপনার জন্যও কি হিজরতের অনুমতি আশা করতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
এরপর আবু বকর (রাঃ) মক্কাতেই থেকে গেলেন, যাতে তিনি রাসূলুল্লাহ এর সফর সঙ্গী হতে পারেন। এজন্য তিনি দুটি উটনীকে ভালোভাবে বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে শক্তিশালী করে তুলতে লাগলেন এবং হিজরতের জন্য প্রস্তুত করে রাখলেন।
টিকাঃ
৬৫ সহীহ বুখারী, হা/৩৯২৫।
📄 দারুন নদওয়ায় কুরাইশদের বৈঠক
মুসলিমরা যখন এক এক করে হিজরত করতে লাগলেন, তখন মক্কা নগরী ধীরে ধীরে খালি হতে লাগল। এদিকে মুসলিমরা মদিনায় আশ্রয় নেয়ায় বিষয়টি কুরাইশদেরকে আরো চিন্তিত করে তুলেছিল। কেননা কুরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সবেচেয়ে বড় কেন্দ্র 'সিরিয়া' যেতে হতো মদিনাকে অতিক্রম করেই। এসব চিন্তা করে কুরাইশরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নবুওয়াতের চতুর্দশ বর্ষের ২৬ শে সফর মোতাবেক ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দিনের প্রথম ভাগে তাদের সভাকেন্দ্র দারুন নদওয়াতে একত্রিত হয় এবং এতে কুরাইশ গোত্রের সকল নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে। অতঃপর যখন তারা আলোচনা শুরু করে, তখন ইবলিসও ছদ্মবেশে তাদের সাথে যোগ দেয়।
উক্ত সভায় অনেক শলা-পরামর্শের পর সবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, রাসূলুল্লাহ -কে হত্যা করা হবে এবং এ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে সুঠামদেহী ও শক্তিশালী যুবক অংশ গ্রহণ করবে। ফলে এর দায় সবার উপর বর্তাবে। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ। কেননা এমনটি হলে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের পক্ষে সবার সাথে লড়াই করা সম্ভব হবে না।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হিজরত
যখন দারুন নদওয়ায় বসে কুরাইশরা এ ধরনের ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ এর নিকট আগমন করেন। তারপর তিনি তাঁকে সবকিছু জানিয়ে দেন এবং বলেন, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেছেন। রাসূলুল্লাহ হিজরত করার জন্য অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই আবু বকর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য তার বাড়িতে যান। অতঃপর তিনি তার সাথে সবকিছু আলোচনা করে ঐ রাতেই হিজরত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।