📄 আকাবার তৃতীয় শপথ
মুসয়াব (রাঃ) মদিনায় গিয়ে আসয়াদ বিন যুররা (রাঃ) এর বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে থাকেন। এতে তিনি এত সফলতা পান যে, যার কারণে তিনি মুকরিউন তথা পাঠদানকারী উপাধিতে ভূষিত হন। এসব দাওয়াতের ফলে সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) তাঁর গোত্রসহ সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি পরবর্তী হজ্জের মৌসুম পর্যন্ত মদিনায় কেবলমাত্র বনু উমাইয়া বিন যায়েদ, খাতমা ও ওয়ায়েলের বাড়ি ছাড়া এমন কোন বাড়ি ছিল না, যাদের পুরুষ ও মহিলাদের কিছু সংখ্যক ইসলাম গ্রহণ করেনি।
অতঃপর মুসয়াব (রাঃ) নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষের হজ্জের মৌসুমে এসব অভাবনীয় সফলতার সুসংবাদ নিয়ে রাসূলুল্লাহ এর কাছে আগমন করেন এবং সাথে করে বাই'আত প্রদানের জন্য বিশাল একটি দলও নিয়ে আসেন। সুতরাং পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা আইয়ামে তাশরীকের মধ্য রাতে তথা জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখে জামরায়ে উলা অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার নিকটবর্তী একটি সুরঙ্গে রাসূলুল্লাহ এর সাথে খুব গোপনে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ কেবল চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের কাছ থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন। বাই'আতের বিষয়বস্তু এরূপ ছিল যে,
১. সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আমার (রাসূলুল্লাহ এর) কথা শুনতে হবে এবং মেনে নিতে হবে।
২. অভাব ও সচ্ছলতায় একই ধারায় খরচ করতে হবে।
৩. ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে।
৪. আল্লাহর পথে দণ্ডায়মান থাকবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোন ভর্ৎসনাকারীর পরোয়া করবে না।
৫. যখন আমি তোমাদের কাছে হিজরত করে যাব, তখন যেমনভাবে স্বীয় জান-মাল ও সন্তানদের হেফাযত করো সেভাবেই আমার হেফাযত করবে।
এগুলো পালন করলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। ৬০ এ অঙ্গীকার নেয়ার সময় মদিনাবাসীদের মধ্য থেকে সর্বমোট ৭৫ জন লোক উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন মহিলা। তারা হলেন, উম্মে আম্মারা নাসীরা বিনতে কা'ব (রাঃ) এবং উম্মে মানী আসমা বিনতে আমর (রাঃ)। ইসলামের ইতিহাসে এ অঙ্গীকারটিই আকাবার তৃতীয় শপথ বা আকাবার বড় শপথ নামে পরিচিত। এর ফলে ইসলামের গতিধারায় এক আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল এবং মদিনা ও মদিনার আশেপাশে ক্রমেই ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছিল।
টিকাঃ
৬০ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৪৯৬; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৬৩।
📄 শয়তান কর্তৃক বাই’আতের কথা ফাঁস
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে তাদের বাই'আত প্রদানের পর্ব যখন প্রায় শেষ প্রান্তে, তখন একটি শয়তান বিষয়টি জেনে যায়। ফলে সে এ খবরটি মুশরিকদের নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে সুড়ঙ্গের পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চ কণ্ঠে ডাকতে থাকে যে, হে তাবুওয়ালারা! মুহাম্মাদকে দেখো, বেদ্বীনরা এখন তার সাথে রয়েছে। তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হয়েছে। তখন কাব বিন মালেক (রাঃ) বললেন, এরূপ দূরবর্তী আওয়াজ ইতিপূর্বে আমরা কখনো শুনিনি। রাসূলুল্লাহ বললেন, এটা হচ্ছে সুড়ঙ্গের শয়তান। অতঃপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর দুশমন! অচিরেই আমি তোর জন্য বেরিয়ে পড়ব। এ কথা শুনে আব্বাস বিন উবাদাহ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি চাইলে আগামীকালই আমরা মিনাবাসীদের উপর তরবারি নিয়ে হামলা চালাব। রাসূলুল্লাহ বললেন, আমি সে জন্য আদিষ্ট হইনি। তোমরা স্ব স্ব তাবুতে ফিরে যাও। ফলে তারা সকলেই নিজ নিজ তাবুতে ফিরে গেলেন।
টিকাঃ
৬৪ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৮৩৬।
📄 কুরাইশদের ক্ষোভ
শয়তান কর্তৃক বাই'আতের কথা ফাঁস হওয়ার বিষয়টি কুরাইশদের কানে পৌঁছার সাথে সাথে তারা খুবই চিন্তিত হয়ে গিয়েছিল। ফলে তারা পরের দিন সকালে রাগান্বিত হয়ে মদিনাবাসীদের কাছে গমন করে তাদেরকে ধমকাতে থাকে। কিন্তু এসময় তারা যে কোনভাবেই হোক এটা বুঝাতে সচেষ্ট হয় যে, আসলে ওখানে কিছুই হয়নি এবং সে ব্যাপারে তারা কিছুই জানে না। ফলে এ পর্যায়ে কুরাইশরা শান্ত হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রাখে। অতঃপর যখন তারা নিশ্চিত হয় যে, আসলেই কিছু হয়েছিল, তখন তারা আবার মদিনাবাসীদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিমধ্যেই মদিনাবাসীরা মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিল। ফলে কুরাইশরা আর তাদের নাগাল পেল না। কিন্তু ঘটনাক্রমে সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-কে তারা ধরে ফেলেছিল। তারপর তারা মদিনার মধ্য দিয়ে নিজেদের বাণিজ্য কাফেলার যাতায়াতের কথা চিন্তা করে তাকে ছেড়ে দেয়।
এরপর থেকে কুরাইশরা মক্কায় অবস্থিত মুসলিমদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করে দেয়। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, মুসলিমদের পক্ষে মক্কায় বসবাস করা আর সম্ভব হচ্ছিল না।
📄 মুসলিমদের হিজরত
দ্বিতীয় বাই'আতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের জন্য মদিনাকে হিজরতের ভূমি হিসেবে নিশ্চিত করেন। ফলে এর কিছু দিন পর থেকেই মুসলিমরা একে একে আল্লাহর অনুমতিক্রমে নিজেদের ধনসম্পদ, পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি সবকিছু ছেড়ে হিজরত করে মদিনায় চলে যেতে থাকেন। সর্বপ্রথম যিনি মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করার জন্য যাত্রা করেছিলেন তিনি ছিলেন আবু সালামা (রাঃ)। তারপর উমর (রাঃ) সহ আরো অনেকেই। আবার মাঝে মধ্যে হিজরত করার ব্যাপারে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বাধা আসতে থাকে। এদিকে আবু বকর (রাঃ)-ও হিজরত করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। বাকি ছিল রাসূলুল্লাহ অনুমতি। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ এর কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, ধৈর্যধারণ করো। কেননা আমি আশা করছি যে, আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন, আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক। আপনার জন্যও কি হিজরতের অনুমতি আশা করতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
এরপর আবু বকর (রাঃ) মক্কাতেই থেকে গেলেন, যাতে তিনি রাসূলুল্লাহ এর সফর সঙ্গী হতে পারেন। এজন্য তিনি দুটি উটনীকে ভালোভাবে বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে শক্তিশালী করে তুলতে লাগলেন এবং হিজরতের জন্য প্রস্তুত করে রাখলেন।
টিকাঃ
৬৫ সহীহ বুখারী, হা/৩৯২৫।