📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মিরাজ
মিরাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঊর্ধ্বগমন। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন দাওয়াতী কাজ সাহসীকতার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক সে সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁর আত্মবিশ্বাসকে আরো বেশি করে বৃদ্ধি করার জন্য তাঁকে সাত আসমানের উপর একেবারে নিজের কাছে ডেকে নেন। অতঃপর সেখান থেকে ফেরত পাঠানোর সময় তাঁর উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার হিসেবে দান করেন। এ ঘটনাটি ঠিক কবে সংঘটিত হয়েছিল এ ব্যাপারে কোন সঠিক মতামত পাওয়া যায় না। তবে এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল খাদীজা (রাঃ) এর মৃত্যুর পর তথা নবুওয়াতের ১০ম বছরে হিজরতের প্রায় কাছাকাছি সময়ের মধ্যে।
ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন, আমার জন্য বুরাক পাঠানো হলো। বুরাক گাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। দৃষ্টি যতদূর যায় এক পদক্ষেপে সে ততদূর চলতে পারে। রাসূলুল্লাহ বলেন, আমি এতে আরোহণ করলাম এবং বাইতুল মাকদাস এসে পৌঁছলাম। তারপর অন্যান্য নবীগণ তাদের বাহনগুলো যে খুঁটির সাথে বাঁধতেন, আমি সে খুঁটির সাথে আমার বাহনটিও বাঁধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু'রাক'আত সালাত আদায় করে বের হলাম। জিবরাঈল (আঃ) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। তখন জিবরাঈল (আঃ) আমাকে বললেন, আপনি ফিতরাতকেই গ্রহণ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌঁছে দ্বার খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি আদম (আঃ) এর দেখা পাই। তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে কি আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনে মারইয়াম ও ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়া (আঃ) এর দেখা পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দু'আ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। আমি সেখানে ইউসুফ (আঃ) এর দেখা পেলাম। তাঁকে সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল।
জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। আমি সেখানে ইদরীস (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন- এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায় (সূরা হাদীদ- ১৯)।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে হারূন (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে মূসা (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। আমি সেখানে ইবরাহীম (আঃ) এর দেখা পেলাম।
সেখানে আছে বাইতুল মা'মূর। বাইতুল মা'মূরে প্রত্যেকদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন এবং যারা একবার আসেন তারা সেখানে পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। ৫১ সে বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায়; আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মতো। এরপর আল্লাহ তা'আলা আমার উপর যে ওহী করার তা করলেন।
তিনি আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি যখন মূসা (আঃ) এর কাছে ফিরে আসলাম তখন তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কী নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মত এ নির্দেশ পালনে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসূলুল্লাহ বললেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। তখন পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হলো। তারপর মূসা (আঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন। রাসূলুল্লাহ বললেন, এভাবে আমি একবার মূসা (আঃ) ও একবার আল্লাহর কাছে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তা'আলা বললেন, হে মুহাম্মাদ! যাও দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হলো। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হলো) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। (আল্লাহ তা'আলা আরো বললেন,) যে ব্যক্তি কোন নেক কাজের নিয়ত করল এবং তা কাজে পরিণত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সওয়াব লিখব; আর তা কাজে পরিণত করলে তার জন্য দশটি সওয়াব লিখব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের নিয়ত করল অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ লিখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর একটি মাত্র গুনাহ লিখা হয়।
রাসূলুল্লাহ বলেন, তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ বললেন, এ বিষয়টি নিয়ে বারবার আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আসা-যাওয়া করেছি, এখন আবার যেতে লজ্জা হচ্ছে।৬০
অন্য বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ সে সময় জান্নাত ও জাহান্নামকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন- এমনকি তিনি কিছু কিছু জাহান্নামীর শাস্তিও প্রত্যক্ষ করেন। এ ঘটনাটি ছিল একটি বড় পরীক্ষা। কারণ প্রকৃত ঈমানদার ব্যতীত এটা মেনে নেয়া কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে যে রাতে এ ঘটনাটি ঘটেছিল সেদিন সকালে তিনি যখন মানুষের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করলেন,
তখন কাফিররা তো বিশ্বাস করলই না; বরং অনেক মুসলিমও বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে বিব্রতবোধ করছিলেন। তবে একমাত্র আবু বকর (রাঃ) এসব কথা শোনামাত্রই সত্য হিসেবে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ তাঁকে সিদ্দীক তথা সত্যবাদী উপাধীতে ভূষিত করেন। ৬১ তাছাড়া এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ -কে নানা ধরনের প্রশ্ন করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ তাদের প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও মুশরিকরা কোনভাবেই বিশ্বাস স্থাপন করেনি।
মিরাজ স্বশরীরে হয়েছিল না স্বপ্নযোগে হয়েছিল: মিরাজ স্বশরীরে হয়েছিল না স্বপ্নযোগে হয়েছিল এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, স্বপ্নযোগে হয়েছিল। এটা অত্যন্ত দুর্বল কথা। পূর্ব ও পরের অধিকাংশ উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্দিসীনের অভিমত হলো প্রিয়নবী এর জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। এর বিপরীত অন্য ব্যাখ্যার কোন সুযোগ নেই।
টিকাঃ
৫১ "সিদরাতুল মুনতাহা" হচ্ছে সপ্তম আকাশের উপরে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। সেখানে একটি বরই গাছ রয়েছে। আর এটিই হচ্ছে ফেরেশতাদের বিচরণের শেষ সীমা। এর উপরে ফেরেশতারা গমন করতে পারে না।
৬০ সহীহ মুসলিম, হা/১৬২; সহীহ বুখারী, হা/৩৮৮৭।
৬১ মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৪09; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩০৬।
📄 আকাবার প্রথম শপথ
রাসূলুল্লাহ প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে নিয়মিত দাওয়াত দিয়েই যাচ্ছিলেন এবং লোকশ্রুতিতেও তাঁর নবুওয়াতের কথা অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। সেই সুবাদে মক্কার বাহিরেও কিছু কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিল। সেসব সৌভাগ্যবান লোকদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুয়াইদ বিন সামিত (রাঃ), ইয়াস বিন মুয়ায (রাঃ), আবু যর গিফারী (রাঃ), তোফায়েল বিন আমর দাওসী (রাঃ), যিমাদ আযদী (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী। বিশেষ করে নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে হজ্জের মৌসুমে ইয়াসরিব তথা মদিনা থেকে ৬ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যারা সকলেই ছিলেন মদিনার জ্ঞানী ব্যক্তি। তারা হলেন-
১। আসয়াদ বিন যুরারাহ (রাঃ)
২। আউন বিন হারিস বিন রিফাআহ (রাঃ)
৩। রাফে বিন মালিক বিন আজলান (রাঃ)
৪। কুতবা বিন আমের বিন হাদীদাহ (রাঃ)
৫। উকবা বিন আমের বিন নাবী (রাঃ) এবং
৬। হারিস বিন আবদুল্লাহ বিন রিআব (রাঃ)।
এসব ব্যক্তিবর্গ যখন হজ্জব্রত পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন, তখন রাসূলুল্লাহ গোপনে তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। এদিকে তারা মদিনার ইয়াহুদিদের কাছ থেকে ইতিপূর্বেই জানতে পেরেছিল যে, অতি শীঘ্রই একজন নবীর আগমন ঘটবে এবং তাঁর আগমনের সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। আর তারা তাদেরকে এ বলেও হুমকি দিত যে, তারা সেই নবীর সাথে যুক্ত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। ফলে রাসূলুল্লাহ যখন নিজের নবুওয়াতের কথা এবং তাওহীদের কথা তাদের সামনে উপস্থাপন করেন, তখন তারা নিশ্চিত হলো যে, ইনিই হলেন সেই নবী, যার ব্যাপারে ইয়াহুদিরা তাদেরকে হুমকি দিত। ফলে তারা সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করে নেন এবং রাসূলুল্লাহ এর হাতে বাই'আত প্রদান করেন।
এটি ছিল কেবল ইসলাম গ্রহণের উপর সাধারণ বাই'আত। যেহেতু এ বাই'আতটি মিনার নিকটবর্তী আকাবা নামক স্থানে করা হয়েছিল, তাই একে বাই'আতে আকাবা তথা আকাবার বাই'আত বলা হয়। আর এটিই ছিল আকাবার প্রথম বাই'আত। এতে কোন শর্ত বা কোন বিশেষ নির্দেশনা ছিল না। যার কারণে অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ এটিকে বাই'আত হিসেবে গণনা করেননি।
📄 আকাবার দ্বিতীয় শপথ
আকাবার প্রথম শপথের মাধ্যমে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তারা সকলেই ইয়াসরিবে ফিরে গিয়ে ইয়াসরিববাসীকে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। ফলে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পরবর্তী বর্ষে হজ্জের মৌসুমে তথা নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষের জিলহজ্জ মোতাবেক ৬২১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ১২ জন লোক রাসূলুল্লাহ এর কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন নতুন ইসলাম গ্রহণকারী। তারা হলেন-
১। মুয়ায ইবনে হারেস বিন রিফা'আহ (রাঃ)
২। যাকওয়ান ইবনে আবদে কায়েস (রাঃ)
৩। উবাদা ইবনে সামেত (রাঃ)
৪। ইয়াযীদ ইবনে সালাবাহ (রাঃ)
৫। আব্বাস ইবনে উবাদাহ ইবনে নাযালাহ (রাঃ)
৬। আবুল হায়ছাম মালেক ইবনুত তাইয়েহান (রাঃ)
৭। ওয়ায়েম ইবনে সাঈদাহ (রাঃ)
আর বাকিরা ছিলেন প্রথম বাই'আতে অংশগ্রহণকারী। প্রথম বাই'আতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেবল জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) অনুপস্থিত ছিলেন।
এরা গভীর রাতে পূর্ব নির্ধারিত আকাবা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের থেকে দ্বীনের ব্যাপারে কয়েকটি কথার উপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। এসব অঙ্গীকারনামার বিষয়সমূহ পরবর্তীতে হুদায়বিয়া সন্ধিপত্র এবং মক্কা বিজয়ের সময় মহিলাদের নিকট থেকে গৃহীত অঙ্গীকারনামারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেগুলো হলো-
১. আল্লাহর সাথে কোন কিছুকেই শরীক করবে না।
২. চুরি করবে না।
৩. যিনা করবে না।
৪. নিজেদের সন্তানকে হত্যা করবে না।
৫. কাউকে মনগড়া অপবাদ দেবে না।
৬. ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে আমার অবাধ্যতা করবে না।
যারা এসব কথা মান্য করবে এবং পূর্ণ করবে তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট পুরস্কার রয়েছে। কিন্তু যারা এগুলোর মধ্যে কোন একটি করে বসে এবং তার শাস্তি এখানেই প্রদান করা হয়, তাহলে সেটা তার মুক্তি লাভের কারণ হয়ে যাবে। আর যদি কেউ এসবের মধ্যে কোন কিছু করে বসে এবং আল্লাহ তা গোপন রেখে দেন, তাহলে তার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হবে। সুতরাং তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনাটিই আকাবার দ্বিতীয় বাই'আত হিসেবে পরিচিত। এর ফলে ইসলামের অনেক উপকার সাধিত হয়। এসব অঙ্গীকার নিয়ে যখন তারা সকলেই নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান, তখন রাসূলুল্লাহ তাদের সাথে একটি ধর্ম প্রচারকের দলও প্রেরণ করেন। যাতে করে তারা তাদেরকে ইসলামের বিষয়গুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারেন এবং যাবতীয় হুকুম-আহকাম যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিতে পারেন। আর এটিই ছিল ইয়াসরিব তথা মদিনার উদ্দেশ্যে প্রেরিত প্রথম ধর্ম প্রচারক দল। এদের নেতা ছিলেন, মুসআব বিন উমায়ের আবদারী (রাঃ)।
টিকাঃ
৬২ সহীহ বুখারী, হা/১৮; সহীহ মুসলিম, হা/১৭০৯।
📄 আকাবার তৃতীয় শপথ
মুসয়াব (রাঃ) মদিনায় গিয়ে আসয়াদ বিন যুররা (রাঃ) এর বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে থাকেন। এতে তিনি এত সফলতা পান যে, যার কারণে তিনি মুকরিউন তথা পাঠদানকারী উপাধিতে ভূষিত হন। এসব দাওয়াতের ফলে সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) তাঁর গোত্রসহ সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি পরবর্তী হজ্জের মৌসুম পর্যন্ত মদিনায় কেবলমাত্র বনু উমাইয়া বিন যায়েদ, খাতমা ও ওয়ায়েলের বাড়ি ছাড়া এমন কোন বাড়ি ছিল না, যাদের পুরুষ ও মহিলাদের কিছু সংখ্যক ইসলাম গ্রহণ করেনি।
অতঃপর মুসয়াব (রাঃ) নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষের হজ্জের মৌসুমে এসব অভাবনীয় সফলতার সুসংবাদ নিয়ে রাসূলুল্লাহ এর কাছে আগমন করেন এবং সাথে করে বাই'আত প্রদানের জন্য বিশাল একটি দলও নিয়ে আসেন। সুতরাং পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা আইয়ামে তাশরীকের মধ্য রাতে তথা জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখে জামরায়ে উলা অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার নিকটবর্তী একটি সুরঙ্গে রাসূলুল্লাহ এর সাথে খুব গোপনে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ কেবল চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের কাছ থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন। বাই'আতের বিষয়বস্তু এরূপ ছিল যে,
১. সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আমার (রাসূলুল্লাহ এর) কথা শুনতে হবে এবং মেনে নিতে হবে।
২. অভাব ও সচ্ছলতায় একই ধারায় খরচ করতে হবে।
৩. ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে।
৪. আল্লাহর পথে দণ্ডায়মান থাকবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোন ভর্ৎসনাকারীর পরোয়া করবে না।
৫. যখন আমি তোমাদের কাছে হিজরত করে যাব, তখন যেমনভাবে স্বীয় জান-মাল ও সন্তানদের হেফাযত করো সেভাবেই আমার হেফাযত করবে।
এগুলো পালন করলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। ৬০ এ অঙ্গীকার নেয়ার সময় মদিনাবাসীদের মধ্য থেকে সর্বমোট ৭৫ জন লোক উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন মহিলা। তারা হলেন, উম্মে আম্মারা নাসীরা বিনতে কা'ব (রাঃ) এবং উম্মে মানী আসমা বিনতে আমর (রাঃ)। ইসলামের ইতিহাসে এ অঙ্গীকারটিই আকাবার তৃতীয় শপথ বা আকাবার বড় শপথ নামে পরিচিত। এর ফলে ইসলামের গতিধারায় এক আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল এবং মদিনা ও মদিনার আশেপাশে ক্রমেই ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছিল।
টিকাঃ
৬০ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৪৯৬; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৬৩।