📄 দুঃখের বছর
একই বছর প্রাণপ্রিয় চাচা আবু তালিব এবং সহধর্মিণী খাদীজা (রাঃ) এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ মানসিকভাবে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। কেননা এতদিন বহিরাগত যত শত্রুতাই থাকুক না কেন, তাদের দুজনের কাছ থেকে শক্তি-সাহস পেতেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুতে শক্তি-সাহস যোগানোর মতো এখন আর কেউ রইল না। উপরন্তু যখন রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর চাচা আবু তালিব মৃত্যুবরণ করল তখন মুশরিকদের মধ্যে এবং রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর মধ্যে আর কোন বাধা অবশিষ্ট থাকল না। ফলে তাদের পক্ষ থেকে নেমে আসতে থাকল অবিরাম ধারায় নির্যাতন। মুশরিকদের পক্ষ থেকে আগত নির্যাতনের ধারা এতই বেশি ছিল যে, ইতিপূর্বে সকল মাত্রা অতিক্রম করে ফেলল। ফলে রাসূলুল্লাহ এর জীবন আরো দুর্বিষহ ও বিষাদময় হয়ে উঠল। তাই রাসূলুল্লাহ এ বছরের নাম দেন- আমুল হুযন অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের বছর।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে সাওদা (রাঃ) এর বিবাহ
খাদীজা (রাঃ) এর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম সাওদা বিনতে যাময়াহ (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। তখন ছিল নবুওয়াতের ১০ম বর্ষের শাওয়াল মাস। ইতিপূর্বে সাওদা (রাঃ) সাকারীন বিন আমর (রাঃ) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তারা উভয়েই প্রাথমিক যুগের মুসলিম ছিলেন এবং হাবশায় হিজরত করেছিলেন। অতঃপর হাবশায় থাকা অবস্থাতেই স্বামী সাকারীন বিন আমর (রাঃ) মৃত্যুবরণ করেন। তারপর সাওদা (রাঃ) মক্কায় ফিরে এসে ইদ্দত পালন শেষে রাসূলুল্লাহ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
📄 তায়েফ গমন
নবুওয়াতের ১০ম বছর শাওয়াল মাস অর্থাৎ ৬১৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাস। রাসূলুল্লাহ মক্কার মুশরিকদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে দাওয়াত প্রদানের জন্য তায়েফ গমন করেন। তায়েফ মক্কা থেকে আনুমানিক ৬০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। এ দীর্ঘ পথ তিনি পায়ে হেঁটেই অতিক্রম করেছিলেন। সাথে ছিলেন মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়েদ ইবনে হারিস (রাঃ)। পথিমধ্যে যে গোত্রের মধ্যেই উপস্থিত হতেন তাদের কাছেই ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতেন। কিন্তু এতে কেউ সাড়া দিত না।
সে সময় তায়েফে সাকীফ গোত্র বসবাস করত। সে গোত্রের তিন নেতা যথাক্রমে আবদে ইয়ালাইল, মাসউদ ও হাবীব তাদের নেতৃত্ব প্রদান করত। এরা তিনজনই ছিল সহোদর ভাই। রাসূলুল্লাহ তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে আল্লাহর আনুগত্য করার এবং ইসলামকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাওয়াত প্রদান করলেন। তখন তারা সবাই ভিন্ন ভিন্ন উত্তর প্রদান করেছিল। একজন বলেছিল, তুমি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাক, তাহলে কাবা ঘরের পর্দা ফেঁড়ে দেখাও। দ্বিতীয়জন বলেছিল, নবী পাঠানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পাননি? আর তৃতীয়জন বলেছিল, তোমার সাথে আমি কোন ক্রমেই কথা বলব না। কেননা তুমি যদি সত্যিই নবী হয়ে থাক, তাহলে তোমার কথা প্রত্যাখ্যান করা আমাদের জন্য বিপজ্জনক। আর যদি তুমি আল্লাহর নামে মিথ্যাচার করে থাক, তাহলে তোমার সাথে আমাদের কথা বলা উচিত নয়।
তাদের এ ধরনের কথাবার্তায় রাসূলুল্লাহ খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন এবং ফিরে আসার সময় তাদেরকে এসব আলোচনা গোপন রাখতে বললেন। কিন্তু তারা বিষয়গুলো গোপন না রেখে রাসূলুল্লাহ-কে আরো অপমানের সাথে তাড়িয়ে দিল। ফলে রাসূলুল্লাহ ফিরে আসার সময় শিশু-কিশোর ও যুবকদের দ্বারা উত্যক্ত ও অপমানের শিকার হয়েছিলেন। এ সময় তারা তাঁকে নানা ধরনের অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করেছিল এবং পাথর ছুড়ে মেরেছিল। আর যায়েদ বিন হারিস (রাঃ) তাকে যথাসম্ভব আড়াল করে রেখেছিলেন। এরপরও আঘাতের কারণে রাসূলুল্লাহ এর পায়ের জুতা পর্যন্ত রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ একটি আঙ্গুরের বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। বাগানটি ছিল রাবিয়ার পুত্র উতবা ও শায়বার। এটি ছিল তায়েফ থেকে তিন মাইল দূরে। রাসূলুল্লাহ বাগানে প্রবেশ করলে দুরাচার তায়েফবাসীরা নিজ নিজ ঘরের দিকে ফিরে যায়।
📄 জিবরাঈল (আঃ) এর প্রস্তাব
রাসূলুল্লাহ যখন তায়েফবাসীদের দ্বারা অপমানের শিকার হয়ে উক্ত বাগানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে বললেন, আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যা বলেছে এবং আপনার প্রতি যে আচরণ করেছে আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই শুনেছেন এবং দেখেছেন। এখন তিনি পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতাকে আপনার জন্য প্রেরণ করেছেন। আপনি তাদেরকে যা ইচ্ছা নির্দেশ প্রদান করুন। এরপর পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ-কে সালাম জানিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! কথা একটাই, আপনি যদি চান এদেরকে আমি দুই পাহাড় একত্রিত করে পিষে মারি, তাহলে তাই হবে। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, না- বরং আমার আশা এই যে, আল্লাহ তা'আলা এদের পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন, যারা একমাত্র তাঁর ইবাদাত করবে এবং অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না।
এভাবে রাসূলুল্লাহ এত নির্যাতন ও অপমানের পরও তাদের প্রতি চরম সহমর্মিতা ও উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
৬ সহীহ বুখারী, হা/৩২৩১; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৯৫; মিশকাত, হা/৫৮৪৮।