📄 মুশরিক কর্তৃক মুসলিমদেরকে পূর্ণাঙ্গ বয়কট
তাদের এসব একের পর এক ব্যর্থ মিশন খুব দ্রুতই সংঘটিত হচ্ছিল। ফলে তারা বারবার হোঁচট খেয়ে দিশেহারা হচ্ছিল। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, যদি তারা মুহাম্মাদ-কে হত্যা করে তাহলে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তারা একদিন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মুহাসসাব নামক উপত্যকায় খাইফে বনু কেনানা এর ভেতরে একত্রিত হলো। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে,
১. বনু হাশেম এবং বনু মুত্তালিবের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক আদান-प्रদান ও কুশল বিনিময় ইত্যাদি সবকিছুই বন্ধ রাখা হবে।
২. কেউ তাদের কন্যা গ্রহণ করতে কিংবা তাদেরকে কন্যা দান করতে পারবে না।
৩. তাদের সাথে উঠা-বসা, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, মেলা-মেশা, বাড়িতে যাতায়াত ইত্যাদি কোন কিছুই করা যাবে না।
৪. যতদিন পর্যন্ত তারা রাসূলুল্লাহ-কে তাদের হাতে তুলে না দেবে ততদিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
এ বয়কটের দলীলস্বরূপ একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয় এবং এটি কাবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের সকল মুসলিম ও অমুসলিম সদস্য আতঙ্কিত হয়ে শিয়াবে আবু তালিব গিরিপর্বতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন- কেবল আবু লাহাব ব্যতীত। আর এ ঘটনাটি ঘটেছিল নবুওয়াতের ৭ম বছরের মুহাররম মাসের শুরুতে।
📄 শিয়াবে আবু তালিবের অবস্থা
কাফির-মুশরিকদের এ ধরনের বয়কটের কারণে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের লোকদের জীবনযাপন করা খুবই সঙ্কটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্য খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আমদানী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি পানি সরবরাহ পর্যন্তও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের অবস্থা এমন হলো যে, তাদেরকে গাছের পাতা, চামড়া ইত্যাদি খেতে হতো। যার ফলে তাদের পায়খানা ছাগলের পায়খানার মতো হয়ে গিয়েছিল। আবার যদি তারা কখনো খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করার জন্য বাইরে বের হতো, তখন তাদের থেকে এত বেশি দাম হাঁকানো হতো যে, সেগুলো তাদের পক্ষে ক্রয় করা সম্ভব ছিল না। এদিকে আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। ফলে সকলেই যখন নিজ নিজ বিছানায় শয়ন করতেন, তখন আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর নিরাপত্তার জন্য তাঁকে নিজের বিছানায় শয়ন করিয়ে দিতেন এবং রাসূলুল্লাহ এর বিছানায় অন্য কাউকে শয়ন করাতেন। এরূপ অবরুদ্ধ অবস্থাতেও যখন হজ্জের সময় আসত, তখন মুসলিমগণ শিয়াবে আবু তালিব থেকে বের হয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে আগত লোকদেরকে দাওয়াত দিতেন। শিয়াবে আবু তালিবের এ অবস্থাটি তিন বৎসর স্থায়ী ছিল।
📄 আবু তালিবের মৃত্যু
মুশরিকদের বয়কটের কারণে আবু তালিব পূর্বের তুলনায় খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তিনি এ সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপরন্তু বার্ধক্য, দুশ্চিন্তা ইত্যাদির কারণে তার সে অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি এক সময় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তখন ছিল নবুওয়াতের ১০ম বৎসরের রজব মাস।
যখন চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল, তখন রাসূলুল্লাহ তার নিকট যান এবং সেখানে আবু জাহেলও গমন করে। রাসূলুল্লাহ বললেন, চাচা! আপনি কেবল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটি উচ্চারণ করুন, যাতে আমি সেটা বিচারের দিন আল্লাহর কাছে পেশ করতে পারি। তখন আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ বিন উমাইয়া বলল, হে আবু তালিব! আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে কি তাহলে শেষ পর্যন্ত বিমুখ হয়ে যাবেন? এভাবে উভয় পক্ষের বাদানুবাদ চলতেই থাকল। অবশেষে আবু তালিব নিজের পিতৃপুরুষদের ধর্মের উপরই মৃত্যুবরণ করেন।
📄 খাদীজা (রাঃ) এর মৃত্যু
খাদীজা (রাঃ) আবু তালিবের মৃত্যুর ঠিক দুই মাস পর নবুওয়াতের ১০ম বছরের রমাযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৬৫ বছর। রাসূলুল্লাহ তখন পর্যন্ত অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। অথচ তখন তার বয়স ছিল ৫০ বছর।
খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামতস্বরূপ ছিলেন। তিনি সবসময় রাসূলুল্লাহ এর সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন। ইসলামের প্রয়োজনে তিনি সকল সম্পত্তি রাসূলুল্লাহ এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যখন সকল মানুষ রাসূলুল্লাহ এর বিরোধিতা করে আসছিল, তখন তিনি ছায়ার মতো রাসূলুল্লাহ-কে বিভিন্ন কথাবার্তার মাধ্যমে সান্ত্বনা প্রদান করে সাহস যোগাতেন। তার এ মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন।