📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কুরাইশদের প্রতিনিধি প্রেরণ
হামযা (রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর মতো প্রতাপশালী দুজন বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ করার কারণে মুসলিমদের উপর মুশরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। যার কারণে মুশরিকদের অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে। তবে এর পরিবর্তে তারা বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগ করার প্রতি মনোযোগী হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে মুশরিকদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে আবুল ওয়ালীদ নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে একটি লোভনীয় প্রস্তাব পেশ করল। যাতে করে রাসূলুল্লাহ দাওয়াতের কাজ থেকে সরে আসেন। সে বলল, হে ভাতিজা! তুমি যা নিয়ে আগমন করেছ এবং মানুষকে যেসব কথা বলে বেড়াচ্ছ তার উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, এর মাধ্যমে তুমি কিছু ধনসম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এত বেশি ধনসম্পদ একত্রিত করে দেব যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদের মালিক হয়ে যাবে কিংবা যদি তুমি এটা চাও যে, মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি তোমার কাম্য, তাহলে আমাদের নেতৃত্ব তোমার হাতে সমর্পণ করে দেব এবং তোমাকে ছাড়া কোন সমস্যার সমাধান কিংবা মীমাংসা আমরা করব না। যদি এমনও হয় যে, তুমি রাজা-বাদশাহ হতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সম্রাটের পদে অধিষ্ঠিত করে দেব। তাছাড়া তোমার নিকট যে আগমন করে সে যদি জিন কিংবা ভূতপ্রেত হয়- যাকে তুমি দেখছ অথচ নিজে নিজে তার কুপ্রভাব প্রতিহত করতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেব এবং তোমার পূর্ণ সুস্থতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন আমরা তা করতে প্রস্তুত থাকব। কেননা কখনো কখনো এমনও হয় যে, জিন-ভূতেরা মানুষের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে এবং এজন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূলুল্লাহ তার এ কথাগুলো শোনার পর তাকে সূরা ফুসসিলাতের প্রথম আয়াত থেকে সিজদার আয়াত পর্যন্ত বা ৩৭ নং আয়াত পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন। তারপর আর কিছু না বলেই তাকে বিদায় দিয়ে দিলেন।
এ বাণীগুলো শোনার পর সে খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। ফলে সে মুশরিকদের নিকট ফিরে গিয়ে নিজের আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কথা ব্যক্ত করে বলল, আমি এমন বাণী শুনে এসেছি যে, এগুলো কোনদিনই শুনিনি। আল্লাহর শপথ! সেগুলো কবিতা নয় এবং যাদুও নয়। হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমার কথা মেনে নিয়ে ব্যাপারটি আমার উপর ছেড়ে দাও। আমার মত এই যে, ঐ ব্যক্তিকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। সে পৃথক হয়ে থাক ।
আল্লাহর কসম! আমি তার মুখ থেকে যে বাণী শুনে এলাম তার দ্বারা অতি শীঘ্রই কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংঘটিত হয়ে যাবে। আর যদি তাকে কোন আরবি ব্যক্তি হত্যা করে ফেলে, তাহলে তো তোমাদের কর্মটা অন্যের দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু এই ব্যক্তি যদি আরবিদের উপর বিজয়ী হয়ে প্রাধান্য বিস্তারে সক্ষম হয়, তাহলে তার রাজত্ব পরিচালনা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের রাজত্ব হিসেবে গণ্য হবে। এর অস্তিত্ব বা টিকে থাকা সবচেয়ে বেশি তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। কিন্তু লোকেরা আবুল ওয়ালীদের মুখে এসব কথা শুনে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং তাকেও একজন যাদুগ্রস্ত মনে করল।
📄 মুশরিক কর্তৃক মুসলিমদেরকে পূর্ণাঙ্গ বয়কট
তাদের এসব একের পর এক ব্যর্থ মিশন খুব দ্রুতই সংঘটিত হচ্ছিল। ফলে তারা বারবার হোঁচট খেয়ে দিশেহারা হচ্ছিল। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, যদি তারা মুহাম্মাদ-কে হত্যা করে তাহলে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তারা একদিন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মুহাসসাব নামক উপত্যকায় খাইফে বনু কেনানা এর ভেতরে একত্রিত হলো। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে,
১. বনু হাশেম এবং বনু মুত্তালিবের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক আদান-प्रদান ও কুশল বিনিময় ইত্যাদি সবকিছুই বন্ধ রাখা হবে।
২. কেউ তাদের কন্যা গ্রহণ করতে কিংবা তাদেরকে কন্যা দান করতে পারবে না।
৩. তাদের সাথে উঠা-বসা, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, মেলা-মেশা, বাড়িতে যাতায়াত ইত্যাদি কোন কিছুই করা যাবে না।
৪. যতদিন পর্যন্ত তারা রাসূলুল্লাহ-কে তাদের হাতে তুলে না দেবে ততদিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
এ বয়কটের দলীলস্বরূপ একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয় এবং এটি কাবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের সকল মুসলিম ও অমুসলিম সদস্য আতঙ্কিত হয়ে শিয়াবে আবু তালিব গিরিপর্বতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন- কেবল আবু লাহাব ব্যতীত। আর এ ঘটনাটি ঘটেছিল নবুওয়াতের ৭ম বছরের মুহাররম মাসের শুরুতে।
📄 শিয়াবে আবু তালিবের অবস্থা
কাফির-মুশরিকদের এ ধরনের বয়কটের কারণে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের লোকদের জীবনযাপন করা খুবই সঙ্কটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্য খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আমদানী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি পানি সরবরাহ পর্যন্তও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের অবস্থা এমন হলো যে, তাদেরকে গাছের পাতা, চামড়া ইত্যাদি খেতে হতো। যার ফলে তাদের পায়খানা ছাগলের পায়খানার মতো হয়ে গিয়েছিল। আবার যদি তারা কখনো খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করার জন্য বাইরে বের হতো, তখন তাদের থেকে এত বেশি দাম হাঁকানো হতো যে, সেগুলো তাদের পক্ষে ক্রয় করা সম্ভব ছিল না। এদিকে আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। ফলে সকলেই যখন নিজ নিজ বিছানায় শয়ন করতেন, তখন আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর নিরাপত্তার জন্য তাঁকে নিজের বিছানায় শয়ন করিয়ে দিতেন এবং রাসূলুল্লাহ এর বিছানায় অন্য কাউকে শয়ন করাতেন। এরূপ অবরুদ্ধ অবস্থাতেও যখন হজ্জের সময় আসত, তখন মুসলিমগণ শিয়াবে আবু তালিব থেকে বের হয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে আগত লোকদেরকে দাওয়াত দিতেন। শিয়াবে আবু তালিবের এ অবস্থাটি তিন বৎসর স্থায়ী ছিল।
📄 আবু তালিবের মৃত্যু
মুশরিকদের বয়কটের কারণে আবু তালিব পূর্বের তুলনায় খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তিনি এ সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপরন্তু বার্ধক্য, দুশ্চিন্তা ইত্যাদির কারণে তার সে অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি এক সময় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তখন ছিল নবুওয়াতের ১০ম বৎসরের রজব মাস।
যখন চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল, তখন রাসূলুল্লাহ তার নিকট যান এবং সেখানে আবু জাহেলও গমন করে। রাসূলুল্লাহ বললেন, চাচা! আপনি কেবল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটি উচ্চারণ করুন, যাতে আমি সেটা বিচারের দিন আল্লাহর কাছে পেশ করতে পারি। তখন আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ বিন উমাইয়া বলল, হে আবু তালিব! আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে কি তাহলে শেষ পর্যন্ত বিমুখ হয়ে যাবেন? এভাবে উভয় পক্ষের বাদানুবাদ চলতেই থাকল। অবশেষে আবু তালিব নিজের পিতৃপুরুষদের ধর্মের উপরই মৃত্যুবরণ করেন।