📄 হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
সময়টি ছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরের জিলহজ্জ মাস। ইসলামের দাওয়াত তার নিজ গতিতেই এগিয়ে চলছিল এবং কাফিররাও তাদের বিরোধিতার চরম মুহূর্তে অবর্তীণ হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ এর চাচা হামযা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন। আর তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী একজন ব্যক্তি। ঘটনাটি ছিল এই যে, একদিন আবু জাহেল সাফা পর্বতের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিল। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তখন সে তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তার কোন প্রত্যুত্তর না দিয়ে নীরবে বাড়ি ফিরে যান। তারপর আবু জাহেল কাবা ঘরের কাছে এসে উক্ত কর্মের জন্য বড়াই করতে থাকে।
এদিকে ঘটনাটি এক ক্রীতদাসী সাফা পর্বত থেকে ভালোভাবে লক্ষ্য করছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব তীর-ধনুকে সজ্জিত অবস্থায় শিকার থেকে ঘরে ফিরছিলেন। তখন উক্ত দাসী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আবু জাহেলের ব্যবহারের কথা তাকে জানাল। এতে তিনি খুবই রাগান্বিত হয়ে যান। ফলে আবু জাহেলকে খোঁজ করে তাকে মসজিদুল হারামে পেয়ে যান। তারপর তাকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে সে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তারপর তিনি তাকে বললেন, তুমি তাকে গালি দিয়েছ, অথচ আমি তার দ্বীনের উপরে আছি। আমি তাই বলি যা সে বলে।
অতঃপর বিষয়টি নিয়ে আবু জাহেলের বনু মাখযুম গোত্র এবং হামযার বনু হাশেম গোত্রের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তখন আবু জাহেল বলল, তোমরা আবু উমারাহ [হামযা (রাঃ)]-কে ছেড়ে দাও। আমি তার ভাতিজাকে নিকৃষ্ট ভাষায় গালি দিয়েছি। ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
হামযা (রাঃ) কর্তৃক এভাবে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি আকস্মিক এবং গোত্রপ্রীতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অন্তরে ইসলামপ্রীতি জোরদার করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি দ্বীনের রশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আর এ ঘটনার মাধ্যমে ইসলামের শক্তি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
টিকাঃ
৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৯১-৯২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৮৭৮।
📄 উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
হামযা (রাঃ) সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং মাত্র তিনদিন অতিবাহিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মুসলিমরা কিছুটা আত্মবিশ্বাস অর্জন করে ফেলেছে। এমন সময় হঠাৎ আরো একটি আকস্মিক ঘটনা সকলকেই হতভম্ব করে দিল।
ঘটনাটি মুমিনদেরকে আনন্দিত করল এবং কাফির-মুশরিকদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো আঘাত হানল। আর সেটি হচ্ছে, উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ। ইতিপূর্বে একদিন রাসূলুল্লাহ এ মর্মে দু'আ করেছিলেন যে,
اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ بِأَحَبِّ هُذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الخَطَابِ
হে আল্লাহ! আবু জাহেল অথবা উমর ইবনে খাত্তাব- এ দুই ব্যক্তির মধ্যে যে ব্যক্তি তোমার নিকট বেশি প্রিয় তার দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী করে দাও। ৫৪ ফলে আল্লাহ তা'আলা উমর (রাঃ)-কে পছন্দ করলেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দিলেন। ঘটনাটি হচ্ছে, উমর (রাঃ) ছিলেন উগ্রমেজাজ, রূঢ় প্রকৃতি ও বীরত্বের দিক থেকে আরব সমাজের বিখ্যাত ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ এবং মুসলিমদের বিপজ্জনক শত্রু। একদিন তিনি কোন একটি বিষয়ে খুবই উত্তেজিত হয়ে রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য খোলা তরবারি হাতে নিয়ে রাস্তায় বের হন। পথিমধ্যে বন্ধু নাঈম বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর সাথে দেখা হয়। তিনি ইতিপূর্বে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে উমর (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতেন না। তিনি উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে উমর! কী উদ্দেশ্যে বের হয়েছ? তিনি বললেন, মুহাম্মাদকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। তখন নাঈম (রাঃ) পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য উমর (রাঃ) এর বোন ফাতিমা (রাঃ) এবং তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দিলেন। এতে উমর (রাঃ) আরো উত্তেজিত হয়ে প্রথমে নিজের বোনের বাড়ির দিকে ছুটলেন। সেখানে খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ) তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন। অতঃপর উমর (রাঃ) এর আগমনের বিষয়টি বুঝতে পেরে খাব্বাব (রাঃ) সেখানেই আত্মগোপন করলেন এবং ফাতিমা (রাঃ) সহীফাটি লুকিয়ে রাখলেন। তারপর উমর (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বোন ফাতিমা (রাঃ)-কে বকা-ঝকা করতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে বোন এবং ভগ্নিপতি উভয়কে নির্মমভাবে প্রহার করতে শুরু করলেন। একসময় তাঁর বোনের গণ্ডদেশে এমন এক চপেটাঘাত করলেন যে, সাথে সাথে তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। এতে উমর (রাঃ) বিনম্র হলেন এবং বিব্রতবোধ করলেন। তারপর ইতিপূর্বে তারা যা পাঠ করছিল সেটি পড়তে চাইলেন। তখন ফাতিমা (রাঃ) তাকে গোসল করে আসতে বললেন। ফলে তিনি তাই করলেন। তারপর তিনি সহীফাটি হাতে নিয়ে সূরা ত্ব-হা- এর নিম্নোক্ত অংশটি পাঠ করলেন-
إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
নিশ্চয় আমিই আল্লাহ; আমি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো এবং আমাকেই স্মরণ করার উদ্দেশ্যে সালাত কায়েম করো। (সূরা ত্ব-হা- ১৪)
এ অংশটুকু পাঠ করে উমর (রাঃ) খুবই অভিভূত হলেন এবং তখনই তাকে মুহাম্মাদ এর কাছে নিয়ে যেতে বললেন। উমর (রাঃ) এর এ কথা শুনে খাব্বাব (রাঃ) লুকানো জায়গা থেকে বের হয়ে এসে উমর (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর দু'আ করার বিষয়টির সুসংবাদ দিলেন।
সে সময় রাসূলুল্লাহ সাফা পর্বতের নিকটস্থ গোপন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। ফলে তারা উমর (রাঃ)-কে সেখানেই নিয়ে গেলেন। তখন সেখানে হামযা (রাঃ) সহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁর আগমনের কারণে সাধারণ মুসলিমরা প্রাথমিকভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেলেও হামযা (রাঃ) এর উপস্থিতির কারণে কিছুটা আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন যে, হে সর্বশক্তিমান প্রভু! তোমার ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছাই হচ্ছে চূড়ান্ত। এই উমর ইবনে খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি এবং সম্মান বৃদ্ধি করুন। ৫৫ এতে উমর (রাঃ) খুবই প্রভাবান্বিত হলেন এবং সাথে সাথেই শাহাদাত বাক্য পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
টিকাঃ
৫৪ তিরমিযী হা/৩৬৮১; মসনাদে আহমাদ হা/৫২৬৯/৬০ মাস্তাদরাকে হাকো মা
৫৫ মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৪৮৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৬৯৬; তিরমিযী, হা/৩৬৮১।
📄 সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে সালাত আদায়
এতদিন পর্যন্ত মুসলিমরা কেবল গোপনেই সালাত আদায় করে যাচ্ছিলেন। প্রকাশ্যে সালাত আদায় করার মতো সাহস ছিল না। অতঃপর যখন উমর (রাঃ) মুসলিম হয়ে গেলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই- যদিও আমরা জীবিত থাকি অথবা মারা যাই? রাসূলুল্লাহ বললেন, অবশ্যই! সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি জীবিত থাক কিংবা মৃত্যুমুখে পতিত হও তবুও তোমরা সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছ।
এ কথা শুনে উমর (রাঃ) সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তাহলে গোপনীয়তার কী প্রয়োজন? সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন। আমরা অবশ্যই গোপনীয়তা পরিহার করে বাইরে বের হব। ফলে মুসলিমরা দুটি সারি বেঁধে রাসূলুল্লাহ-কে উভয় সারির মধ্যে নিয়ে বাইরে বের হলেন। এক সারির সামনে ছিলেন হামযা (রাঃ) এবং অন্য সারির সামনে ছিলেন উমর (রাঃ)। তারা সকলেই দল বেধে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন। তারপর তারা সেখানে সালাত আদায় করলেন। আর এটিই ছিল ইসলামের প্রথম প্রকাশ্যে সালাত আদায়।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কুরাইশদের প্রতিনিধি প্রেরণ
হামযা (রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর মতো প্রতাপশালী দুজন বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ করার কারণে মুসলিমদের উপর মুশরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। যার কারণে মুশরিকদের অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে। তবে এর পরিবর্তে তারা বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগ করার প্রতি মনোযোগী হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে মুশরিকদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে আবুল ওয়ালীদ নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে একটি লোভনীয় প্রস্তাব পেশ করল। যাতে করে রাসূলুল্লাহ দাওয়াতের কাজ থেকে সরে আসেন। সে বলল, হে ভাতিজা! তুমি যা নিয়ে আগমন করেছ এবং মানুষকে যেসব কথা বলে বেড়াচ্ছ তার উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, এর মাধ্যমে তুমি কিছু ধনসম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এত বেশি ধনসম্পদ একত্রিত করে দেব যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদের মালিক হয়ে যাবে কিংবা যদি তুমি এটা চাও যে, মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি তোমার কাম্য, তাহলে আমাদের নেতৃত্ব তোমার হাতে সমর্পণ করে দেব এবং তোমাকে ছাড়া কোন সমস্যার সমাধান কিংবা মীমাংসা আমরা করব না। যদি এমনও হয় যে, তুমি রাজা-বাদশাহ হতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সম্রাটের পদে অধিষ্ঠিত করে দেব। তাছাড়া তোমার নিকট যে আগমন করে সে যদি জিন কিংবা ভূতপ্রেত হয়- যাকে তুমি দেখছ অথচ নিজে নিজে তার কুপ্রভাব প্রতিহত করতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেব এবং তোমার পূর্ণ সুস্থতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন আমরা তা করতে প্রস্তুত থাকব। কেননা কখনো কখনো এমনও হয় যে, জিন-ভূতেরা মানুষের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে এবং এজন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূলুল্লাহ তার এ কথাগুলো শোনার পর তাকে সূরা ফুসসিলাতের প্রথম আয়াত থেকে সিজদার আয়াত পর্যন্ত বা ৩৭ নং আয়াত পর্যন্ত পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন। তারপর আর কিছু না বলেই তাকে বিদায় দিয়ে দিলেন।
এ বাণীগুলো শোনার পর সে খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। ফলে সে মুশরিকদের নিকট ফিরে গিয়ে নিজের আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কথা ব্যক্ত করে বলল, আমি এমন বাণী শুনে এসেছি যে, এগুলো কোনদিনই শুনিনি। আল্লাহর শপথ! সেগুলো কবিতা নয় এবং যাদুও নয়। হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমার কথা মেনে নিয়ে ব্যাপারটি আমার উপর ছেড়ে দাও। আমার মত এই যে, ঐ ব্যক্তিকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। সে পৃথক হয়ে থাক ।
আল্লাহর কসম! আমি তার মুখ থেকে যে বাণী শুনে এলাম তার দ্বারা অতি শীঘ্রই কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংঘটিত হয়ে যাবে। আর যদি তাকে কোন আরবি ব্যক্তি হত্যা করে ফেলে, তাহলে তো তোমাদের কর্মটা অন্যের দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু এই ব্যক্তি যদি আরবিদের উপর বিজয়ী হয়ে প্রাধান্য বিস্তারে সক্ষম হয়, তাহলে তার রাজত্ব পরিচালনা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের রাজত্ব হিসেবে গণ্য হবে। এর অস্তিত্ব বা টিকে থাকা সবচেয়ে বেশি তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। কিন্তু লোকেরা আবুল ওয়ালীদের মুখে এসব কথা শুনে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং তাকেও একজন যাদুগ্রস্ত মনে করল।