📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 পুনরায় আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের আগমন

📄 পুনরায় আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের আগমন


কুরাইশরা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে আবু তালিবকে এত কঠোর হুমকি দেয়ার পরও কোন ফলাফল পাওয়া গেল না, তখন তারা একটি অভিনব অফার নিয়ে পুনরায় আবু তালিবের কাছে গমন করল। তারা বলল, হে আবু তালিব! এ হচ্ছে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ধীমান যুবক। আপনি একে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। এর রক্তপাতের খেসারত এবং সাহায্যের অধিকারী আপনিই হবেন। এই যুবক আজ হতে আপনার সন্তান বলে গণ্য হবে। এর পরিবর্তে আপনার ভাতিজাকে আমাদের হাতে তুলে দিন। সে আপনার ও আমাদের পিতা-পিতামহদের বিরোধিতা করছে, তাকে হত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। এক ব্যক্তির বিনিময়ে এক ব্যক্তিই যথেষ্ট।
কুরাইশদের এ ধরনের অভিনব প্রস্তাবে আবু তালিব বললেন, তোমরা যে কথা বললে এর চেয়ে জঘন্য এবং অর্থহীন কথা আর কিছু হতে পারে কি? তোমরা তোমাদের সন্তান আমাকে এই উদ্দেশ্যে দিচ্ছ যে, আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে লালনপালন করব। আর আমার সন্তানকে তোমাদের হাতে এ উদ্দেশ্যে তুলে দেব যে, তোমরা তাকে হত্যা করবে। আল্লাহর কসম! কখনই এমনটি হতে পারে না।
এভাবে আবু তালিবের সাথে কুরাইশদের আরো কিছুক্ষণ বিতর্ক চলার পর তাদের এ আগমনটাও ব্যর্থ হয়ে গেল। আর কুরাইশদের আগমনের এ ঘটনা দুটি ঘটেছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র


রাসূলুল্লাহ এর চাচার সাথে বারবার আলোচনা করার পর যখন কুরাইশরা বিন্দু পরিমাণ সফল হতে পারল না, তখন তারা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোর হতে থাকল। এক সময় এ দাওয়াতকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার কথা চিন্তা করতে লাগল। কিন্তু এমন কঠিন মুহূর্তে কুরাইশদের শক্তির অন্যতম বড় উৎস হামযা ও উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের সকল পরিকল্পনায় ভাটা পড়ে যায়। এতে ইসলামের শক্তি আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় মক্কার কাফির-মুশরিকরা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। যার কয়েকটি চিত্র নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. একদিন উতায়বা ইবনে আবু লাহাব উত্তেজিত হয়ে রাসূলুল্লাহ এর জামা ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেলল এবং তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। ফলে রাসূলুল্লাহ তার জন্য বদদু'আ করলেন যে, হে আল্লাহ! তোমার কুকুরগুলোর মধ্য থেকে এর জন্য একটি কুকুর নিযুক্ত করে দাও। রাসূলুল্লাহ এর এ দু'আ আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গেল। যার ফলে একদিন সে কয়েকজন কুরাইশ ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফরে বের হলো। তারপর যখন তারা শাম দেশের জারকা নামক স্থানে তাবু স্থাপন করল, তখন রাতের বেলায় একটি বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলল।
২. একদিন আবু জাহেল রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য কাবা ঘরের চত্বরে একটি পাথর নিয়ে বসেছিল। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সেখানে আগমন করে সালাত আদায় করতে লাগলেন, তখন আবু জাহেল পাথরটি উঠিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে পরাস্ত সৈনিকের মতো পালাতে লাগল। এ সময় তাকে খুবই বিবর্ণ ও ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। তার এ অবস্থা দেখে লোকেরা তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করল। তখন সে বলল, আমি তাকে হত্যা করার জন্যই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন আমি তার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, তখন একটি উট আমার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। ইতিপূর্বে আমি এরকম মাথা, ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট আর কখনো দেখিনি। মনে হলো যে, সে আমাকে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে। অতঃপর এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ-কে জানানো হলে তিনি বললেন, উটের রূপ ধারণ করে সেখানে জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়েছিলেন। আবু জাহেল যদি আমার নিকট আসত তাহলে তার উপর মহাবিপদ নেমে আসত।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ


সময়টি ছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরের জিলহজ্জ মাস। ইসলামের দাওয়াত তার নিজ গতিতেই এগিয়ে চলছিল এবং কাফিররাও তাদের বিরোধিতার চরম মুহূর্তে অবর্তীণ হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ এর চাচা হামযা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন। আর তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী একজন ব্যক্তি। ঘটনাটি ছিল এই যে, একদিন আবু জাহেল সাফা পর্বতের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিল। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তখন সে তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তার কোন প্রত্যুত্তর না দিয়ে নীরবে বাড়ি ফিরে যান। তারপর আবু জাহেল কাবা ঘরের কাছে এসে উক্ত কর্মের জন্য বড়াই করতে থাকে।
এদিকে ঘটনাটি এক ক্রীতদাসী সাফা পর্বত থেকে ভালোভাবে লক্ষ্য করছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব তীর-ধনুকে সজ্জিত অবস্থায় শিকার থেকে ঘরে ফিরছিলেন। তখন উক্ত দাসী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আবু জাহেলের ব্যবহারের কথা তাকে জানাল। এতে তিনি খুবই রাগান্বিত হয়ে যান। ফলে আবু জাহেলকে খোঁজ করে তাকে মসজিদুল হারামে পেয়ে যান। তারপর তাকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে সে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তারপর তিনি তাকে বললেন, তুমি তাকে গালি দিয়েছ, অথচ আমি তার দ্বীনের উপরে আছি। আমি তাই বলি যা সে বলে।
অতঃপর বিষয়টি নিয়ে আবু জাহেলের বনু মাখযুম গোত্র এবং হামযার বনু হাশেম গোত্রের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তখন আবু জাহেল বলল, তোমরা আবু উমারাহ [হামযা (রাঃ)]-কে ছেড়ে দাও। আমি তার ভাতিজাকে নিকৃষ্ট ভাষায় গালি দিয়েছি। ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
হামযা (রাঃ) কর্তৃক এভাবে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি আকস্মিক এবং গোত্রপ্রীতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অন্তরে ইসলামপ্রীতি জোরদার করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি দ্বীনের রশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আর এ ঘটনার মাধ্যমে ইসলামের শক্তি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

টিকাঃ
৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৯১-৯২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৮৭৮।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ

📄 উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ


হামযা (রাঃ) সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং মাত্র তিনদিন অতিবাহিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মুসলিমরা কিছুটা আত্মবিশ্বাস অর্জন করে ফেলেছে। এমন সময় হঠাৎ আরো একটি আকস্মিক ঘটনা সকলকেই হতভম্ব করে দিল।
ঘটনাটি মুমিনদেরকে আনন্দিত করল এবং কাফির-মুশরিকদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো আঘাত হানল। আর সেটি হচ্ছে, উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ। ইতিপূর্বে একদিন রাসূলুল্লাহ এ মর্মে দু'আ করেছিলেন যে,
اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ بِأَحَبِّ هُذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الخَطَابِ
হে আল্লাহ! আবু জাহেল অথবা উমর ইবনে খাত্তাব- এ দুই ব্যক্তির মধ্যে যে ব্যক্তি তোমার নিকট বেশি প্রিয় তার দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী করে দাও। ৫৪ ফলে আল্লাহ তা'আলা উমর (রাঃ)-কে পছন্দ করলেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দিলেন। ঘটনাটি হচ্ছে, উমর (রাঃ) ছিলেন উগ্রমেজাজ, রূঢ় প্রকৃতি ও বীরত্বের দিক থেকে আরব সমাজের বিখ্যাত ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ এবং মুসলিমদের বিপজ্জনক শত্রু। একদিন তিনি কোন একটি বিষয়ে খুবই উত্তেজিত হয়ে রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য খোলা তরবারি হাতে নিয়ে রাস্তায় বের হন। পথিমধ্যে বন্ধু নাঈম বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর সাথে দেখা হয়। তিনি ইতিপূর্বে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে উমর (রাঃ) তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতেন না। তিনি উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে উমর! কী উদ্দেশ্যে বের হয়েছ? তিনি বললেন, মুহাম্মাদকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। তখন নাঈম (রাঃ) পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য উমর (রাঃ) এর বোন ফাতিমা (রাঃ) এবং তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দিলেন। এতে উমর (রাঃ) আরো উত্তেজিত হয়ে প্রথমে নিজের বোনের বাড়ির দিকে ছুটলেন। সেখানে খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ) তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন। অতঃপর উমর (রাঃ) এর আগমনের বিষয়টি বুঝতে পেরে খাব্বাব (রাঃ) সেখানেই আত্মগোপন করলেন এবং ফাতিমা (রাঃ) সহীফাটি লুকিয়ে রাখলেন। তারপর উমর (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বোন ফাতিমা (রাঃ)-কে বকা-ঝকা করতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে বোন এবং ভগ্নিপতি উভয়কে নির্মমভাবে প্রহার করতে শুরু করলেন। একসময় তাঁর বোনের গণ্ডদেশে এমন এক চপেটাঘাত করলেন যে, সাথে সাথে তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। এতে উমর (রাঃ) বিনম্র হলেন এবং বিব্রতবোধ করলেন। তারপর ইতিপূর্বে তারা যা পাঠ করছিল সেটি পড়তে চাইলেন। তখন ফাতিমা (রাঃ) তাকে গোসল করে আসতে বললেন। ফলে তিনি তাই করলেন। তারপর তিনি সহীফাটি হাতে নিয়ে সূরা ত্ব-হা- এর নিম্নোক্ত অংশটি পাঠ করলেন-
إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
নিশ্চয় আমিই আল্লাহ; আমি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো এবং আমাকেই স্মরণ করার উদ্দেশ্যে সালাত কায়েম করো। (সূরা ত্ব-হা- ১৪)
এ অংশটুকু পাঠ করে উমর (রাঃ) খুবই অভিভূত হলেন এবং তখনই তাকে মুহাম্মাদ এর কাছে নিয়ে যেতে বললেন। উমর (রাঃ) এর এ কথা শুনে খাব্বাব (রাঃ) লুকানো জায়গা থেকে বের হয়ে এসে উমর (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর দু'আ করার বিষয়টির সুসংবাদ দিলেন।
সে সময় রাসূলুল্লাহ সাফা পর্বতের নিকটস্থ গোপন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। ফলে তারা উমর (রাঃ)-কে সেখানেই নিয়ে গেলেন। তখন সেখানে হামযা (রাঃ) সহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁর আগমনের কারণে সাধারণ মুসলিমরা প্রাথমিকভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেলেও হামযা (রাঃ) এর উপস্থিতির কারণে কিছুটা আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন যে, হে সর্বশক্তিমান প্রভু! তোমার ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছাই হচ্ছে চূড়ান্ত। এই উমর ইবনে খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি এবং সম্মান বৃদ্ধি করুন। ৫৫ এতে উমর (রাঃ) খুবই প্রভাবান্বিত হলেন এবং সাথে সাথেই শাহাদাত বাক্য পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

টিকাঃ
৫৪ তিরমিযী হা/৩৬৮১; মসনাদে আহমাদ হা/৫২৬৯/৬০ মাস্তাদরাকে হাকো মা
৫৫ মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৪৮৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৬৯৬; তিরমিযী, হা/৩৬৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00