📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের পক্ষ থেকে হুমকি

📄 আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের পক্ষ থেকে হুমকি


এত কিছুর পরও যখন মুসলিমদের থামানো সম্ভব হচ্ছিল না তখন কুরাইশরা আবু তালিবকে আরো বড় ধরনের হুমকি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। যাতে করে আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর পথ থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তারা রাসূলুল্লাহ-কে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা হতে নিবৃত্ত করতে পারে। সুতরাং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা একদিন আবু তালিবের কাছে গিয়ে বলল, আপনি আমাদের মাঝে মান-মর্যাদার অধিকারী একজন বয়স্ক ব্যক্তি। আমরা ইতিপূর্বে আপনার নিকট আবেদন করেছিলাম যে, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের ধর্ম সম্পর্কে নিন্দা করা থেকে বিরত থাকুন। কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনি মনে রাখবেন, আমরা এটা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছি না যে, আমাদের পিতা, পিতামহ এবং পূর্বপুরুষদের গালমন্দ করা হবে, আমাদের বিবেককে নির্বুদ্ধিতা বলে আখ্যায়িত করা হবে এবং আমাদের দেব-দেবীদেরকে নিন্দা করা হবে। আমরা আবারও আপনাকে অনুরোধ করছি, হয় আপনি তাকে সেসব থেকে নিবৃত্ত রাখুন, নতুবা আমাদের দুই দলের মধ্যে এক দল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বিগ্রহ চলতেই থাকবে। কুরাইশ নেতাদের এমন কঠোর হুমকিতে আবু তালিব খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। ফলে তিনি তখনই রাসূলুল্লাহ -কে ডেকে পাঠালেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, বাবা- একটু ভেবে চিন্তে কাজ করো। যে ভার বহন করার শক্তি আমার নেই, সে ভার তুমি আমার উপর চাপিয়ে দিয়ো না। চাচার এ ধরনের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ অনেকটা চিন্তিত হয়ে গেলেন এবং কুরাইশদের কঠোরতা কিছুটা অনুভব করলেন। কিন্তু তিনি এতে কোনরকম প্রভাবান্বিত না হয়ে চাচাকে বললেন, চাচাজান; আল্লাহর কসম! যদি এরা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তবুও আমি আমার এই কর্তব্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছপা হব না। এতে আল্লাহ তা'আলা আমাকে হয় জয়যুক্ত করবেন, নতুবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব।
আবু তালিব এক দিকে কুরাইশদের কঠোরতা এবং অপরদিকে ভাতিজা মুহাম্মাদ এর অনমনিয়তা প্রত্যক্ষ করে নিজের মধ্যে অসহায়ত্ব অনুভব করলেন। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ -কে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি নির্দ্বিধায় তোমার কাজ করে যাও। আল্লাহর কসম! আমি কোন অবস্থাতেই তোমাকে পরিত্যাগ করব না।
এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ পুনরায় তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন ।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 পুনরায় আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের আগমন

📄 পুনরায় আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের আগমন


কুরাইশরা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে আবু তালিবকে এত কঠোর হুমকি দেয়ার পরও কোন ফলাফল পাওয়া গেল না, তখন তারা একটি অভিনব অফার নিয়ে পুনরায় আবু তালিবের কাছে গমন করল। তারা বলল, হে আবু তালিব! এ হচ্ছে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ধীমান যুবক। আপনি একে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। এর রক্তপাতের খেসারত এবং সাহায্যের অধিকারী আপনিই হবেন। এই যুবক আজ হতে আপনার সন্তান বলে গণ্য হবে। এর পরিবর্তে আপনার ভাতিজাকে আমাদের হাতে তুলে দিন। সে আপনার ও আমাদের পিতা-পিতামহদের বিরোধিতা করছে, তাকে হত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। এক ব্যক্তির বিনিময়ে এক ব্যক্তিই যথেষ্ট।
কুরাইশদের এ ধরনের অভিনব প্রস্তাবে আবু তালিব বললেন, তোমরা যে কথা বললে এর চেয়ে জঘন্য এবং অর্থহীন কথা আর কিছু হতে পারে কি? তোমরা তোমাদের সন্তান আমাকে এই উদ্দেশ্যে দিচ্ছ যে, আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে লালনপালন করব। আর আমার সন্তানকে তোমাদের হাতে এ উদ্দেশ্যে তুলে দেব যে, তোমরা তাকে হত্যা করবে। আল্লাহর কসম! কখনই এমনটি হতে পারে না।
এভাবে আবু তালিবের সাথে কুরাইশদের আরো কিছুক্ষণ বিতর্ক চলার পর তাদের এ আগমনটাও ব্যর্থ হয়ে গেল। আর কুরাইশদের আগমনের এ ঘটনা দুটি ঘটেছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র


রাসূলুল্লাহ এর চাচার সাথে বারবার আলোচনা করার পর যখন কুরাইশরা বিন্দু পরিমাণ সফল হতে পারল না, তখন তারা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোর হতে থাকল। এক সময় এ দাওয়াতকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার কথা চিন্তা করতে লাগল। কিন্তু এমন কঠিন মুহূর্তে কুরাইশদের শক্তির অন্যতম বড় উৎস হামযা ও উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের সকল পরিকল্পনায় ভাটা পড়ে যায়। এতে ইসলামের শক্তি আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় মক্কার কাফির-মুশরিকরা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। যার কয়েকটি চিত্র নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. একদিন উতায়বা ইবনে আবু লাহাব উত্তেজিত হয়ে রাসূলুল্লাহ এর জামা ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেলল এবং তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। ফলে রাসূলুল্লাহ তার জন্য বদদু'আ করলেন যে, হে আল্লাহ! তোমার কুকুরগুলোর মধ্য থেকে এর জন্য একটি কুকুর নিযুক্ত করে দাও। রাসূলুল্লাহ এর এ দু'আ আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গেল। যার ফলে একদিন সে কয়েকজন কুরাইশ ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফরে বের হলো। তারপর যখন তারা শাম দেশের জারকা নামক স্থানে তাবু স্থাপন করল, তখন রাতের বেলায় একটি বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলল।
২. একদিন আবু জাহেল রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য কাবা ঘরের চত্বরে একটি পাথর নিয়ে বসেছিল। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সেখানে আগমন করে সালাত আদায় করতে লাগলেন, তখন আবু জাহেল পাথরটি উঠিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে পরাস্ত সৈনিকের মতো পালাতে লাগল। এ সময় তাকে খুবই বিবর্ণ ও ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। তার এ অবস্থা দেখে লোকেরা তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করল। তখন সে বলল, আমি তাকে হত্যা করার জন্যই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন আমি তার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, তখন একটি উট আমার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। ইতিপূর্বে আমি এরকম মাথা, ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট আর কখনো দেখিনি। মনে হলো যে, সে আমাকে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে। অতঃপর এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ-কে জানানো হলে তিনি বললেন, উটের রূপ ধারণ করে সেখানে জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়েছিলেন। আবু জাহেল যদি আমার নিকট আসত তাহলে তার উপর মহাবিপদ নেমে আসত।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ


সময়টি ছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরের জিলহজ্জ মাস। ইসলামের দাওয়াত তার নিজ গতিতেই এগিয়ে চলছিল এবং কাফিররাও তাদের বিরোধিতার চরম মুহূর্তে অবর্তীণ হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ এর চাচা হামযা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন। আর তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী একজন ব্যক্তি। ঘটনাটি ছিল এই যে, একদিন আবু জাহেল সাফা পর্বতের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিল। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তখন সে তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তার কোন প্রত্যুত্তর না দিয়ে নীরবে বাড়ি ফিরে যান। তারপর আবু জাহেল কাবা ঘরের কাছে এসে উক্ত কর্মের জন্য বড়াই করতে থাকে।
এদিকে ঘটনাটি এক ক্রীতদাসী সাফা পর্বত থেকে ভালোভাবে লক্ষ্য করছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব তীর-ধনুকে সজ্জিত অবস্থায় শিকার থেকে ঘরে ফিরছিলেন। তখন উক্ত দাসী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আবু জাহেলের ব্যবহারের কথা তাকে জানাল। এতে তিনি খুবই রাগান্বিত হয়ে যান। ফলে আবু জাহেলকে খোঁজ করে তাকে মসজিদুল হারামে পেয়ে যান। তারপর তাকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে সে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তারপর তিনি তাকে বললেন, তুমি তাকে গালি দিয়েছ, অথচ আমি তার দ্বীনের উপরে আছি। আমি তাই বলি যা সে বলে।
অতঃপর বিষয়টি নিয়ে আবু জাহেলের বনু মাখযুম গোত্র এবং হামযার বনু হাশেম গোত্রের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তখন আবু জাহেল বলল, তোমরা আবু উমারাহ [হামযা (রাঃ)]-কে ছেড়ে দাও। আমি তার ভাতিজাকে নিকৃষ্ট ভাষায় গালি দিয়েছি। ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
হামযা (রাঃ) কর্তৃক এভাবে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি আকস্মিক এবং গোত্রপ্রীতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অন্তরে ইসলামপ্রীতি জোরদার করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি দ্বীনের রশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আর এ ঘটনার মাধ্যমে ইসলামের শক্তি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

টিকাঃ
৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৯১-৯২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৮৭৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00