📄 মুসলিমদের হাবশায় হিজরত
মুসলিমগণ হাবশায় দুই বার হিজরত করেছিলেন। প্রথমবার হিজরত করেছিলেন ৫ম নববী বর্ষের রজব মাসে। আর দ্বিতীয়বার হিজরত করেছিলেন উক্ত বছরের যিলকদ মাসে।
প্রথম হিজরত : প্রথমবার যারা হিজরত করেছিলেন তারা ছিলেন ১২ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলা। তাদের দলনেতা ছিলেন উসমান (রাঃ)। আর এই দলে রাসূলুল্লাহ এর কন্যা রুকাইয়া (রাঃ)-ও ছিলেন। মক্কায় যখন কাফিররা মুসলিমদের উপর চরমভাবে নির্যাতন শুরু করে দিয়েছিল, তখন তিনি সাহাবীগণের পরামর্শক্রমে উক্ত দলটিকে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি দেন। কেননা তিনি ইতিপূর্বেই জানতে পেরেছিলেন যে, হাবশার বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশী একজন ন্যায়নিষ্ঠ শাসক। তার রাজ্যে সকলেই সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে দেয়া হয়। ফলে রাসূলুল্লাহ -ও এ আশা পোষণ করেছিলেন যে, যদি নির্যাতিত মুসলিমদেরকে সেখানে পাঠানো হয়, তাহলে তারা আপাতত কুরাইশ কাফিরদের হাত থেকে রেহাই পাবে।
দ্বিতীয় হিজরত: দ্বিতীয়বার যারা হাবশায় হিজরত করেন তারা ছিলেন ৮২/৮৩ জন পুরুষ এবং ১৮/১৯ জন মহিলা। তাদের দলনেতা ছিলেন রাসূলুল্লাহ এর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালেব (রাঃ)। হাবশায় প্রথমদল হিজরত করার মাধ্যমে কুরাইশরা যখন জানতে পেরেছিল যে, সেখানে তারা নিরাপদে বসবাস করছে, তখন তারা খুবই রাগান্বিত হলো। ফলে তারা মুসলিমদের হিজরত করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক হয়ে গেল। কিন্তু এরপরও মুসলিমদের এই বৃহত্তম দলটি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হাবশায় হিজরত করতে সক্ষম হন। এদিকে কুরাইশরা তাদের হাবশায় গমনের সংবাদ পেয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে যায়। ফলে তারা তাদেরকে ফেরত আনার জন্য আমর ইবনুল 'আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবী'আকে দায়িত্ব দিয়ে হাবশায় প্রেরণ করে।
তারা সেখানে গিয়ে প্রথমে নাজ্জাশীর দরবারে উপঢৌকন পেশ করল। তারপর বলল, হে বাদশাহ! আপনার দেশে আমাদের কিছু মূর্খ লোক পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে- যারা তাদের সম্প্রদায়ের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে; এমনকি তারা আপনাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি। তারা এমন এক নতুন দ্বীন নিয়ে এসেছে, যে ব্যাপারে আমরা কখনো শুনিনি এবং আপনিও কিছু জানেন না। আমাদের সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি তাদেরকে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফেরত পাঠান।
তাদের কথা শেষ হলে উপস্থিত পাদ্রীনেতাগণ কুরাইশ দূতদ্বয়ের সমর্থনে মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ করল। তখন বাদশাহ বললেন, আল্লাহর কসম! এটা কখনোই হতে পারে না। তারা আমার দেশে এসেছে এবং অন্যদের চেয়ে আমাকে পছন্দ করেছে। অতএব তাদের বক্তব্য না শুনে কোনরূপ সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। ফলে তিনি আশ্রিত মুসলিম দলটিকে বাদশার দরবারে উপস্থিত করার নির্দেশ দিলেন।
সে অনুযায়ী পরের দিন জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ) তাঁর সাথিদের নিয়ে বাদশার দরবারে উপস্থিত হন। যখন তিনি বাদশার দরবারে উপস্থিত হন, তখন তিনি ইসলামিক নিয়ম অবলম্বন করে অন্যান্যদের মতো সিজদা করলেন না। ফলে বাদশাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা প্রথানুযায়ী আমাকে সিজদা করলে না কেন? যেমনিভাবে ইতিপূর্বে তোমাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদ্বয় এসে করেছে? বাদশাহ আরো বললেন, তোমরা বাপ-দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করে এবং আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন যে ধর্ম গ্রহণ করেছ সেটা কী, আমাকে শোনাও!
তখন জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ) বললেন, হে বাদশাহ! আমাদের ধর্মের নাম ইসলাম। আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তার সাথে কাউকে শরীক করি না। বাদশাহ বললেন, এসব কথা তোমাদেরকে কে শিখিয়েছেন? জাফর (রাঃ) বললেন, আমাদের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তি। ইতিপূর্বে আমরা মূর্তিপূজা ও অশ্লীলতা এবং অন্যায় ও অত্যাচারে নিমজ্জিত ছিলাম। আমরা শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে শোষণ করতাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করে আমাদের মধ্য হতে তাঁর শেষ নবীকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নাম মুহাম্মাদ। তিনি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তাঁর বংশ মর্যাদা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা, সংযমশীলতা, পরোপকারিতা প্রভৃতি গুণাবলি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। নবুওয়াত লাভের পর তিনি আমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদাত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সাথে সাথে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম হতে তওবা করে সৎকর্মশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং এক আল্লাহর ইবাদাত করছি ও হালাল-হারাম মেনে চলছি। এতে আমাদের সম্প্রদায়ের নেতারা আমাদের উপর রাগান্বিত হয়েছে এবং আমাদের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছে। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে আপনার রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছি। আমরা অন্য স্থান বাদ দিয়ে আপনাকে পছন্দ করেছি এবং আমরা আপনার এখানেই থাকতে চাই। কেননা আমরা জানি যে, আপনি ন্যায়বিচার করে থাকেন। আশা করি আমরা আপনার নিকট অত্যাচারিত হব না।
জাফর (রাঃ) আরো বললেন, হে বাদশাহ! অভিবাদন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পরে অভিবাদন হলো 'সালাম' এবং রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে পরস্পরে 'সালাম' করার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন বাদশাহ বললেন, ঈসা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে তোমরা কী বলতে চাও? উত্তরে জাফর (রাঃ) সূরা মারইয়ামের শুরু থেকে নিয়ে ৩৬ নং আয়াত পর্যন্ত পাঠ করে শোনান। যেখানে যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আঃ) এর বর্ণনা, মারইয়াম (আঃ) এর প্রতিপালন, ঈসা (আঃ) এর জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন, শিশুকালে ঈসা (আঃ) এর কথোপকথন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
আর বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাওরাত-ইঞ্জীলের পণ্ডিত। ফলে তিনি কুরআনের অপূর্ব বাকভঙ্গি ও ভাষালঙ্কার এবং ঘটনার সারমর্ম উপলব্ধি করে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। সাথে সাথে উপস্থিত পাদ্রীগণও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর নাজ্জাশী বলে উঠলেন, নিশ্চয় এই কালাম এবং ঈসার নিকট যা নাযিল হয়েছিল দুটি একই আলোর উৎস থেকে নির্গত। তারপর তিনি কুরাইশ দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম! আমি কখনই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না। ফলে সেদিনকার মতো আমর ইবনে আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবী রাবী'আহ বাদশার দরবার থেকে বেরিয়ে যায়।
অতঃপর তারা পরের দিন আবার বাদশাহর দরবারে আগমন করে বলল, হে বাদশাহ! এরা ঈসা ইবনে মারইয়াম সম্পর্কে ভয়ঙ্কর সব কথা বলে থাকে। এ কথা শুনে বাদশাহ মুসলিম দলটিকে আবার ডাকালেন। তখন তারা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কেননা নাসারারা ঈসা (আঃ)-কে উপাস্য হিসেবে মানে। কিন্তু মুসলিমরা তাকে আল্লাহর বান্দা বলে থাকে। অবশেষে তারা কোনরূপ বাহানার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলার ব্যাপারে মনস্থির করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করলেন। অতঃপর তারা বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলে বাদশাহ তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে দলনেতা জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ) বললেন, তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত রূহ এবং তাঁর নির্দেশ, যা তিনি মহীয়সী কুমারী মাতা মারইয়ামের উপর ফুঁকে দিয়েছিলেন। কোন পুরুষ লোক তাকে [মারইয়াম (আঃ)-কে] স্পর্শ করেনি।
এসব কথা শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো উঠিয়ে নিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যা বলেছ ঈসা ইবনে মারইয়াম তার চেয়ে এই কাঠের টুকরা পরিমাণও বেশি ছিলেন না। তারপর তিনি জাফর (রাঃ) ও তার সাথিদের উদ্দেশ্যে বললেন, যাও! তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দিবে, তার জরিমানা হবে। এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, তোমাদের কাউকে কষ্ট দেয়ার বিনিময়ে যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড় এনে দেয়, তবুও আমি তা পছন্দ করব না। অতঃপর তিনি কুরাইশ দূতদ্বয়ের প্রদত্ত উপঢৌক ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এরপর থেকে তারা সেখানে দীর্ঘদিন যাবত নিরাপদে অবস্থান করেন এবং ৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের দিন মদিনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৫২ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩৩৩-৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪০; যাদুল মা'আদ, ৩/২৬।
📄 আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের পক্ষ থেকে হুমকি
এত কিছুর পরও যখন মুসলিমদের থামানো সম্ভব হচ্ছিল না তখন কুরাইশরা আবু তালিবকে আরো বড় ধরনের হুমকি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। যাতে করে আবু তালিব রাসূলুল্লাহ এর পথ থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তারা রাসূলুল্লাহ-কে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা হতে নিবৃত্ত করতে পারে। সুতরাং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা একদিন আবু তালিবের কাছে গিয়ে বলল, আপনি আমাদের মাঝে মান-মর্যাদার অধিকারী একজন বয়স্ক ব্যক্তি। আমরা ইতিপূর্বে আপনার নিকট আবেদন করেছিলাম যে, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের ধর্ম সম্পর্কে নিন্দা করা থেকে বিরত থাকুন। কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনি মনে রাখবেন, আমরা এটা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছি না যে, আমাদের পিতা, পিতামহ এবং পূর্বপুরুষদের গালমন্দ করা হবে, আমাদের বিবেককে নির্বুদ্ধিতা বলে আখ্যায়িত করা হবে এবং আমাদের দেব-দেবীদেরকে নিন্দা করা হবে। আমরা আবারও আপনাকে অনুরোধ করছি, হয় আপনি তাকে সেসব থেকে নিবৃত্ত রাখুন, নতুবা আমাদের দুই দলের মধ্যে এক দল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বিগ্রহ চলতেই থাকবে। কুরাইশ নেতাদের এমন কঠোর হুমকিতে আবু তালিব খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। ফলে তিনি তখনই রাসূলুল্লাহ -কে ডেকে পাঠালেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, বাবা- একটু ভেবে চিন্তে কাজ করো। যে ভার বহন করার শক্তি আমার নেই, সে ভার তুমি আমার উপর চাপিয়ে দিয়ো না। চাচার এ ধরনের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ অনেকটা চিন্তিত হয়ে গেলেন এবং কুরাইশদের কঠোরতা কিছুটা অনুভব করলেন। কিন্তু তিনি এতে কোনরকম প্রভাবান্বিত না হয়ে চাচাকে বললেন, চাচাজান; আল্লাহর কসম! যদি এরা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তবুও আমি আমার এই কর্তব্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছপা হব না। এতে আল্লাহ তা'আলা আমাকে হয় জয়যুক্ত করবেন, নতুবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব।
আবু তালিব এক দিকে কুরাইশদের কঠোরতা এবং অপরদিকে ভাতিজা মুহাম্মাদ এর অনমনিয়তা প্রত্যক্ষ করে নিজের মধ্যে অসহায়ত্ব অনুভব করলেন। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ -কে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি নির্দ্বিধায় তোমার কাজ করে যাও। আল্লাহর কসম! আমি কোন অবস্থাতেই তোমাকে পরিত্যাগ করব না।
এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ পুনরায় তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন ।
📄 পুনরায় আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের আগমন
কুরাইশরা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে আবু তালিবকে এত কঠোর হুমকি দেয়ার পরও কোন ফলাফল পাওয়া গেল না, তখন তারা একটি অভিনব অফার নিয়ে পুনরায় আবু তালিবের কাছে গমন করল। তারা বলল, হে আবু তালিব! এ হচ্ছে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ধীমান যুবক। আপনি একে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। এর রক্তপাতের খেসারত এবং সাহায্যের অধিকারী আপনিই হবেন। এই যুবক আজ হতে আপনার সন্তান বলে গণ্য হবে। এর পরিবর্তে আপনার ভাতিজাকে আমাদের হাতে তুলে দিন। সে আপনার ও আমাদের পিতা-পিতামহদের বিরোধিতা করছে, তাকে হত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। এক ব্যক্তির বিনিময়ে এক ব্যক্তিই যথেষ্ট।
কুরাইশদের এ ধরনের অভিনব প্রস্তাবে আবু তালিব বললেন, তোমরা যে কথা বললে এর চেয়ে জঘন্য এবং অর্থহীন কথা আর কিছু হতে পারে কি? তোমরা তোমাদের সন্তান আমাকে এই উদ্দেশ্যে দিচ্ছ যে, আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে লালনপালন করব। আর আমার সন্তানকে তোমাদের হাতে এ উদ্দেশ্যে তুলে দেব যে, তোমরা তাকে হত্যা করবে। আল্লাহর কসম! কখনই এমনটি হতে পারে না।
এভাবে আবু তালিবের সাথে কুরাইশদের আরো কিছুক্ষণ বিতর্ক চলার পর তাদের এ আগমনটাও ব্যর্থ হয়ে গেল। আর কুরাইশদের আগমনের এ ঘটনা দুটি ঘটেছিল নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র
রাসূলুল্লাহ এর চাচার সাথে বারবার আলোচনা করার পর যখন কুরাইশরা বিন্দু পরিমাণ সফল হতে পারল না, তখন তারা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোর হতে থাকল। এক সময় এ দাওয়াতকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার কথা চিন্তা করতে লাগল। কিন্তু এমন কঠিন মুহূর্তে কুরাইশদের শক্তির অন্যতম বড় উৎস হামযা ও উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের সকল পরিকল্পনায় ভাটা পড়ে যায়। এতে ইসলামের শক্তি আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় মক্কার কাফির-মুশরিকরা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। যার কয়েকটি চিত্র নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. একদিন উতায়বা ইবনে আবু লাহাব উত্তেজিত হয়ে রাসূলুল্লাহ এর জামা ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেলল এবং তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। ফলে রাসূলুল্লাহ তার জন্য বদদু'আ করলেন যে, হে আল্লাহ! তোমার কুকুরগুলোর মধ্য থেকে এর জন্য একটি কুকুর নিযুক্ত করে দাও। রাসূলুল্লাহ এর এ দু'আ আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গেল। যার ফলে একদিন সে কয়েকজন কুরাইশ ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফরে বের হলো। তারপর যখন তারা শাম দেশের জারকা নামক স্থানে তাবু স্থাপন করল, তখন রাতের বেলায় একটি বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলল।
২. একদিন আবু জাহেল রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য কাবা ঘরের চত্বরে একটি পাথর নিয়ে বসেছিল। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সেখানে আগমন করে সালাত আদায় করতে লাগলেন, তখন আবু জাহেল পাথরটি উঠিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে পরাস্ত সৈনিকের মতো পালাতে লাগল। এ সময় তাকে খুবই বিবর্ণ ও ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। তার এ অবস্থা দেখে লোকেরা তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করল। তখন সে বলল, আমি তাকে হত্যা করার জন্যই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন আমি তার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, তখন একটি উট আমার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। ইতিপূর্বে আমি এরকম মাথা, ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট আর কখনো দেখিনি। মনে হলো যে, সে আমাকে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে। অতঃপর এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ-কে জানানো হলে তিনি বললেন, উটের রূপ ধারণ করে সেখানে জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়েছিলেন। আবু জাহেল যদি আমার নিকট আসত তাহলে তার উপর মহাবিপদ নেমে আসত।