📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে কুরাইশদের কলা-কৌশল

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে কুরাইশদের কলা-কৌশল


যখন কুরাইশরা দেখল যে, আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে কোন লাভ হলো না; বরং রাসূলুল্লাহ তাঁর কাজ আরো দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তারা এ দাওয়াত প্রতিরোধ করার জন্য নানা ধরনের কলা- কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ এর বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করা : রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতকে প্রতিহত করার জন্য মক্কার কাফির-মুশরিকরা প্রথমত যে পদক্ষেপটি হাতে নেয়, সেটি হলো তাঁর বিরুদ্ধে নানাবিধ অপবাদ আরোপ করে তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন সময় রাসূলুল্লাহ এর নামে বিভিন্ন ধরনের অপবাদ আরোপ করত। যেমন- কখনো বলতো তিনি একজন পাগল, আবার কখনো বলতো তিনি একজন কবি, আবার কখনো বলতো তিনি একজন যাদুকর, আবার কখনো বলতো তিনি একজন মিথ্যুক, আবার কখনো বলতো তিনি একজন গণক, আবার কখনো বলতো তিনি একজন পথভ্রষ্ট, আবার কখনো বলতো তিনি একজন ধর্মত্যাগী ইত্যাদি।
হজ্জযাত্রীদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা : মক্কায় প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে অনেক লোকের সমাগম হতো। রাসূলুল্লাহ সবসময় এ সুযোগটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। এভাবে তিনি এ দাওয়াতকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেন। কুরাইশরা এটা বুঝতে পেরে মক্কায় আগত হজ্জযাত্রীদেরকে আগে থেকেই নানাভাবে রাসূলুল্লাহ থেকে সতর্ক করে দিত এবং তাঁর ব্যাপারে নানা ধরনের অপবাদ দিয়ে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করত।
ঠাট্টা-বিদ্রূপ : যখন রাসূলুল্লাহ কাউকে দাওয়াত দিতে যেতেন, তখন কুরাইশরা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। তারা সর্বদা রাসূলুল্লাহ -কে মিথ্যাবাদী বলা, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা, অবমাননাকর উক্তি করা ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করত।
জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা : মানুষ যাতে কোনভাবে রাসূলুল্লাহ এর দ্বীন গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয় অথবা এ নিয়ে ভাবার সময় না পায় সেজন্য কুরাইশরা জনমনে নানা ধরনের সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। যেমন- এগুলো পূর্ব যুগের কাহিনী, এগুলো কোন জ্বিন এসে তাঁকে শিক্ষা দিয়ে যায় ইত্যাদি মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করত।
কিসসা-কাহিনীর আসর বসানো : জনগণ যাতে রাসূলুল্লাহ এর বাণী শোনা থেকে বিরত থাকে সেজন্য তারা নানা ধরনের কিসসা-কাহিনী র আয়োজন করত। ফলে অধিকাংশ মানুষ সেসব কিসসা-কাহিনী শোনার মধ্যে ব্যস্ত থাকত। আর এজন্য তারা কোন কোন সময় অন্য দেশ থেকে গল্পকারকে নিয়ে আসত।
নাচ-গানের আসর : কুরাইশরা এ দাওয়াত থেকে মানুষদেরকে দূরে রাখার জন্য কিসসা-কাহিনীর মতো নাচ-গানেরও আয়োজন করত। যাতে তারা রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
অহেতুক প্রশ্নকরণ : কাফিররা রাসূলুল্লাহ-কে বিভ্রান্ত করার জন্য ইয়াহুদি নেতাদের সাথে পরামর্শ করে অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ধরনের ঘটনাবলি সম্পর্কে অহেতুক প্রশ্ন করত। যেমন- আসহাবে কাহাফের ঘটনা, যুলক্বারনাইনের ঘটনা, ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা ইত্যাদি। আবার কখনো কখনো ফেরেশতাদের সম্পর্কে অথবা রূহ সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করত। তখন আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -কে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিতেন এবং রাসূলুল্লাহ তাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করতেন।
চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব:
রাসূলুল্লাহ এর উপর আরোপিত সকল ধরনের কলা-কৌশল যখন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল, তখন কাফিররা ইয়াহুদি পণ্ডিতদের কাছ থেকে আরো একটি বিস্ময়কর কৌশল শিখে নিল। আর তা হলো, তারা রাসূলুল্লাহ-কে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব দিবে। ফলে তিনি ব্যর্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এর বিপরীত। তারা যখন রাসূলুল্লাহ-কে এ প্রস্তাব দিল তখন তিনি তাদের ইসলাম গ্রহণ করার শর্তে এ কাজটি করতে রাজি হয়ে গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ হাতের ইশারা করলে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং তা সকলেই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল। এমনকি পরবর্তীতে বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকেও চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিষয়টি জানা গেল। কিন্তু এত স্পষ্ট নিদর্শন থাকার পরও কাফিররা ইসলাম গ্রহণ করল না। বরং তারা উল্টো রাসূলুল্লাহ -কে বড় যাদুকর বলে অপবাদ আরোপ করতে থাকল।
আপোষমুখী প্রস্তাব পেশ :
কাফিররা যখন আর কোনভাবেই রাসূলুল্লাহ এর উপর বিজয়ী হতে পারছিল না, তখন তারা কিছু কিছু বিষয়ে আপোষ করতে চাইল। তাদের ধারণা ছিল যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ তাদের সেসব প্রস্তাব মেনে নিবেন। অথচ তাদের সকল ধরনের আপোষমুখী প্রস্তাবই ছিল শিরক মিশ্রিত, যা কখনো মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে রাসূলুল্লাহ তাদের সেসকল প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যেমন- একদিন রাসূলুল্লাহ কাবাঘরে তাওয়াফ করছিলেন। এমন সময় কাফিরদের কয়েকজন নেতৃবৃন্দ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! এসো তুমি যার ইবাদাত কর আমরাও তার ইবাদাত করি। আর আমরা যার ইবাদাত করি, তুমিও তার ইবাদাত করো। আমরা এবং তুমি আমাদের কাজে একে অপরের শরীক হই। অতঃপর তুমি যার ইবাদাত কর তিনি যদি আমরা যার ইবাদাত করি তার চেয়ে উত্তম হন, তাহলে আমরা তার ইবাদাতে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করব। আর আমরা যাদের ইবাদাত করি তারা যদি তুমি যার ইবাদাত কর তার চেয়ে উত্তম হয়, তাহলে তুমি তাদের ইবাদাতে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের এসব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কাফিরুন নাযিল করেন এবং তাদের এসব অযৌক্তিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

টিকাঃ
৪৯. তাফসীরে ইবনে জারীর, হা/৩২৬৯৯; কুরতুবী, হা/৫৭৩৭।
৪৭. ফাতহুল বারী, ৪৭২১ নং হাদীসের আলোচনা; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৯৪; তিরমিযী, হা/৩১৪০।
৪৮. সহীহ বুখারী, হা/৩৮৬৮-৭১; সহীহ মুসলিম, হা/২৮০০; মিশকাত, হা/৫৮৫৪-৫৫।
৫০. সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৩৬২।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুসলিমদের প্রতি কাফির-মুশরিকদের অত্যাচার

📄 মুসলিমদের প্রতি কাফির-মুশরিকদের অত্যাচার


রাসূলুল্লাহ যখন প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের এক বৎসর অতিক্রম করে নবুওয়াতের চতুর্থ বছরে পদার্পণ করলেন এবং ব্যাপক সফলতা অর্জন করে ফেললেন তখন মক্কার কাফির-মুশরিকরা তাঁর প্রতি আরো উত্তেজিত হয়ে গেল। এ প্রেক্ষাপটে তারা ২৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করল, যার নেতৃত্বে ছিল রাসূলুল্লাহ এর চাচা আবু লাহাব। তাদের মূল কাজ ছিল, রাসূলুল্লাহ-কে ইসলাম প্রচার করা থেকে বিরত রাখা এবং মুসলিমদেরকে ইসলাম ধর্ম থেকে ফিরিয়ে আনা। এতে প্রয়োজনে তারা কোনরূপ অন্যায়-অত্যাচার ও নির্যাতনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করবে না।
এরপর থেকে মুসলিমদের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। বিশেষ করে যারা সমাজের নিম্ন শ্রেণির লোক ছিল তারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতো এবং তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য কেউ আসত না। আর ক্রীতদাস হলে তো কোন কথাই নেই। মোটকথা নির্যাতনের একপর্যায়ে মুসলিমদের পক্ষে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। বিলাল (রাঃ), খাব্বাব (রাঃ), আম্মার (রাঃ), সুমাইয়া (রাঃ) ইত্যাদি গরীব সাহাবীগণ ছিলেন এর বাস্তব দৃষ্টান্ত। কুরাইশদের এ নির্যাতন থেকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-ও রেহাই পাননি। একদা রাসূলুল্লাহ সালাত আদায় করছিলেন। এটা দেখে আবু জাহেল ও তার সাথিরা মিলে রাসূলুল্লাহ এর ঘাড়ের উপর উটের ভুঁড়ি চাপিয়ে দিল। অতঃপর ফাতিমা (রাঃ) খবর পেয়ে তাঁর উপর থেকে ভুঁড়িটি সরিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে নাম ধরে অভিশাপ দিয়েছিলেন।
উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করলে তার চাচা তাকে খেজুর পাতার চাটাইয়ের মধ্যে জড়িয়ে রেখে নিচ থেকে আগুন লাগিয়ে ধোঁয়া দিত। মুস'আব বিন উমায়ের (রাঃ) এর মা তার ইসলাম গ্রহণ করার কথা জানতে পেরে তার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। অথচ কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি অশেষ আরাম-আয়েশে ও সুখ-সাচ্ছন্দে জীবনযাপন করছিলেন।
এভাবে প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রের নওমুসলিমদের উপর নির্যাতন চালাত। কিন্তু যেসব নওমুসলিম কোন গোত্রের সাথেই সম্পৃক্ত থাকত না, তাদের উপর এত অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো যে, পাষাণ-হৃদয়সম্পন্ন ব্যক্তিটিও তা প্রত্যক্ষ করে অস্থির কিংবা বিচলিত না হয়ে পারত না।

টিকাঃ
৫১ সহীহ মুসলিম, হা/৪৭৫০।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুসলিমদের ঘাঁটি

📄 মুসলিমদের ঘাঁটি


মুসলিমদের এমন কঠিন দিনে তারা আরকাম বিন আবুল আরকাম মাখযুমীর বাড়িটিকে গোপন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত। এটি ছিল সাফা পর্বতের উপর কাফির-মুশরিকদের দৃষ্টির আড়ালে এবং তাদের সম্মেলন কেন্দ্র থেকে দূরে। আর এ বাড়িটিকেই ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও গণ্য করা হয়।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুসলিমদের হাবশায় হিজরত

📄 মুসলিমদের হাবশায় হিজরত


মুসলিমগণ হাবশায় দুই বার হিজরত করেছিলেন। প্রথমবার হিজরত করেছিলেন ৫ম নববী বর্ষের রজব মাসে। আর দ্বিতীয়বার হিজরত করেছিলেন উক্ত বছরের যিলকদ মাসে।
প্রথম হিজরত : প্রথমবার যারা হিজরত করেছিলেন তারা ছিলেন ১২ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলা। তাদের দলনেতা ছিলেন উসমান (রাঃ)। আর এই দলে রাসূলুল্লাহ এর কন্যা রুকাইয়া (রাঃ)-ও ছিলেন। মক্কায় যখন কাফিররা মুসলিমদের উপর চরমভাবে নির্যাতন শুরু করে দিয়েছিল, তখন তিনি সাহাবীগণের পরামর্শক্রমে উক্ত দলটিকে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি দেন। কেননা তিনি ইতিপূর্বেই জানতে পেরেছিলেন যে, হাবশার বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশী একজন ন্যায়নিষ্ঠ শাসক। তার রাজ্যে সকলেই সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে দেয়া হয়। ফলে রাসূলুল্লাহ -ও এ আশা পোষণ করেছিলেন যে, যদি নির্যাতিত মুসলিমদেরকে সেখানে পাঠানো হয়, তাহলে তারা আপাতত কুরাইশ কাফিরদের হাত থেকে রেহাই পাবে।
দ্বিতীয় হিজরত: দ্বিতীয়বার যারা হাবশায় হিজরত করেন তারা ছিলেন ৮২/৮৩ জন পুরুষ এবং ১৮/১৯ জন মহিলা। তাদের দলনেতা ছিলেন রাসূলুল্লাহ এর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালেব (রাঃ)। হাবশায় প্রথমদল হিজরত করার মাধ্যমে কুরাইশরা যখন জানতে পেরেছিল যে, সেখানে তারা নিরাপদে বসবাস করছে, তখন তারা খুবই রাগান্বিত হলো। ফলে তারা মুসলিমদের হিজরত করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক হয়ে গেল। কিন্তু এরপরও মুসলিমদের এই বৃহত্তম দলটি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হাবশায় হিজরত করতে সক্ষম হন। এদিকে কুরাইশরা তাদের হাবশায় গমনের সংবাদ পেয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে যায়। ফলে তারা তাদেরকে ফেরত আনার জন্য আমর ইবনুল 'আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবী'আকে দায়িত্ব দিয়ে হাবশায় প্রেরণ করে।
তারা সেখানে গিয়ে প্রথমে নাজ্জাশীর দরবারে উপঢৌকন পেশ করল। তারপর বলল, হে বাদশাহ! আপনার দেশে আমাদের কিছু মূর্খ লোক পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে- যারা তাদের সম্প্রদায়ের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে; এমনকি তারা আপনাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি। তারা এমন এক নতুন দ্বীন নিয়ে এসেছে, যে ব্যাপারে আমরা কখনো শুনিনি এবং আপনিও কিছু জানেন না। আমাদের সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি তাদেরকে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফেরত পাঠান।
তাদের কথা শেষ হলে উপস্থিত পাদ্রীনেতাগণ কুরাইশ দূতদ্বয়ের সমর্থনে মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ করল। তখন বাদশাহ বললেন, আল্লাহর কসম! এটা কখনোই হতে পারে না। তারা আমার দেশে এসেছে এবং অন্যদের চেয়ে আমাকে পছন্দ করেছে। অতএব তাদের বক্তব্য না শুনে কোনরূপ সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। ফলে তিনি আশ্রিত মুসলিম দলটিকে বাদশার দরবারে উপস্থিত করার নির্দেশ দিলেন।
সে অনুযায়ী পরের দিন জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ) তাঁর সাথিদের নিয়ে বাদশার দরবারে উপস্থিত হন। যখন তিনি বাদশার দরবারে উপস্থিত হন, তখন তিনি ইসলামিক নিয়ম অবলম্বন করে অন্যান্যদের মতো সিজদা করলেন না। ফলে বাদশাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা প্রথানুযায়ী আমাকে সিজদা করলে না কেন? যেমনিভাবে ইতিপূর্বে তোমাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদ্বয় এসে করেছে? বাদশাহ আরো বললেন, তোমরা বাপ-দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করে এবং আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন যে ধর্ম গ্রহণ করেছ সেটা কী, আমাকে শোনাও!
তখন জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ) বললেন, হে বাদশাহ! আমাদের ধর্মের নাম ইসলাম। আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তার সাথে কাউকে শরীক করি না। বাদশাহ বললেন, এসব কথা তোমাদেরকে কে শিখিয়েছেন? জাফর (রাঃ) বললেন, আমাদের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তি। ইতিপূর্বে আমরা মূর্তিপূজা ও অশ্লীলতা এবং অন্যায় ও অত্যাচারে নিমজ্জিত ছিলাম। আমরা শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে শোষণ করতাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করে আমাদের মধ্য হতে তাঁর শেষ নবীকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নাম মুহাম্মাদ। তিনি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তাঁর বংশ মর্যাদা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা, সংযমশীলতা, পরোপকারিতা প্রভৃতি গুণাবলি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। নবুওয়াত লাভের পর তিনি আমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদাত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সাথে সাথে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম হতে তওবা করে সৎকর্মশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং এক আল্লাহর ইবাদাত করছি ও হালাল-হারাম মেনে চলছি। এতে আমাদের সম্প্রদায়ের নেতারা আমাদের উপর রাগান্বিত হয়েছে এবং আমাদের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছে। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে আপনার রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছি। আমরা অন্য স্থান বাদ দিয়ে আপনাকে পছন্দ করেছি এবং আমরা আপনার এখানেই থাকতে চাই। কেননা আমরা জানি যে, আপনি ন্যায়বিচার করে থাকেন। আশা করি আমরা আপনার নিকট অত্যাচারিত হব না।
জাফর (রাঃ) আরো বললেন, হে বাদশাহ! অভিবাদন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পরে অভিবাদন হলো 'সালাম' এবং রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে পরস্পরে 'সালাম' করার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন বাদশাহ বললেন, ঈসা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে তোমরা কী বলতে চাও? উত্তরে জাফর (রাঃ) সূরা মারইয়ামের শুরু থেকে নিয়ে ৩৬ নং আয়াত পর্যন্ত পাঠ করে শোনান। যেখানে যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আঃ) এর বর্ণনা, মারইয়াম (আঃ) এর প্রতিপালন, ঈসা (আঃ) এর জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন, শিশুকালে ঈসা (আঃ) এর কথোপকথন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
আর বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাওরাত-ইঞ্জীলের পণ্ডিত। ফলে তিনি কুরআনের অপূর্ব বাকভঙ্গি ও ভাষালঙ্কার এবং ঘটনার সারমর্ম উপলব্ধি করে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। সাথে সাথে উপস্থিত পাদ্রীগণও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর নাজ্জাশী বলে উঠলেন, নিশ্চয় এই কালাম এবং ঈসার নিকট যা নাযিল হয়েছিল দুটি একই আলোর উৎস থেকে নির্গত। তারপর তিনি কুরাইশ দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম! আমি কখনই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না। ফলে সেদিনকার মতো আমর ইবনে আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবী রাবী'আহ বাদশার দরবার থেকে বেরিয়ে যায়।
অতঃপর তারা পরের দিন আবার বাদশাহর দরবারে আগমন করে বলল, হে বাদশাহ! এরা ঈসা ইবনে মারইয়াম সম্পর্কে ভয়ঙ্কর সব কথা বলে থাকে। এ কথা শুনে বাদশাহ মুসলিম দলটিকে আবার ডাকালেন। তখন তারা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কেননা নাসারারা ঈসা (আঃ)-কে উপাস্য হিসেবে মানে। কিন্তু মুসলিমরা তাকে আল্লাহর বান্দা বলে থাকে। অবশেষে তারা কোনরূপ বাহানার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলার ব্যাপারে মনস্থির করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করলেন। অতঃপর তারা বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলে বাদশাহ তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে দলনেতা জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ) বললেন, তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত রূহ এবং তাঁর নির্দেশ, যা তিনি মহীয়সী কুমারী মাতা মারইয়ামের উপর ফুঁকে দিয়েছিলেন। কোন পুরুষ লোক তাকে [মারইয়াম (আঃ)-কে] স্পর্শ করেনি।
এসব কথা শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো উঠিয়ে নিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যা বলেছ ঈসা ইবনে মারইয়াম তার চেয়ে এই কাঠের টুকরা পরিমাণও বেশি ছিলেন না। তারপর তিনি জাফর (রাঃ) ও তার সাথিদের উদ্দেশ্যে বললেন, যাও! তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দিবে, তার জরিমানা হবে। এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, তোমাদের কাউকে কষ্ট দেয়ার বিনিময়ে যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড় এনে দেয়, তবুও আমি তা পছন্দ করব না। অতঃপর তিনি কুরাইশ দূতদ্বয়ের প্রদত্ত উপঢৌক ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এরপর থেকে তারা সেখানে দীর্ঘদিন যাবত নিরাপদে অবস্থান করেন এবং ৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের দিন মদিনায় ফিরে আসেন।

টিকাঃ
৫২ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩৩৩-৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪০; যাদুল মা'আদ, ৩/২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00