📄 সাফা পর্বতের উপর আরোহণ করে দাওয়াত প্রদান
যখন রাসূলুল্লাহ এর এসব সম্মেলন ব্যর্থ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ শেষ বারের মতো নিকটাত্মীয়দেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করার জন্য সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন। তখনকার যুগে প্রচলন ছিল যে, যদি কখনো কোন ধরনের বিপদাপদ দেখা দিত অথবা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘোষণা করার প্রয়োজন হতো, তখন তারা সাফা পাহাড়ের শীর্ষে আরোহণ করে 'ইয়া সাবাহাহ' অর্থাৎ হায় প্রাতঃকাল! বলে চিৎকার করতে থাকত। এতে লোকজন সবাই তার কথা শোনার জন্য একত্রিত হয়ে যেত। অবশেষে রাসূলুল্লাহ -ও এ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ঐ শব্দগুলো উচ্চারণ করে বললেন, ওহে বনু ফিহর! ওহে বনু আদী! তখন সকলেই একত্রিত হলো। এমনকি কোন ব্যক্তির পক্ষে সেখানে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলেও ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য তার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, হে কুরাইশগণ! তোমরা বলো, আজ (এই পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে) আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, পর্বতের আড়ালে এক বিরাট শত্রু বাহিনী তোমাদের সবকিছু লুণ্ঠন করে নেয়ার জন্য লুকিয়ে আছে, তাহলে তোমরা আমার এই কথা বিশ্বাস করবে কি? সকলে সমস্বরে উত্তর দিল, হ্যাঁ- নিশ্চয়। আপনার কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই; আর আমরা আপনাকে কখনই মিথ্যা বলতে শুনিনি। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, যদি তা-ই হয় তবে শুনো, আমি তোমাদেরকে পাপ ও আল্লাহদ্রোহিতার ভীষণ পরিণাম এবং তার জন্য অবশ্যম্ভাবী কঠোর দণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। এতটুকু শুনে আবু লাহাব ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠল, তোর সর্বনাশ হোক! এজন্যেই কি তুই এখানে আমাদেরকে সমবেত করেছিস? তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা লাহাব অবর্তীণ করেন।
এ ঘটনার আরেকটি অংশ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর (আযাব) থেকে নিজেদেরকে কিনে নাও (বাঁচাও)। তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! তোমাদেরকে আমি রক্ষা করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব! তোমাকেও আমি রক্ষা করতে পারব না। হে আল্লাহর রাসূলের ফুফু সাফিয়া! আমি আল্লাহর (আযাব) থেকে তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমা! তোমার যা ইচ্ছা চাও। আল্লাহর (আযাব) থেকে আমি তোমাকেও রক্ষা করতে পারব না।
টিকাঃ
৩৯ সহীহ বুখারী, হা/২৭৫৩; সহীহ মুসলিম, হা/২০৮; মিশকাত, হা/৫৩৭২-৭৩।
৪০ সহীহ মুসলিম, হা/৫২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬০৬৬।
📄 কাফিরদের প্রতিক্রিয়া ও আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ গোত্রকে দাওয়াত দেয়ার পর এ দাওয়াত ক্রমেই মক্কার বাহিরেও প্রসারিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় দাওয়াতী কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে এবং এতে অটল থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা নবী ﷺ-কে বলেন,
﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾ অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদেরকে উপেক্ষা করো। (সূরা হিজর- ৯৪)
এরপর থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বহুত্ববাদের বিশ্বাস এবং মিথ্যার পর্দা উন্মোচন করে প্রতিমার প্রকৃতি, মর্যাদা এবং মূল্যের অসারতা সম্পর্কে প্রকাশ্যভাবে কথা বলা শুরু করলেন। এই প্রতিমাগুলোর জড়ত্ব, অসামর্থতা ও অকর্মাণ্যতা যুক্তি-প্রমাণসমূহ তিনি জোরালো কণ্ঠে তুলে ধরেন এবং যারা এদেরকে আল্লাহ এবং নিজের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে তারা যে কত বড় ভ্রষ্টতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে তাও বলতে লাগলেন। এতে মুশরিকরা ক্রমেই ক্ষিপ্ত হতে শুরু করল। এদিকে তিনি আবু তালিবের মতো সম্মানিত লোকের আশ্রয়ে থাকার কারণে তারা তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেও কুণ্ঠাবোধ করল। অবশেষ তারা কোন পথ খুঁজে না পেয়ে সকলে মিলে আবু তালিবের কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করল। তারা আবু তালিবকে বলল, হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজা আমাদের দেব-দেবীকে গালিগালাজ করছে, আমাদের ধর্মের নিন্দা করছে, আমাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেকহীন মূর্খ বলছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে ধর্মভ্রষ্ট বলছে। অতএব হয় আপনি তাকে এ জাতীয় কাজকর্ম থেকে বিরত রাখুন, নতুবা আমাদের এবং তার মধ্য থেকে আপনি দূরে সরে যান। কারণ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আপনিও আমাদের মতোই ভিন্নধর্মের অনুসারী। সুতরাং আমরাই আপনার ভাতিজার জন্য যথেষ্ট হব।
তখন আবু তালিব তাদের এসব আবেগপূর্ণ কথা শুনে তাদেরকে বুঝিয়ে কোনভাবে বিদায় করলেন। ফলে তারা চলে গেল। এদিকে রাসূলুল্লাহ তাঁর দাওয়াতী কাজ পূর্ণ গতিতে চালিয়ে যেতে লাগলেন এবং এতে কোন রকম প্রভাবান্বিত হলেন না।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে কুরাইশদের কলা-কৌশল
যখন কুরাইশরা দেখল যে, আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে কোন লাভ হলো না; বরং রাসূলুল্লাহ তাঁর কাজ আরো দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তারা এ দাওয়াত প্রতিরোধ করার জন্য নানা ধরনের কলা- কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ এর বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করা : রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতকে প্রতিহত করার জন্য মক্কার কাফির-মুশরিকরা প্রথমত যে পদক্ষেপটি হাতে নেয়, সেটি হলো তাঁর বিরুদ্ধে নানাবিধ অপবাদ আরোপ করে তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন সময় রাসূলুল্লাহ এর নামে বিভিন্ন ধরনের অপবাদ আরোপ করত। যেমন- কখনো বলতো তিনি একজন পাগল, আবার কখনো বলতো তিনি একজন কবি, আবার কখনো বলতো তিনি একজন যাদুকর, আবার কখনো বলতো তিনি একজন মিথ্যুক, আবার কখনো বলতো তিনি একজন গণক, আবার কখনো বলতো তিনি একজন পথভ্রষ্ট, আবার কখনো বলতো তিনি একজন ধর্মত্যাগী ইত্যাদি।
হজ্জযাত্রীদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা : মক্কায় প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে অনেক লোকের সমাগম হতো। রাসূলুল্লাহ সবসময় এ সুযোগটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। এভাবে তিনি এ দাওয়াতকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেন। কুরাইশরা এটা বুঝতে পেরে মক্কায় আগত হজ্জযাত্রীদেরকে আগে থেকেই নানাভাবে রাসূলুল্লাহ থেকে সতর্ক করে দিত এবং তাঁর ব্যাপারে নানা ধরনের অপবাদ দিয়ে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করত।
ঠাট্টা-বিদ্রূপ : যখন রাসূলুল্লাহ কাউকে দাওয়াত দিতে যেতেন, তখন কুরাইশরা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। তারা সর্বদা রাসূলুল্লাহ -কে মিথ্যাবাদী বলা, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা, অবমাননাকর উক্তি করা ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করত।
জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা : মানুষ যাতে কোনভাবে রাসূলুল্লাহ এর দ্বীন গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয় অথবা এ নিয়ে ভাবার সময় না পায় সেজন্য কুরাইশরা জনমনে নানা ধরনের সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। যেমন- এগুলো পূর্ব যুগের কাহিনী, এগুলো কোন জ্বিন এসে তাঁকে শিক্ষা দিয়ে যায় ইত্যাদি মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করত।
কিসসা-কাহিনীর আসর বসানো : জনগণ যাতে রাসূলুল্লাহ এর বাণী শোনা থেকে বিরত থাকে সেজন্য তারা নানা ধরনের কিসসা-কাহিনী র আয়োজন করত। ফলে অধিকাংশ মানুষ সেসব কিসসা-কাহিনী শোনার মধ্যে ব্যস্ত থাকত। আর এজন্য তারা কোন কোন সময় অন্য দেশ থেকে গল্পকারকে নিয়ে আসত।
নাচ-গানের আসর : কুরাইশরা এ দাওয়াত থেকে মানুষদেরকে দূরে রাখার জন্য কিসসা-কাহিনীর মতো নাচ-গানেরও আয়োজন করত। যাতে তারা রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
অহেতুক প্রশ্নকরণ : কাফিররা রাসূলুল্লাহ-কে বিভ্রান্ত করার জন্য ইয়াহুদি নেতাদের সাথে পরামর্শ করে অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ধরনের ঘটনাবলি সম্পর্কে অহেতুক প্রশ্ন করত। যেমন- আসহাবে কাহাফের ঘটনা, যুলক্বারনাইনের ঘটনা, ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা ইত্যাদি। আবার কখনো কখনো ফেরেশতাদের সম্পর্কে অথবা রূহ সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করত। তখন আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -কে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিতেন এবং রাসূলুল্লাহ তাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করতেন।
চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব:
রাসূলুল্লাহ এর উপর আরোপিত সকল ধরনের কলা-কৌশল যখন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল, তখন কাফিররা ইয়াহুদি পণ্ডিতদের কাছ থেকে আরো একটি বিস্ময়কর কৌশল শিখে নিল। আর তা হলো, তারা রাসূলুল্লাহ-কে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব দিবে। ফলে তিনি ব্যর্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এর বিপরীত। তারা যখন রাসূলুল্লাহ-কে এ প্রস্তাব দিল তখন তিনি তাদের ইসলাম গ্রহণ করার শর্তে এ কাজটি করতে রাজি হয়ে গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ হাতের ইশারা করলে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং তা সকলেই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল। এমনকি পরবর্তীতে বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকেও চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিষয়টি জানা গেল। কিন্তু এত স্পষ্ট নিদর্শন থাকার পরও কাফিররা ইসলাম গ্রহণ করল না। বরং তারা উল্টো রাসূলুল্লাহ -কে বড় যাদুকর বলে অপবাদ আরোপ করতে থাকল।
আপোষমুখী প্রস্তাব পেশ :
কাফিররা যখন আর কোনভাবেই রাসূলুল্লাহ এর উপর বিজয়ী হতে পারছিল না, তখন তারা কিছু কিছু বিষয়ে আপোষ করতে চাইল। তাদের ধারণা ছিল যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ তাদের সেসব প্রস্তাব মেনে নিবেন। অথচ তাদের সকল ধরনের আপোষমুখী প্রস্তাবই ছিল শিরক মিশ্রিত, যা কখনো মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে রাসূলুল্লাহ তাদের সেসকল প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যেমন- একদিন রাসূলুল্লাহ কাবাঘরে তাওয়াফ করছিলেন। এমন সময় কাফিরদের কয়েকজন নেতৃবৃন্দ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! এসো তুমি যার ইবাদাত কর আমরাও তার ইবাদাত করি। আর আমরা যার ইবাদাত করি, তুমিও তার ইবাদাত করো। আমরা এবং তুমি আমাদের কাজে একে অপরের শরীক হই। অতঃপর তুমি যার ইবাদাত কর তিনি যদি আমরা যার ইবাদাত করি তার চেয়ে উত্তম হন, তাহলে আমরা তার ইবাদাতে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করব। আর আমরা যাদের ইবাদাত করি তারা যদি তুমি যার ইবাদাত কর তার চেয়ে উত্তম হয়, তাহলে তুমি তাদের ইবাদাতে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের এসব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কাফিরুন নাযিল করেন এবং তাদের এসব অযৌক্তিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
টিকাঃ
৪৯. তাফসীরে ইবনে জারীর, হা/৩২৬৯৯; কুরতুবী, হা/৫৭৩৭।
৪৭. ফাতহুল বারী, ৪৭২১ নং হাদীসের আলোচনা; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৯৪; তিরমিযী, হা/৩১৪০।
৪৮. সহীহ বুখারী, হা/৩৮৬৮-৭১; সহীহ মুসলিম, হা/২৮০০; মিশকাত, হা/৫৮৫৪-৫৫।
৫০. সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৩৬২।
📄 মুসলিমদের প্রতি কাফির-মুশরিকদের অত্যাচার
রাসূলুল্লাহ যখন প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের এক বৎসর অতিক্রম করে নবুওয়াতের চতুর্থ বছরে পদার্পণ করলেন এবং ব্যাপক সফলতা অর্জন করে ফেললেন তখন মক্কার কাফির-মুশরিকরা তাঁর প্রতি আরো উত্তেজিত হয়ে গেল। এ প্রেক্ষাপটে তারা ২৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করল, যার নেতৃত্বে ছিল রাসূলুল্লাহ এর চাচা আবু লাহাব। তাদের মূল কাজ ছিল, রাসূলুল্লাহ-কে ইসলাম প্রচার করা থেকে বিরত রাখা এবং মুসলিমদেরকে ইসলাম ধর্ম থেকে ফিরিয়ে আনা। এতে প্রয়োজনে তারা কোনরূপ অন্যায়-অত্যাচার ও নির্যাতনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করবে না।
এরপর থেকে মুসলিমদের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। বিশেষ করে যারা সমাজের নিম্ন শ্রেণির লোক ছিল তারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতো এবং তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য কেউ আসত না। আর ক্রীতদাস হলে তো কোন কথাই নেই। মোটকথা নির্যাতনের একপর্যায়ে মুসলিমদের পক্ষে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। বিলাল (রাঃ), খাব্বাব (রাঃ), আম্মার (রাঃ), সুমাইয়া (রাঃ) ইত্যাদি গরীব সাহাবীগণ ছিলেন এর বাস্তব দৃষ্টান্ত। কুরাইশদের এ নির্যাতন থেকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-ও রেহাই পাননি। একদা রাসূলুল্লাহ সালাত আদায় করছিলেন। এটা দেখে আবু জাহেল ও তার সাথিরা মিলে রাসূলুল্লাহ এর ঘাড়ের উপর উটের ভুঁড়ি চাপিয়ে দিল। অতঃপর ফাতিমা (রাঃ) খবর পেয়ে তাঁর উপর থেকে ভুঁড়িটি সরিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে নাম ধরে অভিশাপ দিয়েছিলেন।
উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করলে তার চাচা তাকে খেজুর পাতার চাটাইয়ের মধ্যে জড়িয়ে রেখে নিচ থেকে আগুন লাগিয়ে ধোঁয়া দিত। মুস'আব বিন উমায়ের (রাঃ) এর মা তার ইসলাম গ্রহণ করার কথা জানতে পেরে তার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। অথচ কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি অশেষ আরাম-আয়েশে ও সুখ-সাচ্ছন্দে জীবনযাপন করছিলেন।
এভাবে প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রের নওমুসলিমদের উপর নির্যাতন চালাত। কিন্তু যেসব নওমুসলিম কোন গোত্রের সাথেই সম্পৃক্ত থাকত না, তাদের উপর এত অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো যে, পাষাণ-হৃদয়সম্পন্ন ব্যক্তিটিও তা প্রত্যক্ষ করে অস্থির কিংবা বিচলিত না হয়ে পারত না।
টিকাঃ
৫১ সহীহ মুসলিম, হা/৪৭৫০।