📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 দ্বিতীয় পর্যায়

📄 দ্বিতীয় পর্যায়


প্রথম পর্যায়ে গোপনে গোপনে প্রায় তিন বছর ইসলাম প্রচার বা দাওয়াতী কার্যক্রম চালানো হয়। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ এর প্রতি আদেশ দেয়া হয়। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে যে নির্দেশ প্রদান করা হয় সেটি হলো, وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾
আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দাও। (সূরা শু'আরা- ২১৪) এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ দাওয়াতকে আরো গতিশীল করার জন্য প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে বেরিয়ে আসেন এবং প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করা শুরু করেন।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 নিকটাত্মীয়দেরকে দাওয়াত

📄 নিকটাত্মীয়দেরকে দাওয়াত


রাসূলুল্লাহ এর নিকট প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ সম্পর্কিত আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর একদিন তিনি বনু হাশেম গোত্রকে নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করলেন। সেখানে বনু মুত্তালিব বিন আবদে মানাফেরও একদল লোক উপস্থিত ছিল। এতে উপস্থিত লোকের সংখ্যা ছিল ৪৫ জন। সম্মেলনের শুরুতেই চাচা আবু লাহাব হঠাৎ করে বলে উঠল যে, দেখো ভাতিজা! এরা সকলেই তোমার নিকটাত্মীয়- চাচা, চাচাতো ভাই ইত্যাদি। বাচালতা বাদ দিয়ে এদের সাথে ভালোভাবে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করো। তোমার জানা উচিত যে, তোমার জন্য সকল আরববাসীদের সাথে শত্রুতা করার শক্তি আমাদের নেই। তোমার আত্মীয়-স্বজনদের পক্ষে তোমাকে ধরে কারারুদ্ধ করে রাখাই হচ্ছে তাদের কর্তব্য। সুতরাং তোমার জন্য তোমার পিতৃ পরিবারই যথেষ্ট। তুমি যদি তোমার ধ্যান-ধারণা এবং কথাবার্তায় অটল থাকো, তাহলে এটা অনেক সহজ ও স্বাভাবিক যে, সমগ্র কুরাইশ গোত্র তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে এবং অন্যান্য আরব গোত্র এই ব্যাপারে সহযোগিতা করবে।
আবু লাহাবের এমন কথাবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং ঐ নীরবতার মধ্য দিয়েই সম্মেলন শেষ হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ আরেক দিন নিকটাত্মীয়দেরকে একত্রিত করে আবারো সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি সকলের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেটি হলো- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, আমি তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি, তাঁর উপরেই নির্ভর করছি এবং সাক্ষ্য প্রদান করছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি একক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। তারপর তিনি বলেন, কল্যাণকামী পথপ্রদর্শক আপন আত্মীয়-স্বজনের সাথে কখনই মিথ্যা বলতে পারেন না। সেই আল্লাহর শপথ! যিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। বিশেষভাবে তোমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য আমি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। আল্লাহ জানেন তোমরা সকলেই সেভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হবে যেমনটি বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ো এবং সেভাবেই পুনরায় উত্থিত হবে যেমনটি তোমরা ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জাগ্রত হও। পুনরুত্থান দিবসে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে হিসাব গ্রহণ করা হবে। পরিশেষে পুণ্যের ফলশ্রুতি হিসেবে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির আবাসস্থল জান্নাতে ও পাপাচারের ফলশ্রুতি হিসেবে কঠিন আযাব ও দুঃখ-কষ্টের আবাসস্থল জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।
রাসূলুল্লাহ এর এ কথা শুনে চাচা আবু তালিব বললেন, আমরা কতটুকু তোমার সাহায্য করতে পারব! তোমার উপদেশ আমাদের জন্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে এবং তোমার কথাবার্তা কতটুকু সত্য বলে আমরা জানব! এখানে সমবেত লোকজন তোমার পিতৃপরিবারের সদস্য এবং আমিও অনুরূপ একজন সদস্য। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, তোমার সহযোগিতার জন্য তাদের তুলনায় আমি অগ্রগামী আছি। অতএব তোমার নিকট যে নির্দেশনাবলি নাযিল হয়েছে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকো। আল্লাহ ভরসা! আমি অবিরামভাবে তোমার কাজ-কর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করব এবং তোমার প্রতি আমার সদয় সহানুভূতি সবসময় থাকবে। তবে আবদুল মুত্তালিবের দ্বীন ত্যাগ করতে আমি প্রস্তুত নই। এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, আল্লাহর শপথ! এ হচ্ছে অন্যায়। একে অন্যদের আগে তোমরাই থামিয়ে দাও। তখন আবু তালিব বললেন, আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ থাকবে আমি মুহাম্মাদের হেফাযত বা রক্ষণাবেক্ষণ করতে থাকব।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 সাফা পর্বতের উপর আরোহণ করে দাওয়াত প্রদান

📄 সাফা পর্বতের উপর আরোহণ করে দাওয়াত প্রদান


যখন রাসূলুল্লাহ এর এসব সম্মেলন ব্যর্থ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ শেষ বারের মতো নিকটাত্মীয়দেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করার জন্য সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন। তখনকার যুগে প্রচলন ছিল যে, যদি কখনো কোন ধরনের বিপদাপদ দেখা দিত অথবা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘোষণা করার প্রয়োজন হতো, তখন তারা সাফা পাহাড়ের শীর্ষে আরোহণ করে 'ইয়া সাবাহাহ' অর্থাৎ হায় প্রাতঃকাল! বলে চিৎকার করতে থাকত। এতে লোকজন সবাই তার কথা শোনার জন্য একত্রিত হয়ে যেত। অবশেষে রাসূলুল্লাহ -ও এ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ঐ শব্দগুলো উচ্চারণ করে বললেন, ওহে বনু ফিহর! ওহে বনু আদী! তখন সকলেই একত্রিত হলো। এমনকি কোন ব্যক্তির পক্ষে সেখানে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলেও ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য তার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, হে কুরাইশগণ! তোমরা বলো, আজ (এই পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে) আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, পর্বতের আড়ালে এক বিরাট শত্রু বাহিনী তোমাদের সবকিছু লুণ্ঠন করে নেয়ার জন্য লুকিয়ে আছে, তাহলে তোমরা আমার এই কথা বিশ্বাস করবে কি? সকলে সমস্বরে উত্তর দিল, হ্যাঁ- নিশ্চয়। আপনার কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই; আর আমরা আপনাকে কখনই মিথ্যা বলতে শুনিনি। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, যদি তা-ই হয় তবে শুনো, আমি তোমাদেরকে পাপ ও আল্লাহদ্রোহিতার ভীষণ পরিণাম এবং তার জন্য অবশ্যম্ভাবী কঠোর দণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। এতটুকু শুনে আবু লাহাব ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠল, তোর সর্বনাশ হোক! এজন্যেই কি তুই এখানে আমাদেরকে সমবেত করেছিস? তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা লাহাব অবর্তীণ করেন।
এ ঘটনার আরেকটি অংশ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর (আযাব) থেকে নিজেদেরকে কিনে নাও (বাঁচাও)। তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! তোমাদেরকে আমি রক্ষা করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব! তোমাকেও আমি রক্ষা করতে পারব না। হে আল্লাহর রাসূলের ফুফু সাফিয়া! আমি আল্লাহর (আযাব) থেকে তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমা! তোমার যা ইচ্ছা চাও। আল্লাহর (আযাব) থেকে আমি তোমাকেও রক্ষা করতে পারব না।

টিকাঃ
৩৯ সহীহ বুখারী, হা/২৭৫৩; সহীহ মুসলিম, হা/২০৮; মিশকাত, হা/৫৩৭২-৭৩।
৪০ সহীহ মুসলিম, হা/৫২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬০৬৬।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 কাফিরদের প্রতিক্রিয়া ও আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ

📄 কাফিরদের প্রতিক্রিয়া ও আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ


রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ গোত্রকে দাওয়াত দেয়ার পর এ দাওয়াত ক্রমেই মক্কার বাহিরেও প্রসারিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় দাওয়াতী কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে এবং এতে অটল থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা নবী ﷺ-কে বলেন,
﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾ অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদেরকে উপেক্ষা করো। (সূরা হিজর- ৯৪)
এরপর থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বহুত্ববাদের বিশ্বাস এবং মিথ্যার পর্দা উন্মোচন করে প্রতিমার প্রকৃতি, মর্যাদা এবং মূল্যের অসারতা সম্পর্কে প্রকাশ্যভাবে কথা বলা শুরু করলেন। এই প্রতিমাগুলোর জড়ত্ব, অসামর্থতা ও অকর্মাণ্যতা যুক্তি-প্রমাণসমূহ তিনি জোরালো কণ্ঠে তুলে ধরেন এবং যারা এদেরকে আল্লাহ এবং নিজের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে তারা যে কত বড় ভ্রষ্টতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে তাও বলতে লাগলেন। এতে মুশরিকরা ক্রমেই ক্ষিপ্ত হতে শুরু করল। এদিকে তিনি আবু তালিবের মতো সম্মানিত লোকের আশ্রয়ে থাকার কারণে তারা তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেও কুণ্ঠাবোধ করল। অবশেষ তারা কোন পথ খুঁজে না পেয়ে সকলে মিলে আবু তালিবের কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করল। তারা আবু তালিবকে বলল, হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজা আমাদের দেব-দেবীকে গালিগালাজ করছে, আমাদের ধর্মের নিন্দা করছে, আমাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেকহীন মূর্খ বলছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে ধর্মভ্রষ্ট বলছে। অতএব হয় আপনি তাকে এ জাতীয় কাজকর্ম থেকে বিরত রাখুন, নতুবা আমাদের এবং তার মধ্য থেকে আপনি দূরে সরে যান। কারণ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আপনিও আমাদের মতোই ভিন্নধর্মের অনুসারী। সুতরাং আমরাই আপনার ভাতিজার জন্য যথেষ্ট হব।
তখন আবু তালিব তাদের এসব আবেগপূর্ণ কথা শুনে তাদেরকে বুঝিয়ে কোনভাবে বিদায় করলেন। ফলে তারা চলে গেল। এদিকে রাসূলুল্লাহ তাঁর দাওয়াতী কাজ পূর্ণ গতিতে চালিয়ে যেতে লাগলেন এবং এতে কোন রকম প্রভাবান্বিত হলেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00