📄 পুনরায় ওহীর আগমন
কিছুদিন ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ থাকার কারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুললেন। সেসময় তাঁর মনে এ ধারণাও বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর রাসূল বা বার্তাবাহক। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মনোনীত করেছেন। সর্বপ্রথম যিনি তাঁর নিকট আগমন করেছিলেন তিনিই ছিলেন আসমানী দূত জিবরাঈল (আঃ)। তিনি ওহী গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেন এবং আগ্রহী হয়ে উঠেন। তখন একদিন জিবরাঈল (আঃ) আবারও ওহী নিয়ে আগমন করেন। হাদীসে এসেছে,
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী -কে বলতে শুনেছেন যে, (হেরা গুহার ঘটনার) পর আমার নিকট ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর একদিন আমি রাস্তা দিয়ে চলছিলাম, এমনসময় আকাশ হতে এক আওয়াজ শুনলাম। তখন আমি আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম, হেরা গুহায় আমার নিকট যিনি এসেছিলেন, ইনি সেই ফেরেশতা। আসমান ও জমিনের মাঝখানে একটি 'কুরসী' এর উপর বসে আছেন। আমি তাকে দেখে ভীত হয়ে গেলাম; এমনকি মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর আমি পরিবার-পরিজনের কাছে এসে বললাম, আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরো, আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরো। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন- يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ - قُمْ فَأَنْذِرْ - وَرَبَّكَ فَكَبَرْ - وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ - وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠো, লোকদেরকে সতর্ক করো। তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো, তোমার পোশাক পবিত্র করো এবং অপবিত্রতা দূর করো- (সূরা মুদ্দাস্সির, ১-৫)।
এরপর থেকে অবিরাম ধারায় ওহী নাযিল হতে থাকে। অতঃপর পরবর্তীতে আরো একবার ওহীর আগমন বন্ধ ছিল। এতে মুশরিকরা বলে বেড়াচ্ছিল যে, মুহাম্মাদের রব তাকে ছেড়ে গেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা যোহা নাযিল করে বলেন, وَالضُّحى - وَاللَّيْلِ إِذَا سَجِى - مَا وَدَعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাত্রির যখন তা গভীর হয়, তোমার পালনকর্তা তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি। (সূরা যোহা, ১-৩)
টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩২৩৮; সহীহ মুসলিম, হা/৪২৫; তিরমিযী, হা/৩৩২৫; মিশকাত, হা/৫৮৪৩।
📄 দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা
মূলত দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী নাযিল হওয়ার মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ -কে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ ধীরে ধীরে বিভিন্নভাবে আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট প্রচার করতে থাকেন এবং তাদের নিকট আল্লাহর সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে থাকেন। তারপর তিনি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের নানা ধরনের শিরকী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ এর মক্কী জীবনের দাওয়াতী কার্যক্রমকে পর্যালোচনা করলে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। নিম্নে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
📄 প্রথম পর্যায়
রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রথম পর্যায়টি ছিল খুবই গোপনীয়। এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ মানুষকে গোপনে দাওয়াত দিতেন এবং বিষয়টি কেবল নিজ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন। বিশেষ করে তিনি তাদেরকেই দাওয়াত দিতেন, যারা তাঁর প্রতি বেশ আগ্রহী এবং যাদের কথাবার্তা ও চালচলনে সত্যপ্রীতির ছাপ রয়েছে। তিনি তাদের নিকট আল্লাহর বাণীগুলো পাঠ করে শোনাতেন এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো সুস্পষ্ট ও নম্র ভাষায় তুলে ধরতেন। অতঃপর তাদেরকে আল্লাহর সাথে শিরক করা থেকে বিরত থাকতে বলতেন।
রাসূলুল্লাহ এর প্রথম আহ্বানেই যারা সাড়া দিয়েছিলেন তারা হলেন- নারীদের মধ্যে স্ত্রী খাদীজা (রাঃ), পুরুষদের মধ্যে আবু বকর (রাঃ), শিশুদের মধ্যে আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ), ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ বিন সাবেত (রাঃ)। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথেই তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর কথা মেনে নিয়েছিলেন।
এরপর তারা তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দাওয়াতী কাজ গতিশীল করতে থাকেন এবং তাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনকে দাওয়াত দিতে থাকেন। আবু বকর (রাঃ) এর নিজ প্রচেষ্টায় উসমান (রাঃ), জুবায়ের (রাঃ), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। এছাড়া এ পর্যায়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- বেলাল (রাঃ), আবু উবায়দা (রাঃ), আমের বিন জাররাহ (রাঃ), আবু সালামা বিন আবদুল আসাদ (রাঃ), আরকাম বিন আবিল আরকাম (রাঃ), উসমান বিন মাযউন (রাঃ), কুদামা ইবনে মাযউন (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনে মাযউন (রাঃ), উবায়দা বিন হারিস ইবনে মুত্তালিব ইবনে আবদে মানাফ (রাঃ), সাঈদ বিন যায়েদ (রাঃ), ফাতিমা বিনতে খাত্তাব (রাঃ), খাব্বাব বিন আরাত (রাঃ) ও আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ সৌভাগ্যবান সাহাবীবৃন্দ।
সালাত আদায়ের নির্দেশ: প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব আয়াত নাযিল হয় তাতে সালাতের নির্দেশনা বিদ্যমান ছিল। তবে সে সময় কেবল ফজরের দুই রাক'আত এবং মাগরিবের দুই রাক'আত সালাত আদায় করা ফরয ছিল। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَسَبِّحُ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
সকাল-সন্ধ্যায় তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো। (সূরা মু'মিন- ৫৫)
এ সময় রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবীগণ সালাত আদায় করার জন্য গোপন ঘাঁটিতে চলে যেতেন এবং সেখানে সালাত আদায় করতেন। একদা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ ও আলী (রাঃ)-কে সালাত আদায় করতে দেখেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করে প্রকৃত বিষয়টি অবগত হওয়ার পর তিনি তাঁদেরকে এর উপর অটল থাকার পরামর্শ দেন।
কুরাইশদের প্রতিক্রিয়া : এভাবেই রাসূলুল্লাহ এর প্রথম পর্যায়ের দাওয়াতী কার্যক্রম ধীরে ধীরে চুপিসারে এগিয়ে যেতে থাকে। তারপরও কুরাইশদের নিকট বিষয়টি প্রকাশ পায়। কিন্তু তখনও তারা রাসূলুল্লাহ এর এসব কার্যক্রমের উপর গুরুত্বারোপ করেনি। তারা বিষয়টিকে সে যুগের প্রচলিত হানীফ সম্প্রদায়ের মতো মনে করেছিল। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ এর দাওয়াতী কার্যক্রম ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁর অনুসারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে, তখন ধীরে ধীরে বিষয়টিকে তারা বেশ গুরুত্বের সাথে দেখতে থাকে। আর এমন পরিস্থিতিতেই কেটে যায় তিনটি বছর। এ সময়ের মধ্যেই ঈমানদারদের একটি ছোট দলও তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যারা একে অপরের সাথে শক্ত ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা এমনভাবে তৈরি হয়েছিলেন যে, সকলেই রাসূলুল্লাহ এর আহ্বানে জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন এবং তারা সর্বদাই রাসূলুল্লাহ -কে যথাযথ মর্যাদা প্রদানে সচেষ্ট থাকতেন।
📄 দ্বিতীয় পর্যায়
প্রথম পর্যায়ে গোপনে গোপনে প্রায় তিন বছর ইসলাম প্রচার বা দাওয়াতী কার্যক্রম চালানো হয়। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ এর প্রতি আদেশ দেয়া হয়। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে যে নির্দেশ প্রদান করা হয় সেটি হলো, وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾
আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দাও। (সূরা শু'আরা- ২১৪) এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ দাওয়াতকে আরো গতিশীল করার জন্য প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে বেরিয়ে আসেন এবং প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করা শুরু করেন।