📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুওয়াত লাভ

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুওয়াত লাভ


রাসূলুল্লাহ এর বয়স যখন ৪০ বছর ঠিক তখনই তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত লাভ করার কিছুদিন পূর্ব থেকেই তিনি আস্তে আস্তে জনগণ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন এবং অধিক নির্জনতাপ্রিয় হয়ে গেলেন। তিনি প্রতিদিন মক্কার দুই মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তিনি ঠিক কোন্ দিনটিতে নবুওয়াত লাভ করে সর্বপ্রথম ওহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে। তবে একথা স্পষ্ট যে, সেটি ছিল রমাযান মাস এবং কদরের রাত্রি। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ রমাযান তো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক এবং হেদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)। (সূরা বাক্বারা- ১৮৫)
অন্যত্র বলা হয়েছে, إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ - لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ )
আমি একে (কুরআনকে) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জান, লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হলো, হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা ক্বদর, ১-৩)
অপর আয়াতে বলা হয়েছে, حمَ - وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ - إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ )
হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাত্রিতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। (সূরা দুখান, ১-৩)
সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কদরের রাত্রিটি রমাযান মাসের শেষ দশ রাত্রির বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে নিহিত।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ এর নিকট ঘুমের মধ্যে স্বপ্নরূপে ওহীর সূচনা হয়। স্বপ্নে তিনি যা দেখতেন তা-ই প্রভাতের আলোর ন্যায় তাঁর কাছে প্রকাশ হয়ে যেত। কিছুদিন এ অবস্থা চলার পর তাঁর অন্তরে লোকালয় হতে সংস্রবহীন নির্জনে থাকার প্রেরণা উদিত হয়। তিনি (মক্কা নগরী হতে তিন মাইল দূরে) হেরা নামক পর্বত গুহায় নির্জনে (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) বাস করতে লাগলেন। তিনি তাঁর পরিবারের নিকট না গিয়ে সেথায় কয়েক রাত পর্যন্ত ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন। এজন্য তিনি সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। তারপর খাদীজা (রাঃ) এর নিকট ফিরে আসতেন। পুনরায় কিছু পানাহার সামগ্রী নিয়ে (একাধারে ইবাদাতে রত হওয়ার জন্য) হেরা গুহায় চলে যেতেন।
এমনিভাবে হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকাকালে হঠাৎ একদিন তাঁর নিকট ওহী এলো। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) ওহী নিয়ে রাসূলুল্লাহ এর সামনে হাজির হয়ে বললেন, (হে নবী) আপনি পড় ন। উত্তরে তিনি বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। রাসূলুল্লাহ বলেন, এ কথা শুনে জিবরাঈল (আঃ) আমাকে ধরে আলিঙ্গন করে এমন জোরে চাপ দিলেন, যাতে আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! জবাবে আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। এটা শুনে ফেরেশতা আবার আমাকে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করলেন। এবারও আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বললেন, আপনি পড়ুন। জবাবে আমি আগের ন্যায় বললাম, আমি তো পড়তে পারি না। এটা শুনে জিবরাঈল (আঃ) তৃতীয় বার আমাকে আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিয়ে বললেন,
﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ - اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ - الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ - عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴾
পড়ো, তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাধা রক্তপিণ্ড হতে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক অতি মহান। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের দ্বারা। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আলাক্ব, ১-৫)
তারপর রাসূলুল্লাহ উক্ত আয়াতসমূহ (তিলাওয়াত করতে করতে) বাড়ি ফিরলেন। তখন ভয়ে তাঁর অন্তর থর থর করে কাঁপছিল। তিনি স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাঃ) এর কাছে এসে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দাও। অতঃপর খাদীজা (রাঃ) তাঁকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর এ অবস্থা কেটে গেলে তিনি স্ত্রী খাদীজাকে সব ঘটনা খুলে বললেন এবং বললেন, আমি আমার জীবন নিয়ে ভয় করছি। তখন তীক্ষ্ণ জ্ঞানের অধিকারিণী খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ -কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! কিছুতেই নয়, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কখনো চিন্তায় ফেলবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করেন; ইয়াতীম, বিধবা, অন্ধ ও অক্ষমদের খাওয়া-পরা ও থাকার ব্যবস্থা করে থাকেন, বেকারদের কর্মসংস্থান করেন, মেহমানের সম্মান করে থাকেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের সাহায্যে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন (অতএব এ অবস্থায় আপনার ভয়ের কোন কারণ নেই)।
এরূপ সান্ত্বনা দেয়ার পর খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ -কে সাথে নিয়ে স্বীয় চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল এর নিকট গেলেন। যিনি জাহেলিয়াতের যুগে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইব্রানী ভাষায় কিতাব লিখতেন। সুতরাং সুরইয়ানী ভাষার ইঞ্জীল কিতাব হতে তিনি ইব্রানী ভাষায় আল্লাহর ইচ্ছায় সামর্থানুযায়ী অনেক কিছু লিখেছেন (এক কথায় তিনি আসমানী কিতাবে পারদর্শী ছিলেন)। তিনি সে সময় খুব বৃদ্ধ হওয়ায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। তখন ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল রাসূলুল্লাহ-কে লক্ষ্য করে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি কী দেখেছ? তখন রাসূলুল্লাহ তাকে সব ঘটনা খুলে বললেন, যা তিনি দেখেছিলেন। ঘটনাটি শোনার পর ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, উনি তো সেই মঙ্গলময় বার্তাবাহক, জিবরাঈল ফেরেশতা, যাকে আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! (তোমার নবুওয়াতের প্রচারকালে) যদি আমি ক্ষমতাশালী যুবক হতাম! যদি আমি সেদিন জীবিত থাকতাম যেদিন তোমার কওম তোমাকে দেশান্তরিত করে ছাড়বে! এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, আমার দেশবাসী কি আমাকে বিতাড়িত করবে? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ! তুমি যে সত্য ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, ইতিপূর্বে এরূপ সত্য ধর্ম নিয়ে যারাই তাদের কওমের নিকট এসেছিলেন, তাদের কওম তাদের সাথে শত্রুতা না করে ছাড়েনি। (আমি তোমাকে কথা দিলাম) যদি আমি সেদিন জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই প্রবলভাবে তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু এর কিছু দিন পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। এরপর কিছুদিন ওহী আগমন করা বন্ধ ছিল।

টিকাঃ
৩৭ সহীহ বুখারী, হা/৩; সহীহ মুসলিম, হা/৪২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০০১; মিশকাত, হা/৫৮৪১ ।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 সাময়িকভাবে ওহী নাযিল বন্ধ হয়ে যাওয়া

📄 সাময়িকভাবে ওহী নাযিল বন্ধ হয়ে যাওয়া


হঠাৎ ওহী প্রাপ্ত হওয়ায় রাসূলুল্লাহ ﷺ সাময়িকভাবে কিছুটা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যাতে সহজেই এ অবস্থা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিকভাবে আবারও ওহীর প্রতি আগ্রহী হন, সম্ভবত সে কারণেই কিছুদিন ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ ছিল।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 পুনরায় ওহীর আগমন

📄 পুনরায় ওহীর আগমন


কিছুদিন ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ থাকার কারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুললেন। সেসময় তাঁর মনে এ ধারণাও বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর রাসূল বা বার্তাবাহক। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মনোনীত করেছেন। সর্বপ্রথম যিনি তাঁর নিকট আগমন করেছিলেন তিনিই ছিলেন আসমানী দূত জিবরাঈল (আঃ)। তিনি ওহী গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেন এবং আগ্রহী হয়ে উঠেন। তখন একদিন জিবরাঈল (আঃ) আবারও ওহী নিয়ে আগমন করেন। হাদীসে এসেছে,
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী -কে বলতে শুনেছেন যে, (হেরা গুহার ঘটনার) পর আমার নিকট ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর একদিন আমি রাস্তা দিয়ে চলছিলাম, এমনসময় আকাশ হতে এক আওয়াজ শুনলাম। তখন আমি আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম, হেরা গুহায় আমার নিকট যিনি এসেছিলেন, ইনি সেই ফেরেশতা। আসমান ও জমিনের মাঝখানে একটি 'কুরসী' এর উপর বসে আছেন। আমি তাকে দেখে ভীত হয়ে গেলাম; এমনকি মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর আমি পরিবার-পরিজনের কাছে এসে বললাম, আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরো, আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরো। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন- يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ - قُمْ فَأَنْذِرْ - وَرَبَّكَ فَكَبَرْ - وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ - وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠো, লোকদেরকে সতর্ক করো। তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো, তোমার পোশাক পবিত্র করো এবং অপবিত্রতা দূর করো- (সূরা মুদ্দাস্সির, ১-৫)।
এরপর থেকে অবিরাম ধারায় ওহী নাযিল হতে থাকে। অতঃপর পরবর্তীতে আরো একবার ওহীর আগমন বন্ধ ছিল। এতে মুশরিকরা বলে বেড়াচ্ছিল যে, মুহাম্মাদের রব তাকে ছেড়ে গেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা যোহা নাযিল করে বলেন, وَالضُّحى - وَاللَّيْلِ إِذَا سَجِى - مَا وَدَعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাত্রির যখন তা গভীর হয়, তোমার পালনকর্তা তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি। (সূরা যোহা, ১-৩)

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩২৩৮; সহীহ মুসলিম, হা/৪২৫; তিরমিযী, হা/৩৩২৫; মিশকাত, হা/৫৮৪৩।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা

📄 দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা


মূলত দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী নাযিল হওয়ার মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ -কে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ ধীরে ধীরে বিভিন্নভাবে আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট প্রচার করতে থাকেন এবং তাদের নিকট আল্লাহর সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে থাকেন। তারপর তিনি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের নানা ধরনের শিরকী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ এর মক্কী জীবনের দাওয়াতী কার্যক্রমকে পর্যালোচনা করলে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। নিম্নে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00