📄 খাদীজা (রাঃ) এর ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ
সে সময় পুরো কুরাইশ গোত্র জীবিকা অর্জনের জন্য নানা ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকত। যার ফলে রাসূলুল্লাহ -ও মাঝে মধ্যে এসব কাজে বেরিয়ে পড়তেন। তখন বিভিন্ন প্রকার শর্তের ভিত্তিতে একে অপরের ব্যবসায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, উত্তম চরিত্র ও একনিষ্ঠ আমানতদার। ফলে যে কেউ তাঁর সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে সাচ্ছন্দবোধ করত। তাঁর এই সুনাম যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন তিনি মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খাদীজা (রাঃ) এর দৃষ্টিগোচর হন। তিনি মুহাম্মাদ-কে তার সাথে ব্যবসায় অংশ গ্রহণ করার জন্য এক চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। এরপর তিনি চুক্তি অনুযায়ী খাদীজা (রাঃ) এর ক্রীতদাস মায়সারাকে সাথে নিয়ে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বারের মতো শাম তথা সিরিয়া গমন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। অতঃপর তিনি ফিরে এসে খাদীজা (রাঃ)-কে মূলধনসহ এত বেশি পরিমাণ অর্থ ফেরত দেন যে, ইতিপূর্বে খাদীজা (রাঃ) এত অর্থ আর কখনো পাননি। এতে খাদীজা (রাঃ) তাঁর উপর অনেক খুশি হয়ে গেলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে খাদীজা (রাঃ) এর বিবাহ
খাদীজা (রাঃ) ছিলেন মক্কার ধনাঢ্য মহিলাদের মধ্যে একজন। রাসূলুল্লাহ যখন একটি সফল ব্যবসায়িক অভিযান শেষে ফিরে আসলেন এবং তাঁর ক্রীতদাস মায়সারার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত মন-মানসিকতা, আমানতরক্ষায় আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার মনোবাসনা তার মধ্যে জাগতে থাকে। তিনি বিষয়টি নিয়ে বান্ধবী 'নাফীসা বিনতে মুনাব্বিহ' এর সাথে আলোচনা করলেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর সাথে আলোচনা করার অনুরোধ জানালেন। ফলে বান্ধবী নাফীসা খাদীজা (রাঃ) এর প্রস্তাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে অবহিত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ এ প্রস্তাবটি সম্পর্কে চাচা আবু তালিবের সাথে আলোচনা করলেন। আবু তালিব এ ব্যাপারে খাদীজা (রাঃ) এর অভিভাকের সাথে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। তারা একটি দিন নির্ধারণ করে তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদীজা (রাঃ) এর বয়স ছিল ৪০ বছর।
রাসূলুল্লাহ এর এটিই ছিল প্রথম বিবাহ। অপর পক্ষে খাদীজা (রাঃ) এর ছিল তৃতীয় বিবাহ। প্রথমে আবু হালা ইবনে যাররাহ আত-তামীমীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অতঃপর সে মৃত্যুবরণ করলে আতীক বিন আবিদ আল মাখযুমীর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ খাদীজা (রাঃ) এর জীবদ্দশায় অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। ইবরাহীম ব্যতীত রাসূলুল্লাহ এর অন্যান্য সকল সন্তানই খাদীজা (রাঃ) এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের প্রথম সন্তানের নাম ছিল কাসেম, যার কারণে রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর উপনাম হয়েছিল আবুল কাসেম অর্থাৎ কাসেমের পিতা। এরপর জন্মগ্রহণ করেন যথাক্রমে যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ এর উপাধি ছিল তাইয়েব এবং তাহের। রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর সকল পুত্রসন্তান বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাতিমা (রাঃ) ব্যতীত অন্যান্য সকল কন্যা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন। ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর মৃত্যুর ৬ মাস পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
📄 হাজরে আসওয়াদ নিয়ে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা
এ ঘটনাটি ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ এর বয়স যখন ৩৫ বছর তখন। সে সময় কাবাঘর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কেননা তখন কাবা ঘরটি ছিল চারটি দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত; কিন্তু এর উপর কোন ছাদ ছিল না। উপরন্তু এটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, এমনকি অনেক সময় এর থেকে অনেক কিছু চুরি হয়ে যেত। তাছাড়া ঐ বছরই মক্কা নগরীতে বন্যা হওয়ায় কাবাঘরের দেয়ালগুলো প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। যার কারণে কুরাইশরা কাবা ঘরকে পুনরায় নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন কাবাঘর নির্মাণ কাজ চলতে থাকে, তখন এক পর্যায়ে সকল গোত্রই হাজরে আসওয়াদ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকেই দাবি করছিল যে, হাজরে আসওয়াদটি তারাই পুনঃস্থাপন করবে।
ফলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দাবিতে অটল থাকে। কেননা সকলেই জানত যে, এই পাথরটি একটি বরকতময় পাথর। সুতরাং যারা এটিকে পুনঃস্থাপন করবে তারা আলাদা মর্যাদা লাভ করবে। অবশেষে বিবাদটি সেদিনের জন্য স্থগিত রাখা হলো এবং 'আবু উমাইয়া মাখযুমী' নামক এক ব্যক্তির প্রস্তাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তাঁর উপরেই এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব বর্তাবে। অতঃপর উপস্থিত সকলেই এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল এবং সকাল হওয়ার প্রতীক্ষা করতে লাগল। অবশেষে যখন সকাল হলো তখন দেখা গেল যে, মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করেছেন, যিনি ছিলেন সকলের কাছে প্রিয়পাত্র। তখন সকলেই খুশি হয়ে বলে উঠল, “এই তো আমাদের আল-আমীন। আমরা সকলেই তাঁর উপর আস্থাশীল। তিনিই হলেন মুহাম্মাদ"।
অতঃপর সকলেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট সমস্যাটি উত্থাপন করল। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি চাদর নিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ নামক পাথরটি রাখলেন। অতঃপর তিনি সকল গোত্রপতিকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনারা সকলে মিলে একসাথে চাদরটির চার কোণায় ধরুন এবং পাথরটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চলুন। ফলে তা-ই করা হলো। অতঃপর নির্দিষ্ট স্থানে পাথরটি মুহাম্মাদ নিজ হাতে পুনঃস্থাপন করলেন এবং এতে সকলেই সন্তুষ্ট হয়ে গেল। আর এভাবেই এত বড় একটি বিবাদের মীমাংসা খুব সহজেই হয়ে গেল।
উল্লেখ্য যে, এ সময় অর্থের অভাবে কাবা ঘরটি ইসমাঈল (আঃ) এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাধ্য হয়ে নির্মাণ কাজ করার সময় উত্তর দিক থেকে প্রায় নয় ফিট কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেননা কুরাইশরা এর নির্মাণ কাজে ব্যয় করার জন্য সম্পূর্ণ পবিত্র ও হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের শর্ত করেছিল। কিন্তু তাদের কাছে এ ধরনের সম্পদের পরিমাণ এত কম ছিল যে, এটি নির্মাণ করার জন্য পরিমিত অর্থ সংগৃহীত হয়ে উঠেনি।
টিকাঃ
* সীরাতে ইবনে হিশাম ১/১৯৭; আহমাদ, হা/১৫৫৪৩; মুসতাদরাকে হাকেম, হা/১৬৮৩।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুওয়াত লাভ
রাসূলুল্লাহ এর বয়স যখন ৪০ বছর ঠিক তখনই তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত লাভ করার কিছুদিন পূর্ব থেকেই তিনি আস্তে আস্তে জনগণ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন এবং অধিক নির্জনতাপ্রিয় হয়ে গেলেন। তিনি প্রতিদিন মক্কার দুই মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তিনি ঠিক কোন্ দিনটিতে নবুওয়াত লাভ করে সর্বপ্রথম ওহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে। তবে একথা স্পষ্ট যে, সেটি ছিল রমাযান মাস এবং কদরের রাত্রি। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ রমাযান তো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক এবং হেদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)। (সূরা বাক্বারা- ১৮৫)
অন্যত্র বলা হয়েছে, إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ - لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ )
আমি একে (কুরআনকে) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জান, লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হলো, হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা ক্বদর, ১-৩)
অপর আয়াতে বলা হয়েছে, حمَ - وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ - إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ )
হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাত্রিতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। (সূরা দুখান, ১-৩)
সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কদরের রাত্রিটি রমাযান মাসের শেষ দশ রাত্রির বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে নিহিত।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ এর নিকট ঘুমের মধ্যে স্বপ্নরূপে ওহীর সূচনা হয়। স্বপ্নে তিনি যা দেখতেন তা-ই প্রভাতের আলোর ন্যায় তাঁর কাছে প্রকাশ হয়ে যেত। কিছুদিন এ অবস্থা চলার পর তাঁর অন্তরে লোকালয় হতে সংস্রবহীন নির্জনে থাকার প্রেরণা উদিত হয়। তিনি (মক্কা নগরী হতে তিন মাইল দূরে) হেরা নামক পর্বত গুহায় নির্জনে (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) বাস করতে লাগলেন। তিনি তাঁর পরিবারের নিকট না গিয়ে সেথায় কয়েক রাত পর্যন্ত ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন। এজন্য তিনি সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। তারপর খাদীজা (রাঃ) এর নিকট ফিরে আসতেন। পুনরায় কিছু পানাহার সামগ্রী নিয়ে (একাধারে ইবাদাতে রত হওয়ার জন্য) হেরা গুহায় চলে যেতেন।
এমনিভাবে হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকাকালে হঠাৎ একদিন তাঁর নিকট ওহী এলো। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) ওহী নিয়ে রাসূলুল্লাহ এর সামনে হাজির হয়ে বললেন, (হে নবী) আপনি পড় ন। উত্তরে তিনি বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। রাসূলুল্লাহ বলেন, এ কথা শুনে জিবরাঈল (আঃ) আমাকে ধরে আলিঙ্গন করে এমন জোরে চাপ দিলেন, যাতে আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! জবাবে আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। এটা শুনে ফেরেশতা আবার আমাকে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করলেন। এবারও আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বললেন, আপনি পড়ুন। জবাবে আমি আগের ন্যায় বললাম, আমি তো পড়তে পারি না। এটা শুনে জিবরাঈল (আঃ) তৃতীয় বার আমাকে আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিয়ে বললেন,
﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ - اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ - الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ - عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴾
পড়ো, তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাধা রক্তপিণ্ড হতে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক অতি মহান। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের দ্বারা। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আলাক্ব, ১-৫)
তারপর রাসূলুল্লাহ উক্ত আয়াতসমূহ (তিলাওয়াত করতে করতে) বাড়ি ফিরলেন। তখন ভয়ে তাঁর অন্তর থর থর করে কাঁপছিল। তিনি স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাঃ) এর কাছে এসে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দাও। অতঃপর খাদীজা (রাঃ) তাঁকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর এ অবস্থা কেটে গেলে তিনি স্ত্রী খাদীজাকে সব ঘটনা খুলে বললেন এবং বললেন, আমি আমার জীবন নিয়ে ভয় করছি। তখন তীক্ষ্ণ জ্ঞানের অধিকারিণী খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ -কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! কিছুতেই নয়, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কখনো চিন্তায় ফেলবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করেন; ইয়াতীম, বিধবা, অন্ধ ও অক্ষমদের খাওয়া-পরা ও থাকার ব্যবস্থা করে থাকেন, বেকারদের কর্মসংস্থান করেন, মেহমানের সম্মান করে থাকেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের সাহায্যে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন (অতএব এ অবস্থায় আপনার ভয়ের কোন কারণ নেই)।
এরূপ সান্ত্বনা দেয়ার পর খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ -কে সাথে নিয়ে স্বীয় চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল এর নিকট গেলেন। যিনি জাহেলিয়াতের যুগে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইব্রানী ভাষায় কিতাব লিখতেন। সুতরাং সুরইয়ানী ভাষার ইঞ্জীল কিতাব হতে তিনি ইব্রানী ভাষায় আল্লাহর ইচ্ছায় সামর্থানুযায়ী অনেক কিছু লিখেছেন (এক কথায় তিনি আসমানী কিতাবে পারদর্শী ছিলেন)। তিনি সে সময় খুব বৃদ্ধ হওয়ায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। তখন ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল রাসূলুল্লাহ-কে লক্ষ্য করে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি কী দেখেছ? তখন রাসূলুল্লাহ তাকে সব ঘটনা খুলে বললেন, যা তিনি দেখেছিলেন। ঘটনাটি শোনার পর ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, উনি তো সেই মঙ্গলময় বার্তাবাহক, জিবরাঈল ফেরেশতা, যাকে আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! (তোমার নবুওয়াতের প্রচারকালে) যদি আমি ক্ষমতাশালী যুবক হতাম! যদি আমি সেদিন জীবিত থাকতাম যেদিন তোমার কওম তোমাকে দেশান্তরিত করে ছাড়বে! এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, আমার দেশবাসী কি আমাকে বিতাড়িত করবে? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ! তুমি যে সত্য ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, ইতিপূর্বে এরূপ সত্য ধর্ম নিয়ে যারাই তাদের কওমের নিকট এসেছিলেন, তাদের কওম তাদের সাথে শত্রুতা না করে ছাড়েনি। (আমি তোমাকে কথা দিলাম) যদি আমি সেদিন জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই প্রবলভাবে তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু এর কিছু দিন পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। এরপর কিছুদিন ওহী আগমন করা বন্ধ ছিল।
টিকাঃ
৩৭ সহীহ বুখারী, হা/৩; সহীহ মুসলিম, হা/৪২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০০১; মিশকাত, হা/৫৮৪১ ।