📄 হিলফুল ফুযূল প্রতিষ্ঠা
ফুজ্জার যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হিংস্রতা দেখে রাসূলুল্লাহ খুবই ব্যথিত হন। এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক চিন্তা করে তিনি মানুষের সেবা-যত্ন করার জন্য একটি সংঘঠন প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন। তাই তিনি চাচা যুবায়ের ইবনে আবদুল মুত্তালিবের নিকট এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। ফলে যুবায়ের ইবনে আবদুল মুttalib এতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। তারপর তাদের উভয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই ধীরে ধীরে এর সমর্থক সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে জুদ'আনের ঘরে বিভিন্ন গোত্রপতির উপস্থিতি ও সম্মতি সাপেক্ষে এ মর্মে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয় যে,
১. দেশের অশান্তি দূর করার জন্য আমরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকব।
২. বিদেশি লোকদের ধনসম্পদ ও মানসম্মান রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
৩. দরিদ্র, দুর্বল ও অসহায় লোকদের সহায়তাদানে আমরা কখনই কুণ্ঠাবোধ করব না।
৪. অত্যাচারীর অত্যাচার থেকে দুর্বল লোকদেরকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব।
এ অঙ্গীকারনামা সম্পাদনের সময় উপস্থিত ছিলেন বনু হাশেম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ বিন আবদুল উযযা, বনু যোহরা বিন কিলাব এবং বনু তামীম বিন মুররাহ প্রমুখ গোত্রের প্রধানগণ।
যেহেতু এ অঙ্গীকারনামাটি ছিল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, তাই এ সংগঠনের নাম দেয়া হয় 'হিলফুল ফুযূল' বা শান্তি সংঘ। এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়তে থাকে। কিন্তু ইসলাম আগমনের মধ্য দিয়ে এর কার্যকারিতা স্তিমিত হয়ে যায়।
📄 খাদীজা (রাঃ) এর ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ
সে সময় পুরো কুরাইশ গোত্র জীবিকা অর্জনের জন্য নানা ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকত। যার ফলে রাসূলুল্লাহ -ও মাঝে মধ্যে এসব কাজে বেরিয়ে পড়তেন। তখন বিভিন্ন প্রকার শর্তের ভিত্তিতে একে অপরের ব্যবসায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, উত্তম চরিত্র ও একনিষ্ঠ আমানতদার। ফলে যে কেউ তাঁর সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে সাচ্ছন্দবোধ করত। তাঁর এই সুনাম যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন তিনি মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খাদীজা (রাঃ) এর দৃষ্টিগোচর হন। তিনি মুহাম্মাদ-কে তার সাথে ব্যবসায় অংশ গ্রহণ করার জন্য এক চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। এরপর তিনি চুক্তি অনুযায়ী খাদীজা (রাঃ) এর ক্রীতদাস মায়সারাকে সাথে নিয়ে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বারের মতো শাম তথা সিরিয়া গমন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। অতঃপর তিনি ফিরে এসে খাদীজা (রাঃ)-কে মূলধনসহ এত বেশি পরিমাণ অর্থ ফেরত দেন যে, ইতিপূর্বে খাদীজা (রাঃ) এত অর্থ আর কখনো পাননি। এতে খাদীজা (রাঃ) তাঁর উপর অনেক খুশি হয়ে গেলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে খাদীজা (রাঃ) এর বিবাহ
খাদীজা (রাঃ) ছিলেন মক্কার ধনাঢ্য মহিলাদের মধ্যে একজন। রাসূলুল্লাহ যখন একটি সফল ব্যবসায়িক অভিযান শেষে ফিরে আসলেন এবং তাঁর ক্রীতদাস মায়সারার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত মন-মানসিকতা, আমানতরক্ষায় আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার মনোবাসনা তার মধ্যে জাগতে থাকে। তিনি বিষয়টি নিয়ে বান্ধবী 'নাফীসা বিনতে মুনাব্বিহ' এর সাথে আলোচনা করলেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর সাথে আলোচনা করার অনুরোধ জানালেন। ফলে বান্ধবী নাফীসা খাদীজা (রাঃ) এর প্রস্তাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে অবহিত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ এ প্রস্তাবটি সম্পর্কে চাচা আবু তালিবের সাথে আলোচনা করলেন। আবু তালিব এ ব্যাপারে খাদীজা (রাঃ) এর অভিভাকের সাথে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। তারা একটি দিন নির্ধারণ করে তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদীজা (রাঃ) এর বয়স ছিল ৪০ বছর।
রাসূলুল্লাহ এর এটিই ছিল প্রথম বিবাহ। অপর পক্ষে খাদীজা (রাঃ) এর ছিল তৃতীয় বিবাহ। প্রথমে আবু হালা ইবনে যাররাহ আত-তামীমীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অতঃপর সে মৃত্যুবরণ করলে আতীক বিন আবিদ আল মাখযুমীর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ খাদীজা (রাঃ) এর জীবদ্দশায় অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। ইবরাহীম ব্যতীত রাসূলুল্লাহ এর অন্যান্য সকল সন্তানই খাদীজা (রাঃ) এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের প্রথম সন্তানের নাম ছিল কাসেম, যার কারণে রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর উপনাম হয়েছিল আবুল কাসেম অর্থাৎ কাসেমের পিতা। এরপর জন্মগ্রহণ করেন যথাক্রমে যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ এর উপাধি ছিল তাইয়েব এবং তাহের। রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর সকল পুত্রসন্তান বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাতিমা (রাঃ) ব্যতীত অন্যান্য সকল কন্যা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন। ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর মৃত্যুর ৬ মাস পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
📄 হাজরে আসওয়াদ নিয়ে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা
এ ঘটনাটি ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ এর বয়স যখন ৩৫ বছর তখন। সে সময় কাবাঘর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কেননা তখন কাবা ঘরটি ছিল চারটি দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত; কিন্তু এর উপর কোন ছাদ ছিল না। উপরন্তু এটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, এমনকি অনেক সময় এর থেকে অনেক কিছু চুরি হয়ে যেত। তাছাড়া ঐ বছরই মক্কা নগরীতে বন্যা হওয়ায় কাবাঘরের দেয়ালগুলো প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। যার কারণে কুরাইশরা কাবা ঘরকে পুনরায় নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন কাবাঘর নির্মাণ কাজ চলতে থাকে, তখন এক পর্যায়ে সকল গোত্রই হাজরে আসওয়াদ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকেই দাবি করছিল যে, হাজরে আসওয়াদটি তারাই পুনঃস্থাপন করবে।
ফলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দাবিতে অটল থাকে। কেননা সকলেই জানত যে, এই পাথরটি একটি বরকতময় পাথর। সুতরাং যারা এটিকে পুনঃস্থাপন করবে তারা আলাদা মর্যাদা লাভ করবে। অবশেষে বিবাদটি সেদিনের জন্য স্থগিত রাখা হলো এবং 'আবু উমাইয়া মাখযুমী' নামক এক ব্যক্তির প্রস্তাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তাঁর উপরেই এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব বর্তাবে। অতঃপর উপস্থিত সকলেই এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল এবং সকাল হওয়ার প্রতীক্ষা করতে লাগল। অবশেষে যখন সকাল হলো তখন দেখা গেল যে, মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করেছেন, যিনি ছিলেন সকলের কাছে প্রিয়পাত্র। তখন সকলেই খুশি হয়ে বলে উঠল, “এই তো আমাদের আল-আমীন। আমরা সকলেই তাঁর উপর আস্থাশীল। তিনিই হলেন মুহাম্মাদ"।
অতঃপর সকলেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট সমস্যাটি উত্থাপন করল। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি চাদর নিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ নামক পাথরটি রাখলেন। অতঃপর তিনি সকল গোত্রপতিকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনারা সকলে মিলে একসাথে চাদরটির চার কোণায় ধরুন এবং পাথরটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চলুন। ফলে তা-ই করা হলো। অতঃপর নির্দিষ্ট স্থানে পাথরটি মুহাম্মাদ নিজ হাতে পুনঃস্থাপন করলেন এবং এতে সকলেই সন্তুষ্ট হয়ে গেল। আর এভাবেই এত বড় একটি বিবাদের মীমাংসা খুব সহজেই হয়ে গেল।
উল্লেখ্য যে, এ সময় অর্থের অভাবে কাবা ঘরটি ইসমাঈল (আঃ) এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাধ্য হয়ে নির্মাণ কাজ করার সময় উত্তর দিক থেকে প্রায় নয় ফিট কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেননা কুরাইশরা এর নির্মাণ কাজে ব্যয় করার জন্য সম্পূর্ণ পবিত্র ও হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের শর্ত করেছিল। কিন্তু তাদের কাছে এ ধরনের সম্পদের পরিমাণ এত কম ছিল যে, এটি নির্মাণ করার জন্য পরিমিত অর্থ সংগৃহীত হয়ে উঠেনি।
টিকাঃ
* সীরাতে ইবনে হিশাম ১/১৯৭; আহমাদ, হা/১৫৫৪৩; মুসতাদরাকে হাকেম, হা/১৬৮৩।