📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সিরিয়া গমন
রাসূলুল্লাহ এর বয়স যখন ১২ বছর তখন তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে আবু তালিবের সাথে সিরিয়া গমন করেন। সে সময় সিরিয়া 'শাম' নামে পরিচিত ছিল। সফরের এক পর্যায়ে তারা বসরায় গিয়ে উপস্থিত হন। সে সময় বসরা ছিল শাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
সেখানে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক (রাহেব) বসবাস করত। তাঁর উপাধি ছিল বুহায়রা। তিনি কখনো কোন কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গীর্জা থেকে বের হতেন না। কিন্তু যখন এ কাফেলাটি সেখানে গিয়ে শিবির স্থাপন করল, তখন তিনি গীর্জা থেকে বের হয়ে এলেন এবং তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। তারপর বালক মুহাম্মাদ এর হাত ধরে বললেন, ইনি হচ্ছেন বিশ্বজাহানের সরদার। অচিরেই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ রাসূল হিসেবে মনোনীত করবেন। এ কথা শুনে আবু তালিব বললেন, আপনি কীভাবে জানলেন যে, ইনিই হচ্ছেন শেষ নবী? তখন তিনি বললেন, গিরিপথের ঐ প্রান্ত থেকে তোমাদের আগমন যখন ধীরে ধীরে আমার দৃষ্টিগোচর হয়ে আসছিল তখন আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে, সেখানে এমন কোন বৃক্ষ কিংবা পাথর ছিল না- যা তাঁকে সিজদা করেনি।' এসব জিনিস নবী-রাসূল ছাড়া সৃষ্টিকুলের মধ্যে অন্য কাউকে কখনই সিজদা করে না। উপরন্তু মোহরে নবুওয়াত দেখেও আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তাঁর স্কন্দদেশের নিচে কড়ি হাড্ডির পাশে 'সেব' ফলের আকৃতিবিশিষ্ট একটি দাগ রয়েছে। সেটাই হচ্ছে মোহরে নবুওয়াত। আর এগুলো আমি বাইবেল থেকে অবগত হয়েছি। তারপর তিনি আবু তালিবকে বললেন, আপনি একে সাথে নিয়ে আর বিদেশে ভ্রমণ করবেন না; বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যান। কেননা ইয়াহুদিরা এর পরিচয় জানতে পারলে একে হত্যা করে ফেলতে পারে। ফলে আবু তালিব খুব শীঘ্রই তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
টিকাঃ
* সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৮০-৮৩; তিরমিযী, হা/৩৬২০।
📄 হিলফুল ফুযূল প্রতিষ্ঠা
ফুজ্জার যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হিংস্রতা দেখে রাসূলুল্লাহ খুবই ব্যথিত হন। এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক চিন্তা করে তিনি মানুষের সেবা-যত্ন করার জন্য একটি সংঘঠন প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন। তাই তিনি চাচা যুবায়ের ইবনে আবদুল মুত্তালিবের নিকট এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। ফলে যুবায়ের ইবনে আবদুল মুttalib এতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। তারপর তাদের উভয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই ধীরে ধীরে এর সমর্থক সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে জুদ'আনের ঘরে বিভিন্ন গোত্রপতির উপস্থিতি ও সম্মতি সাপেক্ষে এ মর্মে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয় যে,
১. দেশের অশান্তি দূর করার জন্য আমরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকব।
২. বিদেশি লোকদের ধনসম্পদ ও মানসম্মান রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
৩. দরিদ্র, দুর্বল ও অসহায় লোকদের সহায়তাদানে আমরা কখনই কুণ্ঠাবোধ করব না।
৪. অত্যাচারীর অত্যাচার থেকে দুর্বল লোকদেরকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব।
এ অঙ্গীকারনামা সম্পাদনের সময় উপস্থিত ছিলেন বনু হাশেম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ বিন আবদুল উযযা, বনু যোহরা বিন কিলাব এবং বনু তামীম বিন মুররাহ প্রমুখ গোত্রের প্রধানগণ।
যেহেতু এ অঙ্গীকারনামাটি ছিল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, তাই এ সংগঠনের নাম দেয়া হয় 'হিলফুল ফুযূল' বা শান্তি সংঘ। এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়তে থাকে। কিন্তু ইসলাম আগমনের মধ্য দিয়ে এর কার্যকারিতা স্তিমিত হয়ে যায়।
📄 খাদীজা (রাঃ) এর ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ
সে সময় পুরো কুরাইশ গোত্র জীবিকা অর্জনের জন্য নানা ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকত। যার ফলে রাসূলুল্লাহ -ও মাঝে মধ্যে এসব কাজে বেরিয়ে পড়তেন। তখন বিভিন্ন প্রকার শর্তের ভিত্তিতে একে অপরের ব্যবসায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, উত্তম চরিত্র ও একনিষ্ঠ আমানতদার। ফলে যে কেউ তাঁর সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে সাচ্ছন্দবোধ করত। তাঁর এই সুনাম যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন তিনি মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খাদীজা (রাঃ) এর দৃষ্টিগোচর হন। তিনি মুহাম্মাদ-কে তার সাথে ব্যবসায় অংশ গ্রহণ করার জন্য এক চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। এরপর তিনি চুক্তি অনুযায়ী খাদীজা (রাঃ) এর ক্রীতদাস মায়সারাকে সাথে নিয়ে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বারের মতো শাম তথা সিরিয়া গমন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। অতঃপর তিনি ফিরে এসে খাদীজা (রাঃ)-কে মূলধনসহ এত বেশি পরিমাণ অর্থ ফেরত দেন যে, ইতিপূর্বে খাদীজা (রাঃ) এত অর্থ আর কখনো পাননি। এতে খাদীজা (রাঃ) তাঁর উপর অনেক খুশি হয়ে গেলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে খাদীজা (রাঃ) এর বিবাহ
খাদীজা (রাঃ) ছিলেন মক্কার ধনাঢ্য মহিলাদের মধ্যে একজন। রাসূলুল্লাহ যখন একটি সফল ব্যবসায়িক অভিযান শেষে ফিরে আসলেন এবং তাঁর ক্রীতদাস মায়সারার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত মন-মানসিকতা, আমানতরক্ষায় আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার মনোবাসনা তার মধ্যে জাগতে থাকে। তিনি বিষয়টি নিয়ে বান্ধবী 'নাফীসা বিনতে মুনাব্বিহ' এর সাথে আলোচনা করলেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর সাথে আলোচনা করার অনুরোধ জানালেন। ফলে বান্ধবী নাফীসা খাদীজা (রাঃ) এর প্রস্তাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে অবহিত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ এ প্রস্তাবটি সম্পর্কে চাচা আবু তালিবের সাথে আলোচনা করলেন। আবু তালিব এ ব্যাপারে খাদীজা (রাঃ) এর অভিভাকের সাথে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। তারা একটি দিন নির্ধারণ করে তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদীজা (রাঃ) এর বয়স ছিল ৪০ বছর।
রাসূলুল্লাহ এর এটিই ছিল প্রথম বিবাহ। অপর পক্ষে খাদীজা (রাঃ) এর ছিল তৃতীয় বিবাহ। প্রথমে আবু হালা ইবনে যাররাহ আত-তামীমীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অতঃপর সে মৃত্যুবরণ করলে আতীক বিন আবিদ আল মাখযুমীর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ খাদীজা (রাঃ) এর জীবদ্দশায় অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। ইবরাহীম ব্যতীত রাসূলুল্লাহ এর অন্যান্য সকল সন্তানই খাদীজা (রাঃ) এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের প্রথম সন্তানের নাম ছিল কাসেম, যার কারণে রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর উপনাম হয়েছিল আবুল কাসেম অর্থাৎ কাসেমের পিতা। এরপর জন্মগ্রহণ করেন যথাক্রমে যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ এর উপাধি ছিল তাইয়েব এবং তাহের। রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর সকল পুত্রসন্তান বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাতিমা (রাঃ) ব্যতীত অন্যান্য সকল কন্যা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন। ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর মৃত্যুর ৬ মাস পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।