📄 ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবের ধর্মীয় অবস্থা
আরবের লোকেরা মূলত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) এর অনুসারী ছিল। ইসমাঈল (আঃ) এর দাওয়াত প্রচারের কারণেই তারা ইবরাহীম (আঃ) এর প্রচারিত দ্বীনের অনুসারী হয়ে উঠে এবং সেটাকেই যুগ যুগ ধরে ধরে রাখে। কিন্তু কালের আবর্তে পৃথিবীর অন্যান্য ভ্রান্ত জাতির মতো এক সময় তারা এ বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। একপর্যায়ে তারা আল্লাহর একত্ববাদ বাদ দিয়ে ওসীলা গ্রহণের অজুহাতে মূর্তিপূজা করতে থাকে। তারা মনে করতে থাকে যে, এসব মূর্তির পূজা করার মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হয়।
মূর্তিপূজার প্রতি বিশ্বাস : যখন আরবের প্রায় সর্বত্রই ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীন বিলুপ্তির পথে, তখনই মূর্তিপূজার প্রচলন শুরু হয়। আর এর প্রচলন করে আমর ইবনে লুহাই। ইবরাহীম (আঃ) এর সামান্য কিছু নিয়মনীতি সমাজের মাঝে তখনো প্রচলিত ছিল। এসব নিয়মনীতির প্রতি আমর ইবনে লুহাই এর বেশ অনুরাগ থাকায় লোকেরা তাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করত এবং তার কথা মেনে নিত। একদা সে শাম দেশে ভ্রমণে গিয়ে 'হুবল' নামক একটি মূর্তি নিয়ে আসে। অতঃপর সে এটি কাবাঘরে স্থাপন করে এর পূজা করতে শুরু করে এবং মক্কাবাসীদেরকেও পূজা করার জন্য আহ্বান জানায়। ফলে মক্কাবাসীরা তার ডাকে সাড়া দেয়; এমনকি হেজাজবাসীরাও এতে উৎসাহী হয়ে উঠে। এবার আমর ইবনে লুহাই এর দেখাদেখি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মূর্তির পূজা শুরু হয়। যেমন- লাত, মানাত, উযযা, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাসর ইত্যাদি। আরবরা এগুলোর আকৃতিতে ছোট-বড় অনেক মূর্তি তৈরি করে নিজেদের ঘরে ঘরে রাখতে শুরু করে- এমনকি সেগুলোকে কাবা ঘরেও স্থাপন করতে থাকে। আর এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে মূর্তিপূজার প্রচলন। রাসূলুল্লাহ যখন মক্কা বিজয় করে কাবাঘরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সেখানে ৩৬০টি মূর্তি পেয়েছিলেন। তারপর তিনি সেগুলো স্বীয় লাঠি দিয়ে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলেন।
মূর্তিপূজাকে কেন্দ্র করে আরবদের মধ্যে অনেক ধরনের শিরক প্রচলিত ছিল। যেমন-
১. আরবরা তাদের সকল ধরনের প্রয়োজন ও বিপদাপদের সময় এসব মূর্তির কাছেই প্রার্থনা করত। এতে তারা মনে করত যে, মূর্তিরূপী এসব দেব-দেবী তাদের প্রার্থনা কবুল করার জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে সুপারিশ করবে। ফলে তাদের প্রার্থনা গ্রহণযোগ্য হবে।
২. তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে হজ্জ পালন, মূর্তিকে তাওয়াফ এবং সিজদা করত।
৩. তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে প্রাণী বলি দিত এবং যেকোন পশু যবেহ করার সময় মূর্তির নাম নিয়ে যবেহ করত।
৪. তারা মূর্তিদের নামে উৎসর্গ করত এবং তাদের নামেই মানত করত।
গণক ও তীরের প্রতি বিশ্বাস : কুরআন মাজীদে গণক এবং তীরের প্রতি বিশ্বাস করাকে আযলাম নামে অভিহিত করা হয়েছে। আযলাম হচ্ছে যালামুন শব্দের বহুবচন। আর যালাম বলা হয় এমন তীরকে, যার উপর পালক লাগানো থাকে না। আরবরা এসব তীর দ্বারা তাদের ভাগ্য গণনা করত এবং যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও এসব তীরের দারস্থ হতো। বিশেষ করে কোন স্থানে ভ্রমণ করা, কাউকে বিবাহ করা, কোন ব্যবসা শুরু করা, নেতৃত্ব নির্ধারণ করা, কারো ব্যাপারে সন্দেহ দূর করা ইত্যাদি কর্যাবলি সম্পাদনের ব্যাপারে এগুলো ব্যবহার করত।
জুয়ার প্রচলন : আরবদের প্রায় কার্যক্রমেই জুয়ার প্রচলন ছিল। যেমন- ক্রয়-বিক্রয় করা, মূল্য নির্ধারণ করা, পশু যবেহ করা ও মাংস বণ্টন করা ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করত। যেমন- কোন কিছু নিক্ষেপ করা, নির্দিষ্ট চিহ্নের তীর বের করা ইত্যাদি।
কোন নির্ধারিত খেলার নাম জুয়া নয়। যেসব খেলায় আর্থিক লাভ-লোকসানের ব্যবস্থা রয়েছে সেটাই জুয়া, যাকে ইসলামে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কেননা এটা জয়ী-পরাজয়ীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনে। কাজেই জুয়া যেমন অর্থোপার্জনের জন্য খেলা হারাম তেমনি বিনোদনের জন্যও খেলা হারাম।
যাদুর প্রতি বিশ্বাস : পূর্বযুগের ধারাবাহিকতায় আরবে আইয়ামে জাহেলিয়াতেও যাদুবিদ্যার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তারা যাদুকরদেরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করত, তাদের কথাবার্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত। অনেক সময় তারা নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য যাদুর আশ্রয় গ্রহণ করত। এতে যাদের উপর যাদু করা হতো তাদের অনেকেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
জ্যোতিষীদের প্রতি বিশ্বাস:
আরবরা জ্যোতিষীদেরকে বিশ্বাস করত। যে কোন কাজকর্মে তারা জ্যোতিষীদের পরামর্শ মেনে চলত। জ্যোতিষীরা আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি, উদয়-অস্ত, আগমন-প্রত্যাগমন ইত্যাদি লক্ষ্য করে ভবিষ্যতের আবহাওয়া কিংবা ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন কোন ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা সম্পর্কে পূর্বাভাষ প্রদান করত। আবার কোন কোন জ্যোতিষী এসব সম্পাদনের জন্য জিনদেরকে ব্যবহার করত।
কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস :
আরবের লোকেরা নানা ধরনের কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত। তাদের এসব কুসংস্কারের কোন শেষ ছিল না। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো- সপ্তাহের কোন কোন দিনকে তারা অশুভ মনে করত। দিন বা রাতের কোন কোন সময়কে অশুভ মনে করত। কোন কোন বাড়িঘর অথবা স্থানকে তারা অশুভ মনে করত। কিছু কিছু লোকের চেহারা দেখাকে অশুভ মনে করত। হত্যাকৃত লোকের আত্মা প্রতিশোধ গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত আশেপাশে ঘুরাফেরা করে বলে মনে করত। কিছু কিছু পশুর গোশত পুরুষদের জন্য আবার কিছু কিছু পশুর গোশত নারীদের জন্য আবার কিছু কিছু পশুর গোশত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট করে নিত।
ইয়াহুদি ধর্ম:
সে সময় ইয়াহুদিদের অবস্থা ছিল আরো করুণ। তারা তাদের মূল ধর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। তারা নিজেদের মতামতকে আল্লাহর বাণী বলে চালিয়ে দিত। তারা অনেক হালালকে হারাম বলে চালিয়ে দিত। বিভিন্ন অসৎ ও অনৈতিক কার্যাবলিকে বৈধ মনে করত। তারা আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া নিয়মানুযায়ী জীবন পরিচালনা করত। এমনকি তারা নিজেদের জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা প্রদান করত। ফলে তারা যত অপরাধই করত সেগুলোকে কোন অপরাধই মনে করত না। আর এসব কাজে তাদের আলেমরাই বেশি ভূমিকা পালন করত। তাদের আলেমরা যা-ই বলত তারা তা-ই বিশ্বাস করত। এভাবে তারা তাদের আলেমদেরকে আল্লাহর আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
খ্রিস্টান ধর্ম :
সে সময় খ্রিস্টানরাও ছিল নানা ধরনের সত্যবিবর্জিত শিরক ও পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত। তারা আল্লাহর একত্ববাদের পরিবর্তে ত্রিত্ববাদের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। তারা আল্লাহর সাথে শিরক করত। ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর স্ত্রী মনে করত (নাউযুবিল্লাহ)। তবে এ ধর্ম তখনকার আরবে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি।
এছাড়াও অবশিষ্ট আরবদের ধর্মীয় অবস্থা মুশরিকদের মতোই ছিল। কারণ তাদের অন্তঃকরণ একই ছিল। বিশ্বাসসমূহে পরস্পরের সাদৃশ্য ছিল এবং রীতি-নীতিতেও সামঞ্জস্য ছিল।
টিকাঃ
২৯ সূরা ইউনুস- ১৮।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম ও বংশ
রাসূলুল্লাহ ছিলেন ইবরাহীম (আঃ) এর পুত্র ইসমাঈল (আঃ) এর বংশধর। ইবরাহীম (আঃ) এর দু'জন পুত্র ছিল। একজন হলেন ইসহাক (আঃ) এবং অপরজন হলেন ইসমাঈল (আঃ)। ইসহাক (আঃ) এর বংশে অনেক নবীর আগমন হলেও ইসমাঈল (আঃ) এর বংশে কেবল শেষ নবী মুহাম্মাদ এর আগমন হয়েছিল। তিনি মক্কার বিখ্যাত বনু হাশেম গোত্রে ৯ রবিউল আউয়াল সোমবার দিবাগত রাতে সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজি পঞ্জীকা অনুযায়ী তারিখটি ছিল ২০/২২ এপ্রিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম ছিল আমিনা এবং তাঁর দাদার নাম ছিল আবদুল মুত্তালিব। তাঁর জন্মের পরপরই মাতা আমিনা আবদুল মুত্তালিবের নিকট এ সুসংবাদটি প্রদান করেন। তখন তিনি খুবই আনন্দের সাথে তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে কাবাঘরে চলে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। অতঃপর তিনি তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মাদ। ইতিপূর্বে আরবের মধ্যে এ নামে আর কারও নামকরণ করা হয়নি।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পূর্ণ বংশ পরিচয়
রাসূলুল্লাহ এর পূর্ণ বংশ পরিচয়টি হলো : মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব (শায়বা) বিন হাশেম (আমর) বিন আবদে মানাফ (মুগীরাহ) বিন কুসাই (যায়েদ) বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কা'ব বিন লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তার উপাধি ছিল কুরাইশ এবং উক্ত সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালেক বিন নাযর (কায়েস) বিন কেনানা বিন খুযায়মা বিন মুদরেকা (আমের) বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মা'দ বিন আদনান বিন আদ বিন হামিসায়া বিন সালমান বিন আউস বিন বুয বিন কামওয়াল বিন উবাই বিন আওয়াম বিন নাশিদ বিন হেযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন তারিখ বিন জাহিম বিন নাহিস বিন মাখী বিন আইস বিন আবকার বিন উবাইদ বিন আদদোয়া বিন হামদান বিন সুনবর বিন ইয়াসরাবী বিন ইয়াহযুন বিন ইয়ালহান বিন আরআওয়া বিন আইয বিন যীশান বিন আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুকশির বিন নাহিস বিন যারেহ বিন সুমাই বিন মুযী বিন অওয়াহ বিন এরাম বিন কাইদার বিন ইসমাঈল (আঃ) বিন ইবরাহীম (আঃ) বিন তাবেহ (আযর) বিন নাহুর বিন সারুহ (অথবা সারুগ) বিন রাউ বিন ফালেখ বিন আবের বিন শালেখ বিন আরফাখশাদ বিন শাম বিন নূহ (আঃ) বিন লামেক বিন মাতুশলখ বিন আখনুখ (কথিত আছে যে, এই নাম ছিল ইদরীস (আঃ) এর} বিন ইয়াদ বিন মহালায়েল বিন কায়নান বিন আনুশ বিন শীশ বিন আদম (আঃ)।
টিকাঃ
৩২ সহীহ বুখারী, 'সাহাবীদের মার্যাদা' অধ্যায় ৫৭ নং অনুচ্ছেদ 'নবী এর আগমন'।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর লালন পালন
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের কিছুদিন পূর্বে তাঁর পিতা মারা যান। সুতরাং তিনি জন্মগ্রহণের পর থেকেই ইয়াতীম অবস্থায় লালিত পালিত হন। তাঁর জন্ম গ্রহণের পর সর্বপ্রথম তাঁকে দুধ পান করান মাতা আমিনা, তারপর আবু লাহাবের দাসী সুওয়ায়বা।
তারপর তখনকার আরবদের নিয়ম অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ-কে সুস্থ-সবল ও সুস্পষ্টভাষী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দাদা আবদুল মুত্তালিব ধাত্রী মা হালিমা বিনতে যুবায়েরের নিকট সমর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ শিশুকালে সেখানেই লালিত পালিত হতে থাকেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর লালন পালন করার জন্য চুক্তির দুই বছর পূর্ণ হয়ে যায়, তখন হালিমা বিনতে যুবায়ের রাসূলুল্লাহ-কে মাতা আমিনার কাছে ফেরত দিতে যান। তখন হালিমা শিশু মুহাম্মাদ-কে আরো কিছুদিন নিজেদের কাছে রাখার জন্য আবেদন করেন। এতে মাতা আমিনা রাজি হয়ে যান। ফলে মা হালিমা শিশু মুহাম্মাদ-কে ফেরত না দিয়ে আরো কিছুদিন নিজের কাছে রাখার জন্য সাথে করে নিয়ে আসেন।
টিকাঃ
** আর রাহীকুল মাখতুম, পৃঃ ৮৮।