📄 নবী ﷺ-কে যাদুকর বলে দোষারোপ করা
নবী ﷺ এর বিরোধীরা নবী ﷺ এর প্রতি যত ধরনের অপবাদ ও দোষারোপ করেছিল তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে, তারা তাঁকে যাদুকর বলে আখ্যায়িত করেছিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, كَذلِكَ مَا أَتَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُونٌ - أَتَوَاصَوْا بِهِ * بَلْ هُمْ قَوْمٌ طَاغُونَ﴾
এভাবে, তাদের পূর্ববর্তীদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছেন তখনই তারা বলেছে, তুমি তো এক যাদুকর অথবা উন্মাদ। তারা কি একে অপরকে এই উপদেশই দিয়ে এসেছে? বস্তুত তারা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। (সূরা যারিয়াত- ৫২, ৫৩)
📄 কাফির-মুশরিকরা নবী ﷺ এর বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র করেছিল
বর্তমান যুগের কাফির-মুশরিকরা এবং কাফির-মুশরিকদের আদর্শ বাস্তবায়নকারী নামধারী মুসলিমরা যেভাবে ইসলামের বিধানকে লঙ্ঘন করে যাচ্ছে এবং মুসলিমদের উপর যুলুম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, অনুরূপভাবে মক্কার কাফিররাও নবী এর বিরোধিতা করেছে এবং মুসলিমদের উপর নানা ধরনের যুলুম নির্যাতন চালিয়েছে। আর এসব ছিল তাদের কুফরী ও মুনাফিকী আচরণের কারণে। তাদের খারাপ আচরণের দিকগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে আলোচনা করেছেন। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছু আলোচনা তুলে ধরা হলো;
১. তারা আল্লাহর নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত:
وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ ﴾ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলো প্রত্যক্ষ করে, কিন্তু তারা এগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সূরা ইউসুফ- ১০৫)
وَمَا تَأْتِيهِمْ مِنْ آيَةٍ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ ) তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলির যে কোন নিদর্শনই তাদের কাছে আসে, তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সূরা ইয়াসীন- ৪৫, ৪৬)
২. তারা গোপনে শলা-পরামর্শ করত: الَّذِينَ ظَلَمُوا هَلْ هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُوْنَ) যারা যালিম তারা গোপনে পরামর্শ করে যে, এ তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে যাদুর কবলে পড়বে? (সূরা আম্বিয়া- ৩)
৩. নবী -কে কুরআন থেকে দূরে রাখতে চাইত : وَإِنْ كادُوا لَيَفْتِنُوْنَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غَيْرَهُ وَإِذًا لَّا تَّخَذُوكَ خَلِيْلًا - وَلَوْلَا أَنْ ثَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدْتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا ) আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি, তারা তা হতে পদস্খলন ঘটানোর চেষ্টা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল, যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার বিপরীত মিথ্যা উদ্ভাবন কর। (এতে যদি তারা সফল হতো) তবে তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করত। আমি তোমাকে অবিচল না রাখলে তুমি তাদের দিকে প্রায় ঝুঁকে পড়তে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৩, ৭৪)
৪. কুরআন শুনলে পাশ কাটিয়ে চলে যেত : وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا وَلَّى مُسْتَكْبِرًا كَأَنْ لَّمْ يَسْمَعْهَا كَأَنْ فِي أُذُنَيْهِ وَقْرًا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ যখন তার কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন সে অহংকারবশত এমনভাবে ফিরে যায়, যেন সে কিছুই শুনতে পায়নি; যেন তার কর্ণদ্বয়ের মধ্যে ছিপি রয়েছে। অতএব তাকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। (সূরা লুকুমান- ৭)
৫. তারা বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করতে চাইত না : وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তোমরা তার আনুগত্য করো; তখন তারা বলে, বরং আমরা তো তার আনুগত্য করব, যার উপর আমাদের বাপ-দাদাদেরকে পেয়েছি। যদিও শয়তান তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে আহ্বান করতে থাকে তবুও কি (তারা তাদের অনুসরণ করবে)? (সূরা লুকমান- ২১)
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বর্তমান সময়ে অনেক নামধারী মুসলিমদের মধ্যেও এসব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে।
৬. ইসলামের শত্রুরা মানুষের মধ্যে কুধারণা সৃষ্টি করত:
وَأَسَرُّوا النَّجْوَى الَّذِيْنَ ظَلَمُوا هَلْ هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ)
যালিমরা গোপনে পরামর্শ করে (বলে), সে তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ; তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে যাদুর কবলে পড়বে? (সূরা আম্বিয়া- ৩) নবী সম্পর্কে বিরোধীরা নানা ধরনের কথা বলত। কখনো বলত, এ ব্যক্তি যাদুকর। কখনো বলত, সে নিজেই কিছু বাণী রচনা করে বলছে- এটা আল্লাহর বাণী। কখনো বলত, কিছু কাব্যিক ছন্দকে সে আল্লাহর বাণী নাম দিয়েছে। কখনো বলত, এগুলো আবার এমন কি বাণী! এগুলো তো পাগলের প্রলাপ এবং অহেতুক চিন্তা ধারার একটা আবর্জনার স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলত এসব সমালোচনার উদ্দেশ্যই ছিল লোকদেরকে প্রতারিত করা। ফলে তারা কোন একটি কথার উপর অবিচল থেকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। কিন্তু মিথ্যা প্রচারণার ফল যা হলো তা হচ্ছে, তারা নিজেরাই নবী এর নাম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিল। মুসলিমদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় যে প্রচার ও পরিচিতি হওয়া সম্ভব ছিল না, কুরাইশদের এ বিরোধিতার ফলে অল্প কিছু সময়েই তা হয়ে গেল। প্রত্যেক ব্যক্তির মনে একটি প্রশ্ন জাগল, যার বিরুদ্ধে এতো মারাত্মক অভিযোগ, কে সেই ব্যক্তি? অনেকে ভাবল, তার কথা তো শোনা উচিত। আমরা তো আর দুধের শিশু নই যে, অযথা তার কথায় পথভ্রষ্ট হয়ে যাব। তুফাইল ইবনে আমর বলেন, আমি দাওস গোত্রের একজন কবি ছিলাম। একদা কোন কাজে মক্কায় গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছতেই কুরাইশদের কয়েকজন লোক আমাকে ঘিরে ফেলল এবং নবী এর বিরুদ্ধে আমাকে অনেক কথা বলল। ফলে তাঁর সম্পর্কে আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মাল। আমি ভাবলাম, তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকব। পরদিন আমি দেখলাম তিনি কা'বাগৃহের কাছে নামায পড়ছেন। তাঁর মুখ নিঃসৃত কয়েকটি বাক্য আমার কানে আসলে আমি অনুভব করলাম, বড় চমৎকার বাণী। মনে মনে বললাম- আমি কবি, যুবক ও বুদ্ধিমান। আমি কোন শিশু নই যে, ঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব না। তাহলে এ ব্যক্তি কী বলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করি না কেন? অতঃপর নবী যখন নামায শেষ করে চলে যেতে লাগলেন তখন আমি তাঁর পিছু নিলাম। তাঁর গৃহে পৌঁছে তাঁকে বললাম, আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে এসব কথা বলেছিল, ফলে আমি আপনার ব্যাপারে এতই খারাপ ধারণা করেছিলাম যে, নিজের কানে তুলা দিয়েছিলাম, যাতে আপনার কথা শুনতে না পাই। কিন্তু একটু আগে যে কয়েকটি বাক্য আমি আপনার মুখ থেকে শুনেছি তা আমার কাছে বড়ই চমৎকার মনে হয়েছে। আপনি কী বলেন, আমাকে একটু বিস্তারিত জানান। জবাবে নবী আমাকে কুরআনের একটি অংশ শোনালেন। তাতে আমি এত বেশি প্রভাবিত হলাম যে, তখনই ইসলাম গ্রহণ করে ফেললাম। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে আমি নিজের পিতা ও স্ত্রীকে মুসলিম বানালাম। এরপর নিজের গোত্রের মধ্যে অবিরাম ইসলাম প্রচারের কাজ করতে লাগলাম। এমনকি খন্দকের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত আমার গোত্রের সত্তর/আশিটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে ফেলল।
৭. কুরআন প্রচারের সময় গোলমাল সৃষ্টি করত: কাফিররা যেসব পরিকল্পনার মাধ্যমে নবী এর প্রচারকে ব্যর্থ করে দিতে চাচ্ছিল, এটি ছিল তার অন্যতম। তারা মনে করত, এরকম উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মুখ থেকে এমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে এই নজিরবিহীন বাণী যে-ই শুনবে সে-ই ঘায়েল হয়ে যাবে। অতএব তারা পরিকল্পনা করল যে, তারা এ বাণী নিজেরাও শুনবে না এবং অন্য কাউকে শুনতেও দেবে না। মুহাম্মাদ যখনই তা শোনাতে আরম্ভ করবেন, তখনই তারা হৈ চৈ শুরু করে দেবে। তালি বাজাবে, বিদ্রূপ করবে এবং চিৎকার জুড়ে দেবে। তারা আশা করত, এ কৌশল অবলম্বন করে তারা আল্লাহর নবীকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيْهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ﴾ কাফিররা বলে, তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না; বরং তা তিলাওয়াতকালে শোরগোল সৃষ্টি করো, যাতে তোমরা জয়ী হতে পার। (সূরা সাজদা- ২৬)
৮. গান-বাজনার আসর বসিয়ে মানুষকে ব্যস্ত রাখত : কাফিরদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যখন এ দাওয়াত সম্প্রসারিত হয়েই চলছিল তখন নযর ইবনে হারিস কুরাইশ নেতাদেরকে বলল, তোমরা যেভাবে এ ব্যক্তির মোকাবেলা করছ, তাতে কোন কাজ হবে না। নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে সে ছিল তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত লোক। এখন তোমরা বলছ, সে যাদুকর ও পাগল। এ কথা কে বিশ্বাস করবে? থামো, এ রোগের চিকিৎসা আমিই করব। এরপর সে মক্কা থেকে ইয়ামেন চলে যায়। সেখান থেকে অনারব বাদশাহদের কিসসা-কাহিনী সংগ্রহ করে মক্কায় ফিরে এসে গল্পের আসর জমিয়ে তুলতে লাগল। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, এভাবে লোকেরা কুরআনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং এসব কাহিনীর মধ্যে ডুবে যাবে। এভাবে তারা জনগণকে খেল-তামাশা ও নাচগানে মশগুল করতে থাকে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে লোকদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞতাবশত অমূলক কাহিনী ক্রয় করে নেয় এবং আল্লাহর দেখানো পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বস্তু বানিয়ে নেয়। এদের জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (সূরা লুকুমান- ৬)
لَهُوَ الْحَدِيثِ 'লাহওয়াল হাদীস' এমন কথা, যা মানুষকে অন্য সবকিছু থেকে গাফিল করে দেয়। এ শব্দটি খারাপ ও অর্থহীন কথা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- কিসসা-কাহিনী, হাসি-ঠাট্টা এবং গান-বাজনা ইত্যাদি। 'লাহওয়াল হাদীস' কিনে নেয়ার অর্থ হলো, ঐ ব্যক্তি সত্য কথাকে বাদ দিয়ে মিথ্যা কথা গ্রহণ করে এবং সঠিক পথনির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এমন কথার প্রতি আগ্রহী হয়, যার মধ্যে দুনিয়াতেও কোন মঙ্গল নেই এবং আখিরাতেও নেই। এর প্রকৃত অর্থ এই যে, মানুষ তার নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে কোন বাজে জিনিস ক্রয় করে। লোকেরা এসব সাংস্কৃতিক অপতৎপরতায় ডুবে গিয়ে আল্লাহ, আখিরাত ও নৈতিক চরিত্রের কথা শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর পরিণামে আল্লাহ তাকে কঠিন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি দান করবেন ।
৯. নবী-কে নামায পড়তেও বাধা দিত : মুসলিমদের প্রধান ইবাদাত হচ্ছে নামায। কাফির-মুশরিকরা এটাকে কোনভাবে সহ্য করতে পারত না। ফলে মক্কার কাফির-মুশরিকরা নবী-কে নামায পড়তে দেখলে বাধা প্রদান করার চেষ্টা করত ।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আবু জাহেল বলেছিল, আমি যদি মুহাম্মাদকে কাবার পাশে সালাত আদায় করতে দেখি তবে অবশ্যই আমি তার ঘাড় পদদলিত করব। এ কথা জানতে পেরে নবী বললেন, সে যদি এমনটি করে তাহলে ফেরেশতারা অবশ্যই তাকে পাকড়াও করবে। এ প্রসঙ্গে আয়াত নাযিল হয়,
أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهُى - عَبْدًا إِذَا صَلَّى - أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ عَلَى الْهُدَى - أَوْ أَمَرَ بِالتَّقْوَى
তুমি কি এমন এক বান্দাকে দেখেছ, যখন সে নামায পড়ে তখন তারা (কাফিররা) তাকে নিষেধ করে? তুমি কি এটাও লক্ষ্য করেছ যে, যদি সে সৎপথে থাকে অথবা আল্লাহভীতি শিক্ষা দেয় তখনও (তাকে নিষেধ করে?) (সূরা আলাক্ব, ৯-১২)
১০. নবী এর উপর যাদু করেছে : হুদায়বিয়া সন্ধির পর মহানবী যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন ৭ম হিজরীর মুহাররম মাসে খায়বার হতে একদল ইয়াহুদি মদিনায় আগমন করে বিখ্যাত যাদুকর লাবীদের সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা বলল, আমরা মুহাম্মাদকে ধ্বংস করার জন্য বহুবার যাদু করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু তাতে সফল হতে পারিনি। আমরা তোমাকে তিনটি আশরাফি (স্বর্ণমুদ্রা) দিচ্ছি, তুমি তার ওপর খুব শক্ত আকারের যাদু করো। এ সময় এক ইয়াহুদি ছেলে নবী এর খাদিম ছিল। তারা তার সাথে যোগাযোগ করে নবী এর চিরুনির একটি অংশ সংগ্রহ করে নিল, যার সাথে নবী এর চুলও লাগানো ছিল। লাবীদ বা অন্য বর্ণনায় তার যাদুকর বোন এ চিরুনি ও চুলের সঙ্গে এগারটি গিরা বিশিষ্ট এক গাছি সূতা ও সূঁচ বিশিষ্ট একটি মোমের পুতুলিসহ খেজুর গাছের ছড়ার আবরণে রেখে 'যারওয়ান' কূপের নিচে একটি পাথরের তলায় চাপা দিয়ে রেখেছিল। নবী এর উপর এ যাদুর প্রভাব পড়ল, তিনি শারীরিক দিক দিয়ে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, নবী এর এ অসুস্থতা ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। অবশেষে নবী আয়েশা (রাঃ) এর ঘরে অবস্থান করে আল্লাহর দরবারে পর পর কয়েকবার দু'আ করলেন। এক সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। জেগে উঠে আয়েশা (রাঃ)-কে বললেন, আমি আল্লাহর কাছে যা জানতে চেয়েছিলাম তা তিনি আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কী? নবী বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম- দু'জন ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে একজন আমার মাথার দিকে ও অপরজন পায়ের দিকে বসলেন। (তারা পরস্পর কথোপকথন করছিলেন এভাবে যে-)
প্রথমজন : এর কী হয়েছে?
দ্বিতীয়জন : তাঁর ওপর যাদু করা হয়েছে।
প্রথমজন : কে যাদু করেছে?
দ্বিতীয়জন : লাবীদ।
প্রথমজন : কিসে যাদু করেছে?
দ্বিতীয়জন : চিরুনি ও চুলে একটি পুরুষ খেজুর গাছের আবরণের মধ্যে।
প্রথমজন: সেটি এখন কোথায় আছে?
দ্বিতীয়জন : যারওয়ান কূপের তলায় পাথরের নিচে।
প্রথমজন : এখন কী করা যায়?
দ্বিতীয়জন: পানি শুকিয়ে তা বের করতে হবে।
অতঃপর নবী কয়েকজন সাহাবীকে সাথে নিয়ে কূপের কাছে গেলেন এবং পানি শুকিয়ে জিনিসটা বের করলেন। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে নবী -কে বললেন, আপনি ফালাক ও নাস সূরা দুটি পড়ুন। নবী একটি করে আয়াত পড়তে লাগলেন- এতে একেকটি গিরা খুলতে লাগল, এভাবে যখন তিনি এগারটি আয়াত পড়া শেষ করলেন তখন এগারটি গিরা একটি একটি করে খুলে গেল এবং সকল সূঁচ পুতলি হতে বের হয়ে গেল।
এবার নবী এর শরীরে শক্তি ফিরে আসল এবং তিনি সুস্থ হয়ে গেলেন। নবী লাবীদকে ডেকে এনে কৈফিয়ত চাইলে সে তার দোষ স্বীকার করে নিল। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। কারণ ব্যক্তিগত কারণে তিনি কখনো কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতেন না। কোন কোন সাহাবী আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এ খবীসকে হত্যা করব না কেন? তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে রোগমুক্ত করে দিয়েছেন- আমি কারো কষ্টের কারণ হতে চাই না।
১১. নবী -কে দাওয়াত দিয়ে এনে হত্যা করতে চেয়েছে: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা ইয়াহুদিদের একটি দল নবী ও তাঁর বিশেষ বিশেষ সাহাবীদেরকে একটি ভোজে আমন্ত্রণ করেছিল। সাথে সাথে তারা গোপনে এ চক্রান্তও করেছিল যে, নবী ও সাহাবীগণ এসে গেলে একযোগে তাদের ওপর আকস্মিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে শেষ করে দেবে এবং এভাবে তারা ইসলামের মূলোৎপাটনে সক্ষম হবে। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে সঠিক সময়ে নবী এ ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ﴾ হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হাত উত্তোলন করতে চেয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদের হাত তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত করে দিলেন। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর মুমিনদের তো আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত। (সূরা মায়েদা- ১১)
১২. নবী -কে গ্রেফতার ও হত্যা করার চেষ্টা করেছে: যখন কুরাইশদের এ আশঙ্কা নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল যে, মুহাম্মাদ মদিনায় চলে যাবেন। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে, এ ব্যক্তি মক্কা থেকে বের হয়ে গেলে আরো বিপদ। কেননা সে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কাজেই তারা তাঁর ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য দারুন নাদওয়ায় জাতীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে একটি সভা ডাকল। কীভাবে এ বিপদের পথ রোধ করা যায়, এ ব্যাপারে তারা পরামর্শ করল।
এক দলের মত ছিল, এ ব্যক্তির হাতে ও পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে এক জায়গায় বন্দী করে রাখা হোক। মৃত্যুর পূর্বে আর তাকে মুক্তি দেয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ মত গৃহীত হলো না। কারণ তারা বলল, আমরা তাকে বন্দী করে রাখলেও তার যেসব সাথি কারাগারের বাইরে থাকবে, তারা কাজ করে যেতে থাকবে এবং সামান্য একটু শক্তি অর্জন করতে পারলেই তাকে মুক্ত করার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না।
দ্বিতীয় দলের মত ছিল, একে আমাদের এখান থেকে বের করে দাও। তারপর যখন সে আমাদের মধ্যে থাকবে না তখন সে কোথায় থাকে ও কী করে- তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ মতটিও গৃহিত হলো না। তারা বলল, এ ব্যক্তি হচ্ছে কথার যাদুকর। কথার মাধ্যমে মানুষের মন গলিয়ে ফেলার ব্যাপারে তার জুড়ি নেই। সে এখান থেকে বের হয়ে গিয়ে আরবের অন্যান্য গোত্রকে নিজের অনুসারী বানিয়ে ফেলতে পারে। তারপর প্রচুর পরিমাণ ক্ষমতা অর্জন করে আরবের কেন্দ্রস্থলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তোমাদের ওপর আক্রমণ করে বসবে।
সবশেষে আবু জাহেল মত প্রকাশ করল যে, আমাদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে উচ্চ বংশীয় তরবারি চালনায় পারদর্শী যুবক বাছাই করে নিতে হবে। তারা সবাই মিলে একই সঙ্গে মুহাম্মাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং তাকে হত্যা করবে। এভাবে মুহাম্মাদকে হত্যা করার দায়িত্বটি সকল গোত্রের ওপর ভাগাভাগি হয়ে যাবে। আর সবার সঙ্গে লড়াই করা বনু আবদে মানাফের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। কাজেই বাধ্য হয়ে তারা রক্তমূল্য গ্রহণ করতে রাজী হয়ে যাবে।
অবশেষে এ মতটি সবাই পছন্দ করল। অতঃপর হত্যা করার জন্য লোকদের নাম নির্ধারিত হলো। হত্যা করার সময়ও নির্ধারিত হলো। এমনকি যে রাতটি হত্যার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে রাতে ঠিক সময়ে হত্যাকারীরাও যথাস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই নবী বের হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আলী (রাঃ)-কে নিজের বিছানায় শুইয়ে আবু বকর (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে "সাওর” নামক গুহায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর মদিনায় চলে যান। ফলে একেবারে শেষ সময় তাদের পরিকল্পিত কৌশল বানচাল হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَاِذْ يَّمْكُرُ بِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِيُثْبِتُوْكَ اَوْ يَقْتُلُوْكَ اَوْ يُخْرِجُوْكَ وَيَمْكُرُوْنَ وَيَمْكُرُ اللّٰهُ * وَاللّٰهُ خَيْرُ الْمَاكِرِيْنَ স্মরণ করো, যখন কাফিররা তোমাকে বন্দী করা বা হত্যা করা অথবা নির্বাসিত করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। আর তারা ষড়যন্ত্র করে, অপরদিকে আল্লাহও ষড়যন্ত্র করেন; কিন্তু আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ ষড়যন্ত্রকারী।
(সূরা আনফাল- ৩০)
১৪. তারা নবী-কে দেশ হতে বিতাড়িত করেছে : বিরোধীরা নবী-কে নিজের জন্মভূমি থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করল। এরপর আট বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হতে না হতেই তিনি বিজয়ীর বেশে জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করলেন। তারপর দু'বছরের মধ্যেই সমগ্র আরব ভূখণ্ডকে মুশরিক শূন্য করলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِنْ كادُوا لَيَسْتَفِزُوْنَكَ مِنَ الْأَرْضِ لِيُخْرِجُوكَ مِنْهَا وَإِذًا لَّا يَلْبَثُونَ خِلَا فَكَ إِلَّا قَلِيلًا
তারা তোমাকে দেশ হতে উৎখাত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করেছিল, যাতে তারা তোমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারে। (আর যদি তারা তোমাকে বহিষ্কার করেই ফেলত) তাহলে তোমার পর তারাও সেখানে অল্পকাল টিকে থাকতে পারত। অর্থাৎ তোমাকে বহিষ্কার করলে তারাও ধ্বংস হয়ে যেত। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৬)
টিকাঃ
২২ সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, ২২-২৪ পৃঃ।
২০ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, ৩২০-৩২১ পৃঃ
২৪ সহীহ বুখারী, হা/৫৭৬৫; মুসনাদে হুমাইদী, হা/২৫৯; ইবনে কাসীর, খণ্ড- ৮; পৃঃ- ৫৩৯।
📄 নবীকে নিয়ে ব্যঙ্গকারীরা কাফির ও মুরতাদ
বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কতক বিবেকহীন নাস্তিক আল্লাহর নবী সম্পর্কে এতই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে যে, এগুলো লিখতে এবং বলতেও লজ্জা হয়। পূর্বযুগের লোকেরা যারা নবী এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছে তারা ছিল কাফির-মুশরিক। কিন্তু বর্তমান যুগে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও ব্লগের মধ্যে যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও কুরআনসহ ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ ও খারাপ মন্তব্য করে যাচ্ছে, তারা নামধারী মুসলিম হলেও কাজকর্মে পূর্বযুগের কাফির-মুশরিক থেকে কোন দিকে কম নয়।
আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত নবী-রাসূলদেরকে নিয়ে যারা ব্যঙ্গ করে তারা মুমিন থাকে না। তারা কাফির ও মুরতাদ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ - لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
আর তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয় বলবে, আমরা তো আলাপ আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম। বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব- কারণ তারা অপরাধী। (সূরা তাওবা- ৬৫, ৬৬)
📄 উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
রাসূলুল্লাহ যখন থেকে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন থেকেই তারা তাঁর ব্যাপারে নানা ধরনের ভুল ধারণায় লিপ্ত ছিল। ফলে তারা তাঁর সাথে নানা প্রকার খারাপ আচরণ করত। বর্তমান সময়ে যারা নবী এর আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করবে তাদের উপরও একই ধরনের দোষারোপ ও যুলুম নির্যাতন আসবে। যারা দোষারোপ ও যুলুম নির্যাতনের স্বীকার হন না, তারা মুখে যদিও বলে থাকে যে, আমরা হকের দাওয়াত দিচ্ছি, কিন্তু আসলে সেটা হকের দাওয়াত হতে পারে না। কারণ যারা সত্যিকারার্থে নবী এর দ্বীন প্রচার করবে তাদের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটে, যা নবী -এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এর ব্যতিক্রম কিছু হবে না। এজন্য যারা সত্যিকারার্থে দ্বীনের কাজ করেন, তাদের জন্য কতিপয় সান্ত্বনার বাণী আল্লাহ তা'আলা নবী-কে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ جَاءُوا بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَالْكِتَابِ الْمُنِيرِ
তারা যদি তোমার প্রতি মিথ্যারোপ করে, তবে (জেনে রেখো) তোমার পূর্বেও রাসূলগণকে মিথ্যারোপ করা হয়েছিল, যারা প্রকাশ্য নিদর্শনাবলি ও অনেক সহীফা এবং উজ্জ্বল গ্রন্থসহ আগমন করেছিল। (সূরা আলে ইমরান- ১৮৪)
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ * وَكَفَى بِرَبِّكَ هَادِيًا وَنَصِيرًا﴾
এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু হিসেবে মনোনীত করেছিলাম। তবে পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট ছিল। (সূরা ফুরক্বান- ৩১)
وَإِنْ يُرِيدُوا أَنْ يَخْدَعُوكَ فَإِنَّ حَسْبَكَ اللَّهُ هُوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ﴾
যদি তারা তোমাকে প্রতারিত করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। (সূরা আনফাল- ৬২)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ)
হে নবী! তোমার জন্য ও তোমার অনুসারী মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা আনফাল- ৬৪)
ইসলামের দুষমনদের কাছে দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না: শত্রুরা যেন মুসলিমদেরকে এমন দুর্বল অবস্থায় না পায় যে, তাদের মিথ্যাচার দেখে তাঁরা সাহস হারিয়ে ফেলে অথবা তাদের হুমকি ও নির্যাতনে ভীত হয়ে পড়ে। বরং তারা যেন মুসলিমদেরকে ঈমানী চেতনায় ও সুপথ হাসিলের উদ্দেশ্যে এত বেশি মজবুত পায় যে, তাদেরকে কোন প্রকার ভয়ে ভীত করা সম্ভব নয়, কোন প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ও নির্যাতন চালিয়ে সুপথ থেকে সরানোও সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন
﴿فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ ﴾ অতএব তুমি ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। যারা দৃঢ় বিশ্বাসী নয় তারা যেন তোমাকে বিচলিত করতে না পারে। (সূরা রূম- ৬০)
﴿لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ﴾ শহরসমূহে কাফিরদের চালচলন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। (সূরা আলে ইমরান- ১৯৬) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে যেমন শক্তিশালী ও গুরুত্ববহ দেখতে চাচ্ছিলেন, তিনি ঠিক তেমনটিই হতে পেরেছিলেন। তাঁর সাথে যে ব্যক্তিই যে ময়দানে শক্তি পরীক্ষা করেছে, সে-ই হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত এ মহান ব্যক্তিত্ব এমন বিপ্লব সৃষ্টি করেন, যাঁর পথ রোধ করার জন্য আরবের কাফির ও মুশরিকসমাজ নিজেদের সর্বশক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হয়ে গেছে। ধৈর্যধারণ করতে হবে :
﴿وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا﴾ তুমি তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্যধারণ করো; কেননা তুমি আমার চোখের সামনেই রয়েছ। (সূরা তূর- ৪৮) যারা তাগুতকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য নিজেদের সকল প্রকার প্রচেষ্টা প্রয়োগ করে, তারা নৈতিকতার সকল বাঁধন মুক্ত হয়ে নবী এর বিরুদ্ধে সবরকমের নিকৃষ্ট চক্রান্ত চালাচ্ছিল। তারা অশ্লীলতা, প্রতারণা, জালিয়াতি ও মিথ্যার অস্ত্র ব্যবহার করে এমন এক নিষ্কলুষ ব্যক্তির কার্যক্রমকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, যিনি নিঃস্বার্থভাবে সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য দিন-রাত সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। তাদের এ তৎপরতা দেখে নবী মনে মনে অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করতেন। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ﴾ অতএব তুমি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করে দেবে না। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। (সূরা ফাতির- ৮) নবী -কে এ মর্মে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে যে, এদের ঈমান না আনার দায়-দায়িত্ব তোমার ওপর বর্তায় না। কাজেই তুমি কেন অনর্থক নিজেকে দুঃখে ও শোকে দগ্ধীভূত করছ? তোমার কাজ শুধুমাত্র সুখবর দেয়া ও ভয় দেখানো। কাজেই তুমি কেবল নিজের প্রচারের দায়িত্ব পালন করে যাও। যে মেনে নেবে তাকে সুখবর দেবে এবং যে মেনে নেবে না তাকে তার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে।
নবী-কে যে দুঃখটি ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল সেটি ছিল এই যে, তিনি নিজের জাতিকে নৈতিক অধঃপতন ও ভ্রষ্টতা থেকে বের করে আনতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা কোনক্রমেই এ পথে পা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছিল না। আর এ ভ্রষ্টতার অনিবার্য ফল ধ্বংস ও আল্লাহর আযাব। তাই তিনি তাদেরকে এ পরিণতি থেকে রক্ষা করার জন্য দিন-রাত প্রাণপণ পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন।
নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাঁর এ মানসিক অবস্থাকে একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো, যে আলোর জন্য আগুন জ্বালাল। আর পতঙ্গরা পুড়ে মরার জন্য তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। সে এদেরকে যে কোনক্রমে আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, কিন্তু এ পতঙ্গরা তার কোন প্রচেষ্টাকেই ফলপ্রসূ করতে দেয় না। আমার অবস্থাও অনুরূপ। আমি তোমাদের হাত ধরে টানছি; কিন্তু তোমরা আগুনে লাফিয়ে পড়ছ।
টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩৪২৬; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৯৭: মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৬৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৪০৮।