📄 নবী ﷺ খাওয়া-দাওয়া ও হাট-বাজার করার কারণে অভিযোগ
কাফির-মুশরিকদের একটি ভুল ধারণা হচ্ছে এই যে, যিনি রাসূল হবেন তিনি খাওয়া-দাওয়া করতে পারবেন না। হাট-বাজারে চলাফেরা করতে পারবেন না। তিনি হবেন মানুষ থেকে ভিন্ন প্রকৃতির কেউ। কুরআন মাজীদে এসেছে, وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ لَوْلَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَلَكٌ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيرًا
তারা বলে, সে কেমন রাসূল যে আহার করে এবং হাট-বাজারে চলাফেরা করে। তার নিকট কোন ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হলো না, যে সতর্ককারী হিসেবে তার সঙ্গে থাকত? (সূরা ফুরক্বান- ৭)
একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যে জীবিত থাকার জন্য খাদ্যের মুখাপেক্ষী হয়, সে কেমন করে আল্লাহর বাণী নিয়ে আসে? আর যদি মানুষকেই রাসূল বানানো হয়ে থাকে, তবে তাকে তো অন্তত বাদশাহ অথবা দুনিয়ার বড় লোকদের মতো উন্নত পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত ছিল, যাকে দেখার জন্য চোখ উন্মাদ হয়ে থাকত এবং অনেক সাধনার পর তার দরবারে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য হতো। কিন্তু তা না হয়ে এমন একজন সাধারণ লোককে কীভাবে নবী বানিয়ে প্রেরণ করা হলো, যে বাজারে যায়। একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে চলাফেরা করে, সেও সেভাবে চলাফেরা করে এবং কোন দিক দিয়েই তার মধ্যে কোন অসাধারণত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না। সুতরাং কীভাবে তাকে গ্রহণ করা যায়?
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আয়াত নাযিল করে জানিয়ে দিলেন যে, উম্মতকে সর্ব ক্ষেত্রে দ্বীন শিক্ষা দিতে হলে এমন একজন নবী হওয়া দরকার যিনি নিজে খাওয়া-দাওয়া করবেন এবং হাট-বাজার করবেন। তাছাড়া সকল নবী-রাসূলই হাট-বাজারে চলাফেরা করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُونَ الطَّعَamَ وَيَمْشُونَ فِي الْأَسْوَاقِ
তোমার পূর্বে আমি যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছি তারা সকলেই আহার করত ও হাট-বাজারে চলাফেরা করত। (সূরা ফুরক্বান- ২০)
📄 নবী ﷺ এর স্ত্রী-সন্তান থাকাতে অভিযোগ
কাফির-মুশরিকদের আরো একটি ভুল ধারণা হচ্ছে, যিনি নবী হবেন তিনি বিয়ে শাদী করবেন না। তার সন্তান-সন্ততীও হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে তাদের এই ভুল ধারণা খণ্ডন করে জানিয়ে দিলেন যে, শুধু মুহাম্মাদ ﷺ এর ক্ষেত্রেই নয়, বরং পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছিলেন, সকলেরই পরিবার-পরিজন ছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةٌ ۚ وَمَا كَانَ لِرَسُولٍ أَنْ يَأْتِيَ بِآيَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ
তোমার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রাসূলের কাজ নয়। প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্ধারিত কাল লিপিবদ্ধ রয়েছে। (সূরা রা'দ- ৩৮)
অধিক বিয়ের কারণ :
মুহাম্মাদ ﷺ এগার জন নারীকে বিয়ে করেছিলেন। এর প্রকৃত কারণ না জানার কারণে এ সম্পর্কে অনেকে ভুল ধারণার শিকার হয়েছে।
এ বিষয়টি বুঝতে হলে নবী -কে আল্লাহ যে মহান দায়িত্ব সম্পাদন করার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন, তা অনুধাবন করা জরুরি। নবী- আলাইহিস সালাম-কে যে কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তা ছিল এই যে, তিনি একটি জাতিকে শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে উন্নত পর্যায়ের জাতিতে পরিণত করবেন। এ উদ্দেশ্যে কেবলমাত্র পুরুষদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়াই যথেষ্ট ছিল না। বরং মহিলাদেরকেও প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার ছিল। আর মহিলাদের মধ্যে কাজ করার কেবলমাত্র একটি পথই তাঁর জন্য খোলা ছিল; সেটি হচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাসম্পন্ন মহিলাদেরকে তিনি বিয়ে করবেন এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দান করে নিজের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত করবেন। তারপর তাদের সাহায্যে নগরবাসী ও মরুচারী, যুবতী ও বৃদ্ধা সবধরনের নারীদেরকে দ্বীন ও নৈতিকতার নতুন নীতিসমূহ শিখানোর ব্যবস্থা করবেন।
এছাড়াও নবী-আলাইহিস সালাম-কে জাহেলী জীবনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল। এ দায়িত্ব সম্পাদন করার জন্য জাহেলী জীবনব্যবস্থার পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল। এ অবস্থায় অন্যান্য ব্যবস্থার সাথে বিভিন্ন পরিবারে বিয়ে করে বন্ধুত্বকে পাকাপোক্ত এবং বহুতর শত্রুতাকে খতম করার ব্যবস্থা করাও তাঁর জন্য জরুরি ছিল। তাই তিনি যেসব মহিলাকে বিয়ে করেন তাঁদেরকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যক্তিগত গুণাবলি ছাড়াও এসব বিষয়ও কমবেশি জড়িত ছিল। আয়েশা (রাঃ) ও হাফসা (রাঃ)-কে বিয়ে করে তিনি আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) এর সাথে নিজের সম্পর্ককে মজবুত করে নেন। উম্মে সালামা (রাঃ) ছিলেন এমন এক পরিবারের মেয়ে, যার সাথে ছিল আবু জাহেল ও খালিদ ইবনে ওয়ালীদের সম্পর্ক। উম্মে হাবীবা (রাঃ) ছিলেন আবু সুফিয়ানের মেয়ে। এ বিয়েগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর শত্রুতার জের অনেকাংশ কমিয়ে দেয়। বরং উম্মে হাবীবা (রাঃ) এর সাথে নবী এর বিয়ে হওয়ার পর আবু সুফিয়ান আর কখনো তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেনি। সাফিয়া, জুওয়াইরিয়া ও রাইহানা (রাঃ) ইয়াহুদি পরিবারের মেয়ে ছিলেন। তাঁদেরকে যুদ্ধবন্দী থেকে মুক্তি দিয়ে যখন নবী নিজেই তাঁদেরকে বিয়ে করে নেন তখন তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াহুদিদের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। কারণ সে যুগের রীতি অনুযায়ী যে ব্যক্তির সাথে কোন গোত্রের মেয়ের বিয়ে হতো তাঁকে কেবল মেয়েটির পরিবারের নয়, বরং সমগ্র গোত্রের জামাতা মনে করা হতো এবং জামাতার সাথে যুদ্ধ করা বড়ই লজ্জাকর ছিল। সমাজের কার্যক্রম সংশোধন এবং এর জাহেলী রসম রেওয়াজ নির্মূল করাও নবী এর অন্যতম দায়িত্ব ছিল। কাজেই এ উদ্দেশ্যেও তাঁকে বিয়ে করতে হয়। জাহেলী যুগে পালক পুত্রের মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ মনে করা হতো না। এ কুপ্রথাকে বাতিল করার জন্য তিনি তাঁর পালক পুত্র যায়েদের স্ত্রী যয়নাবকে বিয়ে করেন।
এসব কারণে বিয়ের ব্যাপারে নবী এর জন্য কোন রকম সংকীর্ণতা ও অসুবিধা রাখা হয়নি। এর ফলে যে মহান দায়িত্ব তাঁর প্রতি অর্পিত হয়েছিল তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিয়ে করেছেন। তিনি এ সমস্ত বিয়ে করেন প্রচার ও শিক্ষামূলক প্রয়োজনে অথবা সমাজ সংস্কারার্থে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য।
📄 নবী ﷺ এর ধন-সম্পদ না থাকার কারণে অভিযোগ
নবী সম্পর্কে কাফির-মুশরিকদের আরো একটি ভুল ধারণা ছিল এই যে, যিনি নবী হবেন, তাকে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হতে হবে। অথচ তাদের এই অভিযোগটিও ছিল একেবারেই ভিত্তিহীন। আল্লাহ তা'আলা তাদের এই অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে বলেন,
وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا - أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْجِيرًا - أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللهِ وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلًا - أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ تُؤْمِنَ لِرُقِيكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُوْلًا)
তারা বলে, আমরা কখনই তোমার প্রতি ঈমান আনব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে একটি নদী প্রবাহিত করবে, অথবা তোমার খেজুরের ও আঙ্গুরের একটি বাগান থাকবে- যার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র ধারায় প্রবাহিত করবে নদী-নালা, অথবা তুমি যেমন বলে থাক তদানুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের ওপর ফেলবে, অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করবে, অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে। কিন্তু তোমার আকাশে আরোহণ করাতেও আমরা কখনো ঈমান আনব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পাঠ করব। (হে নবী!) বলো, আমার প্রতিপালক খুবই পবিত্র ও মহান! আমি তো একজন মানুষ ও একজন রাসূল মাত্র। (সূরা বনী ইসরাঈল, ৯০-৯৩)
আল্লাহ তা'আলা নিচের আয়াতের মাধ্যমে তাদের এ ভুল ধারণা ও অভিযোগ খণ্ডন করেছেন-
تَبَارَكَ الَّذِي إِنْ شَاءَ جَعَلَ لَكَ خَيْرًا مِنْ ذَلِكَ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَيَجْعَلْ لَّكَ قُصُورًا - بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ وَاعْتَدْنَا لِمَنْ كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا)
তিনি কতই না মহান, যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট বস্তু দিতে পারেন- (যেমন) উদ্যানসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নদী-নালাসমূহ
প্রবাহিত হবে এবং তিনি তোমাকে (আরো) দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ। কিন্তু তারা (কাফিররা) কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। আর যারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা ফুরক্বান- ১০, ১১)
📄 নবী ﷺ এর মজলিসে গরীব লোকেরা থাকাতে অভিযোগ
কাফির-মুশরিকদের স্বভাব হলো, তারা সর্বদা আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখে চলে। তারা গরীবদের সাথে চলাফেরাকে নিজেদের মর্যাদাহানীর কারণ মনে করে। ফলে যখন তারা রাসূলুল্লাহ এর সাথে কোন বিষয়ে আলোচনা করতে আসত, তখন তারা উক্ত বৈঠক থেকে গরীবদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ এর নিকট আবেদন জানাত। অথচ তাদের এ দাবিটি ছিল ইসলাম আগমনের উদ্দেশ্যের বিপরীত। আল্লাহ তা'আলা তাদের এসব অযৌক্তিক দাবির জবাব দিয়ে বলেন,
وَلَا تَطْرُدِ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِّنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ ﴾
যারা তাদের প্রতিপালককে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ডাকে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করো না। তাদের কর্মের জবাবদিহিতার দায়িত্ব তোমার নয় এবং তোমার কোন কর্মের জবাবদিহিতার দায়িত্বও তাদের নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে; (যদি কর তবে) তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (সূরা আন'আম- ৫২)