📄 নবুওয়াতী জীবনের শুরু থেকে মুহাম্মদ ﷺ এর ব্যাপারে যেসব ভুল ধারণা ও অভিযোগ ছিল
বর্তমান সময়ে যেভাবে নবী সম্পর্কে মানুষ নানা ধরনের ভুল ধারণায় লিপ্ত হয়েছে এবং তাঁর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করেছে। তিনি জীবিত থাকাবস্থাতেও কাফির-মুশরিকরা তাঁর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের ভুল ধারণায় লিপ্ত ছিল। ফলে তারা তাঁর ব্যাপারে নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করত। এসকল অভিযোগের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ করেছেন এবং এর যথাযথ জবাব দিয়েছেন। নিচে এ সংক্রান্ত আয়াতগুলো নিয়ে কিছু আলোচনা করা হলো:
📄 মুহাম্মদ ﷺ-কে রাসূল বলে স্বীকার না করা
নবীর ব্যাপারে কাফির মুশরিকদের যত ভুল ধারণা ও অভিযোগ ছিল তার মধ্যে একটি ছিল এই যে, তারা মুহাম্মাদ-কে রাসূল বলে স্বীকার করতে রাজি ছিল না। তারা তাঁর রিসালাতকে সরাসরি অস্বীকার করত। তাদের এ ভুল ধারণার জবাবে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন- وَيَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَسْتَ مُرْسَلًا * قُلْ كَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَمَنْ عِنْدَهُ عِلْمُ الْكِتَابِ
যারা কুফরী করে তারা বলে, তুমি তো রাসূল নও। বলো, আল্লাহ এবং যাদের নিকট কিতাবের জ্ঞান রয়েছে, তারাই আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। (সূরা রা'দ-৪৩) এ আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা যদিও নবী-কে রাসূল মানতে রাজি নয়, কিন্তু আসলে তিনি একজন রাসূল। আল্লাহ এবং কিতাবের জ্ঞানের অধিকারী যারা, তাদের সাক্ষ্যই মুহাম্মাদ আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা কেউ স্বীকার করুক বা না করুক তাতে কিছু যায়-আসে না।
📄 মুহাম্মদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত ওহীকে অস্বীকার করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরোধিতাকারীদের অভিযোগগুলোর মধ্যে আরো একটি অভিযোগ ছিল যে, ওহীর মাধ্যমে তার কাছে যা নাযিল হতো, তা যখন তিনি মানুষের কাছে প্রকাশ করতেন, তখন তারা বলত- তিনি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করছেন। তাদের এ ভুল ধারণার জবাব নিচের আয়াতের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে-
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا فَإِنْ يَّشَأِ اللَّهُ يَخْتِمْ عَلَى قَلْبِكَ ، وَيَمْحُ اللَّهُ الْبَاطِلَ وَيُحِقُّ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
তারা কি বলে যে, সে (রাসূল) আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বানিয়েছে? (অথচ) আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমার হৃদয়ে মোহর মেরে দিতে পারতেন। আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয় তিনি (মানুষের) অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। (সূরা শূরা- ২৪)
📄 নবী ﷺ মানুষ হওয়াতে অভিযোগ
নবী ﷺ এর ব্যাপারে কাফির-মুশরিকদের আরো একটি অভিযোগ এ ছিল যে, আল্লাহ যদি কাউকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন, তাহলে তিনি মানুষ হবেন কেন? তাদের ধারণা ছিল যে, কেউ রাসূল হলে তিনি ফেরেশতার মধ্য থেকে হতে পারেন।
নবীগণ মানুষ হওয়াতে সকল যুগেই আপত্তি ছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا
যখনই মানুষের কাছে (আল্লাহর কাছ থেকে) হেদায়াত আসত, তখনই তাদের ঈমান আনা থেকে এ ছাড়া অন্য কোন জিনিসই বিরত রাখেনি যে, তারা বলত- আল্লাহ কি (আমাদের মতো) একজন মানুষকেই নবী করে পাঠালেন! (সূরা বনী ইসরাঈল- ৯৪)
আল্লাহ তা'আলা নিচের আয়াতগুলোর মাধ্যমে তাদের এ ভুল ধারণা ও অভিযোগ খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْহِمْ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ - وَمَا جَعَلْنَاهُمْ جَسَدًا لَّا يَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَمَا كَانُوا خَالِدِينَ
তোমার পূর্বে যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং যাদের প্রতি ওহী করতাম তারা সকলেই মানুষ ছিল। (এ বিষয়ে) তোমরা যদি না জেনে থাক, তবে (অবতীর্ণ) কিতাবের জ্ঞান যাদের কাছে আছে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে নাও। (তাছাড়া) আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাদ্য খেত না। আর তারা চিরস্থায়ীও ছিল না। (সূরা আম্বিয়া- ৭, ৮)
قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَسُولًا)
বলো, ফেরেশতারা যদি নিশ্চিন্তে পৃথিবীতে বিচরণ করত, তবে অবশ্যই আমি আকাশ থেকে কোন ফেরেশতাকে তাদের নিকট রাসূল করে পাঠাতাম। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৯৫)
একজন মানুষকেই নবী বানিয়ে পাঠানোর পেছনে যে নিগূঢ় যৌক্তিকতা নিহিত ছিল, মহান আল্লাহ সে যৌক্তিকতাও বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহর বাণী ফেরেশতাদের মাধ্যমে অথবা কাগজে সরাসরি ছাপিয়ে প্রত্যেকটি মানুষের হাতে পৌঁছানো যেত। কিন্তু ওহী অবতরণ করার মাধ্যমে আল্লাহ প্রকৃতপক্ষে যে উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে চান তা হলো, একজন যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ তা নিয়ে আসবেন। তিনি তা থেকে একটু একটু করে লোকদের সামনে পেশ করবেন। যারা এর কোন কথা বুঝতে পারবে না, তাদেরকে তার অর্থ বুঝিয়ে দেবেন। এর কোন ব্যাপারে যাদের সন্দেহ থাকবে, তাদের সন্দেহ দূর করে দেবেন। কোন ব্যাপারে যাদের আপত্তি ও প্রশ্ন থাকবে, তাদের আপত্তি ও প্রশ্নের জবাব দেবেন। যারা তাকে মেনে নিতে অস্বীকার করবে এবং এর অগ্রগতিতে বাধা দিতে এগিয়ে আসবে, তাদের মোকাবেলায় তিনি এমন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করবেন- যা এ যিকির বা আল্লাহর বাণীর ধারকদের জন্য উপযোগী। যারা মেনে নেবে তাদের জীবনের প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগ সম্পর্কে পথনির্দেশনা দেবেন। নিজের জীবনকে তাদের সামনে আদর্শ হিসেবে পেশ করবেন। তাদেরকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে অনুশীলন দান করে সারা দুনিয়ার সামনে এমন একটি সমাজ আদর্শ হিসেবে তুলে ধরবেন, যার সমগ্র সামাজিক ব্যবস্থা হবে আল্লাহর কিতাবের বাস্তব প্রতিফলন।