📄 মীলাদ মাহফিলের হুকুম
প্রকৃতপক্ষে মীলাদ মাহফিল বলতে যা বুঝায় তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করা একটি উত্তম কাজ। ফলে এর জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশা করা যায়। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে যেভাবে মীলাদ মাহফিল পালন করা হয়, সেটা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা এটা অনেক প্রকার বিদআত ও শিরকী কর্মকাণ্ডের দ্বারা পরিপূর্ণ। যেমন- বিশেষ নিয়মে নানা ধরনের দরূদ পাঠ করা, কবিতা পাঠ করা, কিয়াম করা ইত্যাদি।
১। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করা, যিকির-আযকার করার মাঝে সওয়াব রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জীবনবৃত্তান্ত আলোচনার জন্য সুন্নত গর্হিত যে নিয়ম-নীতি অবলম্বন করা হয়, এই নিয়ম সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনদের কোন যুগেই ছিল না। এর দ্বারা সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে।
২। মীলাদ মাহফিল সাহাবায়ে কেরামের যুগ, তাবেঈনদের যুগ ও তাবে তাবেঈনদের যুগ- মর্যাদাপূর্ণ এই তিন যুগে ছিল না বিধায় তা বিদআত ও গর্হিত কাজ।
📄 প্রচলিত মীলাদ মাহফিলের ইতিহাস
প্রকৃতপক্ষে ইসলামে মীলাদ মাহফিল নামে পৃথক কোন দিবসের কথা উল্লেখ নেই। বর্তমানে আমাদের সমাজে মীলাদ মাহফিল নামে যা কিছুর প্রচলন আছে সেগুলোর কোন অস্তিত্ব রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে, সাহাবায়ে কেরামের যুগে, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনদের যুগে ছিল না। এমনকি এর পরবর্তীতেও তথা ৬০০ হিজরী পর্যন্তও এর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত।
সর্বপ্রথম মীলাদ মাহফিল চালু হয় ৬০৪ হিজরীতে ইরাকের মসুল শহরে। এ সময় এটি কেবল চিত্তবিনোদন হিসেবে চালু হয়। তখনকার বাদশা মুজাফফর উদ্দীন ইবনে আরবালের নির্দেশে আবুল খাত্তাব উমর বিন মুহাম্মাদ মসুলী নামক জনৈক নামধারী আলেম এর সূচনা করেন। অথচ আবুল খাত্তাব উমর বিন মুহাম্মাদ কোন মুজতাহিদ বা মুহাদ্দিস ছিলেন না; বরং ইলম ও সম্মানের দিক দিয়ে তিনি একজন অখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। প্রচলিত মীলাদের সূচনা করার কারণে সে যুগের বিজ্ঞ আলেম ও মহামনীষীগণ তীব্র ও কঠিন ভাষায় তার সমালোচনা করেছেন। আল্লামা তাজুদ্দীন ফাকেহানী (রহ.) বলেন, প্রচলিত মীলাদ আবিষ্কার করেছে ভ্রষ্ট ও চিত্তপূজারী লোকেরা। আর পেটপূজারী লোকেরা এর উপর গুরুত্বারোপ করেছে।
আর অপরদিকে বাদশা মুজাফফর উদ্দীন ছিল অপচয়কারী ও ধর্মীয় ব্যাপারে উদাসীন। সে উলামায়ে কেরামকে অন্যের মাযহাব বর্জন করে নিজ নিজ ইজতিহাদ ও গবেষণা অনুসারে চলার নির্দেশ দিত। সে মীলাদ মাহফিল চালু করে দুনিয়ালোভী দরবারী মৌলভী দ্বারা মীলাদের স্বপক্ষে দলীলাদী জমা করত। প্রজাদের অন্তরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট ও অনুরক্ত রাখার জন্য মীলাদের আয়োজন করত। মীলাদের দিন তার জন্য এবং স্ত্রীর জন্য সুরমা কাঠের গম্বুজাকৃতির তাঁবু তৈরি করার নির্দেশ দিত। কয়েকদিন পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলত। বাদশা মুজাফফর প্রতিদিন আসরের পর সেখানে আসত এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করত।
টিকাঃ
১৯ তারিখে মীলাদ পৃ: ১৩।
📄 কিয়ামের সূচনা
বর্তমানে কিয়াম মীলাদ মাহফিলের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলামে এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া যখন মীলাদ মাহফিলের সূচনা হয়, তখনও কিয়ামের সূচনা হয় নাই। বরং এরও অনেক পরে ৭৫৫ হিজরীতে কিয়ামের সূচনা হয়। বর্ণিত আছে যে, এ সময় খাজা তাক্বী উদ্দীন মালেকী (রহ.) এর দরবারে একদা ফাতেমীয় কবি ইয়াহইয়া ইবনে ইউসুফ উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ এর শানে কিছু গজল ও কবিতা আবৃত্তি করল। যখন সে এই পংক্তিতে পৌঁছল- وَإِنْ تَنْهَضِ الْأَشْرَافُ عِنْدَ سِمَاعِهِ قِيَامًا صُفُوفًا وَجَيْشًا عَلَى الرَّكْبِ
অর্থাৎ “যে সম্মানিত ব্যক্তিগণ রাসূলুল্লাহ এর না'ত শ্রবণ করার সময় কাতার বন্দী হয়ে অথবা সওয়ারীর উপর একত্রিত হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন।” তখন খাজা সাহেবের মনে জযবা এসে গেল। ফলে তিনি দাঁড়িয়ে যান। তখন তার ভক্তবৃন্দ যারা উপস্থিত ছিল সকলেই তার সম্মান রক্ষার্থে দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে শিয়া সম্প্রদায়ের উপদল ইমামী আলেমগণ এই দাঁড়ানোকে মীলাদ মাহফিলের অত্যাবশ্যকীয় অংশরূপে নির্ধারিত করে দেন। উল্লেখ্য যে, যিনি মীলাদের সূচনা করেছেন তিনি কিয়াম করেননি। আর যিনি কিয়ামের সূচনা করেছেন তিনি মীলাদ করেননি। অথচ বর্তমানে মীলাদ পন্থীরা কিয়ামকে মীলাদের অংশ সাব্যস্ত করে নিয়েছেন।
টিকাঃ
২০ তারিখে মীলাদ পৃ: ১৮।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুকে বিশ্বাস না করার আকীদা ভুল
রাসূলুল্লাহ -এর মৃত্যু সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকে তাঁর মৃত্যুকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। অথচ কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। (সূরা যুমার- ৩০)
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর ব্যাপারে যে শব্দটি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন ঠিক একই শব্দ রাসূলুল্লাহ -এর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন। বলা হয়েছে,
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِنْ مِّتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে? (সূরা আম্বিয়া- ৩৪)
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা দুটি বিষয় বর্ণনা করেছেন। প্রথমত, রাসূলুল্লাহ -এর পূর্বে যত নবী আগমন করেছেন তাঁরাও মৃত্যুবরণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, সকল মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। চিরস্থায়ী জীবন আল্লাহ কাউকেই দেননি।
উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ -এর শাহাদাতের মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল, তখন সাহাবীগণ যুদ্ধের ময়দানে নিরাশ হয়ে পড়লেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করলেন,
﴿أَفَإِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ অনন্তর যদি সে মৃত্যুবরণ করে অথবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? (সূরা আলে ইমরান- ১৪৪)
যুবাইর বিন মুতইম (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট এসে কিছু কথা বলল, তখন রাসূলুল্লাহ অন্য কোন সময় তাকে আবার আসার জন্য বললেন। মহিলা বলল,
أَرَأَيْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ لَمْ أَجِدُكَ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি এসে আপনাকে না পাই (তাহলে আমি কী করব)? তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, যদি আমাকে না পাও তাহলে আবু বকর এর সাথে কথা বলবে। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথার মাধ্যমে মহিলা যেন রাসূলুল্লাহ -এর মৃত্যুর প্রতি ইশারা করছিল। ২১
এ ঘটনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাসূলুল্লাহ এর যুগে সাহাবীগণের এরূপ আকীদা ছিল না যে, রাসূলুলাহ মৃত্যুবরণ করবেন না বা তিনি মারা যাননি অথবা মৃত্যুর পর তিনি উম্মতকে কোন সাহায্য করতে পারবেন।
টিকাঃ
২১ সহীহ বুখারী, হা/৭৩৬০; তিরমিযী, হা/৩৬৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬৮০১।