📄 মীলাদ ও কিয়াম জায়েয না বিদআত
(مِیْلَادٌ )মীলাদ) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে জন্মবৃত্তান্ত। আর পারিভাষিক অর্থে মীলাদ বলা হয়, রাসূলুল্লাহ এর জন্ম ও জীবনী নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু আমাদের দেশে মীলাদ মাহফিল বলতে ঐসব অনুষ্ঠানকে বুঝানো হয়, যেখানে রাসূলুল্লাহ এর প্রশংসামূলক উর্দু, ফারসী, আরবি ও বাংলা ভাষায় বিভিন্ন কবিতা পাঠ করা হয় এবং সমস্বরে দরূদ পাঠ করা হয়।
আর قيام )কিয়াম) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, দাঁড়ানো বা দণ্ডায়মান হওয়া। আর পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ এর উপস্থিতির কারণে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়াকেই কিয়াম বলা হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ এর নামে মীলাদ পাঠ করার পর পরই কিয়াম করা হয়ে থাকে।
📄 প্রচলিত মীলাদ ও কিয়ামের ভ্রান্তিসমূহ
বর্তমান সমাজে মীলাদ মাহফিল ও কিয়ামের নামে যেসব অনুষ্ঠান পালন করা হয়, সেগুলোতে অনেক ধরনের ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মদিন পালন করা:
মূলত মীলাদ মাহফিলের উৎপত্তি রাসূলুল্লাহ এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করেই। রাসূলুল্লাহ যে দিন জন্ম গ্রহণ করেছেন, সে দিনটিকে বিশেষভাবে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয়। অথচ এ ধরনের অনুষ্ঠানের কোন অনুমোদন ইসলামে নেই। এরূপ কোন দিবস পালনের রীতি সাহাবী, তাবেঈ, তাবেতাবেঈগণের যুগে ছিল না। অথচ তাদের ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ له قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : خَيْرُ أُمَّتِي الْقَرْنُ الَّذِينَ يَلُوْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ قَوْمٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِيْنَهُ وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ
আবদুল্লাহ ইবনে মাস'উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের মাঝে সর্বাধিক উত্তম তারাই, যারা আমার যুগের সাথে সংশ্লিষ্ট (অর্থাৎ সাহাবীগণ)। তারপর তাদের সন্নিকটবর্তী সংযুক্ত যুগের লোক (অর্থাৎ তাবেঈগণ)। তারপর তাদের সংযুক্ত যুগ (অর্থাৎ তাবে তাবেঈগণ)। অতঃপর এমন এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে, যারা শপথের পূর্বে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং সাক্ষ্য প্রদানের পূর্বে শপথ করবে। সুতরাং সওয়াবের আশায় রাসূলুল্লাহ সহ যে কারো জন্মদিন পালন করাই বিদআত। কেননা দিবস পালনের এ বিষয়টি উপরোক্ত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সালফদের যুগে ছিল না।
২. বিদআতী দরূদ পাঠ করা: মীলাদকে কেন্দ্র করে আরো একটি মারাত্মক বিদআত বর্তমান সমাজে প্রচলিত রয়েছে। আর সেটা হলো, বিদআতী দরূদ পাঠ করা অর্থাৎ সেসব অনুষ্ঠানগুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে যেভাবে দরূদ শিক্ষা দিয়েছেন এবং সহীহ হাদীসসমূহে যেসব দরূদ পাওয়া যায়, সেগুলো পাঠ করা হয় না। বরং নিজেদের মনগড়া নানা প্রকার দরূদ পাঠ করা হয়।
৩. কিয়ামের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ উপস্থিত হন বলে মনে করা : এসব মীলাদ অনুষ্ঠান পালনের অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে কিয়াম করা অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামে দরূদ পাঠ করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ নাকি সামনে উপস্থিত হন, ফলে তাঁর সম্মানে দাঁড়ানো হয়। অথচ এ ধরনের কোন রীতিনীতি ইসলামের মর্যাদাপূর্ণ তিন যুগেও ছিল না। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিও একেবারেই ভ্রান্ত।
টিকাঃ
১৮ সহীহ বুখারী, হা/২৬৫২; সহীহ মুসলিম, হা/৬৬৩২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৯৬৩; মিশকাত, হা/৩৭৬৭।
📄 মীলাদ মাহফিলের হুকুম
প্রকৃতপক্ষে মীলাদ মাহফিল বলতে যা বুঝায় তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করা একটি উত্তম কাজ। ফলে এর জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশা করা যায়। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে যেভাবে মীলাদ মাহফিল পালন করা হয়, সেটা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা এটা অনেক প্রকার বিদআত ও শিরকী কর্মকাণ্ডের দ্বারা পরিপূর্ণ। যেমন- বিশেষ নিয়মে নানা ধরনের দরূদ পাঠ করা, কবিতা পাঠ করা, কিয়াম করা ইত্যাদি।
১। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করা, যিকির-আযকার করার মাঝে সওয়াব রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জীবনবৃত্তান্ত আলোচনার জন্য সুন্নত গর্হিত যে নিয়ম-নীতি অবলম্বন করা হয়, এই নিয়ম সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনদের কোন যুগেই ছিল না। এর দ্বারা সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে।
২। মীলাদ মাহফিল সাহাবায়ে কেরামের যুগ, তাবেঈনদের যুগ ও তাবে তাবেঈনদের যুগ- মর্যাদাপূর্ণ এই তিন যুগে ছিল না বিধায় তা বিদআত ও গর্হিত কাজ।
📄 প্রচলিত মীলাদ মাহফিলের ইতিহাস
প্রকৃতপক্ষে ইসলামে মীলাদ মাহফিল নামে পৃথক কোন দিবসের কথা উল্লেখ নেই। বর্তমানে আমাদের সমাজে মীলাদ মাহফিল নামে যা কিছুর প্রচলন আছে সেগুলোর কোন অস্তিত্ব রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে, সাহাবায়ে কেরামের যুগে, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনদের যুগে ছিল না। এমনকি এর পরবর্তীতেও তথা ৬০০ হিজরী পর্যন্তও এর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত।
সর্বপ্রথম মীলাদ মাহফিল চালু হয় ৬০৪ হিজরীতে ইরাকের মসুল শহরে। এ সময় এটি কেবল চিত্তবিনোদন হিসেবে চালু হয়। তখনকার বাদশা মুজাফফর উদ্দীন ইবনে আরবালের নির্দেশে আবুল খাত্তাব উমর বিন মুহাম্মাদ মসুলী নামক জনৈক নামধারী আলেম এর সূচনা করেন। অথচ আবুল খাত্তাব উমর বিন মুহাম্মাদ কোন মুজতাহিদ বা মুহাদ্দিস ছিলেন না; বরং ইলম ও সম্মানের দিক দিয়ে তিনি একজন অখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। প্রচলিত মীলাদের সূচনা করার কারণে সে যুগের বিজ্ঞ আলেম ও মহামনীষীগণ তীব্র ও কঠিন ভাষায় তার সমালোচনা করেছেন। আল্লামা তাজুদ্দীন ফাকেহানী (রহ.) বলেন, প্রচলিত মীলাদ আবিষ্কার করেছে ভ্রষ্ট ও চিত্তপূজারী লোকেরা। আর পেটপূজারী লোকেরা এর উপর গুরুত্বারোপ করেছে।
আর অপরদিকে বাদশা মুজাফফর উদ্দীন ছিল অপচয়কারী ও ধর্মীয় ব্যাপারে উদাসীন। সে উলামায়ে কেরামকে অন্যের মাযহাব বর্জন করে নিজ নিজ ইজতিহাদ ও গবেষণা অনুসারে চলার নির্দেশ দিত। সে মীলাদ মাহফিল চালু করে দুনিয়ালোভী দরবারী মৌলভী দ্বারা মীলাদের স্বপক্ষে দলীলাদী জমা করত। প্রজাদের অন্তরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট ও অনুরক্ত রাখার জন্য মীলাদের আয়োজন করত। মীলাদের দিন তার জন্য এবং স্ত্রীর জন্য সুরমা কাঠের গম্বুজাকৃতির তাঁবু তৈরি করার নির্দেশ দিত। কয়েকদিন পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলত। বাদশা মুজাফফর প্রতিদিন আসরের পর সেখানে আসত এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করত।
টিকাঃ
১৯ তারিখে মীলাদ পৃ: ১৩।