📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মাটির তৈরি মনে করলে তাঁর মর্যাদা কমে না
আল্লাহ তা'আলা অগণিত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে মানবজাতিকেই সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ علَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭০)
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সকল সৃষ্টির সেরা জীব মাটি দ্বারা সৃষ্ট মানব। তাছাড়া আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর তাকে সিজদা করার আদেশের মাধ্যমেও তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন মাজীদে এসেছে, قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ) তিনি (আল্লাহ তা'আলা) তাকে (ইবলিসকে) বললেন, যখন আমি (আদমকে) সিজদা করতে আদেশ দিয়েছি, তখন কোন্ জিনিস তোমাকে সিজদা করতে নিষেধ করল? সে (ইবলিস) বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন; আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। (সূরা আ'রাফ- ১২)
আল্লাহ তা'আলা নূরের তৈরি ফেরেশতাদের উপরও মাটির তৈরি আদমকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এমনকি আদম (আঃ) মাটির তৈরি বলে তার মর্যাদা কম হবে, এই যুক্তি দেয়ার কারণে ইবলিস চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ -কে মাটির তৈরি বলে স্বীকার করলে তাঁর মর্যাদা কমে না। বরং আরো বৃদ্ধি পায়।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নূরের তৈরি মনে করা বাড়াবাড়ি
ঈসা (আঃ) এর উম্মতগণের মধ্যে যারা অতিভক্ত ছিল, তারা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করল। যারা বেআদব ছিল, তারা ঈসা (আঃ)-কে জারজ সন্তান বলে ঘোষণা দিল। এদের মধ্যে যারা অতিভক্ত ছিল, তারাও - গোমরাহ। যারা তাঁর সাথে বেআদবী করেছে তারাও গোমরাহ।
ঠিক তেমনি উম্মতে মুহাম্মাদীর মাঝে যারা অতিভক্ত, তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে আল্লাহর জাতি নূরের সৃষ্টি বলে বিশ্বাস করে। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত আকীদা । । এ কারণে রাসূলুল্লাহ এর মুহাব্বতের ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে তাকে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করাই ন্যায়সঙ্গত।
তাছাড়া রাসূলুল্লাহ-কে নূরের তৈরি মনে করার আকীদা খ্রিস্টানদের একটি শিরকী আকীদার সাথে সাদৃশ্য রাখে। যেমন- তারা বলে থাকে যে, ঈসা (আঃ)-ই আল্লাহ। তিনি মানুষ রূপে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। অথচ এ আকীদা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ সৃষ্টি আর স্রষ্টা কখনো এক হতে পারে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ -কে আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে যদি দাবি করা হয়, তাহলে এক অর্থে তাকে আল্লাহ বলেই দাবি করা হয়। উম্মত কর্তৃক এ ধরনের বাড়াবাড়ির আশংকা ছিল বিধায় রাসূলুল্লাহ জীবদ্দশাতেই এ ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। হাদীসে এসেছে, সাল্লাল্লাহ আাসাল্লাম عَنْ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ لَا تُطَرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامِ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ فَقُولُوا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা আমার প্রশংসায় এতটা বাড়াবাড়ি করো না যেমনটা খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে করেছিল। নিশ্চয় আমি শুধুমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং রাসূলই বলবে।
টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩২৬১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৪; সুনানে দারেমী, হা/২৮৪০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৩৯।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গায়েব জানা সম্পর্কে ভুল ধারণা
পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হচ্ছেন, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ। তিনি ছিলেন বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বিশেষ রহমতে তাকে মানবজাতির জন্য নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন এবং অনেক গায়েবী বিষয় অবহিত করেছিলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবী বিষয় কেবল ততটুকুই জানতে পারতেন, যতটুকু তিনি (আল্লাহ তা'আলা) ওহীর মাধ্যমে তাকে অবহিত করতেন। এর বাহিরে তিনি কিছুই জানতে পারতেন না। রাসূলুল্লাহ এর সাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈগণসহ যুগে যুগে সালফে সালেহীনগণও সর্বদা এরূপ আকীদাই পোষণ করতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে পথভ্রষ্ট কতিপয় আলেমের উদ্ভব হয়েছে, যারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট দলীলকে বিকৃত করে দাবি করে যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ গায়েব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। নিম্নে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে তাদের এসব মতবাদের ভ্রষ্টতা প্রমাণ করা হলো:
📄 ইলমে গায়েবের অধিকারী কে
ইলমে গায়েব এর সংজ্ঞা: الْعِلْمُ শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। আর اَلْغَيْبُ শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে অদৃশ্য, গুপ্তজ্ঞান, অজানা রহস্য, কোন জিনিস গোপন থাকা ইত্যাদি। সুতরাং الْعِلْمُ الْغَيْبُ অর্থ হচ্ছে অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান।
ইসলামী পরিভাষায় الْعِلْمُ الْغَيْبَ বলা হয়- إِنَّ الْغَيْبَ مَا غَابَ عَنِ الْحَوَاسِ وَالْعِلْمِ الضَّرُورِيِّ وَالْعِلْمِ الْاِسْتِدْ لَا لِي দলীল ব্যতীত পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা সাধারণভাবে যা জানা যায় না, তাকে গায়েব বলা হয়।
ইলমে গায়েবের অধিকারী কে আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন জ্ঞানের আধার এবং একমাত্র তিনিই হচ্ছেন সকল জ্ঞানের উৎস। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ জ্ঞান থেকে সামান্য কিছু দান করে অনুগ্রহ করে থাকেন। তিনি সৃষ্টির সবধরনের খবরাখবর রাখেন। বিশেষ করে যেসব বিষয় বান্দাদের থেকে অদৃশ্য রয়েছে, সে সম্পর্কেও খবর রাখেন। তিনি বলেন, قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ বলো, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউ অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না এবং তারা জানে না যে, তারা কখন উত্থিত হবে। (সূরা নামল- ৬৫) অপর আয়াতে এসেছে, أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ وَأَنَّ اللَّهَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ﴾ (তারা কি জানত না যে) আল্লাহ তাদের অন্তরের গোপন কথা ও তাদের গোপন পরামর্শ সম্পর্কেও অবগত আছেন এবং যা অদৃশ্য তাও তিনি বিশেষভাবে জানেন? (সূরা তওবা- ৭৮) এভাবে কুরআন মাজীদের আরো অনেক আয়াত দ্বারা গায়েবের জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার একক অধিকারের কথা প্রমাণ পাওয়া যায়।