📄 সাধারণ মানুষ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পার্থক্য
রাসূলুল্লাহ ছিলেন অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ। তবে অন্যান্য মানুষ থেকে যে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে ছিল সেটি হচ্ছে, তাঁর উপর ওহী নাযিল হতো। এ বৈশিষ্ট্যটি আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا الْهُكُمْ إِلهُ وَاحِدٌ
বলো, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে যে, তোমাদের মাবুদ হচ্ছেন একজন। (সূরা কাহফ- ১১০) উল্লেখ্য যে, এ পার্থক্যটি রাসূলুল্লাহ-কে মানুষ হওয়া থেকে পৃথক করে দেয় না; বরং তিনি যে একজন মানুষ- এটাই সাব্যস্ত করে।
📄 ফেরেশতারা নূরের তৈরি
আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা তৈরি করেছেন। তবে তাদের মধ্য থেকে কোন নবী বা রাসূল প্রেরণ করেননি; বরং তিনি কেবল মানবজাতি থেকেই রাসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَسُولًا
বলো, যদি পৃথিবীতে ফেরেশতারা স্বাচ্ছন্দে বিচরণ করত, তবে আমি আসমান থেকে কোন ফেরেশতাকেই তাদের নিকট রাসূল হিসেবে প্রেরণ করতাম। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৯৫) এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেননি। বরং মানবজাতির হেদায়াতের জন্য মানুষকেই নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আদম (আঃ) থেকে নিয়ে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ পর্যন্ত সকল নবী ও রাসূল মানুষ ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও আম্বিয়ায়ে কেরামসহ সকল উলামায়ে কেরামের আকীদা-বিশ্বাস এটাই। একথাও সকলে এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, নবীকূলের সর্দার মুহাম্মাদ সকল মানবজাতির শ্রেষ্ঠ এবং তার সাথে অন্য কোন মানুষের তুলনা হয় না। তিনি গুণগতভাবে সকল মানবজাতির হেদায়াতের আলো ও সরল পথের দিশারী।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মাটির তৈরি মনে করলে তাঁর মর্যাদা কমে না
আল্লাহ তা'আলা অগণিত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে মানবজাতিকেই সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ علَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭০)
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সকল সৃষ্টির সেরা জীব মাটি দ্বারা সৃষ্ট মানব। তাছাড়া আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর তাকে সিজদা করার আদেশের মাধ্যমেও তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন মাজীদে এসেছে, قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ) তিনি (আল্লাহ তা'আলা) তাকে (ইবলিসকে) বললেন, যখন আমি (আদমকে) সিজদা করতে আদেশ দিয়েছি, তখন কোন্ জিনিস তোমাকে সিজদা করতে নিষেধ করল? সে (ইবলিস) বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন; আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। (সূরা আ'রাফ- ১২)
আল্লাহ তা'আলা নূরের তৈরি ফেরেশতাদের উপরও মাটির তৈরি আদমকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এমনকি আদম (আঃ) মাটির তৈরি বলে তার মর্যাদা কম হবে, এই যুক্তি দেয়ার কারণে ইবলিস চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ -কে মাটির তৈরি বলে স্বীকার করলে তাঁর মর্যাদা কমে না। বরং আরো বৃদ্ধি পায়।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নূরের তৈরি মনে করা বাড়াবাড়ি
ঈসা (আঃ) এর উম্মতগণের মধ্যে যারা অতিভক্ত ছিল, তারা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করল। যারা বেআদব ছিল, তারা ঈসা (আঃ)-কে জারজ সন্তান বলে ঘোষণা দিল। এদের মধ্যে যারা অতিভক্ত ছিল, তারাও - গোমরাহ। যারা তাঁর সাথে বেআদবী করেছে তারাও গোমরাহ।
ঠিক তেমনি উম্মতে মুহাম্মাদীর মাঝে যারা অতিভক্ত, তারা রাসূলুল্লাহ এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে আল্লাহর জাতি নূরের সৃষ্টি বলে বিশ্বাস করে। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত আকীদা । । এ কারণে রাসূলুল্লাহ এর মুহাব্বতের ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে তাকে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করাই ন্যায়সঙ্গত।
তাছাড়া রাসূলুল্লাহ-কে নূরের তৈরি মনে করার আকীদা খ্রিস্টানদের একটি শিরকী আকীদার সাথে সাদৃশ্য রাখে। যেমন- তারা বলে থাকে যে, ঈসা (আঃ)-ই আল্লাহ। তিনি মানুষ রূপে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। অথচ এ আকীদা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ সৃষ্টি আর স্রষ্টা কখনো এক হতে পারে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ -কে আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে যদি দাবি করা হয়, তাহলে এক অর্থে তাকে আল্লাহ বলেই দাবি করা হয়। উম্মত কর্তৃক এ ধরনের বাড়াবাড়ির আশংকা ছিল বিধায় রাসূলুল্লাহ জীবদ্দশাতেই এ ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। হাদীসে এসেছে, সাল্লাল্লাহ আাসাল্লাম عَنْ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ لَا تُطَرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامِ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ فَقُولُوا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা আমার প্রশংসায় এতটা বাড়াবাড়ি করো না যেমনটা খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে করেছিল। নিশ্চয় আমি শুধুমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং রাসূলই বলবে।
টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩২৬১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৪; সুনানে দারেমী, হা/২৮৪০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৩৯।