📘 মুহাম্মাদ ﷺ ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল > 📄 যে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক

📄 যে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক


নিম্নে এই হাদীছের তিনভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করা হল। ১. হাদীছের অর্থ ২. শানে উরুদ তথা এই হাদীছ রাসূল (ছাঃ) কেন বললেন? ৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা।
হাদীছের অর্থ :
এখানে 'আমি' দ্বারা কে উদ্দেশ্য? যদি বলা হয় মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাহলে এই হাদীছের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এই হাদীছের আরেকভাবেও অর্থ হয়। 'আমি' দ্বারা প্রত্যেক কথক উদ্দেশ্য। রাসূল (ছাঃ) বলতে চাচ্ছেন, কেউ যদি বলে যে, আমি তথা ঐ কথক ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাহলে সে মিথ্যুক। আর এটা স্পষ্ট যে, আম জনসাধারণ যদি নিজেকে ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে, তাহলে সে অবশ্যই মিথ্যুক। নিম্নে এই অর্থের দু'টি দলীল পেশ করা হল :
১. এই হাদীছটি বুখারীতে এসেছে। নীচে বুখারীর ইবারাত পেশ করা হল :
وَلَا أَقُولُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ
অর্থাৎ 'আমি বলি না যে, কেউ ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
এখানে রাসূল (ছাঃ) 'আমি' ব্যবহার করেননি, বরং বলেছেন 'কেউ'। সুতরাং 'আমি' শব্দ থেকে রাসূল (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য নেয়ার যে সম্ভাবনা ছিল তা শেষ হয়ে যায়।
২. মহান আল্লাহ বলেন,
لا يَنْبَغِي لِعَبْدٍ لِي أَنْ يَقُولَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ.
অর্থাৎ 'আমার কোন বান্দার উচিত নয় যে, সে বলে আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
আলবানী (রহঃ)ও জামে ছগীরে এই হাদীছকে 'ছহীহ' বলেছেন।
এই হাদীছে কুদসী দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, 'আমি' দ্বারা আল্লাহ্র প্রত্যেক বান্দা উদ্দেশ্য। মুহাম্মাদ (ছাঃ) নয়।
প্রশ্ন হতে পারে, 'আম জনসাধারণ কিভাবে নিজেকে একজন নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হতে পারে, এই হুকুম শুধু ইউনুস (আঃ)-এর সাথে কেন খাছ করা হল? অন্য নবীদের কথা কেন বলা হল না?
এর জবাবের জন্য আমাদেরকে শানে উরূদ দেখতে হবে। তথা এই হাদীছ 'রাসূল (ছাঃ) কেন বলেছেন' তা জানতে হবে।
শানে উরূদ : পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আমাদের রাসূলকে বলেছেন,
وَلَا تَكُنْ كَصَاحِبِ الْحُوتِ.
অর্থাৎ 'আপনি আপনার প্রতিপালকের নির্দেশের উপর ধৈর্যধারণ করুন! ইউনুস-এর মত হয়ো না'।
আর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণে ধৈর্যধারণ না করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলছেন, তুমি ইউনুস (আঃ)-এর মত ধৈর্যহীন হয়ো না, বরং উলুল আযমগণের মত ধৈর্যশীল হও!
এর দ্বারা অনেকের মনে হতে পারে যে, এই আয়াতে ইউনুস (আঃ)-এর মত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব তিনি খারাপ। নাউযুবিল্লাহ!
এই দৃষ্টিকোন থেকে কেউ যদি আমাদের রাসূলকে ভাল এবং ইউনুস (আঃ)-কে খারাপ বলে বা নিজেকেই ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে ভাল মনে করে, তাহলে সে মিথ্যুক হবে এবং একজন নবীর মানহানি করার অপরাধে অপরাধী হবে।
রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের অন্তর থেকে এই আয়াতের কারণে সৃষ্টি হওয়া খারাপ ধারণা দূর করার উদ্দেশ্য এই হাদীছ বলেন। আজও যদি কুরআন পড়ার সময় এই আয়াত পাঠ কালে অন্তরে ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে তাঁর আক্বীদাকে সংশোধন করার জন্য তাঁর সামনে এই হাদীছ পেশ করা হবে।
সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা:
আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, والرسول صلى الله عليه وسلم قال هذا لما جاء في القرآن عنه من أنه لم يصبر على ما حصل من قومه؛ فذهب مغاضباً وحصل له ما حصل، والواجب توقير رسل الله عليهم الصلاة والسلام ومحبتهم والثناء عليهم
অর্থাৎ 'রাসূল (ছাঃ) এই কথা তখনই বলেছিলেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণ সহ্য না করে রাগান্বিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন'।
কেননা আল্লাহ্র রাসূলগণের সম্মান করা, তাদেরকে ভালবাসা এবং তাদের প্রশংসা করা ওয়াজিব।
ইমাম সুয়ূত্বী (রহঃ) বলেন, قال العلماء هذا زجر عن أن يتخيل أحد من الجاهلين شيئا من حط مرتبة يونس من أجل ما في القرآن العزيز في قصته ولهذا خصه بالذكر.
অর্থাৎ 'আলেমগণ বলেছেন, ইহা ঐ সমস্ত জাহেলদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কীকরণ, যারা ইউনুস (আঃ)-এর সম্মানে বিন্দুমাত্র কমতি করে। এই জন্যই এখানে শুধুমাত্র ইউনুস (আঃ)-এর নাম নেয়া হয়েছে অন্য নবীদের নাম নেয়া হয়নি'।
অতএব, কেউ যদি এই হাদীছ দ্বারা সালাফে সালেহীনের উল্টা বুঝে বলতে চায় যে, এই হাদীছে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। তাই আমাদের নবীকে অন্য নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ঠিক নয় তাহলে সে হাদীছের অর্থের বিকৃতি ঘটাবে।

টিকাঃ
৭৪. দেখুন: বুখারী, وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ -এই আয়াতের তাফসীর' অধ্যায় এবং মুসলিম, 'মূসা (আঃ) এর ফযীলত' অধ্যায়।
৭৫. দেখুন: মুসলিম, 'ইউনুস (আঃ) -এর যিকির বা উল্লেখ' অধ্যায়, ছহীহ ও যঈফ জামে সগীর হা/৭৭৮৫।
৭৬. সূরা কালাম, আয়াত নং-৪৮।
৭৭. শারহে আবুদাউদ ২৬/৪৫২, 'বাবে আত-তাখয়ির বাইনাল আম্বিয়া' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
৭৮. দেখুন, ইমাম নববী এর শারহে মুসলিম ১৫/১৩২, ইমাম সুয়ূত্বী এর শারহে মুসলিম হা/৫৯০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00