📘 মুহাম্মাদ ﷺ ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল > 📄 আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করি না

📄 আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করি না


যারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল বলতে চান না, তাদের সবচেয়ে বড় দলীল। পবিত্র কুরআনের আয়াত, لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না'।
শুধু তাই না, এই আয়াতের নামেই এই বিষয়ে লিখিত একটি বইয়ের নাম রাখা হয়েছে 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না' শিরোনামে। তাদের নিকটে এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে আমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেই না।
সঠিক ব্যাখ্যা :
মহান আল্লাহ এই আয়াত পবিত্র কুরআনে নিয়ে এসেছেন দুই জায়গায়। সূরা বাক্বারাহ আয়াত নং-১৩৪ ও সূরা আলে ইমরান আয়াত নং-৮৪। দুই জায়গাতেই আগে রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর এই আয়াত নিয়ে এসেছেন। যেমন নীচে সূরা বাক্বারাহ্ সম্পূর্ণ আয়াত পেশ করা হল :
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ (١٣٦)
অর্থাৎ 'তোমরা বল! আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ্র প্রতি এবং আমাদের প্রতি, যা অবতীর্ণ হয়েছে। এছাড়া যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, এবং তাদের বংশধরদের প্রতি। আর যা দেয়া হয়েছে মূসা ও ঈসাকে এবং আল্লাহ্ পক্ষ থেকে অন্য আরও নবীদেরকে তাঁর প্রতি। বস্তুত আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পনকারী (বাক্বারাহ ২/১৩৬)।
এই আয়াত পড়ার পর একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বুঝতে পারবে যে, এখানে 'পার্থক্য করি না' অর্থ কুফরি করি না বরং ঈমান আনি। কেননা আয়াতের আগের আলোচনাতে আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান আনতে বলেছেন এবং পরের অংশে ঈমানের বিপরীতটা থেকে নিষেধ করছেন এবং এই জন্যই মহান আল্লাহ 'হারফে আতফ' ব্যবহার করেননি।
ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন, وَأَنْ لَا يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ، بَلْ يُؤْمِنُوا بِهِمْ كُلِّهِمْ، وَلَا يَكُونُوا كَمَنْ قَالَ اللَّهُ فيهم. অর্থাৎ 'তারা যেন রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য না করে বরং ঈমান আনে'। এরপর ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) কুরআনের তাফসীর কুরআনের আয়াত দিয়ে করেছেন।
সূরা বাকারার আয়াতে আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। এই পার্থক্য করার সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا. অর্থাৎ 'আর তারা চায় যে, রাসূলগণ ও আল্লাহ্ মাঝে পার্থক্য করবে এবং বলবে আমরা কিছুর উপর ঈমান আনি এবং কিছু কুফরি করি। তারা এর মাঝে একটা রাস্তা গ্রহণ করতে চায় আর বস্তুত তারাই সত্যিকারের কাফের' (নিসা ৪/১৫০)।
এখানে মহান আল্লাহ পার্থক্য করার অর্থ স্পষ্টভাবে বলেছেন। কারো উপর ঈমান আনা আবার কারো সাথে কুফরি করাই হল পার্থক্য করা।
সুতরাং আগের আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা কিছু রাসূলের প্রতি ঈমান আনি এবং কিছু রাসূলের সাথে কুফরি যেন না করি। যারা এইরূপ করবে তারা কাফের।
যেমন ইমাম জারীর তাবারী (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
لا نؤمن ببعض الأنبياء ونكفر ببعض، ونتبرأ من بعض ونتولى بعضًا، كما تبرأت اليهود من عيسى ومحمد عليهما السلام وأقرت بغيرهما من الأنبياء، وكما تبرأت النصارى من محمد صلى الله عليه وسلم وأقرت بغيره من الأنبياء، بل نشهد لجميعهم أنهم كانوا رسل الله وأنبياءه، بعثوا بالحق والهدى
অর্থাৎ 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না তথা আমরা কিছু নবীর প্রতি ঈমান আনি আবার কিছু নবীর সাথে কুফরী করি এইরূপ করি না। আমরা কিছু নবীর সাথে সম্পর্ক করি আবার কিছু নবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি এইরূপ করিনা। যেমনটা ইহুদীরা ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাদের প্রতি ঈমান আনেনি। এই দুইজন ব্যতীত সকল নবীর প্রতি ঈমান এনেছে। নাছারারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি এবং তিনি ব্যতীত সকলের প্রতি ঈমান এনেছে। কিন্তু আমরা সকল নবী ও রাসূলগণের জন্য সাক্ষ্য দেই। তাঁরা সকলেই মহান আল্লাহ্ নবী ও রাসূল তাঁরা সত্য ও হেদায়াত নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন।
অতএব এই কথা এখন দিনের আলোর ন্যায় স্পষ্ট যে, 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না' এই আয়াতের অর্থ যদি করা হয় যে, আমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেই না, তাহলে কুরআনের আয়াতের অর্থের বিকৃতি হবে।
কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তিনি নিজেও কুরআনে রাসূলগণকে একে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ অর্থ্যাৎ ‘হে নবী! আপনি রাসূলগণের মধ্যে থেকে যারা উলুল আযম বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী রাসূল তাদের মত ধৈর্যধারণ করুন' (আহকাফ৪৬/৩৫)।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে শুরু করে সকল মুফাসসিরে কেরাম এই বিষয়ে একমত যে, এই 'উলুল আযম' বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল হচ্ছেন ৫ জন। মুহাম্মাদ (ছাঃ), ইবরাহীম, নূহ, মূসা ও ঈসা (আঃ)।
অত্র আয়াতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাঝে পাঁচ জনকে এই মহান ছিফাতে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে অন্যদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাইতো স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُs
অর্থাৎ 'এই নবী-রাসূলগণের কাউকে কারো উপর আমি বেশী সম্মানদান করেছি। তাদের কারো সাথে মহান আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাদের কাউকে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন স্থানদান করেছেন এবং ঈসা ইবনু মারিয়ামকে উজ্জ্বল নিদর্শন দান করেছেন এবং তাকে রুহুল কুদ্দুস দ্বারা সহযোগিতা করেছেন' (বাকারাহ ২/২৫৩)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মহান আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
তাইতো ইবনু কাসীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে ঐ সমস্ত হাদীছের পাঁচভাবে জবাব দিয়েছেন, যে হাদীছসমূহে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করা হয়েছে। যদি এই আয়াতের অন্য উদ্দেশ্য হত, তাহলে 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' মর্মে বর্ণিত হাদীছসমূহকে তিনি এই আয়াতের বিরোধী মনে করতেন না এবং সেগুলোর পাঁচভাবে জবাব দিতেন না।
অতএব উপরে উল্লেখিত দু'টি আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সেই হিসাবেই তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

টিকাঃ
৬৮. তাফসীরে তাবারী ৩/১১০ পৃঃ; সূরা বাকারার ১৩৬ নং আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর দ্রষ্টব্য।

📘 মুহাম্মাদ ﷺ ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল > 📄 তোমরা নবীদের মাঝে প্রাধান্য দিও না

📄 তোমরা নবীদের মাঝে প্রাধান্য দিও না


রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ.
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না'।
হাদীছের ব্যাখ্যা:
আমরা এই হাদীছের ব্যাখ্যা তিনভাবে করব। ১. শাব্দিক বিশ্লেষণ। ২. শানে উরূদ ৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা।
১. শাব্দিক বিশ্লেষণ মূলত এই হাদীছটি তিনটি শব্দে বর্ণিত হয়েছে
১. لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না'। এইভাবে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছে আব্দুর রহমান আল আরাজ। তাঁর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু ফাযল।
২. لَا تُخَيَّرُونِي عَلَى مُوسَى
অর্থাৎ 'তোমরা মূসাকে বাদ দিয়ে আমাকে বেছে নিও না'। এইভাবে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহামান আল আরাজ, আবু সালামা ও সাঈদ ইবনুল মূসায়য়িব। এই তিনজন থেকে বর্ণনা করেছেন ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ)।
৩. لَا تُخَيَّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ.
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে বেছে নিও না'। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে আসা সকল সানাদ এইভাবেই এসেছে।
অত্র হাদীছরে মধ্যে لَا تُخَيَّرُوا শব্দটি প্রাধান্য পাবে। কেননা لَا تُفَضَّلُوا এই শব্দে শুধুমাত্র আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে আবদুল্লাহ ইবনু ফাযল বর্ণনা করেছেন। অথচ এই হাদীছই ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) আব্দুর রহমান আল আরাজ থেকে لَا تُخيّرُونِي শব্দে বর্ণনা করেছেন। আব্দুর রহমান আল-আরাজ ছাড়াও দুইজন থেকে তিনি এই শব্দে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একজন হচ্ছেন বিখ্যাত তাবেয়ী সাঈদ ইবনু মুসাঈয়িব (রহঃ)।
অতএব তিনটি কারণে لَا تُخَيّرُوا তথা তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না। এই শব্দটি প্রাধান্য পাবে
১. সংখ্যাধিক্য। কেননা তিনজন রাবী এইভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনজনের মধ্যে সাঈদ ইবনু মুসায়য়িব-এর মত আবু হুরায়রা (রা)-এর খাছ ছাত্র আছেন।
২. যেই আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে আবদুল্লাহ ইবনু ফাযল বর্ণনা করছেন সেই আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে ইবনু শিহাব যুহরীও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি لَا تُخَيّرُوا শব্দে বর্ণনা করছেন। ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ)-এর ইমামাতে শানের কারণে তার বর্ণিত এই শব্দই প্রাধান্য পাবে।
৩. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত সকল সানাদে হাদীছটি এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং বলা যায় রাসূল (ছাঃ) মূলত لَا تُخَيّرُوا বা 'তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না' এই কথা বলেছিলেন।
لَا تُخَيَّرُوا শব্দের অর্থ :
মি'রাজের রাত্রে যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সামনে দুধ ও মদ দেয়া হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল, তুমি এই দুইটির মধ্যে একটিকে বেছে নাও! এখানে এই তাখয়ীর শব্দমূল থেকে নির্গত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং তাখয়ির হচ্ছে একটাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটাকে গ্রহণ করা। একটার মধ্যে কোন দুর্বলতা থাকার কারণে তাঁর উপর আরেকটাকে প্রাধান্য দেয়া।
সুতরাং এই হাদীছের কেউ যদি এই অর্থ করে যে, 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' তাহলে তা অর্থের বিকৃতি হবে; বরং সঠিক অর্থ হবে তোমরা অন্য রাসূলকে ছেড়ে আমাকে প্রাধান্য দিও না। আর এই ধরণের বিশ্বাস সর্বসম্মতিক্রমে না জায়েয।
لَا تُفَضَّلُوا তথা 'শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' শব্দের অর্থ :
(২) শানে উরূদ : কুরআনের তাফসীরে যেমন শানে নুযূলের গুরত্ব থাকে, তেমনি হাদীছের ব্যাখ্যায় শানে উরূদের গুরুত্ব। তথা এই হাদীছ রাসূল (ছাঃ) কি কারণে বলেছিলেন। এই হাদীছ বলার পিছনের কাহিনী কি? এই হাদীছ বলার পিছনের কাহিনী অন্য হাদীছে বিস্তারিত আমাদের সামনে এসেছে।
একদা এক ইহুদী মূসা (আঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ বললে একজন ছাহাবী তাকে রেগে গিয়ে থাপ্পড় মেরেছিলেন। তাঁরপর রাসূল (ছাঃ) এই হাদীছ বর্ণনা করেন।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, রাসূল (ছাঃ) শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে আরেকজন-এর সাথে ঝগড়াতে লিপ্ত হয়ে অন্য নবীর শানে গুস্তাখী বা অসমীচীন আচরণ করলে তিনি এই হাদীছ বর্ণনা করেন। তথা তোমরা রাসূলগণের মাঝে এইভাবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাদের শানে গুস্তাখী কর না। কেননা অন্য নবীগণও অনেক সম্মানী। তারাও মহান আল্লাহ্র রাসূল। তাদেরও রয়েছে অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত।
৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা: ১. ইমাম বাগাভী (রহঃ) তাঁর 'শারহুস সুন্নাহ' বইয়ে এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন,
وليس معنى النهي عن التخيير أن يعتقد التسوية بينهم في درجاتهم ، فإن الله عز وجل قد أخبرنا أنه فضل بعضهم على بعض ، فقال سبحانه وتعالى : ( تِلكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ( الآية البقرة : ٢٥٣ ) بل معناه ترك التخيير على وجه الإزراء ببعضهم ، والإخلال بالواجب من حقوقهم ، فإنه يكون سبباً لفساد الإعتقاد في بعضهم ، وذلك كفر.
অর্থাৎ 'রাসূলগণের মাঝে একজনকে আরেকজনের উপর প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এটা নয় যে, আমরা বিশ্বাস করব তাঁরা সকলেই মর্যাদাগত ভাবে সমান। কেননা স্বয়ং আল্লাহই বলেছেন যে, তিনি কিছু রাসূলকে কিছু রাসূলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অত্র নিষেধাজ্ঞার সঠিক অর্থ হচ্ছে কোন নবীর শানে গুস্তাখী করে এবং তাদের মানের হানি করে অন্য নবীকে প্রাধান্য না দেওয়া। কেননা এতে আক্বীদার মধ্যে ভ্রান্তি সৃষ্টি হয় আর এটা কুফুরী'।
২. এই হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)ও একই কথা বলেছেন। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে যেন অন্য নবীদের অপমান না করা হয়।
৩. ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) তাঁর লিখিত দালায়িলুন নবুওয়াতে বলেন, باب ما جاء في التخيير بين الأنبياء قال الله عز وجل : تلك الرسل فضلنا بعضهم على بعض فأخبر بأنه فاوت بينهم في الفضل ، فأما الأخبار التي وردت في النهي عن التخيير بين الأنبياء فإنما هي في مجادلة أهل الكتاب في تفضيل نبينا عليه السلام على أنبيائهم عليهم السلام ؛ لأن المخايرة إذا وقعت بين أهل دينين مختلفين لم يؤمن أن يخرج كل واحد منهما في تفضيل من يريد تفضيله إلى الإزراء بالآخر ف يكفر بذلك অর্থাৎ 'মহান আল্লাহ বলেন, আমি রাসূলগণের কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিয়েছি। এই আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে পার্থক্য করেছেন। আর 'রাসূলগণের মাঝে কাউকে প্রাধান্য দিতে নিষেধ' মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলো মূলত আহলে কিতাবদের সাথে গণ্ডগোলের সময়ে তাদের নবীর উপর আমাদের নবীকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে। কেননা যখন দুই ধর্মের অনুসারীর মাঝে নবীদেরকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে ঝগড়া হবে তখন তাঁরা নবীদের শানে গুস্তাখী এবং তাদের মানহানি করে ফেলবে এবং এর দ্বারা তাঁরা কাফের হয়ে যাবে।
ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ)-এর কথার সারমর্মও এই যে, প্রাধান্য দিতে গিয়ে যেন মানহানি না হয়।
অতএব সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, কেউ যদি অন্য নবীদের প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে তাদের মানহানি করতঃ কোন রাসূলকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। নিষেধের হাদীছগুলো মূলত তাদের জন্যই।

টিকাঃ
৬৯. বুখারী وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ -এই আয়াতের তাফসীর অধ্যায়।
৭০. দেখুন, বুখারী, 'ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে ঝগড়া অধ্যায় ও মূসা (আঃ)-এর মৃত্যু' অধ্যায়।
৭১. দেখুন, বুখারী, 'ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে ঝগড়া' অধ্যায়
৭২. দেখুন: শারহুস সুন্নাহ ১৩/২০৪।
৭৩. দেখুন, ফাহুল বারী হা/৩১৫৬, ১০/২০৫।

📘 মুহাম্মাদ ﷺ ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল > 📄 যে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক

📄 যে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক


নিম্নে এই হাদীছের তিনভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করা হল। ১. হাদীছের অর্থ ২. শানে উরুদ তথা এই হাদীছ রাসূল (ছাঃ) কেন বললেন? ৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা।
হাদীছের অর্থ :
এখানে 'আমি' দ্বারা কে উদ্দেশ্য? যদি বলা হয় মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাহলে এই হাদীছের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এই হাদীছের আরেকভাবেও অর্থ হয়। 'আমি' দ্বারা প্রত্যেক কথক উদ্দেশ্য। রাসূল (ছাঃ) বলতে চাচ্ছেন, কেউ যদি বলে যে, আমি তথা ঐ কথক ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাহলে সে মিথ্যুক। আর এটা স্পষ্ট যে, আম জনসাধারণ যদি নিজেকে ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে, তাহলে সে অবশ্যই মিথ্যুক। নিম্নে এই অর্থের দু'টি দলীল পেশ করা হল :
১. এই হাদীছটি বুখারীতে এসেছে। নীচে বুখারীর ইবারাত পেশ করা হল :
وَلَا أَقُولُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ
অর্থাৎ 'আমি বলি না যে, কেউ ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
এখানে রাসূল (ছাঃ) 'আমি' ব্যবহার করেননি, বরং বলেছেন 'কেউ'। সুতরাং 'আমি' শব্দ থেকে রাসূল (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য নেয়ার যে সম্ভাবনা ছিল তা শেষ হয়ে যায়।
২. মহান আল্লাহ বলেন,
لا يَنْبَغِي لِعَبْدٍ لِي أَنْ يَقُولَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ.
অর্থাৎ 'আমার কোন বান্দার উচিত নয় যে, সে বলে আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
আলবানী (রহঃ)ও জামে ছগীরে এই হাদীছকে 'ছহীহ' বলেছেন।
এই হাদীছে কুদসী দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, 'আমি' দ্বারা আল্লাহ্র প্রত্যেক বান্দা উদ্দেশ্য। মুহাম্মাদ (ছাঃ) নয়।
প্রশ্ন হতে পারে, 'আম জনসাধারণ কিভাবে নিজেকে একজন নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হতে পারে, এই হুকুম শুধু ইউনুস (আঃ)-এর সাথে কেন খাছ করা হল? অন্য নবীদের কথা কেন বলা হল না?
এর জবাবের জন্য আমাদেরকে শানে উরূদ দেখতে হবে। তথা এই হাদীছ 'রাসূল (ছাঃ) কেন বলেছেন' তা জানতে হবে।
শানে উরূদ : পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আমাদের রাসূলকে বলেছেন,
وَلَا تَكُنْ كَصَاحِبِ الْحُوتِ.
অর্থাৎ 'আপনি আপনার প্রতিপালকের নির্দেশের উপর ধৈর্যধারণ করুন! ইউনুস-এর মত হয়ো না'।
আর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণে ধৈর্যধারণ না করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলছেন, তুমি ইউনুস (আঃ)-এর মত ধৈর্যহীন হয়ো না, বরং উলুল আযমগণের মত ধৈর্যশীল হও!
এর দ্বারা অনেকের মনে হতে পারে যে, এই আয়াতে ইউনুস (আঃ)-এর মত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব তিনি খারাপ। নাউযুবিল্লাহ!
এই দৃষ্টিকোন থেকে কেউ যদি আমাদের রাসূলকে ভাল এবং ইউনুস (আঃ)-কে খারাপ বলে বা নিজেকেই ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে ভাল মনে করে, তাহলে সে মিথ্যুক হবে এবং একজন নবীর মানহানি করার অপরাধে অপরাধী হবে।
রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের অন্তর থেকে এই আয়াতের কারণে সৃষ্টি হওয়া খারাপ ধারণা দূর করার উদ্দেশ্য এই হাদীছ বলেন। আজও যদি কুরআন পড়ার সময় এই আয়াত পাঠ কালে অন্তরে ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে তাঁর আক্বীদাকে সংশোধন করার জন্য তাঁর সামনে এই হাদীছ পেশ করা হবে।
সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা:
আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, والرسول صلى الله عليه وسلم قال هذا لما جاء في القرآن عنه من أنه لم يصبر على ما حصل من قومه؛ فذهب مغاضباً وحصل له ما حصل، والواجب توقير رسل الله عليهم الصلاة والسلام ومحبتهم والثناء عليهم
অর্থাৎ 'রাসূল (ছাঃ) এই কথা তখনই বলেছিলেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণ সহ্য না করে রাগান্বিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন'।
কেননা আল্লাহ্র রাসূলগণের সম্মান করা, তাদেরকে ভালবাসা এবং তাদের প্রশংসা করা ওয়াজিব।
ইমাম সুয়ূত্বী (রহঃ) বলেন, قال العلماء هذا زجر عن أن يتخيل أحد من الجاهلين شيئا من حط مرتبة يونس من أجل ما في القرآن العزيز في قصته ولهذا خصه بالذكر.
অর্থাৎ 'আলেমগণ বলেছেন, ইহা ঐ সমস্ত জাহেলদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কীকরণ, যারা ইউনুস (আঃ)-এর সম্মানে বিন্দুমাত্র কমতি করে। এই জন্যই এখানে শুধুমাত্র ইউনুস (আঃ)-এর নাম নেয়া হয়েছে অন্য নবীদের নাম নেয়া হয়নি'।
অতএব, কেউ যদি এই হাদীছ দ্বারা সালাফে সালেহীনের উল্টা বুঝে বলতে চায় যে, এই হাদীছে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। তাই আমাদের নবীকে অন্য নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ঠিক নয় তাহলে সে হাদীছের অর্থের বিকৃতি ঘটাবে।

টিকাঃ
৭৪. দেখুন: বুখারী, وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ -এই আয়াতের তাফসীর' অধ্যায় এবং মুসলিম, 'মূসা (আঃ) এর ফযীলত' অধ্যায়।
৭৫. দেখুন: মুসলিম, 'ইউনুস (আঃ) -এর যিকির বা উল্লেখ' অধ্যায়, ছহীহ ও যঈফ জামে সগীর হা/৭৭৮৫।
৭৬. সূরা কালাম, আয়াত নং-৪৮।
৭৭. শারহে আবুদাউদ ২৬/৪৫২, 'বাবে আত-তাখয়ির বাইনাল আম্বিয়া' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
৭৮. দেখুন, ইমাম নববী এর শারহে মুসলিম ১৫/১৩২, ইমাম সুয়ূত্বী এর শারহে মুসলিম হা/৫৯০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00