📄 মুহাম্মাদ (ছাঃ)-ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল
সকল নবীর (আঃ) ফযীলত মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমতঃ সকল নবীকে এমন কিছু ফযীলত দেয়া হয়েছে, যা অন্য নবীদেরকেও দেয়া হয়েছে। যেমন : মূসা (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। মে'রাজে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথেও কথা বলেছেন। দ্বিতীয়তঃ কিছু কিছু নবীকে এমন কিছু ফযীলত দেয়া হয়েছে, যা অন্য নবীদেরকে দেয়া হয়নি। কিন্তু এই ফযীলত অন্য নবীদের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। কেননা এই রকম খাছ ফযীলত অনেককেই দেয়া হয়েছে। এই রকম ফযীলত আমাদের নবীসহ অন্য অনেক নবীকেই দেয়া হয়েছে। যেমন ঈসা (আঃ)-কে পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করা তার জন্য খাছ ফযিলত, যা অন্য নবীদেরকে দেয়া হয়নি। ক্বিয়ামতের মাঠে সর্বপ্রথম পোশাক পরিধান করানো হবে ইবরাহীম (আঃ)-কে। এই ফযীলত তাঁর জন্য খাছ। আরো সহজভাবে বলা যায়, প্রত্যেক নবীর কিছু জুযয়ী বা আংশিক ফযীলত রয়েছে, যা অন্য সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। কিন্তু আমাদের নবী ও শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শুধু জুযয়ী বা আংশিক ফযীলত নয়, বরং কুল্লী বা সমষ্টিগত ফযীলত রয়েছে, যা অন্য সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। ইনশাআল্লাহ আমরা কুরআন ও হাদীছ থেকে সেগুলো আলোচনা করার প্রয়াস পাব।
কুরআন থেকে দলীল
১. মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ
অনুবাদ : 'তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত, যাদেরকে মানুষদের জন্য বের করা হয়েছে। যাতে করে তোমরা তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বাঁধাদান করতে পার। যদি আহলে কিতাবগণ ঈমান নিয়ে আসত, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গল হত। তথা তারা এই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। তাদের মধ্যে কিছু মুসলিম এবং অধিকাংশই কাফের' (আলে ইমরান ৩/১১০)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না' মর্মে লিখিত বইয়ে বলা হয়েছে যে, এখানে 'তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত' বলে রাসূল (ছাঃ)-এর উম্মাত উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রত্যেক উম্মাতের মুমিনগণ উদ্দেশ্য।
আসুন আমরা দেখি সালাফে ছালেহীন এই আয়াতের ব্যাখ্যায় 'উম্মাত' বলতে কোন্ উম্মাত বুঝেছেন। উল্লেখ্য যে, আলোচিত বইয়ে সম্পূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হয়নি। শুধু আয়াতের ১ম অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। যদি আমরা সম্পূর্ণ আয়াত পড়ি এবং আয়াতের আগের ও পিছনের আলোচনা, যাকে আরবীতে 'সিয়াক' ও 'সাবাক' বলা হয়; দেখি তাহলে স্পষ্ট বুঝে আসবে, এখানে আল্লাহ 'উম্মাত' দ্বারা 'উম্মাতে মুহাম্মাদী'-কে বুঝিয়েছেন। কেননা আল্লাহ আয়াতের সাথেই এটা বলেছেন যে, 'যদি আহলে কিতাবগণ ঈমান নিয়ে আসত, তাহলে তাদের জন্য মঙ্গল হত' দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, তারা এই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই আয়াতের পরেই আল্লাহ ইহুদী সম্প্রদায়কে 'অভিশপ্ত সম্প্রদায়' বলেছেন। এর দ্বারাও বুঝা যায় তারা 'শ্রেষ্ঠ উম্মাত' নয়।
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূল (ছাঃ)-এর একটি হাদীছ নকল করেছেন। যেখানে স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি (ছাঃ) বলেন,
إِنَّكُمْ تُتِمُّونَ سَبْعِينَ أُمَّةً أَنْتُمْ خَيْرُهَا وَأَكْرَمُهَا عَلَى اللَّه.
অর্থাৎ 'তোমরা উম্মাতের সংখ্যা সত্তর পূর্ণ করেছ। তোমরাই এই সত্তর উম্মাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে সম্মানী'। আলবানী (রহঃ) এই হাদীছকে তিরমিযির তাহক্বীক্বে 'হাসান' বলেছেন।
ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন,
يخبر تعالى عن هذه الأمة المحمدية بأنهم خير الأمم فقال كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ. أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ.
অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'আলা উম্মাতে মুহাম্মাদিয়া সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা সকল উম্মাতের মাঝে শ্রেষ্ঠ। তাই তিনি বলছেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত যাদেরকে মানুষদের জন্য বের করা হয়েছে'।
ইবনু কাছীর (রহঃ) আরো বলেন,
وإنما حازت هذه الأمة قَصَبَ السَّبْق إلى الخيرات بنبيها محمد صلى الله عليه وسلم فإنه أشرف خلق الله أكرم الرسل على الله، وبعثه الله بشرع كامل عظيم لم يعطه نبيا قبله ولا رسولا من الرسل. অর্থাৎ 'এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হচ্ছে, এই উম্মাতের রাসূল শ্রেষ্ঠ। কেননা তিনি আল্লাহ্র সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে সম্মানিত এবং নবীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহ তাকে এমন পূর্ণ শরী'আত দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যা অন্য কোন রাসূলকে দেননি'।
ইবনু কাছীর (রহঃ)-এর কথা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এখানে 'উম্মাত' দ্বারা 'উম্মাতে মুহাম্মাদিয়া' উদ্দেশ্য। উম্মাতী মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হচ্ছে, এই উম্মাতের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) সকল নবীর শ্রেষ্ঠ রাসূল। এরপর ইবনু কাছীর (রহঃ) দলীল হিসাবে একটি হাদীছ পেশ করেন। হাদীছকে তিনি 'হাসান' বলেছেন। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
وَجُعِلَتْ أُمَّتِي خَيْرَ الأُمَمِ . অর্থাৎ 'আমার উম্মাতকে শ্রেষ্ঠ উম্মাত করা হয়েছে'।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাওকানী (রহঃ) তাঁর বিশ্বসেরা তাফসীর গ্রন্থ 'ফাল্গুল ক্বাদীরে' বলেন,
يتضمن بيان حال هذه الأمة في الفضل على غيرها من الأمم . অর্থাৎ 'এই আয়াতে 'উম্মাতে মুহাম্মাদি অন্য উম্মাতের উপর শ্রেষ্ঠ' এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (রহঃ) তাঁর 'তাফসীরে জালালাইনে' এই আয়াতে কাকে সম্বোধন করা হয়েছে তা স্পষ্ট করতে গিয়ে বলেন,
كُنتُمْ" يَا أُمَّةً مُحَمَّد فِي عِلْمِ اللهِ تَعَالَى " خَيْر أُمَّة.
অর্থাৎ 'হে উম্মাতে মুহাম্মাদী! তোমরা আল্লাহ্র জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ উম্মাত'।
এই আয়াতের তাফসীরে প্রায় সকল সালাফে ছালেহীন এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার অনেক কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন- এই উম্মাতের সত্তর হাযার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে।
সুতরাং এই কথা স্পষ্ট যে, উম্মাতে মুহাম্মাদী সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাত। কেননা তাদের নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।
প্রশ্ন হতে পারে, উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠ হওয়া থেকে কিভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) শ্রেষ্ঠ রাসূল।
মূলত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার সাথে সেই উম্মাতের নবীর শ্রেষ্ঠত্ব ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। নিম্নে এই মর্মে কয়েকটি হাদীছ পেশ করা হল : মে'রাজের রাত্রে যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ) মূসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মূসা (আঃ) কাঁদছিলেন। তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
أَبْكِي لِأَنَّ غُلَامًا بُعِثَ بَعْدِي يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِهِ أَكْثَرُ مِمَّنْ يَدْخُلُهَا مِنْ أُمَّتِي.
অর্থাৎ 'আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পরে একজন যুবককে প্রেরণ করা হয়েছে, যার উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে বেশী জান্নাতে যাবে'। এখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের সাথে নবীর শ্রেষ্ঠত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নাহলে ইহুদী সম্প্রদায় জান্নাতে কম যাবে এতে মূসা (আঃ)-এর দুঃখ করার কি আছে? এই জন্যই আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেছেন,
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمُ الْأُمَمَ.
অর্থাৎ 'তোমরা অত্যধিক সন্তান প্রসবকারীনি মেয়েকে বিবাহ কর। কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে ক্বিয়ামতের মাঠে গর্ব করব'।” তিনি আরও বলেন,
إني مكاثر بكم الأمم فلا تقتتلن بعدي.
অর্থাৎ 'তোমরা পরস্পরে মারামারিতে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমি তোমাদের নিয়ে গর্ব করব'। অন্য হাদীছে স্পষ্ট এসেছে যে, 'তিনি মূলত অন্য নবীদের সাথে গর্ব করবেন'।
এক কথায় উম্মাত ও সেই উম্মাতের নবীর শ্রেষ্ঠত্ব পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই যখন কুরআন থেকে এই কথা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, উম্মাতে মুহাম্মাদী সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাত। তাহলে অবশ্যই এটাও প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, এই উম্মাতের নবীও শ্রেষ্ঠ। আর কেনইবা নয়? যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাতের নেতা তিনি কেমনে সর্বশ্রেষ্ঠ হবেন না? যদি সর্বশ্রেষ্ঠ না হন, তাহলে তো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাতের নেতা বা নবী হওয়ার যোগ্যতা নেই। নাঊযুবিল্লাহ! মহান আল্লাহ আমাদের এহেন ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে রক্ষা করুন।
এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার আরেকটি সহজ দলীল হচ্ছে, ঈসা (আঃ) যখন আসমান থেকে নামবেন, তখন ইমাম মাহদী তাকে ইমামতি করাতে বলবেন। কিন্তু তিনি এই উম্মাতের সম্মানে ইমামতি করাবেন না। একজন মহান নবী (আঃ) এই উম্মাতকে এতটা সম্মান জানাচ্ছেন এই উম্মাতের নবী কত মহান হতে পারে। অতএব এটাই সত্য যে, সকল উম্মাতের মাঝে শ্রেষ্ঠ উম্মাত উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং সকল নবীর মাঝে শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)।
২. রাসূল (ছাঃ)-এর নামে কসম : মহান আল্লাহ দুনিয়ার কোন মানুষের নামে কসম খাননি একমাত্র আমাদের রাসূল ব্যতীত। তিনি বলেন,
لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ .
অর্থ্যাৎ 'আপনার জীবনের কসম! নিশ্চয় তারা আনন্দ উল্লাসে মত্ত রয়েছে'। এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন,
أقسم تعالى بحياة نبيه صلوات الله وسلامه عليه، وفي هذا تشريف عظيم، ومقام رفيع وجاه عريض.
অর্থাৎ 'আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের কসম করেছেন। আর এই কসমের মধ্যে রয়েছে মহান সম্মান, উঁচু স্থান এবং অসামান্য খ্যাতি'।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قال عمرو بن مالك التكري عن أبي الجوزاء، عن ابن عباس، أنه قال: ما خلق الله وما ذرأ وما برأ نفسًا أكرم عليه من محمد صلى الله عليه وسلم، وما سمعت الله أقسم بحياة أحد غيره، قال الله تعالى: { لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ.
অর্থাৎ 'আল্লাহ এমন কিছু সৃষ্টি করেননি, যা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস মহান আল্লাহকে আর কারো হায়াত নিয়ে [কুরআনে] কসম খেতে শুনিনি একমাত্র মুহাম্মাদ (ছাঃ) ব্যতীত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, 'আপনার জীবনের কসম! তারা আনন্দ উল্লাসে মেতে আছে'।
আবুবকর আদ-দিনোয়ারী (রহঃ) তার المجالسة وجواهر العلم বইয়ে এই সানাদকে 'হাসান' বলেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর এই কথা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ্র মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নামে শপথ করা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল। সাথে সাথে ছাহাবীগণ যে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসাবে বিশ্বাস করতেন তাও প্রমাণিত হয়।
৩. সকল নবীর নিকট শপথ গ্রহণ : মহান আল্লাহ বলেন,
إِذْ أَخَذَ الله مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولُ مُصَدِّقُ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرَنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ .
অর্থাৎ 'আর যখন মহান আল্লাহ সকল নবীর শপথ নিলেন, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকটে রাসূল আসবেন। তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়ন করবেন। তখন অবশ্যই তোমরা তার উপর ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। আল্লাহ নবীগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা কি স্বীকৃতি দিলে এবং এই কথা মানার অঙ্গীকার করলে? তখন সকল নবী বললেন, আমরা স্বীকৃতি দিলাম। আল্লাহ বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম' (আলে ইমরান ৩/৮১)।
ইবনু কাছীর (রহঃ) অত্র আয়াতের তাফসীরে বলেন,
فالرسول محمد خاتم الأنبياء صلوات الله وسلامه عليه، دائما إلى يوم الدين، وهو الإمام الأعظم الذي لو وجد في أي عصر وجد لكان هو الواجب الطاعة المقدم على الأنبياء كلهم؛ ولهذا كان إمامهم ليلة الإسراء لما اجتمعوا ببيت المقدس، وكذلك هو الشفيع في يوم الحشر في إتيان الرب لفصل القضاء، وهو المقام المحمود الذي لا يليق إلا له
'আর মুহাম্মাদ তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক ক্বিয়মাত পর্যন্ত। তিনিই হচ্ছেন মহান ইমাম। যদি তাঁকে কোন যুগে পাওয়া যায়, তাহলে সকল নবীর উপর তাঁর আনুগত্য করা যরূরী হবে। এই জন্য তিনিই তো মে'রাজের রাত্রে তাদের ইমাম ছিলেন, যখন তারা বায়তুল মাক্বদিসে একত্রিত হয়েছিলেন। অনুরূপ তিনিই হাশরের ময়দানে আল্লাহ্র নিকট বিচার শুরু করার সুফারিশ করবেন। আর এটাই মাক্বামাম মাহমূদ, যা তিনি ব্যতীত কারো জন্য শোভা পায় না।
সুতরাং এই আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ করছে যে, মুহম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর ঈমান নিয়ে আসার জন্য সকল রাসূলের শপথ নেয়াটা মুহম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল রাসূলের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
৪. মহান আল্লাহ সূরা ইনশিরাহে বলেন, وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ [الشرح: ٤] অর্থাৎ 'এবং আমি আপনার স্মরণ বা যিকরকে উঁচু করে দিয়েছি' (ইনশিরাহ ৪)।
এই উঁচু করে দেয়ার ব্যাখ্যায় স্বয়ং মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেন,
عن أنس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "لما فرغت مما أمرني الله به من أمر السموات والأرض قلت: يا رب، إنه لم يكن نبي قبلي إلا وقد كرمته، جعلت إبراهيم خليلا وموسى كليما، وسخرت لداود الجبال، ولسليمان الريح والشياطين، وأحييت لعيسى الموتى، فما جعلت لي؟ قال: أو ليس قد أعطيتك أفضل من ذلك كله، أني لا أذكر إلا ذكرت معي،
অর্থাৎ 'যখন আমি আমার দায়িত্ব থেকে ফারেগ হলাম তখন বললাম, হে আমার প্রতিপালক! ইতিপূর্বে প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে আপনি সম্মানিত করেছেন। আপনি ইবরাহীমকে আপনার বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। মূসার সাথে কথা বলেছেন। দাউদের জন্য পাহাড়-পর্বতকে অনুগত করে দিয়েছেন। সুলায়মানের জন্য জীন শয়তান ও বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছেন এবং ঈসার জন্য মৃতকে জীবিত করেছেন। কিন্তু আমার জন্য কি করেছেন? মহান আল্লাহ জবাবে বললেন, আমি কি তোমাকে এই সবগুলোর চেয়ে শ্রেষ্ঠটা দেইনি? দুনিয়াতে যখনই আমার নাম নেয়া হবে বা আমাকে স্মরণ করা হবে তখনই সাথে সাথে তোমাকেও স্মরণ করা হবে, তোমার নাম নেয়া হবে।
হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, আল্লাহ তাঁর নামের স্মরণের সাথে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নামকে যুক্ত করে তাঁকে এমন সম্মান দিয়েছেন, যা অন্য সকল নবী ও রাসূলকে দেয়া সম্মানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ফালিল্লাহিল হামদ।
তাইতো আমরা দেখি, আযানে, ইক্বামাতে, তাশাহ্হুদে, কালেমাতে আল্লাহ্ নামের পাশাপাশি তাঁর রাসূলের নাম উচ্চারিত হয় এবং আল্লাহর কাছে কোন দু'আ করার জন্য তাঁর হামদ ও ছানার পর তাঁর রাসূলের উপর দরুদ পড়ে কোন দু'আ করলে তা তাড়াতাড়ি কবুল হয়।
তাহক্বীক্ব : অধম হাদীছটিকে তাফসীর ইবনু কাছীর-এর সূরা ইনশিরাহের এই আয়াতের তাফসীরে পেয়েছে। এই হাদীছ উল্লেখ করার পর নিচে টীকাতে লেখা আছে,
ওয়াযকারাহুল মুআল্লিফু ফিল বিদায়াতি ওয়ান নিহায়াতি ছুম্মা ক্বালাঃ "ওয়াহাযা ইসনাদুন ফিহি গারাবাতুন, ওয়ালাকিন উরিদু লাহু শাহিদান মিন তরীক্বি আবিল ক্বাসিমি বিন মুনিঈল বাগুয়ী, আন সুলায়মানা বিন দাউদাল মিহরাণী, আন হাম্মাদ বিন যায়দ, আন আত্বা বিন আস সায়েব, আন সাঈদ বিন যুবাইর, আন ইবন আব্বাস মারফুআন বিনাহুউ।"
অর্থাৎ 'এই হাদীছকে ইবনু কাছীর (রহঃ) তাঁর 'বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ' বইয়ে নিয়ে এসেছেন। সেখানে ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, এই হাদীছের সানাদে কিছুটা গারাবাত রয়েছে, কিন্তু এই হাদীছের শাহেদ বা সাক্ষী অন্য সানাদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে মারফু' সূত্রে এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ অধম বিদায়া ও নিহায়াতে এই হাদীছের অন্য সানাদটি পেয়েছে।
ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) এই শাহেদ পেশ করার মাধ্যমে হাদীছটির 'হাসান' হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, এই সানাদের রাবি আতা ইবনু সায়িব-এর স্মৃতিশক্তি খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অত্র হাদীছে হাম্মাদ ইবনু যায়দ তার কাছ থেকে স্মৃতিশক্তি খারাপ হওয়ার আগেই শ্রবণ করেছে।
হাদীছ থেকে দলীল
১.
عن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم يخرج في آخر الزمان قوم أحداث الأسنان سفهاء الأحلام يقرءون القرآن لا يجاوز تراقيهم يقولون من قول خير البرية يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, শেষ যামানায় কিছু মানুষ বের হবে। যারা হবে অল্প বয়স্ক বোকা। তাঁরা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কথা থেকে কথা বলবে তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর হাদীছ শুনাবে। তাঁরা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর বের হয়ে যায় ধনুক থেকে।
'এই হাদীছ এর সানাদ ছহীহ এবং এই হাদীছ আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ)- এর উপর মাওকুফ নয়। কেননা তিনি এই হাদীছকে অন্য রিওয়ায়েতে রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্পর্কিত করেছেন'।
অনেক মূসান্নিফ ইমাম হাকেমের এই কথা উল্লেখ করে ক্ষান্ত হয়ে গেছেন। তাঁরা ঐ মারফু সানাদটি কোথায় আছে তা বলেন নি।
আল হামদুলিল্লাহ! অধম এই মারফু সানাদটি ইমাম আবু নুয়াইম আল ইস্পাহানী (রহঃ) কর্তৃক লিখিত সিফাতুল জান্নাত বইয়ে পেয়েছে।” তিনি এই হাদীছকে 'আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মাদ (ছাঃ)' নামক অধ্যায়ে নিয়ে এসেছেন। অতএব হাদীছটি নিঃসন্দেহে মারফু' সূত্রে ছহীহ। ফালিল্লাহিল হামদ।
৩. উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إذا كان يوم القيامة كنت إمام النبيين وخطيبهم وصاحب شفاعتهم. অর্থাৎ 'আমি ক্বিয়ামতের দিন সকল নবীদের ইমাম বা নেতা হব এবং তাদের মুখপাত্র হব তথা যখন ক্বিয়ামতের মাঠে তারা আল্লাহ্র সামনে কথা বলতে পারবেন না, তখন আমি তাদের পক্ষ থেকে কথা বলব এবং তাদের জন্য সুপারিশকারী হব'।
তাহক্বীক: মারফু' ছহীহ। আলবানী (রহঃ) তিরমিযীর তাহক্বীক্বে এই হাদীছকে 'হাসান' বলেছেন। শুয়াইব আরনাউত্ব এই হাদীছকে 'ছহীহ' বলেছেন। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে মুহাম্মাদ (ছাঃ) সকল নবীর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ। কেননা যিনি সকল নবীর ইমাম বা নেতা হবেন তিনি অবশ্যই সকল নবীর মাঝে শ্রেষ্ঠ হবেন।
৪. أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আমি ক্বিয়ামাতের মাঠে সকল আদম সন্তানের সরদার হব। আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যাকে প্রথমে কবর থেকে উঠানো হবে। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে প্রথমে শাফা'আত করবে এবং যার শাফা'আত প্রথমে গ্রহণ করা হবে। সালাফে ছালেহীন এই হাদীছ দ্বারা সকল আদম সন্তানের উপর রাসূল (ছাঃ)- এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করেছেন।
৫. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, أنا سيد ولد آدم يوم القيامة ولا فخر وبيدي لواء الحمد ولا فخر وما من نبي يومئذ آدم فمن سواه إلا تحت لوائي অর্থাৎ 'ক্বিয়ামতের মাঠে সকল আদম সন্তানের সরদার আমি হব এবং আমি এটা গর্ব করে বলছি না। ঐ দিন আমার হাতে হবে প্রশংসার ঝাণ্ডা। আর ঐ দিন প্রত্যেক নবী আমার এই ঝাণ্ডার নীচে সমবেত হবেন। এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, আদম (আঃ) থেকে শুরু করে সকল নবী সেই দিন মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর ঝাণ্ডার নীচে সমবেত হবেন। এটা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অন্য সকল নবীদের উপর সমষ্টিগত ফযীলত। অতএব তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল এবং সকল রাসূলগণের সরদার। এছাড়া এই হাদীছ অন্য শব্দে أنا خير ولد آدم يوم القيامة ولا فخر এভাবেও এসেছে। 'আমিই হব ক্বিয়ামতের মাঠে আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মাঝে শ্রেষ্ঠ সন্তান'। ইমাম উকাঈলী (রহঃ) তাঁর 'যু'আফা' নামক বইয়ে বলেন, والأسانيد الجياد عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال : « أنا خير ولد آدم يوم القيامة ولا فخر অর্থাৎ 'হাদীছের এই ইবারাত রাসূল (ছাঃ) থেকে ছহীহ সানাদ দ্বারা প্রমাণিত।
৬. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন بعثت من خير قرون بني آدم.
অর্থাৎ 'আমি প্রেরিত হয়েছি আদম সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে'। এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) পৃথিবীর শুরু থেকে নিয়ে ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে প্রেরিত হয়েছেন। আর তিনি তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। অতএব তিনি সকল যামানার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। ফালিল্লাহিল হামদ।
৭. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
وَأَنَا أَكْرَمُ وَلَدِ آدَمَ عَلَى رَبِّي
'আমি আল্লাহ্র নিকটে সকল আদম সন্তানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ'।
তাহক্বীক্ব : এই হাদীছকে ইমাম তিরমিযী (রহঃ) 'হাসান গরীব' বলেছেন এবং আলবানী (রহঃ) 'যঈফ' বলেছেন।
যঈফ বলার কারন: এই হাদীছে তিরমিযীর সানাদে একজন রাবী আছে যার নাম লাইস ইবনু আবি সুলাইম। তার স্মৃতিশক্তি খারাপ হয়ে যায় এবং তাঁর স্মৃতিশক্তি খারাপ হওয়ার আগের ও পরের হাদীছ এর মাঝে পার্থক্য না করতে পারার দরুন তাঁর হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়।
হাদীছ ছহীহ : অধমের মতে এই হাদীছ ছহীহ। কেননা এই যঈফ রাবীর একজন মুতাবি' তথা এই রাবীর স্থলে অন্য একজন রাবি রয়েছে। হাদীছটিকে ইমাম বায়হাকী (রহঃ) তাঁর 'দালায়িলুন নবুঅত' বইয়ে بَابُ مَا جَاءَ فِي تَحَدُّثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِنِعْمَةِ رَبِّهِ নিয়ে এসেছেন। ফালিল্লাহিল হামদ।
ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেন, تابعه محمد بن فضيل عن عبيد الله بن زحر অর্থাৎ 'লাইসের মুতাবাত করেছে মুহাম্মাদ ইবনু ফুযাইল। আর এই মুহাম্মাদ ইবনু ফুযাইল সম্পর্কে হাফিয (রহঃ) তাঁর তাক্বরীবুত তাহযীবে বলেন, ছুদুক বা সত্যবাদী'।
অতএব এই রাবীর হাদীছ গ্রহণযোগ। সুতরাং এই হাদীছ মারফু সূত্রে ছহীহ। আল-হামদুলিল্লাহ!
৮. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً ، وَإِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ ، إِنَّ مُحَمَّدًا أَكْرَمُ الْخَلْقِ عَلَى اللهِ ، ثُمَّ قَرَأَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا অর্থাৎ 'আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদের সাথী তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও আল্লাহ্র বন্ধু। নিশ্চয় মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এরপর তিনি কুরআন থেকে পাঠ করেন, 'আশা করা যায় যে, আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাক্বামাম মাহমূদ বা সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন স্থান দান করবেন।
এই হাদীছটি ইমাম আবুদাউদ ত্বায়ালিসী (রহঃ) মাসূদী থেকে তিনি আসেম থেকে তিনি আবু ওয়াইল থেকে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনু আবি শায়বা (রহঃ) আলি ইবনু হাফস থেকে তিনি মাসূদী থেকে তাঁরপর হাদীছের সানাদ অনুরূপ।
তাহক্বীক : এই হাদীছের কোন তাহক্বীক্ব আমি আলবানী (রহঃ)-এর পক্ষ থেকে পাইনি।
অধমের মতে মাসূদী হচ্ছেন আব্দুর রহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাসূদ। এনার সম্পর্কে হাফিয (রহঃ) তাক্বরীবুত তাহযীবে বলেন ছুদুক। কিন্তু শেষ জীবনে তাঁর স্মৃতিশক্তি খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যারা তাঁর কাছ থেকে হাদীছ বাগদাদে শুনেছে তাদের হাদীছ গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু যারা তাঁর কাছ থেকে কুফা এবং বসরাতে হাদীছ শুনেছে তাদের হাদীছ গ্রহণ করা হবে।
এই হাদীছে মাসুদী থেকে দুইজন রাবী রিওয়ায়েত করেছেন। ইমাম আবুদাউদ ত্বায়ালিসী, যার কাছ থেকে ইমাম বুয়াইসিরী (রহঃ) তাঁর লিখিত إتحاف الخيرة المهرة বইয়ে এই হাদীছটি নকল করেছেন। আরেকজন হছেন আলী ইবনু হাফস, যার কাছ থেকে এই হাদীছ ইবনু আবী শায়বা তাঁর মুছান্নাফে নকল করেছেন। বাকী সানাদটা হচ্ছে আসেম তথা আসেম ইবনু বাহদালা সে আবু ওয়াইল তথা শাক্বিক্ব ইবনু সালামা থেকে সে ইবনু মাসূদ (রাঃ) থেকে। আলবানী (রহঃ) তাঁর বাকী সানাদ সম্পর্কে বলেন, قلت : و هذا إسناد جيد অর্থাৎ আমি [আলবানী] বলব এই সানাদ উত্তম। অতএব ইনশাআল্লাহ পুরো সানাদ ছহীহ। ফালিল্লাহিল হামদ।
৯.
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال فضلت على الأنبياء بست أعطيت جوامع الكلام ونصرت بالرعب وأحلت لي الغنائم وجعلت لي الأرض طهورا ومسجدا وأرسلت إلى الخلق كافة وختم بي النبيون
অর্থাৎ আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আমাকে সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে ৬ টি বিষয় দ্বারা। যথা : ১. আমাকে জামে' তথা অল্প কথায় বেশী ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ২. আমাকে সাহায্য করা হয়েছে শত্রুদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে। ৩. আমার জন্য গণিমত হালাল করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গণিমত পূর্ববর্তী উম্মাতের জন্য হালাল ছিল না। ৪. পুরো পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র ও মসজিদ করে দেয়া হয়েছে। [যা অন্য উম্মাতের জন্য ছিল না] ৫. আমাকে পুরো সৃষ্টির কাছে পূর্ণ রিসালাত দ্বারা প্রেরণ করা হয়েছে। [আগের সকল নবীগণকে নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তাদের রিসালাত ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য] এবং ৬. আমার দ্বারা নবুয়াতের সিলসিলাকে খতম করে দেয়া হয়েছে।
এই হাদীছ পেশ করার পর ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) তাঁর লিখিত মুশকিলুল আসার-এ বলেন,
وفي هذا ذكر تفضيله صلى الله عليه وسلم على النبيين وفيهم إبراهيم صلى الله عليه وعليهم أجمعين.
অর্থাৎ 'এই হাদীছে রাসূল (ছাঃ) যে অন্য সকল নবী [আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) এমনকি ইবরাহিম (আঃ)-এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ তাঁর বর্ণনা রয়েছে।
১০.
عن ابن عباس قال : إن الله تعالى فضل محمدا صلى الله عليه وسلم على الأنبياء وعلى أهل السماء فقالوا يا ابن عباس بم فضله الله على أهل السماء ؟ قال : إن الله تعالى قال لأهل السماء [ ومن يقل منهم إني إله من دونه فذلك نجزيه جهنم كذلك نجزى الظالمين ] وقال الله تعالى لمحمد صلى الله عليه وسلم : [ إنا فتحنا لك فتحا مبينا ليغفر لك الله ما تقدم من ذنبك وما تأخر ] قالوا : وما فضله على الأنبياء ؟ قال : قال الله تعالى : [ وما أرسلنا من رسول إلا بلسان قومه ليبين لهم فيضل الله من يشاء ] الآية وقال الله تعالى لمحمد صلى الله عليه وسلم : [ وما أرسلناك إلا كافة للناس ] فأرسله إلى الجن والإنس
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নিশ্চয় মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবীগণ ও আসমানবাসী তথা ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
তখন তারা তথা তাঁর ছাত্ররা বলল, হে ইবনু আব্বাস! কিসের দ্বারা আল্লাহ তাকে আসমানবাসী তথা ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিলেন? জবাবে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ বলেছেন, যদি তাদের মধ্যে কেউ বলে যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ আছে, তাহলে আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি দিব। আর আমি এই রূপ অত্যাচারীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।
কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যাপারে বলেছেন, 'আমি আপনাকে মহান বিজয় দান করেছি, যাতে করে আল্লাহ আপনার আগের ও পরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন'। তখন তাকে বলা হল, সকল নবীর উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কি? তিনি বললেন, 'আল্লাহ অন্য রাসূলদের জন্য বলেছেন, আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে করে তারা তাদের জন্য আমার বাণী বর্ণনা করতে পারে। আর আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন।
তথা, প্রত্যেক রাসূল ছিলেন তাঁর নিজ জাতির জন্য।
আর রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যাপারে বলেন, আমি আপনাকে মানব জাতির পূর্ণতা হিসাবে প্রেরণ করেছি। তথা তিনি নির্দিষ্ট কোন জাতি বা গোত্রের রাসূল নন বরং সকল মানুষের রাসূল।
তাহক্বীক : এই হাদীছ সম্পর্কে ইমাম হায়ছামী (রহঃ) তাঁর মাজমাউয যাওয়ায়েদ-এ বলেন,
রواه الطبراني ورجاله رجال الصحيح غير الحكم بن أبان وهو ثقة অর্থাৎ 'এই হাদীছকে ইমাম ত্বাবারাণী বর্ণনা করেছেন হাদীছের রাবীগণ বুখারী ও মুসলিম-এর রাবী শুধুমাত্র হাকাম ইবনু আবান ছাড়া এবং সে শক্তিশালী।
ইমাম হাকেম বলেন, هذا حديث صحيح الإسناد অর্থাৎ 'এই হাদীছের সানাদ ছহীহ। ইমাম যাহাবী (রহঃ)ও এই হাদীছকে ছহীহ বলেছেন'।
১১.
ابن مسعود قال : " إن الله نظر في قلوب العباد فوجد قلب محمد صلى الله عليه وسلم خير قلوب العباد ، فاصطفاه لنفسه ، فابتعثه برسالته
ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তরের দিকে দেখলেন এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অন্তরকে সর্বশ্রেষ্ঠ অন্তর হিসাবে পেলেন। এই জন্য তাকে নির্বাচন করলেন এবং রাসূল হিসাবে দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন।
তাহক্বীক্ব : ইমাম হায়ছামী তাঁর মাজমাউয যাওয়ায়েদ-এ এই হাদীছ নকল করার পর رواه أحمد والبزار والطبراني في الكبير والأوسط ورجاله موثقون , বলেন ‘এই হাদীছকে ইমাম আহমাদ, বাযযার, ও তাবারানী বর্ণনা করেছেন এবং হাদীছের রাবীগণ শক্তিশালী। উল্লেখ্য যে, হাদীছটি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)-এর কথা তথা মাওকুফ হাদীছ। এই হাদীছকে মাওকুফ হিসেবে ইমাম আলবানী (রহঃ) হাসান বলেছেন।
১২.
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, خيار ولد آدم خمسة نوح وابراهيم وموسى وعيسى ومحمد وخيرهم محمد هريرة (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান হচ্ছেন, পাঁচজন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) এবং তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)'।
তাহক্বীক্ব : আল্লামা মুনাবী (রহঃ) তাঁর শারহে জামে' ছাগীর-এ বলেন এই হাদীছের সানাদ ছহীহ। ইমাম হায়ছামী (রহঃ) তাঁর মাজমাউয যাওয়ায়েদ-এ বলেন, 'এই হাদীছের রাবীগণ ছহীহ মুসলিমের রাবী'। উল্লেখ্য যে, এই হাদীছকে মুখাতাসারে তারিখ দিমাশকু নামক বইয়ে মারফুয়ান উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ ভাল জানেন।
১৩. মি'রাজের রাত্রে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্য বুরাক্ব নিয়ে আসা হলে বুরাক্ব লাফিলাফি শুরু করে তখন জিবরাঈল (আঃ) তাকে বলেন, فما ركبك أحد أكرم على الله منه অর্থাৎ 'তুমি মুহাম্মাদের সাথে এইরূপ করছ! অথচ ইতিপূর্বে তোমার পিঠে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ আরোহণ করেনি। আলবানী (রহঃ) এই হাদীছকে তিরমিযীর তাহক্বীক্বে ছহীহ বলেছেন। এই হাদীছের ব্যাখ্যায় প্রায় সকল মুহাদ্দিছ একমত পোষণ করেছেন যে, এখানে আমাদের নবীকে অন্য নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, কেননা বোরাক্ব নবীদের আরোহী ছিল। যেমন হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) তাঁর ফাল্গুল বারীতে এই বিষয়ে অনেক রিওয়ায়েত জমা করেছেন। এর মধ্যে ঐ রিওয়ায়েতও আছে যেখানে রাসূল (ছাঃ) বললেন, 'অতপর আমি বোরাক্বকে বায়তুল মাকদিসের ঐ খুঁটির সাথে বাঁধলাম যার সাথে অন্য নবীরা বাঁধতেন'। তথা বোরাক্ব অন্য নবীরাও ব্যবহার করেছেন। এছাড়া আরও অনেক রিওয়ায়েত জমা করে বোরাক্ব যে নবীদের আরোহী তা প্রমাণ করেছেন। সুতরাং জিবরাঈল (আঃ)-এর এই কথা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) অন্য নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। ফালিল্লাহিল হামদ।
১৪. জান্নাত হচ্ছে মানব জাতির মধ্যে কে আল্লাহ্ কত প্রিয় বান্দা এবং কত ভাল ও শ্রেষ্ঠ বান্দা তা প্রমাণ হওয়ার অন্যতম জায়গা। এই জান্নাতে আমাদের রাসূলের স্থান সম্পর্কে স্বয়ং মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেন,
عن أبو هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم سلوا الله لي الوسيلة قالوا يا رسول الله وما الوسيلة ؟ قال أعلى درجة في الجنة لا ينالها إلا رجل واحد أرجو أن أكون أنا هو
অর্থাৎ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা আমার জন্য অসীলা চাও! তখন ছাহাবীরা বললেন, অসীলা কি হে আল্লাহ্ নবী? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন জায়গা। কেউ তা অর্জন করতে পারবে না একজন ব্যক্তি ব্যতীত এবং আমি আশা রাখি যে সেই ব্যক্তিটি আমিই হব। এই হাদীছকে ইমাম আলবানী (রহঃ) ছহীহ বলেছেন।
জান্নাতের এই স্থানের মর্যাদা এত বেশী যে, রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে প্রতিদিন আযানের শেষে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্য এই জায়গা চাইতে বলেছেন এবং এও বলেছেন যে, আমার জন্য আযানের শেষে এই জায়গা চাইবে তাঁর জন্য ক্বিয়ামতে মাঠে শাফায়ত করা আমার উপর ওয়াজিব।
এই হাদীছ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, এই জায়গার অধিকারী ব্যক্তি সকল আদম সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানী হবেন এবং তিনি হবেন আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
১৫. শাফায়াতে কুবরা : আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল আম্বিয়া কেরাম আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম-এর উপর যে সমস্ত সমষ্টিগত ফযীলত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শাফা'আতে কুবরা। শাফা'আত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, 'কে আছে এমন, যে সুফারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া।
মহান আল্লাহ এই শাফা'আত বা সুফারিশ করার অনুমতি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে দিবেন এবং সকল নবীর অপারগতা প্রকাশ করার পর দিবেন। যা তার সকল নবীর উপর সমষ্টিগত ফযীলত। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হল।
হাশরের মাঠে মহান প্রতাপশালী আল্লাহ যখন আসমানকে এক হাতে ও যমীনকে এক হাত তার একচ্ছত্র মালিকানা ও রাজত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে হুংকার দিবেন, কোথায় দুনিয়ার অত্যাচারী রাজা বাদশাহরা? এইরূপ পরিস্থিতিতে মানুষ যখন আল্লাহ্র আযাবের ভয়ে ভীত হয়ে যাবে এবং ক্বিয়ামতের মাঠের অসহনীয় পরিস্থিতির শিকার হবে, যেমন অনতিদূরে অবস্থিত সূর্যের তাপ। কিন্তু ক্বিয়ামতের মাঠ থেকে বাঁচার কোন পথ খুঁজে পাবে না। তখন প্রত্যেক উম্মতের মুমিনগণ একত্রিত হয়ে একজন সুপারিশকারী খুঁজে ফিরবে। যাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারে। প্রথমে তারা আদম (আঃ)-এর কাছে গমন করবেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম)-এর কাছে যাবে। প্রত্যেক নবী নিজেদের ত্রুটি উল্লেখ করে তাদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবেন। অবশেষে তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসবেন। তিনি মানুষকে এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহ্র আরশের নীচে সিজদায় অবনত হবেন। আল্লাহ্র প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করবেন। তখন আল্লাহ্ তাঁকে মাথা উঠিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দিবেন। তিনি তখন সমগ্র মানুষের হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তাঁর সুফারিশ কবুল করবেন। এটিই হল 'মাক্বামে মাহমূদ' বা সুমহান মর্যাদা, যা আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন।
১৭. সকল নবীর ইমামতি : সকল নবীদের [আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম)-এর উপর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আরেকটি সমষ্টিগত ফযীলত হচ্ছে মহান আল্লাহ তাকে দিয়ে মি'রাজের রাত্রে সকল নবীর ইমামতি করিয়েছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে, وَقَدْ رَأَيْتُنِي فِي جَمَاعَةٍ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ ... فَحَانَتِ الصَّلَاةُ فَأَمَّمْتُهُمْ 'আমি আমাকে রাসূলগণের জামা'আতের মধ্যে পেলাম। ইতিমধ্যে ছালাতের সময় হয়ে গেলে আমি তাদের ইমামতি করালাম।
১৮, ওয়াসিলা ইবনু আসকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى مِنْ وَلَدِ إِبْرَاهِيمَ إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ بَنِي كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي كِنَانَةَ قُرَيْشًا وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هاشم.
অর্থাৎ 'মহান আল্লাহ ইবরাহীমের সন্তানের মধ্যে থেকে ইসমাইলকে নির্বাচন করেছেন এবং ইসমাইলের সন্তানের মধ্যে থেকে বানী কানানাকে নির্বাচন করেছেন এবং বানী কানানার মধ্যে থেকে কুরাইশকে নির্বাচন করেছেন এবং কুরাইশের মধ্যে থেকে বানী হাকেমকে নির্বাচন করেছেন আর আমাকে নির্বাচন করেছেন বানী হাকেম থেকে'।
তাহক্বীক : এই হাদীছকে ইমাম তিরমিযী হাসান ছহীহ এবং আলবানী (রহঃ) তিরমিযীর তাহক্বীক্বে ছহীহ বলেছেন।
প্রশ্ন হতে পারে, এই হাদীছে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শুধুমাত্র ইবারাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়া প্রমাণিত হয়।
আমরা বলব এই রকম অনেক হাদীছ আছে যেগুলোতে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল বাণী আদামের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়া প্রমাণ করে। যেমন :
وعن العباس ....... فقام النبي صلى الله عليه وسلم على المنبر فقال : " من أنا ؟ " فقالوا : أنت رسول الله . فقال : " أنا محمد بن عبد الله بن عبد المطلب إن الله خلق الخلق فجعلني في خيرهم ثم جعلهم فرقتين فجعلني في خير فرقة ثم جعلهم قبائل فجعلني في خيرهم قبيلة ثم جعله بيوتا فجعلني في خيرهم بيتا فأنا خيرهم نفسا وخيرهم بيتا
অর্থাৎ আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) মিম্বারে উঠে বললেন, আমি কে? তখন ছাহাবীগণ বললেন, আপনি আল্লাহ্র রাসূল। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল মুত্তালিব। আল্লাহ সৃষ্টিজীব সৃষ্টি করত আমাকে তাদের ভালোদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, অতঃপর তাদেরকে দুইভাগে ভাগ করেছেন [তথা আরব ও আজম] এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ ভাগের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ গোত্রে স্থান দিয়েছেন। অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন বাড়িতে পৃথক করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ বাড়িতে স্থান দিয়েছেন। অতএব আমি তাদের মধ্যে বাড়ির দিক দিয়েও শ্রেষ্ঠ এবং ব্যক্তির দিক দিয়েও শ্রেষ্ঠ।
তাহক্বীক : এই হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন। শায়খ আলবানী (রহঃ) জামে সাগীর-এ ছহীহ বলেছেন এবং তিরমিযীতে যঈফ বলেছেন। তবে আমি নির্ণয় করতে পারিনি কোন মন্তব্য তাঁর পরের মন্তব্য। শুয়াইব আরনাউত্ব হাসান বলেছেন।
এই হাদীছের তিরমিযীর সানাদে একজন রাবী আছেন যার নাম ইয়াযিদ ইবনু আবি যিয়াদ, সে যঈফ। অধম এই যঈফ রাবীর মুতাবি বা তদস্থলে অন্য রাবী পেয়েছে। যেমন :
رواه الطبراني وفيه يحيى بن عبد الحميد الحماني وعباية بن ربعي وكلاهما ضعيف.
অর্থাৎ 'এই হাদীছকে ত্বাবারাণী রিওয়ায়েত করেছেন এবং এতে ইয়াহিয়া ইবনু আব্দুল হামিদ এবং ইবায়া ইবনু রিবঈ আছে এবং উভয়েই যঈফ'। পরবর্তীতে অধম অত্র হাদীছের দুইটা মুরসাল ছহীহ সানাদ পাই। প্রথম সানাদ :
مَنْصُور بن أَبِي مُزَاحِم ، قال حَدَّثَنَا أبو النَّضْرِ هَاشِمِ بنِ الْقَاسِمِ ، عَنْ وَرْقَاء بن عُمَرَ الْيَشْكُرِيِّ ، عَنْ عَمْرو بن دِينَارٍ
তাহক্বীক : এই সানাদের সবাই শক্তিশালী। যথা : ১. মানসুর ইবনু আবু মুযাহি-ছহীহ মুসলিমে রাবী। হাফিয (রহঃ) বলেছেন, ছিকাহ তথা শক্তিশালী। ২. আবুন নাযর হাকেম ইবনু আল-কাসেম- ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের রাবী। হাফিয (রহঃ) বলেন ছিকাহ ও সাবত তথা অধিক শক্তিশালী। ৩. ওয়ারাকা ইবনু উমার আল ঈয়াশকুরী - বুখারী ও মুসলিমের রাবী। হাফিয (রহঃ) বলেন সদুক। তবে অত্র রাবীর মানসুর থেকে বর্ণিত হাদীছে কিছু সমস্যা আছে। উল্লেখ্য যে, এই হাদীছ তিনি মানসুর থেকে বর্ণনা করেননি বরং বিখ্যাত তাবেয়ী আমর ইবনু দিনার থেকে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় সানাদ:
أبو ضمرة المدني أنس بن عياض الليثي أخبرنا جعفر بن محمد بن علي عن أبيه محمد بن علي بن حسين بن علي بن أبي طالب أن النبي صلى الله عليه وسلم.
তাহক্বীক্ব : ১. আনাস ইবনু ইয়ায আল লাইছি - কুতুবে সিত্তাহর সকলেই তাকে গ্রহন করেছেন। হাফিয (রহঃ) বলেন, শক্তিশালী। ২. জাফর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আলী। ইমাম মুসলিম ও সুনানে আরবাআ'- এর সংকলকগণ তার হাদীছকে গ্রহণ করেছেন। হাফিয (রহঃ) বলেন, সত্যবাদী, ফক্বীহ এবং ইমাম। ৩, মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু হুসাইন ইবনু আলি ইবনু আবি তালিব। কুতুবে সিত্তাহর সকলেই তার হাদীছ গ্রহণ করেছেন। হাফিয (রহঃ) বলেন, শক্তিশালী।
উপরের দু'টি হালকা দুর্বল মারফু সানাদ এবং দু'টি ছহীহ মুরসাল সানাদকে সামনে রেখে অত্র হাদীছকে হাসান বলা যায়।
আক্বলী দলীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল :
১. নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব আল-কুরআন। এই কিতাব যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ মাস (রামাযান)। যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ রাত (লাইলাতুল কদর)। যে ফেরেশতা নিয়ে এসেছেন তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা (জীবরাঈল)। সুতারাং স্বভাবতই যে নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তিনি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হবেন।
২. মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াত অন্যান্য রাসূলগণের নবুয়াতের চেয়ে বৈশিষ্ট্যগতভাবে অনেক মহান। কেননা মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াতের দ্বারা অন্য সকল নবীদের নবুয়াত ও দ্বীনকে মানসূখ বা রহিত করে দিয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াত অন্য কোন নবীর নবুয়াত দ্বারা মানসুখ হবে না। অন্য নবীদের নবুওয়াত ছিল নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য এবং রাসূল (ছাঃ)-এর নবুয়াত সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য।
রাসূল (ছাঃ)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়ার প্রমাণে উপরের দলীলগুলো আশা করি যথেষ্ট হবে। ইনশাআল্লাহ। সত্যি বলতে কি, হক্বের অন্বেষণকারীদের জন্য একটি দলীলই যথেষ্ট। গবেষণা করতে গিয়ে আরো অনেক অনেক দলীল চোখে পড়েছে। কিন্তু সেগুলো তাহক্বীক্বে র মুখাপেক্ষী। সময় সঙ্কীর্ণতার কারণে সেদিকে আর পা বাড়াচ্ছি না। তবে কিছু বইয়ের নাম উল্লেখ করছি, যেখানে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মহত্ত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছগুলো জমা করা হয়েছে। যেমন : ইমাম বায়হাক্বির দালায়িলুন নবুওয়াত। একই নামে ইমাম ইস্পাহানী (রহঃ)-এরও বই রয়েছে। এছাড়া আল খাসায়িসুল কুবরাও এই বিষয়ে চমৎকার একটি কিতাব।
'মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল নয়' মর্মে পেশকৃত দলীলসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা:
১. আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করি না
যারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল বলতে চান না, তাদের সবচেয়ে বড় দলীল। পবিত্র কুরআনের আয়াত, لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না'।
শুধু তাই না, এই আয়াতের নামেই এই বিষয়ে লিখিত একটি বইয়ের নাম রাখা হয়েছে 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না' শিরোনামে। তাদের নিকটে এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে আমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেই না।
সঠিক ব্যাখ্যা :
মহান আল্লাহ এই আয়াত পবিত্র কুরআনে নিয়ে এসেছেন দুই জায়গায়। সূরা বাক্বারাহ আয়াত নং-১৩৪ ও সূরা আলে ইমরান আয়াত নং-৮৪। দুই জায়গাতেই আগে রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর এই আয়াত নিয়ে এসেছেন। যেমন নীচে সূরা বাক্বারাহ্ সম্পূর্ণ আয়াত পেশ করা হল :
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ (١٣٦)
অর্থাৎ 'তোমরা বল! আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ্র প্রতি এবং আমাদের প্রতি, যা অবতীর্ণ হয়েছে। এছাড়া যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, এবং তাদের বংশধরদের প্রতি। আর যা দেয়া হয়েছে মূসা ও ঈসাকে এবং আল্লাহ্ পক্ষ থেকে অন্য আরও নবীদেরকে তাঁর প্রতি। বস্তুত আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পনকারী (বাক্বারাহ ২/১৩৬)।
এই আয়াত পড়ার পর একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বুঝতে পারবে যে, এখানে 'পার্থক্য করি না' অর্থ কুফরি করি না বরং ঈমান আনি। কেননা আয়াতের আগের আলোচনাতে আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান আনতে বলেছেন এবং পরের অংশে ঈমানের বিপরীতটা থেকে নিষেধ করছেন এবং এই জন্যই মহান আল্লাহ 'হারফে আতফ' ব্যবহার করেননি।
ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন, وَأَنْ لَا يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ، بَلْ يُؤْمِنُوا بِهِمْ كُلِّهِمْ، وَلَا يَكُونُوا كَمَنْ قَالَ اللَّهُ فيهم. অর্থাৎ 'তারা যেন রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য না করে বরং ঈমান আনে'। এরপর ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) কুরআনের তাফসীর কুরআনের আয়াত দিয়ে করেছেন।
সূরা বাকারার আয়াতে আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। এই পার্থক্য করার সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا. অর্থাৎ 'আর তারা চায় যে, রাসূলগণ ও আল্লাহ্ মাঝে পার্থক্য করবে এবং বলবে আমরা কিছুর উপর ঈমান আনি এবং কিছু কুফরি করি। তারা এর মাঝে একটা রাস্তা গ্রহণ করতে চায় আর বস্তুত তারাই সত্যিকারের কাফের' (নিসা ৪/১৫০)।
এখানে মহান আল্লাহ পার্থক্য করার অর্থ স্পষ্টভাবে বলেছেন। কারো উপর ঈমান আনা আবার কারো সাথে কুফরি করাই হল পার্থক্য করা।
সুতরাং আগের আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা কিছু রাসূলের প্রতি ঈমান আনি এবং কিছু রাসূলের সাথে কুফরি যেন না করি। যারা এইরূপ করবে তারা কাফের।
যেমন ইমাম জারীর তাবারী (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
لا نؤمن ببعض الأنبياء ونكفر ببعض، ونتبرأ من بعض ونتولى بعضًا، كما تبرأت اليهود من عيسى ومحمد عليهما السلام وأقرت بغيرهما من الأنبياء، وكما تبرأت النصارى من محمد صلى الله عليه وسلم وأقرت بغيره من الأنبياء، بل نشهد لجميعهم أنهم كانوا رسل الله وأنبياءه، بعثوا بالحق والهدى
অর্থাৎ 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না তথা আমরা কিছু নবীর প্রতি ঈমান আনি আবার কিছু নবীর সাথে কুফরী করি এইরূপ করি না। আমরা কিছু নবীর সাথে সম্পর্ক করি আবার কিছু নবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি এইরূপ করিনা। যেমনটা ইহুদীরা ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাদের প্রতি ঈমান আনেনি। এই দুইজন ব্যতীত সকল নবীর প্রতি ঈমান এনেছে। নাছারারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি এবং তিনি ব্যতীত সকলের প্রতি ঈমান এনেছে। কিন্তু আমরা সকল নবী ও রাসূলগণের জন্য সাক্ষ্য দেই। তাঁরা সকলেই মহান আল্লাহ্ নবী ও রাসূল তাঁরা সত্য ও হেদায়াত নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন।
অতএব এই কথা এখন দিনের আলোর ন্যায় স্পষ্ট যে, 'আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না' এই আয়াতের অর্থ যদি করা হয় যে, আমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেই না, তাহলে কুরআনের আয়াতের অর্থের বিকৃতি হবে।
কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তিনি নিজেও কুরআনে রাসূলগণকে একে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ অর্থ্যাৎ ‘হে নবী! আপনি রাসূলগণের মধ্যে থেকে যারা উলুল আযম বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী রাসূল তাদের মত ধৈর্যধারণ করুন' (আহকাফ৪৬/৩৫)।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে শুরু করে সকল মুফাসসিরে কেরাম এই বিষয়ে একমত যে, এই 'উলুল আযম' বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল হচ্ছেন ৫ জন। মুহাম্মাদ (ছাঃ), ইবরাহীম, নূহ, মূসা ও ঈসা (আঃ)।
অত্র আয়াতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাঝে পাঁচ জনকে এই মহান ছিফাতে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে অন্যদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাইতো স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ.
অর্থাৎ 'এই নবী-রাসূলগণের কাউকে কারো উপর আমি বেশী সম্মানদান করেছি। তাদের কারো সাথে মহান আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাদের কাউকে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন স্থানদান করেছেন এবং ঈসা ইবনু মারিয়ামকে উজ্জ্বল নিদর্শন দান করেছেন এবং তাকে রুহুল কুদ্দুস দ্বারা সহযোগিতা করেছেন' (বাকারাহ ২/২৫৩)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মহান আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
তাইতো ইবনু কাসীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে ঐ সমস্ত হাদীছের পাঁচভাবে জবাব দিয়েছেন, যে হাদীছসমূহে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করা হয়েছে। যদি এই আয়াতের অন্য উদ্দেশ্য হত, তাহলে 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' মর্মে বর্ণিত হাদীছসমূহকে তিনি এই আয়াতের বিরোধী মনে করতেন না এবং সেগুলোর পাঁচভাবে জবাব দিতেন না।
অতএব উপরে উল্লেখিত দু'টি আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সেই হিসাবেই তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন।
২. তোমরা নবীদের মাঝে প্রাধান্য দিও না : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ.
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না'।
হাদীছের ব্যাখ্যা:
আমরা এই হাদীছের ব্যাখ্যা তিনভাবে করব। ১. শাব্দিক বিশ্লেষণ। ২. শানে উরূদ ৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা।
১. শাব্দিক বিশ্লেষণ মূলত এই হাদীছটি তিনটি শব্দে বর্ণিত হয়েছে
১. لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না'। এইভাবে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছে আব্দুর রহমান আল আরাজ। তাঁর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু ফাযল।
২. لَا تُخَيَّرُونِي عَلَى مُوسَى
অর্থাৎ 'তোমরা মূসাকে বাদ দিয়ে আমাকে বেছে নিও না'। এইভাবে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহামান আল আরাজ, আবু সালামা ও সাঈদ ইবনুল মূসায়য়িব। এই তিনজন থেকে বর্ণনা করেছেন ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ)।
৩. لَا تُخَيَّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ.
অর্থাৎ 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে বেছে নিও না'। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে আসা সকল সানাদ এইভাবেই এসেছে।
অত্র হাদীছরে মধ্যে لَا تُخَيَّرُوا শব্দটি প্রাধান্য পাবে। কেননা لَا تُفَضَّلُوا এই শব্দে শুধুমাত্র আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে আবদুল্লাহ ইবনু ফাযল বর্ণনা করেছেন। অথচ এই হাদীছই ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) আব্দুর রহমান আল আরাজ থেকে لَا تُخيّرُونِي শব্দে বর্ণনা করেছেন। আব্দুর রহমান আল-আরাজ ছাড়াও দুইজন থেকে তিনি এই শব্দে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একজন হচ্ছেন বিখ্যাত তাবেয়ী সাঈদ ইবনু মুসাঈয়িব (রহঃ)।
অতএব তিনটি কারণে لَا تُخَيّرُوا তথা তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না। এই শব্দটি প্রাধান্য পাবে
১. সংখ্যাধিক্য। কেননা তিনজন রাবী এইভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনজনের মধ্যে সাঈদ ইবনু মুসায়য়িব-এর মত আবু হুরায়রা (রা)-এর খাছ ছাত্র আছেন।
২. যেই আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে আবদুল্লাহ ইবনু ফাযল বর্ণনা করছেন সেই আব্দুর রহমান আল-আরাজ থেকে ইবনু শিহাব যুহরীও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি لَا تُخَيّرُوا শব্দে বর্ণনা করছেন। ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ)-এর ইমামাতে শানের কারণে তার বর্ণিত এই শব্দই প্রাধান্য পাবে।
৩. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত সকল সানাদে হাদীছটি এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং বলা যায় রাসূল (ছাঃ) মূলত لَا تُخَيّرُوا বা 'তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না' এই কথা বলেছিলেন।
لَا تُخَيَّرُوا শব্দের অর্থ :
মি'রাজের রাত্রে যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সামনে দুধ ও মদ দেয়া হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল, তুমি এই দুইটির মধ্যে একটিকে বেছে নাও! এখানে এই তাখয়ীর শব্দমূল থেকে নির্গত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং তাখয়ির হচ্ছে একটাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটাকে গ্রহণ করা। একটার মধ্যে কোন দুর্বলতা থাকার কারণে তাঁর উপর আরেকটাকে প্রাধান্য দেয়া।
সুতরাং এই হাদীছের কেউ যদি এই অর্থ করে যে, 'তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' তাহলে তা অর্থের বিকৃতি হবে; বরং সঠিক অর্থ হবে তোমরা অন্য রাসূলকে ছেড়ে আমাকে প্রাধান্য দিও না। আর এই ধরণের বিশ্বাস সর্বসম্মতিক্রমে না জায়েয।
لَا تُفَضَّلُوا তথা 'শ্রেষ্ঠত্ব দিও না' শব্দের অর্থ :
(২) শানে উরূদ : কুরআনের তাফসীরে যেমন শানে নুযূলের গুরত্ব থাকে, তেমনি হাদীছের ব্যাখ্যায় শানে উরূদের গুরুত্ব। তথা এই হাদীছ রাসূল (ছাঃ) কি কারণে বলেছিলেন। এই হাদীছ বলার পিছনের কাহিনী কি? এই হাদীছ বলার পিছনের কাহিনী অন্য হাদীছে বিস্তারিত আমাদের সামনে এসেছে।
একদা এক ইহুদী মূসা (আঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ বললে একজন ছাহাবী তাকে রেগে গিয়ে থাপ্পড় মেরেছিলেন। তাঁরপর রাসূল (ছাঃ) এই হাদীছ বর্ণনা করেন।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, রাসূল (ছাঃ) শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে আরেকজন-এর সাথে ঝগড়াতে লিপ্ত হয়ে অন্য নবীর শানে গুস্তাখী বা অসমীচীন আচরণ করলে তিনি এই হাদীছ বর্ণনা করেন। তথা তোমরা রাসূলগণের মাঝে এইভাবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাদের শানে গুস্তাখী কর না। কেননা অন্য নবীগণও অনেক সম্মানী। তারাও মহান আল্লাহ্র রাসূল। তাদেরও রয়েছে অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত।
৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা: ১. ইমাম বাগাভী (রহঃ) তাঁর 'শারহুস সুন্নাহ' বইয়ে এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন,
وليس معنى النهي عن التخيير أن يعتقد التسوية بينهم في درجاتهم ، فإن الله عز وجل قد أخبرنا أنه فضل بعضهم على بعض ، فقال سبحانه وتعالى : ( تِلكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ( الآية البقرة : ٢٥٣ ) بل معناه ترك التخيير على وجه الإزراء ببعضهم ، والإخلال بالواجب من حقوقهم ، فإنه يكون سبباً لفساد الإعتقاد في بعضهم ، وذلك كفر.
অর্থাৎ 'রাসূলগণের মাঝে একজনকে আরেকজনের উপর প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এটা নয় যে, আমরা বিশ্বাস করব তাঁরা সকলেই মর্যাদাগত ভাবে সমান। কেননা স্বয়ং আল্লাহই বলেছেন যে, তিনি কিছু রাসূলকে কিছু রাসূলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অত্র নিষেধাজ্ঞার সঠিক অর্থ হচ্ছে কোন নবীর শানে গুস্তাখী করে এবং তাদের মানের হানি করে অন্য নবীকে প্রাধান্য না দেওয়া। কেননা এতে আক্বীদার মধ্যে ভ্রান্তি সৃষ্টি হয় আর এটা কুফুরী'।
২. এই হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)ও একই কথা বলেছেন। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে যেন অন্য নবীদের অপমান না করা হয়।
৩. ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) তাঁর লিখিত দালায়িলুন নবুওয়াতে বলেন, باب ما جاء في التخيير بين الأنبياء قال الله عز وجل : تلك الرسل فضلنا بعضهم على بعض فأخبر بأنه فاوت بينهم في الفضل ، فأما الأخبار التي وردت في النهي عن التخيير بين الأنبياء فإنما هي في مجادلة أهل الكتاب في تفضيل نبينا عليه السلام على أنبيائهم عليهم السلام ؛ لأن المخايرة إذا وقعت بين أهل دينين مختلفين لم يؤمن أن يخرج كل واحد منهما في تفضيل من يريد تفضيله إلى الإزراء بالآخر ف يكفر بذلك অর্থাৎ 'মহান আল্লাহ বলেন, আমি রাসূলগণের কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিয়েছি। এই আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে পার্থক্য করেছেন। আর 'রাসূলগণের মাঝে কাউকে প্রাধান্য দিতে নিষেধ' মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলো মূলত আহলে কিতাবদের সাথে গণ্ডগোলের সময়ে তাদের নবীর উপর আমাদের নবীকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে। কেননা যখন দুই ধর্মের অনুসারীর মাঝে নবীদেরকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে ঝগড়া হবে তখন তাঁরা নবীদের শানে গুস্তাখী এবং তাদের মানহানি করে ফেলবে এবং এর দ্বারা তাঁরা কাফের হয়ে যাবে।
ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ)-এর কথার সারমর্মও এই যে, প্রাধান্য দিতে গিয়ে যেন মানহানি না হয়।
অতএব সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, কেউ যদি অন্য নবীদের প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে তাদের মানহানি করতঃ কোন রাসূলকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। নিষেধের হাদীছগুলো মূলত তাদের জন্যই।
৩. যে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক :
নিম্নে এই হাদীছের তিনভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করা হল। ১. হাদীছের অর্থ ২. শানে উরুদ তথা এই হাদীছ রাসূল (ছাঃ) কেন বললেন? ৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা।
হাদীছের অর্থ :
এখানে 'আমি' দ্বারা কে উদ্দেশ্য? যদি বলা হয় মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাহলে এই হাদীছের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এই হাদীছের আরেকভাবেও অর্থ হয়। 'আমি' দ্বারা প্রত্যেক কথক উদ্দেশ্য। রাসূল (ছাঃ) বলতে চাচ্ছেন, কেউ যদি বলে যে, আমি তথা ঐ কথক ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাহলে সে মিথ্যুক। আর এটা স্পষ্ট যে, আম জনসাধারণ যদি নিজেকে ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে, তাহলে সে অবশ্যই মিথ্যুক। নিম্নে এই অর্থের দু'টি দলীল পেশ করা হল :
১. এই হাদীছটি বুখারীতে এসেছে। নীচে বুখারীর ইবারাত পেশ করা হল :
وَلَا أَقُولُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ
অর্থাৎ 'আমি বলি না যে, কেউ ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
এখানে রাসূল (ছাঃ) 'আমি' ব্যবহার করেননি, বরং বলেছেন 'কেউ'। সুতরাং 'আমি' শব্দ থেকে রাসূল (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য নেয়ার যে সম্ভাবনা ছিল তা শেষ হয়ে যায়।
২. মহান আল্লাহ বলেন,
لا يَنْبَغِي لِعَبْدٍ لِي أَنْ يَقُولَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلَامُ.
অর্থাৎ 'আমার কোন বান্দার উচিত নয় যে, সে বলে আমি ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
আলবানী (রহঃ)ও জামে ছগীরে এই হাদীছকে 'ছহীহ' বলেছেন।
এই হাদীছে কুদসী দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, 'আমি' দ্বারা আল্লাহ্র প্রত্যেক বান্দা উদ্দেশ্য। মুহাম্মাদ (ছাঃ) নয়।
প্রশ্ন হতে পারে, 'আম জনসাধারণ কিভাবে নিজেকে একজন নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হতে পারে, এই হুকুম শুধু ইউনুস (আঃ)-এর সাথে কেন খাছ করা হল? অন্য নবীদের কথা কেন বলা হল না?
এর জবাবের জন্য আমাদেরকে শানে উরূদ দেখতে হবে। তথা এই হাদীছ 'রাসূল (ছাঃ) কেন বলেছেন' তা জানতে হবে।
শানে উরূদ : পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আমাদের রাসূলকে বলেছেন,
وَلَا تَكُنْ كَصَاحِبِ الْحُوتِ.
অর্থাৎ 'আপনি আপনার প্রতিপালকের নির্দেশের উপর ধৈর্যধারণ করুন! ইউনুস-এর মত হয়ো না'।
আর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণে ধৈর্যধারণ না করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলছেন, তুমি ইউনুস (আঃ)-এর মত ধৈর্যহীন হয়ো না, বরং উলুল আযমগণের মত ধৈর্যশীল হও!
এর দ্বারা অনেকের মনে হতে পারে যে, এই আয়াতে ইউনুস (আঃ)-এর মত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব তিনি খারাপ। নাউযুবিল্লাহ!
এই দৃষ্টিকোন থেকে কেউ যদি আমাদের রাসূলকে ভাল এবং ইউনুস (আঃ)-কে খারাপ বলে বা নিজেকেই ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে ভাল মনে করে, তাহলে সে মিথ্যুক হবে এবং একজন নবীর মানহানি করার অপরাধে অপরাধী হবে।
রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের অন্তর থেকে এই আয়াতের কারণে সৃষ্টি হওয়া খারাপ ধারণা দূর করার উদ্দেশ্য এই হাদীছ বলেন। আজও যদি কুরআন পড়ার সময় এই আয়াত পাঠ কালে অন্তরে ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে তাঁর আক্বীদাকে সংশোধন করার জন্য তাঁর সামনে এই হাদীছ পেশ করা হবে।
সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা:
আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, والرسول صلى الله عليه وسلم قال هذا لما جاء في القرآن عنه من أنه لم يصبر على ما حصل من قومه؛ فذهب مغاضباً وحصل له ما حصل، والواجب توقير رسل الله عليهم الصلاة والسلام ومحبتهم والثناء عليهم
অর্থাৎ 'রাসূল (ছাঃ) এই কথা তখনই বলেছিলেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণ সহ্য না করে রাগান্বিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন'।
কেননা আল্লাহ্র রাসূলগণের সম্মান করা, তাদেরকে ভালবাসা এবং তাদের প্রশংসা করা ওয়াজিব।
ইমাম সুয়ূত্বী (রহঃ) বলেন, قال العلماء هذا زجر عن أن يتخيل أحد من الجاهلين شيئا من حط مرتبة يونس من أجل ما في القرآن العزيز في قصته ولهذا خصه بالذكر.
অর্থাৎ 'আলেমগণ বলেছেন, ইহা ঐ সমস্ত জাহেলদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কীকরণ, যারা ইউনুস (আঃ)-এর সম্মানে বিন্দুমাত্র কমতি করে। এই জন্যই এখানে শুধুমাত্র ইউনুস (আঃ)-এর নাম নেয়া হয়েছে অন্য নবীদের নাম নেয়া হয়নি'।
অতএব, কেউ যদি এই হাদীছ দ্বারা সালাফে সালেহীনের উল্টা বুঝে বলতে চায় যে, এই হাদীছে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। তাই আমাদের নবীকে অন্য নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ঠিক নয় তাহলে সে হাদীছের অর্থের বিকৃতি ঘটাবে।
আর ফযীলতের বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীছের আরেকটা অন্যতম ব্যাখ্যা নিম্নরূপ :
কেউ যদি কোন এক রাসূলকে আরেক রাসূলের উপর এই মনে করে প্রাধান্য দেয় যে, অন্য রাসূলগণ তাদের নবুয়াতের হক্ব আদায় করতে পারেননি। নাউযুবিল্লাহ! তথা মূসা (আঃ) ইউনুস (আঃ) তাদের নবুয়াতের হক্ব আদায় করতে পারেননি। আমাদের রাসূল পেরেছেন। তাহলে সে মিথ্যুক এবং পাপী, এমনকি কাফেরও হয়ে যেতে পারে। সকল নবী তাদের নবুয়াতের দায়িত্ব পালনে বরাবর। কিন্তু এটা মহান আল্লাহ্র রহমত যে, তিনি কাউকে কারো উপর ফযীলত দিয়েছেন। সেই রকম আমাদের রাসূলকে অন্য সকল রাসূলগণের উপর ফযীলত দিয়েছেন।
ইবরাহীম (আঃ)-এর বিষয়ে বর্ণিত হাদীছ :
একদা এক লোক মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলল, হে সৃষ্টির সেরা মানুষ! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, সে তো ইবরাহীম। তথা সৃষ্টির সেরা মানুষ ইবরাহীম (আঃ)।
ব্যাখ্যা:
প্রথমতঃ যারা রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব-কে অস্বীকার করেন, তাদেরকে আগে এই হাদীছের জবাব দিতে হবে। কেননা এই হাদীছে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর উপর এবং সকল নবীর উপর ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রাধান্যকে মেনে নিচ্ছেন এবং এই হাদীছ একটা বড় দলীল যে, রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে কমবেশী আছে।
দ্বিতীয়তঃ অত্র হাদীছে ইবরাহীম (আঃ)-কে 'খাইরুল বারিয়্যা' বলা হয়েছে, তেমনি অন্য হাদীছে মুহাম্মাদ (ছাঃ) স্বয়ং নিজেকে 'খাইরুল বারিয়্যা' বা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলেছেন,
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يخرج في آخر الزمان قوم أحداث الأسنان سفهاء الأحلام يقرءون القرآن لا يجاوز تراقيهم يقولون من قول خير البرية يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية
অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, শেষ যামানায় কিছু মানুষ বের হবে যারা হবে অল্প বয়সি বোকা। তাঁরা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবেনা। তাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কথা থেকে কথা বলবে তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর হাদীছ শুনাবে। তাঁরা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর বের হয়ে যায় ধনুক থেকে।
এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) 'খাইরুল বারিয়্যা' তথা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
তৃতীয়তঃ সালাফে ছালেহীন এই হাদীছের দুইভাবে জবাব দিয়েছেন।
১. মানসুখ ২. ভদ্রতা ও সম্মানের জন্য।
মানসুখ: রাসূল (ছাঃ) আগে জানতেন না যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন, তাকেও সেইভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এটাও জানতেন না যে, তিনি সকল আদম সন্তানের সরদার এবং ইবরাহীম (আঃ) ক্বিয়ামতের মাঠে তাঁর ঝাণ্ডার নীচে হবেন। এও জানতেন না যে, মহান আল্লাহ তাঁর আগের ও পিছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। এগুলো না জানার কারণে তিনি এই কথা বলেছিলেন। যখন জানতে পারলেন যে, তিনিই শ্রেষ্ঠ, তখন আবার ঐ সমস্ত হাদীছ বলেন যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে।
যেমন বিংশ শতাব্দীর মহান মুহাদ্দিস নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, وأجاب العلماء عن هذا بأن النبي صلى الله عليه وسلم قال ذلك تواضعاً وهضماً لنفسه، أو أنه قال ذلك قبل أن يوحى إليه بأن الله تعالى اتخذه خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً، وأنه سيد الناس يوم القيامة، آدم فمن دونه تحت لوائه - صلى الله عليه وسلم - ، كما جاء في الأحاديث الصحيحة
অর্থাৎ 'আলেমগণ এই হাদীছের দুইভাবে জবাব দিয়েছেন। হয় তিনি এটা সম্মান ও ভদ্রতার খাতিরে বলেছেন বা তিনি এই খবর জানার আগে বলেছেন যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাঁকেও সেভাবেই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ক্বিয়ামতের মাঠে আদম সন্তানের সরদার হবেন এবং আদম (আঃ) সহ সকলেই তাঁর ঝাণ্ডার নীচে হবেন। অনুরূপই ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
মানসূখ হওয়ার দলীল হতে পারে এই যে, এই হাদীছ আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন এবং আদম সন্তানের সরদার হওয়ার হাদীছ আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আর আবু হুরায়রা (রাঃ) অনেক পরে ইসলাম নিয়ে এসেছেন তিনি ৭ম হিজরিতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তথা তাঁর বর্ণিত হাদীছগুলো শেষের দিকের হাদীছ।
রাসূল (ছাঃ) আসলে ভদ্রতার কারণে অন্য কাউকে তাঁর সামনে তাঁর প্রশংসা করতে দিতেন না। এই জন্যই তিনি যখনই তাঁর সম্মানের কথা জনগণের সামনে জানিয়েছেন তখনই বলেছেন, 'ওলা ফাখরা' তথা আমি এই কথা গর্ব করতে বলছি না। বরং তোমাদেরকে দ্বীনের একটা বিষয় জানানোর জন্য বলছি, যেন তোমরা তার উপর ঈমান আন।
অবশ্য এই হাদীছ মানসূখ হলেও এই হাদীছই দলীল যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও মানব হচ্ছেন ইবরাহীম (আঃ)। যেমন শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেন,
فَإِبْرَاهِيمُ أَفْضَلُ الْخَلْقِ بَعْدَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থাৎ 'ইবরাহিম (আঃ) মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর পর সৃষ্টির সেরা'।
উল্লেখ্য যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর শানে বর্ণিত অত্র হাদীছ ছাড়া আর যত হাদীছ বিভিন্ন নবী ও মানুষের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে, যেমন আলী (রাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সেগুলো সবই শী'আ ও বাতিল ফিরকাগুলোর বানোয়াট হাদীছ।
সালাফে ছালেহীন-এর ঐক্যমত :
আক্বীদার অন্য মাসআলাগুলোর মত এই মাসআলাতেও সালাফে ছালেহীন-এর কোন ইখতিলাফ নেই। নীচে বিশিষ্ট কিছু সালাফে ছালেহীন-এর নাম সহ তাদের মন্তব্য পেশ করা হল।
উল্লেখ্য যে, আবু হুরায়রা (রাঃ), ইবনু আব্বাস (রাঃ), ইবনু মাসউদ (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ)-এর মন্তব্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
১. ইমাম আলবানী (রহঃ)-এর মন্তব্য: বিংশ শতাব্দীর মহান মুহাদ্দিছ ও মুজাদ্দিদ ইমাম আলবানী (রহঃ) বলেন,
قوله صلى الله عليه وسلم: أنا سيد ولد آدم صريح في تفضيله صلى الله عليه وسلم على جميع ولد آدم.
অর্থাৎ 'রাসূল (ছাঃ)-এর এই কথা যে, তিনি আদম সন্তানের সরদার স্পষ্ট দলীল যে, তিনি সকল আদম সন্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ'।
২. ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-এর মন্তব্য: মহান মুহাদ্দিছ ও মুজাদ্দিদ ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তাঁর লিখিত কিতাবুর রিসালাতে বলেন,
فكان خيرته المصطفى لوحيه المنتخب لرسالته المفضل على جميع خلقه بفتح رحمته وختم نبوته وأعم ما أرسل به مرسل قبله المرفوع ذكره مع ذكره
অর্থাৎ 'মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মুহাম্মাদ মুছত্বফা (ছাঃ) তাঁর বাছাইকৃত অহির জন্য এবং এমন রিসালাতের জন্য যা সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ আর তাঁর রিসালাত সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্র রহমতের কারণে, খতমে নবুয়াতের কারণে এবং তাঁর রিসালাতের বিশ্বব্যপ্তিতার কারণে। যা ইতিপূর্বে প্রেরিত কোন নবীর ক্ষেত্রে ছিল না এবং মুহাম্মাদের যিকর বা স্মরণকে স্বয়ং মহান আল্লাহ্র স্মরনের সাথে সম্পর্কিত করার কারণে।
ইমাম ইবনু হাজার আল-হায়ছামী (রহঃ) বলেন, উল্লেখ্য ইনি ইবনু হাজার আসক্বালানী নন।
وما صرح به الشافعي رضي الله عنه من تفضيل نبينا وسيدنا محمد ( صلى الله عليه وسلم ) على جميع الخلق هو الذي عليه العلماء كافة.
অর্থাৎ 'ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এখানে স্পষ্ট আকারে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্বে যে কথা উল্লেখ করেছেন সেটার উপর রয়েছে সমস্ত ওলামায়ে কেরামের ঐক্যমত'।
৩. ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ)-এর মন্তব্য:
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর 'মাজমুউল ফাতওয়া' গ্রন্থে বলেন,
وَقَدْ اتَّفَقَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى أَنَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْظَمُ الْخَلْقِ جَاهَا عِنْدَ اللَّهِ অর্থাৎ 'মুসলিমগণ এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আল্লাহ্র নিকটে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর লিখিত الفرقان بين أولياء الرَّحْمَنِ وأولياء الشيطان অর্থাৎ 'আল্লাহ্র অলী ও শয়তানের অলীর মাঝে পার্থক্য' মর্মে লিখিত বইয়ে বলেন,
أَفْضَلُ أَوْلِيَاءِ اللهِ هُمْ أَنْبِيَاؤُهُ ، وَأَفْضَلُ أَنْبِيَائِهِ هُمُ الْمُرْسَلُونَ مِنْهُمْ ، وَأَفْضَلُ الْمُرْسَلِينَ أُولُو الْعَزْمِ : نُوحٌ وَإِبْرَاهِيمُ وَمُوسَى وَعِيسَى وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ 'আল্লাহ্ অলী বা বন্ধুগণ-এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন নবীগণ। নবীগণের মাঝে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন রাসূলগণ। রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন উলুল আযম বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী পাঁচজন রাসূল। যথাক্রমে নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)।
এরপর ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন,
وَأَفْضَلُ أُولِي الْعَزْمِ مُحَمَّدُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ অর্থাৎ 'সর্বশ্রেষ্ঠ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী পাঁচজন রাসূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)।
এই কথা বলার পর ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অনেক মর্যাদা জমা করেন যা, তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
৪. শায়খ ছালেহ আল-উছাইমীন (রহঃ)-এর মন্তব্য:
শায়খ ছালেহ আল-উছাইমীন (রহঃ) তাঁর লিখিত 'আক্বীদাতু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত' বইয়ের ২৬ পৃষ্ঠায় বলেন-
'রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁরপর ইবরাহীম (আঃ) তারপর মূসা (আঃ) তাঁরপর নুহ (আঃ) তাঁরপর ঈসা (আঃ)'।
৫. শায়খ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ-এর ফাতওয়া :
শায়খ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ তাঁর ফাতওয়া হল : فتاوى الإسلام سؤال وجواب
'ইসলামের ফাতাওয়া জিজ্ঞেস ও জবাবের ১০৬৬৯ নং প্রশ্নের জবাবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং যেই হাদীছগুলোতে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করা হয়েছে, তাঁর চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন,
لا خلاف بين العلماء في تفضيل نبينا محمد صلى الله عليه وسلم على سائر إخوانه الأنبياء عليهم السلام
অর্থাৎ 'মুহাম্মাদ (ছাঃ) যে, তাঁর ভাই অন্য নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ব্যাপার নিয়ে ওলামাদের মাঝে কোন ইখতিলাফ নেই'।
৬. ইমাম নববী (রহঃ)-এর ফাতওয়া :
ইমাম নববী (রহঃ) তাঁর শারহে মুসলিমে 'আমি আদম সন্তানের সরদার' মর্মে বর্ণিত হাদীছের উপর এই নামে বাব বেধেছেন
باب تَفْضِيلِ نَبِيِّنَا - صلى الله عليه وسلم - عَلَى جَمِيعِ الخَلائِقِ.
অর্থাৎ 'রাসূল (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব অধ্যায়'। অতঃপর হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন,
وهذا الحديث دليل لتفضيله صلى الله عليه وسلم على الخلق كلهم لأن مذهب أهل السنة أن الآدميين أفضل من الملائكة وهو صلى الله عليه و سلم أفضل الآدميين وغيرهم..
অর্থাৎ 'এই হাদীছ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল। কেননা আহলুস সুন্নাহ-এর মাযহাব হচ্ছে, মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) সকল মানুষ ও অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
৭. ইমাম রাযী (রহঃ)-এর বক্তব্য : ইমাম রাযী এই বিষয়ে সালাফে ছালেহীন ঐক্যমতের কথা নকল করেছেন। وَقَدْ حَتَّى الرَّازِي الْإِجْمَاعَ عَلَى أَنَّهُ مُفَضَّلٌ عَلَى جَمِيعِ الْعَالَمِينَ তথা রাযী এই বিষয়ে ইজমা নকল করেছেন যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ।
৮. ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর বক্তব্য: ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, لأن النبي صلى الله عليه وسلم أفضل الأنبياء عليهم السلام অর্থাৎ 'কেননা মুহাম্মাদ (ছাঃ) হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী'।
৯. শায়খ আবদুল্লাহ ইবনু বায (রহঃ)-এর ফাতওয়া : শায়খ আবদুল্লাহ ইবনু বায (রহঃ) বলেন, أن نبينا صلى الله عليه وسلم هو أفضل الأنبياء অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী'।
১০. সউদী আরবের ফাতাওয়া বোর্ড 'লাজনা দায়েমা'-এর ফাতাওয়া : ফাতওয়া লাজনা দায়েমা-এর ফাতাওয়া নং, ২০৯৭২-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।
অতএব, যারা দলীল জানার পরেও রাসূল (ছাঃ) কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল বলবে না এবং সালাফে ছালেহীনের বিশ্বাস ও আক্বীদা থেকে সরে নতুন বিশ্বাস ও আক্বীদা পোষণ করবে তাঁরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত থেকে বের হয়ে যাবে।
টিকাঃ
২. সুনানে তিরমিযী, 'সূরা আলে ইমরানের তাফসীর' অধ্যায়।
৩. সুনানে তিরমিযী, 'সূরা আলে ইমরানের তাফসীর' অধ্যায়。
৪. বাংলা ইবনু কাছীর ২/১৩৯ পৃঃ।
৫. বাংলা ইবনু কাছীর ২/১৩৯ পৃঃ।
৬. সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৯৩৯।
৭. ফাহুল ক্বাদীর ২/১১ পৃঃ।
৮. বুখারী, মিশকাত হা/৫৮৬২।
৯. আবুদাউদ হা/২০৫২।
১০. ইবনু হিব্বান হা/৫৯৮৫।
১১. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৫৯৪।
১২. সূরা হিজর, আয়াত নং-৭২।
১৩. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা হিজর-এর ৭২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।
১৪. দেখুন: আল'মুজালাসাতু ও জাওয়াহিরুল ইলম, দারু ইবনু হাজাম ১/৫৪৩ পৃঃ, হা/২৫২৭।
১৫. দেখুন : তাফসীরে ইবনু কাছীর, সূরা আলে ইমরান ৮১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।
১৬. দেখুন: তাফসীরে ইবনু কাছীর, সূরা ইনশিরাহের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।
১৭. দেখুন : আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৬/৩১৫ পৃঃ।
২২. দেখুন : ১২৬ নং হাদীছ ইমাম আবু নুয়াইম আল-ইস্পাহানী (রহঃ) কর্তৃক লিখিত সিফাতুল জান্নাত 'আল্লাহ্র সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মাদ (ছাঃ)' অধ্যায়।
২৩. ইবনু মাজাহ হা/৪৩১৪।
২৪. তিরমিযী, 'ফাযলুন নাবী' অধ্যায়।
২৫. দেখুন: মুসনাদে আহমাদ হা/২১২৮৩।
২৬. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪১।
২৭. তিরমিযী, ছহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৩৫৪৩।
২৮. জু'আফাউল কাবীর হা/১০৬৭।
২৯. বুখারী, 'রাসূল (ছাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য' অধ্যায়।
৩০. তিরমিযী হা/৩৬১০, 'রাসূল (ছাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত' অধ্যায়।
৩১. তাক্বরীবুত তাহযীব নং ৫৬৮৫।
৩২. দালায়িলুন নবুয়াত হা/২২৩৩ 'রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক তাঁর উপর আল্লাহর নে'আমত-এর ব্যাপারে আলোচনা' অধ্যায়।
৩৩. তাক্বরীবুত তাহযীবে নং, ৬২২৮।
৩৪. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৩২৩৪৩, 'আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে যা দিয়েছেন' অধ্যায়।
৩৫. তাক্বরীবুত তাহযীব, ৩৯১৯ নং।
৩৬. إتحاف الخيرة المهرة বইয়ের 'নবুয়াতের আলামাত' অধ্যায়, হা/৬৩৭৩।
৩৭. সিলসিলা ছহীহাহ-এর ২৮১ নং হাদীছ।
৩৮. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪৮ 'নবীদের সরদারের ফযীলত' অধ্যায়。
৩৯. মুশকিলুল আসার, 'তোমরা আমাকে মূসার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না মর্মে বর্ণিত হাদীছের সমস্যার সমাধান' অধ্যায়।
৪০. মিশকাত হা/৫৭৭৩, 'ফাযায়েলে সাইয়িদুল মুরসালিন বা নবীদের সরদারের' ফযীলত অধ্যায়।
৪১. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হা/১৩৯২৭ অধ্যায় باب عظم قدره صلى الله عليه وسلم
৪২. মুস্তাদারাকে হাকেম হা/৩৩৩৫, 'সূরা ইবরাহীমের তাফসীর' অধ্যায়।
৪৩. দেখুন : মাজমাউয যাওয়ায়েদ অধ্যায় باب عظم قدره صلى الله عليه وسلم
৪৪. দেখুন : সিলসিলাহ যঈফাহ হা/৫৩৩।
৪৫. দেখুন: শারহে জামে সাগীর ১/১৬৩, আরবী বর্ণমালার 'খা' অক্ষর অধ্যায়।
৪৬. দেখুন: মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/ ১৩৯২৯, অধ্যায়
৪৭. দেখুন: মুখতাসার তারিখে দিমাশক রাসূল (ছাঃ)-এর মিরাজে গমন অধ্যায়।
৪৮. দেখুন তিরমিযী হা/৩১৩১, সূরা বানী ইসরাইল এর 'তাফসীর' অধ্যায়।
৪৯. বিস্তারিত দেখুন ফাল্গুল বারি, মি'রাজ অধ্যায়, দারুল মা'আরিফা ২/২০৭ পৃঃ।
৫০. দেখুন, তিরমিযী হা/৩৬১২, 'রাসূল (ছাঃ)-এর ফযীলত' অধ্যায়।
৫১. সূরা বাক্বারাহ ২/২৫৫।
৫২. বুখারী ও মুসলিম দেখুন, মিশকাত হা/৫৫৭২, হাওয ও শাফা'আত অধ্যায়]
৫৩. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬৬, দেখুন ফাজায়েলে সাইয়েদুল মুরসালীন অধ্যায়।
৫৪. তিরমিযী, রাসূল (ছাঃ)-এর ফযীলত অধ্যায়।
৫৫. মিশকাত, সাইয়েদুল মুরসালীন-এর শ্রেষ্ঠত্ব অধ্যায় হা/৫৭৫৭।
৫৬. দেখুন, তিরমিযী হা/৩৬০৮, অধ্যায় ফাজলিন নাবি বা রাসূলের শ্রেষ্ঠত্ব।
৫৭. দেখুন ছহীহ ও যঈফ জামে সগীর হা/২৩৫২।
৫৮. দেখুন, মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৮৮।
৫৯. দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হা/ ১৩৮২২ রাসূল (ছাঃ) এর কারামাত অধ্যায়।
৬০. দেখুন, তারিখে ইবনু আবী খায়ছামা, হা/২৯৫৭, ২/৭১৩।
৬১. দেখুন তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং, ৬৯০৭]
২. তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৭২৫৬।
৬৩. দেখুন তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং, ৭৪০৩।
৬৪. দেখুন তাবাকাতুল কুবরা, ইবনু সাদ, ১/২০ অধ্যায় ذكر من انتمى إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم
৬৫. দেখুন তাকরীবুত তাহযীব রাবী নং ৫৬৪।
৬৬. দেখুন, তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৯৫০।
৬৭. দেখুন, তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৬১৫১।
৬৮. তাফসীরে তাবারী ৩/১১০ পৃঃ; সূরা বাকারার ১৩৬ নং আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর দ্রষ্টব্য।
৬৯. বুখারী وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ -এই আয়াতের তাফসীর অধ্যায়।
৭০. দেখুন, বুখারী, 'ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে ঝগড়া অধ্যায় ও মূসা (আঃ)-এর মৃত্যু' অধ্যায়।
৭১. দেখুন, বুখারী, 'ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে ঝগড়া' অধ্যায়
৭২. দেখুন: শারহুস সুন্নাহ ১৩/২০৪।
৭৩. দেখুন, ফাহুল বারী হা/৩১৫৬, ১০/২০৫।
৭৪. দেখুন: বুখারী, وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ -এই আয়াতের তাফসীর' অধ্যায় এবং মুসলিম, 'মূসা (আঃ) এর ফযীলত' অধ্যায়।
৭৫. দেখুন: মুসলিম, 'ইউনুস (আঃ) -এর যিকির বা উল্লেখ' অধ্যায়, ছহীহ ও যঈফ জামে সগীর হা/৭৭৮৫।
৭৬. সূরা কালাম, আয়াত নং-৪৮।
৭৭. শারহে আবুদাউদ ২৬/৪৫২, 'বাবে আত-তাখয়ির বাইনাল আম্বিয়া' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
৭৮. দেখুন, ইমাম নববী এর শারহে মুসলিম ১৫/১৩২, ইমাম সুয়ূত্বী এর শারহে মুসলিম হা/৫৯০।
৭৯. দেখুন মুসলিম, 'ইবরাহীম (আঃ)-এর ফযীলত' অধ্যায়।
৮০. দেখুন, বুখারী 'আলামাতে নবুয়াত' অধ্যায়, হা/৩৪১৫, তিরমিযী হা/২১৮৮।
৮১. সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪৪।
৮২. দেখুন মাজমুউ ফাতাওয়া ১৭/৪৮৩।
৮৩. সিলসিলা যইফাহ হা/৫৬৭৮।
৮৪. দেখুন ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর কিতাবুর রিসালাত ১/১৩ পৃঃ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া।
৮৫. দেখুন, আল-ফাতাওয়া আল-হাদীছিয়াহ ১/১৩৬, দারুল ফিকর।
৮৬. দেখুন, মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়াহ, দারুল ওয়াফা ১/১৪৫।
৮৭. দেখুন, আল ফুরকান বাইনা আওলিয়াইর রহমান ও আওলিইয়াইশ শায়তন, মূল, ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ, তাহক্বীক্ব ও টীকা, আলী ইবনু নায়িফ আশ-শুহৃদ, 'উলূল আযমদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাম্মাদ (ছাঃ)' অধ্যায় দ্রষ্টব্য ১/৮৩।
৮৮. শারহে নববী ১৫/৩৭, 'আমাদের রাসূল (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব' অধ্যায়।
৮৯. দেখুন, ইমাম নববীর منهاج الطالبين-এর 'শারহ তুহফাতুল মুহতাজ' ভূমিকা দ্রষ্টব্য ১/১০০ পৃঃ।
৯০. দেখুন, সূরা নাহলের ১২৩ নং আয়াতের তাফসীর।
৯১. দেখুন, মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনু বায ১/১৭৯ পৃঃ।
📄 আক্বলী দলীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল
১. নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব আল-কুরআন। এই কিতাব যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ মাস (রামাযান)। যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ রাত (লাইলাতুল কদর)। যে ফেরেশতা নিয়ে এসেছেন তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা (জীবরাঈল)। সুতারাং স্বভাবতই যে নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তিনি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হবেন।
২. মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াত অন্যান্য রাসূলগণের নবুয়াতের চেয়ে বৈশিষ্ট্যগতভাবে অনেক মহান। কেননা মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াতের দ্বারা অন্য সকল নবীদের নবুয়াত ও দ্বীনকে মানসূখ বা রহিত করে দিয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুয়াত অন্য কোন নবীর নবুয়াত দ্বারা মানসুখ হবে না। অন্য নবীদের নবুওয়াত ছিল নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য এবং রাসূল (ছাঃ)-এর নবুয়াত সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য।
রাসূল (ছাঃ)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়ার প্রমাণে উপরের দলীলগুলো আশা করি যথেষ্ট হবে। ইনশাআল্লাহ। সত্যি বলতে কি, হক্বের অন্বেষণকারীদের জন্য একটি দলীলই যথেষ্ট। গবেষণা করতে গিয়ে আরো অনেক অনেক দলীল চোখে পড়েছে। কিন্তু সেগুলো তাহক্বীক্বে র মুখাপেক্ষী। সময় সঙ্কীর্ণতার কারণে সেদিকে আর পা বাড়াচ্ছি না। তবে কিছু বইয়ের নাম উল্লেখ করছি, যেখানে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মহত্ত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছগুলো জমা করা হয়েছে। যেমন : ইমাম বায়হাক্বির দালায়িলুন নবুওয়াত। একই নামে ইমাম ইস্পাহানী (রহঃ)-এরও বই রয়েছে। এছাড়া আল খাসায়িসুল কুবরাও এই বিষয়ে চমৎকার একটি কিতাব।
📄 ইবরাহীম (আঃ)-এর বিষয়ে বর্ণিত হাদীছ
একদা এক লোক মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলল, হে সৃষ্টির সেরা মানুষ! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, সে তো ইবরাহীম। তথা সৃষ্টির সেরা মানুষ ইবরাহীম (আঃ)।
ব্যাখ্যা:
প্রথমতঃ যারা রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব-কে অস্বীকার করেন, তাদেরকে আগে এই হাদীছের জবাব দিতে হবে। কেননা এই হাদীছে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর উপর এবং সকল নবীর উপর ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রাধান্যকে মেনে নিচ্ছেন এবং এই হাদীছ একটা বড় দলীল যে, রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে কমবেশী আছে।
দ্বিতীয়তঃ অত্র হাদীছে ইবরাহীম (আঃ)-কে 'খাইরুল বারিয়্যা' বলা হয়েছে, তেমনি অন্য হাদীছে মুহাম্মাদ (ছাঃ) স্বয়ং নিজেকে 'খাইরুল বারিয়্যা' বা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলেছেন,
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يخرج في آخر الزمان قوم أحداث الأسنان سفهاء الأحلام يقرءون القرآن لا يجاوز تراقيهم يقولون من قول خير البرية يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية
অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, শেষ যামানায় কিছু মানুষ বের হবে যারা হবে অল্প বয়সি বোকা। তাঁরা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবেনা। তাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কথা থেকে কথা বলবে তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর হাদীছ শুনাবে। তাঁরা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর বের হয়ে যায় ধনুক থেকে।
এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) 'খাইরুল বারিয়্যা' তথা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
তৃতীয়তঃ সালাফে ছালেহীন এই হাদীছের দুইভাবে জবাব দিয়েছেন।
১. মানসুখ ২. ভদ্রতা ও সম্মানের জন্য।
মানসুখ: রাসূল (ছাঃ) আগে জানতেন না যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন, তাকেও সেইভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এটাও জানতেন না যে, তিনি সকল আদম সন্তানের সরদার এবং ইবরাহীম (আঃ) ক্বিয়ামতের মাঠে তাঁর ঝাণ্ডার নীচে হবেন। এও জানতেন না যে, মহান আল্লাহ তাঁর আগের ও পিছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। এগুলো না জানার কারণে তিনি এই কথা বলেছিলেন। যখন জানতে পারলেন যে, তিনিই শ্রেষ্ঠ, তখন আবার ঐ সমস্ত হাদীছ বলেন যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে।
যেমন বিংশ শতাব্দীর মহান মুহাদ্দিস নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, وأجاب العلماء عن هذا بأن النبي صلى الله عليه وسلم قال ذلك تواضعاً وهضماً لنفسه، أو أنه قال ذلك قبل أن يوحى إليه بأن الله تعالى اتخذه خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً، وأنه سيد الناس يوم القيامة، آدم فمن دونه تحت لوائه - صلى الله عليه وسلم - ، كما جاء في الأحاديث الصحيحة
অর্থাৎ 'আলেমগণ এই হাদীছের দুইভাবে জবাব দিয়েছেন। হয় তিনি এটা সম্মান ও ভদ্রতার খাতিরে বলেছেন বা তিনি এই খবর জানার আগে বলেছেন যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাঁকেও সেভাবেই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ক্বিয়ামতের মাঠে আদম সন্তানের সরদার হবেন এবং আদম (আঃ) সহ সকলেই তাঁর ঝাণ্ডার নীচে হবেন। অনুরূপই ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
মানসূখ হওয়ার দলীল হতে পারে এই যে, এই হাদীছ আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন এবং আদম সন্তানের সরদার হওয়ার হাদীছ আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আর আবু হুরায়রা (রাঃ) অনেক পরে ইসলাম নিয়ে এসেছেন তিনি ৭ম হিজরিতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তথা তাঁর বর্ণিত হাদীছগুলো শেষের দিকের হাদীছ।
রাসূল (ছাঃ) আসলে ভদ্রতার কারণে অন্য কাউকে তাঁর সামনে তাঁর প্রশংসা করতে দিতেন না। এই জন্যই তিনি যখনই তাঁর সম্মানের কথা জনগণের সামনে জানিয়েছেন তখনই বলেছেন, 'ওলা ফাখরা' তথা আমি এই কথা গর্ব করতে বলছি না। বরং তোমাদেরকে দ্বীনের একটা বিষয় জানানোর জন্য বলছি, যেন তোমরা তার উপর ঈমান আন।
অবশ্য এই হাদীছ মানসূখ হলেও এই হাদীছই দলীল যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও মানব হচ্ছেন ইবরাহীম (আঃ)। যেমন শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেন,
فَإِبْرَاهِيمُ أَفْضَلُ الْخَلْقِ bعْدَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থাৎ 'ইবরাহিম (আঃ) মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর পর সৃষ্টির সেরা'।
উল্লেখ্য যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর শানে বর্ণিত অত্র হাদীছ ছাড়া আর যত হাদীছ বিভিন্ন নবী ও মানুষের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে, যেমন আলী (রাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সেগুলো সবই শী'আ ও বাতিল ফিরকাগুলোর বানোয়াট হাদীছ।
টিকাঃ
৭৯. দেখুন মুসলিম, 'ইবরাহীম (আঃ)-এর ফযীলত' অধ্যায়।
৮০. দেখুন, বুখারী 'আলামাতে نবুয়াত' অধ্যায়, হা/৩৪১৫, তিরমিযী হা/২১৮৮।
৮১. সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪৪।
৮২. দেখুন মাজমুউ ফাতাওয়া ১৭/৪৮৩।
📄 সতর্কীকরণ
রাসূল (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু তিনি মানবতার উর্ধ্বে নন। তিনি নূরের তৈরি নন এবং তিনি গায়েবের খবর জানতেন না। তাঁর কাছে প্রার্থনা করা শিরক।
রাসূল (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু তিনি মানবতার উর্ধ্বে নন। তিনি নূরের তৈরি নন এবং তিনি গায়েবের খবর জানতেন না। তাঁর কাছে প্রার্থনা করা শিরক।