📄 ইহুদি রাষ্ট্র
যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মদদে প্যালেস্টাইনে ইহুদি বাসভূমির ঠিকানার ভিত তৈরি হলেও এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হঠাৎ করেই নীতি পরির্তন করে। এতে ইহুদি কূটনীতিকে সংকটে ফেলে দেয়। জুইশ এজেন্সি ও আমেরিকার জাইঅনবাদীরা খাইম ওয়াইজম্যানকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এই সংকট সমাধানের জন্য জরুরি অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমত পক্ষে আনার ক্ষেত্রে খাইম ওয়াইজম্যানের বিকল্প ছিল না। ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে ব্রিটিশদের সহায়তার প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ ব্যাপক হারে ইহুদি অভিবাসন সম্ভব হয়েছিল। ইহুদিরা সেই রাষ্ট্র স্থাপনের দ্বারপ্রান্ত এসে যায়। এখন পরিস্থিতি বদলে যাবার আগেই সর্বোচ্চ কূটনেতিক প্রভাব খাটিয়ে প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যতটা সম্ভব ত্বরান্বিত করে অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা সৃষ্টি করতে হবে। জাইঅনবাদীরা ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্যালেস্টাইনে যে নীতি অনুসরণ করছিল তা খাইম ওয়াইজম্যানের ভাষায় চমৎকার ফুটে উঠেছে। প্যালেস্টাইনের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে 'আমার কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে পিছু হটা হবে মারাত্মক। আগের মতোই, এখন আমাদের একমাত্র সুযোগ হচ্ছে বাস্তবতা সৃস্টি করা, তা নিয়ে পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়া এবং তার ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।'
খাইম ওয়াইজম্যান প্রথমে ব্রিটেনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের ওপর বেশি প্রভাব খাটাতে সক্ষম হয়েছিলো। মূলত তারই প্রয়াসে ১০০ বছর আগে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বালফো ঘোষণা করেছিল, যা ছিল প্যালেস্টাইনে ইহুদি বাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি কোনো বিশ্বশক্তির প্রথম আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার। প্রথম মহাযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য ম্যান্ডেটরি কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে মর্মে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাও ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি আলোচনায় ইহুদি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে ওয়াইজম্যানের কূটনৈতিক দক্ষতার ফসল। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে 'প্যালেস্টাইন পার্টিশন প্ল্যান' অনুমোদনের পেছনেও ওয়াইজম্যানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াইজম্যান প্রথমবার ১৯২১-১৯৩১ এবং দ্বিতীয়বার ১৯৩৫-১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওয়াইজম্যানের ব্রিটিশঘেঁষা নীতি এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্দে সন্ত্রাসী আক্রমণের বিরোধিতা কারণে তিনি ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গানাইজেশনে কোনোঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৪৬ এর কংগ্রেসে অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি প্রেসিডেনেটর পদ হতে বাদ পড়েন এবং বেন গুরিয়নকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৪৭ এর ২৯ নভেম্বর জাসিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্যালেস্টাইন পার্টিশন প্ল্যান অনুমোদিত হওয়ার পর ওয়াইজম্যান ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব সমাপ্ত হয়েছে ধারণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে কিছুদিন অবস্থানের পর প্যালেস্টাইনে তার প্রতিষ্ঠিত ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৮ এর জানুয়ারি মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্যালেস্টাইন নীতি তথা প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের নীতি পরিবর্তনের আভাস লক্ষ্য করতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশেষকওের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সন্দিহান হয়ে পড়েন যে প্যালেস্টাইনের জাইঅনবাদীরা আরব রাষ্ট্রসমূহের আক্রমণেরমুখে টিকে থাকতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে ওয়াইজম্যান যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি ও সকল ধর্মের প্রতি সমহানুভূতিশীল নেতাদের সাথে শলাপরমার্শ শুরু করেন। সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং জাতিসংঘের সদস্যদের প্রতিনিধিদের সাথে প্যালেস্টাইনের পার্টিশন বিষয়ে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনো সিকিউরিটি কাউন্সিলের বৈঠকে পার্টিশন প্ল্যানের সমর্থনে প্রস্তাব পাশ করা সম্ভব হয়নি। ৪৭ এর ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান প্যালেস্টাইন পার্টিশনের পক্ষে তার অবস্থানের কথা ওয়াইজম্যানকে জানিয়েছিলেন। ওয়াইজম্যান আমেরিকান প্রেসিডেন্টের এই কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি। তিনি মন্তব্য করেনে, 'যাই হোক আমি সন্দিহান তিনি জোনেন কিনা স্টেট ডিপার্টমেন্ট তারই অধস্তনরা কি পরিমাণে তার নীতি ও উদ্দেশ্যকে বাধ্যগ্রস্ত করছে।'
তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি প্রশাসন ছিল খুবই দুর্বল। ঐ বছরই নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্ভাব্য ফল সম্ভাব্য সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান পুনঃনির্বাচিত হবেন না। তাই রাষ্ট্রপতি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যে অনেক বিষয়েই সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছিল। প্যালেস্টাইন বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ও স্টেট ডির্পাটমেন্টের মতদ্বৈততা প্রকট হয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল। ১৯ মার্চ জাসিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনেটর অস্টিন প্যালেস্টাইনে বিবদমান পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধ-বিরতি করা এবং ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব করে যাতে ১৫ মে, ১৯৪৮ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের পূর্বেই ওসি পরিষদের অধীনে প্যালেস্টাইনের নতুন সরকার গঠন সম্ভব হয়।
ওয়াইজম্যান যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে পক্ষে আনতে না পারলেও ইহুদি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে এবং তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকায় এটা ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্যালেস্টাইনে যে ট্রাস্টিশিপ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে তা বাস্তবায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত তিন লক্ষ সেনা প্যালেস্টাইনে মোতায়েন করতে হবে। ২য় মহাযুদ্ধ-পরবর্তীকালে আমেরিকান জনগণের নিকট এই সম্ভাবনা মোটেই আকর্ষণীয় ছিল না।
শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুসারে প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব স্থগিত রেখে অন্তর্বর্তীকালের জন্য সমগ্র ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইন ট্রাস্টিশিপ সরকার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি। ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বিস্তারিত ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাব সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পেশ করে। সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য ১ম কমিটিতে প্রেরণ করে। ২০ এপ্রিল হতে ১ম কমিটিতে প্রস্তাবটির ওপর বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্য হতে প্রতীয়মান হয় যে, প্রস্তাবটি খুব সহজে অনুমোদিত হবে না। বিশেষকরে প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের সামরিক অগ্রগতি, লক্ষ লক্ষ আরবদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হওয়া এবং প্যালেস্টাইনের সার্বিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের কো সদস্য রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণে আগ্রহ দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাবের প্রতি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সাধারণ পরিষদকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল যে, ১৫ মে যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্টাইনে শান্তিরক্ষায় কোনো ভূমিকাই পালন করবে না। এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাতিসংঘ ১৫ মে'র আগে কোনোক্রমেই ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাবের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। সিকিউরিটি কাউন্সিল ১ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। বিবাদমান কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি' পালনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ওয়াইজম্যান ও জাতিসংঘে তাদের প্রতিনিধিদল নিশ্চিত হয়েছিল যে, জাতিসংঘের ২ নভেম্বর, ১৯৪৭ প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব রহিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তারা প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঘোষণার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলে এবং ১৫ মে'র পূর্বেই তা বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাই ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার সাথে সাথেই যাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক বৃহৎ শক্তি ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বীকৃতি দেয় ওয়াইজম্যান সে বিষয়টি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার সাথে সাথেই যেন তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় সেই অনুরোধ জানিয়ে ওয়াইজম্যান ১৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির নিকট পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ১৫ মে মধ্যরাতে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের সাথে সাথেই ইহুদি রাষ্ট্রের সরকার সীমানায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণকে রক্ষা করার সকল ব্যবস্থা করবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বিশ্বের সকল দেশের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করবে। 'আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আপনার নেতৃত্বে যে যুক্তরাষ্ট্র একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান বের করার জন্য এতো কিছু করেছে সেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন ইহুদি রাষ্ট্রকে অতি দ্রুত স্বীকৃতি দান করবে। আমি মনে করি পৃথিবী এটাই যথাযথ মনে করবে যে সবচেয়ে মহৎ প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ সবচেয়ে নতুন (গণতান্ত্রিক) দেশকে সর্বপ্রথম জাতিসমূহের পরিবারে বরণ করে নেবে।' প্রেসিডেন্ট ট্রম্যান ওয়াইজম্যানের অনুরোধ রেখেছিলেন। তেলআবিবে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার ১১ মিনিটের মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঘোষণা: প্যালেস্টাইনের অধিকাংশ ইহুদির কাছে ইহুদি রাষ্ট্রের শুরু হয়েছিল ২৯ নভেম্বর ১৯৪৭ যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের স্বীকৃতি লাভ করে। ব্রিটিশদের ম্যান্ডেট অবসানের তারিখ ঘোষণার ফলে ইহুদিদের নিকট এটা ছিল সময়ের ব্যাপার যে সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে আইনগতভাবে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট কর্তৃপক্ষে ম্যান্ডেট অবসানের তারিখ ঘোষণার পর থেকে তাদের ১ লক্ষ সেনাকে নিরাপদে প্যালেস্টাইন থেকে প্রত্যাহারের জন্য যতটুকু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা প্রয়োজন শুধু তার মধ্যে সরকারের কার্যক্রম সীমিত রেখেছিল। ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত এলাকায় রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ সকল রাষ্ট্রীয় পরিষেবা জুইশ এজেন্সি দিয়ে আসছিল।
প্রস্তাবিত ইহুদা রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে ইহুদিদের ক্ষমতা সুসংহত করার উদ্দেশ্যে যা যা করণীয় তা সবই তারা করেছিলেন। কিন্তু প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রর নীতির হঠাৎ করে 'উল্টো যাত্রা' তাদের নেতৃত্বকে বিচলিত করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে পূর্ব-সিদ্ধান্ত অনুসারে যথাসময়ে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেটের শেষের দিকে ব্রিটিশদের ছেড়ে যাওয়া শূন্যতাকে পূরণের কাজ করার জন্য ৩৭ সদস্যের একটি গণপরিষদ গঠন করে। এই পরিষদে সকল দল ও মতের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এটা ইহুদি রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক আইনসভার দায়িত্ব পালন করছিল। এছাড়া বেন গুয়িরনের নেতৃত্বে ১৩ সদ্যসের জাতীয় প্রশাসন গঠন করা হয়, যা কার্যত মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পালন করেছিল। জাতীয় প্রতিরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ উপেক্ষা করে জাতীয় প্রশাসন সৃষ্টি করে কার্যথ ইহুদি রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে।
১২ মে জাতীয় প্রশাসনের রাতব্যাপী সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২ দিন পর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। প্যালেস্টাইনের চলমান যুদ্ধের অবস্থা এবং ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার পর আবর রাষ্ট্রসমূহের নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার কৌশল ও ক্ষমতা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা উপক্ষো করে রাষ্ট্র ঘোষণা করার পরিণতি শিশু রাষ্ট্রের জন্য কী হতে পারে এটা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক হয়। যথাসময়ে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণা না করে হলে প্যালেস্টাইনে ইহুদি অধিবাসীদের ও যোদ্ধাদের মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে বলে যুক্তি তুলে ধরা হয়। এই সভা চলাকালে টেলিফোনে ওয়াইজম্যানের মতামত চাওয়া হলে ওয়াইজম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠেন, What are they waiting for. idiots? 'বোকারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছে?' তিনি অবিলম্বে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মতো জানান। সারা রাত আলোচনার পর জাতীয় প্রশাসন ৬ এবং ৪ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রের নাম কী হবে তা নিয়েও সর্বশেষে বিতর্ক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম Eretz Israel' (ইসরায়েলের দেশ), 'জাইঅন', 'যুদা', 'জাইঅনা,' ইব্রিয়া', (ইব্রাহিমের দেশ) 'হার্জলিয়া' (হার্জেলের দেশ) নাম প্রস্তাব করা হয়। প্রথম চারটি নামের প্রস্তাব নাকচ করা হয় এই কারণে যে, এই নামগুলি ইহুদি রাষ্ট্রের বাস্তবতার সাতে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ নয়। Eretz Israel' এর 'ঐতিহাসিক ধারণাগত' সীমায় প্যালেস্টাইন, ট্র্যান্সজর্ডন, লেবানন, সিরিয়র অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্য নাম তিনটি সাধারণ জেরুজালেমের অপর নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু জেরুজালেমের ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নেই।
সর্বশেষ, বেন গুরিয়ন রাষ্ট্রের নাম 'ইসরায়েল' প্রস্তাব করলে তা ভোটে গৃহীত হয়। ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষণার মাত্র কয়েক মিনিট আগে রাষ্ট্রের নাম নির্ধারণ করা হয়। প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার করা হবে ১৬ এই মর্মে ঘোষণা ছিল ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গনাইজেশনের। ম্যান্ডেট অবসানের পরের দিন এই ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল। প্রকৃতপক্ষে ঘোষণা ওদয়ো হয়, ১৪ই মে বেলা ৪টার। প্যালেস্টাইনের ব্রিটিশ হাইকমিশনার ১৪ মে রাত ১২-০১ মিনিটে হাইফা বন্দর থেকে নোঙর তুলে প্যালেস্টাইন থেকে বিদায় নেন এবং এর সাথেই প্যালেস্টাইনে নব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান হয়। এর আট ঘণ্টা আগে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা করা হয়। ইসরায়েল রাস্ট্র ঘোষণার তারিখ ও সময় গোপন রাখা হয়েছিল গোষণা অনুষ্ঠানের সিরাপত্তার স্বার্থে এবং শত্রুকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। আরেকটি বড় কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অতি উৎসাহের কারণে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ঘোষণা ব্যহত করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই ইহুদি উঠেস্ট্রকে বাস্তব সত্য পরিণত করা।
📄 ইহুদি ধর্ম
যা ধারণ করা যায় তাহাই ধর্ম। আজ ধর্মের সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। পৃথিবীতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত বহুবিধ আচার-আচরণ, দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা, সামাজিক আচরণেরপ নীতিমালা, জীবন-বিধান, ন্যায়-অন্যায় বিধি, পবিত্রতা বিধান ইত্যাদির প্রতি আনুগত্যতাকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিকগণ বিভিন্ন মাত্রা অবলম্বন করে ধর্মের সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছেন। তবে মানবজীবন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আছে যা পুনঃপুন" ঘটনশীল, অটল এবং অসহনীয় যেগুলি মোকাবিলা করতে ধম, এবং বিশ্বাস আমাদের সাহায্য করে। কেন এবং কিভাবে জগতসংসার সৃষ্টি হয়েছে ধর্ম আমাদের কিছু ধারণা ও তত্ত্ব দিয়ে থাকে যা আমাদের মানসিক ধারণশক্তির সীমাবদ্ধতা উত্তরণের সহায়ক হয়। সংখ্যার দিক থেকে ইহুদি ধর্ম খুব ছোট ধর্ম।
'আধুনিক প্রেক্ষাপটে 'ইহুদি ধর্মকে' একটি ধর্ম হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে সনাতন ইহুদিগণের মধ্যে বেশ আপত্তি লক্ষণীয়। তারা মনে করেন, তাহলে ইহুদিধর্মের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। ইসলাম খ্রিস্ট অথবা বৌদ্ধধর্মের সাথে এক সারিতে একই শ্রেণিীতে ইহুদিধর্মকে বিবেচনা করা তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
তৌরিদ অনুসারে, সকল ইসরায়েলিদের উপস্থিতিতে ঈশ্বর সাইনাই পর্বতে নিজের আবির্ভাব ঘটিয়ে মোশী এবং ইসরায়েলিদের সাথে ঈশ্বরের চুক্তি ঘোষণা করেছিলেন এবং এই চুক্তি নির্দিষ্টভাবে শুধু ইসরায়েলিদের ওপর প্রযোজ্য ছিল। তৌরিদ আকারে ঈশ্বর যে বিধান ঘোষহণা করেছিলেন তা পালন করা ও রক্ষা করা একমাত্র ইসরায়েলিদের দায়িত্ব। তাই এটা অনস্বীকার্য যে, ইহুদিধর্মে যে নির্দিষ্টতা রয়েছে তা এই ধর্মের অন্তস্থিত বিশ্বজনীনতাকে ঢেকে রেখেছে। ইহুদিধর্মের ইতিহাসে কোনো কোনো পর্যায়ে পুতুল-পূজারিদের মধ্য থেকে ধর্মান্তরের মাধ্যমে ইহুদি ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত থাকলেও ইহুদিধর্ম সাধারণভাবে এর মধ্যে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের প্রবণতা সবসময় বজায় রেখেছে।
ইহুদি পণ্ডিতগণের মতে, কে অতীতের ঋষিগণ কখনোই একটা ধর্শ বলে মনে করতেন না। যেই অর্থে পৌত্তলিকতাকে ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হত সেই অর্থে Judaism কে ধর্ম হিসেবে গণ্য করায় তাদের তীব্র বিরোধিতা ছিল। ইসরায়েলিদের সাথে ঈশ্বরের বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে Judaism হচ্ছে একে স্বয়ংসম্পূর্ণ জীনযাপন প্রণালী। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইহুদি ধর্ম এবং সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ইহজাগতিকতার মধ্যে কোনো পরস্পরবিরোধী দ্বি-বিভাজনত্ব ছিল না। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর যাবৎ ইহুদিরা কোথাও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিষ্ঠিত ছিল না, তাই আধুনিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইহুদি ধর্মীয় বিধানের সাংঘর্ষিকতা পরীক্ষিত হয় নাই। আর ইহুদিরা পৃথিবীর যেখানেই বাস করুক না কেন, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তারা তাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিত জীবনযাপন করত। তাই ধর্মীয় বিধান ও ইহজাগতিক বাস্তবতার সংঘর্ষ ইহুদি মননে প্রকট হয়ে ধরা পড়েনি, যা ইসরায়েল রাষ্ট্রে এখন দেখা দিয়েছে।
অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ধর্মগুলির মধ্যে ইহুদি ধর্ম একেশ্বরবাদের প্রাচীনতম ধারক ও বাহক। অপর দুটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম, যথা খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ইহুদিধর্মের বহু ঐতিহ্যের অংশীদার। প্রকৃতপক্ষে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাস করে যে, ইহুদি বাইবেলের কতিপয় বিধান ঈশ্বরই বাতিল করে নব-বিধান বা New Testament বহাল করেছেন। তাসত্ত্বেও ও ইহুদি বাইবেলকে খ্রিস্টানগণ এখনো ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে বিশ্বাস করেন এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ New Testament এর সম্পূরক বলে বিবেচনা করে। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে অবশ্য বর্তমানে তৌরিদ বলে প্রচলিত গ্রন্থ ঈশ্বরপ্রদত্ত মূল তৌরিদ গ্রন্থনয়। এটা পরিবর্তন করে তৌরিদের মূল শিক্ষাকে বিকৃত করা হয়েছে। New Testament এর ক্ষেত্রেও ইসলাম অনুরূপ বিশ্বাস পোষণ করে। প্রকৃতপক্ষে ইহুদিধর্মের মূল আচার-পশু-পক্ষী বলিদান, অগ্নি-আহুতি, বিসর্জন, নৈবদ্য, ইত্যাদির প্রচলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। জেরুজালেমের মহাপবিত্র মন্দিরকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে বিকেন্দ্রিত গণ-প্রার্থনা প্রবর্তিত হয়েছে। ঈশ্বরের সাথে ইসরায়েলিদের তথাকথিত চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া বহু ধর্মীয় বিধান ইহুদিরা স্থগিত বা বাতিল করেছে।
ইহুদি ধর্মের কতকগুলি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা হাজার বছর যাবৎ ইহুদিধর্মকে অন্যান্য ধর্ম থেকে পৃথক করে রেখেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি ইহুদিধর্মকে শুধু নিজস্ব ভাবমূর্তি দেয়নি, হাজার বছর ধরে এর ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করেছে, এই ধর্মের প্রতি বিভিন্ন ধর্ম, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অধিকারী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করেছে। এই ধর্মের এমন কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে যা অ-ইহুদিগণকে এর থেকে দূরে রেখেছে। পশ্চিমা লেখক ও গণমাধ্যম ইহুদিধর্মকে অন্যতম মহান ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে। কিন্তু এর অনুসারী সংখ্যা অথবা এর ভৌগোলিক ব্যাপ্তি কোনো বিবেচনায়ই ইহুদিধর্মকে একটি মহান ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সংখ্যার দিক দিয়ে এই ধর্ম বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র একটি ধর্ম। বহু উপজাতীয় প্রাচীন বিশ্বাসের অনুসারী অথবা ধর্মীয় উপগোষ্ঠীর অনুসারীরর সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেইএর চেয়ে বেশি।
ইহুদিরা মনে করে ইহুদিদের প্রথম পুরুষতান্ত্রিক প্রধান আব্রামকে (আব্রাহাম) ঈশ্বর প্রথম দেখা দিয়ে প্রথম নির্দেশ দিয়েছিলেন তার পিতা-পিতামহের দেশ ত্যাগ করে কানানদের দেশে (বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও প্যালেস্টাইন) চলে যেতে। ঈশ্বর কানানদের বাসভূমি আব্রাহামের বংশধরগণকে চিরকালের জন্য তাদের বাসভূমি হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঈশ্বরের এই প্রতিশ্রুতি আংশিকভাবে বাস্তাব রূপ নিতে সময় লেগেছিল প্রায় ৬০০ বছর। এর মধ্যে আব্রাহাম ও তার অধস্তন দুই পুরুষ যাযাবর হিসেবে জীবন কাটিয়েছে। পরবর্তী ৪৩০ বছর আব্রাহামের বংশধরগণ বাস করেছে মিশরে এবং ৪০ বছর কাটিয়েছে জনহীন প্রান্তরে। আনুমানিক ৯২১ অব্দে রাজা সলোমানের মৃত্যুর পর ইসরাইলের রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে-উত্তরে ইসরায়েল রাজ্য ও দক্ষিণে জুডিয়া (যুদা) রাজ্য। এই দুই রাজ্যের মধ্যে ইসরায়েল রাজ্য আসিরিয়গণ দখল করে নেয় খ্রি. পৃ. ৭৪০ অব্দে এবং জুডিয়া রাজ্যের পতন হচ নেবুখাদনেজার বাহিনীর নিকট খ্রি. পৃ. ৫৮৬ অন্ধে। ঐ বছরই জেরুজালেমের প্রথম মহাপবিত্র মন্দির ধ্বংস করা হয়। ইতোমধ্যে খ্রি. পৃ. ৫৯৭ অব্দে বিপুল সংখ্যক ইহুদিকে বন্দি করে বেবিলনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ইহুদিদের বেবিলনীয় বন্দিত্ব শুরু হয়। প্যালেস্টাইনের একটি অংশে দু'টি ইহুদি রাজ্য ছিল ২৭০ বছর। খ্রি. পৃ. ৫৮৬ অব্দে জুডিয়া রাজ্যের পতনের পর ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের মন্দির দ্বিতীয়বার ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত কখনো জেরুজালেমকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র ইহুদি রাজ্যের উত্থান বা পতন হয়েছে কিন্তু কখনো তা কানান দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজ্য হয়ে উঠেনি। আধুনিক ইসরালেয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার বছর ইহুদিগণ মূলত নির্বাসন জীবন কাটিয়েছে এবং প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রীয় ক্ষশতা তাদের হাতে ছিল না। সমগ্র প্যালেস্টাইন অথবা বাইবেলীয় তথাকথিত ইসরায়েলের আবাসভূমি কখনো ইসরায়েলিদের অধীন ছিল না এবং এখনো নেই।
কানানীয়দের দেশে ইসরায়েলিদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে পন্থা বেছে নিয়েছিলো তা রীতিমত লোমহর্ষক। কানানীয়দের দেশের পথে জর্ডন নদীর পারে মিদিয়ান রাজাদের ইসরায়েলিরা পরাজিত করে তাদের শহরের সকল পুরুষদের হত্যা করে। তাদের শহরগুলি পুড়িয়ে দেয়, গবাদিপশু ও ধনসম্পদ লুট করে এবং মহিলা ও শিশুদের বন্দي করে ইসরায়েলিদের শিবিরে নিয়ে আসে। কানানীয়দের দেশের যেসকল এলাকা ভবিষ্যত ইসরায়েল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সেসকল এলাকার শহরবাসীদের ভাগ্যের তুলনায় কোনোানীয় কুমারী মেয়েদের ভাগ্য অনেক ভাল ছিল। তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে ছিল।
📄 অন্য ধর্মের প্রতি মনোভাব
অন্যধর্মের প্রতি ইহুদির মনোভাব সবসময়ই উন্নাসিকতাদুষ্ট। কখনো কখনো ধৃষ্টাতাপূর্ণ এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ঈশ্বরের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক, ঈশ্বরে বরপুত্র হিসেবে নিজদের তারা বিশেষ এক শ্রেণিভুক্ত গণ্য করে থাকে। একমাত্র ইহুদি মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করলেই সেই শ্রেণিভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব।
তারা মনে করে 'সকল বস্তুর প্রভুর আমরা প্রশংসা করি, সকল মহত্বের অধিকারী সৃষ্টিকর্তা, যিনি আমাদেরকে সকল দেশের সকল জাতি থেকে পৃথক করেছেন, পৃথিবীর অন্যসব পরিবারের মধ্যে আমাদের স্থাপিত করেননি। কারণ অন্যের ভাগ্যের সাথে আমাদের অংশীদার করেননি এবং আমাদের নিয়তি অন্য জনতার সাথে মিলিয়ে দেননি। কারণ তারা অহমিকা ও নিঃসারতার কাছে মাথা নত করে এবং যে দেবতা তাদের রক্ষা করতে পারে না তার কাছে তারা প্রার্থনা করে। অন্নদিকে, আমরা হাটু বাঁকা করি ও প্রণিপাত করি রাজা, রাজাধিরাজ পবিত্র সত্তা বরণ্যের প্রতি... শুধু মহাপ্রভু ব্যতীত অন্য কোরো প্রতি নয়। আমাদের রাজা সত্য, অন্য কেউ নয়।'
ইহুদিগণ নিজদের মধ্যে অ-ইহুদিকে নিন্দে করে যেসব সর্বনাম ব্যবহার করে তার মধ্যে 'gentile' শব্দটি সবচেয়ে ভদ্রসূচক। gentile শব্দটি Latin শব্দ মবহঃরষব থেকে উৎপত্তি হয়েছে। শব্দটির অর্থ হচ্ছে, pagan বা heathen। সহজ বাংলা কথায় পৌত্তলিক বা বিধর্মী। অ-ইহুদিগণকে gentile নামে আখ্যায়িত করা এতো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে যে এখন সর্বনামটিকে খ্রিস্টানগণ তেমন অপমানজনক মনে করেন। আরেকটি অবমাননাকর সর্বনাম যা ইহুদিগণ-অ-ইহুদি, বিশেষকরে খ্রিস্টানদের বর্ণনা করতে ব্যবহার করেন তা হচ্ছে Goi, বহু বচনে Goim। পৃথিবীতে বাস করে ইহুদি এবং Goim। সাধারণ অর্থে Goim হচ্ছে জাতি। Goi অর্থ মানুষ নয় তবে পশুও নয়। 'Ye are my flock, the flock of my pasture are men ইহুদিগণ মানুষ, অন্যরা Goim। তালমুদ অনুসারে, The seed if a Goi is worth the same of a beast' অর্থাৎ একজন Goi এর বীজ (বীর্য) একটি পশুর বীজের সমমূল্যের। 'The sexual intercourse of a Goi is like that of a beast.' 'একজন Goi এর যৌন সঙ্গম পশুর সঙ্গমের সমতুল।' অ-ইহুদি, বিশেষ করে খ্রিস্টানগণের ক্ষেত্রে আরেকটি যে সর্বনাম ব্যবহার করা হয় তা আরো মারাত্মক। সেটি হচ্ছে 'shektz' স্ত্রী লিঙ্গ shektz। এটি একটি Hebrew 00 যার অর্থ হচ্ছে 'abomination' বা নিদারুণ ঘৃণ্য বা বিভীষিকাজনক ব্যক্তি বা বস্তু। ইহুদি বাইবেলে shekt ব্যবহার করা হয়েছে kashrut অনুসারে অপরিচ্ছন্ন ও অপবিত্র পশু শুকর এর ক্ষেত্রে। অ-ইহুদিগণকে ইহুদিগণ কতটা তাচ্ছিল্য বা ঘৃনার চোখে দেখতে পারে এ থেকেই তা বুঝা যায়। 'The heathen or Goi, was not considered to be on the same moral or socip cultural level as the Jew, and he was to live an animal-like existence.' নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিধর্মী অথবা Goi -কে ইহুদিদের সমপর্যায়ের গণ্য করা হত না এবং সে পশুর পর্যায়েই জীবনযাপন করত বলে মনে করা হত।'
ইসলামধর্মের ব্যাপারে ইহুদি ধমতত্ত্ববিদদের বিরোধিতা ততটা কঠোর নয়। ইসলামের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অন্তত পৌত্তলিকা ও বহু ঈশ্বরবাদের অভিযোগ তাদের নেই। ইসলাম পূর্ববর্তী কালে মক্কার কা'বা ঘর পৌত্তলিকতার আখড়ায় পরিণত হবার পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিরা আব্রাহামের সম্মানে তার উত্তরাধিকার বঞ্চিত কিন্তু অশীর্বাদপুষ্ট জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইলের জন্য প্রতিষ্ঠিত কাবাকে তাদের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবেগণ্য করত।
পৌত্তলিকতা ও বহু-ঈশ্বরবাদ বর্জনের কারণে ইহুদি ধর্মতত্ত্ববিদগণ ইসলাম সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নমনীয় মনোভাব পোষণ করে। তালমুদের বিধান অনুসারে, ইহুদিক কোনো পৌত্তলিক উপাসনালয় খ্রিস্টানদের গির্জাসহ অতিক্রমকালে মনে মনে এর আশু ধ্বংস কামনা করতে হয় এবং তার নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, ঐ উপাসনালয়ের উদ্দেশ্য অন্তত তিনবার থু থু নিক্ষেপ করতে হয়। মুসলমানদের মসজিদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয় বলে রাবাইগণ রায় দিয়েছে। ইহুদিদের দৈনন্দিন তিনবেলা গণ-প্রার্থনায় মূল প্রার্থনা Shemoneh Esrei এর একটি অংশ ধর্মত্যাগীগণ যারা পৌত্তলিকতা অর্থাৎ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছে তাদের আশু ধ্বংস কামনা করে একটি প্রার্থনা খ্রি. ১ম শতাব্দী থেকে প্রচলন করা হয়। রাবাইগণ রায় দিয়েছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী ইহুদিগণ এই অভিসম্পাতের আওতায় পড়ে না। আঙুর রসের মদের বোতলের ছিপি খোলা অবস্থায় কোনো পুতুল-পূজারির (সকল মতবাদের খ্রিস্টানসহ) হাতের ছোঁয়া লাগলে সেই মদ সম্পূর্ণটা ঢেলে ফেলে দিতে হবে, কিন্তু একজন ইসলাম অনুসারীরা ছোঁয়া লাগলে তা ইহুদি পান করতে পারবে না। তবে, তা ফেলে না দিয়ে বিক্রি করতে পারবে।
ইহুদি আইন ব্যবস্থায় (Halakhan) অ-ইহুদিকে কোনো পরিস্থিতিতেই মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ইহুদি বিচারিক প্রক্রিয়াকোন অ-ইহুদির সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ নেই। কারণ, ধরে নেওয়া হয়েছে যে, অ-ইহুদিগণ জন্মগতভাবে মিথ্যাবাদী। সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একমাত্র কোনো অ-ইহুদির সাক্ষ্যের ওপর রাবাই আদালতকে নির্ভর করতে হয়। ইহুদি ধর্মীয় আইন অনুসারে, একজন মহিলাকে তখনই বিধবা ঘোষণা করা যাবে এবং সে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে, যদি একজন চাক্ষুষ সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে সে এই মহিলার স্বামীকে মারা যেতে দেখেছে অথবা মৃতদেহ সে সনাক্ত করেছে। সেই চাক্ষুষ সাক্ষী যদি অ-ইহুদি হয় তাহলে বিচারক সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করে তথ্য দিতে পারবে না। কারণ ধরে নেওয়া হয় যে অ-ইহাদি মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে। অ-ইহুদিদের মধ্যে বিবাহের সম্পর্কে ইহুদি আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। তাই ইহুদির সাথে অ-ইহুদির বিবাহ শুধু স্বীকৃতির অযোগ্যই নয় এটা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
ইহুদি আইনে কোনো ইহুদিকে হত্যা করা মৃতুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, কোনো ইহুদি যদি অন্য কোনো ইহুদির মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী হয় তাহলে আইন অনুসারে সে ঐশ্বরিক আইনে পাপী সাব্যস্ত হবে। এই জন্য তার শাস্তি ইশ্বর দেবেন, কোনো পার্থিব আদালতে তার শাস্তি হবে না। কোনো ইহুদি যদি একজন অ-ইহদিকে হত্যা করে তা হলে সে অজাগতিক আইনে পাপী সাব্যস্ত হবে এবং তার শাস্তি দিতে পারবে একমাত্র ঈশ্বর। সে যদি একজন অ-ইহুদির মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী হয় তাহলে তার কোনো পাপও হবে না।
বিবাহিত ইহুদি মহিলা তার স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের সাথে যৌনসঙ্গম করলে উভয় পক্ষের জন্যই নিদিষ্ট শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু অ-ইহুদি মহিলাদের ক্ষেত্রে বিষয় অন্যরকম একজন অ-ইহুদি মহিলা বিবাহিতা কি অবিবাহিতা তা মোটেই বিবেচ্য বিষয় নয়, কারণ ইহুদিগণ বৈবাহিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না। তাই একজন ইহুদি পুরুষ ও অ-ইহুদি মহিলার মধ্যে ব্যভিচারের প্রশ্ন উঠে না। তারমুদ এই ধরনের যৌনসঙ্গমকে পশু গমনের পাপের সমতুল্য বলে গণ্য করে। উল্লেখ্য তৌরিদ প্রদত্ত বিধান অনুসারে, কোনো ইহুদি পুরুষ যদি পশুগমন করে তাহলে সংশ্লিষ্ট পশুটিকে অবশ্যই হত্রা করতে হবে, আর ইহুদি অপরাধীকে বেত্রাঘাত করতে হবে।
তবে অবশ্য ধরে নেওয়া যাবে না যে, একজন ইহুদি পুরুষ ও একজন অ-ইহুদি মহিলার মধ্যে যৌনসম্পর্ক গ্রহণযোগ্য। তা নয়, তবে এই পরিস্থিতিতে মূল শাস্তি হবে মহিলার তাকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এমনকি যদি সেই মহিলা একজন ইহুদি পুরুষের ধর্ষণের শিকারও হয়। 'যদি কোনো ইহুদি অ- ইহুদি নারীর সাথে যৌনসঙ্গম করে সেই নারী তিন বছরের শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্কা হোক, বিবাহিতা হোক কি অবিবাহিতা, আর সে (ইহুদি পুরুষ) যদি নয় বছর একদিন বয়সের অপ্রাপ্তবয়স্কও হয়, সে যেহেতু ইচ্ছাকৃতভাবে তার (অ-ইহুদি নারী) সাথে সঙ্গম করেছে তাই তাকে (অ-ইহুদি নারী) অবশ্যই পশুর মতই হত্যা করতে হবে কারণ তার মাধ্যমে একজন ইহুদি ঝামেলা পড়েছে। ঐ ইহুদিকে অবশ্য বেত্রাঘাত করতেই হবে। সে যদি ইহুদি পুরোহিত সম্প্রদায়ভুক্ত হয় তাকে দ্বিগুণ বেত্রাঘাত করতে হবে। কারণ সে দ্বিগুণ অপরাধ করেছে। সকল অ-ইহুদি নারীকেই বেশ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।' এখানে অপরাধ হলো, সে একই সাথে পশু গমন ও বেশ্যা গমনের অপরাধ করেছে। উল্লেখ্য বেশ্যাগমন সাধারণ ইহুদিদের জন্য অপরাধ নয়, কিন্তু একজন Kohen -এর জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অ-ইহুদিগণকে উপহার দেওয়ার বিষয়ে ইহুদিদের ওপর তালমুদের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্ট। অবশ্য মধ্যযুগীয় রাবাই কর্তৃপক্ষ এই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছে। কারণ প্রাচীনকাল থেকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উপহার বিনিময় বহুল প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। এই ধরনের উপহার প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতে প্রাপ্তির আশায় বিনিয়োগ বলে বিবেচিত হয় তাই ইহুদি ও অ-ইহুদিদের মধ্যে এই ধরনের উপহার বিনিময়কে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিস্বার্থভাবে কোনো অ-ইহুদিকে উপহার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। ভিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধান রয়েছে। ইহুদি ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। তবে অ-ইহুদি ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিলে যদি ইহুদিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে শান্তি রক্ষার খাতিরে তা দেওয়া যেতে পারে। তবে অ-ইহুদি দরিদ্রগণ যাতে ইহুদি ভিক্ষা পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে না পরে সেদিকে সতর্ক থাকার জন্য রাবচাই কর্তৃপক্ষের বহু উপদেশ রয়েছে।
যদি কোনো ইহুদি সম্ভাব্য কোনো ইহুদির হারাসোর সম্পত্তি পায় তাহলে তার মালিক খুঁজে বের করার জন্য তাকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ যেমন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে মর্মে কঠিন নিদের্শ দেওয়া আছে। অপরদিকে, পাওয়া সম্পদের মালিক যদি অ-ইহুদি হয় সেই ক্ষেত্রে তালমুদ ও অন্যান্য রাবাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশহল, পাওয়া সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো ইহুদিকে প্রতারণা করা মহাপাপ। অ-ইহুদিদের বেলায় সরাসরি প্রতারণা করা নিষেধ। যদি ইহুদির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে অ-ইহুদির সাথে পরোক্ষ প্রতারণায় অসুবিধা নেই। এই ধরনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কেনা-বেচার হিসাব করার সময় যদি কোনো ইহুদি নিজেরপক্ষে ভুল করে তাহলে অপর পক্ষের ধর্মীয় কর্তব্য হচ্ছে সেই ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং সঠিক হিসাব অনুসারে লেনদেন করা। কিন্তু অপর পক্ষ যদি অ-ইহুদি হয় তাহলে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া ইহুদির দায়িত্ব নয়। পাছে পরবর্তীকালে ক্ষতিগ্রস্ত অ-ইহুদি তার ভুল বুঝতে পেরে ইহুদির প্রতি মারমুখি হয় তাই এই পরিস্থিতিতে 'আপনার হিসাবের ওপরই আমি নির্ভর করছি' বলে লেনদেন সমাপ্ত করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বেচা-কেনার ক্ষেত্রে কোনো ইহুদির সাথে প্রবঞ্চনা করা মহাপাপ, কারণ তৌরিদে এটা কঠোরভাবে নিষেধ করা আছে। কিন্তু কোনো অ-ইহুদির ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়।
সহিংসতা ব্যতীত চুরি সকল ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ, এমনকি এর শিকার যদি অ-ইহুদিও হয়। কোনো ইহুদির ওপর ডাকাতি করা (সহিংস) সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু অ-ইহুদির ওপর সহিংস ডাকাতি করা যাবে কিনা তা নির্ভর করবে ডাকাতির শিকার অ-ইহুদি শাসনাধীন কিনা তার ওপর। তালমুদ অনুসারে, সেই অ-ইহুদি যদি ইহুদি শাসনাধীন হয় তাহলে ডাকাতি করা কোনো অপরাধ নয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাবাই কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে বিতর্ক হচ্ছে ঠিক কি পরিস্থিতিতে অ-ইহুদিকে ডাকাতির শিকার করা যাবে তার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে, বিশ্বজনীন বিচারের ধারণা এবং মানবিকতার বিবেচনায় এরূপ ডাকাতি কতটুকু অনুমোদনযোগ্য সেই বিষয় নিয়ে নয়।
📄 ইহুদিদের স্বপ্ন
পৃথিবীর প্রধান প্রবীন ধর্মের অনুসারীদের ইহুদি ধর্মের এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের কর্ণধার বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা সবকিছু করতে প্রস্তুত ইউএস ব্যুরো অব সেন্সাসের বিশ্ব জনসংখ্যা ঘড়ি অনুসারে, ২০১২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭০৫ কোটি ৭৪ লক্ষ ৮৩ হাজার ৪৯৮ জন। এর মদ্যে ইহুদি জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লক্ষ। গণনাকালে অনেকেই আবার নিজের ধর্ম পরিচয় ঘোষণা করতে চান না। ইহুদি জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার, ২০ শতাংশ বা প্রতি হাজারে ২ জন। সেই তুলনায় পৃথিবীর মুসলমানের সংখ্যা ১৬০ কোটি।
সংখ্যার দিক থেকে ইহুদিরা পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। কিন্তু ইতিহাস জুড়ে, বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের ইতিহাসে এই ধর্মের অনুসারীদের বিচিত্র ভূমিকায় উপস্থিতি কখনোই তাদের সংখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপ জুড়ে হিটলারের নেতৃত্বে ইহুদি নিধনযজ্ঞে পরিণত হয় যা ইতিহাসে 'হলোকস্ট' নামে পরিচিতি লাভ করে। হিটলারের পতনের পর ইহুদিগণ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইহুদিগোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তার অধিকাংশ আরব অধিবাসীদের বহিষ্কার করে প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালেও প্যালেস্টাইনে ইহুদি জনসংখ্যা প্যালেস্টাইনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়ায়শ এবং এতদঞ্চলের আরব অধিবাসীদের সংখ্যার এক শতাংশেরও কম ছিল।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে ইহুদিদের উত্থান মধ্যপ্রাচ্য তথা ইসলামি জগতে এমন এক উত্তেজক উপাদান সৃষ্টি হয়েছে যা বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে অদ্যাবধি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং বহু ক্ষেত্রে বহমান আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল ক্ষেত্র-জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহত্যি, দর্শন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, সমর-শক্তিতে ইহুদিদের অতুলনীয় অর্জনে। এই অর্জনকে দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করে ইহুদিগণ বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বস্ত সহায়ক হিসেবে পাওয়া নিশ্চিত করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ইহুদিদের অবস্থানের জরিপ, সে যত ছোট আকারেই হোক, এবং সে অবস্থানের কার্যকরণের কিছু বিশ্লেষণ ব্যতীত বিশ্ব-মঞ্চে ইহুদিদের অতীত ও বর্তমান অবস্থান সম্যক অনুধাবন করা কঠিন। এবং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে।
১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার শুরু হওয়ার পর থেকে ১১২ বছরে মোট যে ৮৫০ জন এই বিরল সম্মান পেয়েছেন তার মধ্যে ১৭৭টি ইহুদি। নোবেলের ইতিহাসে মোট ৯ জন মুসলিম এই সম্মান পেয়েছেন, হিন্দু পেয়েছেন ৬ জন, খ্রিষ্টান পেয়েছেন ৬৩৭ জন এবং বৌদ্ধ অন্যান্যরা পেয়েছেন ২১ জন।
জনসংখ্যা ও নোবেল প্রাপ্তির সংখ্যার তুলনা করা হলে ইহুদিরা মুসলিমদের ২২২২ গুণ, হিন্দুদের ২০৯৪ গুণ, খ্রিস্টানদের ৫৬৫ গুণ বেশি নোবেল পুরস্কার পেয়েচেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে এযাবত যতজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের ৪০ শতাংশই ইহুদি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি জনসংখ্যা ইসরায়েল রাষ্ট্রের ইহুদি জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা ৩১.৫ কোটি। এর মধ্যে ইহুদির সংখ্যা আনুমানিক ৫৪ লক্ষ, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১.৭ শতাংশ। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইহুদিদের অবস্থান ঈর্ষণীয়। 'ফোর্বস' সাময়িকীর হিসাব অনুসারে, ২০১২ সালে আমেরিকার ৫০ জন সবচেয়ে ধনী মানুষের মধ্যে ২০ জন্য ইহুদি;। দেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বৃহত্তম আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে। আরেকটি বিষয় হল ইহুদিরা সাধারণ সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়ে থাকেন যে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ পরিমাপের তুলনায় গণমাধ্যমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ পরিমাপ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। যুক্তরাষ্ট্রে রেডিও, টেলিভিশন সম্প্রচার, পত্র-পত্রিকা পরিচালনা ও প্রকাশনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা ও বিতরণ এবং পুস্তক ও সাময়িকী প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা ও এসকল সংস্থার মালিকানা কাদের হাতে তা বের করা মোটেই কঠিন নয়। বলা হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচার ও গণ-বিনোদনের মাধ্যমে পাঁচটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কোম্পানিগুলো হল ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি, টাইম ওয়ার্নার কর্পোরেশন, (ভিডিও এন্ড অডিও কমিউনিকেশনস) কর্পোরেশন, নিউজ কর্পোরেশন, সনি কর্পোরেশন অব আমেরিকা। ওয়াল্ট ডিজনি কর্পোরেশনের পরিধি সর্ববৃহৎ। এই কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন রবার্ট এ, আইগার। ইনি একজন ইহুদি। এই পদে তার পূর্বসূরী ছিলেন মাইকেল আইজনার। তিনিও ছিলেন ইহুদি। এই কর্পোরেশনের অধীন রয়েছে আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (এবিসি)। এবিসি এর ৭টি নিজস্ব টেলিভিশন স্টেশন ও ২২৫টি এফিলিয়েট। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইহুদিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন থেকেই প্রচারমাধ্যমের ওপর ইহুদিদের কর্তৃত্ব বাড়তে থাকে। যে সকল পত্র পত্রিকা প্রথমত-অ ইহুদিরা শুরু করেছিল সেগুলো ক্রয়ের মাধ্যমে ইহুদিরা তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়াতে থাকে। রেডিও- টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলে। প্রচারমাধ্যমে অ-ইহুদিদের উপস্থিতি কমতে থাকে। মূলত ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ঠিক করে কোনোটি খবর ও কোনোটি খবর নয়। অন্যরা তা অনুসরণ করে। যারা ইহুদি লাইনের বাইরে অথবা তার বিপরীতে খবর বা মতামত প্রকাশ করতে উৎসাহ দেখায় তারা যেন বেশি দিন টিকে থাকতে না পারে সে ব্যবস্থা করে ইহুদি ব্যবসায়ীরা, যারা বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দূরবর্তী ক্ষুদ্র কমিউনিটি পর্যায়ে খবর-মাধ্যমে একই নিয়ন্ত্রণ কাজ করে। রিপোর্টং, পরিবেশনা ও মতামত প্রকাশে ইহুদি সংবেদনশীলতার দিকে খেয়াল রাখতে বাধ্য থাকে। ছোট ছোট পত্রিকাগুলোর তাদের শহর বা কমিউনিটির বাইরে খবর সংগ্রহের সংগঠন বা আর্থিক সামর্থ থাকে না। তারা বাস্তব কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরের জন্য বৃহৎ পত্রিকা কোম্পানি ও নিউজ এজেন্সির ওপর নির্ভর করে। তাই তারা নামে 'স্বাধীন' হলেও কার্যত ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা কোম্পানির লাইন অনুসরণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি অভিবাসন ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই দেশটির রাজনীতিতে ইহুদিদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে যখন ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় তখনই ইহুদিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সেটাকে টিকিয়ে রাখতে হলে যে কোনো উপায়েই হোক তাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন আদায় করতে হবে এবং সেই সমর্থন অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ক্ষেত্রে ইহুদিদের প্রাধান্য খুবই দৃশ্যমান। প্রথমটি হচ্ছে গণমাধ্যম ও দ্বিতীয়টি রাজনীতি। এই দুটি ক্ষেত্রে ইহুদিদের প্রাধান্য আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকদের যতটা উৎকণ্ঠার কারণ তার চেয়ে বেশি উৎকণ্ঠার কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিশেষকরে মুসলিম দেশগুলোর জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের তথা মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় একটি অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সম্পর্ক ইসরায়েলকে তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সাথে দুঃসাহসী আচরণে প্ররোচিত করে। বিশ্ব জনমত উপেক্ষা করে প্যালেস্টাইনিদের মৌলিক অধিকার যথেচ্ছ লঙ্ঘন করতে সামান্যতম দ্বিধা অনুভব করে না। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে অধিকৃত প্যালেস্টাইনে যেখানে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে এবং তা থামানোর কার্যকর কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেই। যখন তখন যে কোনো মুসলিম দেশের ওপর আগ্রাসন চালাতে ইসরায়েলকে অগ্র-পশ্চাৎ ভাবতে হয় না। ১৯৮১ সালে বাগদাদের কাছে ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লি চালু করার পূর্বেই ইসরায়েল তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল এক রাতে বিমান হামলা চালিয়ে। এই হামলা চালাতে আরো দুটি আরব রাষ্ট্র—জর্ডান ও সৌদি আরবের আকাশসীমা লঙ্ঘন করা হয়েছিল। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এমন হামলা ও অপর দুটি রাষ্ট্রের আকাশসীমা লঙ্ঘন করার অপরাধে জাতিসংঘ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে। এই কিছুদিন আগে ইসরায়েল সুদানের একটি গোলা-বারুদ কারখানায় বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে। সুদানের সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থা নেই। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত তথা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম এটা নিয়ে কোনো হৈ-হুল্লোড় করেনি। আন্তর্জাতিক সমাজ এটা ধরে নিয়েছে আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েল এ আচরণই করবে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ইসরায়েল ধ্বংস করে দেবে এটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক আইনে এর বৈধতা কতটুকু আছে তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার গড়ে তুলেছে এটা নিয়ে বিশ্ব প্রচারমাধ্যমে কোনো হৈ চৈ নেই। রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে আমেরিকানরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারলেও ইরানের কাল্পনিক পারমাণবিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জীবন-মরণ হুমকি সৃষ্টি করবে এমন অদ্ভুত ধারণা ইহুদি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম অধিকাংশ আমেরিকানদের মনে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
অনেকেই মনে করেন, বিশ্বে ইহুদিদের উত্থান স্বাভাবিক সামাজিক বিবর্তনের ফল নয়। বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে ইহুদিদের গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দশকে একটা রহস্যময় পরিবেশে নামে একটি দলিল প্রথমে সীমিত আকারে ও পরে প্রকাশ্যে বই আকারে প্রচারিত হয়। বইটিতে সমগ্র পৃথিবীতে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথিত নীলনক্সা প্রণয়নের জন্য জায়নবাদী (বিশ্ব ইহুদিবাদী) নেতাদের গোপন বৈঠকগুলোর কার্যবিবরণী হিসেবে প্রকাশ করা হয়। বইটিতে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিশ্ব সরকার প্রতিষ্ঠার যে কৌশল অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অ-ইহুদি সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটানো, অর্থনীতি ও গণমাধ্যমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, বিশ্ব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে সামাজিক যোগসূত্রকে ছিন্ন-ভিন্ন করে ইহুদি মসীহ্ এর নেতৃত্বে বিশ্বা সরকার গঠনের পথ সুগম করা ইত্যাদি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইউরোপ ও আমেরিকার ইহুদিবিরোধী মনোভাব সৃষ্টিতে বইটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হিটলার এই বইটিকে ইহুদি ষড়যন্ত্রের প্রধান হিসেবে তুলে ধরে জার্মানদের মধ্যে ইহুদিবিরোধী মনোভাব সৃস্টি করতে সফল হয়েছিলেন। অবশ্য বইটি যে সম্পূর্ণ ভুয়া, জালিয়াতি ও ইহুদিবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের ফলস এটা প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে ইহুদি মহা পরিকল্পনা থাকুক কি না থাকুক বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের গতিধারা-প্রথমে মহাযুদ্ধের আগে বিশ্ব-বাণিজ্য ব্যবস্থার অরাজকতা, প্রথম মহাযুদ্ধ, প্রথম মহাযুদ্ধের পর লীগ অব ন্যাশনস প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব, মহামন্দা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফর প্রতিষ্ঠা, ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন- সচেতন বা অবচেতন 'প্রটোকল-এর মহা পরিকল্পনার' পথে পৃথিবীতে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থার ওপর ইহুদি প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের তথা বিশ্ব গণমাধ্যমে ইহুদি আধিপত্য এবং বিশ্ব জনতম সৃষ্টিতে তার অভিঘাত এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে যে বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইহুদি মাত্রা কোনো পরিমাপেই অবহেলার বিষয় নয়। তারা যে কোনো উপায়ে শ্রেষ্ঠত্বে পরিণত হতে চায়।