📘 মোসাদ > 📄 রানি মারিয়ামের দেশে

📄 রানি মারিয়ামের দেশে


সাদা কাপড় পরা কালো চামড়ার ইথিওপীয় শিশুরা জেরুজালেমের বিশাল এক সমাবেশের মঞ্চে গান গাইতে এসেছে। শিশুদের চোখে-মুখে ব্যাপক কৌতূহল এবং গর্ব। ইসরাইলের বিশিষ্ট সুরকার শ্লোমো গ্রোনিচ পিয়ানো হাতে মঞ্চে উপস্থিত। প্রায় ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকা দর্শক শিশুদের সমবেত সংগীতের কয়েক চরণ শুনেই উজ্জীবিত। শিশুদের গানটি এরকম: চাঁদ আমাদের দেখছে। আমার পিঠের ব্যাগে রয়েছে খাবার। আমার মা আমার ছোট ভাইদের পা চালিয়ে যেতে বলছে। বলছে, আর একটু আগাও। আরেকটু। এরপরই জেরুজালেম।
কবি হেইম ইদিসিসেরজার্নি সংশীর্ষক এই গানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জেরুজালেমে আসার বর্ণনা রয়েছে। গানটি শুনে দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিতে লাগল। ইথিওপিয়ায় বসবাসরত ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে আনতে যে ধকল গেছে, যা ছিল মিশন ইমপসিবল- সেকথা মনে করে শ্রোতা-দর্শক ছিল উত্তাল। আর গানটির বিশেষত্বও তাই। অন্যকিছু নয়।
সমবেত সংগীতের বাণীতে আরও ছিল: আমাদের খাবারের ব্যাগ গেল হারিয়ে। রাতে ডাকাতরা আমাদের আক্রমণ করল। তারা ছিল চাকু ও শানিত অস্ত্রসহ। বিশালাকায় মরুভূমিতে তারা আমার মাকে হত্যা করল। চাঁদ এর একমাত্র সাক্ষী। আমি আমার ছোট ভাইদের বললাম, আরেকটু পা চালাও। আরেকটু পা চালাও। এরপরই পূরণ হবে স্বপ্ন। সহসাই আমরা ইসরাইলের নাগাল পেয়ে যাব।
ইসরাইল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে এনেছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। বহু ফিলিস্তীনীকে হত্যা করেছে। সেই হত্যাকাণ্ড আজও অব্যাহত। তবে ইথিওপিয়া থেকে ইহুদি উপজাতিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে তাদের অভিযান ছিল খুবই সংকটাপন্ন ও ঝুঁকিবহুল।
সেই ঘটনা জীবন্ত কিম্বদন্তি হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় বসবাসরত এই ইহুদি উপজাতিরা সারা বিশ্ব থেকে ছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তারা ইথিওপিয়ার বিভিন্ন পাহাড় ও উপত্যকায় বসবাস করত। আর দেশটি রানি শেবার নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে এই উপজাতি ইহুদিদের বিশেষত্ব হল হাজার বছর ধরে তারা বাইবেলে বর্ণিত উল্লেখিত ধর্মকে অদম্য মনোযোগের সঙ্গে অবিকৃতভাবে ঐ বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছিল।
এই শান্ত ও লাজুক ইহুদিরা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়েই গিয়েছিল। তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা বেসিম ঢোলা সাদা গাউন পরিধান করত। জায়নবাদের প্রাচীনতম নিয়মনীতি অনুসরণ করত। একই সাথে আধুনিক জীবনের নিয়মনীতিও মেনে চলত। তারা বরাবরই শান্তিপ্রিয় ছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখত। এর পাশাপাশি দীর্ঘকাল তারা নিষ্ঠুর শাসনের হাতে ব্যাপকভাবে নিগৃহীতও হয়েছে। তবে ওদের জন্য দুঃখের বিষয় ছিল ইহুদিদের ধর্মীয় নেতা রাব্বি ও আধ্যাত্মিক নেতারা। বিশ্বব্যাপী তারা প্রচার করত যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা ফালাসা নামে পরিচিত- তারা প্রকৃত অর্থে ইহুদি নয়।
ইথিওপীয় ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়া সত্ত্বেও মনোবল হারায়নি। যুগ যুগ ধরে তারা জায়নবাদীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে আসছিল। বাবা থেকে ছেলে, মা থেকে মেয়ে ইহুদিবাদে অবিচল থেকে তারা একদিন তাদের কথায় পবিত্র ভূমি ইসরাইলে চলে আসার স্বপ্ন দেখত।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে প্রায় ত্রিশ বছর ইথিওপিয়া থেকে বেশ কিছু ইহুদি ইসরাইলে সমর্থ হয়েছিল। সম্রাট হাইলে সেলাসি ছিলেন ইসরাইলের বিশেষ মিত্র ও সুহৃদ। তার সময়ে সুযোগ থাকলেও ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তেমন কোনো প্রয়াস চালানো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে। ঐ সময় ইসলাইলের প্রধান রাব্বি বা ধর্মীয় নেতা ওভাদিয়া ইয়োসেফ এক দ্ব্যর্থহীন রুলিংয়ে বলেন যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা নিজেদেরকে বেটা ইসরাইল বলে পরিচয় দেয় তারা পরিপূর্ণভাবেই ইহুদি। মূলত: এরপর থেকে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়। দু'বছর পর ইসরাইল ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইন পাস করে। অতঃপর ১৯৭৭ সালে মোনাচেম বেগিন প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি এ কাজে মোসাদ-প্রধান জেনারেল আইজাক (হাকা) হোফিকে ডেকে পাঠান। বেগিন মোসাদ-প্রধানকে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।
মোসাদের অবকাঠামোতে বিটজুর নামে একটা বিশেষ ইউনিট রয়েছে। বহু দেশের ইহুদিদের নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ এই ইউনিটের ওপর ন্যস্ত। বিটজুরের নাম পরিবর্তিত হয়ে রাফরিরিম করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বেগিনের নির্দেশ পেয়ে মোসাদ-প্রধান হাসা ডেভিড কিমহিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় পাঠান। কিমহি মোসাদের সহকারী পরিচালক এবং টেভেল নামে একটি গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়াদি গোপনে দেখভাল করে। সে ইথিওপিয়ার শাসক মেনগিন্তু হাইলে মারিয়ামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ঐ সময় ইহুদি দেশত্যাগীদের জন্য ইথিওপিয়ার দরজা বন্ধ ছিল। একই সাথে গৃহযুদ্ধের তাণ্ডবে ইথিওপিয়ায় তখন ব্যাপক বিশৃঙ্খলা চলছিল। মারিয়াম বিদ্রোহীদের দমনে ইসরাইলের সহায়তা চাইলেন। কিমহি বিদ্রোহীদের দমনে হাইলে মারিয়ামের প্রস্তাবে না বললেও অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে সম্মত হন। তবে সিদ্ধান্ত হয় হাইলে মারিয়াম ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশত্যাগে বাধা দেবেন না।
আরও সিদ্ধান্ত হয়, হারকিউলিস বিমানে করে ইসরাইল থেকে ইথিওপিয়ায় অস্ত্রশস্ত্র যাবে। ঐ বিমানেই ইহুদিরা ইসরাইলে ফিরে আসবে। উল্লেখ্য, সেভাবেই ছয় মাস কাজ চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে দায়ান একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেন। একটি সুইস পত্রিকায় মোশে দায়ান ভুল করে বলে ফেলেন যে, হাইলে মারিয়ামের সেনাবাহিনীতে ইসরাইল অস্ত্র সরবরাহ করছে। অনেকের মতে মোশে দায়ানের ঐ উক্তি ভুলবশত ছিল না, ছিল উদ্দেশ্যমূলক। কেননা সোভিয়েত সমর্থিত হাইলে মারিয়ামের সরকারকে অস্ত্র প্রদান তার মনঃপূত ছিল না।
হাইলে মারিয়াম মোশে দায়ানের মন্তব্যে অতিশয় ক্রুব্ধ হন। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মারিয়াম জনসমক্ষে ফোকাসের বিরুদ্ধে ছিলেন। এর ফলে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের সরাসরি ইসরাইলে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যদিও মোসাদ-প্রধান হাকার প্রতি বেগিনের নির্দেশ বহাল ছিল।
ইথিয়পিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় আরেকবার। এদিকে ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী দেশ সুদানের রাজধানী খার্তুম থেকে মোসাদ সদর দফতরে একটি চিঠি এসে পৌছায়। এই চিঠিতে ইথিওপিয়া থেকে বিকল্প একটি রুট দিয়ে ইহুদিদের পালানোর পরিকল্পনার বিবরণ দিল। ঐ চিঠির প্রেরক ফেরেডা আকলুম নামের ইথিওপিয়ার ইহুদির। সে একজন শিক্ষক। ইথিওপিয়া থেকে সে পালিয়ে বর্তমানে সুদানে বসবাসরত।
এদিকে ইসরাইলের দৃষ্টিতে সুদান হল তাদের শত্রুরাষ্ট্র। দুর্ভিক্ষ, খরা, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ ও উপজাতিদের বিরোধে দেশটি বিপর্যস্ত। সুদানের কয়েক হাজার উদ্বাস্তু থাকে তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার বহু শরণার্থীরও বাস এসব তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার ইহুদিদের রক্ষায় আকলুম ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশের ত্রাণ সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়েই চলেছে। অবশ্য তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যাতে কোনো প্রকারে ইসরাইলে পৌঁছতে পারে। আকলুম একটি চিঠিতে মোসাদের কাছে বিমানের একটি টিকেট চায়। মোসাদ তাকে বিমানের টিকেট না পাঠিয়ে তাদের একজন গোয়েন্দাকে পাঠায়। মোসাদের ড্যানি লিমোর গিয়ে আকলুমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাদের দু'জনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় আকলুম শরণার্থী শিবিরে ইহুদিদের খুঁজে বের করবে এবং তা ড্যানিকে অবহিত করবে। এই সময় আকলুমকে সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আকলুম ত্রিশ জন ইহুদির সন্ধান পায় এবং মোসাদ বুদ্ধির বলে তাদের ইসরাইলে পাঠাতে সক্ষম হয়। আকলুস আর কোনো ইহুদিকে খুঁজে না পাওয়ায় মোসাদ গোয়েন্দা ইসরাইলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। লিমুর আকলুমকে ইসরাইলে তার মতো চলে আসতে বলে।
কিন্তু আকলুম এতে কোনোমতেই রাজি নয়। সে সুদানের প্রত্যন্ত এলাকায় ইহুদিদের খুঁজে পেতে তৎপরতা চালাবে। এদিকে মোসাদের লিমুরও অ্যাডামেন্ট। লিমুর আকলুমকে এক সপ্তাহের মধ্যে সুদান ছেড়ে ইসরাইলে চলে আসার নির্দেশ দেয়। লিমুরের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে আকলুম এক শরণার্থী শিবির থেকে আরেক শিবিরে ইহুদি খুঁজতে মগ্ন থাকে। সে কিন্তু এ পর্যায়ে একজন ইহুদিকেও খুঁজে পায়নি। তবুও সে ইসরাইল ফিরবে না। তার আশংকা সে চলে গেলে সুদান হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রকল্প চিরকালের জন্য পরিত্যক্ত হবে। অতঃপর সে মোসাদ সদর দফতরে একটা মিথ্যা রিপোর্ট পাঠায়। ঐ রিপোর্টে সে এমনসব ইহুদিদের নামের তালিকা নথিভুক্ত করে যারা সুদানে নয়, ইথিওপিয়ায় থাকে।
সে আরও ঘোষণা করে যে, সুদানের কথিত ঐ ইহুদিদের দেখভাল করার জন্য সে সুদানেই অবস্থান করবে। এখন আকলুম তার তালিকা ধরে সুদানে নয় ইথিওপিয়ার গ্রামে গ্রামে একাকী ঘুরে ইহুদি খুঁজে বের করার কাজ নেয়। ঐ ইহুদিদের সে ইথিওপিয়া ছেড়ে ইসরাইলে যেতে ব্রেনওয়াশ করতে থাকে। এদিকে জেরুজালেমে পৌঁছতে আবিষ্কৃত নতুন রুটের বিষয়টি ইথিওপিয়ার ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সঞ্চার করে। প্রথমে কয়েকজন ব্যক্তি, পরবর্তীতে কয়েকটি পরিবার ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। পরে দেখা গেল পুরো একটি ইহুদি গ্রাম তাদের মালামাল বাক্সবন্দী করে দেশত্যাগে প্রস্তুত। এভাবে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, মহিলা, শিশুসহ কয়েক হাজার ইহুদি গোপনে ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। এসব ইহুদি বাইবেলে বর্ণিত মসীহ-এর স্বপ্ন অনুযায়ী দুধ ও মধুর দেশ ইসরাইলে পৌঁছতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ইসরাইলে পৌঁছতে বন্ধুর, কষ্টকর পথের জন্য তারা পানি ও খাদ্য তৈরি করে সঙ্গে নেয়। তারা সারা রাত ধরে হাঁটত। কিন্তু দিনের বেলায় গুহার মধ্যে লুকিয়ে থাকত। এভাবে বহু ইহুদি অসুস্থ হয়ে মারা গেল। এই দুঃসাহসিক ভ্রমণে এক বাবা তারা চার-চারটি সন্তানকে হারিয়েছে। মারা গেছে তারা। সাপ, বিছের আক্রমণ ও সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা অগণিত। সর্বোপরি তাদের খাদ্য ও পানি ছিল সীমিত। পথে বহুবার ডাকাতের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে।
কয়েক বছর পর এই কষ্টকর সফরের বর্ণনা দিয়েছে অভিনেত্রী মেহেরেতা বারুশ। বারুশও তাদের সফরসঙ্গী ছিল। তার ভাষ্য, সফরসঙ্গীরা প্রতিদিন সকালে লাশ খুঁজত। কখনো কখনো বালিতে দশটি পর্যন্ত লাশ পাওয়া যেত। কোনোদিন পনেরটি। এমন কোনো পরিবার ছিল না যারা অন্তত একজন সন্তানকে হারায়নি।
১৯৮১ সালের গ্রীষ্মকালে ড্যানি লিমুর তার মোসাদের সহকর্মীদের নিয়ে ছদ্মবেশে সুদানে আসে। তাদের টার্গেট সুদানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের খুঁজে বের করা। বেঁচে গিয়ে খার্তুমসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ইহুদিরা মোসাদের পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের ইহুদি পরিচয় গোপন করল। শরণার্থীরা ত্রাণ কর্মকর্তাদের দেয়া 'ননকোশার' খাবার গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানাল। এদিকে শরণার্থী শিবিরে ষণ্ডা ও পাণ্ডারা সমানে মহিলা এবং কিশোরীদের ধর্ষণ করতে লাগল। শতাধিক মেয়েদের একটি গ্রুপ অপহৃত এবং গুম হল। তাদের স্বজনরা জানতে পারল ঐ মেয়েদের সৌদি আরবে পাচার করা হয়েছে। সেখানে আরও এক লক্ষ ২০ হাজার মহিলা দাসত্ব বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ত্রাণশিবিরে বহু ইহুদি নারীকে ধরিয়ে দিল এক সময়ের প্রতিবেশীরা। সুদানের পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ও নির্দয়ভাবে মারধর করে।
ইথিওপীয় ইহুদিদের জেরুজালেমে যেতে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ইসরাইলের পথে প্রায় চার হাজার ইহুদির মৃত্যু হয়। কানাডার ইহুদি হেনরি গোল্ড সুদান ও ইথিওপিয়ার আশ্রয় শিবিরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত। ইসরাইল তাদের ফিরিয়ে নিতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলে সে তীব্র সমালোচনা করে।
প্রকৃতপক্ষে মোসাদ তাদের একটি নিরাপদ রুটে ইসরাইলে নেয়ার চেষ্টা করছিল। মোসাদ সুদান থেকে ভুয়া পাসপোর্টে ইহুদিদের বিমানে ইসরাইল নেয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এখন তারা সমুদ্রপথে তাদের নিতে ইচ্ছুক।
এ লক্ষ্যে মোসাদ ইউরোপে একটি পর্যটন কোম্পানি খোলে। কোম্পানিটি সুদান বন্দরের কাছের একটি পরিত্যক্ত বীচ রিসোর্ট ভাড়া করে। লোহিত সাগরের ঐ বিচে উপকূল-উপযোগী খেলাধুলার উন্নয়নে সুদান সরকারের সঙ্গে একটা চুক্তি করে। রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় ইয়োনাতান সেফা নামের এক মোসাদ গোয়েন্দা। এই বীচ ও রিসোর্টে কয়েকটি একক বাংলো এবং কয়েকটি বেসরকারি ভবন ছিল। জাল পাসপোর্ট নিয়ে মোসাদ এজেন্টরা এই রিসোর্ট পল্লিতে এসে নানা পদে চাকরি নিতে শুরু করল। রিসোর্টের গুদাম গোয়েন্দারা সাঁতারের বিভিন্ন পোশাক, মুখোশ, ডুবসাঁতারুর নল, ডুবুরির জুতা দিয়ে ভরে ফেলল। মোসাদ সদর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন রেডিও স্থাপিত হল। মোসাদের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রিসোর্টের গোয়েন্দাদের বলল, এই অভিযানে যেন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না হয়। এটি হতে হবে মানবিক। এই অভিযানটি তাদের জন্য অনেক বেশি আবেগপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়। রিসোর্টের লোকদের জানানো হয় যে, তাদের রিসোর্টের সুখ্যাতির কথা জানিয়ে সারা ইউরোপ জুড়ে পোস্টার ছাড়া হবে।
আরআউস নামের এই রিসোর্টে একে একে বহু পর্যটক আসতে শুরু করল। দিনের বেলা পর্যটকরা সাঁতার কাটত, ডুবসাঁতার ইত্যাদি দিত। কিন্তু এই পর্যটকদের কেউই জানত না, প্রতি রাতে মোসাদ গোয়েন্দারা শরণার্থী ক্যাম্প ও গ্রাম থেকে ইহুদিদের এখানে এনে জড়ো করত। ঐ ভিলেজে বহু সুদানি কাজ করত। সাঁতার প্রশিক্ষক তাদের জন্য একটা গল্প সাজাল। গল্পটি হল, সন্নিহিত শহরের রেডক্রস হাসপাতালে যোগদানের জন্য এরা এখানে রাতটা কাটাবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সুদানিরা সন্দেহজনক কিছু কর্মকাণ্ডের আভাস পায়। কিন্তু রিসোর্টের পক্ষ থেকে ভালো বেতন ভাতা পাওয়ার কারণে তারা এ বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয় না।
মোসাদ রাতের অভিযান চালাত চারটি পুরনো ট্রাকের সাহায্যে। সেই ট্রাকে ইহুদিদের তোলা হত। কিন্তু বিষয়টি অত সহজ ছিল না। ইসরাইলিদের বহু ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে। প্রতি মুহুর্তে ছিল ধরা পড়ার আশংকা।
এদিকে গ্রাম থেকে সংগ্রহীত ইহুদিদের অনেকেই সাদা চামড়ার মানুষ কখনো দেখেনি। সাদা চামড়ার মানুষ যে ইহুদি হতে পারে এ ছিল তাদের ধারণারও বাইরে। ফলে সাদাদের কথা তারা বিশ্বাস করতে চাইত না। এক সাদা গোয়েন্দা কর্মকর্তা যখন তাদের সঙ্গে প্রার্থনায় যোগ দিল তখনই তাদের মনে প্রত্যয় জন্মাল যে তারাও ইহুদি।
এখন চার ট্রাক ভর্তি ইহুদিকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কয়েকশত মাইল পাড়ি দিতে হবে। পথে সুদানী সামরিক বাহিনী এবং পুলিশকে মোসাদের এক কর্মকর্তা সমানে ঘুষ দিয়ে চলতে লাগল। এভাবে ইসরাইলি নৌবাহিনীর জাহাজ যেখানে অপেক্ষা করছে সেখানে ট্রাকগুলো নেয়া হল। সেখানে কিছুটা দূরে একটি নেভি বোট নোঙ্গর করা ছিল। নৌবাহিনীর কমান্ডোরা রাবারের ডিঙ্গি নিয়ে এসে ইহুদিদের মাদার শিপে নিয়ে যেতে লাগল। এভাবে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল।
কানাডার হেনরি গোল্ড একজন স্বেচ্ছাসেবী ও ইহুদি। ক্লান্ত-শ্রান্ত গোল্ড রিসোর্ট ভিলেজে থাকার সময়ই সন্দেহজনক কিছু একটা আঁচ করল। গ্রাম ঘুরতে গিয়ে তার মনে হল মোসাদ গুপ্তচরদের দ্বারা সে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। যেমন এক মহিলা নিজেকে সুইস বলে পরিচয় দিল কিন্তু তার অ্যাকসেপ্ট ভিন্নতর। এক ইরানির এ্যাকসেপ্টও ইরানিদের মতো নয়। গোল্ড পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছে বিধায় সে অভিজ্ঞ। একদিন ডিনারে সে এমন এক পদের সালাদ দেখল তা শুধুমাত্র ইসরাইলেই বানানো হয়।
পরদিন সকালে গোল্ড সাঁতার-প্রশিক্ষককে গিয়ে ধরল এবং হিব্রু ভাষায় তাকে প্রশ্ন করল, এখানে হচ্ছেটা কী। যাহোক, গোল্ডকে কোনো রকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করা হল।
১৯৮২ সালের মার্চে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের বেশ কয়েকটি বোটে করে পাচারের সময় একটা ডিঙ্গিতে বসা চার মোসাদ গোয়েন্দা সুদানী সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেল। সেই দলে লিমুরও ছিল। লিমুর ইংরেজিতে সুদানি সৈন্যদের বলল, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পর্যটকদের রাইফেল দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হয়েছ! লিমুর আরও বলল, সুদানের পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করতে পর্যটকরা এই রিসোর্টে আসে।
পরদিন লিমুর সুদানি সেনাবাহিনীর এক কমান্ডারকে বিষয়টি জানালে সে ক্ষমা চাইতে চাইতে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠে। সে অবশ্য বলে যে, তার সৈন্যরা চোরাচালানি মনে করেছিল। সে তার সৈন্যদের ঐ স্থান অবিলম্বে ত্যাগের নির্দেশ দেয়। ফলে মোসাদ গোয়েন্দারা নিরাপদ এখন।
অবশ্য এখান থেকে সমুদ্রপথে ইহুদিদের চালান আপাতত বন্ধ। নতুন একটি যাত্রাপথ আবিষ্কৃত হয়েছে। একদিন সকালে এখানকার পর্যটকরা দেখে যে, সব বিদেশি স্টাফ লাপাত্তা। স্থানীয় কয়েকজন স্টাফ অবশ্য সকালের নাস্তা তৈরি করছিল। আসলে আগের রাতেই মোসাদ গোয়েন্দারা ঐ টুরিস্টপল্লী ছেড়ে গেছে। গোয়েন্দারা এক নোটিশ টানিয়ে লিখে গেছে, বাজেট সংকটের কারণে তারা টুরিস্টপল্লীটি বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব পর্যটক টাকা জমা রেখেছিল তা পরে দেয়া হবে বলে জানিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা হল।
মোসাদ সদর দফতরে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হল, নৌপথে আর নয়, এবার বিমানযোগে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে আসা হবে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর হারকিউলিস সি-১৩০ বিমানযোগে ইহুদিদের শত্রু দেশ সুদানে থেকে আনা হবে। মোসাদ বুঝল, সুদানে এই কর্ম করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং বারে বারে শত্রু দেশের ভূখণ্ডে বিমান ওঠা-নামা করা সহজ কাজ নয়।
১৯৮২ সালের মে মাসে মোসাদ গোয়েন্দাদের একটি অগ্রবর্তী দল সুদানে আসে। উদ্দেশ্য, সুদান বন্দরের দক্ষিণে একটি নিরাপদ বিমান ওঠা-নামার স্থান চিহ্নিত করা। দলটি ব্রিটিশ নির্মিত একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড সংস্কার করে। ওখানে যখন ইসরাইলি বিমান বাহিনীর রিনো বিমানটি নামল অপেক্ষমাণ ইথিওপিয়া ইহুদিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। এতো বড় স্টিলের বডি একটি পাখি যার গর্জন ভয়ংকর- এ তারা জীবনে প্রথম দেখল। অনেক ইহুদি ভয়ে পালিয়ে গেল। মোসাদ গোয়েন্দারা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে। অনেকে এই দৈত্যাকার স্টিল বডি দেখে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়। এভাবে প্লেনটির উড়াল দিতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ঘণ্টাখানেক বেশি সময় লেগে যায় এবং অবেশেষে ২১৩ জন ইথিওপিয়ার ইহুদিকে নিয়ে সেটি উড্ডয়ন করে। মোসাদ সদর দফতর থেকে এই অভিযানের প্রশংসা করে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়।
ইসরাইলিদের এই অভিযান বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সুদানি কর্তৃপক্ষের কাছে তা জানাজানি হলে মোসাদ আরেকটি এলাকা নির্বাচনে নামে। নতুন স্পটটি পোর্ট সুদান থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে।
মোসাদ-প্রধান হাকার তত্ত্বাবধানে ১৯৮২-১৯৮৪ এর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। ইসরাইলি ছত্রীসেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল অ্যামোল ইয়ারোন হাকাকে সহযোগিতা করেন। উল্লেখিত সময়ে এক হাজার পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে ইসরাইলে স্থানান্তর সম্ভব হয়।
এই সকল অভিযান এক পর্যায়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুদানি এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোসাদের সঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পের লোকদের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়া আদ্দিস সলোমানকে আটক করে। সলোমান ইথিওপিয়ার ইহুদি। তাকে সুদানে বিয়াল্লিশ দিন ধরে নির্যাতন করা হয়। তার নেপথ্যের লোকদের নামধাম এতেঠ নিগ্রহ সত্ত্বেও সে স্বীকার করেনি।
১৯৮৪ সালে সুদানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর দুরবস্থা ও সংক্রামক রোগ চরম আকার ধারণ করে। সুদানের গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হলে দেশের স্বৈরশাসক জাফর নিমেরির সিংহাসন টলমল করে উঠে। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাহায্য ছাড়া আর তার গত্যন্তর নেই।
ইসরাইল আমেরিকাকে বলে, যদি সুদান তাদের বিমান অভিযান চালাতে দেয়, তাহলে যেন সাহায্য করে। মার্কিন প্রশাসন সম্মত হলে খার্তুমে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সেই আলোকে আলোচনা করে। সমঝোতা হয় ইহুদিদের সুদান থেকে সরাসরি ইসরাইলে নেয়া যাবে না। তবে একটি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সম্ভব। বিনিময়ে সুদানকে খাদ্য ও তেল সরবরাহের সুযোগ দিতে হবে। সুদানের আমেরিকার দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায়, পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের জন্য সুদান থেকে ইসরাইল ইহুদিদের নিতে পারবে। এভাবেই অভিযানের শুরু হয়।
এদিক মোসাদ-প্রধান হাকার স্থলাভিষিক্ত হন তার ডেপুটি নাহুম আদমোনি। আদমোনি বেলজিয়াম হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে আনতে শুরু করেন।
সুদানে বেলজিয়ামের বিমানচালক হুড়মুড় করে বিমানে ঢোকা আড়াইশত যাত্রীকে নিয়ে প্লেন চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। তার ভাষ্য, উড়োজাহাজে অক্সিজেন মাস্ক রয়েছে দুশটি। কিন্তু যাত্রী পঞ্চাশজন বেশি।
মোসাদের এক গোয়েন্দা বিমানের পাইলটকে একান্তে ডেকে বলে, কে বাঁচবে আর কে মরবে এখন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি যদি এখন ককপিটে না ওঠ আমি তোমাকে প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে সেখানে অন্য পাইলট বসাব। ঐ পাইলটই তাড়াতাড়ি বিমানে উঠে বসে। পরবর্তী সাতচল্লিশ দিনে ঐ বিমানটি গোপন অভিযান চালিয়ে সাত হাজার আটশত ইথিওপিয়া ইহুদিকে ইসরাইলে ব্রাসেলস হয়ে পৌছে দেয়।
ইসরাইল এই অভিযান গোপন রাখতে দেশের গণমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি করলেও ইহুদি এজেন্সি চেয়ারম্যান এরিয়ে ডুজলিন এক বিবৃতির মাধ্যমে তা ফাঁস করে দেন। ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইহুদিদের একটা উপজাতি আমাদের পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছে। নিউইয়র্ক জিউস প্রেস এই অভিযানের বিস্তারিত ছাপে। লস এঞ্জেলস টাইমসও তা প্রকাশ করে।
তিনদিন পর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সিমন পেরেজ সংসদে বলেন, তার সরকার যা করছে তা অব্যাহত থাকবে। সর্বশেষ ইথিওপিয়ার ইহুদিকে দেশে না নিয়ে আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে। এদিকে সেদিনই সুদান বিমান চলাচল বন্ধ করে দিলে ইহুদিদের ফিরে আসার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সুদানীদের কাছে অভিযানের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইসরাইল যদি একটা মাস চুপচাপ থাকত তাহলে ইথিওপিয়ার সর্বশেষ ইহুদিকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবশ্য ইসরাইলিদের অভিযানে চমৎকৃত হন। তার মতে, অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বুশ অতঃপর ভূমিকা রাখতে চাইলেন। ইসরাইলিদের অভিযান বন্ধের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকার বিমান বাহিনীর সাতটি হারকিউলিস বিমান সুদানের বিমানবন্দর আল কাদারিকে পাঠালেন। সেই উড়োজাহাজে ছিল সিআইএ'র বেশ কিছু গোয়েন্দা। মার্কিন টাস্ক ফোর্স রানি শেবা দেশে অভিযান চালিয়ে পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে সুদান থেকে উড়িয়ে এনে সরাসরি ইসরাইলের বিমানবন্দরে নামাল।
দু'মাস পরে সামরিক বাহিনী জাফর নিমেরিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। লিবিয়ার গোয়েন্দারা সুদানে গিয়েই খার্তুমে মোসাদ গোয়েন্দাদের উপস্থিতি লক্ষ করেন। তখনো মোসাদের তিনজন গোয়েন্দা সুদানে ছিল। তারা অবশ্য সিআইএ'র গোয়েন্দাদের বাসায় লুকিয়ে থাকতে সমর্থ হয়। সেই লুকানো অবস্থা থেকেই মার্কিনিরা মোসাদ গোয়েন্দাদের স্বদেশে যেতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের কুইন অব 'শিবা'র শীর্ষক অভিযানটি খুবই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। একই সাথে তা ছিল সরল, শান্ত ও মনোরম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরাইলি গোয়েন্দা পোলার্ডের একটি ঘটনায় আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
পোলার্ড যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করলেও ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে সে গ্রেফতার হয়। এই ঘটনায় আমেরিকা স্তম্ভিত। যে আমেরিকা ইসরাইলের জন্য এতেঠ কিছু করল তাদের এই আচরণে- সিআইএ'র শীর্ষ কর্মকর্তারা খুবই ক্ষুব্ধ হন।
ইসরাইল এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে এবং পোলার্ডের চুরি করে নেয়া কাগজপত্র আমেরিকাকে ফিরিয়ে দেয়। তবে দুই দেশের মধ্যকার গোয়েন্দা তৎপরতায় দীর্ঘদিন অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়। পোলার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেন রাফি এইতান। তিনি গোয়েন্দাদের যে ইউনিটটি চালাতেন সেটি তখনি বন্ধ করে দেয়া হয়। এইতানের বিরুদ্ধে আমেরিকায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়ে যায়। বহুদিন গ্রেফতারের ভয়ে আমেরিকায় যাননি মোসাদ গোয়েন্দা এইতান।
ইথিওপিয়া থেকে আগত ইহুদিদের অনেকেই কুইন অব শেবা অভিযানের বিপক্ষে ছিলেন। কেননা এই অভিযানে চার হাজার ইহুদি মারা গেছে। মোসাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান কায়েসারেয়ার শীর্ষ গোয়েন্দাদের অভিমত, বিতজার বিভাগের লোকদের দ্বারা এতবড় একটা অভিযান পরিচালনা উচিত হয়নি। তাছাড়া বিতজার গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে খুবই ছোট্ট একটা ইউনিট। তারা তেমন সুসংগঠিতও নয়।
বিতজারের লোকজন তাদের সফল অভিযানের জন্য খুবই খুশি ছিল। তারা অবশ্য বলে যে, মোসাদের বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে তারা সঙ্গে নিয়েছিল।
দুই গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে বিরোধ সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য ইথিওপিয়ার অসংখ্য ইহুদি আজ ইসরাইলে আসতে পেরেছে। কিন্তু এ-ও সত্য যে, এখনো কয়েক হাজার ইহুদি ইথিওপিয়ায় রয়ে গেছে। তারা ইসরাইলে আসতে খুবই আগ্রহী কিন্তু দরজা তো বন্ধ। ইসরাইল মনে করে আদর্শগত ও ইহুদি হওয়ার কারণে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা অবশ্য কর্তব্য। মানবিক কারণেও এর প্রয়োজনীতা রয়েছে। কেননা আগত ও আটকে পড়া পরিবারগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক শিশুরা চলে এসেছে অথচ তাদের বাবা-মা আসতে পারেনি। স্বামী এসেছে, স্ত্রী আসতে পারেনি। নতুন পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এবং স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অনেকে আত্মহত্যাও করেছে।
এদিকে ইহুদি এজেন্সির প্রতিনিধিরা কয়েক হাজার ইহুদিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার কাছে জড়ো করতে সমর্থ হয়। ১৯৯১ সালের অপারেশন শেবা শেষ হওয়ার ছয় বছরের মাথায় ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জন্য অলৌকিক ঘটনা ঘটে। শুরু হয় অপারেশন সলোমোন।
ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আদ্দিস আবাবার দিকে আসতে শুরু করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় ইসরাইল ও শাসক মারিয়ামের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর কিছু পরেই মারিয়াম ক্ষমতাচ্যুত হন।
এই চুক্তির পেছনে এক রহস্যমানবের ভূমিকা ছিল মুখ্য। তার নাম ইউরি লুবরানি। ইরান ও লেবাননের বিশেষ দূত ছিলেন তিনি। চুক্তি হয় ইহুদিদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে ইসরাইল ইথিওপিয়াকে ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেয় মারিয়াম সরকারের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে তারা আমরিকার রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে। এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে বিদ্রোহীদেরও একটা চুক্তি হয়। এ চুক্তি মোতাবেক বিদ্রোহীরা ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতি করবে এবং এই সময়ের মধ্যে ইহুদিদের ইসরাইলে ফেরত নিয়ে যাওয়া হবে। ইসরাইল ঐ সময়ের মধ্যেই তাদের লোকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
সলোমোন অভিযান পরিচালনার মূল দায়িত্ব পায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আমনন লিপকিন ছিলেন কমান্ডার। ইসরাইলের এয়ারলাইন ইথিওপিয়ায় ৩০টি বিমান পাঠায়। বিমান বাহিনী পাঠায় বেশ কয়েকটি বিমান। গোয়েন্দা ইউনিট কিং ফিশারের একটি কমান্ডো বাহিনীকে ইথিওপিয়ায় পাঠানো হয়। এভাবে মাত্র ৩৪ ঘণ্টায় ১৪ হাজার চারশত ইহুদিকে ইসরাইলে আনা হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বরেকর্ডের সৃষ্টি হয়। বোয়িং ৭৪৭ এক হাজার ৮৭জন ইহুদিকে নিয়ে ইসরাইলের অভিমুখে রওয়ানা দিলেও বিমানবন্দরে একজন বেশি লোক পাওয়া যায়। সে একটি নবজাতক। বিমানেই তার জন্ম।
সলোমোন অভিযানের ২০ বছর পরেও ইথিওপিয়ায় বহু ইহুদি এখনো রয়ে গেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগ অব্যাহত। তবে নবাগত ইহুদিদের ইসরাইলের মাটিতে বসবাসে সমস্যা হচ্ছে। আগতরা অধিকাংশই আফ্রিকার গ্রাম থেকে উঠে আসা। অথচ ইসরাইল একটা আধুনিক রাষ্ট্র। ওদিকে কতিপয় ধর্মীয় নেতা এখনো দাবি করে চলেছেন, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা প্রকৃত নয়।
শুরুতে যে জার্নি সংটি গীত হচ্ছিল তার শেষাংশ ছিল এরকম: চাঁদের মধ্যে আমার মায়ের মুখটি আমার দিকে তাকিয়ে। মা, হারিয়ে যেও না। মা যদি আমার পাশে থাকে, তাহলে সেই আমাকে ভাবতে বাধ্য করবে যে, আমি একজন ইহুদি।

📘 মোসাদ > 📄 কোথায় ইয়োসেলি?

📄 কোথায় ইয়োসেলি?


১৯৬২ সালের মার্চের প্রথমার্ধে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন। বৃদ্ধ গুরিয়েন আইসারকে তার অফিসে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বেশ কিছুক্ষণ খোশগল্পে মেতে উঠেন। মোসাদ-প্রধান ভাবতে থাকেন, এই বুড়ো প্রধানমন্ত্রী তার কাছে কী চান। আইসার তাকে খুব ভালোভাবেই জানতেন। এই খোশগল্প করতে তাকে যে ডাকা হয়নি আইসার তা ভালোভাবেই জানতেন। এরা দু'জনই দু'জনকে খুব ভালোবাসেন, পছন্দ করেন। তাদের মন-মানসিকতাও একই ধরনের। এরা দু'জনই আকৃতিতে ছোট-খাট কিন্তু ভীষণ একগুঁয়ে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দক্ষ ও বলিষ্ঠ। নেতৃত্বদানের ক্ষমতাও এদের সহজাত। আর ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রশ্নে এরা আপোষহীন। আজে-বাজে কাজে সময়ক্ষেপণও এদের অপছন্দ। সম্প্রতি আইচম্যানকে আটকের পর এদের সম্পর্ক আরও প্রগাঢ়।

আলোচনায় মাঝপথে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গুরিয়েন আইসারের দিকে ঘুরে প্রশ্ন করেন, আপনি কি শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী কোন শিশুর উদ্ধারের কথা বলছেন তা আইসারের কাছে উল্লেখ না করলেও আইসারের বুঝতে বাকি থাকল না। কেননা দু'বছর ধরে একটি শিশুর অন্তর্ধান বা নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ইসরাইলে প্রচণ্ড আলোড়ন চলছিল। ইসরাইলের পত্রিকাগুলো এই শিশুকে নিয়ে যেমন নিয়মিত শিরোনাম করে চলেছে, তেমনি সে দেশের আইনসভা নেসেটেও এনিয়ে প্রবল অসন্তোষ বিরাজ করছিল। সেক্যুলার তরুণরা ইয়েসেলির প্রসঙ্গ উঠলেই আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের প্রতি ইংগিত করে ক্রোধ ও উদ্বেগ প্রকাশ করত। কোথায় ইয়েসেলি এই শ্লোগান ঐ অর্থোডক্স ইহুদিদের প্রতি লক্ষ্য করে তরুণরা প্রতিনিয়তই শ্লোগান দিত।

ইয়োসেলির বয়স ৮ বছর। হোলেনি শহরে ছিল তার বাস। তাকে অতি আধ্যাত্মিক ঘরানার ইহুদি অর্থাৎ আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিরা অপহরণ করেছে। আর এই অপহরণের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইয়েসেলির পিতামহ। ইয়েসেলির বৃদ্ধ নানার ইচ্ছা, আল্ট্রা অর্থোডক্স ঐতিহ্যে তার নাতিকে বড় করে তোলার। সেই মানসিকতায় তিনি ইয়েসেলিকে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। এরপর থেকেই ইয়েসেলি লাপাত্তা, কোনো খোঁজ মিলছে না তার। এক পর্যায়ে ইয়েসেলির নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে সারা ইসরাইল জুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায়। পারিবারিক এই বিষয়টি ইসরাইলের জাতীয় ইস্যু ও স্ক্যান্ডালে পরিণত হয়। পক্ষ-বিপক্ষের লোকেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে থাকে। সেক্যুলার ইহুদি ও আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা বেশি বেশি করে ঘটতে থাকে। অনেকে ইয়েসেলিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ারও আশংকা করেন। ঠিক এমনিতরো অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

আইসার প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আপনি এ কাজে আমাকে চাইলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। আইসার অতঃপর নিজের অফিসে আসেন এবং নিখোঁজ ইয়েসেলির নামে একটা ফাইল খোলেন। তিনি এই ফাইলের নাম দেন অপারেশন টাইগার কাব।

ইয়েসেলি এককথায় সুদর্শন প্রাণবন্ত এক শিশু। কিন্তু তার নানা নাহমান সাতারকেসের বিশ্বাস শিশুটি ভুল বাবা-মায়ের কাছে মানুষ হচ্ছে। কৃশকায় শ্মশ্রুমন্ডিত চশমা পরিহিত বৃদ্ধ নানা নাহমান হাসিদ সম্প্রদায়ের এক ধর্মান্ধ অনুরাগী। হাসিদ মতবাদের তিনি যেমন ঘোর সমর্থক তেমনি মতবাদের ব্যাপারে তিনি আপোষহীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নানা নাহমান বরফে ঢাকা সাইবেরিয়ায় বেশ কিছু সময় কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি সোভিয়েত শ্রম শিবিরে ছিলেন। কেজিবি'র সহযোগী গুণ্ডাদের তিনি পাত্তা দেননি। ফলে এই লোককে দমানো খুব কঠিন। সাইবেরিয়া বসবাসকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তার পায়ের তিনটি আঙ্গুল খসে পড়লেও তার মানসিক শক্তি বরাবরই অবিচল ছিল। সাইবেরিয়ায় তিনি একটি চোখও হারান। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তিনি মনে- প্রাণে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। সোভিয়েতদের প্রতি তার ঘৃণা চরম আকার ধারণ করে ১৯৫১ সালে। তার এক ছেলেকে গুণ্ডারা ছুরিকাহত করে মেরে ফেললে তার ঘৃণা চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। বাকি দুই ছেলে শালোম ও ওভাদিয়া এবং মেয়ে আইডা তার বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। আইডা এক দর্জিকে বিয়ে করে।

আইডা দম্পতি তার বাবার পুরনো বাড়ি লভোতে বেশ কিছুদিন বসবাস করে। রাশিয়া এবং পোল্যান্ডে কাটিয়ে তারা লভোভে বসবাস শুরু করে। ১৯৫৩ সালে এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এই শিশুটিই ইয়োসেলি।

ইয়োসেলির বয়স যখন চার বছর তখন বাবা মা'র সঙ্গে সে ইসরাইলে চলে আসে। আইডা'র বাবা-মা অর্থাৎ নাহমান সাতরাকেস তার পত্নী এবং তাদের এক ছেলে শালোম আইডাদের নিয়ে কিছুদিন আগে ইসরাইলে চলে আসে। নাহমান ব্রেসলাড হাসিদিম গোত্রভুক্ত। তারা মিয়া শেয়ারিম এলাকায় সেটল করে। এই এলাকাটি জেরুজালেমের আল্ট্রা অর্থোডক্স এলাকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এই এলাকাটি অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্নতর। এখানকার পুরুষরা লম্বা কালো কোট অথবা সিল্কের কাফতান বা ঢোলা জামা পরিধান করে। কালো অথবা পশমি টুপি তাদের থাকবেই। দাড়ি রাখে ঝোপঝাড়ের মতো। মেয়েদের পোশাক হয় পরিপাটি। তবে তাদের চুল হয় পরচুলা অথবা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা থাকে। ইয়েসিভালদের জগৎ এটি। প্রতিবেশীদের অধিকাংশই ইহুদি আইনজ্ঞ কিম্বা দরবেশ মানসিকতার। এদিকে শালোম একটা ইয়েসিভায় যোগদান করে এবং তার সহোদর ওভাদিয়া ইংল্যান্ডে চলে যায়।

আইডা এবং তার স্বামী অল্টার হোলোনোয় সেটেল করে। তেলআবিব এলাকায় একটা টেক্সটাইল কারখানায় অল্টারের চাকরি হয়। এক ফটোগ্রাফার আইডাকে কাজ দেয়। এক পর্যায়ে আইডা দম্পতি একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ইতিমধ্যে এই দম্পতি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়লে তারা তাদের প্রথম মেয়েসন্তান জিনাকে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেয়। আর ইয়েসেলি তার নানা-নানীর কাছে থাকতে শুরু করে।

জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত আইডা এবং তার স্বামী কাশিয়ার তার বন্ধুদের কাছে একের পর এক চিঠি লিখতে থাকে। এসব চিঠিতে তাদের ইসরাইলে চলে আসা সমীচীন হয়নি বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। আইডা ও স্বামীর কাছে প্রেরিত রাশিয়ার বন্ধুদের চিঠিগুলো তার বাবা নাহমানের হস্তগত হতে থাকে। নাহমান উপলব্ধি করেন যে, তার মেয়ে আইডা ও জামাতা অল্টার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অবশ্যই রাশিয়ায় পাড়ি দেবে। ক্রোধান্বিত ও উদ্বেগাকুল নাহমান অতঃপর সিদ্ধান্ত নেন ইয়েসেলিকে কোনোমতেই তিনি তার বাবা-মার কাছে ফেরত দেবেন না।

১৯৫৯ সালের শেষার্ধে আইডা দম্পতির আর্থিক অবস্থা ভালো হয়। অতএব পুরো পরিবার আবার একত্রিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। আইডা জেরুজালেমে তার বাবার বাড়িতে আসে ইয়েসেলিকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ইয়েসেলি এবং তার বাবা কাউকেই সে বাসায় পায় না। আইডা'র মা তাকে জানায় তার ভাই শালোম ছেলে ইয়েসেলিকে তার কাছে পৌঁছে দেবে। আইডা'র মা তাকে জানায় যে, ইয়েসেলি তার নানার সঙ্গে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে গেছে এবং তাদের এখন বিরক্ত করা ঠিক হবে না।

পরের দিন শালোম তার বোন আইভার বাসায় গিয়ে জানায় যে, তার বাবা নাহমান কিছুতেই ইয়েসেলিকে তাদের কাছে ফেরত দেবে না। বিপর্যস্ত আইডা তার স্বামীকে নিয়ে জেরুজালেমে এসে কয়েকদিন বাবার বাড়িতে কাটায়। সে সময় ইয়েসেলি সেই বাসাতেই ছিল। শনিবার বিকেলে যখন তার সন্তানকে নিয়ে নিজেদের বাসায় চলে যাবে তখন আইডা'র মা বলে, বাইরে খুব ঠাণ্ডা। ইয়েসেলি রাতটা এখানেই কাটাক। সকালে আমি ওকে দিয়ে আসব। আইডারা এতে রাজি হয় এবং ছেলেকে কম্বল দিয়ে চলে যায়। আইডা দম্পতি কি জানত, এই ছেলেকে আবার ফিরে পেতে তাদের কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে?

পরের দিন ইয়েসেলি এবং তার নানী আইডাদের বাড়িতে আর যায়নি। আইডা এবং তার স্বামী জেরুজালেমে ছুটে এসেও তাদের খুঁজে পায়নি। ছেলেটি তাহলে ভ্যানিশ হয়ে গেছে! এদিকে ইয়েসেলির নানা-নানী কোনোমতেই নাতিকে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। কাঁদতে থাকে আইডা। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয় না। ছেলেকে হারিয়ে ফেলল আইডা। আইডা এবং তার স্বামী ছেলেকে নিতে এরপর বহুবার তার বাবার বাড়িতে গেছে। কিন্তু কোনো লাভ না হওয়ায় ১৯৬০ সালে তারা আদালতে যায়। আইডা তার বাবা নাহমানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। তেল-আবিবের আদালতে আইডা মামলা করে। নাহমানরা এই মামলার কোনো জবাব দেয় না। শুরু হয় ইয়েসেলিকে নিয়ে বাবা-মেয়ের যুদ্ধ।

জানুয়ারির ১৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট ত্রিশ দিনের মধ্যে নাহমানকে নির্দেশ দেয় ইয়েসেলিকে ফেরত দিতে। তাকে আদালতে হাজির হওয়ারও নির্দেশ দেয়। দুদিন পরে নাহমান আদালতকে জানায় যে, ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য তার পক্ষে আদালতে হাজির হওয়া সম্ভব নয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি আইডা তার বাবার বিরুদ্ধে পুলিশে মামলা করে গ্রেফতারের দাবি করে। ছেলেকে কাছে না পাওয়া পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখারও আর্জি করা হয়। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট ইয়েসেলিকে খুঁজে বের করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। দশ দিন পর পুলিশ ইয়েসেলিকে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ ইয়েসেলিকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় এবং এই অনুসন্ধান থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে অনুরোধ করে।

১২ মে সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে ইয়েসেলির নানাকে গ্রেফতার ও অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয়। পরদিন নাহমান গ্রেফতার হয়। নাহমানকে গ্রেফতার করেও কোনো লাভ হয় না। সে একটি কথাও স্বীকার করেনি।

এতে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, নাহমান পরিবার নিজেদের থেকে নাতি ইয়েসেলিকে লুকিয়ে রাখেনি। আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের একটা নেটওয়ার্ক ইয়েসেলিকে লুকিয়ে ফেলেছে এবং তারা পুলিশকে প্রতারিত করছে। তারা যে অলঙ্ঘনীয় নীতি গ্রহণ করেছে তা হল, কোনোমতেই যেন ইয়েসেলিকে তার বাবা মা রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে না পারে তা ব্যর্থ করে দেয়া। অবশ্য ইয়েসেলির নানা নাহমানই হয়তো এ রকম ধারণা দিয়েছে ইহুদিদের ঐ গোত্রগত নেটওয়ার্ককে। মজার ব্যাপার হল, জেরুজালেমের রাব্বি সম্প্রদায়ের প্রধান রাব্বি ফ্রাঙ্ক ইয়েসেলির নানার পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। ঐ বিবৃতিতে তিনি অর্থোডক্স কমিউনিটিকে নাহমানকে সর্বতোভাবে সহযোগিতারও আহ্বান জানান।

১৯৬০ সালের মে মাসে ইসরাইলের সংসদ নেসেটে এই বাচ্চা হারানোর বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করে তুমুল আলোচনা হয় এবং সাংবাদিকদের জন্য এ দিনটি ব্যস্ততম দিন হিসেবে পরিগণিত হয়। সংসদে ধর্মীয় দলগুলোর প্রতিনিধিরা এ নিয়ে ব্যাপক গোলযোগও করেন। সংসদ সদস্য লরেঞ্জ বলেন, বাচ্চা হারানোর বিষয়টি ঘিরে ইসরাইলে যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছে। তিনি নানা নাহমান ও তার মেয়ে আইডা'র মধ্যস্থতাকারী হওয়ারও প্রস্তাব করেন। সংসদ সদস্য লরেঞ্জ জেলখানায় নাহমানের কাছে একটা চুক্তিনামা পাঠান। সেখানে লেখা ছিল শিশুটিকে ফেরত দেয়া হলে তাকে অর্থোডক্স অনুগামী নাহমান অতঃপর এই বলে সম্মতি দেন, যদি এ কাজে তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মগুরু অর্থাৎ রাব্বি মেইজিম যদি তাকে আদেশ দেন তাহলে চুক্তিতে তিনি রাজি আছেন।

লরেঞ্জ দ্রুততার সঙ্গে জেরুজালেমে পৌঁছে ঐ রাব্বির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাব্বি মেইজিম ধারণা দেন যে, যদি অপহরণকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হয় তাহলে তিনি এই চুক্তিতে সম্মতি দিতে রাজি আছেন।

সংসদ সদস্য লরেঞ্জ পুলিশ প্রধান জোসেকের কাছে ছুটে যান। পুলিশ প্রধান সম্মতি দেন যে, মামলা হবে না। গ্যারান্টেড। তিনি তার গাড়ি সাংসদ লরেঞ্জকে এগিয়ে দেন। এ-ও বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার অনেক অগ্রাধিকার রয়েছে। আপনি এই গাড়ি নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সন্দেহও করবে না। আপনি শিশুটিকে নিয়ে আসুন।

খুশিমনে লরেঞ্জ ফিরে আসেন রাব্বি মেইজিসের কাছে। কিন্তু রাব্বি ইতিমধ্যে তার মন পরিবর্তন করেছেন। লরেঞ্জ ফিরে আসেন ভগ্ন হৃদয়ে। তিনি ধারণা করেন শিশুটিকে সম্ভবত কোনো ধর্মীয় কমিউনিটিতে কিম্বা কোনো অর্থোডক্স গ্রামে লুকিয়ে রাখা হয়েছে কিম্বা কোনো স্কুলে। কিন্তু রাব্বিদের নীরবতার দেয়াল ভাঙা কঠিন এবং মিশনটি হয়ে উঠল ইমপসিবল।

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল অপহৃত শিশুর নানা নাহমান ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে জেল থেকে ছাড়া পান। তবে তিনি তার নাতিকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি তার কথা না রাখলে সুপ্রিম কোর্ট আবার তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট শিশুর অপহরণকে দুঃখজনক ও জঘন্য কাজ বলে উল্লেখ করে। ১৯৬১ সালের আগস্টে ইয়েসেলির উদ্ধারে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হলে তারা সর্বত্র লিফলেট বিতরণ ও জনসভা করে। কয়েক হাজার মানুষ ইয়েসেলিকে উদ্ধারের পক্ষে দরখাস্ত করে। দুই সংস্কৃতির যুদ্ধ ও বিরোধের ছায়া ইসরাইলিদের আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে ফেলে।

১৯৬১ সালের আগস্টে পুলিশ হাসিদিকদের গ্রাম কোমেমিউটে অভিযান চালায়। ইয়েসেলিকে অবশ্য এই গ্রামে দেড় বছর আটকে রাখা হয়েছিল। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে ইয়েসেলির মামা শালোম তাকে এখানে নিয়ে এসে জালমান কট নামের এক লোকের বাড়িতে রাখে। তখন ইয়েসেলির নাম দেয়া হয়েছিল ইসরায়েল হাজাক।

ইতিমধ্যে শিশুটির মামা শালোম দেশ ছেড়ে লন্ডনে স্থায়ীভাবে চলে যায়। লন্ডনে হাদিসিক সম্প্রদায়ের লন্ডনের গোল্ডরাস গ্রিনে যে এলাকা রয়েছে সেখানে সে বসতি গাড়ে। ইসরাইলি পুলিশের নির্দেশে ব্রিটিশ পুলিশ লন্ডনে শালোমকে গ্রেফতার করে। ঐ সময়ই তার প্রথম সন্তান কালমানের জন্ম হয়। শিশু কালমানের খতনা সম্পন্ন করার জন্য তাকে তার বাবা শালোমের জেল খানায় নেয়া হয়।

কিন্তু ইয়েসেলির কোনো সন্ধান নেই। কারো কারো ধারণা তাকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা অসুস্থতায় সে মারা গেছে। এদিকে সারা দেশে পুলিশ হাসির পাত্রে পরিণত হয়। পুরো ইসরাইল জুড়ে সেক্যুলার ও অর্থোডক্স ইহুদিদের মধ্যে লাগাতার সংঘর্ষ বেধে যায়।

ইয়েশিভার ছাত্রদের পথচারীরা রাস্তায় ধরে পেটাতে শুরু করে। সেক্যুলার তরুণরা অর্থোডক্স তরুণদের দেখলেই চিৎকার করে বলে উঠে, কোথায় ইয়েসেলি? পুরো ইসরাইল জুড়ে এই তাণ্ডব। ওদিকে ইসরাইলের সংসদে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছেই।

মোসাদ-প্রধান আইসার যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইয়েসেলিকে খুঁজে বের করে দেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি; তার ক্যারিয়ারের একটা জটিলতম অধ্যায় হয়ে উঠবে এটি। আইসার হারেল অভিযানের কোনো ব্যাপারে তার স্ত্রীর সঙ্গে কখনো আলোচনা করেননি। কিন্তু শিশু অপহরণের ব্যাপারটি আলাপ না করে পারলেন না। স্ত্রীকে বললেন, সরকার এবার খুব বেকায়দায় পড়েছে।

এদিকে আইসারের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা আব্রাহام সালোম বললেন অন্যকথা। তার ভাষায় আইসার প্রমাণ করতে চান, পুলিশ যেখানে ব্যর্থ সেখানে তিনি সফল হবেনই।

পুলিশ প্রধান আইসারকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী মনে করেন শিশুটিকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব হবে? সাবাক পুলিশ প্রধান এবং আইসারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আমোক ম্যানোর এই অভিযানের বিরোধী ছিলেন বরাবরই। মোসাদ ও সাবাকের সিনিয়র কর্মকর্তারাও অনুরূপ ধারণা পোষণ করতেন। তাদের ভাষ্য, শিশু খুঁজে বের করার দায়িত্ব মোসাদের মতো মর্যাদাবান সংগঠনের হতে পারে না। ইসরাইলের নিরাপত্তা দেখাই মোসাদের কাজ। প্রকৃতপক্ষে আইসার ছাড়া কোনো পর্যায়ের গোয়েন্দারাই মনে করেন না যে, ইহুদি রাষ্ট্রের সুনাম সংরক্ষণও তাদের দায়িত্বেরও অংশ। তবে সমস্যা হল, আইসার যখন মন স্থির করে ফেলেছেন, তদন্তটি তিনি চালাবেন তখন তাকে বাধা কে দেবেন? কেননা তার কর্তৃত্বই চূড়ান্ত।

আইসার ও তার সহযোগীরা সাবাকের সেরা গোয়েন্দাদের নিয়ে ৪০ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করলেন। তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা এমনকি সুশীল সমাজের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এই অভিযানে শরিক হতে আগ্রহী হলেন। অর্থোডক্স সমাজের স্বেচ্ছাসেবীরা অনুধাবন করলেন যে, ইয়েসেলির অপহরণ জাতিকে একটা বিপজ্জনক পর্যায়ে ফেলে দিয়েছে। যাহোক, তাদের প্রথম অভিযান নিদারুণভাবে ব্যর্থ হল। প্রথম অভিযানটি করা হয়েছিল অর্থোডক্সদের একটি দুর্গে। কিন্তু অভিযানের পর তারা উপহাসের পাত্রে পরিণত হলেন। আইসারের গোয়েন্দাদের ভাষ্য ছিল, আমরা যেন মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করেছি।

আইসার খুবই সতর্কতার সঙ্গে ইয়েসেলির ফাইলটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। প্রত্যেকটি তথ্য একাধিকবার পড়তে লাগলেন। কিন্তু ইসরাইল জুড়ে শিশুটির অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। মোসাদ-প্রধান আইসার-ভাবনার পরিণতি টানলেন এভাবে যে, শিশুটিকে দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। বিদেশে নিয়ে যাওয়া হলে সেটা কোনো দেশ?

একটা ছোট্ট নিউজে চোখ আটকে গেল আইসারের। ১৯৬২ সালের মধ্য মার্চে হাসিদিক ইহুদিদের বিরাট একটি দল সুইজারল্যান্ড থেকে ইসরাইলে এসেছিলো। রাব্বিদের এক শ্রদ্ধাভাজন গুরুর অন্তোষ্টিক্রিয়ায় এসকর্ট হিসেবে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ ছাড়া শিশুরাও ছিল। ঐ রাব্বি গুরুকে হলি ল্যান্ডে সৎকার করা হয়। আইসারের কেন জানি মনে হল মরদেহ সৎকারের ব্যাপারটি ছিল আইওয়াশ। দলটি কয়েক সপ্তাহ পরে সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় ইয়েসেলিকে নিয়ে গেছে। নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই বাহানা। আইসার বিমানবন্দরে তার লোক নিয়োগ করলেন এবং জুরিখে তার একটি টিম পাঠালেন আব্রাহام শালোমের নেতৃত্বে। হাসিদিকরা সেখানে ফিরে গিয়ে কী করছে তা দেখার জন্য। মোসাদ গোয়েন্দারা শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে পর্যন্ত গোপন তল্লাশি চালায়। রাতের বেলা লুকিয়ে বোর্ডিংয়ের বারান্দা প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করে। বলতে গেলে প্রতিটি শিশুকে তারা অবলোকন করে। একটা জঙ্গলের মাঝখানে ছিল ইয়েসিভাদের স্কুল। আব্রাহام শালোমের ভাষায়, ইয়েসেলির বয়সী সব ছেলেকে লুকিয়ে জানালা দিয়ে পরীক্ষা করেছি। কেননা, আমাদের ধারণা ছিল হয়তো তাকে ছদ্মবেশ ধারণা করে রাখা হয়েছে। এক সপ্তাহ রাতের অভিযান চালিয়ে আব্রাহام আইসারকে জানান যে, সুইস শিশুদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ওখানে ইয়েসেলি নেই।

আইসার নিজেই অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। তিনি তার হাতের কাজ অন্যদের ওপর ন্যস্ত করলেন। প্যারিসে তিনি সাময়িকভাবে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরিত করলেন এবং বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিলেন। তার গোয়েন্দারা ফ্রান্স, ইটালি, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকায় গোয়েন্দাগিরি শুরু করল। অর্থোডক্সদের সমাজ ও ইয়েসিভাগুলো বিশ্বব্যাপী যেখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে সর্বত্রই লোক লাগানো হল। জেরুজালেম থেকে এক তরুণ অর্থোডক্স ইহুদি সুইজারল্যান্ডের একটা বিখ্যাত ইয়েসিভায় আসল। সে একজন পণ্ডিত সাজল এবং একজন নামি শিক্ষকের অধীনে অধ্যয়ন করবে বলে ওদেরকে জানাল। লন্ডনে গিয়ে উপস্থিত হল ইয়েডিথ নিশিইয়াহু নামের এক মহিলা গোয়েন্দা। এই ভদ্রমহিলা আইসারের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা। আইচম্যানকে ধরে আনার ক্ষেত্রে সে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইয়েডিথ একজন ধর্মপ্রাণ মহিলা। সে লন্ডনে এসেছে অপহৃত শিশুটির মামা শ্যালোমের শাশুড়ির চিঠি নিয়ে। এই চিঠি নিতে বা আস্থা অর্জনে তাকে কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি। শ্যালোমের পরিবার লন্ডনে তাকে তাদের বাসায় হাউজগেস্ট হিসেবে থাকার আমন্ত্রণ জানায়। তারা অবশ্যই এই ভালো মহিলা যে গোয়েন্দা তা জানতে পারেনি।

লন্ডনে ইয়েডিথই একমাত্র গোয়েন্দা ছিল না। সাতমার গোত্রের আল্ট্রা অর্থোডক্স হাসিদিকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল লন্ডন। রোমানিয়ার সাতুমারে গ্রামের নামানুসারে এই গোত্রের নামকরণ করা হয়। কেননা ঐ গ্রাম থেকেই এই গোত্রের উৎপত্তি।

মোসাদ-প্রধান আইসার লন্ডনে হাসিদিকদের আবাসিক এলাকায়ও তার গোয়েন্দা নিয়োগ করেন। আরেকটি টিমকে পাঠানো হয় আয়ারল্যান্ডে। এক গোয়েন্দা অবহিত হল যে, ধর্মপ্রাণ এক দম্পতি সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে একটা বিচ্ছিন্ন বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। মোসাদ গোয়েন্দারা ভাবল, এই বাড়ি হয়তো ইয়েসেলির নতুন ঠিকানা হয়েছে। তারা ঐ বাড়িতে অভিযান চালানোর জন্য পাশেই বাড়ি ভাড়া করল, জাল কাগজপত্র তৈরি করল। কিন্তু এখানেও তাদের অভিযান ব্যর্থ হল। তাদের ভাষআয়াল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ দম্পতি প্রকৃত অর্থেই ধার্মিক। তারা আয়ারল্যান্ডে ছুটি কাটাতে এসেছে। জাঁদরেল মহিলা গোয়েন্দাও অপহৃত শিশুর মামার বাড়ি থেকে কোনো তথ্যসূত্র উদ্ধার করতে পারল না। সুইজারল্যান্ডে নিয়োগকৃত গোয়েন্দাও খালি হাতে ফিরল। সারা বিশ্ব থেকেই অপহৃত শিশুর ব্যাপারে নেতিবাচক খবর আসতে থাকল। কোথাও নেই সে।

আইসারের গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটে গেল লন্ডনের সাতমার হাসিদিকে। ইয়েশিভার স্মার্ট বেশ কয়েকজন তরুণ স্টামফোর্ড হিল এলাকায় আইসারের গোয়েন্দাদের প্রায় ঘিরে ফেলল। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, ইহুদিবাদীরা এখানে ঢুকে গেছে। আস তোমরা। ইয়েসিলে এখানেই আছে। তরুণরা লন্ডন পুলিশকেও খবর দিল। আইসারের কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য গোয়েন্দাদের ব্রিটিশ রাণির জেলখানা ঢোকা থেকে মুক্ত করতে সমর্থ হল।

আইসারের সব মিশনই ব্যর্থ। ব্যর্থ গোয়েন্দারা আইসারকে অভিযান বন্ধ করে দিতে বলল। আরও বলল, আপনি খড়ের গাদায় সুচ খুঁজছেন। ঐ বাচ্চাকে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মোসাদ-প্রধান আইসার নাছোড়বান্দা। তিনি আশাবাদী। অবশ্যই নিখোঁজ শিশুটিকে তিনি উদ্ধার করে ছাড়বেন।

আইসার প্যারিসের মোসাদ-প্রধান ইয়াকোভ কারুণকে ডেকে পাঠালেন। তার জন্ম রোমানিয়ায়। গণহত্যা কালে কারুজ তার বাবা-মাকে হারিয়েছেন। জেরুজালেমে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি গোয়েন্দাগিরি ও ইসরাইলের নিরাপত্তা বিষয়গুলো দেখভালের সঙ্গে যুক্ত। কারুজকে দেখলে একজন বুদ্ধিজীবীর মতো মনে হয়। তিনি মোসাদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক প্রধান। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হত তাকে। ইসরাইলের সঙ্গে ইরান, ইথিওপিয়া, তুরস্ক এমনকি সুদানের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনে তার অবদান রয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটিশ ও জার্মান সিক্রেট সার্ভিসের সঙ্গে তার বিশেষ দহরম-মহরম বিদ্যমান। মরক্কোর ভয়ংকর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কুফকিরের সঙ্গে তার দুর্দান্ত সম্পর্ক। বাদশা কিং হাসানের সঙ্গে তিনি একবার মরক্কোতে গোপনে গিয়ে সাক্ষাৎও করে এসেছেন। ইথিয়পিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসিকেও তিনি সম্ভাব্য এক অভ্যুত্থান থেকে রক্ষা করেছেন। আলজেরিয়ায় অভিযানকালে জুলিয়েটে নামের এক মহিলার প্রেমে পড়ে তাকেই বিয়ে করেন। স্বল্পভাষী কারুজ নিপাট ভদ্রলোকও। স্যুট-টাই পরিহিত এই কারুজ একজন মাস্টার স্পাই। তাকে অবশ্য কখনো মাঠে কাজ করতে হয়নি। আইসারের কাছে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা। ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় অনর্গল কথাও বলতে সিদ্ধহস্ত কারুজ।

আইসার সারাদিনই কাজে মগ্ন থাকেন। তিনি একটা হোটেল রুম ভাড়া নিয়েছেন সত্য কিন্তু দিন-রাত সর্বক্ষণই কাটান একটি এপার্টমেন্টে। এটিকেই তিনি অপারেশনাল সদর দফতর বানিয়েছেন। ঐ এ্যাপার্টমেন্টে তার জন্য একটা ফোল্ডিং খাটিয়া কেনা হয়েছে। জুনিয়াররা যার নাম দিয়েছে ইয়েসেলি বেড। মাঝে মাঝে কখনো তিনি কয়েক মিনিটের একটা দিবানিদ্রা ঐ খাটিয়ায় শুয়ে সারেন। গত কয়েক মাস ধরে যা ঘটেছে আইসার সারা ইউরোপ জুড়ে থাকা তার গোয়েন্দাদের চিঠি বা টেলিগ্রাম লিখছেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রাপ্ত রিপোর্ট দেখছেন, গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন। হয়তো ভোররাতে অফিস ছেড়ে তিনি হোটেলে যান, গোসল করেন। আবার কিছুক্ষণের মধ্যে অফিসে চলে আসেন। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে হোটেলের দ্বাররক্ষী অবাক বনে যায়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে হোটেলের দ্বাররক্ষী শেষ দিকে হ্যাট নামিয়ে তার প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাত।

এপ্রিলের এক সকালে মোসাদের কাছে একটা কৌতূহলোদ্দীপক রিপোর্ট এল। মেইর নামে এক অর্থোডক্স ইহুদি রিপোর্টের প্রেরক। মেইরকে পাঠানো হয়েছিল অ্যান্টওয়ার্প। এটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। সেখানে সে এক গ্রুপ ধর্মীয় ডায়মন্ড ব্যবসায়ীর সন্ধান পেয়েছে। এই ব্যবসায়ীরা বৃদ্ধ রাব্বি ইটজিকেলের কথাকে যেমন আইন হিসেবে গণ্য করে তেমনি তাকে হলিম্যান মনে করে। এই ডায়মন্ড ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরোধ বাধলে তারা কোনো আদালতের শরণাপন্ন হয় না। তারা ঐ রাব্বির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মনে করে এবং তার যে কোনো রায় মেনে নেয়। হাজার কোটি টাকার বিরোধ হলেও। এই রাব্বির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ইউরোপের আধুনিক জীবনেও তারা এই বিশেষ গ্রুপটি প্রাচীন আমলের রীতি-নীতি মেনে চলে।

মেইর আরো জানতে পারে যে, রাব্বির ঐ অনুসারীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজিবিরোধী আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপ হিসেবে কাজ করত। একই সঙ্গে গেস্টাপো বাহিনীর হাত থেকে বহু ইহুদিকে রক্ষা করেছে। যুদ্ধশেষেও তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে থাকে। ডায়মন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মেইর ক্যাথোলিক, স্মার্ট, স্বর্ণকেশী, নীলনয়না এক ফরাসি মহিলার কথা জানতে পেরেছে। যুদ্ধের সময় ঐ মহিলাও এদের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং হিটলারের কবল থেকে বহু ইহুদিকে রক্ষা করেছে। মহিলা ব্যাপকভাবে রাব্বিদের মতবাদের অনুরক্ত হয়ে পড়ে এবং ইহুদিধর্মে নিজেকে দীক্ষিত করে। পরবর্তীতে ধর্মপ্রাণ অর্থোডক্সে নিজেকে উন্নীত করে। আন্ডারগ্রাউন্ডের জীবন মহিলাকে অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছে। সুন্দরী, দুঃসাহসী হিসেবে সে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তার ব্যবসায়িক বুদ্ধিরও তুলনা হয় না। ফ্রান্সের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অ্যান্টওয়ার্প গ্রুপের কাজে সে সারা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছে। মেইয়ের ভাষায়, মহিলাটি এক কথায় হলি ওম্যান। মেইর জানিয়েছে, এই হলি ওম্যান ইসরাইলও সফর করেছে। প্রথম বিয়ের মাধ্যমে জন্ম দেওয়া পুত্র ক্লাউডেও ধর্মান্তরিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ইয়েশিভাসের প্রাক্তন ছাত্র ক্লাউডেও বর্তমানে জেরুজালেমের তালমুডিক স্কুলে পড়েছে। কিন্তু অ্যান্টগ্রুপের লোকজন এখন জানে না যে, এই দুর্দান্ত হলি ওম্যান এখন কোথায়।

মেইর প্রেরিত এই তথ্যাদি আইসারের মনের দিগন্ত যেন খুলে দিল। মেইরের রিপোর্টটি সাদামাটা বটে। কিন্তু আইসার এর মধ্যে কী যেন একটা পেলেন। এক মহিলার হাজারো চেহারা। নিশ্চয়ই এর সঙ্গে ইয়েসেলির ঘটনার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যদিও মেইরের রিপোর্টের মাধ্যমে মহিলার সঙ্গে ইয়েসেলির ঘটনার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া বিরল। তবে আইসার নিশ্চিত অর্থোডক্স নেতাদের কাছে এরকম মহিলার গুরুত্ব থাকবেই। অর্থোডক্স নেতারা ইয়েসেলিকে পাচার করে থাকলে তার সঙ্গে এই মহিলার যোগসাজশ না থেকে পারে না।

আইসারের মনে এখন এই মহিলার কর্মকাণ্ড বড় করে দেখা দিল। তিনি অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে এই মহিলাকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে ভাবতে লাগলেন। আইসার ইসরাইলে বিস্তারিত জানালেন এবং ঐ মহিলা ও তার ছেলে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে বললেন।

কয়েকদিনের মাথায় সেই টেলিগ্রামের উত্তর এল। ছেলের বর্তমান নাম এরিয়েল এবং সে ইসরাইলেই রয়েছে। এরিয়েলের মা কোথায় আছে কেউ তা জানে না। তার প্রকৃত নাম মেডেলিন ফেরাল্লিয়ে। কিন্তু ইসরাইলে তার নাম রুথ বেনডেভিড।

এসব তথ্যাদিতে আইসারের সদর দফতর ম্যাডেলিন সম্পর্কে অনেকখানি প্রকৃত তথ্য জানতে সমর্থ হল। মেডেলিন প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করেছে। সহকর্মী সুদর্শন হেরীকে সে বিয়ে করে এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর পরই তাদের সন্তানের জন্ম হয়। যুদ্ধের সময় ম্যাডেলিন ম্যাকুইস রেসিসট্যান্ট গ্রুপে যোগদান করে। আন্ডারগাউন্ড কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কারণে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের ইহুদি গ্রুপ বিশেষ করে অ্যান্টওয়ার্প গ্রুপের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। যুদ্ধ শেষে এদের কিছু লোকের সঙ্গে সে আমদানি-রফতানি ব্যবসাও শুরু করে।

১৯৫১ সালে সে স্বামী হেনরিকে তালাক দেয়। ক্ষুদ্র আলতাসান শহরের এক তরুণ রাব্বির সঙ্গে প্রেমলীলায় সে জড়িয়ে পড়ে। এই নিষ্ঠাবান রাব্বি ইসরাইলে স্থায়ীভাবে চলে আসতে আগ্রহী এবং সেখানেই তারা বিয়ে করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ইহুদি ধর্মে মহিলার দীক্ষা বা ঠিক ধর্মকে ভালোবেসে হয়নি। তার অনুগামীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই ধর্মান্তর। ধর্মান্তরিত হয়েই ম্যাডেলিন অথবা রুথ বেন হেজাবি বনে যায়। তার স্বর্ণকেশ এ সময় ওড়না দিয়ে ঢাকা থাকত। সাজপোশাকে ব্যাপকভাবে আগ্রহী এই মহিলা অর্থোডক্স ইহুদিদের মতো সাদাসিধে পোশাক পরতে শুরু করে। কিন্তু ইসরাইলে এই প্রেমিকযুগলের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। ঐ রাব্বি তাকে ছেড়ে চলে গেলে সে একাকী হয়ে যায়। হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত এই মহিলা জেরুজালেমের সবচে বড় সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। রাব্বি নেতা মেইজিশের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে। এই ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এই মহিলা বেশ শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হয় এবং ফরাসি পাসপোর্টের কারণে জেরুজালেমের জর্ডান অংশে তার অবাধ যাতায়াতেও কোনো সমস্যা হয় না।

পঞ্চাশ দশকের শুরুতে মেডেলিন অথবা রুথ ফ্রান্সে ফিরে এসে ব্যাপকভাবে দেশ-বিদেশ সফর শুরু করে। মোসাদ এজেন্টরা জানতে পারে মেডেলিন প্রায়ই প্যারিস সন্নিহিত মহিলাদের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করত। কিন্তু তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না।

ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আইসারকে মেডেলিন অথবা রুথের দু'বার ইসরাইল সফরের কথা জানায়। এ অবশ্য গত কয়েক বছরের মধ্যে। তার দ্বিতীয়বার সফর ঘটে ১৯৬০ সালের ২১ জুন। এই সময় ইসরাইলে তার ছোট্ট একটি মেয়েকে রেখে যায়। পাসপোর্টে এটি তার মেয়ে বলে সে উল্লেখ করে। কিন্তু কে এই মেয়েটি? মেডেলিন অথবা রুয়ের তো কোনো মেয়ে ছিল না। মোসাদ- প্রধান আইসার স্থির সিদ্ধান্তে এলেন এই বলে যে, মহিলাকে খুঁজে বের করাই তার প্রধান কাজ। তিনি সঠিক পথেই আছেন। ইয়াকোভ কারুজকে তিনি ঐ মহিলাকে ধরার নির্দেশ দিলেন।

প্যারিস সন্নিহিত এইক্সলেজ বেইনসে গিয়ে কারুজ মেডেলীন কিম্বা রুথকে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও চেহারায় দেখতে পেলেন। গোয়েন্দাদের আরেকটি সূত্র লন্ডনের ধনী মণিমুক্তা ব্যবসায়ী জোসেফ ডোম্বের সঙ্গে ম্যাডেলিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানতে পারল। ডোম্বের সঙ্গে যে ধরনের গাড়িতে মেডেলীন বসা ছিল তা হাসিদিক গোত্রের কোনো মানুষের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। আইসার ভালো করেই জানতেন, ডোম্ব হল ইসরাইল রাষ্ট্রের একজন শত্রু। ডোম্ব সাতমার হাসিদিক গোত্রের লোক এবং নিউইয়র্কের সাতমার রাব্বির বিশেষ আস্থাভাজন। নিউইয়র্কের সাতমার রাব্বিকে যদি পোপ বলা হয় সেক্ষেত্রে ডোম্ব হল আর্চ বিশপ। আইসারকে একজন বিশেষজ্ঞ এভাবেই বর্ণনা দিয়েছিলেন।

মোসাদ-প্রধান আইসার উপলব্ধি করলেন, তাকে এখন লন্ডনের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত অপহৃত শিশুটির দুই চাচার বাস এখন লন্ডনে। ডোম্বের নেতৃত্বাধীন সাতমার সম্প্রদায় লন্ডনে খুব তৎপর। ফলে মেডোলন ইয়েসেলিকে ইসরাইল থেকে পাচার করে লন্ডনে নিয়ে এসেছে বলে আইসার স্থিরনিশ্চিত হলেন। ইউরোপ ও ইসরাইলের সাতমার হাসিদিকরা যৌথভাবে ইয়েসেলিকে অপহরণ করেছে। ডোম্ব এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে। মেডেলিনের ফ্রান্সের পাসপোর্ট বিদ্যমান। সে সুন্দরী। প্রতিভাময়ী ও অভিজ্ঞ। মেডেলিন এই অপহরণে স্বশ্যই সহযোগী ছিল এবং সে জানে ইয়েসেলি কোথায় আছে।

আইসারের এই সন্দেহ তাদের সহযোগী গোয়েন্দা সংস্থা সাবাকের এক গোয়েন্দা কনফার্ম করে। মেডেলিন তার ছেলেকে যেসব চিঠি লিখেছে তার মধ্যে ইয়েসেলিকে অপহরণের বিষয়ে কিছু আভাস-ইংগিতও ছিল।

আইসারের প্রয়োজন আরও খবর, আরও তথ্য। সাতমার হাসিডিমে তিনি আরও লোক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এক মোসাদ গোয়েন্দা ফ্রেয়ার নামের এক খৎনাকারীকে খুঁজে পায়। ইহুদিদের নবজাতকদের ফ্রেয়ার খৎনা করে থাকে। বাচাল প্রকৃতির এই লোকটির আরাধ্য হল খাও দাও ফুর্তি কর জাতীয়। সে ডোম্বের খুব ঘনিষ্ঠ এবং ইয়েসেলি কোথায় আছে তা জানে বলে দাবি করে।

আইসার ফ্রায়েরকে প্যারিসে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মরক্কোর প্রিন্স সাজিয়ে তার কাছে লোক পাঠানো হয়। মরক্কোর কথিত প্রিন্স তাকে বলে যে, এক ইহুদি মেয়ের প্রেম পড়ে তাকে সে বিয়ে করেছে। বাড়িতে তারা ইহুদি মতে জীবন-যাপন করে বটে কিন্তু মরক্কোতে তা জানাজানি হলে তার পরিবার তাকে হত্যা করবে। এখন তাদের দম্পতির যে সন্তান হয়েছে তার খৎনা করতে তাকে প্যারিসে আসতে হবে। নবজাতক বাবা-মা'র সঙ্গে এখন প্যারিসে রয়েছে। রাব্বি ফ্রেয়ার যদি খৎনাটা করে দেয় বিরাট এমাউন্টের টাকা-পয়সাও কোনো সমস্যা হবে না।

ফ্রেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয় এবং কয়েকদিনের মাথায় প্যারিসে আসে। মরক্কোর কথিত প্রিন্সের ফ্ল্যাটে আসার সঙ্গে সঙ্গে মোসাদ গোয়েন্দারা তাকে আটকে ফেলে। মুত্যভয়ে ভীত ফ্লেয়ার সব তথ্য দিতে সম্মত হয় কিন্তু যখন ইয়েসিলের প্রসঙ্গ উঠে সে তারস্বরে কোনো তথ্য দিতে পারবে না বলে জানায়।

প্রকৃতপক্ষে অবশেষে জানা যায় অপহৃত ইয়েসেলির ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। হামবড়া ভাবের জন্যই সে ধরা পড়েছে। অতএব আইসারের অভিযান তৎপরতা আরেকবার দেয়ালের সঙ্গে বাড়ি খেল।

পক্ষান্তরে মোসাদ-প্রধান আইসারের আরেকটি গোয়েন্দা দল যেন স্বর্ণের খনি আবিষ্কার করে বসল। ফ্রান্সের সিক্রেট সার্ভিসের মাধ্যমে মোসাদ গোয়েন্দারা মেডেলিনকে লেখা বেশ কিছু চিঠি উদ্ধার করল। মেডেলিন একটা বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। প্যারিসের লয়রে ভেলির এই বাড়িটি মেডেলিনেরই। খুবই সুন্দর এলাকা। মোসাদ গোয়েন্দারা মেডেলিনকে পরিচয় গোপন করে লিখল যে, তার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দাম দিতে তারা তারা কিনতে আগ্রহী। তারা নিজেদের অস্ট্রিয়ার ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিল। মেডেলিন এবার তাদের এপয়েনমেন্ট দিল প্যারিসের একটা বিশাল হোটেলে। তারিখটা ১৯৬২ সালের ২১ জুন।

ঐ তারিখের আগে আইসারের গোয়েন্দারা একের পর এক প্যারিসে আসতে শুরু করেন। গোয়েন্দারা জাল কাগজপত্র, ভাড়া গাড়ি, সেফ হাউস সহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর বন্দোবস্ত রাখল। পালিয়ে যাওয়ার রাস্তায়ও ঠিক করে রাখল।

আইসার এ-ও ধারণা করেছিলেন, মেডেলিনের ছেলে তার মা সম্পর্কে অনেক বেশি জানবে। সে পড়ত ইসরাইলে। আইসার তার মায়ের গ্রেফতারলগ্নে ইসরাইলে তার ছেলেকেও গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নিলেন। এরিয়েলও অর্থোডক্স কিন্তু মায়ের মতো সে গোঁড়া নয়। দু'জনকে একই সময়ে গ্রেফতারের কারণ হল, মাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রয়োজনে যেন ছেলের কাছ থেকে তার সত্যতা যাচাই করা যায়। এমনই সিস্টেম করে ফেললেন আইসার।

২১ জুন বেশ লম্বা, চোখে লাগার মতো এক সুন্দর রমনী হোটেলের লবীতে ঢুকলো। এই-ই হল গোয়েন্দাদের কাছে প্রত্যাশিত মেডেলিন।

কথিত দুই অস্ট্রীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে নিজে থেকে পরিচয় পর্ব সারল মেডেলিন। মেডেলিন চমৎকার ইংরেজি বলে। দুই ব্যবসায়ী বাড়ি বিক্রির আলোচনা দ্রুত শেষ করল। কিন্তু উকিল আসতে দেরি করছিল। উকিলকে ফোন করা হলে সে ব্যস্ততার জন্য ক্ষমা চাইল। তবে উকিল বলল, শহরের কাছেই তার বাসা। তিন মক্কেল যদি তার বাসায় আসে তাহলে সেখানে সব কাগজপত্র দেখে সই করে দেবে। মেডেলিন উকিলের বাড়ি যেতে রাজি হল। ভাড়া গাড়িতে তিনজনই উঠল। এদের মধ্যে দু'জন যে মোসাদ গোয়েন্দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সুন্দরী মেডেলিনকে দেখে গাড়ির চালক গোয়েন্দার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। সে ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করে বসল। মেডেলিন মিষ্টি কথায় ট্রাফিক সার্জেন্টকে জানাল যে, এরা বিদেশি-ট্রাফিক আইন ভালো করে জানে না। ট্রাফিক যদি বিদেশিদের টিকেট ধরিয়ে দিত তাহলে গোয়েন্দাদের অনেক জারিজুড়ি ফাঁস হয়ে যেত।

কথিত উকিলের বাড়িতে অবশেষে গাড়িটি ঢুকল। কথিত অস্ট্রীয় দুই ব্যবসায়ী মেডেলিনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। সেখানে বসা ছিলেন মোসাদের আরেক ডাকসাইটে গোয়েন্দা কারুজ। কারুজ মেডেলিনকে ফরাসি ভাষায় বললেন, ম্যাডাম আপনার বাড়ি নিয়ে আলোচনার জন্য এখানে আনিনি। ম্যাডোলীন অবাক হয়ে চিৎকার করলেন। কারুজ বললেন, অপহৃত শিশু ইয়েসেলির ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। এই সময় কথিত দুই অস্ট্রীয় ব্যবসায়ী তথা মোসাদ এজেন্ট গায়েব হয়ে গেল। মেডেলিন ভয় পেয়ে গেল।

কারুজের সঙ্গের এক গোয়েন্দা মেডেলিনের সঙ্গে বেশ রূঢ় ভাষায় কথা বলল। তার ধারণা ছিল মেডেলিনও কড়া ভাষায় কথা বলবে। ওদিকে মেডেলিনের ছেলেকেও ইসরাইলে গোয়েন্দাদের প্রশ্নবানে ফল ফলতে শুরু করল। মেডেলিন বুঝল মোসাদ গোয়েন্দাদের হাতে সে আটক হয়েছে।

কারুজ মেডেলিনকে বললেন, ইয়াসেলির অপহরণে আপনি জড়িত। আমরা শিশু ইয়েসেলিকে চাই। মেডেলিন বলল, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না এবং আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলব না। মেডেলিনকে বিদ্যুতের শক দেয়া হল। কিছুক্ষণের মধ্যে মেডেলিন সুস্থ হয়ে উঠল। জরুরি প্রয়োজনে কারুজ একজন প্রশিক্ষিত নার্স এনে রেখেছিলেন।

ইসরাইলিরা বুঝেছিলেন লৌহমানবী মেডেলিন সহজে মুখ খুলবে না। কিন্তু তাদের শেষ আশা এই মহিলা। মেডেলিনকে ইয়েহুডিথ নিশিয়াহু'র কাছে হস্তান্তর করা হল। সে এসেছে লন্ডন থেকে। ইয়েহুডিথ মেডেলিনকে সুন্দর ভাবে পরিচর্যা করল। একজন ধর্মপ্রাণ মহিলার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করল সে। ধর্মমতানুযায়ী তার জন্য বিশেষ খাবার রান্না করা হল। প্রার্থনা বই দেয়া হল। দেয়া হল মোমবাতি। মেডেলিনকে যেখানে রাখা হল সেখানে পুরুষদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হল। মেডেলিনের পাশের রুমে নার্সকে রাখা হল।

আবার শুরু হল মেডেলিনকে জিজ্ঞাসাবাদ। কারুজ এবং ভিক্টর কোহেন ফরাসি ভাষায় মেডেলিনকে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। মেডেলিন ইসরাইলি গোয়েন্দাদের তার সম্পর্কে জানার বহর দেখে স্তম্ভিত। এতদসত্ত্বেও মেডেলিন ইয়েসেলি সম্পর্কে একটি শব্দও বলতে রাজি নয়। বরং অপহরণের বিষয়টি সে পুরোপুরি অস্বীকার করল। মেডেলিন গোয়েন্দাদের ফরাসি ভাষায় কিছু গালিও দিল। গোয়েন্দা ভিক্টর কোহেন পরে বলেছেন, প্রথমে তিনি মেডেলিনকে শান্ত করার চেষ্টা চালান। তবে তার অন্তর্গত মনে যে প্রশ্নটা ছিল তা হল, একটি খ্রিস্টান মেয়ে কী করে ধর্মান্ধ অর্থোডক্সে পরিণত হল তা জানা। কেননা দুটি হল বিপরীতমুখী জগৎ। প্রথমদিকে মেডেলিনকে প্রশ্নোত্তরকালে এক মহিলা উপস্থিত ছিল। পরে মেডেলিন একাই গোয়েন্দা কোহেনের সঙে বসে কথা বলে। অবশ্য দরজা খোলাই ছিল।

জিজ্ঞাসাবাদকালে এই গোয়েন্দা মেডেলিনের সঙ্গে বেশ খানিকটা দুর্ব্যবহার করে। কৌশল হিসেবেই গোয়েন্দা এটি করেছিল যাতে মেডেলিনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় এবং এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এদিকে মেডেলিনের ছেলে এরিয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু ফল বেরুতে থাকে। এরিয়েলকে ইসরাইলে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন মোসাদের এক দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা। এই দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা নাকি বাঘ-মহিষকে এক ঘাটে জল খাওয়াতে পারঙ্গম। এ কারণে তার একটি কোড নামও বিদ্যমান। নাম আব্রাহাম হাডার। তিনি মেডেলিনের ছেলেকে বলেন, তোমার মা স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এখন তুমি সত্যি কথাগুলো বল।

কিছুক্ষণের মধ্যে এরিয়েল কেঁদে ফেলে। শিশু ইয়েসেলিকে নিয়ে সে যা জানে বলতে রাজি আছে যদি তার মাকে ও তাকে বিচারের আওতায় আনা না হয়।

আব্রাহام বললেন, তাই হবে। একথা বলেই আব্রাহাম এরিয়েলকে সাবাক প্রধান এমোস মানোরের কাছে নিয়ে গেলেন। মানোর বললেন, আব্রাহাম তোমাকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা পালন করা হবে। এখন বল, ইয়েসিলি কোথায়?

এরিয়েল কেঁপে উঠল। কিন্তু অবশেষে স্বীকার করল, তার মা ইয়েসেলিকে ইসরাইলের বাইরে পাচার করেছে। একটি মেয়েশিশুর ছদ্মবেশে এই পাচার সংঘটিত হয়। ইয়েসেলির পাসপোর্ট জাল করা হয়। তার নাম ও বয়সও পরিবর্তন করা হয়। সে যা জানে তা হল ইয়েসেলিকে সুইজারল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে।

এরিয়েলের স্বীকারোক্তি তার মা মেডেলিনকে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হল। কোহেন তাকে বললেন, এরিয়েল এখন আমাদের হাতে। তার কঠিন সাজা হবে। সে সব কিছু স্বীকার করেছে। এখন আপনার ছেলে যে কঠিন বিচারের সম্মুখীন হবে এতে কি আপনি উদ্বিগ্ন নন?

মেডেলিন বললেন, এরিয়েল এখন আর আমার ছেলে নয়। ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও মেডেলিন ভেঙে পড়ল না।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত গোয়েন্দারা উপলব্ধি করল যে, তাদের অভিযান মোটেই সফল হচ্ছে না। অবশেষে মোসাদ-প্রধান হারেল আইসার নিজেই মেডেলিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিলেন।

একটা অন্ধকার কক্ষে হারেল আইসার এবং মেডেলিন মুখোমুখি বসলেন। কয়েকজন মোসাদ গোয়েন্দা পেছনে দাঁড়িয়ে। কোহেন এবং কারুজ দোভাষীর ভূমিকা নিলেন।

আইসার বুঝেছিলেন যে, এই দৃঢ়চেতা মহিলাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে যৌক্তিক আর্গুমেন্ট করা। আইসার বুঝেছিলেন, মেডেলিন ধর্মপরায়ণা কিন্তু নিশ্চয়ই যুক্তির কথা শুনবে। সর্বোপরি মেডেলিন সারাজীবন ধরে ধর্মান্ধ অর্থোডক্স ইহুদি নয়। তাছাড়া আগের জেনারেশনের মতো ধর্ম নিয়ে উন্মাদনা তার রক্তে প্রবাহিত হওয়ার কথা নয়। সর্বোপরি সে বুদ্ধিমতী ও চতুর। ফলে সেভাবেই সে ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

আইসার মেডেলিনকে বললেন, আমি ইসরাইল সরকারের প্রতিনিধিত্ব করি। আমার কথার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আপনার ছেলে সবকিছু স্বীকার করেছে। আপনার সম্পর্কে আমাদের কাছে বহু তথ্যাদি রয়েছে। আপনার সব গোপনীয় তথ্যাদি আমাদের হাতের মুঠোয়। আমরা দুঃখিত যে, আপনাকে জেল থেকে এখানে আনা হয়েছে। আপনি ইহুদি হিসেবে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। আর ইহুদিবাদ মানেই ইসরাইল। আবার ইসরাইল ছাড়া ইহুদিবাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ইয়েসেলির অপহরণে ইসরাইলের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক হানাহানি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলের মানুষ অর্থোডক্সদের বিরুদ্ধে ফুঁসছে। আপনার কারণেই ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। যদি আপনি অপহৃত ইয়েসেলিকে ফেরত না দেন রক্তপাত সেক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। আবার ভাবুন, অপহৃত শিশুটির ক্ষেত্রে কি ঘটতে পারে। শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, মারাও যেতে পারে। আপনি এবং আপনার সহযোগীরা শিশুটির বাবা- মাকে কী উত্তর দেবেন? এই ঘটনা সারাজীবন আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। আপনি একাধারে একজন মহিলা এবং মা। যে সন্তানকে আপনি লালন-পালন করছেন তাকে যদি কেউ তুলে নিয়ে যায় আপনার মনের অবস্থা তখন কী হবে। রাত্রে কী আপনার ঠিকমতো ঘুম হবে?

আইসার বলেন, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি না। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য অপহৃত শিশুটি উদ্ধার। যত তাড়াতাড়ি শিশুটি আমাদের হাতে আসবে আপনার মুক্তি তত আসন্ন। আপনার ছেলেও মুক্তি পাবে। সর্বোপরি ইসরাইল আবার ঐক্যবদ্ধ হবে।

আইসার মেডেলিনের মনটাও কথা বলতে বলতে অনুধাবনের চেষ্টা করছিলেন। মেডেলিনকে এই সময় চূড়ান্ত অস্থির দেখা যায়। তার ভেতরে যে নানা তোলপাড় দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছিল তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। সর্বোপরি তেজস্বী একজন মহিলার দৃষ্টিভঙ্গি বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়া এক কঠিন কাজ। মোসাদ গোয়েন্দারা ছিলেন নির্বিকার। তবে তারা বুঝতে পারছিলেন, সত্য প্রকাশের পথে। মেডেলিন তার মুখ তুলে বলল, আপনারা যে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি তা আমি জানব কী করে? আপনাদের ওপর আস্থা রাখব কী ভাবে?

মুহূর্তের মধ্যে আইসার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট মেডেলিনের হাতে দিলেন। আইসারের লোক এসব দেখে স্তম্ভিত। বস এসব কী করছেন। তিনি কী পাগল হয়ে গেছেন? বিবাদিকে প্রকৃত নাম বলা, পাসপোর্ট দেখানোর মতো ঝুঁকির কাজ আর হতে পারে না। কিন্তু আইসারের ভাবনাটা বিপরীত। তার মতে, তিনি যে আন্তরিক এবং মেডেলিনের প্রতি আস্থাশীল এটা বোঝানো জরুরি। হয়তো এভাবেই সাফল্যের পথ সুগম হবে।

মেডেলিন ইসরাইলের এমব্রোস করা পাসপোর্টের সিলমোহরটি বেশ সময় নিয়ে দেখল। এতক্ষণ সে দাঁত দিয়ে ঠোঁটে কামড় দিয়ে রেখেছিল। এক সময় তার ঠোঁট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। অস্থির গলায় সে বলল, আমি আর পারছি না। আমি আর পারছি না...।

হঠাৎ করেই মেডেলিন তার মাথা তুলল। বলল, শিশুটি এখন আছে গারটনার পরিবারের সঙ্গে। ঠিকানা হল, ১২৬ পেন স্ট্রিট, ব্রুকলিন, নিউইয়র্ক। ঐ পরিবারে শিশুটির নাম ইয়ানকেলে।

আইসার চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, যত তাড়াতাড়ি শিশুটিকে আমরা পাব তত তাড়াতাড়ি আপনার মুক্তি। তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন।

জেরুজালেম, নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে টেলিগ্রামের বন্যা বইল। উত্তর আমেরিকার ইসরাইলি দূতাবাসসমূহের নিরাপত্তা কর্মকর্তা গুর অরিয়ের সঙ্গে কথা বললেন আইসার। নিউইয়র্কভিত্তিক গুর অরিয়ে ব্রুকলিনের ঠিকানা চেক করে আইসারকে জানালেন, ঠিকানা নির্ভুল এবং গারটনার পরিবারের বাস সেখানেই। ঐ জেলায় ব্যাপকভাবে সাতমার হাসিদিকদের বসবাস। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে এফবিআই'র সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুটিকে উদ্ধার করে ইসরাইলে পাঠাতে বলা হল।

গুর অরিয়ে এফবিআই'র সঙ্গে কথা বললেন এবং তাদেরকে সব তথ্য দিলেন। এফবিআই বলল, তোমরা যেহেতু সবই জান, তোমরা নিজেরা গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে আনছ না কেন? গুর অরিয়ে অনুমতিপত্র চাইলে এফবিআই তা দিতে আপত্তি করল।

প্রকৃতপক্ষে আমেরিকা অভিযান চালাতে ইতস্তত করছিল। তাদের প্রশ্ন, তোমরা কি নিশ্চিত অপহৃত শিশুটি ঐ ঠিকানায় রয়েছে? আমরা যদি অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে সেখানে না পাই তাহলে তার ভয়াবহ পরিণতির কথা কি তোমরা অনুমান করতে পারছ? এফবিআই আভাস দেয় কংগ্রেশনাল নির্বাচন সেখানে আসন্ন। সাতমার সম্প্রদায় হাজার হাজার ভোট সেখানে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রশাসন তাদের সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াতে চায় না।

এদিকে প্যারিসে আইসারের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম। মধ্যরাতে তিনি আমেরিকায় ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত হারমানকে ফোন করলেন। তিনি হারমানকে মার্কিন এটর্নি জেনারেল রবার্ট কেনেডীর সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করতে ফোনে নির্দেশ দিলেন। এ-ও বললেন, কেনেডিকে আমার নাম বলবেন এবং এফবিআই যেন এই মুহূর্তে শিশুটিকে ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করে।

রাষ্ট্রদূত হারমান বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললেন, আইসার, আপনি এভাবে কী কথা বলছেন। রাষ্ট্রদূত আইসারকে আভাস দেন, তাদের এহেন আলোচনা মার্কিন গোয়েন্দারা আড়ি পেতে যদি শুনে ফেলে তাহলে কূটনৈতিক সম্পর্ক যে সংকটে পড়বে? আইসার বললেন, আমি তো আপনাকেই এভাবেই একথা বলছি না। আমি অনেককেই একই কথা বলেছি।

আইসারের ধারণা ছিল, আমেরিকান প্রশাসন তার উত্তেজক কথাবার্তা শুনুক এবং পদক্ষেপ নিক। ওদিকে রাষ্ট্রদূত হারমান ভয় পাচ্ছেন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্টের। হারমানের উপদেশ শুনে আইসার বললেন, আমি আপনার মতামত শুনতে চাই না। একথা বলেই তিনি টেলিফোন কেটে দিলেন। এ-ও বলে ছাড়লেন, যদি তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিণতির জন্য তারাই দায়ী থাকবে।

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই আমেরিকায় তাদের কনস্যুলেট থেকে ফোন পেলেন আইসার। তাকে জানানো হল, রবার্ট কেনেডি অবিলম্বে অ্যাকশনে যেতে এফবি আইএ এজেন্টের একটি টিমকে অনুমতি দিয়েছেন। ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের নিয়ে তারা ব্রুকলিনে অভিযান চালায়। শিশুটিকে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়। এই শিশুটিই ইয়েসেলি।

এলিয়ে ওয়াইসেল তখন একজন তরুণ রিপোর্টার। তিনি ফোন করলেন গুর অরিয়েকে। জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটিকে নাকি উদ্ধার করা হয়েছে? গুর অরিয়ে শপথ নিয়েছিলেন, গোপনীয়তা রক্ষায়। তিনি এলিয়েকে শিশু উদ্ধারের কথা অস্বীকার করলেন। এলিয়ে ওয়াইসেল এই মিথ্যাচারের জন্য গুর অরিয়েকে কয়েক বছর ক্ষমা করতে পারেননি। এলিয়ে পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন।

১৯৬২ সালের ৪ জুলাই ইসরাইলে জাতীয় দিবস পালিত হয়। কেননা এদিন ইয়েসেলিকে প্লেনে করে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনা হয়। ইসরাইলের গণমাধ্যম তাদের সিক্রেট সার্ভিসকে বাহবা দিয়ে নানা প্রতিবেদন তৈরি করতে থাকে। এতে আরও বলা হয়, বিশ্বে ইসরাইল প্রথম দেশ যেখানকার সব মানুষের কাছে গোয়েন্দারা শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন। ইসরাইলের এক সুপরিচিত আইনজীবী কোহেন জিদন শিশুটি উদ্ধারের প্রশংসা করে বেন গুরিয়েনকে চিঠি দেন। বেন গুরিয়েন চিঠির উত্তরে লেখেন, আমাদের সিক্রেট সার্ভিসকে আপনার প্রশংসা করা উচিত। বিশেষ করে গোয়েন্দা বিভাগের মাথায় যারা বসে আছে। তারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা কোনো বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করেছে। বিশেষ করে জুনিয়ররা যখন এই মামলাটি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। পাচারকৃত এই ছেলেটিকে উদ্ধার ছিল সত্যিই এক কঠিন কাজ।

ইয়েসেলির উদ্ধারে সারা ইসরাইল যখন উৎসবমুখর আইসার তখনো প্যারিসে। সেখানকার গোয়েন্দারা আইসারের সম্মানে একটা পার্টি দেয়। সেখানে মোসাদ-প্রধান হারেল আইসারের দক্ষতার প্রভূত প্রশংসা করা হয়। ইসরাইল জানে তার দেশের জনগণকে কী ভাবে রক্ষা করতে হয়। আইসারকে কিছু উপহারও দেয়া হয়। ইয়েসেলির বিছানা নামের যে খাটিয়ায় আইসার বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন সেটি তার সহকারীরা ইসরাইলের উদ্দেশ্যে জাহাজে উঠিয়ে দেয়।

অবশেষে শিশু ইয়েসেলিকে উদ্ধারের মাধ্যমে সব সত্য কাহিনী প্রকাশিত হতে শুরু করে। একটি টেলিগ্রামের মাধ্যমে শুরু হয় পাচারপর্ব।

১৯৬০ সালের বসন্তকালে ইয়েসেলিকে যখন ইসরাইলের এক ইয়েশিভা থেকে আরেকটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন মেডেলিন তার বন্ধু রাব্বি মেইজিশের কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম পায়। টেলিগ্রামে তাকে অবিলম্বে জেরুজালেমে আসতে বলা হয়। মেডেলিন জেরুজালেমে এসে জানতে পারে তাকে একটি সিক্রেট মিশন চালাতে হবে। আর সেটি হল ইয়েসেলিকে ইসরাইলের বাইরে বের করে নিয়ে যেতে হবে।

মেডেলিন ফ্রান্সে ফিরে এসে তার পাসপোর্টে ঘষামাজা করে। তার ছেলের নাম ক্লাউডিয়ে থেকে ক্লাওডাইন করে। জন্মতারিখ ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল করে। সে তার নিজের নামও পরিবর্তন করে। সে গিয়োনা থেকে ইসরাইল অভিমুখী জাহাজে চড়ে।

গিয়োনা বসেই সে খেলা শুরু করে। এক ইমিগ্রান্ট পরিবারের আট বছরের একটি মেয়েকে সে নিজের মেয়ে হিসেবে দেখায়। ইটালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট চেক করে তার সঙ্গে আট বছরের একটি মেয়ে রয়েছে বলে ছাড়পত্র দেয়। ইসরাইলেও সে একই প্রক্রিয়ার অবতারণা করে।

এর কিছুদিন পর মেডেলিন ইসরাইলের লড এয়ারপোর্ট থেকে আট বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে বিমানে উঠে। পরিচয় দেয় নিজের মেয়ে। যে মেয়েকে নিয়ে সে ইসরাইলে ঢুকেছিল। প্রকৃতপক্ষে মেয়ের পোশাকের এই ছেলেটিই ইয়েসেলি।

ইয়েসেলি সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের আল্ট্রা অর্থোডক্স বোর্ডিং স্কুলে দু'বছর কাটায়। কিন্তু ইয়েসেলিকে নিয়ে যখন সারা ইসরাইলে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তখন তাকে মেআউক্সে নিয়ে যাওয়া যায়। সেখানে ইয়েসেলিকে সুইস বাবা-মা'র এতিম বলে ভর্তি করা হয়।

ইয়েসেলিকে আরেকবার মেয়ের সাজে সাজিয়ে আমেরিকা নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে তাকে সাতমার সম্প্রদায়ের প্রধান রাব্বি জোয়েল তাকে সাহায্য করেন। রাব্বি জোয়েল গারটনারকে ইয়েসেলিকে তাদের বাড়িতে আত্মীয় হিসেবে দীর্ঘদিন রাখতে নির্দেশ দেন। এ বাড়িতে তার নাম হয় ইয়ানকেলে। বলা হয় আর্জেন্টিনা থেকে এসেছে এবং গারটনারের কাজিন হয়।

মোসাদের শীর্ষ নেতারা উপসংহারে আসেন যে, আল্ট্রা অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের নেটওয়ার্ক আমেরিকা ইউরোপ জুড়ে বিস্তৃত এবং তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য। এবং মেডেলিনকে নিয়ে সম্প্রদায়ের লোকজন গর্বিত। অর্থাৎ এই সম্প্রদায়ের যে কোনো ষড়যন্ত্রে মেডেলিন অপরিহার্য। তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সে সব সময় তার হাত ব্যাগেই রাখে। মানুষ যেভাবে কাপড় বদলায় মেডেলিন সেভাবে পরিচয় বদলাতে পারঙ্গম। অর্থাৎ অর্থোডক্সদের বিশ্বে ফরাসি মেডেলিন মাতা হারি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইয়েসেলির উদ্ধারে সারা ইসরাইল জুড়ে যখন উৎসব তখন মেডেলিন তার দোষ স্বীকার করে। তার এক বন্ধুকে একথা সে বলে। সে আরও বলে, আমাদের যে লক্ষ্য ছিল তা থেকে আমি বিচ্যুত হয়েছি। আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।

মেডেলিন তার বুদ্ধিমত্তার কারণে মোসাদের শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। একজন চৌকস গোয়েন্দার সকল গুণই তার মধ্যে বিদ্যমান। আইসার তাকে মোসাদে চাকরি দেয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সে প্রস্তাব দিতে দেরি করে ফেলেন আইসার। মেডেলিন জেরুজালেমে ফিরে আল্ট্রা অর্থোডক্স সমাজে মিশে যান। তিন বছর পর সে রাব্বি আমরাম ব্লাউকে বিয়ে করে। ৭২ বছর বয়স্ক আমবরাম সব গোত্রের সর্বাধিক ফ্যানাটিকাল গ্রুপের প্রধান।

মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল ও ইয়েসেলির মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল নয় বছর পর। আইসারের ওপর লেখা একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে ইয়েসেলিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ইয়েসেলি ইসরাইলের ট্যাঙ্ক ডিভিশনে এখন কাজ করে। খুব ভালো চাকরি। ঐ অনুষ্ঠানে আইসারের সঙ্গে করমর্দনকালে সে ঘোষণা দেয় আইসার হারেল আমার জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আইসার ব্যতিরেকে আমি আপনাদের মাঝে কখনোই ফিরে আসতে পারতাম না।

📘 মোসাদ > 📄 টীকা

📄 টীকা


বিশ্বযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বেন গুরিয়ন হাগানাকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে। কোনো কারন ছাড়াই ইহুদিরা জেরুজালেমে দাঙ্গা বাধায়। ২ জুন জেরুজালেমের জাফা গেইটের বাইরে বাজারে ইরগুন বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমা হামলায় ৯জন আরব নিহত এবং বহু অহত হয়। ৮ জুন রাতে জেরুজালেমের উপর্যুপরি বোমা হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়। ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বেন গুরিয়ন প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ-বিরোধী সব তৎপরতা বন্ধ করে। এমনকি ইরগুনও তাদের ব্রিটিশবিরোধী অভিযান বন্ধ রাখে। জুইশ এজেন্সির তৎকালীন সভাপতি বেন গুরিয়ন সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ এ ঘোষণা করে, 'আমরা হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব এমনভাবে যেন শ্বেতপত্র (১৯৩৯ এর) নেই আর শ্বেতপত্রের এমনিভাবে বিরোধিতা করব যেন (হিটলারের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ নেই।' এজেন্সিটি সকল ইহুদিকে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্রিটিশদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানায়। যদিও ১৯৩৯ এর শ্বেতপত্র সরাসরি ইহুদিদের স্বার্থবিরোধী ছিল এবং ব্রিটিশদের দীর্ঘদিনের ইহুদি আশা আকাঙ্ক্ষার লালন ও পৃষ্ঠপোষকতার অবসান সূচনা করেছিল। ইহুদিরা সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিল যে জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রপক্ষের বিজয় ব্যতীত বিশ্বে ইহুদি অস্তিত্ব বজায় রাখা অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হবে।

ব্রিটিশদের যুদ্ধ প্রয়াসে সমর্থন ও সহযোগিতা করা ইহুদিদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়। ফলে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ সহায়ক বাহিনীতে ২৭,০০০ ইহুদি যোগ দেয় অথচ আরবদের মধ্যথেকে মাত্র ১২০০০ এইবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনীতে একটি ইহুদি ডিভিশন গঠন করার প্রশ্ন বেশ কিছুকাল বিবেচনাধীন ছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ একটি ইহুদি ব্রিগেড গঠন করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা ইহুদি কমান্ডো ইউনিটকে প্রশিক্ষণ দেয় যা পরে বিখ্যাত ইহুদি অভিঘাত বাহিনী (Shock troops) Palmach এর মূল্যধারের ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও ইহুদি স্বেচ্ছাসেবকদের নাশকতা, বিধ্বংসী কৌশল ও শত্রুর দখলকৃত এলাকায় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভাগ্যের পরিহাস এই যে, এই প্রশিক্ষণ পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শক্তিকে প্যালেস্টাইন থেকে উৎখাত করতে ইহুদিরা অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে।

১৯৪০ সালের মে মাসে উইনস্টন চার্চিল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ইহুদিদের প্রতি চার্চালের সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল সর্বজনবিদিত তাই তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয় যে অচিরেই হয়তো ১৯৩৯ এর শ্বেতপত্র বাতিল করা হবে। কিন্তু একই মাসে ইটালি জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে যুদ্ধক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি চলে আসে। চার্চিল বুঝতে পারেন যে, শ্বেতপত্রের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, আরব সহযোগিতা পাওয়া দুষ্কর হবে। তাই ব্রিটিশরা এমন এক সময় প্যালেস্টাইনে অভিবাসন কোটা বলবৎ করে যখন ইউরোপীয় ইহুদিরা জার্মান নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্যালেস্টাইনে পা রাখতে মরিয়া হয়ে উঠে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এবং ইহুদিদের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমান্বয়ে তীব্র আকার ধারণ সত্ত্বেও হাজার হাজার ইহুদি স্বেচ্ছাসেবক ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দেয়।

তারা অনুধাবন করে যে, চার্চিল ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও তারা প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্রিটিশদের সহায়তার ওপর আর নির্ভর করতে পারবে না। তারা আরো বুঝতে পারে যে, তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে যুক্তরাষ্ট্রেই ইহুদি রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করার সময় এসেছে। আমেরিকান ইহুদি অর্গানাইজেশন নিউইয়র্ক সিটির বিল্টমোর হোটেলে ইহুদিদের এক সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলন ১৯৪২ সালের মে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ওয়ার্ল্ড ইহুদি অর্গানাইজেশনের সভাপতি খাইম ওয়াইজম্যান, জুইশ এজেন্সির কার্যনির্বাহী সভাপতি বেন গুরিয়ন এবং নির্বাহী সদস্য নাহাম গোল্ডম্যান।

সম্মেলনে ৮টি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ঐ প্রস্তাবগুলি ইতিহাসে 'বিল্টমোর প্রোগ্রাম' নামে পরিচিত। প্রস্তাবে ১৯৩৯ সালের শ্বেতপত্র সমূলে প্রত্যাখ্যান করে। বালফোর ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য ও ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। এই প্রথমবার প্যালেস্টাইনে ইহুদি কমনওয়েলথ' প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। বালফোর ঘোষণার প্যালেস্টাইনে 'ইহুদি কমনওয়েলথ' বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো উল্লেখ ছিল না। ছিল না ইহুদিদের আবাসভূমি স্থাপনও কথা। ১৯২২ সালের শ্বেতপত্রে প্যালেস্টাইন নয় বরং প্যালেস্টাইনের একটি অংশে ইহুদি জাতির আবাসভূমি স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল।

বিল্টমোর প্রোগ্রামের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি রাজ্যের আইনসভায় প্রস্তাব পাশ করা হয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে দিয়ে এই প্রোগ্রামের সমর্থনে একটি বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেই জাইঅনবাদী কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধান সহায়ক বহিঃশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার তৎপরতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিদের কবজায় থাকা বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রচার মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে দ্রুত তাদের প্রভাব বলয় সৃস্টি করতে সক্ষম হয়। এই প্রভাব বলয়কে ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত করে ইহুদিদের লক্ষ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা শুরু হয়।

প্যালেস্টাইনে ইহুদি পাচার তৎপরতায় আরো অনেক ইহুদির সলিল সমাধি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৪০ এর ২৫ নভেম্বরের Patria বিপর্যয় উল্লেখযোগ্য। অবৈধভাবে প্যালেস্টাইনে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে আগত ১৮০০ ইহুদি হাইফা বন্দরে পৌঁছলে তাদেরকে মরিসাসের ডিটেনশন কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য Patria নামের একটি জাহাজে উঠানো হয়। জাহাজটি যখন মরিশাস যাওয়ার অপেক্ষা করছিল তখন তাদেরকে প্যালেস্টাইনে থাকার অনুমতি দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিল। সাধারণ ধর্মঘট করে হাইফা বন্দর অচল করেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বদলাতে না পেরে জাহাজটি যাতে বন্দর ত্যাগ না করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে হাগনার এজেন্টরা জাহাজটিকে অকেজো করার জন্য বোমা পেতে রাখে। হাগানার পোঁতা বোমার বিস্ফোরণ ক্ষমতার হিসাব ভুল করায় বোমাটি বিস্ফোরণের পরে মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে জাহাজটি সম্পূর্ণরূপেড নিমজ্জিত হয়ে যায়। জাহাজের খোলে আটকে পড়া যাত্রীদের সকলকে এতেঠ অল্প সময়ে উদ্ধার করা যায়নি। এই ঘটনায় ২৬০জন ইহুদির মুত্যু ঘটে।

১৯৪২ এর অক্টোবরে জেনারেল মন্টগোমারী আল-আলামিনে জার্মানদের পরাজিত করে। এর মাধ্যমে জার্মানদের মিশর দখল অভিযান ব্যর্থ হয়। এরপর জার্মান ও ইটালিয়ানদের উভয় আফ্রিকা অভিযানও সমাপ্তি ঘটে যখন ১৯৪৩ সালে ১৩ জার্মান আফ্রিকার মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্যালেস্টাইন হিটলার বাহিনীর হুমকিমুক্ত হয়। ইতিমধ্যে হিটলারের ইহুদি নিধন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ হতে থাকে। হিটলারের ইহুদি নিধন কেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে ইহুদিদের নিজ বাহু বলের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কোনো বৃহৎ শক্তি ইহুদি রাষ্ট্র সাজিয়ে ইহুদিদের উপহার দেবে না।

জুইশ এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে প্যালস্টাইনে ছিল সবচেয়ে বড় ইহুদি বেসামরিক বাহিনী হাগানা। সেখানে ছিল ২০০০০০ সৈন্যসহ বিশেষ বাহিনী পালমাখ এবং ব্রিটিশদের দ্বারা প্রশিক্ষিত প্রায় ২৫,০০০ আধা সামরিক বাহিনী। জুইশ এজেন্সির নেতা বেন গুরিয়ন ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তার বাহিনীকে ব্রিটিশদের সহায়তায় নিয়োজিত রেখেছিল। কিন্তু সন্ত্রাসী দল ইরগুন এবং এই দল থেকে বেরিয়ে আসা স্টার্ন গ্যাং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কিছুটা নিম্ন মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। ইরগুন কমান্ডার জাবতনিস্কি ১৯৪০ সালে হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন এবং স্ট্যার্ন গ্যাং নেতা আব্রাহামকে ব্রিটিশ বাহিনী হত্যা করে ১৯৪২ সালে।

বেগিনের জন্মগ্রহণ পোল্যান্ডের ব্রেস্ট লিটভস্কে এবং প্রথম জীবনে জাবতনিস্কির সংশোনবাদীতে দীক্ষা নেয়। সোভিয়েত বাহিনী পোল্যান্ড দখল করার পর বেগিনকে ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪১ সালে স্ট্যালিনের সাথে পোলিশ জেনারেল সিকরস্কির সমঝোতা হবার পর বেগিন কারামুক্ত হয়ে পোলিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। পরবর্তীকালে জাবতনিস্কির ব্রিটিশ-ঘেষা নীতিকে যথেষ্ট আক্রমণাত্মক নয় বিবেচনা করে নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধের ধারণা নিয়ে ১৯৪২ সালে পারস্য হয়ে প্যালেস্টাইনে আসে। তার মতে আরবরা প্যালেস্টাইনে জবরদখলকারী এবং ব্রিটিশরা তাদের সহযোগী। প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই দুই পক্ষের বিরুদ্দে যুগপৎ যুদ্ধ করতে হবে। আরব এবং ব্রিটিশ উভয়কেই প্যালেস্টাইন থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ইসরায়েলের একজন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী (১৯৭৮-১৯৮৩) মেনাখেম বেগিন ইরুগুন বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হয় ১৯৪৪ সালে।

মেনাখেম বেগিন প্যালেস্টাইনে পৌঁছেই ইরগুন বাহিনীকে সক্রিয় করতে শুরু করে। ইরগুন থেকে বেরিয়ে গিয়ে আব্রাহাম স্টার্ন এর নেতৃত্বে লেহী (ইসরায়েলের স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ) গঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইরগুন ব্রিটিশদের সাথে যোগ দিলেও লেহী বা স্টার্ন গ্যাং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের নিজস্ব বিদ্রোহ চালিয়ে যাচ্ছিল। বেগিন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের প্রথম চ্যালেঞ্জ করে অক্টোবর ১৯৪৩ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আল- আকসার পশ্চিম দেয়ালের সামনে সোফার ফুঁকিয়ে। ব্রিটিশ পুলিশ আক্রমণ করে তাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে। পরের বছর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মনোভাব পরীক্ষা করার জন্য বেগিন আবার 'সোফার' ফুৎকারের আদেশ দেয়। এবার ব্রিটিশ পুলিশ সংযত থাকে। বেগিন এটাকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ভেবে তার বাহিনীকে ব্রিটিশদের ওপর আক্রমণনির্দেশ দেয়। ব্রিটিশ সরকারের ট্যাক্স অফিস, ইমিগ্রেশন অফিস ও পুলিশ স্টেশনের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। সেপ্টেম্বর, ১৯৪৪ এ ইরগুন জেরুজামেলের পুলিশ স্টেশনগুলিতে হামলা চালিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একজন সিআইডি কর্মকর্তা যখন শহরের রাস্তায় হাঁটছিলেন তখন তাকে হত্যা করে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বেগিনকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০,০০০ পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করে। বেগিন লম্বা দাড়িওয়ালা তালমুদ পণ্ডিতের ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্মগোপনে থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে। ১৯৪৪ সালের শেষের দিকে ইরগুন প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হ্যারল্ড ম্যাকমাইকেলকে জেরুজালেমের রাস্তায় দুইবার হত্যা প্রচেষ্টা চালায়। ঐ বছরই ইরগুন নভেম্বর কায়রোতে ব্রিটিশ স্টেটমন্ত্রী ও চার্চিলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লর্ড ময়নীকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডে জুইশ এজেন্সি নিন্দা জানিয়েছিল। কিন্তুএর ফলে উইনস্টন চার্চিল যিনি ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তিনিও তীব্র সমালোচনা করে।

সন্ত্রাস

সন্ত্রাসের দিক থেকেও ইহুদিরা শ্রেষ্ঠ ১ নভেম্বর ১৯৪৫ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হাগানা, ইরগুন ও লেহী তাদের প্রথম সম্মিলিত সন্ত্রাসী আক্রমণ পরিচালনা করে। ঐ রাতে হাগানা ইউনিটসমূহ একই সময়ে সারা দেশের রেল সিস্টেমের ১৫৩টি স্থানে নাশকতা করে এবং হাইফা ও জাফা বন্দরের দুটি টহল লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়।, ইরগুন ও লেহীর একটি যৌথ ইউনিট লিড্ডায় প্রধান রেলস্টেশনে হামলা চালায়। এই অভিযানকে আখ্যায়িত করা হয় 'Night of The Trains নামে। জবাবে ব্রিটিশ সরকার হাগানা দমনের নির্দেশ দেয়। বহু ইহুদি নেতাকে আটক করা হয়। বেন গুরিয়ন তখন বিদেশে থাকায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন হাগানা দমনে ব্যস্ত তখন ইরগুন ও লেহী মেনাখেম বেগিনের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সন্ত্রাসী আক্রমণ চালায়। জেরুজালেমের রুশ প্রাঙ্গণের জার আমলে নির্মিত বিশাল হোস্টেলগুলিতে প্যালেস্টাইনের পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স স্থাপন করা হয়েছিল। দুর্গসম এই রুশ প্রাঙ্গণ ইরগুন আক্রমণের প্রিয় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৫ তারা রুশ প্রাঙ্গণে অবস্থিত সিআইডি সদরদপ্তর উড়িয়ে দেয়। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে ধ্বংস করে একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত জেলখানা।

২৭ জুন ১৯৪৬ সালের হাগানা প্যালেস্টাইন ও প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে যোগাযোগের ১১টি সেতুর মধ্যে ১০টি সেতু ধ্বংস করে। ব্রিটিশরা দুই সপ্তাহব্যাপী এক অভিযান শুরু করে। সারা দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে ১৭,০০০ সৈন্য নামিয়ে সারাদেশের ইহুদি বসতি, যৌথ খামার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র ও দলিলাদি উদ্ধার ও নেতাদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযান সন্ত্রাসী দলের কোনো বড় অধিনায়ক গ্রেফতার বা অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ইহুদিদের বেতনভুক্ত গুপ্তচরদের তৎপরতায় হাগানা এই অভিযানের খবর পূর্বাহ্নেই পেয়ে যায়। এর ফলে ব্রিটিশদের এই বিশাল অভিযান ফল লাভে ব্যর্থ হয়। ইহুদিদের সাবাৎ-এর দিন অর্থাৎ শনিবারে শুরু হওয়া ব্রিটিস কর্তৃপক্ষের এই অভিযানকে ইহুদিরা 'ব্ল্যাক সাবাৎ' নামে অভিহিত করে থাকে।

ইরগুনের সবচেয়ে চমকপ্রদ আক্রমণছিল জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলের ওপর। কিং ডেভিড হোটেল ছিল জেরুজালেমের প্রথম ও সর্ববৃহৎ বিলাসবহুল হোটেল। ১৯৩৮ সাল থেকে এই হোটেলের দক্ষিণ উইংয়ে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ বাহিনীর সদরদপ্তরের একটি অংশ ও ম্যান্ডেট সরকারের সচিবালয় অবস্থিত ছিল। মেনাকেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন ইরগুন ২২ জুলাই ১৯৪৬ হোটেলে বোম হামলা চালায়। ঐ দিন ভোরে ২০ জন ইহুদিসন্ত্রাসী আরব পোষাক পড়ে একটি লরি থেকে কয়েকটি দুধের বড় ভাও নামিয়ে হোটেলের বেইজমেন্টে রাখে। প্রকৃতপক্ষে এই দুধের ভাণ্ডগুলিতে ৩৫০ কেজি বিস্ফোরক ভর্তি ছিল। কাছে দাঁড়ানো একজন ব্রিটিশ অফিসার মেজর ম্যাকিন্টশ আগন্তুকদের সন্দেহজনক দেখে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে আগন্তুকদের একজন তাকে গুলি করে হত্যা করে। বেইজমেন্ট থেকে বের হওয়ার গেটে আরেক পুলিশ গার্ডও একই ভাগ্য বরণ করে। তখন গার্ড এবং সন্ত্রাসীদের মধ্যে গুলি বিনিময় শুরু হলে কয়েকজন সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়, কিন্তু সকলেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরই মধ্যে হোটেলের বেইজমেন্টে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে হোটেলের দক্ষিণ উইং এর পশ্চিমের অংশ সম্পূর্ণভাবে ধ্বসে পড়ে। আক্রমণে ৯১ জন মৃত্যুবরণ করে এবং ৬০ জন আহত হয়। মৃতদের মধ্যে ২৮ জন ব্রিটিশ, ৪১, জন আরব, ১৭ জন ইহুদি ও অন্যান্য জাতিসত্তার ৫জন।

হোটেলে বোমা হামলা ছিল ব্রিটিশ ম্যান্ডেট সরকারের বিরুদ্দে পরিচালিত সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণহানিকর হামলা। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট সরকার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনে যে অভিযান চালিয়েছিল এই হামলা তারই চরম ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে। অপরদিকে, কিং ডেভিড হোটেলের মতো একটা নিরাপত্তা বেষ্টনি এলাকার অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক জড়ো করে তা সাফল্যের সাথে বিস্ফোরণ ঘটানোর মধ্যে ইহুদি সন্ত্রাসী গ্রুপের সাংগঠনিক শক্তি ওসন্ত্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষমতার প্রমান ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর দায়ী ব্যক্তিদের ধরার জন্য তেলআবিব শহরে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। সামরিক কারফিউ, যখন তখন ইহুদিদের দেহ ও বাসস্থান তল্লাশি, রাস্তায় পদ্রপ্রতিবন্ধক স্থাপন এবং গণগ্রেপ্তারের পরও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রকৃত দোষীদের সনাক্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে, ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনীর এসকল কার্যক্রমের কারণে সাধারণ ইহুদি সমাজে ম্যান্ডেট সরকারের গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের পর্যায়ে চলে যায়, যা ছিল ইরগুণের অন্যতম লক্ষ্য।

সারা বিশ্বে এই ঘটনার প্রতিবাদের ঝড় উঠে। পশ্চিমা জগতে ইহুদিদের বিরুদ্দে নাৎসি বীভৎসতার কারণে যে সহানুভূতির আবহ সৃস্টি হয়েছিল এই হামলায় নির্দোষ সাধারণ মানুষের হত্যাযজ্ঞের কারণে সেই সহানুভূতিতে ভাটা দেখা দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে ইহুদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তীব্র ভাষায় এই আক্রমণের নিন্দা জানায় হাগানা, ইরগুন, ও লেহী গঠিত ০০০ অকার্যকর করে দেওয়া হয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইরগুন ও লেহীর সাথে তাদের দূরত্ব সৃষ্টির দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেয়। যদিও পরবর্তীকালে এটা প্রমাণিত হয় যে হাগানা সদর থেকে লিখিত নির্দেশ পেয়েই ইরগুন কিং ডেভিড হোটেলে আক্রমণ চালিয়েছিল। অ্যাংলো আমেরিকান কমিটির অন্যতম সদস্য ব্রিটিশ লেবার পার্টির এম. পি. রিচার্ড ক্রসম্যানকে এই ঘটনার কিছুদিন পরে ইহুদি নেতা ও পরবর্তীতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট ড. খাইম ওয়াইজম্যান বলেছিলেন, 'আমি আমার এই ছেলেদের (ইরগুন) নিয়ে গর্বিত না হয়ে পারি না। এটা (কিং ডেভিড হোটেল) যদি একটা জার্মান সদর হত তাহলে তারা ভিকটোরিয়া ক্রস (যুদ্ধে বীরত্বের জন্য সর্বোচ্চ ব্রিটিশ সামরিক মেডেল)।

এই হামলা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও ইহুদিদের মধ্যে সংগাত চরম পর্যায়ে পৌছে দেয়। ব্রিটিশ সেনা ও ইহুদি বেসামরিক ব্যক্তিদের সামাজিক মেলামেশা সীমিত হয়ে যায়। ব্রিটিশদের প্যালস্টাইন ম্যান্ডেট চালিয়ে যাওয়ার স্পৃহা কমিয়ে দেয় এবং তাদের প্যালেস্টাইন ত্যাগ ত্বরান্বিত করে। প্যালেস্টাইনে আসন্ন যুদ্ধের কথা সকলের মুখে মুখে আলোচিত হতে থাকে। জেরুজালেমের সামাজিক জীবনে যেন একটি অদৃশ্য পর্দা নেমে আসে। ইহুদিরা আসন্ন নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের গুজবে আতঙ্কিত দিন কাটাতে থাকে। জেরুজালেম থেকে বিট্রিশ বেসামরিক ব্যক্তিদের অপসারণ করা হয় নিরাপত্তার কারণে। ঘটনার দুই মাসের মধ্যে প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট সরকারের চিফ সেক্রেটারি স্যার জন শ'কে ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোর হাই কমিশনার পদে বদলি করা হয়। জনকে ত্রিনিদাদে পৌঁছা মাত্রই ইরগুন তাকে পত্র বোমা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। তারা অক্টোবরে রোমে ব্রিটিশ দূতাবাসে আক্রমণ চালায়। একজন ইরগুন সন্ত্রাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরগুন ১ মার্চ ১৯৪৭ সালে জেরুজালেম গোল্ডস্মিথ অফিসার্স ক্লাব উড়িয়ে দেয়। এতে ১৩ জন নিহত এবং আহত হয় ১৮জন।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরগুনের একটি প্রিয় কৌশল ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের অপহরণ করে জিম্মি হিসেবে বন্দি রেখে বিভিন্ন দাবি আদায় করা। এই ধরনের প্রথম অপহরণের ঘটনা ঘটে ২৭ জানুয়ারি ১৯৪৫। তেলআবিব আদালত কক্ষ থেকে বিচারক উহন্ডহ্যামনকে অপহরণ করা হয়। ইহুদি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে তাকে ফেরত দেওয়া হয়। একই বছর ১৮ জুন তেলআবিব অফিসার্স ক্লাব থেকে ৫জন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও রয়েল এয়ার ফোর্সের একজন এয়ারম্যাসকে অপহরণ করা হয়। অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে কারাগারে বন্দি দুইজন ইহুদিকে মুক্ত করার বিনিময়ে চার দিন পর দু'জন অফিসারকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকিদের ছাড়া হয় দু'জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ইরগুন সন্ত্রাসীর মৃত্যুদণ্ড শাস্তি কমিয়ে কারাদণ্ড দেওয়ার পরে। ১৬ জুন ১৯৪৭ এক জেলখানা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করার অপরাধে দুজন ইহুদি সন্ত্রাসীকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১২ জুলাই ব্রিটিশ ফিল্ড সিকিউরিটির দুজন কর্মকর্তাকে অপহরণ করা হয়। দুই সপ্তাহ অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই ২জন কর্মকর্তার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। ২ জুলাই দুই ইহুদি বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দুইদিন পর ৩১ জুলাই অপহৃত দুইজন কর্মকর্তাকে ইরগুন গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করে। অফিসার দুজনকে যেখান থেকে অপহরণ করা হয়েছিল গিয়ে দেখা গেল গাছের চারদিকে মাইন পুঁতে রাখা। মৃতদেহের মধ্যেও 'বুবি ট্র্যাপ' ছিল। একটি মৃতদেহের দড়ি কেটে নামানোর পর মৃতদেহের ভিতরে ঢুকানো 'বুবি ট্র্যাপ' বিস্ফোরণ ঘটে। মৃতদেহ উদ্ধারকারী একজন ব্রিটিশ সৈন্য মারাত্মকভাবে আহত হয়।

২৮ জুন ১৯৪৭ ইরগুন হাইফার একটি রেস্টুরেন্টে আক্রমণ চালায়। হাইফার এস্টোরিয়া রেস্টুরেন্টে কতিপয় ব্রিটিশ আর্মি অফিসার নৈশভোজরত ছিলেন। দুজন ইহুদি সন্ত্রাসী রেস্টুরেন্টের বিপরীত দিকে অবস্থান নিয়ে সাবমেশিনগান নিয়ে শুরু করে রেস্টুরেন্টের ওপর গুলিবর্ষণ। ৯ম প্যারাসুট ডিভিশন ক্যাপ্টেন কিসানে তৎক্ষণাৎ নিহত এবং অন্য দুজন অফিসার আহত হন। অন্য অফিসাররা যারা আহত হননি তারা পাল্টা গুলি শুরু করলে ইহুদি সন্ত্রাসীরা পশ্চাদপ্রসারণ করে।

১০০জন ইহুদি যে পরিমাণ সন্ত্রাস না করে ১জন ইহুদি সেই পরিমাণ সন্ত্রাস করে।

ইহুদি রাষ্ট্র

যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মদদে প্যালেস্টাইনে ইহুদি বাসভূমির ঠিকানার ভিত তৈরি হলেও এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হঠাৎ করেই নীতি পরির্তন করে। এতে ইহুদি কূটনীতিকে সংকটে ফেলে দেয়। জুইশ এজেন্সি ও আমেরিকার জাইঅনবাদীরা খাইম ওয়াইজম্যানকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এই সংকট সমাধানের জন্য জরুরি অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমত পক্ষে আনার ক্ষেত্রে খাইম ওয়াইজম্যানের বিকল্প ছিল না। ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে ব্রিটিশদের সহায়তার প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ ব্যাপক হারে ইহুদি অভিবাসন সম্ভব হয়েছিল। ইহুদিরা সেই রাষ্ট্র স্থাপনের দ্বারপ্রান্ত এসে যায়। এখন পরিস্থিতি বদলে যাবার আগেই সর্বোচ্চ কূটনেতিক প্রভাব খাটিয়ে প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যতটা সম্ভব ত্বরান্বিত করে অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা সৃষ্টি করতে হবে। জাইঅনবাদীরা ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্যালেস্টাইনে যে নীতি অনুসরণ করছিল তা খাইম ওয়াইজম্যানের ভাষায় চমৎকার ফুটে উঠেছে। প্যালেস্টাইনের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে 'আমার কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে পিছু হটা হবে মারাত্মক। আগের মতোই, এখন আমাদের একমাত্র সুযোগ হচ্ছে বাস্তবতা সৃস্টি করা, তা নিয়ে পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়া এবং তার ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।'

খাইম ওয়াইজম্যান প্রথমে ব্রিটেনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের ওপর বেশি প্রভাব খাটাতে সক্ষম হয়েছিলো। মূলত তারই প্রয়াসে ১০০ বছর আগে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বালফো ঘোষণা করেছিল, যা ছিল প্যালেস্টাইনে ইহুদি বাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি কোনো বিশ্বশক্তির প্রথম আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার। প্রথম মহাযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য ম্যান্ডেটরি কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে মর্মে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাও ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি আলোচনায় ইহুদি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে ওয়াইজম্যানের কূটনৈতিক দক্ষতার ফসল। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে 'প্যালেস্টাইন পার্টিশন প্ল্যান' অনুমোদনের পেছনেও ওয়াইজম্যানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াইজম্যান প্রথমবার ১৯২১-১৯৩১ এবং দ্বিতীয়বার ১৯৩৫-১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওয়াইজম্যানের ব্রিটিশঘেঁষা নীতি এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্দে সন্ত্রাসী আক্রমণের বিরোধিতা কারণে তিনি ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গানাইজেশনে কোনোঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৪৬ এর কংগ্রেসে অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি প্রেসিডেনেটর পদ হতে বাদ পড়েন এবং বেন গুরিয়নকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৪৭ এর ২৯ নভেম্বর জাসিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্যালেস্টাইন পার্টিশন প্ল্যান অনুমোদিত হওয়ার পর ওয়াইজম্যান ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব সমাপ্ত হয়েছে ধারণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে কিছুদিন অবস্থানের পর প্যালেস্টাইনে তার প্রতিষ্ঠিত ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৮ এর জানুয়ারি মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্যালেস্টাইন নীতি তথা প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের নীতি পরিবর্তনের আভাস লক্ষ্য করতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশেষকওের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সন্দিহান হয়ে পড়েন যে প্যালেস্টাইনের জাইঅনবাদীরা আরব রাষ্ট্রসমূহের আক্রমণেরমুখে টিকে থাকতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে ওয়াইজম্যান যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি ও সকল ধর্মের প্রতি সমহানুভূতিশীল নেতাদের সাথে শলাপরমার্শ শুরু করেন। সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং জাতিসংঘের সদস্যদের প্রতিনিধিদের সাথে প্যালেস্টাইনের পার্টিশন বিষয়ে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনো সিকিউরিটি কাউন্সিলের বৈঠকে পার্টিশন প্ল্যানের সমর্থনে প্রস্তাব পাশ করা সম্ভব হয়নি। ৪৭ এর ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান প্যালেস্টাইন পার্টিশনের পক্ষে তার অবস্থানের কথা ওয়াইজম্যানকে জানিয়েছিলেন। ওয়াইজম্যান আমেরিকান প্রেসিডেন্টের এই কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি। তিনি মন্তব্য করেনে, 'যাই হোক আমি সন্দিহান তিনি জোনেন কিনা স্টেট ডিপার্টমেন্ট তারই অধস্তনরা কি পরিমাণে তার নীতি ও উদ্দেশ্যকে বাধ্যগ্রস্ত করছে।'

তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি প্রশাসন ছিল খুবই দুর্বল। ঐ বছরই নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্ভাব্য ফল সম্ভাব্য সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান পুনঃনির্বাচিত হবেন না। তাই রাষ্ট্রপতি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যে অনেক বিষয়েই সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছিল। প্যালেস্টাইন বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ও স্টেট ডির্পাটমেন্টের মতদ্বৈততা প্রকট হয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল। ১৯ মার্চ জাসিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনেটর অস্টিন প্যালেস্টাইনে বিবদমান পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধ-বিরতি করা এবং ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব করে যাতে ১৫ মে, ১৯৪৮ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের পূর্বেই ওসি পরিষদের অধীনে প্যালেস্টাইনের নতুন সরকার গঠন সম্ভব হয়।

ওয়াইজম্যান যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে পক্ষে আনতে না পারলেও ইহুদি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে এবং তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকায় এটা ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্যালেস্টাইনে যে ট্রাস্টিশিপ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে তা বাস্তবায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত তিন লক্ষ সেনা প্যালেস্টাইনে মোতায়েন করতে হবে। ২য় মহাযুদ্ধ-পরবর্তীকালে আমেরিকান জনগণের নিকট এই সম্ভাবনা মোটেই আকর্ষণীয় ছিল না।

শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুসারে প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব স্থগিত রেখে অন্তর্বর্তীকালের জন্য সমগ্র ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইন ট্রাস্টিশিপ সরকার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি। ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বিস্তারিত ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাব সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পেশ করে। সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য ১ম কমিটিতে প্রেরণ করে। ২০ এপ্রিল হতে ১ম কমিটিতে প্রস্তাবটির ওপর বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্য হতে প্রতীয়মান হয় যে, প্রস্তাবটি খুব সহজে অনুমোদিত হবে না। বিশেষকরে প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের সামরিক অগ্রগতি, লক্ষ লক্ষ আরবদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হওয়া এবং প্যালেস্টাইনের সার্বিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের কো সদস্য রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণে আগ্রহ দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাবের প্রতি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সাধারণ পরিষদকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল যে, ১৫ মে যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্টাইনে শান্তিরক্ষায় কোনো ভূমিকাই পালন করবে না। এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাতিসংঘ ১৫ মে'র আগে কোনোক্রমেই ট্রাস্টিশিপ প্রস্তাবের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। সিকিউরিটি কাউন্সিল ১ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। বিবাদমান কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি' পালনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ওয়াইজম্যান ও জাতিসংঘে তাদের প্রতিনিধিদল নিশ্চিত হয়েছিল যে, জাতিসংঘের ২ নভেম্বর, ১৯৪৭ প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব রহিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তারা প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঘোষণার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলে এবং ১৫ মে'র পূর্বেই তা বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাই ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার সাথে সাথেই যাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক বৃহৎ শক্তি ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বীকৃতি দেয় ওয়াইজম্যান সে বিষয়টি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার সাথে সাথেই যেন তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় সেই অনুরোধ জানিয়ে ওয়াইজম্যান ১৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির নিকট পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ১৫ মে মধ্যরাতে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের সাথে সাথেই ইহুদি রাষ্ট্রের সরকার সীমানায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণকে রক্ষা করার সকল ব্যবস্থা করবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বিশ্বের সকল দেশের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করবে। 'আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আপনার নেতৃত্বে যে যুক্তরাষ্ট্র একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান বের করার জন্য এতো কিছু করেছে সেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন ইহুদি রাষ্ট্রকে অতি দ্রুত স্বীকৃতি দান করবে। আমি মনে করি পৃথিবী এটাই যথাযথ মনে করবে যে সবচেয়ে মহৎ প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ সবচেয়ে নতুন (গণতান্ত্রিক) দেশকে সর্বপ্রথম জাতিসমূহের পরিবারে বরণ করে নেবে।' প্রেসিডেন্ট ট্রম্যান ওয়াইজম্যানের অনুরোধ রেখেছিলেন। তেলআবিবে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার ১১ মিনিটের মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঘোষণা: প্যালেস্টাইনের অধিকাংশ ইহুদির কাছে ইহুদি রাষ্ট্রের শুরু হয়েছিল ২৯ নভেম্বর ১৯৪৭ যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের স্বীকৃতি লাভ করে। ব্রিটিশদের ম্যান্ডেট অবসানের তারিখ ঘোষণার ফলে ইহুদিদের নিকট এটা ছিল সময়ের ব্যাপার যে সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে আইনগতভাবে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট কর্তৃপক্ষে ম্যান্ডেট অবসানের তারিখ ঘোষণার পর থেকে তাদের ১ লক্ষ সেনাকে নিরাপদে প্যালেস্টাইন থেকে প্রত্যাহারের জন্য যতটুকু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা প্রয়োজন শুধু তার মধ্যে সরকারের কার্যক্রম সীমিত রেখেছিল। ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত এলাকায় রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ সকল রাষ্ট্রীয় পরিষেবা জুইশ এজেন্সি দিয়ে আসছিল।

প্রস্তাবিত ইহুদা রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে ইহুদিদের ক্ষমতা সুসংহত করার উদ্দেশ্যে যা যা করণীয় তা সবই তারা করেছিলেন। কিন্তু প্যালেস্টাইন বিভাগের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রর নীতির হঠাৎ করে 'উল্টো যাত্রা' তাদের নেতৃত্বকে বিচলিত করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে পূর্ব-সিদ্ধান্ত অনুসারে যথাসময়ে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেটের শেষের দিকে ব্রিটিশদের ছেড়ে যাওয়া শূন্যতাকে পূরণের কাজ করার জন্য ৩৭ সদস্যের একটি গণপরিষদ গঠন করে। এই পরিষদে সকল দল ও মতের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এটা ইহুদি রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক আইনসভার দায়িত্ব পালন করছিল। এছাড়া বেন গুয়িরনের নেতৃত্বে ১৩ সদ্যসের জাতীয় প্রশাসন গঠন করা হয়, যা কার্যত মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পালন করেছিল। জাতীয় প্রতিরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ উপেক্ষা করে জাতীয় প্রশাসন সৃষ্টি করে কার্যথ ইহুদি রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে।

১২ মে জাতীয় প্রশাসনের রাতব্যাপী সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২ দিন পর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। প্যালেস্টাইনের চলমান যুদ্ধের অবস্থা এবং ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার পর আবর রাষ্ট্রসমূহের নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার কৌশল ও ক্ষমতা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা উপক্ষো করে রাষ্ট্র ঘোষণা করার পরিণতি শিশু রাষ্ট্রের জন্য কী হতে পারে এটা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক হয়। যথাসময়ে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণা না করে হলে প্যালেস্টাইনে ইহুদি অধিবাসীদের ও যোদ্ধাদের মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে বলে যুক্তি তুলে ধরা হয়। এই সভা চলাকালে টেলিফোনে ওয়াইজম্যানের মতামত চাওয়া হলে ওয়াইজম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠেন, What are they waiting for. idiots? 'বোকারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছে?' তিনি অবিলম্বে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মতো জানান। সারা রাত আলোচনার পর জাতীয় প্রশাসন ৬ এবং ৪ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

রাষ্ট্রের নাম কী হবে তা নিয়েও সর্বশেষে বিতর্ক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম Eretz Israel' (ইসরায়েলের দেশ), 'জাইঅন', 'যুদা', 'জাইঅনা,' ইব্রিয়া', (ইব্রাহিমের দেশ) 'হার্জলিয়া' (হার্জেলের দেশ) নাম প্রস্তাব করা হয়। প্রথম চারটি নামের প্রস্তাব নাকচ করা হয় এই কারণে যে, এই নামগুলি ইহুদি রাষ্ট্রের বাস্তবতার সাতে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ নয়। Eretz Israel' এর 'ঐতিহাসিক ধারণাগত' সীমায় প্যালেস্টাইন, ট্র্যান্সজর্ডন, লেবানন, সিরিয়র অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্য নাম তিনটি সাধারণ জেরুজালেমের অপর নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু জেরুজালেমের ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নেই।

সর্বশেষ, বেন গুরিয়ন রাষ্ট্রের নাম 'ইসরায়েল' প্রস্তাব করলে তা ভোটে গৃহীত হয়। ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষণার মাত্র কয়েক মিনিট আগে রাষ্ট্রের নাম নির্ধারণ করা হয়। প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার করা হবে ১৬ এই মর্মে ঘোষণা ছিল ওয়ার্ল্ড জাইঅনিস্ট অর্গনাইজেশনের। ম্যান্ডেট অবসানের পরের দিন এই ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল। প্রকৃতপক্ষে ঘোষণা ওদয়ো হয়, ১৪ই মে বেলা ৪টার। প্যালেস্টাইনের ব্রিটিশ হাইকমিশনার ১৪ মে রাত ১২-০১ মিনিটে হাইফা বন্দর থেকে নোঙর তুলে প্যালেস্টাইন থেকে বিদায় নেন এবং এর সাথেই প্যালেস্টাইনে নব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান হয়। এর আট ঘণ্টা আগে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা করা হয়। ইসরায়েল রাস্ট্র ঘোষণার তারিখ ও সময় গোপন রাখা হয়েছিল গোষণা অনুষ্ঠানের সিরাপত্তার স্বার্থে এবং শত্রুকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। আরেকটি বড় কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অতি উৎসাহের কারণে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ঘোষণা ব্যহত করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই ইহুদি উঠেস্ট্রকে বাস্তব সত্য পরিণত করা।

ইহুদিধর্ম

যা ধারণ করা যায় তাহাই ধর্ম। আজ ধর্মের সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। পৃথিবীতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত বহুবিধ আচার-আচরণ, দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা, সামাজিক আচরণেরপ নীতিমালা, জীবন-বিধান, ন্যায়-অন্যায় বিধি, পবিত্রতা বিধান ইত্যাদির প্রতি আনুগত্যতাকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিকগণ বিভিন্ন মাত্রা অবলম্বন করে ধর্মের সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছেন। তবে মানবজীবন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আছে যা পুনঃপুন" ঘটনশীল, অটল এবং অসহনীয় যেগুলি মোকাবিলা করতে ধম, এবং বিশ্বাস আমাদের সাহায্য করে। কেন এবং কিভাবে জগতসংসার সৃষ্টি হয়েছে ধর্ম আমাদের কিছু ধারণা ও তত্ত্ব দিয়ে থাকে যা আমাদের মানসিক ধারণশক্তির সীমাবদ্ধতা উত্তরণের সহায়ক হয়। সংখ্যার দিক থেকে ইহুদি ধর্ম খুব ছোট ধর্ম।

'আধুনিক প্রেক্ষাপটে 'ইহুদি ধর্মকে' একটি ধর্ম হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে সনাতন ইহুদিগণের মধ্যে বেশ আপত্তি লক্ষণীয়। তারা মনে করেন, তাহলে ইহুদিধর্মের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। ইসলাম খ্রিস্ট অথবা বৌদ্ধধর্মের সাথে এক সারিতে একই শ্রেণিীতে ইহুদিধর্মকে বিবেচনা করা তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।

তৌরিদ অনুসারে, সকল ইসরায়েলিদের উপস্থিতিতে ঈশ্বর সাইনাই পর্বতে নিজের আবির্ভাব ঘটিয়ে মোশী এবং ইসরায়েলিদের সাথে ঈশ্বরের চুক্তি ঘোষণা করেছিলেন এবং এই চুক্তি নির্দিষ্টভাবে শুধু ইসরায়েলিদের ওপর প্রযোজ্য ছিল। তৌরিদ আকারে ঈশ্বর যে বিধান ঘোষহণা করেছিলেন তা পালন করা ও রক্ষা করা একমাত্র ইসরায়েলিদের দায়িত্ব। তাই এটা অনস্বীকার্য যে, ইহুদিধর্মে যে নির্দিষ্টতা রয়েছে তা এই ধর্মের অন্তস্থিত বিশ্বজনীনতাকে ঢেকে রেখেছে। ইহুদিধর্মের ইতিহাসে কোনো কোনো পর্যায়ে পুতুল-পূজারিদের মধ্য থেকে ধর্মান্তরের মাধ্যমে ইহুদি ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত থাকলেও ইহুদিধর্ম সাধারণভাবে এর মধ্যে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের প্রবণতা সবসময় বজায় রেখেছে।

ইহুদি পণ্ডিতগণের মতে, কে অতীতের ঋষিগণ কখনোই একটা ধর্শ বলে মনে করতেন না। যেই অর্থে পৌত্তলিকতাকে ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হত সেই অর্থে Judaism কে ধর্ম হিসেবে গণ্য করায় তাদের তীব্র বিরোধিতা ছিল। ইসরায়েলিদের সাথে ঈশ্বরের বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে Judaism হচ্ছে একে স্বয়ংসম্পূর্ণ জীনযাপন প্রণালী। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইহুদি ধর্ম এবং সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ইহজাগতিকতার মধ্যে কোনো পরস্পরবিরোধী দ্বি-বিভাজনত্ব ছিল না। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর যাবৎ ইহুদিরা কোথাও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিষ্ঠিত ছিল না, তাই আধুনিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইহুদি ধর্মীয় বিধানের সাংঘর্ষিকতা পরীক্ষিত হয় নাই। আর ইহুদিরা পৃথিবীর যেখানেই বাস করুক না কেন, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তারা তাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিত জীবনযাপন করত। তাই ধর্মীয় বিধান ও ইহজাগতিক বাস্তবতার সংঘর্ষ ইহুদি মননে প্রকট হয়ে ধরা পড়েনি, যা ইসরায়েল রাষ্ট্রে এখন দেখা দিয়েছে।

অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ধর্মগুলির মধ্যে ইহুদি ধর্ম একেশ্বরবাদের প্রাচীনতম ধারক ও বাহক। অপর দুটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম, যথা খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ইহুদিধর্মের বহু ঐতিহ্যের অংশীদার। প্রকৃতপক্ষে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাস করে যে, ইহুদি বাইবেলের কতিপয় বিধান ঈশ্বরই বাতিল করে নব-বিধান বা New Testament বহাল করেছেন। তাসত্ত্বেও ও ইহুদি বাইবেলকে খ্রিস্টানগণ এখনো ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে বিশ্বাস করেন এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ New Testament এর সম্পূরক বলে বিবেচনা করে। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে অবশ্য বর্তমানে তৌরিদ বলে প্রচলিত গ্রন্থ ঈশ্বরপ্রদত্ত মূল তৌরিদ গ্রন্থনয়। এটা পরিবর্তন করে তৌরিদের মূল শিক্ষাকে বিকৃত করা হয়েছে। New Testament এর ক্ষেত্রেও ইসলাম অনুরূপ বিশ্বাস পোষণ করে। প্রকৃতপক্ষে ইহুদিধর্মের মূল আচার-পশু-পক্ষী বলিদান, অগ্নি-আহুতি, বিসর্জন, নৈবদ্য, ইত্যাদির প্রচলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। জেরুজালেমের মহাপবিত্র মন্দিরকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে বিকেন্দ্রিত গণ-প্রার্থনা প্রবর্তিত হয়েছে। ঈশ্বরের সাথে ইসরায়েলিদের তথাকথিত চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া বহু ধর্মীয় বিধান ইহুদিরা স্থগিত বা বাতিল করেছে।

ইহুদি ধর্মের কতকগুলি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা হাজার বছর যাবৎ ইহুদিধর্মকে অন্যান্য ধর্ম থেকে পৃথক করে রেখেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি ইহুদিধর্মকে শুধু নিজস্ব ভাবমূর্তি দেয়নি, হাজার বছর ধরে এর ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করেছে, এই ধর্মের প্রতি বিভিন্ন ধর্ম, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অধিকারী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করেছে। এই ধর্মের এমন কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে যা অ-ইহুদিগণকে এর থেকে দূরে রেখেছে। পশ্চিমা লেখক ও গণমাধ্যম ইহুদিধর্মকে অন্যতম মহান ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে। কিন্তু এর অনুসারী সংখ্যা অথবা এর ভৌগোলিক ব্যাপ্তি কোনো বিবেচনায়ই ইহুদিধর্মকে একটি মহান ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সংখ্যার দিক দিয়ে এই ধর্ম বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র একটি ধর্ম। বহু উপজাতীয় প্রাচীন বিশ্বাসের অনুসারী অথবা ধর্মীয় উপগোষ্ঠীর অনুসারীরর সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেইএর চেয়ে বেশি।

ইহুদিরা মনে করে ইহুদিদের প্রথম পুরুষতান্ত্রিক প্রধান আব্রামকে (আব্রাহাম) ঈশ্বর প্রথম দেখা দিয়ে প্রথম নির্দেশ দিয়েছিলেন তার পিতা-পিতামহের দেশ ত্যাগ করে কানানদের দেশে (বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও প্যালেস্টাইন) চলে যেতে। ঈশ্বর কানানদের বাসভূমি আব্রাহামের বংশধরগণকে চিরকালের জন্য তাদের বাসভূমি হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঈশ্বরের এই প্রতিশ্রুতি আংশিকভাবে বাস্তাব রূপ নিতে সময় লেগেছিল প্রায় ৬০০ বছর। এর মধ্যে আব্রাহাম ও তার অধস্তন দুই পুরুষ যাযাবর হিসেবে জীবন কাটিয়েছে। পরবর্তী ৪৩০ বছর আব্রাহামের বংশধরগণ বাস করেছে মিশরে এবং ৪০ বছর কাটিয়েছে জনহীন প্রান্তরে। আনুমানিক ৯২১ অব্দে রাজা সলোমানের মৃত্যুর পর ইসরাইলের রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে-উত্তরে ইসরায়েল রাজ্য ও দক্ষিণে জুডিয়া (যুদা) রাজ্য। এই দুই রাজ্যের মধ্যে ইসরায়েল রাজ্য আসিরিয়গণ দখল করে নেয় খ্রি. পৃ. ৭৪০ অব্দে এবং জুডিয়া রাজ্যের পতন হচ নেবুখাদনেজার বাহিনীর নিকট খ্রি. পৃ. ৫৮৬ অন্ধে। ঐ বছরই জেরুজালেমের প্রথম মহাপবিত্র মন্দির ধ্বংস করা হয়। ইতোমধ্যে খ্রি. পৃ. ৫৯৭ অব্দে বিপুল সংখ্যক ইহুদিকে বন্দি করে বেবিলনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ইহুদিদের বেবিলনীয় বন্দিত্ব শুরু হয়। প্যালেস্টাইনের একটি অংশে দু'টি ইহুদি রাজ্য ছিল ২৭০ বছর। খ্রি. পৃ. ৫৮৬ অব্দে জুডিয়া রাজ্যের পতনের পর ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের মন্দির দ্বিতীয়বার ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত কখনো জেরুজালেমকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র ইহুদি রাজ্যের উত্থান বা পতন হয়েছে কিন্তু কখনো তা কানান দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজ্য হয়ে উঠেনি। আধুনিক ইসরালেয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার বছর ইহুদিগণ মূলত নির্বাসন জীবন কাটিয়েছে এবং প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রীয় ক্ষশতা তাদের হাতে ছিল না। সমগ্র প্যালেস্টাইন অথবা বাইবেলীয় তথাকথিত ইসরায়েলের আবাসভূমি কখনো ইসরায়েলিদের অধীন ছিল না এবং এখনো নেই।

কানানীয়দের দেশে ইসরায়েলিদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে পন্থা বেছে নিয়েছিলো তা রীতিমত লোমহর্ষক। কানানীয়দের দেশের পথে জর্ডন নদীর পারে মিদিয়ান রাজাদের ইসরায়েলিরা পরাজিত করে তাদের শহরের সকল পুরুষদের হত্যা করে। তাদের শহরগুলি পুড়িয়ে দেয়, গবাদিপশু ও ধনসম্পদ লুট করে এবং মহিলা ও শিশুদের বন্দি করে ইসরায়েলিদের শিবিরে নিয়ে আসে। কানানীয়দের দেশের যেসকল এলাকা ভবিষ্যত ইসরায়েল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সেসকল এলাকার শহরবাসীদের ভাগ্যের তুলনায় কোনোানীয় কুমারী মেয়েদের ভাগ্য অনেক ভাল ছিল। তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে ছিল।

অন্যধর্মের প্রতি মনোভাব

অন্যধর্মের প্রতি ইহুদির মনোভাব সবসময়ই উন্নাসিকতাদুষ্ট। কখনো কখনো ধৃষ্টাতাপূর্ণ এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ঈশ্বরের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক, ঈশ্বরে বরপুত্র হিসেবে নিজদের তারা বিশেষ এক শ্রেণিভুক্ত গণ্য করে থাকে। একমাত্র ইহুদি মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করলেই সেই শ্রেণিভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব।

তারা মনে করে 'সকল বস্তুর প্রভুর আমরা প্রশংসা করি, সকল মহত্বের অধিকারী সৃষ্টিকর্তা, যিনি আমাদেরকে সকল দেশের সকল জাতি থেকে পৃথক করেছেন, পৃথিবীর অন্যসব পরিবারের মধ্যে আমাদের স্থাপিত করেননি। কারণ অন্যের ভাগ্যের সাথে আমাদের অংশীদার করেননি এবং আমাদের নিয়তি অন্য জনতার সাথে মিলিয়ে দেননি। কারণ তারা অহমিকা ও নিঃসারতার কাছে মাথা নত করে এবং যে দেবতা তাদের রক্ষা করতে পারে না তার কাছে তারা প্রার্থনা করে। অন্নদিকে, আমরা হাটু বাঁকা করি ও প্রণিপাত করি রাজা, রাজাধিরাজ পবিত্র সত্তা বরণ্যের প্রতি... শুধু মহাপ্রভু ব্যতীত অন্য কোরো প্রতি নয়। আমাদের রাজা সত্য, অন্য কেউ নয়।'

ইহুদিগণ নিজদের মধ্যে অ-ইহুদিকে নিন্দে করে যেসব সর্বনাম ব্যবহার করে তার মধ্যে 'gentile' শব্দটি সবচেয়ে ভদ্রসূচক। gentile শব্দটি Latin শব্দ মবহঃরষব থেকে উৎপত্তি হয়েছে। শব্দটির অর্থ হচ্ছে, pagan বা heathen। সহজ বাংলা কথায় পৌত্তলিক বা বিধর্মী। অ-ইহুদিগণকে gentile নামে আখ্যায়িত করা এতো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে যে এখন সর্বনামটিকে খ্রিস্টানগণ তেমন অপমানজনক মনে করেন। আরেকটি অবমাননাকর সর্বনাম যা ইহুদিগণ-অ-ইহুদি, বিশেষকরে খ্রিস্টানদের বর্ণনা করতে ব্যবহার করেন তা হচ্ছে Goi, বহু বচনে Goim। পৃথিবীতে বাস করে ইহুদি এবং Goim। সাধারণ অর্থে Goim হচ্ছে জাতি। Goi অর্থ মানুষ নয় তবে পশুও নয়। 'Ye are my flock, the flock of my pasture are men ইহুদিগণ মানুষ, অন্যরা Goim। তালমুদ অনুসারে, The seed if a Goi is worth the same of a beast' অর্থাৎ একজন Goi এর বীজ (বীর্য) একটি পশুর বীজের সমমূল্যের। 'The sexual intercourse of a Goi is like that of a beast.' 'একজন Goi এর যৌন সঙ্গম পশুর সঙ্গমের সমতুল।' অ-ইহুদি, বিশেষ করে খ্রিস্টানগণের ক্ষেত্রে আরেকটি যে সর্বনাম ব্যবহার করা হয় তা আরো মারাত্মক। সেটি হচ্ছে 'shektz' স্ত্রী লিঙ্গ shektz। এটি একটি Hebrew 00 যার অর্থ হচ্ছে 'abomination' বা নিদারুণ ঘৃণ্য বা বিভীষিকাজনক ব্যক্তি বা বস্তু। ইহুদি বাইবেলে shekt ব্যবহার করা হয়েছে kashrut অনুসারে অপরিচ্ছন্ন ও অপবিত্র পশু শুকর এর ক্ষেত্রে। অ-ইহুদিগণকে ইহুদিগণ কতটা তাচ্ছিল্য বা ঘৃনার চোখে দেখতে পারে এ থেকেই তা বুঝা যায়। 'The heathen or Goi, was not considered to be on the same moral or socip cultural level as the Jew, and he was to live an animal-like existence.' নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিধর্মী অথবা Goi -কে ইহুদিদের সমপর্যায়ের গণ্য করা হত না এবং সে পশুর পর্যায়েই জীবনযাপন করত বলে মনে করা হত।'

ইসলামধর্মের ব্যাপারে ইহুদি ধমতত্ত্ববিদদের বিরোধিতা ততটা কঠোর নয়। ইসলামের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অন্তত পৌত্তলিকা ও বহু ঈশ্বরবাদের অভিযোগ তাদের নেই। ইসলাম পূর্ববর্তী কালে মক্কার কা'বা ঘর পৌত্তলিকতার আখড়ায় পরিণত হবার পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিরা আব্রাহামের সম্মানে তার উত্তরাধিকার বঞ্চিত কিন্তু অশীর্বাদপুষ্ট জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইলের জন্য প্রতিষ্ঠিত কাবাকে তাদের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবেগণ্য করত।

পৌত্তলিকতা ও বহু-ঈশ্বরবাদ বর্জনের কারণে ইহুদি ধর্মতত্ত্ববিদগণ ইসলাম সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নমনীয় মনোভাব পোষণ করে। তালমুদের বিধান অনুসারে, ইহুদিক কোনো পৌত্তলিক উপাসনালয় খ্রিস্টানদের গির্জাসহ অতিক্রমকালে মনে মনে এর আশু ধ্বংস কামনা করতে হয় এবং তার নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, ঐ উপাসনালয়ের উদ্দেশ্য অন্তত তিনবার থু থু নিক্ষেপ করতে হয়। মুসলমানদের মসজিদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয় বলে রাবাইগণ রায় দিয়েছে। ইহুদিদের দৈনন্দিন তিনবেলা গণ-প্রার্থনায় মূল প্রার্থনা Shemoneh Esrei এর একটি অংশ ধর্মত্যাগীগণ যারা পৌত্তলিকতা অর্থাৎ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছে তাদের আশু ধ্বংস কামনা করে একটি প্রার্থনা খ্রি. ১ম শতাব্দী থেকে প্রচলন করা হয়। রাবাইগণ রায় দিয়েছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী ইহুদিগণ এই অভিসম্পাতের আওতায় পড়ে না। আঙুর রসের মদের বোতলের ছিপি খোলা অবস্থায় কোনো পুতুল-পূজারির (সকল মতবাদের খ্রিস্টানসহ) হাতের ছোঁয়া লাগলে সেই মদ সম্পূর্ণটা ঢেলে ফেলে দিতে হবে, কিন্তু একজন ইসলাম অনুসারীরা ছোঁয়া লাগলে তা ইহুদি পান করতে পারবে না। তবে, তা ফেলে না দিয়ে বিক্রি করতে পারবে।

ইহুদি আইন ব্যবস্থায় (Halakhan) অ-ইহুদিকে কোনো পরিস্থিতিতেই মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ইহুদি বিচারিক প্রক্রিয়াকোন অ-ইহুদির সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ নেই। কারণ, ধরে নেওয়া হয়েছে যে, অ-ইহুদিগণ জন্মগতভাবে মিথ্যাবাদী। সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একমাত্র কোনো অ-ইহুদির সাক্ষ্যের ওপর রাবাই আদালতকে নির্ভর করতে হয়। ইহুদি ধর্মীয় আইন অনুসারে, একজন মহিলাকে তখনই বিধবা ঘোষণা করা যাবে এবং সে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে, যদি একজন চাক্ষুষ সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে সে এই মহিলার স্বামীকে মারা যেতে দেখেছে অথবা মৃতদেহ সে সনাক্ত করেছে। সেই চাক্ষুষ সাক্ষী যদি অ-ইহুদি হয় তাহলে বিচারক সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করে তথ্য দিতে পারবে না। কারণ ধরে নেওয়া হয় যে অ-ইহাদি মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে। অ-ইহুদিদের মধ্যে বিবাহের সম্পর্কে ইহুদি আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। তাই ইহুদির সাথে অ-ইহুদির বিবাহ শুধু স্বীকৃতির অযোগ্যই নয় এটা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।

ইহুদি আইনে কোনো ইহুদিকে হত্যা করা মৃতুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, কোনো ইহুদি যদি অন্য কোনো ইহুদির মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী হয় তাহলে আইন অনুসারে সে ঐশ্বরিক আইনে পাপী সাব্যস্ত হবে। এই জন্য তার শাস্তি ইশ্বর দেবেন, কোনো পার্থিব আদালতে তার শাস্তি হবে না। কোনো ইহুদি যদি একজন অ-ইহদিকে হত্যা করে তা হলে সে অজাগতিক আইনে পাপী সাব্যস্ত হবে এবং তার শাস্তি দিতে পারবে একমাত্র ঈশ্বর। সে যদি একজন অ-ইহুদির মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী হয় তাহলে তার কোনো পাপও হবে না।

বিবাহিত ইহুদি মহিলা তার স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের সাথে যৌনসঙ্গম করলে উভয় পক্ষের জন্যই নিদিষ্ট শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু অ-ইহুদি মহিলাদের ক্ষেত্রে বিষয় অন্যরকম একজন অ-ইহুদি মহিলা বিবাহিতা কি অবিবাহিতা তা মোটেই বিবেচ্য বিষয় নয়, কারণ ইহুদিগণ বৈবাহিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না। তাই একজন ইহুদি পুরুষ ও অ-ইহুদি মহিলার মধ্যে ব্যভিচারের প্রশ্ন উঠে না। তারমুদ এই ধরনের যৌনসঙ্গমকে পশু গমনের পাপের সমতুল্য বলে গণ্য করে। উল্লেখ্য তৌরিদ প্রদত্ত বিধান অনুসারে, কোনো ইহুদি পুরুষ যদি পশুগমন করে তাহলে সংশ্লিষ্ট পশুটিকে অবশ্যই হত্রা করতে হবে, আর ইহুদি অপরাধীকে বেত্রাঘাত করতে হবে।

তবে অবশ্য ধরে নেওয়া যাবে না যে, একজন ইহুদি পুরুষ ও একজন অ-ইহুদি মহিলার মধ্যে যৌনসম্পর্ক গ্রহণযোগ্য। তা নয়, তবে এই পরিস্থিতিতে মূল শাস্তি হবে মহিলার তাকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এমনকি যদি সেই মহিলা একজন ইহুদি পুরুষের ধর্ষণের শিকারও হয়। 'যদি কোনো ইহুদি অ- ইহুদি নারীর সাথে যৌনসঙ্গম করে সেই নারী তিন বছরের শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্কা হোক, বিবাহিতা হোক কি অবিবাহিতা, আর সে (ইহুদি পুরুষ) যদি নয় বছর একদিন বয়সের অপ্রাপ্তবয়স্কও হয়, সে যেহেতু ইচ্ছাকৃতভাবে তার (অ-ইহুদি নারী) সাথে সঙ্গম করেছে তাই তাকে (অ-ইহুদি নারী) অবশ্যই পশুর মতই হত্যা করতে হবে কারণ তার মাধ্যমে একজন ইহুদি ঝামেলা পড়েছে। ঐ ইহুদিকে অবশ্য বেত্রাঘাত করতেই হবে। সে যদি ইহুদি পুরোহিত সম্প্রদায়ভুক্ত হয় তাকে দ্বিগুণ বেত্রাঘাত করতে হবে। কারণ সে দ্বিগুণ অপরাধ করেছে। সকল অ-ইহুদি নারীকেই বেশ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।' এখানে অপরাধ হলো, সে একই সাথে পশু গমন ও বেশ্যা গমনের অপরাধ করেছে। উল্লেখ্য বেশ্যাগমন সাধারণ ইহুদিদের জন্য অপরাধ নয়, কিন্তু একজন Kohen -এর জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অ-ইহুদিগণকে উপহার দেওয়ার বিষয়ে ইহুদিদের ওপর তালমুদের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্ট। অবশ্য মধ্যযুগীয় রাবাই কর্তৃপক্ষ এই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছে। কারণ প্রাচীনকাল থেকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উপহার বিনিময় বহুল প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। এই ধরনের উপহার প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতে প্রাপ্তির আশায় বিনিয়োগ বলে বিবেচিত হয় তাই ইহুদি ও অ-ইহুদিদের মধ্যে এই ধরনের উপহার বিনিময়কে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিস্বার্থভাবে কোনো অ-ইহুদিকে উপহার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। ভিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধান রয়েছে। ইহুদি ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। তবে অ-ইহুদি ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিলে যদি ইহুদিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে শান্তি রক্ষার খাতিরে তা দেওয়া যেতে পারে। তবে অ-ইহুদি দরিদ্রগণ যাতে ইহুদি ভিক্ষা পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে না পরে সেদিকে সতর্ক থাকার জন্য রাবচাই কর্তৃপক্ষের বহু উপদেশ রয়েছে।

যদি কোনো ইহুদি সম্ভাব্য কোনো ইহুদির হারাসোর সম্পত্তি পায় তাহলে তার মালিক খুঁজে বের করার জন্য তাকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ যেমন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে মর্মে কঠিন নিদের্শ দেওয়া আছে। অপরদিকে, পাওয়া সম্পদের মালিক যদি অ-ইহুদি হয় সেই ক্ষেত্রে তালমুদ ও অন্যান্য রাবাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশহল, পাওয়া সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো ইহুদিকে প্রতারণা করা মহাপাপ। অ-ইহুদিদের বেলায় সরাসরি প্রতারণা করা নিষেধ। যদি ইহুদির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে অ-ইহুদির সাথে পরোক্ষ প্রতারণায় অসুবিধা নেই। এই ধরনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কেনা-বেচার হিসাব করার সময় যদি কোনো ইহুদি নিজেরপক্ষে ভুল করে তাহলে অপর পক্ষের ধর্মীয় কর্তব্য হচ্ছে সেই ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং সঠিক হিসাব অনুসারে লেনদেন করা। কিন্তু অপর পক্ষ যদি অ-ইহুদি হয় তাহলে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া ইহুদির দায়িত্ব নয়। পাছে পরবর্তীকালে ক্ষতিগ্রস্ত অ-ইহুদি তার ভুল বুঝতে পেরে ইহুদির প্রতি মারমুখি হয় তাই এই পরিস্থিতিতে 'আপনার হিসাবের ওপরই আমি নির্ভর করছি' বলে লেনদেন সমাপ্ত করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বেচা-কেনার ক্ষেত্রে কোনো ইহুদির সাথে প্রবঞ্চনা করা মহাপাপ, কারণ তৌরিদে এটা কঠোরভাবে নিষেধ করা আছে। কিন্তু কোনো অ-ইহুদির ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়।

সহিংসতা ব্যতীত চুরি সকল ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ, এমনকি এর শিকার যদি অ-ইহুদিও হয়। কোনো ইহুদির ওপর ডাকাতি করা (সহিংস) সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু অ-ইহুদির ওপর সহিংস ডাকাতি করা যাবে কিনা তা নির্ভর করবে ডাকাতির শিকার অ-ইহুদি শাসনাধীন কিনা তার ওপর। তালমুদ অনুসারে, সেই অ-ইহুদি যদি ইহুদি শাসনাধীন হয় তাহলে ডাকাতি করা কোনো অপরাধ নয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাবাই কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে বিতর্ক হচ্ছে ঠিক কি পরিস্থিতিতে অ-ইহুদিকে ডাকাতির শিকার করা যাবে তার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে, বিশ্বজনীন বিচারের ধারণা এবং মানবিকতার বিবেচনায় এরূপ ডাকাতি কতটুকু অনুমোদনযোগ্য সেই বিষয় নিয়ে নয়।

ইহুদিদের স্বপ্ন

পৃথিবীর প্রধান প্রবীন ধর্মের অনুসারীদের ইহুদি ধর্মের এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের কর্ণধার বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা সবকিছু করতে প্রস্তুত ইউএস ব্যুরো অব সেন্সাসের বিশ্ব জনসংখ্যা ঘড়ি অনুসারে, ২০১২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭০৫ কোটি ৭৪ লক্ষ ৮৩ হাজার ৪৯৮ জন। এর মদ্যে ইহুদি জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লক্ষ। গণনাকালে অনেকেই আবার নিজের ধর্ম পরিচয় ঘোষণা করতে চান না। ইহুদি জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার, ২০ শতাংশ বা প্রতি হাজারে ২ জন। সেই তুলনায় পৃথিবীর মুসলমানের সংখ্যা ১৬০ কোটি।

সংখ্যার দিক থেকে ইহুদিরা পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। কিন্তু ইতিহাস জুড়ে, বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের ইতিহাসে এই ধর্মের অনুসারীদের বিচিত্র ভূমিকায় উপস্থিতি কখনোই তাদের সংখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপ জুড়ে হিটলারের নেতৃত্বে ইহুদি নিধনযজ্ঞে পরিণত হয় যা ইতিহাসে 'হলোকস্ট' নামে পরিচিতি লাভ করে। হিটলারের পতনের পর ইহুদিগণ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইহুদিগোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তার অধিকাংশ আরব অধিবাসীদের বহিষ্কার করে প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালেও প্যালেস্টাইনে ইহুদি জনসংখ্যা প্যালেস্টাইনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়ায়শ এবং এতদঞ্চলের আরব অধিবাসীদের সংখ্যার এক শতাংশেরও কম ছিল।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে ইহুদিদের উত্থান মধ্যপ্রাচ্য তথা ইসলামি জগতে এমন এক উত্তেজক উপাদান সৃষ্টি হয়েছে যা বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে অদ্যাবধি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং বহু ক্ষেত্রে বহমান আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল ক্ষেত্র-জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহত্যি, দর্শন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, সমর-শক্তিতে ইহুদিদের অতুলনীয় অর্জনে। এই অর্জনকে দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করে ইহুদিগণ বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বস্ত সহায়ক হিসেবে পাওয়া নিশ্চিত করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ইহুদিদের অবস্থানের জরিপ, সে যত ছোট আকারেই হোক, এবং সে অবস্থানের কার্যকরণের কিছু বিশ্লেষণ ব্যতীত বিশ্ব-মঞ্চে ইহুদিদের অতীত ও বর্তমান অবস্থান সম্যক অনুধাবন করা কঠিন। এবং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে।

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার শুরু হওয়ার পর থেকে ১১২ বছরে মোট যে ৮৫০ জন এই বিরল সম্মান পেয়েছেন তার মধ্যে ১৭৭টি ইহুদি। নোবেলের ইতিহাসে মোট ৯ জন মুসলিম এই সম্মান পেয়েছেন, হিন্দু পেয়েছেন ৬ জন, খ্রিষ্টান পেয়েছেন ৬৩৭ জন এবং বৌদ্ধ অন্যান্যরা পেয়েছেন ২১ জন।

জনসংখ্যা ও নোবেল প্রাপ্তির সংখ্যার তুলনা করা হলে ইহুদিরা মুসলিমদের ২২২২ গুণ, হিন্দুদের ২০৯৪ গুণ, খ্রিস্টানদের ৫৬৫ গুণ বেশি নোবেল পুরস্কার পেয়েচেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে এযাবত যতজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের ৪০ শতাংশই ইহুদি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি জনসংখ্যা ইসরায়েল রাষ্ট্রের ইহুদি জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা ৩১.৫ কোটি। এর মধ্যে ইহুদির সংখ্যা আনুমানিক ৫৪ লক্ষ, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১.৭ শতাংশ। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইহুদিদের অবস্থান ঈর্ষণীয়। 'ফোর্বস' সাময়িকীর হিসাব অনুসারে, ২০১২ সালে আমেরিকার ৫০ জন সবচেয়ে ধনী মানুষের মধ্যে ২০ জন্য ইহুদি;। দেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বৃহত্তম আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে। আরেকটি বিষয় হল ইহুদিরা সাধারণ সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়ে থাকেন যে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ পরিমাপের তুলনায় গণমাধ্যমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ পরিমাপ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। যুক্তরাষ্ট্রে রেডিও, টেলিভিশন সম্প্রচার, পত্র-পত্রিকা পরিচালনা ও প্রকাশনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা ও বিতরণ এবং পুস্তক ও সাময়িকী প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা ও এসকল সংস্থার মালিকানা কাদের হাতে তা বের করা মোটেই কঠিন নয়। বলা হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচার ও গণ-বিনোদনের মাধ্যমে পাঁচটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কোম্পানিগুলো হল ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি, টাইম ওয়ার্নার কর্পোরেশন, (ভিডিও এন্ড অডিও কমিউনিকেশনস) কর্পোরেশন, নিউজ কর্পোরেশন, সনি কর্পোরেশন অব আমেরিকা। ওয়াল্ট ডিজনি কর্পোরেশনের পরিধি সর্ববৃহৎ। এই কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন রবার্ট এ, আইগার। ইনি একজন ইহুদি। এই পদে তার পূর্বসূরী ছিলেন মাইকেল আইজনার। তিনিও ছিলেন ইহুদি। এই কর্পোরেশনের অধীন রয়েছে আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (এবিসি)। এবিসি এর ৭টি নিজস্ব টেলিভিশন স্টেশন ও ২২৫টি এফিলিয়েট। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইহুদিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন থেকেই প্রচারমাধ্যমের ওপর ইহুদিদের কর্তৃত্ব বাড়তে থাকে। যে সকল পত্র পত্রিকা প্রথমত-অ ইহুদিরা শুরু করেছিল সেগুলো ক্রয়ের মাধ্যমে ইহুদিরা তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়াতে থাকে। রেডিও- টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলে। প্রচারমাধ্যমে অ-ইহুদিদের উপস্থিতি কমতে থাকে। মূলত ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ঠিক করে কোনোটি খবর ও কোনোটি খবর নয়। অন্যরা তা অনুসরণ করে। যারা ইহুদি লাইনের বাইরে অথবা তার বিপরীতে খবর বা মতামত প্রকাশ করতে উৎসাহ দেখায় তারা যেন বেশি দিন টিকে থাকতে না পারে সে ব্যবস্থা করে ইহুদি ব্যবসায়ীরা, যারা বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দূরবর্তী ক্ষুদ্র কমিউনিটি পর্যায়ে খবর-মাধ্যমে একই নিয়ন্ত্রণ কাজ করে। রিপোর্টং, পরিবেশনা ও মতামত প্রকাশে ইহুদি সংবেদনশীলতার দিকে খেয়াল রাখতে বাধ্য থাকে। ছোট ছোট পত্রিকাগুলোর তাদের শহর বা কমিউনিটির বাইরে খবর সংগ্রহের সংগঠন বা আর্থিক সামর্থ থাকে না। তারা বাস্তব কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরের জন্য বৃহৎ পত্রিকা কোম্পানি ও নিউজ এজেন্সির ওপর নির্ভর করে। তাই তারা নামে 'স্বাধীন' হলেও কার্যত ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা কোম্পানির লাইন অনুসরণ করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি অভিবাসন ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই দেশটির রাজনীতিতে ইহুদিদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে যখন ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় তখনই ইহুদিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সেটাকে টিকিয়ে রাখতে হলে যে কোনো উপায়েই হোক তাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন আদায় করতে হবে এবং সেই সমর্থন অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ক্ষেত্রে ইহুদিদের প্রাধান্য খুবই দৃশ্যমান। প্রথমটি হচ্ছে গণমাধ্যম ও দ্বিতীয়টি রাজনীতি। এই দুটি ক্ষেত্রে ইহুদিদের প্রাধান্য আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকদের যতটা উৎকণ্ঠার কারণ তার চেয়ে বেশি উৎকণ্ঠার কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিশেষকরে মুসলিম দেশগুলোর জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের তথা মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় একটি অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সম্পর্ক ইসরায়েলকে তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সাথে দুঃসাহসী আচরণে প্ররোচিত করে। বিশ্ব জনমত উপেক্ষা করে প্যালেস্টাইনিদের মৌলিক অধিকার যথেচ্ছ লঙ্ঘন করতে সামান্যতম দ্বিধা অনুভব করে না। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে অধিকৃত প্যালেস্টাইনে যেখানে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে এবং তা থামানোর কার্যকর কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেই। যখন তখন যে কোনো মুসলিম দেশের ওপর আগ্রাসন চালাতে ইসরায়েলকে অগ্র-পশ্চাৎ ভাবতে হয় না। ১৯৮১ সালে বাগদাদের কাছে ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লি চালু করার পূর্বেই ইসরায়েল তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল এক রাতে বিমান হামলা চালিয়ে। এই হামলা চালাতে আরো দুটি আরব রাষ্ট্র—জর্ডান ও সৌদি আরবের আকাশসীমা লঙ্ঘন করা হয়েছিল। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এমন হামলা ও অপর দুটি রাষ্ট্রের আকাশসীমা লঙ্ঘন করার অপরাধে জাতিসংঘ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে। এই কিছুদিন আগে ইসরায়েল সুদানের একটি গোলা-বারুদ কারখানায় বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে। সুদানের সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থা নেই। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত তথা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম এটা নিয়ে কোনো হৈ-হুল্লোড় করেনি। আন্তর্জাতিক সমাজ এটা ধরে নিয়েছে আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েল এ আচরণই করবে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ইসরায়েল ধ্বংস করে দেবে এটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক আইনে এর বৈধতা কতটুকু আছে তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার গড়ে তুলেছে এটা নিয়ে বিশ্ব প্রচারমাধ্যমে কোনো হৈ চৈ নেই। রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে আমেরিকানরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারলেও ইরানের কাল্পনিক পারমাণবিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জীবন-মরণ হুমকি সৃষ্টি করবে এমন অদ্ভুত ধারণা ইহুদি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম অধিকাংশ আমেরিকানদের মনে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

অনেকেই মনে করেন, বিশ্বে ইহুদিদের উত্থান স্বাভাবিক সামাজিক বিবর্তনের ফল নয়। বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে ইহুদিদের গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দশকে একটা রহস্যময় পরিবেশে নামে একটি দলিল প্রথমে সীমিত আকারে ও পরে প্রকাশ্যে বই আকারে প্রচারিত হয়। বইটিতে সমগ্র পৃথিবীতে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথিত নীলনক্সা প্রণয়নের জন্য জায়নবাদী (বিশ্ব ইহুদিবাদী) নেতাদের গোপন বৈঠকগুলোর কার্যবিবরণী হিসেবে প্রকাশ করা হয়। বইটিতে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিশ্ব সরকার প্রতিষ্ঠার যে কৌশল অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অ-ইহুদি সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটানো, অর্থনীতি ও গণমাধ্যমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, বিশ্ব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে সামাজিক যোগসূত্রকে ছিন্ন-ভিন্ন করে ইহুদি মসীহ্ এর নেতৃত্বে বিশ্বা সরকার গঠনের পথ সুগম করা ইত্যাদি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইউরোপ ও আমেরিকার ইহুদিবিরোধী মনোভাব সৃষ্টিতে বইটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হিটলার এই বইটিকে ইহুদি ষড়যন্ত্রের প্রধান হিসেবে তুলে ধরে জার্মানদের মধ্যে ইহুদিবিরোধী মনোভাব সৃস্টি করতে সফল হয়েছিলেন। অবশ্য বইটি যে সম্পূর্ণ ভুয়া, জালিয়াতি ও ইহুদিবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের ফলস এটা প্রমাণিত হয়েছে।

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে ইহুদি মহা পরিকল্পনা থাকুক কি না থাকুক বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের গতিধারা-প্রথমে মহাযুদ্ধের আগে বিশ্ব-বাণিজ্য ব্যবস্থার অরাজকতা, প্রথম মহাযুদ্ধ, প্রথম মহাযুদ্ধের পর লীগ অব ন্যাশনস প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব, মহামন্দা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফর প্রতিষ্ঠা, ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন- সচেতন বা অবচেতন 'প্রটোকল-এর মহা পরিকল্পনার' পথে পৃথিবীতে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থার ওপর ইহুদি প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের তথা বিশ্ব গণমাধ্যমে ইহুদি আধিপত্য এবং বিশ্ব জনতম সৃষ্টিতে তার অভিঘাত এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে যে বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইহুদি মাত্রা কোনো পরিমাপেই অবহেলার বিষয় নয়। তারা যে কোনো উপায়ে শ্রেষ্ঠত্বে পরিণত হতে চায়।

জেরুজালেম

আধুনিক জেরুজালেম শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ০.৯ বর্গ কিমি. (০.৩৫ বর্গ মাইল) আয়তন বিশিষ্ট দেয়ালঘেরা অঞ্চল। ১৮৬০ সালে মিশকেনট শানানিম নামক ইহুদি বসতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলটি নিয়েই জেরুজালেম শহর গঠিত ছিল। পুরনো শহরটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু স্থানের অবস্থানস্থল, যেমন মুসলিমদের কাছে ডোম অব দ্য রক ও আল-আকসা মসজিদ, ইহুদিদের কাছে টেম্পল মাউন্ট ও পশ্চিম দেয়াল এবং খ্রিষ্টানদের কাছে চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৮১ সালে এই অঞ্চলটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

প্রথাগতভাবে পুরনো শহরটি চারটি অসমান অংশে বিভক্ত। তবে বর্তমান অবস্থাটি ১৯ শতক থেকে চালু হয়েছে। বর্তমানে শহরটি মোটামোটিভাবে মুসলিম মহল্লা, খ্রিষ্টান মহল্লা, ইহুদি মহল্লা ও আর্মেনীয় মহল্লা নামক ভাগে বিভক্ত। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পুরনো শহরটি জর্ডান কর্তৃক অধিকৃত হয় এবং এর ইহুদি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে টেম্পল মাউন্টের উপর দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হয়। এসময় ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমের বাকি অংশসহ পুরনো শহর দখল করে নেয় এবং পশ্চিম অংশের সাথে একীভূত করে পুরো এলাকাকে ইসরায়েলের অন্তর্গত করে নেয়া হয়। এখনো এ এলাকাটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে এবং তারা একে ইসরায়েলের জাতীয় রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে। ২০১০ সালে জেরুজালেমের সর্ব প্রাচীন লেখার নমুনা পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে পাওয়া যায়। ১৯৮০ সালের জেরুজালেম আইন নামক আইন যেটিতে পূর্ব জেরুজালেমকে কার্যকরভাবে ইসরায়েলের অংশ ঘোষণা করা হয় তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাব ৪৭৮ দ্বারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ব জেরুজালেমকে অধীকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলের অংশ হিসেবে গণ্য করে।

[বাইবেল অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ১১শ শতকে রাজা দাউদের (দাউদ আঃ) জেরুজালেম জয়ের পূর্বে শহরটি জেবুসিয়দের বাসস্থান ছিল। বাইবেলের বর্ণনা মতে এই শহর মজবুত নগর প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। রাজা দাউদ কর্তৃক শাসিত শহর যেটি দাউদের শহর বলে পরিচিত তা পুরনো শহরের দেয়ালের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। তাঁর পুত্র রাজা সুলায়মানের (সুলাইমান আঃ) শহরের দেয়াল সম্প্রসারিত করেন। ৪৪০ খ্রিষ্টপূর্বের দিকে পারস্য আমলে নেহেমিয়া ব্যবিলন থেকে ফিরে আসেন ও এর পুনর্নিমাণ করেন। ৪১-৪৪ খ্রিষ্টাব্দে জুডিয়ার রাজা আগ্রিপ্পা "তৃতীয় দেয়াল” নামক নতুন নগর প্রাচীর নির্মাণ করেন।

৭ম শতকে (৬৩৭ সালে) খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে মুসলিমরা জেরুজালেম জয় করে। খলিফা উমর একে মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তিনি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। জেরুজালেম অবরোধের পর সফ্রোনিয়াস খলিফা উমরকে স্বাগতম জানান। কারণ জেরুজালেমের চার্চের কাছে পরিচিত বাইবেলের একটি ভবিষ্যতবাণীতে "একজন দরিদ্র কিন্তু ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী ব্যক্তি” জেরুজালেমের খ্রিষ্টানদের রক্ষক ও মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হবেন এমন উল্লেখ ছিল। সফ্রোনিয়াস বিশ্বাস করতেন যে সাদাসিধে জীবনযাপনকারী বীর যোদ্ধা উমর এই ভবিষ্যতবাণীকে পূর্ণ করেছেন। আলেক্সান্দ্রিয়ার পেট্রিয়ার্ক ইউটিকিয়াসের লেখা, উমর চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার পরিদর্শন করেন ও উঠোনে বসেন। নামাজের সময় হলে তিনি চার্চের বাইরে গিয়ে নামাজ আদায় করেন যাতে পরবর্তীতে কেউ তার নামাজের কারণকে ব্যবহার করে পরবর্তীকালে কেউ এই চার্চকে মসজিদে রূপান্তর না করে। তিনি এও উল্লেখ করেন যে উমর একটি আদেশনামা লিখে তা পেট্রিয়ার্ককে হস্তান্তর করে। এতে উক্ত স্থানে মুসলিমদের প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয় বলে ইউটিকিয়াস উল্লেখ করেন। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সেনাবাহিনী জেরুজালেম দখল করে এবং ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কর্তৃক তা বিজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এতে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল। তিনি ইহুদিদেরকে শহরে বসবাসের অনুমতি দেন। ১২১৯ সালে দামেস্কের সুলতান মুয়াজ্জিম নগরের দেয়াল ধ্বংস করেন। ১২৪৩ সালে মিশরের সাথে চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম জার্মানির দ্বিতীয় ফ্রেডেরিখের হস্তগত হয়। ১২৩৯ সালে তিনি দেয়াল পুনর্নিমাণ করেন। কিন্তু কেরাকের আমির দাউদ সেগুলোকে ধ্বংস করে দেন। ১২৪৩ সালে জেরুজালেম পুনরায় খ্রিষ্টানদের দখলে আসে এবং দেয়ালগুলো সংস্কার করা হয়। ১২৪৪ সালে খোয়ারিজমিয় তাতাররা শহরটি দখল করে এবং সুলতান মালিক আল-মুয়াত্তাম নগর প্রাচীর ভেঙে ফেলেন। ফলে শহর আবার প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে এবং শহরের মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে।

বর্তমান দেয়ালগুলো ১৫৩৮ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান প্রথম সুলাইমান কর্তৃক নির্মিত হয়। দেয়ালগুলো প্রায় ৪.৫ কিমি. (২.৮ মাইল) দীর্ঘ ও ৫ থেকে ১৫ মিটার (১৬ থেকে ৪৯ ফুট) পর্যন্ত উঁচু এবং ৩ মিটার (১০ ফুট) পুরু)। সব মিলিয়ে পুরনো শহরে মোট ৪৩টি প্রহরা টাওয়ার ও ১১ টি গেট আছে। এদের মধ্যে সাতটি বর্তমানে উন্মুক্ত। শহর ভূখণ্ডটির দৈর্ঘ ১৫০ মাইল ও প্রস্ত ১০০ মাইল। ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর দক্ষিণ-পূর্ব কোনে এর অবস্থান। শীত, গ্রীষ্ম ও বসন্তের আমেজ তীব্রভাবে অনুভূত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার বছর আগে এখানে মানুষের বাস ছিল। জেরুজালেমকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বর্ণাঢ্য নগরী। পুরনো শহরটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য ১৯৮০ সালে জর্ডান প্রস্তাব করে। ১৯৮১ সালে এটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়।

মুসলিম মহল্লা: মুসলিম মহল্লা হল চারটি মহল্লার মধ্যে সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে জনবহুল অংশ। এটি উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত। পূর্বে সিংহ দরজা থেকে শুরু করে টেম্পল মাউন্টের উত্তর দেয়াল নিয়ে পশ্চিমে দামেস্ক পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। ২০০৫ সালে এখানে ২২,০০০ জন বসবাস করত। অন্য তিনটি মহল্লার মত মুসলিম মহল্লাতেও ১৯২৯ এর দাঙ্গার আগ পর্যন্ত মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বসবাস করত। বর্তমানে ৬০ টি ইহুদি পরিবার এখানে বসবাস করে এবং এখানে কয়েকটি ইয়েশিভা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হল আটেরেট কোহানিম।

খ্রিষ্টান মহল্লা: শহরের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। এটি উত্তরে নতুন গেট থেকে শুরু করে পুরনো শহরের পশ্চিম দেয়াল নিয়ে জাফা গেট সহ দক্ষিণে বিস্তৃত। এর সাথে ইহুদি ও আর্মেনীয় মহল্লার সীমানা রয়েছে। পূর্বে দামেস্ক গেটে মুসলিম মহল্লার সাথে এর সীমানা রয়েছে। এই মহল্লায় খ্রিষ্টানদের পবিত্রতম স্থান চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার অবস্থিত।

আর্মেনীয় মহল্লা: চারটি অংশের মধ্যে ক্ষুদ্রতম। আর্মেনীয়রাও ধর্মে খ্রিষ্টান হলেও এটি খ্রিষ্টান মহল্লা থেকে আলাদা। ক্ষুদ্র আকৃতি ও জনসংখ্যা সত্ত্বেও এই অংশে আর্মেনীয় ও তাদের পেট্রিয়ার্কেট স্বাধীনভাবে অবস্থান করছে এবং শহরে সবল অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে ৩,০০০ এরও বেশি আর্মেনীয় জেরুজালেমে বসবাস করে যাদের মধ্যে ৫০০ জন আর্মেনীয় মহল্লায় থাকে। ১৯৭৫ সালে আর্মেনীয় মহল্লায় একটি ধর্মতাত্ত্বিক সেমিনারি স্থাপিত হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলী সরকার যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত চার্চ বা যেকোনো ধর্মীয় স্থাপনা সংস্কারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়।

ইহুদি মহল্লা: শহরের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি দক্ষিণে জায়ন গেট থেকে পশ্চিমে আর্মেনীয় মহল্লা নিয়ে উত্তরে কারডো এবং পূর্বে পশ্চিম দেয়াল ও টেম্পল মাউন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মহল্লার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে এখানে ইহুদিরা ধারাবাহিকভাবে বসবাস করে আসছে। ১৯৪৮ সালে ২,০০০ ইহুদিকে অবরোধ করা হয় এবং সবাইকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। মহল্লাটি সম্পূর্ণরূপে অধীকৃত হয় ও এর প্রাচীন সিনাগগগুলো ধ্বংস করা হয়।

১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলী ছত্রীসেনারা দখল করার আগ পর্যন্ত এটি জর্ডানের অধিকারে ছিল। কয়েকদিন পর পশ্চিম দেয়ালে প্রবেশের রাস্তা উন্মুক্ত করতে ইসরায়েলী কর্তৃপক্ষ পার্শ্ববর্তী মরক্কোন মহল্লা ধ্বংস করে ফেলার আদেশ দেয়। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইহুদি মহল্লা পুনরায় নির্মাণ করা হয়। এখানে বর্তমানে ২,৩৪৮ জন বাস করে (২০০৪ সালের হিসাবমতে) এবং বহু বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে গড উঠেছে। পুনর্নির্মাণের আগে এখানে যত্নসহকারে খননকার্য চালানো হয়। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নাহমান আভিগাদ এই কাজের তত্ত্বাবধান করেন। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ জাদুঘর ও বাইরের পার্কে প্রদর্শন করা হয়। এজন্য পর্যটকদেরকে বর্তমান শহরের দুই বা তিন তলা পর্যন্ত নিচে নামতে হয়। এই মহল্লায় "কারাইটেস স্ট্রিট" রয়েছে। এখানে প্রাচীন আনান বেন ডেভিড কেনেসা অবস্থিত। পুরনো শহরে একটি ক্ষুদ্র মরোক্কান মহল্লাও ছিল। ছয় দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর পশ্চিম দেয়ালে দর্শনার্থীদের বেশি সুবিধা দেয়ার জন্য এটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। যে অংশটি ধ্বংস করা হয়নি সেটি বর্তমানে ইহুদি মহল্লার অংশ হিসেবে রয়েছে। এরপর থেকে অমুসলিমরা মাগরিবি ব্রিজ দিয়ে টেম্পল মাউন্টে যেতে পারে। এটি অমুসলিমদের জন্য একমাত্র প্রবেশ পথ।

ক্রুসেডার রাজ্য জেরুজালেমের সময় জেরুজালেমের পুরনো শহরে চারটি ফটক ছিল। এদের প্রত্যেকটি একেক পাশে অবস্থিত ছিল। বর্তমানে অবস্থিত দেয়ালগুলো প্রথম সুলায়মান কর্তৃক নির্মিত হয় ও এর ফটক সংখ্যা এগারোটি। তবে সাতটি উন্মুক্ত রয়েছে। ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত ফটকগুলো সূর্যাস্তের আগে বন্ধ করে দেয়া হত ও সূর্যোদয়ের সময় বন্ধ করে দেয়া হত। নিম্নোক্ত চার্ট অনুযায়ী ফটকগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়কালে ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাধ্যমে নামগুলো চালু হয়

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00