📄 মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্প ভন্ডুল
১৯৬৩ সালের আগস্টে মাদ্রিদের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে দু'জন লোক ঢুকে মালিকের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। অস্ট্রিয়ার এই মালিকের নাম অট্টো স্করজেনি। তারা মালিককে ন্যাটোর অফিসার পরিচয় দিল এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা তার স্ত্রীর কাছে একটা চিঠি লিখে দিতে বলল।
খুব অল্পতেই ঐ সম্মানিত ব্যবসায়ী বুঝলেন, আগতরা তার অতীত-বর্তমান সবই জেনে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্করজেনি ছিলেন একজন ডাকসাইটে কর্মকর্তা। আসলে তার চেয়েও অধিক। এবং অবশ্যই জার্মানিতে। সুদর্শন, ডেয়ারডেভিল এই কম্যান্ডোর অভিযানগুলো ছিল তুলনা রহিত এবং দর্শনীয়। ১৯৪৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ছত্রী-সেনাদের একটি ব্যাটেলিয়ন নিয়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থান থেকে ফ্যাসিস্ট ডিকটেটর বেনিতো মুসোলিনিকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন। নাজিবিরোধী ইটালী সরকার মুসোলিনিকে জেল দিয়েছিল। এসএস ক্যাপ্টেন স্করজেনি মুসোলিনিকে হিটলারের সামনে উপহার দিলে তাকে অনেক পদক ও পদোন্নতি দেয়া হয়। স্করজেনি অসংখ্য বিপজ্জনক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। এজন্য তাকে ইউরোপের সবচে ভয়ানক মানুষ হিসেবে খেতাব দেয়া হয়েছিল।
যুদ্ধাপরাধ আদালত থেকে মুক্ত হয়ে স্করজেনি স্পেনে বসবাস শুরু করেন এবং তার ব্যবসাও বেশ জমে উঠে।
স্করজেনির কাছে আগত এই দুই যুবক বলল, আমরা আসলে ন্যাটোর গোয়েন্দা নই। আমরা ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের লোক। এই দুই লোক হল রাফি এইতান ও জার্মানিতে নিযুক্ত মোসাদ বাহিনীর প্রধান আব্রাহাম।
স্করজেনির মুখটা ইসরাইলের কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কেননা বছরখানেক আগে ইহুদি হত্যার জন্য তারা এডলফ আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছে। এবার কি তার পালা? সামনে বসা ছোটখাট লোকটা স্করজেনির ভয়টা ভাঙিয়ে দিল। গোয়েন্দাটি বলল, আপনার মিসরে খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে। একটা ব্যাপারে আমরা শুধু আপনার সহযোগিতা চাই।
১৯৬২ সালের ২১ জুলাই ইসরাইলে ইয়েসেলির আগমনের দুই সপ্তাহ পরে মিসর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সংবাদ জানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল। এর মধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি ১৭৫ মাইল করে, বাকি দু'টির ৩৫০ মাইল করে। ২৩ জুলাই মিসরের বিপ্লব দিবসের প্যারেডে বহু মিসাইল থরে থরে সাজিয়ে প্রদর্শিত হল। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এক বিশাল সমাবেশে বললেন, তাদের মিসাইল বহু বহু দূরের টার্গেটে হিট করতে সক্ষম।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের মূল টার্গেট হল ইসরাইল। অর্থাৎ ইসরাইলের যে কোনো স্থান তা আঘাতে সক্ষম। মিসরের এই সাফল্য ইসরাইলকে বিস্মিত করল এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মোসাদ-প্রধান ইসার হারেলের প্রতি ক্রোধপূর্ণ সব মন্তব্য করতে লাগলেন। কেন মোসাদ তাদেরকে আগে-ভাগে কিছু জানাতে পারল না। কেউ কেউ এমনও বললেন, নাসের যখন সাংঘাতিক সব অস্ত্র বানাচ্ছেন সেখানে হারেল ক্ষুদে ইয়েসেলিকে উদ্ধারে দেশ-বিদেশ করছেন।
উদ্বিগ্ন বেন গুরিয়ান আইসার হারেলকে ডেকে মিসরের রকেট-ক্ষেপণাস্ত্রের আপডেট দিতে বললে তিনি তাতে সম্মতি দেন। আইসার হারেল এক দক্ষ গোয়েন্দাকে এ ব্যাপারে মিসরে পাঠালেন। মাস-খানেকের মধ্যে হারেল বেন গুরিয়ানকে মিসরের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চিং সংক্রান্ত তথ্যাদি দিলেন।
আইসার হারেল রিপোর্টে লিখলেন যে, জার্মানির বিজ্ঞানীরা মিসরকে এ প্রকল্পে সহায়তা করছে।
১৯৫৯ সালে নাসের আনকনভেনশনাল অস্ত্র বানানোর লক্ষ্যে গোপন একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন।
নাসের এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেন সাবেক এয়ারফোর্স ইন্টেলেজিন্সের কমান্ডার জেনারেল খলিলকে। স্পেশাল মিলিটারি প্রোগ্র্যামস ব্যুরোর তিনি প্রধানও। তার ওপর দায়িত্ব পড়ল যুদ্ধবিমান, রকেট মিসাইল একই সাথে রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্র বানানোর। এই খাতে প্রচুর বরাদ্দও দেয়া হল।
জেনারেল খলিলের প্রথম কাজ হল, এসব অস্ত্র বানাতে সক্ষম ব্যক্তিদের এনে জড়ো করা। এবং তিনি জানতেনও, লোক কোথায় পাওয়া যাবে।
নাজি জার্মানিতে রকেট ইত্যাদি অত্যাধুনিক অস্ত্রাদি বানিয়েছে এমন দক্ষ বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের অনেক বেতন, ভাতা, বোনাস ও হাজারো সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জেনারেল খলিল তাদের মিসরে এনে জড়ো করলেন। এদের সংখ্যা তিন শতাধিক।
মিসরের একটি প্রকল্পের নাম ৩৬। এখানে যোগ দিলেন যুদ্ধবিমান বানাতে দক্ষ উইলি মেসেরস্পীট। তিনি একটি মিসরীয় যুদ্ধবিমান এসেম্বলিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেসেরস্পিটকে মারাত্মক যুদ্ধবিমান তৈরির জনক বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজি বিমান বাহিনীতে তিনি এই পদবি পান।
জেনারেল মোট তিনটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করে জগৎজোড়া বিজ্ঞানীদের সেখানে নিয়োগ দেন। তিনটি প্রকল্পের মধ্যে ৩৩৩ নম্বর প্রকল্পটি ছিল গোপন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এখানেও হিটলারের লোকজন ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে তৎপর ছিলেন।
মোসাদ-প্রধান আইসারের পর্যবেক্ষণ হল ১৯৬০ সালের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণের প্রকল্পগুলো পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করে। ঐ বছরই আমেরিকার একটি বিমান থেকে তোলা ছবির সূত্র ধরে বলা হয় ইসরাইল পরমাণু বোমা বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যানার হেডিং করে সেই খবর ছাপে। ইসরাইল যতই বলল, ওটা টেক্সটাইল কারখানা- কেউ তাতে কর্ণপাত করে না। এদিকে মিসরসহ আরব দেশগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। মিসর সিদ্ধান্ত নেয়, ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র বানানোর প্রকল্পগুলো আরও জোরেসোরে এগিয়ে নিতে হবে।
জার্মানিতে রকেট বানাতেন যে বিজ্ঞানীরা তাদের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ইউজেন স্যাঞ্জার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কয়েক বছর ফ্রান্সে কাটান; সেখানে তিনি ভেরোনিক রকেট বানান। এটি জার্মানিদের ভি২ রকেটের একটি সংস্করণ। এভাবে মিসরে জড়ো হওয়া জার্মান বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে বটেই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়কর অস্ত্র বানাতে শুরু করেন। ইউজেন স্যাঙ্গার মিসরীয় প্রকল্পে যোগ দিলে তার সঙ্গী সাথী বিজ্ঞানীদেরও সেখান নিয়ে আসেন। জার্মান ও মিসরীয়রা মিলে এসব প্রকল্পের জন্য কয়েকটি ফ্রন্ট অফিস খোলেন। হাসান কামিল নামের এক মিলিয়নিয়ার বাস করতেন সুইজারল্যান্ডে। তিনি লিয়াজোঁ করতেন মিসরীয় প্রকল্পে। তারা সুইজারল্যান্ডে দুটি ডামি কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি কোম্পানির কাজ ছিল মিসরীয় প্রকল্পের জন্য নানারকম যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ সংগ্রহের।
১৯৬১ সালে স্যাঙ্গার এবং কয়েকশত দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান মিসরীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু বছরের শেষ দিকে জার্মান সরকার জানতে পারে যে, তাদের স্টুটগার্টের প্রকল্পের কিছু লোক মিসরীয় প্রকল্পে কাজ করছে। জার্মান সরকার অতঃপর স্যাঙ্গারকে জার্মান যেতে বাধ্য করে। প্রফেসর পিলজ মিসরীয় প্রকল্পের প্রধান হন।
১৯৬২ সালের জুলাইয়ে মিসরের ৩৩৩ প্রকল্প ত্রিশটি মিসাইল বানিয়ে ফেলে। তার মধ্যে চারটি মিসাইল নির্দিষ্ট অতিথি ও সাংবাদিকদের দেখান হয়। কুড়িটি মিসাইল সে দেশের পতাকা জড়িয়ে কায়রোর রাস্তায় প্রদক্ষিণ করে।
মোসাদ-প্রধান হারেল আগস্ট মাসে বেন গুরিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় পিলজের লেখা একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। চিঠিটি মিসরের ৩৩৩ প্রকল্পের পরিচালক কামিল আজবকে লেখা। ঐ চিঠিতে পিলজ টাইপ টু'এর পাঁচশত মিসাইল টাইপ পাঁচশত মিসাইল বানানোর জন্য ৩৭ লক্ষ সুইস ফ্রাঙ্ক বরাদ্দের কথা বলেন। ঐ সব ক্ষেপণাস্ত্রের মেশিন পার্টস ও যন্ত্রপাতির জন্য ঐ টাকার প্রয়োজন। অর্থাৎ নয়শত মিসাইল বানাচ্ছে মিসর।
এই চিঠি দেখে ইসরাইলি শীর্ষ পর্যায়ে মাথা খারাপের যোগাড় হয়। মোসাদ-প্রধানের আশংকা জার্মানির বিজ্ঞানীরা প্রতারণার মাধ্যমে ইসরাইলকে ধ্বংস করতে চায়। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা পৃথিবীতে রোজ কেয়ামত ঘটিয়ে ছাড়বে। মিসরের অস্ত্রভাণ্ডারে এমন অস্ত্র আসছে যা যে কোনো জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হবে। ইসরাইলের ভূখণ্ডে এমন একটি নারকীয় গ্যাস তারা ছাড়তে সক্ষম হবে যার অস্তিত্ব বহুদিন অনুভূত হবে ইত্যাদি।
ঐ সময় ইসরাইলের চিফ অব স্টাফ ছিলেন জেনারেল জভি জুর। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, মিসরের অস্ত্র বানানোর বিষয়টি তারা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বিজ্ঞানীরা সৌখিন এবং তথ্যের ব্যবহার তারা জানে না।
মোসাদ-প্রধানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সব সময়ই ঈর্ষণীয়। সবাই তাকে ভালো বাসতেন, ভালো জানতেন। কিন্তু আইচম্যানকে আটকের পর তার মানসিকতা ও চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। স্টিলের মতো শক্ত এই মানুষটি এখন জার্মানির বিরুদ্ধে লেগেছেন। কেননা জার্মানির বিজ্ঞানীরা ইসরাইল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। মোসাদ-প্রধান বেন গুরিয়ানকে বললেন, জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে কথা বলতে। বেন গুরিয়ান জার্মান চ্যান্সেলর কোনোরাদ এডেনাউয়ের সঙ্গে তাদের বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। কেননা সম্প্রতি জার্মানি ইসরাইলের একটি মরুভূমির উন্নয়নে পাঁচশত মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। গুরিয়ান ও জার্মান চ্যান্সেলরের মধ্যে সম্প্রতি ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রানিজ যোশেফ ইসরাইলকে শত শত কোটি টাকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাংক, কামান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ইত্যাদি। সবই বিনামূল্যে। হালোকাস্টের মাধ্যমে জার্মানির পক্ষ থেকে ইহুদিদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এই উপহার। বেন গুরিয়ান বর্তমান জার্মান সরকারকে বিশ্বাস করেন এবং মিসরকে কেন্দ্র করে তিনি এই সম্পর্ক কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না। গুরিয়েন তার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শিমন পেরেজকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখার পরামর্শ দেন।
কিন্তু এতটুকুতে মোসাদ-প্রধান আইসার সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মিসরে জার্মানদের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে ব্যক্তিগতভাবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর প্রতিজ্ঞা করেন।
১৯৬২ সনের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় এক অপরিচিত ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীর চেহারার একজনকে সঙ্গে নিয়ে মিউনিখে মিসরীয়দের উল্লেখিত একটি প্রকল্প অফিসে আসে। আধঘণ্টার মধ্যে হেনজ ক্রুগকে নিয়ে তারা ভবন ত্যাগ করে।
পরদিন সকালে মিসেস ক্রুগ পুলিশকে জানান যে, তার স্বামী নিখোঁজ। দুদিন পরে পুলিশ ক্রুগের সাদা মাইক্রোবাস গাড়িটি মিউনিখের শহরতলী থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। গাড়িটি কাদা দিয়ে ল্যাপা ছিল এবং ট্যাঙ্কে এক ফোঁটাও পেট্রোল ছিল না। অচেনা এক লোক ফোন করে ক্রুগের মৃত্যুর সংবাদ দেয়। পুলিশ অবশ্য অন্য একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছিল, মোসাদ ক্রুগকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে গেছে। যাহোক এখন সন্দেহাতীত যে, ক্রুগ মারা গেছেন।
২৭ নভেম্বর পিলজের সেক্রেটারি ওয়েন্ডি তার ৩৩৩ ফ্যাক্টরির অফিসে একটি খাম দেখতে পান। প্রেরক হামবুর্গের বিশিষ্ট আইনজীবী। ওয়েন্ডি খামটি খোলামাত্র একটা বিস্ফোরণে অফিসটি কেঁপে উঠে। পিলজের সেক্রেটারি কয়েক মাস হাসপাতালে কাটালেও তার চোখ অন্ধ হয়ে যায়। তার মুখমণ্ডল বিকৃত এবং তিনি কালো হয়ে যান।
পরের দিন মিসরের ৩৩৩ নম্বর ফ্যাক্টরির ঠিকানায় এক বই প্রকাশকের অফিস থেকে একটা প্যাকেট আসে। প্যাকেটে লেখা ছিল বই। যখন এক মিসরীয় ক্লার্ক সেটি খোলে অমনি তা বিস্ফোরিত হলে পাঁচজন লোক নিহত হয়। প্যাকেটে প্রকাশকের যে ঠিকানা ছিল তা স্পষ্টতই ভুয়া ছিল।
এরপর জার্মানি থেকে এবং মিসরের ভেতর থেকে এরকম প্যাকেট আসতে থাকে। সেগুলো বিস্ফোরিত ও লোকজন আহত হতে থাকে।
পরবর্তীতে মিসরের অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্প থেকে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। সেনাবাহিনী বেশ কিছু বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়ও করে। মিসরবাসী এবং সাংবাদিকদের বুঝতে বাকি থাকে না কায়রোতে এর প্রেরক ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। আরও পরে জানা যায় কিছু পার্সেলের প্রেরক 'শ্যাম্পেন স্পাই' নামের এক গোয়েন্দা। মিসরেই ভিন্ন পরিচয়ে তিনি থাকেন এবং জার্মানির সাবেক এসএস অফিসার বলে পরিচয় দেন। জার্মান স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কায়রোতে স্থায়ী এবং মিসরের হাই সোসাইটি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের খুব ঘনিষ্ঠ।
পত্রবোমা জার্মান বিজ্ঞানীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে এবং তাদের প্রাণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করেন। প্রেসিডেন্ট নাসেরের প্রকল্পে তাদের এবং তাদের স্বজনদের কাজ না করার জন্য বেনামে ফোন দেয়া হতে থাকে। নাসেরের তিন প্রকল্পে কড়া নিরাপত্তা দেয়া শুরু হয়। জার্মানিতেও তাদের অফিসে কড়া নিরাপত্তা চালু হয়। বিজ্ঞানীরা যখন ইউরোপ যেতেন তখন তারা একসঙ্গে থাকতেন এবং জার্মান পুলিশের সাহায্য নিতেন। এর ফলে সম্ভবত প্রফেসর পিলজের ১৯৬২ সালের শেষার্ধে একবার জীবন রক্ষা পায়। তাকে মোসাদ ফলো করলেও হত্যার সুযোগ পায়নি।
মোসাদ-প্রধান আইসার ১৯৬২ সালের অধিকাংশ সময় মিসর-ইস্যুতে ইউরোপেই কাটান এবং মোসাদ গোয়েন্দাদের নানাকাজে নিয়োগ করেন। রাফি এইতান বিজ্ঞানীদের চিঠিপত্র গায়েবে ওস্তাদ এবং এজেন্ট নিয়োগের পরিবর্তে এ কাজে তিনি সাফল্য দেখান। এইতানের মতে, চিঠিপত্রের মাধ্যমে ফার্স্টক্লাস ম্যাটেরিয়াল পাওয়া যায়।
অপ্রচলিত পন্থায় অভিযান চালানোর জন্য এইতানের কিছু ইলেকট্রোনিক যন্ত্রপাতি দরকার। কিন্তু সেগুলো দোকানে পাওয়া যায় না। এসব যন্ত্রপাতি সিআইএসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে এইতান ল্যান্সকি নামের এক ডাকাতের সন্ধান পান মিয়ামিতে। সে-ও ইহুদি। তাকে ফোনে পাওয়া গেলে সে জানায়, সুইজারল্যান্ডে এক মাসের মধ্যে সে এইতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ল্যান্সকি এইতানের শিকাগোর এক লোকের ঠিকানা দিলে তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।
মোসাদ-প্রধানের এবারের টার্গেট ড. অট্টো জোকলিক। সূত্র মতে, ড. জোকলিক একজন অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী এবং পরমাণু রেডিয়েশনে তার বিশেষ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। তার আরেকটি বিশেষত্ব হল স্বল্প সময়ে তিনি পরমাণু বোমা বানাতে পারেন। ড. অট্রো জোকলিকের জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ ক্রয়ের জন্য মিসর অস্ট্রিয়ায় একটি ফ্রন্ট অফিস খোলে। ওখান থেকে মালামাল মিসরে পাঠানো হবে। জোকলিক মিসরের জন্য দুটি পরমাণু পরীক্ষা চালাবেন এবং বেশ কিছু পরমাণু বোমা বানাবেন যা ক্ষেপণাস্ত্রের ওভারহেডে যুক্ত করা হবে।
এসব ঘটনায় সহজেই অনুমেয় জোকেলিক একজন ভয়ংকর মানুষ। এমনও হতে পারে জার্মানির বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচে ভয়ংকর। মোসাদ জরুরি ভিত্তিতে জোকলিককে খুঁজে বের করতে ইউরোপে তাদের সব গোয়েন্দার কাছে বার্তা পাঠায়।
১৯৬২ সালের ২৩ অক্টোবর মোসাদ-প্রধান আইসার একটি ঘটনায় স্তম্ভিত। ইউরোপে ইসরাইলি দূতাবাসের কলিংবেল টিপে এক লোক নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। সেখানে তিনি বললেন, আমিই অট্টো জোকলিক। মিসরের জন্য আমি যেসব মারণাস্ত্র বানাচ্ছি তার একটি প্রতিবেদন ইসরাইলকে দিতে আমি প্রস্তুত।
দুই সপ্তাহ বাদে ব্যাপক গোপনীয়তার মধ্যে জোকলিক ইসরাইল যান। বেশ কয়েকমাস পরে জোকলিকের স্বপক্ষ ত্যাগের বিষয়টি যখন প্রকাশ্যে এল তখন ইউরোপের সাংবাদিকরা লিখতে শুরু করলেন যে, তিনি ইসরাইলিদের সঙ্গে ভিড়েছেন। বিশেষ করে ক্রুগের মৃত্যুর পরে। প্রকৃতপক্ষে জোকলিক সব সময়ই ক্রুগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ক্রুগ অপহৃত হলে জোকলিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার আশংকা ক্রুগ যদি ইসরাইলিদের দ্বারা অপহৃত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তার নাম বলেছেন। মিসরীয়দের অস্ত্র প্রকল্পে তার গুরুত্বের কথা বলেছেন। ফলে জোকালিক ভাবলেন, ইহুদিদের হাতে তার মৃত্যু অবধারিত। ফলে তিনি স্বপক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ইসরাইলিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। আর জীবন বাঁচাতে যে তিনি এটা করেছেন তা বলাই বাহুল্য।
জোকলিক ইসরাইলে ছিলেন। মোসাদ তাকে সার্বিক নিরাপত্তা দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে রেখেছিল। মোসাদ-প্রধান তাকে বিশেষ দুটি কাজে লাগাতে চাইলেন। প্রথমত, তার মাধ্যমে মিসরীয় প্রজেক্ট সম্পর্কে তথ্য পাওয়া; আরেকটি হল মিসরে ফিরে গিয়ে মোসাদের পক্ষ হয়ে কাজ করা। এক কথায় ডাবল এজেন্ট।
অট্টো জোকলিক ইসরাইলিদের জানান, একজন সিনিয়র জার্মান ক্লার্কের মাধ্যমে তার সঙ্গে জেনারেল খলিলের পরিচয় ঘটে এবং নিয়োগ লাভ করেন।
মিসরীয়দের একটি প্রকল্পের নাম ছিল ক্লিওপেট্রা। এই প্রকল্পের দুটি পরমাণু বোমা বানানোর কথা। জোকলিক এক্ষেত্রে প্রতিভাদীপ্ত দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলেন। তার যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে ২০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনে জার্মানি ও হল্যান্ডে তা আরও সমৃদ্ধ করে বিশেষ পরমাণু শক্তিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা ছিল। এক্ষেত্রে জার্মানি ও হল্যান্ডের তিনজন জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীকে তিনি তালিকাভুক্ত করেন। আর ঐ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়েই পরমাণু বোমা বানানো হবে।
জোকলিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। তিনি জার্মান বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে কথাও বলেন এবং মিসরে পরমাণু বোমা বানানোর দাওয়াত দেন। ইউরোপ থেকে তিনি বেশ কিছু নিকেল জাতীয় জিনিস কেনেন এবং তা কায়রোতে পাঠাতে সক্ষম হন।
জোকলিকের রিপোর্ট বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেননি। প্রথমত শতকরা কুড়ি ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাওয়া কঠিন। আরও কিছু হিসাব কষে বিশেষজ্ঞরা বললেন, জোকলিকের ফর্মুলা ভুল।
বিশেষজ্ঞদের শীতল মন্তব্য মিসরের নেতাদের দমাতে ব্যর্থ হল। মিসরীয়রা রাসায়নিক অস্ত্র বানাচ্ছে এ নিয়ে রিপোর্ট ছাপা হলে তারা আরও সতর্ক হয়। ১৯৬৩ সালের ১১ জানুয়ারি মিসর ইয়েমেনে সঙ্গে যুদ্ধে পয়জন গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে বিশ্ববাসী ও উল্লেখিত বিজ্ঞানীরা বললেন, তাদের ধারণা অমূলক নয়। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে বিষয়টি জানান। গোল্ডা মেয়ার তাকে বলেন যে, মিসর আনকনভেনশনাল ওয়ারহেড ব্যবহার করে মিসাইল বানাচ্ছে। কেনেডিকে তিনি হস্তক্ষেপ করতে বলেন। কিন্তু কেনেডি এ নিয়ে কিছুই করেননি।
আনকনভেনশনাল ওয়ারহেডস খুবই ভয়ানক। কিন্তু মিসর তাদের প্রথম অগ্রাধিকার দিল মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করার কাজে।
১৯৬৩ সালের শীতকালে মিসরের ৩৩৩নং ফ্যাক্টরির গাইডেন্স বিশেষজ্ঞ ড. ক্লেইনওয়াচার কয়েক সপ্তাহের জন্য জার্মান আসেন। নিজের ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে অন্ধকার ও সরু গলি দিয়ে তিনি তার বাসায় যাচ্ছিলেন। রাস্তায় অনেক পুরু বরফও ছিল। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একটি গাড়ি এসে তার পথ আটকায়। গাড়ি থেকে একটি লোক নেমে ক্রেইনওয়াচারের দিকে এগোতে থাকে। বিজ্ঞানী তৃতীয় একটি লোককেও গাড়িতে দেখতে পান। আগত ব্যক্তিটি ক্লেইনওয়াচারের কাছে জানতে চান ড. সেনকার কোথায় থাকেন? উত্তরের জন্য কোনো অপেক্ষা না করেই লোকটি তার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার দিয়ে ক্লেইনওয়াচারকে গুলি করে। গুলিতে গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে যায় এবং ক্লেইনওয়াচারের উলের মাফলারে আটকে যায়। ক্রেইনওয়াচার তার রিভলবার বের করার আগেই আততায়ী দ্বিতীয় একটি গাড়িতে চড়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ দেখে যে, ঘটনাস্থল থেকে একশ গজ দূরে প্রথম গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আগত তিনজনই আরেকটি গাড়িতে করে পালিয়েছে। তারা আলি সামিরের একটি পাসপোর্ট ফেলে যায়। আলি সামির হলেন মিসরীয় গোয়েন্দা বাহিনীর একজন প্রধান। তিনি তখন কায়রোতে। যাহোক, ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলাকারীদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবগুলো পত্রিকারই একই মন্তব্য, এ হত্যা প্রচেষ্টা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের। যদিও এবারের হত্যা চেষ্টা সফল হয়নি।
মোসাদের এবারের টার্গেট সুইজারল্যান্ডে জার্মান বংশোদ্ভূত ড. পলে গোয়েরকেকে নিধন!
ক্লেইনওয়াচারের অনুরূপ গোয়েরকে মিসরের মিসাইল প্রজেক্টে গাইডেন্স সিস্টেমে কর্মরত। তিনি মিসরের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা পান। মোসাদের কাছেও ভিন্ন কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়েরকের মেয়ে হেইদির জার্মানিতে সুইস সীমান্তের কাছে বসবাস। ক্লেইনওয়াচারের ওপর মোসাদের হামলার পর ড. জোকলিক হেইদিকে ফোন করে বলেন যে, তার বাবার সাথে মিসরে তার দেখা হয়েছে। সেখানে তিনি ইসরাইল ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিপজ্জনক অস্ত্র বানাচ্ছেন। জোকলিক হেইদিকে ইংগিত করেন যে, তার বাবা যদি ঐ বিপজ্জনক কাজ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। এর বিকল্প হল, যদি তিনি মিসর ত্যাগ করেন, তাহলে ভয়ের কিছু নেই।
জোকলিক উপসংহারে হেইদিকে বলেন, যদি তুমি তোমার বাবাকে ভালোবাস, তাহলে শনিবার ২ মার্চ বিকাল ৪টায় আমার সঙ্গে বাসেলের থ্রি কিংস হোটেলে দেখা কর। অস্থির হেইদি অবিলম্বে সাবেক নাজি অফিসার এইচ মানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মান আবার মিসরের অস্ত্র প্রকল্পে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের দায়িত্বে নিয়োজিত। মান পুলিশকে বিষয়টি জানালে তারা আবার তা সুইস কর্তৃপক্ষকে জানায়। জোকলিক এবং তার বন্ধু যখন থ্রি কিংস হোটেলে ঢোকেন তখন হোটেলের পেছনে পুলিশের বেশ কিছু গাড়ি মোতায়েন করা। লবিতে গোয়েন্দা মোতায়েন, হেইদিরা যে টেবিলে বসবে সেখানে টেপরেকর্ডার সেট করা- সব আয়োজনই সমাপ্ত।
জোকলিকের সঙ্গে ছিলেন মোসাদ গোয়েন্দা যোশেফ বেন গাল। তারা ফাঁদে পা দিলেন। তারা এসবের কিছুই সন্দেহ করেননি এবং হেইদির সঙ্গে ঘণ্টা খানেক কথা বলেন। সতর্ক থাকার কারণে তারা হেইদিকে কোনো ভয় দেখাননি বরং যদি তার বাবা মিসরে উল্লেখিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকেন, তাহলে কী ধরনের ক্ষতির আশংকা তার নজির দেখালেন। তারা হেইদিকে কায়রোর একটি বিমান টিকেট দিতে চাইলেন। তাদের বক্তব্য, হেইদি যেন মিসরে গিয়ে তার বাবাকে বুঝায় এবং জার্মানিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জার্মানিতে তাদের পরিবারের কারো কোনো ভয় নেই।
মিটিংশেষে তারা দু'জনই জুরিখে চলে যান। সেখান থেকে তাদের পৃথক যাত্রা শুরু হয়। জোকলিক যখন আরেকটি ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ তখনই সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মোসাদ গোয়েন্দা বেন গালকে ইসরাইলি কনস্যুলেটের কাছে গ্রেফতার করা হয়। ঐ দিনই অপরাহ্নে জার্মান পুলিশ সুইস কর্তৃপক্ষকে ঐ দুই ব্যক্তিকে এক্সট্রাডিয়েট করতে বলে। হেইদিকে ভয় দেখানো এবং ড. ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
ইউরোপের সদর দফতরে বসেই মোসাদ-প্রধান আইসার সুইস কর্তৃপক্ষকে বেনগাল এবং জোকলিককে ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু জার্মানির এক্সট্রাডিশন অনুরোধের কারণে তা সম্ভব নয় বলে সুইস পুলিশ জানায়। আইসার অবশেষে ইসরাইল ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেষদিকে তারা দু'জনই মিসরকে নিয়ে জার্মানির আচরণে বিরক্ত ছিলেন।
গোল্ডা মেয়ার বলেন, ইসরাইল যদি জার্মান চ্যান্সেলরকে বলে তাহলে হয়তো পশ্চিম জার্মানি এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নিতে পারে।
মোসাদ-প্রধান দ্রুত টাইবেরিয়াসে চলে যান। সেখানে তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ান অবকাশে ছিলেন। মোসাদ-প্রধান অবিলম্বে পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনে প্রতিনিধি পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন। এই প্রতিনিধিদল পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলরকে প্রমাণাদিসহ দেখাবে যে, মিসরে জার্মানির বিজ্ঞানী রকেট ইত্যাদি বানাতে লিপ্ত। এ এক ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন। একই সাথে জার্মানি যেন এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নেয়।
কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন এতে অস্বীকৃতি জানান।
আইসার নাছোড়বান্দা। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, যদি গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় তাহলে পুরো ব্যাপারটিই নস্যাৎ হয়ে যাবে। আইসার বলেন, বেন গালের গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হওয়ামাত্র জার্মান বিজ্ঞানীদের মিসরের কার্যকলাপ প্রকাশ্যে এসে যাবে। তখন ইসরাইল বলতে পারবে বেনগালের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড সংগতিপূর্ণ ছিল। আমরা এ কথাও বলতে পারব যে, মিসর রকেট বানানোসহ অন্যান্য প্রকল্পে জার্মানির বিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়েছে।
বেন গুরিয়েন কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন এবং অবশেষে বললেন 'সো বি ইট'।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন ও মোসাদ-প্রধান আইসারের সম্পর্কে এই প্রথমবারের মতো চিড় ধরল।
১৯৬৩ সালের ১৫ মার্চ ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল জোকলিক ও বেনগালের গ্রেফতারের সংবাদটি ছাপল। মিসর সরকারের প্রকল্পে কর্মরত জার্মান বিজ্ঞানীর মেয়েকে ভয় দেখানোর কারণে এই গ্রেফতার।
মোসাদ-প্রধান আইসার দৈনিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদকদের নিয়ে গোপন বৈঠক করলেন। সেখানে তিনি জোকলিকের ভূমিকার উল্লেখ করলেন। বললেন, জোকলিক মিসরের প্রজেক্টে কাজ করতেন কিন্তু এখন পক্ষ বদলেছেন। আর সেখানে একটি ধ্বংসযজ্ঞ বাধানোর কাজে জোকলিক লিপ্ত ছিলেন। এখন সেই ক্ষতি পোষাতে স্বেচ্ছায় তিনি ইসরাইলের পক্ষে কাজ করছেন।
এদিকে মোসাদ-প্রধানের সহযোগীরা ইসরাইলের সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে লাগলেন। ইসরাইলের তিন সাংবাদিক বিস্তারিত রিপোর্ট করতে ইউরোপ যান। তারা ইউরোপ থেকে জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট লিখে পাঠাতে থাকেন। মোসাদ গোয়েন্দাদের বিদেশে পাঠিয়ে ইসরাইলিপন্থী সাংবাদিকদের দিয়েও জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়।
মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল ঠিক বুঝতে পারছেন না, জার্মানইস্যু ইসরাইলে কেন এতেঠ স্পর্শকাতর ব্যাপার হয়ে উঠল। জার্মানির প্রতি তার লাগামহীন আক্রমণে ইসরাইলের মানুষ যেন ফুঁসে উঠেছে। ঘরে ঘরে জার্মানির বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রচারণা চলছিল।
এদিকে মার্চের ১৭ তারিখ থেকে ইসরাইল ও বিদেশিদের তুলোধোনা শুরু হল পত্র-পত্রিকায়। পত্রিকায় আরও বলা হল, পশ্চিম জার্মানির এসব বিজ্ঞানীরা সাবেক নাজি। তারা এমন মারণাস্ত্র নেই যা মিসরের হয়ে বানাচ্ছে না। এমনও বলা হল, ঐ বিজ্ঞানীরা ইসরাইলে প্লেগ ছড়িয়ে দেবে। এমন বিষাক্ত বিষ ছাড়বে যা ইসরাইলের বাতাসে নব্বই বছর ধরে বহমান থাকবে। পত্রিকাগুলো এমন লেখাও লিখল যে, হিটলারের পন্থা অবলম্বন করেই জার্মানি নতুন করে ইহুদিনিধনে মেতেছে। জার্মান সরকারকেই এজন্য দায়ী করা হল।
বেনগাল ও জোকলিকের সাজা হল সামান্যই। তাদেরকে দু'মাস করে জেল দেয়া হল। হঠাৎ বিচারক লক্ষ করলেন, একটি লোক আদালতে বন্দুক নিয়ে ঢুকেছে। রেগে গিয়ে বিচারক বললেন, কোনো সাহসে আপনি বন্দুক নিয়ে আদালতে ঢুকেছেন?
বন্দুকধারী বললেন, চব্বিশ ঘণ্টা বন্দুক নিয়ে ঘোরার অনুমতি রয়েছে আমার। মিসরে জার্মান বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার। তিনি তার নাম বললেন, এইচ মান। মান হলেন সেই লোক; বিজ্ঞানীর মেয়ে হেইদি গোয়েরকে যাকে প্রথম ঘটনাটা জানিয়েছিল।
এই মানই জার্মান পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন।
সাদা পোশাকের এক মোসাদ গোয়েন্দা আদালতকক্ষ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পুরো বিষয়টি তার সুপিরিয়ারদের জানাল। আরেক মোসাদ গোয়েন্দা দ্রুত চলে গেল ভিয়েনায়। দেখা গেল নাজিদের এক আততায়ী সিমনের সঙ্গে। সিমন মোসাদকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিল।
মোসাদ গোয়েন্দা সিমনের কাছে জার্মান নাগরিক মানকে চেনেন কিনা জানতে চাইল। সিমন কিছুক্ষণ পর আর্কাইভ থেকে এইচ মানের ফাইলটি নিয়ে এল। জানাল, মান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এসএস অফিসার ছিল। কর্নেল অট্টোর অধীনে সে একটা কমান্ডো বাহিনীতে কাজ করত। এক পর্যায়ে স্করজেনি'র নাম আসে। এই রচনার শুরুতেই স্করজেনি'র উল্লেখ রয়েছে। মোসাদের দু'জন গোয়েন্দা তার কাছেই গিয়েছিল। কেননা স্করজেনি'র পক্ষেই সম্ভব তার অধীনস্থ সাবেক কর্মী মান সম্পর্কে তথ্য প্রদানের। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা স্করজেনি'র স্ত্রীকে প্রথম খুঁজে বের করা হল। মহিলা প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করলেন মোসাদ গোয়েন্দাদের।
মোসাদ স্করজেনিকে তাদের গোয়েন্দা হতে বলল। স্করজেনি মোসাদের লোকদের বললেন, আমি তোমাদের কী করে বিশ্বাস করব? কেননা তোমরা যুদ্ধাপরাধের দায়ে আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছ। এরপর তোমরা যে আমাকে ফাঁসি দেবে না তার নিশ্চয়তা কী।
মোসাদ গোয়েন্দা বললেন, আপনার ভয়ের কোনো কারণ ঘটবে না সে গ্যারান্টি আমরা আপনাকে দিচ্ছি। মোসাদ গোয়েন্দা এক পাতা কাগজ নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের পক্ষে তাকে সফল অপকর্ম থেকে অব্যাহতিপত্র দিলেন এবং তার প্রতি কোনো সহিংস আচরণ করা হবে না বলেও লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেন। স্করজেনি অবশেষে ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে সম্মত হলেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার হাতে খুন হয়েছে অসংখ্য ইহুদি।
কয়েক মাসের মধ্যে স্করজেনি এইচ মানের সহযোগিতায় মিসরে দায়িত্বরত জার্মান বিজ্ঞানীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচরণ এবং মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্পের অগ্রগতির সর্বশেষ খবর মোসাদের হাতে পৌঁছে দিলেন।
এদিকে ইসরাইলে জার্মানবিরোধী প্রচারণা আরও তুঙ্গে উঠল। প্রবন্ধ, প্রতিবেদন কার্টুনের মাধ্যমে বলা হচ্ছিল যে, ১৯৩৩ সালের জার্মানি ১৯৬৩ সালেও বদলায়নি। তখন তারা ৬০ লক্ষ ইহুদিনিধন করেছে। এখন মিসরের মাধ্যমে নতুন করে ইহুদি নিধনে জার্মানরা মত্ত। ইসরাইলের সংসদে মেনাহেম বেগিন কঠোর ভাষায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের সমালোচনা করলেন। গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে মোসাদ-প্রধানের মিত্রতা ছিল। তিনিও সংসদে তারস্বরে বললেন, মিসর যে অস্ত্র বানাচ্ছে তাতে ইসরাইলের নাগরিকসহ সব প্রাণীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
কিন্তু ইসরাইলের আরেকটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আমান মোসাদের ভয়াবহ বিবরণের বিরোধিতা করল। তারা এ-ও বলল, মিসরে যেসব জার্মান বিজ্ঞানী মারণাস্ত্র বানাচ্ছে তারা মাঝারি মানের। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জেনারেল মেই'র অভিমতও অনুরূপ।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের হাতে আমানের রিপোর্টটি পৌঁছলে তিনি মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠান। তিনি হারেলের কাছে তার সংবাদের উৎস জানতে চান এবং প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা চান। মোসাদ-প্রধান ইউরোপে ইসরাইলি সাংবাদিক প্রেরণের কথা স্বীকার করেন এবং মিসরের বিষাক্ত গ্যাস কিম্বা নিকেলের তৈরি বোমা বানানোর ব্যাপারে তার কাছে তথ্য নেই বলে জানান। পরের দিন আমান-প্রধান প্রধানমন্ত্রীকে আরও বলেন, মিসরের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক বটে কিন্তু ইসরাইলি শাসকদের যেভাবে আতঙ্কিত করা হচ্ছে সে রকম কিছু নয়।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন মোসাদ-প্রধান আইসারকে আবার ডেকে পাঠান। এই সময় প্রধানমন্ত্রী ও মোসাদ-প্রধানের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী জার্মানির সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। আইসার এক পর্যায়ে নিজের অফিসে চলে আসেন। নিজের পদত্যাগপত্র লিখে পাঠিয়ে দেন।
বেন গুরিয়েন তার সংস্থা থেকে বের হয়ে না যাওয়ার জন্য আইসারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু আইসার ছিলেন অ্যাডামেন্ট। শেষ হয়ে গেল একটি অধ্যায়ের।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন নতুন কাউকে মোসাদ-প্রধান না করা পর্যন্ত তাকে ঐ পদে থাকতে বললেও আইসার তাতে রাজি হননি। আইসার একজনকে বলেন, বেন গুরিয়েন যেন কাউকে পাঠিয়ে তার কাছ থেকে চাবির গোছা নিয়ে নেন।
বেন গুরিয়েন তার সেক্রেটারিকে আমোসের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। কেননা মোসাদ-প্রধানের পদ তো খালি রাখা যায় না।
কিন্তু সাবাক-প্রধান আমোস তখন বিদেশে, স্বজনদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন।
বেন গুরিয়েন অতঃপর জেনারেল মেইর অমিতকে ডেকে পাঠালেন। তিনি ছিলেন এক অভিযানে। রেডিওবার্তার মাধ্যমে তাকে অবিলম্বে তেলআবিবে আসতে বলা হল। ফিরে এসে তিনি শুনলেন, তাকে মোসাদের উপ-প্রধান করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পরে মেইর অমিতকে মোসাদের প্রধান করা হয়।
জার্মানিতে লেখা পেরেজের চিঠির ফলশ্রুতিতে জার্মান সরকার আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মাধ্যমে মিসরে কর্মরতদের দেশে ফিরিয়ে আনলেন। তাদের জার্মানির বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ দেয়া হল। কয়েকজন নিজের থেকেই মিসর ত্যাগ করলেন। তারা মিসাইল বানানো শেষ না করেই চলে এসেছিলেন।
ড. ওয়েনহারকে নাসা'র ব্লু আইড বয় বলা হয়। জার্মানির বিজ্ঞানীদের তালিকা দেখে তিনি এক লেখককে বলেন যে, উক্ত দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীদের পক্ষে কার্যকর মিসাইল বানানো অসম্ভব।
জার্মান বিজ্ঞানীদের কারণেই আইসার হারেলের পতন হল। এদিকে মেইর অমিত যতদিন মোসাদ-প্রধান ছিলেন ততদিন তাকে আইসার হারেলের কটু ও বিদ্বেষপূর্ণ কথা শুনতে হয়েছে।
জার্মান বিজ্ঞানীদের নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়ায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের রাজনৈতিক কারিশমা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কয়েক মাসের মধ্যে বেন গুরিয়েন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
📄 যারা কখনো ভুলবে না
১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে চল্লিশের কাছাকাছি বয়সী বলিষ্ঠ ও সানগ্লাস পরা এক লোক প্যারিস থেকে হল্যান্ডে এসে নামল। অ্যান্টন কুঞ্জলে নামে একটি নামি হোটেলে সে উঠল। পরিচয় দিল অস্ট্রিয় ব্যবসায়ী। ডাকঘরে সে অ্যান্টন কুঞ্জলে নামেই একটা পোস্টবক্স ভাড়া করল। তিন হাজার ডলার জমা দিয়ে ব্যাংকে একটা একাউন্ট খুলল। একই নামে সেই বিজনেস কার্ড বানাল। সেখানে তার পরিচয় একটি লগ্নিকারক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। সেখান থেকে সে গেল ব্রাজিলের কনস্যুলেটে এবং ব্রাজিলে টুরিস্ট হিসেবে যাওয়ার জন্য একটা ফর্ম ফিলাপ করল। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ভাসাভাসাভাবে সে চেকআপ করাল এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট নিল। অতঃপর চোখের ডাক্তার দেখিয়ে মোটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের অর্ডার দিল। চোখের ডাক্তারের কাছে সে মিথ্যা বলেছে এবং ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের তার দরকারও নেই।
পরের দিন সে জুরিখে গিয়ে ৬ হাজার ডলার জমা দিয়ে ক্রেডিট সুইস ব্যাংকে একাউন্ট খুলল। সেখান থেকে প্যারিসে ফিরে এক মেকাপম্যানকে দিয়ে ঝোপঝাপের মতো গোঁফ লাগিয়ে মোটা চশমা পরে পাসপোর্টের জন্য কতগুলো ছবি তুলল। রডেরড্যামে ফিরে ব্রাজিলের কনস্যুলেটে গিয়ে ব্রাজিলের টুরিস্ট ভিসার সিল সে তার অস্ট্রিয়ান পাসপোর্টে লাগাল। এখন সে রিওডি জেনেরিওতে যাওয়ার জন্য প্লেনের টিকেট কিনতে পারবে। সে সাওপাওলো এবং উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতেও যাবে। সে যেখানেই যাবে, ভাষা তার জন্য কোনো সমস্যা নয়। বাকপটুও সে। সর্বত্রই সে তার রমরমা ব্যবসার কথা বলবে। বড় ব্যবসায়ীর ভড়ং ধরতে হয় বিধায় সে সব সময়ই ভালো হোটেল ও ক্যাফেতে গিয়ে থাকে। আর এভাবেই মোসাদ গোয়েন্দা আইজাক সারিদ (প্রকৃত নাম নয়) তার নিজের জন্য একটা ফুলপ্রুফ আদল তৈরি করে নিয়েছে।
মাত্র কয়েকদিন আগে প্যারিসের এক বৈঠকে সারিদকে উপস্থিত থাকতে হয়। মোসাদের কায়েসারা নামের একটি অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটের সে সদস্য। সেখানে বস ইয়ারিব তাকে বিফিং দেয়। ইয়ারিব তাকে বলে, পশ্চিম জর্ডান সরকার পার্লামেন্টে একটা যুদ্ধাপরাধী আইন করতে যাচ্ছে। সেই আইনে যেসব যুদ্ধাপরাধী নাজি আত্মগোপনে রয়েছে তাদেরকে জনসম্মুখে আসার সুযোগ দেয়া হবে। তবে তারা নতুন করে আর অপরাধকর্মে জড়াবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইয়ারিব জানায়, জার্মানি চাইছে অতীত খুঁড়ে আর লাভ নেই। এদিকে ইসরাইল দীর্ঘদিন 'পালিয়ে থাকা নাজি যুদ্ধাপরাধী আইচম্যানকে ধরে ফাঁসি দেয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের ধরার অভিযান অনেকখানি স্তিমিত হয়ে পড়ে। এদিকে ইসরাইলের মনোভাব হল, নাজি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলতে থাকাই বাঞ্ছনীয়। কেননা বিশ্ববাসী দেখুক, অপরাধীদের নিস্তার নেই।
ইয়ারিব এ পর্যায়ে মোসাদ গোয়েন্দা সারিদকে দায়িত্ব দেয় 'রিগার কসাই' নামে খ্যাত লাটভিয়ার এক নাজিকে ধরার জন্য। তার নির্দেশে ত্রিশ হাজার ইহুদি নিধন হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। তাকে সঠিকভাবে চিহ্নিতও করা হয়েছে। সে ব্রাজিলে তার প্রকৃত নাম হারবার্ট কুকুরস নামেই পরিচিত। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত কুকুরসকে পাকড়াও করতে সবুজ সংকেত দিলেন।
ইয়ারিব জানেন, গোয়েন্দা হিসেবে সারিদের দক্ষতার কথা। আইচম্যানকে ধরার অভিযানে সারিদ ছিল। জার্মানিতে জন্ম সারিদের বাবা-মা দু'জনই হলোকাস্টে নিহত। ইয়াবিরের পরামর্শ, সারিদকে বলা হল, তুমি প্রথমে টার্গেটে হারবার্ট কুকুরসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করবে। তারপর অভিযান। আর তোমার নতুন নাম অ্যান্টন কুঞ্জলে।
বিদেশে এককভাবে অভিযান পরিচালনা সারিদের এই প্রথম। ফলে তার টেনশনও ছিল। এদিকে কুকুরস সব সময়ই জানত, একদিন তাকে ধরা পড়তেই হবে। কেননা ত্রিশ হাজার ইহুদিকে হত্যার সঙ্গে সে জড়িত। কুঞ্জলেও ভালো করে জানত সামান্য একটু ভুলে পুরো অভিযানটি ব্যর্থ হতে পারে।
ত্রিশের দশকে কুকুরস ছিল একজন নামি বিমানচালক। ছোট্ট একটি বিমান সে নিজে নিজে বানিয়েছে। এক পর্যায়ে এই তরুণ লাটভিয়ার জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কারও সে পেয়েছে। তাকে লাটভিয়ার ঈগল উপাধি দেয়া হয়েছিল।
রিগা'র যুদ্ধ-যাদুঘরে কুকুরসের একটি বিমান রাখা হয়েছে এবং সেটি বহু লোক দেখতে আসে।
লাটভিয়ার দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী কুকুরসের বহু বন্ধু ইহুদি। সে ফিলিস্তিন সফর করেছে এবং ইহুদিদের নানা ক্ষেত্রে উন্নতি দেখে অভিভূত। ফিলিস্তিনে তার উদ্দীপনামূলক ভাষণ শুনে অনেকেই তাকে লাটভিয়ার ইহুদিদের মিত্র বলে মনে করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া প্রথম লাটভিয়া দখল করে। তখন কুকুরস তাদের গুণগান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু জার্মানি যখন লাটভিয়া দখল করে তখন কুকুরস জার্মানির গুণগানে মত্ত হয়ে পড়ে। ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট সংস্থা থান্ডার ক্রসের সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী হিসেবে কুকুরস নাজিদের সাহায্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসে। পরিণতিতে সবচে নিষ্ঠুর ও স্যাডিস্টিক হত্যাকারীতে সে রূপান্তরিত হয়। এভাবে সে রিগা'র কসাই নামে পরিচিতি পায়। কুকুরস ও তার সৈন্যরা প্রথম যে অপকর্মটি করে তাহল ইহুদিদের একটি ধর্মস্থানে এক সঙ্গে বসবাসরত তিনজন ইহুদিকে পুড়িকে মারা। সে ইহুদিদের গ্রেফতার করে রাইফেলের বাট দিয়ে হত্যা করত। এরপর সে শতাধিক ইহুদিকে গুলি করে হত্যা করে। গোঁড়া ইহুদিরা তার অবমাননা ও হত্যার শিকার হয়। বহু ইহুদি শিশুর মাথা দেয়ালে থেঁতলে সে মেরে ফেলে। এক রাতে ইহুদি বন্দিদের সামনে এক ইহুদি কিশোরীকে সে উলঙ্গ করে। তারপর ইহুদিদের এক বৃদ্ধ পুরোহিতকে বাধ্য করে মেয়েটির শরীর লেহন করতে। এই সময় মদ্যপ লাটভিয়ার সেনারা হাসিতে ফেটে পড়ছিল। গ্রীষ্মকালে কুলদিগা লেকে একসঙ্গে বার শত ইহুদিকে সে ডুবিয়ে মারে। ১৯৪১ সালের নভেম্বরে রিগাতে ত্রিশ হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হয় কুকুরসের নির্দেশে। রুমবুলা ফরেস্টে প্রথমে তাদের নগ্ন করা হয় এবং জার্মান সৈন্যরা ঠাণ্ডা মাথায় তাদের হত্যা করে।
সারিদ কুকুরসের ফাইল ঘেঁটে আরও দেখতে পায় কিছু লোক অবশ্য তার হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল। যাহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে কুকুরস ভুয়া দলিলপত্র নিয়ে তার প্লেন নিয়ে ফ্রান্সে চলে যায়। কৃষক সেজে একটি নৌকায় করে সে রিওডি জেনোরিওতে চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় মিরিয়াম কেইটজার নামের এক ইহুদি নারীর একটি রহস্যজনক ইন্সুরেন্স পলিসি। এই মেয়েটিকে অবশ্যই যুদ্ধের সময় সে বাঁচিয়েছিল। সেই মেয়েটি ব্রাজিলে কুকুরসের গুণগানে ব্যস্ত। মেয়েটিকে সে রিগায় বাঁচিয়েছিল।
রিওতে কুকুরস ব্রাজিলের বহু ইহুদির সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। সর্বত্রই সে মিরিয়ামের গল্পটি বলে থাকে। গল্পটি এরকম: নাজি মিরিয়ামকে লাটভিয়ায় আটক করে। তাকে নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় মেরে ফেলা হত। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেয়েটিকে সে বাঁচিয়েছে ইত্যাদি। একটি ইহুদি মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শহরের সকলে লাটভিয়ার এই নায়ককে প্রভূত শ্রদ্ধা করত। ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও একদিন মদের ঘোরে সে বেফাঁস করে তার অতীত। ইহুদিদের ইউরোপে ব্যাপকভাবে হত্যার কথাও সে স্বীকার করে। কত ইহুদিকে সে পিটিয়ে মেরেছে, পুড়িয়ে মেরেছে, ডুবিয়ে মেরেছে- সবই সে ফাঁস করল। লাটভিয়ার তার ইহুদি বন্ধুরা এতে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা তদন্ত শুরু করল। এর ফলাফল এককথায় লোমহর্ষক।
কুকুরসের প্রকৃত পরিচয় জানাজানি হলে সে গায়েব হয়ে গেল। যদিও সে রিও ছাড়ল না। পাশের একটি শহরে গেল মাত্র। সে যে মিরিয়ামের গল্প বলত এখন তা বন্ধ করে দিয়েছে। মিরিয়াম স্থানীয় এক ইহুদিকে বিয়ে করে ব্রাজিলের সমাজের সাথে মিশে গেল। এদিকে কুকুরস তার স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে আসল।
এভাবে দশ বছর অতিবাহিত হল। একটি এয়ার ট্যাক্সি কোম্পানির শ্রদ্ধাভাজন মালিক হল সে। আবার তাকে রিও শহরে ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা গেলে এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করল। ছাত্ররা কুকুরসের এয়ার ট্যাক্সি অফিসের দরজা-জানালা ভাঙ্গল। কুকুরস রিও ছেড়ে সাওপাওলোতে স্থায়ী হল।
সাও পাওলোতে কুকুরসের ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকত। নতুন কাউকে দেখলেই অজানা আশংকায় সে ভীত হয়ে পড়ত। ১৯৬০ সালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আইচম্যানের ফাঁসি হলে সে সাওপাওলো পুলিশের কাছে গিয়ে নিরাপত্তা চাইল। পুলিশ তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও সে নিউজটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হল। কুকুরসের দ্বারা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের জানতে বাকি রইল না সে কোথায় আছে।
বছর যত যায়, কুকুরসের ভয় তত বাড়ে। সে তার স্ত্রী ও ছেলেদের বলে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ইহুদিরা ঠিকই একদিন তাকে খুঁজে বের করবে এবং তাকে হত্যা করবে। তাকে যারা হত্যা করতে পারে তারও একটা তালিকা সে করল। এই তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম সিনেটর আহারোন স্টেইনব্রাক, ড. আলফ্রেড গাটেনবার্গ প্রমুখ।
কুকুরস তার প্রকৃত নাম না বদলালেও বাড়িটি বানাল দুর্গের মতো করে। সব দিক থেকেই বাড়িটি ছিল সুরক্ষিত। বেশ কয়েকটি ব্যবসা শুরু করলেও সেগুলো জমেনি। কুঞ্জলে তার সম্পর্কে সর্বশেষ যেসব তথ্য নথিভুক্ত করেছে তার মধ্যে রয়েছে- তার সর্বশেষ ঠিকানা হল সাও পালের বাইরে একটি কৃত্রিম লেক মেরিনায়। সে কয়েকটি বোট ভাড়া দিত। তাছাড়া তার যে সি প্লেনটি ছিল তাতে সে পর্যটকদের উঠিয়ে শহর ঘুরে দেখাত।
কুঞ্জলে ভালো করেই জানত, যদি সে সরাসরি কুকুরসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাহলে তার ফলাফল ভালো না-ও হতে পারে। সে কয়েকদিন রিও শহরে কাটাল। কুঞ্জলে এই শহরে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে চায় বলে নিজেই কয়েকজন লগ্নিকারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। ঘুরে-ফিরে সে কম দেখল না। দেখল সাম্বা নৃত্যও। সাও পাওলো'র পর্যটন ব্যবসা যারা ম্যাটার করে তাদের সঙ্গে রিকোমেন্ডেশন চিঠিসহ সে সাক্ষাৎ করল।
সাওপাওলোতে ঢুকেই সে কুকুরসের ম্যারিনা প্রথমে খুঁজে বের করল। জেটির সাথে বাঁধা আনন্দবিহারের বোটগুলোর সাথেই ছিল তার পুরানো সি প্লেনটি। সেখানেই কৃশকায় হারবার্টস কুকুরসকে সে দেখতে পেল। গায়ে পাইলটের পোশাক।
বোটের টিকেট বিক্রি করছিল একটি জার্মান মেয়ে। কুঞ্জলে মেয়েটিকে স্থানীয় পর্যটন শিল্প সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে তার অপরাগতা প্রকাশ করে। তবে পাশে দাঁড়ানো একটি লোককে দেখিয়ে দেয়। সেই লোকটিই কুকুরস। আর মেয়েটি তার বড় ছেলের স্ত্রী।
কুঞ্জলে কুকুরসের কাছে নিজেকে একজন অস্ট্রিয়ান লগ্নিকারক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পেশাগত কিছু প্রশ্ন করলে সে তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু প্লেনে চড়ে শহর ঘুরে দেখার কথা বললে সে নড়ে-চড়ে বসে। কুঞ্জলে জানে কী করে মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়। প্লেনে করে আকাশ চক্কর দেয়ার সময় তারা দু'জন বন্ধুতে পরিণত হয়। ফেরার সময় কুকুরস কুঞ্জলেকে বোটে নিয়ে যায় এবং ব্রান্ডি খাওয়ায়।
ব্রান্ডি খাওয়ার সময় কুকুরস হঠাৎ করেই উত্তেজিত হয়ে বলে, আমাকে যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে। অথচ আমি যুদ্ধের সময় ইহুদি বালিকাকে রক্ষা করেছি।
কুকুরসের প্রশ্নের জবাবে কুঞ্জলে জানায় সে-ও রাশিয়ান ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছে। কুঞ্জলে তার শার্টের বোতাম খুলে কুকুরসকে যুদ্ধকালীন একটা ক্ষতচিহ্নও দেখায়।
কুঞ্জলে কুকুরসের বর্তমান অবস্থা পরিমাপের চেষ্টা করে। সে বুঝে নেয় কুকুরসের আর্থিক অবস্থা এখন ভালো নয়। তার বোট ও প্লেন দুটোই জরাজীর্ণ। কুঞ্জলে তাকে এমন ধারণা দেয় যে, তার সঙ্গে থাকা মানে অবস্থাটা ফিরল বলে। অতঃপর কুঞ্জলে তার কোম্পানি ও পর্যটন নিয়ে আলোচনা করে এবং ল্যাটিন আমেরিকায় প্রচুর লগ্নি করার কথা বলে। কুকুরসকে তার কোম্পানিতে যোগদানেরও আভাস দেয়। কুকুরস তার মেহমানের ব্যাপারে আগ্রহান্বিত হওয়ামাত্র কুঞ্জলে তাড়াতাড়ি সটকে পড়ে। লোভে পড়ে কুকুরস কুঞ্জলেকে তার বাসায় দাওয়াত দেয় এবং সেখানে ব্যবসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানায়।
ঐ দিন রাতেই কুঞ্জলে ইয়াবিরকে সাংকেতিক ভাষায় একটি টেলিগ্রাম পাঠায়। ইয়াবির কুকুরসের অভিযানের নাম দিয়েছিল 'দ্যা ডিসিসড'।
কুকুরসও এদিন ডাইরি লেখে। সেখানে সে তার চরম শত্রুদের নামের তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত করে। নামটি হল অ্যান্টন কুঞ্জলে।
এক সপ্তাহ পরে কুকুরসের দুর্গ আকারের সুরক্ষিত বাড়িতে যায় কুঞ্জলে। বাড়িটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং বিদ্যুতের তার লাগানো। সুরক্ষিত বাড়ির গেটে এক তরুণ এবং একটি হিংস্র কুকুর রয়েছে। তরুণটি তার ছেলে।
কুকুরস কুঞ্জলেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং বাড়িটি ঘুরে দেখায়, স্ত্রী মিল্ডার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যুদ্ধের সময় পাওয়া পনেরটি পদক দেখায় যার উপর নাজিদের স্বস্তিকা প্রতীক ছিল। কুকুরস আরেকটি ড্রয়ার খুলে কুঞ্জলেকে তার ব্যক্তিগত অস্ত্রগুলো দেখায়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি হেভি রিভলবার ও একটি সেমি অটোমেটিক রাইফেল। কুকুরস গর্ব করে বলে, ব্রাজিলের গোয়েন্দা বাহিনী এসব অস্ত্র ব্যবহারে তাকে অনুমতি দিয়েছে। সে বেশ গর্বের সঙ্গে আরও বলে, কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয় তা তার জানা। কুঞ্জলের বুঝতে বাকি থাকে না, এসব তাকে ভয় দেখানোর ইংগিত। সে বোঝাতে চায়, আমি একজন সশস্ত্র মানুষ এবং ভয়ংকর।
হঠাৎ করেই কুকুরস কুঞ্জলেকে তার তিনটি খামার দেখতে এবং সেখানে একটি রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানায়।
কুঞ্জলে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু হোটেলে ফেরার পথে সে একটা স্বয়ংক্রিয় চাকু- যার ফলা সুইচ টিপলেই বেরিয়ে যায় তা কিনতে ভোলেনি। কয়েকদিনের মাথায় তারা দু'জন কুঞ্জলের ভাড়া করা গাড়িতে পাহাড়ের দিকে বেড়াতে যায়।
কুঞ্জলের জন্য এই ভ্রমণটা ছিল টেনশন ও অস্বস্তির। কুকুরসের কাছে রয়েছে অস্ত্র আর তার কাছে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় একটা চাকু। কুঞ্জলে অবশ্য কুকুরসকে ইজি মানির লোভ দেখিয়ে তাকে হত্যার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে তার গাড়িতে পাশে বসা কুকুরস বলিষ্ঠ কিন্তু দরিদ্র। আবার সহযাত্রীকে তার ব্যাপক সন্দেহ। সাথে ব্যাগভর্তি অস্ত্র।
কুঞ্জলের মনে হল বিড়াল-ইঁদুরের এই খেলায় সে ভিকটিম হবে। পর্যটনশিল্প নিয়ে যে গল্প করছে কুকুরস তা বিশ্বাস করেনি। তাকে বরং পাহাড়ের দিকে নিয়ে মেরে ফেলবে।
ওরা একটা অবহেলিত খামারে ঢুকল। এখানে কুকুরস হঠাৎ করেই রিভলবার ও সেমি অটোমেটিক রাইফেলটি বের করল। কুঞ্জলে ভাবল, দুটি অস্ত্র সে এক সঙ্গে বের করছে কেন।
আসলে কুকুরস গুলিচালনার একটা প্রতিযোগিতা শুরু করল। কুঞ্জলে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছে তার একটা পরীক্ষা। সে গাছে একটা কাগজ ঝুলিয়ে রাইফেল বের করে পরপর দশটা গুলি করল। ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে এবার কুঞ্জলেকে রাইফেল দিল। ব্রিটিশ ও ইসরাইলি আর্মির চৌকষ অফিসার কুঞ্জলে রাইফেল উঁচিয়ে পরপর দশটা গুলি করে কুকুরসের চেয়েও ভালো ফল দেখাল। কুকুরস ভূয়সী প্রশংসা করল কুঞ্জলের।
ওরা দ্বিতীয় দিন বিশালাকায় আরেকটি খামারে গেল। এখানে রয়েছে গভীর অরণ্য ও নদী। কুমিরগুলো এখানে অলস সময় কাটায়। কুকুরস যত এগিয়ে যাচ্ছে কুঞ্জলে ভাবছে সে একটা ফাঁদে পড়ছে। কোনো প্রমাণ না রেখেই কুকুরস এখানে তাকে নিশ্চয়ই গুলি করে মেরে ফেলবে।
হাঁটতে গিয়ে কুঞ্জলের পায়ের একটি নখ থেঁতলে গেলে সে তার জুতা খুলে ফেলে। বেশ রক্ত বেরুচ্ছিল। কুঞ্জলে এক পর্যায়ে ভাবল, এই হল তার অন্তিম সময়। লাটভিয়ার কুকুরস তাকে কুকুরের মতো মেরে ফেলবে। যদিও কুকুরসও কুঞ্জলেকে একবার তার বন্দুক দিয়েছিল। কিন্তু জায়গাটা এমন—মাইলখানেকের মধ্যে কোনো লোকের অস্তিত্ব নেই। এদিকে কুঞ্জলের হাতের রাইফেলে গুলি ভরা। সে এই মুহূর্তে কুকুরসকে শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু তার পরিবর্তে কুঞ্জলে তার ক্ষতবিক্ষত নখটি ভালো করে ব্যান্ডেজ করল এবং রাইফেলটি তার মালিককে ফেরত দিল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা দু'জন একটি অস্থায়ী হাটে উপস্থিত হল এবং সঙ্গে থাকা খাবার খেল। পুরনো দুটি লোহার খাটে তারা স্লিপিংব্যাগ পাতল। কুঞ্জলে দেখল, কুকুরস তার বালিশের নিচে অস্ত্রগুলো রেখে ঘুমাল। অমঙ্গলের আশংকায় কুঞ্জলে তার সঙ্গে থাকা চাকুটা পকেট থেকে বের করে প্রস্তুত করে রাখল। কিন্তু ঘুম আর তার আসল না।
মধ্যরাতে কুঞ্জলে কুকুরসের বিছানার দিকে একটা শব্দ শুনল। নাজি নেতা বন্দুকসহ নিচে নামল। কেন নামল? কুঞ্জলে বোঝার চেষ্টা করল বাইরের শব্দের। সে বুঝতে পারল কুকুরসই প্রস্রাব করছে। অবশ্য বাইরে চুপিসারে ঘুরে বেড়ানো জন্তুর শব্দও কুঞ্জলে শুনতে পেয়েছিল। পরের দিন তারা নিরাপদে সাওপাওলো ফিরল। কুঞ্জলে হোটেলে ওঠার পর কিছুটা স্বস্তি বোধ করল।
কুঞ্জলে অতঃপর কুকুরসকে নামি-দামি হোটেলে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে শুরু করল। দামি নাইটক্লাব, বার, সব কিছুই তার জন্য উন্মুক্ত। কুঞ্জলে অনুভব করল, গরিব হয়ে পড়ার কারণে কুকুরস কতদিন এরকম ভালো ভালো খাবার খায়নি। কুঞ্জলে অভ্যন্তরীণ রুটে কুকুরসকে নিয়ে বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরল। তারা কয়েকটি সেরা পর্যটনস্পটে গেল। কুকুরস কুঞ্জলের টাকায় কয়েকদিন ভালো হোটেলে থাকল এবং উপাদেয় সব খাবার খেল।
কুঞ্জলে এবার তাকে নিয়ে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিও যেতে চাইল। সে বলল, তার পার্টনাররা সেখানে বিশাল পর্যটন এলাকা গড়তে চায়। কুঞ্জলের টাকায় কুকুরসের পাসপোর্ট তৈরি হল। কুঞ্জলে মন্টেভিডিও যাওয়ার কয়েকদিন পর কুকুরস সেখানে গেল। যদিও এই লাটভিয়াবাসীর সন্দেহ ও ভয় কাটেনি। মন্টেভিডিও বিমানবন্দরে কুকুরস কুঞ্জলের বেশ কয়েকটি ছবি তুলে ফেলল। কুঞ্জলের সঙ্গে যারা ছিল প্রত্যেকেই সে তার হত্যাকারী বলে সন্দেহ করল।
কুঞ্জলে বেশ বড় গাড়ি ভাড়া করল এবং ওখানকার সবচে দামি হোটেলে রুম ভাড়া করল। কোম্পানির সদর দফতর এখানে বানানোর জন্য তারা কয়েকটি অফিসও দেখাল। কুকুরসকে এখানেও জবরদস্ত খাওয়া, ক্যাসিনো, সাইট সিয়িং করানো হল। অর্থাৎ বন্ধুর মন জয়ের জন্য সবই করল কুঞ্জলে। ওদিকে কুকুরস খুব খুশি। অবশেষে কুঞ্জলে তার বন্ধুকে ছেড়ে কয়েক মাসের জন্য ইউরোপের পথে পাড়ি জমাল। কুকুরস সাওপাওলোতে ফিরে গিয়ে তার স্ত্রীকে বলল, কিছু লোক তাকে ফলো করেছে মন্টেভিডিওতে। ফলে তাকে আরও সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।
প্যারিসে কুঞ্জলে আবার ইয়ারিব ও তার সহকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তারা অবিলম্বে কুকুরসকে পাকড়াও করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত হয় কুকুরসকে মন্টেভিডিওতে হত্যা করা হবে। ব্রাজিলে নয়। কেননা ব্রাজিলে সেখানকার পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেয়। ফলে সেখানে সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত ব্রাজিলের ইহুদিরা নব্য নাজি কিম্বা যেসব জার্মানি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া তাদের কোপানলে পড়তে পারে। তৃতীয়ত ব্রাজিলে মৃত্যুদণ্ড বিদ্যমান। মোসাদ গোয়েন্দাদের কেউ যদি গ্রেফতার হয় এবং তার বিচার হয় তাহলে নিশ্চিত ফাঁসি।
আততায়ীদের টিমে দলনেতা ইয়ারিবসহ পাঁচজন মোসাদ গোয়েন্দা অন্তর্ভুক্ত হয়। এদের মধ্যে একজন মোসাদ-প্রধান মেইর অমিতের চাচাতো ভাই; নাম জিভ অমিত। আর কুঞ্জলেসহ আরও দু'জন।
১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টিমটি মন্টিভিডিওতে এসে উপস্থিত হয়। গোয়েন্দা অসওয়াল্ড একটি গাড়ি ও বাড়ি ভাড়া করে। শেষ মুহূর্তে ইয়ারিব পরিকল্পনা কিছুটা পরিবর্তন করে একটি ট্রাঙ্কও কিনতে বলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে ধরনের ট্রাঙ্ক প্রচলিত ছিল, সেই ধরনের। নাজি নেতা কুকুরসের লাশ ঐ ট্রাঙ্কে সাময়িকভাবে রাখার জন্য এই ব্যবস্থা।
কুঞ্জলে কুকুরসকে আবার মন্টিভিডিওতে আমন্ত্রণ জানায়।
১৯৬৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুকুরস ব্রাজিলে পুলিশের সদর দফতরে গিয়ে জানায় যে, সে একজন ব্যবসায়ী। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি ব্রাজিল পুলিশের নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছি। আর আমার জীবনের ওপর ঝুঁকি থাকার অনেক কারণ বিদ্যমান। এখন ইউরোপের এক ব্যবসায়িক অংশীদার আমাকে মন্টিভিডিও যেতে বলছে। এখন আপনারা কি মনে করেন আমার কি উরুগুয়ে সফর করা উচিত? এই সফর কি ঝুঁকিপূর্ণ হবে?
ব্রাজিল পুলিশের কর্মকর্তা ফিলাহো তাকে যেতে নিষেধ করেন। বলেন, আমরা এখানে আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি বিধায় আপনি শান্তিতে ও নিরাপদে রয়েছেন। যে মুহূর্তে আপনি ব্রাজিল ছাড়বেন আপনার কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। কুকুরস মুহূর্তকাল ভাবল। তারপর বলল, আমি সব সময় একজন সাহসী মানুষ। আমি ভয় পাই না। আমি জানি নিজেকে কিভাবে রক্ষা করতে হয়। আমি সব সময়ই অস্ত্র বহন করি। আজ এতদিন পরও আমি বলব যে, আমার টার্গেট লক্ষ্যভেদী।
২৩ ফেব্রুয়ারি কুকুরসের সঙ্গে মন্টিভিডিওতে সাক্ষাৎ করে কুঞ্জলে। ফাঁদ পাতা সম্পন্ন। কুঞ্জলে একটি ভাড়া গাড়িতে করে কাসা কুবারতিনির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে হিট টিম অপেক্ষমান। কুঞ্জলে পথে বেশ কয়েকটি বাড়ি তাদের অফিসের জন্য উপযুক্ত কীনা তা খতিয়ে দেখে। এদিকে ঘটনাস্থলে গাড়ি থেকে নেমে একটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় কুঞ্জলে। তাকে অনুসরণ করে কুকুরস। কুঞ্জলে অন্ধকার বাড়ির একটি ঘরে ঢুকে দেখতে পায় শুধুমাত্র জাঙ্গিয়া পরে হিট টিমের সদস্যরা দেয়ালের সঙ্গে লেপটে আছে। তারা ভালো করেই জানে, কুকুরসের সঙ্গে তাদের সিরিয়স ও রক্তাক্ত একটা লড়াই অনিবার্য। ফলে গায়ে রক্ত লেগে যেতে পারে। একারণেই জাঙ্গিয়া।
কুকুরস বাড়িতে ঢুকতেই কুঞ্জলে দরজা বন্ধ করে দেয়। তিন খুনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জিভ অমিত কুকুরসের টুটি চেপে ধরে। এই প্রশিক্ষণ তাকে প্যারিসে দেয়া হয়েছে। অন্যরা দুই পাশ দিয়ে তাকে জাপটে ধরে।
লাটভিয়ার নাগরিক কুকুরস ভালোই লড়াই করে। আক্রমণকারীদের ঝাঁকুনি দিয়ে সরিয়ে সে দরজার দিকে এগুতে থাকে। দরজার হ্যান্ডেলটা সে ঝাকি মেরে খোলার চেষ্টা করে। অতঃপর তার পকেটে রাখা একটি অস্ত্র বের করে জার্মান ভাষায় চিৎকার করে বলে, আমাকে কথা বলতে দাও। লড়াইকালে কুকুরস যাতে চিৎকার করতে না পারে সে জন্য ইয়ারিব তার মুখটা চেপে ধরে। কুকুরস ইয়ারিবের আঙ্গুলগুলো এমনভাবে কামড়ে ধরে সেগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। সে ব্যথায় ককিয়ে উঠে। ঐ সময় অমিত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিশাল একটা হাতুড়ি দিয়ে সজোরে কুকুরসের মাথায় আঘাত করে। রক্তের ধারা বইতে শুরু করে ক্ষতস্থান থেকে। আক্রমণকারী ও ভিকটিম মেঝেতে বেদম লড়াইয়ে লিপ্ত হয় এবং তখনো কুকুরস তার অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। পুরো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। ইতিমধ্যে মোসাদ গোয়েন্দা আরিয়ে কুকুরসের মাথা লক্ষ্য করে দু'রাউন্ড গুলি করে। তার অস্ত্রে সাইলেন্সার লাগানো ছিল। ফলে আশপাশের লোকজন শব্দ শুনতে পায়নি।
কুকুরস নিস্তেজ হয়ে পড়ে যায়। তার রক্তে ঘরের মেঝে, টাইলস ভরে যায়। আততায়ীদের শরীরেও রক্ত লেগে যায়। অভিযানের বেশ পরে হিট টিমের এক সদস্য জানায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল কুকুরসকে জীবিত পাকড়াও করা। হত্যা নয়। কিন্তু তার শরীরে এতই জোর তাকে হত্যা না করে উপায় ছিল না। তাকে হত্যার বিষয়টি অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় ছিল। জীবিত ধরতে পারলে কোর্ট মার্শাল করে তাকে শাস্তি দেয়া যেত।
মোসাদ এজেন্টরা কুকুরসের লাশ ট্রাঙ্কে ভরে। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। পুলিশ যেন বুঝতে পারে আক্রমণকারীরা তাকে অপহরণ করে উরুগুয়ের বাইরে নেয়ার জন্য ট্রাঙ্ক নিয়ে এসেছিল। খুনিরা লাশের সাথে ইংরেজিতে টাইপ করা একটি নোটও রেখে যায়। ঐ নোটে লেখা ছিল, কুকুরসের অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। ত্রিশ হাজার ইহুদি নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যার সঙ্গে সে জড়িত। এই অপরাধীকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল। নিচে উল্লেখ করা হল, যে ঘটনা কখনো ভোলার নয়, যে মানুষেরাই হন্তারক।
ঘাতকরা ঐ ভবন ত্যাগ করে চলে যায়। ইয়ারি তার মৃত্যু পর্যন্ত হাতের ব্যথায় ভুগেছেন। সারা জীবন তিনি একটি আঙ্গুল যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারেননি। কুঞ্জলে এবং টাউসিগা গাড়িতে করে হোটেলে আসে এবং হোটেল ত্যাগ করে। পুরো টিমই মন্টেভিডিও ত্যাগ করে এবং জটিল পথে ইউরোপ হয়ে ইসরাইলে পৌঁছায়। হিট টিমের লোকজন ল্যাটিন আমেরিকা ত্যাগের পর এক মোসাদ গোয়েন্দা জার্মানিতে সংবাদ সংস্থাকে এক নাজি অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের কথা প্রকাশ করে।
রিপোর্টাররা প্রথম দিকে এই খবর খারিজ করে দেয়। তাদের ধারণা ছিল এ এক কৌতুক। মোসাদ এজেন্ট অবশেষে কুকুরসের ব্যাপারে বিস্তারিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য একটি বার্তা সংস্থাকে দেয়। মন্টেভিডিও'র এক রিপোর্টারকেও নিউজটি দেয়া হয়। সে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে। কুকুরস নিহত হওয়ার দশদিন পর অকুস্থল থেকে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।
পরের দিন বিশ্বজুড়ে কুকুরসের মৃত্যুর খবর হেডলাইন হিসেবে ছাপা হয়। অ্যান্টন কুঞ্জলে ও অসওয়ার্ল্ডের নাম খুনি হিসেবে প্রকাশ পায়। কয়েকদিন পর রিওতে একটি সাপ্তাহিকী কুঞ্জলের অসংখ্য ছবি প্রকাশ করে। কুকুরস এই ছবিগুলো তুলেছিল। ইসরাইলের একটি পত্রিকা ঐ ছবি থেকে কুঞ্জলের একটি ছবি প্রকাশ করলে তারা বন্ধুরা কুঞ্জলের সংযুক্তির কথা জানতে পারে।
কয়েকদিন পর কুকুরসের বাড়িতে একটা চিঠি আসে। এটি কুঞ্জলের লেখা বলেই অধিকাংশের অভিমত।
চিঠিতে আমার প্রিয় হারবার্টাশ কুকুরস বলে সম্বোধন করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ঈশ্বরের সাহায্য ও কতিপয় স্বদেশবাসীর সহযোগিতায় আমি নিরাপদে চিলি এসে পৌছেছি। দীর্ঘ সফর শেষে আমি কিছুটা পরিশ্রান্ত। আমি নিশ্চিত আপনিও শীঘ্র দেশে ফিরে যাবেন। যা হোক, আমার ধারণা, একজন পুরুষ ও একজন নারী আমাদের দু'জনকে ফলো করত। সেক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি আপনাকে বরাবরই বলেছি, স্বনামে কাজ করা এবং সফর করা আপনার জন্য একটা বিরাট ঝুঁকি। এটা আমাদের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
যাহোক আমি মনে করি, উরুগুয়ের জটিল ঘটনাবলি আপনার ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় হবে। সেজন্য আপনাকে এখন থেকেই দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। যদি আপনার বাড়ির কাছাকাছি সন্দেহজনক কিছু ধারণা করেন তাহলে এবারও আমার পরামর্শ হল আত্মগোপন করুন। ভেন লীডের কথা মনে করুন। এই নারী নেতা কায়রোতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। জার্মানি থেকে চলে যাওয়া একটি গ্রুপের সঙ্গে ছিলেন। এ্যামনেস্টির বিষয়টি সুরাহা পর্যন্ত এক-দুই বছর তারা আত্মগোপনে ছিল। আপনি এই চিঠি পাওয়ার পর চিলির শান্তিয়াগোর ঠিকানায় আমাকে উত্তর দেবেন। ইতি অ্যান্টন কুঞ্জলে। কুঞ্জলে তার গোয়েন্দা পরিচয় ঢাকার জন্য এই চিঠি লিখলেও সকলেই বুঝল যে, চিঠির প্রেরক কুঞ্জলেই। কুকুরসের স্ত্রী মিলদারের এক কথা- কুঞ্জলেই তার স্বামীর হত্যাকারী।
কুকুরসের হত্যাকারীদের কেউ বেঁচে নেই। জিভ অমিত মারা যায় ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে- ১৯৭৩ সালে। কুকুরস হত্যাকাণ্ডের এই মিশন সফল হয়েছিল। জার্মানি ও অস্ট্রিয়া নাজি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতার বাইরে রাখার জন্য যে আইন করতে চেয়েছিল তা তারা বাতিল করে।
কয়েক বছর পরে সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল এই গ্রন্থের এক লেখককে বলেন যে, তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাক্ষাৎপ্রত্যাশী। হারেল বিস্তারিত কিছু বলেননি। শুধুমাত্র তেলআবিবের একটা ঠিকানা দিলেন। এই গ্রন্থের লেখক সেই ঠিকানায় গিয়ে টেকো মাথার বলিষ্ঠ এক লোকের সন্ধান পায়।
সেই ব্যক্তিই কুঞ্জলে। অ্যান্টন কুঞ্জলে।
📄 রানি মারিয়ামের দেশে
সাদা কাপড় পরা কালো চামড়ার ইথিওপীয় শিশুরা জেরুজালেমের বিশাল এক সমাবেশের মঞ্চে গান গাইতে এসেছে। শিশুদের চোখে-মুখে ব্যাপক কৌতূহল এবং গর্ব। ইসরাইলের বিশিষ্ট সুরকার শ্লোমো গ্রোনিচ পিয়ানো হাতে মঞ্চে উপস্থিত। প্রায় ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকা দর্শক শিশুদের সমবেত সংগীতের কয়েক চরণ শুনেই উজ্জীবিত। শিশুদের গানটি এরকম: চাঁদ আমাদের দেখছে। আমার পিঠের ব্যাগে রয়েছে খাবার। আমার মা আমার ছোট ভাইদের পা চালিয়ে যেতে বলছে। বলছে, আর একটু আগাও। আরেকটু। এরপরই জেরুজালেম।
কবি হেইম ইদিসিসেরজার্নি সংশীর্ষক এই গানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জেরুজালেমে আসার বর্ণনা রয়েছে। গানটি শুনে দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিতে লাগল। ইথিওপিয়ায় বসবাসরত ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে আনতে যে ধকল গেছে, যা ছিল মিশন ইমপসিবল- সেকথা মনে করে শ্রোতা-দর্শক ছিল উত্তাল। আর গানটির বিশেষত্বও তাই। অন্যকিছু নয়।
সমবেত সংগীতের বাণীতে আরও ছিল: আমাদের খাবারের ব্যাগ গেল হারিয়ে। রাতে ডাকাতরা আমাদের আক্রমণ করল। তারা ছিল চাকু ও শানিত অস্ত্রসহ। বিশালাকায় মরুভূমিতে তারা আমার মাকে হত্যা করল। চাঁদ এর একমাত্র সাক্ষী। আমি আমার ছোট ভাইদের বললাম, আরেকটু পা চালাও। আরেকটু পা চালাও। এরপরই পূরণ হবে স্বপ্ন। সহসাই আমরা ইসরাইলের নাগাল পেয়ে যাব।
ইসরাইল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে এনেছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। বহু ফিলিস্তীনীকে হত্যা করেছে। সেই হত্যাকাণ্ড আজও অব্যাহত। তবে ইথিওপিয়া থেকে ইহুদি উপজাতিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে তাদের অভিযান ছিল খুবই সংকটাপন্ন ও ঝুঁকিবহুল।
সেই ঘটনা জীবন্ত কিম্বদন্তি হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় বসবাসরত এই ইহুদি উপজাতিরা সারা বিশ্ব থেকে ছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তারা ইথিওপিয়ার বিভিন্ন পাহাড় ও উপত্যকায় বসবাস করত। আর দেশটি রানি শেবার নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে এই উপজাতি ইহুদিদের বিশেষত্ব হল হাজার বছর ধরে তারা বাইবেলে বর্ণিত উল্লেখিত ধর্মকে অদম্য মনোযোগের সঙ্গে অবিকৃতভাবে ঐ বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছিল।
এই শান্ত ও লাজুক ইহুদিরা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়েই গিয়েছিল। তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা বেসিম ঢোলা সাদা গাউন পরিধান করত। জায়নবাদের প্রাচীনতম নিয়মনীতি অনুসরণ করত। একই সাথে আধুনিক জীবনের নিয়মনীতিও মেনে চলত। তারা বরাবরই শান্তিপ্রিয় ছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখত। এর পাশাপাশি দীর্ঘকাল তারা নিষ্ঠুর শাসনের হাতে ব্যাপকভাবে নিগৃহীতও হয়েছে। তবে ওদের জন্য দুঃখের বিষয় ছিল ইহুদিদের ধর্মীয় নেতা রাব্বি ও আধ্যাত্মিক নেতারা। বিশ্বব্যাপী তারা প্রচার করত যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা ফালাসা নামে পরিচিত- তারা প্রকৃত অর্থে ইহুদি নয়।
ইথিওপীয় ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়া সত্ত্বেও মনোবল হারায়নি। যুগ যুগ ধরে তারা জায়নবাদীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে আসছিল। বাবা থেকে ছেলে, মা থেকে মেয়ে ইহুদিবাদে অবিচল থেকে তারা একদিন তাদের কথায় পবিত্র ভূমি ইসরাইলে চলে আসার স্বপ্ন দেখত।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে প্রায় ত্রিশ বছর ইথিওপিয়া থেকে বেশ কিছু ইহুদি ইসরাইলে সমর্থ হয়েছিল। সম্রাট হাইলে সেলাসি ছিলেন ইসরাইলের বিশেষ মিত্র ও সুহৃদ। তার সময়ে সুযোগ থাকলেও ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তেমন কোনো প্রয়াস চালানো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে। ঐ সময় ইসলাইলের প্রধান রাব্বি বা ধর্মীয় নেতা ওভাদিয়া ইয়োসেফ এক দ্ব্যর্থহীন রুলিংয়ে বলেন যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা নিজেদেরকে বেটা ইসরাইল বলে পরিচয় দেয় তারা পরিপূর্ণভাবেই ইহুদি। মূলত: এরপর থেকে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়। দু'বছর পর ইসরাইল ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইন পাস করে। অতঃপর ১৯৭৭ সালে মোনাচেম বেগিন প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি এ কাজে মোসাদ-প্রধান জেনারেল আইজাক (হাকা) হোফিকে ডেকে পাঠান। বেগিন মোসাদ-প্রধানকে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।
মোসাদের অবকাঠামোতে বিটজুর নামে একটা বিশেষ ইউনিট রয়েছে। বহু দেশের ইহুদিদের নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ এই ইউনিটের ওপর ন্যস্ত। বিটজুরের নাম পরিবর্তিত হয়ে রাফরিরিম করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বেগিনের নির্দেশ পেয়ে মোসাদ-প্রধান হাসা ডেভিড কিমহিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় পাঠান। কিমহি মোসাদের সহকারী পরিচালক এবং টেভেল নামে একটি গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়াদি গোপনে দেখভাল করে। সে ইথিওপিয়ার শাসক মেনগিন্তু হাইলে মারিয়ামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ঐ সময় ইহুদি দেশত্যাগীদের জন্য ইথিওপিয়ার দরজা বন্ধ ছিল। একই সাথে গৃহযুদ্ধের তাণ্ডবে ইথিওপিয়ায় তখন ব্যাপক বিশৃঙ্খলা চলছিল। মারিয়াম বিদ্রোহীদের দমনে ইসরাইলের সহায়তা চাইলেন। কিমহি বিদ্রোহীদের দমনে হাইলে মারিয়ামের প্রস্তাবে না বললেও অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে সম্মত হন। তবে সিদ্ধান্ত হয় হাইলে মারিয়াম ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশত্যাগে বাধা দেবেন না।
আরও সিদ্ধান্ত হয়, হারকিউলিস বিমানে করে ইসরাইল থেকে ইথিওপিয়ায় অস্ত্রশস্ত্র যাবে। ঐ বিমানেই ইহুদিরা ইসরাইলে ফিরে আসবে। উল্লেখ্য, সেভাবেই ছয় মাস কাজ চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে দায়ান একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেন। একটি সুইস পত্রিকায় মোশে দায়ান ভুল করে বলে ফেলেন যে, হাইলে মারিয়ামের সেনাবাহিনীতে ইসরাইল অস্ত্র সরবরাহ করছে। অনেকের মতে মোশে দায়ানের ঐ উক্তি ভুলবশত ছিল না, ছিল উদ্দেশ্যমূলক। কেননা সোভিয়েত সমর্থিত হাইলে মারিয়ামের সরকারকে অস্ত্র প্রদান তার মনঃপূত ছিল না।
হাইলে মারিয়াম মোশে দায়ানের মন্তব্যে অতিশয় ক্রুব্ধ হন। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মারিয়াম জনসমক্ষে ফোকাসের বিরুদ্ধে ছিলেন। এর ফলে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের সরাসরি ইসরাইলে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যদিও মোসাদ-প্রধান হাকার প্রতি বেগিনের নির্দেশ বহাল ছিল।
ইথিয়পিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় আরেকবার। এদিকে ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী দেশ সুদানের রাজধানী খার্তুম থেকে মোসাদ সদর দফতরে একটি চিঠি এসে পৌছায়। এই চিঠিতে ইথিওপিয়া থেকে বিকল্প একটি রুট দিয়ে ইহুদিদের পালানোর পরিকল্পনার বিবরণ দিল। ঐ চিঠির প্রেরক ফেরেডা আকলুম নামের ইথিওপিয়ার ইহুদির। সে একজন শিক্ষক। ইথিওপিয়া থেকে সে পালিয়ে বর্তমানে সুদানে বসবাসরত।
এদিকে ইসরাইলের দৃষ্টিতে সুদান হল তাদের শত্রুরাষ্ট্র। দুর্ভিক্ষ, খরা, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ ও উপজাতিদের বিরোধে দেশটি বিপর্যস্ত। সুদানের কয়েক হাজার উদ্বাস্তু থাকে তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার বহু শরণার্থীরও বাস এসব তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার ইহুদিদের রক্ষায় আকলুম ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশের ত্রাণ সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়েই চলেছে। অবশ্য তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যাতে কোনো প্রকারে ইসরাইলে পৌঁছতে পারে। আকলুম একটি চিঠিতে মোসাদের কাছে বিমানের একটি টিকেট চায়। মোসাদ তাকে বিমানের টিকেট না পাঠিয়ে তাদের একজন গোয়েন্দাকে পাঠায়। মোসাদের ড্যানি লিমোর গিয়ে আকলুমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাদের দু'জনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় আকলুম শরণার্থী শিবিরে ইহুদিদের খুঁজে বের করবে এবং তা ড্যানিকে অবহিত করবে। এই সময় আকলুমকে সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আকলুম ত্রিশ জন ইহুদির সন্ধান পায় এবং মোসাদ বুদ্ধির বলে তাদের ইসরাইলে পাঠাতে সক্ষম হয়। আকলুস আর কোনো ইহুদিকে খুঁজে না পাওয়ায় মোসাদ গোয়েন্দা ইসরাইলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। লিমুর আকলুমকে ইসরাইলে তার মতো চলে আসতে বলে।
কিন্তু আকলুম এতে কোনোমতেই রাজি নয়। সে সুদানের প্রত্যন্ত এলাকায় ইহুদিদের খুঁজে পেতে তৎপরতা চালাবে। এদিকে মোসাদের লিমুরও অ্যাডামেন্ট। লিমুর আকলুমকে এক সপ্তাহের মধ্যে সুদান ছেড়ে ইসরাইলে চলে আসার নির্দেশ দেয়। লিমুরের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে আকলুম এক শরণার্থী শিবির থেকে আরেক শিবিরে ইহুদি খুঁজতে মগ্ন থাকে। সে কিন্তু এ পর্যায়ে একজন ইহুদিকেও খুঁজে পায়নি। তবুও সে ইসরাইল ফিরবে না। তার আশংকা সে চলে গেলে সুদান হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রকল্প চিরকালের জন্য পরিত্যক্ত হবে। অতঃপর সে মোসাদ সদর দফতরে একটা মিথ্যা রিপোর্ট পাঠায়। ঐ রিপোর্টে সে এমনসব ইহুদিদের নামের তালিকা নথিভুক্ত করে যারা সুদানে নয়, ইথিওপিয়ায় থাকে।
সে আরও ঘোষণা করে যে, সুদানের কথিত ঐ ইহুদিদের দেখভাল করার জন্য সে সুদানেই অবস্থান করবে। এখন আকলুম তার তালিকা ধরে সুদানে নয় ইথিওপিয়ার গ্রামে গ্রামে একাকী ঘুরে ইহুদি খুঁজে বের করার কাজ নেয়। ঐ ইহুদিদের সে ইথিওপিয়া ছেড়ে ইসরাইলে যেতে ব্রেনওয়াশ করতে থাকে। এদিকে জেরুজালেমে পৌঁছতে আবিষ্কৃত নতুন রুটের বিষয়টি ইথিওপিয়ার ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সঞ্চার করে। প্রথমে কয়েকজন ব্যক্তি, পরবর্তীতে কয়েকটি পরিবার ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। পরে দেখা গেল পুরো একটি ইহুদি গ্রাম তাদের মালামাল বাক্সবন্দী করে দেশত্যাগে প্রস্তুত। এভাবে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, মহিলা, শিশুসহ কয়েক হাজার ইহুদি গোপনে ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। এসব ইহুদি বাইবেলে বর্ণিত মসীহ-এর স্বপ্ন অনুযায়ী দুধ ও মধুর দেশ ইসরাইলে পৌঁছতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ইসরাইলে পৌঁছতে বন্ধুর, কষ্টকর পথের জন্য তারা পানি ও খাদ্য তৈরি করে সঙ্গে নেয়। তারা সারা রাত ধরে হাঁটত। কিন্তু দিনের বেলায় গুহার মধ্যে লুকিয়ে থাকত। এভাবে বহু ইহুদি অসুস্থ হয়ে মারা গেল। এই দুঃসাহসিক ভ্রমণে এক বাবা তারা চার-চারটি সন্তানকে হারিয়েছে। মারা গেছে তারা। সাপ, বিছের আক্রমণ ও সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা অগণিত। সর্বোপরি তাদের খাদ্য ও পানি ছিল সীমিত। পথে বহুবার ডাকাতের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে।
কয়েক বছর পর এই কষ্টকর সফরের বর্ণনা দিয়েছে অভিনেত্রী মেহেরেতা বারুশ। বারুশও তাদের সফরসঙ্গী ছিল। তার ভাষ্য, সফরসঙ্গীরা প্রতিদিন সকালে লাশ খুঁজত। কখনো কখনো বালিতে দশটি পর্যন্ত লাশ পাওয়া যেত। কোনোদিন পনেরটি। এমন কোনো পরিবার ছিল না যারা অন্তত একজন সন্তানকে হারায়নি।
১৯৮১ সালের গ্রীষ্মকালে ড্যানি লিমুর তার মোসাদের সহকর্মীদের নিয়ে ছদ্মবেশে সুদানে আসে। তাদের টার্গেট সুদানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের খুঁজে বের করা। বেঁচে গিয়ে খার্তুমসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ইহুদিরা মোসাদের পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের ইহুদি পরিচয় গোপন করল। শরণার্থীরা ত্রাণ কর্মকর্তাদের দেয়া 'ননকোশার' খাবার গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানাল। এদিকে শরণার্থী শিবিরে ষণ্ডা ও পাণ্ডারা সমানে মহিলা এবং কিশোরীদের ধর্ষণ করতে লাগল। শতাধিক মেয়েদের একটি গ্রুপ অপহৃত এবং গুম হল। তাদের স্বজনরা জানতে পারল ঐ মেয়েদের সৌদি আরবে পাচার করা হয়েছে। সেখানে আরও এক লক্ষ ২০ হাজার মহিলা দাসত্ব বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ত্রাণশিবিরে বহু ইহুদি নারীকে ধরিয়ে দিল এক সময়ের প্রতিবেশীরা। সুদানের পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ও নির্দয়ভাবে মারধর করে।
ইথিওপীয় ইহুদিদের জেরুজালেমে যেতে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ইসরাইলের পথে প্রায় চার হাজার ইহুদির মৃত্যু হয়। কানাডার ইহুদি হেনরি গোল্ড সুদান ও ইথিওপিয়ার আশ্রয় শিবিরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত। ইসরাইল তাদের ফিরিয়ে নিতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলে সে তীব্র সমালোচনা করে।
প্রকৃতপক্ষে মোসাদ তাদের একটি নিরাপদ রুটে ইসরাইলে নেয়ার চেষ্টা করছিল। মোসাদ সুদান থেকে ভুয়া পাসপোর্টে ইহুদিদের বিমানে ইসরাইল নেয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এখন তারা সমুদ্রপথে তাদের নিতে ইচ্ছুক।
এ লক্ষ্যে মোসাদ ইউরোপে একটি পর্যটন কোম্পানি খোলে। কোম্পানিটি সুদান বন্দরের কাছের একটি পরিত্যক্ত বীচ রিসোর্ট ভাড়া করে। লোহিত সাগরের ঐ বিচে উপকূল-উপযোগী খেলাধুলার উন্নয়নে সুদান সরকারের সঙ্গে একটা চুক্তি করে। রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় ইয়োনাতান সেফা নামের এক মোসাদ গোয়েন্দা। এই বীচ ও রিসোর্টে কয়েকটি একক বাংলো এবং কয়েকটি বেসরকারি ভবন ছিল। জাল পাসপোর্ট নিয়ে মোসাদ এজেন্টরা এই রিসোর্ট পল্লিতে এসে নানা পদে চাকরি নিতে শুরু করল। রিসোর্টের গুদাম গোয়েন্দারা সাঁতারের বিভিন্ন পোশাক, মুখোশ, ডুবসাঁতারুর নল, ডুবুরির জুতা দিয়ে ভরে ফেলল। মোসাদ সদর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন রেডিও স্থাপিত হল। মোসাদের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রিসোর্টের গোয়েন্দাদের বলল, এই অভিযানে যেন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না হয়। এটি হতে হবে মানবিক। এই অভিযানটি তাদের জন্য অনেক বেশি আবেগপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়। রিসোর্টের লোকদের জানানো হয় যে, তাদের রিসোর্টের সুখ্যাতির কথা জানিয়ে সারা ইউরোপ জুড়ে পোস্টার ছাড়া হবে।
আরআউস নামের এই রিসোর্টে একে একে বহু পর্যটক আসতে শুরু করল। দিনের বেলা পর্যটকরা সাঁতার কাটত, ডুবসাঁতার ইত্যাদি দিত। কিন্তু এই পর্যটকদের কেউই জানত না, প্রতি রাতে মোসাদ গোয়েন্দারা শরণার্থী ক্যাম্প ও গ্রাম থেকে ইহুদিদের এখানে এনে জড়ো করত। ঐ ভিলেজে বহু সুদানি কাজ করত। সাঁতার প্রশিক্ষক তাদের জন্য একটা গল্প সাজাল। গল্পটি হল, সন্নিহিত শহরের রেডক্রস হাসপাতালে যোগদানের জন্য এরা এখানে রাতটা কাটাবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সুদানিরা সন্দেহজনক কিছু কর্মকাণ্ডের আভাস পায়। কিন্তু রিসোর্টের পক্ষ থেকে ভালো বেতন ভাতা পাওয়ার কারণে তারা এ বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয় না।
মোসাদ রাতের অভিযান চালাত চারটি পুরনো ট্রাকের সাহায্যে। সেই ট্রাকে ইহুদিদের তোলা হত। কিন্তু বিষয়টি অত সহজ ছিল না। ইসরাইলিদের বহু ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে। প্রতি মুহুর্তে ছিল ধরা পড়ার আশংকা।
এদিকে গ্রাম থেকে সংগ্রহীত ইহুদিদের অনেকেই সাদা চামড়ার মানুষ কখনো দেখেনি। সাদা চামড়ার মানুষ যে ইহুদি হতে পারে এ ছিল তাদের ধারণারও বাইরে। ফলে সাদাদের কথা তারা বিশ্বাস করতে চাইত না। এক সাদা গোয়েন্দা কর্মকর্তা যখন তাদের সঙ্গে প্রার্থনায় যোগ দিল তখনই তাদের মনে প্রত্যয় জন্মাল যে তারাও ইহুদি।
এখন চার ট্রাক ভর্তি ইহুদিকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কয়েকশত মাইল পাড়ি দিতে হবে। পথে সুদানী সামরিক বাহিনী এবং পুলিশকে মোসাদের এক কর্মকর্তা সমানে ঘুষ দিয়ে চলতে লাগল। এভাবে ইসরাইলি নৌবাহিনীর জাহাজ যেখানে অপেক্ষা করছে সেখানে ট্রাকগুলো নেয়া হল। সেখানে কিছুটা দূরে একটি নেভি বোট নোঙ্গর করা ছিল। নৌবাহিনীর কমান্ডোরা রাবারের ডিঙ্গি নিয়ে এসে ইহুদিদের মাদার শিপে নিয়ে যেতে লাগল। এভাবে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল।
কানাডার হেনরি গোল্ড একজন স্বেচ্ছাসেবী ও ইহুদি। ক্লান্ত-শ্রান্ত গোল্ড রিসোর্ট ভিলেজে থাকার সময়ই সন্দেহজনক কিছু একটা আঁচ করল। গ্রাম ঘুরতে গিয়ে তার মনে হল মোসাদ গুপ্তচরদের দ্বারা সে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। যেমন এক মহিলা নিজেকে সুইস বলে পরিচয় দিল কিন্তু তার অ্যাকসেপ্ট ভিন্নতর। এক ইরানির এ্যাকসেপ্টও ইরানিদের মতো নয়। গোল্ড পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছে বিধায় সে অভিজ্ঞ। একদিন ডিনারে সে এমন এক পদের সালাদ দেখল তা শুধুমাত্র ইসরাইলেই বানানো হয়।
পরদিন সকালে গোল্ড সাঁতার-প্রশিক্ষককে গিয়ে ধরল এবং হিব্রু ভাষায় তাকে প্রশ্ন করল, এখানে হচ্ছেটা কী। যাহোক, গোল্ডকে কোনো রকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করা হল।
১৯৮২ সালের মার্চে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের বেশ কয়েকটি বোটে করে পাচারের সময় একটা ডিঙ্গিতে বসা চার মোসাদ গোয়েন্দা সুদানী সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেল। সেই দলে লিমুরও ছিল। লিমুর ইংরেজিতে সুদানি সৈন্যদের বলল, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পর্যটকদের রাইফেল দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হয়েছ! লিমুর আরও বলল, সুদানের পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করতে পর্যটকরা এই রিসোর্টে আসে।
পরদিন লিমুর সুদানি সেনাবাহিনীর এক কমান্ডারকে বিষয়টি জানালে সে ক্ষমা চাইতে চাইতে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠে। সে অবশ্য বলে যে, তার সৈন্যরা চোরাচালানি মনে করেছিল। সে তার সৈন্যদের ঐ স্থান অবিলম্বে ত্যাগের নির্দেশ দেয়। ফলে মোসাদ গোয়েন্দারা নিরাপদ এখন।
অবশ্য এখান থেকে সমুদ্রপথে ইহুদিদের চালান আপাতত বন্ধ। নতুন একটি যাত্রাপথ আবিষ্কৃত হয়েছে। একদিন সকালে এখানকার পর্যটকরা দেখে যে, সব বিদেশি স্টাফ লাপাত্তা। স্থানীয় কয়েকজন স্টাফ অবশ্য সকালের নাস্তা তৈরি করছিল। আসলে আগের রাতেই মোসাদ গোয়েন্দারা ঐ টুরিস্টপল্লী ছেড়ে গেছে। গোয়েন্দারা এক নোটিশ টানিয়ে লিখে গেছে, বাজেট সংকটের কারণে তারা টুরিস্টপল্লীটি বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব পর্যটক টাকা জমা রেখেছিল তা পরে দেয়া হবে বলে জানিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা হল।
মোসাদ সদর দফতরে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হল, নৌপথে আর নয়, এবার বিমানযোগে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে আসা হবে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর হারকিউলিস সি-১৩০ বিমানযোগে ইহুদিদের শত্রু দেশ সুদানে থেকে আনা হবে। মোসাদ বুঝল, সুদানে এই কর্ম করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং বারে বারে শত্রু দেশের ভূখণ্ডে বিমান ওঠা-নামা করা সহজ কাজ নয়।
১৯৮২ সালের মে মাসে মোসাদ গোয়েন্দাদের একটি অগ্রবর্তী দল সুদানে আসে। উদ্দেশ্য, সুদান বন্দরের দক্ষিণে একটি নিরাপদ বিমান ওঠা-নামার স্থান চিহ্নিত করা। দলটি ব্রিটিশ নির্মিত একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড সংস্কার করে। ওখানে যখন ইসরাইলি বিমান বাহিনীর রিনো বিমানটি নামল অপেক্ষমাণ ইথিওপিয়া ইহুদিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। এতো বড় স্টিলের বডি একটি পাখি যার গর্জন ভয়ংকর- এ তারা জীবনে প্রথম দেখল। অনেক ইহুদি ভয়ে পালিয়ে গেল। মোসাদ গোয়েন্দারা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে। অনেকে এই দৈত্যাকার স্টিল বডি দেখে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়। এভাবে প্লেনটির উড়াল দিতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ঘণ্টাখানেক বেশি সময় লেগে যায় এবং অবেশেষে ২১৩ জন ইথিওপিয়ার ইহুদিকে নিয়ে সেটি উড্ডয়ন করে। মোসাদ সদর দফতর থেকে এই অভিযানের প্রশংসা করে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়।
ইসরাইলিদের এই অভিযান বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সুদানি কর্তৃপক্ষের কাছে তা জানাজানি হলে মোসাদ আরেকটি এলাকা নির্বাচনে নামে। নতুন স্পটটি পোর্ট সুদান থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে।
মোসাদ-প্রধান হাকার তত্ত্বাবধানে ১৯৮২-১৯৮৪ এর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। ইসরাইলি ছত্রীসেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল অ্যামোল ইয়ারোন হাকাকে সহযোগিতা করেন। উল্লেখিত সময়ে এক হাজার পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে ইসরাইলে স্থানান্তর সম্ভব হয়।
এই সকল অভিযান এক পর্যায়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুদানি এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোসাদের সঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পের লোকদের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়া আদ্দিস সলোমানকে আটক করে। সলোমান ইথিওপিয়ার ইহুদি। তাকে সুদানে বিয়াল্লিশ দিন ধরে নির্যাতন করা হয়। তার নেপথ্যের লোকদের নামধাম এতেঠ নিগ্রহ সত্ত্বেও সে স্বীকার করেনি।
১৯৮৪ সালে সুদানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর দুরবস্থা ও সংক্রামক রোগ চরম আকার ধারণ করে। সুদানের গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হলে দেশের স্বৈরশাসক জাফর নিমেরির সিংহাসন টলমল করে উঠে। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাহায্য ছাড়া আর তার গত্যন্তর নেই।
ইসরাইল আমেরিকাকে বলে, যদি সুদান তাদের বিমান অভিযান চালাতে দেয়, তাহলে যেন সাহায্য করে। মার্কিন প্রশাসন সম্মত হলে খার্তুমে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সেই আলোকে আলোচনা করে। সমঝোতা হয় ইহুদিদের সুদান থেকে সরাসরি ইসরাইলে নেয়া যাবে না। তবে একটি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সম্ভব। বিনিময়ে সুদানকে খাদ্য ও তেল সরবরাহের সুযোগ দিতে হবে। সুদানের আমেরিকার দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায়, পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের জন্য সুদান থেকে ইসরাইল ইহুদিদের নিতে পারবে। এভাবেই অভিযানের শুরু হয়।
এদিক মোসাদ-প্রধান হাকার স্থলাভিষিক্ত হন তার ডেপুটি নাহুম আদমোনি। আদমোনি বেলজিয়াম হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে আনতে শুরু করেন।
সুদানে বেলজিয়ামের বিমানচালক হুড়মুড় করে বিমানে ঢোকা আড়াইশত যাত্রীকে নিয়ে প্লেন চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। তার ভাষ্য, উড়োজাহাজে অক্সিজেন মাস্ক রয়েছে দুশটি। কিন্তু যাত্রী পঞ্চাশজন বেশি।
মোসাদের এক গোয়েন্দা বিমানের পাইলটকে একান্তে ডেকে বলে, কে বাঁচবে আর কে মরবে এখন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি যদি এখন ককপিটে না ওঠ আমি তোমাকে প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে সেখানে অন্য পাইলট বসাব। ঐ পাইলটই তাড়াতাড়ি বিমানে উঠে বসে। পরবর্তী সাতচল্লিশ দিনে ঐ বিমানটি গোপন অভিযান চালিয়ে সাত হাজার আটশত ইথিওপিয়া ইহুদিকে ইসরাইলে ব্রাসেলস হয়ে পৌছে দেয়।
ইসরাইল এই অভিযান গোপন রাখতে দেশের গণমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি করলেও ইহুদি এজেন্সি চেয়ারম্যান এরিয়ে ডুজলিন এক বিবৃতির মাধ্যমে তা ফাঁস করে দেন। ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইহুদিদের একটা উপজাতি আমাদের পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছে। নিউইয়র্ক জিউস প্রেস এই অভিযানের বিস্তারিত ছাপে। লস এঞ্জেলস টাইমসও তা প্রকাশ করে।
তিনদিন পর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সিমন পেরেজ সংসদে বলেন, তার সরকার যা করছে তা অব্যাহত থাকবে। সর্বশেষ ইথিওপিয়ার ইহুদিকে দেশে না নিয়ে আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে। এদিকে সেদিনই সুদান বিমান চলাচল বন্ধ করে দিলে ইহুদিদের ফিরে আসার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সুদানীদের কাছে অভিযানের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইসরাইল যদি একটা মাস চুপচাপ থাকত তাহলে ইথিওপিয়ার সর্বশেষ ইহুদিকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবশ্য ইসরাইলিদের অভিযানে চমৎকৃত হন। তার মতে, অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বুশ অতঃপর ভূমিকা রাখতে চাইলেন। ইসরাইলিদের অভিযান বন্ধের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকার বিমান বাহিনীর সাতটি হারকিউলিস বিমান সুদানের বিমানবন্দর আল কাদারিকে পাঠালেন। সেই উড়োজাহাজে ছিল সিআইএ'র বেশ কিছু গোয়েন্দা। মার্কিন টাস্ক ফোর্স রানি শেবা দেশে অভিযান চালিয়ে পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে সুদান থেকে উড়িয়ে এনে সরাসরি ইসরাইলের বিমানবন্দরে নামাল।
দু'মাস পরে সামরিক বাহিনী জাফর নিমেরিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। লিবিয়ার গোয়েন্দারা সুদানে গিয়েই খার্তুমে মোসাদ গোয়েন্দাদের উপস্থিতি লক্ষ করেন। তখনো মোসাদের তিনজন গোয়েন্দা সুদানে ছিল। তারা অবশ্য সিআইএ'র গোয়েন্দাদের বাসায় লুকিয়ে থাকতে সমর্থ হয়। সেই লুকানো অবস্থা থেকেই মার্কিনিরা মোসাদ গোয়েন্দাদের স্বদেশে যেতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের কুইন অব 'শিবা'র শীর্ষক অভিযানটি খুবই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। একই সাথে তা ছিল সরল, শান্ত ও মনোরম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরাইলি গোয়েন্দা পোলার্ডের একটি ঘটনায় আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
পোলার্ড যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করলেও ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে সে গ্রেফতার হয়। এই ঘটনায় আমেরিকা স্তম্ভিত। যে আমেরিকা ইসরাইলের জন্য এতেঠ কিছু করল তাদের এই আচরণে- সিআইএ'র শীর্ষ কর্মকর্তারা খুবই ক্ষুব্ধ হন।
ইসরাইল এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে এবং পোলার্ডের চুরি করে নেয়া কাগজপত্র আমেরিকাকে ফিরিয়ে দেয়। তবে দুই দেশের মধ্যকার গোয়েন্দা তৎপরতায় দীর্ঘদিন অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়। পোলার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেন রাফি এইতান। তিনি গোয়েন্দাদের যে ইউনিটটি চালাতেন সেটি তখনি বন্ধ করে দেয়া হয়। এইতানের বিরুদ্ধে আমেরিকায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়ে যায়। বহুদিন গ্রেফতারের ভয়ে আমেরিকায় যাননি মোসাদ গোয়েন্দা এইতান।
ইথিওপিয়া থেকে আগত ইহুদিদের অনেকেই কুইন অব শেবা অভিযানের বিপক্ষে ছিলেন। কেননা এই অভিযানে চার হাজার ইহুদি মারা গেছে। মোসাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান কায়েসারেয়ার শীর্ষ গোয়েন্দাদের অভিমত, বিতজার বিভাগের লোকদের দ্বারা এতবড় একটা অভিযান পরিচালনা উচিত হয়নি। তাছাড়া বিতজার গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে খুবই ছোট্ট একটা ইউনিট। তারা তেমন সুসংগঠিতও নয়।
বিতজারের লোকজন তাদের সফল অভিযানের জন্য খুবই খুশি ছিল। তারা অবশ্য বলে যে, মোসাদের বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে তারা সঙ্গে নিয়েছিল।
দুই গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে বিরোধ সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য ইথিওপিয়ার অসংখ্য ইহুদি আজ ইসরাইলে আসতে পেরেছে। কিন্তু এ-ও সত্য যে, এখনো কয়েক হাজার ইহুদি ইথিওপিয়ায় রয়ে গেছে। তারা ইসরাইলে আসতে খুবই আগ্রহী কিন্তু দরজা তো বন্ধ। ইসরাইল মনে করে আদর্শগত ও ইহুদি হওয়ার কারণে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা অবশ্য কর্তব্য। মানবিক কারণেও এর প্রয়োজনীতা রয়েছে। কেননা আগত ও আটকে পড়া পরিবারগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক শিশুরা চলে এসেছে অথচ তাদের বাবা-মা আসতে পারেনি। স্বামী এসেছে, স্ত্রী আসতে পারেনি। নতুন পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এবং স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অনেকে আত্মহত্যাও করেছে।
এদিকে ইহুদি এজেন্সির প্রতিনিধিরা কয়েক হাজার ইহুদিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার কাছে জড়ো করতে সমর্থ হয়। ১৯৯১ সালের অপারেশন শেবা শেষ হওয়ার ছয় বছরের মাথায় ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জন্য অলৌকিক ঘটনা ঘটে। শুরু হয় অপারেশন সলোমোন।
ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আদ্দিস আবাবার দিকে আসতে শুরু করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় ইসরাইল ও শাসক মারিয়ামের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর কিছু পরেই মারিয়াম ক্ষমতাচ্যুত হন।
এই চুক্তির পেছনে এক রহস্যমানবের ভূমিকা ছিল মুখ্য। তার নাম ইউরি লুবরানি। ইরান ও লেবাননের বিশেষ দূত ছিলেন তিনি। চুক্তি হয় ইহুদিদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে ইসরাইল ইথিওপিয়াকে ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেয় মারিয়াম সরকারের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে তারা আমরিকার রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে। এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে বিদ্রোহীদেরও একটা চুক্তি হয়। এ চুক্তি মোতাবেক বিদ্রোহীরা ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতি করবে এবং এই সময়ের মধ্যে ইহুদিদের ইসরাইলে ফেরত নিয়ে যাওয়া হবে। ইসরাইল ঐ সময়ের মধ্যেই তাদের লোকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
সলোমোন অভিযান পরিচালনার মূল দায়িত্ব পায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আমনন লিপকিন ছিলেন কমান্ডার। ইসরাইলের এয়ারলাইন ইথিওপিয়ায় ৩০টি বিমান পাঠায়। বিমান বাহিনী পাঠায় বেশ কয়েকটি বিমান। গোয়েন্দা ইউনিট কিং ফিশারের একটি কমান্ডো বাহিনীকে ইথিওপিয়ায় পাঠানো হয়। এভাবে মাত্র ৩৪ ঘণ্টায় ১৪ হাজার চারশত ইহুদিকে ইসরাইলে আনা হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বরেকর্ডের সৃষ্টি হয়। বোয়িং ৭৪৭ এক হাজার ৮৭জন ইহুদিকে নিয়ে ইসরাইলের অভিমুখে রওয়ানা দিলেও বিমানবন্দরে একজন বেশি লোক পাওয়া যায়। সে একটি নবজাতক। বিমানেই তার জন্ম।
সলোমোন অভিযানের ২০ বছর পরেও ইথিওপিয়ায় বহু ইহুদি এখনো রয়ে গেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগ অব্যাহত। তবে নবাগত ইহুদিদের ইসরাইলের মাটিতে বসবাসে সমস্যা হচ্ছে। আগতরা অধিকাংশই আফ্রিকার গ্রাম থেকে উঠে আসা। অথচ ইসরাইল একটা আধুনিক রাষ্ট্র। ওদিকে কতিপয় ধর্মীয় নেতা এখনো দাবি করে চলেছেন, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা প্রকৃত নয়।
শুরুতে যে জার্নি সংটি গীত হচ্ছিল তার শেষাংশ ছিল এরকম: চাঁদের মধ্যে আমার মায়ের মুখটি আমার দিকে তাকিয়ে। মা, হারিয়ে যেও না। মা যদি আমার পাশে থাকে, তাহলে সেই আমাকে ভাবতে বাধ্য করবে যে, আমি একজন ইহুদি।
📄 কোথায় ইয়োসেলি?
১৯৬২ সালের মার্চের প্রথমার্ধে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন। বৃদ্ধ গুরিয়েন আইসারকে তার অফিসে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বেশ কিছুক্ষণ খোশগল্পে মেতে উঠেন। মোসাদ-প্রধান ভাবতে থাকেন, এই বুড়ো প্রধানমন্ত্রী তার কাছে কী চান। আইসার তাকে খুব ভালোভাবেই জানতেন। এই খোশগল্প করতে তাকে যে ডাকা হয়নি আইসার তা ভালোভাবেই জানতেন। এরা দু'জনই দু'জনকে খুব ভালোবাসেন, পছন্দ করেন। তাদের মন-মানসিকতাও একই ধরনের। এরা দু'জনই আকৃতিতে ছোট-খাট কিন্তু ভীষণ একগুঁয়ে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দক্ষ ও বলিষ্ঠ। নেতৃত্বদানের ক্ষমতাও এদের সহজাত। আর ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রশ্নে এরা আপোষহীন। আজে-বাজে কাজে সময়ক্ষেপণও এদের অপছন্দ। সম্প্রতি আইচম্যানকে আটকের পর এদের সম্পর্ক আরও প্রগাঢ়।
আলোচনায় মাঝপথে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গুরিয়েন আইসারের দিকে ঘুরে প্রশ্ন করেন, আপনি কি শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারবেন?
প্রধানমন্ত্রী কোন শিশুর উদ্ধারের কথা বলছেন তা আইসারের কাছে উল্লেখ না করলেও আইসারের বুঝতে বাকি থাকল না। কেননা দু'বছর ধরে একটি শিশুর অন্তর্ধান বা নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ইসরাইলে প্রচণ্ড আলোড়ন চলছিল। ইসরাইলের পত্রিকাগুলো এই শিশুকে নিয়ে যেমন নিয়মিত শিরোনাম করে চলেছে, তেমনি সে দেশের আইনসভা নেসেটেও এনিয়ে প্রবল অসন্তোষ বিরাজ করছিল। সেক্যুলার তরুণরা ইয়েসেলির প্রসঙ্গ উঠলেই আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের প্রতি ইংগিত করে ক্রোধ ও উদ্বেগ প্রকাশ করত। কোথায় ইয়েসেলি এই শ্লোগান ঐ অর্থোডক্স ইহুদিদের প্রতি লক্ষ্য করে তরুণরা প্রতিনিয়তই শ্লোগান দিত।
ইয়োসেলির বয়স ৮ বছর। হোলেনি শহরে ছিল তার বাস। তাকে অতি আধ্যাত্মিক ঘরানার ইহুদি অর্থাৎ আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিরা অপহরণ করেছে। আর এই অপহরণের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইয়েসেলির পিতামহ। ইয়েসেলির বৃদ্ধ নানার ইচ্ছা, আল্ট্রা অর্থোডক্স ঐতিহ্যে তার নাতিকে বড় করে তোলার। সেই মানসিকতায় তিনি ইয়েসেলিকে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। এরপর থেকেই ইয়েসেলি লাপাত্তা, কোনো খোঁজ মিলছে না তার। এক পর্যায়ে ইয়েসেলির নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে সারা ইসরাইল জুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায়। পারিবারিক এই বিষয়টি ইসরাইলের জাতীয় ইস্যু ও স্ক্যান্ডালে পরিণত হয়। পক্ষ-বিপক্ষের লোকেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে থাকে। সেক্যুলার ইহুদি ও আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা বেশি বেশি করে ঘটতে থাকে। অনেকে ইয়েসেলিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ারও আশংকা করেন। ঠিক এমনিতরো অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
আইসার প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আপনি এ কাজে আমাকে চাইলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। আইসার অতঃপর নিজের অফিসে আসেন এবং নিখোঁজ ইয়েসেলির নামে একটা ফাইল খোলেন। তিনি এই ফাইলের নাম দেন অপারেশন টাইগার কাব।
ইয়েসেলি এককথায় সুদর্শন প্রাণবন্ত এক শিশু। কিন্তু তার নানা নাহমান সাতারকেসের বিশ্বাস শিশুটি ভুল বাবা-মায়ের কাছে মানুষ হচ্ছে। কৃশকায় শ্মশ্রুমন্ডিত চশমা পরিহিত বৃদ্ধ নানা নাহমান হাসিদ সম্প্রদায়ের এক ধর্মান্ধ অনুরাগী। হাসিদ মতবাদের তিনি যেমন ঘোর সমর্থক তেমনি মতবাদের ব্যাপারে তিনি আপোষহীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নানা নাহমান বরফে ঢাকা সাইবেরিয়ায় বেশ কিছু সময় কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি সোভিয়েত শ্রম শিবিরে ছিলেন। কেজিবি'র সহযোগী গুণ্ডাদের তিনি পাত্তা দেননি। ফলে এই লোককে দমানো খুব কঠিন। সাইবেরিয়া বসবাসকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তার পায়ের তিনটি আঙ্গুল খসে পড়লেও তার মানসিক শক্তি বরাবরই অবিচল ছিল। সাইবেরিয়ায় তিনি একটি চোখও হারান। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তিনি মনে- প্রাণে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। সোভিয়েতদের প্রতি তার ঘৃণা চরম আকার ধারণ করে ১৯৫১ সালে। তার এক ছেলেকে গুণ্ডারা ছুরিকাহত করে মেরে ফেললে তার ঘৃণা চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। বাকি দুই ছেলে শালোম ও ওভাদিয়া এবং মেয়ে আইডা তার বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। আইডা এক দর্জিকে বিয়ে করে।
আইডা দম্পতি তার বাবার পুরনো বাড়ি লভোতে বেশ কিছুদিন বসবাস করে। রাশিয়া এবং পোল্যান্ডে কাটিয়ে তারা লভোভে বসবাস শুরু করে। ১৯৫৩ সালে এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এই শিশুটিই ইয়োসেলি।
ইয়োসেলির বয়স যখন চার বছর তখন বাবা মা'র সঙ্গে সে ইসরাইলে চলে আসে। আইডা'র বাবা-মা অর্থাৎ নাহমান সাতরাকেস তার পত্নী এবং তাদের এক ছেলে শালোম আইডাদের নিয়ে কিছুদিন আগে ইসরাইলে চলে আসে। নাহমান ব্রেসলাড হাসিদিম গোত্রভুক্ত। তারা মিয়া শেয়ারিম এলাকায় সেটল করে। এই এলাকাটি জেরুজালেমের আল্ট্রা অর্থোডক্স এলাকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এই এলাকাটি অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্নতর। এখানকার পুরুষরা লম্বা কালো কোট অথবা সিল্কের কাফতান বা ঢোলা জামা পরিধান করে। কালো অথবা পশমি টুপি তাদের থাকবেই। দাড়ি রাখে ঝোপঝাড়ের মতো। মেয়েদের পোশাক হয় পরিপাটি। তবে তাদের চুল হয় পরচুলা অথবা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা থাকে। ইয়েসিভালদের জগৎ এটি। প্রতিবেশীদের অধিকাংশই ইহুদি আইনজ্ঞ কিম্বা দরবেশ মানসিকতার। এদিকে শালোম একটা ইয়েসিভায় যোগদান করে এবং তার সহোদর ওভাদিয়া ইংল্যান্ডে চলে যায়।
আইডা এবং তার স্বামী অল্টার হোলোনোয় সেটেল করে। তেলআবিব এলাকায় একটা টেক্সটাইল কারখানায় অল্টারের চাকরি হয়। এক ফটোগ্রাফার আইডাকে কাজ দেয়। এক পর্যায়ে আইডা দম্পতি একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ইতিমধ্যে এই দম্পতি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়লে তারা তাদের প্রথম মেয়েসন্তান জিনাকে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেয়। আর ইয়েসেলি তার নানা-নানীর কাছে থাকতে শুরু করে।
জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত আইডা এবং তার স্বামী কাশিয়ার তার বন্ধুদের কাছে একের পর এক চিঠি লিখতে থাকে। এসব চিঠিতে তাদের ইসরাইলে চলে আসা সমীচীন হয়নি বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। আইডা ও স্বামীর কাছে প্রেরিত রাশিয়ার বন্ধুদের চিঠিগুলো তার বাবা নাহমানের হস্তগত হতে থাকে। নাহমান উপলব্ধি করেন যে, তার মেয়ে আইডা ও জামাতা অল্টার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অবশ্যই রাশিয়ায় পাড়ি দেবে। ক্রোধান্বিত ও উদ্বেগাকুল নাহমান অতঃপর সিদ্ধান্ত নেন ইয়েসেলিকে কোনোমতেই তিনি তার বাবা-মার কাছে ফেরত দেবেন না।
১৯৫৯ সালের শেষার্ধে আইডা দম্পতির আর্থিক অবস্থা ভালো হয়। অতএব পুরো পরিবার আবার একত্রিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। আইডা জেরুজালেমে তার বাবার বাড়িতে আসে ইয়েসেলিকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ইয়েসেলি এবং তার বাবা কাউকেই সে বাসায় পায় না। আইডা'র মা তাকে জানায় তার ভাই শালোম ছেলে ইয়েসেলিকে তার কাছে পৌঁছে দেবে। আইডা'র মা তাকে জানায় যে, ইয়েসেলি তার নানার সঙ্গে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে গেছে এবং তাদের এখন বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
পরের দিন শালোম তার বোন আইভার বাসায় গিয়ে জানায় যে, তার বাবা নাহমান কিছুতেই ইয়েসেলিকে তাদের কাছে ফেরত দেবে না। বিপর্যস্ত আইডা তার স্বামীকে নিয়ে জেরুজালেমে এসে কয়েকদিন বাবার বাড়িতে কাটায়। সে সময় ইয়েসেলি সেই বাসাতেই ছিল। শনিবার বিকেলে যখন তার সন্তানকে নিয়ে নিজেদের বাসায় চলে যাবে তখন আইডা'র মা বলে, বাইরে খুব ঠাণ্ডা। ইয়েসেলি রাতটা এখানেই কাটাক। সকালে আমি ওকে দিয়ে আসব। আইডারা এতে রাজি হয় এবং ছেলেকে কম্বল দিয়ে চলে যায়। আইডা দম্পতি কি জানত, এই ছেলেকে আবার ফিরে পেতে তাদের কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে?
পরের দিন ইয়েসেলি এবং তার নানী আইডাদের বাড়িতে আর যায়নি। আইডা এবং তার স্বামী জেরুজালেমে ছুটে এসেও তাদের খুঁজে পায়নি। ছেলেটি তাহলে ভ্যানিশ হয়ে গেছে! এদিকে ইয়েসেলির নানা-নানী কোনোমতেই নাতিকে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। কাঁদতে থাকে আইডা। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয় না। ছেলেকে হারিয়ে ফেলল আইডা। আইডা এবং তার স্বামী ছেলেকে নিতে এরপর বহুবার তার বাবার বাড়িতে গেছে। কিন্তু কোনো লাভ না হওয়ায় ১৯৬০ সালে তারা আদালতে যায়। আইডা তার বাবা নাহমানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। তেল-আবিবের আদালতে আইডা মামলা করে। নাহমানরা এই মামলার কোনো জবাব দেয় না। শুরু হয় ইয়েসেলিকে নিয়ে বাবা-মেয়ের যুদ্ধ।
জানুয়ারির ১৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট ত্রিশ দিনের মধ্যে নাহমানকে নির্দেশ দেয় ইয়েসেলিকে ফেরত দিতে। তাকে আদালতে হাজির হওয়ারও নির্দেশ দেয়। দুদিন পরে নাহমান আদালতকে জানায় যে, ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য তার পক্ষে আদালতে হাজির হওয়া সম্ভব নয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি আইডা তার বাবার বিরুদ্ধে পুলিশে মামলা করে গ্রেফতারের দাবি করে। ছেলেকে কাছে না পাওয়া পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখারও আর্জি করা হয়। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট ইয়েসেলিকে খুঁজে বের করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। দশ দিন পর পুলিশ ইয়েসেলিকে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ ইয়েসেলিকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় এবং এই অনুসন্ধান থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে অনুরোধ করে।
১২ মে সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে ইয়েসেলির নানাকে গ্রেফতার ও অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয়। পরদিন নাহমান গ্রেফতার হয়। নাহমানকে গ্রেফতার করেও কোনো লাভ হয় না। সে একটি কথাও স্বীকার করেনি।
এতে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, নাহমান পরিবার নিজেদের থেকে নাতি ইয়েসেলিকে লুকিয়ে রাখেনি। আল্ট্রা অর্থোডক্স ইহুদিদের একটা নেটওয়ার্ক ইয়েসেলিকে লুকিয়ে ফেলেছে এবং তারা পুলিশকে প্রতারিত করছে। তারা যে অলঙ্ঘনীয় নীতি গ্রহণ করেছে তা হল, কোনোমতেই যেন ইয়েসেলিকে তার বাবা মা রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে না পারে তা ব্যর্থ করে দেয়া। অবশ্য ইয়েসেলির নানা নাহমানই হয়তো এ রকম ধারণা দিয়েছে ইহুদিদের ঐ গোত্রগত নেটওয়ার্ককে। মজার ব্যাপার হল, জেরুজালেমের রাব্বি সম্প্রদায়ের প্রধান রাব্বি ফ্রাঙ্ক ইয়েসেলির নানার পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। ঐ বিবৃতিতে তিনি অর্থোডক্স কমিউনিটিকে নাহমানকে সর্বতোভাবে সহযোগিতারও আহ্বান জানান।
১৯৬০ সালের মে মাসে ইসরাইলের সংসদ নেসেটে এই বাচ্চা হারানোর বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করে তুমুল আলোচনা হয় এবং সাংবাদিকদের জন্য এ দিনটি ব্যস্ততম দিন হিসেবে পরিগণিত হয়। সংসদে ধর্মীয় দলগুলোর প্রতিনিধিরা এ নিয়ে ব্যাপক গোলযোগও করেন। সংসদ সদস্য লরেঞ্জ বলেন, বাচ্চা হারানোর বিষয়টি ঘিরে ইসরাইলে যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছে। তিনি নানা নাহমান ও তার মেয়ে আইডা'র মধ্যস্থতাকারী হওয়ারও প্রস্তাব করেন। সংসদ সদস্য লরেঞ্জ জেলখানায় নাহমানের কাছে একটা চুক্তিনামা পাঠান। সেখানে লেখা ছিল শিশুটিকে ফেরত দেয়া হলে তাকে অর্থোডক্স অনুগামী নাহমান অতঃপর এই বলে সম্মতি দেন, যদি এ কাজে তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মগুরু অর্থাৎ রাব্বি মেইজিম যদি তাকে আদেশ দেন তাহলে চুক্তিতে তিনি রাজি আছেন।
লরেঞ্জ দ্রুততার সঙ্গে জেরুজালেমে পৌঁছে ঐ রাব্বির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাব্বি মেইজিম ধারণা দেন যে, যদি অপহরণকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হয় তাহলে তিনি এই চুক্তিতে সম্মতি দিতে রাজি আছেন।
সংসদ সদস্য লরেঞ্জ পুলিশ প্রধান জোসেকের কাছে ছুটে যান। পুলিশ প্রধান সম্মতি দেন যে, মামলা হবে না। গ্যারান্টেড। তিনি তার গাড়ি সাংসদ লরেঞ্জকে এগিয়ে দেন। এ-ও বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার অনেক অগ্রাধিকার রয়েছে। আপনি এই গাড়ি নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সন্দেহও করবে না। আপনি শিশুটিকে নিয়ে আসুন।
খুশিমনে লরেঞ্জ ফিরে আসেন রাব্বি মেইজিসের কাছে। কিন্তু রাব্বি ইতিমধ্যে তার মন পরিবর্তন করেছেন। লরেঞ্জ ফিরে আসেন ভগ্ন হৃদয়ে। তিনি ধারণা করেন শিশুটিকে সম্ভবত কোনো ধর্মীয় কমিউনিটিতে কিম্বা কোনো অর্থোডক্স গ্রামে লুকিয়ে রাখা হয়েছে কিম্বা কোনো স্কুলে। কিন্তু রাব্বিদের নীরবতার দেয়াল ভাঙা কঠিন এবং মিশনটি হয়ে উঠল ইমপসিবল।
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল অপহৃত শিশুর নানা নাহমান ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে জেল থেকে ছাড়া পান। তবে তিনি তার নাতিকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি তার কথা না রাখলে সুপ্রিম কোর্ট আবার তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট শিশুর অপহরণকে দুঃখজনক ও জঘন্য কাজ বলে উল্লেখ করে। ১৯৬১ সালের আগস্টে ইয়েসেলির উদ্ধারে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হলে তারা সর্বত্র লিফলেট বিতরণ ও জনসভা করে। কয়েক হাজার মানুষ ইয়েসেলিকে উদ্ধারের পক্ষে দরখাস্ত করে। দুই সংস্কৃতির যুদ্ধ ও বিরোধের ছায়া ইসরাইলিদের আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে ফেলে।
১৯৬১ সালের আগস্টে পুলিশ হাসিদিকদের গ্রাম কোমেমিউটে অভিযান চালায়। ইয়েসেলিকে অবশ্য এই গ্রামে দেড় বছর আটকে রাখা হয়েছিল। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে ইয়েসেলির মামা শালোম তাকে এখানে নিয়ে এসে জালমান কট নামের এক লোকের বাড়িতে রাখে। তখন ইয়েসেলির নাম দেয়া হয়েছিল ইসরায়েল হাজাক।
ইতিমধ্যে শিশুটির মামা শালোম দেশ ছেড়ে লন্ডনে স্থায়ীভাবে চলে যায়। লন্ডনে হাদিসিক সম্প্রদায়ের লন্ডনের গোল্ডরাস গ্রিনে যে এলাকা রয়েছে সেখানে সে বসতি গাড়ে। ইসরাইলি পুলিশের নির্দেশে ব্রিটিশ পুলিশ লন্ডনে শালোমকে গ্রেফতার করে। ঐ সময়ই তার প্রথম সন্তান কালমানের জন্ম হয়। শিশু কালমানের খতনা সম্পন্ন করার জন্য তাকে তার বাবা শালোমের জেল খানায় নেয়া হয়।
কিন্তু ইয়েসেলির কোনো সন্ধান নেই। কারো কারো ধারণা তাকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা অসুস্থতায় সে মারা গেছে। এদিকে সারা দেশে পুলিশ হাসির পাত্রে পরিণত হয়। পুরো ইসরাইল জুড়ে সেক্যুলার ও অর্থোডক্স ইহুদিদের মধ্যে লাগাতার সংঘর্ষ বেধে যায়।
ইয়েশিভার ছাত্রদের পথচারীরা রাস্তায় ধরে পেটাতে শুরু করে। সেক্যুলার তরুণরা অর্থোডক্স তরুণদের দেখলেই চিৎকার করে বলে উঠে, কোথায় ইয়েসেলি? পুরো ইসরাইল জুড়ে এই তাণ্ডব। ওদিকে ইসরাইলের সংসদে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছেই।
মোসাদ-প্রধান আইসার যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইয়েসেলিকে খুঁজে বের করে দেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি; তার ক্যারিয়ারের একটা জটিলতম অধ্যায় হয়ে উঠবে এটি। আইসার হারেল অভিযানের কোনো ব্যাপারে তার স্ত্রীর সঙ্গে কখনো আলোচনা করেননি। কিন্তু শিশু অপহরণের ব্যাপারটি আলাপ না করে পারলেন না। স্ত্রীকে বললেন, সরকার এবার খুব বেকায়দায় পড়েছে।
এদিকে আইসারের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা আব্রাহام সালোম বললেন অন্যকথা। তার ভাষায় আইসার প্রমাণ করতে চান, পুলিশ যেখানে ব্যর্থ সেখানে তিনি সফল হবেনই।
পুলিশ প্রধান আইসারকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী মনে করেন শিশুটিকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব হবে? সাবাক পুলিশ প্রধান এবং আইসারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আমোক ম্যানোর এই অভিযানের বিরোধী ছিলেন বরাবরই। মোসাদ ও সাবাকের সিনিয়র কর্মকর্তারাও অনুরূপ ধারণা পোষণ করতেন। তাদের ভাষ্য, শিশু খুঁজে বের করার দায়িত্ব মোসাদের মতো মর্যাদাবান সংগঠনের হতে পারে না। ইসরাইলের নিরাপত্তা দেখাই মোসাদের কাজ। প্রকৃতপক্ষে আইসার ছাড়া কোনো পর্যায়ের গোয়েন্দারাই মনে করেন না যে, ইহুদি রাষ্ট্রের সুনাম সংরক্ষণও তাদের দায়িত্বেরও অংশ। তবে সমস্যা হল, আইসার যখন মন স্থির করে ফেলেছেন, তদন্তটি তিনি চালাবেন তখন তাকে বাধা কে দেবেন? কেননা তার কর্তৃত্বই চূড়ান্ত।
আইসার ও তার সহযোগীরা সাবাকের সেরা গোয়েন্দাদের নিয়ে ৪০ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করলেন। তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা এমনকি সুশীল সমাজের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এই অভিযানে শরিক হতে আগ্রহী হলেন। অর্থোডক্স সমাজের স্বেচ্ছাসেবীরা অনুধাবন করলেন যে, ইয়েসেলির অপহরণ জাতিকে একটা বিপজ্জনক পর্যায়ে ফেলে দিয়েছে। যাহোক, তাদের প্রথম অভিযান নিদারুণভাবে ব্যর্থ হল। প্রথম অভিযানটি করা হয়েছিল অর্থোডক্সদের একটি দুর্গে। কিন্তু অভিযানের পর তারা উপহাসের পাত্রে পরিণত হলেন। আইসারের গোয়েন্দাদের ভাষ্য ছিল, আমরা যেন মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করেছি।
আইসার খুবই সতর্কতার সঙ্গে ইয়েসেলির ফাইলটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। প্রত্যেকটি তথ্য একাধিকবার পড়তে লাগলেন। কিন্তু ইসরাইল জুড়ে শিশুটির অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। মোসাদ-প্রধান আইসার-ভাবনার পরিণতি টানলেন এভাবে যে, শিশুটিকে দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। বিদেশে নিয়ে যাওয়া হলে সেটা কোনো দেশ?
একটা ছোট্ট নিউজে চোখ আটকে গেল আইসারের। ১৯৬২ সালের মধ্য মার্চে হাসিদিক ইহুদিদের বিরাট একটি দল সুইজারল্যান্ড থেকে ইসরাইলে এসেছিলো। রাব্বিদের এক শ্রদ্ধাভাজন গুরুর অন্তোষ্টিক্রিয়ায় এসকর্ট হিসেবে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ ছাড়া শিশুরাও ছিল। ঐ রাব্বি গুরুকে হলি ল্যান্ডে সৎকার করা হয়। আইসারের কেন জানি মনে হল মরদেহ সৎকারের ব্যাপারটি ছিল আইওয়াশ। দলটি কয়েক সপ্তাহ পরে সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় ইয়েসেলিকে নিয়ে গেছে। নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই বাহানা। আইসার বিমানবন্দরে তার লোক নিয়োগ করলেন এবং জুরিখে তার একটি টিম পাঠালেন আব্রাহام শালোমের নেতৃত্বে। হাসিদিকরা সেখানে ফিরে গিয়ে কী করছে তা দেখার জন্য। মোসাদ গোয়েন্দারা শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে পর্যন্ত গোপন তল্লাশি চালায়। রাতের বেলা লুকিয়ে বোর্ডিংয়ের বারান্দা প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করে। বলতে গেলে প্রতিটি শিশুকে তারা অবলোকন করে। একটা জঙ্গলের মাঝখানে ছিল ইয়েসিভাদের স্কুল। আব্রাহام শালোমের ভাষায়, ইয়েসেলির বয়সী সব ছেলেকে লুকিয়ে জানালা দিয়ে পরীক্ষা করেছি। কেননা, আমাদের ধারণা ছিল হয়তো তাকে ছদ্মবেশ ধারণা করে রাখা হয়েছে। এক সপ্তাহ রাতের অভিযান চালিয়ে আব্রাহام আইসারকে জানান যে, সুইস শিশুদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ওখানে ইয়েসেলি নেই।
আইসার নিজেই অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। তিনি তার হাতের কাজ অন্যদের ওপর ন্যস্ত করলেন। প্যারিসে তিনি সাময়িকভাবে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরিত করলেন এবং বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিলেন। তার গোয়েন্দারা ফ্রান্স, ইটালি, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকায় গোয়েন্দাগিরি শুরু করল। অর্থোডক্সদের সমাজ ও ইয়েসিভাগুলো বিশ্বব্যাপী যেখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে সর্বত্রই লোক লাগানো হল। জেরুজালেম থেকে এক তরুণ অর্থোডক্স ইহুদি সুইজারল্যান্ডের একটা বিখ্যাত ইয়েসিভায় আসল। সে একজন পণ্ডিত সাজল এবং একজন নামি শিক্ষকের অধীনে অধ্যয়ন করবে বলে ওদেরকে জানাল। লন্ডনে গিয়ে উপস্থিত হল ইয়েডিথ নিশিইয়াহু নামের এক মহিলা গোয়েন্দা। এই ভদ্রমহিলা আইসারের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা। আইচম্যানকে ধরে আনার ক্ষেত্রে সে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইয়েডিথ একজন ধর্মপ্রাণ মহিলা। সে লন্ডনে এসেছে অপহৃত শিশুটির মামা শ্যালোমের শাশুড়ির চিঠি নিয়ে। এই চিঠি নিতে বা আস্থা অর্জনে তাকে কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি। শ্যালোমের পরিবার লন্ডনে তাকে তাদের বাসায় হাউজগেস্ট হিসেবে থাকার আমন্ত্রণ জানায়। তারা অবশ্যই এই ভালো মহিলা যে গোয়েন্দা তা জানতে পারেনি।
লন্ডনে ইয়েডিথই একমাত্র গোয়েন্দা ছিল না। সাতমার গোত্রের আল্ট্রা অর্থোডক্স হাসিদিকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল লন্ডন। রোমানিয়ার সাতুমারে গ্রামের নামানুসারে এই গোত্রের নামকরণ করা হয়। কেননা ঐ গ্রাম থেকেই এই গোত্রের উৎপত্তি।
মোসাদ-প্রধান আইসার লন্ডনে হাসিদিকদের আবাসিক এলাকায়ও তার গোয়েন্দা নিয়োগ করেন। আরেকটি টিমকে পাঠানো হয় আয়ারল্যান্ডে। এক গোয়েন্দা অবহিত হল যে, ধর্মপ্রাণ এক দম্পতি সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে একটা বিচ্ছিন্ন বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। মোসাদ গোয়েন্দারা ভাবল, এই বাড়ি হয়তো ইয়েসেলির নতুন ঠিকানা হয়েছে। তারা ঐ বাড়িতে অভিযান চালানোর জন্য পাশেই বাড়ি ভাড়া করল, জাল কাগজপত্র তৈরি করল। কিন্তু এখানেও তাদের অভিযান ব্যর্থ হল। তাদের ভাষআয়াল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ দম্পতি প্রকৃত অর্থেই ধার্মিক। তারা আয়ারল্যান্ডে ছুটি কাটাতে এসেছে। জাঁদরেল মহিলা গোয়েন্দাও অপহৃত শিশুর মামার বাড়ি থেকে কোনো তথ্যসূত্র উদ্ধার করতে পারল না। সুইজারল্যান্ডে নিয়োগকৃত গোয়েন্দাও খালি হাতে ফিরল। সারা বিশ্ব থেকেই অপহৃত শিশুর ব্যাপারে নেতিবাচক খবর আসতে থাকল। কোথাও নেই সে।
আইসারের গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটে গেল লন্ডনের সাতমার হাসিদিকে। ইয়েশিভার স্মার্ট বেশ কয়েকজন তরুণ স্টামফোর্ড হিল এলাকায় আইসারের গোয়েন্দাদের প্রায় ঘিরে ফেলল। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, ইহুদিবাদীরা এখানে ঢুকে গেছে। আস তোমরা। ইয়েসিলে এখানেই আছে। তরুণরা লন্ডন পুলিশকেও খবর দিল। আইসারের কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য গোয়েন্দাদের ব্রিটিশ রাণির জেলখানা ঢোকা থেকে মুক্ত করতে সমর্থ হল।
আইসারের সব মিশনই ব্যর্থ। ব্যর্থ গোয়েন্দারা আইসারকে অভিযান বন্ধ করে দিতে বলল। আরও বলল, আপনি খড়ের গাদায় সুচ খুঁজছেন। ঐ বাচ্চাকে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মোসাদ-প্রধান আইসার নাছোড়বান্দা। তিনি আশাবাদী। অবশ্যই নিখোঁজ শিশুটিকে তিনি উদ্ধার করে ছাড়বেন।
আইসার প্যারিসের মোসাদ-প্রধান ইয়াকোভ কারুণকে ডেকে পাঠালেন। তার জন্ম রোমানিয়ায়। গণহত্যা কালে কারুজ তার বাবা-মাকে হারিয়েছেন। জেরুজালেমে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি গোয়েন্দাগিরি ও ইসরাইলের নিরাপত্তা বিষয়গুলো দেখভালের সঙ্গে যুক্ত। কারুজকে দেখলে একজন বুদ্ধিজীবীর মতো মনে হয়। তিনি মোসাদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক প্রধান। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হত তাকে। ইসরাইলের সঙ্গে ইরান, ইথিওপিয়া, তুরস্ক এমনকি সুদানের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনে তার অবদান রয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটিশ ও জার্মান সিক্রেট সার্ভিসের সঙ্গে তার বিশেষ দহরম-মহরম বিদ্যমান। মরক্কোর ভয়ংকর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কুফকিরের সঙ্গে তার দুর্দান্ত সম্পর্ক। বাদশা কিং হাসানের সঙ্গে তিনি একবার মরক্কোতে গোপনে গিয়ে সাক্ষাৎও করে এসেছেন। ইথিয়পিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসিকেও তিনি সম্ভাব্য এক অভ্যুত্থান থেকে রক্ষা করেছেন। আলজেরিয়ায় অভিযানকালে জুলিয়েটে নামের এক মহিলার প্রেমে পড়ে তাকেই বিয়ে করেন। স্বল্পভাষী কারুজ নিপাট ভদ্রলোকও। স্যুট-টাই পরিহিত এই কারুজ একজন মাস্টার স্পাই। তাকে অবশ্য কখনো মাঠে কাজ করতে হয়নি। আইসারের কাছে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা। ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় অনর্গল কথাও বলতে সিদ্ধহস্ত কারুজ।
আইসার সারাদিনই কাজে মগ্ন থাকেন। তিনি একটা হোটেল রুম ভাড়া নিয়েছেন সত্য কিন্তু দিন-রাত সর্বক্ষণই কাটান একটি এপার্টমেন্টে। এটিকেই তিনি অপারেশনাল সদর দফতর বানিয়েছেন। ঐ এ্যাপার্টমেন্টে তার জন্য একটা ফোল্ডিং খাটিয়া কেনা হয়েছে। জুনিয়াররা যার নাম দিয়েছে ইয়েসেলি বেড। মাঝে মাঝে কখনো তিনি কয়েক মিনিটের একটা দিবানিদ্রা ঐ খাটিয়ায় শুয়ে সারেন। গত কয়েক মাস ধরে যা ঘটেছে আইসার সারা ইউরোপ জুড়ে থাকা তার গোয়েন্দাদের চিঠি বা টেলিগ্রাম লিখছেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রাপ্ত রিপোর্ট দেখছেন, গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন। হয়তো ভোররাতে অফিস ছেড়ে তিনি হোটেলে যান, গোসল করেন। আবার কিছুক্ষণের মধ্যে অফিসে চলে আসেন। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে হোটেলের দ্বাররক্ষী অবাক বনে যায়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে হোটেলের দ্বাররক্ষী শেষ দিকে হ্যাট নামিয়ে তার প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাত।
এপ্রিলের এক সকালে মোসাদের কাছে একটা কৌতূহলোদ্দীপক রিপোর্ট এল। মেইর নামে এক অর্থোডক্স ইহুদি রিপোর্টের প্রেরক। মেইরকে পাঠানো হয়েছিল অ্যান্টওয়ার্প। এটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। সেখানে সে এক গ্রুপ ধর্মীয় ডায়মন্ড ব্যবসায়ীর সন্ধান পেয়েছে। এই ব্যবসায়ীরা বৃদ্ধ রাব্বি ইটজিকেলের কথাকে যেমন আইন হিসেবে গণ্য করে তেমনি তাকে হলিম্যান মনে করে। এই ডায়মন্ড ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরোধ বাধলে তারা কোনো আদালতের শরণাপন্ন হয় না। তারা ঐ রাব্বির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মনে করে এবং তার যে কোনো রায় মেনে নেয়। হাজার কোটি টাকার বিরোধ হলেও। এই রাব্বির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ইউরোপের আধুনিক জীবনেও তারা এই বিশেষ গ্রুপটি প্রাচীন আমলের রীতি-নীতি মেনে চলে।
মেইর আরো জানতে পারে যে, রাব্বির ঐ অনুসারীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজিবিরোধী আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপ হিসেবে কাজ করত। একই সঙ্গে গেস্টাপো বাহিনীর হাত থেকে বহু ইহুদিকে রক্ষা করেছে। যুদ্ধশেষেও তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে থাকে। ডায়মন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মেইর ক্যাথোলিক, স্মার্ট, স্বর্ণকেশী, নীলনয়না এক ফরাসি মহিলার কথা জানতে পেরেছে। যুদ্ধের সময় ঐ মহিলাও এদের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং হিটলারের কবল থেকে বহু ইহুদিকে রক্ষা করেছে। মহিলা ব্যাপকভাবে রাব্বিদের মতবাদের অনুরক্ত হয়ে পড়ে এবং ইহুদিধর্মে নিজেকে দীক্ষিত করে। পরবর্তীতে ধর্মপ্রাণ অর্থোডক্সে নিজেকে উন্নীত করে। আন্ডারগ্রাউন্ডের জীবন মহিলাকে অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছে। সুন্দরী, দুঃসাহসী হিসেবে সে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তার ব্যবসায়িক বুদ্ধিরও তুলনা হয় না। ফ্রান্সের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অ্যান্টওয়ার্প গ্রুপের কাজে সে সারা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছে। মেইয়ের ভাষায়, মহিলাটি এক কথায় হলি ওম্যান। মেইর জানিয়েছে, এই হলি ওম্যান ইসরাইলও সফর করেছে। প্রথম বিয়ের মাধ্যমে জন্ম দেওয়া পুত্র ক্লাউডেও ধর্মান্তরিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ইয়েশিভাসের প্রাক্তন ছাত্র ক্লাউডেও বর্তমানে জেরুজালেমের তালমুডিক স্কুলে পড়েছে। কিন্তু অ্যান্টগ্রুপের লোকজন এখন জানে না যে, এই দুর্দান্ত হলি ওম্যান এখন কোথায়।
মেইর প্রেরিত এই তথ্যাদি আইসারের মনের দিগন্ত যেন খুলে দিল। মেইরের রিপোর্টটি সাদামাটা বটে। কিন্তু আইসার এর মধ্যে কী যেন একটা পেলেন। এক মহিলার হাজারো চেহারা। নিশ্চয়ই এর সঙ্গে ইয়েসেলির ঘটনার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যদিও মেইরের রিপোর্টের মাধ্যমে মহিলার সঙ্গে ইয়েসেলির ঘটনার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া বিরল। তবে আইসার নিশ্চিত অর্থোডক্স নেতাদের কাছে এরকম মহিলার গুরুত্ব থাকবেই। অর্থোডক্স নেতারা ইয়েসেলিকে পাচার করে থাকলে তার সঙ্গে এই মহিলার যোগসাজশ না থেকে পারে না।
আইসারের মনে এখন এই মহিলার কর্মকাণ্ড বড় করে দেখা দিল। তিনি অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে এই মহিলাকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে ভাবতে লাগলেন। আইসার ইসরাইলে বিস্তারিত জানালেন এবং ঐ মহিলা ও তার ছেলে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে বললেন।
কয়েকদিনের মাথায় সেই টেলিগ্রামের উত্তর এল। ছেলের বর্তমান নাম এরিয়েল এবং সে ইসরাইলেই রয়েছে। এরিয়েলের মা কোথায় আছে কেউ তা জানে না। তার প্রকৃত নাম মেডেলিন ফেরাল্লিয়ে। কিন্তু ইসরাইলে তার নাম রুথ বেনডেভিড।
এসব তথ্যাদিতে আইসারের সদর দফতর ম্যাডেলিন সম্পর্কে অনেকখানি প্রকৃত তথ্য জানতে সমর্থ হল। মেডেলিন প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করেছে। সহকর্মী সুদর্শন হেরীকে সে বিয়ে করে এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর পরই তাদের সন্তানের জন্ম হয়। যুদ্ধের সময় ম্যাডেলিন ম্যাকুইস রেসিসট্যান্ট গ্রুপে যোগদান করে। আন্ডারগাউন্ড কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কারণে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের ইহুদি গ্রুপ বিশেষ করে অ্যান্টওয়ার্প গ্রুপের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। যুদ্ধ শেষে এদের কিছু লোকের সঙ্গে সে আমদানি-রফতানি ব্যবসাও শুরু করে।
১৯৫১ সালে সে স্বামী হেনরিকে তালাক দেয়। ক্ষুদ্র আলতাসান শহরের এক তরুণ রাব্বির সঙ্গে প্রেমলীলায় সে জড়িয়ে পড়ে। এই নিষ্ঠাবান রাব্বি ইসরাইলে স্থায়ীভাবে চলে আসতে আগ্রহী এবং সেখানেই তারা বিয়ে করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ইহুদি ধর্মে মহিলার দীক্ষা বা ঠিক ধর্মকে ভালোবেসে হয়নি। তার অনুগামীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই ধর্মান্তর। ধর্মান্তরিত হয়েই ম্যাডেলিন অথবা রুথ বেন হেজাবি বনে যায়। তার স্বর্ণকেশ এ সময় ওড়না দিয়ে ঢাকা থাকত। সাজপোশাকে ব্যাপকভাবে আগ্রহী এই মহিলা অর্থোডক্স ইহুদিদের মতো সাদাসিধে পোশাক পরতে শুরু করে। কিন্তু ইসরাইলে এই প্রেমিকযুগলের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। ঐ রাব্বি তাকে ছেড়ে চলে গেলে সে একাকী হয়ে যায়। হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত এই মহিলা জেরুজালেমের সবচে বড় সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। রাব্বি নেতা মেইজিশের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে। এই ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এই মহিলা বেশ শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হয় এবং ফরাসি পাসপোর্টের কারণে জেরুজালেমের জর্ডান অংশে তার অবাধ যাতায়াতেও কোনো সমস্যা হয় না।
পঞ্চাশ দশকের শুরুতে মেডেলিন অথবা রুথ ফ্রান্সে ফিরে এসে ব্যাপকভাবে দেশ-বিদেশ সফর শুরু করে। মোসাদ এজেন্টরা জানতে পারে মেডেলিন প্রায়ই প্যারিস সন্নিহিত মহিলাদের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করত। কিন্তু তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না।
ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আইসারকে মেডেলিন অথবা রুথের দু'বার ইসরাইল সফরের কথা জানায়। এ অবশ্য গত কয়েক বছরের মধ্যে। তার দ্বিতীয়বার সফর ঘটে ১৯৬০ সালের ২১ জুন। এই সময় ইসরাইলে তার ছোট্ট একটি মেয়েকে রেখে যায়। পাসপোর্টে এটি তার মেয়ে বলে সে উল্লেখ করে। কিন্তু কে এই মেয়েটি? মেডেলিন অথবা রুয়ের তো কোনো মেয়ে ছিল না। মোসাদ- প্রধান আইসার স্থির সিদ্ধান্তে এলেন এই বলে যে, মহিলাকে খুঁজে বের করাই তার প্রধান কাজ। তিনি সঠিক পথেই আছেন। ইয়াকোভ কারুজকে তিনি ঐ মহিলাকে ধরার নির্দেশ দিলেন।
প্যারিস সন্নিহিত এইক্সলেজ বেইনসে গিয়ে কারুজ মেডেলীন কিম্বা রুথকে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও চেহারায় দেখতে পেলেন। গোয়েন্দাদের আরেকটি সূত্র লন্ডনের ধনী মণিমুক্তা ব্যবসায়ী জোসেফ ডোম্বের সঙ্গে ম্যাডেলিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানতে পারল। ডোম্বের সঙ্গে যে ধরনের গাড়িতে মেডেলীন বসা ছিল তা হাসিদিক গোত্রের কোনো মানুষের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। আইসার ভালো করেই জানতেন, ডোম্ব হল ইসরাইল রাষ্ট্রের একজন শত্রু। ডোম্ব সাতমার হাসিদিক গোত্রের লোক এবং নিউইয়র্কের সাতমার রাব্বির বিশেষ আস্থাভাজন। নিউইয়র্কের সাতমার রাব্বিকে যদি পোপ বলা হয় সেক্ষেত্রে ডোম্ব হল আর্চ বিশপ। আইসারকে একজন বিশেষজ্ঞ এভাবেই বর্ণনা দিয়েছিলেন।
মোসাদ-প্রধান আইসার উপলব্ধি করলেন, তাকে এখন লন্ডনের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত অপহৃত শিশুটির দুই চাচার বাস এখন লন্ডনে। ডোম্বের নেতৃত্বাধীন সাতমার সম্প্রদায় লন্ডনে খুব তৎপর। ফলে মেডোলন ইয়েসেলিকে ইসরাইল থেকে পাচার করে লন্ডনে নিয়ে এসেছে বলে আইসার স্থিরনিশ্চিত হলেন। ইউরোপ ও ইসরাইলের সাতমার হাসিদিকরা যৌথভাবে ইয়েসেলিকে অপহরণ করেছে। ডোম্ব এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে। মেডেলিনের ফ্রান্সের পাসপোর্ট বিদ্যমান। সে সুন্দরী। প্রতিভাময়ী ও অভিজ্ঞ। মেডেলিন এই অপহরণে স্বশ্যই সহযোগী ছিল এবং সে জানে ইয়েসেলি কোথায় আছে।
আইসারের এই সন্দেহ তাদের সহযোগী গোয়েন্দা সংস্থা সাবাকের এক গোয়েন্দা কনফার্ম করে। মেডেলিন তার ছেলেকে যেসব চিঠি লিখেছে তার মধ্যে ইয়েসেলিকে অপহরণের বিষয়ে কিছু আভাস-ইংগিতও ছিল।
আইসারের প্রয়োজন আরও খবর, আরও তথ্য। সাতমার হাসিডিমে তিনি আরও লোক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এক মোসাদ গোয়েন্দা ফ্রেয়ার নামের এক খৎনাকারীকে খুঁজে পায়। ইহুদিদের নবজাতকদের ফ্রেয়ার খৎনা করে থাকে। বাচাল প্রকৃতির এই লোকটির আরাধ্য হল খাও দাও ফুর্তি কর জাতীয়। সে ডোম্বের খুব ঘনিষ্ঠ এবং ইয়েসেলি কোথায় আছে তা জানে বলে দাবি করে।
আইসার ফ্রায়েরকে প্যারিসে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মরক্কোর প্রিন্স সাজিয়ে তার কাছে লোক পাঠানো হয়। মরক্কোর কথিত প্রিন্স তাকে বলে যে, এক ইহুদি মেয়ের প্রেম পড়ে তাকে সে বিয়ে করেছে। বাড়িতে তারা ইহুদি মতে জীবন-যাপন করে বটে কিন্তু মরক্কোতে তা জানাজানি হলে তার পরিবার তাকে হত্যা করবে। এখন তাদের দম্পতির যে সন্তান হয়েছে তার খৎনা করতে তাকে প্যারিসে আসতে হবে। নবজাতক বাবা-মা'র সঙ্গে এখন প্যারিসে রয়েছে। রাব্বি ফ্রেয়ার যদি খৎনাটা করে দেয় বিরাট এমাউন্টের টাকা-পয়সাও কোনো সমস্যা হবে না।
ফ্রেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয় এবং কয়েকদিনের মাথায় প্যারিসে আসে। মরক্কোর কথিত প্রিন্সের ফ্ল্যাটে আসার সঙ্গে সঙ্গে মোসাদ গোয়েন্দারা তাকে আটকে ফেলে। মুত্যভয়ে ভীত ফ্লেয়ার সব তথ্য দিতে সম্মত হয় কিন্তু যখন ইয়েসিলের প্রসঙ্গ উঠে সে তারস্বরে কোনো তথ্য দিতে পারবে না বলে জানায়।
প্রকৃতপক্ষে অবশেষে জানা যায় অপহৃত ইয়েসেলির ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। হামবড়া ভাবের জন্যই সে ধরা পড়েছে। অতএব আইসারের অভিযান তৎপরতা আরেকবার দেয়ালের সঙ্গে বাড়ি খেল।
পক্ষান্তরে মোসাদ-প্রধান আইসারের আরেকটি গোয়েন্দা দল যেন স্বর্ণের খনি আবিষ্কার করে বসল। ফ্রান্সের সিক্রেট সার্ভিসের মাধ্যমে মোসাদ গোয়েন্দারা মেডেলিনকে লেখা বেশ কিছু চিঠি উদ্ধার করল। মেডেলিন একটা বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। প্যারিসের লয়রে ভেলির এই বাড়িটি মেডেলিনেরই। খুবই সুন্দর এলাকা। মোসাদ গোয়েন্দারা মেডেলিনকে পরিচয় গোপন করে লিখল যে, তার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দাম দিতে তারা তারা কিনতে আগ্রহী। তারা নিজেদের অস্ট্রিয়ার ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিল। মেডেলিন এবার তাদের এপয়েনমেন্ট দিল প্যারিসের একটা বিশাল হোটেলে। তারিখটা ১৯৬২ সালের ২১ জুন।
ঐ তারিখের আগে আইসারের গোয়েন্দারা একের পর এক প্যারিসে আসতে শুরু করেন। গোয়েন্দারা জাল কাগজপত্র, ভাড়া গাড়ি, সেফ হাউস সহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর বন্দোবস্ত রাখল। পালিয়ে যাওয়ার রাস্তায়ও ঠিক করে রাখল।
আইসার এ-ও ধারণা করেছিলেন, মেডেলিনের ছেলে তার মা সম্পর্কে অনেক বেশি জানবে। সে পড়ত ইসরাইলে। আইসার তার মায়ের গ্রেফতারলগ্নে ইসরাইলে তার ছেলেকেও গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নিলেন। এরিয়েলও অর্থোডক্স কিন্তু মায়ের মতো সে গোঁড়া নয়। দু'জনকে একই সময়ে গ্রেফতারের কারণ হল, মাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রয়োজনে যেন ছেলের কাছ থেকে তার সত্যতা যাচাই করা যায়। এমনই সিস্টেম করে ফেললেন আইসার।
২১ জুন বেশ লম্বা, চোখে লাগার মতো এক সুন্দর রমনী হোটেলের লবীতে ঢুকলো। এই-ই হল গোয়েন্দাদের কাছে প্রত্যাশিত মেডেলিন।
কথিত দুই অস্ট্রীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে নিজে থেকে পরিচয় পর্ব সারল মেডেলিন। মেডেলিন চমৎকার ইংরেজি বলে। দুই ব্যবসায়ী বাড়ি বিক্রির আলোচনা দ্রুত শেষ করল। কিন্তু উকিল আসতে দেরি করছিল। উকিলকে ফোন করা হলে সে ব্যস্ততার জন্য ক্ষমা চাইল। তবে উকিল বলল, শহরের কাছেই তার বাসা। তিন মক্কেল যদি তার বাসায় আসে তাহলে সেখানে সব কাগজপত্র দেখে সই করে দেবে। মেডেলিন উকিলের বাড়ি যেতে রাজি হল। ভাড়া গাড়িতে তিনজনই উঠল। এদের মধ্যে দু'জন যে মোসাদ গোয়েন্দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সুন্দরী মেডেলিনকে দেখে গাড়ির চালক গোয়েন্দার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। সে ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করে বসল। মেডেলিন মিষ্টি কথায় ট্রাফিক সার্জেন্টকে জানাল যে, এরা বিদেশি-ট্রাফিক আইন ভালো করে জানে না। ট্রাফিক যদি বিদেশিদের টিকেট ধরিয়ে দিত তাহলে গোয়েন্দাদের অনেক জারিজুড়ি ফাঁস হয়ে যেত।
কথিত উকিলের বাড়িতে অবশেষে গাড়িটি ঢুকল। কথিত অস্ট্রীয় দুই ব্যবসায়ী মেডেলিনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। সেখানে বসা ছিলেন মোসাদের আরেক ডাকসাইটে গোয়েন্দা কারুজ। কারুজ মেডেলিনকে ফরাসি ভাষায় বললেন, ম্যাডাম আপনার বাড়ি নিয়ে আলোচনার জন্য এখানে আনিনি। ম্যাডোলীন অবাক হয়ে চিৎকার করলেন। কারুজ বললেন, অপহৃত শিশু ইয়েসেলির ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। এই সময় কথিত দুই অস্ট্রীয় ব্যবসায়ী তথা মোসাদ এজেন্ট গায়েব হয়ে গেল। মেডেলিন ভয় পেয়ে গেল।
কারুজের সঙ্গের এক গোয়েন্দা মেডেলিনের সঙ্গে বেশ রূঢ় ভাষায় কথা বলল। তার ধারণা ছিল মেডেলিনও কড়া ভাষায় কথা বলবে। ওদিকে মেডেলিনের ছেলেকেও ইসরাইলে গোয়েন্দাদের প্রশ্নবানে ফল ফলতে শুরু করল। মেডেলিন বুঝল মোসাদ গোয়েন্দাদের হাতে সে আটক হয়েছে।
কারুজ মেডেলিনকে বললেন, ইয়াসেলির অপহরণে আপনি জড়িত। আমরা শিশু ইয়েসেলিকে চাই। মেডেলিন বলল, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না এবং আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলব না। মেডেলিনকে বিদ্যুতের শক দেয়া হল। কিছুক্ষণের মধ্যে মেডেলিন সুস্থ হয়ে উঠল। জরুরি প্রয়োজনে কারুজ একজন প্রশিক্ষিত নার্স এনে রেখেছিলেন।
ইসরাইলিরা বুঝেছিলেন লৌহমানবী মেডেলিন সহজে মুখ খুলবে না। কিন্তু তাদের শেষ আশা এই মহিলা। মেডেলিনকে ইয়েহুডিথ নিশিয়াহু'র কাছে হস্তান্তর করা হল। সে এসেছে লন্ডন থেকে। ইয়েহুডিথ মেডেলিনকে সুন্দর ভাবে পরিচর্যা করল। একজন ধর্মপ্রাণ মহিলার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করল সে। ধর্মমতানুযায়ী তার জন্য বিশেষ খাবার রান্না করা হল। প্রার্থনা বই দেয়া হল। দেয়া হল মোমবাতি। মেডেলিনকে যেখানে রাখা হল সেখানে পুরুষদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হল। মেডেলিনের পাশের রুমে নার্সকে রাখা হল।
আবার শুরু হল মেডেলিনকে জিজ্ঞাসাবাদ। কারুজ এবং ভিক্টর কোহেন ফরাসি ভাষায় মেডেলিনকে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। মেডেলিন ইসরাইলি গোয়েন্দাদের তার সম্পর্কে জানার বহর দেখে স্তম্ভিত। এতদসত্ত্বেও মেডেলিন ইয়েসেলি সম্পর্কে একটি শব্দও বলতে রাজি নয়। বরং অপহরণের বিষয়টি সে পুরোপুরি অস্বীকার করল। মেডেলিন গোয়েন্দাদের ফরাসি ভাষায় কিছু গালিও দিল। গোয়েন্দা ভিক্টর কোহেন পরে বলেছেন, প্রথমে তিনি মেডেলিনকে শান্ত করার চেষ্টা চালান। তবে তার অন্তর্গত মনে যে প্রশ্নটা ছিল তা হল, একটি খ্রিস্টান মেয়ে কী করে ধর্মান্ধ অর্থোডক্সে পরিণত হল তা জানা। কেননা দুটি হল বিপরীতমুখী জগৎ। প্রথমদিকে মেডেলিনকে প্রশ্নোত্তরকালে এক মহিলা উপস্থিত ছিল। পরে মেডেলিন একাই গোয়েন্দা কোহেনের সঙে বসে কথা বলে। অবশ্য দরজা খোলাই ছিল।
জিজ্ঞাসাবাদকালে এই গোয়েন্দা মেডেলিনের সঙ্গে বেশ খানিকটা দুর্ব্যবহার করে। কৌশল হিসেবেই গোয়েন্দা এটি করেছিল যাতে মেডেলিনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় এবং এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এদিকে মেডেলিনের ছেলে এরিয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু ফল বেরুতে থাকে। এরিয়েলকে ইসরাইলে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন মোসাদের এক দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা। এই দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা নাকি বাঘ-মহিষকে এক ঘাটে জল খাওয়াতে পারঙ্গম। এ কারণে তার একটি কোড নামও বিদ্যমান। নাম আব্রাহাম হাডার। তিনি মেডেলিনের ছেলেকে বলেন, তোমার মা স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এখন তুমি সত্যি কথাগুলো বল।
কিছুক্ষণের মধ্যে এরিয়েল কেঁদে ফেলে। শিশু ইয়েসেলিকে নিয়ে সে যা জানে বলতে রাজি আছে যদি তার মাকে ও তাকে বিচারের আওতায় আনা না হয়।
আব্রাহام বললেন, তাই হবে। একথা বলেই আব্রাহাম এরিয়েলকে সাবাক প্রধান এমোস মানোরের কাছে নিয়ে গেলেন। মানোর বললেন, আব্রাহাম তোমাকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা পালন করা হবে। এখন বল, ইয়েসিলি কোথায়?
এরিয়েল কেঁপে উঠল। কিন্তু অবশেষে স্বীকার করল, তার মা ইয়েসেলিকে ইসরাইলের বাইরে পাচার করেছে। একটি মেয়েশিশুর ছদ্মবেশে এই পাচার সংঘটিত হয়। ইয়েসেলির পাসপোর্ট জাল করা হয়। তার নাম ও বয়সও পরিবর্তন করা হয়। সে যা জানে তা হল ইয়েসেলিকে সুইজারল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে।
এরিয়েলের স্বীকারোক্তি তার মা মেডেলিনকে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হল। কোহেন তাকে বললেন, এরিয়েল এখন আমাদের হাতে। তার কঠিন সাজা হবে। সে সব কিছু স্বীকার করেছে। এখন আপনার ছেলে যে কঠিন বিচারের সম্মুখীন হবে এতে কি আপনি উদ্বিগ্ন নন?
মেডেলিন বললেন, এরিয়েল এখন আর আমার ছেলে নয়। ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও মেডেলিন ভেঙে পড়ল না।
জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত গোয়েন্দারা উপলব্ধি করল যে, তাদের অভিযান মোটেই সফল হচ্ছে না। অবশেষে মোসাদ-প্রধান হারেল আইসার নিজেই মেডেলিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিলেন।
একটা অন্ধকার কক্ষে হারেল আইসার এবং মেডেলিন মুখোমুখি বসলেন। কয়েকজন মোসাদ গোয়েন্দা পেছনে দাঁড়িয়ে। কোহেন এবং কারুজ দোভাষীর ভূমিকা নিলেন।
আইসার বুঝেছিলেন যে, এই দৃঢ়চেতা মহিলাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে যৌক্তিক আর্গুমেন্ট করা। আইসার বুঝেছিলেন, মেডেলিন ধর্মপরায়ণা কিন্তু নিশ্চয়ই যুক্তির কথা শুনবে। সর্বোপরি মেডেলিন সারাজীবন ধরে ধর্মান্ধ অর্থোডক্স ইহুদি নয়। তাছাড়া আগের জেনারেশনের মতো ধর্ম নিয়ে উন্মাদনা তার রক্তে প্রবাহিত হওয়ার কথা নয়। সর্বোপরি সে বুদ্ধিমতী ও চতুর। ফলে সেভাবেই সে ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
আইসার মেডেলিনকে বললেন, আমি ইসরাইল সরকারের প্রতিনিধিত্ব করি। আমার কথার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আপনার ছেলে সবকিছু স্বীকার করেছে। আপনার সম্পর্কে আমাদের কাছে বহু তথ্যাদি রয়েছে। আপনার সব গোপনীয় তথ্যাদি আমাদের হাতের মুঠোয়। আমরা দুঃখিত যে, আপনাকে জেল থেকে এখানে আনা হয়েছে। আপনি ইহুদি হিসেবে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। আর ইহুদিবাদ মানেই ইসরাইল। আবার ইসরাইল ছাড়া ইহুদিবাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ইয়েসেলির অপহরণে ইসরাইলের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক হানাহানি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলের মানুষ অর্থোডক্সদের বিরুদ্ধে ফুঁসছে। আপনার কারণেই ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। যদি আপনি অপহৃত ইয়েসেলিকে ফেরত না দেন রক্তপাত সেক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। আবার ভাবুন, অপহৃত শিশুটির ক্ষেত্রে কি ঘটতে পারে। শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, মারাও যেতে পারে। আপনি এবং আপনার সহযোগীরা শিশুটির বাবা- মাকে কী উত্তর দেবেন? এই ঘটনা সারাজীবন আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। আপনি একাধারে একজন মহিলা এবং মা। যে সন্তানকে আপনি লালন-পালন করছেন তাকে যদি কেউ তুলে নিয়ে যায় আপনার মনের অবস্থা তখন কী হবে। রাত্রে কী আপনার ঠিকমতো ঘুম হবে?
আইসার বলেন, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি না। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য অপহৃত শিশুটি উদ্ধার। যত তাড়াতাড়ি শিশুটি আমাদের হাতে আসবে আপনার মুক্তি তত আসন্ন। আপনার ছেলেও মুক্তি পাবে। সর্বোপরি ইসরাইল আবার ঐক্যবদ্ধ হবে।
আইসার মেডেলিনের মনটাও কথা বলতে বলতে অনুধাবনের চেষ্টা করছিলেন। মেডেলিনকে এই সময় চূড়ান্ত অস্থির দেখা যায়। তার ভেতরে যে নানা তোলপাড় দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছিল তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। সর্বোপরি তেজস্বী একজন মহিলার দৃষ্টিভঙ্গি বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়া এক কঠিন কাজ। মোসাদ গোয়েন্দারা ছিলেন নির্বিকার। তবে তারা বুঝতে পারছিলেন, সত্য প্রকাশের পথে। মেডেলিন তার মুখ তুলে বলল, আপনারা যে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি তা আমি জানব কী করে? আপনাদের ওপর আস্থা রাখব কী ভাবে?
মুহূর্তের মধ্যে আইসার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট মেডেলিনের হাতে দিলেন। আইসারের লোক এসব দেখে স্তম্ভিত। বস এসব কী করছেন। তিনি কী পাগল হয়ে গেছেন? বিবাদিকে প্রকৃত নাম বলা, পাসপোর্ট দেখানোর মতো ঝুঁকির কাজ আর হতে পারে না। কিন্তু আইসারের ভাবনাটা বিপরীত। তার মতে, তিনি যে আন্তরিক এবং মেডেলিনের প্রতি আস্থাশীল এটা বোঝানো জরুরি। হয়তো এভাবেই সাফল্যের পথ সুগম হবে।
মেডেলিন ইসরাইলের এমব্রোস করা পাসপোর্টের সিলমোহরটি বেশ সময় নিয়ে দেখল। এতক্ষণ সে দাঁত দিয়ে ঠোঁটে কামড় দিয়ে রেখেছিল। এক সময় তার ঠোঁট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। অস্থির গলায় সে বলল, আমি আর পারছি না। আমি আর পারছি না...।
হঠাৎ করেই মেডেলিন তার মাথা তুলল। বলল, শিশুটি এখন আছে গারটনার পরিবারের সঙ্গে। ঠিকানা হল, ১২৬ পেন স্ট্রিট, ব্রুকলিন, নিউইয়র্ক। ঐ পরিবারে শিশুটির নাম ইয়ানকেলে।
আইসার চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, যত তাড়াতাড়ি শিশুটিকে আমরা পাব তত তাড়াতাড়ি আপনার মুক্তি। তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন।
জেরুজালেম, নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে টেলিগ্রামের বন্যা বইল। উত্তর আমেরিকার ইসরাইলি দূতাবাসসমূহের নিরাপত্তা কর্মকর্তা গুর অরিয়ের সঙ্গে কথা বললেন আইসার। নিউইয়র্কভিত্তিক গুর অরিয়ে ব্রুকলিনের ঠিকানা চেক করে আইসারকে জানালেন, ঠিকানা নির্ভুল এবং গারটনার পরিবারের বাস সেখানেই। ঐ জেলায় ব্যাপকভাবে সাতমার হাসিদিকদের বসবাস। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে এফবিআই'র সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুটিকে উদ্ধার করে ইসরাইলে পাঠাতে বলা হল।
গুর অরিয়ে এফবিআই'র সঙ্গে কথা বললেন এবং তাদেরকে সব তথ্য দিলেন। এফবিআই বলল, তোমরা যেহেতু সবই জান, তোমরা নিজেরা গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে আনছ না কেন? গুর অরিয়ে অনুমতিপত্র চাইলে এফবিআই তা দিতে আপত্তি করল।
প্রকৃতপক্ষে আমেরিকা অভিযান চালাতে ইতস্তত করছিল। তাদের প্রশ্ন, তোমরা কি নিশ্চিত অপহৃত শিশুটি ঐ ঠিকানায় রয়েছে? আমরা যদি অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে সেখানে না পাই তাহলে তার ভয়াবহ পরিণতির কথা কি তোমরা অনুমান করতে পারছ? এফবিআই আভাস দেয় কংগ্রেশনাল নির্বাচন সেখানে আসন্ন। সাতমার সম্প্রদায় হাজার হাজার ভোট সেখানে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রশাসন তাদের সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াতে চায় না।
এদিকে প্যারিসে আইসারের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম। মধ্যরাতে তিনি আমেরিকায় ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত হারমানকে ফোন করলেন। তিনি হারমানকে মার্কিন এটর্নি জেনারেল রবার্ট কেনেডীর সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করতে ফোনে নির্দেশ দিলেন। এ-ও বললেন, কেনেডিকে আমার নাম বলবেন এবং এফবিআই যেন এই মুহূর্তে শিশুটিকে ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করে।
রাষ্ট্রদূত হারমান বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললেন, আইসার, আপনি এভাবে কী কথা বলছেন। রাষ্ট্রদূত আইসারকে আভাস দেন, তাদের এহেন আলোচনা মার্কিন গোয়েন্দারা আড়ি পেতে যদি শুনে ফেলে তাহলে কূটনৈতিক সম্পর্ক যে সংকটে পড়বে? আইসার বললেন, আমি তো আপনাকেই এভাবেই একথা বলছি না। আমি অনেককেই একই কথা বলেছি।
আইসারের ধারণা ছিল, আমেরিকান প্রশাসন তার উত্তেজক কথাবার্তা শুনুক এবং পদক্ষেপ নিক। ওদিকে রাষ্ট্রদূত হারমান ভয় পাচ্ছেন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্টের। হারমানের উপদেশ শুনে আইসার বললেন, আমি আপনার মতামত শুনতে চাই না। একথা বলেই তিনি টেলিফোন কেটে দিলেন। এ-ও বলে ছাড়লেন, যদি তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিণতির জন্য তারাই দায়ী থাকবে।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই আমেরিকায় তাদের কনস্যুলেট থেকে ফোন পেলেন আইসার। তাকে জানানো হল, রবার্ট কেনেডি অবিলম্বে অ্যাকশনে যেতে এফবি আইএ এজেন্টের একটি টিমকে অনুমতি দিয়েছেন। ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের নিয়ে তারা ব্রুকলিনে অভিযান চালায়। শিশুটিকে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়। এই শিশুটিই ইয়েসেলি।
এলিয়ে ওয়াইসেল তখন একজন তরুণ রিপোর্টার। তিনি ফোন করলেন গুর অরিয়েকে। জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটিকে নাকি উদ্ধার করা হয়েছে? গুর অরিয়ে শপথ নিয়েছিলেন, গোপনীয়তা রক্ষায়। তিনি এলিয়েকে শিশু উদ্ধারের কথা অস্বীকার করলেন। এলিয়ে ওয়াইসেল এই মিথ্যাচারের জন্য গুর অরিয়েকে কয়েক বছর ক্ষমা করতে পারেননি। এলিয়ে পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন।
১৯৬২ সালের ৪ জুলাই ইসরাইলে জাতীয় দিবস পালিত হয়। কেননা এদিন ইয়েসেলিকে প্লেনে করে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনা হয়। ইসরাইলের গণমাধ্যম তাদের সিক্রেট সার্ভিসকে বাহবা দিয়ে নানা প্রতিবেদন তৈরি করতে থাকে। এতে আরও বলা হয়, বিশ্বে ইসরাইল প্রথম দেশ যেখানকার সব মানুষের কাছে গোয়েন্দারা শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন। ইসরাইলের এক সুপরিচিত আইনজীবী কোহেন জিদন শিশুটি উদ্ধারের প্রশংসা করে বেন গুরিয়েনকে চিঠি দেন। বেন গুরিয়েন চিঠির উত্তরে লেখেন, আমাদের সিক্রেট সার্ভিসকে আপনার প্রশংসা করা উচিত। বিশেষ করে গোয়েন্দা বিভাগের মাথায় যারা বসে আছে। তারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা কোনো বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করেছে। বিশেষ করে জুনিয়ররা যখন এই মামলাটি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। পাচারকৃত এই ছেলেটিকে উদ্ধার ছিল সত্যিই এক কঠিন কাজ।
ইয়েসেলির উদ্ধারে সারা ইসরাইল যখন উৎসবমুখর আইসার তখনো প্যারিসে। সেখানকার গোয়েন্দারা আইসারের সম্মানে একটা পার্টি দেয়। সেখানে মোসাদ-প্রধান হারেল আইসারের দক্ষতার প্রভূত প্রশংসা করা হয়। ইসরাইল জানে তার দেশের জনগণকে কী ভাবে রক্ষা করতে হয়। আইসারকে কিছু উপহারও দেয়া হয়। ইয়েসেলির বিছানা নামের যে খাটিয়ায় আইসার বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন সেটি তার সহকারীরা ইসরাইলের উদ্দেশ্যে জাহাজে উঠিয়ে দেয়।
অবশেষে শিশু ইয়েসেলিকে উদ্ধারের মাধ্যমে সব সত্য কাহিনী প্রকাশিত হতে শুরু করে। একটি টেলিগ্রামের মাধ্যমে শুরু হয় পাচারপর্ব।
১৯৬০ সালের বসন্তকালে ইয়েসেলিকে যখন ইসরাইলের এক ইয়েশিভা থেকে আরেকটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন মেডেলিন তার বন্ধু রাব্বি মেইজিশের কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম পায়। টেলিগ্রামে তাকে অবিলম্বে জেরুজালেমে আসতে বলা হয়। মেডেলিন জেরুজালেমে এসে জানতে পারে তাকে একটি সিক্রেট মিশন চালাতে হবে। আর সেটি হল ইয়েসেলিকে ইসরাইলের বাইরে বের করে নিয়ে যেতে হবে।
মেডেলিন ফ্রান্সে ফিরে এসে তার পাসপোর্টে ঘষামাজা করে। তার ছেলের নাম ক্লাউডিয়ে থেকে ক্লাওডাইন করে। জন্মতারিখ ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল করে। সে তার নিজের নামও পরিবর্তন করে। সে গিয়োনা থেকে ইসরাইল অভিমুখী জাহাজে চড়ে।
গিয়োনা বসেই সে খেলা শুরু করে। এক ইমিগ্রান্ট পরিবারের আট বছরের একটি মেয়েকে সে নিজের মেয়ে হিসেবে দেখায়। ইটালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট চেক করে তার সঙ্গে আট বছরের একটি মেয়ে রয়েছে বলে ছাড়পত্র দেয়। ইসরাইলেও সে একই প্রক্রিয়ার অবতারণা করে।
এর কিছুদিন পর মেডেলিন ইসরাইলের লড এয়ারপোর্ট থেকে আট বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে বিমানে উঠে। পরিচয় দেয় নিজের মেয়ে। যে মেয়েকে নিয়ে সে ইসরাইলে ঢুকেছিল। প্রকৃতপক্ষে মেয়ের পোশাকের এই ছেলেটিই ইয়েসেলি।
ইয়েসেলি সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের আল্ট্রা অর্থোডক্স বোর্ডিং স্কুলে দু'বছর কাটায়। কিন্তু ইয়েসেলিকে নিয়ে যখন সারা ইসরাইলে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তখন তাকে মেআউক্সে নিয়ে যাওয়া যায়। সেখানে ইয়েসেলিকে সুইস বাবা-মা'র এতিম বলে ভর্তি করা হয়।
ইয়েসেলিকে আরেকবার মেয়ের সাজে সাজিয়ে আমেরিকা নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে তাকে সাতমার সম্প্রদায়ের প্রধান রাব্বি জোয়েল তাকে সাহায্য করেন। রাব্বি জোয়েল গারটনারকে ইয়েসেলিকে তাদের বাড়িতে আত্মীয় হিসেবে দীর্ঘদিন রাখতে নির্দেশ দেন। এ বাড়িতে তার নাম হয় ইয়ানকেলে। বলা হয় আর্জেন্টিনা থেকে এসেছে এবং গারটনারের কাজিন হয়।
মোসাদের শীর্ষ নেতারা উপসংহারে আসেন যে, আল্ট্রা অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের নেটওয়ার্ক আমেরিকা ইউরোপ জুড়ে বিস্তৃত এবং তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য। এবং মেডেলিনকে নিয়ে সম্প্রদায়ের লোকজন গর্বিত। অর্থাৎ এই সম্প্রদায়ের যে কোনো ষড়যন্ত্রে মেডেলিন অপরিহার্য। তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সে সব সময় তার হাত ব্যাগেই রাখে। মানুষ যেভাবে কাপড় বদলায় মেডেলিন সেভাবে পরিচয় বদলাতে পারঙ্গম। অর্থাৎ অর্থোডক্সদের বিশ্বে ফরাসি মেডেলিন মাতা হারি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইয়েসেলির উদ্ধারে সারা ইসরাইল জুড়ে যখন উৎসব তখন মেডেলিন তার দোষ স্বীকার করে। তার এক বন্ধুকে একথা সে বলে। সে আরও বলে, আমাদের যে লক্ষ্য ছিল তা থেকে আমি বিচ্যুত হয়েছি। আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।
মেডেলিন তার বুদ্ধিমত্তার কারণে মোসাদের শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। একজন চৌকস গোয়েন্দার সকল গুণই তার মধ্যে বিদ্যমান। আইসার তাকে মোসাদে চাকরি দেয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সে প্রস্তাব দিতে দেরি করে ফেলেন আইসার। মেডেলিন জেরুজালেমে ফিরে আল্ট্রা অর্থোডক্স সমাজে মিশে যান। তিন বছর পর সে রাব্বি আমরাম ব্লাউকে বিয়ে করে। ৭২ বছর বয়স্ক আমবরাম সব গোত্রের সর্বাধিক ফ্যানাটিকাল গ্রুপের প্রধান।
মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল ও ইয়েসেলির মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল নয় বছর পর। আইসারের ওপর লেখা একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে ইয়েসেলিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
ইয়েসেলি ইসরাইলের ট্যাঙ্ক ডিভিশনে এখন কাজ করে। খুব ভালো চাকরি। ঐ অনুষ্ঠানে আইসারের সঙ্গে করমর্দনকালে সে ঘোষণা দেয় আইসার হারেল আমার জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আইসার ব্যতিরেকে আমি আপনাদের মাঝে কখনোই ফিরে আসতে পারতাম না।