📘 মোসাদ > 📄 সিরিয়ায় ইসরাইলি গুপ্তচরের ফাঁসি

📄 সিরিয়ায় ইসরাইলি গুপ্তচরের ফাঁসি


প্রিয় নাদিয়া, প্রিয় আমার পরিবার এই লেখাই আমার শেষ লেখা। আমি আশা করব তোমরা সকলে একত্রে সারাজীবন বসবাস করবে। আমি আমার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইছি। আমার স্ত্রী যেন নিজ খেয়াল রাখে এবং সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়--- আমার প্রিয়তম নাদিয়া, তুমি আবার বিয়ে করতে পার। আমার ছেলে-মেয়েরা তাহলে একটা বাবা পাবে। এক্ষেত্রে তোমাকে সর্বাত্মক স্বাধীনতা দিলাম। আমার শেষ চুম্বন নাও। প্লীজ আমার আত্মার জন্য প্রার্থনা কর। ইতি তোমার এলি।
১৯৬৫ সালে ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের নতুন প্রধান মেইর অমিতের টেবিলে চিঠিটি পৌছে। গোয়েন্দাগিরির ইতিহাসে অন্যতম বলিষ্ঠ গোয়েন্দা এলি কোহেন কাঁপা কাঁপা হাতে এই চিঠিটা লিখেছেন। সিরিয়র রাজধানী দামেস্কে অকাল মৃত্যু হতে যাচ্ছে এই গোয়েন্দার। মৃত্যুর আগে লেখা হয়েছে এই চিঠি।
এলি কোহেনের গোয়েন্দাবৃত্তির জীবন কুড়ি বছরের। তিনি একজন মিসরীয় ইহুদি। তরুণ, সুদর্শন এলি কোহেনের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে তার এক পুলিশ বন্ধুর দেখা। কথা প্রসঙ্গে পুলিশটি বলে যে, আজ আমরা বেশ কিছু ইসরাইলি সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করব। এদের মধ্যে একজন হল শমুয়েল আজর।
এলি কোহেন কথাটা শুনে চমকে গেলেও বন্ধু পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে হনহনিয়ে নিজ বাসায় গেলেন। তার ভাড়া বাসা থেকে মুহূর্তে বিস্ফোরক, হ্যান্ডগান এবং ডকুমেন্টসমূহ সরিয়ে ফেললেন। এলি কোহেন প্রকৃতপক্ষে মিসরে চোরাগুপ্তা হামলাদির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মিসর থেকে ইসরাইলে যেতে আগ্রহী ইহুদিদের পালানোর পথ আবিষ্কারে এবং তাদের জন্য ভুয়া কাগজ তৈরির কাজেও ব্যাপৃত ছিলেন এলি কোহেন। মিসরের জেলে আটক ইসরাইলি বন্দিদের মুক্ত করতে তৎপর একটি আন্ডারগ্রাউন্ড দলের সঙ্গেও এলি কোহেন সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
১৯৫৪ সালে প্রথমার্থে ইসরাইলি নেতারা জানতে পারেন ব্রিটিশ সরকার মিসর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে। মিসর আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচে শক্তিশালী এবং ইসরাইলকে বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারে না। ব্রিটিশ সৈন্য মিসরে অবস্থানের ফলে সেখানে তারা সুয়েজ খালকে ঘিরে অসংখ্য সামরিক স্থাপনা ও বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করে। ইসরাইল মনে করে সব মিলিয়ে মিসরের ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের ওপর ব্রিটিশদের প্রভাব রয়েছে। এখন ব্রিটিশরা মিসর ছেড়ে গেলে ঐ সব সামরিক স্থাপনা ও প্রভূত অস্ত্রশস্ত্র মিসরের হাতে এসে পড়বে। আবার মিসরের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এদিকে ইসরাইল তখন নবীন রাষ্ট্র। মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীনতা পেয়েছে।
সর্বোপরি ইসরাইলের প্রতি মিসরের ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত। কেননা ১৯৪৮ সালের ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধে মিসর তাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। নতুন শক্তি বলে বৃহৎ দেশ মিসর ইসরাইলকে এবার এক হাত দেখে নেবে।
ব্রিটিশদের মিসর থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত কী প্রত্যাহার করানো যায়? বেন গুরিয়েন এখন আর ইসরাইলের শীর্ষ পদে নেই। তিনি অবসরে গেছেন। তার স্থলাভিষিক্ত যিনি হয়েছেন সেই মোশে শ্যারেট মডারেট কিন্তু দুর্বল চিত্তের লোক। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিনহাস ল্যাভেন প্রতিনিয়ত তার সঙ্গে কোন্দলে লিপ্ত।
শ্যারেটকে না জানিয়ে এবং মোসাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ল্যাভেন এবং সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর (আমান) প্রধান কর্নেল বেঞ্জামিন ভয়ংকর ও বোকাসুলভ একটা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ব্রিটিশ ও মিসরের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ঘেঁটে তারা দেখতে পান, ব্রিটিশরা যে কোনো সময় আবার মিসরে ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে যদি মিসরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ইসরাইলের ঐ দুই নেতা সারল্যের সঙ্গে মিসরে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চাঙ্গা করান। মিসরের সর্বত্র শুরু হয় বোমাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা ইত্যাদি। ল্যাডেন ও কর্নেল বেঞ্জামিনের নির্দেশ মোতাবেক মিসরে অবস্থিত ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা-বোমাবাজি শুরু হয়ে যায়। ঐ দুই দেশের লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সিনেমা, ডাকঘর এবং বেসামরিক ভবনাদি ছিল হামলার লক্ষ্যবস্তু। উদ্দেশ্য একটাই আইন, শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে ব্রিটিশরা যেন মিসর ছেড়ে চলে না যায়। গোয়েন্দা সংস্থা আমান মিসরের বেশ কিছু ইহুদিকে এই গোলযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব দেয়। এসব তরুণরা আবার ইসরাইলের অনুকূলে সর্বদা জীবন দিতে প্রস্তুত। তবে এই আচরণের মাধ্যমে গোয়েন্দা বৃত্তিতে যে পূত পবিত্র এবং নৈতিক দিক থাকে তা লংঘিত হয় এবং খোদ ইসরাইলের অন্য গোয়েন্দা সংস্থা তার সমালোচনা শুরু করে। তাদের যুক্তি হল, স্থানীয় ইহুদিদের দ্বারা গোলযোগ করালে মিসরের অন্য ইহুদিদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। সর্বোপরি এসব তরুণ-তরুণীদের দাঙ্গা করার প্রাথমিক প্রশিক্ষণও নেই।
ইহুদিদের নিক্ষিপ্ত বোমাগুলো যেমন শক্তিশালী ছিল না তেমনি অপরিণত। চশমার খাপে কিছু বিস্ফোরক ভরে এগুলো তৈরি। কন্ডোমের মধ্যে বিস্ফোরক ভরেও কিছু দুর্বল বোমা বানানো হল। আসলে বোমাবাজির পরিকল্পনা প্রথম দিকেই ভেস্তে যায়। ২৩ জুলাই ফিলিপ নাটাসোন নামের এক লোকের পকেটেই একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার একটি সিনেমা হলের গেটে ইহুদিবাদী ফিলিপের পকেটে এই বোমাটি বিস্ফোরিত হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এভাবে সকল বোমাবাজ ঐ সূত্র ধরে গ্রেফতার হয়।
এলি কোহেনও গ্রেফতার হয়েছিলেন কিন্তু তার বাড়িতে আপত্তিকর কিছু না পাওয়ায় মুক্ত হন। কিন্তু মিসরের পুলিশ তার নামে একটা ফাইল খোলে। এতে তার চৌদ্দগোষ্ঠীর বৃত্তান্ত তার ছবি নথিভুক্ত করা হয়। বিবরণীতে লেখা হয়, ১৯২৪ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এলি কোহেনের জন্ম। ফরাসি কলেজ থেকে এলি গ্রাজুয়েশন করেছেন এবং কায়রোর ফারুক ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
এলি কোহেনের সাত ভাই-বোন অজানার উদ্দেশ্যে দেশান্তরী হয়েছেন। তবে মিসর পুলিশের জানা ছিল না যে, এলি কোহেনের পরিবার স্থায়ীভাবে ইসরাইলে চলে গেছেন।
গ্রেফতার হওয়া সত্ত্বেও এলি কোহেন মিসরে থেকে যেতে মনস্থ করেন। মিসরের জেলে তার সমভাবাপন্ন কর্মীদের কাকে কী পরিমাণ নির্যাতন করা হচ্ছে তা তিনি লিখে রাখতে শুরু করেন।
অক্টোবরে মিসর সরকার ইসরাইলি গোয়েন্দাদের শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়। ৭ ডিসেম্বর কায়রোতে এসব মামলার শুনানি শুরু হয়। দলবলসহ গ্রেফতার হওয়া ম্যাক্স ব্যানেট গ্রেফতার হলে কবজি কেটে আত্মহত্যা করে। সব মামলাতেই রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। এদিকে মিসরের এই কড়াকড়িতে বিশ্ববিবেক তীব্র প্রতিবাদ করে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতবৃন্দ এবং বহু দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিচারের নামে প্রহসনের নিন্দা করে তা বন্ধের দাবি জানান। এদিকে মিসরের একটি বিশেষ আদালত একটি মামলায় কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয় এবং ড. মোশে মারজুক ও প্রকৌশলী আজরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। চারদিনের মাথায় কায়রো জেলখানায় তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়। এই ফাঁসির প্রতিবাদে ইসরাইল সরকার দেশের মানুষের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সবারই প্রশ্ন, এই ধরনের বোমাবাজির বোকা বোকা পরিকল্পনার নেপথ্যে কে। বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ল্যাভোন ও গিবলি পরস্পরকে দোষারোপ করেন। ল্যাভোনকে পদত্যাগে বাধ্য করে সেখানে বেন গুরিয়নকে ফিরিয়ে আনা হয়। কর্নেল গিবলিকে আর পদোন্নতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হলে এক পর্যায়ে তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।
মিসরে এলি কোহেন তার কয়েকজন সেরা বন্ধুকে হারালেও তিনি সেখানেই থেকে যেতে মনস্থ করেন। আর নাশকতামূলক কার্যকলাপও তিনি সমানে চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৫৭ সালের সুয়েজ খাল নিয়ে যুদ্ধের পরে এলি কোহেন ইসরাইলে দেশান্তরী হন।
ইসরাইলে আসার পর এলি কোহেন প্রায় প্রতিদিনই তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। ইসরাইলে তার শুরুর দিকটা খুব সহজ ছিল না। কয়েক সপ্তাহ ধরে চাকরি খুঁজছিলেন তিনি। তিনি আরবি, ফরাসি, ইংরেজি এমনকি হিব্রু ভাষায়ও তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। গোয়েন্দা বাহিনী আমানের একটি মাসিক পত্রিকায় অনুবাদকের কাজ পেলেন এলি কোহেন। তেলআবিবের একটি বাণিজ্যিক অফিসের ছদ্মাবরণে তাদের কাজ চলত। এলি কোহেনের বেতন খারাপ ছিল না। মাসে ১৭০ ইসরাইলি পাউন্ড বা ৯৫ মার্কিন ডলার। কয়েক মাস পরে তার চাকরি চলে যায়। এক মিসরীয় ইহুদি বন্ধু তাকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি দেয়। চাকরিটি বোরিং হলেও বেতন ভালো। ঐ সময় এলির ভাই ইরাকী বংশোদ্ভূত এক সুন্দরী স্মার্ট নার্সের সঙ্গে এলি কোহেনের পরিচয় করিয়ে দেন। এক মাস ডেটিং করে এলি কোহেন নাদিয়াকে বিয়ে করেন। নাদিয়ার ভাই সামি মাইকেল তখনকার একজন উঠতি বুদ্ধিজীবী। যাহোক, একদিন সকালে এলি কোহেনের অফিসে ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের এক লোক এসে নিজেকে জালমান বলে পরিচয় দেন। জালমান এলি কোহেনকে চাকরির অফার দেন।
এলি কোহেন চাকরির ধরন জানতে চাইলে জালমান জানান, খুব ভালো চাকরি। আপনি চাকরির সুবাদে ইউরোপে যথেচ্ছ ভ্রমণ করতে পারবেন। তবে সম্ভবত আমাদের গোয়েন্দা হিসেবে আরব দেশগুলোতে আপনাকে বেশি বেশি কাটাতে হবে।
এলি কোহেন ওই চাকরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমি মাত্র বিয়ে করেছি। আমি ইউরোপ কিম্বা অন্যত্র সফর করতে চাই না। ইতিমধ্যে এলি কোহেনের স্ত্রী নাদিয়া গর্ভবতী হন। নাদিয়াকে তার চাকরি ছাড়তে হয়। ওদিকে এলির চাকরিটিও চলে যায় এবং বেকার বসে থাকেন।
একদিন এলি কোহেনের ভাড়া বাড়িতে আবার আগমন ঘটে জালমানের। জালমান তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন আমাদের চাকরিতে আপনার অনীহা। মাসে আমরা আপনাকে ১৯৫ মার্কিন ডলার দেব। প্রথম ছয় মাস প্রশিক্ষণ শেষে আপনি ইচ্ছে করলে চাকরি ছেড়েও দিতে পারেন। এবার এলি কোহেন আর না করলেন না। তিনি হয়ে গেলেন ইসরাইলের একজন গোয়েন্দা।
গোয়েন্দা বাহিনী আমানের কয়েক সদস্যের অভিমত অবশ্য ভিন্নতর। তাদের মতে ইসরাইলে আসার পর অতিমাত্রার যোগ্যতার কারণে এলি কোহেনের আমানে চাকরি হয়নি। মানসিক পরীক্ষায় তাকে অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী মনে করেছিলেন আমানের পরীক্ষকরা। কেননা তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় সাহসী। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। মোটকথা ঈশ্বরপ্রদত্ত অনেক গুণ প্রতিভাত হত তার মধ্যে। তবে তাকে নিয়ে সমস্যা হল নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ছিল অতিমাত্রায় উঁচু এবং প্রয়োজন ছাড়াই বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে প্রকট।
ষাট দশকের শুরুতে আমানের স্পেশাল ইউনিটে সিরিয়র দামেস্কের জন্যও একজন চৌকস অফিসারের প্রয়োজন পড়ল। বিগত কয়েক বছর ধরে সিরিয় অতিমাত্রায় আগ্রাসী আরব দেশ হয়ে উঠেছিল। ইসরাইলকে সিরিয় জাতশত্রু মনে করত। আর এমন কোনো যুদ্ধ নেই যেখানে সিরিয় ইসরাইলকে আক্রমণ করেনি। গোলান উপত্যকায় সিরিয়-ইসরাইলের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে। ইসরাইলি সীমান্তে সিরিয় অসংখ্য সন্ত্রাসী স্কোয়াড পাঠিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সিরিয় বিশাল এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। উদ্দেশ্য, ইসরাইল যাতে কোনোভাবেই জর্ডান নদীর পানি না পায়।
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ইসরাইল মরুপ্রবণ নেগেভ অঞ্চলে পানি সেচের জন্য বিশাল একটা প্রকল্প স্থাপন করে। এই পানি নেয়া হচ্ছিল জর্ডান নদী থেকেই। ইসরাইলের যে অংশ দিয়ে জর্ডান নদী গেছে সেখান থেকেই পানি নেয়া হচ্ছিল। এই পানি নেয়া নিয়ে অসংখ্যবার আরব শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। আরব দেশগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জর্ডান শাখানদীর পানি অন্যত্র প্রবাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ইসরাইলের উক্ত প্রকল্পটিকে ব্যর্থ করে দেয়া এবং সিরিয়র ওপরও সে দায়িত্ব বর্তায়।
জর্ডান নদীর পানি ছাড়া ইসরাইলের অস্তিত্ব থাকবে না। ইসরাইলের উপলব্ধি হল সিরিয়কে সফল হতে দেয়া যাবে না। এজন্যই দামেস্কে তাদের একজন চৌকস গোয়েন্দা নিয়োগ জরুরি। আর সেই গোয়েন্দাকে হতে হবে বিশ্বস্ত প্রত্যয়ী এবং দুঃসাহসী। এসব গুণের কারণেই এক সময় আমান থেকে এলি কোহেন বাদ পড়েছিলেন। আর আজ এলিকেই তাদের দরকার।
ঐ সময় এ পদে আরও যাদের নাম ছিল তার মধ্যে সামি মাইকেলও ছিলেন যিনি এলির শ্যালক এবং তার স্ত্রী নাদিয়ার ভাই। কিন্তু সামি গোয়েন্দা হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইসরাইলে থেকে যান এবং পরবর্তীতে দেশের নামজাদা একজন কবি হন।
কোহেনের প্রশিক্ষণ ছিল দীর্ঘমেয়াদি এবং বিরক্তিকর। সকালবেলাই তাকে আমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চলে যেতে হত। কয়েক সপ্তাহ ধরে আইজাক নামের মাত্র একজন প্রশিক্ষকের অধীনে তাকে ট্রেনিং নিতে হত। প্রথমেই তার সামনে অসংখ্য দ্রব্যসামগ্রী মেলে ধরা হত। এলি কোহেলকে তা দেখতে দেয়া হত এক/দুই সেকেন্ড সময়। এরপর চোখ বুজে তাকে বলতে হবে কী সব আইটেম তিনি দেখলেন। বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কেও তাকে ধারণা দেয়া হয়। আইজাক তেলআবিবের ব্যস্ততম রাস্তায় হয়তো এলি কোহেনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। নিউজপেপার স্ট্যান্ডে গিয়ে বললেন, পেপারগুলা পড়ুন কিন্তু কতজন আপনাকে ফলো করছে তা পরে বলতে হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফিরে এলির কাছে সংখ্যা জানতে চাইতেন আইজাক। এক পর্যায়ে কতগুলো ছবি টেবিলে রাখতেন। উত্তর ঠিকঠাক না হলে বলতেন, গাছের পেছনে যে লোকটি সে-ও কিন্তু আপনাকে ফলো করছিল। এভাবে এলিকে শিক্ষা দিতেন আইজাক।
এখানে জালমান ইয়েহুদা নামে আরেক প্রশিক্ষকের সঙ্গে এলি কোহেনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই প্রশিক্ষক খুবই ছোট ও সফিসটিকেটেড রেডিও ট্রান্সমিটার সম্পর্কে এলি কোহেনকে প্রশিক্ষণ দিলেন। ইয়েহুদা তার শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যেরও পরীক্ষা নিলেন। এরপর জালমান আরেক মহিলা প্রশিক্ষককে নিয়ে এলেন। তার নাম মারসেল্লে কাজিন।
এরপর জালমান বললেন, এটাই আপনার চূড়ান্ত পরীক্ষা। টিকবেন কি টিকবেন না সেটাই দেখা হবে। এরপর বিশাল ছবক দিয়ে বললেন, মারসেল্লে আপনাকে মিসরীয় এক ইহুদির নামে ফ্রান্সের একটা পাসপোর্ট দেবেন। ভদ্রলোকের আফ্রিকায় স্থায়ী বসবাস কিন্তু পর্যটক হিসেবে এখন ইসরাইলে। এই পাসপোর্ট নিয়ে আপনি দশদিনের জন্য জেরুজালেম যাবেন। মারসেল্লে আপনাকে বিস্তারিত বলবে যেমন মিসরে আপনার অতীত, আপনার পরিবার, আফ্রিকায় আপনার পেশা ইত্যাদি। জেরুজালেমে আপনি শুধু আরবি ও ফরাসি ভাষায় কথা বলবেন। আপনাকে প্রচুর মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে হবে। কিন্তু কাউকেই আপনার প্রকৃত পরিচয় দেয়া যাবে না। খেয়াল রাখবেন, কেউ যেন আপনাকে ফলো না করে।
জেরুজালেম থেকে দেশে ফেরার পর এলিকে কয়েকদিনের ছুটি দেয়া হল। তার স্ত্রী নাদিয়া সোফিয়ে নামে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। ইহুদিদের নববর্ষ রস হাসানার পরে জালমান তার সঙ্গে দু'জন লোকের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এদের একজন হাসিমুখে এলিকে বললেন, জেরুজালেমের পরীক্ষায় আপনি পাশ। এখন আপনার সামনে আসবে আরও অনেক বড় বড় কাজ।
আমানের অফিসের একটি ঘরে এক মুসলিম শেখ এলি কোহেনকে খুবই ধৈর্যের সঙ্গে পবিত্র কোরান ও নামাজ শিক্ষা দিলেন। এলি খুবই মনোযোগী হলেও ভুল হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিম শেখ তাকে চিন্তিত না হতে বললেন। বললেন, কেউ আপনাকে প্রশ্ন করলে বলবেন, আপনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম বটে কিন্তু এসব পাঠ স্কুলের পরে আর তিনি নিতে পারেননি।
যাহোক এখন এলি কোহেনকে কোনো নিরপেক্ষ দেশে পাঠানো হবে। বাড়তি প্রশিক্ষণ হিসেবে তাকে কোনো আরব দেশের রাজধানীতে পাঠানো হবে। চলে যাওয়ার সময় বললেন, আরব দেশে গেলে আপনাকে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আর ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। কোনো রকম দ্বিরুক্তি ছাড়াই এলি কোহেন সম্মতি দিলেন। এলি কোহেন এখন অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। কেননা সবগুলো পরীক্ষায় তিনি পাশ করেছেন।
জালমান এলিকে জানালেন, আপনাকে সিরিয় অথবা ইরাকে পাঠানো হবে। এলি বললেন, আমি ইরাকের কিছুই জানি না। আমাকে মিসরে পাঠান। এ অসম্ভব, একথা বলে জালমান বললেন, সম্প্রতি মিসর তাদের আদমশুমারি শেষ করেছে এবং পাসপোর্টপ্রাপ্তদের নামের তালিকা করেছে। ফলে মিসর এখন বিপজ্জনক। ইরাক ও সিরিয় এ জাতীয় এখনো কিছু করেনি। তারা আপনার হদিস খুঁজে পাবে না। দুদিন পরে জালমান গং এলিকে বললেন, এখন থেকে আপনার নাম কামাল। আপনার পিতার নাম আমিন তাবেত। অতএব আপনার পুরো নাম কামাল আমিন তাবেত।
এলি কোহেনের কেস অফিসার তার এক নতুন জীবন বৃত্তান্ত তৈরি করেছেন। বিফ্রিংয়ে কেস অফিসার বলেন, প্রথমত সিরীয় বাবা-মায়ের সন্তান আপনি। আপনার মায়ের নাম সাঈদা ইব্রাহিম। আপনার এক বোন। লেবাননের বৈরুতে আপনার জন্ম। আপনার বয়স যখন তিন বছর তখন আপনার বাবা-মা লেবানন ত্যাগ করে মিসরে আসেন। কখনোই ভুলবেন না আপনি সিরীয়। এক বছর পর আপনার বোন মারা যায়। আপনার বাবা একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী।
১৯৪৬ সালে আপনার চাচা আর্জেন্টিনায় দেশান্তরী হন। আপনার চাচা আপনার বাবাকে পরিবারসহ বুয়েন্স আয়ারসে যেতে বলেছিলেন। ১৯৪৭ সালে আপনারা সকলে আর্জেন্টিনায় যান। আপনার বাবা ও চাচা আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে একটা কাপড়ের দোকান দেন এবং সেটি দেউলিয়া হয়ে যায়। আপনার বাবা ১৯৫৬ সালে এবং তার তিন মাসের মধ্যে আপনার মা ইন্তেকাল করেন। আপনি চাচার সঙ্গে থেকে যান এবং ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি পান। অতঃপর আপনি ব্যবসা শুরু করেন এবং আজ আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী।
মোসাদ কিম্বা আমান এলি কোহেনের নতুন জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে দিলে ঘরের জন্য অর্থাৎ নাদিয়াকে বোঝানোর জন্য এলি কোহেন একটা গল্প সাজান। নাদিয়াকে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কোম্পানিতে তিনি চাকরি পেয়েছেন। ইসরাইলের সামরিক সরঞ্জামাদি তাকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখাতে হবে একই সাথে নিজেদের সরঞ্জামাদির মার্কেট তৈরি করতে হবে। নাদিয়াকে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, দীর্ঘদিনের ছুটি নিয়ে তিনি দেশে আসবেন। তবে তার পুরো বেতন ইসরাইল থেকেই তাকে দেয়া হবে। এলি বলেন, আমাদের দীর্ঘ বিচ্ছেদ দুঃসহ বটে। যাহোক, কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপে আমরা ফ্ল্যাট ও আসবাবপত্র কিনব।
১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে করে এলি কোহেন ইসরাইল ছাড়েন। এলিকে তার প্রকৃত নামেই ইসরাইলের পাসপোর্ট, ৫ শত ডলার ও জুরিখের একটি বিমান-টিকেট ধরিয়ে দেয়া হয়।
জুরিখে এক বৃদ্ধ লোক এলি কোহেনের পাসপোর্টটি নিয়ে নেয় এবং অন্য নামে ইউরোপীয় একটি দেশের পাসপোর্ট দেয়। এই পাসপোর্টে চিলির জন্য এন্ট্রি ভিসা ও আর্জেন্টিনার জন্য ট্রানজিট ভিসার সিল দেয়া হয়েছে। লোকটি আরও বলে, বুয়েন্স আয়ার্সে আমাদের লোকজন আপনার ট্রানজিট ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে দেবে। আগামীকাল আপনি বুয়েন্স আয়ার্সে যাবেন এবং একদিন পর সকাল এগারটায় ক্যাফে কারিয়েন্টসে যাবেন। সেখানে আমাদের লোকজন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।
আর্জেন্টিনায় একটি ভালো হোটেলে উঠে এলি কোহেন নির্দেশিত ক্যাফেতে গেলে আব্রাহাম নামের এক বয়স্ক লোক তার টেবিলে আসেন। কোহেনকে চমৎকার একটি ফ্ল্যাটে ওঠার কথা বলা হয় এবং সেটি ইতিমধ্যেই ভাড়া করা হয়েছে বলে লোকটি জানান। আরও জানান, স্থানীয় এক শিক্ষক তাকে স্পেনীশ ভাষা শিক্ষা দেবেন। এছাড়া আপনার আর কোনো কাজ নেই। এবং আমি আপনার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করব।
তিন মাস পর আগামী কর্তব্যের জন্য এলি কোহেন প্রস্তুত। এখন চলনসই স্পেনীশ ভাষা বলতে পারেন। আরেক প্রশিক্ষক তাকে সিরিয় উচ্চারণে আরবি ভাষা শেখালেন। এদিকে এলি কোহেন বুয়েনস আয়ার্স ভালোভাবে চিনে ফেলেছেন। আর্জেন্টিনার রাজধানীতে আরব দেশ থেকে আগত ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীরা যে ধরনের ধোপদুরস্ত পোশাকাদি পরেন ও আচরণ করেন এলি কোহেনও অনুরূপ করে থাকেন।
আরেকটি ক্যাফেতে আব্রাহাম আবার এলি কোহেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে একটি সিরিয় পাসপোর্ট দেন। এই পাসপোর্টে তার নাম কামাল আমিন তাবেত। আব্রাহাম তাকে সপ্তাহখানেকের মধ্যে তার ঠিকানা বদলের কথা বলেন এবং নতুন নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে বলেন। তাকে আরবিয় রেস্তোরাঁগুলোতে যাওয়ার পরামর্শ এবং আরব দেশের সিনেমা দেখার কথাও বলেন। আরবদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্লাবগুলোতে নিয়মিত যাতায়াতের পরামর্শ দিয়ে তাকে যত লোকের সঙ্গে সম্ভব বিশেষ করে আরব দেশের কম্যুনিটি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। বলা হয়, আপনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, একজন মার্চেন্ট এবং মেধাবী ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে আপনি পরিবহন ও লগ্নি ব্যবসায় জড়িত। আরব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনে অনুদানও দেবেন। গুডলাক!
আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি এই গোয়েন্দার ভাগ্য সত্যিই সুপ্রসন্ন। কয়েক মাসের মধ্যেই এলি কোহেন বুয়েন্স আয়ার্সের আরব-সিরিয় কম্যুনিটির শীর্ষ মহলে সফলভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার মধুর ব্যবহার, আত্মবিশ্বাস, কমনসেন্স এবং সৌভাগ্য বহু আরবকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। আর্জেন্টিনা থেকে প্রকাশিত আরব ওয়ার্ল্ড পত্রিকার প্রধান সম্পাদক আবদেল লতিফ হাসানের সঙ্গে একদিন এলি কোহেনের পরিচয় ঘটে। সিরিয় অভিবাসী এবং অন্যান্য গুণাবলির কারণে হাসান এলি কোহেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এদিকে সিরিয় দূতাবাসের আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় এলির নাম যুক্ত হয়। এক পার্টিতে হাসানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় নিযুক্ত সিরিয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশে জেনারেল আমিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে।
এলি প্রায় প্রবাদপুরুষে পরিণত হয়ে গেলে অতঃপর তার গোয়েন্দাবৃত্তি শুরু হয়। আব্রাহামের সঙ্গে গোপন বৈঠকের পরদিন এলি হাসানের অফিসে যান। তাকে বলেন, আর্জেন্টিনায় তার বসবাস তাকে অসুস্থ করে তুলেছে। সিরিয়ই তার ভালো লাগে এবং এলি সেখানে ফিরে যেতে চান। এখন হাসান কি তাকে কয়েকটি রেকোমেন্ডেশন লেটার দিতে পারেন? হাসান সঙ্গে সঙ্গে চারটি চিঠি লিখে দেন। একটি তার ছেলেকে দামেস্কে, বৈরুতে তার দুই প্রভাবশালী বন্ধুকে এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় তার শ্যালিকাকে। এভাবে আরও কয়েকজনের কাছ থেকে এলি চিঠি সংগ্রহ করেন এবং তার ব্রিফকেস চিঠিতে ভরে যায়।
১৯৬১ সালের জুলাইয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা কামাল আমিন তাবেত জুরিখে যান এবং বিমান পরিবর্তন করে মিউনিখে নামেন। সেই বিমানবন্দরে ইসরাইলি এক গোয়েন্দা তাকে ইসরাইলি পাসপোর্ট ও তেলআবিবের বিমান টিকেট দিয়ে যান। এলি কোহেন দেশে ফিরে স্ত্রী নাদিয়াকে বলেন, আমি কয়েক মাস দেশেই থাকব।
এর পরবর্তী কয়েক মাস এলিকে আরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এলি কোহেনের নতুন যে পরিচয় তার সঙ্গে তার আচরণ সম্পূর্ণরূপেই সংগতিপূর্ণ। এলির রেডিও প্রশিক্ষক ইয়েহুদা রেডিও ট্রান্সমিশনের কোড তাকে শিক্ষা দেন। কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণেই এলি কোহেন মিনিটে বার থেকে ষোল শব্দ প্রচার ও রিসিভ করতে সমর্থ হন। তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সিরিয়র ইতিহাস, ঐতিহ্য, তার সেনাবাহিনী, অস্ত্রশস্ত্র এবং কৌশলাদি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয়। পণ্ডিতদের এরকম অসংখ্য ব্রিফিং শেষে এলি কোহেন সিরিয়র অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে এলি কোহেন তার চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল সিরিয়র দামেস্কে পৌঁছান।
সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছিল। এদিকে সিরিয় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৯৪৮ সালের পর একের পর এক অভ্যুত্থানে দেশটি সবদিক থেকে কাহিল হয়ে পড়ে। সিরিয়র কোনো স্বৈরাচারেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। হয় ফাঁসি, ফায়ারিং স্কোয়াড কিম্বা আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে।
অন্তর্কলহ ধামাচাপা দিতে ও জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে সীমান্ত বিরোধ আরো বেশি করে করা হত। দামেস্ক স্কোয়ারে জনগণকে কতল বা শিরশ্ছেদ ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। কোতোয়ালের একটাই বক্তব্য ছিল, এসব লোক ষড়যন্ত্রকারী, গুপ্তচর, রাষ্ট্রের শত্রু। আবার বলা হত এরা পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থক।
দামেস্কে আসার কিছুদিন আগেই সিরিয়ায় একটি অভ্যুত্থান হয়। অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। এই অভ্যুত্থানের ফলে সিরিয় ও মিসরের মধ্যে যে ইউনিয়ন ছিল যার নাম ছিল ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক; সেটি ভেঙে যায়। সংগঠনটি অবশ্য খুব পুরনো ছিল না।
গুপ্তচরবৃত্তি শুরুর আগে এলি কোহেন জালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জালমানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হল, মিউনিখে জেলিঙ্গার নামে আমাদের যে লোক রয়েছে সে আপনাকে রেডিও ট্রান্সমিটার দিয়ে যাবে। দামেস্কে আসার পর সিরিয়র সরকারি প্রচারমাধ্যমের একজন কর্মচারী আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ঐ ভদ্রলোকও আপনার মতো একজন ইমিগ্রান্ট এবং তিনিও খুব বেশি দিন হয়নি দামেস্কে এসেছেন। ঐ ভদ্রলোক আপনার প্রকৃত পরিচয় জানেন না। তাকে আপনার খোঁজার দরকার নেই। সঠিক সময়ে তিনিই আপনাকে খুঁজে নেবেন।
মিউনিখে জেলিঙ্গার এলি কোহেনকে গোয়েন্দাগিরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একটি প্যাকেট দেন। এতে এমন এক ধরনের কাগজ ছিল, যে কাগজে লিখলে তা বোঝা যেত না। বিশেষ একটা টাইপ রাইটার ছাড়াও ছিল একটা ট্রানজিস্টার, যার মধ্যে লুকায়িত ছিল একটা ট্রান্সমিটার। একটা ইলেকট্রিক রেজর দেয়া হয়েছিল। এর কর্ড ট্রান্সমিটারের এন্টেনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্যাকেজে ডিনামাইটের কাঠি দেয়া হয়েছিল যা লুকানো ছিল সাবানের ভেতর। আর দেয়া হয়েছিল আত্মহত্যার জন্য সায়ানাইড পিল। যদি প্রয়োজন হয়। এলি দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কী করে সিরিয়র ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসকে ধুলো দিয়ে এসব তিনি সিরিয়ায় ঢোকাবেন।
জেলিঙ্গার বললেন, জানুয়ারিতে গেনোয়া থেকে বৈরুতে যে জাহাজ যাবে আপনাকে তার টিকেট কাটতে হবে। জাহাজে আপনার একজন সঙ্গী থাকবে। তিনি আপনাকে বর্ডার পার করে দিলে আপনি সিরিয়ায় ঢুকতে পারবেন। জাহাজে যাত্রীদের মধ্যে অবস্থানকালে এক লোক এলি কোহেনকে নিভৃতে ডাকেন। নাম বলেন, মাজেদ শেখ এল আরদ। মাজেদ বলেন, আমার একটা গাড়ি আছে। সেই গাড়িতে আমি আপনাকে দামেস্কে পৌঁছে দেব।
১৯৬২ সালের ১০ জানুয়ারি বৈরুত থেকে আসা মাজেদের গাড়ি সিরিয়র সীমান্তে থামান হয়। ঐ গাড়িতে এলি কোহেনের ট্রান্সমিশনের সব যন্ত্রপাতি। মাজেদ এবং এলি ঐ গাড়িতেই ছিলেন। মাজেদ সিরিয়র কাস্টম ইন্সপেক্টরকে পাঁচশত ডলার ঘুষ দিলে গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়। এলি কোহেন সিরিয়ায় পৌঁছে যান।
সিরিয়র সামরিক বাহিনীর সদর দফতর, জাতীয় নেতৃবৃন্দের সরকারি বাসভবন, সরকারি গেস্ট হাউস, দূতাবাসসমূহ ধনী ব্যবসায়ীদের আবাসস্থলের কাছেই বাড়ি ভাড়া নেন এলি কোহেন। বাড়িতে ঢুকেই তিনি রেডিও'র যন্ত্রপাতি ঘরের বিভিন্নস্থানে লুকিয়ে রাখেন। বাড়িতে কোনো কাজের লোকও রাখেননি যাতে তথ্যাদি পাচার হয়ে যায়। একাই বাড়িতে থাকেন তিনি।
এলি কোহেন আরও ভাগ্যবান এ কারণে যে, তার আগমনের সময়ই ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক ভেঙে যায়। প্রেসিডেন্ট নাসেরকে অপমান ও মিসরের প্রতি অবহেলার কারণ দেখিয়ে দুই দেশের রিপাবলিক ভেঙে যায়। এ সময় সিরিয়র নেতা ও সামরিক বাহিনীর মনে এই প্রত্যয় জন্মে যে, এখন কোনো অভ্যুত্থান হলে তা হবে মিসর সরকারের অনুপ্রেরণায়। ইসরাইলের দিক থেকে কোনো ষড়যন্ত্র কিম্বা বিপদ হতে পারে এমনটি তাদের মাথায় ছিল না।
এদিকে সিরিয় মরিয়া হয়ে নতুন মিত্র, সমর্থক ও তহবিল জোগাতে সক্ষম লোকদের খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সিরিয় এবং বিদেশে বসবাসরত সিরিয় অভিবাসীদের দিকে তাদের নজর ছিল। ঠিক এ রকম সময় কামাল আমিন তাবেত তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হল। প্রথমত তিনি জাতীয়তাবাদী এবং কোটিপতি, তার সঙ্গে রয়েছে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি ইত্যাদি।
কামাল আমিন তাবেত তথা এলি কোহেন দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন। গচ্ছিত রেকোমেন্ডেশনের চিঠির মাধ্যমে তিনি বড় বড় জায়গায় স্থান করে নিতে থাকেন। হাই সোসাইটি, ব্যাংকসমূহ এবং বাণিজ্যিক সার্কেল ২৮ সেপ্টেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদের সঙ্গে কোহেনের মধুর সম্পর্ক। এলি কোহেনের নতুন বন্ধুরা তাকে সামরিক বাহিনীসহ সবক্ষেত্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দেন। দুই শীর্ষ ব্যবসায়ী তরুণ ও সুদর্শন কোটিপতি এলি কোহেনের সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়ার কথাও ভাবেন। এলি কোহেন তথা তাবেতের টাকায় দামেস্কের হত-দরিদ্রদের জন্য একটি খাবার ঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এলি ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার কারণে প্রশাসন তাকে সমীহ করতে শুরু করে। সিরিয়র বর্তমান শাসকদের থেকে তিনি অবশ্য দূরত্ব বজায় রাখতেন। কেননা তার অন্তর্গত মন বলত, এরা খুব ক্ষণস্থায়ী। তাছাড়া মিসর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সিরিয়ায় নতুন অনেক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে।
দামেস্কে আসার এক মাস পর জর্জ সালেম সেইফের সঙ্গে এলি কোহেন তথা তাবেতের পরিচয় হয়। সালেম সেইফ সিরিয়র সরকারি বেতারে কাজ করেন। বিদেশে বসবাসরত সিরিয়দের উদ্দেশে তিনি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন। ইসরাইলে জালমান সর্বশেষ বিফ্রিংয়ে এই সেইফের কথাই বলেছিলেন। এলি তথা তাবেতের দামেস্কে আসার সামান্য কিছু আগে সেইফ এসেছেন। সেইফের বাড়ির পার্টিতে আসায় সিরিয়র রাজনৈতিক ঘটনাবলি যেমন অনুধাবনে সক্ষম হলেন তেমনি সিরিয়র প্রচার নীতিমালাও জেনে নিলেন। ফলে এলি কোহেন তার গোপন রেডিয়োতে কী প্রচার করবেন আর কী করবেন না তার ধারণা পেলেন।
আল আরদ, সেইফ কারোই এলি কোহেন তথা তাবেতের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তাদের ধারণা এলি কোহেন একজন ফ্যানাটিক জাতীয়তাবাদী এবং তার নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে।
এলি কোহেন নিশ্চিত যে, তার মতো নিঃসঙ্গ গোয়েন্দা পৃথিবীতে আর দুটি নেই। না আছে তার কোনো বন্ধু, না কারো প্রতি তিনি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছেন। এমনকী দামেস্কে থেকে ইসরাইলি কোনো নেটওয়ার্ক প্রচারের পরিণতিও তিনি বুঝতে পারছেন না।
এলি কোহেনের এখন যে অবস্থান তাতে তাকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। মাঝে-মধ্যে তিনি স্ত্রী নাদিয়ার কাছে যান বটে কিন্তু তাকে বলা যাবে না সত্যি কথাগুলো; আবার তাকে বিভ্রান্তও করা যাবে না।
এলি কোহেন প্রতিদিন সকাল আটটায় তার বার্তা ইসরাইলে পাঠানো শুরু করলেন। বিকেলেও পাঠাতেন। তার প্রচারণা নির্বিঘ্নই ছিল। তার ট্রান্সমিটার তার বাড়িতে বসানো হয়েছিল। সিরিয়র সামরিক সদর দফতরের কাছেই এটি অবস্থিত। এখানে অবশ্য অসংখ্য ট্রান্সমিশন বসানো। এর মধ্যে কোনোটা এলি কোহেনের তা ঠাহর করা কঠিন। আর আর্মির ট্রান্সমিশনগুলো পুনঃপুনঃ অসংখ্য বার্তা উগড়ে দিচ্ছে।
মাঝে ইসরাইলে ফিরে এলে অফিস থেকে তাকে একটি মিনিয়েচার ক্যামেরা দেয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি ছবি তুলতে পারবেন। তার এই ক্যামেরা লুকিয়ে রাখাও একটা সমস্যা। তিনি ঐ ক্যামেরা পাশা খেলার একটি বক্সে রাখতেন। আর্জেন্টিনার বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি ঐ সব ছবি ইসরাইলে পাচার করতেন।
ক্যামেরার মাধ্যমে প্রথম যে ডকুমেন্টটি তিনি পাঠান তাহল, সিরিয়ায় সামরিক বাহিনীর মধ্যে অস্থিরতার এবং বাথ পার্টির উত্থান সংক্রান্ত। এলি কোহেন অনুভব করেন যে, সিরিয়র রাজনীতি কোনো পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিনি বাথ পার্টির নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেন।
এলি কোহেনের ধারণা সত্য বলে প্রমাণিত হয় ১৯৬৩ সালের ৮ মার্চ। সামরিক বাহিনী সরকার উৎখাত করলে বাথ পার্টি ক্ষমতা গ্রহণ করে। বুয়েন্স আয়ার্স থেকে এলি কোহেনের বন্ধু জেনারেল হাফেজ সালাহ আল বিতারের মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। জুলাই মাসে আরেকটি অভ্যুত্থان হলে জেনারেল হাফেজ সিরিয়র রেভ্যুলশনারি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হন। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি। এলি কোহেন তথা তাবেতের বন্ধুরা মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে থাকেন। সামরিক বাহিনীতেও তার বন্ধুরা ভালো ভালো পদ পান। ইসরাইলি এই গোয়েন্দা আজ সিরিয়র ইনার সার্কেলের একজন সদস্য বনে যান।
দামেস্কে একটা গ্লামারাস পার্টি চলছে। মন্ত্রী, বাথ পার্টির নেতা, জেনারেল, ব্যবসায়ী-কে নেই পার্টিতে! অনেককে দেখা গেল সালিম হাতুমকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের তিনিই নেতা, ট্যাঙ্ক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাফেজকে তিনিই ক্ষমতায় বসান। ঐ ভিলায় প্রেসিডেন্ট হাফেজ সপত্নীক আসেন। কিছুটা বিলম্বে। কিন্তু তার গায়ে যে কোটটি সেটি এলি কোহেন বা তাবেতের দেয়া। সিরিয় ইমিগ্র্যান্টদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্বরূপ টোকেন হিসেবে কোটটি দেয়া হয়েছিল।
মিসেস হাফেজকেই তিনি উপহার দিয়েছেন তা নয়। বহু মহিলাকে অলংকার সেট, জেনারেলদের গাড়ি উপহার দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক নেতারা তাবেতের টাকা নিজ নিজ একাউন্টে জমা করেছেন।
ঐ বাড়ির লিভিংরুমে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা ইসরাইলের সীমান্ত থেকে ফিরে এসে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার অন্যতম বিষয়, জর্ডান নদী থেকে ইসরাইল যাতে পানি না পায় সে লক্ষ্যে সিরিয়র বিশাল প্রকল্প নিয়ে। সিরিয় রেডিও'র প্রধান এলি কোহেন বললেন, অভিবাসী সিরিয়দের নিয়ে নিয়মিত একটা শো করাতে। সেখানে এলি কোহেন যেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ করেন।
এলি কোহেন তথা তাবেতের মতো ভাগ্যবান লোক আর হয় না। আজ সব দরজা তার জন্য উন্মুক্ত। সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে তার নিয়মিত বৈঠক থাকে। বাথ পার্টির নীতিনির্ধারণী বৈঠকে তার উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক।
এলি কোহেন তথা তাবেতের হাতে এখন তথ্যের ভাণ্ডার। টপ সিক্রেট মিলিটারি নির্দেশাবলি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব গোপন বিষয়াদি, জেনারেলদের মনোভাবনা এমনকি কোনো নেতার সঙ্গে কার বন্ধুত্ব ও বিরোধ সবই কোহেন তাৎক্ষণিকভাবে রেডিওমাধ্যমে পাঠিয়ে চলেছেন। সর্বোপরি ইসরাইলের ব্যাপারে সিরিয়র নীতি ও মানসিকতাও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
সিরিয় নতুন কী অস্ত্র কিনল, ইসরাইল সীমান্তে সিরিয় কী ধরনের ক্যান্টনমেন্ট বানাতে যাচ্ছে- সবই মুহূর্তের মধ্যে ছবি ম্যাপসহ ইসরাইলের কাছে চলে যাচ্ছিল। এক শীর্ষ জেনারেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সেনাবাহিনীর কোনো গোপন বিষয়ই এলি কোহেনের কাছে গোপন থাকছে না।
এলি কোহেন নির্বিঘ্নে ইসরাইলের তথ্য পাচারে সমর্থ হলেও একদিন সিরিয়র লে. জাহেরের কাছে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই জাহের তার বাড়িতে এসে উপস্থিত। এলি কোহেন যন্ত্রপাতি সরাতে পারলেও কিছু কাগজ তার টেবিলে রয়ে গিয়েছিল। জাহের জানতে চাইলেন এগুলো কী। এলি কোহেন বললেন, এ হল ক্রসওয়ার্ডের কাগজ। প্রকৃতপক্ষে ঐ সব কাগজে গোপন কালি দিয়ে অনেক কিছুই লেখা ছিল।
ইসরাইলে গোপন তথ্য পাচারে এলি কোহেনের নিজস্ব রেডিও তো ছিলই- তিনি সিরিয়র সরকারি রেডিও'র মাধ্যমেও তেলআবিবে সংবাদ পাঠাতে লাগলেন। সাংকেতিক শব্দাবলি ও প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে তিনি সংবাদ পাঠাতেন। ইসরাইলি গোয়েন্দারা সেসব শব্দ অবমুক্ত করে নিত।
আরো আরো গোপন সংবাদাদি পেতে মরিয়া এলি কোহেন মেয়েদের কাজে লাগাতে লাগলেন। সিরিয়র সরকারি মহলে কানাঘুষা চলছিল যে, এলি কোহেনের বাড়িতে সেক্স পার্টি হয়ে থাকে নিয়মিত। এলির ঘনিষ্ঠ লোকজন এতে অংশ নিতেন এবং সুন্দরী বিদুষী রমণীরা তাদের সঙ্গ দিতেন। এসব মেয়েদের মধ্যে যেমন রাস্তার পতিতারা থাকত তেমনি ভালো ঘরের মেয়েরাও থাকত। এলি কোহেন তথা তাবেতের অতিথিরা সবরকম সেক্স করলেও মেজবান থাকতেন ধীরস্থির। এলি কোহেন তার উচ্চ পর্যায়ের বন্ধুদের কাছেও মেয়ে পাঠাতেন। তার এরকম একজন বন্ধু হলেন কর্নেল সেলিম হনতুম। কর্নেলের কাছ থেকে যা যা শুনত মেয়েটি হুবহু তা এলি কোহেন তথা তাবেতের কাছে এসব বর্ণনা করত।
বক্তৃতাকালে তাবেত সিরিয়র প্রতি দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে ইসরাইলকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করতেন এবং ইসরাইল যে সিরিয়র এক নম্বর শত্রু তা উল্লেখ করতেন। তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার আরও বৃদ্ধির জন্য সিরিয়র নেতাদের কাছে তদবির করতেন। মিসরের পাশাপাশি সিরিয়র বিরুদ্ধেও একটা ফ্রন্ট খোলার কথা তিনি বলতেন। তার বন্ধুরা ইসরাইলের আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও তিনি অনুযোগ করতেন। এসব বলে এলি কোহেন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে আরও সমর্থ হলেন।
এলি কোহেনের সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা তাকে বলতেন, ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে তাদের বেশ ভালো প্রস্তুতি রয়েছে। এবং ইসরাইলের ব্যাপারে এলি কোহেনের আশংকা যে অমূলক একদিন তারা তা প্রমাণ করবেন। এ উপলক্ষে সিরিয়র সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা এলি কোহেনকে নিয়ে তিন বার ইসরাইল সীমান্তে যান এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র কী ভাবে তাক করা আছে তা দেখান। তারা এলি কোহেনকে সিরিয়র দুর্গসমূহ, বাঙ্কার, অস্ত্রের গুদাম ইত্যাদি দেখান। সিরিয়র রণকৌশলও এলি কোহেন তথা তাবেতের কাছে ব্যাখ্যা করেন। এখানে বিপুল পরিমাণ নতুন কেনা অস্ত্র মজুদ ছিল। এলি কোহেন তথা তাবেত চতুর্থবার যখন ইসরাইলের সীমান্তে যান সেদিন মিসরের জেনারেল আলি আমিরও তাদের সফরসঙ্গী ছিলেন। ঐদিন বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র তাবেতই ছিলেন। আলি আমিরকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় জেনারেল গণ্য করা হয়; আবার তিনি ইউনাইটেড আরব কমান্ডের প্রধানও। মিসর, সিরিয় ও ইরাক ইসরাইলের বিরুদ্ধে একযোগে কীভাবে যুদ্ধ করবে তারও পরিকল্পনাকারী ও কমান্ডার আলি আমির।
আমীরের সঙ্গে সীমান্তভ্রমণের কয়েকদিনের মধ্যে বাথ পার্টির নেতারা তাবেতকে জর্ডানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে পাঠান। বার্থ পার্টির বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা সালাহ আল বিতার সেখানে তথাকথিত চিকিৎসায় রয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিতারকে তাড়িয়েছেন বর্তমান সরকারপ্রধান জেনারেল হাফেজ। বিতারকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তাবেতকে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি বেশ কিছু দিন বিতারের সঙ্গে কাটান।
দামেস্কে ফিরে এলি কোহেন ওরফে তাবেত প্রেসিডেন্ট হাফেজকে প্যারিসের পথে বিদায় দিতে বিমানবন্দরে যান। প্রেসিডেন্টকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছিল। কয়েক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট হাফেজ যখন আবার দেশে ফেরেন তখনও তাবেতকে টারমাকে দেখা যায়। অর্থাৎ সব দিক দিয়েই তার মিশন সফল।
এলি কোহেন ও নাদিয়া দম্পতির তৃতীয় সন্তানটি ছেলে। তার নাম শাওল। এই পর্যায়ে কিছুদিন ইসরাইলে ছিলেন এলি। তার স্বজনরা পরবর্তীতে বলেছেন, এই দফায় এলি কোহেনকে অনেক বেশি নার্ভাস ও হিংস্র মনে হয়েছে। এলি কোহেন তাদেরকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেন। পরের বছর তিনি চাকরি ছেড়ে ইসরাইলে থাকতে শুরু করবেন বলেও জানান। কেননা পরিবার তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ বছর নভেম্বরে এলি কোহেন তথা তাবেত স্ত্রী নাদিয়া ও তিন সন্তানকে চুমু দিয়ে সিরিয়র পথে বিদায় নেন। নাদিয়া জানতেন না এলি কোহেনের এটাই শেষ গুডবাই।
১৯৬৪ সালের ১৩ নভেম্বর তেলধান সীমান্তের কাছে বেসামরিক জোনে কর্মরত ইসরাইলি ট্রাক্টরের ওপর সিরিয়া গুলি করতে শুরু করলে ইসরাইল ট্যাংক কামান এবং মিরেজ ও ভাউচার বিমান নিয়ে ইসরাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইসরাইলি বিমান সিরিয় বাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ করতে করতে চালাকি করে জর্ডান নদীর সেই স্পর্শকাতর অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
ইসরাইলকে জর্ডান নদীর পানি দেবে না বলে গৃহীত প্রকল্পের জন্য যেসব ট্রাক্টর বুলডোজারসহ বৃহদাকার মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি সিরিয় এনেছিল- ইসরাইল পরিকল্পনার মাধ্যমে তা ধ্বংস করে দেয়। সিরিয়র বিমান বাহিনী ছিল নিশ্চল। কেননা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আনীত মিগ ফাইটারগুলো তারা তখনো ব্যবহার শুরু করেনি।
সিরিয়র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসরাইলি তাণ্ডব বিশ্বব্যাপী নজর কাড়ে। কয়েক ঘণ্টা পরে সিরিয়র সামরিক কর্মকর্তারা অনুধাবন করেন যে, ইসরাইলি আক্রমণের পরিকল্পনাকারী হলেন এলি কোহেন। এলি কোহেন ঐ যুদ্ধকালে ইসরাইলে ছিলেন। এলি কোহেনকে ধন্যবাদ এ কারণে যে, তার মাধ্যমেই ইসরাইল জেনে যায় গরিব রাষ্ট্র সিরিয়র বিমান বাহিনীর পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সিরিয়য় দুর্গপ্রাকারের অবস্থান এবং জর্ডান নদীর পানি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রকল্পটা সম্পর্কে ইসরাইল ছিল সম্যক অবহিত। এমনকি সিরিয়ার অস্ত্র এবং কোনো ঘাঁটি ও বাঙ্কার থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কত গুলি ছোঁড়া হবে তা-ও তারা জানত। এলি কোহেন অবশ্য এর চেয়েও বেশি জানতেন। সিরিয়র জর্ডান নদীর পানি প্রকল্পের এই প্রথম কাজটি পেয়েছিলেন এক সৌদি ঠিকাদার।
সিরিয়র এই প্রকল্পটি কোথায় কতখানি গভীর হবে, কোথায় কোথায় খনন করা হবে তার পরিকল্পনারও দায়িত্বে ঐ ঠিকাদার। এলি কোহেন তার সঙ্গে দোস্তালি পাতালেন। জেনে নিলেন সব তথ্য এবং জেনে গেল ইসরাইলও। একই সঙ্গে ক্যানেলের প্রন্থের পরিমাপ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ধরনসহ কারিগরি সব তথ্যই ইসরাইলের নখদর্পণে।
এলি কোহেন তথা তাবেতকে তার ঠিকাদার বন্ধু আরও তথ্য ফাস করলেন। ক্যানেলের ক্যাপাসিটি কত হবে এবং ক্যানেলটি রক্ষায় কৌশলগত অস্ত্র কিভাবে বসানো হবে। এলি কোহেনের এই ভালো বন্ধুটির নাম বিল লাদেন। ওসামা বিন লাদেনের পিতা তিনি।
ঐ প্রকল্পকে টার্গেট করে ইসরাইল সেখানে বহুবার আক্রমণ চালিয়েছে। আক্রমণে জর্জরিত আরব দেশগুলো ১৯৬৫ সালে ঐ প্রকল্প স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়।
যুদ্ধাবস্থার অবসানে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে স্বামী এলি কোহেনের ফরাসি ভাষায় লেখা একটি পোস্টকার্ড পান নাদিয়া। আমার প্রিয়তমা নাদিয়া সম্বোধন করে এলি কোহেন উল্লেখ করেন, নববর্ষ উপলক্ষে তোমাকে দুয়েকটি লাইন লিখছি। আশা করি নববর্ষ তোমাদের সবার জীবনে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসুক। ফিকি, আইরিখ ও শাউলকে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা জানাচ্ছি।
নাদিয়ার হাতে যখন এই পোস্টকার্ড পৌঁছায় এলি কোহেন তখন দামেস্কের কারাগারের মেঝেতে শুয়ে। তাকে মেরে হাড়-গোড় প্রায় ভেঙেই ফেলা হয়েছে।
কয়েক মাস ধরেই সিরিয়র সিক্রেট সার্ভিস সিরিয়ন মুখাভারত সারা দেশজুড়ে উচ্চ মাত্রার সতর্কতা জারি করে রেখেছে। ফিলিস্তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান টায়ারা'র পরামর্শ মোতাবেক এই সতর্কতা। টায়ারা সিরিয়র প্রশাসনকে জানান, ১৯৬৪ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে সিরিয়র ব্যাপারে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে। সিরিয় সরকার বিকেল কিম্বা রাতে হোক যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, ইসরাইলের সরকারি বেতারে তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রচারিত হয়ে থাকে। রুদ্ধদ্বার কক্ষে নেয়া সিরিয়র অনেক গোপন সিদ্ধান্তও জনগণ জেনে ফেলছে। নভেম্বরের ১৩ তারিখে ইসরাইল সিরিয়র লক্ষ্যবস্তুতে যেভাবে নির্ভুলভাবে বোমা ফেলেছে তাতেও টায়ারা বিস্মিত। তার যৌক্তিক উপসংহার হল, ফ্রন্টলাইনে সিরিয় যেভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে তা ইসরাইলের নখদর্পণে। এবং সেই আলোকেই হামলা চালিয়েছে। কী করে এ সম্ভব! টায়ারা নিশ্চিত হন যে, সিরিয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কোনো গোয়েন্দা ঢুকে পড়েছে। ঐ গোয়েন্দা থেকে প্রাপ্ত তথ্যই ইসরাইলি সরকারি বেতার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রচার করে থাকে। আর এর অর্থ হল ওয়ারলেসযোগে ঐ গোয়েন্দা খবর পাঠাচ্ছে। কিন্তু কোথায় ট্রান্সমিটার?
১৯৬৪ সালের শেষার্ধ্বে টায়ারা এবং তার সহকর্মীরা সোভিয়েত নির্মিত যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে স্থাপিত ট্রান্সমিটারের সন্ধান চালিয়েও তা পেতে ব্যর্থ হন। কিন্তু ভাগ্য তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন হয় ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে।
সিরিয়র লাতাকিয়া বন্দরে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল পরিমাণ নতুন সম্প্রচার যন্ত্রপাতি আনলোড করছিল। ৭ জানুয়ারি ঐসব যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য সিরিয় সেনাবাহিনী ২৪ ঘণ্টা তাদের সকল ট্রান্সমিটার বন্ধ রাখে। দেশজুড়ে সিরিয় সেনাবাহিনীর যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন বন্ধ ছিল তখন এক আর্মি অফিসার একটি সচল ট্রান্সমিটারের অস্তিত্ব টের পান। তিনি নিশ্চিত হন এটাই গোয়েন্দা ট্রান্সমিটার।
সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত প্রদত্ত ডিটেক্টর সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সিরিয় গোয়েন্দারা। কিন্তু ট্রান্সমিটারের কাছাকাছি আসামাত্রই সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু টেকনিশিয়ানরা ঠিকই এলি কোহেন তথা কামাল আমিন তাবেতের বাসাটি চিহ্নিত করে ফেলে।
এক সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা অবশ্য বলেছিলেন, এ উদঘাটন সঠিক নয়। হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। তার বক্তব্য তাবেতকে আগামী মন্ত্রিসভার বাথ পার্টির নেতারা মন্ত্রী করতে যাচ্ছেন। তার পক্ষে গোয়েন্দা হওয়া অসম্ভব। এলি কোহেন বা তাবেত সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু বিকেলে ঐ ট্রান্সমিটারটি আবার চালু পাওয়া গেলে সিরিয় গোয়েন্দারা সেখানে হাজির হন। সকাল আটটায় চার সিরিয় গোয়েন্দা বন্দুক হাতে দরজা ভেঙে ঐ বাড়িতে ঢুকে পড়েন। গোয়েন্দা সেখানেই রয়েছে। কিন্তু ঘুমে নয়। তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। তখনো ট্রান্সমিশন চলছিল। ইসরাইলি ঐ গোয়েন্দা লাফিয়ে পড়ে সিরিয় গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হন। ইসরাইলি গোয়েন্দা পালানোরও চেষ্টা করেননি আবার গ্রেফতার এড়াতেও চাননি। বিস্ময়বিভূত কমান্ডিং অফিসার। কামাল আমিন তাবেত তথা এলি কোহেন এই ট্রান্সমিটার চালাচ্ছেন।
ঝড়ের গতিতে দামেস্ক জুড়ে এই খবর ডালপালা ছড়াতে থাকে। সিরিয়র নেতারা এ খবর শুনলেন, কেউ বললেন, ননসেন্স, কেউ বললেন অসম্ভব, কেউ বললেন ফ্যান্টাস্টিক, ইমপসিবল ইত্যাদি। দামেস্ক জুড়ে একটাই প্রশ্ন, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বন্ধু, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, একজন কোটিপতি তাবেত কী করে একজন গোয়েন্দা হন।
কিন্তু সব প্রমাণ তো হাজির। তাবেত জানালার শাটারের পেছনেসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রান্সমিটারের যন্ত্রপাতি বসিয়েছেন। এ লোক রাষ্ট্রদ্রোহী না হয়ে যায় না।
সিরিয় জুড়ে যখন তাবেতকে নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে- প্রশাসন ব্যাপক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিল। আশংকা দেখা দিল প্রশাসনের অনেকের মনে। তাবেত কি তাদেরও জড়াতে পারেন? প্রেসিডেন্ট হাফেজ নিজে ছুটে গেলেন জেলখানায়। জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তাবেতকে।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হাফেজ বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাবেতের চোখের দিকে তাকাতেই আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। আমার মনে হতে লাগল, আমার সামনে যে লোকটি দাঁড়িয়ে সে কোনো আরব নয়। কোরান ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমি তাকে সতর্কতার সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন করি। আমি তাকে সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত করতে বলি। তাবেত কয়েকটি আয়াত ভুলভাবে পাঠ করেন বটে। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তাবেত বলেন, খুব ছোটবেলায় তিনি সিরিয়া ত্যাগ করেছেন। স্মরণশক্তি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। প্রেসিডেন্ট হাফেজ বলেন, কিন্তু ঐ মুহূর্তেই আমি ধরে ফেলি যে, লোকটি ইহুদি।
অন্ধকারাচ্ছন্ন সেলে অচেতন অবস্থায় সারা শরীরে নানা আঘাতের চিহ্ন নিয়ে শুয়েছিলেন তাবেত। তার নখ উৎপাটন করা হয়েছিল। এদিকে তার জবানবন্দি প্রেসিডেন্ট জেনারেল হাফেজের কাছে পাঠানো হয়েছে। উপসংহার হল, লোকটি তাবেত নন, এলি কোহেন, ইসরাইলি ইহুদি।
১৯৬৫ সালে ২৪ জানুয়ারি দামেস্ক সরকারিভাবে একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসরাইলি গোয়েন্দাকে গ্রেফতারের তথ্য প্রকাশ করে। এক সিনিয়র অফিসার সাংবাদিক সম্মেলনে রাগে গজগজ করতে করতে বলেন, ইসরাইল হল শয়তান আর সেই শয়তানের গোয়েন্দা এলি কোহেন।
দামেস্ক তথা সিরিয় জুড়ে আতঙ্ক, গুজব, গুঞ্জন। প্রশ্ন হল এলি কোহেন কি গোয়েন্দা চক্রে এককভাবে জড়িত, নাকি দলের নেতা তিনি।
একজন একজন করে ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হল। এর মধ্যে ২৭ জন নারী। সন্দেহভাজনদের মধ্যে আরও আছেন মাজেদ শেখ এল আরদ, সালেম সেইফ, লে. জাহের আলদিন, বেশ কয়েকজন সম্প্রচার কর্মকর্তা এবং যৌন কর্মী। এদের বাইরে আরও যেসব মহিলারা রয়েছেন তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না সংগত কারণেই। তাবেতের সঙ্গে জড়িত চারশত লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাবাদে কিছু সমস্যা ছিল। সিরিয়ার বেশ কিছু রাজনৈতিক, সামরিক ও বয়স্ক নেতা এলি কোহেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তদন্ত করেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। এমনকি তাদের নামও উল্লেখ করা যাবে না। তারাও গোয়েন্দাগিরির সঙ্গে যুক্ত এমন ধারণা সাধারণ্যে তৈরি হতে পারে। আরেকটি সমস্যা হল, তাবেত তার সঙ্গে যুক্তদের কোনো তালিকা কখনো তৈরি করেননি। ফলে চক্রটিকে ডিটেক্ট করা কঠিন।
এদিকে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী এলি কোহেনের গ্রেফতার সম্পর্কিত কোনো সংবাদ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইসরাইলিরা আশাবাদী তারা এলি কোহেনকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন। ফলে সংবাদ ছাপানোর ওপর এই নিষেধাজ্ঞা। এরই মধ্যে এক লোক এলি কোহেনের বাড়িতে গিয়ে তার ভাইকে গ্রেফতারের কথা জানায়। ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির জন্য এই গ্রেফতার।
গ্রেফতারের খবরে এলি কোহেনের ভাইয়েরা বিস্ময়াবিভূত। এক ভাই মায়ের বাসায় গিয়ে তাকে এলির গ্রেফতারের খবর দিলে তিনি প্রায় বোবা হয়ে যান। তিনি প্রশ্ন করেন সিরিয়ায় এলি কী করে গ্রেফতার হয়। এলি কি ভুল করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় চলে গিয়েছিল? এক পর্যায়ে বেহুঁশ হয় যান এলির মা।
নাদিয়া তার তিন সন্তানসহ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। এমনকি তার সব সময়ই মনে হত তার স্বামী সব কথা তাকে বলছে না। নাদিয়া কখনোই ধারণা করতে পারেননি তার স্বামীর কাজের ক্ষেত্রটা কী। এলি কোহেনের সহকর্মীরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাকে জানানো হল, এখনই তোমার প্যারিসের ফ্লাইট। কোহেনের ঐ সহকর্মীর আশ্বাস, আমরা সবচে ভালো উকিল নিয়োগ দেব। তাকে বাঁচানোর যা যা দরকার আমরা তা করব। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত ব্যক্তিগতভাবে এলি কোহেনকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেন।
৩১ জানুয়ারি এলি কোহেনকে বাঁচাতে ফ্রান্সের সুপরিচিত আইনজীবী জ্যাকুয়েস মারসিয়ার সিরিয়ায় আসেন। সরকারিভাবে তার নিয়োগকর্তা এলি কোহেনের পরিবার বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল সরকার তাকে প্রচুর টাকা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে। মারসিয়ার এই মিশন ছিল মিশন ইমপসিবল।
পরবর্তীতে মারসিয়ার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দামেস্কে আসার পর প্রথম দিনই আমার মনে হয়েছে এলি কোহেনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাকে অবশ্যই ফাঁসি দেয়া হবে। তবে সময়ক্ষেপনোর মাধ্যমে কোনো প্যাকেজ বলে তাকে বাঁচানোর লক্ষ্যে আমরা কাজ করতে থাকি।
প্রথমেই মারসিয়ার ট্রায়াল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। মারসিয়ার সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলি কোহেনের সঙ্গে কথা বলা ও তার সই সংগ্রহের তদবির করেন। কিন্তু এলির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি প্রথমবারেই না করে দেয়া হয়। সিরীয় সরকারের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। তারা বিশ্বজনমতও বেশ তোয়াক্কা করেন। এই মহলটি চাইছিলেন যাতে আসামির অধিকার ক্ষুন্ন না হয়। তারা আসলে ভিন্ন কারণে ঐ অধিকার সমর্থন করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর এই আমলা শ্রেণিটি মূলত প্রেসিডেন্ট হাফেজের ঘোরতর শত্রু। প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এলি কোহেন ওরফে তাবেত যে অনেক অপকর্মের হোতা তার বিচার প্রকাশ্য আদালতে হলে সরকারের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু এই আবেদনে সরকারের আরেকটি অংশ ঘোরতরভাবে বিরোধিতা করে। তারাও জানতেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচার হলেও কোহেনের ফাঁসি হবে। তারা এলি কোহেনকে অবিলম্বে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পক্ষপাতী ছিলেন।
এতসব বাদানুবাদের পর অবশেষে একটি বিশেষ সামরিক আদালতে কোহেনের বিচার শুরু হল। মামলার যুক্তিতর্কের একটি অংশ সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানোও হয়। অবশ্য এলি কোহেনের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না। এলি কোহেন যখন তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগের দাবি করেন তখন প্রিসাইডিং জজ এজলাসে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি এলি কোহেনকে বলেন, আপনার জন্য কোনো আইনজীবীর দরকার হবে না। দুর্নীতিপরায়ণ গণমাধ্যম আপনার পক্ষে রয়েছে। রেভিল্যুশন-বিরোধীরাও আপনার পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে প্রিসাইডিং জজই হয়ে ওঠলেন প্রসিকিউটর, প্রশ্নকারী ও বিচারক। তবে এই প্রিসাইডিং জজের জন্য স্পর্শকাতর বিষয়টি হল তিনিও তাবেতের সাবেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নাম ব্রিগেডিয়ার সালাহ ডালি। তাবেতের আরেক ঘনিষ্ঠতম বন্ধু কর্নেল সেলিম হাতুমও ছিলেন এই আদালতের আরেকজন বিচারক। হাতুমের সঙ্গে এলি কোহেনের সুসম্পর্কের গুজব ভণ্ডুল করতে হাতুম আদালত কক্ষে তাকে প্রশ্ন করেন; আপনি কি সালিম হাতুমকে চেনেন? মামলার আসামি এলি কোহেন একজন সুঅভিনেতার মতো আদালতের কোনোগুলো পর্যবেক্ষণ করে হাতুমের দিকে তাকিয়ে বলেন, না আমি তাকে এই কক্ষের কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
এলি কোহেন ও সেলিম হাতুমের এই প্রশ্নোত্তর পর্বটি সিরিয়ার সরকারি টিভিতে দেখানো হলে দামেস্কের সব মানুষ হাসিতে ফেটে পড়ে। ফরাসি আইনজীবী মারসিয়ার বলেন, এটাকে মামলার শুনানি না বলে সার্কাস বলাই সংগত।
টেলিভিশন ক্যামেরা পুনঃপুনঃ এলি কোহেনের সহযোগী আলদিন, সেইফ ও কিছু যৌনকর্মী দেখালেও অন্য বান্ধবীরা কোথায়? সিনিয়র কর্মকর্তাদের পত্নীরা যারা ভিড় করে থাকতেন এলি কোহেনের কাছাকাছি। বাথ পার্টির সেই নেতারাই বা কোথায়? এলি কোহেনকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করা হলে ইসরাইলে তিনি কী সব তথ্য পাঠিয়েছে তা কিন্তু মামলার আলোচনায় মুখ্য বিষয় ছিল না। এমনকি রেডিও বা ট্রান্সমিটারের প্রসঙ্গও উঠেনি। ক্যামেরা এলি কোহেনের বিধ্বস্ত চেহারা ও শরীরটাই বারে বারে দেখাচ্ছিল। আর এ যে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মারধরের ফল তা সহজেই অনুমেয়।
ইসরাইল নীরবে এই বিচারকার্য পর্যবেক্ষণ করছিল। এলি কোহেনের পরিবারকে ইসরাইল সরকার একটা টেলিভিশন সেট ধার দিয়েছিল। এলির পরিবার টিভিতে প্রতিদিন তাকে দেখার সুযোগ পেত। ছেলে-মেয়েরা, নাদিয়া এবং এলির ভাইরা টিভিতে এলি কোহেনকে দেখে নীরবে কাঁদত। এলির ছবি যখনই পর্দায় ভেসে উঠত এলি কোহেনের মা সেই ছবিতে চুমু খেতেন। এলির মেয়ে সোফিয়া তার বাবাকে পর্দায় দেখে বলত, এই হল আমার বাবা। হি ইজ এ হিরো। নাদিয়া নীরবে কাঁদতেন।
৩১ মার্চ সামরিক আদালত তার রায়ে এলি কোহেন, মজিদ শেখ আল আর্দ এবং লে. জাহের আলদিনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এলি কোহেনের ফরাসি আইনজীবীরা তার মক্কেলকে বাঁচাতে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তিনি তিনবার দামেস্কে সফর করেন। তিনি ইসরাইল সরকারের একাধিক প্রস্তাব নিয়ে সেখানে যান। প্রথমত ইসরাইল সিরিয়কে ওষুধ ও কৃষির উন্নয়নে কোটি কোটি ডলারের আধুনিক যন্ত্রপাতি দিতে আগ্রহী। সিরিয় এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ইসরাইলের কারাগারে এগারজন সিরিয় গোয়েন্দা আটক রয়েছে। তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাবও সিরিয় প্রত্যাখ্যান করে। তবে একটা কথা বলে যে, প্রেসিডেন্ট যদি ক্ষমা করে দেন তাহলে ভিন্ন কথা।
১ মে এল আর্দের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। ৮ মে এলি কোহেনের সাজার কথা সরকারিভাবে ঘোষিত হয়। মোসাদ অতঃপর নাদিয়াকে দিয়ে তার স্বামীকে নির্দোষ ঘোষণার জন্য সিরিয় দূতাবাসে একটা আবেদন করায়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে এলি কোহেনকে ছেড়ে দেয়ার বিবৃতি আসতে শুরু করে। পোপ পল, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, বেলজিয়ামের রাণি, ইটালির কার্ডিনাল ও মন্ত্রীরা, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ২২জন সদস্য, হিউম্যান রাইটস লিগ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস এলি কোহেনকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানায়। মূলত এ তালিকা ছিল দীর্ঘ।
১৮ মে মধ্যরাতে জেলার এলি কোহেনকে ঘুম থেকে জাগান। তাকে সাদা রংয়ের বিশাল একটা গাউন পরানো হয় এবং দামেস্কের মার্কেটপ্লেসে নেয়া হয়। তাকে তার পরিবারের উদ্দেশে একটি চিঠি লেখার সুযোগ দেয়া হয়। দামেস্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের এক ধর্মগুরু বা রাব্বি নিসিমের সঙ্গেও তাকে দু'একটি কথা বলতে দেয়া হয়। সিরিয়র সেনাবাহিনী তার বুকে বিশাল একটি পোস্টার ঝুলিয়ে দেয়। তাতে আরবিতে বড় বড় অক্ষরে তার মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা হয়। দুই সারি সশস্ত্র সৈন্যদের মাঝখান থেকে একাকী এলি কোহেনের ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়া টিভি ও পত্রিকার ক্যামেরার প্রধান দ্রষ্টব্য হয়ে দাঁড়ায়।
জল্লাদ বসেই ছিল। সে দ্রুত ফাঁসির রজ্জু এলি কোহেনের গলায় ঝুলিয়ে দেয়।
এলি সমবেত জনতার দিকে একবার তাকালেন। নিশ্চুপ তিনি। কিন্তু পরাজয়ের কোনো গ্লানি তার চোখে-মুখে দেখা যায়নি। জনতা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় সমবেত। ফাঁসি হয়ে গেল এলি কোহেনের। ইসরাইলি গোয়েন্দার ফাঁসি হওয়ায় সিরিয় জনতার সে কী উল্লাস! কয়েক ঘণ্টা ধরে রাত জেগে দামেস্কের মানুষ এলি কোহেনের মৃতদেহ দেখতে থাকে।
এদিকে ফাঁসি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলি কোহেন ইসরাইলের জাতীয় বীরে পরিণত হন। হাজার হাজার লোক তার জন্য শোক করতে থাকে। তার নামে ইসরাইলে স্কুল, রাস্তা এবং পার্কের নামকরণ করা হতে থাকে। এলি কোহেনের গুণগান করে অসংখ্য লেখা ছাপা হতে থাকে।
এলি কোহেন তার অন্তিম চিঠিতে স্ত্রী নাদিয়াকে পুনর্বার বিয়ে করতে বললেও নাদিয়া সে কথা রাখেননি। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও সিরিয় এলি কোহেনের লাশ ফেরত দিতে এবং ইসরাইলে সমাধিস্থ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এলি কোহেনকে মোসাদের একজন বীর বা হিরো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এতদসত্ত্বেও কিছু লোক এলির পরিণতির জন্য মোসাদকে দায়ী করে থাকে। এলি কোহেনের পরিবার এবং বহু লেখকের অভিমত মোসাদ তাকে যথেচ্ছভাবে কাজে লাগিয়েছে। প্রতিদিনই তাকে দিয়ে রেডিও ট্রান্সমিশন করিয়েছে। কোনো কোনো দিন দু'বার। মোসাদ সিরিয় পার্লামেন্টের বাদানুবাদ এলি কোহেনকে নিয়মিত পাঠানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই রিপোর্টের প্রয়োজনীয়তা ছিল শূন্য। এসব উদ্দেশ্যহীন কাজ এলি কোহেনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
এলি কোহেন ছিলেন 'মহান' এক গোয়েন্দা। তার জীবন-অবসানের মধ্য দিয়ে মহান গোয়েন্দাদের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
মোসাদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস এবং কাজ আদায়ে বাড়াবাড়ি তার লোকদের মৃত্যুঝুঁকি যে বাড়িয়ে দেয়, তা বলাই বাহুল্য।

📘 মোসাদ > 📄 মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্প ভন্ডুল

📄 মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্প ভন্ডুল


১৯৬৩ সালের আগস্টে মাদ্রিদের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে দু'জন লোক ঢুকে মালিকের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। অস্ট্রিয়ার এই মালিকের নাম অট্টো স্করজেনি। তারা মালিককে ন্যাটোর অফিসার পরিচয় দিল এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা তার স্ত্রীর কাছে একটা চিঠি লিখে দিতে বলল।
খুব অল্পতেই ঐ সম্মানিত ব্যবসায়ী বুঝলেন, আগতরা তার অতীত-বর্তমান সবই জেনে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্করজেনি ছিলেন একজন ডাকসাইটে কর্মকর্তা। আসলে তার চেয়েও অধিক। এবং অবশ্যই জার্মানিতে। সুদর্শন, ডেয়ারডেভিল এই কম্যান্ডোর অভিযানগুলো ছিল তুলনা রহিত এবং দর্শনীয়। ১৯৪৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ছত্রী-সেনাদের একটি ব্যাটেলিয়ন নিয়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থান থেকে ফ্যাসিস্ট ডিকটেটর বেনিতো মুসোলিনিকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন। নাজিবিরোধী ইটালী সরকার মুসোলিনিকে জেল দিয়েছিল। এসএস ক্যাপ্টেন স্করজেনি মুসোলিনিকে হিটলারের সামনে উপহার দিলে তাকে অনেক পদক ও পদোন্নতি দেয়া হয়। স্করজেনি অসংখ্য বিপজ্জনক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। এজন্য তাকে ইউরোপের সবচে ভয়ানক মানুষ হিসেবে খেতাব দেয়া হয়েছিল।
যুদ্ধাপরাধ আদালত থেকে মুক্ত হয়ে স্করজেনি স্পেনে বসবাস শুরু করেন এবং তার ব্যবসাও বেশ জমে উঠে।
স্করজেনির কাছে আগত এই দুই যুবক বলল, আমরা আসলে ন্যাটোর গোয়েন্দা নই। আমরা ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের লোক। এই দুই লোক হল রাফি এইতান ও জার্মানিতে নিযুক্ত মোসাদ বাহিনীর প্রধান আব্রাহাম।
স্করজেনির মুখটা ইসরাইলের কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কেননা বছরখানেক আগে ইহুদি হত্যার জন্য তারা এডলফ আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছে। এবার কি তার পালা? সামনে বসা ছোটখাট লোকটা স্করজেনির ভয়টা ভাঙিয়ে দিল। গোয়েন্দাটি বলল, আপনার মিসরে খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে। একটা ব্যাপারে আমরা শুধু আপনার সহযোগিতা চাই।
১৯৬২ সালের ২১ জুলাই ইসরাইলে ইয়েসেলির আগমনের দুই সপ্তাহ পরে মিসর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সংবাদ জানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল। এর মধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি ১৭৫ মাইল করে, বাকি দু'টির ৩৫০ মাইল করে। ২৩ জুলাই মিসরের বিপ্লব দিবসের প্যারেডে বহু মিসাইল থরে থরে সাজিয়ে প্রদর্শিত হল। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এক বিশাল সমাবেশে বললেন, তাদের মিসাইল বহু বহু দূরের টার্গেটে হিট করতে সক্ষম।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের মূল টার্গেট হল ইসরাইল। অর্থাৎ ইসরাইলের যে কোনো স্থান তা আঘাতে সক্ষম। মিসরের এই সাফল্য ইসরাইলকে বিস্মিত করল এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মোসাদ-প্রধান ইসার হারেলের প্রতি ক্রোধপূর্ণ সব মন্তব্য করতে লাগলেন। কেন মোসাদ তাদেরকে আগে-ভাগে কিছু জানাতে পারল না। কেউ কেউ এমনও বললেন, নাসের যখন সাংঘাতিক সব অস্ত্র বানাচ্ছেন সেখানে হারেল ক্ষুদে ইয়েসেলিকে উদ্ধারে দেশ-বিদেশ করছেন।
উদ্বিগ্ন বেন গুরিয়ান আইসার হারেলকে ডেকে মিসরের রকেট-ক্ষেপণাস্ত্রের আপডেট দিতে বললে তিনি তাতে সম্মতি দেন। আইসার হারেল এক দক্ষ গোয়েন্দাকে এ ব্যাপারে মিসরে পাঠালেন। মাস-খানেকের মধ্যে হারেল বেন গুরিয়ানকে মিসরের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চিং সংক্রান্ত তথ্যাদি দিলেন।
আইসার হারেল রিপোর্টে লিখলেন যে, জার্মানির বিজ্ঞানীরা মিসরকে এ প্রকল্পে সহায়তা করছে।
১৯৫৯ সালে নাসের আনকনভেনশনাল অস্ত্র বানানোর লক্ষ্যে গোপন একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন।
নাসের এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেন সাবেক এয়ারফোর্স ইন্টেলেজিন্সের কমান্ডার জেনারেল খলিলকে। স্পেশাল মিলিটারি প্রোগ্র্যামস ব্যুরোর তিনি প্রধানও। তার ওপর দায়িত্ব পড়ল যুদ্ধবিমান, রকেট মিসাইল একই সাথে রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্র বানানোর। এই খাতে প্রচুর বরাদ্দও দেয়া হল।
জেনারেল খলিলের প্রথম কাজ হল, এসব অস্ত্র বানাতে সক্ষম ব্যক্তিদের এনে জড়ো করা। এবং তিনি জানতেনও, লোক কোথায় পাওয়া যাবে।
নাজি জার্মানিতে রকেট ইত্যাদি অত্যাধুনিক অস্ত্রাদি বানিয়েছে এমন দক্ষ বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের অনেক বেতন, ভাতা, বোনাস ও হাজারো সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জেনারেল খলিল তাদের মিসরে এনে জড়ো করলেন। এদের সংখ্যা তিন শতাধিক।
মিসরের একটি প্রকল্পের নাম ৩৬। এখানে যোগ দিলেন যুদ্ধবিমান বানাতে দক্ষ উইলি মেসেরস্পীট। তিনি একটি মিসরীয় যুদ্ধবিমান এসেম্বলিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেসেরস্পিটকে মারাত্মক যুদ্ধবিমান তৈরির জনক বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজি বিমান বাহিনীতে তিনি এই পদবি পান।
জেনারেল মোট তিনটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করে জগৎজোড়া বিজ্ঞানীদের সেখানে নিয়োগ দেন। তিনটি প্রকল্পের মধ্যে ৩৩৩ নম্বর প্রকল্পটি ছিল গোপন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এখানেও হিটলারের লোকজন ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে তৎপর ছিলেন।
মোসাদ-প্রধান আইসারের পর্যবেক্ষণ হল ১৯৬০ সালের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণের প্রকল্পগুলো পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করে। ঐ বছরই আমেরিকার একটি বিমান থেকে তোলা ছবির সূত্র ধরে বলা হয় ইসরাইল পরমাণু বোমা বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যানার হেডিং করে সেই খবর ছাপে। ইসরাইল যতই বলল, ওটা টেক্সটাইল কারখানা- কেউ তাতে কর্ণপাত করে না। এদিকে মিসরসহ আরব দেশগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। মিসর সিদ্ধান্ত নেয়, ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র বানানোর প্রকল্পগুলো আরও জোরেসোরে এগিয়ে নিতে হবে।
জার্মানিতে রকেট বানাতেন যে বিজ্ঞানীরা তাদের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ইউজেন স্যাঞ্জার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কয়েক বছর ফ্রান্সে কাটান; সেখানে তিনি ভেরোনিক রকেট বানান। এটি জার্মানিদের ভি২ রকেটের একটি সংস্করণ। এভাবে মিসরে জড়ো হওয়া জার্মান বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে বটেই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়কর অস্ত্র বানাতে শুরু করেন। ইউজেন স্যাঙ্গার মিসরীয় প্রকল্পে যোগ দিলে তার সঙ্গী সাথী বিজ্ঞানীদেরও সেখান নিয়ে আসেন। জার্মান ও মিসরীয়রা মিলে এসব প্রকল্পের জন্য কয়েকটি ফ্রন্ট অফিস খোলেন। হাসান কামিল নামের এক মিলিয়নিয়ার বাস করতেন সুইজারল্যান্ডে। তিনি লিয়াজোঁ করতেন মিসরীয় প্রকল্পে। তারা সুইজারল্যান্ডে দুটি ডামি কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি কোম্পানির কাজ ছিল মিসরীয় প্রকল্পের জন্য নানারকম যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ সংগ্রহের।
১৯৬১ সালে স্যাঙ্গার এবং কয়েকশত দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান মিসরীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু বছরের শেষ দিকে জার্মান সরকার জানতে পারে যে, তাদের স্টুটগার্টের প্রকল্পের কিছু লোক মিসরীয় প্রকল্পে কাজ করছে। জার্মান সরকার অতঃপর স্যাঙ্গারকে জার্মান যেতে বাধ্য করে। প্রফেসর পিলজ মিসরীয় প্রকল্পের প্রধান হন।
১৯৬২ সালের জুলাইয়ে মিসরের ৩৩৩ প্রকল্প ত্রিশটি মিসাইল বানিয়ে ফেলে। তার মধ্যে চারটি মিসাইল নির্দিষ্ট অতিথি ও সাংবাদিকদের দেখান হয়। কুড়িটি মিসাইল সে দেশের পতাকা জড়িয়ে কায়রোর রাস্তায় প্রদক্ষিণ করে।
মোসাদ-প্রধান হারেল আগস্ট মাসে বেন গুরিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় পিলজের লেখা একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। চিঠিটি মিসরের ৩৩৩ প্রকল্পের পরিচালক কামিল আজবকে লেখা। ঐ চিঠিতে পিলজ টাইপ টু'এর পাঁচশত মিসাইল টাইপ পাঁচশত মিসাইল বানানোর জন্য ৩৭ লক্ষ সুইস ফ্রাঙ্ক বরাদ্দের কথা বলেন। ঐ সব ক্ষেপণাস্ত্রের মেশিন পার্টস ও যন্ত্রপাতির জন্য ঐ টাকার প্রয়োজন। অর্থাৎ নয়শত মিসাইল বানাচ্ছে মিসর।
এই চিঠি দেখে ইসরাইলি শীর্ষ পর্যায়ে মাথা খারাপের যোগাড় হয়। মোসাদ-প্রধানের আশংকা জার্মানির বিজ্ঞানীরা প্রতারণার মাধ্যমে ইসরাইলকে ধ্বংস করতে চায়। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা পৃথিবীতে রোজ কেয়ামত ঘটিয়ে ছাড়বে। মিসরের অস্ত্রভাণ্ডারে এমন অস্ত্র আসছে যা যে কোনো জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হবে। ইসরাইলের ভূখণ্ডে এমন একটি নারকীয় গ্যাস তারা ছাড়তে সক্ষম হবে যার অস্তিত্ব বহুদিন অনুভূত হবে ইত্যাদি।
ঐ সময় ইসরাইলের চিফ অব স্টাফ ছিলেন জেনারেল জভি জুর। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, মিসরের অস্ত্র বানানোর বিষয়টি তারা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বিজ্ঞানীরা সৌখিন এবং তথ্যের ব্যবহার তারা জানে না।
মোসাদ-প্রধানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সব সময়ই ঈর্ষণীয়। সবাই তাকে ভালো বাসতেন, ভালো জানতেন। কিন্তু আইচম্যানকে আটকের পর তার মানসিকতা ও চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। স্টিলের মতো শক্ত এই মানুষটি এখন জার্মানির বিরুদ্ধে লেগেছেন। কেননা জার্মানির বিজ্ঞানীরা ইসরাইল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। মোসাদ-প্রধান বেন গুরিয়ানকে বললেন, জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে কথা বলতে। বেন গুরিয়ান জার্মান চ্যান্সেলর কোনোরাদ এডেনাউয়ের সঙ্গে তাদের বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। কেননা সম্প্রতি জার্মানি ইসরাইলের একটি মরুভূমির উন্নয়নে পাঁচশত মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। গুরিয়ান ও জার্মান চ্যান্সেলরের মধ্যে সম্প্রতি ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রানিজ যোশেফ ইসরাইলকে শত শত কোটি টাকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাংক, কামান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ইত্যাদি। সবই বিনামূল্যে। হালোকাস্টের মাধ্যমে জার্মানির পক্ষ থেকে ইহুদিদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এই উপহার। বেন গুরিয়ান বর্তমান জার্মান সরকারকে বিশ্বাস করেন এবং মিসরকে কেন্দ্র করে তিনি এই সম্পর্ক কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না। গুরিয়েন তার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শিমন পেরেজকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখার পরামর্শ দেন।
কিন্তু এতটুকুতে মোসাদ-প্রধান আইসার সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মিসরে জার্মানদের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে ব্যক্তিগতভাবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর প্রতিজ্ঞা করেন।
১৯৬২ সনের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় এক অপরিচিত ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীর চেহারার একজনকে সঙ্গে নিয়ে মিউনিখে মিসরীয়দের উল্লেখিত একটি প্রকল্প অফিসে আসে। আধঘণ্টার মধ্যে হেনজ ক্রুগকে নিয়ে তারা ভবন ত্যাগ করে।
পরদিন সকালে মিসেস ক্রুগ পুলিশকে জানান যে, তার স্বামী নিখোঁজ। দুদিন পরে পুলিশ ক্রুগের সাদা মাইক্রোবাস গাড়িটি মিউনিখের শহরতলী থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। গাড়িটি কাদা দিয়ে ল্যাপা ছিল এবং ট্যাঙ্কে এক ফোঁটাও পেট্রোল ছিল না। অচেনা এক লোক ফোন করে ক্রুগের মৃত্যুর সংবাদ দেয়। পুলিশ অবশ্য অন্য একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছিল, মোসাদ ক্রুগকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে গেছে। যাহোক এখন সন্দেহাতীত যে, ক্রুগ মারা গেছেন।
২৭ নভেম্বর পিলজের সেক্রেটারি ওয়েন্ডি তার ৩৩৩ ফ্যাক্টরির অফিসে একটি খাম দেখতে পান। প্রেরক হামবুর্গের বিশিষ্ট আইনজীবী। ওয়েন্ডি খামটি খোলামাত্র একটা বিস্ফোরণে অফিসটি কেঁপে উঠে। পিলজের সেক্রেটারি কয়েক মাস হাসপাতালে কাটালেও তার চোখ অন্ধ হয়ে যায়। তার মুখমণ্ডল বিকৃত এবং তিনি কালো হয়ে যান।
পরের দিন মিসরের ৩৩৩ নম্বর ফ্যাক্টরির ঠিকানায় এক বই প্রকাশকের অফিস থেকে একটা প্যাকেট আসে। প্যাকেটে লেখা ছিল বই। যখন এক মিসরীয় ক্লার্ক সেটি খোলে অমনি তা বিস্ফোরিত হলে পাঁচজন লোক নিহত হয়। প্যাকেটে প্রকাশকের যে ঠিকানা ছিল তা স্পষ্টতই ভুয়া ছিল।
এরপর জার্মানি থেকে এবং মিসরের ভেতর থেকে এরকম প্যাকেট আসতে থাকে। সেগুলো বিস্ফোরিত ও লোকজন আহত হতে থাকে।
পরবর্তীতে মিসরের অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্প থেকে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। সেনাবাহিনী বেশ কিছু বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়ও করে। মিসরবাসী এবং সাংবাদিকদের বুঝতে বাকি থাকে না কায়রোতে এর প্রেরক ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। আরও পরে জানা যায় কিছু পার্সেলের প্রেরক 'শ্যাম্পেন স্পাই' নামের এক গোয়েন্দা। মিসরেই ভিন্ন পরিচয়ে তিনি থাকেন এবং জার্মানির সাবেক এসএস অফিসার বলে পরিচয় দেন। জার্মান স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কায়রোতে স্থায়ী এবং মিসরের হাই সোসাইটি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের খুব ঘনিষ্ঠ।
পত্রবোমা জার্মান বিজ্ঞানীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে এবং তাদের প্রাণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করেন। প্রেসিডেন্ট নাসেরের প্রকল্পে তাদের এবং তাদের স্বজনদের কাজ না করার জন্য বেনামে ফোন দেয়া হতে থাকে। নাসেরের তিন প্রকল্পে কড়া নিরাপত্তা দেয়া শুরু হয়। জার্মানিতেও তাদের অফিসে কড়া নিরাপত্তা চালু হয়। বিজ্ঞানীরা যখন ইউরোপ যেতেন তখন তারা একসঙ্গে থাকতেন এবং জার্মান পুলিশের সাহায্য নিতেন। এর ফলে সম্ভবত প্রফেসর পিলজের ১৯৬২ সালের শেষার্ধে একবার জীবন রক্ষা পায়। তাকে মোসাদ ফলো করলেও হত্যার সুযোগ পায়নি।
মোসাদ-প্রধান আইসার ১৯৬২ সালের অধিকাংশ সময় মিসর-ইস্যুতে ইউরোপেই কাটান এবং মোসাদ গোয়েন্দাদের নানাকাজে নিয়োগ করেন। রাফি এইতান বিজ্ঞানীদের চিঠিপত্র গায়েবে ওস্তাদ এবং এজেন্ট নিয়োগের পরিবর্তে এ কাজে তিনি সাফল্য দেখান। এইতানের মতে, চিঠিপত্রের মাধ্যমে ফার্স্টক্লাস ম্যাটেরিয়াল পাওয়া যায়।
অপ্রচলিত পন্থায় অভিযান চালানোর জন্য এইতানের কিছু ইলেকট্রোনিক যন্ত্রপাতি দরকার। কিন্তু সেগুলো দোকানে পাওয়া যায় না। এসব যন্ত্রপাতি সিআইএসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে এইতান ল্যান্সকি নামের এক ডাকাতের সন্ধান পান মিয়ামিতে। সে-ও ইহুদি। তাকে ফোনে পাওয়া গেলে সে জানায়, সুইজারল্যান্ডে এক মাসের মধ্যে সে এইতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ল্যান্সকি এইতানের শিকাগোর এক লোকের ঠিকানা দিলে তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।
মোসাদ-প্রধানের এবারের টার্গেট ড. অট্টো জোকলিক। সূত্র মতে, ড. জোকলিক একজন অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী এবং পরমাণু রেডিয়েশনে তার বিশেষ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। তার আরেকটি বিশেষত্ব হল স্বল্প সময়ে তিনি পরমাণু বোমা বানাতে পারেন। ড. অট্রো জোকলিকের জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ ক্রয়ের জন্য মিসর অস্ট্রিয়ায় একটি ফ্রন্ট অফিস খোলে। ওখান থেকে মালামাল মিসরে পাঠানো হবে। জোকলিক মিসরের জন্য দুটি পরমাণু পরীক্ষা চালাবেন এবং বেশ কিছু পরমাণু বোমা বানাবেন যা ক্ষেপণাস্ত্রের ওভারহেডে যুক্ত করা হবে।
এসব ঘটনায় সহজেই অনুমেয় জোকেলিক একজন ভয়ংকর মানুষ। এমনও হতে পারে জার্মানির বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচে ভয়ংকর। মোসাদ জরুরি ভিত্তিতে জোকলিককে খুঁজে বের করতে ইউরোপে তাদের সব গোয়েন্দার কাছে বার্তা পাঠায়।
১৯৬২ সালের ২৩ অক্টোবর মোসাদ-প্রধান আইসার একটি ঘটনায় স্তম্ভিত। ইউরোপে ইসরাইলি দূতাবাসের কলিংবেল টিপে এক লোক নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। সেখানে তিনি বললেন, আমিই অট্টো জোকলিক। মিসরের জন্য আমি যেসব মারণাস্ত্র বানাচ্ছি তার একটি প্রতিবেদন ইসরাইলকে দিতে আমি প্রস্তুত।
দুই সপ্তাহ বাদে ব্যাপক গোপনীয়তার মধ্যে জোকলিক ইসরাইল যান। বেশ কয়েকমাস পরে জোকলিকের স্বপক্ষ ত্যাগের বিষয়টি যখন প্রকাশ্যে এল তখন ইউরোপের সাংবাদিকরা লিখতে শুরু করলেন যে, তিনি ইসরাইলিদের সঙ্গে ভিড়েছেন। বিশেষ করে ক্রুগের মৃত্যুর পরে। প্রকৃতপক্ষে জোকলিক সব সময়ই ক্রুগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ক্রুগ অপহৃত হলে জোকলিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার আশংকা ক্রুগ যদি ইসরাইলিদের দ্বারা অপহৃত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তার নাম বলেছেন। মিসরীয়দের অস্ত্র প্রকল্পে তার গুরুত্বের কথা বলেছেন। ফলে জোকালিক ভাবলেন, ইহুদিদের হাতে তার মৃত্যু অবধারিত। ফলে তিনি স্বপক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ইসরাইলিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। আর জীবন বাঁচাতে যে তিনি এটা করেছেন তা বলাই বাহুল্য।
জোকলিক ইসরাইলে ছিলেন। মোসাদ তাকে সার্বিক নিরাপত্তা দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে রেখেছিল। মোসাদ-প্রধান তাকে বিশেষ দুটি কাজে লাগাতে চাইলেন। প্রথমত, তার মাধ্যমে মিসরীয় প্রজেক্ট সম্পর্কে তথ্য পাওয়া; আরেকটি হল মিসরে ফিরে গিয়ে মোসাদের পক্ষ হয়ে কাজ করা। এক কথায় ডাবল এজেন্ট।
অট্টো জোকলিক ইসরাইলিদের জানান, একজন সিনিয়র জার্মান ক্লার্কের মাধ্যমে তার সঙ্গে জেনারেল খলিলের পরিচয় ঘটে এবং নিয়োগ লাভ করেন।
মিসরীয়দের একটি প্রকল্পের নাম ছিল ক্লিওপেট্রা। এই প্রকল্পের দুটি পরমাণু বোমা বানানোর কথা। জোকলিক এক্ষেত্রে প্রতিভাদীপ্ত দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলেন। তার যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে ২০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনে জার্মানি ও হল্যান্ডে তা আরও সমৃদ্ধ করে বিশেষ পরমাণু শক্তিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা ছিল। এক্ষেত্রে জার্মানি ও হল্যান্ডের তিনজন জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীকে তিনি তালিকাভুক্ত করেন। আর ঐ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়েই পরমাণু বোমা বানানো হবে।
জোকলিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। তিনি জার্মান বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে কথাও বলেন এবং মিসরে পরমাণু বোমা বানানোর দাওয়াত দেন। ইউরোপ থেকে তিনি বেশ কিছু নিকেল জাতীয় জিনিস কেনেন এবং তা কায়রোতে পাঠাতে সক্ষম হন।
জোকলিকের রিপোর্ট বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেননি। প্রথমত শতকরা কুড়ি ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাওয়া কঠিন। আরও কিছু হিসাব কষে বিশেষজ্ঞরা বললেন, জোকলিকের ফর্মুলা ভুল।
বিশেষজ্ঞদের শীতল মন্তব্য মিসরের নেতাদের দমাতে ব্যর্থ হল। মিসরীয়রা রাসায়নিক অস্ত্র বানাচ্ছে এ নিয়ে রিপোর্ট ছাপা হলে তারা আরও সতর্ক হয়। ১৯৬৩ সালের ১১ জানুয়ারি মিসর ইয়েমেনে সঙ্গে যুদ্ধে পয়জন গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে বিশ্ববাসী ও উল্লেখিত বিজ্ঞানীরা বললেন, তাদের ধারণা অমূলক নয়। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে বিষয়টি জানান। গোল্ডা মেয়ার তাকে বলেন যে, মিসর আনকনভেনশনাল ওয়ারহেড ব্যবহার করে মিসাইল বানাচ্ছে। কেনেডিকে তিনি হস্তক্ষেপ করতে বলেন। কিন্তু কেনেডি এ নিয়ে কিছুই করেননি।
আনকনভেনশনাল ওয়ারহেডস খুবই ভয়ানক। কিন্তু মিসর তাদের প্রথম অগ্রাধিকার দিল মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করার কাজে।
১৯৬৩ সালের শীতকালে মিসরের ৩৩৩নং ফ্যাক্টরির গাইডেন্স বিশেষজ্ঞ ড. ক্লেইনওয়াচার কয়েক সপ্তাহের জন্য জার্মান আসেন। নিজের ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে অন্ধকার ও সরু গলি দিয়ে তিনি তার বাসায় যাচ্ছিলেন। রাস্তায় অনেক পুরু বরফও ছিল। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একটি গাড়ি এসে তার পথ আটকায়। গাড়ি থেকে একটি লোক নেমে ক্রেইনওয়াচারের দিকে এগোতে থাকে। বিজ্ঞানী তৃতীয় একটি লোককেও গাড়িতে দেখতে পান। আগত ব্যক্তিটি ক্লেইনওয়াচারের কাছে জানতে চান ড. সেনকার কোথায় থাকেন? উত্তরের জন্য কোনো অপেক্ষা না করেই লোকটি তার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার দিয়ে ক্লেইনওয়াচারকে গুলি করে। গুলিতে গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে যায় এবং ক্লেইনওয়াচারের উলের মাফলারে আটকে যায়। ক্রেইনওয়াচার তার রিভলবার বের করার আগেই আততায়ী দ্বিতীয় একটি গাড়িতে চড়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ দেখে যে, ঘটনাস্থল থেকে একশ গজ দূরে প্রথম গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আগত তিনজনই আরেকটি গাড়িতে করে পালিয়েছে। তারা আলি সামিরের একটি পাসপোর্ট ফেলে যায়। আলি সামির হলেন মিসরীয় গোয়েন্দা বাহিনীর একজন প্রধান। তিনি তখন কায়রোতে। যাহোক, ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলাকারীদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবগুলো পত্রিকারই একই মন্তব্য, এ হত্যা প্রচেষ্টা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের। যদিও এবারের হত্যা চেষ্টা সফল হয়নি।
মোসাদের এবারের টার্গেট সুইজারল্যান্ডে জার্মান বংশোদ্ভূত ড. পলে গোয়েরকেকে নিধন!
ক্লেইনওয়াচারের অনুরূপ গোয়েরকে মিসরের মিসাইল প্রজেক্টে গাইডেন্স সিস্টেমে কর্মরত। তিনি মিসরের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা পান। মোসাদের কাছেও ভিন্ন কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়েরকের মেয়ে হেইদির জার্মানিতে সুইস সীমান্তের কাছে বসবাস। ক্লেইনওয়াচারের ওপর মোসাদের হামলার পর ড. জোকলিক হেইদিকে ফোন করে বলেন যে, তার বাবার সাথে মিসরে তার দেখা হয়েছে। সেখানে তিনি ইসরাইল ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিপজ্জনক অস্ত্র বানাচ্ছেন। জোকলিক হেইদিকে ইংগিত করেন যে, তার বাবা যদি ঐ বিপজ্জনক কাজ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। এর বিকল্প হল, যদি তিনি মিসর ত্যাগ করেন, তাহলে ভয়ের কিছু নেই।
জোকলিক উপসংহারে হেইদিকে বলেন, যদি তুমি তোমার বাবাকে ভালোবাস, তাহলে শনিবার ২ মার্চ বিকাল ৪টায় আমার সঙ্গে বাসেলের থ্রি কিংস হোটেলে দেখা কর। অস্থির হেইদি অবিলম্বে সাবেক নাজি অফিসার এইচ মানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মান আবার মিসরের অস্ত্র প্রকল্পে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের দায়িত্বে নিয়োজিত। মান পুলিশকে বিষয়টি জানালে তারা আবার তা সুইস কর্তৃপক্ষকে জানায়। জোকলিক এবং তার বন্ধু যখন থ্রি কিংস হোটেলে ঢোকেন তখন হোটেলের পেছনে পুলিশের বেশ কিছু গাড়ি মোতায়েন করা। লবিতে গোয়েন্দা মোতায়েন, হেইদিরা যে টেবিলে বসবে সেখানে টেপরেকর্ডার সেট করা- সব আয়োজনই সমাপ্ত।
জোকলিকের সঙ্গে ছিলেন মোসাদ গোয়েন্দা যোশেফ বেন গাল। তারা ফাঁদে পা দিলেন। তারা এসবের কিছুই সন্দেহ করেননি এবং হেইদির সঙ্গে ঘণ্টা খানেক কথা বলেন। সতর্ক থাকার কারণে তারা হেইদিকে কোনো ভয় দেখাননি বরং যদি তার বাবা মিসরে উল্লেখিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকেন, তাহলে কী ধরনের ক্ষতির আশংকা তার নজির দেখালেন। তারা হেইদিকে কায়রোর একটি বিমান টিকেট দিতে চাইলেন। তাদের বক্তব্য, হেইদি যেন মিসরে গিয়ে তার বাবাকে বুঝায় এবং জার্মানিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জার্মানিতে তাদের পরিবারের কারো কোনো ভয় নেই।
মিটিংশেষে তারা দু'জনই জুরিখে চলে যান। সেখান থেকে তাদের পৃথক যাত্রা শুরু হয়। জোকলিক যখন আরেকটি ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ তখনই সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মোসাদ গোয়েন্দা বেন গালকে ইসরাইলি কনস্যুলেটের কাছে গ্রেফতার করা হয়। ঐ দিনই অপরাহ্নে জার্মান পুলিশ সুইস কর্তৃপক্ষকে ঐ দুই ব্যক্তিকে এক্সট্রাডিয়েট করতে বলে। হেইদিকে ভয় দেখানো এবং ড. ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
ইউরোপের সদর দফতরে বসেই মোসাদ-প্রধান আইসার সুইস কর্তৃপক্ষকে বেনগাল এবং জোকলিককে ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু জার্মানির এক্সট্রাডিশন অনুরোধের কারণে তা সম্ভব নয় বলে সুইস পুলিশ জানায়। আইসার অবশেষে ইসরাইল ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেষদিকে তারা দু'জনই মিসরকে নিয়ে জার্মানির আচরণে বিরক্ত ছিলেন।
গোল্ডা মেয়ার বলেন, ইসরাইল যদি জার্মান চ্যান্সেলরকে বলে তাহলে হয়তো পশ্চিম জার্মানি এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নিতে পারে।
মোসাদ-প্রধান দ্রুত টাইবেরিয়াসে চলে যান। সেখানে তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ান অবকাশে ছিলেন। মোসাদ-প্রধান অবিলম্বে পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনে প্রতিনিধি পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন। এই প্রতিনিধিদল পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলরকে প্রমাণাদিসহ দেখাবে যে, মিসরে জার্মানির বিজ্ঞানী রকেট ইত্যাদি বানাতে লিপ্ত। এ এক ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন। একই সাথে জার্মানি যেন এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নেয়।
কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন এতে অস্বীকৃতি জানান।
আইসার নাছোড়বান্দা। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, যদি গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় তাহলে পুরো ব্যাপারটিই নস্যাৎ হয়ে যাবে। আইসার বলেন, বেন গালের গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হওয়ামাত্র জার্মান বিজ্ঞানীদের মিসরের কার্যকলাপ প্রকাশ্যে এসে যাবে। তখন ইসরাইল বলতে পারবে বেনগালের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড সংগতিপূর্ণ ছিল। আমরা এ কথাও বলতে পারব যে, মিসর রকেট বানানোসহ অন্যান্য প্রকল্পে জার্মানির বিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়েছে।
বেন গুরিয়েন কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন এবং অবশেষে বললেন 'সো বি ইট'।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন ও মোসাদ-প্রধান আইসারের সম্পর্কে এই প্রথমবারের মতো চিড় ধরল।
১৯৬৩ সালের ১৫ মার্চ ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল জোকলিক ও বেনগালের গ্রেফতারের সংবাদটি ছাপল। মিসর সরকারের প্রকল্পে কর্মরত জার্মান বিজ্ঞানীর মেয়েকে ভয় দেখানোর কারণে এই গ্রেফতার।
মোসাদ-প্রধান আইসার দৈনিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদকদের নিয়ে গোপন বৈঠক করলেন। সেখানে তিনি জোকলিকের ভূমিকার উল্লেখ করলেন। বললেন, জোকলিক মিসরের প্রজেক্টে কাজ করতেন কিন্তু এখন পক্ষ বদলেছেন। আর সেখানে একটি ধ্বংসযজ্ঞ বাধানোর কাজে জোকলিক লিপ্ত ছিলেন। এখন সেই ক্ষতি পোষাতে স্বেচ্ছায় তিনি ইসরাইলের পক্ষে কাজ করছেন।
এদিকে মোসাদ-প্রধানের সহযোগীরা ইসরাইলের সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে লাগলেন। ইসরাইলের তিন সাংবাদিক বিস্তারিত রিপোর্ট করতে ইউরোপ যান। তারা ইউরোপ থেকে জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট লিখে পাঠাতে থাকেন। মোসাদ গোয়েন্দাদের বিদেশে পাঠিয়ে ইসরাইলিপন্থী সাংবাদিকদের দিয়েও জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়।
মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল ঠিক বুঝতে পারছেন না, জার্মানইস্যু ইসরাইলে কেন এতেঠ স্পর্শকাতর ব্যাপার হয়ে উঠল। জার্মানির প্রতি তার লাগামহীন আক্রমণে ইসরাইলের মানুষ যেন ফুঁসে উঠেছে। ঘরে ঘরে জার্মানির বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রচারণা চলছিল।
এদিকে মার্চের ১৭ তারিখ থেকে ইসরাইল ও বিদেশিদের তুলোধোনা শুরু হল পত্র-পত্রিকায়। পত্রিকায় আরও বলা হল, পশ্চিম জার্মানির এসব বিজ্ঞানীরা সাবেক নাজি। তারা এমন মারণাস্ত্র নেই যা মিসরের হয়ে বানাচ্ছে না। এমনও বলা হল, ঐ বিজ্ঞানীরা ইসরাইলে প্লেগ ছড়িয়ে দেবে। এমন বিষাক্ত বিষ ছাড়বে যা ইসরাইলের বাতাসে নব্বই বছর ধরে বহমান থাকবে। পত্রিকাগুলো এমন লেখাও লিখল যে, হিটলারের পন্থা অবলম্বন করেই জার্মানি নতুন করে ইহুদিনিধনে মেতেছে। জার্মান সরকারকেই এজন্য দায়ী করা হল।
বেনগাল ও জোকলিকের সাজা হল সামান্যই। তাদেরকে দু'মাস করে জেল দেয়া হল। হঠাৎ বিচারক লক্ষ করলেন, একটি লোক আদালতে বন্দুক নিয়ে ঢুকেছে। রেগে গিয়ে বিচারক বললেন, কোনো সাহসে আপনি বন্দুক নিয়ে আদালতে ঢুকেছেন?
বন্দুকধারী বললেন, চব্বিশ ঘণ্টা বন্দুক নিয়ে ঘোরার অনুমতি রয়েছে আমার। মিসরে জার্মান বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার। তিনি তার নাম বললেন, এইচ মান। মান হলেন সেই লোক; বিজ্ঞানীর মেয়ে হেইদি গোয়েরকে যাকে প্রথম ঘটনাটা জানিয়েছিল।
এই মানই জার্মান পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন।
সাদা পোশাকের এক মোসাদ গোয়েন্দা আদালতকক্ষ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পুরো বিষয়টি তার সুপিরিয়ারদের জানাল। আরেক মোসাদ গোয়েন্দা দ্রুত চলে গেল ভিয়েনায়। দেখা গেল নাজিদের এক আততায়ী সিমনের সঙ্গে। সিমন মোসাদকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিল।
মোসাদ গোয়েন্দা সিমনের কাছে জার্মান নাগরিক মানকে চেনেন কিনা জানতে চাইল। সিমন কিছুক্ষণ পর আর্কাইভ থেকে এইচ মানের ফাইলটি নিয়ে এল। জানাল, মান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এসএস অফিসার ছিল। কর্নেল অট্টোর অধীনে সে একটা কমান্ডো বাহিনীতে কাজ করত। এক পর্যায়ে স্করজেনি'র নাম আসে। এই রচনার শুরুতেই স্করজেনি'র উল্লেখ রয়েছে। মোসাদের দু'জন গোয়েন্দা তার কাছেই গিয়েছিল। কেননা স্করজেনি'র পক্ষেই সম্ভব তার অধীনস্থ সাবেক কর্মী মান সম্পর্কে তথ্য প্রদানের। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা স্করজেনি'র স্ত্রীকে প্রথম খুঁজে বের করা হল। মহিলা প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করলেন মোসাদ গোয়েন্দাদের।
মোসাদ স্করজেনিকে তাদের গোয়েন্দা হতে বলল। স্করজেনি মোসাদের লোকদের বললেন, আমি তোমাদের কী করে বিশ্বাস করব? কেননা তোমরা যুদ্ধাপরাধের দায়ে আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছ। এরপর তোমরা যে আমাকে ফাঁসি দেবে না তার নিশ্চয়তা কী।
মোসাদ গোয়েন্দা বললেন, আপনার ভয়ের কোনো কারণ ঘটবে না সে গ্যারান্টি আমরা আপনাকে দিচ্ছি। মোসাদ গোয়েন্দা এক পাতা কাগজ নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের পক্ষে তাকে সফল অপকর্ম থেকে অব্যাহতিপত্র দিলেন এবং তার প্রতি কোনো সহিংস আচরণ করা হবে না বলেও লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেন। স্করজেনি অবশেষে ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে সম্মত হলেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার হাতে খুন হয়েছে অসংখ্য ইহুদি।
কয়েক মাসের মধ্যে স্করজেনি এইচ মানের সহযোগিতায় মিসরে দায়িত্বরত জার্মান বিজ্ঞানীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচরণ এবং মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্পের অগ্রগতির সর্বশেষ খবর মোসাদের হাতে পৌঁছে দিলেন।
এদিকে ইসরাইলে জার্মানবিরোধী প্রচারণা আরও তুঙ্গে উঠল। প্রবন্ধ, প্রতিবেদন কার্টুনের মাধ্যমে বলা হচ্ছিল যে, ১৯৩৩ সালের জার্মানি ১৯৬৩ সালেও বদলায়নি। তখন তারা ৬০ লক্ষ ইহুদিনিধন করেছে। এখন মিসরের মাধ্যমে নতুন করে ইহুদি নিধনে জার্মানরা মত্ত। ইসরাইলের সংসদে মেনাহেম বেগিন কঠোর ভাষায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের সমালোচনা করলেন। গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে মোসাদ-প্রধানের মিত্রতা ছিল। তিনিও সংসদে তারস্বরে বললেন, মিসর যে অস্ত্র বানাচ্ছে তাতে ইসরাইলের নাগরিকসহ সব প্রাণীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
কিন্তু ইসরাইলের আরেকটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আমান মোসাদের ভয়াবহ বিবরণের বিরোধিতা করল। তারা এ-ও বলল, মিসরে যেসব জার্মান বিজ্ঞানী মারণাস্ত্র বানাচ্ছে তারা মাঝারি মানের। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জেনারেল মেই'র অভিমতও অনুরূপ।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের হাতে আমানের রিপোর্টটি পৌঁছলে তিনি মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠান। তিনি হারেলের কাছে তার সংবাদের উৎস জানতে চান এবং প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা চান। মোসাদ-প্রধান ইউরোপে ইসরাইলি সাংবাদিক প্রেরণের কথা স্বীকার করেন এবং মিসরের বিষাক্ত গ্যাস কিম্বা নিকেলের তৈরি বোমা বানানোর ব্যাপারে তার কাছে তথ্য নেই বলে জানান। পরের দিন আমান-প্রধান প্রধানমন্ত্রীকে আরও বলেন, মিসরের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক বটে কিন্তু ইসরাইলি শাসকদের যেভাবে আতঙ্কিত করা হচ্ছে সে রকম কিছু নয়।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন মোসাদ-প্রধান আইসারকে আবার ডেকে পাঠান। এই সময় প্রধানমন্ত্রী ও মোসাদ-প্রধানের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী জার্মানির সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। আইসার এক পর্যায়ে নিজের অফিসে চলে আসেন। নিজের পদত্যাগপত্র লিখে পাঠিয়ে দেন।
বেন গুরিয়েন তার সংস্থা থেকে বের হয়ে না যাওয়ার জন্য আইসারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু আইসার ছিলেন অ্যাডামেন্ট। শেষ হয়ে গেল একটি অধ্যায়ের।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন নতুন কাউকে মোসাদ-প্রধান না করা পর্যন্ত তাকে ঐ পদে থাকতে বললেও আইসার তাতে রাজি হননি। আইসার একজনকে বলেন, বেন গুরিয়েন যেন কাউকে পাঠিয়ে তার কাছ থেকে চাবির গোছা নিয়ে নেন।
বেন গুরিয়েন তার সেক্রেটারিকে আমোসের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। কেননা মোসাদ-প্রধানের পদ তো খালি রাখা যায় না।
কিন্তু সাবাক-প্রধান আমোস তখন বিদেশে, স্বজনদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন।
বেন গুরিয়েন অতঃপর জেনারেল মেইর অমিতকে ডেকে পাঠালেন। তিনি ছিলেন এক অভিযানে। রেডিওবার্তার মাধ্যমে তাকে অবিলম্বে তেলআবিবে আসতে বলা হল। ফিরে এসে তিনি শুনলেন, তাকে মোসাদের উপ-প্রধান করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পরে মেইর অমিতকে মোসাদের প্রধান করা হয়।
জার্মানিতে লেখা পেরেজের চিঠির ফলশ্রুতিতে জার্মান সরকার আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মাধ্যমে মিসরে কর্মরতদের দেশে ফিরিয়ে আনলেন। তাদের জার্মানির বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ দেয়া হল। কয়েকজন নিজের থেকেই মিসর ত্যাগ করলেন। তারা মিসাইল বানানো শেষ না করেই চলে এসেছিলেন।
ড. ওয়েনহারকে নাসা'র ব্লু আইড বয় বলা হয়। জার্মানির বিজ্ঞানীদের তালিকা দেখে তিনি এক লেখককে বলেন যে, উক্ত দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীদের পক্ষে কার্যকর মিসাইল বানানো অসম্ভব।
জার্মান বিজ্ঞানীদের কারণেই আইসার হারেলের পতন হল। এদিকে মেইর অমিত যতদিন মোসাদ-প্রধান ছিলেন ততদিন তাকে আইসার হারেলের কটু ও বিদ্বেষপূর্ণ কথা শুনতে হয়েছে।
জার্মান বিজ্ঞানীদের নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়ায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের রাজনৈতিক কারিশমা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কয়েক মাসের মধ্যে বেন গুরিয়েন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

📘 মোসাদ > 📄 যারা কখনো ভুলবে না

📄 যারা কখনো ভুলবে না


১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে চল্লিশের কাছাকাছি বয়সী বলিষ্ঠ ও সানগ্লাস পরা এক লোক প্যারিস থেকে হল্যান্ডে এসে নামল। অ্যান্টন কুঞ্জলে নামে একটি নামি হোটেলে সে উঠল। পরিচয় দিল অস্ট্রিয় ব্যবসায়ী। ডাকঘরে সে অ্যান্টন কুঞ্জলে নামেই একটা পোস্টবক্স ভাড়া করল। তিন হাজার ডলার জমা দিয়ে ব্যাংকে একটা একাউন্ট খুলল। একই নামে সেই বিজনেস কার্ড বানাল। সেখানে তার পরিচয় একটি লগ্নিকারক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। সেখান থেকে সে গেল ব্রাজিলের কনস্যুলেটে এবং ব্রাজিলে টুরিস্ট হিসেবে যাওয়ার জন্য একটা ফর্ম ফিলাপ করল। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ভাসাভাসাভাবে সে চেকআপ করাল এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট নিল। অতঃপর চোখের ডাক্তার দেখিয়ে মোটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের অর্ডার দিল। চোখের ডাক্তারের কাছে সে মিথ্যা বলেছে এবং ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের তার দরকারও নেই।
পরের দিন সে জুরিখে গিয়ে ৬ হাজার ডলার জমা দিয়ে ক্রেডিট সুইস ব্যাংকে একাউন্ট খুলল। সেখান থেকে প্যারিসে ফিরে এক মেকাপম্যানকে দিয়ে ঝোপঝাপের মতো গোঁফ লাগিয়ে মোটা চশমা পরে পাসপোর্টের জন্য কতগুলো ছবি তুলল। রডেরড্যামে ফিরে ব্রাজিলের কনস্যুলেটে গিয়ে ব্রাজিলের টুরিস্ট ভিসার সিল সে তার অস্ট্রিয়ান পাসপোর্টে লাগাল। এখন সে রিওডি জেনেরিওতে যাওয়ার জন্য প্লেনের টিকেট কিনতে পারবে। সে সাওপাওলো এবং উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতেও যাবে। সে যেখানেই যাবে, ভাষা তার জন্য কোনো সমস্যা নয়। বাকপটুও সে। সর্বত্রই সে তার রমরমা ব্যবসার কথা বলবে। বড় ব্যবসায়ীর ভড়ং ধরতে হয় বিধায় সে সব সময়ই ভালো হোটেল ও ক্যাফেতে গিয়ে থাকে। আর এভাবেই মোসাদ গোয়েন্দা আইজাক সারিদ (প্রকৃত নাম নয়) তার নিজের জন্য একটা ফুলপ্রুফ আদল তৈরি করে নিয়েছে।
মাত্র কয়েকদিন আগে প্যারিসের এক বৈঠকে সারিদকে উপস্থিত থাকতে হয়। মোসাদের কায়েসারা নামের একটি অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটের সে সদস্য। সেখানে বস ইয়ারিব তাকে বিফিং দেয়। ইয়ারিব তাকে বলে, পশ্চিম জর্ডান সরকার পার্লামেন্টে একটা যুদ্ধাপরাধী আইন করতে যাচ্ছে। সেই আইনে যেসব যুদ্ধাপরাধী নাজি আত্মগোপনে রয়েছে তাদেরকে জনসম্মুখে আসার সুযোগ দেয়া হবে। তবে তারা নতুন করে আর অপরাধকর্মে জড়াবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইয়ারিব জানায়, জার্মানি চাইছে অতীত খুঁড়ে আর লাভ নেই। এদিকে ইসরাইল দীর্ঘদিন 'পালিয়ে থাকা নাজি যুদ্ধাপরাধী আইচম্যানকে ধরে ফাঁসি দেয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের ধরার অভিযান অনেকখানি স্তিমিত হয়ে পড়ে। এদিকে ইসরাইলের মনোভাব হল, নাজি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলতে থাকাই বাঞ্ছনীয়। কেননা বিশ্ববাসী দেখুক, অপরাধীদের নিস্তার নেই।
ইয়ারিব এ পর্যায়ে মোসাদ গোয়েন্দা সারিদকে দায়িত্ব দেয় 'রিগার কসাই' নামে খ্যাত লাটভিয়ার এক নাজিকে ধরার জন্য। তার নির্দেশে ত্রিশ হাজার ইহুদি নিধন হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। তাকে সঠিকভাবে চিহ্নিতও করা হয়েছে। সে ব্রাজিলে তার প্রকৃত নাম হারবার্ট কুকুরস নামেই পরিচিত। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত কুকুরসকে পাকড়াও করতে সবুজ সংকেত দিলেন।
ইয়ারিব জানেন, গোয়েন্দা হিসেবে সারিদের দক্ষতার কথা। আইচম্যানকে ধরার অভিযানে সারিদ ছিল। জার্মানিতে জন্ম সারিদের বাবা-মা দু'জনই হলোকাস্টে নিহত। ইয়াবিরের পরামর্শ, সারিদকে বলা হল, তুমি প্রথমে টার্গেটে হারবার্ট কুকুরসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করবে। তারপর অভিযান। আর তোমার নতুন নাম অ্যান্টন কুঞ্জলে।
বিদেশে এককভাবে অভিযান পরিচালনা সারিদের এই প্রথম। ফলে তার টেনশনও ছিল। এদিকে কুকুরস সব সময়ই জানত, একদিন তাকে ধরা পড়তেই হবে। কেননা ত্রিশ হাজার ইহুদিকে হত্যার সঙ্গে সে জড়িত। কুঞ্জলেও ভালো করে জানত সামান্য একটু ভুলে পুরো অভিযানটি ব্যর্থ হতে পারে।
ত্রিশের দশকে কুকুরস ছিল একজন নামি বিমানচালক। ছোট্ট একটি বিমান সে নিজে নিজে বানিয়েছে। এক পর্যায়ে এই তরুণ লাটভিয়ার জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কারও সে পেয়েছে। তাকে লাটভিয়ার ঈগল উপাধি দেয়া হয়েছিল।
রিগা'র যুদ্ধ-যাদুঘরে কুকুরসের একটি বিমান রাখা হয়েছে এবং সেটি বহু লোক দেখতে আসে।
লাটভিয়ার দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী কুকুরসের বহু বন্ধু ইহুদি। সে ফিলিস্তিন সফর করেছে এবং ইহুদিদের নানা ক্ষেত্রে উন্নতি দেখে অভিভূত। ফিলিস্তিনে তার উদ্দীপনামূলক ভাষণ শুনে অনেকেই তাকে লাটভিয়ার ইহুদিদের মিত্র বলে মনে করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া প্রথম লাটভিয়া দখল করে। তখন কুকুরস তাদের গুণগান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু জার্মানি যখন লাটভিয়া দখল করে তখন কুকুরস জার্মানির গুণগানে মত্ত হয়ে পড়ে। ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট সংস্থা থান্ডার ক্রসের সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী হিসেবে কুকুরস নাজিদের সাহায্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসে। পরিণতিতে সবচে নিষ্ঠুর ও স্যাডিস্টিক হত্যাকারীতে সে রূপান্তরিত হয়। এভাবে সে রিগা'র কসাই নামে পরিচিতি পায়। কুকুরস ও তার সৈন্যরা প্রথম যে অপকর্মটি করে তাহল ইহুদিদের একটি ধর্মস্থানে এক সঙ্গে বসবাসরত তিনজন ইহুদিকে পুড়িকে মারা। সে ইহুদিদের গ্রেফতার করে রাইফেলের বাট দিয়ে হত্যা করত। এরপর সে শতাধিক ইহুদিকে গুলি করে হত্যা করে। গোঁড়া ইহুদিরা তার অবমাননা ও হত্যার শিকার হয়। বহু ইহুদি শিশুর মাথা দেয়ালে থেঁতলে সে মেরে ফেলে। এক রাতে ইহুদি বন্দিদের সামনে এক ইহুদি কিশোরীকে সে উলঙ্গ করে। তারপর ইহুদিদের এক বৃদ্ধ পুরোহিতকে বাধ্য করে মেয়েটির শরীর লেহন করতে। এই সময় মদ্যপ লাটভিয়ার সেনারা হাসিতে ফেটে পড়ছিল। গ্রীষ্মকালে কুলদিগা লেকে একসঙ্গে বার শত ইহুদিকে সে ডুবিয়ে মারে। ১৯৪১ সালের নভেম্বরে রিগাতে ত্রিশ হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হয় কুকুরসের নির্দেশে। রুমবুলা ফরেস্টে প্রথমে তাদের নগ্ন করা হয় এবং জার্মান সৈন্যরা ঠাণ্ডা মাথায় তাদের হত্যা করে।
সারিদ কুকুরসের ফাইল ঘেঁটে আরও দেখতে পায় কিছু লোক অবশ্য তার হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল। যাহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে কুকুরস ভুয়া দলিলপত্র নিয়ে তার প্লেন নিয়ে ফ্রান্সে চলে যায়। কৃষক সেজে একটি নৌকায় করে সে রিওডি জেনোরিওতে চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় মিরিয়াম কেইটজার নামের এক ইহুদি নারীর একটি রহস্যজনক ইন্সুরেন্স পলিসি। এই মেয়েটিকে অবশ্যই যুদ্ধের সময় সে বাঁচিয়েছিল। সেই মেয়েটি ব্রাজিলে কুকুরসের গুণগানে ব্যস্ত। মেয়েটিকে সে রিগায় বাঁচিয়েছিল।
রিওতে কুকুরস ব্রাজিলের বহু ইহুদির সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। সর্বত্রই সে মিরিয়ামের গল্পটি বলে থাকে। গল্পটি এরকম: নাজি মিরিয়ামকে লাটভিয়ায় আটক করে। তাকে নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় মেরে ফেলা হত। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেয়েটিকে সে বাঁচিয়েছে ইত্যাদি। একটি ইহুদি মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শহরের সকলে লাটভিয়ার এই নায়ককে প্রভূত শ্রদ্ধা করত। ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও একদিন মদের ঘোরে সে বেফাঁস করে তার অতীত। ইহুদিদের ইউরোপে ব্যাপকভাবে হত্যার কথাও সে স্বীকার করে। কত ইহুদিকে সে পিটিয়ে মেরেছে, পুড়িয়ে মেরেছে, ডুবিয়ে মেরেছে- সবই সে ফাঁস করল। লাটভিয়ার তার ইহুদি বন্ধুরা এতে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা তদন্ত শুরু করল। এর ফলাফল এককথায় লোমহর্ষক।
কুকুরসের প্রকৃত পরিচয় জানাজানি হলে সে গায়েব হয়ে গেল। যদিও সে রিও ছাড়ল না। পাশের একটি শহরে গেল মাত্র। সে যে মিরিয়ামের গল্প বলত এখন তা বন্ধ করে দিয়েছে। মিরিয়াম স্থানীয় এক ইহুদিকে বিয়ে করে ব্রাজিলের সমাজের সাথে মিশে গেল। এদিকে কুকুরস তার স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে আসল।
এভাবে দশ বছর অতিবাহিত হল। একটি এয়ার ট্যাক্সি কোম্পানির শ্রদ্ধাভাজন মালিক হল সে। আবার তাকে রিও শহরে ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা গেলে এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করল। ছাত্ররা কুকুরসের এয়ার ট্যাক্সি অফিসের দরজা-জানালা ভাঙ্গল। কুকুরস রিও ছেড়ে সাওপাওলোতে স্থায়ী হল।
সাও পাওলোতে কুকুরসের ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকত। নতুন কাউকে দেখলেই অজানা আশংকায় সে ভীত হয়ে পড়ত। ১৯৬০ সালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আইচম্যানের ফাঁসি হলে সে সাওপাওলো পুলিশের কাছে গিয়ে নিরাপত্তা চাইল। পুলিশ তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও সে নিউজটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হল। কুকুরসের দ্বারা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের জানতে বাকি রইল না সে কোথায় আছে।
বছর যত যায়, কুকুরসের ভয় তত বাড়ে। সে তার স্ত্রী ও ছেলেদের বলে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ইহুদিরা ঠিকই একদিন তাকে খুঁজে বের করবে এবং তাকে হত্যা করবে। তাকে যারা হত্যা করতে পারে তারও একটা তালিকা সে করল। এই তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম সিনেটর আহারোন স্টেইনব্রাক, ড. আলফ্রেড গাটেনবার্গ প্রমুখ।
কুকুরস তার প্রকৃত নাম না বদলালেও বাড়িটি বানাল দুর্গের মতো করে। সব দিক থেকেই বাড়িটি ছিল সুরক্ষিত। বেশ কয়েকটি ব্যবসা শুরু করলেও সেগুলো জমেনি। কুঞ্জলে তার সম্পর্কে সর্বশেষ যেসব তথ্য নথিভুক্ত করেছে তার মধ্যে রয়েছে- তার সর্বশেষ ঠিকানা হল সাও পালের বাইরে একটি কৃত্রিম লেক মেরিনায়। সে কয়েকটি বোট ভাড়া দিত। তাছাড়া তার যে সি প্লেনটি ছিল তাতে সে পর্যটকদের উঠিয়ে শহর ঘুরে দেখাত।
কুঞ্জলে ভালো করেই জানত, যদি সে সরাসরি কুকুরসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাহলে তার ফলাফল ভালো না-ও হতে পারে। সে কয়েকদিন রিও শহরে কাটাল। কুঞ্জলে এই শহরে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে চায় বলে নিজেই কয়েকজন লগ্নিকারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। ঘুরে-ফিরে সে কম দেখল না। দেখল সাম্বা নৃত্যও। সাও পাওলো'র পর্যটন ব্যবসা যারা ম্যাটার করে তাদের সঙ্গে রিকোমেন্ডেশন চিঠিসহ সে সাক্ষাৎ করল।
সাওপাওলোতে ঢুকেই সে কুকুরসের ম্যারিনা প্রথমে খুঁজে বের করল। জেটির সাথে বাঁধা আনন্দবিহারের বোটগুলোর সাথেই ছিল তার পুরানো সি প্লেনটি। সেখানেই কৃশকায় হারবার্টস কুকুরসকে সে দেখতে পেল। গায়ে পাইলটের পোশাক।
বোটের টিকেট বিক্রি করছিল একটি জার্মান মেয়ে। কুঞ্জলে মেয়েটিকে স্থানীয় পর্যটন শিল্প সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে তার অপরাগতা প্রকাশ করে। তবে পাশে দাঁড়ানো একটি লোককে দেখিয়ে দেয়। সেই লোকটিই কুকুরস। আর মেয়েটি তার বড় ছেলের স্ত্রী।
কুঞ্জলে কুকুরসের কাছে নিজেকে একজন অস্ট্রিয়ান লগ্নিকারক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পেশাগত কিছু প্রশ্ন করলে সে তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু প্লেনে চড়ে শহর ঘুরে দেখার কথা বললে সে নড়ে-চড়ে বসে। কুঞ্জলে জানে কী করে মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়। প্লেনে করে আকাশ চক্কর দেয়ার সময় তারা দু'জন বন্ধুতে পরিণত হয়। ফেরার সময় কুকুরস কুঞ্জলেকে বোটে নিয়ে যায় এবং ব্রান্ডি খাওয়ায়।
ব্রান্ডি খাওয়ার সময় কুকুরস হঠাৎ করেই উত্তেজিত হয়ে বলে, আমাকে যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে। অথচ আমি যুদ্ধের সময় ইহুদি বালিকাকে রক্ষা করেছি।
কুকুরসের প্রশ্নের জবাবে কুঞ্জলে জানায় সে-ও রাশিয়ান ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছে। কুঞ্জলে তার শার্টের বোতাম খুলে কুকুরসকে যুদ্ধকালীন একটা ক্ষতচিহ্নও দেখায়।
কুঞ্জলে কুকুরসের বর্তমান অবস্থা পরিমাপের চেষ্টা করে। সে বুঝে নেয় কুকুরসের আর্থিক অবস্থা এখন ভালো নয়। তার বোট ও প্লেন দুটোই জরাজীর্ণ। কুঞ্জলে তাকে এমন ধারণা দেয় যে, তার সঙ্গে থাকা মানে অবস্থাটা ফিরল বলে। অতঃপর কুঞ্জলে তার কোম্পানি ও পর্যটন নিয়ে আলোচনা করে এবং ল্যাটিন আমেরিকায় প্রচুর লগ্নি করার কথা বলে। কুকুরসকে তার কোম্পানিতে যোগদানেরও আভাস দেয়। কুকুরস তার মেহমানের ব্যাপারে আগ্রহান্বিত হওয়ামাত্র কুঞ্জলে তাড়াতাড়ি সটকে পড়ে। লোভে পড়ে কুকুরস কুঞ্জলেকে তার বাসায় দাওয়াত দেয় এবং সেখানে ব্যবসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানায়।
ঐ দিন রাতেই কুঞ্জলে ইয়াবিরকে সাংকেতিক ভাষায় একটি টেলিগ্রাম পাঠায়। ইয়াবির কুকুরসের অভিযানের নাম দিয়েছিল 'দ্যা ডিসিসড'।
কুকুরসও এদিন ডাইরি লেখে। সেখানে সে তার চরম শত্রুদের নামের তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত করে। নামটি হল অ্যান্টন কুঞ্জলে।
এক সপ্তাহ পরে কুকুরসের দুর্গ আকারের সুরক্ষিত বাড়িতে যায় কুঞ্জলে। বাড়িটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং বিদ্যুতের তার লাগানো। সুরক্ষিত বাড়ির গেটে এক তরুণ এবং একটি হিংস্র কুকুর রয়েছে। তরুণটি তার ছেলে।
কুকুরস কুঞ্জলেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং বাড়িটি ঘুরে দেখায়, স্ত্রী মিল্ডার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যুদ্ধের সময় পাওয়া পনেরটি পদক দেখায় যার উপর নাজিদের স্বস্তিকা প্রতীক ছিল। কুকুরস আরেকটি ড্রয়ার খুলে কুঞ্জলেকে তার ব্যক্তিগত অস্ত্রগুলো দেখায়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি হেভি রিভলবার ও একটি সেমি অটোমেটিক রাইফেল। কুকুরস গর্ব করে বলে, ব্রাজিলের গোয়েন্দা বাহিনী এসব অস্ত্র ব্যবহারে তাকে অনুমতি দিয়েছে। সে বেশ গর্বের সঙ্গে আরও বলে, কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয় তা তার জানা। কুঞ্জলের বুঝতে বাকি থাকে না, এসব তাকে ভয় দেখানোর ইংগিত। সে বোঝাতে চায়, আমি একজন সশস্ত্র মানুষ এবং ভয়ংকর।
হঠাৎ করেই কুকুরস কুঞ্জলেকে তার তিনটি খামার দেখতে এবং সেখানে একটি রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানায়।
কুঞ্জলে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু হোটেলে ফেরার পথে সে একটা স্বয়ংক্রিয় চাকু- যার ফলা সুইচ টিপলেই বেরিয়ে যায় তা কিনতে ভোলেনি। কয়েকদিনের মাথায় তারা দু'জন কুঞ্জলের ভাড়া করা গাড়িতে পাহাড়ের দিকে বেড়াতে যায়।
কুঞ্জলের জন্য এই ভ্রমণটা ছিল টেনশন ও অস্বস্তির। কুকুরসের কাছে রয়েছে অস্ত্র আর তার কাছে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় একটা চাকু। কুঞ্জলে অবশ্য কুকুরসকে ইজি মানির লোভ দেখিয়ে তাকে হত্যার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে তার গাড়িতে পাশে বসা কুকুরস বলিষ্ঠ কিন্তু দরিদ্র। আবার সহযাত্রীকে তার ব্যাপক সন্দেহ। সাথে ব্যাগভর্তি অস্ত্র।
কুঞ্জলের মনে হল বিড়াল-ইঁদুরের এই খেলায় সে ভিকটিম হবে। পর্যটনশিল্প নিয়ে যে গল্প করছে কুকুরস তা বিশ্বাস করেনি। তাকে বরং পাহাড়ের দিকে নিয়ে মেরে ফেলবে।
ওরা একটা অবহেলিত খামারে ঢুকল। এখানে কুকুরস হঠাৎ করেই রিভলবার ও সেমি অটোমেটিক রাইফেলটি বের করল। কুঞ্জলে ভাবল, দুটি অস্ত্র সে এক সঙ্গে বের করছে কেন।
আসলে কুকুরস গুলিচালনার একটা প্রতিযোগিতা শুরু করল। কুঞ্জলে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছে তার একটা পরীক্ষা। সে গাছে একটা কাগজ ঝুলিয়ে রাইফেল বের করে পরপর দশটা গুলি করল। ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে এবার কুঞ্জলেকে রাইফেল দিল। ব্রিটিশ ও ইসরাইলি আর্মির চৌকষ অফিসার কুঞ্জলে রাইফেল উঁচিয়ে পরপর দশটা গুলি করে কুকুরসের চেয়েও ভালো ফল দেখাল। কুকুরস ভূয়সী প্রশংসা করল কুঞ্জলের।
ওরা দ্বিতীয় দিন বিশালাকায় আরেকটি খামারে গেল। এখানে রয়েছে গভীর অরণ্য ও নদী। কুমিরগুলো এখানে অলস সময় কাটায়। কুকুরস যত এগিয়ে যাচ্ছে কুঞ্জলে ভাবছে সে একটা ফাঁদে পড়ছে। কোনো প্রমাণ না রেখেই কুকুরস এখানে তাকে নিশ্চয়ই গুলি করে মেরে ফেলবে।
হাঁটতে গিয়ে কুঞ্জলের পায়ের একটি নখ থেঁতলে গেলে সে তার জুতা খুলে ফেলে। বেশ রক্ত বেরুচ্ছিল। কুঞ্জলে এক পর্যায়ে ভাবল, এই হল তার অন্তিম সময়। লাটভিয়ার কুকুরস তাকে কুকুরের মতো মেরে ফেলবে। যদিও কুকুরসও কুঞ্জলেকে একবার তার বন্দুক দিয়েছিল। কিন্তু জায়গাটা এমন—মাইলখানেকের মধ্যে কোনো লোকের অস্তিত্ব নেই। এদিকে কুঞ্জলের হাতের রাইফেলে গুলি ভরা। সে এই মুহূর্তে কুকুরসকে শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু তার পরিবর্তে কুঞ্জলে তার ক্ষতবিক্ষত নখটি ভালো করে ব্যান্ডেজ করল এবং রাইফেলটি তার মালিককে ফেরত দিল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা দু'জন একটি অস্থায়ী হাটে উপস্থিত হল এবং সঙ্গে থাকা খাবার খেল। পুরনো দুটি লোহার খাটে তারা স্লিপিংব্যাগ পাতল। কুঞ্জলে দেখল, কুকুরস তার বালিশের নিচে অস্ত্রগুলো রেখে ঘুমাল। অমঙ্গলের আশংকায় কুঞ্জলে তার সঙ্গে থাকা চাকুটা পকেট থেকে বের করে প্রস্তুত করে রাখল। কিন্তু ঘুম আর তার আসল না।
মধ্যরাতে কুঞ্জলে কুকুরসের বিছানার দিকে একটা শব্দ শুনল। নাজি নেতা বন্দুকসহ নিচে নামল। কেন নামল? কুঞ্জলে বোঝার চেষ্টা করল বাইরের শব্দের। সে বুঝতে পারল কুকুরসই প্রস্রাব করছে। অবশ্য বাইরে চুপিসারে ঘুরে বেড়ানো জন্তুর শব্দও কুঞ্জলে শুনতে পেয়েছিল। পরের দিন তারা নিরাপদে সাওপাওলো ফিরল। কুঞ্জলে হোটেলে ওঠার পর কিছুটা স্বস্তি বোধ করল।
কুঞ্জলে অতঃপর কুকুরসকে নামি-দামি হোটেলে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে শুরু করল। দামি নাইটক্লাব, বার, সব কিছুই তার জন্য উন্মুক্ত। কুঞ্জলে অনুভব করল, গরিব হয়ে পড়ার কারণে কুকুরস কতদিন এরকম ভালো ভালো খাবার খায়নি। কুঞ্জলে অভ্যন্তরীণ রুটে কুকুরসকে নিয়ে বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরল। তারা কয়েকটি সেরা পর্যটনস্পটে গেল। কুকুরস কুঞ্জলের টাকায় কয়েকদিন ভালো হোটেলে থাকল এবং উপাদেয় সব খাবার খেল।
কুঞ্জলে এবার তাকে নিয়ে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিও যেতে চাইল। সে বলল, তার পার্টনাররা সেখানে বিশাল পর্যটন এলাকা গড়তে চায়। কুঞ্জলের টাকায় কুকুরসের পাসপোর্ট তৈরি হল। কুঞ্জলে মন্টেভিডিও যাওয়ার কয়েকদিন পর কুকুরস সেখানে গেল। যদিও এই লাটভিয়াবাসীর সন্দেহ ও ভয় কাটেনি। মন্টেভিডিও বিমানবন্দরে কুকুরস কুঞ্জলের বেশ কয়েকটি ছবি তুলে ফেলল। কুঞ্জলের সঙ্গে যারা ছিল প্রত্যেকেই সে তার হত্যাকারী বলে সন্দেহ করল।
কুঞ্জলে বেশ বড় গাড়ি ভাড়া করল এবং ওখানকার সবচে দামি হোটেলে রুম ভাড়া করল। কোম্পানির সদর দফতর এখানে বানানোর জন্য তারা কয়েকটি অফিসও দেখাল। কুকুরসকে এখানেও জবরদস্ত খাওয়া, ক্যাসিনো, সাইট সিয়িং করানো হল। অর্থাৎ বন্ধুর মন জয়ের জন্য সবই করল কুঞ্জলে। ওদিকে কুকুরস খুব খুশি। অবশেষে কুঞ্জলে তার বন্ধুকে ছেড়ে কয়েক মাসের জন্য ইউরোপের পথে পাড়ি জমাল। কুকুরস সাওপাওলোতে ফিরে গিয়ে তার স্ত্রীকে বলল, কিছু লোক তাকে ফলো করেছে মন্টেভিডিওতে। ফলে তাকে আরও সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।
প্যারিসে কুঞ্জলে আবার ইয়ারিব ও তার সহকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তারা অবিলম্বে কুকুরসকে পাকড়াও করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত হয় কুকুরসকে মন্টেভিডিওতে হত্যা করা হবে। ব্রাজিলে নয়। কেননা ব্রাজিলে সেখানকার পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেয়। ফলে সেখানে সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত ব্রাজিলের ইহুদিরা নব্য নাজি কিম্বা যেসব জার্মানি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া তাদের কোপানলে পড়তে পারে। তৃতীয়ত ব্রাজিলে মৃত্যুদণ্ড বিদ্যমান। মোসাদ গোয়েন্দাদের কেউ যদি গ্রেফতার হয় এবং তার বিচার হয় তাহলে নিশ্চিত ফাঁসি।
আততায়ীদের টিমে দলনেতা ইয়ারিবসহ পাঁচজন মোসাদ গোয়েন্দা অন্তর্ভুক্ত হয়। এদের মধ্যে একজন মোসাদ-প্রধান মেইর অমিতের চাচাতো ভাই; নাম জিভ অমিত। আর কুঞ্জলেসহ আরও দু'জন।
১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টিমটি মন্টিভিডিওতে এসে উপস্থিত হয়। গোয়েন্দা অসওয়াল্ড একটি গাড়ি ও বাড়ি ভাড়া করে। শেষ মুহূর্তে ইয়ারিব পরিকল্পনা কিছুটা পরিবর্তন করে একটি ট্রাঙ্কও কিনতে বলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে ধরনের ট্রাঙ্ক প্রচলিত ছিল, সেই ধরনের। নাজি নেতা কুকুরসের লাশ ঐ ট্রাঙ্কে সাময়িকভাবে রাখার জন্য এই ব্যবস্থা।
কুঞ্জলে কুকুরসকে আবার মন্টিভিডিওতে আমন্ত্রণ জানায়।
১৯৬৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুকুরস ব্রাজিলে পুলিশের সদর দফতরে গিয়ে জানায় যে, সে একজন ব্যবসায়ী। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি ব্রাজিল পুলিশের নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছি। আর আমার জীবনের ওপর ঝুঁকি থাকার অনেক কারণ বিদ্যমান। এখন ইউরোপের এক ব্যবসায়িক অংশীদার আমাকে মন্টিভিডিও যেতে বলছে। এখন আপনারা কি মনে করেন আমার কি উরুগুয়ে সফর করা উচিত? এই সফর কি ঝুঁকিপূর্ণ হবে?
ব্রাজিল পুলিশের কর্মকর্তা ফিলাহো তাকে যেতে নিষেধ করেন। বলেন, আমরা এখানে আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি বিধায় আপনি শান্তিতে ও নিরাপদে রয়েছেন। যে মুহূর্তে আপনি ব্রাজিল ছাড়বেন আপনার কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। কুকুরস মুহূর্তকাল ভাবল। তারপর বলল, আমি সব সময় একজন সাহসী মানুষ। আমি ভয় পাই না। আমি জানি নিজেকে কিভাবে রক্ষা করতে হয়। আমি সব সময়ই অস্ত্র বহন করি। আজ এতদিন পরও আমি বলব যে, আমার টার্গেট লক্ষ্যভেদী।
২৩ ফেব্রুয়ারি কুকুরসের সঙ্গে মন্টিভিডিওতে সাক্ষাৎ করে কুঞ্জলে। ফাঁদ পাতা সম্পন্ন। কুঞ্জলে একটি ভাড়া গাড়িতে করে কাসা কুবারতিনির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে হিট টিম অপেক্ষমান। কুঞ্জলে পথে বেশ কয়েকটি বাড়ি তাদের অফিসের জন্য উপযুক্ত কীনা তা খতিয়ে দেখে। এদিকে ঘটনাস্থলে গাড়ি থেকে নেমে একটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় কুঞ্জলে। তাকে অনুসরণ করে কুকুরস। কুঞ্জলে অন্ধকার বাড়ির একটি ঘরে ঢুকে দেখতে পায় শুধুমাত্র জাঙ্গিয়া পরে হিট টিমের সদস্যরা দেয়ালের সঙ্গে লেপটে আছে। তারা ভালো করেই জানে, কুকুরসের সঙ্গে তাদের সিরিয়স ও রক্তাক্ত একটা লড়াই অনিবার্য। ফলে গায়ে রক্ত লেগে যেতে পারে। একারণেই জাঙ্গিয়া।
কুকুরস বাড়িতে ঢুকতেই কুঞ্জলে দরজা বন্ধ করে দেয়। তিন খুনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জিভ অমিত কুকুরসের টুটি চেপে ধরে। এই প্রশিক্ষণ তাকে প্যারিসে দেয়া হয়েছে। অন্যরা দুই পাশ দিয়ে তাকে জাপটে ধরে।
লাটভিয়ার নাগরিক কুকুরস ভালোই লড়াই করে। আক্রমণকারীদের ঝাঁকুনি দিয়ে সরিয়ে সে দরজার দিকে এগুতে থাকে। দরজার হ্যান্ডেলটা সে ঝাকি মেরে খোলার চেষ্টা করে। অতঃপর তার পকেটে রাখা একটি অস্ত্র বের করে জার্মান ভাষায় চিৎকার করে বলে, আমাকে কথা বলতে দাও। লড়াইকালে কুকুরস যাতে চিৎকার করতে না পারে সে জন্য ইয়ারিব তার মুখটা চেপে ধরে। কুকুরস ইয়ারিবের আঙ্গুলগুলো এমনভাবে কামড়ে ধরে সেগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। সে ব্যথায় ককিয়ে উঠে। ঐ সময় অমিত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিশাল একটা হাতুড়ি দিয়ে সজোরে কুকুরসের মাথায় আঘাত করে। রক্তের ধারা বইতে শুরু করে ক্ষতস্থান থেকে। আক্রমণকারী ও ভিকটিম মেঝেতে বেদম লড়াইয়ে লিপ্ত হয় এবং তখনো কুকুরস তার অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। পুরো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। ইতিমধ্যে মোসাদ গোয়েন্দা আরিয়ে কুকুরসের মাথা লক্ষ্য করে দু'রাউন্ড গুলি করে। তার অস্ত্রে সাইলেন্সার লাগানো ছিল। ফলে আশপাশের লোকজন শব্দ শুনতে পায়নি।
কুকুরস নিস্তেজ হয়ে পড়ে যায়। তার রক্তে ঘরের মেঝে, টাইলস ভরে যায়। আততায়ীদের শরীরেও রক্ত লেগে যায়। অভিযানের বেশ পরে হিট টিমের এক সদস্য জানায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল কুকুরসকে জীবিত পাকড়াও করা। হত্যা নয়। কিন্তু তার শরীরে এতই জোর তাকে হত্যা না করে উপায় ছিল না। তাকে হত্যার বিষয়টি অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় ছিল। জীবিত ধরতে পারলে কোর্ট মার্শাল করে তাকে শাস্তি দেয়া যেত।
মোসাদ এজেন্টরা কুকুরসের লাশ ট্রাঙ্কে ভরে। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। পুলিশ যেন বুঝতে পারে আক্রমণকারীরা তাকে অপহরণ করে উরুগুয়ের বাইরে নেয়ার জন্য ট্রাঙ্ক নিয়ে এসেছিল। খুনিরা লাশের সাথে ইংরেজিতে টাইপ করা একটি নোটও রেখে যায়। ঐ নোটে লেখা ছিল, কুকুরসের অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। ত্রিশ হাজার ইহুদি নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যার সঙ্গে সে জড়িত। এই অপরাধীকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল। নিচে উল্লেখ করা হল, যে ঘটনা কখনো ভোলার নয়, যে মানুষেরাই হন্তারক।
ঘাতকরা ঐ ভবন ত্যাগ করে চলে যায়। ইয়ারি তার মৃত্যু পর্যন্ত হাতের ব্যথায় ভুগেছেন। সারা জীবন তিনি একটি আঙ্গুল যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারেননি। কুঞ্জলে এবং টাউসিগা গাড়িতে করে হোটেলে আসে এবং হোটেল ত্যাগ করে। পুরো টিমই মন্টেভিডিও ত্যাগ করে এবং জটিল পথে ইউরোপ হয়ে ইসরাইলে পৌঁছায়। হিট টিমের লোকজন ল্যাটিন আমেরিকা ত্যাগের পর এক মোসাদ গোয়েন্দা জার্মানিতে সংবাদ সংস্থাকে এক নাজি অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের কথা প্রকাশ করে।
রিপোর্টাররা প্রথম দিকে এই খবর খারিজ করে দেয়। তাদের ধারণা ছিল এ এক কৌতুক। মোসাদ এজেন্ট অবশেষে কুকুরসের ব্যাপারে বিস্তারিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য একটি বার্তা সংস্থাকে দেয়। মন্টেভিডিও'র এক রিপোর্টারকেও নিউজটি দেয়া হয়। সে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে। কুকুরস নিহত হওয়ার দশদিন পর অকুস্থল থেকে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।
পরের দিন বিশ্বজুড়ে কুকুরসের মৃত্যুর খবর হেডলাইন হিসেবে ছাপা হয়। অ্যান্টন কুঞ্জলে ও অসওয়ার্ল্ডের নাম খুনি হিসেবে প্রকাশ পায়। কয়েকদিন পর রিওতে একটি সাপ্তাহিকী কুঞ্জলের অসংখ্য ছবি প্রকাশ করে। কুকুরস এই ছবিগুলো তুলেছিল। ইসরাইলের একটি পত্রিকা ঐ ছবি থেকে কুঞ্জলের একটি ছবি প্রকাশ করলে তারা বন্ধুরা কুঞ্জলের সংযুক্তির কথা জানতে পারে।
কয়েকদিন পর কুকুরসের বাড়িতে একটা চিঠি আসে। এটি কুঞ্জলের লেখা বলেই অধিকাংশের অভিমত।
চিঠিতে আমার প্রিয় হারবার্টাশ কুকুরস বলে সম্বোধন করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ঈশ্বরের সাহায্য ও কতিপয় স্বদেশবাসীর সহযোগিতায় আমি নিরাপদে চিলি এসে পৌছেছি। দীর্ঘ সফর শেষে আমি কিছুটা পরিশ্রান্ত। আমি নিশ্চিত আপনিও শীঘ্র দেশে ফিরে যাবেন। যা হোক, আমার ধারণা, একজন পুরুষ ও একজন নারী আমাদের দু'জনকে ফলো করত। সেক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি আপনাকে বরাবরই বলেছি, স্বনামে কাজ করা এবং সফর করা আপনার জন্য একটা বিরাট ঝুঁকি। এটা আমাদের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
যাহোক আমি মনে করি, উরুগুয়ের জটিল ঘটনাবলি আপনার ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় হবে। সেজন্য আপনাকে এখন থেকেই দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। যদি আপনার বাড়ির কাছাকাছি সন্দেহজনক কিছু ধারণা করেন তাহলে এবারও আমার পরামর্শ হল আত্মগোপন করুন। ভেন লীডের কথা মনে করুন। এই নারী নেতা কায়রোতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। জার্মানি থেকে চলে যাওয়া একটি গ্রুপের সঙ্গে ছিলেন। এ্যামনেস্টির বিষয়টি সুরাহা পর্যন্ত এক-দুই বছর তারা আত্মগোপনে ছিল। আপনি এই চিঠি পাওয়ার পর চিলির শান্তিয়াগোর ঠিকানায় আমাকে উত্তর দেবেন। ইতি অ্যান্টন কুঞ্জলে। কুঞ্জলে তার গোয়েন্দা পরিচয় ঢাকার জন্য এই চিঠি লিখলেও সকলেই বুঝল যে, চিঠির প্রেরক কুঞ্জলেই। কুকুরসের স্ত্রী মিলদারের এক কথা- কুঞ্জলেই তার স্বামীর হত্যাকারী।
কুকুরসের হত্যাকারীদের কেউ বেঁচে নেই। জিভ অমিত মারা যায় ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে- ১৯৭৩ সালে। কুকুরস হত্যাকাণ্ডের এই মিশন সফল হয়েছিল। জার্মানি ও অস্ট্রিয়া নাজি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতার বাইরে রাখার জন্য যে আইন করতে চেয়েছিল তা তারা বাতিল করে।
কয়েক বছর পরে সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল এই গ্রন্থের এক লেখককে বলেন যে, তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাক্ষাৎপ্রত্যাশী। হারেল বিস্তারিত কিছু বলেননি। শুধুমাত্র তেলআবিবের একটা ঠিকানা দিলেন। এই গ্রন্থের লেখক সেই ঠিকানায় গিয়ে টেকো মাথার বলিষ্ঠ এক লোকের সন্ধান পায়।
সেই ব্যক্তিই কুঞ্জলে। অ্যান্টন কুঞ্জলে।

📘 মোসাদ > 📄 রানি মারিয়ামের দেশে

📄 রানি মারিয়ামের দেশে


সাদা কাপড় পরা কালো চামড়ার ইথিওপীয় শিশুরা জেরুজালেমের বিশাল এক সমাবেশের মঞ্চে গান গাইতে এসেছে। শিশুদের চোখে-মুখে ব্যাপক কৌতূহল এবং গর্ব। ইসরাইলের বিশিষ্ট সুরকার শ্লোমো গ্রোনিচ পিয়ানো হাতে মঞ্চে উপস্থিত। প্রায় ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকা দর্শক শিশুদের সমবেত সংগীতের কয়েক চরণ শুনেই উজ্জীবিত। শিশুদের গানটি এরকম: চাঁদ আমাদের দেখছে। আমার পিঠের ব্যাগে রয়েছে খাবার। আমার মা আমার ছোট ভাইদের পা চালিয়ে যেতে বলছে। বলছে, আর একটু আগাও। আরেকটু। এরপরই জেরুজালেম।
কবি হেইম ইদিসিসেরজার্নি সংশীর্ষক এই গানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জেরুজালেমে আসার বর্ণনা রয়েছে। গানটি শুনে দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিতে লাগল। ইথিওপিয়ায় বসবাসরত ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে আনতে যে ধকল গেছে, যা ছিল মিশন ইমপসিবল- সেকথা মনে করে শ্রোতা-দর্শক ছিল উত্তাল। আর গানটির বিশেষত্বও তাই। অন্যকিছু নয়।
সমবেত সংগীতের বাণীতে আরও ছিল: আমাদের খাবারের ব্যাগ গেল হারিয়ে। রাতে ডাকাতরা আমাদের আক্রমণ করল। তারা ছিল চাকু ও শানিত অস্ত্রসহ। বিশালাকায় মরুভূমিতে তারা আমার মাকে হত্যা করল। চাঁদ এর একমাত্র সাক্ষী। আমি আমার ছোট ভাইদের বললাম, আরেকটু পা চালাও। আরেকটু পা চালাও। এরপরই পূরণ হবে স্বপ্ন। সহসাই আমরা ইসরাইলের নাগাল পেয়ে যাব।
ইসরাইল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে এনেছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। বহু ফিলিস্তীনীকে হত্যা করেছে। সেই হত্যাকাণ্ড আজও অব্যাহত। তবে ইথিওপিয়া থেকে ইহুদি উপজাতিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে তাদের অভিযান ছিল খুবই সংকটাপন্ন ও ঝুঁকিবহুল।
সেই ঘটনা জীবন্ত কিম্বদন্তি হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় বসবাসরত এই ইহুদি উপজাতিরা সারা বিশ্ব থেকে ছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তারা ইথিওপিয়ার বিভিন্ন পাহাড় ও উপত্যকায় বসবাস করত। আর দেশটি রানি শেবার নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে এই উপজাতি ইহুদিদের বিশেষত্ব হল হাজার বছর ধরে তারা বাইবেলে বর্ণিত উল্লেখিত ধর্মকে অদম্য মনোযোগের সঙ্গে অবিকৃতভাবে ঐ বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছিল।
এই শান্ত ও লাজুক ইহুদিরা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়েই গিয়েছিল। তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা বেসিম ঢোলা সাদা গাউন পরিধান করত। জায়নবাদের প্রাচীনতম নিয়মনীতি অনুসরণ করত। একই সাথে আধুনিক জীবনের নিয়মনীতিও মেনে চলত। তারা বরাবরই শান্তিপ্রিয় ছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখত। এর পাশাপাশি দীর্ঘকাল তারা নিষ্ঠুর শাসনের হাতে ব্যাপকভাবে নিগৃহীতও হয়েছে। তবে ওদের জন্য দুঃখের বিষয় ছিল ইহুদিদের ধর্মীয় নেতা রাব্বি ও আধ্যাত্মিক নেতারা। বিশ্বব্যাপী তারা প্রচার করত যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা ফালাসা নামে পরিচিত- তারা প্রকৃত অর্থে ইহুদি নয়।
ইথিওপীয় ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়া সত্ত্বেও মনোবল হারায়নি। যুগ যুগ ধরে তারা জায়নবাদীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে আসছিল। বাবা থেকে ছেলে, মা থেকে মেয়ে ইহুদিবাদে অবিচল থেকে তারা একদিন তাদের কথায় পবিত্র ভূমি ইসরাইলে চলে আসার স্বপ্ন দেখত।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে প্রায় ত্রিশ বছর ইথিওপিয়া থেকে বেশ কিছু ইহুদি ইসরাইলে সমর্থ হয়েছিল। সম্রাট হাইলে সেলাসি ছিলেন ইসরাইলের বিশেষ মিত্র ও সুহৃদ। তার সময়ে সুযোগ থাকলেও ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তেমন কোনো প্রয়াস চালানো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে। ঐ সময় ইসলাইলের প্রধান রাব্বি বা ধর্মীয় নেতা ওভাদিয়া ইয়োসেফ এক দ্ব্যর্থহীন রুলিংয়ে বলেন যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যারা নিজেদেরকে বেটা ইসরাইল বলে পরিচয় দেয় তারা পরিপূর্ণভাবেই ইহুদি। মূলত: এরপর থেকে তাদের ইসরাইলে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়। দু'বছর পর ইসরাইল ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইন পাস করে। অতঃপর ১৯৭৭ সালে মোনাচেম বেগিন প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি এ কাজে মোসাদ-প্রধান জেনারেল আইজাক (হাকা) হোফিকে ডেকে পাঠান। বেগিন মোসাদ-প্রধানকে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।
মোসাদের অবকাঠামোতে বিটজুর নামে একটা বিশেষ ইউনিট রয়েছে। বহু দেশের ইহুদিদের নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ এই ইউনিটের ওপর ন্যস্ত। বিটজুরের নাম পরিবর্তিত হয়ে রাফরিরিম করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বেগিনের নির্দেশ পেয়ে মোসাদ-প্রধান হাসা ডেভিড কিমহিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় পাঠান। কিমহি মোসাদের সহকারী পরিচালক এবং টেভেল নামে একটি গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়াদি গোপনে দেখভাল করে। সে ইথিওপিয়ার শাসক মেনগিন্তু হাইলে মারিয়ামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ঐ সময় ইহুদি দেশত্যাগীদের জন্য ইথিওপিয়ার দরজা বন্ধ ছিল। একই সাথে গৃহযুদ্ধের তাণ্ডবে ইথিওপিয়ায় তখন ব্যাপক বিশৃঙ্খলা চলছিল। মারিয়াম বিদ্রোহীদের দমনে ইসরাইলের সহায়তা চাইলেন। কিমহি বিদ্রোহীদের দমনে হাইলে মারিয়ামের প্রস্তাবে না বললেও অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে সম্মত হন। তবে সিদ্ধান্ত হয় হাইলে মারিয়াম ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশত্যাগে বাধা দেবেন না।
আরও সিদ্ধান্ত হয়, হারকিউলিস বিমানে করে ইসরাইল থেকে ইথিওপিয়ায় অস্ত্রশস্ত্র যাবে। ঐ বিমানেই ইহুদিরা ইসরাইলে ফিরে আসবে। উল্লেখ্য, সেভাবেই ছয় মাস কাজ চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে দায়ান একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেন। একটি সুইস পত্রিকায় মোশে দায়ান ভুল করে বলে ফেলেন যে, হাইলে মারিয়ামের সেনাবাহিনীতে ইসরাইল অস্ত্র সরবরাহ করছে। অনেকের মতে মোশে দায়ানের ঐ উক্তি ভুলবশত ছিল না, ছিল উদ্দেশ্যমূলক। কেননা সোভিয়েত সমর্থিত হাইলে মারিয়ামের সরকারকে অস্ত্র প্রদান তার মনঃপূত ছিল না।
হাইলে মারিয়াম মোশে দায়ানের মন্তব্যে অতিশয় ক্রুব্ধ হন। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মারিয়াম জনসমক্ষে ফোকাসের বিরুদ্ধে ছিলেন। এর ফলে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের সরাসরি ইসরাইলে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যদিও মোসাদ-প্রধান হাকার প্রতি বেগিনের নির্দেশ বহাল ছিল।
ইথিয়পিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় আরেকবার। এদিকে ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী দেশ সুদানের রাজধানী খার্তুম থেকে মোসাদ সদর দফতরে একটি চিঠি এসে পৌছায়। এই চিঠিতে ইথিওপিয়া থেকে বিকল্প একটি রুট দিয়ে ইহুদিদের পালানোর পরিকল্পনার বিবরণ দিল। ঐ চিঠির প্রেরক ফেরেডা আকলুম নামের ইথিওপিয়ার ইহুদির। সে একজন শিক্ষক। ইথিওপিয়া থেকে সে পালিয়ে বর্তমানে সুদানে বসবাসরত।
এদিকে ইসরাইলের দৃষ্টিতে সুদান হল তাদের শত্রুরাষ্ট্র। দুর্ভিক্ষ, খরা, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ ও উপজাতিদের বিরোধে দেশটি বিপর্যস্ত। সুদানের কয়েক হাজার উদ্বাস্তু থাকে তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার বহু শরণার্থীরও বাস এসব তাঁবুতে। ইথিওপিয়ার ইহুদিদের রক্ষায় আকলুম ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশের ত্রাণ সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়েই চলেছে। অবশ্য তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা যাতে কোনো প্রকারে ইসরাইলে পৌঁছতে পারে। আকলুম একটি চিঠিতে মোসাদের কাছে বিমানের একটি টিকেট চায়। মোসাদ তাকে বিমানের টিকেট না পাঠিয়ে তাদের একজন গোয়েন্দাকে পাঠায়। মোসাদের ড্যানি লিমোর গিয়ে আকলুমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাদের দু'জনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় আকলুম শরণার্থী শিবিরে ইহুদিদের খুঁজে বের করবে এবং তা ড্যানিকে অবহিত করবে। এই সময় আকলুমকে সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আকলুম ত্রিশ জন ইহুদির সন্ধান পায় এবং মোসাদ বুদ্ধির বলে তাদের ইসরাইলে পাঠাতে সক্ষম হয়। আকলুস আর কোনো ইহুদিকে খুঁজে না পাওয়ায় মোসাদ গোয়েন্দা ইসরাইলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। লিমুর আকলুমকে ইসরাইলে তার মতো চলে আসতে বলে।
কিন্তু আকলুম এতে কোনোমতেই রাজি নয়। সে সুদানের প্রত্যন্ত এলাকায় ইহুদিদের খুঁজে পেতে তৎপরতা চালাবে। এদিকে মোসাদের লিমুরও অ্যাডামেন্ট। লিমুর আকলুমকে এক সপ্তাহের মধ্যে সুদান ছেড়ে ইসরাইলে চলে আসার নির্দেশ দেয়। লিমুরের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে আকলুম এক শরণার্থী শিবির থেকে আরেক শিবিরে ইহুদি খুঁজতে মগ্ন থাকে। সে কিন্তু এ পর্যায়ে একজন ইহুদিকেও খুঁজে পায়নি। তবুও সে ইসরাইল ফিরবে না। তার আশংকা সে চলে গেলে সুদান হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রকল্প চিরকালের জন্য পরিত্যক্ত হবে। অতঃপর সে মোসাদ সদর দফতরে একটা মিথ্যা রিপোর্ট পাঠায়। ঐ রিপোর্টে সে এমনসব ইহুদিদের নামের তালিকা নথিভুক্ত করে যারা সুদানে নয়, ইথিওপিয়ায় থাকে।
সে আরও ঘোষণা করে যে, সুদানের কথিত ঐ ইহুদিদের দেখভাল করার জন্য সে সুদানেই অবস্থান করবে। এখন আকলুম তার তালিকা ধরে সুদানে নয় ইথিওপিয়ার গ্রামে গ্রামে একাকী ঘুরে ইহুদি খুঁজে বের করার কাজ নেয়। ঐ ইহুদিদের সে ইথিওপিয়া ছেড়ে ইসরাইলে যেতে ব্রেনওয়াশ করতে থাকে। এদিকে জেরুজালেমে পৌঁছতে আবিষ্কৃত নতুন রুটের বিষয়টি ইথিওপিয়ার ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সঞ্চার করে। প্রথমে কয়েকজন ব্যক্তি, পরবর্তীতে কয়েকটি পরিবার ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। পরে দেখা গেল পুরো একটি ইহুদি গ্রাম তাদের মালামাল বাক্সবন্দী করে দেশত্যাগে প্রস্তুত। এভাবে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, মহিলা, শিশুসহ কয়েক হাজার ইহুদি গোপনে ইথিওপিয়া ত্যাগ করে। এসব ইহুদি বাইবেলে বর্ণিত মসীহ-এর স্বপ্ন অনুযায়ী দুধ ও মধুর দেশ ইসরাইলে পৌঁছতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ইসরাইলে পৌঁছতে বন্ধুর, কষ্টকর পথের জন্য তারা পানি ও খাদ্য তৈরি করে সঙ্গে নেয়। তারা সারা রাত ধরে হাঁটত। কিন্তু দিনের বেলায় গুহার মধ্যে লুকিয়ে থাকত। এভাবে বহু ইহুদি অসুস্থ হয়ে মারা গেল। এই দুঃসাহসিক ভ্রমণে এক বাবা তারা চার-চারটি সন্তানকে হারিয়েছে। মারা গেছে তারা। সাপ, বিছের আক্রমণ ও সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা অগণিত। সর্বোপরি তাদের খাদ্য ও পানি ছিল সীমিত। পথে বহুবার ডাকাতের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে।
কয়েক বছর পর এই কষ্টকর সফরের বর্ণনা দিয়েছে অভিনেত্রী মেহেরেতা বারুশ। বারুশও তাদের সফরসঙ্গী ছিল। তার ভাষ্য, সফরসঙ্গীরা প্রতিদিন সকালে লাশ খুঁজত। কখনো কখনো বালিতে দশটি পর্যন্ত লাশ পাওয়া যেত। কোনোদিন পনেরটি। এমন কোনো পরিবার ছিল না যারা অন্তত একজন সন্তানকে হারায়নি।
১৯৮১ সালের গ্রীষ্মকালে ড্যানি লিমুর তার মোসাদের সহকর্মীদের নিয়ে ছদ্মবেশে সুদানে আসে। তাদের টার্গেট সুদানে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের খুঁজে বের করা। বেঁচে গিয়ে খার্তুমসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ইহুদিরা মোসাদের পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের ইহুদি পরিচয় গোপন করল। শরণার্থীরা ত্রাণ কর্মকর্তাদের দেয়া 'ননকোশার' খাবার গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানাল। এদিকে শরণার্থী শিবিরে ষণ্ডা ও পাণ্ডারা সমানে মহিলা এবং কিশোরীদের ধর্ষণ করতে লাগল। শতাধিক মেয়েদের একটি গ্রুপ অপহৃত এবং গুম হল। তাদের স্বজনরা জানতে পারল ঐ মেয়েদের সৌদি আরবে পাচার করা হয়েছে। সেখানে আরও এক লক্ষ ২০ হাজার মহিলা দাসত্ব বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ত্রাণশিবিরে বহু ইহুদি নারীকে ধরিয়ে দিল এক সময়ের প্রতিবেশীরা। সুদানের পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ও নির্দয়ভাবে মারধর করে।
ইথিওপীয় ইহুদিদের জেরুজালেমে যেতে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ইসরাইলের পথে প্রায় চার হাজার ইহুদির মৃত্যু হয়। কানাডার ইহুদি হেনরি গোল্ড সুদান ও ইথিওপিয়ার আশ্রয় শিবিরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত। ইসরাইল তাদের ফিরিয়ে নিতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলে সে তীব্র সমালোচনা করে।
প্রকৃতপক্ষে মোসাদ তাদের একটি নিরাপদ রুটে ইসরাইলে নেয়ার চেষ্টা করছিল। মোসাদ সুদান থেকে ভুয়া পাসপোর্টে ইহুদিদের বিমানে ইসরাইল নেয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এখন তারা সমুদ্রপথে তাদের নিতে ইচ্ছুক।
এ লক্ষ্যে মোসাদ ইউরোপে একটি পর্যটন কোম্পানি খোলে। কোম্পানিটি সুদান বন্দরের কাছের একটি পরিত্যক্ত বীচ রিসোর্ট ভাড়া করে। লোহিত সাগরের ঐ বিচে উপকূল-উপযোগী খেলাধুলার উন্নয়নে সুদান সরকারের সঙ্গে একটা চুক্তি করে। রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় ইয়োনাতান সেফা নামের এক মোসাদ গোয়েন্দা। এই বীচ ও রিসোর্টে কয়েকটি একক বাংলো এবং কয়েকটি বেসরকারি ভবন ছিল। জাল পাসপোর্ট নিয়ে মোসাদ এজেন্টরা এই রিসোর্ট পল্লিতে এসে নানা পদে চাকরি নিতে শুরু করল। রিসোর্টের গুদাম গোয়েন্দারা সাঁতারের বিভিন্ন পোশাক, মুখোশ, ডুবসাঁতারুর নল, ডুবুরির জুতা দিয়ে ভরে ফেলল। মোসাদ সদর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন রেডিও স্থাপিত হল। মোসাদের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রিসোর্টের গোয়েন্দাদের বলল, এই অভিযানে যেন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না হয়। এটি হতে হবে মানবিক। এই অভিযানটি তাদের জন্য অনেক বেশি আবেগপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়। রিসোর্টের লোকদের জানানো হয় যে, তাদের রিসোর্টের সুখ্যাতির কথা জানিয়ে সারা ইউরোপ জুড়ে পোস্টার ছাড়া হবে।
আরআউস নামের এই রিসোর্টে একে একে বহু পর্যটক আসতে শুরু করল। দিনের বেলা পর্যটকরা সাঁতার কাটত, ডুবসাঁতার ইত্যাদি দিত। কিন্তু এই পর্যটকদের কেউই জানত না, প্রতি রাতে মোসাদ গোয়েন্দারা শরণার্থী ক্যাম্প ও গ্রাম থেকে ইহুদিদের এখানে এনে জড়ো করত। ঐ ভিলেজে বহু সুদানি কাজ করত। সাঁতার প্রশিক্ষক তাদের জন্য একটা গল্প সাজাল। গল্পটি হল, সন্নিহিত শহরের রেডক্রস হাসপাতালে যোগদানের জন্য এরা এখানে রাতটা কাটাবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সুদানিরা সন্দেহজনক কিছু কর্মকাণ্ডের আভাস পায়। কিন্তু রিসোর্টের পক্ষ থেকে ভালো বেতন ভাতা পাওয়ার কারণে তারা এ বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয় না।
মোসাদ রাতের অভিযান চালাত চারটি পুরনো ট্রাকের সাহায্যে। সেই ট্রাকে ইহুদিদের তোলা হত। কিন্তু বিষয়টি অত সহজ ছিল না। ইসরাইলিদের বহু ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে। প্রতি মুহুর্তে ছিল ধরা পড়ার আশংকা।
এদিকে গ্রাম থেকে সংগ্রহীত ইহুদিদের অনেকেই সাদা চামড়ার মানুষ কখনো দেখেনি। সাদা চামড়ার মানুষ যে ইহুদি হতে পারে এ ছিল তাদের ধারণারও বাইরে। ফলে সাদাদের কথা তারা বিশ্বাস করতে চাইত না। এক সাদা গোয়েন্দা কর্মকর্তা যখন তাদের সঙ্গে প্রার্থনায় যোগ দিল তখনই তাদের মনে প্রত্যয় জন্মাল যে তারাও ইহুদি।
এখন চার ট্রাক ভর্তি ইহুদিকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কয়েকশত মাইল পাড়ি দিতে হবে। পথে সুদানী সামরিক বাহিনী এবং পুলিশকে মোসাদের এক কর্মকর্তা সমানে ঘুষ দিয়ে চলতে লাগল। এভাবে ইসরাইলি নৌবাহিনীর জাহাজ যেখানে অপেক্ষা করছে সেখানে ট্রাকগুলো নেয়া হল। সেখানে কিছুটা দূরে একটি নেভি বোট নোঙ্গর করা ছিল। নৌবাহিনীর কমান্ডোরা রাবারের ডিঙ্গি নিয়ে এসে ইহুদিদের মাদার শিপে নিয়ে যেতে লাগল। এভাবে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল।
কানাডার হেনরি গোল্ড একজন স্বেচ্ছাসেবী ও ইহুদি। ক্লান্ত-শ্রান্ত গোল্ড রিসোর্ট ভিলেজে থাকার সময়ই সন্দেহজনক কিছু একটা আঁচ করল। গ্রাম ঘুরতে গিয়ে তার মনে হল মোসাদ গুপ্তচরদের দ্বারা সে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। যেমন এক মহিলা নিজেকে সুইস বলে পরিচয় দিল কিন্তু তার অ্যাকসেপ্ট ভিন্নতর। এক ইরানির এ্যাকসেপ্টও ইরানিদের মতো নয়। গোল্ড পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছে বিধায় সে অভিজ্ঞ। একদিন ডিনারে সে এমন এক পদের সালাদ দেখল তা শুধুমাত্র ইসরাইলেই বানানো হয়।
পরদিন সকালে গোল্ড সাঁতার-প্রশিক্ষককে গিয়ে ধরল এবং হিব্রু ভাষায় তাকে প্রশ্ন করল, এখানে হচ্ছেটা কী। যাহোক, গোল্ডকে কোনো রকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করা হল।
১৯৮২ সালের মার্চে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের বেশ কয়েকটি বোটে করে পাচারের সময় একটা ডিঙ্গিতে বসা চার মোসাদ গোয়েন্দা সুদানী সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেল। সেই দলে লিমুরও ছিল। লিমুর ইংরেজিতে সুদানি সৈন্যদের বলল, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পর্যটকদের রাইফেল দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হয়েছ! লিমুর আরও বলল, সুদানের পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করতে পর্যটকরা এই রিসোর্টে আসে।
পরদিন লিমুর সুদানি সেনাবাহিনীর এক কমান্ডারকে বিষয়টি জানালে সে ক্ষমা চাইতে চাইতে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠে। সে অবশ্য বলে যে, তার সৈন্যরা চোরাচালানি মনে করেছিল। সে তার সৈন্যদের ঐ স্থান অবিলম্বে ত্যাগের নির্দেশ দেয়। ফলে মোসাদ গোয়েন্দারা নিরাপদ এখন।
অবশ্য এখান থেকে সমুদ্রপথে ইহুদিদের চালান আপাতত বন্ধ। নতুন একটি যাত্রাপথ আবিষ্কৃত হয়েছে। একদিন সকালে এখানকার পর্যটকরা দেখে যে, সব বিদেশি স্টাফ লাপাত্তা। স্থানীয় কয়েকজন স্টাফ অবশ্য সকালের নাস্তা তৈরি করছিল। আসলে আগের রাতেই মোসাদ গোয়েন্দারা ঐ টুরিস্টপল্লী ছেড়ে গেছে। গোয়েন্দারা এক নোটিশ টানিয়ে লিখে গেছে, বাজেট সংকটের কারণে তারা টুরিস্টপল্লীটি বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব পর্যটক টাকা জমা রেখেছিল তা পরে দেয়া হবে বলে জানিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা হল।
মোসাদ সদর দফতরে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হল, নৌপথে আর নয়, এবার বিমানযোগে ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে আসা হবে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর হারকিউলিস সি-১৩০ বিমানযোগে ইহুদিদের শত্রু দেশ সুদানে থেকে আনা হবে। মোসাদ বুঝল, সুদানে এই কর্ম করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং বারে বারে শত্রু দেশের ভূখণ্ডে বিমান ওঠা-নামা করা সহজ কাজ নয়।
১৯৮২ সালের মে মাসে মোসাদ গোয়েন্দাদের একটি অগ্রবর্তী দল সুদানে আসে। উদ্দেশ্য, সুদান বন্দরের দক্ষিণে একটি নিরাপদ বিমান ওঠা-নামার স্থান চিহ্নিত করা। দলটি ব্রিটিশ নির্মিত একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড সংস্কার করে। ওখানে যখন ইসরাইলি বিমান বাহিনীর রিনো বিমানটি নামল অপেক্ষমাণ ইথিওপিয়া ইহুদিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। এতো বড় স্টিলের বডি একটি পাখি যার গর্জন ভয়ংকর- এ তারা জীবনে প্রথম দেখল। অনেক ইহুদি ভয়ে পালিয়ে গেল। মোসাদ গোয়েন্দারা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে। অনেকে এই দৈত্যাকার স্টিল বডি দেখে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়। এভাবে প্লেনটির উড়াল দিতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ঘণ্টাখানেক বেশি সময় লেগে যায় এবং অবেশেষে ২১৩ জন ইথিওপিয়ার ইহুদিকে নিয়ে সেটি উড্ডয়ন করে। মোসাদ সদর দফতর থেকে এই অভিযানের প্রশংসা করে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়।
ইসরাইলিদের এই অভিযান বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সুদানি কর্তৃপক্ষের কাছে তা জানাজানি হলে মোসাদ আরেকটি এলাকা নির্বাচনে নামে। নতুন স্পটটি পোর্ট সুদান থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে।
মোসাদ-প্রধান হাকার তত্ত্বাবধানে ১৯৮২-১৯৮৪ এর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। ইসরাইলি ছত্রীসেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল অ্যামোল ইয়ারোন হাকাকে সহযোগিতা করেন। উল্লেখিত সময়ে এক হাজার পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে ইসরাইলে স্থানান্তর সম্ভব হয়।
এই সকল অভিযান এক পর্যায়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুদানি এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোসাদের সঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পের লোকদের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়া আদ্দিস সলোমানকে আটক করে। সলোমান ইথিওপিয়ার ইহুদি। তাকে সুদানে বিয়াল্লিশ দিন ধরে নির্যাতন করা হয়। তার নেপথ্যের লোকদের নামধাম এতেঠ নিগ্রহ সত্ত্বেও সে স্বীকার করেনি।
১৯৮৪ সালে সুদানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর দুরবস্থা ও সংক্রামক রোগ চরম আকার ধারণ করে। সুদানের গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হলে দেশের স্বৈরশাসক জাফর নিমেরির সিংহাসন টলমল করে উঠে। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাহায্য ছাড়া আর তার গত্যন্তর নেই।
ইসরাইল আমেরিকাকে বলে, যদি সুদান তাদের বিমান অভিযান চালাতে দেয়, তাহলে যেন সাহায্য করে। মার্কিন প্রশাসন সম্মত হলে খার্তুমে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সেই আলোকে আলোচনা করে। সমঝোতা হয় ইহুদিদের সুদান থেকে সরাসরি ইসরাইলে নেয়া যাবে না। তবে একটি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সম্ভব। বিনিময়ে সুদানকে খাদ্য ও তেল সরবরাহের সুযোগ দিতে হবে। সুদানের আমেরিকার দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায়, পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের জন্য সুদান থেকে ইসরাইল ইহুদিদের নিতে পারবে। এভাবেই অভিযানের শুরু হয়।
এদিক মোসাদ-প্রধান হাকার স্থলাভিষিক্ত হন তার ডেপুটি নাহুম আদমোনি। আদমোনি বেলজিয়াম হয়ে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরাইলে আনতে শুরু করেন।
সুদানে বেলজিয়ামের বিমানচালক হুড়মুড় করে বিমানে ঢোকা আড়াইশত যাত্রীকে নিয়ে প্লেন চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। তার ভাষ্য, উড়োজাহাজে অক্সিজেন মাস্ক রয়েছে দুশটি। কিন্তু যাত্রী পঞ্চাশজন বেশি।
মোসাদের এক গোয়েন্দা বিমানের পাইলটকে একান্তে ডেকে বলে, কে বাঁচবে আর কে মরবে এখন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি যদি এখন ককপিটে না ওঠ আমি তোমাকে প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে সেখানে অন্য পাইলট বসাব। ঐ পাইলটই তাড়াতাড়ি বিমানে উঠে বসে। পরবর্তী সাতচল্লিশ দিনে ঐ বিমানটি গোপন অভিযান চালিয়ে সাত হাজার আটশত ইথিওপিয়া ইহুদিকে ইসরাইলে ব্রাসেলস হয়ে পৌছে দেয়।
ইসরাইল এই অভিযান গোপন রাখতে দেশের গণমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি করলেও ইহুদি এজেন্সি চেয়ারম্যান এরিয়ে ডুজলিন এক বিবৃতির মাধ্যমে তা ফাঁস করে দেন। ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইহুদিদের একটা উপজাতি আমাদের পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছে। নিউইয়র্ক জিউস প্রেস এই অভিযানের বিস্তারিত ছাপে। লস এঞ্জেলস টাইমসও তা প্রকাশ করে।
তিনদিন পর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সিমন পেরেজ সংসদে বলেন, তার সরকার যা করছে তা অব্যাহত থাকবে। সর্বশেষ ইথিওপিয়ার ইহুদিকে দেশে না নিয়ে আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে। এদিকে সেদিনই সুদান বিমান চলাচল বন্ধ করে দিলে ইহুদিদের ফিরে আসার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সুদানীদের কাছে অভিযানের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইসরাইল যদি একটা মাস চুপচাপ থাকত তাহলে ইথিওপিয়ার সর্বশেষ ইহুদিকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবশ্য ইসরাইলিদের অভিযানে চমৎকৃত হন। তার মতে, অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বুশ অতঃপর ভূমিকা রাখতে চাইলেন। ইসরাইলিদের অভিযান বন্ধের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকার বিমান বাহিনীর সাতটি হারকিউলিস বিমান সুদানের বিমানবন্দর আল কাদারিকে পাঠালেন। সেই উড়োজাহাজে ছিল সিআইএ'র বেশ কিছু গোয়েন্দা। মার্কিন টাস্ক ফোর্স রানি শেবা দেশে অভিযান চালিয়ে পাঁচশত ইথিওপিয়ার ইহুদিকে সুদান থেকে উড়িয়ে এনে সরাসরি ইসরাইলের বিমানবন্দরে নামাল।
দু'মাস পরে সামরিক বাহিনী জাফর নিমেরিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। লিবিয়ার গোয়েন্দারা সুদানে গিয়েই খার্তুমে মোসাদ গোয়েন্দাদের উপস্থিতি লক্ষ করেন। তখনো মোসাদের তিনজন গোয়েন্দা সুদানে ছিল। তারা অবশ্য সিআইএ'র গোয়েন্দাদের বাসায় লুকিয়ে থাকতে সমর্থ হয়। সেই লুকানো অবস্থা থেকেই মার্কিনিরা মোসাদ গোয়েন্দাদের স্বদেশে যেতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের কুইন অব 'শিবা'র শীর্ষক অভিযানটি খুবই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। একই সাথে তা ছিল সরল, শান্ত ও মনোরম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরাইলি গোয়েন্দা পোলার্ডের একটি ঘটনায় আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
পোলার্ড যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করলেও ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে সে গ্রেফতার হয়। এই ঘটনায় আমেরিকা স্তম্ভিত। যে আমেরিকা ইসরাইলের জন্য এতেঠ কিছু করল তাদের এই আচরণে- সিআইএ'র শীর্ষ কর্মকর্তারা খুবই ক্ষুব্ধ হন।
ইসরাইল এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে এবং পোলার্ডের চুরি করে নেয়া কাগজপত্র আমেরিকাকে ফিরিয়ে দেয়। তবে দুই দেশের মধ্যকার গোয়েন্দা তৎপরতায় দীর্ঘদিন অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়। পোলার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেন রাফি এইতান। তিনি গোয়েন্দাদের যে ইউনিটটি চালাতেন সেটি তখনি বন্ধ করে দেয়া হয়। এইতানের বিরুদ্ধে আমেরিকায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়ে যায়। বহুদিন গ্রেফতারের ভয়ে আমেরিকায় যাননি মোসাদ গোয়েন্দা এইতান।
ইথিওপিয়া থেকে আগত ইহুদিদের অনেকেই কুইন অব শেবা অভিযানের বিপক্ষে ছিলেন। কেননা এই অভিযানে চার হাজার ইহুদি মারা গেছে। মোসাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান কায়েসারেয়ার শীর্ষ গোয়েন্দাদের অভিমত, বিতজার বিভাগের লোকদের দ্বারা এতবড় একটা অভিযান পরিচালনা উচিত হয়নি। তাছাড়া বিতজার গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে খুবই ছোট্ট একটা ইউনিট। তারা তেমন সুসংগঠিতও নয়।
বিতজারের লোকজন তাদের সফল অভিযানের জন্য খুবই খুশি ছিল। তারা অবশ্য বলে যে, মোসাদের বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে তারা সঙ্গে নিয়েছিল।
দুই গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে বিরোধ সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য ইথিওপিয়ার অসংখ্য ইহুদি আজ ইসরাইলে আসতে পেরেছে। কিন্তু এ-ও সত্য যে, এখনো কয়েক হাজার ইহুদি ইথিওপিয়ায় রয়ে গেছে। তারা ইসরাইলে আসতে খুবই আগ্রহী কিন্তু দরজা তো বন্ধ। ইসরাইল মনে করে আদর্শগত ও ইহুদি হওয়ার কারণে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা অবশ্য কর্তব্য। মানবিক কারণেও এর প্রয়োজনীতা রয়েছে। কেননা আগত ও আটকে পড়া পরিবারগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক শিশুরা চলে এসেছে অথচ তাদের বাবা-মা আসতে পারেনি। স্বামী এসেছে, স্ত্রী আসতে পারেনি। নতুন পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এবং স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অনেকে আত্মহত্যাও করেছে।
এদিকে ইহুদি এজেন্সির প্রতিনিধিরা কয়েক হাজার ইহুদিকে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার কাছে জড়ো করতে সমর্থ হয়। ১৯৯১ সালের অপারেশন শেবা শেষ হওয়ার ছয় বছরের মাথায় ইথিওপিয়ার ইহুদিদের জন্য অলৌকিক ঘটনা ঘটে। শুরু হয় অপারেশন সলোমোন।
ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আদ্দিস আবাবার দিকে আসতে শুরু করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় ইসরাইল ও শাসক মারিয়ামের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর কিছু পরেই মারিয়াম ক্ষমতাচ্যুত হন।
এই চুক্তির পেছনে এক রহস্যমানবের ভূমিকা ছিল মুখ্য। তার নাম ইউরি লুবরানি। ইরান ও লেবাননের বিশেষ দূত ছিলেন তিনি। চুক্তি হয় ইহুদিদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে ইসরাইল ইথিওপিয়াকে ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেয় মারিয়াম সরকারের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে তারা আমরিকার রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে। এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে বিদ্রোহীদেরও একটা চুক্তি হয়। এ চুক্তি মোতাবেক বিদ্রোহীরা ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতি করবে এবং এই সময়ের মধ্যে ইহুদিদের ইসরাইলে ফেরত নিয়ে যাওয়া হবে। ইসরাইল ঐ সময়ের মধ্যেই তাদের লোকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
সলোমোন অভিযান পরিচালনার মূল দায়িত্ব পায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আমনন লিপকিন ছিলেন কমান্ডার। ইসরাইলের এয়ারলাইন ইথিওপিয়ায় ৩০টি বিমান পাঠায়। বিমান বাহিনী পাঠায় বেশ কয়েকটি বিমান। গোয়েন্দা ইউনিট কিং ফিশারের একটি কমান্ডো বাহিনীকে ইথিওপিয়ায় পাঠানো হয়। এভাবে মাত্র ৩৪ ঘণ্টায় ১৪ হাজার চারশত ইহুদিকে ইসরাইলে আনা হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বরেকর্ডের সৃষ্টি হয়। বোয়িং ৭৪৭ এক হাজার ৮৭জন ইহুদিকে নিয়ে ইসরাইলের অভিমুখে রওয়ানা দিলেও বিমানবন্দরে একজন বেশি লোক পাওয়া যায়। সে একটি নবজাতক। বিমানেই তার জন্ম।
সলোমোন অভিযানের ২০ বছর পরেও ইথিওপিয়ায় বহু ইহুদি এখনো রয়ে গেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগ অব্যাহত। তবে নবাগত ইহুদিদের ইসরাইলের মাটিতে বসবাসে সমস্যা হচ্ছে। আগতরা অধিকাংশই আফ্রিকার গ্রাম থেকে উঠে আসা। অথচ ইসরাইল একটা আধুনিক রাষ্ট্র। ওদিকে কতিপয় ধর্মীয় নেতা এখনো দাবি করে চলেছেন, ইথিওপিয়ার ইহুদিরা প্রকৃত নয়।
শুরুতে যে জার্নি সংটি গীত হচ্ছিল তার শেষাংশ ছিল এরকম: চাঁদের মধ্যে আমার মায়ের মুখটি আমার দিকে তাকিয়ে। মা, হারিয়ে যেও না। মা যদি আমার পাশে থাকে, তাহলে সেই আমাকে ভাবতে বাধ্য করবে যে, আমি একজন ইহুদি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00