📘 মোসাদ > 📄 রেড প্রিন্সের সন্ধানে

📄 রেড প্রিন্সের সন্ধানে


ইসরাইলি খেলোয়াড় ও এথলেটরা জার্মানিতে এসেছিলেন অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে। ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৪টায় ৮জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী মুখোশ পরে জার্মানির মিউনিখে ইসরাইলি খেলোয়াড়দের ফ্ল্যাটে ঢুকে মুষ্টিযুদ্ধের কোচ মোশে উইনবার্গ ও ওয়েট লিফটিং চ্যাম্পিয়ান যোয়ে রোমানোকে হত্যা করে। তারা সন্ত্রাসীদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন। ইসরাইলি এথলেটদের কয়েকজন গুলির শব্দে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সন্ত্রাসীরা ৯জনকে জিম্মি করে।
জার্মান পুলিশ, সাংবাদিক, টিভি সকলেই দৌড়ে আসে এবং সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এই প্রথম বারের মতো বিশ্বজুড়ে টিভিতে সরাসরি প্রচারিত হয়। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারকে ঘুম থেকে জাগান তার সামরিক এ্যাডজুটেন্ট। গোল্ডা মেয়ার পড়ে গেলেন ফাঁদে। ঘটনাস্থল জার্মানি একটি বন্ধুপ্রতীম দেশ। জিম্মি উদ্ধারের দায়িত্বও জার্মানির। ইসরাইল তাদের সেরা কমান্ডো ইউনিট সায়েরেত মাটকালকে জিম্মি উদ্ধারে পাঠাতে চাইলেও জার্মানির বেভারিয়া রাজ্য সরকার ভদ্রভাবে এতে আপত্তি জানায়। বেভারিয়াতেই সেবার অলিম্পিকের অনুষ্ঠানাদি হচ্ছিল। ইসরাইল সরকারকে জার্মান প্রশাসনের ভাষ্য, আপনাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আমরাই সকল জিম্মিকে মুক্ত করব। সমস্যা হল জিম্মি উদ্ধারে যে অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং সাহসিকতার প্রয়োজন জার্মান সরকারের তাতে ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে এমন একটি ধূর্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাবু করার ক্ষেত্রে।
জার্মান কর্তৃপক্ষ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সারাদিন ধরে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সন্ত্রাসী ও জিম্মিদের মিউনিখের বাইরে ফুরস্টেন ফ্রেন্ডব্রাক বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
জার্মান সরকার তাদেরকে একটি বিমান দিতে চায় যাতে চড়ে তারা যেখানে খুশী যেতে পারবে। কিন্তু জার্মান পুলিশ বিমান বন্দরকে ঘিরে যে আয়োজন করেছে তাতে বিন্দুমাত্র পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। জার্মানি বিমান বন্দরের মাঝখানে একটি বিমান এনে রাখলেও তাতে কোনো পাইলট বা ক্রু ছিল না। আবার বিমান বন্দরের ছাদে অদক্ষ শার্পসুটারদের জড়ো করে রাখা হয়। সন্ত্রাসী চক্রের নেতা প্লেনটি পরিদর্শনে এসে দেখে যে, বিমানটিতে কোনো ক্রুতো নেইই ইঞ্জিনও ঠাণ্ডা হয়ে আছে। এহেন বিমান চালু করে উড়ে যেতে কত সময় লাগবে? সন্ত্রাসীরা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ফলে তারা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়তে ও গুলি করতে শুরু করে। জার্মান পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের শুরুতেই ইসরাইলের সকল জিম্মিকে তারা হত্যা করে। নিহত হয় একজন জার্মান পুলিশও। ৮ সন্ত্রাসীর মধ্যে পাঁচজন নিহত হয়। তিন সন্ত্রাসীকে আটক করা সম্ভব হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। কেননা এই সন্ত্রাসী ঘটনার কিছুদিন পরে একটি লুফথানসা বিমান ছিনতাই হয়। ধারণা করা হয় ঐ সময় শর্তাধীনে আটক তিন সন্ত্রাসীকে মুক্ত করে দেয়া হয়।
ইসরাইলি জেনারেল জভি জামির সবেমাত্র ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হয়েছেন। তাকে অসহায়ের মতো তার দেশের লোকদের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জার্মানিতে উড়ে এসেছিলেন এবং উক্ত বিমান বন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে অবস্থান নিয়েছিলেন। জার্মানি পরিচালিত অভিযানে তার কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না। তদুপরি জার্মান সরকার পুনঃপুনঃ বলছে যে, তাদের উদ্ধারাভিযান এক্সেলেন্ট। মোসাদ-প্রধান উপলব্ধি করলেন, তাদের দেশের এক নতুন শত্রুর অভ্যুদয় ঘটেছে। এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা নিজেদেরকে 'ব্লাক সেপ্টেম্বর' বলে পরিচয় দেয়।
ব্লাক সেপ্টেম্বর নামকরণের পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা। এ মাসে জর্ডানের বাদশা হোসেন তার দেশে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেন। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সঙ্গে ছয়দিনের যুদ্ধ শেষে ইসরাইলের ভাষায় বহু সন্ত্রাসী জর্ডানের রাজধানী আম্মান, শহরতলী এলাকা এমনকী গ্রামে পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইসরাইল সীমান্ত এসব তথাকথিত সন্ত্রাসীদের বিশেষ ঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং প্রকাশ্যে তারা অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। তারা জর্ডানের বাদশাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে এবং ক্রমান্বয়ে সে দেশের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। বাদশাহ এসব জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। বাদশাহ একদিন আর্মি ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন, ট্যাঙ্কের এ্যান্টেনায় একটি ব্রেসিয়ার ঝুলছে। ক্রুব্ধ বাদশাহর প্রশ্ন, ওটা কী?
ট্যাঙ্কের পুরুষ কমান্ডার বললেন, ব্রেসিয়ার ঝোলানোর অর্থ হল আমরা পুরুষ নই, নারী। আপনি আমাদের তো আর যুদ্ধ করতে দিচ্ছেন না। বাদশাহ হোসেনের মনে হল বালিয়ারিতে তিনি তার মাথা ঢুকিয়ে দেন। নিজ দেশ তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে ১৯৭০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন।

📘 মোসাদ > 📄 ব্লাক সেপ্টেম্বর

📄 ব্লাক সেপ্টেম্বর


বাদশাহ হোসেনের এই কঠোর নির্দেশে সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের রাস্তাঘাটে গুলি করে মারতে শুরু করে। গ্রেফতার হয় বহু। আদালতে না নিয়েই তাদের বিচার কাজ শেষ হয়। বহু সন্ত্রাসী ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় শিবিরে লুকালেও সেসব শিবিরে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। মারা যায় কয়েক হাজার। বহু আতঙ্কিত সন্ত্রাসী জর্ডান নদী অতিক্রম করে ইসরাইলিদের হাতে বন্দী হয়। তাদের উপলব্ধি হল, ইসরাইলি কারাগারে পচে মরব; জর্ডান সরকারের গুলিতে নয়। ম্যাসাকারের সময় বহু সন্ত্রাসী সিরিয় ও লেবাননে পালিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের ঐ হামলায় দুই থেকে সাত হাজার লোক নিহত হয়।
ফাতাহ প্রধান ইয়াসির আরাফাত এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞা করলেন। কেননা তার সংগঠনটিই অন্যদের তুলনায় বৃহৎ। ফাতাহর অভ্যন্তরে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হল। আন্ডারগ্রাউন্ডের মধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড। ফাতাহর সদস্য ও কমান্ডাররা পর্যন্ত ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপ সম্পর্কে জানলেন না।
ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপ মানেই নিষ্ঠুরতা। ফিলিস্তিনিদের শত্রু ভাবলেই তারা আক্রমণ চালানোর কথা ভাবত। ইয়াসির আলাফাত এই গ্রুপের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা বরাবরই অস্বীকার করেছেন। কিন্তু ইসরাইলের ভাষায় আরাফাতই এই সংগঠনের স্রষ্টা এবং নেতা। তিনি নাকি ফাতাহর সিনিয়র নেতা আবু ইউসেফকে ব্লাক সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ইসরাইলিদের ভাষায় ধর্মান্ধ তরুণ আলি হাসান সালামেহকে ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের অপারেশন প্রধান করা হয়। সালামেহ'র প্রধান গুণ তিনি ধর্মান্ধ একই সঙ্গে সাহসী ও বুদ্ধিমান। তার বাবা হাসান সালামেহ ১৯৪৮ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বাহিনীর সর্বশেষ সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধে হাসান সালামেহ নিহত হন এবং তার ছেলে আলি হাসান সালামেহ তার পিতার আদর্শ জিইয়ে রাখার সংগ্রামে ব্রতী হন।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের প্রথম দিককার অভিযানগুলো ইসরাইলকে তেমন বিচলিত করেনি। কেননা তাদের মূল টার্গেট ছিল জর্ডান। তারা রোমে জর্ডানের জাতীয় বিমান সংস্থার অফিস ও প্যারিসে জর্ডান দূতাবাসে বোমা হামলা করে। জর্ডানের একটি বিমান ছিনতাই করে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। বার্থে জর্ডান দূতাবাস এবং জার্মানিতে একটি ইলেকট্রোনিক প্ল্যান্ট তারা ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাদের ক্ষতির মধ্যে আরও রয়েছে জর্ডানের পাঁচ গোয়েন্দাকে হত্যা, হামবুর্গ ও রটেরডামে তেল রিজার্ভারের ক্ষতিসাধন ইত্যাদি। ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের একটি অভিযান পরিচালিত হয় কায়রো শেরাটন হোটেলের লবিতে। সেখানে হত্যা করা হয় জর্ডানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওয়াসকি আল তালকে। এখানে এক হত্যাকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শরীরে ঝুঁকে তার রক্ত লেহন করে।
১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের বিজয়ে ব্লাক সেপ্টেম্বরের চোখ পড়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের দিকে। তারা ইসরাইলের বিমান ছিনতাই করে, পুনঃপুনঃ ইসরাইলের সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমে বেসামরিক লোককে হত্যা করতে শুরু করে। একই সঙ্গে বড় বড় শহরে বোমা পুঁতে ও বিস্ফোরণ ঘটাতে শুরু করে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা শাবাক ও মোসাদের নতুন শত্রুতে পরিণত হয় ব্লাক সেপ্টেম্বর। যদিও এই পর্যায়ে মোসাদের শত্রু ছিল ফাতাহ এবং তাদের বহু পরিকল্পনা তারা নস্যাৎ করে এবং বহু লোককে তারা গ্রেফতার করে।
কিন্তু ইতিমধ্যে ব্লাক সেপ্টেম্বর তাদের সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে এবং পশ্চিমা দেশসমূহ তাদের টার্গেটে পরিণত হয়- বিশেষ করে ইসরাইল। জার্মানির মিউনিখের ধ্বংসযজ্ঞ ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের ছিল উল্লেখযোগ্য প্রথম অভিযান।
মিউনিখ অভিযানের পরেই আলি হাসান সালামেহ'র নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ অভিযানের নেপথ্যে ছিল হাসান সালামেহ'র ব্রেন। প্রতিপক্ষকে হত্যার পর ভিকটিমের রক্ত নিজ দলের লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। আর এভাবেই হাসান সালামেহ'র ছেলে আলি হাসান সালামেহর নাম হয়ে যায় রেড প্রিন্স।
১৯৬৯ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এশকলের অকাল মৃত্যুতে তার স্থলাভিষিক্ত হন গোল্ডা মেয়ার। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে গোল্ডা মেয়ার অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এবং বর্তমানে মোসাদ-প্রধান জভি জামির এবং প্রধানমন্ত্রীর কাউন্টার টেররিজম বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক আমান প্রধান আহারোন ইয়ারিভকে তার অফিসে তলব করেন। মিউনিখে ইসরাইলি এথলেটদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোল্ডা মেয়র খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি এই সময় বলেন, জার্মানিতে আবার ইহুদিদের রক্ত ঝরল। গোল্ডা মেয়ার ছিলেন একজন শক্ত মহিলা। আর তিনি যে মিউনিখ ম্যাসাকারে যুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করবেন না এটা ভাবাই যায় না।
জভি জামির সাবেক পালমাক ফাইটার হলেও আউটস্ট্যান্ডিং জেনারেল হিসেবে তার খ্যাতি ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে পদ পাওয়াই ছিল তার সর্বোচ্চ পদায়ন। তিনি কিছুদিন বৃটেনে ইসরাইলের মিলিটারী এটাচে ছিলেন। মেইর অমিত মোসাদ-প্রধান হিসেবে তার কার্যকাল পুরোটা শেষ করার পরই ১৯৬৮ সালে জভি জামির মোসাদের প্রধান হন। জামিরের সমালোচকদের মতে, তিনি অতিমাত্রায় ভদ্রলোক, লাজুক এবং গোয়েন্দাগিরিতে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। মোটকথা তিনি ক্যারিশমেটিক নন এবং হারেল ও মেইর অমিতের মতো মোসাদ-প্রধান হওয়ার যোগ্যতাও তার নেই। জামির মোসাদ-প্রধান হওয়ায় রাফি এইতানসহ বেশ কয়েকজন মোসাদ যোদ্ধা প্রতিবাদে সংগঠন ত্যাগ করেছেন।
জামিরের মতো ইয়ারিভও নেপথ্যে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। ইসরাইলের ছয়দিনের যুদ্ধকালে আমান প্রধান হিসেবে ইয়ারিভ বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন। এটা তার জন্য একটা বিশাল অর্জন। তবে তার গ্রহণযোগ্যতার মূলে রয়েছে তার জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। হালকা পাতলা চশমাধারী, স্বল্পভাষী এবং টাকমাথার ইয়ারিভকে দেখলে একজন পান্ডিত্যপূর্ণ প্রফেসর বলে ভ্রম হয়, তুখোড় গোয়েন্দা মনে হয় না।
ইয়ারিভ এবং জামিরের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ছিল। তাদের আসলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কথা। কেননা কিছুটা ওভারলেপিংও হয়েছে। কিন্তু তারা পরস্পর পরস্পরকে শ্রদ্ধা করা ও সম্প্রীতির মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন। তারা দু'জনই শান্তশিষ্ট, রিজার্ভ এবং কিছুটা লাজুকও। মধ্যমণি হয়ে ওঠার প্রবণতা তাদের মধ্যে ছিল না এবং ঘটনার বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তারা খুব সতর্ক ছিলেন।
মিউনিখের হত্যাযজ্ঞের পর ইয়ারিভ এবং জামির অতি তৎপরতার সঙ্গে ব্লাক সেপ্টেম্বর সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। এ কাজে তারা নামী গোয়েন্দাদের নিয়োগ করেছিলেন। তারা গোল্ডা মেয়ারকে বলেন, ঐ সংগঠনটি ইসরাইলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ব্লাক সেপ্টেম্বরের শপথ হল যতটা সম্ভব ইসরাইলিদের সৈন্য, নাগরিক, মহিলা ও শিশু হত্যা করা। এক্ষেত্রে একের পর এক ওদের সব নেতাকে হত্যা করতে হবে। সাপের মাথা থেতলে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। তরুণ সম্প্রদায়কে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ তার পক্ষে অতি সহজ ছিল না। ইসরাইল অতীতে এমনটা কখনো করেনি। গোল্ডা মেয়ার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকলেন। এবং এক সময় কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তিনি স্বগতোক্তি করছেন কিম্বা নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন। তিনি হলোকাস্টের সময় ইসরাইলি নারী-পুরুষকে হত্যার কথা স্মরণ করলেন। ইহুদিরা এ সময় নিগৃহীত হয়েছে, তাদের নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। অবশেষে তিনি তার মাথা তুলে অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলেন।
জামির অবিলম্বে অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার ভাবছেন, ইয়ারিভ এবং জামির যতই প্রতিশ্রুতি দিক না কেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি তাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন কীনা। মোসাদের তরুণ গোয়েন্দারা যাদের মারতে যাচ্ছে তারা যেই-সেই নন, ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের নেতা এবং প্রধান প্রধান সন্ত্রাসী। গোল্ডা মেয়ার জানতেন এই ধরনের অভিযান আইনের বাইরে চালাতে হবে। মোসাদের কার্যক্রম যদি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে তাদের কর্মকাণ্ড নারকীয় হয়ে পড়ার আশংকা। ফলে অনেক নিরীহ লোকও মারা যেতে পারে। ফলে মোসাদকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এলক্ষ্যে তিনি একটি গোপন কমিটি করলেন যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হল প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দায়ান ও সাবেক মেধাবী জেনারেল ও বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ইগাল আল্লোনকে। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে তো এই কমিটিতে থাকছেনই। এই গোপন ট্রাইব্যুনালের কাজ হবে প্রতিটি অভিযানের ফলাফল পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা। এই কমিটির নাম দেয়া হল এক্স কমিটি। সিদ্ধান্ত হল মোসাদ ও শাবাক প্রধান প্রত্যেকটি অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট টার্গেটের নাম ও ফাইল তাদেরকে দেবেন। তাদের অনুমোদন পেলেই মোসাদের হিট টিম মাঠে নামবে।
মাসাদ হল মোসাদের অভিযান পরিচালনা বিভাগ। তাদেরকে এই অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হল। কালো কেশধারী এবং শ্রমসাধ্য কাজে তৎপর মাইক হারারীকে অভিযানের নেতা বানানো হল। সিদ্ধান্ত হল, ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর বিরোধী সব অভিযানই হবে ইউরোপে। প্রথমত সেখানে তারা সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছে এবং সেখানে তাদের সুরক্ষা দেয়ার লোকেরও অভাব নেই।
মাসাদার অপারেশনাল টিম কিডন থেকে লোক নিয়োগ দিলেন। অনেকগুলো টিম করলেন। তেমনি একটি টিমের নারী ও পুরুষকে দায়িত্ব দেয়া হল তারা সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত ও পরিচয় নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীর যে শহরে বাস সেখানে তারা তাকে ফলো করবে, তার ছবি তুলবে, তার অভ্যাস জানবে, তার বন্ধুদের চিহ্নিত করবে, প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে বের করবে। যেসব বার বা রেস্তোরাঁয় সে যাতায়াত করে তা খুঁজে বের করাও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তার রুটিন জানতে হবে এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার তৎপরতা উদঘাটন করতে হবে। হোটেল রুম ঠিক করা, ফ্ল্যাট ও গাড়ি ভাড়া করার দায়িত্বে থাকবে ছোট্ট একটি দল-একজন নারী আরেকজন পুরুষ। আরেকটি ক্ষুদ্র দলের ওপর বর্তাবে মোসাদ সদর দফতর ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশের অগ্রগামী অপারেশনাল টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার।
মোসাদের হিটটিম বা ঘাতক বাহিনী অকুস্থলে এসে পৌঁছবে সবার শেষে। তারা ব্যক্তি, ঠিকানা ও ছবি এবং অন্যান্য তথ্যাদি নিশ্চিত হয়ে অভিযানে নামবে। যে শহরে অভিযান চলবে সেখানে কর্মরত মোসাদ গোয়েন্দাদের নিরাপত্তায় কাজ করবে আরেকটি দল। ড্রাইভার, গাড়ি অভিযান স্থলে প্রস্তুত থাকবে। মহড়া অনুযায়ী সটকে পড়ার রাস্তা নির্বিঘ্ন করবে এই টিম। এই দলের কাছে অস্ত্র থাকবে এবং প্রয়োজনে হিট টিমের পাশে এসে দাঁড়াবে। অভিযান শেষে হিট টিমের সকল সদস্য তাদের অস্ত্র ও সরঞ্জামাদিসহ ঐ দেশ ত্যাগ করবে। অপারেশনের আগেই সন্দেহভাজনকে খুঁজে পেতে সাহায্যকারী টিম ঐ দেশ ছাড়বে। অন্যরা বাক্স-পেটরা বাঁধাইসহ অন্যান্য কাজে আরও কয়েকদিন সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থান করবে। মোসাদ গোয়েন্দারা অভিযান পরিচালনার জন্য প্রথম যে শহরটি বেছে নিলেন সেটি রোম।
রোমে সন্দেহভাজন হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হল তিনি লিবীয় দূতাবাসের একজন অধঃস্তন কেরানি। নাবলুসে জন্মগ্রহণকারী ৩৮ বছর বয়স্ক ওয়াযেল জেডওয়েলার ভদ্র, হালকা পাতলা গড়ন ও মৃদুভাষী। তার বাবা খুব বিখ্যাত ব্যক্তি এবং আরবিতে অনুবাদে খুব দক্ষ ছিলেন। ওয়াযেল নিজেও কবিতা ও ফিকশন অনুবাদে পারদর্শী। শিল্পকলার একজন সমঝদারও তিনি। লিবীয় দূতাবাসে দোভাষী হিসেবে তিনি কর্মরত। ছোট্ট একটা এ্যাপার্টমেন্টে তার বাস। তার বন্ধুর দাবি ওয়াযেল সব সময় সন্ত্রাসকে ঘৃণা করতেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা হত্যায় লিপ্ত হয় তাদেরও তিনি ঘৃণা করতেন।
কিন্তু ওয়াযেলের বন্ধুরা তার সত্যিকার পরিচয় জানতেন না। তার ভালো বন্ধুরা ছিলেন যেমন নিষ্ঠুর তেমনি ধর্মান্ধ। তারা রোমে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের হয়ে পরিকল্পনা করে স্থির বিশ্বাসে অভিযান চালাতেন। ওয়াযেল রোমে বেড়াতে আসা দুই ইংলিশ তরুণীকে টার্গেট করলেন। এই দুই তরুণী রোম হয়ে ইসরাইলে যাবে। ওয়াযেল দুই সুদর্শন তরুণ ফিলিস্তিনিকে ঐ দুই তরুণীর সঙ্গে বিছানায় যাওয়াসহ সবরকমের সম্পর্ক স্থাপনের নির্দেশ দেন। দুই তরুণ সফলও হন। দুই জোড়া তরুণ তরুণীর বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় হয়। তখন এক তরুণ তার বান্ধবীকে পশ্চিম তীরে তাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা টেপ রেকর্ডার পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। সাধাসিদে তরুণী সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়। রোম বিমানবন্দরের তরুণীদের মালামাল ও টেপরেকর্ডারটি যথাযথভাবে চেক করা হয়। দুই তরুণী জানত না, সুদর্শন দুই তরুণ তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াযেলের তত্ত্বাবধানেই ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের লোকজন ঐ রেকর্ড প্লেয়ারের মধ্যে বিস্ফোরক ভর্তি করে দেন এবং সুন্দর করে ব্রান্ড নিউ বাক্সে সেটি ভরে প্যাক করা হয়। ঐ রেকর্ডারের বডিতে এমন ডিভাইস সংযুক্ত করা হয় যাতে একটা উচ্চতায় ওঠার পর সেটি বিস্ফোরিত হবে এবং প্লেন ও তার সকল যাত্রী মারা যাবে।
সন্ত্রাসীরা জানতেন না যে, ইসরাইল অভিমুখী একটি সুইস বিমানে অনুরূপ বিস্ফোরক ইতিপূর্বে সংযুক্ত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য বিমানটির ধ্বংস। কিন্তু এল আল প্লেন এক ধরনের অস্ত্রের বর্ম দিয়ে তা ঢেকে দেয়ায় প্লেনটি ধ্বংস হয়নি। এই দফায় যা হল, এল আল প্লেনের পাইলট একটি সন্দেহভক রেড লাইট জ্বলতে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিমান বন্দরে ফিরে এলেন। স্তম্ভিত ইংলিশ তরুণীদ্বয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের দুই প্রেমিকের সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু ঐ সুদর্শন তরুণ বান্ধবীদের বিমানবন্দরে ঢুকিয়েই চলে গেছেন ইটালী।
মোসাদ গোয়েন্দাদের প্রথম টিমটি কয়েকদিন ধরে ওয়াযেলকে খুঁজতে থাকে। এক মহিলা গোয়েন্দা লিবীয় দূতাবাসে প্রবেশ ও নির্গমনের সময় হ্যান্ড ব্যাগের নিচে ক্যামেরা রেখে তার ছবি তুলতে সমর্থ হয়। এদিকে ১৬ অক্টোবর ওয়াযেল বাড়ির সামনে এলে এই মহিলার বিষাদমাখা সুর পিয়ানোতে শুনতে পান। হঠাৎ করে বাড়ির সামনের অন্ধকার থেকে রিভলবার হাতে দুই ব্যক্তি বেরিয়ে এসে ওয়াযেলকে গুলি করে। কেউই সেই গুলির শব্দ পায়নি এবং দুই মোসাদ গোয়েন্দা অকুস্থলে পার্ক করে রাখা একটি গাড়িতে লাফ দিয়ে উঠে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা রোম ত্যাগ করে।
যাহোক, ওয়াযেল নিহত হয়েছেন। বৈরুতের একটি পত্রিকা তার মৃত্যু সংবাদ ছাপে। কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠন শোক প্রকাশ করে বলে, ওয়াযেল তাদের একজন পরীক্ষিত যোদ্ধা ছিলেন।
ওয়াযেলের হত্যাকারীর প্রকৃত নাম ডেভিড মোলাডনয়। তার জন্ম তিউনিসিয়ায় এবং ছোট বেলায় ইসরাইলে স্থায়ী হয়েছে। ফরাসি ভাষায় তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। কিন্তু ইসরাইলের প্রতি তার ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। ইসরাইলের ব্যাপারে বরাবরই সে আপোষহীন। সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে মোসাদে যোগদানের পর থেকেই দুর্ধর্ষ সব অভিযানে তার ডাক পড়ে এবং রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠে। ওয়াযেলকে হত্যার পরও মোসাদ বেশ কিছুদিন ইসরাইলে কাটিয়ে প্যারিসে চলে যায়।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর প্যারিসের ১৭৫ রুয়ে আলেসিয়ার ড: মাহমুদ হামশারির বাড়ির ফোন বেজে উঠে। ফোনে তাকে প্রশ্ন করা হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের ফ্রান্স প্রতিনিধি হামশারির এটি কীনা। ফোনকারীর গলায় পুরোপুরি ইটালী এ্যাকসেন্ট। ফোনকারী নিজেকে ইটালীর একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতার কথা বলে। তার দরকার হামশারীর একটা সাক্ষাৎকার। সিদ্ধান্ত হয়, হামশারীর বাড়ির বেশ কিছুটা দূরের এক রেস্তোরাঁয় তাদের সাক্ষাৎ হবে। হামশারী একজন শ্রদ্ধেয় ঐতিহাসিক। প্যারিসে তিনি তার ফরাসি স্ত্রী ও মেয়ে নিয়ে থাকতেন। পরবর্তীতে তার মেয়ের নিরাপত্তায় ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
হামশারী যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন তখন রাস্তাঘাটের দিকে বিশেষ নজর রাখতেন। কেউ তাকে ফলো করছে কীনা ইত্যাদি। মাঝে-মধ্যে প্রতিবেশীদের কাছে জানতে চাইতেন, অচেনা কোনো লোক তাকে খুঁজেছে কীনা।
হামশারীর অবশ্য অত চিন্তিত হওয়ার কথা নয়। কেননা তিনি একজন পন্ডিত ব্যক্তি। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তার বেশ পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু ইসরাইলের গোয়েন্দারা তার সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানত। ১৯৬৯ সালে ডেনমার্কে বেন গুরিয়ানকে হত্যার একটা ব্যর্থ চেষ্টা হয়। সেই অভিযানে হামশারী অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে একটি সুইস বিমান মধ্য আকাশে বিস্ফোরণের কারণে বিধ্বস্ত হলে ৪৭জন নিহত হয়। সেই ঘটনায় হামশারীর সম্পৃক্ততা ছিল। রহস্যজনক আরব তরুণদের সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ ছিল এবং তারা রাতে বিশালাকায় সুটকেস নিয়ে তার বাড়িতে আসত। অনেক হীন আচরণের ঘটনা ঘটত ঐ বাড়িতে। ইহুদি গোয়েন্দারা আরও জানত, ইউরোপে এখন ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলের সে দ্বিতীয় ব্যক্তি।
হামশারী যেদিন সাক্ষাৎকার দিতে বাড়ির বাইরে বের হন কয়েকজন লোক তার এপার্টমেন্ট ভেঙে পনের মিনিট সেখানে কাটায় এবং পরবর্তীতে চলে যায়।
পরের দিন হামশারীর স্ত্রী ও মেয়ে বাড়ি ত্যাগ না করা পর্যন্ত এক ইসরাইলি গোয়েন্দা আশপাশে অবস্থান করছিল। হামশারীর বাড়ির টেলিফোনটি বাজলে তিনি সেটি ধরেন। এটি ছিল ঐ গোয়েন্দার টেলিফোন। গোয়েন্দা হামশারীর বাড়িতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
হঠাৎ করেই হামশারী ভয়াবহ এক বিস্ফোরণের শব্দ পান। তার ডেস্কের নিচে একটা বিস্ফোরক লুকায়িত ছিল। সেটিই বিস্ফোরিত হয়েছে। মারাত্মক আহত হামশারী কয়েকদিন পর হাসপাতালে মারা যান। মোসাদকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগই তিনি পাননি।
হামশারীর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর অভিযানের নেপথ্য নায়ক হারারি জোনাথান নামে একজনকে সঙ্গে নিয়ে সাইপ্রাস দ্বীপে আসেন। সিরিয়, লেবানন ও মিসরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সাইপ্রাস ইসরাইল ও আরব গোয়েন্দাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
হারারীদের লক্ষ্যবস্তু হুসেইন আবদএল হীর। তিনি কয়েকমাস আগে সাইপ্রাসে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্বাঞ্চলীয় ব্লকের সঙ্গে তার যোগাযোগ রাখাও ছিল কর্তব্য। পূর্বাঞ্চল সন্ত্রাসীদের জন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ায় চেক, হাঙ্গেরী, ফিলিস্তিন ও বুলগেরিয়ার সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ হয় সামরিক ঘাঁটি ও বিশেষ বাহিনীর ইউনিটে। ঐ সব দেশ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে। কতিপয় ফিলিস্তিনি নেতা সোভিয়েত আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। তারা পড়াশুনা করতেন মস্কোর প্যাট্টিক লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইসরাইলে সন্ত্রাসী রপ্তানিরও প্রধান ছিলেন আবদ এল হীর। ইসরাইলি গডফাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে যেসব আরব গোয়েন্দা সাইপ্রাসে আসত হীর তাদেরও গুম করার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এক্স কমিটি আবদ এল হীরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এখন এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পালা।
আবদ এল হীর তার হোটেলে ফিরলেন এবং বাতি নিভিয়ে দিলেন। জোনাথানের স্থির বিশ্বাস হীর ঘুমিয়ে পড়েছেন। অতঃপর তিনি রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপলেন। বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পুরো হোটেল। ধোঁয়া অন্তর্হিত হওয়ার পর দেখা গেল আবদ এল হীরের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের বাহিনীর প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের আগুন সেক্ষেত্রে শুরু হয়ে গেল।
১৯৭৩ সালের ২৬ জানুয়ারি মোশে হানান ইশায়ী নামের এক ইসরাইলি তার ফিলিস্তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে মাদ্রিদের একটি পাবে এসেছে। পাব ত্যাগের পর তাদের সামনে এসে দাঁড়াল দু'জন লোক। ফিলিস্তিনি লোকটি পালিয়ে গেল। অতএব আগত দুই লোক গুলি করল ঈশায়ীকে। মৃত্যু হল ঈশায়ীর। আততায়ী দু'জন সটকে পড়ল।
কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল ঈশায়ীর প্রকৃত নাম বারুচ কোহেন। সে একজন নিষ্ঠাবান মোসাদ গোয়েন্দা। সে মাদ্রিদে ফিলিস্তিনি ছাত্রদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। যে লোকটি তার সঙ্গে পাবে দেখা করতে এসেছিল সে হল তার সন্ধানদাতা। ব্লাক সেপ্টেম্বরই তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। কোহেনকে হত্যার মাধ্যমে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের অনুসারীরা তাদের সহকর্মী আবদ এল হীরের হত্যার প্রতিশোধ নিল।
যাদক অফির নামের এক ইসরাইলি গোয়েন্দাকে ব্রাসেলসের ক্যাফেতে গুলি করে আহত করার জন্য ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের লোকদের দায়ী করা হয়। পত্র বোমার মাধ্যমে লন্ডনের ইসরাইলি দূতাবাসের এটাচে ড. আমিকে হত্যার জন্যেও ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলকে দায়ী করা হয়।
আবদ এল হীরের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর সাইপ্রাসে তাদের নতুন এজেন্ট নিয়োগ করে। সাইপ্রাসে পৌঁছানোর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঐ নতুন এজেন্ট রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। অতএব হোটেলে ফিরে বাতি নেভানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পূর্বসূরীর মতো তাকেও হত্যা করা হয়।
আরাফাত এবং আলি হাসান সালামেহ অতঃপর বড় ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তারা একটি বিমান ছিনতাই করে সেটি বিস্ফোরক দিয়ে ভর্তি করেন। অত:পর আত্মঘাতী হামলাকারী কমান্ডোদের ইসরাইল অভিমুখে পাঠানো হয়। ঐ বিমান তেল আবিবে বিধ্বস্ত হলে শতাধিক লোক নিহত হয়। নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংস তথা নাইন ইলেভেনের মতো ঘটনার ধারণার সঙ্গে এর সাজুয্য বিদ্যমান।
মোসাদ এজেন্টরা প্যারিসে ফিলিস্তিনিদের একটি গ্রুপের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। তারা একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। এক রাতে মোসাদের এক গোয়েন্দা ঐ দলে এক বুড়ো লোকের উপস্থিতি শনাক্ত করে। তার ছবি তুলে মোসাদ সদর দফতরে পাঠানো হলে ঐ বৃদ্ধের নাম জানা যায়। তার নাম বাসিল আল খুবাইশী। তিনি ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলের একজন সিনিয়র নেতা। খুবাইশী একজন সুপরিচিত আইনজ্ঞ। বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রফেসর এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় পন্ডিত। কিন্তু হামশারী ও ওয়াযেলের মতো জনাকয়েক ভয়ংকর মানুষের মতো খুবাইশীও গোপনে ভয়ংকর।
১৯৫৬ সালে তিনি বাদশাহ ফয়সালকে গাড়ি বোমার সাহায্যে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রাজকীয় গাড়ি বহরের পথে গাড়ি বোমাটি রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বোমাটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিস্ফোরিত হয়। আলি খুবাইশী পালিয়ে লেবানন চলে যান। পরে আমেরিকা যান। কয়েক বছর আগে তিনি গোল্ডা মেয়ারকে আমেরিকা সফরকালে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ঐ হত্যা চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি প্যারিসে সোসালিস্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আবার গোল্ডা মেয়ারকে হত্যার উদ্যোগ নেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হন।
আল খুবাইশী এরপরও সন্ত্রাসের পথ পরিহার করেননি। তিনি পিএলওতে যোগদান করেন এবং দলনেতা জর্জ হাবাশের ডেপুটি নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালের ৩০ মে লড এয়ারপোর্টে আরব ও জাপানী সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে ২৬জন লোক নিহত হয়। এই হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হলেন খুবাইশী। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল পুয়ের্তোরিকোর তীর্থ যাত্রী। তারা জেরুজালেমে এসেছিল। পরবর্তীতে আল খুবাইশী ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরে যোগদানের মাধ্যমে প্যারিসে যান। আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করতেই হয়তো তার আগমন। তিনি উঠেছেন ছোট্ট একটি হোটেলে। ৬ এপ্রিল একটি ক্যাফেতে রাতের আহার শেষে খুবাইশী তার হোটেলে ফিরছিলেন। মেডেলিয়েনের কাছে ওঁত পেতে ছিল মোসাদ টিম। মোসাদের আরও দু'জন গোয়েন্দা রাস্তায় এবং আরও দু'জন গাড়ির মধ্যে ছিল। এদের মধ্যে একজন স্বর্ণকেশীদের ন্যায় পরচুলা পরে ছিল। খুবাইশী কাছাকাছি আসতেই দুই মোসাদ গোয়েন্দার বন্দুক গর্জে ওঠার অপেক্ষায়। এ সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। বাতি জ্বালিয়ে একটি গাড়ি খুবাইশীর সামনে এসে দাঁড়ায়। ঐ গাড়িতে ছিল সুন্দরী এক মহিলা। দু'চারটি কথা শেষ করে খুবাইশী ঐ গাড়িতে গিয়ে উঠেন। গাড়িটি চলে গেলে মোসাদ গোয়েন্দারা হতাশ হয়ে পড়েন। ঐ নারী আসলে একজন পতিতা। সে আল খুবাইশীকে প্রস্তাব দিয়েছিল।
এক যৌন কর্মীর কারণে এতবড় একটা অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেল। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী অফিসার তার দলের গোয়েন্দাদের শান্ত থাকতে বলল। সে বলল, যৌন কর্মী ঠিকই আল খুবাইশীকে কিছুক্ষণের মধ্যে এখানেই নিয়ে আসবে। দলনেতা কী করে এটা জানত তা বলা কঠিন। কিন্তু তার কথামতই ওরা আগের জায়গায় কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেন। আল খুবাইশী যৌন কর্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হোটেলের দিকে সামান্য অগ্রসর হতেই অন্ধকার থেকে দু'ব্যক্তি তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো। এদের মধ্যে একজন ডেভিড মোসাদ।
আল খুবাইশী সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন কী হতে যাচ্ছে। ফরাসি ভাষায় তিনি না না বলে ওঠলেন। বললেন, গুলি করো না। নয়টি বুলেট খুবাইশীকে ঝাঝরা করে দিল। মোসাদ গোয়েন্দারা লাফ দিয়ে তাদের গাড়িতে উঠে সটকে পড়ল। পরের দিন পিএলও এক বিবৃতিতে আইন প্রফেসরের প্রকৃত পরিচয় বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করল।
এর কয়েক মাসের মধ্যে মোসাদ এবং কিডনের সদস্যরা বেশ কয়েকজন ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলের নেতাদের হত্যা করল গ্রীসে। তারা গ্রীসে এসেছিলেন জাহাজ কিনতে। সেসব জাহাজে বিস্ফোরক ভর্তি করে তা ইসরাইলে পাঠানোর কথা ছিল।
কিন্তু একটি প্রশ্ন তাড়া করে ফিরছে। মিউনিখ অলিম্পিকে হত্যাযজ্ঞ চালানোর মূল পরিকল্পনাকারী সালামেহ কোথায়? সালামেহ ছিলেন বৈরুত সদর দফতরে। তিনি তার পরবর্তী অপারেশনের পরিকল্পনা করছিলেন। এর মধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের মাধ্যমে থাইল্যান্ডে ইসরাইলি দূতাবাস দখল করা। কিন্তু ঐ অভিযান ব্যর্থ হয়। থাই জেনারেলদের কড়া হুমকি এবং ব্যাংককে নিযুক্ত মিসরীয় রাষ্ট্রদূতের চাপে সন্ত্রাসীরা জিম্মিদের মুক্ত করে অপদস্থ হয়ে থাইল্যান্ড ত্যাগ করেন।
সালামেহর পরবর্তী অভিযান চালানো হয় সুদানে সৌদি দূতাবাসে। খার্তুমের এই ফেয়ারওয়েল পার্টি এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল। সালামেহ'র অস্ত্রধারী লোকজন বলতে গেলে খার্তুমের প্রায় সকল কূটনৈতিককে জিম্মি করে ফেলেছিলেন। আরাফাতের নির্দেশে তারা অধিকাংশ কূটনৈতিককে ছেড়ে দেন। তবে যাদেরকে আটক করে রাখা হয় তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ক্লেও এ নোয়েল, একই দূতাবাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি জর্জ সি মুর এবং বেলজিয়ামের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গাই ঈদ। সালামেহর নির্দেশে চরম নিষ্ঠুরভাবে তাদের হত্যা করা হয়। প্রথমে তাদের পায়ে গুলি করা হয়। পরে রাইফেলের গুলিতে হত্যা করা হয়।
সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুদান সরকার তাদের ছেড়ে দেয়। কূটনীতিকদের হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠে। ইসরাইল মনে করে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের লোকদের মরণ কামড় দেয়ার এটাই প্রকৃত সময়। জেরুজালেমে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার নতুন করে অভিযান শুরুর নির্দেশে দেন।
১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল ৩৫ বছর বয়স্ক বেলজিয়ামের পর্যটক গিলবার্ট রিমবাউট বৈরুতের স্যান্ডস হোটেলে উঠেন। একই দিন আরেক পর্যটক দিয়েতার একই হোটেলে রুম ভাড়া নেয়। তাদের সমুদ্রের দিকে মুখ করা রুমগুলো দেয়া হয়। যদিও এরা কেউ কাউকে চিনত না। ৬ এপ্রিল ঐ হোটেলে আরও তিনজন পর্যটক উঠে। হাসিখুশী মুখের এন্ডলু ব্রিটিশ নাগরিক। ডেভিড মোলাড বেলজিয়ামের পাসপোর্ট নিয়ে দু'ঘণ্টা পর রোম ফ্লাইটে আসেন। এখানে তার নাম চার্লস বাউসাউ। বিকেলে আসা জর্জ এলডারও ব্রিটিশ নাগরিক। কিন্তু তার স্বদেশের ঠিক বিপরীত আচরণ। পৃথক একটি বীচ ও হোটেলে উঠেছেন চার্লস মেসি। তার আচরণ প্রকৃতই ইংরেজদের মতো। দু'বেলা আবহাওয়া বার্তা শোনা তার চাই-ই চাই। ছয়জন লোকই নিজ নিজ প্রক্রিয়ায় বৈরুত সফর করছেন। তারা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে শহরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থা, গলি ঘুপচি সবই পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা কয়েকটি দামি গাড়িও ভাড়া করেছেন।
৯ এপ্রিল ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নয়টি জাহাজের একটি বহর এবং ইসরাইলি নৌবাহিনীর টহল যান গভীর সমুদ্রে অবস্থান নেয়। এমবি মিভটাহ জাহাজে প্যারাসুট বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়। এর কমান্ডে রয়েছে কর্নেল আমনোন লিপকিন। এদের দায়িত্ব হল পিএলও'র সদর দফতরে হামলা চালানোও। এহুদ বারাকের অধীনে রয়েছে সায়েরেত মাটকাল ইউনিট। আরেকটি জাহাজেও রয়েছে প্যারাসুট বাহিনী। তাদের অভিযানের লক্ষ্য ভিন্নতর। জাহাজে চড়ার আগে তাদেরকে চার ব্যক্তির ছবি দেখানো হয়। তাদের মধ্যে তিনজন হলেন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের সুপ্রিম কমান্ডার আবু ইউসেফ, ফাতাহর শীর্ষ অপারেশন কমান্ডার কামাল আদওয়ান। ইসরাইল অধিকৃত এলাকায় ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলের অপারেশন চালানোর প্রধান ব্যক্তিও তিনি। আরেকটি ছবি ফাতাহ গ্রুপের প্রধান মুখপাত্র কামাল নাসেরের। মোসাদ গোয়েন্দাদের বলা হল, ওরা তিনজনই রিউ ভারদুনের একই বাড়িতে বসবাস করেন। চতুর্থ ছবিটি হল আলি হাসান সালামেহ'র। কেউ জানে না তিনি কোথায় আছেন।
কমান্ডোদের বেসামরিক পোশাক পরানো হল। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বোটগুলো বৈরুতের দিকে এগুতে থাকল। যাত্রীরা উইগ পরিধান করল। এহুদ বারাক মহিলাদের পোশাক পরল। সে তার ব্রেসিয়ারের মধ্যে বিস্ফোরক চার্জার লুকিয়ে রাখল। বেশ কয়েকটি রাবারের ডিঙ্গি বৈরুতের নির্জন দ্বীপে। এইসব ডিঙ্গিতে মাদারশীপ থেকে আনীত প্যারাসুটবাহী সৈন্যরা রয়েছে। তারা বীচে ছয়টি গাড়ি দেখল। কে কোনো গাড়িতে উঠবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গাড়িগুলো নিয়ে যেখানে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের নেতাদের বাস সেখানে গেলেন।
মিলিটারী কমান্ডোদের যে বহরটি পপুলার ফ্রন্টের সদর দফতরের দিকে যাচ্ছিল তারা আক্রমণ পরিচালনার মহড়া দেশে বসেই করে গিয়েছিল। তেল আবিবের শহরতলীতে এই মহড়া হয়। এখানে রাতে ইসরাইলের চীফ অব স্টাফ ডেভিড এলাজার ঐ মহড়া দেখতে যান। সুদর্শন এক লেফটেন্যান্ট ডেভিডকে মহড়াকালে জানান, বৈরুতের সুনির্দিষ্ট ভবনটি বিধ্বস্ত করতে আমরা ৫২০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহার করব। কিন্তু ডেভিড বললেন, এত বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়। বেশি বিস্ফোরক ব্যবহারে পাশের ভবনগুলোর ক্ষতি হতে পারে। আর বহু বেসামরিক লোকের বাস এসব স্থানে। অত:পর তিনি পকেট থেকে নোট বুক বের করে লেফটেন্যান্টকে দেখালেন যে, মাত্র ৮০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহারই পপুলার ফ্রন্টের ভবন ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীতে ৮০ কিলোগ্রাম ব্যবহারের সিদ্ধান্তই বহাল হল।
প্যারাসুটারদের পপুলار ফ্রন্টের সদর দফতর দখল নিতে তাদের দুই কম্যান্ডোর জীবনহানি হল। অতঃপর তারা ঐ সদর দফতর দখলে নিয়ে ৮০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটালে ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয় এবং বহু সন্ত্রাসী নিহত হয়। কিন্তু আশপাশের কোনো ভবনের ক্ষতি হয়নি।
একই সময়ে দক্ষিণ বৈরুতের বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে আক্রমণ করে ইসরাইলি গোয়েন্দারা। এই আক্রমণের পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। তা হল সন্ত্রাসীর পাল্টা আক্রমণ চালায় কী না এমনকী লেবাননের সেনাবাহিনীও। কিন্তু কোনো তরফ থেকেই কোনো সাড়া মেলেনি।
ইতিমধ্যে সায়েরেত মাটকাল কম্যান্ডোরা রিউ ভারদুম ভবনে চলে গেছে। ঐ বাড়িতে ঢোকার সময় দুই লেবাননী পুলিশ সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তারা এক প্রেমিক যুগলকে দেখল। এই প্রেমিক যুগলের মধ্যে রোমিওর ভূমিকায় ছিল সুপরিচিত যোদ্ধা মুকী বেটজার আর প্রেমিকা জুলিয়েটের ভূমিকায় ছিল এহুদ বারাক। পুলিশ সরে গেলেই মোসাদের লোকজন কামাল আদওয়ান, কামাল নাসের এবং আবু ইউসেফের ফ্ল্যাট ভেঙে ভেতরে ঢুকল। এরা একেকজন একেক ফ্লোরে থাকতেন। ভেতরে ঢুকেই তারা তিন যোদ্ধাকে হত্যা করল। আবু ইউসেফের স্ত্রী তার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে আহত হন।
এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময়ই ইসরাইলি গোয়েন্দারা ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের নেতাদের ড্রয়ারে রক্ষিত মূল্যবান কাগজ পত্রাদি হস্তগত করে। অতঃপর তারা গাড়ি চালিয়ে বীচে চলে যায়। সেখানেই রয়েছে তাদের জন্য অপেক্ষমাণ রাবারের ডিঙ্গি। অবশ্য তিন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নেতাদের মারতে গিয়ে এক ইতালীয় মহিলাও নিহত হন।
অত:পর টাস্ক ফোর্সের লোকজন মাদারশীপে একত্রিত হয়। জাহাজটি ইসরাইলের দিকে যাচ্ছিল। আসলে এই অভিযান প্রকৃত অর্থেই সফল। পিএলও এলপি সদর দপ্তরের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের নেতারা বিশেষ করে সংস্থার কমান্ডার আবু ইউসেফও নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইসরাইলি কমান্ডোরা জানত না যে, রুয়ে ভারদুন ভবন থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরের একটি ভবনে খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন আলি হাসান সালেমেহ। পরদিন আবু ইউসুফের মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হলে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের নেতা হন আলি হাসান সালেমেহ।
নিহতদের ড্রয়ার থেকে উদ্ধারকৃত কাগজপত্র পরীক্ষা করে মোসাদ 'পাসওভার একেয়ার' সম্পর্কে অবগত হয়। মোসাদ এই রহস্য নিয়ে দু'বছর ধরে ব্যতিব্যস্ত ছিল। পাসওভার একেয়ার নিয়ে এখন দু'কথা বলি।
১৯৭১ সালের এপ্রিলে দুই সুন্দরী ফরাসি মহিলা ইসরাইলের লাড বিমানবন্দরে নামে ভুয়া পাসপোর্টে। তাদের আগমন সম্পর্কে বিমানবন্দরকে আগেই অবহিত করা হলে তাদের কাপড়-চোপড় ও আন্ডার গার্মেন্ট সার্চ করে ১২ পাউন্ড সাদা পাউডার উদ্ধার করা হয়। তাদের হাইহিলের মধ্যেও ঐ পাউডার ছিল। এই পাউডার দিয়ে শক্তিশালী প্লাস্টিক বিস্ফোরক বানানো যায়। তাদের সুটকেসে প্রচুর ডেটোনেটরও পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে দুই তরুণীই কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা জানায়, তারা দুবোন এবং তাদের বাবা মরক্কোর একজন ধনী ব্যবসায়ী। প্যারিসে এক লোক তাদের চুক্তিবদ্ধ করলে তারা এডভেঞ্চারের বশে স্মাগলিংয়ের কাজ করে।
ঐ দিন বিকেলে তেলআবিবের একটি ছোট্ট হোটেলে তল্লাশী চালিয়ে ইসরাইলি পুলিশ এক বৃদ্ধ দম্পতিকে আটক করে। পুলিশ তাদের রেডিও ট্রানজিস্টার খুলে প্রচুর পরিমাণ বিস্ফোরক আটক করলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পরের দিন আরেক ফরাসি তরুণীকে আটক করে ইসরাইলি পুলিশ। সে-ও ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে ইসরাইলে ঢুকেছে। সে যে একজন পেশাদার সন্ত্রাসী, একজন ফ্যানাটিক মার্ক্সবাদী মোসাদ তা জানত। সে বহুবার সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নিয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে এই দলটি জানায়, তারা তেলআবিবের নয়টি বিখ্যাত হোটেল পর্যটন মৌসুমে উড়িয়ে দিতে ইসরাইল ঢুকেছে। ইসরাইলিসহ ব্যাপকসংখ্যক পর্যটক হত্যা তাদের টার্গেট। ইসরাইলকে অস্থিতিশীল করাই তাদের লক্ষ্য।
এদের সকলকে জেলে পাঠানো হল। কিন্তু এদের নেপথ্যের মানুষটি হলেন মো: বউদিয়া। আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত বউদিয়া প্যারিসে থিয়েটারের পরিচালক। অনেক নারীর সঙ্গেই তার পরকীয়া বিদ্যমান।
বউদিয়া মূলত জর্জ হাবাম এবং পিএফএলপির নির্দেশনায় চলেন। পাসওভার টিম ধরা পড়ে গেলে বউদিয়া ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপে যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের প্যারিস শাখার প্রধান। মোসাদের সঙ্গে সংযুক্তির দোহাই দিয়ে প্যারিসে এক সিরিয় সাংবাদিককে তারা হত্যা করেছিল। ইউরোপে ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের অভিযান পরিচালনার দায়িত্বেও বউদিয়া।
১৯৭৩ সালে মোসাদের একটি টিম বউদিয়াকে হত্যার টার্গেট নিয়ে প্যারিসে আসে। বউদিয়ার নতুন প্রেমিকার নাম-ঠিকানা মোসাদের হাতে ছিল। ঐ প্রেমিকার বাড়ির আশে-পাশে মোসাদ এজেন্ট লুকিয়ে অবস্থান নেয়। বউদিয়া প্রেমিকার কাছে আসেন বটে কিন্তু পরদিন অন্যরা কাজে বেরিয়ে গেলে বউদিয়ার কোনো পাত্তা নেই। এক মাস শেষে মোসাদ এজেন্ট উপলব্ধি করে যে, বউদিয়া প্রতিদিনই তার প্রেমিকার বাসায় আসেন এবং মহিলার সাজে অন্যদের সঙ্গে বেরিয়ে যান।
বর্তমানের যে সমস্যাটি, বউদিয়া কিছুদিন হল আর তার প্রেমিকার কাছে আসেন না। ফলে মোসাদ তাকে হারিয়ে ফেলে। তবে তাদের কাছে একটা তথ্য অবশ্য ছিল। আর তা হল বউদিয়া প্রতিদিন সকালে সাবওয়ে মেট্রো ও কানেকটিং ট্রেন ধরে মিটিং করতে যান। কিন্তু সাবওয়েতে লক্ষ মানুষ। বহুরূপী বউদিয়াকে ধরা অত সহজ নয়।
মোসাদ বউদিয়ার কয়েকশত ছবি বিলি করে গোয়েন্দাদের মধ্যে এবং সাবওয়েতেই নিয়োজিত অসংখ্য গোয়েন্দাদের মধ্যে একজন বউদিয়াকে চিহ্নিত করে ফেলে। গোয়েন্দারা সারা রাত বউদিয়ার গাড়ি অনুসরণ করে তার নতুন প্রেমিকার বাড়ি ও বউদিয়ার সন্ধান পায়। ১৯৭৩ সালের ২৯ জুন বউদিয়া নিজের গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিধ্বস্ত হয়। মারা যান বউদিয়া। ইউরোপের রিপোর্টারদের সংবাদ, মোসাদ-প্রধান জভি জামির অদূরে দাঁড়িয়ে বউদিয়ার গাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্যাবলী দেখছিলেন।
মোসাদ কর্মকর্তাদের এই সাফল্য উৎসবে রূপান্তরের সুযোগ নেই। এরি মধ্যে জরুরি খবর এল ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের বিশেষ বার্তাবাহক বেন আমান আলি হাসান সালামেইর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নরওয়ের পর্যটন কেন্দ্র লিলেহ্যামারে যাচ্ছেন।
এর কয়েকদিনের মধ্যে মোসাদ লিলেহ্যামারে পজিশন নেয়। এই শান্ত পাহাড়ী এলাকায় সালমেহরের কী ধরনের কাজ থাকতে পারে কারো মাথায় তা ঢুকছিল না। মোসাদ বেন আমানাকে সেখানাকার সুইমিং পুলে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারার আদলে এক লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখে। মোসাদ ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হয় এই লোকটিই সালামেহ। মোসাদ গোয়েন্দাদের একজন অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করে। তার বক্তব্য সালামেহ কিছুতেই নরওয়েজিয়ান ভাষা বলতে পারেন না।
মোসাদ কথিত সালামেহর সঙ্গে নরওয়ের এক নারীর যোগসাজশ প্রত্যক্ষ করে। এই কমবয়সী নারী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সালামেহকে কতল করার যাবতীয় উদ্যোগ নেয় মোসাদ। গোয়েন্দা সংখ্যা বাড়ায়। কিছু পর্যটকের মোসাদের অতিমাত্রায় তৎপরতা নজর কাড়ে। ছোট্ট শহর বলেই হয়তো। কেননা পর্যটকরা যেসব দ্রষ্টব্য স্থানে যাচ্ছে এই পর্যটকদের গন্তব্য সেই স্থানে।
১৯৭৩ সালের ২১ জুলাই কথিত সালমেহ এবং ঐ অন্তঃসত্ত্বা তরুণী সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার পথে এক নির্জন স্থানে মোসাদের কবলে পড়ে। মোসাদ কথিত সালেমেহকে চৌদ্দটি গুলি করে হত্যা করে।
তাহলে রেড প্রিন্স নিহত হলেন। মোসাদ ঘাতকসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নরওয়ে ছেড়ে গেছে। বাড়ি ও গাড়ি ভাড়া দেয়ার জন্য থেকে যাওয়া কয়েকজন গোয়েন্দা এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় গ্রেফতার হয়। এই গ্রেফতারের মাধ্যমে মোসাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। অনেক কাগজপত্র উদ্ধার করে নরওয়ের পুলিশ। ইসরাইলি দূতাবাসের এক নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গেও মোসাদের যোগসূত্র উদঘাটিত হয়।
পরদিন নরওয়ের পত্র-পত্রিকায় ইসরাইলি গোয়েন্দাদের গ্রেফতারের খবর ছাপা হলে মোসাদের মর্যাদা ও ক্রেডিবিলিটি ক্ষুণ্ণ হয়। মোসাদের আরও বেশি ক্ষতি হয় যখন পত্রিকায় ছাপা হয় যে ভুল লোককে মোসাদ হত্যা করেছে।
নরওয়েতে যাকে হত্যা করেছে মোসাদ তিনি আলি হাসান সালমেহ নন। তার নাম আহমদ বুশিকি। মরক্কোর এই ওয়েটার নরওয়েতে চাকরি খুঁজতে এসেছিল। বুশিকি এদেশে এসে নরওয়ের এক নারীকে বিয়ে করে। তার স্ত্রীই সাত মাসের ঐ অন্তঃসত্ত্বা মহিলা।
মোসাদ গোয়েন্দাদের গ্রেফতার ও বিচার নিয়ে বিশ্বমিডিয়ায় তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। বিচারে কয়েক মোসাদ গোয়েন্দাকে দীর্ঘ কারাবাস দেয়া হয়।
নরওয়ের এই বিপর্যয়ের পর মোসাদ তাদের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বাড়ি ভাড়া নেয়ার পাট চুকে যায়। অনেকের চাকরি যায় এবং সোর্সের তালিকা পরিবর্তন করা হয়। মোসাদ আহমদ বুশিকিকে হত্যার দায় স্বীকার করে তার পরিবারকে ৪ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। তবে মোসাদের মর্যাদার যে ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য অনেক অনেক বেশি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার মোসাদ-প্রধান জভি জামিরকে আলোচ্য প্রকল্পের ইতি টানার নির্দেশ দেন। এদিকে সামনে আরও বড় ঘটনা ঘটে। ৬ অক্টোবর মিসর ও সিরিয় হঠাৎ করে ইসরাইল আক্রমণ করে। শুরু হয় ইমুম কিন্তুর যুদ্ধ।
এই ঘটনার পর দু'বছর অতিক্রান্ত হয়। ১৯৭৫ সালে বিশ্বের সেরা সুন্দরীকে এক বৈরুত পরিবার সম্বর্ধনা দেয়। চার বছর আগে এই সুন্দরী মিস ইউনিভার্স হয়েছিলেন। এই গর্জিয়াস লেবানী সুন্দরী ফলশ্রুতিতে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার প্রচুর সুযোগ পান। লেবানন ফিরে এই সুন্দরী সুপার মডেল হিসেবে তার ক্যারিয়ার গড়তে যেমন সমর্থ হন তেমনি একটি ফ্যাশন বুটিকের মালিকও হন।
যাহোক ১৯৭৫ সালের ঐ পার্টিতে ঐ বিশ্ব সুন্দরী সুদর্শন, ক্যারিশমেটিক এক তরুণের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা ভালোবাসায় সিক্ত হন। এবং দু'বছর পরে ১৯৭৭ সালের ৮ জুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
আর এই সুখী বরটি হলেন আলি হাসান সালেমেহ।
১৯৭৩ সালে ব্লাক সেপ্টেম্বর সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটলে আলি হাসান সালেমেহ আরাফাতের দক্ষিণ হস্তে পরিণত হন। আরাফাত তাকে পুত্র হিসেবে দত্তক নেন। এমনও প্রচারণা ছিল একদিন তিনি আরাফাতের স্থলাভিষিক্ত হবেন। হবেন দলীয় প্রধান।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের অবলুপ্তির পর সালামেহ ফোর্স সেভেনটিন নামের একটি গ্রুপের প্রধান হন। একবার সালামেহ আরাফাতের সফরসঙ্গী হয়ে নিউইয়র্কে যান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদানকালেও আরাফাতের কোমরে রিভলবার ছিল। আরাফাত ও সালেমেহ এক সঙ্গে মস্কো যান এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইসরাইলের আতিশয্য দেখে সিআইএ সালেমেহর প্রতি আকৃষ্ট হয়। সিআইএ রেড প্রিন্স সালেমেহ'র রক্তাক্ত অতীত আজ বিস্মৃত হতে চায়। সালেমেহ মিউনিখ ম্যাসাকারের প্রধান ব্যক্তি। খার্তুমে যে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করা হয়েছিল তারও পরিকল্পনাকারী এই সালেমেহ। যাহোক সিআইএ বিশ্বের এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে তাদের গোয়েন্দা নিয়োগ করে। আমেরিকা ভেবেছিল সালেমেহ তাদের অনুগত হবেন। সিআইএ তাকে হাজার হাজার ডলার অফার করলেও সালেমেহ একটি অফার গ্রহণ করেছিলেন। সিআইএর টাকায় সালমেহ দীর্ঘদিন হাইওয়াইতে অবকাশ যাপন করেন।
সালেমেহর জীবনধারা বদলে গিয়েছিল। তার বন্ধুরা মনে করতেন আগের মতো ঝুঁকি নেই সালেমেহর জীবনে। কিন্তু সালেমেহ ভাবতেন তার উল্টোটা। তিনি জানতেন, তাকে আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা হবে না। এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন আমাকে কেউ বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না।
ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল।
ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বরের বিলুপ্তির পর ইসরাইলে প্রশাসনে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বিদায় নিয়েছেন। তার উত্তরসূরী আইজাক রবীন পদত্যাগ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর মেনাচেম বেগিন। মোসাদ-প্রধান জভি জামিরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জেনারেল ইটসাক হোকি। এদিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৬ সালে এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান উগান্ডায় ছিনতাই হলে ইসরাইলের ছত্রীসেনা ও সায়েরের্ত মাটকাল এক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে সেটি উদ্ধার করে। ফাতাহর লোকজন ইসরাইলে ঢুকে একটি বেসামরিক বাস ছিনতাই করলে ৩৫ যাত্রী নিহত হয়। যদিও ফাতাহ'র লোকজন শেষতক হার মানে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেগিন কঠোর মনোভাব গ্রহণ করলে সন্ত্রাসীদের তালিকায় আবার সালেমেহ'র নাম নথিভুক্ত হয়।
ছদ্মবেশে এক মোসাদ গোয়েন্দাকে বৈরুতে পাঠানো হয়। সালেমেহ যে ক্লাবে ব্যায়াম করতেন এই গোয়েন্দাও সেই ক্লাবের সদস্য হন। একদিন এই গোয়েন্দার মুখোমুখি হন সালেমেহ। তখন তিনি ছিলেন উলঙ্গ। সিদ্ধান্ত হয় সালেমেহকে ব্যায়ামাগারে হত্যা করা সহজ হবে। আরেকপক্ষ বলল, এতে অনেক সাধারণ নাগরিকও নিহত হতে পারে।
এই সময় দৃশ্যে প্রবেশ এক ইংলিশ মহিলার। এই রহস্যময়ী সিঙ্গেল, এবং চার বছর ধরে জার্মানিতে তার বসবাস। এই মহিলা গরীব শিশুদের অনুদান দিয়ে থাকে-সমাজকর্মী হিসেবে। প্রতিবেশীরা তাকে পেনিলোপে নামে জানে। সে একবার আলি হাসান সালামেহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বলে জানা যায়। এই নিঃসঙ্গ মহিলা সাধারণ কাপড়-চোপড় পরত। রাস্তায় প্লেটে খাবার নিয়ে বিড়ালকে খাওয়াত। ছবি আঁকা তার হবি। তবে সে সব ছবি দেখে তাকে খুব বেশি নাম্বার দেয়া যাবে না।
পেনিলোপে লক্ষ্য করল দুটি গাড়ি প্রতিদিন একই সময়ে বেরিয়ে ফাতাহ সদর দফতরে যায়, দুপুরে খানিক সময়ের জন্য ফিরে আসে আবার বিকেলে একই সময়ে একই স্থানে যায়। বাইনোকুলার দিয়ে উদ্‌ঘাটন করা হল যে, শেভ্রোলেট গাড়িটিতে দু'জন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে পেছনের সিটে বসেন সালামেহ। ল্যান্ড রোভার গাড়িতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা থাকে এবং তাকে ফলো করে।
সুন্দরী মডেল জিয়োরজিনাকে বিয়ের পর সালামেহর জীবনধারা অনেকটা কেরানির জীবন হয়ে উঠে। সোলুব্রা এলাকায় এই দম্পতির বাস। তবে গোয়েন্দা বা নেতৃস্থানীয়রা যে প্যাটার্নে তাদের জীবন পরিচালিত করে সালেমেহ সে পথ থেকে সরে গেছেন। যেমন এক বাড়িতে এ ধরনের লোকেরা বেশি দিন বসবাস করেন না। ঘড়ি ধরে যাতায়াত করেন না।
যাহোক সালেমেহকে আটকের জন্য মোসাদ গোয়েন্দারা নানা নাম ও পরিচয়ে বৈরুতে আসা শুরু করল। এরি মধ্যে তিনটি ইসরাইলি মিসাইল বোট বৈরুত ও যৌনিয়েহ বন্দরের মাঝামাঝি বীচে অবস্থান নিল। তারা ভেজা বালুতে প্রচুর পরিমানে বিস্ফোরক রেখে গেল। মোসাদের গোয়েন্দারা যা করে, অভিযানের চূড়ান্ত হতেই কয়েকজন দেশ ছেড়ে চলে যায়। গেলও। পৌনে চারটার সময় সালেমেহ তার গাড়ি দেহরক্ষী নিয়ে ফাতাহ সদর দফতরে যথারীতি যাবেন। গাড়িটি সামান্য সামনে এগুলো মাত্র বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমাটি ফাটানো হয়। দক্ষ মোসাদ গোয়েন্দা রিমোটটি দাবিয়ে দেয়। দুই গাড়িই বোমার আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলে আলি হাসান সালেমেহসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন।
দামেস্কের একটি হোটেলে আরাফাত মিটিং করছিলেন। সালেমেহর মৃত্যু সম্বলিত টেলিগ্রামটি তার হাতে পৌঁছলে তিনি কেঁদে ফেলেন।
ঐ দিনই রাবারের একটি ডিঙ্গি যাউনিয়েহ বীচে ভিড়লে মোসাদ গোয়েন্দা কোলবার্গ ও সেই ইংলিশ রমণী লাফ দিয়ে তাতে উঠেন। তাদের মাদার শীপে পৌঁছে দেয়া হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা ইসরাইলে পৌঁছে যায়। লেবাননের পুলিশ মোসাদ গোয়েন্দাদের ভাড়া করা গাড়িটি ঐ বীচ থেকে উদ্ধার করে বটে।
পেনিলোপে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করত। পরে সে স্থায়ীভাবে ইসরাইলে চলে যায়। সে একজন ব্রিটিশ ইহুদি। যাহোক ব্ল‍্যাক সেপ্টেম্বর দলটি সালেমেহর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্ন হলে গেল।
এরপর পেরিয়ে গেছে বহু বহু বছর। ১৯৯৬ সালের ড্যানিয়েল বেন সিমন নামের এক ইসরাইলি সাংবাদিককে তার বন্ধুরা জেরুজালেমের এক পার্টিতে দাওয়াত দিল। সেই পার্টিতে চোস্ত ইংরেজি বলতে পারদর্শী এক সুদর্শন তরুণের সঙ্গে সিমনের পরিচয় ঘটল। সে নিজেই পরিচিত হয়ে তার নাম বলল, আলি হাসান সালামেহ।
সিমন বলল, এই নামে বহু আগে একজন ছিলেন বটে। মিউনিখে ইসরাইলি এথলেটদের হত্যাকাণ্ডে তিনি পরিকল্পনাকারী ছিলেন।
সুদর্শন তরুণটি বলল, সেই ব্যক্তি আমার বাবা। মোসাদ তাকে হত্যা করেছে। তরুণটি আরও জানাল, সে তার মায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে বসবাস করছে। আরাফাতের মেহমান হয়ে এদেশে এসেছে।
সুদর্শন তরুণটি বলল, আমি বিশ্বাস করি না এমন একটা দিন আসবে সেদিন ইসরাইলি মেয়েদের সঙ্গে আমি ডান্স করতে পারব। তরুণটি ইসরাইলিদের আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করল। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনীদের দ্বন্দ্ব সে মেটাতে চায় বলেও জানাল। বলল, আমি একজন শান্তিবাদী মানুষ। শতকরা একশ ভাগ। আমার বাবা যুদ্ধাবস্থায় এখানে বাস করতেন। সেজন্য তিনি তার জীবন দিয়ে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছে। আমি আশা করি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ার প্রেরণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

📘 মোসাদ > 📄 সিরিয়ায় ইসরাইলি গুপ্তচরের ফাঁসি

📄 সিরিয়ায় ইসরাইলি গুপ্তচরের ফাঁসি


প্রিয় নাদিয়া, প্রিয় আমার পরিবার এই লেখাই আমার শেষ লেখা। আমি আশা করব তোমরা সকলে একত্রে সারাজীবন বসবাস করবে। আমি আমার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইছি। আমার স্ত্রী যেন নিজ খেয়াল রাখে এবং সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়--- আমার প্রিয়তম নাদিয়া, তুমি আবার বিয়ে করতে পার। আমার ছেলে-মেয়েরা তাহলে একটা বাবা পাবে। এক্ষেত্রে তোমাকে সর্বাত্মক স্বাধীনতা দিলাম। আমার শেষ চুম্বন নাও। প্লীজ আমার আত্মার জন্য প্রার্থনা কর। ইতি তোমার এলি।
১৯৬৫ সালে ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের নতুন প্রধান মেইর অমিতের টেবিলে চিঠিটি পৌছে। গোয়েন্দাগিরির ইতিহাসে অন্যতম বলিষ্ঠ গোয়েন্দা এলি কোহেন কাঁপা কাঁপা হাতে এই চিঠিটা লিখেছেন। সিরিয়র রাজধানী দামেস্কে অকাল মৃত্যু হতে যাচ্ছে এই গোয়েন্দার। মৃত্যুর আগে লেখা হয়েছে এই চিঠি।
এলি কোহেনের গোয়েন্দাবৃত্তির জীবন কুড়ি বছরের। তিনি একজন মিসরীয় ইহুদি। তরুণ, সুদর্শন এলি কোহেনের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে তার এক পুলিশ বন্ধুর দেখা। কথা প্রসঙ্গে পুলিশটি বলে যে, আজ আমরা বেশ কিছু ইসরাইলি সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করব। এদের মধ্যে একজন হল শমুয়েল আজর।
এলি কোহেন কথাটা শুনে চমকে গেলেও বন্ধু পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে হনহনিয়ে নিজ বাসায় গেলেন। তার ভাড়া বাসা থেকে মুহূর্তে বিস্ফোরক, হ্যান্ডগান এবং ডকুমেন্টসমূহ সরিয়ে ফেললেন। এলি কোহেন প্রকৃতপক্ষে মিসরে চোরাগুপ্তা হামলাদির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মিসর থেকে ইসরাইলে যেতে আগ্রহী ইহুদিদের পালানোর পথ আবিষ্কারে এবং তাদের জন্য ভুয়া কাগজ তৈরির কাজেও ব্যাপৃত ছিলেন এলি কোহেন। মিসরের জেলে আটক ইসরাইলি বন্দিদের মুক্ত করতে তৎপর একটি আন্ডারগ্রাউন্ড দলের সঙ্গেও এলি কোহেন সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
১৯৫৪ সালে প্রথমার্থে ইসরাইলি নেতারা জানতে পারেন ব্রিটিশ সরকার মিসর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে। মিসর আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচে শক্তিশালী এবং ইসরাইলকে বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারে না। ব্রিটিশ সৈন্য মিসরে অবস্থানের ফলে সেখানে তারা সুয়েজ খালকে ঘিরে অসংখ্য সামরিক স্থাপনা ও বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করে। ইসরাইল মনে করে সব মিলিয়ে মিসরের ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের ওপর ব্রিটিশদের প্রভাব রয়েছে। এখন ব্রিটিশরা মিসর ছেড়ে গেলে ঐ সব সামরিক স্থাপনা ও প্রভূত অস্ত্রশস্ত্র মিসরের হাতে এসে পড়বে। আবার মিসরের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এদিকে ইসরাইল তখন নবীন রাষ্ট্র। মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীনতা পেয়েছে।
সর্বোপরি ইসরাইলের প্রতি মিসরের ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত। কেননা ১৯৪৮ সালের ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধে মিসর তাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। নতুন শক্তি বলে বৃহৎ দেশ মিসর ইসরাইলকে এবার এক হাত দেখে নেবে।
ব্রিটিশদের মিসর থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত কী প্রত্যাহার করানো যায়? বেন গুরিয়েন এখন আর ইসরাইলের শীর্ষ পদে নেই। তিনি অবসরে গেছেন। তার স্থলাভিষিক্ত যিনি হয়েছেন সেই মোশে শ্যারেট মডারেট কিন্তু দুর্বল চিত্তের লোক। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিনহাস ল্যাভেন প্রতিনিয়ত তার সঙ্গে কোন্দলে লিপ্ত।
শ্যারেটকে না জানিয়ে এবং মোসাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ল্যাভেন এবং সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর (আমান) প্রধান কর্নেল বেঞ্জামিন ভয়ংকর ও বোকাসুলভ একটা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ব্রিটিশ ও মিসরের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ঘেঁটে তারা দেখতে পান, ব্রিটিশরা যে কোনো সময় আবার মিসরে ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে যদি মিসরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ইসরাইলের ঐ দুই নেতা সারল্যের সঙ্গে মিসরে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চাঙ্গা করান। মিসরের সর্বত্র শুরু হয় বোমাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা ইত্যাদি। ল্যাডেন ও কর্নেল বেঞ্জামিনের নির্দেশ মোতাবেক মিসরে অবস্থিত ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা-বোমাবাজি শুরু হয়ে যায়। ঐ দুই দেশের লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সিনেমা, ডাকঘর এবং বেসামরিক ভবনাদি ছিল হামলার লক্ষ্যবস্তু। উদ্দেশ্য একটাই আইন, শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে ব্রিটিশরা যেন মিসর ছেড়ে চলে না যায়। গোয়েন্দা সংস্থা আমান মিসরের বেশ কিছু ইহুদিকে এই গোলযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব দেয়। এসব তরুণরা আবার ইসরাইলের অনুকূলে সর্বদা জীবন দিতে প্রস্তুত। তবে এই আচরণের মাধ্যমে গোয়েন্দা বৃত্তিতে যে পূত পবিত্র এবং নৈতিক দিক থাকে তা লংঘিত হয় এবং খোদ ইসরাইলের অন্য গোয়েন্দা সংস্থা তার সমালোচনা শুরু করে। তাদের যুক্তি হল, স্থানীয় ইহুদিদের দ্বারা গোলযোগ করালে মিসরের অন্য ইহুদিদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। সর্বোপরি এসব তরুণ-তরুণীদের দাঙ্গা করার প্রাথমিক প্রশিক্ষণও নেই।
ইহুদিদের নিক্ষিপ্ত বোমাগুলো যেমন শক্তিশালী ছিল না তেমনি অপরিণত। চশমার খাপে কিছু বিস্ফোরক ভরে এগুলো তৈরি। কন্ডোমের মধ্যে বিস্ফোরক ভরেও কিছু দুর্বল বোমা বানানো হল। আসলে বোমাবাজির পরিকল্পনা প্রথম দিকেই ভেস্তে যায়। ২৩ জুলাই ফিলিপ নাটাসোন নামের এক লোকের পকেটেই একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার একটি সিনেমা হলের গেটে ইহুদিবাদী ফিলিপের পকেটে এই বোমাটি বিস্ফোরিত হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এভাবে সকল বোমাবাজ ঐ সূত্র ধরে গ্রেফতার হয়।
এলি কোহেনও গ্রেফতার হয়েছিলেন কিন্তু তার বাড়িতে আপত্তিকর কিছু না পাওয়ায় মুক্ত হন। কিন্তু মিসরের পুলিশ তার নামে একটা ফাইল খোলে। এতে তার চৌদ্দগোষ্ঠীর বৃত্তান্ত তার ছবি নথিভুক্ত করা হয়। বিবরণীতে লেখা হয়, ১৯২৪ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এলি কোহেনের জন্ম। ফরাসি কলেজ থেকে এলি গ্রাজুয়েশন করেছেন এবং কায়রোর ফারুক ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
এলি কোহেনের সাত ভাই-বোন অজানার উদ্দেশ্যে দেশান্তরী হয়েছেন। তবে মিসর পুলিশের জানা ছিল না যে, এলি কোহেনের পরিবার স্থায়ীভাবে ইসরাইলে চলে গেছেন।
গ্রেফতার হওয়া সত্ত্বেও এলি কোহেন মিসরে থেকে যেতে মনস্থ করেন। মিসরের জেলে তার সমভাবাপন্ন কর্মীদের কাকে কী পরিমাণ নির্যাতন করা হচ্ছে তা তিনি লিখে রাখতে শুরু করেন।
অক্টোবরে মিসর সরকার ইসরাইলি গোয়েন্দাদের শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়। ৭ ডিসেম্বর কায়রোতে এসব মামলার শুনানি শুরু হয়। দলবলসহ গ্রেফতার হওয়া ম্যাক্স ব্যানেট গ্রেফতার হলে কবজি কেটে আত্মহত্যা করে। সব মামলাতেই রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। এদিকে মিসরের এই কড়াকড়িতে বিশ্ববিবেক তীব্র প্রতিবাদ করে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতবৃন্দ এবং বহু দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিচারের নামে প্রহসনের নিন্দা করে তা বন্ধের দাবি জানান। এদিকে মিসরের একটি বিশেষ আদালত একটি মামলায় কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয় এবং ড. মোশে মারজুক ও প্রকৌশলী আজরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। চারদিনের মাথায় কায়রো জেলখানায় তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়। এই ফাঁসির প্রতিবাদে ইসরাইল সরকার দেশের মানুষের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সবারই প্রশ্ন, এই ধরনের বোমাবাজির বোকা বোকা পরিকল্পনার নেপথ্যে কে। বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ল্যাভোন ও গিবলি পরস্পরকে দোষারোপ করেন। ল্যাভোনকে পদত্যাগে বাধ্য করে সেখানে বেন গুরিয়নকে ফিরিয়ে আনা হয়। কর্নেল গিবলিকে আর পদোন্নতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হলে এক পর্যায়ে তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।
মিসরে এলি কোহেন তার কয়েকজন সেরা বন্ধুকে হারালেও তিনি সেখানেই থেকে যেতে মনস্থ করেন। আর নাশকতামূলক কার্যকলাপও তিনি সমানে চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৫৭ সালের সুয়েজ খাল নিয়ে যুদ্ধের পরে এলি কোহেন ইসরাইলে দেশান্তরী হন।
ইসরাইলে আসার পর এলি কোহেন প্রায় প্রতিদিনই তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। ইসরাইলে তার শুরুর দিকটা খুব সহজ ছিল না। কয়েক সপ্তাহ ধরে চাকরি খুঁজছিলেন তিনি। তিনি আরবি, ফরাসি, ইংরেজি এমনকি হিব্রু ভাষায়ও তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। গোয়েন্দা বাহিনী আমানের একটি মাসিক পত্রিকায় অনুবাদকের কাজ পেলেন এলি কোহেন। তেলআবিবের একটি বাণিজ্যিক অফিসের ছদ্মাবরণে তাদের কাজ চলত। এলি কোহেনের বেতন খারাপ ছিল না। মাসে ১৭০ ইসরাইলি পাউন্ড বা ৯৫ মার্কিন ডলার। কয়েক মাস পরে তার চাকরি চলে যায়। এক মিসরীয় ইহুদি বন্ধু তাকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি দেয়। চাকরিটি বোরিং হলেও বেতন ভালো। ঐ সময় এলির ভাই ইরাকী বংশোদ্ভূত এক সুন্দরী স্মার্ট নার্সের সঙ্গে এলি কোহেনের পরিচয় করিয়ে দেন। এক মাস ডেটিং করে এলি কোহেন নাদিয়াকে বিয়ে করেন। নাদিয়ার ভাই সামি মাইকেল তখনকার একজন উঠতি বুদ্ধিজীবী। যাহোক, একদিন সকালে এলি কোহেনের অফিসে ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের এক লোক এসে নিজেকে জালমান বলে পরিচয় দেন। জালমান এলি কোহেনকে চাকরির অফার দেন।
এলি কোহেন চাকরির ধরন জানতে চাইলে জালমান জানান, খুব ভালো চাকরি। আপনি চাকরির সুবাদে ইউরোপে যথেচ্ছ ভ্রমণ করতে পারবেন। তবে সম্ভবত আমাদের গোয়েন্দা হিসেবে আরব দেশগুলোতে আপনাকে বেশি বেশি কাটাতে হবে।
এলি কোহেন ওই চাকরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমি মাত্র বিয়ে করেছি। আমি ইউরোপ কিম্বা অন্যত্র সফর করতে চাই না। ইতিমধ্যে এলি কোহেনের স্ত্রী নাদিয়া গর্ভবতী হন। নাদিয়াকে তার চাকরি ছাড়তে হয়। ওদিকে এলির চাকরিটিও চলে যায় এবং বেকার বসে থাকেন।
একদিন এলি কোহেনের ভাড়া বাড়িতে আবার আগমন ঘটে জালমানের। জালমান তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন আমাদের চাকরিতে আপনার অনীহা। মাসে আমরা আপনাকে ১৯৫ মার্কিন ডলার দেব। প্রথম ছয় মাস প্রশিক্ষণ শেষে আপনি ইচ্ছে করলে চাকরি ছেড়েও দিতে পারেন। এবার এলি কোহেন আর না করলেন না। তিনি হয়ে গেলেন ইসরাইলের একজন গোয়েন্দা।
গোয়েন্দা বাহিনী আমানের কয়েক সদস্যের অভিমত অবশ্য ভিন্নতর। তাদের মতে ইসরাইলে আসার পর অতিমাত্রার যোগ্যতার কারণে এলি কোহেনের আমানে চাকরি হয়নি। মানসিক পরীক্ষায় তাকে অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী মনে করেছিলেন আমানের পরীক্ষকরা। কেননা তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় সাহসী। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। মোটকথা ঈশ্বরপ্রদত্ত অনেক গুণ প্রতিভাত হত তার মধ্যে। তবে তাকে নিয়ে সমস্যা হল নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ছিল অতিমাত্রায় উঁচু এবং প্রয়োজন ছাড়াই বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে প্রকট।
ষাট দশকের শুরুতে আমানের স্পেশাল ইউনিটে সিরিয়র দামেস্কের জন্যও একজন চৌকস অফিসারের প্রয়োজন পড়ল। বিগত কয়েক বছর ধরে সিরিয় অতিমাত্রায় আগ্রাসী আরব দেশ হয়ে উঠেছিল। ইসরাইলকে সিরিয় জাতশত্রু মনে করত। আর এমন কোনো যুদ্ধ নেই যেখানে সিরিয় ইসরাইলকে আক্রমণ করেনি। গোলান উপত্যকায় সিরিয়-ইসরাইলের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে। ইসরাইলি সীমান্তে সিরিয় অসংখ্য সন্ত্রাসী স্কোয়াড পাঠিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সিরিয় বিশাল এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। উদ্দেশ্য, ইসরাইল যাতে কোনোভাবেই জর্ডান নদীর পানি না পায়।
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ইসরাইল মরুপ্রবণ নেগেভ অঞ্চলে পানি সেচের জন্য বিশাল একটা প্রকল্প স্থাপন করে। এই পানি নেয়া হচ্ছিল জর্ডান নদী থেকেই। ইসরাইলের যে অংশ দিয়ে জর্ডান নদী গেছে সেখান থেকেই পানি নেয়া হচ্ছিল। এই পানি নেয়া নিয়ে অসংখ্যবার আরব শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। আরব দেশগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জর্ডান শাখানদীর পানি অন্যত্র প্রবাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ইসরাইলের উক্ত প্রকল্পটিকে ব্যর্থ করে দেয়া এবং সিরিয়র ওপরও সে দায়িত্ব বর্তায়।
জর্ডান নদীর পানি ছাড়া ইসরাইলের অস্তিত্ব থাকবে না। ইসরাইলের উপলব্ধি হল সিরিয়কে সফল হতে দেয়া যাবে না। এজন্যই দামেস্কে তাদের একজন চৌকস গোয়েন্দা নিয়োগ জরুরি। আর সেই গোয়েন্দাকে হতে হবে বিশ্বস্ত প্রত্যয়ী এবং দুঃসাহসী। এসব গুণের কারণেই এক সময় আমান থেকে এলি কোহেন বাদ পড়েছিলেন। আর আজ এলিকেই তাদের দরকার।
ঐ সময় এ পদে আরও যাদের নাম ছিল তার মধ্যে সামি মাইকেলও ছিলেন যিনি এলির শ্যালক এবং তার স্ত্রী নাদিয়ার ভাই। কিন্তু সামি গোয়েন্দা হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইসরাইলে থেকে যান এবং পরবর্তীতে দেশের নামজাদা একজন কবি হন।
কোহেনের প্রশিক্ষণ ছিল দীর্ঘমেয়াদি এবং বিরক্তিকর। সকালবেলাই তাকে আমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চলে যেতে হত। কয়েক সপ্তাহ ধরে আইজাক নামের মাত্র একজন প্রশিক্ষকের অধীনে তাকে ট্রেনিং নিতে হত। প্রথমেই তার সামনে অসংখ্য দ্রব্যসামগ্রী মেলে ধরা হত। এলি কোহেলকে তা দেখতে দেয়া হত এক/দুই সেকেন্ড সময়। এরপর চোখ বুজে তাকে বলতে হবে কী সব আইটেম তিনি দেখলেন। বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কেও তাকে ধারণা দেয়া হয়। আইজাক তেলআবিবের ব্যস্ততম রাস্তায় হয়তো এলি কোহেনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। নিউজপেপার স্ট্যান্ডে গিয়ে বললেন, পেপারগুলা পড়ুন কিন্তু কতজন আপনাকে ফলো করছে তা পরে বলতে হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফিরে এলির কাছে সংখ্যা জানতে চাইতেন আইজাক। এক পর্যায়ে কতগুলো ছবি টেবিলে রাখতেন। উত্তর ঠিকঠাক না হলে বলতেন, গাছের পেছনে যে লোকটি সে-ও কিন্তু আপনাকে ফলো করছিল। এভাবে এলিকে শিক্ষা দিতেন আইজাক।
এখানে জালমান ইয়েহুদা নামে আরেক প্রশিক্ষকের সঙ্গে এলি কোহেনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই প্রশিক্ষক খুবই ছোট ও সফিসটিকেটেড রেডিও ট্রান্সমিটার সম্পর্কে এলি কোহেনকে প্রশিক্ষণ দিলেন। ইয়েহুদা তার শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যেরও পরীক্ষা নিলেন। এরপর জালমান আরেক মহিলা প্রশিক্ষককে নিয়ে এলেন। তার নাম মারসেল্লে কাজিন।
এরপর জালমান বললেন, এটাই আপনার চূড়ান্ত পরীক্ষা। টিকবেন কি টিকবেন না সেটাই দেখা হবে। এরপর বিশাল ছবক দিয়ে বললেন, মারসেল্লে আপনাকে মিসরীয় এক ইহুদির নামে ফ্রান্সের একটা পাসপোর্ট দেবেন। ভদ্রলোকের আফ্রিকায় স্থায়ী বসবাস কিন্তু পর্যটক হিসেবে এখন ইসরাইলে। এই পাসপোর্ট নিয়ে আপনি দশদিনের জন্য জেরুজালেম যাবেন। মারসেল্লে আপনাকে বিস্তারিত বলবে যেমন মিসরে আপনার অতীত, আপনার পরিবার, আফ্রিকায় আপনার পেশা ইত্যাদি। জেরুজালেমে আপনি শুধু আরবি ও ফরাসি ভাষায় কথা বলবেন। আপনাকে প্রচুর মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে হবে। কিন্তু কাউকেই আপনার প্রকৃত পরিচয় দেয়া যাবে না। খেয়াল রাখবেন, কেউ যেন আপনাকে ফলো না করে।
জেরুজালেম থেকে দেশে ফেরার পর এলিকে কয়েকদিনের ছুটি দেয়া হল। তার স্ত্রী নাদিয়া সোফিয়ে নামে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। ইহুদিদের নববর্ষ রস হাসানার পরে জালমান তার সঙ্গে দু'জন লোকের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এদের একজন হাসিমুখে এলিকে বললেন, জেরুজালেমের পরীক্ষায় আপনি পাশ। এখন আপনার সামনে আসবে আরও অনেক বড় বড় কাজ।
আমানের অফিসের একটি ঘরে এক মুসলিম শেখ এলি কোহেনকে খুবই ধৈর্যের সঙ্গে পবিত্র কোরান ও নামাজ শিক্ষা দিলেন। এলি খুবই মনোযোগী হলেও ভুল হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিম শেখ তাকে চিন্তিত না হতে বললেন। বললেন, কেউ আপনাকে প্রশ্ন করলে বলবেন, আপনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম বটে কিন্তু এসব পাঠ স্কুলের পরে আর তিনি নিতে পারেননি।
যাহোক এখন এলি কোহেনকে কোনো নিরপেক্ষ দেশে পাঠানো হবে। বাড়তি প্রশিক্ষণ হিসেবে তাকে কোনো আরব দেশের রাজধানীতে পাঠানো হবে। চলে যাওয়ার সময় বললেন, আরব দেশে গেলে আপনাকে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আর ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। কোনো রকম দ্বিরুক্তি ছাড়াই এলি কোহেন সম্মতি দিলেন। এলি কোহেন এখন অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। কেননা সবগুলো পরীক্ষায় তিনি পাশ করেছেন।
জালমান এলিকে জানালেন, আপনাকে সিরিয় অথবা ইরাকে পাঠানো হবে। এলি বললেন, আমি ইরাকের কিছুই জানি না। আমাকে মিসরে পাঠান। এ অসম্ভব, একথা বলে জালমান বললেন, সম্প্রতি মিসর তাদের আদমশুমারি শেষ করেছে এবং পাসপোর্টপ্রাপ্তদের নামের তালিকা করেছে। ফলে মিসর এখন বিপজ্জনক। ইরাক ও সিরিয় এ জাতীয় এখনো কিছু করেনি। তারা আপনার হদিস খুঁজে পাবে না। দুদিন পরে জালমান গং এলিকে বললেন, এখন থেকে আপনার নাম কামাল। আপনার পিতার নাম আমিন তাবেত। অতএব আপনার পুরো নাম কামাল আমিন তাবেত।
এলি কোহেনের কেস অফিসার তার এক নতুন জীবন বৃত্তান্ত তৈরি করেছেন। বিফ্রিংয়ে কেস অফিসার বলেন, প্রথমত সিরীয় বাবা-মায়ের সন্তান আপনি। আপনার মায়ের নাম সাঈদা ইব্রাহিম। আপনার এক বোন। লেবাননের বৈরুতে আপনার জন্ম। আপনার বয়স যখন তিন বছর তখন আপনার বাবা-মা লেবানন ত্যাগ করে মিসরে আসেন। কখনোই ভুলবেন না আপনি সিরীয়। এক বছর পর আপনার বোন মারা যায়। আপনার বাবা একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী।
১৯৪৬ সালে আপনার চাচা আর্জেন্টিনায় দেশান্তরী হন। আপনার চাচা আপনার বাবাকে পরিবারসহ বুয়েন্স আয়ারসে যেতে বলেছিলেন। ১৯৪৭ সালে আপনারা সকলে আর্জেন্টিনায় যান। আপনার বাবা ও চাচা আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে একটা কাপড়ের দোকান দেন এবং সেটি দেউলিয়া হয়ে যায়। আপনার বাবা ১৯৫৬ সালে এবং তার তিন মাসের মধ্যে আপনার মা ইন্তেকাল করেন। আপনি চাচার সঙ্গে থেকে যান এবং ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি পান। অতঃপর আপনি ব্যবসা শুরু করেন এবং আজ আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী।
মোসাদ কিম্বা আমান এলি কোহেনের নতুন জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে দিলে ঘরের জন্য অর্থাৎ নাদিয়াকে বোঝানোর জন্য এলি কোহেন একটা গল্প সাজান। নাদিয়াকে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কোম্পানিতে তিনি চাকরি পেয়েছেন। ইসরাইলের সামরিক সরঞ্জামাদি তাকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখাতে হবে একই সাথে নিজেদের সরঞ্জামাদির মার্কেট তৈরি করতে হবে। নাদিয়াকে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, দীর্ঘদিনের ছুটি নিয়ে তিনি দেশে আসবেন। তবে তার পুরো বেতন ইসরাইল থেকেই তাকে দেয়া হবে। এলি বলেন, আমাদের দীর্ঘ বিচ্ছেদ দুঃসহ বটে। যাহোক, কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপে আমরা ফ্ল্যাট ও আসবাবপত্র কিনব।
১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে করে এলি কোহেন ইসরাইল ছাড়েন। এলিকে তার প্রকৃত নামেই ইসরাইলের পাসপোর্ট, ৫ শত ডলার ও জুরিখের একটি বিমান-টিকেট ধরিয়ে দেয়া হয়।
জুরিখে এক বৃদ্ধ লোক এলি কোহেনের পাসপোর্টটি নিয়ে নেয় এবং অন্য নামে ইউরোপীয় একটি দেশের পাসপোর্ট দেয়। এই পাসপোর্টে চিলির জন্য এন্ট্রি ভিসা ও আর্জেন্টিনার জন্য ট্রানজিট ভিসার সিল দেয়া হয়েছে। লোকটি আরও বলে, বুয়েন্স আয়ার্সে আমাদের লোকজন আপনার ট্রানজিট ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে দেবে। আগামীকাল আপনি বুয়েন্স আয়ার্সে যাবেন এবং একদিন পর সকাল এগারটায় ক্যাফে কারিয়েন্টসে যাবেন। সেখানে আমাদের লোকজন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।
আর্জেন্টিনায় একটি ভালো হোটেলে উঠে এলি কোহেন নির্দেশিত ক্যাফেতে গেলে আব্রাহাম নামের এক বয়স্ক লোক তার টেবিলে আসেন। কোহেনকে চমৎকার একটি ফ্ল্যাটে ওঠার কথা বলা হয় এবং সেটি ইতিমধ্যেই ভাড়া করা হয়েছে বলে লোকটি জানান। আরও জানান, স্থানীয় এক শিক্ষক তাকে স্পেনীশ ভাষা শিক্ষা দেবেন। এছাড়া আপনার আর কোনো কাজ নেই। এবং আমি আপনার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করব।
তিন মাস পর আগামী কর্তব্যের জন্য এলি কোহেন প্রস্তুত। এখন চলনসই স্পেনীশ ভাষা বলতে পারেন। আরেক প্রশিক্ষক তাকে সিরিয় উচ্চারণে আরবি ভাষা শেখালেন। এদিকে এলি কোহেন বুয়েনস আয়ার্স ভালোভাবে চিনে ফেলেছেন। আর্জেন্টিনার রাজধানীতে আরব দেশ থেকে আগত ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীরা যে ধরনের ধোপদুরস্ত পোশাকাদি পরেন ও আচরণ করেন এলি কোহেনও অনুরূপ করে থাকেন।
আরেকটি ক্যাফেতে আব্রাহাম আবার এলি কোহেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে একটি সিরিয় পাসপোর্ট দেন। এই পাসপোর্টে তার নাম কামাল আমিন তাবেত। আব্রাহাম তাকে সপ্তাহখানেকের মধ্যে তার ঠিকানা বদলের কথা বলেন এবং নতুন নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে বলেন। তাকে আরবিয় রেস্তোরাঁগুলোতে যাওয়ার পরামর্শ এবং আরব দেশের সিনেমা দেখার কথাও বলেন। আরবদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্লাবগুলোতে নিয়মিত যাতায়াতের পরামর্শ দিয়ে তাকে যত লোকের সঙ্গে সম্ভব বিশেষ করে আরব দেশের কম্যুনিটি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। বলা হয়, আপনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, একজন মার্চেন্ট এবং মেধাবী ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে আপনি পরিবহন ও লগ্নি ব্যবসায় জড়িত। আরব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনে অনুদানও দেবেন। গুডলাক!
আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি এই গোয়েন্দার ভাগ্য সত্যিই সুপ্রসন্ন। কয়েক মাসের মধ্যেই এলি কোহেন বুয়েন্স আয়ার্সের আরব-সিরিয় কম্যুনিটির শীর্ষ মহলে সফলভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার মধুর ব্যবহার, আত্মবিশ্বাস, কমনসেন্স এবং সৌভাগ্য বহু আরবকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। আর্জেন্টিনা থেকে প্রকাশিত আরব ওয়ার্ল্ড পত্রিকার প্রধান সম্পাদক আবদেল লতিফ হাসানের সঙ্গে একদিন এলি কোহেনের পরিচয় ঘটে। সিরিয় অভিবাসী এবং অন্যান্য গুণাবলির কারণে হাসান এলি কোহেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এদিকে সিরিয় দূতাবাসের আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় এলির নাম যুক্ত হয়। এক পার্টিতে হাসানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় নিযুক্ত সিরিয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশে জেনারেল আমিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে।
এলি প্রায় প্রবাদপুরুষে পরিণত হয়ে গেলে অতঃপর তার গোয়েন্দাবৃত্তি শুরু হয়। আব্রাহামের সঙ্গে গোপন বৈঠকের পরদিন এলি হাসানের অফিসে যান। তাকে বলেন, আর্জেন্টিনায় তার বসবাস তাকে অসুস্থ করে তুলেছে। সিরিয়ই তার ভালো লাগে এবং এলি সেখানে ফিরে যেতে চান। এখন হাসান কি তাকে কয়েকটি রেকোমেন্ডেশন লেটার দিতে পারেন? হাসান সঙ্গে সঙ্গে চারটি চিঠি লিখে দেন। একটি তার ছেলেকে দামেস্কে, বৈরুতে তার দুই প্রভাবশালী বন্ধুকে এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় তার শ্যালিকাকে। এভাবে আরও কয়েকজনের কাছ থেকে এলি চিঠি সংগ্রহ করেন এবং তার ব্রিফকেস চিঠিতে ভরে যায়।
১৯৬১ সালের জুলাইয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা কামাল আমিন তাবেত জুরিখে যান এবং বিমান পরিবর্তন করে মিউনিখে নামেন। সেই বিমানবন্দরে ইসরাইলি এক গোয়েন্দা তাকে ইসরাইলি পাসপোর্ট ও তেলআবিবের বিমান টিকেট দিয়ে যান। এলি কোহেন দেশে ফিরে স্ত্রী নাদিয়াকে বলেন, আমি কয়েক মাস দেশেই থাকব।
এর পরবর্তী কয়েক মাস এলিকে আরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এলি কোহেনের নতুন যে পরিচয় তার সঙ্গে তার আচরণ সম্পূর্ণরূপেই সংগতিপূর্ণ। এলির রেডিও প্রশিক্ষক ইয়েহুদা রেডিও ট্রান্সমিশনের কোড তাকে শিক্ষা দেন। কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণেই এলি কোহেন মিনিটে বার থেকে ষোল শব্দ প্রচার ও রিসিভ করতে সমর্থ হন। তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সিরিয়র ইতিহাস, ঐতিহ্য, তার সেনাবাহিনী, অস্ত্রশস্ত্র এবং কৌশলাদি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয়। পণ্ডিতদের এরকম অসংখ্য ব্রিফিং শেষে এলি কোহেন সিরিয়র অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে এলি কোহেন তার চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল সিরিয়র দামেস্কে পৌঁছান।
সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছিল। এদিকে সিরিয় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৯৪৮ সালের পর একের পর এক অভ্যুত্থানে দেশটি সবদিক থেকে কাহিল হয়ে পড়ে। সিরিয়র কোনো স্বৈরাচারেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। হয় ফাঁসি, ফায়ারিং স্কোয়াড কিম্বা আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে।
অন্তর্কলহ ধামাচাপা দিতে ও জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে সীমান্ত বিরোধ আরো বেশি করে করা হত। দামেস্ক স্কোয়ারে জনগণকে কতল বা শিরশ্ছেদ ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। কোতোয়ালের একটাই বক্তব্য ছিল, এসব লোক ষড়যন্ত্রকারী, গুপ্তচর, রাষ্ট্রের শত্রু। আবার বলা হত এরা পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থক।
দামেস্কে আসার কিছুদিন আগেই সিরিয়ায় একটি অভ্যুত্থান হয়। অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। এই অভ্যুত্থানের ফলে সিরিয় ও মিসরের মধ্যে যে ইউনিয়ন ছিল যার নাম ছিল ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক; সেটি ভেঙে যায়। সংগঠনটি অবশ্য খুব পুরনো ছিল না।
গুপ্তচরবৃত্তি শুরুর আগে এলি কোহেন জালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জালমানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হল, মিউনিখে জেলিঙ্গার নামে আমাদের যে লোক রয়েছে সে আপনাকে রেডিও ট্রান্সমিটার দিয়ে যাবে। দামেস্কে আসার পর সিরিয়র সরকারি প্রচারমাধ্যমের একজন কর্মচারী আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ঐ ভদ্রলোকও আপনার মতো একজন ইমিগ্রান্ট এবং তিনিও খুব বেশি দিন হয়নি দামেস্কে এসেছেন। ঐ ভদ্রলোক আপনার প্রকৃত পরিচয় জানেন না। তাকে আপনার খোঁজার দরকার নেই। সঠিক সময়ে তিনিই আপনাকে খুঁজে নেবেন।
মিউনিখে জেলিঙ্গার এলি কোহেনকে গোয়েন্দাগিরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একটি প্যাকেট দেন। এতে এমন এক ধরনের কাগজ ছিল, যে কাগজে লিখলে তা বোঝা যেত না। বিশেষ একটা টাইপ রাইটার ছাড়াও ছিল একটা ট্রানজিস্টার, যার মধ্যে লুকায়িত ছিল একটা ট্রান্সমিটার। একটা ইলেকট্রিক রেজর দেয়া হয়েছিল। এর কর্ড ট্রান্সমিটারের এন্টেনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্যাকেজে ডিনামাইটের কাঠি দেয়া হয়েছিল যা লুকানো ছিল সাবানের ভেতর। আর দেয়া হয়েছিল আত্মহত্যার জন্য সায়ানাইড পিল। যদি প্রয়োজন হয়। এলি দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কী করে সিরিয়র ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসকে ধুলো দিয়ে এসব তিনি সিরিয়ায় ঢোকাবেন।
জেলিঙ্গার বললেন, জানুয়ারিতে গেনোয়া থেকে বৈরুতে যে জাহাজ যাবে আপনাকে তার টিকেট কাটতে হবে। জাহাজে আপনার একজন সঙ্গী থাকবে। তিনি আপনাকে বর্ডার পার করে দিলে আপনি সিরিয়ায় ঢুকতে পারবেন। জাহাজে যাত্রীদের মধ্যে অবস্থানকালে এক লোক এলি কোহেনকে নিভৃতে ডাকেন। নাম বলেন, মাজেদ শেখ এল আরদ। মাজেদ বলেন, আমার একটা গাড়ি আছে। সেই গাড়িতে আমি আপনাকে দামেস্কে পৌঁছে দেব।
১৯৬২ সালের ১০ জানুয়ারি বৈরুত থেকে আসা মাজেদের গাড়ি সিরিয়র সীমান্তে থামান হয়। ঐ গাড়িতে এলি কোহেনের ট্রান্সমিশনের সব যন্ত্রপাতি। মাজেদ এবং এলি ঐ গাড়িতেই ছিলেন। মাজেদ সিরিয়র কাস্টম ইন্সপেক্টরকে পাঁচশত ডলার ঘুষ দিলে গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়। এলি কোহেন সিরিয়ায় পৌঁছে যান।
সিরিয়র সামরিক বাহিনীর সদর দফতর, জাতীয় নেতৃবৃন্দের সরকারি বাসভবন, সরকারি গেস্ট হাউস, দূতাবাসসমূহ ধনী ব্যবসায়ীদের আবাসস্থলের কাছেই বাড়ি ভাড়া নেন এলি কোহেন। বাড়িতে ঢুকেই তিনি রেডিও'র যন্ত্রপাতি ঘরের বিভিন্নস্থানে লুকিয়ে রাখেন। বাড়িতে কোনো কাজের লোকও রাখেননি যাতে তথ্যাদি পাচার হয়ে যায়। একাই বাড়িতে থাকেন তিনি।
এলি কোহেন আরও ভাগ্যবান এ কারণে যে, তার আগমনের সময়ই ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক ভেঙে যায়। প্রেসিডেন্ট নাসেরকে অপমান ও মিসরের প্রতি অবহেলার কারণ দেখিয়ে দুই দেশের রিপাবলিক ভেঙে যায়। এ সময় সিরিয়র নেতা ও সামরিক বাহিনীর মনে এই প্রত্যয় জন্মে যে, এখন কোনো অভ্যুত্থান হলে তা হবে মিসর সরকারের অনুপ্রেরণায়। ইসরাইলের দিক থেকে কোনো ষড়যন্ত্র কিম্বা বিপদ হতে পারে এমনটি তাদের মাথায় ছিল না।
এদিকে সিরিয় মরিয়া হয়ে নতুন মিত্র, সমর্থক ও তহবিল জোগাতে সক্ষম লোকদের খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সিরিয় এবং বিদেশে বসবাসরত সিরিয় অভিবাসীদের দিকে তাদের নজর ছিল। ঠিক এ রকম সময় কামাল আমিন তাবেত তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হল। প্রথমত তিনি জাতীয়তাবাদী এবং কোটিপতি, তার সঙ্গে রয়েছে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি ইত্যাদি।
কামাল আমিন তাবেত তথা এলি কোহেন দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন। গচ্ছিত রেকোমেন্ডেশনের চিঠির মাধ্যমে তিনি বড় বড় জায়গায় স্থান করে নিতে থাকেন। হাই সোসাইটি, ব্যাংকসমূহ এবং বাণিজ্যিক সার্কেল ২৮ সেপ্টেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদের সঙ্গে কোহেনের মধুর সম্পর্ক। এলি কোহেনের নতুন বন্ধুরা তাকে সামরিক বাহিনীসহ সবক্ষেত্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দেন। দুই শীর্ষ ব্যবসায়ী তরুণ ও সুদর্শন কোটিপতি এলি কোহেনের সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়ার কথাও ভাবেন। এলি কোহেন তথা তাবেতের টাকায় দামেস্কের হত-দরিদ্রদের জন্য একটি খাবার ঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এলি ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার কারণে প্রশাসন তাকে সমীহ করতে শুরু করে। সিরিয়র বর্তমান শাসকদের থেকে তিনি অবশ্য দূরত্ব বজায় রাখতেন। কেননা তার অন্তর্গত মন বলত, এরা খুব ক্ষণস্থায়ী। তাছাড়া মিসর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সিরিয়ায় নতুন অনেক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে।
দামেস্কে আসার এক মাস পর জর্জ সালেম সেইফের সঙ্গে এলি কোহেন তথা তাবেতের পরিচয় হয়। সালেম সেইফ সিরিয়র সরকারি বেতারে কাজ করেন। বিদেশে বসবাসরত সিরিয়দের উদ্দেশে তিনি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন। ইসরাইলে জালমান সর্বশেষ বিফ্রিংয়ে এই সেইফের কথাই বলেছিলেন। এলি তথা তাবেতের দামেস্কে আসার সামান্য কিছু আগে সেইফ এসেছেন। সেইফের বাড়ির পার্টিতে আসায় সিরিয়র রাজনৈতিক ঘটনাবলি যেমন অনুধাবনে সক্ষম হলেন তেমনি সিরিয়র প্রচার নীতিমালাও জেনে নিলেন। ফলে এলি কোহেন তার গোপন রেডিয়োতে কী প্রচার করবেন আর কী করবেন না তার ধারণা পেলেন।
আল আরদ, সেইফ কারোই এলি কোহেন তথা তাবেতের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তাদের ধারণা এলি কোহেন একজন ফ্যানাটিক জাতীয়তাবাদী এবং তার নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে।
এলি কোহেন নিশ্চিত যে, তার মতো নিঃসঙ্গ গোয়েন্দা পৃথিবীতে আর দুটি নেই। না আছে তার কোনো বন্ধু, না কারো প্রতি তিনি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছেন। এমনকী দামেস্কে থেকে ইসরাইলি কোনো নেটওয়ার্ক প্রচারের পরিণতিও তিনি বুঝতে পারছেন না।
এলি কোহেনের এখন যে অবস্থান তাতে তাকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। মাঝে-মধ্যে তিনি স্ত্রী নাদিয়ার কাছে যান বটে কিন্তু তাকে বলা যাবে না সত্যি কথাগুলো; আবার তাকে বিভ্রান্তও করা যাবে না।
এলি কোহেন প্রতিদিন সকাল আটটায় তার বার্তা ইসরাইলে পাঠানো শুরু করলেন। বিকেলেও পাঠাতেন। তার প্রচারণা নির্বিঘ্নই ছিল। তার ট্রান্সমিটার তার বাড়িতে বসানো হয়েছিল। সিরিয়র সামরিক সদর দফতরের কাছেই এটি অবস্থিত। এখানে অবশ্য অসংখ্য ট্রান্সমিশন বসানো। এর মধ্যে কোনোটা এলি কোহেনের তা ঠাহর করা কঠিন। আর আর্মির ট্রান্সমিশনগুলো পুনঃপুনঃ অসংখ্য বার্তা উগড়ে দিচ্ছে।
মাঝে ইসরাইলে ফিরে এলে অফিস থেকে তাকে একটি মিনিয়েচার ক্যামেরা দেয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি ছবি তুলতে পারবেন। তার এই ক্যামেরা লুকিয়ে রাখাও একটা সমস্যা। তিনি ঐ ক্যামেরা পাশা খেলার একটি বক্সে রাখতেন। আর্জেন্টিনার বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি ঐ সব ছবি ইসরাইলে পাচার করতেন।
ক্যামেরার মাধ্যমে প্রথম যে ডকুমেন্টটি তিনি পাঠান তাহল, সিরিয়ায় সামরিক বাহিনীর মধ্যে অস্থিরতার এবং বাথ পার্টির উত্থান সংক্রান্ত। এলি কোহেন অনুভব করেন যে, সিরিয়র রাজনীতি কোনো পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিনি বাথ পার্টির নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেন।
এলি কোহেনের ধারণা সত্য বলে প্রমাণিত হয় ১৯৬৩ সালের ৮ মার্চ। সামরিক বাহিনী সরকার উৎখাত করলে বাথ পার্টি ক্ষমতা গ্রহণ করে। বুয়েন্স আয়ার্স থেকে এলি কোহেনের বন্ধু জেনারেল হাফেজ সালাহ আল বিতারের মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। জুলাই মাসে আরেকটি অভ্যুত্থان হলে জেনারেল হাফেজ সিরিয়র রেভ্যুলশনারি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হন। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি। এলি কোহেন তথা তাবেতের বন্ধুরা মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে থাকেন। সামরিক বাহিনীতেও তার বন্ধুরা ভালো ভালো পদ পান। ইসরাইলি এই গোয়েন্দা আজ সিরিয়র ইনার সার্কেলের একজন সদস্য বনে যান।
দামেস্কে একটা গ্লামারাস পার্টি চলছে। মন্ত্রী, বাথ পার্টির নেতা, জেনারেল, ব্যবসায়ী-কে নেই পার্টিতে! অনেককে দেখা গেল সালিম হাতুমকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের তিনিই নেতা, ট্যাঙ্ক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাফেজকে তিনিই ক্ষমতায় বসান। ঐ ভিলায় প্রেসিডেন্ট হাফেজ সপত্নীক আসেন। কিছুটা বিলম্বে। কিন্তু তার গায়ে যে কোটটি সেটি এলি কোহেন বা তাবেতের দেয়া। সিরিয় ইমিগ্র্যান্টদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্বরূপ টোকেন হিসেবে কোটটি দেয়া হয়েছিল।
মিসেস হাফেজকেই তিনি উপহার দিয়েছেন তা নয়। বহু মহিলাকে অলংকার সেট, জেনারেলদের গাড়ি উপহার দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক নেতারা তাবেতের টাকা নিজ নিজ একাউন্টে জমা করেছেন।
ঐ বাড়ির লিভিংরুমে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা ইসরাইলের সীমান্ত থেকে ফিরে এসে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার অন্যতম বিষয়, জর্ডান নদী থেকে ইসরাইল যাতে পানি না পায় সে লক্ষ্যে সিরিয়র বিশাল প্রকল্প নিয়ে। সিরিয় রেডিও'র প্রধান এলি কোহেন বললেন, অভিবাসী সিরিয়দের নিয়ে নিয়মিত একটা শো করাতে। সেখানে এলি কোহেন যেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ করেন।
এলি কোহেন তথা তাবেতের মতো ভাগ্যবান লোক আর হয় না। আজ সব দরজা তার জন্য উন্মুক্ত। সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে তার নিয়মিত বৈঠক থাকে। বাথ পার্টির নীতিনির্ধারণী বৈঠকে তার উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক।
এলি কোহেন তথা তাবেতের হাতে এখন তথ্যের ভাণ্ডার। টপ সিক্রেট মিলিটারি নির্দেশাবলি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব গোপন বিষয়াদি, জেনারেলদের মনোভাবনা এমনকি কোনো নেতার সঙ্গে কার বন্ধুত্ব ও বিরোধ সবই কোহেন তাৎক্ষণিকভাবে রেডিওমাধ্যমে পাঠিয়ে চলেছেন। সর্বোপরি ইসরাইলের ব্যাপারে সিরিয়র নীতি ও মানসিকতাও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
সিরিয় নতুন কী অস্ত্র কিনল, ইসরাইল সীমান্তে সিরিয় কী ধরনের ক্যান্টনমেন্ট বানাতে যাচ্ছে- সবই মুহূর্তের মধ্যে ছবি ম্যাপসহ ইসরাইলের কাছে চলে যাচ্ছিল। এক শীর্ষ জেনারেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সেনাবাহিনীর কোনো গোপন বিষয়ই এলি কোহেনের কাছে গোপন থাকছে না।
এলি কোহেন নির্বিঘ্নে ইসরাইলের তথ্য পাচারে সমর্থ হলেও একদিন সিরিয়র লে. জাহেরের কাছে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই জাহের তার বাড়িতে এসে উপস্থিত। এলি কোহেন যন্ত্রপাতি সরাতে পারলেও কিছু কাগজ তার টেবিলে রয়ে গিয়েছিল। জাহের জানতে চাইলেন এগুলো কী। এলি কোহেন বললেন, এ হল ক্রসওয়ার্ডের কাগজ। প্রকৃতপক্ষে ঐ সব কাগজে গোপন কালি দিয়ে অনেক কিছুই লেখা ছিল।
ইসরাইলে গোপন তথ্য পাচারে এলি কোহেনের নিজস্ব রেডিও তো ছিলই- তিনি সিরিয়র সরকারি রেডিও'র মাধ্যমেও তেলআবিবে সংবাদ পাঠাতে লাগলেন। সাংকেতিক শব্দাবলি ও প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে তিনি সংবাদ পাঠাতেন। ইসরাইলি গোয়েন্দারা সেসব শব্দ অবমুক্ত করে নিত।
আরো আরো গোপন সংবাদাদি পেতে মরিয়া এলি কোহেন মেয়েদের কাজে লাগাতে লাগলেন। সিরিয়র সরকারি মহলে কানাঘুষা চলছিল যে, এলি কোহেনের বাড়িতে সেক্স পার্টি হয়ে থাকে নিয়মিত। এলির ঘনিষ্ঠ লোকজন এতে অংশ নিতেন এবং সুন্দরী বিদুষী রমণীরা তাদের সঙ্গ দিতেন। এসব মেয়েদের মধ্যে যেমন রাস্তার পতিতারা থাকত তেমনি ভালো ঘরের মেয়েরাও থাকত। এলি কোহেন তথা তাবেতের অতিথিরা সবরকম সেক্স করলেও মেজবান থাকতেন ধীরস্থির। এলি কোহেন তার উচ্চ পর্যায়ের বন্ধুদের কাছেও মেয়ে পাঠাতেন। তার এরকম একজন বন্ধু হলেন কর্নেল সেলিম হনতুম। কর্নেলের কাছ থেকে যা যা শুনত মেয়েটি হুবহু তা এলি কোহেন তথা তাবেতের কাছে এসব বর্ণনা করত।
বক্তৃতাকালে তাবেত সিরিয়র প্রতি দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে ইসরাইলকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করতেন এবং ইসরাইল যে সিরিয়র এক নম্বর শত্রু তা উল্লেখ করতেন। তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার আরও বৃদ্ধির জন্য সিরিয়র নেতাদের কাছে তদবির করতেন। মিসরের পাশাপাশি সিরিয়র বিরুদ্ধেও একটা ফ্রন্ট খোলার কথা তিনি বলতেন। তার বন্ধুরা ইসরাইলের আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও তিনি অনুযোগ করতেন। এসব বলে এলি কোহেন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে আরও সমর্থ হলেন।
এলি কোহেনের সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা তাকে বলতেন, ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে তাদের বেশ ভালো প্রস্তুতি রয়েছে। এবং ইসরাইলের ব্যাপারে এলি কোহেনের আশংকা যে অমূলক একদিন তারা তা প্রমাণ করবেন। এ উপলক্ষে সিরিয়র সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা এলি কোহেনকে নিয়ে তিন বার ইসরাইল সীমান্তে যান এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র কী ভাবে তাক করা আছে তা দেখান। তারা এলি কোহেনকে সিরিয়র দুর্গসমূহ, বাঙ্কার, অস্ত্রের গুদাম ইত্যাদি দেখান। সিরিয়র রণকৌশলও এলি কোহেন তথা তাবেতের কাছে ব্যাখ্যা করেন। এখানে বিপুল পরিমাণ নতুন কেনা অস্ত্র মজুদ ছিল। এলি কোহেন তথা তাবেত চতুর্থবার যখন ইসরাইলের সীমান্তে যান সেদিন মিসরের জেনারেল আলি আমিরও তাদের সফরসঙ্গী ছিলেন। ঐদিন বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র তাবেতই ছিলেন। আলি আমিরকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় জেনারেল গণ্য করা হয়; আবার তিনি ইউনাইটেড আরব কমান্ডের প্রধানও। মিসর, সিরিয় ও ইরাক ইসরাইলের বিরুদ্ধে একযোগে কীভাবে যুদ্ধ করবে তারও পরিকল্পনাকারী ও কমান্ডার আলি আমির।
আমীরের সঙ্গে সীমান্তভ্রমণের কয়েকদিনের মধ্যে বাথ পার্টির নেতারা তাবেতকে জর্ডানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে পাঠান। বার্থ পার্টির বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা সালাহ আল বিতার সেখানে তথাকথিত চিকিৎসায় রয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিতারকে তাড়িয়েছেন বর্তমান সরকারপ্রধান জেনারেল হাফেজ। বিতারকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তাবেতকে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি বেশ কিছু দিন বিতারের সঙ্গে কাটান।
দামেস্কে ফিরে এলি কোহেন ওরফে তাবেত প্রেসিডেন্ট হাফেজকে প্যারিসের পথে বিদায় দিতে বিমানবন্দরে যান। প্রেসিডেন্টকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছিল। কয়েক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট হাফেজ যখন আবার দেশে ফেরেন তখনও তাবেতকে টারমাকে দেখা যায়। অর্থাৎ সব দিক দিয়েই তার মিশন সফল।
এলি কোহেন ও নাদিয়া দম্পতির তৃতীয় সন্তানটি ছেলে। তার নাম শাওল। এই পর্যায়ে কিছুদিন ইসরাইলে ছিলেন এলি। তার স্বজনরা পরবর্তীতে বলেছেন, এই দফায় এলি কোহেনকে অনেক বেশি নার্ভাস ও হিংস্র মনে হয়েছে। এলি কোহেন তাদেরকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেন। পরের বছর তিনি চাকরি ছেড়ে ইসরাইলে থাকতে শুরু করবেন বলেও জানান। কেননা পরিবার তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ বছর নভেম্বরে এলি কোহেন তথা তাবেত স্ত্রী নাদিয়া ও তিন সন্তানকে চুমু দিয়ে সিরিয়র পথে বিদায় নেন। নাদিয়া জানতেন না এলি কোহেনের এটাই শেষ গুডবাই।
১৯৬৪ সালের ১৩ নভেম্বর তেলধান সীমান্তের কাছে বেসামরিক জোনে কর্মরত ইসরাইলি ট্রাক্টরের ওপর সিরিয়া গুলি করতে শুরু করলে ইসরাইল ট্যাংক কামান এবং মিরেজ ও ভাউচার বিমান নিয়ে ইসরাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইসরাইলি বিমান সিরিয় বাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ করতে করতে চালাকি করে জর্ডান নদীর সেই স্পর্শকাতর অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
ইসরাইলকে জর্ডান নদীর পানি দেবে না বলে গৃহীত প্রকল্পের জন্য যেসব ট্রাক্টর বুলডোজারসহ বৃহদাকার মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি সিরিয় এনেছিল- ইসরাইল পরিকল্পনার মাধ্যমে তা ধ্বংস করে দেয়। সিরিয়র বিমান বাহিনী ছিল নিশ্চল। কেননা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আনীত মিগ ফাইটারগুলো তারা তখনো ব্যবহার শুরু করেনি।
সিরিয়র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসরাইলি তাণ্ডব বিশ্বব্যাপী নজর কাড়ে। কয়েক ঘণ্টা পরে সিরিয়র সামরিক কর্মকর্তারা অনুধাবন করেন যে, ইসরাইলি আক্রমণের পরিকল্পনাকারী হলেন এলি কোহেন। এলি কোহেন ঐ যুদ্ধকালে ইসরাইলে ছিলেন। এলি কোহেনকে ধন্যবাদ এ কারণে যে, তার মাধ্যমেই ইসরাইল জেনে যায় গরিব রাষ্ট্র সিরিয়র বিমান বাহিনীর পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সিরিয়য় দুর্গপ্রাকারের অবস্থান এবং জর্ডান নদীর পানি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রকল্পটা সম্পর্কে ইসরাইল ছিল সম্যক অবহিত। এমনকি সিরিয়ার অস্ত্র এবং কোনো ঘাঁটি ও বাঙ্কার থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কত গুলি ছোঁড়া হবে তা-ও তারা জানত। এলি কোহেন অবশ্য এর চেয়েও বেশি জানতেন। সিরিয়র জর্ডান নদীর পানি প্রকল্পের এই প্রথম কাজটি পেয়েছিলেন এক সৌদি ঠিকাদার।
সিরিয়র এই প্রকল্পটি কোথায় কতখানি গভীর হবে, কোথায় কোথায় খনন করা হবে তার পরিকল্পনারও দায়িত্বে ঐ ঠিকাদার। এলি কোহেন তার সঙ্গে দোস্তালি পাতালেন। জেনে নিলেন সব তথ্য এবং জেনে গেল ইসরাইলও। একই সঙ্গে ক্যানেলের প্রন্থের পরিমাপ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ধরনসহ কারিগরি সব তথ্যই ইসরাইলের নখদর্পণে।
এলি কোহেন তথা তাবেতকে তার ঠিকাদার বন্ধু আরও তথ্য ফাস করলেন। ক্যানেলের ক্যাপাসিটি কত হবে এবং ক্যানেলটি রক্ষায় কৌশলগত অস্ত্র কিভাবে বসানো হবে। এলি কোহেনের এই ভালো বন্ধুটির নাম বিল লাদেন। ওসামা বিন লাদেনের পিতা তিনি।
ঐ প্রকল্পকে টার্গেট করে ইসরাইল সেখানে বহুবার আক্রমণ চালিয়েছে। আক্রমণে জর্জরিত আরব দেশগুলো ১৯৬৫ সালে ঐ প্রকল্প স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়।
যুদ্ধাবস্থার অবসানে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে স্বামী এলি কোহেনের ফরাসি ভাষায় লেখা একটি পোস্টকার্ড পান নাদিয়া। আমার প্রিয়তমা নাদিয়া সম্বোধন করে এলি কোহেন উল্লেখ করেন, নববর্ষ উপলক্ষে তোমাকে দুয়েকটি লাইন লিখছি। আশা করি নববর্ষ তোমাদের সবার জীবনে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসুক। ফিকি, আইরিখ ও শাউলকে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা জানাচ্ছি।
নাদিয়ার হাতে যখন এই পোস্টকার্ড পৌঁছায় এলি কোহেন তখন দামেস্কের কারাগারের মেঝেতে শুয়ে। তাকে মেরে হাড়-গোড় প্রায় ভেঙেই ফেলা হয়েছে।
কয়েক মাস ধরেই সিরিয়র সিক্রেট সার্ভিস সিরিয়ন মুখাভারত সারা দেশজুড়ে উচ্চ মাত্রার সতর্কতা জারি করে রেখেছে। ফিলিস্তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান টায়ারা'র পরামর্শ মোতাবেক এই সতর্কতা। টায়ারা সিরিয়র প্রশাসনকে জানান, ১৯৬৪ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে সিরিয়র ব্যাপারে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে। সিরিয় সরকার বিকেল কিম্বা রাতে হোক যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, ইসরাইলের সরকারি বেতারে তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রচারিত হয়ে থাকে। রুদ্ধদ্বার কক্ষে নেয়া সিরিয়র অনেক গোপন সিদ্ধান্তও জনগণ জেনে ফেলছে। নভেম্বরের ১৩ তারিখে ইসরাইল সিরিয়র লক্ষ্যবস্তুতে যেভাবে নির্ভুলভাবে বোমা ফেলেছে তাতেও টায়ারা বিস্মিত। তার যৌক্তিক উপসংহার হল, ফ্রন্টলাইনে সিরিয় যেভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে তা ইসরাইলের নখদর্পণে। এবং সেই আলোকেই হামলা চালিয়েছে। কী করে এ সম্ভব! টায়ারা নিশ্চিত হন যে, সিরিয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কোনো গোয়েন্দা ঢুকে পড়েছে। ঐ গোয়েন্দা থেকে প্রাপ্ত তথ্যই ইসরাইলি সরকারি বেতার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রচার করে থাকে। আর এর অর্থ হল ওয়ারলেসযোগে ঐ গোয়েন্দা খবর পাঠাচ্ছে। কিন্তু কোথায় ট্রান্সমিটার?
১৯৬৪ সালের শেষার্ধ্বে টায়ারা এবং তার সহকর্মীরা সোভিয়েত নির্মিত যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে স্থাপিত ট্রান্সমিটারের সন্ধান চালিয়েও তা পেতে ব্যর্থ হন। কিন্তু ভাগ্য তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন হয় ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে।
সিরিয়র লাতাকিয়া বন্দরে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল পরিমাণ নতুন সম্প্রচার যন্ত্রপাতি আনলোড করছিল। ৭ জানুয়ারি ঐসব যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য সিরিয় সেনাবাহিনী ২৪ ঘণ্টা তাদের সকল ট্রান্সমিটার বন্ধ রাখে। দেশজুড়ে সিরিয় সেনাবাহিনীর যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন বন্ধ ছিল তখন এক আর্মি অফিসার একটি সচল ট্রান্সমিটারের অস্তিত্ব টের পান। তিনি নিশ্চিত হন এটাই গোয়েন্দা ট্রান্সমিটার।
সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত প্রদত্ত ডিটেক্টর সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সিরিয় গোয়েন্দারা। কিন্তু ট্রান্সমিটারের কাছাকাছি আসামাত্রই সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু টেকনিশিয়ানরা ঠিকই এলি কোহেন তথা কামাল আমিন তাবেতের বাসাটি চিহ্নিত করে ফেলে।
এক সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা অবশ্য বলেছিলেন, এ উদঘাটন সঠিক নয়। হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। তার বক্তব্য তাবেতকে আগামী মন্ত্রিসভার বাথ পার্টির নেতারা মন্ত্রী করতে যাচ্ছেন। তার পক্ষে গোয়েন্দা হওয়া অসম্ভব। এলি কোহেন বা তাবেত সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু বিকেলে ঐ ট্রান্সমিটারটি আবার চালু পাওয়া গেলে সিরিয় গোয়েন্দারা সেখানে হাজির হন। সকাল আটটায় চার সিরিয় গোয়েন্দা বন্দুক হাতে দরজা ভেঙে ঐ বাড়িতে ঢুকে পড়েন। গোয়েন্দা সেখানেই রয়েছে। কিন্তু ঘুমে নয়। তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। তখনো ট্রান্সমিশন চলছিল। ইসরাইলি ঐ গোয়েন্দা লাফিয়ে পড়ে সিরিয় গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হন। ইসরাইলি গোয়েন্দা পালানোরও চেষ্টা করেননি আবার গ্রেফতার এড়াতেও চাননি। বিস্ময়বিভূত কমান্ডিং অফিসার। কামাল আমিন তাবেত তথা এলি কোহেন এই ট্রান্সমিটার চালাচ্ছেন।
ঝড়ের গতিতে দামেস্ক জুড়ে এই খবর ডালপালা ছড়াতে থাকে। সিরিয়র নেতারা এ খবর শুনলেন, কেউ বললেন, ননসেন্স, কেউ বললেন অসম্ভব, কেউ বললেন ফ্যান্টাস্টিক, ইমপসিবল ইত্যাদি। দামেস্ক জুড়ে একটাই প্রশ্ন, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বন্ধু, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, একজন কোটিপতি তাবেত কী করে একজন গোয়েন্দা হন।
কিন্তু সব প্রমাণ তো হাজির। তাবেত জানালার শাটারের পেছনেসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রান্সমিটারের যন্ত্রপাতি বসিয়েছেন। এ লোক রাষ্ট্রদ্রোহী না হয়ে যায় না।
সিরিয় জুড়ে যখন তাবেতকে নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে- প্রশাসন ব্যাপক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিল। আশংকা দেখা দিল প্রশাসনের অনেকের মনে। তাবেত কি তাদেরও জড়াতে পারেন? প্রেসিডেন্ট হাফেজ নিজে ছুটে গেলেন জেলখানায়। জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তাবেতকে।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হাফেজ বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাবেতের চোখের দিকে তাকাতেই আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। আমার মনে হতে লাগল, আমার সামনে যে লোকটি দাঁড়িয়ে সে কোনো আরব নয়। কোরান ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমি তাকে সতর্কতার সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন করি। আমি তাকে সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত করতে বলি। তাবেত কয়েকটি আয়াত ভুলভাবে পাঠ করেন বটে। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তাবেত বলেন, খুব ছোটবেলায় তিনি সিরিয়া ত্যাগ করেছেন। স্মরণশক্তি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। প্রেসিডেন্ট হাফেজ বলেন, কিন্তু ঐ মুহূর্তেই আমি ধরে ফেলি যে, লোকটি ইহুদি।
অন্ধকারাচ্ছন্ন সেলে অচেতন অবস্থায় সারা শরীরে নানা আঘাতের চিহ্ন নিয়ে শুয়েছিলেন তাবেত। তার নখ উৎপাটন করা হয়েছিল। এদিকে তার জবানবন্দি প্রেসিডেন্ট জেনারেল হাফেজের কাছে পাঠানো হয়েছে। উপসংহার হল, লোকটি তাবেত নন, এলি কোহেন, ইসরাইলি ইহুদি।
১৯৬৫ সালে ২৪ জানুয়ারি দামেস্ক সরকারিভাবে একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসরাইলি গোয়েন্দাকে গ্রেফতারের তথ্য প্রকাশ করে। এক সিনিয়র অফিসার সাংবাদিক সম্মেলনে রাগে গজগজ করতে করতে বলেন, ইসরাইল হল শয়তান আর সেই শয়তানের গোয়েন্দা এলি কোহেন।
দামেস্ক তথা সিরিয় জুড়ে আতঙ্ক, গুজব, গুঞ্জন। প্রশ্ন হল এলি কোহেন কি গোয়েন্দা চক্রে এককভাবে জড়িত, নাকি দলের নেতা তিনি।
একজন একজন করে ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হল। এর মধ্যে ২৭ জন নারী। সন্দেহভাজনদের মধ্যে আরও আছেন মাজেদ শেখ এল আরদ, সালেম সেইফ, লে. জাহের আলদিন, বেশ কয়েকজন সম্প্রচার কর্মকর্তা এবং যৌন কর্মী। এদের বাইরে আরও যেসব মহিলারা রয়েছেন তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না সংগত কারণেই। তাবেতের সঙ্গে জড়িত চারশত লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাবাদে কিছু সমস্যা ছিল। সিরিয়ার বেশ কিছু রাজনৈতিক, সামরিক ও বয়স্ক নেতা এলি কোহেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তদন্ত করেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। এমনকি তাদের নামও উল্লেখ করা যাবে না। তারাও গোয়েন্দাগিরির সঙ্গে যুক্ত এমন ধারণা সাধারণ্যে তৈরি হতে পারে। আরেকটি সমস্যা হল, তাবেত তার সঙ্গে যুক্তদের কোনো তালিকা কখনো তৈরি করেননি। ফলে চক্রটিকে ডিটেক্ট করা কঠিন।
এদিকে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী এলি কোহেনের গ্রেফতার সম্পর্কিত কোনো সংবাদ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইসরাইলিরা আশাবাদী তারা এলি কোহেনকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন। ফলে সংবাদ ছাপানোর ওপর এই নিষেধাজ্ঞা। এরই মধ্যে এক লোক এলি কোহেনের বাড়িতে গিয়ে তার ভাইকে গ্রেফতারের কথা জানায়। ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির জন্য এই গ্রেফতার।
গ্রেফতারের খবরে এলি কোহেনের ভাইয়েরা বিস্ময়াবিভূত। এক ভাই মায়ের বাসায় গিয়ে তাকে এলির গ্রেফতারের খবর দিলে তিনি প্রায় বোবা হয়ে যান। তিনি প্রশ্ন করেন সিরিয়ায় এলি কী করে গ্রেফতার হয়। এলি কি ভুল করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় চলে গিয়েছিল? এক পর্যায়ে বেহুঁশ হয় যান এলির মা।
নাদিয়া তার তিন সন্তানসহ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। এমনকি তার সব সময়ই মনে হত তার স্বামী সব কথা তাকে বলছে না। নাদিয়া কখনোই ধারণা করতে পারেননি তার স্বামীর কাজের ক্ষেত্রটা কী। এলি কোহেনের সহকর্মীরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাকে জানানো হল, এখনই তোমার প্যারিসের ফ্লাইট। কোহেনের ঐ সহকর্মীর আশ্বাস, আমরা সবচে ভালো উকিল নিয়োগ দেব। তাকে বাঁচানোর যা যা দরকার আমরা তা করব। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত ব্যক্তিগতভাবে এলি কোহেনকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেন।
৩১ জানুয়ারি এলি কোহেনকে বাঁচাতে ফ্রান্সের সুপরিচিত আইনজীবী জ্যাকুয়েস মারসিয়ার সিরিয়ায় আসেন। সরকারিভাবে তার নিয়োগকর্তা এলি কোহেনের পরিবার বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল সরকার তাকে প্রচুর টাকা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে। মারসিয়ার এই মিশন ছিল মিশন ইমপসিবল।
পরবর্তীতে মারসিয়ার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দামেস্কে আসার পর প্রথম দিনই আমার মনে হয়েছে এলি কোহেনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাকে অবশ্যই ফাঁসি দেয়া হবে। তবে সময়ক্ষেপনোর মাধ্যমে কোনো প্যাকেজ বলে তাকে বাঁচানোর লক্ষ্যে আমরা কাজ করতে থাকি।
প্রথমেই মারসিয়ার ট্রায়াল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। মারসিয়ার সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলি কোহেনের সঙ্গে কথা বলা ও তার সই সংগ্রহের তদবির করেন। কিন্তু এলির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি প্রথমবারেই না করে দেয়া হয়। সিরীয় সরকারের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। তারা বিশ্বজনমতও বেশ তোয়াক্কা করেন। এই মহলটি চাইছিলেন যাতে আসামির অধিকার ক্ষুন্ন না হয়। তারা আসলে ভিন্ন কারণে ঐ অধিকার সমর্থন করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর এই আমলা শ্রেণিটি মূলত প্রেসিডেন্ট হাফেজের ঘোরতর শত্রু। প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এলি কোহেন ওরফে তাবেত যে অনেক অপকর্মের হোতা তার বিচার প্রকাশ্য আদালতে হলে সরকারের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু এই আবেদনে সরকারের আরেকটি অংশ ঘোরতরভাবে বিরোধিতা করে। তারাও জানতেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচার হলেও কোহেনের ফাঁসি হবে। তারা এলি কোহেনকে অবিলম্বে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পক্ষপাতী ছিলেন।
এতসব বাদানুবাদের পর অবশেষে একটি বিশেষ সামরিক আদালতে কোহেনের বিচার শুরু হল। মামলার যুক্তিতর্কের একটি অংশ সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানোও হয়। অবশ্য এলি কোহেনের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না। এলি কোহেন যখন তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগের দাবি করেন তখন প্রিসাইডিং জজ এজলাসে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি এলি কোহেনকে বলেন, আপনার জন্য কোনো আইনজীবীর দরকার হবে না। দুর্নীতিপরায়ণ গণমাধ্যম আপনার পক্ষে রয়েছে। রেভিল্যুশন-বিরোধীরাও আপনার পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে প্রিসাইডিং জজই হয়ে ওঠলেন প্রসিকিউটর, প্রশ্নকারী ও বিচারক। তবে এই প্রিসাইডিং জজের জন্য স্পর্শকাতর বিষয়টি হল তিনিও তাবেতের সাবেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নাম ব্রিগেডিয়ার সালাহ ডালি। তাবেতের আরেক ঘনিষ্ঠতম বন্ধু কর্নেল সেলিম হাতুমও ছিলেন এই আদালতের আরেকজন বিচারক। হাতুমের সঙ্গে এলি কোহেনের সুসম্পর্কের গুজব ভণ্ডুল করতে হাতুম আদালত কক্ষে তাকে প্রশ্ন করেন; আপনি কি সালিম হাতুমকে চেনেন? মামলার আসামি এলি কোহেন একজন সুঅভিনেতার মতো আদালতের কোনোগুলো পর্যবেক্ষণ করে হাতুমের দিকে তাকিয়ে বলেন, না আমি তাকে এই কক্ষের কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
এলি কোহেন ও সেলিম হাতুমের এই প্রশ্নোত্তর পর্বটি সিরিয়ার সরকারি টিভিতে দেখানো হলে দামেস্কের সব মানুষ হাসিতে ফেটে পড়ে। ফরাসি আইনজীবী মারসিয়ার বলেন, এটাকে মামলার শুনানি না বলে সার্কাস বলাই সংগত।
টেলিভিশন ক্যামেরা পুনঃপুনঃ এলি কোহেনের সহযোগী আলদিন, সেইফ ও কিছু যৌনকর্মী দেখালেও অন্য বান্ধবীরা কোথায়? সিনিয়র কর্মকর্তাদের পত্নীরা যারা ভিড় করে থাকতেন এলি কোহেনের কাছাকাছি। বাথ পার্টির সেই নেতারাই বা কোথায়? এলি কোহেনকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করা হলে ইসরাইলে তিনি কী সব তথ্য পাঠিয়েছে তা কিন্তু মামলার আলোচনায় মুখ্য বিষয় ছিল না। এমনকি রেডিও বা ট্রান্সমিটারের প্রসঙ্গও উঠেনি। ক্যামেরা এলি কোহেনের বিধ্বস্ত চেহারা ও শরীরটাই বারে বারে দেখাচ্ছিল। আর এ যে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মারধরের ফল তা সহজেই অনুমেয়।
ইসরাইল নীরবে এই বিচারকার্য পর্যবেক্ষণ করছিল। এলি কোহেনের পরিবারকে ইসরাইল সরকার একটা টেলিভিশন সেট ধার দিয়েছিল। এলির পরিবার টিভিতে প্রতিদিন তাকে দেখার সুযোগ পেত। ছেলে-মেয়েরা, নাদিয়া এবং এলির ভাইরা টিভিতে এলি কোহেনকে দেখে নীরবে কাঁদত। এলির ছবি যখনই পর্দায় ভেসে উঠত এলি কোহেনের মা সেই ছবিতে চুমু খেতেন। এলির মেয়ে সোফিয়া তার বাবাকে পর্দায় দেখে বলত, এই হল আমার বাবা। হি ইজ এ হিরো। নাদিয়া নীরবে কাঁদতেন।
৩১ মার্চ সামরিক আদালত তার রায়ে এলি কোহেন, মজিদ শেখ আল আর্দ এবং লে. জাহের আলদিনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এলি কোহেনের ফরাসি আইনজীবীরা তার মক্কেলকে বাঁচাতে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তিনি তিনবার দামেস্কে সফর করেন। তিনি ইসরাইল সরকারের একাধিক প্রস্তাব নিয়ে সেখানে যান। প্রথমত ইসরাইল সিরিয়কে ওষুধ ও কৃষির উন্নয়নে কোটি কোটি ডলারের আধুনিক যন্ত্রপাতি দিতে আগ্রহী। সিরিয় এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ইসরাইলের কারাগারে এগারজন সিরিয় গোয়েন্দা আটক রয়েছে। তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাবও সিরিয় প্রত্যাখ্যান করে। তবে একটা কথা বলে যে, প্রেসিডেন্ট যদি ক্ষমা করে দেন তাহলে ভিন্ন কথা।
১ মে এল আর্দের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। ৮ মে এলি কোহেনের সাজার কথা সরকারিভাবে ঘোষিত হয়। মোসাদ অতঃপর নাদিয়াকে দিয়ে তার স্বামীকে নির্দোষ ঘোষণার জন্য সিরিয় দূতাবাসে একটা আবেদন করায়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে এলি কোহেনকে ছেড়ে দেয়ার বিবৃতি আসতে শুরু করে। পোপ পল, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, বেলজিয়ামের রাণি, ইটালির কার্ডিনাল ও মন্ত্রীরা, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ২২জন সদস্য, হিউম্যান রাইটস লিগ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস এলি কোহেনকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানায়। মূলত এ তালিকা ছিল দীর্ঘ।
১৮ মে মধ্যরাতে জেলার এলি কোহেনকে ঘুম থেকে জাগান। তাকে সাদা রংয়ের বিশাল একটা গাউন পরানো হয় এবং দামেস্কের মার্কেটপ্লেসে নেয়া হয়। তাকে তার পরিবারের উদ্দেশে একটি চিঠি লেখার সুযোগ দেয়া হয়। দামেস্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের এক ধর্মগুরু বা রাব্বি নিসিমের সঙ্গেও তাকে দু'একটি কথা বলতে দেয়া হয়। সিরিয়র সেনাবাহিনী তার বুকে বিশাল একটি পোস্টার ঝুলিয়ে দেয়। তাতে আরবিতে বড় বড় অক্ষরে তার মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা হয়। দুই সারি সশস্ত্র সৈন্যদের মাঝখান থেকে একাকী এলি কোহেনের ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়া টিভি ও পত্রিকার ক্যামেরার প্রধান দ্রষ্টব্য হয়ে দাঁড়ায়।
জল্লাদ বসেই ছিল। সে দ্রুত ফাঁসির রজ্জু এলি কোহেনের গলায় ঝুলিয়ে দেয়।
এলি সমবেত জনতার দিকে একবার তাকালেন। নিশ্চুপ তিনি। কিন্তু পরাজয়ের কোনো গ্লানি তার চোখে-মুখে দেখা যায়নি। জনতা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় সমবেত। ফাঁসি হয়ে গেল এলি কোহেনের। ইসরাইলি গোয়েন্দার ফাঁসি হওয়ায় সিরিয় জনতার সে কী উল্লাস! কয়েক ঘণ্টা ধরে রাত জেগে দামেস্কের মানুষ এলি কোহেনের মৃতদেহ দেখতে থাকে।
এদিকে ফাঁসি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলি কোহেন ইসরাইলের জাতীয় বীরে পরিণত হন। হাজার হাজার লোক তার জন্য শোক করতে থাকে। তার নামে ইসরাইলে স্কুল, রাস্তা এবং পার্কের নামকরণ করা হতে থাকে। এলি কোহেনের গুণগান করে অসংখ্য লেখা ছাপা হতে থাকে।
এলি কোহেন তার অন্তিম চিঠিতে স্ত্রী নাদিয়াকে পুনর্বার বিয়ে করতে বললেও নাদিয়া সে কথা রাখেননি। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও সিরিয় এলি কোহেনের লাশ ফেরত দিতে এবং ইসরাইলে সমাধিস্থ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এলি কোহেনকে মোসাদের একজন বীর বা হিরো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এতদসত্ত্বেও কিছু লোক এলির পরিণতির জন্য মোসাদকে দায়ী করে থাকে। এলি কোহেনের পরিবার এবং বহু লেখকের অভিমত মোসাদ তাকে যথেচ্ছভাবে কাজে লাগিয়েছে। প্রতিদিনই তাকে দিয়ে রেডিও ট্রান্সমিশন করিয়েছে। কোনো কোনো দিন দু'বার। মোসাদ সিরিয় পার্লামেন্টের বাদানুবাদ এলি কোহেনকে নিয়মিত পাঠানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই রিপোর্টের প্রয়োজনীয়তা ছিল শূন্য। এসব উদ্দেশ্যহীন কাজ এলি কোহেনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
এলি কোহেন ছিলেন 'মহান' এক গোয়েন্দা। তার জীবন-অবসানের মধ্য দিয়ে মহান গোয়েন্দাদের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
মোসাদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস এবং কাজ আদায়ে বাড়াবাড়ি তার লোকদের মৃত্যুঝুঁকি যে বাড়িয়ে দেয়, তা বলাই বাহুল্য।

📘 মোসাদ > 📄 মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্প ভন্ডুল

📄 মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্প ভন্ডুল


১৯৬৩ সালের আগস্টে মাদ্রিদের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে দু'জন লোক ঢুকে মালিকের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। অস্ট্রিয়ার এই মালিকের নাম অট্টো স্করজেনি। তারা মালিককে ন্যাটোর অফিসার পরিচয় দিল এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা তার স্ত্রীর কাছে একটা চিঠি লিখে দিতে বলল।
খুব অল্পতেই ঐ সম্মানিত ব্যবসায়ী বুঝলেন, আগতরা তার অতীত-বর্তমান সবই জেনে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্করজেনি ছিলেন একজন ডাকসাইটে কর্মকর্তা। আসলে তার চেয়েও অধিক। এবং অবশ্যই জার্মানিতে। সুদর্শন, ডেয়ারডেভিল এই কম্যান্ডোর অভিযানগুলো ছিল তুলনা রহিত এবং দর্শনীয়। ১৯৪৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ছত্রী-সেনাদের একটি ব্যাটেলিয়ন নিয়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থান থেকে ফ্যাসিস্ট ডিকটেটর বেনিতো মুসোলিনিকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন। নাজিবিরোধী ইটালী সরকার মুসোলিনিকে জেল দিয়েছিল। এসএস ক্যাপ্টেন স্করজেনি মুসোলিনিকে হিটলারের সামনে উপহার দিলে তাকে অনেক পদক ও পদোন্নতি দেয়া হয়। স্করজেনি অসংখ্য বিপজ্জনক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। এজন্য তাকে ইউরোপের সবচে ভয়ানক মানুষ হিসেবে খেতাব দেয়া হয়েছিল।
যুদ্ধাপরাধ আদালত থেকে মুক্ত হয়ে স্করজেনি স্পেনে বসবাস শুরু করেন এবং তার ব্যবসাও বেশ জমে উঠে।
স্করজেনির কাছে আগত এই দুই যুবক বলল, আমরা আসলে ন্যাটোর গোয়েন্দা নই। আমরা ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের লোক। এই দুই লোক হল রাফি এইতান ও জার্মানিতে নিযুক্ত মোসাদ বাহিনীর প্রধান আব্রাহাম।
স্করজেনির মুখটা ইসরাইলের কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কেননা বছরখানেক আগে ইহুদি হত্যার জন্য তারা এডলফ আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছে। এবার কি তার পালা? সামনে বসা ছোটখাট লোকটা স্করজেনির ভয়টা ভাঙিয়ে দিল। গোয়েন্দাটি বলল, আপনার মিসরে খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে। একটা ব্যাপারে আমরা শুধু আপনার সহযোগিতা চাই।
১৯৬২ সালের ২১ জুলাই ইসরাইলে ইয়েসেলির আগমনের দুই সপ্তাহ পরে মিসর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সংবাদ জানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল। এর মধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি ১৭৫ মাইল করে, বাকি দু'টির ৩৫০ মাইল করে। ২৩ জুলাই মিসরের বিপ্লব দিবসের প্যারেডে বহু মিসাইল থরে থরে সাজিয়ে প্রদর্শিত হল। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এক বিশাল সমাবেশে বললেন, তাদের মিসাইল বহু বহু দূরের টার্গেটে হিট করতে সক্ষম।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের মূল টার্গেট হল ইসরাইল। অর্থাৎ ইসরাইলের যে কোনো স্থান তা আঘাতে সক্ষম। মিসরের এই সাফল্য ইসরাইলকে বিস্মিত করল এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মোসাদ-প্রধান ইসার হারেলের প্রতি ক্রোধপূর্ণ সব মন্তব্য করতে লাগলেন। কেন মোসাদ তাদেরকে আগে-ভাগে কিছু জানাতে পারল না। কেউ কেউ এমনও বললেন, নাসের যখন সাংঘাতিক সব অস্ত্র বানাচ্ছেন সেখানে হারেল ক্ষুদে ইয়েসেলিকে উদ্ধারে দেশ-বিদেশ করছেন।
উদ্বিগ্ন বেন গুরিয়ান আইসার হারেলকে ডেকে মিসরের রকেট-ক্ষেপণাস্ত্রের আপডেট দিতে বললে তিনি তাতে সম্মতি দেন। আইসার হারেল এক দক্ষ গোয়েন্দাকে এ ব্যাপারে মিসরে পাঠালেন। মাস-খানেকের মধ্যে হারেল বেন গুরিয়ানকে মিসরের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চিং সংক্রান্ত তথ্যাদি দিলেন।
আইসার হারেল রিপোর্টে লিখলেন যে, জার্মানির বিজ্ঞানীরা মিসরকে এ প্রকল্পে সহায়তা করছে।
১৯৫৯ সালে নাসের আনকনভেনশনাল অস্ত্র বানানোর লক্ষ্যে গোপন একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন।
নাসের এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেন সাবেক এয়ারফোর্স ইন্টেলেজিন্সের কমান্ডার জেনারেল খলিলকে। স্পেশাল মিলিটারি প্রোগ্র্যামস ব্যুরোর তিনি প্রধানও। তার ওপর দায়িত্ব পড়ল যুদ্ধবিমান, রকেট মিসাইল একই সাথে রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্র বানানোর। এই খাতে প্রচুর বরাদ্দও দেয়া হল।
জেনারেল খলিলের প্রথম কাজ হল, এসব অস্ত্র বানাতে সক্ষম ব্যক্তিদের এনে জড়ো করা। এবং তিনি জানতেনও, লোক কোথায় পাওয়া যাবে।
নাজি জার্মানিতে রকেট ইত্যাদি অত্যাধুনিক অস্ত্রাদি বানিয়েছে এমন দক্ষ বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের অনেক বেতন, ভাতা, বোনাস ও হাজারো সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জেনারেল খলিল তাদের মিসরে এনে জড়ো করলেন। এদের সংখ্যা তিন শতাধিক।
মিসরের একটি প্রকল্পের নাম ৩৬। এখানে যোগ দিলেন যুদ্ধবিমান বানাতে দক্ষ উইলি মেসেরস্পীট। তিনি একটি মিসরীয় যুদ্ধবিমান এসেম্বলিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেসেরস্পিটকে মারাত্মক যুদ্ধবিমান তৈরির জনক বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজি বিমান বাহিনীতে তিনি এই পদবি পান।
জেনারেল মোট তিনটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করে জগৎজোড়া বিজ্ঞানীদের সেখানে নিয়োগ দেন। তিনটি প্রকল্পের মধ্যে ৩৩৩ নম্বর প্রকল্পটি ছিল গোপন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এখানেও হিটলারের লোকজন ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে তৎপর ছিলেন।
মোসাদ-প্রধান আইসারের পর্যবেক্ষণ হল ১৯৬০ সালের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণের প্রকল্পগুলো পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করে। ঐ বছরই আমেরিকার একটি বিমান থেকে তোলা ছবির সূত্র ধরে বলা হয় ইসরাইল পরমাণু বোমা বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যানার হেডিং করে সেই খবর ছাপে। ইসরাইল যতই বলল, ওটা টেক্সটাইল কারখানা- কেউ তাতে কর্ণপাত করে না। এদিকে মিসরসহ আরব দেশগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। মিসর সিদ্ধান্ত নেয়, ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র বানানোর প্রকল্পগুলো আরও জোরেসোরে এগিয়ে নিতে হবে।
জার্মানিতে রকেট বানাতেন যে বিজ্ঞানীরা তাদের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ইউজেন স্যাঞ্জার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কয়েক বছর ফ্রান্সে কাটান; সেখানে তিনি ভেরোনিক রকেট বানান। এটি জার্মানিদের ভি২ রকেটের একটি সংস্করণ। এভাবে মিসরে জড়ো হওয়া জার্মান বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে বটেই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়কর অস্ত্র বানাতে শুরু করেন। ইউজেন স্যাঙ্গার মিসরীয় প্রকল্পে যোগ দিলে তার সঙ্গী সাথী বিজ্ঞানীদেরও সেখান নিয়ে আসেন। জার্মান ও মিসরীয়রা মিলে এসব প্রকল্পের জন্য কয়েকটি ফ্রন্ট অফিস খোলেন। হাসান কামিল নামের এক মিলিয়নিয়ার বাস করতেন সুইজারল্যান্ডে। তিনি লিয়াজোঁ করতেন মিসরীয় প্রকল্পে। তারা সুইজারল্যান্ডে দুটি ডামি কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি কোম্পানির কাজ ছিল মিসরীয় প্রকল্পের জন্য নানারকম যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ সংগ্রহের।
১৯৬১ সালে স্যাঙ্গার এবং কয়েকশত দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান মিসরীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু বছরের শেষ দিকে জার্মান সরকার জানতে পারে যে, তাদের স্টুটগার্টের প্রকল্পের কিছু লোক মিসরীয় প্রকল্পে কাজ করছে। জার্মান সরকার অতঃপর স্যাঙ্গারকে জার্মান যেতে বাধ্য করে। প্রফেসর পিলজ মিসরীয় প্রকল্পের প্রধান হন।
১৯৬২ সালের জুলাইয়ে মিসরের ৩৩৩ প্রকল্প ত্রিশটি মিসাইল বানিয়ে ফেলে। তার মধ্যে চারটি মিসাইল নির্দিষ্ট অতিথি ও সাংবাদিকদের দেখান হয়। কুড়িটি মিসাইল সে দেশের পতাকা জড়িয়ে কায়রোর রাস্তায় প্রদক্ষিণ করে।
মোসাদ-প্রধান হারেল আগস্ট মাসে বেন গুরিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় পিলজের লেখা একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। চিঠিটি মিসরের ৩৩৩ প্রকল্পের পরিচালক কামিল আজবকে লেখা। ঐ চিঠিতে পিলজ টাইপ টু'এর পাঁচশত মিসাইল টাইপ পাঁচশত মিসাইল বানানোর জন্য ৩৭ লক্ষ সুইস ফ্রাঙ্ক বরাদ্দের কথা বলেন। ঐ সব ক্ষেপণাস্ত্রের মেশিন পার্টস ও যন্ত্রপাতির জন্য ঐ টাকার প্রয়োজন। অর্থাৎ নয়শত মিসাইল বানাচ্ছে মিসর।
এই চিঠি দেখে ইসরাইলি শীর্ষ পর্যায়ে মাথা খারাপের যোগাড় হয়। মোসাদ-প্রধানের আশংকা জার্মানির বিজ্ঞানীরা প্রতারণার মাধ্যমে ইসরাইলকে ধ্বংস করতে চায়। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা পৃথিবীতে রোজ কেয়ামত ঘটিয়ে ছাড়বে। মিসরের অস্ত্রভাণ্ডারে এমন অস্ত্র আসছে যা যে কোনো জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হবে। ইসরাইলের ভূখণ্ডে এমন একটি নারকীয় গ্যাস তারা ছাড়তে সক্ষম হবে যার অস্তিত্ব বহুদিন অনুভূত হবে ইত্যাদি।
ঐ সময় ইসরাইলের চিফ অব স্টাফ ছিলেন জেনারেল জভি জুর। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, মিসরের অস্ত্র বানানোর বিষয়টি তারা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বিজ্ঞানীরা সৌখিন এবং তথ্যের ব্যবহার তারা জানে না।
মোসাদ-প্রধানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সব সময়ই ঈর্ষণীয়। সবাই তাকে ভালো বাসতেন, ভালো জানতেন। কিন্তু আইচম্যানকে আটকের পর তার মানসিকতা ও চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। স্টিলের মতো শক্ত এই মানুষটি এখন জার্মানির বিরুদ্ধে লেগেছেন। কেননা জার্মানির বিজ্ঞানীরা ইসরাইল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। মোসাদ-প্রধান বেন গুরিয়ানকে বললেন, জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে কথা বলতে। বেন গুরিয়ান জার্মান চ্যান্সেলর কোনোরাদ এডেনাউয়ের সঙ্গে তাদের বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। কেননা সম্প্রতি জার্মানি ইসরাইলের একটি মরুভূমির উন্নয়নে পাঁচশত মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। গুরিয়ান ও জার্মান চ্যান্সেলরের মধ্যে সম্প্রতি ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রানিজ যোশেফ ইসরাইলকে শত শত কোটি টাকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাংক, কামান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ইত্যাদি। সবই বিনামূল্যে। হালোকাস্টের মাধ্যমে জার্মানির পক্ষ থেকে ইহুদিদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এই উপহার। বেন গুরিয়ান বর্তমান জার্মান সরকারকে বিশ্বাস করেন এবং মিসরকে কেন্দ্র করে তিনি এই সম্পর্ক কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না। গুরিয়েন তার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শিমন পেরেজকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখার পরামর্শ দেন।
কিন্তু এতটুকুতে মোসাদ-প্রধান আইসার সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মিসরে জার্মানদের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে ব্যক্তিগতভাবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর প্রতিজ্ঞা করেন।
১৯৬২ সনের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় এক অপরিচিত ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীর চেহারার একজনকে সঙ্গে নিয়ে মিউনিখে মিসরীয়দের উল্লেখিত একটি প্রকল্প অফিসে আসে। আধঘণ্টার মধ্যে হেনজ ক্রুগকে নিয়ে তারা ভবন ত্যাগ করে।
পরদিন সকালে মিসেস ক্রুগ পুলিশকে জানান যে, তার স্বামী নিখোঁজ। দুদিন পরে পুলিশ ক্রুগের সাদা মাইক্রোবাস গাড়িটি মিউনিখের শহরতলী থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। গাড়িটি কাদা দিয়ে ল্যাপা ছিল এবং ট্যাঙ্কে এক ফোঁটাও পেট্রোল ছিল না। অচেনা এক লোক ফোন করে ক্রুগের মৃত্যুর সংবাদ দেয়। পুলিশ অবশ্য অন্য একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছিল, মোসাদ ক্রুগকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে গেছে। যাহোক এখন সন্দেহাতীত যে, ক্রুগ মারা গেছেন।
২৭ নভেম্বর পিলজের সেক্রেটারি ওয়েন্ডি তার ৩৩৩ ফ্যাক্টরির অফিসে একটি খাম দেখতে পান। প্রেরক হামবুর্গের বিশিষ্ট আইনজীবী। ওয়েন্ডি খামটি খোলামাত্র একটা বিস্ফোরণে অফিসটি কেঁপে উঠে। পিলজের সেক্রেটারি কয়েক মাস হাসপাতালে কাটালেও তার চোখ অন্ধ হয়ে যায়। তার মুখমণ্ডল বিকৃত এবং তিনি কালো হয়ে যান।
পরের দিন মিসরের ৩৩৩ নম্বর ফ্যাক্টরির ঠিকানায় এক বই প্রকাশকের অফিস থেকে একটা প্যাকেট আসে। প্যাকেটে লেখা ছিল বই। যখন এক মিসরীয় ক্লার্ক সেটি খোলে অমনি তা বিস্ফোরিত হলে পাঁচজন লোক নিহত হয়। প্যাকেটে প্রকাশকের যে ঠিকানা ছিল তা স্পষ্টতই ভুয়া ছিল।
এরপর জার্মানি থেকে এবং মিসরের ভেতর থেকে এরকম প্যাকেট আসতে থাকে। সেগুলো বিস্ফোরিত ও লোকজন আহত হতে থাকে।
পরবর্তীতে মিসরের অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্প থেকে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। সেনাবাহিনী বেশ কিছু বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়ও করে। মিসরবাসী এবং সাংবাদিকদের বুঝতে বাকি থাকে না কায়রোতে এর প্রেরক ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। আরও পরে জানা যায় কিছু পার্সেলের প্রেরক 'শ্যাম্পেন স্পাই' নামের এক গোয়েন্দা। মিসরেই ভিন্ন পরিচয়ে তিনি থাকেন এবং জার্মানির সাবেক এসএস অফিসার বলে পরিচয় দেন। জার্মান স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কায়রোতে স্থায়ী এবং মিসরের হাই সোসাইটি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের খুব ঘনিষ্ঠ।
পত্রবোমা জার্মান বিজ্ঞানীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে এবং তাদের প্রাণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করেন। প্রেসিডেন্ট নাসেরের প্রকল্পে তাদের এবং তাদের স্বজনদের কাজ না করার জন্য বেনামে ফোন দেয়া হতে থাকে। নাসেরের তিন প্রকল্পে কড়া নিরাপত্তা দেয়া শুরু হয়। জার্মানিতেও তাদের অফিসে কড়া নিরাপত্তা চালু হয়। বিজ্ঞানীরা যখন ইউরোপ যেতেন তখন তারা একসঙ্গে থাকতেন এবং জার্মান পুলিশের সাহায্য নিতেন। এর ফলে সম্ভবত প্রফেসর পিলজের ১৯৬২ সালের শেষার্ধে একবার জীবন রক্ষা পায়। তাকে মোসাদ ফলো করলেও হত্যার সুযোগ পায়নি।
মোসাদ-প্রধান আইসার ১৯৬২ সালের অধিকাংশ সময় মিসর-ইস্যুতে ইউরোপেই কাটান এবং মোসাদ গোয়েন্দাদের নানাকাজে নিয়োগ করেন। রাফি এইতান বিজ্ঞানীদের চিঠিপত্র গায়েবে ওস্তাদ এবং এজেন্ট নিয়োগের পরিবর্তে এ কাজে তিনি সাফল্য দেখান। এইতানের মতে, চিঠিপত্রের মাধ্যমে ফার্স্টক্লাস ম্যাটেরিয়াল পাওয়া যায়।
অপ্রচলিত পন্থায় অভিযান চালানোর জন্য এইতানের কিছু ইলেকট্রোনিক যন্ত্রপাতি দরকার। কিন্তু সেগুলো দোকানে পাওয়া যায় না। এসব যন্ত্রপাতি সিআইএসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে এইতান ল্যান্সকি নামের এক ডাকাতের সন্ধান পান মিয়ামিতে। সে-ও ইহুদি। তাকে ফোনে পাওয়া গেলে সে জানায়, সুইজারল্যান্ডে এক মাসের মধ্যে সে এইতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ল্যান্সকি এইতানের শিকাগোর এক লোকের ঠিকানা দিলে তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।
মোসাদ-প্রধানের এবারের টার্গেট ড. অট্টো জোকলিক। সূত্র মতে, ড. জোকলিক একজন অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী এবং পরমাণু রেডিয়েশনে তার বিশেষ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। তার আরেকটি বিশেষত্ব হল স্বল্প সময়ে তিনি পরমাণু বোমা বানাতে পারেন। ড. অট্রো জোকলিকের জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ ক্রয়ের জন্য মিসর অস্ট্রিয়ায় একটি ফ্রন্ট অফিস খোলে। ওখান থেকে মালামাল মিসরে পাঠানো হবে। জোকলিক মিসরের জন্য দুটি পরমাণু পরীক্ষা চালাবেন এবং বেশ কিছু পরমাণু বোমা বানাবেন যা ক্ষেপণাস্ত্রের ওভারহেডে যুক্ত করা হবে।
এসব ঘটনায় সহজেই অনুমেয় জোকেলিক একজন ভয়ংকর মানুষ। এমনও হতে পারে জার্মানির বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচে ভয়ংকর। মোসাদ জরুরি ভিত্তিতে জোকলিককে খুঁজে বের করতে ইউরোপে তাদের সব গোয়েন্দার কাছে বার্তা পাঠায়।
১৯৬২ সালের ২৩ অক্টোবর মোসাদ-প্রধান আইসার একটি ঘটনায় স্তম্ভিত। ইউরোপে ইসরাইলি দূতাবাসের কলিংবেল টিপে এক লোক নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। সেখানে তিনি বললেন, আমিই অট্টো জোকলিক। মিসরের জন্য আমি যেসব মারণাস্ত্র বানাচ্ছি তার একটি প্রতিবেদন ইসরাইলকে দিতে আমি প্রস্তুত।
দুই সপ্তাহ বাদে ব্যাপক গোপনীয়তার মধ্যে জোকলিক ইসরাইল যান। বেশ কয়েকমাস পরে জোকলিকের স্বপক্ষ ত্যাগের বিষয়টি যখন প্রকাশ্যে এল তখন ইউরোপের সাংবাদিকরা লিখতে শুরু করলেন যে, তিনি ইসরাইলিদের সঙ্গে ভিড়েছেন। বিশেষ করে ক্রুগের মৃত্যুর পরে। প্রকৃতপক্ষে জোকলিক সব সময়ই ক্রুগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ক্রুগ অপহৃত হলে জোকলিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার আশংকা ক্রুগ যদি ইসরাইলিদের দ্বারা অপহৃত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তার নাম বলেছেন। মিসরীয়দের অস্ত্র প্রকল্পে তার গুরুত্বের কথা বলেছেন। ফলে জোকালিক ভাবলেন, ইহুদিদের হাতে তার মৃত্যু অবধারিত। ফলে তিনি স্বপক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ইসরাইলিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। আর জীবন বাঁচাতে যে তিনি এটা করেছেন তা বলাই বাহুল্য।
জোকলিক ইসরাইলে ছিলেন। মোসাদ তাকে সার্বিক নিরাপত্তা দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে রেখেছিল। মোসাদ-প্রধান তাকে বিশেষ দুটি কাজে লাগাতে চাইলেন। প্রথমত, তার মাধ্যমে মিসরীয় প্রজেক্ট সম্পর্কে তথ্য পাওয়া; আরেকটি হল মিসরে ফিরে গিয়ে মোসাদের পক্ষ হয়ে কাজ করা। এক কথায় ডাবল এজেন্ট।
অট্টো জোকলিক ইসরাইলিদের জানান, একজন সিনিয়র জার্মান ক্লার্কের মাধ্যমে তার সঙ্গে জেনারেল খলিলের পরিচয় ঘটে এবং নিয়োগ লাভ করেন।
মিসরীয়দের একটি প্রকল্পের নাম ছিল ক্লিওপেট্রা। এই প্রকল্পের দুটি পরমাণু বোমা বানানোর কথা। জোকলিক এক্ষেত্রে প্রতিভাদীপ্ত দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলেন। তার যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে ২০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনে জার্মানি ও হল্যান্ডে তা আরও সমৃদ্ধ করে বিশেষ পরমাণু শক্তিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা ছিল। এক্ষেত্রে জার্মানি ও হল্যান্ডের তিনজন জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীকে তিনি তালিকাভুক্ত করেন। আর ঐ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়েই পরমাণু বোমা বানানো হবে।
জোকলিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। তিনি জার্মান বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে কথাও বলেন এবং মিসরে পরমাণু বোমা বানানোর দাওয়াত দেন। ইউরোপ থেকে তিনি বেশ কিছু নিকেল জাতীয় জিনিস কেনেন এবং তা কায়রোতে পাঠাতে সক্ষম হন।
জোকলিকের রিপোর্ট বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেননি। প্রথমত শতকরা কুড়ি ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাওয়া কঠিন। আরও কিছু হিসাব কষে বিশেষজ্ঞরা বললেন, জোকলিকের ফর্মুলা ভুল।
বিশেষজ্ঞদের শীতল মন্তব্য মিসরের নেতাদের দমাতে ব্যর্থ হল। মিসরীয়রা রাসায়নিক অস্ত্র বানাচ্ছে এ নিয়ে রিপোর্ট ছাপা হলে তারা আরও সতর্ক হয়। ১৯৬৩ সালের ১১ জানুয়ারি মিসর ইয়েমেনে সঙ্গে যুদ্ধে পয়জন গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে বিশ্ববাসী ও উল্লেখিত বিজ্ঞানীরা বললেন, তাদের ধারণা অমূলক নয়। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে বিষয়টি জানান। গোল্ডা মেয়ার তাকে বলেন যে, মিসর আনকনভেনশনাল ওয়ারহেড ব্যবহার করে মিসাইল বানাচ্ছে। কেনেডিকে তিনি হস্তক্ষেপ করতে বলেন। কিন্তু কেনেডি এ নিয়ে কিছুই করেননি।
আনকনভেনশনাল ওয়ারহেডস খুবই ভয়ানক। কিন্তু মিসর তাদের প্রথম অগ্রাধিকার দিল মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করার কাজে।
১৯৬৩ সালের শীতকালে মিসরের ৩৩৩নং ফ্যাক্টরির গাইডেন্স বিশেষজ্ঞ ড. ক্লেইনওয়াচার কয়েক সপ্তাহের জন্য জার্মান আসেন। নিজের ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে অন্ধকার ও সরু গলি দিয়ে তিনি তার বাসায় যাচ্ছিলেন। রাস্তায় অনেক পুরু বরফও ছিল। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একটি গাড়ি এসে তার পথ আটকায়। গাড়ি থেকে একটি লোক নেমে ক্রেইনওয়াচারের দিকে এগোতে থাকে। বিজ্ঞানী তৃতীয় একটি লোককেও গাড়িতে দেখতে পান। আগত ব্যক্তিটি ক্লেইনওয়াচারের কাছে জানতে চান ড. সেনকার কোথায় থাকেন? উত্তরের জন্য কোনো অপেক্ষা না করেই লোকটি তার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার দিয়ে ক্লেইনওয়াচারকে গুলি করে। গুলিতে গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে যায় এবং ক্লেইনওয়াচারের উলের মাফলারে আটকে যায়। ক্রেইনওয়াচার তার রিভলবার বের করার আগেই আততায়ী দ্বিতীয় একটি গাড়িতে চড়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ দেখে যে, ঘটনাস্থল থেকে একশ গজ দূরে প্রথম গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আগত তিনজনই আরেকটি গাড়িতে করে পালিয়েছে। তারা আলি সামিরের একটি পাসপোর্ট ফেলে যায়। আলি সামির হলেন মিসরীয় গোয়েন্দা বাহিনীর একজন প্রধান। তিনি তখন কায়রোতে। যাহোক, ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলাকারীদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবগুলো পত্রিকারই একই মন্তব্য, এ হত্যা প্রচেষ্টা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের। যদিও এবারের হত্যা চেষ্টা সফল হয়নি।
মোসাদের এবারের টার্গেট সুইজারল্যান্ডে জার্মান বংশোদ্ভূত ড. পলে গোয়েরকেকে নিধন!
ক্লেইনওয়াচারের অনুরূপ গোয়েরকে মিসরের মিসাইল প্রজেক্টে গাইডেন্স সিস্টেমে কর্মরত। তিনি মিসরের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা পান। মোসাদের কাছেও ভিন্ন কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়েরকের মেয়ে হেইদির জার্মানিতে সুইস সীমান্তের কাছে বসবাস। ক্লেইনওয়াচারের ওপর মোসাদের হামলার পর ড. জোকলিক হেইদিকে ফোন করে বলেন যে, তার বাবার সাথে মিসরে তার দেখা হয়েছে। সেখানে তিনি ইসরাইল ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিপজ্জনক অস্ত্র বানাচ্ছেন। জোকলিক হেইদিকে ইংগিত করেন যে, তার বাবা যদি ঐ বিপজ্জনক কাজ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। এর বিকল্প হল, যদি তিনি মিসর ত্যাগ করেন, তাহলে ভয়ের কিছু নেই।
জোকলিক উপসংহারে হেইদিকে বলেন, যদি তুমি তোমার বাবাকে ভালোবাস, তাহলে শনিবার ২ মার্চ বিকাল ৪টায় আমার সঙ্গে বাসেলের থ্রি কিংস হোটেলে দেখা কর। অস্থির হেইদি অবিলম্বে সাবেক নাজি অফিসার এইচ মানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মান আবার মিসরের অস্ত্র প্রকল্পে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের দায়িত্বে নিয়োজিত। মান পুলিশকে বিষয়টি জানালে তারা আবার তা সুইস কর্তৃপক্ষকে জানায়। জোকলিক এবং তার বন্ধু যখন থ্রি কিংস হোটেলে ঢোকেন তখন হোটেলের পেছনে পুলিশের বেশ কিছু গাড়ি মোতায়েন করা। লবিতে গোয়েন্দা মোতায়েন, হেইদিরা যে টেবিলে বসবে সেখানে টেপরেকর্ডার সেট করা- সব আয়োজনই সমাপ্ত।
জোকলিকের সঙ্গে ছিলেন মোসাদ গোয়েন্দা যোশেফ বেন গাল। তারা ফাঁদে পা দিলেন। তারা এসবের কিছুই সন্দেহ করেননি এবং হেইদির সঙ্গে ঘণ্টা খানেক কথা বলেন। সতর্ক থাকার কারণে তারা হেইদিকে কোনো ভয় দেখাননি বরং যদি তার বাবা মিসরে উল্লেখিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকেন, তাহলে কী ধরনের ক্ষতির আশংকা তার নজির দেখালেন। তারা হেইদিকে কায়রোর একটি বিমান টিকেট দিতে চাইলেন। তাদের বক্তব্য, হেইদি যেন মিসরে গিয়ে তার বাবাকে বুঝায় এবং জার্মানিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জার্মানিতে তাদের পরিবারের কারো কোনো ভয় নেই।
মিটিংশেষে তারা দু'জনই জুরিখে চলে যান। সেখান থেকে তাদের পৃথক যাত্রা শুরু হয়। জোকলিক যখন আরেকটি ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ তখনই সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মোসাদ গোয়েন্দা বেন গালকে ইসরাইলি কনস্যুলেটের কাছে গ্রেফতার করা হয়। ঐ দিনই অপরাহ্নে জার্মান পুলিশ সুইস কর্তৃপক্ষকে ঐ দুই ব্যক্তিকে এক্সট্রাডিয়েট করতে বলে। হেইদিকে ভয় দেখানো এবং ড. ক্লেইনওয়াচারের ওপর হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
ইউরোপের সদর দফতরে বসেই মোসাদ-প্রধান আইসার সুইস কর্তৃপক্ষকে বেনগাল এবং জোকলিককে ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু জার্মানির এক্সট্রাডিশন অনুরোধের কারণে তা সম্ভব নয় বলে সুইস পুলিশ জানায়। আইসার অবশেষে ইসরাইল ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেষদিকে তারা দু'জনই মিসরকে নিয়ে জার্মানির আচরণে বিরক্ত ছিলেন।
গোল্ডা মেয়ার বলেন, ইসরাইল যদি জার্মান চ্যান্সেলরকে বলে তাহলে হয়তো পশ্চিম জার্মানি এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নিতে পারে।
মোসাদ-প্রধান দ্রুত টাইবেরিয়াসে চলে যান। সেখানে তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ান অবকাশে ছিলেন। মোসাদ-প্রধান অবিলম্বে পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনে প্রতিনিধি পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন। এই প্রতিনিধিদল পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলরকে প্রমাণাদিসহ দেখাবে যে, মিসরে জার্মানির বিজ্ঞানী রকেট ইত্যাদি বানাতে লিপ্ত। এ এক ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন। একই সাথে জার্মানি যেন এক্সট্রাডিশনের অনুরোধ তুলে নেয়।
কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন এতে অস্বীকৃতি জানান।
আইসার নাছোড়বান্দা। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, যদি গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় তাহলে পুরো ব্যাপারটিই নস্যাৎ হয়ে যাবে। আইসার বলেন, বেন গালের গ্রেফতারের বিষয়টি জানাজানি হওয়ামাত্র জার্মান বিজ্ঞানীদের মিসরের কার্যকলাপ প্রকাশ্যে এসে যাবে। তখন ইসরাইল বলতে পারবে বেনগালের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড সংগতিপূর্ণ ছিল। আমরা এ কথাও বলতে পারব যে, মিসর রকেট বানানোসহ অন্যান্য প্রকল্পে জার্মানির বিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়েছে।
বেন গুরিয়েন কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন এবং অবশেষে বললেন 'সো বি ইট'।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন ও মোসাদ-প্রধান আইসারের সম্পর্কে এই প্রথমবারের মতো চিড় ধরল।
১৯৬৩ সালের ১৫ মার্চ ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল জোকলিক ও বেনগালের গ্রেফতারের সংবাদটি ছাপল। মিসর সরকারের প্রকল্পে কর্মরত জার্মান বিজ্ঞানীর মেয়েকে ভয় দেখানোর কারণে এই গ্রেফতার।
মোসাদ-প্রধান আইসার দৈনিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদকদের নিয়ে গোপন বৈঠক করলেন। সেখানে তিনি জোকলিকের ভূমিকার উল্লেখ করলেন। বললেন, জোকলিক মিসরের প্রজেক্টে কাজ করতেন কিন্তু এখন পক্ষ বদলেছেন। আর সেখানে একটি ধ্বংসযজ্ঞ বাধানোর কাজে জোকলিক লিপ্ত ছিলেন। এখন সেই ক্ষতি পোষাতে স্বেচ্ছায় তিনি ইসরাইলের পক্ষে কাজ করছেন।
এদিকে মোসাদ-প্রধানের সহযোগীরা ইসরাইলের সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে লাগলেন। ইসরাইলের তিন সাংবাদিক বিস্তারিত রিপোর্ট করতে ইউরোপ যান। তারা ইউরোপ থেকে জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট লিখে পাঠাতে থাকেন। মোসাদ গোয়েন্দাদের বিদেশে পাঠিয়ে ইসরাইলিপন্থী সাংবাদিকদের দিয়েও জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়।
মোসাদ-প্রধান আইসার হারেল ঠিক বুঝতে পারছেন না, জার্মানইস্যু ইসরাইলে কেন এতেঠ স্পর্শকাতর ব্যাপার হয়ে উঠল। জার্মানির প্রতি তার লাগামহীন আক্রমণে ইসরাইলের মানুষ যেন ফুঁসে উঠেছে। ঘরে ঘরে জার্মানির বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রচারণা চলছিল।
এদিকে মার্চের ১৭ তারিখ থেকে ইসরাইল ও বিদেশিদের তুলোধোনা শুরু হল পত্র-পত্রিকায়। পত্রিকায় আরও বলা হল, পশ্চিম জার্মানির এসব বিজ্ঞানীরা সাবেক নাজি। তারা এমন মারণাস্ত্র নেই যা মিসরের হয়ে বানাচ্ছে না। এমনও বলা হল, ঐ বিজ্ঞানীরা ইসরাইলে প্লেগ ছড়িয়ে দেবে। এমন বিষাক্ত বিষ ছাড়বে যা ইসরাইলের বাতাসে নব্বই বছর ধরে বহমান থাকবে। পত্রিকাগুলো এমন লেখাও লিখল যে, হিটলারের পন্থা অবলম্বন করেই জার্মানি নতুন করে ইহুদিনিধনে মেতেছে। জার্মান সরকারকেই এজন্য দায়ী করা হল।
বেনগাল ও জোকলিকের সাজা হল সামান্যই। তাদেরকে দু'মাস করে জেল দেয়া হল। হঠাৎ বিচারক লক্ষ করলেন, একটি লোক আদালতে বন্দুক নিয়ে ঢুকেছে। রেগে গিয়ে বিচারক বললেন, কোনো সাহসে আপনি বন্দুক নিয়ে আদালতে ঢুকেছেন?
বন্দুকধারী বললেন, চব্বিশ ঘণ্টা বন্দুক নিয়ে ঘোরার অনুমতি রয়েছে আমার। মিসরে জার্মান বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার। তিনি তার নাম বললেন, এইচ মান। মান হলেন সেই লোক; বিজ্ঞানীর মেয়ে হেইদি গোয়েরকে যাকে প্রথম ঘটনাটা জানিয়েছিল।
এই মানই জার্মান পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন।
সাদা পোশাকের এক মোসাদ গোয়েন্দা আদালতকক্ষ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পুরো বিষয়টি তার সুপিরিয়ারদের জানাল। আরেক মোসাদ গোয়েন্দা দ্রুত চলে গেল ভিয়েনায়। দেখা গেল নাজিদের এক আততায়ী সিমনের সঙ্গে। সিমন মোসাদকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিল।
মোসাদ গোয়েন্দা সিমনের কাছে জার্মান নাগরিক মানকে চেনেন কিনা জানতে চাইল। সিমন কিছুক্ষণ পর আর্কাইভ থেকে এইচ মানের ফাইলটি নিয়ে এল। জানাল, মান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এসএস অফিসার ছিল। কর্নেল অট্টোর অধীনে সে একটা কমান্ডো বাহিনীতে কাজ করত। এক পর্যায়ে স্করজেনি'র নাম আসে। এই রচনার শুরুতেই স্করজেনি'র উল্লেখ রয়েছে। মোসাদের দু'জন গোয়েন্দা তার কাছেই গিয়েছিল। কেননা স্করজেনি'র পক্ষেই সম্ভব তার অধীনস্থ সাবেক কর্মী মান সম্পর্কে তথ্য প্রদানের। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা স্করজেনি'র স্ত্রীকে প্রথম খুঁজে বের করা হল। মহিলা প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করলেন মোসাদ গোয়েন্দাদের।
মোসাদ স্করজেনিকে তাদের গোয়েন্দা হতে বলল। স্করজেনি মোসাদের লোকদের বললেন, আমি তোমাদের কী করে বিশ্বাস করব? কেননা তোমরা যুদ্ধাপরাধের দায়ে আইচম্যানকে ফাঁসি দিয়েছ। এরপর তোমরা যে আমাকে ফাঁসি দেবে না তার নিশ্চয়তা কী।
মোসাদ গোয়েন্দা বললেন, আপনার ভয়ের কোনো কারণ ঘটবে না সে গ্যারান্টি আমরা আপনাকে দিচ্ছি। মোসাদ গোয়েন্দা এক পাতা কাগজ নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের পক্ষে তাকে সফল অপকর্ম থেকে অব্যাহতিপত্র দিলেন এবং তার প্রতি কোনো সহিংস আচরণ করা হবে না বলেও লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেন। স্করজেনি অবশেষে ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে সম্মত হলেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার হাতে খুন হয়েছে অসংখ্য ইহুদি।
কয়েক মাসের মধ্যে স্করজেনি এইচ মানের সহযোগিতায় মিসরে দায়িত্বরত জার্মান বিজ্ঞানীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচরণ এবং মিসরের মারণাস্ত্র প্রকল্পের অগ্রগতির সর্বশেষ খবর মোসাদের হাতে পৌঁছে দিলেন।
এদিকে ইসরাইলে জার্মানবিরোধী প্রচারণা আরও তুঙ্গে উঠল। প্রবন্ধ, প্রতিবেদন কার্টুনের মাধ্যমে বলা হচ্ছিল যে, ১৯৩৩ সালের জার্মানি ১৯৬৩ সালেও বদলায়নি। তখন তারা ৬০ লক্ষ ইহুদিনিধন করেছে। এখন মিসরের মাধ্যমে নতুন করে ইহুদি নিধনে জার্মানরা মত্ত। ইসরাইলের সংসদে মেনাহেম বেগিন কঠোর ভাষায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের সমালোচনা করলেন। গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে মোসাদ-প্রধানের মিত্রতা ছিল। তিনিও সংসদে তারস্বরে বললেন, মিসর যে অস্ত্র বানাচ্ছে তাতে ইসরাইলের নাগরিকসহ সব প্রাণীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
কিন্তু ইসরাইলের আরেকটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আমান মোসাদের ভয়াবহ বিবরণের বিরোধিতা করল। তারা এ-ও বলল, মিসরে যেসব জার্মান বিজ্ঞানী মারণাস্ত্র বানাচ্ছে তারা মাঝারি মানের। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জেনারেল মেই'র অভিমতও অনুরূপ।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের হাতে আমানের রিপোর্টটি পৌঁছলে তিনি মোসাদ-প্রধান আইসার হারেলকে ডেকে পাঠান। তিনি হারেলের কাছে তার সংবাদের উৎস জানতে চান এবং প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা চান। মোসাদ-প্রধান ইউরোপে ইসরাইলি সাংবাদিক প্রেরণের কথা স্বীকার করেন এবং মিসরের বিষাক্ত গ্যাস কিম্বা নিকেলের তৈরি বোমা বানানোর ব্যাপারে তার কাছে তথ্য নেই বলে জানান। পরের দিন আমান-প্রধান প্রধানমন্ত্রীকে আরও বলেন, মিসরের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক বটে কিন্তু ইসরাইলি শাসকদের যেভাবে আতঙ্কিত করা হচ্ছে সে রকম কিছু নয়।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন মোসাদ-প্রধান আইসারকে আবার ডেকে পাঠান। এই সময় প্রধানমন্ত্রী ও মোসাদ-প্রধানের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী জার্মানির সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। আইসার এক পর্যায়ে নিজের অফিসে চলে আসেন। নিজের পদত্যাগপত্র লিখে পাঠিয়ে দেন।
বেন গুরিয়েন তার সংস্থা থেকে বের হয়ে না যাওয়ার জন্য আইসারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু আইসার ছিলেন অ্যাডামেন্ট। শেষ হয়ে গেল একটি অধ্যায়ের।
প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন নতুন কাউকে মোসাদ-প্রধান না করা পর্যন্ত তাকে ঐ পদে থাকতে বললেও আইসার তাতে রাজি হননি। আইসার একজনকে বলেন, বেন গুরিয়েন যেন কাউকে পাঠিয়ে তার কাছ থেকে চাবির গোছা নিয়ে নেন।
বেন গুরিয়েন তার সেক্রেটারিকে আমোসের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। কেননা মোসাদ-প্রধানের পদ তো খালি রাখা যায় না।
কিন্তু সাবাক-প্রধান আমোস তখন বিদেশে, স্বজনদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন।
বেন গুরিয়েন অতঃপর জেনারেল মেইর অমিতকে ডেকে পাঠালেন। তিনি ছিলেন এক অভিযানে। রেডিওবার্তার মাধ্যমে তাকে অবিলম্বে তেলআবিবে আসতে বলা হল। ফিরে এসে তিনি শুনলেন, তাকে মোসাদের উপ-প্রধান করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পরে মেইর অমিতকে মোসাদের প্রধান করা হয়।
জার্মানিতে লেখা পেরেজের চিঠির ফলশ্রুতিতে জার্মান সরকার আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মাধ্যমে মিসরে কর্মরতদের দেশে ফিরিয়ে আনলেন। তাদের জার্মানির বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ দেয়া হল। কয়েকজন নিজের থেকেই মিসর ত্যাগ করলেন। তারা মিসাইল বানানো শেষ না করেই চলে এসেছিলেন।
ড. ওয়েনহারকে নাসা'র ব্লু আইড বয় বলা হয়। জার্মানির বিজ্ঞানীদের তালিকা দেখে তিনি এক লেখককে বলেন যে, উক্ত দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীদের পক্ষে কার্যকর মিসাইল বানানো অসম্ভব।
জার্মান বিজ্ঞানীদের কারণেই আইসার হারেলের পতন হল। এদিকে মেইর অমিত যতদিন মোসাদ-প্রধান ছিলেন ততদিন তাকে আইসার হারেলের কটু ও বিদ্বেষপূর্ণ কথা শুনতে হয়েছে।
জার্মান বিজ্ঞানীদের নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়ায় প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েনের রাজনৈতিক কারিশমা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কয়েক মাসের মধ্যে বেন গুরিয়েন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00