📄 আমরা চাই একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান
অপহৃত ইয়োসেলিকে উদ্ধারে মোসাদ-প্রধান আইসারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। মোসাদে আইসারের স্থলাভিষিক্ত হন মেইর অমিত। তিনি এক বিশেষ ধাঁচের মানুষ। কী রকম? মেইর অমিত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কখনো কখনো কাঠখোট্টা হালকা ঝগড়াটে স্বভাবের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল। পাশাপাশি উষ্ণ স্বভাবের সোলজারস সোলজার এবং তার অনেক বন্ধু-বান্ধবও। মোশে দায়ান একবার বলেছিলেন, আমার সব বন্ধুর মধ্যে মেইর অমিতই সেরা।
মেইর অমিতের জীবন-যাপন এবং পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ পদ্ধতি মোসাদের নেতৃত্বের ধরনই পাল্টে দেয়। আগের মোসাদ-প্রধান আইসারের জন্ম রাশিয়ায়। মেইর অমিতের জন্ম ইসরাইলেই। ইসরাইল যুদ্ধে মেইর অমিত অংশ নিয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীতে যথারীতি ইউনিফর্ম পরে দীর্ঘদিন চাকরি করে তবে মোসাদে যোগদান করেন। আইসারদের জেনারেশনের ছিল নিজেকে অন্যের নজরে না আনার প্রবণতা। মুখ বন্ধ রাখা, ষড়যন্ত্র এবং অন্তরালে থাকার মানসিকতা নিয়ে তারা কাজ করতেন। কিন্তু মেইর অমিত সেনাবাহিনীর লোক। অনেক বন্ধু ও সহকর্মী তার। এবং তারা সকলেই ধারণা করতেন যে, মেইর অমিত কী করতে যাচ্ছেন। ছায়ার পেছনে লুকিয়ে থাকার মানুষ তিনি নন। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসারের মধ্যে কারিশমা ও রহস্যপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু অমিত ও তার উত্তরসুরীদের মধ্যে প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা ও কর্তৃত্বপরায়ণতা লক্ষণীয়। সামরিক বাহিনীতে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ইউনিফর্ম তাদের মধ্যে এমন গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছে।
ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধে অমিত আহত হলেও সামরিক বাহিনীতে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়ে ছিলেন। এলিট বাহিনী গোলানী ব্রিগেডের কমান্ডার অমিত সিনাই ক্যাম্পেইনের সময় অপারেশন চীফ ছিলেন। তার সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু প্যারাসুট জ্যাম্পে আহত হয়ে তাকে এক বছর হাসপাতালে কাটাতে হয়। সামান্য আরোগ্য লাভ করে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতে যান। পরে তাকে আমান বাহিনীর প্রধান করা হয়। ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে নেল গুরিয়েন তাকে আইসারের স্থলাভিষিক্ত করেন। মোসাদ-প্রধান হন মেইর অমিত।
মোসাদের প্রধান হিসেবে অমিতের প্রথম দিকের দিনগুলো খুব সহজ ছিল না। ইয়াকেভ কারুজসহ আইসারের অনেক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীই অমিতের আচরণে রুষ্ট ছিলেন। তার আকস্মিক মেজাজ দেখানো কিম্বা অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী ভঙ্গি অনেক সিনিয়রদের কাছেই ছিল বিরক্তিকর। অনেকেই চটজলদি পদত্যাগ করলেন, কয়েকজন পদত্যাগে কিছুটা সময় নিলেন। অমিতের নেতৃত্বে মোসাদে পরিবর্তন হতে থাকল। তবে মেইর অমিতের সঙ্গে আইসারের সম্পর্ক খুব বেশি খারাপ হয়ে পড়ে।
১৯৬৩ সালের বসন্তকালে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে বেন গুরিয়েন পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন তারই ঘনিষ্ঠ সহযোগী লেভী এসকোল। এসকোলের বেশ কিছু সিদ্ধান্তে তার পূর্বসূরী বিরক্ত হন। এর মধ্যে আইসারকে তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দান। গোয়েন্দা বিষয়ক দফতরে আইসারকে উপদেষ্টা করা হয়। মোসাদ থেকে চলে যাওয়ার পর আইসার ছিলেন বিরক্ত। যখন তিনি শুনলেন যে, অমিত মরক্কো সরকারকে নিয়মনীতি ভেঙে সহযোগিতা করতে যাচ্ছে তখন তিনি আর সুস্থির থাকতে পারলেন না। সোজা অমিতের অফিসে গিয়ে তার ঘাড়টা ধরেন আর কী।
অমিতের নেতৃত্বাধীন মোসাদ মরক্কোর রাজ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আইসারের কার্যকালেই মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে শুরু করে। মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের ইয়াকোভ কারুজ ও রাফি এইটান প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৬৩ সালের শীতকালে আইসার এইটানকে একটা বড় ধরনের সিদ্ধান্তের কথা অত্যন্ত গোপনীয় রাখার শর্তে প্রকাশ করেছিলেন। কথাটা হল মরক্কোর বাদশা হাসান দুই-এর আশংকা মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। হত্যা ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারণ হল বাদশাহ হাসান পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়ে উঠছেন। এখন বাদশাহ হাসান চাইছেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব মোসাদ নিক।
এই গল্প, কাহিনী বা তথ্য অভাবনীয় বা অসম্ভব মনে হতে পারে। একটি আরব দেশের বাদশাহ আজ ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্য নিতে চাইছেন? সব সময় বাস্তববাদী হিসেবে খ্যাত রাফি এইটান ও ডেভিড সমোরন নামের আরেক গোয়েন্দা গোপনে মরক্কোর রাজধানী রাবাত সফর করেন। তারা ভুয়া পাসপোর্টে সেখানে যান। একটা গোপন দরজা দিয়ে তাদের বাদশাহর প্রাসাদে ঢোকানো হয়। সেখানে তারা মরক্কোর ভয়ানক জেনারেল ওইউফকীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওইউফকীর মরক্কোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যাবতীয় নিষ্ঠুরতার জন্য সুপরিচিত। বাদশার বিরুদ্ধে গেলে ওইউফকীর তাকে বাঁচিয়ে রাখেন না। দলে দলে বিরোধী দলীয় লোক গায়েব হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে বাকি থাকে না এর পেছনে রয়েছেন ওইউফকীর। গোয়েন্দা বিষয়ক পরামর্শের ক্ষেত্রে বাদশাহ হাসান এই জেনারেলের পরামর্শকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে ইসরাইল ও মরক্কোর মধ্যে কোনো চুক্তি সম্পাদনে তার অনুমোদন লাগবে। মোসাদের এইটানের সঙ্গে বৈঠককালে জেনারেল ওইউফকীর তার ডেপুটি কর্নেল ডলিমিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
এইটান এবং ওইউফকীর একটা চুক্তিতে উপনীত হন। চুক্তিটা হল মোসাদ ও মরক্কোর গোয়েন্দা বিভাগ সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করবে এবং পরস্পর পরস্পরের দেশে স্থায়ী অফিস খুলবে। মোসাদ মরক্কোর গোয়েন্দাদের প্রশিক্ষণ দেবে এবং মরক্কো বিশ্বব্যাপী মোসাদ সদস্যদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। গোয়েন্দা তথ্যসমূহ দুই দেশ ভাগাভাগি করে নেয়ার স্বার্থে একটা বিশেষ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করবে। চুক্তিতে আরও বলা হয়, মরক্কোর বাদশার নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের মোসাদ উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবে। বাদশাহ হাসানের উপস্থিতিতে এই চুক্তিপত্রের সীলমোহর করা হয় এবং এইটান বাদশাহকে কুর্নিশ শেষে তার হাতে চুম্বন করেন।
আরব বিশ্বে মোসাদ এই প্রথম তার কোনো বন্ধু বা সুহৃদের সন্ধান পেল।
এই চুক্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে ওইউফকীর ইসরাইল যান। জেনারেল ওইউফকীর বিদেশে সবচে দামী হোটেলে থাকেন। কিন্তু ইসরাইলে গিয়ে তিনি এইটানের তেলআবিব সন্নিহিত ক্ষুদ্র তিন রুমের ফ্ল্যাটে উঠেন। জেনারেল ওইউফকীরের খাওয়া-দাওয়ার জন্য মোসাদের প্রবাদপ্রতিম বাবুর্চি ফিলিপকে পাওয়া যায়। ওইউফকীরের এই আসা-যাওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক বেশ ভালো হয়ে উঠে। ঠিক এমনি সময় ওইউফকীর মোসাদ-প্রধান মেইর অমিতের কাছে একটা স্পেশাল ফেভার চান।
মরক্কোর বাদশাহর প্রধান শত্রু ছিলেন সে দেশেরই মেহেদী বেন বারকা। তিনি আবার বিরোধী দলেরও নেতা। বাদশাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলেও দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ সমানে চলছিল। পলাতক অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মেহেদী তার জীবনের ওপর হুমকির কথা জানতেন এবং ওইউফকীর লোকজন যাতে তাকে ধরতে না পারে সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। ফলে তাকে ধরা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মোসাদ কী এখন তাকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করবে?
মেইর অমিতের লোকজন একাজে সহায়তা করেছিলেন। মোসাদ মেহেদী বেন বারকাকে ধোঁকা দিয়ে সুইজারল্যান্ডে আসতে রাজি করেছিলো। অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা বলে তাকে প্যারিসে নিয়ে আসা হয়। প্যারিসের বিখ্যাত লেফট ব্যাংক রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই ফ্রান্সের দুই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে জানা গেছে মরক্কোর মন্ত্রী ওইউফকীরের পে-রোলে ছিল ওই দুই পুলিশ অফিসার। বেন বারকাকে ওইউফকীরের হাতে হস্তান্তর করা হলে তিনি গুম হয়ে যান। কিন্তু একজন সাক্ষী বলেন যে, তিনি দেখেছেন ওইউফকীর নিজে মেহেদী বেন বারকাকে ছুরি মেরে হত্যা করেছেন। মেইর অমিত নিজেই প্রধানমন্ত্রী এসকোলকে জানান যে, লোকটিকে হত্যা করা হয়েছে।
বেন বারকার গুম হওয়ার ঘটনায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক গুজব গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট দ্যা গল এই ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ হন। যখন তিনি এই ঘটনায় মোসাদের সংশ্লিষ্টতার খবর পান তখন তিনি আরও ক্রোধান্বিত হন।
সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। মোসাদ কী করে এই ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হয়? তার জিজ্ঞাসা, মোসাদ কী করে এমন অনৈতিক ও ফৌজদারী অপরাধে নিজেদের যুক্ত করে এবং এর ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক আজ খুবই খারাপ হতে চলেছে। আইসার প্রধানমন্ত্রী এসকোলের কাছেও এ প্রশ্ন করেন এবং অবিলম্বে মেইর অমিতকে চাকরিচ্যুত করার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী এসকোল দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং বাধ্য হয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দুটি কমিটিই মেইর অমিতকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার অতঃপর পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও মেইর অমিতের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে নেমে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের সাহায্য কামনা করলেও কঠিন সামরিক সেন্সরশীপের কারণে এ ব্যাপারটি কোনো প্রচারণা পায় না।
আইসার অমিতের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকলেও বর্তমান মোসাদ-প্রধান অমিত অপর একটি অভিযান নিয়ে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছেন। আর এই অভিযানটি ইসরাইলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। অমিতের এই নতুন প্রকল্পটি হল ইরাকের কুর্দীদের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত তৈরি।
১৯৬৫ সালের শেষার্ধ্বে মেইর অমিত তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে। অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ইরাকের কুর্দী বিদ্রোহী নেতা মোল্লা মোস্তফা বারজানীর তাঁবুতে ইসরাইলি সরকারি প্রতিনিধি আস্তানা গাড়তে সক্ষম হয়েছে। মোসাদ কর্মকর্তাদের কুর্দীস্তানে অবস্থানকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের এক বিশাল সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হল। ইরাকের একটি প্রধান ফ্যাক্টর হল কুর্দীরা। এই একগুঁয়ে সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই প্রথম বারের মতো ইসরাইলের একটা যোগসূত্র সৃষ্টি হল। কুর্দীরা ইরাকী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কুর্দীরা ছাড়া ইরাকের আর দুটি ফ্যাক্টর হল শিয়া ও সুন্নীরা। বারজানীর নেতৃত্বাধীন কুর্দীরা ইরাকের অভ্যন্তরে ব্যাপক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। মোসাদ যদি কুর্দী বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে আরও শক্তিশালী করতে সমর্থ হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ইরাককে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে ইরাকের শক্তি ক্ষয় হবে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাবে। কুর্দীদের সঙ্গে এই আঁতাত ইসরাইলের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।
প্রথমে তিনজন মোসাদ গোয়েন্দা কুর্দীস্তানে তিন মাস অবস্থান করে। বারজানী তাদেরকে ইনার সার্কেলের অংশ করে নেন। বারজানি যেখানেই যেতেন তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ফলে কুর্দীদের সব গোপন তথ্যাদি মোসাদের জানা হয়ে যায়। মোসাদ ও কুর্দীদের এই সম্পর্ক বেশ ক'বছর উষ্ণ ছিল। বারজানী ও কুর্দীদের সামরিক বাহিনীর প্রধান বেশ কয়েকবার ইসরাইল সফর করেন। মেইর অমিত এবং সহকারীরা কুর্দীস্তান সফর করেন। ইসরাইল কুর্দীদের প্রচুর অস্ত্র দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে কুর্দীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে।
কুর্দীস্তান সফরকারী ইসরাইলি গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রথম সিনিয়র মোস্ট গোয়েন্দা হলেন বেনি জেভি। তার স্ত্রী গালিলা সন্তান প্রসবের লক্ষ্যে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এই দম্পতির পুত্র সন্তান নাদাভের জন্মের সময় বেনি জেভি কুর্দীস্তানের পাহাড়ে পাহাড়ে বারজানীর সঙ্গে সফর করছিলেন। এই সময় বেনি জেভির কাছে সাংকেতিক ভাষায় একটি টেলিগ্রাম পাঠান মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত। অমিতের কোড নাম রিমন। টেলিগ্রামে বলা হয় মা ও সন্তানের স্বাস্থ্য খুবই ভালো রয়েছে।
বেনি জেভির ছেলে হওয়ার সংবাদে বারজানী চারখন্ড পাথর নিয়ে তাতে নানা কথা লিখলেন। জেভিকে বললেন, আপনার ছেলের জন্য আমার এই উপহার। ছেলে বড় হয়ে যখন আমার দেশে আসতে চাইবে তাকে কেউ আটকাবে না। কুর্দীস্তানে সে জমিও পাবে।
বেশ কয়েক বছর পর অমিতের মৃত্যুতে তাকে স্মরণ করে ইসরাইলের বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ইজার ওয়েইজম্যান বলেছেন, আমরা প্রায়শই তার বাড়িতে যেতাম। প্রায়শই আমরা এক সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতাম। এরকম একদিন সকালে মেইর অমিত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মোসাদ-প্রধান হিসেবে আমি আপনার জন্য কী করতে পারি। জেনারেল ওয়েইজম্যান বললেন মেইর আমি একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চাই।
মেইর অমিত তাকে বললেন, আপনি কী পাগল হয়ে গেছেন? পশ্চিমাদের কাছে পর্যন্ত এরকম একটি যুদ্ধবিমান নেই।
প্রকৃতপক্ষে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ঐ আমলের সবচে সফিসটিকেটেড যুদ্ধবিমান। সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েকটি আরব দেশকে অবশ্য ঐ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে।
কিন্তু জেনারেল ওয়েইজম্যান নাছোড়বান্দা। অমিতের মাধ্যমে একটা মিগ তার চাইই চাই। মেইর অমিত এরকম একটি বিমান সংগ্রহে অপারেশন অফিসার বেহাভিয়া ভার্দিকে দায়িত্ব দিলেন। ভার্দি ইতিপূর্বে সিরিয় অথবা মিসর থেকে একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান গায়েবের চেষ্টা করেছেন। ভার্দি এক বছর পরে অমিতকে জানালেন যে, একাজে আমরা কয়েকমাস অতিবাহিত করেছি। মূল সমস্যা হল এরকম একটি প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করা কঠিন।
ভার্দি তার প্রত্যাশার কথা আরব দেশগুলোতে তার লোকজনের কাছে জানালেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ইরানে নিযুক্ত ইসরাইলের সামরিক এ্যাটাশে ইয়াকোভ নিমরোদি এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন পাঠালেন মোসাদে। তার চিঠির ভাষ্যমতে ইয়োসেফ সেমেশ নামে এক ইরাকী ইহুদির দাবি তিনি এমন একজন ইরাকী পাইলটকে জানেন যে, সে কাজটি পারবে। অর্থাৎ ইরাক থেকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান উড়িয়ে সে ইসরাইলে অবতরণ করাবে।
ইয়োসেফ সেমেশ বিয়ে থা করেননি। স্মার্ট, পরকীয়া করে বেড়াচ্ছেন সমানে। আবার ভোজনবিলাসী। তার একটা মস্ত গুণ স্বল্প সময়েই তিনি বন্ধু হয়ে যেতে পারেন যে কারো। এসব বন্ধুরা তাকে বিশ্বাসও করে।
নিমরোদি সেমেশ সম্পর্কে মোসাদকে আরও জানালেন যে, তার পক্ষেই এ কাজ করা সম্ভব। তাছাড়া সেমেশ তার সঙ্গে গত এক বছর ধরে কাজ করছেন।
নিমরোদি সেমেশকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ করলেন। গুপ্তচরবৃত্তির কয়েকটি ছোটখাট কাজে সেমেশকে নিয়োগ দিলেন। সেমেশ অতিশয় বুদ্ধিমত্তার জন্য পরীক্ষায় পাশও করলেন।
নিমরোদি অতঃপর তাকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান বিমান হাইজ্যাকের ব্যাপারে অগ্রসর হতে সবুজ সংকেত দিলেন।
বাগদাদে সেমেশের একজন খ্রীষ্টান রক্ষিতা ছিল। তার বোন ক্যামলে ইরাকি বিমান বাহিনীর পাইলট মুনীর রেডফাকে বিয়ে করেছেন। মুনীরও খ্রীষ্টান। সেমেশ জানতেন মুনীর হতাশায় নিমজ্জিত। মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর ক্ষেত্রে মুনীর খুব পারদর্শী হলেও তাকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। তদুপরি একটা সেকেলে মিগ সেভেনটিন বিমান দিয়ে কুর্দী এলাকায় হামলা চালাতে নির্দেশ দেয়া হল। তার মনে হল এ তার পদাবনতি এবং তার জন্য অমর্যাদাকর। সুপেরিয়ার অফিসারদের সঙ্গে এ ব্যাপারে নালিশ করেও কোনো ফল হল না। একটা পর্যায়ে সে বুঝতে পারল খ্রীষ্টান হওয়ার কারণেই তার পদোন্নতি কখনো হবে না। অর্থাৎ সে স্কোয়াড্রন লিডার হতে পারবে না। উচ্চাভিলাষী মুনীর বুঝলো এই অবস্থায় ইরাক বসবাসের কোনো মানে হয় না।
সেমেশ প্রায় এক বছর ধরে তরুণ পাইলট মুনীরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকলেন। এক পর্যায়ে মুনীরকে এথেন্সে একটা শর্ট ট্রিপে যেতে রাজি করালেন। বাকপটু সেমেশ ইরাকী কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, মুনীরের স্ত্রী দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং পশ্চিমের কোনো দেশে তার চিকিৎসা জরুরি। মুনীরের স্ত্রী প্রথমে গ্রীসে যাবে। এক্ষেত্রে তার স্বামীকে সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কেননা ঐ পরিবারে মুনীরই একমাত্র ইংরেজি জানে।
ইরাকী কর্তৃপক্ষ শর্তাধীনে মুনীর ও তার স্ত্রীকে এথেন্সে যাওয়ার অনুমতি দিল। সেখানে তাদের সঙ্গে ইসরাইলের এয়ারফোর্স অফিসার কর্নেল লিরনের যোগাযোগ হল। লিরনের জন্ম পোল্যান্ডে এবং হলোকাষ্ট থেকে যাওয়া এই অফিসার ইসরাইলি এয়ারফোর্স ইন্টেলিজেন্সের প্রধান। মোসাদ তাকে নির্দেশ দিল মুনীর রেডফার বিষয়টি দেখার জন্য। লিরন এবং মুনীর সামনা-সামনি বসে অনেকগুলো বৈঠক করলেন। লিরন পরিচয় গোপন করে নিজেকে একজন পোলিশ পাইলট হিসেবে পরিচয় দিলেন এবং কম্যুনিষ্ট বিরোধী সংস্থার কাজ করেন বলে জানালেন।
মুনীর লিরনকে তার সব দুঃখের কথা বললেন। প্রথমে তার পরিবার, ইরাকে তার জীবন, সিনিয়রদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার ঘটনা, কুর্দীস্তানে বোমা ফেলার কাজে তাকে ব্যবহার ইত্যাদি তিনি লিরনকে খুলে বললেন। কুর্দীস্তানে তার বোমা হামলায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা মারা যাচ্ছে বলে মুনীর দুঃখ প্রকাশ করলেন। এসব নাদান মানুষকে বোমা মেরে হত্যার জন্যই কী তার জন্ম। লিরনের সঙ্গে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হল মুনীর ইরাক ছাড়বেন।
মোসাদের নির্দেশ মোতাবেক লিরন মুনীরকে গ্রীসের একটি ছোট্ট দ্বীপে দাওয়াত দিলেন। মোসাদ একটা সাঙ্কেতিক নাম দিল। ইংরেজিতে যা ডায়মন্ড বাংলায় হীরকখন্ড।
গ্রীসের দ্বীপের শান্ত সমাহিত পরিবেশে মুনীর এবং লিরন আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেলেন। লিরন মুনীরকে একটি প্রশ্ন করলেন, যদি আপনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরাক ত্যাগ করেন তার পরিণতি কী হবে। মুনীর বললেন, তারা হয়তো আমাকে হত্যা করবে। এছাড়া কোনো দেশই আমাকে আশ্রয় দিতে রাজি হবে না।
এ সময় লিরন দু'বাহু বাড়িয়ে মুনীরকে বললেন, পৃথিবীতে একটা দেশই রয়েছে। যে আপনাকে আশ্রয় দেবে। লিরন তার বন্ধুর কাছে স্বীকারও করলেন, তিনি কোনো পোলিশ পাইলট নন, ইসরাইলি পাইলট। ঘানার টেবিলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।
লিরন ঐ দিনের জন্য বিদায় নিলেন। পরদিন মুনীর লিরনের প্রস্তাবে তার সম্মতির কথা জানালেন। তারা দু'জন মুনীরের দেশত্যাগ তথা স্বপক্ষ ত্যাগ নিয়ে এবং মুনীরকে কত টাকা দেয়া হবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হল।
মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীর ভালো লোক। মুনীর ইচ্ছে করলে টাকার অংক দ্বিগুণ করতে পারতেন। কিন্তু প্রথমবার প্রদত্ত প্রস্তাবেই মুনীর রাজি হয়ে গেলেন। মুনীরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হল, তার পরিবার ইসরাইলে গিয়ে তার সঙ্গে যোগদান করবে।
গ্রীসের ঐ দ্বীপ থেকে লিরন ও মুনীর উড়ে গেল রোমে। সেমেশ এবং তার রক্ষিতা বাগদাদ থেকে সেখানে এল। কয়েকদিন পর তারা ইসরাইলি বিমান বাহিনীর গবেষণা কর্মকর্তা ইয়েহুদা পোরাটের সঙ্গে বৈঠক করলেন। পোরাট মুনীরকে পুরো ব্রিফিং দিলেন। পরবর্তীতে পোরাট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন মুনীর এককথায় ভদ্র, খুবই বিবেচক। তাকে শ্রদ্ধা করা যায়। পোরাট আরও বলেন, মুনীর সাহসী। বাচাল নয়।
রোমে লিরন ও মুনীর যোগাযোগের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করলেন। উভয়ে সিদ্ধান্তে এলেন যে, ইসরাইলি রেডিও থেকে আরবি জনপ্রিয় গান বাজানো শুরু হলে মুনীর বিমান নিয়ে তার যাত্রা শুরু করবেন। এটাই তার সিগনাল। গানটি হল মারহাবা মারহাবা।
মুনীর জানতেন না, তিনি যখন রোমে মোসাদের লোকদের সঙ্গে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বৈঠক করে চলছেন, তাকে মোসাদের শীর্ষ বসরা তখন পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত বলেছেন, যে লোকটা পৃথিবীর সেরা যুদ্ধবিমানটি নিজ দেশ থেকে উড়িয়ে শত্রু দেশে নিয়ে আসবে তাকে একবার চোখে দেখা তার জন্য জরুরি। অমিত বলেছেন, তিনি রোমে উড়ে যান এবং তার লোকের সঙ্গে মুনীরের বৈঠকের সময় তিনি পাশের টেবিলেই বসা ছিলেন। যাহোক, মুনীরকে আমার যোগ্য লোকই মনে হল। আমি আমার অফিসারকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম।
মেইর অমিত হেড অন নামক তার বইয়ে ক্যাফের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায় ইহুদি প্রেমিক সেমেশ ঐ দিন স্লিপার পরেছিলেন। কেননা তার পায়ে চোট লেগেছিল। তার ভাষায়, সেমেশের বান্ধবী বা রক্ষিতা মোটা-সোটা মহিলা এবং বিন্দুমাত্র সুন্দরী নয়। আমি জানি না সেমেশ ঐ মহিলার মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছে। এদের সঙ্গে ছিলেন মুনীর-বিশাল কাধের অধিকারী কিন্তু খাটো এবং সিরিয়স চেহারার এক মানুষ। এরা কেউই বুঝতে পারেননি যে, তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে।
মুনীরকে আস্থায় নিয়ে মোসাদ-প্রধান অমিত ভাদিকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন।
লিরন ও মুনীর এথেন্সে এসে তেলআবিবের প্লেন ধরবেন। মুনীর তেলআবিবের প্লেনের বদলে কায়রোগামী প্লেনে উঠে বসেছিলেন। হতাশ লিরন ভাবলেন, তাদের সব আশা-ভরসা শেষ। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে লिरনের পাশে এসে উপস্থিত হলেন মুনীর। কায়রোগামী প্লেনের যাত্রী গণনাকালে একজন অতিরিক্ত যাত্রীর সন্ধান মেলে। সেই যাত্রীই মুনীর। টিকেট চেক করা হলে দেখা গেল মুনীরের টিকেট তেলআবিবগামী।
মুনীর ইসরাইলে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা অবস্থান করেন। সে সময় তাকে ব্যাপকভাবে ব্রিফ করা হয় এবং ইরাক থেকে কোনো পথে বিমানটি আসবে তারও নির্দেশিকা দেখানো হয়। মোসাদ অফিসে তাকে একটি গোপন কোডও দেয়া হয়। আরও কিছু কর্মসূচী শেষে তাকে জাফার ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়ানো হয়। যাতে মুনীরের মনে প্রত্যয় জাগে যে, তিনি বাড়িতেই আছেন। মুনীর পরিকল্পনা বদল করে এথেন্স হয়ে বাগদাদে ফিরে এলেন। এরপর শুরু হবে তার চূড়ান্ত পর্বের কার্যক্রম।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীরের একটি ঘটনায় তার হার্ট এ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মুনীর দেশ ত্যাগের কিছুদিন আগে তার বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ বিমানের একজন পাইলটের এহেন কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবলে গা শিউরে না উঠে পারে না। ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারত যদি তার এসব মালামাল বিক্রির হেতু জানতে চায় নির্ঘাৎ মুনীর ধরা পড়বেন। মুনীরকে গ্রেফতার করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি যাবতীয় ষড়যন্ত্রের কথা বলে দেবেন। ব্যস, কেল্লা ফতে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, মুখাভারত ঐ বেচা-বিক্রি নিয়ে কিছু জানতে পারেনি। গাধা ও কৃপন মুনীর সামান্য টাকার জন্য জীবনটাই খোয়াতে বসেছিলেন।
এরপর আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। পাইলট মুনীরের পরিবারকে কী করে ইরাকের বাইরে আনা যায়- প্রথমে লন্ডন পরে আমেরিকা। মুনীরের অনেকগুলো বোন ও ভগ্নিপতি। যুদ্ধবিমান ছিনতাইয়ের আগেই তাদেরকে ইরাক থেকে সরাতে হবে। পরিবারের কয়েকজন ইসরাইলে চলে আসতে রাজি হলেও পাইলট মুনীর কী সব হতে যাচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গও তার স্ত্রীকে ভয়ে বলেননি। স্ত্রীকে শুধু একটা কথাই বলেছেন তারা ইউরোপে যাবেন এবং সেখানে দীর্ঘদিন থাকবেন। তার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে আমস্টারডামে এলে মোসাদের লোকজন তাদের প্যারিসে নিয়ে এল। লিরন সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলেও এরা যে মোসাদের লোক মিসেস মুনীর তা ধারণা করতে পারেননি।
লিরন পরে বলেছেন, মিসেস মুনীরকে ছোট ফ্ল্যাটে একটা ডাবল বেডের বিছানার ব্যবস্থা করা হল। লিরনের ভাষায়, আমরা তার ডাবল বেডে বসলাম। ঐ দিন রাতেই পাইলট মুনীরের মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইল অভিমুখে ইরাক থেকে ভেগে আসার কথা। লিরন বলেন, এক পর্যায়ে আমি যে ইসরাইলি অফিসার সে কথা তাকে বললাম। তাকে আরও বললাম, আপনার স্বামী আগামীকাল ইসরাইলে ল্যান্ড করবেন এবং আমরা এক পর্যায়ে সেখানেই চলে যাব।
লিরন বলেন, একথায় পাইলট মুনীরের স্ত্রী বেজায় কান্না জুড়ে দেন। সারা রাত চীৎকার করে এই মহিলা কাঁদছিলেন। মিসেস মুনীর তার স্বামীকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রভৃতি বলে গালাগালি দিতে থাকেন। লিরন আবার সে কথা তার সিনিয়রদের জানিয়েও দেন। মিসেস মুনীর আরও বলেন, তার স্বামী ইরাকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার ভাইয়েরা যখনি পাবে মুনীরকে হত্যা করবে। মিসেস মুনীর এখুনি ইরাকী দূতাবাসে যেতে চাইলেন এবং তার স্বামীর কুকীর্তির কথা তাদের জানাবেন।
পাইলট মুনীরের স্ত্রী এভাবেই সারা রাত কাঁদলেন। লিরন তাকে থামাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে লিরন তাকে বললেন, স্বামীকে দেখতে চাইলে আমার সঙ্গে ইসরাইল যেতে হবে। মিসেস মুনীর বুঝলেন, তার কাছে আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। অশ্রুভেজা চোখে মিসেস মুনীর তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ইসরাইলের প্লেনে গিয়ে উঠে বসলেন।
১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই ইউরোপে মোসাদের অফিস একটা সাংকেতিক চিঠি পায় মুনীরের কাছ থেকে। মুনীর তাতে লিখেছেন, তিনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইলের পথে যাত্রার কাজ শুরু করেছেন। ১৪ আগস্ট মুনীর যাত্রা শুরু করলেও বিমানের বৈদ্যুতিক সিষ্টেমে গলদের কারণে তিনি ফিরে এসে রশীদ বিমান ঘাঁটিতে ল্যান্ড করেন।
মোসাদ-প্রধান অমিত পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মুনীরের বিমানের ত্রুটি বড় ধরনের ছিল না। মুনীর ইচ্ছে করলে উড়ে আসতে পারতেন। কিন্তু মুনীর কোনো ঝুঁকি না নিয়েই ঘাঁটিতে ফিরে যান। অমিত বলেন, এই ঘটনায় আমি কত যে পাকা চুল ছিঁড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আমার টেবিলটি পাকা চুলে ভরে গিয়েছিল।
দু'দিন পরে মুনীর আবার যুদ্ধবিমানটি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি নির্দেশিত পথেই উড়ে আসছিলেন। এক পর্যায়ে ইসরাইলি রাডারে একটি বিদেশি বিমানের এগিয়ে আসার চিহ্ন উদ্ভাসিত হল। বিমান বাহিনীর নতুন কমান্ডার জেনারেল মোরডেচাই (মোট্টি) হড সামান্য কয়েকজন পাইলটকে এই কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল মুনীরের বিমানটিকে এসকর্ট করে নির্বিঘ্নে ঘাঁটিতে নিয়ে আসা। হড ঐ ঘাঁটির সব কর্মকর্তা, কর্মচারী, পাইলট, স্কোয়াড্রনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমাদের আজ কোনো কাজ নেই। ছুটি। তবে আমার মৌখিক নির্দেশ পেলে জীবন দিতে বললে তাই করতে হবে। এবং তোমরা সবাই তো আমার কণ্ঠস্বর চেনই। ইসরাইলি ভূমিতে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে কতিপয় অতিমাত্রায় হিংসুক প্রকৃতির পাইলট যাতে শত্রু বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত না করে সে কারণেই এই ব্যবস্থা।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান এখন ইসরাইলের আকাশে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর এক দক্ষ কর্মকর্তা রান পেকারকে মুনীরকে এসকর্ট করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেয়া হল। পেকার বিমান ঘাঁটির কন্ট্রোলকে জানালেন, আমাদের মেহমান গতি কমিয়ে আনছেন। মেহমান আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইংগিত করেছেন যে, তিনি ল্যান্ড করতে চাইছেন। তিনি তার বিমানের পাখাও কাত করে দেখিয়েছেন। আর আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বিমানের পাখা কাত করে দেখানোর অর্থ হল তিনি শান্তি চান। শান্তির বার্তা নিয়ে তিনি এসেছেন।
সকাল আটটায় ইরাকী পাইলট মুনীরের বিমান ইসরাইলের বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করল। ৬৫ মিনিট সময় লেগেছে ইরাকের বাগদাদ থেকে ইসরাইলে হাটজোর বিমান ঘাঁটিতে এসে পৌঁছাতে।
১৯৬৭ সালের আগে কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ৬দিন ব্যাপী একক যুদ্ধে ইসরাইল বড় ধরনের জয় পেয়েছিল। আর এই যুদ্ধের আগেই অনৈতিকভাবে ইসরাইল একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান করায়ত্ত করেছিল। দুটি মিরেজ যুদ্ধবিমান মিগটিকে এসকর্ট করে সীমান্ত ঘাঁটি থেকে উড়িয়ে এনেছিল। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত এবং তার লোকজন এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ঐ সময় মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমানকে সোভিয়েত অস্ত্র ভান্ডারের ক্রাউন জুয়েল বলে অভিহিত করা হত। পশ্চিমা শক্তিও মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের ভয়ে সর্বদা কাঁপত। সেই মিগটি আজ ইসরাইলের দখলে।
ইরাকী পাইলট মুনীর ইসরাইলের ঘাঁটিতে নিরাপদ অবতরণের পরেও বিভ্রান্ত ও হতচকিত ছিলেন। মুনীরকে হাটজোর ঘাঁটির কমান্ডারের বাসায় নেয়া হয়। এখানে সিনিয়র অফিসাররা তার সম্মানে পার্টির আয়োজন করেন।
মুনীর পার্টির বহর দেখে বিস্মিত। প্রথমে তার মনে হয়েছিল অন্য কারো বিয়ের পার্টিতে ভুল করে তিনি ঢুকে পড়েছেন। মেইর অমিত বলেছেন, মুনীর পার্টির এক কোনে জড়সড় ও শান্ত হয়ে বসেছিলেন।
কিছুটা বিশ্রাম শেষে মুনীরকে জানান হল তার স্ত্রী ও শিশুরা বিমানে করে ইসরাইলে আসছে। মুনীরকে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া হল। সাংবাদিক সম্মেলনে পাইলট মুনীর ইরাকে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের কথা বলেন। দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে মুনীর তার ওপর অবিচারের কথা বলেন এবং কুর্দীদের ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণের প্রতিবাদ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে মুনীরকে তেলআবিব সন্নিহিত সমুদ্র তীরবর্তী হারজলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে তার পরিবার অবস্থান করছে।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত লিখেছেন, পাইলট মুনীরকে স্বাভাবিক ও শান্ত করতে আমরা সবধরনের পদক্ষেপ নেই। আমরা তাকে নানাভাবে উজ্জীবিত করি এবং বড় একটা সফল অভিযানের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। মেইর অমিত আরও লিখেছেন, আমার যত ক্ষমতা রয়েছে তা ব্যবহারের মাধ্যমে মুনীর এবং তার পরিবারের কল্যাণ করা হবে বলে আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে। কেননা মুনীরের পরিবার যে একটা সমস্যা সংকুল পরিবার তা আমি জানতাম।
এর কিছুদিনের মধ্যেই মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইসরাইলে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন সেই বিখ্যাত সেমেশ এবং তার বান্ধবী ক্যামিল্লে। মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইরাকী সেনাবাহিনীর অফিসার। ঐ অফিসারটি রাগে গজগজ করছিলেন। সামনা-সামনি হতেই তিনি মুনীরের মাথায় ঘুষি মারেন। ঐ অফিসার বলেন, তার বোন গুরুতর অসুস্থ বিধায় তাকে ইউরোপ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর আজ তিনি তাকে ইসরাইলের মাটিতে দেখে বিস্মিত। ইরাকী অফিসার মুনিরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আক্রমণের এক পর্যায়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তার বোন অর্থাৎ মুনীরের স্ত্রীকেও ভৎসনা করেন। সে কেন সবকিছু জেনেও তাদের জানাল না। মুনীরের স্ত্রী ভাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। কয়েকদিন পর মুনীরের ঐ আত্মীয় ইরাকী সামরিক অফিসার ইসরাইল ত্যাগ করেন।
জালিয়াতি করে ইরাক থেকে আনীত মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর জন্য প্রথম মনোনীত হন ড্যানি সাপিরা। ড্যানিও ইসরাইলি বিমান বাহিনীর পাইলট এবং তাকে সেরা টেষ্ট পাইলট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোট্রি হড তাকে ডেকে বললেন, তুমি প্রথম পশ্চিমা পাইলট হিসেবে মিগটি নিয়ে আকাশে উড়বে। যত খুশী, যত ঘণ্টা খুশী উড়তে থাক এবং এর ভালো-মন্দ দিকগুলো আমাদের জানাও।
ড্যানি পরবর্তীতে বলেছেন, মুনীর আমাকে প্লেনের কোথায় কোনো সুইচ তা দেখিয়ে দেন। সব কমান্ডই আরবি ও রুশ ভাষায় লেখা ছিল। যাহোক এক ঘণ্টার মাথায় আমি মুনীরকে বললাম, এখন মিগটি চালাব। একথা শুনে মুনীর বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন, এখনো তো আপনার কোর্স শেষ হয়নি। আমি তাকে বললাম, আমি একজন টেষ্ট পাইলট। একথা শোনার পরও মুনীরকে খুব চিন্তাযুক্ত মনে হল। তিনি ককপিটে আমার পাশে বসারও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু তার প্রয়োজন নেই বলে তাকে আমি আশ্বস্ত করলাম।
ইসরাইলের বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জেনারেল ওয়েজম্যানকে মনে আছে? তিনিই প্রথম মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ইসরাইলের হস্তগত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পাইলট সাপিরা অতীতের সেই ঘটনা স্মরণ করে বললেন, জেনারেল ওয়েজম্যান আমার কাছে এসে আমাকে বাহবা দিলেন। তারপর বললেন, তুমি আবার কোনো চালাকি কর না। মিগটি নিয়ে আবার ফিরে এস। সাপিরা আরও বলেছেন, বিমানটি চালিয়ে ফিরে আসার পর পাইলট মুনীরও আমাকে বাহবা দেন। তিনি আমাকে যখন জড়িয়ে ধরেন তখন তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। তিনি আরও বললেন, ইসরাইলি বাহিনীতে আমার মতো পাইলট থাকলে আরবরা কিছুই করতে পারবে না।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ব্যাপকভাবে চালানো ও পরীক্ষার পর ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা বুঝলেন, কেন পশ্চিমারা এরকম একটি বিমান পাওয়ার জন্য ব্যাগ্র। এর বিস্ময়কর বিশেষত্ব হল এটি দ্রুতগতি সম্পন্ন, ওড়ে আংশিক উঁচু দিয়ে এবং ইসরাইলি মিরেজ দুই ও ফরাসি যুদ্ধ বিমানের চেয়ে ওজন এক টন কম।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান আকাশে ওড়ানোর মাধ্যমে ইসরাইল আবার বিশ্বের গণমাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাল। মার্কিনীরা বিস্মিত। কয়েকদিন পরে মার্কিন একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল বিমানটি পরীক্ষা এবং আকাশে উড্ডয়ন করে। মার্কিনীদের মিগের কাছে যাওয়ার আগে ইসরাইল একটা শর্ত দেয়। আর তা হল সোভিয়েত এয়ারক্রাফট ক্ষেপণাস্ত্র সাম-২ এর কাগজপত্রের কপি আগে তাদেরকে মার্কিনীদের দিতে হবে। আমেরিকানরা অবশেষে রাজি হয়। মার্কিন পাইলট ইসরাইলে আসেন, আতিপাতি করে পরীক্ষা করেন এবং সেটি চালিয়ে দেখেন।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের গোপন রহস্য ও শক্তি উদঘাটনের মাধ্যমে আরবদের বিরুদ্ধে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালের জুনে। মিগটি পাওয়া গিয়েছিল এর দশ মাস আগে। আর ঐ যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সফল পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল মিগ টুয়েন্টি ওয়ান। উল্লেখ্য, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরাইল আলোচ্য মিগের সাহায্যে মিসরের বিমান বাহিনীকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিল। বাকি পাঁচটি দেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের মাধ্যমে ব্যাপক জয়লাভের প্রেক্ষাপটে ইরাকী পাইলট মুনীর ও তার পরিবারকে ইসরাইল প্রভূত আর্থিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু ইসরাইলে আসার পর মুনীরের জীবন বিষাদময় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
মোসাদের একজন সিনিয়রের ভাষায়, একজন এজেন্টের জন্য দেশের বাইরে নতুন জীবন শুরু অলমোস্ট ইমপসিবল। মুনীর দিনে দিনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তার পরিবারও ভোগান্তিতে পড়ে। আর পুরো পরিবারের কাঠামোই ভেঙে পড়ে।
তিন বছর পরেও মুনীর ইসরাইলকে তার নিজ দেশ ভাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ডাকোটার বিমানে করে ইসরাইলি তেল সিনাই পৌঁছে দেয়ার কাজও তিনি নিয়েছিলেন। তার পরিবার ইরানি শরণার্থী হিসেবে তেলআবিবেই বসবাস করছিল। কিন্তু মুনীরের স্ত্রী নিষ্ঠাবর্তী ক্যাথোলিক হিসেবে বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছিলেন। বলতে গেলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন তিনি। ইসরাইলে তিনি কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন না। পরবর্তীতে জাল পরিচয়ে তারা পশ্চিমা দেশে চলে যান। আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত তাদের ঠিকানা দেয়া হয়নি। যদিও তাদেরকে প্রভূত নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। তবুও তারা সব সময় ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারতের ভয়ে তটস্থ থাকতেন।
ঘটনার ২২ বছর পর ১৯৮৮ সালের আগস্টে নিজ বাড়িতেই আকস্মিক হার্ট এ্যাটাকে ইরাকী পাইলট মুনীর মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মুনীরের স্ত্রী মেইর অমিতকে ফোন করেন। অমিত আর তখন মোসাদের প্রধান নন। মুনীরের স্ত্রী জানান, তার স্বামীর মৃত্যুর সময় তার এক ছেলে পাশেই দাঁড়ানো ছিল। সকাল বেলা তার স্বামী তাদের বাড়ির তিন তলা থেকে নামার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান।
মুনীরের মৃত্যুর পর মোসাদ এক শোকসভার আয়োজন করে। শোকসভায় সিনিয়র কর্মকর্তারা কেঁদে ফেলেন। লিরন বলেন, ইরাকী এক পাইলটের জন্য ইসরাইলের মোসাদ বাহিনী আজ কাঁদছে।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান অধিগত হওয়া ও ছয় আরব দেশের বিরুদ্ধে ইসরাইলের একক যুদ্ধে জয়লাভের পর মোসাদ-প্রধান অমিত আরও উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ল্যাভন এফেয়ার্সের আদলে তিনি ইসরাইলের কয়েকজন বন্দীকে দেশে আনার পরিকল্পনা করেন। তরুণ ল্যাভন ১৩ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জেলে পচছিল। তার মুক্তি কিম্বা ক্ষমা প্রাপ্তির কোনো আশাই ছিল না।
আরব দেশের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরাইল ছিল মিসরের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে। ঐ যুদ্ধে মিসরের ৪ হাজার ৩৩৮ জন মিসরীয় সৈন্য ইসরাইলের হাতে বন্দী ছিল। ৮৩০ জন বেসমারিক মিসরীয় নাগরিকও বন্দী ছিল। ওদিকে মাত্র ১১জন ইসরাইলি সৈন্য মিসরের হাতে বন্দী ছিল। এক্ষেত্রে অমিত লেভন ফর্মুলায় তাদেরকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিলে মিসর দৃঢ়তার সঙ্গে তার বিরোধিতা করে।
কিন্তু মেইর অমিত ছিলেন নাছোড়বান্দা। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান অমিতের ভালো বন্ধু। তিনিও অমিতকে বললেন, মিসরীয়রা কখনোই তাদের মুক্তি দেবে না। প্রধানমন্ত্রী এসকোলেরও অনুরূপ অভিমত। অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরকে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিঠি লিখলেন। এবং বন্দীদের মুক্তি দাবি করলেন।
অমিত সিরিয়য় বন্দী ইসরাইলি মোসাদের জন্যও কাজ শুরু করলেন।
লেবাননে বন্দী মিসেস সুলা কোহেনকে মুক্ত করতে তিনি সিরিয়র সহযোগিতা চাইলেন। সুলার কোড নাম পার্ল। তিনি মোসাদের একজন প্রবাদ প্রতিম গোয়েন্দা। একজন সামান্য গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও সিরিয় ও লেবাননের বিখ্যাত নেতা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ব্যাপক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল। তিনি ইসরাইলের একটা গোয়েন্দা চক্র সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। তার বড় ধরনের একটা সাফল্য হল সিরিয় ও লেবাননের কয়েক হাজার ইহুদিকে তিনি চোরাগুপ্তা পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মেইর অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরের কাছে যে আবেদন করেছিলেন তা কাজে এসেছিল। সিরিয়ও কিছু দিনের মাথায় অনুরূপ আবেদনে সাড়া দিলে অমিতের জয় হয়। লুভন ফর্মূলা প্রয়োগ করে অমিত লুটজ, সুলা কোহেনকে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
বিদেশে থাকা বন্দীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সাফল্য লাভ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং অবশ্যই বড় ধরনের অভিযান।
📄 ইরাকে ফাঁসির মঞ্চে ইসরাইলি গোয়েন্দা
ইসার বেরী 'বিগ ইসার' নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি বেশ লম্বা, তবে চুল তেমন নেই এবং তা সাদা কালো। তার কালো ভ্রূ কোটরাগত চোখ দুটিকে ঢেকে রাখে। তার তিক্ত বা ঘৃণাপূর্ণ হাসি প্রায়শই তার পাতলা ঠোঁটে খেলা করে। পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ইসার বেরী আবার যেমন সৌন্দর্য প্রিয়, তেমনি তার ইন্টেরগ্রেটিও ত্রুটিমুক্ত। তার প্রতিপক্ষের ভাষ্য, লোকটি এককথায় ভয়ংকর। হাগানার দীর্ঘদিনের সদস্য ইসার বেরী হাইফার একটি প্রাইভেট কনস্ট্রাকশন কোম্পানির পরিচালক ছিলেন। অসামাজিক, নিঃসঙ্গ এবং চুপচাপ স্বভাবের ইসার বেরী স্ত্রী, ছেলেকে নিয়ে চারদিক খোলা একটা বাড়িতে বসবাস করতেন। বাট গালিমের একটি উপকূলীয় এলাকায় তার বাড়িটি অবস্থিত।
ইসরাইল রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পূর্বে হাগানার কমান্ডাররা তাকে সাই-এর প্রধান পদে নিয়োগ দেন। ইসরাইল ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই চারদিকের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলকে আক্রমণ করে। এই সময় সদ্য স্বাধীন ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান পদে নিয়োগ লাভ করেন। তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত বামপন্থীদের সংগঠনে তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন। তার বন্ধুরা ইসরাইলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইসার বেরীর উৎসর্গিত মনোভাবের খুব প্রশংসা করতেন। তবে সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান হওয়ার পর বেরীর কার্যকালে একের পর এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটতে শুরু করে।
মাউন্ট কারবেলে এক দম্পতি ভয়াবহ একটি ঘটনা উদঘাটন করে। এই দম্পতি পাহাড়ের পাদদেশে অর্ধদগ্ধ লাশ দেখতে পায়। লাশের শরীরটি গুলিতে ঝাঝরা হয়ে ছিল। পরে তার নাম জানা যায় আলি কাসেম। কাসেম আরব দেশগুলোকে নানা তথ্যাদি সরবরাহ করতেন। প্রথমে আততায়ীরা তাকে গুলি করে অতঃপর পুড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়নের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ পরে এক গোপন বৈঠকে আইসার প্রধানমন্ত্রীরই দলের লোক আব্বা হুশিকে একটি ঘটনায় অভিযুক্ত করেন। আব্বা হুশি ছিলেন মাপাই দলের প্রভাবশালী নেতা। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ আনে ইসার বেরী। প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন একথা শুনে স্তম্ভিত। ফিলিস্তিনিদের শাসক ছিল ব্রিটিশরা। ইসরাইলের রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ইহুদি নেতৃত্বের মধ্যে তাদের চর হিসেবে নিয়োগদানের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, হাইফার শ্রমিকদের মধ্যে ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে পরিচিত।
ইহুদি সম্প্রদায়ের একটা স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত আব্বা হুশি কী করে একজন রাষ্ট্রদ্রোহী হন? এটা যে অবিশ্বাস্য। প্রথমে ইসরাইলের নেতারা ক্রোধ ভরে বেরীর এই অভিযোগ বাতিল করে দেন। কিন্তু আব্বা হুশির কাছে পাঠানো ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দুটি টেলিগ্রাম হস্তগত হয় বেরীর। সে দুটি টেলিগ্রাম তিনি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে জমা দেন। আব্বা হুশির বিশ্বাসঘাতকতার আর কোনো প্রমাণের দরকার আছে কী!
বেরী এ সময় হুশির বন্ধু জুলেস আমস্টারকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। শহর থেকে কিছুটা দূরে লবণের গুদামে জুলেসকে ৭৬ দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তার ওপর এই বলে চাপ প্রয়োগ করা হয় যে, আব্বা হুশি যে একজন ঘৃণিত রাষ্ট্রদ্রোহী একথা সে বলুক। জুলেস হার মানতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। মুক্ত অবস্থায় সে একজন বিধ্বস্ত মানুষে পরিণত হয়। তার দাঁত বলতে কিছুই ছিল না। তার পা ছিল আঘাতে আঘাতে ছিন্ন। জুলেস বহু বছর এই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
১৯৪৮ সালের ৩০ জুন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মেয়ার টুবিয়ানস্কিকে গ্রেফতার করা হয়। সামরিক গোয়েন্দাদের অভিযোগ টুবিয়ানস্কি সামরিক বাহিনীর গোপনীয় তথ্যাদি এক ব্রিটিশ নাগরিককে সরবরাহ করে। ঐ ব্রিটিশ আবার এসব তথ্য জর্ডান সেনাবাহিনীর কাছে পাচার করে।
জর্ডান সামরিক বাহিনী ঐ তথ্যের ভিত্তিতে কৌশলগত এলাকায় বোমাবর্ষণ করলে ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আধা ঘণ্টারও কম সময়ে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে জড়ো হওয়া কিছু লোকও স্তম্ভিত; ইসরাইলি সৈন্যদের সামনেই টুবিয়ানস্কিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়।
উপরোক্ত দুটি ঘটনায় তদন্তকারীরা বেরীকে দোষী সাব্যস্ত করে। বেরী মনে করেছিল আলি কাসেম ডাবল এজেন্ট। এ কারণেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
যাহোক এভাবে বেরীর অনেক দোষ বেরুতে থাকে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করেন। বেরীর প্রথমে সামরিক আদালতে পরে বেসামরিক আদালতে বিচার হয়। তার র্যাঙ্ক নামিয়ে দেয়া হয়। অসম্মানজনকভাবে আইডিএফ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। আলি কাসেম ও ক্যাপ্টেন টুবিয়ানস্কির মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়। কুখ্যাত কেজিবির আদলে গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালিত হতে দেখে ইসরাইলের নেতারা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।
বেরীকে অপসারণের পর তার স্থলাভিষিক্ত হন রেউভেন শিলোয়াহ। তিনি বেরীর বিপরীত মেরুর লোক। সিআলাহর বয়স ৪০। মৃদুভাষী ও রহস্যঘেরা একজন মানুষ। সমৃদ্ধ কালচার্ড ফ্যামিলি থেকে তার আগমন। পর্যবেক্ষণী ক্ষমতা তার ঈর্ষণীয়। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে বিশেষ করে গোত্রগুলোর ঐতিহ্য, শত্রুতা এবং রক্তের ঋণ নিয়ে বিবাদ-বিসম্বাদ তার নখদর্পণে। শিলোয়াহ'র এক ভক্ত শিলোয়াহকে প্রধানমন্ত্রীর দাবা কোর্টের রানি বলে উল্লেখ করেন। রানির ক্ষমতা তো অপরিসীম। অবশ্য শিলোয়াহ যখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন তখন তাকে অনেক কিছুই সামলাতে হয়েছে। এভাবে তার সম্পর্কে অনেকেই ভালো ভালো বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। শিলোয়াহ সারাজীবনই খুব এ্যাকটিভ। সে সিক্রেট মিশনে হোক কিম্বা অন্য জটিল কোনো ক্ষেত্রে।
ইহুদিদের এক ধর্মযাজক বা ধর্মগুরুর ছেলে শিলোয়াহর জন্ম পুরনো জেরুজালেমে। ইসরাইলের জন্মের আগেই শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ছদ্মবেশে তিনি ইরাকে কাটিয়েছেন সে দেশের রাজনীতি অনুধাবনের জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে দেন-দরবার করে একটি ইহুদি কম্যান্ডো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদ্দেশ্য নাকি অধিকৃত ইউরোপে তাদের অভিযান ব্যর্থ করে দেয়া। তিনি এভাবে দুটি বিশেষ ইহুদি কম্যান্ডো বাহিনী গঠন করেন। এর মধ্যে একটি ছিল জার্মান অস্ত্রশস্ত্র ও তাদের ইউনিফর্মধারী জার্মান ব্যাটেলিয়ান। এই ইউনিট ইউরোপে শত্রুর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে। আরেকটি ছিল আরব ব্যাটালিয়ান। এই ইউনিটের সকলেই আরবি ভাষায় কথা বলত, আরবদের পোশাক পরত। আরব দেশসমূহের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের অভিযান পরিচালনারও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। শিলোয়াহ প্রথম ব্যক্তি যিনি স্ট্রাটেজিক সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হন। এটিই সিআই-এর পূর্ববর্তী নাম। ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিলোয়াহ প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজধানী গোপনে সফর করেন। আরব সেনাবাহিনীগুলো তাদের দেশে আগ্রাসন চালাবে সেই তথ্য নিয়ে তিনি ফিরে আসেন।
শিলোয়াহ অত্যন্ত গোপনীয় ভাবে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতেন। ফলে অগণিত সোর্স যেমন তার ছিল তেমনি গোপন তথ্যের ভান্ডার ছিল তার নখদর্পণে। শিলোয়াহর এক বন্ধু একটা জোক বলেছিলেন। আহৃত ট্যাক্সি ড্রাইভার শিলোয়াহকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন। শিলোয়াহ তাকে বললেন, বলা যাবে না। এটা স্টেট সিক্রেট।
ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিলোয়াহ বৈদেশিক রাজনৈতিক ইনফরমেশন বিভাগের প্রধান ছিলেন। একাধিক প্রায় বিচার বিভাগীয় স্বাধীন গোয়েন্দা গ্রুপ ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন দেশের গোয়েন্দাবৃত্তিকে একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ইনষ্টিটিউট গড়ার নির্দেশ জারি করেন। এই ইনষ্টিটিউটের হিব্রু নাম 'মোসাদ'। রেডভেন শিলোয়াহ মোসাদ-এর প্রথম প্রধান নিযুক্ত হন।
প্রকৃতপক্ষে মোসাদ প্রতিষ্ঠা আরও দু'বছর বিলম্বিত হয়। গোয়েন্দাদের একটি ইউনিয়নের কাজ ছিল বিদেশে অবস্থান করে কার্য পরিচালনা। এটিকে পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট বলা হত। এই বিভাগের লোকজন প্রচুর খরচ যেমন করতে পারত বিদেশে তাদের জীবন-যাপনও ছিল রাজকীয়। মোসাদ গঠনের প্রতিক্রিয়ায় তারা বিদ্রোহ করল। তারা ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি করতে অস্বীকৃতি জানাল। তাদের ইউনিটের বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এই হল ক্ষোভের কারণ। অবস্থা এমন দাঁড়াল, তাদের চাকরিচ্যুত না করলে এবং প্রায় নির্যাতনের মুখোমুখি করা না গেলে শিলোয়াহ'র পক্ষে মোসাদ গঠন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শিলোয়াহ'র দর্শন ছিল, মোসাদ শুধুমাত্র ইসরাইলের স্বার্থই দেখবে না। বিশ্বে যত ইহুদি রয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল মোসাদ। প্রথম নিয়োগ পরীক্ষাকালে মোসাদ-প্রধান শিলোয়াহ স্পষ্টই তার বক্তৃতায় বলেন, যাবতীয় গোয়েন্দাগিরির পাশাপাশি আমাদের আরও একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। আর তা হল ইহুদি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা। তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদেরকে ইসরাইলের স্থায়ী বাসিন্দা করার উদ্যোগ নিতে হবে। উল্লেখ্য, পরবর্তী কয়েক বছরে দেখা গেছে মোসাদ এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বহু দেশে ইহুদিরা অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে ছিল। তাদের আত্মরক্ষার জন্য মোসাদ গোপনে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক, বাগদাদসহ দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশের ইহুদিরা যারপরনাই কষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করত।
মিলিট্যান্ট ইহুদিদের তাদের অজান্তেই ইসরাইলে ফিরিয়ে এনে প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনী ও মোসাদে ভর্তি করা হল। শত্রু দেশকে অস্থিতিশীল করতে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করা হল। বিদেশে অবস্থানরত ইহুদিদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় সংগঠিত করা হল। বিদেশে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় বিশেষ করে দাঙ্গাকারী কিম্বা অনিয়মিত গ্রুপের হামলা প্রতিরোধে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা হল। কেননা সরকারের সাহায্য না আসা পর্যন্ত কিম্বা বিদেশি সাহায্য সংস্থার হস্তক্ষেপ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করল মোসাদ।
পঞ্চাশের দশকে আরবদেশসমূহ ও মরক্কো থেকে মোসাদ দশ হাজারের অধিক দূর্দশায় পতিত ইহুদিকে ইসরাইলে ফেরত নিয়ে এসেছে। একইভাবে আশির দশকে খোমেনীর ইরানে আটকাপড়া বহু ইহুদিকে মোসাদ ইসরাইলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। কিন্তু মোসাদের প্রথম গোয়েন্দাগিরি ইরাকে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল।
ইরাকের রশীদ স্ট্রীটের বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে আসাদ নামের এক লোকের একটা টাইয়ের দোকান ছিল। সে একজন ফিলিস্তিনী শরণার্থী। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক রাত্রে তাদের বাড়িঘর দখল করে নিলে সে দেশ ত্যাগ করে। ইসরাইল ত্যাগ করার কিছুদিন আগে সে তার অসুস্থ এক কাজিনের জন্য অনেকের সাহায্য কামনা করে। তার অসুস্থ কাজিনকে সামরিক গভর্নরের কম্পাউন্ডের কাছাকাছি অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ দেয়। এক সপ্তাহের কাছাকাছি সময়ে আসাদ মিলিটারী গভর্নরের ভবনের বারান্দা দিয়ে হাঁটছিল। তার হাতে ছিল পিতলের অলঙ্কৃত ট্রে। ট্রেতে করে বেশ কয়েক কাপ কড়া টার্কিশ কফি সে ইসরাইলি আর্মি অফিসারদের মধ্যে পরিবেশন করছিল। এই তরুণ অফিসারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন তার মুখ চেনা।
১৯৫১ সালের ২২ মে সে লক্ষ্য করল তার টাইয়ের দোকানের কাছাকাছি যারা ঘুরছে তাদের মধ্যকার একটি মুখ তার খুব চেনা। প্রথমে ভেবেছিল সে ভুল দেখেছে। কিন্তু যে মানুষটিকে সে দেখেছে তাকে এই পোশাকে সে কখনো দেখেনি। এখন এই লোকটির গায়ে গরম কালের পোশাক। কিন্তু আসাদ তাকে দেখেছে খাকি ইউনিফর্মে। আসাদ পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পুলিশকে সে বলে, আমি এখনই বাগদাদে একজন ইসরাইলি আর্মি অফিসারকে দেখেছি। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় চেহারায় ঐ লোকটিকে গ্রেফতার করে। ঐ লোকের সঙ্গে ছিল ইরাকী এক ইহুদি। তার নাম নিসিম মোশে। সে পুলিশকে জানায়, ইহুদিদের স্থানীয় কম্যুনিটি সেন্টারে সে ছোট্ট একটা চাকরি করে। সে ব্যাখ্যা করে বলে, গ্রেফতারকৃত পর্যটকের সঙ্গে একটা কনসার্টে গতকালই তার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। সেই বাগদাদের দোকানপাট আমাকে ঘুরে দেখাতে অনুরোধ করে।
বাগদাদের পুলিশ সদর দফতরে ওদের দু'জনকে নেয়া হলে এক পর্যায়ে আলাদা করে ফেলা হয়। ইরাকী গোয়েন্দারা মোশেকে নির্যাতনপূর্বক ইসরাইলি লোকটি সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু মোশে অনড়। সে এক কথাই বলে যাচ্ছে; গতকালই ঐ ইসরাইলির সঙ্গে প্রথম আলাপ। পুলিশ সদর দফতরের গোপন নির্দেশে মোশেকে নির্যাতন করে প্রায় মেরে ফেলার উপক্রম করে। এমনকী তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু বন্দীর এক কথা। সে কিছু জানে না। এক সপ্তাহ ধরে প্রচন্ড মারধরের পরও কোনো কথা আদায় করতে না পেরে ইরাক সরকার তাকে মুক্তি দেয়।
অপর বন্দীরও একই কথা। তার নাম ইসমাইল সালহুন। সে ইরানি। সে প্রশাসনকে তার ইরানি পাসপোর্ট দেখায়। তারপরও অবশ্য নির্যাতন থামে না। তাকে নিয়ে সমস্যা হল সে দেখতে ইরানিদের মতো নয়।
ফারসী শব্দ সে বিন্দুমাত্র জানে না। অবশেষে শেষোক্ত বন্দীর সঙ্গে টাই বিক্রেতা আসাদকে মুখোমুখি করা হয়। আসাদকে দেখামাত্র আমার রক্ত হিমশীতল হয়ে পড়েছিল বলে দ্বিতীয় বন্দী পরে জানায়। দ্বিতীয় বন্দী ভেঙে পড়ে এবং স্বীকারোক্তি দেয়।
স্বীকারোক্তিতে সে তার নাম বলে ইয়েহুদী ট্যাগার। আইডিএফের একজন ক্যাপ্টেন। অবশ্যই ইসরাইলি নাগরিক। ইরাকী গোয়েন্দারা ট্যাগারের বাড়ি তছনছ করে। দেয়াল ফুটো করে। দেয়াল ভাঙ্গার পর গুপ্তভান্ডারে বহু ডকুমেন্ট পায়।
শুরু হয় প্রচন্ড আতঙ্কের। ট্যাগারই শুধু আতঙ্কগ্রস্ত নয়, বাগদাদের পুরো ইহুদি সম্প্রদায় অজানা আতঙ্কে কাঁপতে থাকে।
বেশ কিছু লুকিয়ে থাকা ইহুদি এবং বাগদাদে পরিচালিত ইসরাইলি সংগঠন ইরাকীদের তোপের মুখে পড়ে। অবৈধ ইমিগ্রেশন ইউনিট, আত্মরক্ষায় নিয়োজিত একটি গ্রুপ এবং জায়নবাদী বেশ কিছু তরুণ ইরাকীদের রোষানলে পড়ে। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে গঠিত সংগঠনগুলোর মধ্যেও ভয়, ত্রাস।
প্রকৃতপক্ষে ইরাকের রাজধানী বাগদাদকে ঘিরে ইসরাইলিদের বহু অস্ত্র ভান্ডার ও দলিল ডকুমেন্ট গুপ্ত ভান্ডারে রক্ষিত ছিল। কিছু ইহুদিদের ধর্মস্থান মাসুদা সেমটভে। প্রকৃতপক্ষে ইরাকের ঘোরতর শত্রু হল ইসরাইল। ফলে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইরাকে অবস্থানরত ইসরাইলি গোপন সংগঠনের নেতারা ভালো করেই জানত ইরাক তাদেরকে ক্ষমা করার পাত্র নয়। ফাঁসি অবশ্যম্ভাবী।
প্রকৃতপক্ষে ট্যাগারকে ইসরাইল সরকার ভালো কাজেই ইরাকে পাঠিয়েছিলো। তাকে গোয়েন্দাদের মধ্যে যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ২৭ বছর বয়সী ট্যাগারের বিদেশ মিশন এই প্রথম। ট্যাগার ধরা পড়ার আগে বেশ কয়েকটি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ও গ্রুপের মধ্যকার যোগাযোগ নিষ্ক্রিয়ও করেছিল। কিন্তু কয়েকজন তার কথা শোনেনি। তারা ঠিকই নিজেদের মধ্যে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল। এ দলের নেতৃত্বে ছিল প্রকৃতই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী পিটার ইয়ানিভ।
ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবের সঙ্গে ট্যাগারের যোগাযোগ হতো একজন শীর্ষ কমান্ডারের মাধ্যমে। তার পরিচয় সামান্য লোকই জানে। তার ছদ্মনাম যাকী হাভিভ। প্রকৃত নাম বেন পোরাত। ইরাকে জন্মগ্রহণকারী এক ইসরাইলি। ইসরাইলের মুক্তিযুদ্ধকালীন একজন অফিসার। বেন পোরাত ইরাকে কাজ নিতে অনাগ্রহী ছিল। আর্মিতে থাকাকালীন প্রেম হওয়া এক সহকর্মীকে বিয়ে করার জন্য সে ছিল মরিয়া। কিন্তু ইসরাইলের গোয়েন্দা বিভাগের চাপে তাকে ইরাকে বিপজ্জনক পোস্টিং নিতে হয়।
ট্যাগারকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদকালে ইরাকে অবস্থানরত ইসরাইলের গোপন সংগঠনগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ইরাকী পুলিশ অসংখ্য ইহুদিকে গ্রেফতার করে এবং তাদের মধ্যে অনেকে দোষও স্বীকার করে। ইরাকী পুলিশ যেসব ডকুমেন্ট আটক করে তার মধ্যে প্রচুর গোয়েন্দা তথ্যও ছিল। ইহুদিদের প্রার্থনা স্থানের গোপন ভান্ডার থেকে প্রচুর অস্ত্র আটক করা হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে এসব অস্ত্রশস্ত্র জমা করা হচ্ছিল। অস্ত্র জমা শুরু হয় ১৯৪১ সাল থেকে। তখন ১৭৯ জন ইহুদিকে হত্যা করা হয়, ২১১৮ জন আহত হয় এবং বহু নারী ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্মশালা থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র দেখে ইরাকীদের চক্ষু ছানাবড়া। এখানে ছিল ৪৩৬টি গ্রেনেড, ৩৩টি মেশিন পিস্তল, ১৬৮টি রিভলবার, ৯৭টি মেশিনগান চার্জার, ৩২টি কমান্ডো ড্যাগার এবং ২৫ হাজার গুলি।
ইরাকীদের হিংস্র ও ভয়ংকর প্রশ্নবানে একটি নাম বন্দীদের কাছ থেকে বারে বারে উচ্চারিত হতে থাকে। নামটি যাকী হাভিভ। আন্ডারগ্রাউন্ডের রহস্যজনক শীর্ষ ব্যক্তি।
কিন্তু কে এই যাকী হাভিভ? সে কোথায়? অবশেষে ইরাকী এক তরুণ গোয়েন্দা যাকীর পরিচয় কিছুটা উদঘাটনে সমর্থ হয়। তার নিশ্চিত বিশ্বাস যাকী হাভিভই নিসিম মোশে। এই মোশে ট্যাগারের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু পরে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। অসংখ্য গোয়েন্দা নিসিম মোশের বাড়ি ঘেরাও করেও তার সন্ধান পায়নি। সারা ইরাক জুড়ে তার তল্লাশী চলে কিন্তু যাকী হাভিতের কোনো হদিশ নেই। আসলে যাকী হাভিভ তখন ছিল জেলে। যা ইরাকী পুলিশের মাথাতেই আসেনি।
ট্যাগারের সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে কয়েকদিন পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে একদিন সে বাড়ির গেটে ইরাক পুলিশের খুব হাঁক-ডাক শুনতে পায়। পুলিশ তাকে দরজা খুলতে বলে। বেন পোরাত মনে করে তার জীবনের এই শেষ। তার বাড়ির পেছন দিকে বেরুনোরও কোনো দরজা ছিল না। সে ভালো করেই জানত, তার পজিশনের কাউকে আটক করা মানে নিশ্চিত ফাঁসি।
ইরাকী পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব গুরুতর নয়। কয়েক মাস আগে সে একটা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিল। সেই মামলায় আদালতের সমন সে কয়েকবার অগ্রাহ্য করেছে। ইরাকী আদালতে এক ঘণ্টার শুনানী শেষে বেন পোরাতকে দুই সপ্তাহের কারাবাস দেয়।
দুই সপ্তাহের দণ্ড শেষ না হওয়ার আগেই বেন পোরাতকে পুলিশ সদর দফতরে নেয়া হয় তার ছবি তোলা ও হাতের আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার জন্য। সে ভালো করে জানত যদি এসব নেয়া হয় তাহলে সে মরেছে। তখন পুলিশ নিশ্চিতভাবেই সে যে যাকী হাভিভ তা শনাক্ত করতে পারবে। আর এবার তাকে দুই সপ্তাহের সামান্য জেল দেয়া হবে না।
সামান্য দূরের পুলিশ সদর দফতরে দু'জন গার্ডের সঙ্গে বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হেঁটেই যাচ্ছিল। গলি ঘুপচির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সে ভাবল পালানোর এটাই তার সেরা সময়। যাকী হাভিভ দুই পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। দুই পুলিশ তাকে বাধাও দেয়নি। কেননা মামলাটি তেমন গুরুতর নয়। হয়তো ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে ছাড়া পাবে। অতএব দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।
ইরাকী দুই পুলিশ যখন সিনিয়রদের কাছে গেল তারা বড় ধরনের ধমক খেল। ইরাকের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড মানুষটিকে তারা ছেড়ে দিল। ইরাকের বিরোধী দলের পত্রিকাগুলোর হেডলাইন কোথায় যাকী হাভিভ? আরেকটি পত্রিকা লিখল যাকী হাভিভ এখন তেলআবিবে।
এদিকে তেলআবিবে যাকী হাভিভের গোয়েন্দা বসরা নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করে রেখেছে, কীভাবে সে ইরাক থেকে পালাবে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হয়। ঐ সময় ইরাক থেকে হাজার হাজার ইহুদিদের সাইপ্রাস হয়ে ইসরাইলে নিয়ে আসা হচ্ছিল। এক লক্ষ ইহুদি তখন ইরাক থেকে প্লেনযোগে ইসরাইলে আসে। প্রতি রাত্রেই বিমানে করে তাদের আনা হতো।
১২ জুন রাতে বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ সুন্দর পোশাক পরে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে। তার বন্ধুরা তাকে প্রচুর পরিমাণে লোকাল মদ খাওয়ায়। ট্যাক্সির পেছনের আসনে সে বেহুশ হয়ে পড়ে এবং ঘুমের ছল করে। ট্যাক্সির ড্রাইভার তাকে বাগদাদ বিমান বন্দরের কাছে একটি জায়গায় রেখে যায়।
একাকী বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ বিমান বন্দরের কাঁটাতার ভেদ করে ভেতরে চলে যায়। সে জানত, কাঁটাতার কোনো জায়গায় কাটা আছে। এদিকে টারমাকে একটি প্লেন দেশত্যাগীদের নিয়ে রানওয়ে চলতে শুরু করে। কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ মোতাবেক প্লেনটি শক্তি সঞ্চয় করে গতি বাড়িয়ে দেয়। বিমানটি দশ ফুট উঁচুতে উঠে গেছে। ঠিক এই সময়েই একটি ঝুলন্ত রশি ঝুলতে দেখা যায় প্লেনের। অন্ধকার থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ ঐ দড়িটি ধরে ফেলে। তাকে প্লেনে তুলে নেয়া হয়। এবং প্লেনটি ওড়ার জন্য ভূমিত্যাগ করে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত এবং কোনো যাত্রীই জানতে পারল না কীভাবে একজন যাত্রীকে প্লেনে নিয়ে যাওয়া হল। অ্যাকশন মুভিতে যেমনটা দেখা যায় ঠিক তেমনটাই ঘটল বেন পোরাত তথা যাকী হাভিভের ক্ষেত্রে।
বাগদাদের ওপর দিয়ে প্লেনটি ওড়ার সময় ছাদে দাঁড়ানো অনেকেই ঈশ্বরের প্রশংসা করল। প্রশংসার কারণ তাদের বন্ধুর যাত্রা নিরাপদ হোক। আর বন্ধুটি হল বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই যাকি হাভিভ ইসরাইলে পৌঁছে গেল। ইসরাইলে পৌঁছে যাকি হাভিভ তার সুইট হার্টকে বিয়ে করে। সে রাজনীতিতে নেমে সফল হয়। এমপি হয়, মন্ত্রী হয়। বর্তমানে ইসরাইলের ইরাকী ইহুদিদের কাছে সে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
ইরাকে আটকে পড়া ইহুদিদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। গ্রেফতারকৃত অসংখ্য ইহুদিকে বেদম মারধর করা হয়। ট্যাগারসহ ২২ জনকে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠিন সাজা দেয়া হয়। অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহনের জন্য দু'জন সুপরিচিত বাগদাদের ইহুদি সালোম সালাচ ও যোশেফ বাটজরিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
ট্যাগারকে একদিন জেলের মধ্যে মধ্যরাতে ঘুম থেকে জাগান হয়। তার সেলের মধ্যে তখন অসংখ্য পুলিশ। প্রধান তদন্তকারী ট্যাগারকে বললেন, আজ রাত্রে তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। ট্যাগারের বিচারকার্য এখনো শেষ হয়নি। ট্যাগার তাদের বলল, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা ফাঁসি দিতে পার না।
ট্যাগারকে বলা হল, আমরা পারি না মানে? আমরা তোমার সব অতীত কর্মকাণ্ড জেনে গেছি। তুমি একজন ইসরাইলি অফিসার। একজন গোয়েন্দা।
ইহুদিদের একজন ধর্মগুরু এসে ট্যাগারের পাশে বসলেন। ট্যাগারকে তিনি ত্রোস্ত বা প্রার্থনা সংগীত শোনালেন। শেষ রাত সাড়ে তিনটায় ট্যাগারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হল। ট্যাগারের মনে পড়ে গেল, মাত্র এক সপ্তাহ আগে সে জেরুজালেমে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছে। বাগদাদে আসার আগে কিছু সময় সে প্যারিস ও রোমে ছুটি কাটিয়েছে। আর এখন দড়িতে ঝুলতে হবে।
ইরাকী কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ফর্মে ট্যাগারের সই নিল। জল্লাদ তার ঘড়ি ও আংটি নিয়ে নিল। ট্যাগার দাবি করল, তার লাশ যেন ইসরাইলে পাঠানো হয়। জল্লাদ ট্যাগারকে একটি ফাঁসির দরজায় দাঁড় করালো। তার পায়ে বালুর বস্তা বাঁধা হল। ট্যাগারের মাথায় একটা যমটুপি পরাতে চাইলে সে বাধা দেয়। আয়োজন সব শেষ হলে জল্লাদের দৃষ্টি এখন কমান্ডিং অফিসারের দিকে। এ সময়ও আরও অনেক অফিসার উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষটাকে সবাই দেখছিল। ট্যাগার তার পরিবারের লোকদের কথা ভাবছিল। ভাবছিল জেরুজালেমের কথা। সেখানে থাকলে তার জীবনটা কেমন হতো। সে এও ভাবছিল তার মুন্ডুটা কী দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
হঠাৎ করেই কমান্ডিং অফিসার উঠে চলে যান। ট্যাগারকে মৃত্যুকূপ থেকে সরিয়ে আনা হল। তার পায়ের বালুর বস্তা খুলে ফেলা হল। জল্লাদ বলল, আজ রাত্রে সে যে পরিশ্রমিক বা সম্মানী পেত তা আর পাওয়া যাবে না। ট্যাগার বুঝল, তাকে এই দফায় আর মরতে হচ্ছে না। ট্যাগারকে বিচারে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পরে তার দণ্ড কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। বাটজরি ও সালাহকে ফাঁসি দেয়া হয়।
ইয়োককে যে করেই হোক বেঁচে যাওয়ার আয়োজনও করেছিল ইরাকের জেলাররা। রাজনৈতিক বন্দীরা, আততায়ীরা সকলেই বুঝতে পারল ইয়োককে বন্দী অবস্থায় মরতে হবে না। একদিন সে মুক্ত হয়ে যাবে।
ট্যাগারকে ৯ বছর ইরাকের জেলে কাটাতে হয়। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আব্দুল করিম কাসেম অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরাকে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ইরাকী প্রধানমন্ত্রী ও রাজকীয় পরিবারের বহু লোককে হত্যা করেন। ক্ষমতাগ্রহণের দু'বছর পর জেনারেল কাসেমের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। অবশ্য কয়েক বছর পরে তাদের সে চেষ্টা সফল হয়। যাহোক, জেনারেল কাসেমকে হত্যা চেষ্টার খবর টের পায় মোসাদ। মোসাদ-প্রধান সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল কাসেমের ঘনিষ্ঠ লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মোসাদ এবং জেনারেল কাসেমের লোকদের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়। সমঝোতাটি হল, জেনারেল কাসেমকে যারা হত্যা করতে চায় মোসাদ তাদের নাম দেবে বিনিময়ে ট্যাগারকে জেল থেকে মুক্তি দিতে হবে। জেলে ট্যাগারের কাছে জেলার গেলেন। তাকে কয়েদীর পোশাক ছেড়ে অন্য পোশাক পরতে দেয়া হল। জেলার বললেন, আপনাকে এখন বাগদাদ যেতে হবে।
পুলিশের একটি গাড়িতে ট্যাগারকে তোলা হল। এতসব আয়োজন দেখে ট্যাগার স্তম্ভিত। ট্যাগারকে নেয়া হল রাজকীয় প্রাসাদে। সৈন্যরা তাকে এসকর্ট করে বিশাল এক অফিসে নিয়ে গেল। সুদৃশ্য একটি টেবিলে ট্যাগার একটি পরিচিত মুখ দেখতে পেল। ইনি ইরাকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট- জেনারেল কাসেম। ট্যাগার হঠাৎ করেই বুঝল, তাকে আসলে ছেড়ে দেয়া হবে। এদিকে জেনারেল কাসেম এই ইসরাইলির মুখটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট কাসেম ট্যাগারকে জিজ্ঞেস করলেন, ইরাক ও ইসরাইলের মধ্যে যদি যুদ্ধ লেগে যায়, তাহলে তুমি কী আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? ট্যাগার উত্তর দিল, আমি যখন দেশে ফিরে যাব তখন ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় আমি কাজ করব। আর যদি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় আমি নিশ্চিতভাবে ইসরালের পক্ষে যুদ্ধ করব। আপনি যেভাবে নিজ দেশের হয়ে বহু যুদ্ধ করেছেন।
জেনারেল কাসেমের ট্যাগারের এই উত্তর ভালো লাগার কথা। প্রেসিডেন্ট কাসেম আসন ছেড়ে দাঁড়ালেন। বললেন, দেশে গিয়ে তোমার লোকদের বলবে যে, ইরাক এখন একটা স্বাধীন দেশ। আমরা আজ আর সাম্রাজ্যবাদের দালাল নই।
রাজকীয় প্রাসাদ থেকে একটি গাড়ি ট্যাগারকে বিমান বন্দরে নিয়ে গেল। বৈরুতের একটি বিমানে তুলে দেয়া হল ট্যাগারকে। বৈরুত, নিকোসিয়া, সাইপ্রাস হয়ে অবশেষে ইসরাইলে গিয়ে পৌঁছল ট্যাগার।
বিমানবন্দরে ট্যাগারের সহকর্মী, বন্ধুরা উপস্থিত ছিল। তাদের ধারণা ছিল বিধ্বস্ত এক ট্যাগারকে দেখবে তারা। কিন্তু জীবন্ত ট্যাগারকে দেখার পরিবর্তে তারা দেখল তেজস্বী, সমঝদার, মিশুক ও হাসি মুখের ট্যাগারকে। গত নয় বছরে একই রকম আছে ট্যাগার।
ট্যাগারকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর মোসাদ-প্রধান শিলোয়াহ বলেন, যে কোনো মূল্যে আমাদের বিপদাপন্ন লোকগুলোকে ফিরিয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
ইসরাইলে ফিরে ট্যাগার বিয়ে করে। বিদেশে কূটনৈতিক হিসেবে সাফল্য লাভ করে এবং অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেয়।
📄 রেড প্রিন্সের সন্ধানে
ইসরাইলি খেলোয়াড় ও এথলেটরা জার্মানিতে এসেছিলেন অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে। ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৪টায় ৮জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী মুখোশ পরে জার্মানির মিউনিখে ইসরাইলি খেলোয়াড়দের ফ্ল্যাটে ঢুকে মুষ্টিযুদ্ধের কোচ মোশে উইনবার্গ ও ওয়েট লিফটিং চ্যাম্পিয়ান যোয়ে রোমানোকে হত্যা করে। তারা সন্ত্রাসীদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন। ইসরাইলি এথলেটদের কয়েকজন গুলির শব্দে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সন্ত্রাসীরা ৯জনকে জিম্মি করে।
জার্মান পুলিশ, সাংবাদিক, টিভি সকলেই দৌড়ে আসে এবং সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এই প্রথম বারের মতো বিশ্বজুড়ে টিভিতে সরাসরি প্রচারিত হয়। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারকে ঘুম থেকে জাগান তার সামরিক এ্যাডজুটেন্ট। গোল্ডা মেয়ার পড়ে গেলেন ফাঁদে। ঘটনাস্থল জার্মানি একটি বন্ধুপ্রতীম দেশ। জিম্মি উদ্ধারের দায়িত্বও জার্মানির। ইসরাইল তাদের সেরা কমান্ডো ইউনিট সায়েরেত মাটকালকে জিম্মি উদ্ধারে পাঠাতে চাইলেও জার্মানির বেভারিয়া রাজ্য সরকার ভদ্রভাবে এতে আপত্তি জানায়। বেভারিয়াতেই সেবার অলিম্পিকের অনুষ্ঠানাদি হচ্ছিল। ইসরাইল সরকারকে জার্মান প্রশাসনের ভাষ্য, আপনাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আমরাই সকল জিম্মিকে মুক্ত করব। সমস্যা হল জিম্মি উদ্ধারে যে অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং সাহসিকতার প্রয়োজন জার্মান সরকারের তাতে ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে এমন একটি ধূর্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাবু করার ক্ষেত্রে।
জার্মান কর্তৃপক্ষ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সারাদিন ধরে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সন্ত্রাসী ও জিম্মিদের মিউনিখের বাইরে ফুরস্টেন ফ্রেন্ডব্রাক বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
জার্মান সরকার তাদেরকে একটি বিমান দিতে চায় যাতে চড়ে তারা যেখানে খুশী যেতে পারবে। কিন্তু জার্মান পুলিশ বিমান বন্দরকে ঘিরে যে আয়োজন করেছে তাতে বিন্দুমাত্র পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। জার্মানি বিমান বন্দরের মাঝখানে একটি বিমান এনে রাখলেও তাতে কোনো পাইলট বা ক্রু ছিল না। আবার বিমান বন্দরের ছাদে অদক্ষ শার্পসুটারদের জড়ো করে রাখা হয়। সন্ত্রাসী চক্রের নেতা প্লেনটি পরিদর্শনে এসে দেখে যে, বিমানটিতে কোনো ক্রুতো নেইই ইঞ্জিনও ঠাণ্ডা হয়ে আছে। এহেন বিমান চালু করে উড়ে যেতে কত সময় লাগবে? সন্ত্রাসীরা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ফলে তারা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়তে ও গুলি করতে শুরু করে। জার্মান পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের শুরুতেই ইসরাইলের সকল জিম্মিকে তারা হত্যা করে। নিহত হয় একজন জার্মান পুলিশও। ৮ সন্ত্রাসীর মধ্যে পাঁচজন নিহত হয়। তিন সন্ত্রাসীকে আটক করা সম্ভব হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। কেননা এই সন্ত্রাসী ঘটনার কিছুদিন পরে একটি লুফথানসা বিমান ছিনতাই হয়। ধারণা করা হয় ঐ সময় শর্তাধীনে আটক তিন সন্ত্রাসীকে মুক্ত করে দেয়া হয়।
ইসরাইলি জেনারেল জভি জামির সবেমাত্র ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হয়েছেন। তাকে অসহায়ের মতো তার দেশের লোকদের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জার্মানিতে উড়ে এসেছিলেন এবং উক্ত বিমান বন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে অবস্থান নিয়েছিলেন। জার্মানি পরিচালিত অভিযানে তার কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না। তদুপরি জার্মান সরকার পুনঃপুনঃ বলছে যে, তাদের উদ্ধারাভিযান এক্সেলেন্ট। মোসাদ-প্রধান উপলব্ধি করলেন, তাদের দেশের এক নতুন শত্রুর অভ্যুদয় ঘটেছে। এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা নিজেদেরকে 'ব্লাক সেপ্টেম্বর' বলে পরিচয় দেয়।
ব্লাক সেপ্টেম্বর নামকরণের পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা। এ মাসে জর্ডানের বাদশা হোসেন তার দেশে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেন। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সঙ্গে ছয়দিনের যুদ্ধ শেষে ইসরাইলের ভাষায় বহু সন্ত্রাসী জর্ডানের রাজধানী আম্মান, শহরতলী এলাকা এমনকী গ্রামে পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইসরাইল সীমান্ত এসব তথাকথিত সন্ত্রাসীদের বিশেষ ঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং প্রকাশ্যে তারা অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। তারা জর্ডানের বাদশাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে এবং ক্রমান্বয়ে সে দেশের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। বাদশাহ এসব জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। বাদশাহ একদিন আর্মি ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন, ট্যাঙ্কের এ্যান্টেনায় একটি ব্রেসিয়ার ঝুলছে। ক্রুব্ধ বাদশাহর প্রশ্ন, ওটা কী?
ট্যাঙ্কের পুরুষ কমান্ডার বললেন, ব্রেসিয়ার ঝোলানোর অর্থ হল আমরা পুরুষ নই, নারী। আপনি আমাদের তো আর যুদ্ধ করতে দিচ্ছেন না। বাদশাহ হোসেনের মনে হল বালিয়ারিতে তিনি তার মাথা ঢুকিয়ে দেন। নিজ দেশ তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে ১৯৭০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন।
📄 ব্লাক সেপ্টেম্বর
বাদশাহ হোসেনের এই কঠোর নির্দেশে সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের রাস্তাঘাটে গুলি করে মারতে শুরু করে। গ্রেফতার হয় বহু। আদালতে না নিয়েই তাদের বিচার কাজ শেষ হয়। বহু সন্ত্রাসী ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় শিবিরে লুকালেও সেসব শিবিরে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। মারা যায় কয়েক হাজার। বহু আতঙ্কিত সন্ত্রাসী জর্ডান নদী অতিক্রম করে ইসরাইলিদের হাতে বন্দী হয়। তাদের উপলব্ধি হল, ইসরাইলি কারাগারে পচে মরব; জর্ডান সরকারের গুলিতে নয়। ম্যাসাকারের সময় বহু সন্ত্রাসী সিরিয় ও লেবাননে পালিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের ঐ হামলায় দুই থেকে সাত হাজার লোক নিহত হয়।
ফাতাহ প্রধান ইয়াসির আরাফাত এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞা করলেন। কেননা তার সংগঠনটিই অন্যদের তুলনায় বৃহৎ। ফাতাহর অভ্যন্তরে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হল। আন্ডারগ্রাউন্ডের মধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড। ফাতাহর সদস্য ও কমান্ডাররা পর্যন্ত ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপ সম্পর্কে জানলেন না।
ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপ মানেই নিষ্ঠুরতা। ফিলিস্তিনিদের শত্রু ভাবলেই তারা আক্রমণ চালানোর কথা ভাবত। ইয়াসির আলাফাত এই গ্রুপের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা বরাবরই অস্বীকার করেছেন। কিন্তু ইসরাইলের ভাষায় আরাফাতই এই সংগঠনের স্রষ্টা এবং নেতা। তিনি নাকি ফাতাহর সিনিয়র নেতা আবু ইউসেফকে ব্লাক সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ইসরাইলিদের ভাষায় ধর্মান্ধ তরুণ আলি হাসান সালামেহকে ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের অপারেশন প্রধান করা হয়। সালামেহ'র প্রধান গুণ তিনি ধর্মান্ধ একই সঙ্গে সাহসী ও বুদ্ধিমান। তার বাবা হাসান সালামেহ ১৯৪৮ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বাহিনীর সর্বশেষ সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধে হাসান সালামেহ নিহত হন এবং তার ছেলে আলি হাসান সালামেহ তার পিতার আদর্শ জিইয়ে রাখার সংগ্রামে ব্রতী হন।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের প্রথম দিককার অভিযানগুলো ইসরাইলকে তেমন বিচলিত করেনি। কেননা তাদের মূল টার্গেট ছিল জর্ডান। তারা রোমে জর্ডানের জাতীয় বিমান সংস্থার অফিস ও প্যারিসে জর্ডান দূতাবাসে বোমা হামলা করে। জর্ডানের একটি বিমান ছিনতাই করে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। বার্থে জর্ডান দূতাবাস এবং জার্মানিতে একটি ইলেকট্রোনিক প্ল্যান্ট তারা ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাদের ক্ষতির মধ্যে আরও রয়েছে জর্ডানের পাঁচ গোয়েন্দাকে হত্যা, হামবুর্গ ও রটেরডামে তেল রিজার্ভারের ক্ষতিসাধন ইত্যাদি। ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের একটি অভিযান পরিচালিত হয় কায়রো শেরাটন হোটেলের লবিতে। সেখানে হত্যা করা হয় জর্ডানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওয়াসকি আল তালকে। এখানে এক হত্যাকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শরীরে ঝুঁকে তার রক্ত লেহন করে।
১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের বিজয়ে ব্লাক সেপ্টেম্বরের চোখ পড়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের দিকে। তারা ইসরাইলের বিমান ছিনতাই করে, পুনঃপুনঃ ইসরাইলের সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমে বেসামরিক লোককে হত্যা করতে শুরু করে। একই সঙ্গে বড় বড় শহরে বোমা পুঁতে ও বিস্ফোরণ ঘটাতে শুরু করে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা শাবাক ও মোসাদের নতুন শত্রুতে পরিণত হয় ব্লাক সেপ্টেম্বর। যদিও এই পর্যায়ে মোসাদের শত্রু ছিল ফাতাহ এবং তাদের বহু পরিকল্পনা তারা নস্যাৎ করে এবং বহু লোককে তারা গ্রেফতার করে।
কিন্তু ইতিমধ্যে ব্লাক সেপ্টেম্বর তাদের সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে এবং পশ্চিমা দেশসমূহ তাদের টার্গেটে পরিণত হয়- বিশেষ করে ইসরাইল। জার্মানির মিউনিখের ধ্বংসযজ্ঞ ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের ছিল উল্লেখযোগ্য প্রথম অভিযান।
মিউনিখ অভিযানের পরেই আলি হাসান সালামেহ'র নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ অভিযানের নেপথ্যে ছিল হাসান সালামেহ'র ব্রেন। প্রতিপক্ষকে হত্যার পর ভিকটিমের রক্ত নিজ দলের লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। আর এভাবেই হাসান সালামেহ'র ছেলে আলি হাসান সালামেহর নাম হয়ে যায় রেড প্রিন্স।
১৯৬৯ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এশকলের অকাল মৃত্যুতে তার স্থলাভিষিক্ত হন গোল্ডা মেয়ার। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে গোল্ডা মেয়ার অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এবং বর্তমানে মোসাদ-প্রধান জভি জামির এবং প্রধানমন্ত্রীর কাউন্টার টেররিজম বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক আমান প্রধান আহারোন ইয়ারিভকে তার অফিসে তলব করেন। মিউনিখে ইসরাইলি এথলেটদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোল্ডা মেয়র খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি এই সময় বলেন, জার্মানিতে আবার ইহুদিদের রক্ত ঝরল। গোল্ডা মেয়ার ছিলেন একজন শক্ত মহিলা। আর তিনি যে মিউনিখ ম্যাসাকারে যুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করবেন না এটা ভাবাই যায় না।
জভি জামির সাবেক পালমাক ফাইটার হলেও আউটস্ট্যান্ডিং জেনারেল হিসেবে তার খ্যাতি ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে পদ পাওয়াই ছিল তার সর্বোচ্চ পদায়ন। তিনি কিছুদিন বৃটেনে ইসরাইলের মিলিটারী এটাচে ছিলেন। মেইর অমিত মোসাদ-প্রধান হিসেবে তার কার্যকাল পুরোটা শেষ করার পরই ১৯৬৮ সালে জভি জামির মোসাদের প্রধান হন। জামিরের সমালোচকদের মতে, তিনি অতিমাত্রায় ভদ্রলোক, লাজুক এবং গোয়েন্দাগিরিতে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। মোটকথা তিনি ক্যারিশমেটিক নন এবং হারেল ও মেইর অমিতের মতো মোসাদ-প্রধান হওয়ার যোগ্যতাও তার নেই। জামির মোসাদ-প্রধান হওয়ায় রাফি এইতানসহ বেশ কয়েকজন মোসাদ যোদ্ধা প্রতিবাদে সংগঠন ত্যাগ করেছেন।
জামিরের মতো ইয়ারিভও নেপথ্যে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। ইসরাইলের ছয়দিনের যুদ্ধকালে আমান প্রধান হিসেবে ইয়ারিভ বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন। এটা তার জন্য একটা বিশাল অর্জন। তবে তার গ্রহণযোগ্যতার মূলে রয়েছে তার জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। হালকা পাতলা চশমাধারী, স্বল্পভাষী এবং টাকমাথার ইয়ারিভকে দেখলে একজন পান্ডিত্যপূর্ণ প্রফেসর বলে ভ্রম হয়, তুখোড় গোয়েন্দা মনে হয় না।
ইয়ারিভ এবং জামিরের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ছিল। তাদের আসলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কথা। কেননা কিছুটা ওভারলেপিংও হয়েছে। কিন্তু তারা পরস্পর পরস্পরকে শ্রদ্ধা করা ও সম্প্রীতির মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন। তারা দু'জনই শান্তশিষ্ট, রিজার্ভ এবং কিছুটা লাজুকও। মধ্যমণি হয়ে ওঠার প্রবণতা তাদের মধ্যে ছিল না এবং ঘটনার বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তারা খুব সতর্ক ছিলেন।
মিউনিখের হত্যাযজ্ঞের পর ইয়ারিভ এবং জামির অতি তৎপরতার সঙ্গে ব্লাক সেপ্টেম্বর সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। এ কাজে তারা নামী গোয়েন্দাদের নিয়োগ করেছিলেন। তারা গোল্ডা মেয়ারকে বলেন, ঐ সংগঠনটি ইসরাইলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ব্লাক সেপ্টেম্বরের শপথ হল যতটা সম্ভব ইসরাইলিদের সৈন্য, নাগরিক, মহিলা ও শিশু হত্যা করা। এক্ষেত্রে একের পর এক ওদের সব নেতাকে হত্যা করতে হবে। সাপের মাথা থেতলে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। তরুণ সম্প্রদায়কে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ তার পক্ষে অতি সহজ ছিল না। ইসরাইল অতীতে এমনটা কখনো করেনি। গোল্ডা মেয়ার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকলেন। এবং এক সময় কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তিনি স্বগতোক্তি করছেন কিম্বা নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন। তিনি হলোকাস্টের সময় ইসরাইলি নারী-পুরুষকে হত্যার কথা স্মরণ করলেন। ইহুদিরা এ সময় নিগৃহীত হয়েছে, তাদের নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। অবশেষে তিনি তার মাথা তুলে অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলেন।
জামির অবিলম্বে অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার ভাবছেন, ইয়ারিভ এবং জামির যতই প্রতিশ্রুতি দিক না কেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি তাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন কীনা। মোসাদের তরুণ গোয়েন্দারা যাদের মারতে যাচ্ছে তারা যেই-সেই নন, ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের নেতা এবং প্রধান প্রধান সন্ত্রাসী। গোল্ডা মেয়ার জানতেন এই ধরনের অভিযান আইনের বাইরে চালাতে হবে। মোসাদের কার্যক্রম যদি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে তাদের কর্মকাণ্ড নারকীয় হয়ে পড়ার আশংকা। ফলে অনেক নিরীহ লোকও মারা যেতে পারে। ফলে মোসাদকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এলক্ষ্যে তিনি একটি গোপন কমিটি করলেন যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হল প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দায়ান ও সাবেক মেধাবী জেনারেল ও বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ইগাল আল্লোনকে। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে তো এই কমিটিতে থাকছেনই। এই গোপন ট্রাইব্যুনালের কাজ হবে প্রতিটি অভিযানের ফলাফল পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা। এই কমিটির নাম দেয়া হল এক্স কমিটি। সিদ্ধান্ত হল মোসাদ ও শাবাক প্রধান প্রত্যেকটি অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট টার্গেটের নাম ও ফাইল তাদেরকে দেবেন। তাদের অনুমোদন পেলেই মোসাদের হিট টিম মাঠে নামবে।
মাসাদ হল মোসাদের অভিযান পরিচালনা বিভাগ। তাদেরকে এই অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হল। কালো কেশধারী এবং শ্রমসাধ্য কাজে তৎপর মাইক হারারীকে অভিযানের নেতা বানানো হল। সিদ্ধান্ত হল, ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর বিরোধী সব অভিযানই হবে ইউরোপে। প্রথমত সেখানে তারা সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছে এবং সেখানে তাদের সুরক্ষা দেয়ার লোকেরও অভাব নেই।
মাসাদার অপারেশনাল টিম কিডন থেকে লোক নিয়োগ দিলেন। অনেকগুলো টিম করলেন। তেমনি একটি টিমের নারী ও পুরুষকে দায়িত্ব দেয়া হল তারা সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত ও পরিচয় নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীর যে শহরে বাস সেখানে তারা তাকে ফলো করবে, তার ছবি তুলবে, তার অভ্যাস জানবে, তার বন্ধুদের চিহ্নিত করবে, প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে বের করবে। যেসব বার বা রেস্তোরাঁয় সে যাতায়াত করে তা খুঁজে বের করাও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তার রুটিন জানতে হবে এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার তৎপরতা উদঘাটন করতে হবে। হোটেল রুম ঠিক করা, ফ্ল্যাট ও গাড়ি ভাড়া করার দায়িত্বে থাকবে ছোট্ট একটি দল-একজন নারী আরেকজন পুরুষ। আরেকটি ক্ষুদ্র দলের ওপর বর্তাবে মোসাদ সদর দফতর ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশের অগ্রগামী অপারেশনাল টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার।
মোসাদের হিটটিম বা ঘাতক বাহিনী অকুস্থলে এসে পৌঁছবে সবার শেষে। তারা ব্যক্তি, ঠিকানা ও ছবি এবং অন্যান্য তথ্যাদি নিশ্চিত হয়ে অভিযানে নামবে। যে শহরে অভিযান চলবে সেখানে কর্মরত মোসাদ গোয়েন্দাদের নিরাপত্তায় কাজ করবে আরেকটি দল। ড্রাইভার, গাড়ি অভিযান স্থলে প্রস্তুত থাকবে। মহড়া অনুযায়ী সটকে পড়ার রাস্তা নির্বিঘ্ন করবে এই টিম। এই দলের কাছে অস্ত্র থাকবে এবং প্রয়োজনে হিট টিমের পাশে এসে দাঁড়াবে। অভিযান শেষে হিট টিমের সকল সদস্য তাদের অস্ত্র ও সরঞ্জামাদিসহ ঐ দেশ ত্যাগ করবে। অপারেশনের আগেই সন্দেহভাজনকে খুঁজে পেতে সাহায্যকারী টিম ঐ দেশ ছাড়বে। অন্যরা বাক্স-পেটরা বাঁধাইসহ অন্যান্য কাজে আরও কয়েকদিন সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থান করবে। মোসাদ গোয়েন্দারা অভিযান পরিচালনার জন্য প্রথম যে শহরটি বেছে নিলেন সেটি রোম।
রোমে সন্দেহভাজন হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হল তিনি লিবীয় দূতাবাসের একজন অধঃস্তন কেরানি। নাবলুসে জন্মগ্রহণকারী ৩৮ বছর বয়স্ক ওয়াযেল জেডওয়েলার ভদ্র, হালকা পাতলা গড়ন ও মৃদুভাষী। তার বাবা খুব বিখ্যাত ব্যক্তি এবং আরবিতে অনুবাদে খুব দক্ষ ছিলেন। ওয়াযেল নিজেও কবিতা ও ফিকশন অনুবাদে পারদর্শী। শিল্পকলার একজন সমঝদারও তিনি। লিবীয় দূতাবাসে দোভাষী হিসেবে তিনি কর্মরত। ছোট্ট একটা এ্যাপার্টমেন্টে তার বাস। তার বন্ধুর দাবি ওয়াযেল সব সময় সন্ত্রাসকে ঘৃণা করতেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা হত্যায় লিপ্ত হয় তাদেরও তিনি ঘৃণা করতেন।
কিন্তু ওয়াযেলের বন্ধুরা তার সত্যিকার পরিচয় জানতেন না। তার ভালো বন্ধুরা ছিলেন যেমন নিষ্ঠুর তেমনি ধর্মান্ধ। তারা রোমে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের হয়ে পরিকল্পনা করে স্থির বিশ্বাসে অভিযান চালাতেন। ওয়াযেল রোমে বেড়াতে আসা দুই ইংলিশ তরুণীকে টার্গেট করলেন। এই দুই তরুণী রোম হয়ে ইসরাইলে যাবে। ওয়াযেল দুই সুদর্শন তরুণ ফিলিস্তিনিকে ঐ দুই তরুণীর সঙ্গে বিছানায় যাওয়াসহ সবরকমের সম্পর্ক স্থাপনের নির্দেশ দেন। দুই তরুণ সফলও হন। দুই জোড়া তরুণ তরুণীর বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় হয়। তখন এক তরুণ তার বান্ধবীকে পশ্চিম তীরে তাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা টেপ রেকর্ডার পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। সাধাসিদে তরুণী সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়। রোম বিমানবন্দরের তরুণীদের মালামাল ও টেপরেকর্ডারটি যথাযথভাবে চেক করা হয়। দুই তরুণী জানত না, সুদর্শন দুই তরুণ তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াযেলের তত্ত্বাবধানেই ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের লোকজন ঐ রেকর্ড প্লেয়ারের মধ্যে বিস্ফোরক ভর্তি করে দেন এবং সুন্দর করে ব্রান্ড নিউ বাক্সে সেটি ভরে প্যাক করা হয়। ঐ রেকর্ডারের বডিতে এমন ডিভাইস সংযুক্ত করা হয় যাতে একটা উচ্চতায় ওঠার পর সেটি বিস্ফোরিত হবে এবং প্লেন ও তার সকল যাত্রী মারা যাবে।
সন্ত্রাসীরা জানতেন না যে, ইসরাইল অভিমুখী একটি সুইস বিমানে অনুরূপ বিস্ফোরক ইতিপূর্বে সংযুক্ত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য বিমানটির ধ্বংস। কিন্তু এল আল প্লেন এক ধরনের অস্ত্রের বর্ম দিয়ে তা ঢেকে দেয়ায় প্লেনটি ধ্বংস হয়নি। এই দফায় যা হল, এল আল প্লেনের পাইলট একটি সন্দেহভক রেড লাইট জ্বলতে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিমান বন্দরে ফিরে এলেন। স্তম্ভিত ইংলিশ তরুণীদ্বয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের দুই প্রেমিকের সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু ঐ সুদর্শন তরুণ বান্ধবীদের বিমানবন্দরে ঢুকিয়েই চলে গেছেন ইটালী।
মোসাদ গোয়েন্দাদের প্রথম টিমটি কয়েকদিন ধরে ওয়াযেলকে খুঁজতে থাকে। এক মহিলা গোয়েন্দা লিবীয় দূতাবাসে প্রবেশ ও নির্গমনের সময় হ্যান্ড ব্যাগের নিচে ক্যামেরা রেখে তার ছবি তুলতে সমর্থ হয়। এদিকে ১৬ অক্টোবর ওয়াযেল বাড়ির সামনে এলে এই মহিলার বিষাদমাখা সুর পিয়ানোতে শুনতে পান। হঠাৎ করে বাড়ির সামনের অন্ধকার থেকে রিভলবার হাতে দুই ব্যক্তি বেরিয়ে এসে ওয়াযেলকে গুলি করে। কেউই সেই গুলির শব্দ পায়নি এবং দুই মোসাদ গোয়েন্দা অকুস্থলে পার্ক করে রাখা একটি গাড়িতে লাফ দিয়ে উঠে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা রোম ত্যাগ করে।
যাহোক, ওয়াযেল নিহত হয়েছেন। বৈরুতের একটি পত্রিকা তার মৃত্যু সংবাদ ছাপে। কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠন শোক প্রকাশ করে বলে, ওয়াযেল তাদের একজন পরীক্ষিত যোদ্ধা ছিলেন।
ওয়াযেলের হত্যাকারীর প্রকৃত নাম ডেভিড মোলাডনয়। তার জন্ম তিউনিসিয়ায় এবং ছোট বেলায় ইসরাইলে স্থায়ী হয়েছে। ফরাসি ভাষায় তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। কিন্তু ইসরাইলের প্রতি তার ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। ইসরাইলের ব্যাপারে বরাবরই সে আপোষহীন। সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে মোসাদে যোগদানের পর থেকেই দুর্ধর্ষ সব অভিযানে তার ডাক পড়ে এবং রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠে। ওয়াযেলকে হত্যার পরও মোসাদ বেশ কিছুদিন ইসরাইলে কাটিয়ে প্যারিসে চলে যায়।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর প্যারিসের ১৭৫ রুয়ে আলেসিয়ার ড: মাহমুদ হামশারির বাড়ির ফোন বেজে উঠে। ফোনে তাকে প্রশ্ন করা হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের ফ্রান্স প্রতিনিধি হামশারির এটি কীনা। ফোনকারীর গলায় পুরোপুরি ইটালী এ্যাকসেন্ট। ফোনকারী নিজেকে ইটালীর একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতার কথা বলে। তার দরকার হামশারীর একটা সাক্ষাৎকার। সিদ্ধান্ত হয়, হামশারীর বাড়ির বেশ কিছুটা দূরের এক রেস্তোরাঁয় তাদের সাক্ষাৎ হবে। হামশারী একজন শ্রদ্ধেয় ঐতিহাসিক। প্যারিসে তিনি তার ফরাসি স্ত্রী ও মেয়ে নিয়ে থাকতেন। পরবর্তীতে তার মেয়ের নিরাপত্তায় ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
হামশারী যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন তখন রাস্তাঘাটের দিকে বিশেষ নজর রাখতেন। কেউ তাকে ফলো করছে কীনা ইত্যাদি। মাঝে-মধ্যে প্রতিবেশীদের কাছে জানতে চাইতেন, অচেনা কোনো লোক তাকে খুঁজেছে কীনা।
হামশারীর অবশ্য অত চিন্তিত হওয়ার কথা নয়। কেননা তিনি একজন পন্ডিত ব্যক্তি। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তার বেশ পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু ইসরাইলের গোয়েন্দারা তার সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানত। ১৯৬৯ সালে ডেনমার্কে বেন গুরিয়ানকে হত্যার একটা ব্যর্থ চেষ্টা হয়। সেই অভিযানে হামশারী অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে একটি সুইস বিমান মধ্য আকাশে বিস্ফোরণের কারণে বিধ্বস্ত হলে ৪৭জন নিহত হয়। সেই ঘটনায় হামশারীর সম্পৃক্ততা ছিল। রহস্যজনক আরব তরুণদের সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ ছিল এবং তারা রাতে বিশালাকায় সুটকেস নিয়ে তার বাড়িতে আসত। অনেক হীন আচরণের ঘটনা ঘটত ঐ বাড়িতে। ইহুদি গোয়েন্দারা আরও জানত, ইউরোপে এখন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের সে দ্বিতীয় ব্যক্তি।
হামশারী যেদিন সাক্ষাৎকার দিতে বাড়ির বাইরে বের হন কয়েকজন লোক তার এপার্টমেন্ট ভেঙে পনের মিনিট সেখানে কাটায় এবং পরবর্তীতে চলে যায়।
পরের দিন হামশারীর স্ত্রী ও মেয়ে বাড়ি ত্যাগ না করা পর্যন্ত এক ইসরাইলি গোয়েন্দা আশপাশে অবস্থান করছিল। হামশারীর বাড়ির টেলিফোনটি বাজলে তিনি সেটি ধরেন। এটি ছিল ঐ গোয়েন্দার টেলিফোন। গোয়েন্দা হামশারীর বাড়িতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
হঠাৎ করেই হামশারী ভয়াবহ এক বিস্ফোরণের শব্দ পান। তার ডেস্কের নিচে একটা বিস্ফোরক লুকায়িত ছিল। সেটিই বিস্ফোরিত হয়েছে। মারাত্মক আহত হামশারী কয়েকদিন পর হাসপাতালে মারা যান। মোসাদকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগই তিনি পাননি।
হামশারীর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর অভিযানের নেপথ্য নায়ক হারারি জোনাথান নামে একজনকে সঙ্গে নিয়ে সাইপ্রাস দ্বীপে আসেন। সিরিয়, লেবানন ও মিসরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সাইপ্রাস ইসরাইল ও আরব গোয়েন্দাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
হারারীদের লক্ষ্যবস্তু হুসেইন আবদএল হীর। তিনি কয়েকমাস আগে সাইপ্রাসে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্বাঞ্চলীয় ব্লকের সঙ্গে তার যোগাযোগ রাখাও ছিল কর্তব্য। পূর্বাঞ্চল সন্ত্রাসীদের জন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ায় চেক, হাঙ্গেরী, ফিলিস্তিন ও বুলগেরিয়ার সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ হয় সামরিক ঘাঁটি ও বিশেষ বাহিনীর ইউনিটে। ঐ সব দেশ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে। কতিপয় ফিলিস্তিনি নেতা সোভিয়েত আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। তারা পড়াশুনা করতেন মস্কোর প্যাট্টিক লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইসরাইলে সন্ত্রাসী রপ্তানিরও প্রধান ছিলেন আবদ এল হীর। ইসরাইলি গডফাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে যেসব আরব গোয়েন্দা সাইপ্রাসে আসত হীর তাদেরও গুম করার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এক্স কমিটি আবদ এল হীরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এখন এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পালা।
আবদ এল হীর তার হোটেলে ফিরলেন এবং বাতি নিভিয়ে দিলেন। জোনাথানের স্থির বিশ্বাস হীর ঘুমিয়ে পড়েছেন। অতঃপর তিনি রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপলেন। বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পুরো হোটেল। ধোঁয়া অন্তর্হিত হওয়ার পর দেখা গেল আবদ এল হীরের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের বাহিনীর প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের আগুন সেক্ষেত্রে শুরু হয়ে গেল।
১৯৭৩ সালের ২৬ জানুয়ারি মোশে হানান ইশায়ী নামের এক ইসরাইলি তার ফিলিস্তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে মাদ্রিদের একটি পাবে এসেছে। পাব ত্যাগের পর তাদের সামনে এসে দাঁড়াল দু'জন লোক। ফিলিস্তিনি লোকটি পালিয়ে গেল। অতএব আগত দুই লোক গুলি করল ঈশায়ীকে। মৃত্যু হল ঈশায়ীর। আততায়ী দু'জন সটকে পড়ল।
কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল ঈশায়ীর প্রকৃত নাম বারুচ কোহেন। সে একজন নিষ্ঠাবান মোসাদ গোয়েন্দা। সে মাদ্রিদে ফিলিস্তিনি ছাত্রদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। যে লোকটি তার সঙ্গে পাবে দেখা করতে এসেছিল সে হল তার সন্ধানদাতা। ব্লাক সেপ্টেম্বরই তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। কোহেনকে হত্যার মাধ্যমে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের অনুসারীরা তাদের সহকর্মী আবদ এল হীরের হত্যার প্রতিশোধ নিল।
যাদক অফির নামের এক ইসরাইলি গোয়েন্দাকে ব্রাসেলসের ক্যাফেতে গুলি করে আহত করার জন্য ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের লোকদের দায়ী করা হয়। পত্র বোমার মাধ্যমে লন্ডনের ইসরাইলি দূতাবাসের এটাচে ড. আমিকে হত্যার জন্যেও ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলকে দায়ী করা হয়।
আবদ এল হীরের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর সাইপ্রাসে তাদের নতুন এজেন্ট নিয়োগ করে। সাইপ্রাসে পৌঁছানোর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঐ নতুন এজেন্ট রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। অতএব হোটেলে ফিরে বাতি নেভানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পূর্বসূরীর মতো তাকেও হত্যা করা হয়।
আরাফাত এবং আলি হাসান সালামেহ অতঃপর বড় ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তারা একটি বিমান ছিনতাই করে সেটি বিস্ফোরক দিয়ে ভর্তি করেন। অত:পর আত্মঘাতী হামলাকারী কমান্ডোদের ইসরাইল অভিমুখে পাঠানো হয়। ঐ বিমান তেল আবিবে বিধ্বস্ত হলে শতাধিক লোক নিহত হয়। নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংস তথা নাইন ইলেভেনের মতো ঘটনার ধারণার সঙ্গে এর সাজুয্য বিদ্যমান।
মোসাদ এজেন্টরা প্যারিসে ফিলিস্তিনিদের একটি গ্রুপের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। তারা একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। এক রাতে মোসাদের এক গোয়েন্দা ঐ দলে এক বুড়ো লোকের উপস্থিতি শনাক্ত করে। তার ছবি তুলে মোসাদ সদর দফতরে পাঠানো হলে ঐ বৃদ্ধের নাম জানা যায়। তার নাম বাসিল আল খুবাইশী। তিনি ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের একজন সিনিয়র নেতা। খুবাইশী একজন সুপরিচিত আইনজ্ঞ। বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রফেসর এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় পন্ডিত। কিন্তু হামশারী ও ওয়াযেলের মতো জনাকয়েক ভয়ংকর মানুষের মতো খুবাইশীও গোপনে ভয়ংকর।
১৯৫৬ সালে তিনি বাদশাহ ফয়সালকে গাড়ি বোমার সাহায্যে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রাজকীয় গাড়ি বহরের পথে গাড়ি বোমাটি রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বোমাটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিস্ফোরিত হয়। আলি খুবাইশী পালিয়ে লেবানন চলে যান। পরে আমেরিকা যান। কয়েক বছর আগে তিনি গোল্ডা মেয়ারকে আমেরিকা সফরকালে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ঐ হত্যা চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি প্যারিসে সোসালিস্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আবার গোল্ডা মেয়ারকে হত্যার উদ্যোগ নেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হন।
আল খুবাইশী এরপরও সন্ত্রাসের পথ পরিহার করেননি। তিনি পিএলওতে যোগদান করেন এবং দলনেতা জর্জ হাবাশের ডেপুটি নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালের ৩০ মে লড এয়ারপোর্টে আরব ও জাপানী সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে ২৬জন লোক নিহত হয়। এই হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হলেন খুবাইশী। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল পুয়ের্তোরিকোর তীর্থ যাত্রী। তারা জেরুজালেমে এসেছিল। পরবর্তীতে আল খুবাইশী ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরে যোগদানের মাধ্যমে প্যারিসে যান। আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করতেই হয়তো তার আগমন। তিনি উঠেছেন ছোট্ট একটি হোটেলে। ৬ এপ্রিল একটি ক্যাফেতে রাতের আহার শেষে খুবাইশী তার হোটেলে ফিরছিলেন। মেডেলিয়েনের কাছে ওঁত পেতে ছিল মোসাদ টিম। মোসাদের আরও দু'জন গোয়েন্দা রাস্তায় এবং আরও দু'জন গাড়ির মধ্যে ছিল। এদের মধ্যে একজন স্বর্ণকেশীদের ন্যায় পরচুলা পরে ছিল। খুবাইশী কাছাকাছি আসতেই দুই মোসাদ গোয়েন্দার বন্দুক গর্জে ওঠার অপেক্ষায়। এ সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। বাতি জ্বালিয়ে একটি গাড়ি খুবাইশীর সামনে এসে দাঁড়ায়। ঐ গাড়িতে ছিল সুন্দরী এক মহিলা। দু'চারটি কথা শেষ করে খুবাইশী ঐ গাড়িতে গিয়ে উঠেন। গাড়িটি চলে গেলে মোসাদ গোয়েন্দারা হতাশ হয়ে পড়েন। ঐ নারী আসলে একজন পতিতা। সে আল খুবাইশীকে প্রস্তাব দিয়েছিল।
এক যৌন কর্মীর কারণে এতবড় একটা অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেল। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী অফিসার তার দলের গোয়েন্দাদের শান্ত থাকতে বলল। সে বলল, যৌন কর্মী ঠিকই আল খুবাইশীকে কিছুক্ষণের মধ্যে এখানেই নিয়ে আসবে। দলনেতা কী করে এটা জানত তা বলা কঠিন। কিন্তু তার কথামতই ওরা আগের জায়গায় কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেন। আল খুবাইশী যৌন কর্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হোটেলের দিকে সামান্য অগ্রসর হতেই অন্ধকার থেকে দু'ব্যক্তি তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো। এদের মধ্যে একজন ডেভিড মোসাদ।
আল খুবাইশী সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন কী হতে যাচ্ছে। ফরাসি ভাষায় তিনি না না বলে ওঠলেন। বললেন, গুলি করো না। নয়টি বুলেট খুবাইশীকে ঝাঝরা করে দিল। মোসাদ গোয়েন্দারা লাফ দিয়ে তাদের গাড়িতে উঠে সটকে পড়ল। পরের দিন পিএলও এক বিবৃতিতে আইন প্রফেসরের প্রকৃত পরিচয় বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করল।
এর কয়েক মাসের মধ্যে মোসাদ এবং কিডনের সদস্যরা বেশ কয়েকজন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের নেতাদের হত্যা করল গ্রীসে। তারা গ্রীসে এসেছিলেন জাহাজ কিনতে। সেসব জাহাজে বিস্ফোরক ভর্তি করে তা ইসরাইলে পাঠানোর কথা ছিল।
কিন্তু একটি প্রশ্ন তাড়া করে ফিরছে। মিউনিখ অলিম্পিকে হত্যাযজ্ঞ চালানোর মূল পরিকল্পনাকারী সালামেহ কোথায়? সালামেহ ছিলেন বৈরুত সদর দফতরে। তিনি তার পরবর্তী অপারেশনের পরিকল্পনা করছিলেন। এর মধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের মাধ্যমে থাইল্যান্ডে ইসরাইলি দূতাবাস দখল করা। কিন্তু ঐ অভিযান ব্যর্থ হয়। থাই জেনারেলদের কড়া হুমকি এবং ব্যাংককে নিযুক্ত মিসরীয় রাষ্ট্রদূতের চাপে সন্ত্রাসীরা জিম্মিদের মুক্ত করে অপদস্থ হয়ে থাইল্যান্ড ত্যাগ করেন।
সালামেহর পরবর্তী অভিযান চালানো হয় সুদানে সৌদি দূতাবাসে। খার্তুমের এই ফেয়ারওয়েল পার্টি এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল। সালামেহ'র অস্ত্রধারী লোকজন বলতে গেলে খার্তুমের প্রায় সকল কূটনৈতিককে জিম্মি করে ফেলেছিলেন। আরাফাতের নির্দেশে তারা অধিকাংশ কূটনৈতিককে ছেড়ে দেন। তবে যাদেরকে আটক করে রাখা হয় তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ক্লেও এ নোয়েল, একই দূতাবাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি জর্জ সি মুর এবং বেলজিয়ামের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গাই ঈদ। সালামেহর নির্দেশে চরম নিষ্ঠুরভাবে তাদের হত্যা করা হয়। প্রথমে তাদের পায়ে গুলি করা হয়। পরে রাইফেলের গুলিতে হত্যা করা হয়।
সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুদান সরকার তাদের ছেড়ে দেয়। কূটনীতিকদের হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠে। ইসরাইল মনে করে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের লোকদের মরণ কামড় দেয়ার এটাই প্রকৃত সময়। জেরুজালেমে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার নতুন করে অভিযান শুরুর নির্দেশে দেন।
১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল ৩৫ বছর বয়স্ক বেলজিয়ামের পর্যটক গিলবার্ট রিমবাউট বৈরুতের স্যান্ডস হোটেলে উঠেন। একই দিন আরেক পর্যটক দিয়েতার একই হোটেলে রুম ভাড়া নেয়। তাদের সমুদ্রের দিকে মুখ করা রুমগুলো দেয়া হয়। যদিও এরা কেউ কাউকে চিনত না। ৬ এপ্রিল ঐ হোটেলে আরও তিনজন পর্যটক উঠে। হাসিখুশী মুখের এন্ডলু ব্রিটিশ নাগরিক। ডেভিড মোলাড বেলজিয়ামের পাসপোর্ট নিয়ে দু'ঘণ্টা পর রোম ফ্লাইটে আসেন। এখানে তার নাম চার্লস বাউসাউ। বিকেলে আসা জর্জ এলডারও ব্রিটিশ নাগরিক। কিন্তু তার স্বদেশের ঠিক বিপরীত আচরণ। পৃথক একটি বীচ ও হোটেলে উঠেছেন চার্লস মেসি। তার আচরণ প্রকৃতই ইংরেজদের মতো। দু'বেলা আবহাওয়া বার্তা শোনা তার চাই-ই চাই। ছয়জন লোকই নিজ নিজ প্রক্রিয়ায় বৈরুত সফর করছেন। তারা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে শহরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থা, গলি ঘুপচি সবই পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা কয়েকটি দামি গাড়িও ভাড়া করেছেন।
৯ এপ্রিল ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নয়টি জাহাজের একটি বহর এবং ইসরাইলি নৌবাহিনীর টহল যান গভীর সমুদ্রে অবস্থান নেয়। এমবি মিভটাহ জাহাজে প্যারাসুট বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়। এর কমান্ডে রয়েছে কর্নেল আমনোন লিপকিন। এদের দায়িত্ব হল পিএলও'র সদর দফতরে হামলা চালানোও। এহুদ বারাকের অধীনে রয়েছে সায়েরেত মাটকাল ইউনিট। আরেকটি জাহাজেও রয়েছে প্যারাসুট বাহিনী। তাদের অভিযানের লক্ষ্য ভিন্নতর। জাহাজে চড়ার আগে তাদেরকে চার ব্যক্তির ছবি দেখানো হয়। তাদের মধ্যে তিনজন হলেন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের সুপ্রিম কমান্ডার আবু ইউসেফ, ফাতাহর শীর্ষ অপারেশন কমান্ডার কামাল আদওয়ান। ইসরাইল অধিকৃত এলাকায় ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলের অপারেশন চালানোর প্রধান ব্যক্তিও তিনি। আরেকটি ছবি ফাতাহ গ্রুপের প্রধান মুখপাত্র কামাল নাসেরের। মোসাদ গোয়েন্দাদের বলা হল, ওরা তিনজনই রিউ ভারদুনের একই বাড়িতে বসবাস করেন। চতুর্থ ছবিটি হল আলি হাসান সালামেহ'র। কেউ জানে না তিনি কোথায় আছেন।
কমান্ডোদের বেসামরিক পোশাক পরানো হল। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বোটগুলো বৈরুতের দিকে এগুতে থাকল। যাত্রীরা উইগ পরিধান করল। এহুদ বারাক মহিলাদের পোশাক পরল। সে তার ব্রেসিয়ারের মধ্যে বিস্ফোরক চার্জার লুকিয়ে রাখল। বেশ কয়েকটি রাবারের ডিঙ্গি বৈরুতের নির্জন দ্বীপে। এইসব ডিঙ্গিতে মাদারশীপ থেকে আনীত প্যারাসুটবাহী সৈন্যরা রয়েছে। তারা বীচে ছয়টি গাড়ি দেখল। কে কোনো গাড়িতে উঠবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গাড়িগুলো নিয়ে যেখানে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের নেতাদের বাস সেখানে গেলেন।
মিলিটারী কমান্ডোদের যে বহরটি পপুলার ফ্রন্টের সদর দফতরের দিকে যাচ্ছিল তারা আক্রমণ পরিচালনার মহড়া দেশে বসেই করে গিয়েছিল। তেল আবিবের শহরতলীতে এই মহড়া হয়। এখানে রাতে ইসরাইলের চীফ অব স্টাফ ডেভিড এলাজার ঐ মহড়া দেখতে যান। সুদর্শন এক লেফটেন্যান্ট ডেভিডকে মহড়াকালে জানান, বৈরুতের সুনির্দিষ্ট ভবনটি বিধ্বস্ত করতে আমরা ৫২০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহার করব। কিন্তু ডেভিড বললেন, এত বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়। বেশি বিস্ফোরক ব্যবহারে পাশের ভবনগুলোর ক্ষতি হতে পারে। আর বহু বেসামরিক লোকের বাস এসব স্থানে। অত:পর তিনি পকেট থেকে নোট বুক বের করে লেফটেন্যান্টকে দেখালেন যে, মাত্র ৮০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহারই পপুলার ফ্রন্টের ভবন ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীতে ৮০ কিলোগ্রাম ব্যবহারের সিদ্ধান্তই বহাল হল।
প্যারাসুটারদের পপুলار ফ্রন্টের সদর দফতর দখল নিতে তাদের দুই কম্যান্ডোর জীবনহানি হল। অতঃপর তারা ঐ সদর দফতর দখলে নিয়ে ৮০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটালে ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয় এবং বহু সন্ত্রাসী নিহত হয়। কিন্তু আশপাশের কোনো ভবনের ক্ষতি হয়নি।
একই সময়ে দক্ষিণ বৈরুতের বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে আক্রমণ করে ইসরাইলি গোয়েন্দারা। এই আক্রমণের পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। তা হল সন্ত্রাসীর পাল্টা আক্রমণ চালায় কী না এমনকী লেবাননের সেনাবাহিনীও। কিন্তু কোনো তরফ থেকেই কোনো সাড়া মেলেনি।
ইতিমধ্যে সায়েরেত মাটকাল কম্যান্ডোরা রিউ ভারদুম ভবনে চলে গেছে। ঐ বাড়িতে ঢোকার সময় দুই লেবাননী পুলিশ সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তারা এক প্রেমিক যুগলকে দেখল। এই প্রেমিক যুগলের মধ্যে রোমিওর ভূমিকায় ছিল সুপরিচিত যোদ্ধা মুকী বেটজার আর প্রেমিকা জুলিয়েটের ভূমিকায় ছিল এহুদ বারাক। পুলিশ সরে গেলেই মোসাদের লোকজন কামাল আদওয়ান, কামাল নাসের এবং আবু ইউসেফের ফ্ল্যাট ভেঙে ভেতরে ঢুকল। এরা একেকজন একেক ফ্লোরে থাকতেন। ভেতরে ঢুকেই তারা তিন যোদ্ধাকে হত্যা করল। আবু ইউসেফের স্ত্রী তার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে আহত হন।
এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময়ই ইসরাইলি গোয়েন্দারা ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের নেতাদের ড্রয়ারে রক্ষিত মূল্যবান কাগজ পত্রাদি হস্তগত করে। অতঃপর তারা গাড়ি চালিয়ে বীচে চলে যায়। সেখানেই রয়েছে তাদের জন্য অপেক্ষমাণ রাবারের ডিঙ্গি। অবশ্য তিন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নেতাদের মারতে গিয়ে এক ইতালীয় মহিলাও নিহত হন।
অত:পর টাস্ক ফোর্সের লোকজন মাদারশীপে একত্রিত হয়। জাহাজটি ইসরাইলের দিকে যাচ্ছিল। আসলে এই অভিযান প্রকৃত অর্থেই সফল। পিএলও এলপি সদর দপ্তরের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের নেতারা বিশেষ করে সংস্থার কমান্ডার আবু ইউসেফও নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইসরাইলি কমান্ডোরা জানত না যে, রুয়ে ভারদুন ভবন থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরের একটি ভবনে খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন আলি হাসান সালেমেহ। পরদিন আবু ইউসুফের মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হলে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের নেতা হন আলি হাসান সালেমেহ।
নিহতদের ড্রয়ার থেকে উদ্ধারকৃত কাগজপত্র পরীক্ষা করে মোসাদ 'পাসওভার একেয়ার' সম্পর্কে অবগত হয়। মোসাদ এই রহস্য নিয়ে দু'বছর ধরে ব্যতিব্যস্ত ছিল। পাসওভার একেয়ার নিয়ে এখন দু'কথা বলি।
১৯৭১ সালের এপ্রিলে দুই সুন্দরী ফরাসি মহিলা ইসরাইলের লাড বিমানবন্দরে নামে ভুয়া পাসপোর্টে। তাদের আগমন সম্পর্কে বিমানবন্দরকে আগেই অবহিত করা হলে তাদের কাপড়-চোপড় ও আন্ডার গার্মেন্ট সার্চ করে ১২ পাউন্ড সাদা পাউডার উদ্ধার করা হয়। তাদের হাইহিলের মধ্যেও ঐ পাউডার ছিল। এই পাউডার দিয়ে শক্তিশালী প্লাস্টিক বিস্ফোরক বানানো যায়। তাদের সুটকেসে প্রচুর ডেটোনেটরও পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে দুই তরুণীই কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা জানায়, তারা দুবোন এবং তাদের বাবা মরক্কোর একজন ধনী ব্যবসায়ী। প্যারিসে এক লোক তাদের চুক্তিবদ্ধ করলে তারা এডভেঞ্চারের বশে স্মাগলিংয়ের কাজ করে।
ঐ দিন বিকেলে তেলআবিবের একটি ছোট্ট হোটেলে তল্লাশী চালিয়ে ইসরাইলি পুলিশ এক বৃদ্ধ দম্পতিকে আটক করে। পুলিশ তাদের রেডিও ট্রানজিস্টার খুলে প্রচুর পরিমাণ বিস্ফোরক আটক করলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পরের দিন আরেক ফরাসি তরুণীকে আটক করে ইসরাইলি পুলিশ। সে-ও ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে ইসরাইলে ঢুকেছে। সে যে একজন পেশাদার সন্ত্রাসী, একজন ফ্যানাটিক মার্ক্সবাদী মোসাদ তা জানত। সে বহুবার সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নিয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে এই দলটি জানায়, তারা তেলআবিবের নয়টি বিখ্যাত হোটেল পর্যটন মৌসুমে উড়িয়ে দিতে ইসরাইল ঢুকেছে। ইসরাইলিসহ ব্যাপকসংখ্যক পর্যটক হত্যা তাদের টার্গেট। ইসরাইলকে অস্থিতিশীল করাই তাদের লক্ষ্য।
এদের সকলকে জেলে পাঠানো হল। কিন্তু এদের নেপথ্যের মানুষটি হলেন মো: বউদিয়া। আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত বউদিয়া প্যারিসে থিয়েটারের পরিচালক। অনেক নারীর সঙ্গেই তার পরকীয়া বিদ্যমান।
বউদিয়া মূলত জর্জ হাবাম এবং পিএফএলপির নির্দেশনায় চলেন। পাসওভার টিম ধরা পড়ে গেলে বউদিয়া ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপে যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের প্যারিস শাখার প্রধান। মোসাদের সঙ্গে সংযুক্তির দোহাই দিয়ে প্যারিসে এক সিরিয় সাংবাদিককে তারা হত্যা করেছিল। ইউরোপে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের অভিযান পরিচালনার দায়িত্বেও বউদিয়া।
১৯৭৩ সালে মোসাদের একটি টিম বউদিয়াকে হত্যার টার্গেট নিয়ে প্যারিসে আসে। বউদিয়ার নতুন প্রেমিকার নাম-ঠিকানা মোসাদের হাতে ছিল। ঐ প্রেমিকার বাড়ির আশে-পাশে মোসাদ এজেন্ট লুকিয়ে অবস্থান নেয়। বউদিয়া প্রেমিকার কাছে আসেন বটে কিন্তু পরদিন অন্যরা কাজে বেরিয়ে গেলে বউদিয়ার কোনো পাত্তা নেই। এক মাস শেষে মোসাদ এজেন্ট উপলব্ধি করে যে, বউদিয়া প্রতিদিনই তার প্রেমিকার বাসায় আসেন এবং মহিলার সাজে অন্যদের সঙ্গে বেরিয়ে যান।
বর্তমানের যে সমস্যাটি, বউদিয়া কিছুদিন হল আর তার প্রেমিকার কাছে আসেন না। ফলে মোসাদ তাকে হারিয়ে ফেলে। তবে তাদের কাছে একটা তথ্য অবশ্য ছিল। আর তা হল বউদিয়া প্রতিদিন সকালে সাবওয়ে মেট্রো ও কানেকটিং ট্রেন ধরে মিটিং করতে যান। কিন্তু সাবওয়েতে লক্ষ মানুষ। বহুরূপী বউদিয়াকে ধরা অত সহজ নয়।
মোসাদ বউদিয়ার কয়েকশত ছবি বিলি করে গোয়েন্দাদের মধ্যে এবং সাবওয়েতেই নিয়োজিত অসংখ্য গোয়েন্দাদের মধ্যে একজন বউদিয়াকে চিহ্নিত করে ফেলে। গোয়েন্দারা সারা রাত বউদিয়ার গাড়ি অনুসরণ করে তার নতুন প্রেমিকার বাড়ি ও বউদিয়ার সন্ধান পায়। ১৯৭৩ সালের ২৯ জুন বউদিয়া নিজের গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিধ্বস্ত হয়। মারা যান বউদিয়া। ইউরোপের রিপোর্টারদের সংবাদ, মোসাদ-প্রধান জভি জামির অদূরে দাঁড়িয়ে বউদিয়ার গাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্যাবলী দেখছিলেন।
মোসাদ কর্মকর্তাদের এই সাফল্য উৎসবে রূপান্তরের সুযোগ নেই। এরি মধ্যে জরুরি খবর এল ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের বিশেষ বার্তাবাহক বেন আমান আলি হাসান সালামেইর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নরওয়ের পর্যটন কেন্দ্র লিলেহ্যামারে যাচ্ছেন।
এর কয়েকদিনের মধ্যে মোসাদ লিলেহ্যামারে পজিশন নেয়। এই শান্ত পাহাড়ী এলাকায় সালমেহরের কী ধরনের কাজ থাকতে পারে কারো মাথায় তা ঢুকছিল না। মোসাদ বেন আমানাকে সেখানাকার সুইমিং পুলে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারার আদলে এক লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখে। মোসাদ ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হয় এই লোকটিই সালামেহ। মোসাদ গোয়েন্দাদের একজন অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করে। তার বক্তব্য সালামেহ কিছুতেই নরওয়েজিয়ান ভাষা বলতে পারেন না।
মোসাদ কথিত সালামেহর সঙ্গে নরওয়ের এক নারীর যোগসাজশ প্রত্যক্ষ করে। এই কমবয়সী নারী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সালামেহকে কতল করার যাবতীয় উদ্যোগ নেয় মোসাদ। গোয়েন্দা সংখ্যা বাড়ায়। কিছু পর্যটকের মোসাদের অতিমাত্রায় তৎপরতা নজর কাড়ে। ছোট্ট শহর বলেই হয়তো। কেননা পর্যটকরা যেসব দ্রষ্টব্য স্থানে যাচ্ছে এই পর্যটকদের গন্তব্য সেই স্থানে।
১৯৭৩ সালের ২১ জুলাই কথিত সালমেহ এবং ঐ অন্তঃসত্ত্বা তরুণী সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার পথে এক নির্জন স্থানে মোসাদের কবলে পড়ে। মোসাদ কথিত সালেমেহকে চৌদ্দটি গুলি করে হত্যা করে।
তাহলে রেড প্রিন্স নিহত হলেন। মোসাদ ঘাতকসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নরওয়ে ছেড়ে গেছে। বাড়ি ও গাড়ি ভাড়া দেয়ার জন্য থেকে যাওয়া কয়েকজন গোয়েন্দা এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় গ্রেফতার হয়। এই গ্রেফতারের মাধ্যমে মোসাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। অনেক কাগজপত্র উদ্ধার করে নরওয়ের পুলিশ। ইসরাইলি দূতাবাসের এক নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গেও মোসাদের যোগসূত্র উদঘাটিত হয়।
পরদিন নরওয়ের পত্র-পত্রিকায় ইসরাইলি গোয়েন্দাদের গ্রেফতারের খবর ছাপা হলে মোসাদের মর্যাদা ও ক্রেডিবিলিটি ক্ষুণ্ণ হয়। মোসাদের আরও বেশি ক্ষতি হয় যখন পত্রিকায় ছাপা হয় যে ভুল লোককে মোসাদ হত্যা করেছে।
নরওয়েতে যাকে হত্যা করেছে মোসাদ তিনি আলি হাসান সালমেহ নন। তার নাম আহমদ বুশিকি। মরক্কোর এই ওয়েটার নরওয়েতে চাকরি খুঁজতে এসেছিল। বুশিকি এদেশে এসে নরওয়ের এক নারীকে বিয়ে করে। তার স্ত্রীই সাত মাসের ঐ অন্তঃসত্ত্বা মহিলা।
মোসাদ গোয়েন্দাদের গ্রেফতার ও বিচার নিয়ে বিশ্বমিডিয়ায় তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। বিচারে কয়েক মোসাদ গোয়েন্দাকে দীর্ঘ কারাবাস দেয়া হয়।
নরওয়ের এই বিপর্যয়ের পর মোসাদ তাদের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বাড়ি ভাড়া নেয়ার পাট চুকে যায়। অনেকের চাকরি যায় এবং সোর্সের তালিকা পরিবর্তন করা হয়। মোসাদ আহমদ বুশিকিকে হত্যার দায় স্বীকার করে তার পরিবারকে ৪ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। তবে মোসাদের মর্যাদার যে ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য অনেক অনেক বেশি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার মোসাদ-প্রধান জভি জামিরকে আলোচ্য প্রকল্পের ইতি টানার নির্দেশ দেন। এদিকে সামনে আরও বড় ঘটনা ঘটে। ৬ অক্টোবর মিসর ও সিরিয় হঠাৎ করে ইসরাইল আক্রমণ করে। শুরু হয় ইমুম কিন্তুর যুদ্ধ।
এই ঘটনার পর দু'বছর অতিক্রান্ত হয়। ১৯৭৫ সালে বিশ্বের সেরা সুন্দরীকে এক বৈরুত পরিবার সম্বর্ধনা দেয়। চার বছর আগে এই সুন্দরী মিস ইউনিভার্স হয়েছিলেন। এই গর্জিয়াস লেবানী সুন্দরী ফলশ্রুতিতে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার প্রচুর সুযোগ পান। লেবানন ফিরে এই সুন্দরী সুপার মডেল হিসেবে তার ক্যারিয়ার গড়তে যেমন সমর্থ হন তেমনি একটি ফ্যাশন বুটিকের মালিকও হন।
যাহোক ১৯৭৫ সালের ঐ পার্টিতে ঐ বিশ্ব সুন্দরী সুদর্শন, ক্যারিশমেটিক এক তরুণের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা ভালোবাসায় সিক্ত হন। এবং দু'বছর পরে ১৯৭৭ সালের ৮ জুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
আর এই সুখী বরটি হলেন আলি হাসান সালেমেহ।
১৯৭৩ সালে ব্লাক সেপ্টেম্বর সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটলে আলি হাসান সালেমেহ আরাফাতের দক্ষিণ হস্তে পরিণত হন। আরাফাত তাকে পুত্র হিসেবে দত্তক নেন। এমনও প্রচারণা ছিল একদিন তিনি আরাফাতের স্থলাভিষিক্ত হবেন। হবেন দলীয় প্রধান।
ব্লাক সেপ্টেম্বরের অবলুপ্তির পর সালামেহ ফোর্স সেভেনটিন নামের একটি গ্রুপের প্রধান হন। একবার সালামেহ আরাফাতের সফরসঙ্গী হয়ে নিউইয়র্কে যান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদানকালেও আরাফাতের কোমরে রিভলবার ছিল। আরাফাত ও সালেমেহ এক সঙ্গে মস্কো যান এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইসরাইলের আতিশয্য দেখে সিআইএ সালেমেহর প্রতি আকৃষ্ট হয়। সিআইএ রেড প্রিন্স সালেমেহ'র রক্তাক্ত অতীত আজ বিস্মৃত হতে চায়। সালেমেহ মিউনিখ ম্যাসাকারের প্রধান ব্যক্তি। খার্তুমে যে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করা হয়েছিল তারও পরিকল্পনাকারী এই সালেমেহ। যাহোক সিআইএ বিশ্বের এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে তাদের গোয়েন্দা নিয়োগ করে। আমেরিকা ভেবেছিল সালেমেহ তাদের অনুগত হবেন। সিআইএ তাকে হাজার হাজার ডলার অফার করলেও সালেমেহ একটি অফার গ্রহণ করেছিলেন। সিআইএর টাকায় সালমেহ দীর্ঘদিন হাইওয়াইতে অবকাশ যাপন করেন।
সালেমেহর জীবনধারা বদলে গিয়েছিল। তার বন্ধুরা মনে করতেন আগের মতো ঝুঁকি নেই সালেমেহর জীবনে। কিন্তু সালেমেহ ভাবতেন তার উল্টোটা। তিনি জানতেন, তাকে আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা হবে না। এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন আমাকে কেউ বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না।
ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল।
ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের বিলুপ্তির পর ইসরাইলে প্রশাসনে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বিদায় নিয়েছেন। তার উত্তরসূরী আইজাক রবীন পদত্যাগ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর মেনাচেম বেগিন। মোসাদ-প্রধান জভি জামিরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জেনারেল ইটসাক হোকি। এদিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৬ সালে এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান উগান্ডায় ছিনতাই হলে ইসরাইলের ছত্রীসেনা ও সায়েরের্ত মাটকাল এক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে সেটি উদ্ধার করে। ফাতাহর লোকজন ইসরাইলে ঢুকে একটি বেসামরিক বাস ছিনতাই করলে ৩৫ যাত্রী নিহত হয়। যদিও ফাতাহ'র লোকজন শেষতক হার মানে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেগিন কঠোর মনোভাব গ্রহণ করলে সন্ত্রাসীদের তালিকায় আবার সালেমেহ'র নাম নথিভুক্ত হয়।
ছদ্মবেশে এক মোসাদ গোয়েন্দাকে বৈরুতে পাঠানো হয়। সালেমেহ যে ক্লাবে ব্যায়াম করতেন এই গোয়েন্দাও সেই ক্লাবের সদস্য হন। একদিন এই গোয়েন্দার মুখোমুখি হন সালেমেহ। তখন তিনি ছিলেন উলঙ্গ। সিদ্ধান্ত হয় সালেমেহকে ব্যায়ামাগারে হত্যা করা সহজ হবে। আরেকপক্ষ বলল, এতে অনেক সাধারণ নাগরিকও নিহত হতে পারে।
এই সময় দৃশ্যে প্রবেশ এক ইংলিশ মহিলার। এই রহস্যময়ী সিঙ্গেল, এবং চার বছর ধরে জার্মানিতে তার বসবাস। এই মহিলা গরীব শিশুদের অনুদান দিয়ে থাকে-সমাজকর্মী হিসেবে। প্রতিবেশীরা তাকে পেনিলোপে নামে জানে। সে একবার আলি হাসান সালামেহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বলে জানা যায়। এই নিঃসঙ্গ মহিলা সাধারণ কাপড়-চোপড় পরত। রাস্তায় প্লেটে খাবার নিয়ে বিড়ালকে খাওয়াত। ছবি আঁকা তার হবি। তবে সে সব ছবি দেখে তাকে খুব বেশি নাম্বার দেয়া যাবে না।
পেনিলোপে লক্ষ্য করল দুটি গাড়ি প্রতিদিন একই সময়ে বেরিয়ে ফাতাহ সদর দফতরে যায়, দুপুরে খানিক সময়ের জন্য ফিরে আসে আবার বিকেলে একই সময়ে একই স্থানে যায়। বাইনোকুলার দিয়ে উদ্ঘাটন করা হল যে, শেভ্রোলেট গাড়িটিতে দু'জন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে পেছনের সিটে বসেন সালামেহ। ল্যান্ড রোভার গাড়িতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা থাকে এবং তাকে ফলো করে।
সুন্দরী মডেল জিয়োরজিনাকে বিয়ের পর সালামেহর জীবনধারা অনেকটা কেরানির জীবন হয়ে উঠে। সোলুব্রা এলাকায় এই দম্পতির বাস। তবে গোয়েন্দা বা নেতৃস্থানীয়রা যে প্যাটার্নে তাদের জীবন পরিচালিত করে সালেমেহ সে পথ থেকে সরে গেছেন। যেমন এক বাড়িতে এ ধরনের লোকেরা বেশি দিন বসবাস করেন না। ঘড়ি ধরে যাতায়াত করেন না।
যাহোক সালেমেহকে আটকের জন্য মোসাদ গোয়েন্দারা নানা নাম ও পরিচয়ে বৈরুতে আসা শুরু করল। এরি মধ্যে তিনটি ইসরাইলি মিসাইল বোট বৈরুত ও যৌনিয়েহ বন্দরের মাঝামাঝি বীচে অবস্থান নিল। তারা ভেজা বালুতে প্রচুর পরিমানে বিস্ফোরক রেখে গেল। মোসাদের গোয়েন্দারা যা করে, অভিযানের চূড়ান্ত হতেই কয়েকজন দেশ ছেড়ে চলে যায়। গেলও। পৌনে চারটার সময় সালেমেহ তার গাড়ি দেহরক্ষী নিয়ে ফাতাহ সদর দফতরে যথারীতি যাবেন। গাড়িটি সামান্য সামনে এগুলো মাত্র বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমাটি ফাটানো হয়। দক্ষ মোসাদ গোয়েন্দা রিমোটটি দাবিয়ে দেয়। দুই গাড়িই বোমার আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলে আলি হাসান সালেমেহসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন।
দামেস্কের একটি হোটেলে আরাফাত মিটিং করছিলেন। সালেমেহর মৃত্যু সম্বলিত টেলিগ্রামটি তার হাতে পৌঁছলে তিনি কেঁদে ফেলেন।
ঐ দিনই রাবারের একটি ডিঙ্গি যাউনিয়েহ বীচে ভিড়লে মোসাদ গোয়েন্দা কোলবার্গ ও সেই ইংলিশ রমণী লাফ দিয়ে তাতে উঠেন। তাদের মাদার শীপে পৌঁছে দেয়া হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা ইসরাইলে পৌঁছে যায়। লেবাননের পুলিশ মোসাদ গোয়েন্দাদের ভাড়া করা গাড়িটি ঐ বীচ থেকে উদ্ধার করে বটে।
পেনিলোপে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করত। পরে সে স্থায়ীভাবে ইসরাইলে চলে যায়। সে একজন ব্রিটিশ ইহুদি। যাহোক ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর দলটি সালেমেহর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্ন হলে গেল।
এরপর পেরিয়ে গেছে বহু বহু বছর। ১৯৯৬ সালের ড্যানিয়েল বেন সিমন নামের এক ইসরাইলি সাংবাদিককে তার বন্ধুরা জেরুজালেমের এক পার্টিতে দাওয়াত দিল। সেই পার্টিতে চোস্ত ইংরেজি বলতে পারদর্শী এক সুদর্শন তরুণের সঙ্গে সিমনের পরিচয় ঘটল। সে নিজেই পরিচিত হয়ে তার নাম বলল, আলি হাসান সালামেহ।
সিমন বলল, এই নামে বহু আগে একজন ছিলেন বটে। মিউনিখে ইসরাইলি এথলেটদের হত্যাকাণ্ডে তিনি পরিকল্পনাকারী ছিলেন।
সুদর্শন তরুণটি বলল, সেই ব্যক্তি আমার বাবা। মোসাদ তাকে হত্যা করেছে। তরুণটি আরও জানাল, সে তার মায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে বসবাস করছে। আরাফাতের মেহমান হয়ে এদেশে এসেছে।
সুদর্শন তরুণটি বলল, আমি বিশ্বাস করি না এমন একটা দিন আসবে সেদিন ইসরাইলি মেয়েদের সঙ্গে আমি ডান্স করতে পারব। তরুণটি ইসরাইলিদের আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করল। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনীদের দ্বন্দ্ব সে মেটাতে চায় বলেও জানাল। বলল, আমি একজন শান্তিবাদী মানুষ। শতকরা একশ ভাগ। আমার বাবা যুদ্ধাবস্থায় এখানে বাস করতেন। সেজন্য তিনি তার জীবন দিয়ে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছে। আমি আশা করি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ার প্রেরণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।