📄 ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ
এই যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা মারওয়ান প্রেসিডেন্ট সাদাতকে প্রয়োজনীয় মূল্যবান সব গোয়েন্দা তথ্য দেন। আশরাফ মারওয়ানকে সাদাত আরব দেশসমূহে তার দূত হিসেবে পাঠান। সিরিয় ও মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের সেনাদের পৃথকীকরণে মারওয়ান সক্রিয় ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও জর্ডানের বাদশা হোসেইনের মধ্যে আম্মানে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মারওয়ান উপস্থিত ছিলেন। সৈন্য পৃথকীকরণের সময় মারওয়ান বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র সংস্পর্শে আসেন। সিআইএ ব্যাকুলভাবে মিসরের পলিসি অবগত হতে একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা খুঁজছিল। কেননা আমেরিকা ইতিমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে একটা ইন্টেরিয়াম চুক্তি করে ফেলেছিল। মার্কিন সূত্র অনুযায়ী মারওয়ান ও সিআইএ'র সম্পর্ক সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য মারওয়ান বহুবার আমেরিকা সফর করেন। সিআইএ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিত। সিনিয়র পদ মর্যাদার কারণে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে তার চাহিদা কিছুটা কমে গেলে মারওয়ান ব্যবসা শুরু করেন। লন্ডনের ২৪ কার্লটন হাউজে তিনি একটা বিলাসবহুল এ্যাপার্টমেন্ট কেনেন এবং তার অগুনতি টাকা বিভিন্নভাবে লগ্নি করেন।
১৯৭৫ সালে আশরাফ মারওয়ান আরব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। মিসর, সৌদি আরব এবং উপ-সাগরীয় আমিরাতের দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য। মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা ধাচেই তাদের প্রচলিত অস্ত্রগুলো তৈরির। প্রকল্পটি ব্যর্থ হলেও ব্যবসায়ী মহলের এবং তাদের লোকদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। যাহোক, কিছুদিন পর অস্ত্র নবায়নের কোম্পানি থেকে বাদ পড়লে মারওয়ান ১৯৭৯ সালে প্যারিসে চলে যান। দু'বছর পর ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের হাতে মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত নিহত হলে মারওয়ান লন্ডনে গিয়ে বিশাল ব্যবসার মাধ্যমে মস্ত ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ব্যালোরক দ্বীপে তার মালিকানাধীন হোটেলে তিনি মোসাদের শীর্ষ গোয়েন্দা ডুবিকে দাওয়াত করেন। তাকে মারওয়ান জানান যে, গোয়েন্দাবৃত্তি থেকে তিনি অবসর নিতে চাইছেন। ওদিকে মিসরের মাটি তার জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সত্তর দশকের শেষার্ধে মারওয়ান উপলব্ধি করেন যে, মিসরের শীর্ষ পর্যায়ে ইসরাইলের সঙ্গে তার সখ্যতার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে আশরাফ মারওয়ান ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরিও ছেড়ে দিলেন।
ইতিমধ্যে সফল ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী হিসেবে চারদিকে মারওয়ানের ব্যাপক পরিচিতি। এর ফলে তিনি ভালো ভালো প্রকল্পে লগ্নি করতে সমর্থ হন। তিনি ফুটবল ক্লাব চেলসির অন্যতম অংশিদার হন। লন্ডনের বিখ্যাত এবং অভিজাত হ্যারোডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর কিনতে মনস্থ করেন। এজন্য তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় প্রিন্সেস ডায়নার প্রেমিক ডোদীর বাবা মোহাম্মদ আল ডায়েদের সঙ্গে। এদিকে তার বিলাসী জীবনের ধরন-ধারণ আরও বৃদ্ধি পেল। প্রেম, ভালোবাসা, পরকীয়া, মেয়ে পটানোতে তিনি বরাবরই পটু। এসব কাজে মারওয়ানের নাম সমার্থক হয়ে উঠে। একবার সিআইএ'র লোকজন তার নিউইয়র্ক হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করেছিল।
আশির দশকে গাদ্দাফীর আমলে বেশ কয়েকটি অস্ত্র কেনা-বেচার ডিলের সঙ্গে মারওয়ান যুক্ত ছিলেন। লেবাননে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহের ব্যবসায়ও তিনি যুক্ত ছিলেন। একবার সিআইএ'র এক এজেন্টকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেন তিনি। বারান্দা থেকে তাকে একটি ঝকঝকে রোলস রয়েস গাড়ি দেখান। আশরাফ মারওয়ান। পার্ক করা গাড়িটি গাদ্দাফী তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা আশরাফ মারওয়ানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের বিষয়টি হয়তো সত্যের অপলাপ। কেননা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক করলে, ব্যবসা করলে মোসাদ তাকে ছেড়ে দেবে না। মোসাদ তার পিছু নিলে ইসরাইলি এজেন্ট হিসেবে তার অতীত প্রকাশিত হবে। একই সাথে মোসাদ নিশ্চিত তাকে হত্যা করবে। মারওয়ান যদি লিবিয়া কিম্বা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক তৈরিই করে থাকেন তা করেছেন মোসাদের পূর্ণ সম্মতিতে।
২০০২ সালে ইসরাইলের ইতিহাস শীর্ষক পুস্তক প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। বইয়ের লেখক ইসরাইলের বিশেষ পন্ডিত আহরন ব্রেগসান। সেখানে ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধের ব্যাপারে ইসরাইলকে এক জামাতা সতর্ক করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। আর ঐ গোয়েন্দা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এঞ্জেল হলেন প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা। ব্রেগম্যান ঐ গোয়েন্দাকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন ঐ ডাবল এজেন্ট ইসরাইলকে মিথ্যা তথ্য দিতেন। ঐ বইয়ে মারওয়ানের নাম ছিল না। মারওয়ান মিসরের আল আহরাম পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রেগম্যানের গবেষণাকে একটা স্টুপিড গোয়েন্দা গল্প বলে অভিহিত করেন।
ব্রেগম্যান এতে খুবই দুঃখ পান। তিনি তার সম্মান বাঁচাতে একই পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। এই সাক্ষাৎকারে 'জামাতা' হিসেবে আশরাফ মারওয়ানের নাম উল্লেখ করেন।
অভিযোগটি গুরুতর। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু সাবেক আমান প্রধান জেনারেল জেইরা যখন মুখ খোলেন তখন ব্রেগম্যানের কথার সত্যতার প্রমাণ মেলে। জেইরা ঘোষণা দেন ঐ জামাতা ছিলেন ডাবল এজেন্ট। ইসরাইলকে তিনি বোকা বানিয়েছেন। এবং তার নাম আশরাফ মারওয়ান।
ইসরাইলের মাটিতে অতীতে কখনোই এমন ঘটনা ঘটেনি। ইসরাইল কখনোই তাদের সাবেক গুপ্তচরদের পরিচয় প্রকাশ করেনি; এমনকী সে যদি জীবিতও না থাকে। এদিকে আশরাফ মারওয়ান তো জীবিত। সাবেক মোসাদ-প্রধান জামির ত্রিশ বছর আগে অবসরে গেছেন। তিনি মারওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু এঞ্জেল জামিরের সাথে গলা মিলিয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। জামির বলেছেন, মারওয়ান হয়তো মনে করেছেন, আমি তাকে রক্ষা করতে পারব না। তবে আমি তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি সফল হইনি।
জেনারেল জেইরা যে তথ্য প্রকাশ করলেন তার কঠোর বিরোধিতা করলেন মোসাদের সাবেক প্রধান জামির। তিনি বললেন, জেইরা রাষ্ট্রের গোপনীয়তা বিনষ্ট করছেন। জেইরা পাল্টা আক্রমণ করে বললেন, মোসাদ-প্রধান জামির যাকে রক্ষা করতে চাইছেন তিনি একজন ডাবল এজেন্ট।
ইসরাইলি সাংবাদিক রোনেন মিসরের একটি টিভি অনুষ্ঠান সরাসরি দেখছিলেন। এটি ঐ সরকারের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে দেখা গেল মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসাইনী মোবারক মারওয়ানের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করছেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিক রোনেন আশরাফ মারওয়ানকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে অভিহিত করেন।
ইসরাইলে মারওয়ানের সত্যিকার পরিচিতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্কের মধ্যে মোসাদ ও আমান সত্য উদঘাটনে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করল। কিন্তু দুটি কমিটির রিপোর্টের উপসংহার ছিল একই। সেখানে বলা হল, মারওয়ান ডাবল এজেন্ট ছিলেন না এবং ইসরাইলের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু তিনি করেননি। জেনারেল জেইরা ছাড়বার পাত্র নন। তিনি সাবেক মোসাদ-প্রধান জামিরের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। একজন সাবেক বিচারপতি ঐ মামলার সালিশ নিযুক্ত হন এবং তিনি জামিরের বক্তব্যই সঠিক বলে রায় দেন।
জেইরা এবং তার সমর্থকরা কখনোই এ তথ্য আমলে নিতে চাননি যে, মারওয়ান মিসর সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা কিম্বা আনোয়ার সাদাতের একজন উপদেষ্টা। এদিকে গেড়াকলে পড়া মিসর সরকার কখনোই স্বীকার করতে চায়নি, তাদের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা একজন রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন কিম্বা ইহুদিদের হয়ে কাজ করেছেন। এটা স্বীকার করার অর্থ হল মিসরের জনগণ এতে যারপরনাই ব্যথিত হবে এবং মিসরের নেতাদের ব্যাপারে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ফলে তারা ভিন্ন এক প্রক্রিয়া গ্রহণ করল। তারা প্রকাশ্যে মারওয়ানের প্রশংসা করল কিন্তু তাকে আর সরকারের কোনো পদে কোনোক্রমেই জায়গা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
২০০৭ সালে ইসরাইলের উল্লেখিত বিচারক তার রায় প্রকাশ করলেন। ১২ জুন ইসরাইলের একটি আদালত সরকারিভাবে স্বীকার করল যে, জামিরের মাধ্যমে মারওয়ান মোসাদের হয়ে কাজ করেছেন। দুই সপ্তাহ পরে ২৭ জুন মারওয়ানের লাশ তার বারান্দার নিচে রাস্তার পাশে পাওয়া গেল।
ইসরাইলি পর্যবেক্ষকরা এই হত্যার জন্য মিসরের গোয়েন্দা বিভাগকে দায়ী করল। অনেকে জেনারেল জেইরকে দায়ী করল। তার লাগামহীন কথাবার্তা ও আচরণই মারওয়ানের মৃত্যুর কারণ। এদিকে মারওয়ানের বিধবা স্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ে তার স্বামীকে হত্যার জন্য মোসাদকে দায়ী করে বিবৃতি দিলেন। এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলল, মৃত্যুর কিছু আগে মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের চেহারার কিছু লোককে মারওয়ানের সঙ্গে বারান্দায় কথা বলতে দেখা গেছে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও মামলার তদন্ত করল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে বলল, হত্যাকারীকে খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ।
এঞ্জেলের হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা আজও হয়নি। ইচ্ছে করলে কেউ তদন্ত করে দেখতে পারেন।
📄 আমরা চাই একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান
অপহৃত ইয়োসেলিকে উদ্ধারে মোসাদ-প্রধান আইসারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। মোসাদে আইসারের স্থলাভিষিক্ত হন মেইর অমিত। তিনি এক বিশেষ ধাঁচের মানুষ। কী রকম? মেইর অমিত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কখনো কখনো কাঠখোট্টা হালকা ঝগড়াটে স্বভাবের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল। পাশাপাশি উষ্ণ স্বভাবের সোলজারস সোলজার এবং তার অনেক বন্ধু-বান্ধবও। মোশে দায়ান একবার বলেছিলেন, আমার সব বন্ধুর মধ্যে মেইর অমিতই সেরা।
মেইর অমিতের জীবন-যাপন এবং পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ পদ্ধতি মোসাদের নেতৃত্বের ধরনই পাল্টে দেয়। আগের মোসাদ-প্রধান আইসারের জন্ম রাশিয়ায়। মেইর অমিতের জন্ম ইসরাইলেই। ইসরাইল যুদ্ধে মেইর অমিত অংশ নিয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীতে যথারীতি ইউনিফর্ম পরে দীর্ঘদিন চাকরি করে তবে মোসাদে যোগদান করেন। আইসারদের জেনারেশনের ছিল নিজেকে অন্যের নজরে না আনার প্রবণতা। মুখ বন্ধ রাখা, ষড়যন্ত্র এবং অন্তরালে থাকার মানসিকতা নিয়ে তারা কাজ করতেন। কিন্তু মেইর অমিত সেনাবাহিনীর লোক। অনেক বন্ধু ও সহকর্মী তার। এবং তারা সকলেই ধারণা করতেন যে, মেইর অমিত কী করতে যাচ্ছেন। ছায়ার পেছনে লুকিয়ে থাকার মানুষ তিনি নন। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসারের মধ্যে কারিশমা ও রহস্যপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু অমিত ও তার উত্তরসুরীদের মধ্যে প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা ও কর্তৃত্বপরায়ণতা লক্ষণীয়। সামরিক বাহিনীতে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ইউনিফর্ম তাদের মধ্যে এমন গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছে।
ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধে অমিত আহত হলেও সামরিক বাহিনীতে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়ে ছিলেন। এলিট বাহিনী গোলানী ব্রিগেডের কমান্ডার অমিত সিনাই ক্যাম্পেইনের সময় অপারেশন চীফ ছিলেন। তার সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু প্যারাসুট জ্যাম্পে আহত হয়ে তাকে এক বছর হাসপাতালে কাটাতে হয়। সামান্য আরোগ্য লাভ করে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতে যান। পরে তাকে আমান বাহিনীর প্রধান করা হয়। ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে নেল গুরিয়েন তাকে আইসারের স্থলাভিষিক্ত করেন। মোসাদ-প্রধান হন মেইর অমিত।
মোসাদের প্রধান হিসেবে অমিতের প্রথম দিকের দিনগুলো খুব সহজ ছিল না। ইয়াকেভ কারুজসহ আইসারের অনেক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীই অমিতের আচরণে রুষ্ট ছিলেন। তার আকস্মিক মেজাজ দেখানো কিম্বা অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী ভঙ্গি অনেক সিনিয়রদের কাছেই ছিল বিরক্তিকর। অনেকেই চটজলদি পদত্যাগ করলেন, কয়েকজন পদত্যাগে কিছুটা সময় নিলেন। অমিতের নেতৃত্বে মোসাদে পরিবর্তন হতে থাকল। তবে মেইর অমিতের সঙ্গে আইসারের সম্পর্ক খুব বেশি খারাপ হয়ে পড়ে।
১৯৬৩ সালের বসন্তকালে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে বেন গুরিয়েন পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন তারই ঘনিষ্ঠ সহযোগী লেভী এসকোল। এসকোলের বেশ কিছু সিদ্ধান্তে তার পূর্বসূরী বিরক্ত হন। এর মধ্যে আইসারকে তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দান। গোয়েন্দা বিষয়ক দফতরে আইসারকে উপদেষ্টা করা হয়। মোসাদ থেকে চলে যাওয়ার পর আইসার ছিলেন বিরক্ত। যখন তিনি শুনলেন যে, অমিত মরক্কো সরকারকে নিয়মনীতি ভেঙে সহযোগিতা করতে যাচ্ছে তখন তিনি আর সুস্থির থাকতে পারলেন না। সোজা অমিতের অফিসে গিয়ে তার ঘাড়টা ধরেন আর কী।
অমিতের নেতৃত্বাধীন মোসাদ মরক্কোর রাজ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আইসারের কার্যকালেই মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে শুরু করে। মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের ইয়াকোভ কারুজ ও রাফি এইটান প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৬৩ সালের শীতকালে আইসার এইটানকে একটা বড় ধরনের সিদ্ধান্তের কথা অত্যন্ত গোপনীয় রাখার শর্তে প্রকাশ করেছিলেন। কথাটা হল মরক্কোর বাদশা হাসান দুই-এর আশংকা মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। হত্যা ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারণ হল বাদশাহ হাসান পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়ে উঠছেন। এখন বাদশাহ হাসান চাইছেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব মোসাদ নিক।
এই গল্প, কাহিনী বা তথ্য অভাবনীয় বা অসম্ভব মনে হতে পারে। একটি আরব দেশের বাদশাহ আজ ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্য নিতে চাইছেন? সব সময় বাস্তববাদী হিসেবে খ্যাত রাফি এইটান ও ডেভিড সমোরন নামের আরেক গোয়েন্দা গোপনে মরক্কোর রাজধানী রাবাত সফর করেন। তারা ভুয়া পাসপোর্টে সেখানে যান। একটা গোপন দরজা দিয়ে তাদের বাদশাহর প্রাসাদে ঢোকানো হয়। সেখানে তারা মরক্কোর ভয়ানক জেনারেল ওইউফকীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওইউফকীর মরক্কোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যাবতীয় নিষ্ঠুরতার জন্য সুপরিচিত। বাদশার বিরুদ্ধে গেলে ওইউফকীর তাকে বাঁচিয়ে রাখেন না। দলে দলে বিরোধী দলীয় লোক গায়েব হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে বাকি থাকে না এর পেছনে রয়েছেন ওইউফকীর। গোয়েন্দা বিষয়ক পরামর্শের ক্ষেত্রে বাদশাহ হাসান এই জেনারেলের পরামর্শকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে ইসরাইল ও মরক্কোর মধ্যে কোনো চুক্তি সম্পাদনে তার অনুমোদন লাগবে। মোসাদের এইটানের সঙ্গে বৈঠককালে জেনারেল ওইউফকীর তার ডেপুটি কর্নেল ডলিমিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
এইটান এবং ওইউফকীর একটা চুক্তিতে উপনীত হন। চুক্তিটা হল মোসাদ ও মরক্কোর গোয়েন্দা বিভাগ সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করবে এবং পরস্পর পরস্পরের দেশে স্থায়ী অফিস খুলবে। মোসাদ মরক্কোর গোয়েন্দাদের প্রশিক্ষণ দেবে এবং মরক্কো বিশ্বব্যাপী মোসাদ সদস্যদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। গোয়েন্দা তথ্যসমূহ দুই দেশ ভাগাভাগি করে নেয়ার স্বার্থে একটা বিশেষ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করবে। চুক্তিতে আরও বলা হয়, মরক্কোর বাদশার নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের মোসাদ উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবে। বাদশাহ হাসানের উপস্থিতিতে এই চুক্তিপত্রের সীলমোহর করা হয় এবং এইটান বাদশাহকে কুর্নিশ শেষে তার হাতে চুম্বন করেন।
আরব বিশ্বে মোসাদ এই প্রথম তার কোনো বন্ধু বা সুহৃদের সন্ধান পেল।
এই চুক্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে ওইউফকীর ইসরাইল যান। জেনারেল ওইউফকীর বিদেশে সবচে দামী হোটেলে থাকেন। কিন্তু ইসরাইলে গিয়ে তিনি এইটানের তেলআবিব সন্নিহিত ক্ষুদ্র তিন রুমের ফ্ল্যাটে উঠেন। জেনারেল ওইউফকীরের খাওয়া-দাওয়ার জন্য মোসাদের প্রবাদপ্রতিম বাবুর্চি ফিলিপকে পাওয়া যায়। ওইউফকীরের এই আসা-যাওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক বেশ ভালো হয়ে উঠে। ঠিক এমনি সময় ওইউফকীর মোসাদ-প্রধান মেইর অমিতের কাছে একটা স্পেশাল ফেভার চান।
মরক্কোর বাদশাহর প্রধান শত্রু ছিলেন সে দেশেরই মেহেদী বেন বারকা। তিনি আবার বিরোধী দলেরও নেতা। বাদশাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলেও দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ সমানে চলছিল। পলাতক অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মেহেদী তার জীবনের ওপর হুমকির কথা জানতেন এবং ওইউফকীর লোকজন যাতে তাকে ধরতে না পারে সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। ফলে তাকে ধরা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মোসাদ কী এখন তাকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করবে?
মেইর অমিতের লোকজন একাজে সহায়তা করেছিলেন। মোসাদ মেহেদী বেন বারকাকে ধোঁকা দিয়ে সুইজারল্যান্ডে আসতে রাজি করেছিলো। অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা বলে তাকে প্যারিসে নিয়ে আসা হয়। প্যারিসের বিখ্যাত লেফট ব্যাংক রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই ফ্রান্সের দুই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে জানা গেছে মরক্কোর মন্ত্রী ওইউফকীরের পে-রোলে ছিল ওই দুই পুলিশ অফিসার। বেন বারকাকে ওইউফকীরের হাতে হস্তান্তর করা হলে তিনি গুম হয়ে যান। কিন্তু একজন সাক্ষী বলেন যে, তিনি দেখেছেন ওইউফকীর নিজে মেহেদী বেন বারকাকে ছুরি মেরে হত্যা করেছেন। মেইর অমিত নিজেই প্রধানমন্ত্রী এসকোলকে জানান যে, লোকটিকে হত্যা করা হয়েছে।
বেন বারকার গুম হওয়ার ঘটনায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক গুজব গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট দ্যা গল এই ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ হন। যখন তিনি এই ঘটনায় মোসাদের সংশ্লিষ্টতার খবর পান তখন তিনি আরও ক্রোধান্বিত হন।
সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। মোসাদ কী করে এই ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হয়? তার জিজ্ঞাসা, মোসাদ কী করে এমন অনৈতিক ও ফৌজদারী অপরাধে নিজেদের যুক্ত করে এবং এর ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক আজ খুবই খারাপ হতে চলেছে। আইসার প্রধানমন্ত্রী এসকোলের কাছেও এ প্রশ্ন করেন এবং অবিলম্বে মেইর অমিতকে চাকরিচ্যুত করার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী এসকোল দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং বাধ্য হয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দুটি কমিটিই মেইর অমিতকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার অতঃপর পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও মেইর অমিতের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে নেমে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের সাহায্য কামনা করলেও কঠিন সামরিক সেন্সরশীপের কারণে এ ব্যাপারটি কোনো প্রচারণা পায় না।
আইসার অমিতের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকলেও বর্তমান মোসাদ-প্রধান অমিত অপর একটি অভিযান নিয়ে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছেন। আর এই অভিযানটি ইসরাইলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। অমিতের এই নতুন প্রকল্পটি হল ইরাকের কুর্দীদের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত তৈরি।
১৯৬৫ সালের শেষার্ধ্বে মেইর অমিত তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে। অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ইরাকের কুর্দী বিদ্রোহী নেতা মোল্লা মোস্তফা বারজানীর তাঁবুতে ইসরাইলি সরকারি প্রতিনিধি আস্তানা গাড়তে সক্ষম হয়েছে। মোসাদ কর্মকর্তাদের কুর্দীস্তানে অবস্থানকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের এক বিশাল সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হল। ইরাকের একটি প্রধান ফ্যাক্টর হল কুর্দীরা। এই একগুঁয়ে সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই প্রথম বারের মতো ইসরাইলের একটা যোগসূত্র সৃষ্টি হল। কুর্দীরা ইরাকী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কুর্দীরা ছাড়া ইরাকের আর দুটি ফ্যাক্টর হল শিয়া ও সুন্নীরা। বারজানীর নেতৃত্বাধীন কুর্দীরা ইরাকের অভ্যন্তরে ব্যাপক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। মোসাদ যদি কুর্দী বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে আরও শক্তিশালী করতে সমর্থ হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ইরাককে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে ইরাকের শক্তি ক্ষয় হবে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাবে। কুর্দীদের সঙ্গে এই আঁতাত ইসরাইলের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।
প্রথমে তিনজন মোসাদ গোয়েন্দা কুর্দীস্তানে তিন মাস অবস্থান করে। বারজানী তাদেরকে ইনার সার্কেলের অংশ করে নেন। বারজানি যেখানেই যেতেন তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ফলে কুর্দীদের সব গোপন তথ্যাদি মোসাদের জানা হয়ে যায়। মোসাদ ও কুর্দীদের এই সম্পর্ক বেশ ক'বছর উষ্ণ ছিল। বারজানী ও কুর্দীদের সামরিক বাহিনীর প্রধান বেশ কয়েকবার ইসরাইল সফর করেন। মেইর অমিত এবং সহকারীরা কুর্দীস্তান সফর করেন। ইসরাইল কুর্দীদের প্রচুর অস্ত্র দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে কুর্দীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে।
কুর্দীস্তান সফরকারী ইসরাইলি গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রথম সিনিয়র মোস্ট গোয়েন্দা হলেন বেনি জেভি। তার স্ত্রী গালিলা সন্তান প্রসবের লক্ষ্যে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এই দম্পতির পুত্র সন্তান নাদাভের জন্মের সময় বেনি জেভি কুর্দীস্তানের পাহাড়ে পাহাড়ে বারজানীর সঙ্গে সফর করছিলেন। এই সময় বেনি জেভির কাছে সাংকেতিক ভাষায় একটি টেলিগ্রাম পাঠান মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত। অমিতের কোড নাম রিমন। টেলিগ্রামে বলা হয় মা ও সন্তানের স্বাস্থ্য খুবই ভালো রয়েছে।
বেনি জেভির ছেলে হওয়ার সংবাদে বারজানী চারখন্ড পাথর নিয়ে তাতে নানা কথা লিখলেন। জেভিকে বললেন, আপনার ছেলের জন্য আমার এই উপহার। ছেলে বড় হয়ে যখন আমার দেশে আসতে চাইবে তাকে কেউ আটকাবে না। কুর্দীস্তানে সে জমিও পাবে।
বেশ কয়েক বছর পর অমিতের মৃত্যুতে তাকে স্মরণ করে ইসরাইলের বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ইজার ওয়েইজম্যান বলেছেন, আমরা প্রায়শই তার বাড়িতে যেতাম। প্রায়শই আমরা এক সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতাম। এরকম একদিন সকালে মেইর অমিত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মোসাদ-প্রধান হিসেবে আমি আপনার জন্য কী করতে পারি। জেনারেল ওয়েইজম্যান বললেন মেইর আমি একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চাই।
মেইর অমিত তাকে বললেন, আপনি কী পাগল হয়ে গেছেন? পশ্চিমাদের কাছে পর্যন্ত এরকম একটি যুদ্ধবিমান নেই।
প্রকৃতপক্ষে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ঐ আমলের সবচে সফিসটিকেটেড যুদ্ধবিমান। সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েকটি আরব দেশকে অবশ্য ঐ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে।
কিন্তু জেনারেল ওয়েইজম্যান নাছোড়বান্দা। অমিতের মাধ্যমে একটা মিগ তার চাইই চাই। মেইর অমিত এরকম একটি বিমান সংগ্রহে অপারেশন অফিসার বেহাভিয়া ভার্দিকে দায়িত্ব দিলেন। ভার্দি ইতিপূর্বে সিরিয় অথবা মিসর থেকে একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান গায়েবের চেষ্টা করেছেন। ভার্দি এক বছর পরে অমিতকে জানালেন যে, একাজে আমরা কয়েকমাস অতিবাহিত করেছি। মূল সমস্যা হল এরকম একটি প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করা কঠিন।
ভার্দি তার প্রত্যাশার কথা আরব দেশগুলোতে তার লোকজনের কাছে জানালেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ইরানে নিযুক্ত ইসরাইলের সামরিক এ্যাটাশে ইয়াকোভ নিমরোদি এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন পাঠালেন মোসাদে। তার চিঠির ভাষ্যমতে ইয়োসেফ সেমেশ নামে এক ইরাকী ইহুদির দাবি তিনি এমন একজন ইরাকী পাইলটকে জানেন যে, সে কাজটি পারবে। অর্থাৎ ইরাক থেকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান উড়িয়ে সে ইসরাইলে অবতরণ করাবে।
ইয়োসেফ সেমেশ বিয়ে থা করেননি। স্মার্ট, পরকীয়া করে বেড়াচ্ছেন সমানে। আবার ভোজনবিলাসী। তার একটা মস্ত গুণ স্বল্প সময়েই তিনি বন্ধু হয়ে যেতে পারেন যে কারো। এসব বন্ধুরা তাকে বিশ্বাসও করে।
নিমরোদি সেমেশ সম্পর্কে মোসাদকে আরও জানালেন যে, তার পক্ষেই এ কাজ করা সম্ভব। তাছাড়া সেমেশ তার সঙ্গে গত এক বছর ধরে কাজ করছেন।
নিমরোদি সেমেশকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ করলেন। গুপ্তচরবৃত্তির কয়েকটি ছোটখাট কাজে সেমেশকে নিয়োগ দিলেন। সেমেশ অতিশয় বুদ্ধিমত্তার জন্য পরীক্ষায় পাশও করলেন।
নিমরোদি অতঃপর তাকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান বিমান হাইজ্যাকের ব্যাপারে অগ্রসর হতে সবুজ সংকেত দিলেন।
বাগদাদে সেমেশের একজন খ্রীষ্টান রক্ষিতা ছিল। তার বোন ক্যামলে ইরাকি বিমান বাহিনীর পাইলট মুনীর রেডফাকে বিয়ে করেছেন। মুনীরও খ্রীষ্টান। সেমেশ জানতেন মুনীর হতাশায় নিমজ্জিত। মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর ক্ষেত্রে মুনীর খুব পারদর্শী হলেও তাকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। তদুপরি একটা সেকেলে মিগ সেভেনটিন বিমান দিয়ে কুর্দী এলাকায় হামলা চালাতে নির্দেশ দেয়া হল। তার মনে হল এ তার পদাবনতি এবং তার জন্য অমর্যাদাকর। সুপেরিয়ার অফিসারদের সঙ্গে এ ব্যাপারে নালিশ করেও কোনো ফল হল না। একটা পর্যায়ে সে বুঝতে পারল খ্রীষ্টান হওয়ার কারণেই তার পদোন্নতি কখনো হবে না। অর্থাৎ সে স্কোয়াড্রন লিডার হতে পারবে না। উচ্চাভিলাষী মুনীর বুঝলো এই অবস্থায় ইরাক বসবাসের কোনো মানে হয় না।
সেমেশ প্রায় এক বছর ধরে তরুণ পাইলট মুনীরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকলেন। এক পর্যায়ে মুনীরকে এথেন্সে একটা শর্ট ট্রিপে যেতে রাজি করালেন। বাকপটু সেমেশ ইরাকী কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, মুনীরের স্ত্রী দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং পশ্চিমের কোনো দেশে তার চিকিৎসা জরুরি। মুনীরের স্ত্রী প্রথমে গ্রীসে যাবে। এক্ষেত্রে তার স্বামীকে সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কেননা ঐ পরিবারে মুনীরই একমাত্র ইংরেজি জানে।
ইরাকী কর্তৃপক্ষ শর্তাধীনে মুনীর ও তার স্ত্রীকে এথেন্সে যাওয়ার অনুমতি দিল। সেখানে তাদের সঙ্গে ইসরাইলের এয়ারফোর্স অফিসার কর্নেল লিরনের যোগাযোগ হল। লিরনের জন্ম পোল্যান্ডে এবং হলোকাষ্ট থেকে যাওয়া এই অফিসার ইসরাইলি এয়ারফোর্স ইন্টেলিজেন্সের প্রধান। মোসাদ তাকে নির্দেশ দিল মুনীর রেডফার বিষয়টি দেখার জন্য। লিরন এবং মুনীর সামনা-সামনি বসে অনেকগুলো বৈঠক করলেন। লিরন পরিচয় গোপন করে নিজেকে একজন পোলিশ পাইলট হিসেবে পরিচয় দিলেন এবং কম্যুনিষ্ট বিরোধী সংস্থার কাজ করেন বলে জানালেন।
মুনীর লিরনকে তার সব দুঃখের কথা বললেন। প্রথমে তার পরিবার, ইরাকে তার জীবন, সিনিয়রদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার ঘটনা, কুর্দীস্তানে বোমা ফেলার কাজে তাকে ব্যবহার ইত্যাদি তিনি লিরনকে খুলে বললেন। কুর্দীস্তানে তার বোমা হামলায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা মারা যাচ্ছে বলে মুনীর দুঃখ প্রকাশ করলেন। এসব নাদান মানুষকে বোমা মেরে হত্যার জন্যই কী তার জন্ম। লিরনের সঙ্গে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হল মুনীর ইরাক ছাড়বেন।
মোসাদের নির্দেশ মোতাবেক লিরন মুনীরকে গ্রীসের একটি ছোট্ট দ্বীপে দাওয়াত দিলেন। মোসাদ একটা সাঙ্কেতিক নাম দিল। ইংরেজিতে যা ডায়মন্ড বাংলায় হীরকখন্ড।
গ্রীসের দ্বীপের শান্ত সমাহিত পরিবেশে মুনীর এবং লিরন আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেলেন। লিরন মুনীরকে একটি প্রশ্ন করলেন, যদি আপনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরাক ত্যাগ করেন তার পরিণতি কী হবে। মুনীর বললেন, তারা হয়তো আমাকে হত্যা করবে। এছাড়া কোনো দেশই আমাকে আশ্রয় দিতে রাজি হবে না।
এ সময় লিরন দু'বাহু বাড়িয়ে মুনীরকে বললেন, পৃথিবীতে একটা দেশই রয়েছে। যে আপনাকে আশ্রয় দেবে। লিরন তার বন্ধুর কাছে স্বীকারও করলেন, তিনি কোনো পোলিশ পাইলট নন, ইসরাইলি পাইলট। ঘানার টেবিলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।
লিরন ঐ দিনের জন্য বিদায় নিলেন। পরদিন মুনীর লিরনের প্রস্তাবে তার সম্মতির কথা জানালেন। তারা দু'জন মুনীরের দেশত্যাগ তথা স্বপক্ষ ত্যাগ নিয়ে এবং মুনীরকে কত টাকা দেয়া হবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হল।
মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীর ভালো লোক। মুনীর ইচ্ছে করলে টাকার অংক দ্বিগুণ করতে পারতেন। কিন্তু প্রথমবার প্রদত্ত প্রস্তাবেই মুনীর রাজি হয়ে গেলেন। মুনীরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হল, তার পরিবার ইসরাইলে গিয়ে তার সঙ্গে যোগদান করবে।
গ্রীসের ঐ দ্বীপ থেকে লিরন ও মুনীর উড়ে গেল রোমে। সেমেশ এবং তার রক্ষিতা বাগদাদ থেকে সেখানে এল। কয়েকদিন পর তারা ইসরাইলি বিমান বাহিনীর গবেষণা কর্মকর্তা ইয়েহুদা পোরাটের সঙ্গে বৈঠক করলেন। পোরাট মুনীরকে পুরো ব্রিফিং দিলেন। পরবর্তীতে পোরাট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন মুনীর এককথায় ভদ্র, খুবই বিবেচক। তাকে শ্রদ্ধা করা যায়। পোরাট আরও বলেন, মুনীর সাহসী। বাচাল নয়।
রোমে লিরন ও মুনীর যোগাযোগের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করলেন। উভয়ে সিদ্ধান্তে এলেন যে, ইসরাইলি রেডিও থেকে আরবি জনপ্রিয় গান বাজানো শুরু হলে মুনীর বিমান নিয়ে তার যাত্রা শুরু করবেন। এটাই তার সিগনাল। গানটি হল মারহাবা মারহাবা।
মুনীর জানতেন না, তিনি যখন রোমে মোসাদের লোকদের সঙ্গে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বৈঠক করে চলছেন, তাকে মোসাদের শীর্ষ বসরা তখন পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত বলেছেন, যে লোকটা পৃথিবীর সেরা যুদ্ধবিমানটি নিজ দেশ থেকে উড়িয়ে শত্রু দেশে নিয়ে আসবে তাকে একবার চোখে দেখা তার জন্য জরুরি। অমিত বলেছেন, তিনি রোমে উড়ে যান এবং তার লোকের সঙ্গে মুনীরের বৈঠকের সময় তিনি পাশের টেবিলেই বসা ছিলেন। যাহোক, মুনীরকে আমার যোগ্য লোকই মনে হল। আমি আমার অফিসারকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম।
মেইর অমিত হেড অন নামক তার বইয়ে ক্যাফের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায় ইহুদি প্রেমিক সেমেশ ঐ দিন স্লিপার পরেছিলেন। কেননা তার পায়ে চোট লেগেছিল। তার ভাষায়, সেমেশের বান্ধবী বা রক্ষিতা মোটা-সোটা মহিলা এবং বিন্দুমাত্র সুন্দরী নয়। আমি জানি না সেমেশ ঐ মহিলার মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছে। এদের সঙ্গে ছিলেন মুনীর-বিশাল কাধের অধিকারী কিন্তু খাটো এবং সিরিয়স চেহারার এক মানুষ। এরা কেউই বুঝতে পারেননি যে, তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে।
মুনীরকে আস্থায় নিয়ে মোসাদ-প্রধান অমিত ভাদিকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন।
লিরন ও মুনীর এথেন্সে এসে তেলআবিবের প্লেন ধরবেন। মুনীর তেলআবিবের প্লেনের বদলে কায়রোগামী প্লেনে উঠে বসেছিলেন। হতাশ লিরন ভাবলেন, তাদের সব আশা-ভরসা শেষ। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে লिरনের পাশে এসে উপস্থিত হলেন মুনীর। কায়রোগামী প্লেনের যাত্রী গণনাকালে একজন অতিরিক্ত যাত্রীর সন্ধান মেলে। সেই যাত্রীই মুনীর। টিকেট চেক করা হলে দেখা গেল মুনীরের টিকেট তেলআবিবগামী।
মুনীর ইসরাইলে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা অবস্থান করেন। সে সময় তাকে ব্যাপকভাবে ব্রিফ করা হয় এবং ইরাক থেকে কোনো পথে বিমানটি আসবে তারও নির্দেশিকা দেখানো হয়। মোসাদ অফিসে তাকে একটি গোপন কোডও দেয়া হয়। আরও কিছু কর্মসূচী শেষে তাকে জাফার ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়ানো হয়। যাতে মুনীরের মনে প্রত্যয় জাগে যে, তিনি বাড়িতেই আছেন। মুনীর পরিকল্পনা বদল করে এথেন্স হয়ে বাগদাদে ফিরে এলেন। এরপর শুরু হবে তার চূড়ান্ত পর্বের কার্যক্রম।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীরের একটি ঘটনায় তার হার্ট এ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মুনীর দেশ ত্যাগের কিছুদিন আগে তার বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ বিমানের একজন পাইলটের এহেন কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবলে গা শিউরে না উঠে পারে না। ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারত যদি তার এসব মালামাল বিক্রির হেতু জানতে চায় নির্ঘাৎ মুনীর ধরা পড়বেন। মুনীরকে গ্রেফতার করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি যাবতীয় ষড়যন্ত্রের কথা বলে দেবেন। ব্যস, কেল্লা ফতে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, মুখাভারত ঐ বেচা-বিক্রি নিয়ে কিছু জানতে পারেনি। গাধা ও কৃপন মুনীর সামান্য টাকার জন্য জীবনটাই খোয়াতে বসেছিলেন।
এরপর আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। পাইলট মুনীরের পরিবারকে কী করে ইরাকের বাইরে আনা যায়- প্রথমে লন্ডন পরে আমেরিকা। মুনীরের অনেকগুলো বোন ও ভগ্নিপতি। যুদ্ধবিমান ছিনতাইয়ের আগেই তাদেরকে ইরাক থেকে সরাতে হবে। পরিবারের কয়েকজন ইসরাইলে চলে আসতে রাজি হলেও পাইলট মুনীর কী সব হতে যাচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গও তার স্ত্রীকে ভয়ে বলেননি। স্ত্রীকে শুধু একটা কথাই বলেছেন তারা ইউরোপে যাবেন এবং সেখানে দীর্ঘদিন থাকবেন। তার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে আমস্টারডামে এলে মোসাদের লোকজন তাদের প্যারিসে নিয়ে এল। লিরন সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলেও এরা যে মোসাদের লোক মিসেস মুনীর তা ধারণা করতে পারেননি।
লিরন পরে বলেছেন, মিসেস মুনীরকে ছোট ফ্ল্যাটে একটা ডাবল বেডের বিছানার ব্যবস্থা করা হল। লিরনের ভাষায়, আমরা তার ডাবল বেডে বসলাম। ঐ দিন রাতেই পাইলট মুনীরের মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইল অভিমুখে ইরাক থেকে ভেগে আসার কথা। লিরন বলেন, এক পর্যায়ে আমি যে ইসরাইলি অফিসার সে কথা তাকে বললাম। তাকে আরও বললাম, আপনার স্বামী আগামীকাল ইসরাইলে ল্যান্ড করবেন এবং আমরা এক পর্যায়ে সেখানেই চলে যাব।
লিরন বলেন, একথায় পাইলট মুনীরের স্ত্রী বেজায় কান্না জুড়ে দেন। সারা রাত চীৎকার করে এই মহিলা কাঁদছিলেন। মিসেস মুনীর তার স্বামীকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রভৃতি বলে গালাগালি দিতে থাকেন। লিরন আবার সে কথা তার সিনিয়রদের জানিয়েও দেন। মিসেস মুনীর আরও বলেন, তার স্বামী ইরাকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার ভাইয়েরা যখনি পাবে মুনীরকে হত্যা করবে। মিসেস মুনীর এখুনি ইরাকী দূতাবাসে যেতে চাইলেন এবং তার স্বামীর কুকীর্তির কথা তাদের জানাবেন।
পাইলট মুনীরের স্ত্রী এভাবেই সারা রাত কাঁদলেন। লিরন তাকে থামাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে লিরন তাকে বললেন, স্বামীকে দেখতে চাইলে আমার সঙ্গে ইসরাইল যেতে হবে। মিসেস মুনীর বুঝলেন, তার কাছে আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। অশ্রুভেজা চোখে মিসেস মুনীর তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ইসরাইলের প্লেনে গিয়ে উঠে বসলেন।
১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই ইউরোপে মোসাদের অফিস একটা সাংকেতিক চিঠি পায় মুনীরের কাছ থেকে। মুনীর তাতে লিখেছেন, তিনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইলের পথে যাত্রার কাজ শুরু করেছেন। ১৪ আগস্ট মুনীর যাত্রা শুরু করলেও বিমানের বৈদ্যুতিক সিষ্টেমে গলদের কারণে তিনি ফিরে এসে রশীদ বিমান ঘাঁটিতে ল্যান্ড করেন।
মোসাদ-প্রধান অমিত পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মুনীরের বিমানের ত্রুটি বড় ধরনের ছিল না। মুনীর ইচ্ছে করলে উড়ে আসতে পারতেন। কিন্তু মুনীর কোনো ঝুঁকি না নিয়েই ঘাঁটিতে ফিরে যান। অমিত বলেন, এই ঘটনায় আমি কত যে পাকা চুল ছিঁড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আমার টেবিলটি পাকা চুলে ভরে গিয়েছিল।
দু'দিন পরে মুনীর আবার যুদ্ধবিমানটি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি নির্দেশিত পথেই উড়ে আসছিলেন। এক পর্যায়ে ইসরাইলি রাডারে একটি বিদেশি বিমানের এগিয়ে আসার চিহ্ন উদ্ভাসিত হল। বিমান বাহিনীর নতুন কমান্ডার জেনারেল মোরডেচাই (মোট্টি) হড সামান্য কয়েকজন পাইলটকে এই কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল মুনীরের বিমানটিকে এসকর্ট করে নির্বিঘ্নে ঘাঁটিতে নিয়ে আসা। হড ঐ ঘাঁটির সব কর্মকর্তা, কর্মচারী, পাইলট, স্কোয়াড্রনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমাদের আজ কোনো কাজ নেই। ছুটি। তবে আমার মৌখিক নির্দেশ পেলে জীবন দিতে বললে তাই করতে হবে। এবং তোমরা সবাই তো আমার কণ্ঠস্বর চেনই। ইসরাইলি ভূমিতে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে কতিপয় অতিমাত্রায় হিংসুক প্রকৃতির পাইলট যাতে শত্রু বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত না করে সে কারণেই এই ব্যবস্থা।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান এখন ইসরাইলের আকাশে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর এক দক্ষ কর্মকর্তা রান পেকারকে মুনীরকে এসকর্ট করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেয়া হল। পেকার বিমান ঘাঁটির কন্ট্রোলকে জানালেন, আমাদের মেহমান গতি কমিয়ে আনছেন। মেহমান আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইংগিত করেছেন যে, তিনি ল্যান্ড করতে চাইছেন। তিনি তার বিমানের পাখাও কাত করে দেখিয়েছেন। আর আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বিমানের পাখা কাত করে দেখানোর অর্থ হল তিনি শান্তি চান। শান্তির বার্তা নিয়ে তিনি এসেছেন।
সকাল আটটায় ইরাকী পাইলট মুনীরের বিমান ইসরাইলের বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করল। ৬৫ মিনিট সময় লেগেছে ইরাকের বাগদাদ থেকে ইসরাইলে হাটজোর বিমান ঘাঁটিতে এসে পৌঁছাতে।
১৯৬৭ সালের আগে কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ৬দিন ব্যাপী একক যুদ্ধে ইসরাইল বড় ধরনের জয় পেয়েছিল। আর এই যুদ্ধের আগেই অনৈতিকভাবে ইসরাইল একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান করায়ত্ত করেছিল। দুটি মিরেজ যুদ্ধবিমান মিগটিকে এসকর্ট করে সীমান্ত ঘাঁটি থেকে উড়িয়ে এনেছিল। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত এবং তার লোকজন এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ঐ সময় মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমানকে সোভিয়েত অস্ত্র ভান্ডারের ক্রাউন জুয়েল বলে অভিহিত করা হত। পশ্চিমা শক্তিও মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের ভয়ে সর্বদা কাঁপত। সেই মিগটি আজ ইসরাইলের দখলে।
ইরাকী পাইলট মুনীর ইসরাইলের ঘাঁটিতে নিরাপদ অবতরণের পরেও বিভ্রান্ত ও হতচকিত ছিলেন। মুনীরকে হাটজোর ঘাঁটির কমান্ডারের বাসায় নেয়া হয়। এখানে সিনিয়র অফিসাররা তার সম্মানে পার্টির আয়োজন করেন।
মুনীর পার্টির বহর দেখে বিস্মিত। প্রথমে তার মনে হয়েছিল অন্য কারো বিয়ের পার্টিতে ভুল করে তিনি ঢুকে পড়েছেন। মেইর অমিত বলেছেন, মুনীর পার্টির এক কোনে জড়সড় ও শান্ত হয়ে বসেছিলেন।
কিছুটা বিশ্রাম শেষে মুনীরকে জানান হল তার স্ত্রী ও শিশুরা বিমানে করে ইসরাইলে আসছে। মুনীরকে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া হল। সাংবাদিক সম্মেলনে পাইলট মুনীর ইরাকে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের কথা বলেন। দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে মুনীর তার ওপর অবিচারের কথা বলেন এবং কুর্দীদের ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণের প্রতিবাদ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে মুনীরকে তেলআবিব সন্নিহিত সমুদ্র তীরবর্তী হারজলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে তার পরিবার অবস্থান করছে।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত লিখেছেন, পাইলট মুনীরকে স্বাভাবিক ও শান্ত করতে আমরা সবধরনের পদক্ষেপ নেই। আমরা তাকে নানাভাবে উজ্জীবিত করি এবং বড় একটা সফল অভিযানের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। মেইর অমিত আরও লিখেছেন, আমার যত ক্ষমতা রয়েছে তা ব্যবহারের মাধ্যমে মুনীর এবং তার পরিবারের কল্যাণ করা হবে বলে আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে। কেননা মুনীরের পরিবার যে একটা সমস্যা সংকুল পরিবার তা আমি জানতাম।
এর কিছুদিনের মধ্যেই মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইসরাইলে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন সেই বিখ্যাত সেমেশ এবং তার বান্ধবী ক্যামিল্লে। মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইরাকী সেনাবাহিনীর অফিসার। ঐ অফিসারটি রাগে গজগজ করছিলেন। সামনা-সামনি হতেই তিনি মুনীরের মাথায় ঘুষি মারেন। ঐ অফিসার বলেন, তার বোন গুরুতর অসুস্থ বিধায় তাকে ইউরোপ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর আজ তিনি তাকে ইসরাইলের মাটিতে দেখে বিস্মিত। ইরাকী অফিসার মুনিরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আক্রমণের এক পর্যায়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তার বোন অর্থাৎ মুনীরের স্ত্রীকেও ভৎসনা করেন। সে কেন সবকিছু জেনেও তাদের জানাল না। মুনীরের স্ত্রী ভাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। কয়েকদিন পর মুনীরের ঐ আত্মীয় ইরাকী সামরিক অফিসার ইসরাইল ত্যাগ করেন।
জালিয়াতি করে ইরাক থেকে আনীত মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর জন্য প্রথম মনোনীত হন ড্যানি সাপিরা। ড্যানিও ইসরাইলি বিমান বাহিনীর পাইলট এবং তাকে সেরা টেষ্ট পাইলট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোট্রি হড তাকে ডেকে বললেন, তুমি প্রথম পশ্চিমা পাইলট হিসেবে মিগটি নিয়ে আকাশে উড়বে। যত খুশী, যত ঘণ্টা খুশী উড়তে থাক এবং এর ভালো-মন্দ দিকগুলো আমাদের জানাও।
ড্যানি পরবর্তীতে বলেছেন, মুনীর আমাকে প্লেনের কোথায় কোনো সুইচ তা দেখিয়ে দেন। সব কমান্ডই আরবি ও রুশ ভাষায় লেখা ছিল। যাহোক এক ঘণ্টার মাথায় আমি মুনীরকে বললাম, এখন মিগটি চালাব। একথা শুনে মুনীর বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন, এখনো তো আপনার কোর্স শেষ হয়নি। আমি তাকে বললাম, আমি একজন টেষ্ট পাইলট। একথা শোনার পরও মুনীরকে খুব চিন্তাযুক্ত মনে হল। তিনি ককপিটে আমার পাশে বসারও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু তার প্রয়োজন নেই বলে তাকে আমি আশ্বস্ত করলাম।
ইসরাইলের বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জেনারেল ওয়েজম্যানকে মনে আছে? তিনিই প্রথম মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ইসরাইলের হস্তগত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পাইলট সাপিরা অতীতের সেই ঘটনা স্মরণ করে বললেন, জেনারেল ওয়েজম্যান আমার কাছে এসে আমাকে বাহবা দিলেন। তারপর বললেন, তুমি আবার কোনো চালাকি কর না। মিগটি নিয়ে আবার ফিরে এস। সাপিরা আরও বলেছেন, বিমানটি চালিয়ে ফিরে আসার পর পাইলট মুনীরও আমাকে বাহবা দেন। তিনি আমাকে যখন জড়িয়ে ধরেন তখন তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। তিনি আরও বললেন, ইসরাইলি বাহিনীতে আমার মতো পাইলট থাকলে আরবরা কিছুই করতে পারবে না।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ব্যাপকভাবে চালানো ও পরীক্ষার পর ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা বুঝলেন, কেন পশ্চিমারা এরকম একটি বিমান পাওয়ার জন্য ব্যাগ্র। এর বিস্ময়কর বিশেষত্ব হল এটি দ্রুতগতি সম্পন্ন, ওড়ে আংশিক উঁচু দিয়ে এবং ইসরাইলি মিরেজ দুই ও ফরাসি যুদ্ধ বিমানের চেয়ে ওজন এক টন কম।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান আকাশে ওড়ানোর মাধ্যমে ইসরাইল আবার বিশ্বের গণমাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাল। মার্কিনীরা বিস্মিত। কয়েকদিন পরে মার্কিন একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল বিমানটি পরীক্ষা এবং আকাশে উড্ডয়ন করে। মার্কিনীদের মিগের কাছে যাওয়ার আগে ইসরাইল একটা শর্ত দেয়। আর তা হল সোভিয়েত এয়ারক্রাফট ক্ষেপণাস্ত্র সাম-২ এর কাগজপত্রের কপি আগে তাদেরকে মার্কিনীদের দিতে হবে। আমেরিকানরা অবশেষে রাজি হয়। মার্কিন পাইলট ইসরাইলে আসেন, আতিপাতি করে পরীক্ষা করেন এবং সেটি চালিয়ে দেখেন।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের গোপন রহস্য ও শক্তি উদঘাটনের মাধ্যমে আরবদের বিরুদ্ধে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালের জুনে। মিগটি পাওয়া গিয়েছিল এর দশ মাস আগে। আর ঐ যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সফল পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল মিগ টুয়েন্টি ওয়ান। উল্লেখ্য, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরাইল আলোচ্য মিগের সাহায্যে মিসরের বিমান বাহিনীকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিল। বাকি পাঁচটি দেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের মাধ্যমে ব্যাপক জয়লাভের প্রেক্ষাপটে ইরাকী পাইলট মুনীর ও তার পরিবারকে ইসরাইল প্রভূত আর্থিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু ইসরাইলে আসার পর মুনীরের জীবন বিষাদময় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
মোসাদের একজন সিনিয়রের ভাষায়, একজন এজেন্টের জন্য দেশের বাইরে নতুন জীবন শুরু অলমোস্ট ইমপসিবল। মুনীর দিনে দিনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তার পরিবারও ভোগান্তিতে পড়ে। আর পুরো পরিবারের কাঠামোই ভেঙে পড়ে।
তিন বছর পরেও মুনীর ইসরাইলকে তার নিজ দেশ ভাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ডাকোটার বিমানে করে ইসরাইলি তেল সিনাই পৌঁছে দেয়ার কাজও তিনি নিয়েছিলেন। তার পরিবার ইরানি শরণার্থী হিসেবে তেলআবিবেই বসবাস করছিল। কিন্তু মুনীরের স্ত্রী নিষ্ঠাবর্তী ক্যাথোলিক হিসেবে বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছিলেন। বলতে গেলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন তিনি। ইসরাইলে তিনি কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন না। পরবর্তীতে জাল পরিচয়ে তারা পশ্চিমা দেশে চলে যান। আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত তাদের ঠিকানা দেয়া হয়নি। যদিও তাদেরকে প্রভূত নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। তবুও তারা সব সময় ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারতের ভয়ে তটস্থ থাকতেন।
ঘটনার ২২ বছর পর ১৯৮৮ সালের আগস্টে নিজ বাড়িতেই আকস্মিক হার্ট এ্যাটাকে ইরাকী পাইলট মুনীর মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মুনীরের স্ত্রী মেইর অমিতকে ফোন করেন। অমিত আর তখন মোসাদের প্রধান নন। মুনীরের স্ত্রী জানান, তার স্বামীর মৃত্যুর সময় তার এক ছেলে পাশেই দাঁড়ানো ছিল। সকাল বেলা তার স্বামী তাদের বাড়ির তিন তলা থেকে নামার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান।
মুনীরের মৃত্যুর পর মোসাদ এক শোকসভার আয়োজন করে। শোকসভায় সিনিয়র কর্মকর্তারা কেঁদে ফেলেন। লিরন বলেন, ইরাকী এক পাইলটের জন্য ইসরাইলের মোসাদ বাহিনী আজ কাঁদছে।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান অধিগত হওয়া ও ছয় আরব দেশের বিরুদ্ধে ইসরাইলের একক যুদ্ধে জয়লাভের পর মোসাদ-প্রধান অমিত আরও উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ল্যাভন এফেয়ার্সের আদলে তিনি ইসরাইলের কয়েকজন বন্দীকে দেশে আনার পরিকল্পনা করেন। তরুণ ল্যাভন ১৩ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জেলে পচছিল। তার মুক্তি কিম্বা ক্ষমা প্রাপ্তির কোনো আশাই ছিল না।
আরব দেশের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরাইল ছিল মিসরের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে। ঐ যুদ্ধে মিসরের ৪ হাজার ৩৩৮ জন মিসরীয় সৈন্য ইসরাইলের হাতে বন্দী ছিল। ৮৩০ জন বেসমারিক মিসরীয় নাগরিকও বন্দী ছিল। ওদিকে মাত্র ১১জন ইসরাইলি সৈন্য মিসরের হাতে বন্দী ছিল। এক্ষেত্রে অমিত লেভন ফর্মুলায় তাদেরকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিলে মিসর দৃঢ়তার সঙ্গে তার বিরোধিতা করে।
কিন্তু মেইর অমিত ছিলেন নাছোড়বান্দা। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান অমিতের ভালো বন্ধু। তিনিও অমিতকে বললেন, মিসরীয়রা কখনোই তাদের মুক্তি দেবে না। প্রধানমন্ত্রী এসকোলেরও অনুরূপ অভিমত। অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরকে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিঠি লিখলেন। এবং বন্দীদের মুক্তি দাবি করলেন।
অমিত সিরিয়য় বন্দী ইসরাইলি মোসাদের জন্যও কাজ শুরু করলেন।
লেবাননে বন্দী মিসেস সুলা কোহেনকে মুক্ত করতে তিনি সিরিয়র সহযোগিতা চাইলেন। সুলার কোড নাম পার্ল। তিনি মোসাদের একজন প্রবাদ প্রতিম গোয়েন্দা। একজন সামান্য গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও সিরিয় ও লেবাননের বিখ্যাত নেতা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ব্যাপক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল। তিনি ইসরাইলের একটা গোয়েন্দা চক্র সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। তার বড় ধরনের একটা সাফল্য হল সিরিয় ও লেবাননের কয়েক হাজার ইহুদিকে তিনি চোরাগুপ্তা পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মেইর অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরের কাছে যে আবেদন করেছিলেন তা কাজে এসেছিল। সিরিয়ও কিছু দিনের মাথায় অনুরূপ আবেদনে সাড়া দিলে অমিতের জয় হয়। লুভন ফর্মূলা প্রয়োগ করে অমিত লুটজ, সুলা কোহেনকে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
বিদেশে থাকা বন্দীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সাফল্য লাভ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং অবশ্যই বড় ধরনের অভিযান।
📄 ইরাকে ফাঁসির মঞ্চে ইসরাইলি গোয়েন্দা
ইসার বেরী 'বিগ ইসার' নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি বেশ লম্বা, তবে চুল তেমন নেই এবং তা সাদা কালো। তার কালো ভ্রূ কোটরাগত চোখ দুটিকে ঢেকে রাখে। তার তিক্ত বা ঘৃণাপূর্ণ হাসি প্রায়শই তার পাতলা ঠোঁটে খেলা করে। পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ইসার বেরী আবার যেমন সৌন্দর্য প্রিয়, তেমনি তার ইন্টেরগ্রেটিও ত্রুটিমুক্ত। তার প্রতিপক্ষের ভাষ্য, লোকটি এককথায় ভয়ংকর। হাগানার দীর্ঘদিনের সদস্য ইসার বেরী হাইফার একটি প্রাইভেট কনস্ট্রাকশন কোম্পানির পরিচালক ছিলেন। অসামাজিক, নিঃসঙ্গ এবং চুপচাপ স্বভাবের ইসার বেরী স্ত্রী, ছেলেকে নিয়ে চারদিক খোলা একটা বাড়িতে বসবাস করতেন। বাট গালিমের একটি উপকূলীয় এলাকায় তার বাড়িটি অবস্থিত।
ইসরাইল রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পূর্বে হাগানার কমান্ডাররা তাকে সাই-এর প্রধান পদে নিয়োগ দেন। ইসরাইল ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই চারদিকের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলকে আক্রমণ করে। এই সময় সদ্য স্বাধীন ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান পদে নিয়োগ লাভ করেন। তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত বামপন্থীদের সংগঠনে তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন। তার বন্ধুরা ইসরাইলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইসার বেরীর উৎসর্গিত মনোভাবের খুব প্রশংসা করতেন। তবে সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান হওয়ার পর বেরীর কার্যকালে একের পর এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটতে শুরু করে।
মাউন্ট কারবেলে এক দম্পতি ভয়াবহ একটি ঘটনা উদঘাটন করে। এই দম্পতি পাহাড়ের পাদদেশে অর্ধদগ্ধ লাশ দেখতে পায়। লাশের শরীরটি গুলিতে ঝাঝরা হয়ে ছিল। পরে তার নাম জানা যায় আলি কাসেম। কাসেম আরব দেশগুলোকে নানা তথ্যাদি সরবরাহ করতেন। প্রথমে আততায়ীরা তাকে গুলি করে অতঃপর পুড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়নের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ পরে এক গোপন বৈঠকে আইসার প্রধানমন্ত্রীরই দলের লোক আব্বা হুশিকে একটি ঘটনায় অভিযুক্ত করেন। আব্বা হুশি ছিলেন মাপাই দলের প্রভাবশালী নেতা। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ আনে ইসার বেরী। প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন একথা শুনে স্তম্ভিত। ফিলিস্তিনিদের শাসক ছিল ব্রিটিশরা। ইসরাইলের রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ইহুদি নেতৃত্বের মধ্যে তাদের চর হিসেবে নিয়োগদানের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, হাইফার শ্রমিকদের মধ্যে ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে পরিচিত।
ইহুদি সম্প্রদায়ের একটা স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত আব্বা হুশি কী করে একজন রাষ্ট্রদ্রোহী হন? এটা যে অবিশ্বাস্য। প্রথমে ইসরাইলের নেতারা ক্রোধ ভরে বেরীর এই অভিযোগ বাতিল করে দেন। কিন্তু আব্বা হুশির কাছে পাঠানো ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দুটি টেলিগ্রাম হস্তগত হয় বেরীর। সে দুটি টেলিগ্রাম তিনি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে জমা দেন। আব্বা হুশির বিশ্বাসঘাতকতার আর কোনো প্রমাণের দরকার আছে কী!
বেরী এ সময় হুশির বন্ধু জুলেস আমস্টারকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। শহর থেকে কিছুটা দূরে লবণের গুদামে জুলেসকে ৭৬ দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তার ওপর এই বলে চাপ প্রয়োগ করা হয় যে, আব্বা হুশি যে একজন ঘৃণিত রাষ্ট্রদ্রোহী একথা সে বলুক। জুলেস হার মানতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। মুক্ত অবস্থায় সে একজন বিধ্বস্ত মানুষে পরিণত হয়। তার দাঁত বলতে কিছুই ছিল না। তার পা ছিল আঘাতে আঘাতে ছিন্ন। জুলেস বহু বছর এই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
১৯৪৮ সালের ৩০ জুন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মেয়ার টুবিয়ানস্কিকে গ্রেফতার করা হয়। সামরিক গোয়েন্দাদের অভিযোগ টুবিয়ানস্কি সামরিক বাহিনীর গোপনীয় তথ্যাদি এক ব্রিটিশ নাগরিককে সরবরাহ করে। ঐ ব্রিটিশ আবার এসব তথ্য জর্ডান সেনাবাহিনীর কাছে পাচার করে।
জর্ডান সামরিক বাহিনী ঐ তথ্যের ভিত্তিতে কৌশলগত এলাকায় বোমাবর্ষণ করলে ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আধা ঘণ্টারও কম সময়ে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে জড়ো হওয়া কিছু লোকও স্তম্ভিত; ইসরাইলি সৈন্যদের সামনেই টুবিয়ানস্কিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়।
উপরোক্ত দুটি ঘটনায় তদন্তকারীরা বেরীকে দোষী সাব্যস্ত করে। বেরী মনে করেছিল আলি কাসেম ডাবল এজেন্ট। এ কারণেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
যাহোক এভাবে বেরীর অনেক দোষ বেরুতে থাকে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করেন। বেরীর প্রথমে সামরিক আদালতে পরে বেসামরিক আদালতে বিচার হয়। তার র্যাঙ্ক নামিয়ে দেয়া হয়। অসম্মানজনকভাবে আইডিএফ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। আলি কাসেম ও ক্যাপ্টেন টুবিয়ানস্কির মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়। কুখ্যাত কেজিবির আদলে গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালিত হতে দেখে ইসরাইলের নেতারা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।
বেরীকে অপসারণের পর তার স্থলাভিষিক্ত হন রেউভেন শিলোয়াহ। তিনি বেরীর বিপরীত মেরুর লোক। সিআলাহর বয়স ৪০। মৃদুভাষী ও রহস্যঘেরা একজন মানুষ। সমৃদ্ধ কালচার্ড ফ্যামিলি থেকে তার আগমন। পর্যবেক্ষণী ক্ষমতা তার ঈর্ষণীয়। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে বিশেষ করে গোত্রগুলোর ঐতিহ্য, শত্রুতা এবং রক্তের ঋণ নিয়ে বিবাদ-বিসম্বাদ তার নখদর্পণে। শিলোয়াহ'র এক ভক্ত শিলোয়াহকে প্রধানমন্ত্রীর দাবা কোর্টের রানি বলে উল্লেখ করেন। রানির ক্ষমতা তো অপরিসীম। অবশ্য শিলোয়াহ যখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন তখন তাকে অনেক কিছুই সামলাতে হয়েছে। এভাবে তার সম্পর্কে অনেকেই ভালো ভালো বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। শিলোয়াহ সারাজীবনই খুব এ্যাকটিভ। সে সিক্রেট মিশনে হোক কিম্বা অন্য জটিল কোনো ক্ষেত্রে।
ইহুদিদের এক ধর্মযাজক বা ধর্মগুরুর ছেলে শিলোয়াহর জন্ম পুরনো জেরুজালেমে। ইসরাইলের জন্মের আগেই শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ছদ্মবেশে তিনি ইরাকে কাটিয়েছেন সে দেশের রাজনীতি অনুধাবনের জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে দেন-দরবার করে একটি ইহুদি কম্যান্ডো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদ্দেশ্য নাকি অধিকৃত ইউরোপে তাদের অভিযান ব্যর্থ করে দেয়া। তিনি এভাবে দুটি বিশেষ ইহুদি কম্যান্ডো বাহিনী গঠন করেন। এর মধ্যে একটি ছিল জার্মান অস্ত্রশস্ত্র ও তাদের ইউনিফর্মধারী জার্মান ব্যাটেলিয়ান। এই ইউনিট ইউরোপে শত্রুর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে। আরেকটি ছিল আরব ব্যাটালিয়ান। এই ইউনিটের সকলেই আরবি ভাষায় কথা বলত, আরবদের পোশাক পরত। আরব দেশসমূহের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের অভিযান পরিচালনারও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। শিলোয়াহ প্রথম ব্যক্তি যিনি স্ট্রাটেজিক সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হন। এটিই সিআই-এর পূর্ববর্তী নাম। ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিলোয়াহ প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজধানী গোপনে সফর করেন। আরব সেনাবাহিনীগুলো তাদের দেশে আগ্রাসন চালাবে সেই তথ্য নিয়ে তিনি ফিরে আসেন।
শিলোয়াহ অত্যন্ত গোপনীয় ভাবে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতেন। ফলে অগণিত সোর্স যেমন তার ছিল তেমনি গোপন তথ্যের ভান্ডার ছিল তার নখদর্পণে। শিলোয়াহর এক বন্ধু একটা জোক বলেছিলেন। আহৃত ট্যাক্সি ড্রাইভার শিলোয়াহকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন। শিলোয়াহ তাকে বললেন, বলা যাবে না। এটা স্টেট সিক্রেট।
ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিলোয়াহ বৈদেশিক রাজনৈতিক ইনফরমেশন বিভাগের প্রধান ছিলেন। একাধিক প্রায় বিচার বিভাগীয় স্বাধীন গোয়েন্দা গ্রুপ ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়েন দেশের গোয়েন্দাবৃত্তিকে একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ইনষ্টিটিউট গড়ার নির্দেশ জারি করেন। এই ইনষ্টিটিউটের হিব্রু নাম 'মোসাদ'। রেডভেন শিলোয়াহ মোসাদ-এর প্রথম প্রধান নিযুক্ত হন।
প্রকৃতপক্ষে মোসাদ প্রতিষ্ঠা আরও দু'বছর বিলম্বিত হয়। গোয়েন্দাদের একটি ইউনিয়নের কাজ ছিল বিদেশে অবস্থান করে কার্য পরিচালনা। এটিকে পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট বলা হত। এই বিভাগের লোকজন প্রচুর খরচ যেমন করতে পারত বিদেশে তাদের জীবন-যাপনও ছিল রাজকীয়। মোসাদ গঠনের প্রতিক্রিয়ায় তারা বিদ্রোহ করল। তারা ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি করতে অস্বীকৃতি জানাল। তাদের ইউনিটের বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এই হল ক্ষোভের কারণ। অবস্থা এমন দাঁড়াল, তাদের চাকরিচ্যুত না করলে এবং প্রায় নির্যাতনের মুখোমুখি করা না গেলে শিলোয়াহ'র পক্ষে মোসাদ গঠন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শিলোয়াহ'র দর্শন ছিল, মোসাদ শুধুমাত্র ইসরাইলের স্বার্থই দেখবে না। বিশ্বে যত ইহুদি রয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল মোসাদ। প্রথম নিয়োগ পরীক্ষাকালে মোসাদ-প্রধান শিলোয়াহ স্পষ্টই তার বক্তৃতায় বলেন, যাবতীয় গোয়েন্দাগিরির পাশাপাশি আমাদের আরও একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। আর তা হল ইহুদি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা। তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদেরকে ইসরাইলের স্থায়ী বাসিন্দা করার উদ্যোগ নিতে হবে। উল্লেখ্য, পরবর্তী কয়েক বছরে দেখা গেছে মোসাদ এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বহু দেশে ইহুদিরা অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে ছিল। তাদের আত্মরক্ষার জন্য মোসাদ গোপনে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক, বাগদাদসহ দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশের ইহুদিরা যারপরনাই কষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করত।
মিলিট্যান্ট ইহুদিদের তাদের অজান্তেই ইসরাইলে ফিরিয়ে এনে প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনী ও মোসাদে ভর্তি করা হল। শত্রু দেশকে অস্থিতিশীল করতে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করা হল। বিদেশে অবস্থানরত ইহুদিদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় সংগঠিত করা হল। বিদেশে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় বিশেষ করে দাঙ্গাকারী কিম্বা অনিয়মিত গ্রুপের হামলা প্রতিরোধে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা হল। কেননা সরকারের সাহায্য না আসা পর্যন্ত কিম্বা বিদেশি সাহায্য সংস্থার হস্তক্ষেপ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করল মোসাদ।
পঞ্চাশের দশকে আরবদেশসমূহ ও মরক্কো থেকে মোসাদ দশ হাজারের অধিক দূর্দশায় পতিত ইহুদিকে ইসরাইলে ফেরত নিয়ে এসেছে। একইভাবে আশির দশকে খোমেনীর ইরানে আটকাপড়া বহু ইহুদিকে মোসাদ ইসরাইলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। কিন্তু মোসাদের প্রথম গোয়েন্দাগিরি ইরাকে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল।
ইরাকের রশীদ স্ট্রীটের বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে আসাদ নামের এক লোকের একটা টাইয়ের দোকান ছিল। সে একজন ফিলিস্তিনী শরণার্থী। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক রাত্রে তাদের বাড়িঘর দখল করে নিলে সে দেশ ত্যাগ করে। ইসরাইল ত্যাগ করার কিছুদিন আগে সে তার অসুস্থ এক কাজিনের জন্য অনেকের সাহায্য কামনা করে। তার অসুস্থ কাজিনকে সামরিক গভর্নরের কম্পাউন্ডের কাছাকাছি অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ দেয়। এক সপ্তাহের কাছাকাছি সময়ে আসাদ মিলিটারী গভর্নরের ভবনের বারান্দা দিয়ে হাঁটছিল। তার হাতে ছিল পিতলের অলঙ্কৃত ট্রে। ট্রেতে করে বেশ কয়েক কাপ কড়া টার্কিশ কফি সে ইসরাইলি আর্মি অফিসারদের মধ্যে পরিবেশন করছিল। এই তরুণ অফিসারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন তার মুখ চেনা।
১৯৫১ সালের ২২ মে সে লক্ষ্য করল তার টাইয়ের দোকানের কাছাকাছি যারা ঘুরছে তাদের মধ্যকার একটি মুখ তার খুব চেনা। প্রথমে ভেবেছিল সে ভুল দেখেছে। কিন্তু যে মানুষটিকে সে দেখেছে তাকে এই পোশাকে সে কখনো দেখেনি। এখন এই লোকটির গায়ে গরম কালের পোশাক। কিন্তু আসাদ তাকে দেখেছে খাকি ইউনিফর্মে। আসাদ পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পুলিশকে সে বলে, আমি এখনই বাগদাদে একজন ইসরাইলি আর্মি অফিসারকে দেখেছি। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় চেহারায় ঐ লোকটিকে গ্রেফতার করে। ঐ লোকের সঙ্গে ছিল ইরাকী এক ইহুদি। তার নাম নিসিম মোশে। সে পুলিশকে জানায়, ইহুদিদের স্থানীয় কম্যুনিটি সেন্টারে সে ছোট্ট একটা চাকরি করে। সে ব্যাখ্যা করে বলে, গ্রেফতারকৃত পর্যটকের সঙ্গে একটা কনসার্টে গতকালই তার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। সেই বাগদাদের দোকানপাট আমাকে ঘুরে দেখাতে অনুরোধ করে।
বাগদাদের পুলিশ সদর দফতরে ওদের দু'জনকে নেয়া হলে এক পর্যায়ে আলাদা করে ফেলা হয়। ইরাকী গোয়েন্দারা মোশেকে নির্যাতনপূর্বক ইসরাইলি লোকটি সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু মোশে অনড়। সে এক কথাই বলে যাচ্ছে; গতকালই ঐ ইসরাইলির সঙ্গে প্রথম আলাপ। পুলিশ সদর দফতরের গোপন নির্দেশে মোশেকে নির্যাতন করে প্রায় মেরে ফেলার উপক্রম করে। এমনকী তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু বন্দীর এক কথা। সে কিছু জানে না। এক সপ্তাহ ধরে প্রচন্ড মারধরের পরও কোনো কথা আদায় করতে না পেরে ইরাক সরকার তাকে মুক্তি দেয়।
অপর বন্দীরও একই কথা। তার নাম ইসমাইল সালহুন। সে ইরানি। সে প্রশাসনকে তার ইরানি পাসপোর্ট দেখায়। তারপরও অবশ্য নির্যাতন থামে না। তাকে নিয়ে সমস্যা হল সে দেখতে ইরানিদের মতো নয়।
ফারসী শব্দ সে বিন্দুমাত্র জানে না। অবশেষে শেষোক্ত বন্দীর সঙ্গে টাই বিক্রেতা আসাদকে মুখোমুখি করা হয়। আসাদকে দেখামাত্র আমার রক্ত হিমশীতল হয়ে পড়েছিল বলে দ্বিতীয় বন্দী পরে জানায়। দ্বিতীয় বন্দী ভেঙে পড়ে এবং স্বীকারোক্তি দেয়।
স্বীকারোক্তিতে সে তার নাম বলে ইয়েহুদী ট্যাগার। আইডিএফের একজন ক্যাপ্টেন। অবশ্যই ইসরাইলি নাগরিক। ইরাকী গোয়েন্দারা ট্যাগারের বাড়ি তছনছ করে। দেয়াল ফুটো করে। দেয়াল ভাঙ্গার পর গুপ্তভান্ডারে বহু ডকুমেন্ট পায়।
শুরু হয় প্রচন্ড আতঙ্কের। ট্যাগারই শুধু আতঙ্কগ্রস্ত নয়, বাগদাদের পুরো ইহুদি সম্প্রদায় অজানা আতঙ্কে কাঁপতে থাকে।
বেশ কিছু লুকিয়ে থাকা ইহুদি এবং বাগদাদে পরিচালিত ইসরাইলি সংগঠন ইরাকীদের তোপের মুখে পড়ে। অবৈধ ইমিগ্রেশন ইউনিট, আত্মরক্ষায় নিয়োজিত একটি গ্রুপ এবং জায়নবাদী বেশ কিছু তরুণ ইরাকীদের রোষানলে পড়ে। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে গঠিত সংগঠনগুলোর মধ্যেও ভয়, ত্রাস।
প্রকৃতপক্ষে ইরাকের রাজধানী বাগদাদকে ঘিরে ইসরাইলিদের বহু অস্ত্র ভান্ডার ও দলিল ডকুমেন্ট গুপ্ত ভান্ডারে রক্ষিত ছিল। কিছু ইহুদিদের ধর্মস্থান মাসুদা সেমটভে। প্রকৃতপক্ষে ইরাকের ঘোরতর শত্রু হল ইসরাইল। ফলে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইরাকে অবস্থানরত ইসরাইলি গোপন সংগঠনের নেতারা ভালো করেই জানত ইরাক তাদেরকে ক্ষমা করার পাত্র নয়। ফাঁসি অবশ্যম্ভাবী।
প্রকৃতপক্ষে ট্যাগারকে ইসরাইল সরকার ভালো কাজেই ইরাকে পাঠিয়েছিলো। তাকে গোয়েন্দাদের মধ্যে যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ২৭ বছর বয়সী ট্যাগারের বিদেশ মিশন এই প্রথম। ট্যাগার ধরা পড়ার আগে বেশ কয়েকটি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ও গ্রুপের মধ্যকার যোগাযোগ নিষ্ক্রিয়ও করেছিল। কিন্তু কয়েকজন তার কথা শোনেনি। তারা ঠিকই নিজেদের মধ্যে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল। এ দলের নেতৃত্বে ছিল প্রকৃতই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী পিটার ইয়ানিভ।
ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবের সঙ্গে ট্যাগারের যোগাযোগ হতো একজন শীর্ষ কমান্ডারের মাধ্যমে। তার পরিচয় সামান্য লোকই জানে। তার ছদ্মনাম যাকী হাভিভ। প্রকৃত নাম বেন পোরাত। ইরাকে জন্মগ্রহণকারী এক ইসরাইলি। ইসরাইলের মুক্তিযুদ্ধকালীন একজন অফিসার। বেন পোরাত ইরাকে কাজ নিতে অনাগ্রহী ছিল। আর্মিতে থাকাকালীন প্রেম হওয়া এক সহকর্মীকে বিয়ে করার জন্য সে ছিল মরিয়া। কিন্তু ইসরাইলের গোয়েন্দা বিভাগের চাপে তাকে ইরাকে বিপজ্জনক পোস্টিং নিতে হয়।
ট্যাগারকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদকালে ইরাকে অবস্থানরত ইসরাইলের গোপন সংগঠনগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ইরাকী পুলিশ অসংখ্য ইহুদিকে গ্রেফতার করে এবং তাদের মধ্যে অনেকে দোষও স্বীকার করে। ইরাকী পুলিশ যেসব ডকুমেন্ট আটক করে তার মধ্যে প্রচুর গোয়েন্দা তথ্যও ছিল। ইহুদিদের প্রার্থনা স্থানের গোপন ভান্ডার থেকে প্রচুর অস্ত্র আটক করা হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে এসব অস্ত্রশস্ত্র জমা করা হচ্ছিল। অস্ত্র জমা শুরু হয় ১৯৪১ সাল থেকে। তখন ১৭৯ জন ইহুদিকে হত্যা করা হয়, ২১১৮ জন আহত হয় এবং বহু নারী ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্মশালা থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র দেখে ইরাকীদের চক্ষু ছানাবড়া। এখানে ছিল ৪৩৬টি গ্রেনেড, ৩৩টি মেশিন পিস্তল, ১৬৮টি রিভলবার, ৯৭টি মেশিনগান চার্জার, ৩২টি কমান্ডো ড্যাগার এবং ২৫ হাজার গুলি।
ইরাকীদের হিংস্র ও ভয়ংকর প্রশ্নবানে একটি নাম বন্দীদের কাছ থেকে বারে বারে উচ্চারিত হতে থাকে। নামটি যাকী হাভিভ। আন্ডারগ্রাউন্ডের রহস্যজনক শীর্ষ ব্যক্তি।
কিন্তু কে এই যাকী হাভিভ? সে কোথায়? অবশেষে ইরাকী এক তরুণ গোয়েন্দা যাকীর পরিচয় কিছুটা উদঘাটনে সমর্থ হয়। তার নিশ্চিত বিশ্বাস যাকী হাভিভই নিসিম মোশে। এই মোশে ট্যাগারের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু পরে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। অসংখ্য গোয়েন্দা নিসিম মোশের বাড়ি ঘেরাও করেও তার সন্ধান পায়নি। সারা ইরাক জুড়ে তার তল্লাশী চলে কিন্তু যাকী হাভিতের কোনো হদিশ নেই। আসলে যাকী হাভিভ তখন ছিল জেলে। যা ইরাকী পুলিশের মাথাতেই আসেনি।
ট্যাগারের সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে কয়েকদিন পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে একদিন সে বাড়ির গেটে ইরাক পুলিশের খুব হাঁক-ডাক শুনতে পায়। পুলিশ তাকে দরজা খুলতে বলে। বেন পোরাত মনে করে তার জীবনের এই শেষ। তার বাড়ির পেছন দিকে বেরুনোরও কোনো দরজা ছিল না। সে ভালো করেই জানত, তার পজিশনের কাউকে আটক করা মানে নিশ্চিত ফাঁসি।
ইরাকী পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব গুরুতর নয়। কয়েক মাস আগে সে একটা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিল। সেই মামলায় আদালতের সমন সে কয়েকবার অগ্রাহ্য করেছে। ইরাকী আদালতে এক ঘণ্টার শুনানী শেষে বেন পোরাতকে দুই সপ্তাহের কারাবাস দেয়।
দুই সপ্তাহের দণ্ড শেষ না হওয়ার আগেই বেন পোরাতকে পুলিশ সদর দফতরে নেয়া হয় তার ছবি তোলা ও হাতের আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার জন্য। সে ভালো করে জানত যদি এসব নেয়া হয় তাহলে সে মরেছে। তখন পুলিশ নিশ্চিতভাবেই সে যে যাকী হাভিভ তা শনাক্ত করতে পারবে। আর এবার তাকে দুই সপ্তাহের সামান্য জেল দেয়া হবে না।
সামান্য দূরের পুলিশ সদর দফতরে দু'জন গার্ডের সঙ্গে বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হেঁটেই যাচ্ছিল। গলি ঘুপচির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সে ভাবল পালানোর এটাই তার সেরা সময়। যাকী হাভিভ দুই পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। দুই পুলিশ তাকে বাধাও দেয়নি। কেননা মামলাটি তেমন গুরুতর নয়। হয়তো ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে ছাড়া পাবে। অতএব দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।
ইরাকী দুই পুলিশ যখন সিনিয়রদের কাছে গেল তারা বড় ধরনের ধমক খেল। ইরাকের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড মানুষটিকে তারা ছেড়ে দিল। ইরাকের বিরোধী দলের পত্রিকাগুলোর হেডলাইন কোথায় যাকী হাভিভ? আরেকটি পত্রিকা লিখল যাকী হাভিভ এখন তেলআবিবে।
এদিকে তেলআবিবে যাকী হাভিভের গোয়েন্দা বসরা নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করে রেখেছে, কীভাবে সে ইরাক থেকে পালাবে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হয়। ঐ সময় ইরাক থেকে হাজার হাজার ইহুদিদের সাইপ্রাস হয়ে ইসরাইলে নিয়ে আসা হচ্ছিল। এক লক্ষ ইহুদি তখন ইরাক থেকে প্লেনযোগে ইসরাইলে আসে। প্রতি রাত্রেই বিমানে করে তাদের আনা হতো।
১২ জুন রাতে বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ সুন্দর পোশাক পরে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে। তার বন্ধুরা তাকে প্রচুর পরিমাণে লোকাল মদ খাওয়ায়। ট্যাক্সির পেছনের আসনে সে বেহুশ হয়ে পড়ে এবং ঘুমের ছল করে। ট্যাক্সির ড্রাইভার তাকে বাগদাদ বিমান বন্দরের কাছে একটি জায়গায় রেখে যায়।
একাকী বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ বিমান বন্দরের কাঁটাতার ভেদ করে ভেতরে চলে যায়। সে জানত, কাঁটাতার কোনো জায়গায় কাটা আছে। এদিকে টারমাকে একটি প্লেন দেশত্যাগীদের নিয়ে রানওয়ে চলতে শুরু করে। কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ মোতাবেক প্লেনটি শক্তি সঞ্চয় করে গতি বাড়িয়ে দেয়। বিমানটি দশ ফুট উঁচুতে উঠে গেছে। ঠিক এই সময়েই একটি ঝুলন্ত রশি ঝুলতে দেখা যায় প্লেনের। অন্ধকার থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ ঐ দড়িটি ধরে ফেলে। তাকে প্লেনে তুলে নেয়া হয়। এবং প্লেনটি ওড়ার জন্য ভূমিত্যাগ করে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত এবং কোনো যাত্রীই জানতে পারল না কীভাবে একজন যাত্রীকে প্লেনে নিয়ে যাওয়া হল। অ্যাকশন মুভিতে যেমনটা দেখা যায় ঠিক তেমনটাই ঘটল বেন পোরাত তথা যাকী হাভিভের ক্ষেত্রে।
বাগদাদের ওপর দিয়ে প্লেনটি ওড়ার সময় ছাদে দাঁড়ানো অনেকেই ঈশ্বরের প্রশংসা করল। প্রশংসার কারণ তাদের বন্ধুর যাত্রা নিরাপদ হোক। আর বন্ধুটি হল বেন পোরাত ওরফে যাকী হাভিভ।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই যাকি হাভিভ ইসরাইলে পৌঁছে গেল। ইসরাইলে পৌঁছে যাকি হাভিভ তার সুইট হার্টকে বিয়ে করে। সে রাজনীতিতে নেমে সফল হয়। এমপি হয়, মন্ত্রী হয়। বর্তমানে ইসরাইলের ইরাকী ইহুদিদের কাছে সে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
ইরাকে আটকে পড়া ইহুদিদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। গ্রেফতারকৃত অসংখ্য ইহুদিকে বেদম মারধর করা হয়। ট্যাগারসহ ২২ জনকে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠিন সাজা দেয়া হয়। অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহনের জন্য দু'জন সুপরিচিত বাগদাদের ইহুদি সালোম সালাচ ও যোশেফ বাটজরিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
ট্যাগারকে একদিন জেলের মধ্যে মধ্যরাতে ঘুম থেকে জাগান হয়। তার সেলের মধ্যে তখন অসংখ্য পুলিশ। প্রধান তদন্তকারী ট্যাগারকে বললেন, আজ রাত্রে তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। ট্যাগারের বিচারকার্য এখনো শেষ হয়নি। ট্যাগার তাদের বলল, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা ফাঁসি দিতে পার না।
ট্যাগারকে বলা হল, আমরা পারি না মানে? আমরা তোমার সব অতীত কর্মকাণ্ড জেনে গেছি। তুমি একজন ইসরাইলি অফিসার। একজন গোয়েন্দা।
ইহুদিদের একজন ধর্মগুরু এসে ট্যাগারের পাশে বসলেন। ট্যাগারকে তিনি ত্রোস্ত বা প্রার্থনা সংগীত শোনালেন। শেষ রাত সাড়ে তিনটায় ট্যাগারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হল। ট্যাগারের মনে পড়ে গেল, মাত্র এক সপ্তাহ আগে সে জেরুজালেমে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছে। বাগদাদে আসার আগে কিছু সময় সে প্যারিস ও রোমে ছুটি কাটিয়েছে। আর এখন দড়িতে ঝুলতে হবে।
ইরাকী কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ফর্মে ট্যাগারের সই নিল। জল্লাদ তার ঘড়ি ও আংটি নিয়ে নিল। ট্যাগার দাবি করল, তার লাশ যেন ইসরাইলে পাঠানো হয়। জল্লাদ ট্যাগারকে একটি ফাঁসির দরজায় দাঁড় করালো। তার পায়ে বালুর বস্তা বাঁধা হল। ট্যাগারের মাথায় একটা যমটুপি পরাতে চাইলে সে বাধা দেয়। আয়োজন সব শেষ হলে জল্লাদের দৃষ্টি এখন কমান্ডিং অফিসারের দিকে। এ সময়ও আরও অনেক অফিসার উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষটাকে সবাই দেখছিল। ট্যাগার তার পরিবারের লোকদের কথা ভাবছিল। ভাবছিল জেরুজালেমের কথা। সেখানে থাকলে তার জীবনটা কেমন হতো। সে এও ভাবছিল তার মুন্ডুটা কী দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
হঠাৎ করেই কমান্ডিং অফিসার উঠে চলে যান। ট্যাগারকে মৃত্যুকূপ থেকে সরিয়ে আনা হল। তার পায়ের বালুর বস্তা খুলে ফেলা হল। জল্লাদ বলল, আজ রাত্রে সে যে পরিশ্রমিক বা সম্মানী পেত তা আর পাওয়া যাবে না। ট্যাগার বুঝল, তাকে এই দফায় আর মরতে হচ্ছে না। ট্যাগারকে বিচারে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পরে তার দণ্ড কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। বাটজরি ও সালাহকে ফাঁসি দেয়া হয়।
ইয়োককে যে করেই হোক বেঁচে যাওয়ার আয়োজনও করেছিল ইরাকের জেলাররা। রাজনৈতিক বন্দীরা, আততায়ীরা সকলেই বুঝতে পারল ইয়োককে বন্দী অবস্থায় মরতে হবে না। একদিন সে মুক্ত হয়ে যাবে।
ট্যাগারকে ৯ বছর ইরাকের জেলে কাটাতে হয়। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আব্দুল করিম কাসেম অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরাকে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ইরাকী প্রধানমন্ত্রী ও রাজকীয় পরিবারের বহু লোককে হত্যা করেন। ক্ষমতাগ্রহণের দু'বছর পর জেনারেল কাসেমের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। অবশ্য কয়েক বছর পরে তাদের সে চেষ্টা সফল হয়। যাহোক, জেনারেল কাসেমকে হত্যা চেষ্টার খবর টের পায় মোসাদ। মোসাদ-প্রধান সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল কাসেমের ঘনিষ্ঠ লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মোসাদ এবং জেনারেল কাসেমের লোকদের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়। সমঝোতাটি হল, জেনারেল কাসেমকে যারা হত্যা করতে চায় মোসাদ তাদের নাম দেবে বিনিময়ে ট্যাগারকে জেল থেকে মুক্তি দিতে হবে। জেলে ট্যাগারের কাছে জেলার গেলেন। তাকে কয়েদীর পোশাক ছেড়ে অন্য পোশাক পরতে দেয়া হল। জেলার বললেন, আপনাকে এখন বাগদাদ যেতে হবে।
পুলিশের একটি গাড়িতে ট্যাগারকে তোলা হল। এতসব আয়োজন দেখে ট্যাগার স্তম্ভিত। ট্যাগারকে নেয়া হল রাজকীয় প্রাসাদে। সৈন্যরা তাকে এসকর্ট করে বিশাল এক অফিসে নিয়ে গেল। সুদৃশ্য একটি টেবিলে ট্যাগার একটি পরিচিত মুখ দেখতে পেল। ইনি ইরাকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট- জেনারেল কাসেম। ট্যাগার হঠাৎ করেই বুঝল, তাকে আসলে ছেড়ে দেয়া হবে। এদিকে জেনারেল কাসেম এই ইসরাইলির মুখটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট কাসেম ট্যাগারকে জিজ্ঞেস করলেন, ইরাক ও ইসরাইলের মধ্যে যদি যুদ্ধ লেগে যায়, তাহলে তুমি কী আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? ট্যাগার উত্তর দিল, আমি যখন দেশে ফিরে যাব তখন ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় আমি কাজ করব। আর যদি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় আমি নিশ্চিতভাবে ইসরালের পক্ষে যুদ্ধ করব। আপনি যেভাবে নিজ দেশের হয়ে বহু যুদ্ধ করেছেন।
জেনারেল কাসেমের ট্যাগারের এই উত্তর ভালো লাগার কথা। প্রেসিডেন্ট কাসেম আসন ছেড়ে দাঁড়ালেন। বললেন, দেশে গিয়ে তোমার লোকদের বলবে যে, ইরাক এখন একটা স্বাধীন দেশ। আমরা আজ আর সাম্রাজ্যবাদের দালাল নই।
রাজকীয় প্রাসাদ থেকে একটি গাড়ি ট্যাগারকে বিমান বন্দরে নিয়ে গেল। বৈরুতের একটি বিমানে তুলে দেয়া হল ট্যাগারকে। বৈরুত, নিকোসিয়া, সাইপ্রাস হয়ে অবশেষে ইসরাইলে গিয়ে পৌঁছল ট্যাগার।
বিমানবন্দরে ট্যাগারের সহকর্মী, বন্ধুরা উপস্থিত ছিল। তাদের ধারণা ছিল বিধ্বস্ত এক ট্যাগারকে দেখবে তারা। কিন্তু জীবন্ত ট্যাগারকে দেখার পরিবর্তে তারা দেখল তেজস্বী, সমঝদার, মিশুক ও হাসি মুখের ট্যাগারকে। গত নয় বছরে একই রকম আছে ট্যাগার।
ট্যাগারকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর মোসাদ-প্রধান শিলোয়াহ বলেন, যে কোনো মূল্যে আমাদের বিপদাপন্ন লোকগুলোকে ফিরিয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
ইসরাইলে ফিরে ট্যাগার বিয়ে করে। বিদেশে কূটনৈতিক হিসেবে সাফল্য লাভ করে এবং অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেয়।
📄 রেড প্রিন্সের সন্ধানে
ইসরাইলি খেলোয়াড় ও এথলেটরা জার্মানিতে এসেছিলেন অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে। ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৪টায় ৮জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী মুখোশ পরে জার্মানির মিউনিখে ইসরাইলি খেলোয়াড়দের ফ্ল্যাটে ঢুকে মুষ্টিযুদ্ধের কোচ মোশে উইনবার্গ ও ওয়েট লিফটিং চ্যাম্পিয়ান যোয়ে রোমানোকে হত্যা করে। তারা সন্ত্রাসীদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন। ইসরাইলি এথলেটদের কয়েকজন গুলির শব্দে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সন্ত্রাসীরা ৯জনকে জিম্মি করে।
জার্মান পুলিশ, সাংবাদিক, টিভি সকলেই দৌড়ে আসে এবং সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এই প্রথম বারের মতো বিশ্বজুড়ে টিভিতে সরাসরি প্রচারিত হয়। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারকে ঘুম থেকে জাগান তার সামরিক এ্যাডজুটেন্ট। গোল্ডা মেয়ার পড়ে গেলেন ফাঁদে। ঘটনাস্থল জার্মানি একটি বন্ধুপ্রতীম দেশ। জিম্মি উদ্ধারের দায়িত্বও জার্মানির। ইসরাইল তাদের সেরা কমান্ডো ইউনিট সায়েরেত মাটকালকে জিম্মি উদ্ধারে পাঠাতে চাইলেও জার্মানির বেভারিয়া রাজ্য সরকার ভদ্রভাবে এতে আপত্তি জানায়। বেভারিয়াতেই সেবার অলিম্পিকের অনুষ্ঠানাদি হচ্ছিল। ইসরাইল সরকারকে জার্মান প্রশাসনের ভাষ্য, আপনাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আমরাই সকল জিম্মিকে মুক্ত করব। সমস্যা হল জিম্মি উদ্ধারে যে অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং সাহসিকতার প্রয়োজন জার্মান সরকারের তাতে ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে এমন একটি ধূর্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাবু করার ক্ষেত্রে।
জার্মান কর্তৃপক্ষ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সারাদিন ধরে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সন্ত্রাসী ও জিম্মিদের মিউনিখের বাইরে ফুরস্টেন ফ্রেন্ডব্রাক বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
জার্মান সরকার তাদেরকে একটি বিমান দিতে চায় যাতে চড়ে তারা যেখানে খুশী যেতে পারবে। কিন্তু জার্মান পুলিশ বিমান বন্দরকে ঘিরে যে আয়োজন করেছে তাতে বিন্দুমাত্র পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। জার্মানি বিমান বন্দরের মাঝখানে একটি বিমান এনে রাখলেও তাতে কোনো পাইলট বা ক্রু ছিল না। আবার বিমান বন্দরের ছাদে অদক্ষ শার্পসুটারদের জড়ো করে রাখা হয়। সন্ত্রাসী চক্রের নেতা প্লেনটি পরিদর্শনে এসে দেখে যে, বিমানটিতে কোনো ক্রুতো নেইই ইঞ্জিনও ঠাণ্ডা হয়ে আছে। এহেন বিমান চালু করে উড়ে যেতে কত সময় লাগবে? সন্ত্রাসীরা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ফলে তারা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়তে ও গুলি করতে শুরু করে। জার্মান পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের শুরুতেই ইসরাইলের সকল জিম্মিকে তারা হত্যা করে। নিহত হয় একজন জার্মান পুলিশও। ৮ সন্ত্রাসীর মধ্যে পাঁচজন নিহত হয়। তিন সন্ত্রাসীকে আটক করা সম্ভব হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। কেননা এই সন্ত্রাসী ঘটনার কিছুদিন পরে একটি লুফথানসা বিমান ছিনতাই হয়। ধারণা করা হয় ঐ সময় শর্তাধীনে আটক তিন সন্ত্রাসীকে মুক্ত করে দেয়া হয়।
ইসরাইলি জেনারেল জভি জামির সবেমাত্র ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হয়েছেন। তাকে অসহায়ের মতো তার দেশের লোকদের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জার্মানিতে উড়ে এসেছিলেন এবং উক্ত বিমান বন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে অবস্থান নিয়েছিলেন। জার্মানি পরিচালিত অভিযানে তার কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না। তদুপরি জার্মান সরকার পুনঃপুনঃ বলছে যে, তাদের উদ্ধারাভিযান এক্সেলেন্ট। মোসাদ-প্রধান উপলব্ধি করলেন, তাদের দেশের এক নতুন শত্রুর অভ্যুদয় ঘটেছে। এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা নিজেদেরকে 'ব্লাক সেপ্টেম্বর' বলে পরিচয় দেয়।
ব্লাক সেপ্টেম্বর নামকরণের পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা। এ মাসে জর্ডানের বাদশা হোসেন তার দেশে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেন। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সঙ্গে ছয়দিনের যুদ্ধ শেষে ইসরাইলের ভাষায় বহু সন্ত্রাসী জর্ডানের রাজধানী আম্মান, শহরতলী এলাকা এমনকী গ্রামে পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইসরাইল সীমান্ত এসব তথাকথিত সন্ত্রাসীদের বিশেষ ঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং প্রকাশ্যে তারা অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। তারা জর্ডানের বাদশাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে এবং ক্রমান্বয়ে সে দেশের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। বাদশাহ এসব জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। বাদশাহ একদিন আর্মি ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন, ট্যাঙ্কের এ্যান্টেনায় একটি ব্রেসিয়ার ঝুলছে। ক্রুব্ধ বাদশাহর প্রশ্ন, ওটা কী?
ট্যাঙ্কের পুরুষ কমান্ডার বললেন, ব্রেসিয়ার ঝোলানোর অর্থ হল আমরা পুরুষ নই, নারী। আপনি আমাদের তো আর যুদ্ধ করতে দিচ্ছেন না। বাদশাহ হোসেনের মনে হল বালিয়ারিতে তিনি তার মাথা ঢুকিয়ে দেন। নিজ দেশ তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে ১৯৭০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন।