📄 অন্যরকম যুদ্ধ
যুদ্ধ শেষে গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সিনিয়র কর্মকর্তারা গোয়েন্দা এঞ্জেলকে ক্রোধান্বিত স্বরে দোষারোপ করতে লাগল। এঞ্জেল মোসাদ-প্রধান জামিরকে বিভ্রান্ত করেছেন। কেননা যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুপুরে অথচ তার রিপোর্ট বলে যুদ্ধ শুরু হবে সন্ধ্যায়। পরে অবশ্য জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে মিসর যুদ্ধ শুরুর সময় পরিবর্তন করেছে। মিসর ও সিরিয়র প্রেসিডেন্টের মধ্যকার টেলিফোন কথোপকথনের পর এই সময় পরিবর্তিত হয়। ততক্ষণে এঞ্জেলতো লন্ডনের পথে বিমানে।
আমানের প্রধানরা এঞ্জেলের ভুল বার্তায় বিরক্ত হন। তার পূর্ববর্তী সতর্কবার্তায় আমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও প্রতীয়মান হয়। প্রকৃতপক্ষে আমানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এঞ্জেলকে কোনো গোয়েন্দা সূত্র বলতে বা ভাবতে নারাজ। তাদের মনোভাব এঞ্জেল হলেন মিসরের প্রেসিডেন্টের অফিসে মোসাদের প্রতিনিধি। তার কাজ হল, সেখানে যা যা ঘটছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদান। বিস্তারিত। আমান কর্মকর্তারা বিস্মৃত হয়েছেন যে, সিনিয়র পদ মর্যাদার কারণে এঞ্জেল শুধুমাত্র একজন গোয়েন্দা নন, তিনি চমৎকার চমৎকার সব রিপোর্ট দিচ্ছেন। তাছাড়া তিনি সব সময় সব খবর জানবেন এমনটিও ভাবা সংগত নয়।
যেদিন যুদ্ধ শুরু হল সেদিনও গোয়েন্দা এঞ্জেল ইসরাইলকে ভালো ভালো গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে যেতে লাগলেন। মিসর ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ওপর দুটি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। ইসরাইল এর পাল্টা হামলা নিলে পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ হত। কিন্তু গোয়েন্দা এঞ্জেল ইসরাইলকে জানান, মিসর আর হয়তো ইরসাইলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করবে না। একথা শুনে ইসরাইল কিছুটা রাশ টেনে ধরে। এঞ্জেল আরও জানান, মিসর ধীরে ধীরে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটাতে চায় না।
ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধ অক্টোবরের ২৩ তারিখে শেষ হয়। গোলান হাইটে সিরিয় সেনাবাহিনী নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ইসরাইলের কামান দামেস্ক থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। দক্ষিণে মিসর পাঁচ মাইলব্যাপী একটা ইসরাইলি প্রণালী দখল করে বটে কিন্তু ইসরাইল মিসর ভূখণ্ডে আক্রমণের এমন একটা পটভূমি তৈরি করে যা কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মিসরের তৃতীয় সেনাবাহিনী পুরোপুরি ইসরাইলি বাহিনী দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। মিসরের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ে এবং মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দূরত্ব ছিল মাত্র ৬৩ কিলোমিটার। এটিও ছিল ইসরাইলের অনুকূলে এক বিরাট অর্জন। তড়িৎ এই যুদ্ধ জয়ের পরেও বিজয় উৎসব থেকে বিরত থাকে ইসরাইল। কেননা তাদের ২ হাজার ৬৫৬ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত ৭ হাজার ২৫১ জন। একই সাথে ইসরাইলের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা এই যুদ্ধে ভূলুণ্ঠিত হয়।
যুদ্ধ শেষে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক শুরু হয়। প্রথমে আটক ব্যক্তিদের বিনিময় এবং দুই জাতির মধ্যে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে বৈঠক বসে। সিরিয় শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে অসম্মতি জানায়।
মোসাদ-প্রধান যভি জামির সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল হোকি। জামিরের ব্যাপক প্রশংসা হয়। ইসরাইলের গোয়েন্দা ইতিহাসে জামির একমাত্র ব্যক্তি যিনি সিরিয় ও মিসরের আক্রমণের খবর জেনে ইসরাইলের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইসরাইলি নেতারা যদি জামিরের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে আরও সতর্ক হতেন ও যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে যুদ্ধের ফলাফল ইসরাইলের পক্ষে আরও বহুগুণ ভালো হত।
কয়েকজন মন্ত্রী বলেন, ইসরাইল প্রথমে আক্রমণ না করে ভালোই করেছে। ফলে ইসরাইলকে কেউ আর আক্রমণকারী হিসেবে দোষারোপ করছে না।
ইসরাইল প্রথমে আক্রমণের মতলব না করে ভালো করেছে কী না এ প্রশ্নে অনেকে বলেছেন, এটা একটা অদূরদর্শী ভাবনা। ইসরাইল বদনামী না হওয়ার জন্য বসে বসে তামাক খাবে, না তার যথাসাধ্য শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, না নিজেকে প্রতিহত করবে এনিয়ে বিতর্ক ছিল।
ইসরাইলি ঐতিহাসিক ড. ইউরিবার ইয়োসেক বলেন, স্বনামধন্য গোয়েন্দা এঞ্জেলের সতর্ক বার্তার কারণেই ইসরাইল গোলান হাইটস রক্ষা করতে পেরেছে। এই ঐতিহাসিকের মতে, এঞ্জেলের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর জরুরি ভিত্তিতে ট্যাংক বাহিনী অপরাহ্নে গোলানে পৌঁছতে সক্ষম হয় এবং নাকাহ সেক্টরে সিরিয়র আগ্রাসন প্রতিহত করতে সমর্থ হয়।
ইয়োম কাঞ্জুর যুদ্ধের পর জনগণের চাপের মুখে ইসরাইল সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আগরানাটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনে বাধ্য হয়। এই কমিটির কাছে তদন্তাধীন বিষয় ছিল, যুদ্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইসরাইলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক প্রক্রিয়ায় কোনো গলদ ছিল কী না। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবিলম্বে আমান প্রধান জেনারেল জেইরাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়। মোসাদ-প্রধান জামিরের চীফ অব স্টাফ ডেভিডকেও বরখাস্ত করা হয়।
এখন প্রশ্ন হল, কে এই এঞ্জেল? তাকে নিয়ে বই ছাপা হতে লাগল। সারা বছর ধরে পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য গল্প, প্রতিবেদন ছাপা হতে লাগল। তার পরিচয় নিয়ে কত প্রশ্ন। তবে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট, এঞ্জেল যেই হোন, মিসরের নীতিনির্ধারক মহলের একজন কেউ হবেন তিনি। নিশ্চয়ই মিসরের সামরিক বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডেও তার ব্যাপক প্রভাব। এতদসত্ত্বেও তার প্রকৃত পরিচয় কেউ উদঘাটনে সমর্থ হল না। সাংবাদিক ও যুদ্ধবিশারদরা তাকে নানা কোড নামে অভিহিত করতে লাগল। তার প্রবাদ প্রতিম মেধা ও প্রতিভা নিয়ে কল্পকাহিনীতে ইসরাইল ছেয়ে গেল। গোয়েন্দা বাহিনীর নায়ক বানিয়ে এঞ্জেলকে কেন্দ্র করে বহুল প্রচারিত বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশিত হল।
গোয়েন্দা বাহিনী আমান থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর জেনারেল জেইরা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন। তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণের জন্য তিনি একটা বই লিখলেন। বইয়ে তিনি নিজে নিজে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন এবং নিজেই তার উত্তর লিপিবদ্ধ করেন। তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, কেন তিনি স্বনামধন্য গোয়েন্দা এঞ্জেলের রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
জেনারেল জেইরা বইয়ে লেখেন, এঞ্জেল একজন ডাবল এজেন্ট। কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মিসর সরকার ইসরাইলকে নানা বিষয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য তাকে মোসাদ বাহিনীতে কায়দা করে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
কয়েকজন সাংবাদিক জেনারেল জেইরার বক্তব্য প্রসঙ্গে লিখলেন, এঞ্জেল ডাবল এজেন্ট হলেও তার মধ্যে চরম উৎকর্ষতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ইসরাইলকে সত্য ও প্রকৃত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে আসছিলেন। আর এসবই তিনি করছিলেন, মোসাদের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য। মোসাদ এঞ্জেলকে বিশ্বাস করে সব তথ্যই গ্রহণ করে আসছিল। কিন্তু এমন তথ্যও এঞ্জেল দিতে পারতেন যার ফলে ইসরাইল কোনো একদিন সর্বনাশা পদক্ষেপও নিয়ে ফেলতে পারত। যা হত চরম ধ্বংসাত্মক ইসরাইলের।
প্রশ্ন হল, জেনারেল জেইরা এবং তার অনুগামীরা ইনিয়ে-বিনিয়ে যে আঘাতই করার চেষ্টা করুন না কেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এঞ্জেলের তথ্য প্রদান প্রকৃতপক্ষেই নির্ভুল। তাহলে এঞ্জেল মিথ্যাচারটা করলেন কীভাবে!
এঞ্জেলতো সাম্প্রতিক যুদ্ধের ব্যাপারে মোসাদকে উল্টো তথ্য দিতে পারতেন। তিনিই তো কেমিক্যালস শব্দটি উল্লেখ করে ইসরাইলের আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছিলেন। এটা কী কোনো ডাবল এজেন্টের কাজ?
কিন্তু জেনারেল জেইরা থেমে থাকলেন না। ১৯৭৪ সালে তিনি যখন তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ বের করলেন সেখানে তিনি গোয়েন্দা এজেন্টের নাম-ধাম পরিচয় সব পাবলিকের কাছে প্রকাশ করলেন। অসংখ্য সাক্ষাৎকার এবং বিশিষ্ট টিভি সাংবাদিক মারগ্যালিতকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারেও জেনারেল জেইরা এঞ্জেলের বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরলেন।
📄 কে এই যুবক
তার প্রকৃত নাম আশরাফ মারওয়ান। এই নামটা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে মিসরে ঝড় বয়ে গেল। শীর্ষ রাজনীতিকরা পর্যন্ত স্তম্ভিত। অনেকেই বললেন, অসম্ভব! আশরাফ মারওয়ান কিছুতেই ইসরাইলের গুপ্তচর হতে পারেন না।
এখন প্রশ্ন হল, কে এই মাস্টার গোয়েন্দা, কে এই আশরাফ মারওয়ান? কি তার পরিচয়? ১৯৬৫ সালে মিসরে সুইট ও লাজুক একটি মেয়ের সঙ্গে সুদর্শন ও হ্যান্ডসাম এক তরুণের পরিচয় হয় হেলিওপোশি টেনিস কোর্টে। মেয়েটির নাম মোনা এবং সে তার পরিবারের তৃতীয় মেয়ে। প্রকৃতপক্ষে মোনা অতবেশী সুন্দরী নয়। তার বোন হুদ হল প্রকৃত সুন্দরী এবং মিশরের গির্জা হাই স্কুলের এ লেভেলের ছাত্রী। তবে মোনাও কিউট, চার্মি এবং তার পিতার প্রিয় সন্তান। এদিকে তরুণটি স্বচ্ছল ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। তরুণটি সদ্য গ্রাজুয়েট। বিষয় রসায়ন এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছে। এখন এই তরুণের জন্য মোনা মরীয়া। প্রেমে হাবুডুবু।
এই পরিচয় ও প্রণয়ের সূত্র ধরে মোনা তার পরিবারের সঙ্গে তরুণের পরিচয় করিয়ে দেয়। তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় মোনার বাবার।
আর মোনার বাবা হলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদুল নাসের।
প্রেসিডেন্ট নাসের ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে, তার মেয়ের পছন্দ উপযুক্ত ও যথার্থ হচ্ছে কী না। কিন্তু মোনা কিছুতেই অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। অবশেষে প্রেসিডেন্ট নাসের মোনার প্রেমিকের বাবাকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বললেন। তরুণের বাবা প্রেসিডেন্টেরই গার্ড রেজিমেন্টের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। দু'জনে আলোচনা করে মোনা ও তার প্রেমিকের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করলেন। এক বছর পর ১৯৬৬ সালে জুলাইয়ে তাদের বিয়ে হয়।
মোনার তরুণ স্বামীকে রিপাবলিক গার্ডের কেমিক্যাল বিভাগে বদলী করা হয়। ১৯৬৮ সালের শেষার্ধে তাকে প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান বিভাগে বদলী করা হয়।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ের জামাতার নামই আশরাফ মারওয়ান।
প্রেসিডেন্টের জামাতা আশরাফ মারওয়ান তার নতুন কর্মস্থলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। আশরাফ মারওয়ান উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যেতে চেয়ে তার শ্বশুরকে জানাল। শ্বশুর প্রেসিডেন্ট তা অনুমোদন করেন। লন্ডনে অবস্থিত মিসরীয় দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে একাই লন্ডনে সেটেল করেন আশরাফ মারওয়ান। আশরাফ মারওয়ানের ব্যাপারে দূতাবাসের নজরদারি কঠোর ছিল না। আশরাফ মারওয়ান অ্যাভেন্চারপ্রিয় পার্টি টার্টি খুব পছন্দ করেন। আর ষাটের দশকে যার যা চাই তা সরবরাহে লন্ডন ছিল সিদ্ধহস্ত। রাতভর পার্টিতে প্রচুর খরচ হয় মারওয়ানের। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে নতুন একটা আয়ের সংস্থান হয়ে গেল আশরাফ মারওয়ানের।
এ রকম একজন মহিলার নাম সাওদা। কুয়েতী শেখ আবদুল্লাহ মুবারক আল সাবাহ তার স্বামী। আশরাফ সাওদাকে মন্ত্রমুগ্ধ করলে ঐ মহিলা দুই হাতে তাকে টাকা দিকে লাগলেন। কিন্তু এই আয়োজন বেশি দিন চলল না। তাদের ভালোবাসা ও সম্পর্কের কথা মিসরের প্রেসিডেন্টের গোচরীভূত হলে তিনি তার মেয়ের জামাতাকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তার এই ব্যভিচারী জামাতাকে তালাক দিতে মেয়ে মোনাকে নির্দেশ দিলে মোনা তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। নাসের অবশেষে জামাতাকে মিসরেই রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। জামাতা আশরাফ মারওয়ানকে শুধুমাত্র তার কাগজপত্র প্রফেসরকে দেয়ার জন্য লন্ডনে যেতে দিতে নাসের রাজি হন। সাওদ আল সাবাহ'র কাছ থেকে নেয়া সব টাকা-পয়সাও আশরাফ মারওয়ান ফেরত দেন। নাসেরের অফিসেই আশরাফ মারওয়ানের আবার চাকরি হয়। এখানে অবশ্য তার বড় কোনো দায়িত্ব ছিল না।
১৯৬৯ সালে আশরাফ মারওয়ান একটি লেখা জমা দিতে আবার লণ্ডনে যান। কিন্তু এই দফায় তিনি তার শ্বশুরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা শুরু করেন। শ্বশুর প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অমর্যাদাকর আচরণ তাকে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তিনি ইসরাইলি দূতাবাসে ফোন করে মিলিটারী এটাচীর সঙ্গে কথা বলতে চান। এক কর্মকর্তা তার ফোন ধরলে আশরাফ মারওয়ান তাকে তার প্রকৃতই নামটাই বলেন। ইসরাইলের পক্ষে তিনি কাজ করতে চান বলেও জানান। ইসরাইল দূতাবাস থেকে তাকে জানান হয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। প্রকৃতপক্ষে ইসরাইলি দূতাবাসের ঐ কর্মকর্তা বিষয়টি সিরিয়সলি নেননি এবং ঐ কর্মকর্তা দফতরকে তিনি কিছু জানাননি। আশরাফ মারওয়ান আবার যে একই বিষয়ে ফোন করেন তাও কেউ ধরেনি। বিষয়টি কীভাবে যেন মোসাদের লোকজন জেনে ফেলে। মোসাদের ইউরোপীয় বিভাগের প্রধান শমুয়েল গোরেনের সঙ্গে মারওয়ানের ফোনে কথা হয়। গোরেন জানতেন মারওয়ান কে, জানতেন তার গুরুত্বপূর্ণ পজিশনের কথা। গোরেন মারওয়ানকে দূতাবাসে আর ফোন করতে নিষেধ করেন। গোরেন তালিকাহীন একটি নম্বরে আশরাফ মারওয়ানকে ফোন করতে বলেন এবং তার কয়েকজন সহকর্মীকে বিষয়টি জানিয়ে রাখেন।
গোরেনের টপসিক্রেট রিপোর্টটি মোসাদ-প্রধান জামির এবং গোয়েন্দা নিয়োগ সংস্থার প্রধান রেহাভিয়া ভার্দির কাছে গিয়ে পৌঁছে। তারা মারওয়ানের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে একটা বিশেষ টিম গঠন করেন। তবে সহজেই অনুমেয় যে, শত্রু দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ যখন নিজের থেকে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ পেতে আগ্রহ দেখায় তাকে নিতে আপত্তি কোথায়। তবে বিষয়টি সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। তাছাড়া এই পর্যায়ের লোকেরা ডাবল এজেন্টও হয়ে থাকে। দেখা গেল মিসরই প্রলোভন দেখিয়ে তাকে প্ররোচিত করেছে।
আবার এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। শত্রু দেশের সংক্ষুব্ধ কেউ এজেন্ট হতে আগ্রহী হতেই পারে। তবে এই পর্যায়ের লোকদের হাতে অনেক গোপন ও স্পর্শকাতর তথ্যাদি থাকে যা অনেকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আর সারা বিশ্বের গোয়েন্দা বিভাগের লোকদের কাছেই এ ধরনের এজেন্ট সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত।
পাশাপাশি, ভার্দির লোকেরা জেনে গেছে আশরাফ মারওয়ান কে। প্রথমত তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, টাকাটা খুব ভালো করে চেনেন এবং ভালোবাসেন। একই সঙ্গে সবরকম আনন্দময় জীবনই তাকে ব্যাপকভাবে টানে। ফলে মোসাদ তাকে গোয়েন্দা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পেরে যারপরনাই খুশী।
ইসরাইল থেকে লন্ডনে উড়ে এসে গোরেন মারওয়ানকে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আহ্বান জানান। ধীমতি মারওয়ান চমৎকার পোশাকাদি পরে গোরেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি প্রকাশ্যে গোরেনকে বলেন যে, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে মিসরের হেরে যাওয়াটা তার ভালো লাগেনি। এবার তিনি বিজয়ীদের দলে যোগ দিতে আগ্রহী। যাহোক, এই আদর্শিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আশরাফ মারওয়ান প্রতি মিটিংয়ের জন্য এক লক্ষ ডলার দাবি করলেন। এই রকম সভায় আশরাফ মারওয়ান মোসাদকে একটি করে রিপোর্ট দেবেন।
বিশাল অংকের টাকার ব্যাপারটি নিয়ে গোরেন দ্বিধান্বিত ছিলেন। কেননা মোসাদ এতেঠ বেশি পরিমাণ টাকা ইতিপূর্বে আর কোনো গোয়েন্দাকে দেয়নি। কিন্তু মারওয়ানের কথা ও কাজের একটা বাস্তব পরীক্ষা নেয়া গোরেনের কাছে জরুরি। মারওয়ানকে গোয়েন্দা তথ্যের কিছু নমুনা দিতে বললেন গোরেন। যাহোক, অবশেষে মারওয়ান ইসরাইলি গোয়েন্দা হলেন। মিসরের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং শত্রু দেশের গোয়েন্দা। আশরাফ মারওয়ানের রিপোর্ট দেখে মোসাদের খুশীর সীমা রইল না। ১৯৭০ সালের ২২ জানুয়ারি মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসেরের সঙ্গে সাক্ষাতে সোভিয়েত নেতাদের যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয় তা সবিস্তার বিবরণ আশরাফ মারওয়ান ইসরাইলিদের হাতে তুলে দেন। ঐ বৈঠকে নাসের সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আধুনিক ও দূরপাল্লার জেট বিমান চান। কেননা এই বিমান হাতে পেলে ইসরাইলের অনেক ভেতরে ঢুকে বোমা ফেলা সম্ভব হবে।
এই গোপন রিপোর্ট ইসরাইলের যেসব নেতা দেখলেন তারা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এতো গোপনীয় প্রমাণাদি অতীতে তারা কখনো দেখেনি। আর এ সব তথ্যের সত্যাসত্য নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এখন মোসাদের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চিত হলেন যে, তাদের হাতে অগনিত গোপন তথ্যাদি বিদ্যমান। মোসাদ ডুবিকে আশরাফ মারওয়ানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য লন্ডনে নিয়োগ দিল। আশরাফ মারওয়ান নাম বদলে হয়ে গেলো এঞ্জেলা। এঞ্জেলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোসাদের পক্ষ থেকে লন্ডনে অফিস ভাড়া করা হল। সেই অফিস অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো হল। লন্ডনের এই অফিসকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে রাখা হল এই তারকা গোয়েন্দাদের কখন কী প্রয়োজন হয় তার জন্যে।
সিদ্ধান্ত হল, তারকা গোয়েন্দা এঞ্জেল তার সুবিধামত লন্ডনের অফিসে মিটিং করবেন। মিটিং করার সময় হলে এঞ্জেল তৃতীয় কাউকে ফোন করবেন। অনেকের মতে, লন্ডনের ইহুদি এক নারী ছিলেন তৃতীয় ব্যক্তি। অতঃপর তা ডুবিকে জানানো হবে। আর এভাবেই মোসাদকে সতর্ক করা হবে। আশরাফ মারওয়ান মোসাদকে অসংখ্য টপসিক্রেট তথ্য ও সামরিক ডকুমেন্ট দিতে লাগলেন। গোয়েন্দা সংস্থা আমানের মিসরীয় আর্মি বিষয়ক কর্মকর্তা কর্নেল মেইর উল্লেখিত গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেন। কেননা তিনি বেশ কয়েকটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। লন্ডনের উল্লেখিত সেফ হাউসে মারওয়ানের সঙ্গে মেইরের সাক্ষাৎও হয়েছে। মেইর বলেছেন, আশরাফ মারওয়ানকে তার অসুখী মানুষ বলে মনে হয়েছে। আশরাফ তার দিকে প্রথম অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে মারওয়ান মেইরের ব্যাপারে সহনশীল হয়ে উঠেন। কেননা মেইরের পান্ডিত্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। মোসাদের কর্মকর্তারা একবার আশরাফ মারওয়ানকে একটি ব্রিফকেস দিতে বলেন মেইরকে। মেইর জানতে চান এর ভেতর কী আছে। তাকে বলা হয় এর মধ্যে বিপুল অংকের টাকা রয়েছে। মোসাদের হিসাব অনুযায়ী আশরাফ মারওয়ান যতদিন তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই সময়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল তাকে ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার দিয়েছে।
১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নাসের মারা গেলে আনোয়ার সাদাত মিসরের প্রেসিডেন্ট হন। প্রফেসর শিমন সামির ইসরাইলের একজন বিশিষ্টতম ব্যক্তি এবং মিসর বিষয়ে অভিজ্ঞ। মোসাদ তার কাছে আনোয়ার সাদাতের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু তথ্য চায়। শিমন সামির আনোয়ার সাদাতকে অতি দুর্বল ও নিষ্প্রাণ চরিত্রের একজন মানুষ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, আনোয়ার সাদাত খুব বেশি দিন মিসরের সিংহাসনে থাকতে পারবেন না আর পারলেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। সামিরের মতো মিসরের অনেক লোকই সাদাত সামিরের অনুরূপ মনোভাব পোষণ করত। কিন্তু আশরাফ মারওয়ান নিঃশর্তভাবে আনোয়ার সাদাতকে পৃষ্টপোষকতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আশরাফ মারওয়ান তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নাসেরের ব্যক্তিগত কেবিনেটগুলোর চাবি নিয়ে নেন। সেখানে যত গোপন ফাইল ও ডকুমেন্ট ছিল তা আনোয়ার সাদাতকে দিয়ে দেন।
১৯৭১ সালের মে মাসে মিসরের কতিপয় রাজনীতিক মস্কোর লাইনে সাদাতের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করেন। এরা সকলেই মিসরের বিখ্যাত ব্যক্তি। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলি সাবরী, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাহমুদ ফাওজি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুমাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি। তাদের পরিকল্পনা ছিল আলেকজান্ড্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সফরকালে সাদাতকে হত্যার। কিন্তু সাদাত ষড়যন্ত্রকারীদের চেয়েও এগিয়ে। তিনি চক্রান্তকারীদের গ্রেফতার করে ফেলেন। এ সময় আশরাফ মারওয়ান সাদাতের পক্ষাবলম্বন করেন। প্রকৃতপক্ষে আরও আগে থেকেই সাদাতের সঙ্গে ছিলেন মারওয়ান।
ফলশ্রুতিতে মিসরের শীর্ষমহলে আশরাফ মারওয়ানের পদ-পদবি ও মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পায়। তিনি প্রেসিডেন্ট সাদাতের তথ্য বিষয়ক প্রেসিডেন্টের সচিব এবং প্রেসিডেন্টের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। সাদাতের সঙ্গে বিভিন্ন আরব দেশ সফরের সুযোগ ঘটে তার। শুধু তাই নয়, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠকগুলোতেও মারওয়ান উপস্থিত ছিলেন।
মারওয়ানের মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার প্রেরিত রিপোর্টের গুরুত্ব ইসরাইলের কাছে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সাদাত বেশ কয়েকবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। ইসরাইলকে আক্রমণ করে কাবু করার জন্য সাদাত সোভিয়েত ব্রেজনেভকে দাবিকৃত অস্ত্রের একটা তালিকা দেন। এ তালিকার মধ্যে ছিল মিগ ২৫ বিমান। আশরাফ মারওয়ান কিনতে চাওয়া অস্ত্রের পুরো তালিকা মোসাদকে সরবরাহ করেন। মোসাদ অতঃপর সাদাত ও ব্রেজনেভের মধ্যকার বৈঠকের কার্যবিবরণী চান মারওয়ানের কাছে। কয়েকদিনের মধ্যে মারওয়ান তাও ইসরাইলকে সরবরাহ করেন।
মোসাদ-প্রধান যভি জামির মারওয়ানের ব্যাপারে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মারওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতও করেন। মারওয়ানের প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট মোসাদ-প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও গোয়েন্দাদের সরবরাহ করে।
আশরাফ মারওয়ান প্রদত্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ইসরাইলের বাইরের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা প্রধানের হাতেও পৌঁছে যায়। মারওয়ান ইটালীর গোয়েন্দা বিভাগের হয়েও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। একটি সূত্র মতে, মারওয়ান ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম সিক্সটিনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ৫ অক্টোবর যেদিন ইসরাইল আক্রমণের খবর দিতে মারওয়ান লন্ডনে যাচ্ছিলেন মাঝে তিনি রোমে যাত্রাবিরতি করেন। ইটালীর গোয়েন্দাদেরও তিনি ইসরাইল মিসর আসন্ন যুদ্ধের কথা জানিয়ে ছিলেন।
আশরাফ মারওয়ানের একটি রিপোর্ট ইটালী কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেছিল। প্রকৃতপক্ষে এটি মোসাদের জন্যই হয়তো তিনি পাঠিয়েছিলেন। ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধের এক মাস আগে লিবিয়া মিসরের কাছে একটা ক্ষেত্রে সহযোগিতা চায়। ফিলিস্তিনীরা লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফীর অনুকূলে ইআই আল বিমান বন্দর থেকে টেকঅফ করার সময় এটি ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন। বিষয়টি যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। যা হোক, ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুল করে একটি বেসামরিক বিমানকে বিধ্বস্ত করা হয় সিনাই অঞ্চলে। মোসাদের কাছে খবর ছিল ফিলিস্তিনীরা একটি বিমান ছিনতাই করে তাতে ব্যাপক বিস্ফোরক ভর্তি করে ইসরাইলের কোনো বড় শহরে বিধ্বস্ত করবে। সিনাই থেকে লিবিয়ার একটি বিমান উড্ডয়ন করে ইসরাইলের আকাশে উড়তে থাকে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রকরা মনে করল এটি একটি আত্মঘাতী বিমান। ইসরাইলের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান লিবিয়ার বিমানটিকে আকাশে ঘিরে ধরল। এক পর্যায়ে ঐ বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করল। পরে বলা হল, বিমানটি পথভ্রষ্ট হয়ে ইসরাইলে ঢুকে পড়েছিল। কেননা সিনাইতে ঐ সময় ব্যাপক ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। যাহোক ইসরাইলি চিকিৎসকরা ঐ বিধ্বস্ত ধূমায়িত বিমান থেকে ১০৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করে।
গাদ্দাফী এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে শপথ করলেন। ফাতাহর পাঁচ কর্মীকে নিয়ে একটি অপারেশন টিম করা হল। এর প্রধান হলেন আমিন আল সিদ্দিকী। মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত লিবিয়াকে সাহায্য করতে মনস্থ করলেন। তিনি মারওয়ানকে, ফাতাহ'র লোকদের রুশ নির্মিত স্ট্রেলা ক্ষেপণাস্ত্র দিতে বললেন।
মারওয়ান ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য দুটি ক্ষেপণাস্ত্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রোমে পাঠালেন। রোমে মারওয়ান ক্ষেপণাস্ত্র দুটি তার গাড়িতে তোলেন। তিনি সেখানে আল হিন্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং বিশ্বখ্যাত কার্পেটের দোকানে ঢুকলেন। সেখান থেকে বিশাল আকারের দুটি কার্পেট কিনলেন। অতঃপর সেই কার্পেটে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি মুড়িয়ে সাবওয়ের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের সেফ হাউজে পাঠালেন। ফাতাহ'র লোকজন সেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার প্রস্তুতি সমাপ্ত করেছে। কিন্তু মারওয়ান এই তথ্য মোসাদকে জানিয়ে দেন। ইটালী কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি তিনি অবহিত করেন। সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ রোমের সন্ত্রাস বিরোধী পুলিশ তাদের বিমান বন্দর সন্নিহিত একটি ফ্লাটের দরজা ভেঙে ঐ ক্ষেপণাস্ত্র আটক করে। এই দফায় বেশ কয়েকজন ফাতাহ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ফাতাহ'র আরও কয়েক সদস্য হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ধারের পর রোমের গণমাধ্যম মোসাদের সতর্কতার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র দুটির উদ্ধার সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করে। অনেকের মতে, ঐ অভিযানকালে মোসাদ-প্রধান জামির এই সময় রোমে অবস্থান করছিলে। এক মাস পর...
📄 ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ
এই যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা মারওয়ান প্রেসিডেন্ট সাদাতকে প্রয়োজনীয় মূল্যবান সব গোয়েন্দা তথ্য দেন। আশরাফ মারওয়ানকে সাদাত আরব দেশসমূহে তার দূত হিসেবে পাঠান। সিরিয় ও মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের সেনাদের পৃথকীকরণে মারওয়ান সক্রিয় ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও জর্ডানের বাদশা হোসেইনের মধ্যে আম্মানে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মারওয়ান উপস্থিত ছিলেন। সৈন্য পৃথকীকরণের সময় মারওয়ান বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র সংস্পর্শে আসেন। সিআইএ ব্যাকুলভাবে মিসরের পলিসি অবগত হতে একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা খুঁজছিল। কেননা আমেরিকা ইতিমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে একটা ইন্টেরিয়াম চুক্তি করে ফেলেছিল। মার্কিন সূত্র অনুযায়ী মারওয়ান ও সিআইএ'র সম্পর্ক সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য মারওয়ান বহুবার আমেরিকা সফর করেন। সিআইএ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিত। সিনিয়র পদ মর্যাদার কারণে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে তার চাহিদা কিছুটা কমে গেলে মারওয়ান ব্যবসা শুরু করেন। লন্ডনের ২৪ কার্লটন হাউজে তিনি একটা বিলাসবহুল এ্যাপার্টমেন্ট কেনেন এবং তার অগুনতি টাকা বিভিন্নভাবে লগ্নি করেন।
১৯৭৫ সালে আশরাফ মারওয়ান আরব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। মিসর, সৌদি আরব এবং উপ-সাগরীয় আমিরাতের দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য। মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা ধাচেই তাদের প্রচলিত অস্ত্রগুলো তৈরির। প্রকল্পটি ব্যর্থ হলেও ব্যবসায়ী মহলের এবং তাদের লোকদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। যাহোক, কিছুদিন পর অস্ত্র নবায়নের কোম্পানি থেকে বাদ পড়লে মারওয়ান ১৯৭৯ সালে প্যারিসে চলে যান। দু'বছর পর ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের হাতে মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত নিহত হলে মারওয়ান লন্ডনে গিয়ে বিশাল ব্যবসার মাধ্যমে মস্ত ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ব্যালোরক দ্বীপে তার মালিকানাধীন হোটেলে তিনি মোসাদের শীর্ষ গোয়েন্দা ডুবিকে দাওয়াত করেন। তাকে মারওয়ান জানান যে, গোয়েন্দাবৃত্তি থেকে তিনি অবসর নিতে চাইছেন। ওদিকে মিসরের মাটি তার জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সত্তর দশকের শেষার্ধে মারওয়ান উপলব্ধি করেন যে, মিসরের শীর্ষ পর্যায়ে ইসরাইলের সঙ্গে তার সখ্যতার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে আশরাফ মারওয়ান ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরিও ছেড়ে দিলেন।
ইতিমধ্যে সফল ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী হিসেবে চারদিকে মারওয়ানের ব্যাপক পরিচিতি। এর ফলে তিনি ভালো ভালো প্রকল্পে লগ্নি করতে সমর্থ হন। তিনি ফুটবল ক্লাব চেলসির অন্যতম অংশিদার হন। লন্ডনের বিখ্যাত এবং অভিজাত হ্যারোডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর কিনতে মনস্থ করেন। এজন্য তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় প্রিন্সেস ডায়নার প্রেমিক ডোদীর বাবা মোহাম্মদ আল ডায়েদের সঙ্গে। এদিকে তার বিলাসী জীবনের ধরন-ধারণ আরও বৃদ্ধি পেল। প্রেম, ভালোবাসা, পরকীয়া, মেয়ে পটানোতে তিনি বরাবরই পটু। এসব কাজে মারওয়ানের নাম সমার্থক হয়ে উঠে। একবার সিআইএ'র লোকজন তার নিউইয়র্ক হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করেছিল।
আশির দশকে গাদ্দাফীর আমলে বেশ কয়েকটি অস্ত্র কেনা-বেচার ডিলের সঙ্গে মারওয়ান যুক্ত ছিলেন। লেবাননে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহের ব্যবসায়ও তিনি যুক্ত ছিলেন। একবার সিআইএ'র এক এজেন্টকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেন তিনি। বারান্দা থেকে তাকে একটি ঝকঝকে রোলস রয়েস গাড়ি দেখান। আশরাফ মারওয়ান। পার্ক করা গাড়িটি গাদ্দাফী তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা আশরাফ মারওয়ানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের বিষয়টি হয়তো সত্যের অপলাপ। কেননা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক করলে, ব্যবসা করলে মোসাদ তাকে ছেড়ে দেবে না। মোসাদ তার পিছু নিলে ইসরাইলি এজেন্ট হিসেবে তার অতীত প্রকাশিত হবে। একই সাথে মোসাদ নিশ্চিত তাকে হত্যা করবে। মারওয়ান যদি লিবিয়া কিম্বা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক তৈরিই করে থাকেন তা করেছেন মোসাদের পূর্ণ সম্মতিতে।
২০০২ সালে ইসরাইলের ইতিহাস শীর্ষক পুস্তক প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। বইয়ের লেখক ইসরাইলের বিশেষ পন্ডিত আহরন ব্রেগসান। সেখানে ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধের ব্যাপারে ইসরাইলকে এক জামাতা সতর্ক করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। আর ঐ গোয়েন্দা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এঞ্জেল হলেন প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা। ব্রেগম্যান ঐ গোয়েন্দাকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন ঐ ডাবল এজেন্ট ইসরাইলকে মিথ্যা তথ্য দিতেন। ঐ বইয়ে মারওয়ানের নাম ছিল না। মারওয়ান মিসরের আল আহরাম পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রেগম্যানের গবেষণাকে একটা স্টুপিড গোয়েন্দা গল্প বলে অভিহিত করেন।
ব্রেগম্যান এতে খুবই দুঃখ পান। তিনি তার সম্মান বাঁচাতে একই পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। এই সাক্ষাৎকারে 'জামাতা' হিসেবে আশরাফ মারওয়ানের নাম উল্লেখ করেন।
অভিযোগটি গুরুতর। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু সাবেক আমান প্রধান জেনারেল জেইরা যখন মুখ খোলেন তখন ব্রেগম্যানের কথার সত্যতার প্রমাণ মেলে। জেইরা ঘোষণা দেন ঐ জামাতা ছিলেন ডাবল এজেন্ট। ইসরাইলকে তিনি বোকা বানিয়েছেন। এবং তার নাম আশরাফ মারওয়ান।
ইসরাইলের মাটিতে অতীতে কখনোই এমন ঘটনা ঘটেনি। ইসরাইল কখনোই তাদের সাবেক গুপ্তচরদের পরিচয় প্রকাশ করেনি; এমনকী সে যদি জীবিতও না থাকে। এদিকে আশরাফ মারওয়ান তো জীবিত। সাবেক মোসাদ-প্রধান জামির ত্রিশ বছর আগে অবসরে গেছেন। তিনি মারওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু এঞ্জেল জামিরের সাথে গলা মিলিয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। জামির বলেছেন, মারওয়ান হয়তো মনে করেছেন, আমি তাকে রক্ষা করতে পারব না। তবে আমি তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি সফল হইনি।
জেনারেল জেইরা যে তথ্য প্রকাশ করলেন তার কঠোর বিরোধিতা করলেন মোসাদের সাবেক প্রধান জামির। তিনি বললেন, জেইরা রাষ্ট্রের গোপনীয়তা বিনষ্ট করছেন। জেইরা পাল্টা আক্রমণ করে বললেন, মোসাদ-প্রধান জামির যাকে রক্ষা করতে চাইছেন তিনি একজন ডাবল এজেন্ট।
ইসরাইলি সাংবাদিক রোনেন মিসরের একটি টিভি অনুষ্ঠান সরাসরি দেখছিলেন। এটি ঐ সরকারের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে দেখা গেল মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসাইনী মোবারক মারওয়ানের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করছেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিক রোনেন আশরাফ মারওয়ানকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে অভিহিত করেন।
ইসরাইলে মারওয়ানের সত্যিকার পরিচিতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্কের মধ্যে মোসাদ ও আমান সত্য উদঘাটনে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করল। কিন্তু দুটি কমিটির রিপোর্টের উপসংহার ছিল একই। সেখানে বলা হল, মারওয়ান ডাবল এজেন্ট ছিলেন না এবং ইসরাইলের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু তিনি করেননি। জেনারেল জেইরা ছাড়বার পাত্র নন। তিনি সাবেক মোসাদ-প্রধান জামিরের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। একজন সাবেক বিচারপতি ঐ মামলার সালিশ নিযুক্ত হন এবং তিনি জামিরের বক্তব্যই সঠিক বলে রায় দেন।
জেইরা এবং তার সমর্থকরা কখনোই এ তথ্য আমলে নিতে চাননি যে, মারওয়ান মিসর সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা কিম্বা আনোয়ার সাদাতের একজন উপদেষ্টা। এদিকে গেড়াকলে পড়া মিসর সরকার কখনোই স্বীকার করতে চায়নি, তাদের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা একজন রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন কিম্বা ইহুদিদের হয়ে কাজ করেছেন। এটা স্বীকার করার অর্থ হল মিসরের জনগণ এতে যারপরনাই ব্যথিত হবে এবং মিসরের নেতাদের ব্যাপারে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ফলে তারা ভিন্ন এক প্রক্রিয়া গ্রহণ করল। তারা প্রকাশ্যে মারওয়ানের প্রশংসা করল কিন্তু তাকে আর সরকারের কোনো পদে কোনোক্রমেই জায়গা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
২০০৭ সালে ইসরাইলের উল্লেখিত বিচারক তার রায় প্রকাশ করলেন। ১২ জুন ইসরাইলের একটি আদালত সরকারিভাবে স্বীকার করল যে, জামিরের মাধ্যমে মারওয়ান মোসাদের হয়ে কাজ করেছেন। দুই সপ্তাহ পরে ২৭ জুন মারওয়ানের লাশ তার বারান্দার নিচে রাস্তার পাশে পাওয়া গেল।
ইসরাইলি পর্যবেক্ষকরা এই হত্যার জন্য মিসরের গোয়েন্দা বিভাগকে দায়ী করল। অনেকে জেনারেল জেইরকে দায়ী করল। তার লাগামহীন কথাবার্তা ও আচরণই মারওয়ানের মৃত্যুর কারণ। এদিকে মারওয়ানের বিধবা স্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ে তার স্বামীকে হত্যার জন্য মোসাদকে দায়ী করে বিবৃতি দিলেন। এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলল, মৃত্যুর কিছু আগে মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের চেহারার কিছু লোককে মারওয়ানের সঙ্গে বারান্দায় কথা বলতে দেখা গেছে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও মামলার তদন্ত করল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে বলল, হত্যাকারীকে খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ।
এঞ্জেলের হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা আজও হয়নি। ইচ্ছে করলে কেউ তদন্ত করে দেখতে পারেন।
📄 আমরা চাই একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান
অপহৃত ইয়োসেলিকে উদ্ধারে মোসাদ-প্রধান আইসারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। মোসাদে আইসারের স্থলাভিষিক্ত হন মেইর অমিত। তিনি এক বিশেষ ধাঁচের মানুষ। কী রকম? মেইর অমিত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কখনো কখনো কাঠখোট্টা হালকা ঝগড়াটে স্বভাবের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল। পাশাপাশি উষ্ণ স্বভাবের সোলজারস সোলজার এবং তার অনেক বন্ধু-বান্ধবও। মোশে দায়ান একবার বলেছিলেন, আমার সব বন্ধুর মধ্যে মেইর অমিতই সেরা।
মেইর অমিতের জীবন-যাপন এবং পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ পদ্ধতি মোসাদের নেতৃত্বের ধরনই পাল্টে দেয়। আগের মোসাদ-প্রধান আইসারের জন্ম রাশিয়ায়। মেইর অমিতের জন্ম ইসরাইলেই। ইসরাইল যুদ্ধে মেইর অমিত অংশ নিয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীতে যথারীতি ইউনিফর্ম পরে দীর্ঘদিন চাকরি করে তবে মোসাদে যোগদান করেন। আইসারদের জেনারেশনের ছিল নিজেকে অন্যের নজরে না আনার প্রবণতা। মুখ বন্ধ রাখা, ষড়যন্ত্র এবং অন্তরালে থাকার মানসিকতা নিয়ে তারা কাজ করতেন। কিন্তু মেইর অমিত সেনাবাহিনীর লোক। অনেক বন্ধু ও সহকর্মী তার। এবং তারা সকলেই ধারণা করতেন যে, মেইর অমিত কী করতে যাচ্ছেন। ছায়ার পেছনে লুকিয়ে থাকার মানুষ তিনি নন। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসারের মধ্যে কারিশমা ও রহস্যপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু অমিত ও তার উত্তরসুরীদের মধ্যে প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা ও কর্তৃত্বপরায়ণতা লক্ষণীয়। সামরিক বাহিনীতে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ইউনিফর্ম তাদের মধ্যে এমন গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছে।
ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধে অমিত আহত হলেও সামরিক বাহিনীতে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়ে ছিলেন। এলিট বাহিনী গোলানী ব্রিগেডের কমান্ডার অমিত সিনাই ক্যাম্পেইনের সময় অপারেশন চীফ ছিলেন। তার সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু প্যারাসুট জ্যাম্পে আহত হয়ে তাকে এক বছর হাসপাতালে কাটাতে হয়। সামান্য আরোগ্য লাভ করে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতে যান। পরে তাকে আমান বাহিনীর প্রধান করা হয়। ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে নেল গুরিয়েন তাকে আইসারের স্থলাভিষিক্ত করেন। মোসাদ-প্রধান হন মেইর অমিত।
মোসাদের প্রধান হিসেবে অমিতের প্রথম দিকের দিনগুলো খুব সহজ ছিল না। ইয়াকেভ কারুজসহ আইসারের অনেক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীই অমিতের আচরণে রুষ্ট ছিলেন। তার আকস্মিক মেজাজ দেখানো কিম্বা অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী ভঙ্গি অনেক সিনিয়রদের কাছেই ছিল বিরক্তিকর। অনেকেই চটজলদি পদত্যাগ করলেন, কয়েকজন পদত্যাগে কিছুটা সময় নিলেন। অমিতের নেতৃত্বে মোসাদে পরিবর্তন হতে থাকল। তবে মেইর অমিতের সঙ্গে আইসারের সম্পর্ক খুব বেশি খারাপ হয়ে পড়ে।
১৯৬৩ সালের বসন্তকালে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে বেন গুরিয়েন পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন তারই ঘনিষ্ঠ সহযোগী লেভী এসকোল। এসকোলের বেশ কিছু সিদ্ধান্তে তার পূর্বসূরী বিরক্ত হন। এর মধ্যে আইসারকে তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দান। গোয়েন্দা বিষয়ক দফতরে আইসারকে উপদেষ্টা করা হয়। মোসাদ থেকে চলে যাওয়ার পর আইসার ছিলেন বিরক্ত। যখন তিনি শুনলেন যে, অমিত মরক্কো সরকারকে নিয়মনীতি ভেঙে সহযোগিতা করতে যাচ্ছে তখন তিনি আর সুস্থির থাকতে পারলেন না। সোজা অমিতের অফিসে গিয়ে তার ঘাড়টা ধরেন আর কী।
অমিতের নেতৃত্বাধীন মোসাদ মরক্কোর রাজ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আইসারের কার্যকালেই মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে শুরু করে। মরক্কোর সঙ্গে মোসাদের ইয়াকোভ কারুজ ও রাফি এইটান প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৬৩ সালের শীতকালে আইসার এইটানকে একটা বড় ধরনের সিদ্ধান্তের কথা অত্যন্ত গোপনীয় রাখার শর্তে প্রকাশ করেছিলেন। কথাটা হল মরক্কোর বাদশা হাসান দুই-এর আশংকা মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। হত্যা ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারণ হল বাদশাহ হাসান পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়ে উঠছেন। এখন বাদশাহ হাসান চাইছেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব মোসাদ নিক।
এই গল্প, কাহিনী বা তথ্য অভাবনীয় বা অসম্ভব মনে হতে পারে। একটি আরব দেশের বাদশাহ আজ ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্য নিতে চাইছেন? সব সময় বাস্তববাদী হিসেবে খ্যাত রাফি এইটান ও ডেভিড সমোরন নামের আরেক গোয়েন্দা গোপনে মরক্কোর রাজধানী রাবাত সফর করেন। তারা ভুয়া পাসপোর্টে সেখানে যান। একটা গোপন দরজা দিয়ে তাদের বাদশাহর প্রাসাদে ঢোকানো হয়। সেখানে তারা মরক্কোর ভয়ানক জেনারেল ওইউফকীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওইউফকীর মরক্কোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যাবতীয় নিষ্ঠুরতার জন্য সুপরিচিত। বাদশার বিরুদ্ধে গেলে ওইউফকীর তাকে বাঁচিয়ে রাখেন না। দলে দলে বিরোধী দলীয় লোক গায়েব হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে বাকি থাকে না এর পেছনে রয়েছেন ওইউফকীর। গোয়েন্দা বিষয়ক পরামর্শের ক্ষেত্রে বাদশাহ হাসান এই জেনারেলের পরামর্শকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে ইসরাইল ও মরক্কোর মধ্যে কোনো চুক্তি সম্পাদনে তার অনুমোদন লাগবে। মোসাদের এইটানের সঙ্গে বৈঠককালে জেনারেল ওইউফকীর তার ডেপুটি কর্নেল ডলিমিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
এইটান এবং ওইউফকীর একটা চুক্তিতে উপনীত হন। চুক্তিটা হল মোসাদ ও মরক্কোর গোয়েন্দা বিভাগ সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করবে এবং পরস্পর পরস্পরের দেশে স্থায়ী অফিস খুলবে। মোসাদ মরক্কোর গোয়েন্দাদের প্রশিক্ষণ দেবে এবং মরক্কো বিশ্বব্যাপী মোসাদ সদস্যদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। গোয়েন্দা তথ্যসমূহ দুই দেশ ভাগাভাগি করে নেয়ার স্বার্থে একটা বিশেষ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করবে। চুক্তিতে আরও বলা হয়, মরক্কোর বাদশার নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের মোসাদ উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবে। বাদশাহ হাসানের উপস্থিতিতে এই চুক্তিপত্রের সীলমোহর করা হয় এবং এইটান বাদশাহকে কুর্নিশ শেষে তার হাতে চুম্বন করেন।
আরব বিশ্বে মোসাদ এই প্রথম তার কোনো বন্ধু বা সুহৃদের সন্ধান পেল।
এই চুক্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে ওইউফকীর ইসরাইল যান। জেনারেল ওইউফকীর বিদেশে সবচে দামী হোটেলে থাকেন। কিন্তু ইসরাইলে গিয়ে তিনি এইটানের তেলআবিব সন্নিহিত ক্ষুদ্র তিন রুমের ফ্ল্যাটে উঠেন। জেনারেল ওইউফকীরের খাওয়া-দাওয়ার জন্য মোসাদের প্রবাদপ্রতিম বাবুর্চি ফিলিপকে পাওয়া যায়। ওইউফকীরের এই আসা-যাওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক বেশ ভালো হয়ে উঠে। ঠিক এমনি সময় ওইউফকীর মোসাদ-প্রধান মেইর অমিতের কাছে একটা স্পেশাল ফেভার চান।
মরক্কোর বাদশাহর প্রধান শত্রু ছিলেন সে দেশেরই মেহেদী বেন বারকা। তিনি আবার বিরোধী দলেরও নেতা। বাদশাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলেও দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ সমানে চলছিল। পলাতক অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মেহেদী তার জীবনের ওপর হুমকির কথা জানতেন এবং ওইউফকীর লোকজন যাতে তাকে ধরতে না পারে সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। ফলে তাকে ধরা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মোসাদ কী এখন তাকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করবে?
মেইর অমিতের লোকজন একাজে সহায়তা করেছিলেন। মোসাদ মেহেদী বেন বারকাকে ধোঁকা দিয়ে সুইজারল্যান্ডে আসতে রাজি করেছিলো। অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা বলে তাকে প্যারিসে নিয়ে আসা হয়। প্যারিসের বিখ্যাত লেফট ব্যাংক রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই ফ্রান্সের দুই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে জানা গেছে মরক্কোর মন্ত্রী ওইউফকীরের পে-রোলে ছিল ওই দুই পুলিশ অফিসার। বেন বারকাকে ওইউফকীরের হাতে হস্তান্তর করা হলে তিনি গুম হয়ে যান। কিন্তু একজন সাক্ষী বলেন যে, তিনি দেখেছেন ওইউফকীর নিজে মেহেদী বেন বারকাকে ছুরি মেরে হত্যা করেছেন। মেইর অমিত নিজেই প্রধানমন্ত্রী এসকোলকে জানান যে, লোকটিকে হত্যা করা হয়েছে।
বেন বারকার গুম হওয়ার ঘটনায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক গুজব গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট দ্যা গল এই ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ হন। যখন তিনি এই ঘটনায় মোসাদের সংশ্লিষ্টতার খবর পান তখন তিনি আরও ক্রোধান্বিত হন।
সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। মোসাদ কী করে এই ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হয়? তার জিজ্ঞাসা, মোসাদ কী করে এমন অনৈতিক ও ফৌজদারী অপরাধে নিজেদের যুক্ত করে এবং এর ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক আজ খুবই খারাপ হতে চলেছে। আইসার প্রধানমন্ত্রী এসকোলের কাছেও এ প্রশ্ন করেন এবং অবিলম্বে মেইর অমিতকে চাকরিচ্যুত করার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী এসকোল দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং বাধ্য হয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দুটি কমিটিই মেইর অমিতকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। সাবেক মোসাদ-প্রধান আইসার অতঃপর পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও মেইর অমিতের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে নেমে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের সাহায্য কামনা করলেও কঠিন সামরিক সেন্সরশীপের কারণে এ ব্যাপারটি কোনো প্রচারণা পায় না।
আইসার অমিতের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকলেও বর্তমান মোসাদ-প্রধান অমিত অপর একটি অভিযান নিয়ে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছেন। আর এই অভিযানটি ইসরাইলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। অমিতের এই নতুন প্রকল্পটি হল ইরাকের কুর্দীদের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত তৈরি।
১৯৬৫ সালের শেষার্ধ্বে মেইর অমিত তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে। অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ইরাকের কুর্দী বিদ্রোহী নেতা মোল্লা মোস্তফা বারজানীর তাঁবুতে ইসরাইলি সরকারি প্রতিনিধি আস্তানা গাড়তে সক্ষম হয়েছে। মোসাদ কর্মকর্তাদের কুর্দীস্তানে অবস্থানকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগের এক বিশাল সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হল। ইরাকের একটি প্রধান ফ্যাক্টর হল কুর্দীরা। এই একগুঁয়ে সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই প্রথম বারের মতো ইসরাইলের একটা যোগসূত্র সৃষ্টি হল। কুর্দীরা ইরাকী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কুর্দীরা ছাড়া ইরাকের আর দুটি ফ্যাক্টর হল শিয়া ও সুন্নীরা। বারজানীর নেতৃত্বাধীন কুর্দীরা ইরাকের অভ্যন্তরে ব্যাপক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। মোসাদ যদি কুর্দী বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে আরও শক্তিশালী করতে সমর্থ হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ইরাককে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে ইরাকের শক্তি ক্ষয় হবে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাবে। কুর্দীদের সঙ্গে এই আঁতাত ইসরাইলের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।
প্রথমে তিনজন মোসাদ গোয়েন্দা কুর্দীস্তানে তিন মাস অবস্থান করে। বারজানী তাদেরকে ইনার সার্কেলের অংশ করে নেন। বারজানি যেখানেই যেতেন তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ফলে কুর্দীদের সব গোপন তথ্যাদি মোসাদের জানা হয়ে যায়। মোসাদ ও কুর্দীদের এই সম্পর্ক বেশ ক'বছর উষ্ণ ছিল। বারজানী ও কুর্দীদের সামরিক বাহিনীর প্রধান বেশ কয়েকবার ইসরাইল সফর করেন। মেইর অমিত এবং সহকারীরা কুর্দীস্তান সফর করেন। ইসরাইল কুর্দীদের প্রচুর অস্ত্র দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে কুর্দীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে।
কুর্দীস্তান সফরকারী ইসরাইলি গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রথম সিনিয়র মোস্ট গোয়েন্দা হলেন বেনি জেভি। তার স্ত্রী গালিলা সন্তান প্রসবের লক্ষ্যে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এই দম্পতির পুত্র সন্তান নাদাভের জন্মের সময় বেনি জেভি কুর্দীস্তানের পাহাড়ে পাহাড়ে বারজানীর সঙ্গে সফর করছিলেন। এই সময় বেনি জেভির কাছে সাংকেতিক ভাষায় একটি টেলিগ্রাম পাঠান মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত। অমিতের কোড নাম রিমন। টেলিগ্রামে বলা হয় মা ও সন্তানের স্বাস্থ্য খুবই ভালো রয়েছে।
বেনি জেভির ছেলে হওয়ার সংবাদে বারজানী চারখন্ড পাথর নিয়ে তাতে নানা কথা লিখলেন। জেভিকে বললেন, আপনার ছেলের জন্য আমার এই উপহার। ছেলে বড় হয়ে যখন আমার দেশে আসতে চাইবে তাকে কেউ আটকাবে না। কুর্দীস্তানে সে জমিও পাবে।
বেশ কয়েক বছর পর অমিতের মৃত্যুতে তাকে স্মরণ করে ইসরাইলের বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ইজার ওয়েইজম্যান বলেছেন, আমরা প্রায়শই তার বাড়িতে যেতাম। প্রায়শই আমরা এক সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতাম। এরকম একদিন সকালে মেইর অমিত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মোসাদ-প্রধান হিসেবে আমি আপনার জন্য কী করতে পারি। জেনারেল ওয়েইজম্যান বললেন মেইর আমি একটা মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চাই।
মেইর অমিত তাকে বললেন, আপনি কী পাগল হয়ে গেছেন? পশ্চিমাদের কাছে পর্যন্ত এরকম একটি যুদ্ধবিমান নেই।
প্রকৃতপক্ষে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ঐ আমলের সবচে সফিসটিকেটেড যুদ্ধবিমান। সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েকটি আরব দেশকে অবশ্য ঐ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে।
কিন্তু জেনারেল ওয়েইজম্যান নাছোড়বান্দা। অমিতের মাধ্যমে একটা মিগ তার চাইই চাই। মেইর অমিত এরকম একটি বিমান সংগ্রহে অপারেশন অফিসার বেহাভিয়া ভার্দিকে দায়িত্ব দিলেন। ভার্দি ইতিপূর্বে সিরিয় অথবা মিসর থেকে একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান গায়েবের চেষ্টা করেছেন। ভার্দি এক বছর পরে অমিতকে জানালেন যে, একাজে আমরা কয়েকমাস অতিবাহিত করেছি। মূল সমস্যা হল এরকম একটি প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করা কঠিন।
ভার্দি তার প্রত্যাশার কথা আরব দেশগুলোতে তার লোকজনের কাছে জানালেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ইরানে নিযুক্ত ইসরাইলের সামরিক এ্যাটাশে ইয়াকোভ নিমরোদি এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন পাঠালেন মোসাদে। তার চিঠির ভাষ্যমতে ইয়োসেফ সেমেশ নামে এক ইরাকী ইহুদির দাবি তিনি এমন একজন ইরাকী পাইলটকে জানেন যে, সে কাজটি পারবে। অর্থাৎ ইরাক থেকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান উড়িয়ে সে ইসরাইলে অবতরণ করাবে।
ইয়োসেফ সেমেশ বিয়ে থা করেননি। স্মার্ট, পরকীয়া করে বেড়াচ্ছেন সমানে। আবার ভোজনবিলাসী। তার একটা মস্ত গুণ স্বল্প সময়েই তিনি বন্ধু হয়ে যেতে পারেন যে কারো। এসব বন্ধুরা তাকে বিশ্বাসও করে।
নিমরোদি সেমেশ সম্পর্কে মোসাদকে আরও জানালেন যে, তার পক্ষেই এ কাজ করা সম্ভব। তাছাড়া সেমেশ তার সঙ্গে গত এক বছর ধরে কাজ করছেন।
নিমরোদি সেমেশকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ করলেন। গুপ্তচরবৃত্তির কয়েকটি ছোটখাট কাজে সেমেশকে নিয়োগ দিলেন। সেমেশ অতিশয় বুদ্ধিমত্তার জন্য পরীক্ষায় পাশও করলেন।
নিমরোদি অতঃপর তাকে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান বিমান হাইজ্যাকের ব্যাপারে অগ্রসর হতে সবুজ সংকেত দিলেন।
বাগদাদে সেমেশের একজন খ্রীষ্টান রক্ষিতা ছিল। তার বোন ক্যামলে ইরাকি বিমান বাহিনীর পাইলট মুনীর রেডফাকে বিয়ে করেছেন। মুনীরও খ্রীষ্টান। সেমেশ জানতেন মুনীর হতাশায় নিমজ্জিত। মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর ক্ষেত্রে মুনীর খুব পারদর্শী হলেও তাকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। তদুপরি একটা সেকেলে মিগ সেভেনটিন বিমান দিয়ে কুর্দী এলাকায় হামলা চালাতে নির্দেশ দেয়া হল। তার মনে হল এ তার পদাবনতি এবং তার জন্য অমর্যাদাকর। সুপেরিয়ার অফিসারদের সঙ্গে এ ব্যাপারে নালিশ করেও কোনো ফল হল না। একটা পর্যায়ে সে বুঝতে পারল খ্রীষ্টান হওয়ার কারণেই তার পদোন্নতি কখনো হবে না। অর্থাৎ সে স্কোয়াড্রন লিডার হতে পারবে না। উচ্চাভিলাষী মুনীর বুঝলো এই অবস্থায় ইরাক বসবাসের কোনো মানে হয় না।
সেমেশ প্রায় এক বছর ধরে তরুণ পাইলট মুনীরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকলেন। এক পর্যায়ে মুনীরকে এথেন্সে একটা শর্ট ট্রিপে যেতে রাজি করালেন। বাকপটু সেমেশ ইরাকী কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, মুনীরের স্ত্রী দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং পশ্চিমের কোনো দেশে তার চিকিৎসা জরুরি। মুনীরের স্ত্রী প্রথমে গ্রীসে যাবে। এক্ষেত্রে তার স্বামীকে সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কেননা ঐ পরিবারে মুনীরই একমাত্র ইংরেজি জানে।
ইরাকী কর্তৃপক্ষ শর্তাধীনে মুনীর ও তার স্ত্রীকে এথেন্সে যাওয়ার অনুমতি দিল। সেখানে তাদের সঙ্গে ইসরাইলের এয়ারফোর্স অফিসার কর্নেল লিরনের যোগাযোগ হল। লিরনের জন্ম পোল্যান্ডে এবং হলোকাষ্ট থেকে যাওয়া এই অফিসার ইসরাইলি এয়ারফোর্স ইন্টেলিজেন্সের প্রধান। মোসাদ তাকে নির্দেশ দিল মুনীর রেডফার বিষয়টি দেখার জন্য। লিরন এবং মুনীর সামনা-সামনি বসে অনেকগুলো বৈঠক করলেন। লিরন পরিচয় গোপন করে নিজেকে একজন পোলিশ পাইলট হিসেবে পরিচয় দিলেন এবং কম্যুনিষ্ট বিরোধী সংস্থার কাজ করেন বলে জানালেন।
মুনীর লিরনকে তার সব দুঃখের কথা বললেন। প্রথমে তার পরিবার, ইরাকে তার জীবন, সিনিয়রদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার ঘটনা, কুর্দীস্তানে বোমা ফেলার কাজে তাকে ব্যবহার ইত্যাদি তিনি লিরনকে খুলে বললেন। কুর্দীস্তানে তার বোমা হামলায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা মারা যাচ্ছে বলে মুনীর দুঃখ প্রকাশ করলেন। এসব নাদান মানুষকে বোমা মেরে হত্যার জন্যই কী তার জন্ম। লিরনের সঙ্গে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হল মুনীর ইরাক ছাড়বেন।
মোসাদের নির্দেশ মোতাবেক লিরন মুনীরকে গ্রীসের একটি ছোট্ট দ্বীপে দাওয়াত দিলেন। মোসাদ একটা সাঙ্কেতিক নাম দিল। ইংরেজিতে যা ডায়মন্ড বাংলায় হীরকখন্ড।
গ্রীসের দ্বীপের শান্ত সমাহিত পরিবেশে মুনীর এবং লিরন আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেলেন। লিরন মুনীরকে একটি প্রশ্ন করলেন, যদি আপনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরাক ত্যাগ করেন তার পরিণতি কী হবে। মুনীর বললেন, তারা হয়তো আমাকে হত্যা করবে। এছাড়া কোনো দেশই আমাকে আশ্রয় দিতে রাজি হবে না।
এ সময় লিরন দু'বাহু বাড়িয়ে মুনীরকে বললেন, পৃথিবীতে একটা দেশই রয়েছে। যে আপনাকে আশ্রয় দেবে। লিরন তার বন্ধুর কাছে স্বীকারও করলেন, তিনি কোনো পোলিশ পাইলট নন, ইসরাইলি পাইলট। ঘানার টেবিলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।
লিরন ঐ দিনের জন্য বিদায় নিলেন। পরদিন মুনীর লিরনের প্রস্তাবে তার সম্মতির কথা জানালেন। তারা দু'জন মুনীরের দেশত্যাগ তথা স্বপক্ষ ত্যাগ নিয়ে এবং মুনীরকে কত টাকা দেয়া হবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হল।
মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীর ভালো লোক। মুনীর ইচ্ছে করলে টাকার অংক দ্বিগুণ করতে পারতেন। কিন্তু প্রথমবার প্রদত্ত প্রস্তাবেই মুনীর রাজি হয়ে গেলেন। মুনীরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হল, তার পরিবার ইসরাইলে গিয়ে তার সঙ্গে যোগদান করবে।
গ্রীসের ঐ দ্বীপ থেকে লিরন ও মুনীর উড়ে গেল রোমে। সেমেশ এবং তার রক্ষিতা বাগদাদ থেকে সেখানে এল। কয়েকদিন পর তারা ইসরাইলি বিমান বাহিনীর গবেষণা কর্মকর্তা ইয়েহুদা পোরাটের সঙ্গে বৈঠক করলেন। পোরাট মুনীরকে পুরো ব্রিফিং দিলেন। পরবর্তীতে পোরাট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন মুনীর এককথায় ভদ্র, খুবই বিবেচক। তাকে শ্রদ্ধা করা যায়। পোরাট আরও বলেন, মুনীর সাহসী। বাচাল নয়।
রোমে লিরন ও মুনীর যোগাযোগের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করলেন। উভয়ে সিদ্ধান্তে এলেন যে, ইসরাইলি রেডিও থেকে আরবি জনপ্রিয় গান বাজানো শুরু হলে মুনীর বিমান নিয়ে তার যাত্রা শুরু করবেন। এটাই তার সিগনাল। গানটি হল মারহাবা মারহাবা।
মুনীর জানতেন না, তিনি যখন রোমে মোসাদের লোকদের সঙ্গে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বৈঠক করে চলছেন, তাকে মোসাদের শীর্ষ বসরা তখন পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত বলেছেন, যে লোকটা পৃথিবীর সেরা যুদ্ধবিমানটি নিজ দেশ থেকে উড়িয়ে শত্রু দেশে নিয়ে আসবে তাকে একবার চোখে দেখা তার জন্য জরুরি। অমিত বলেছেন, তিনি রোমে উড়ে যান এবং তার লোকের সঙ্গে মুনীরের বৈঠকের সময় তিনি পাশের টেবিলেই বসা ছিলেন। যাহোক, মুনীরকে আমার যোগ্য লোকই মনে হল। আমি আমার অফিসারকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম।
মেইর অমিত হেড অন নামক তার বইয়ে ক্যাফের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায় ইহুদি প্রেমিক সেমেশ ঐ দিন স্লিপার পরেছিলেন। কেননা তার পায়ে চোট লেগেছিল। তার ভাষায়, সেমেশের বান্ধবী বা রক্ষিতা মোটা-সোটা মহিলা এবং বিন্দুমাত্র সুন্দরী নয়। আমি জানি না সেমেশ ঐ মহিলার মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছে। এদের সঙ্গে ছিলেন মুনীর-বিশাল কাধের অধিকারী কিন্তু খাটো এবং সিরিয়স চেহারার এক মানুষ। এরা কেউই বুঝতে পারেননি যে, তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে।
মুনীরকে আস্থায় নিয়ে মোসাদ-প্রধান অমিত ভাদিকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন।
লিরন ও মুনীর এথেন্সে এসে তেলআবিবের প্লেন ধরবেন। মুনীর তেলআবিবের প্লেনের বদলে কায়রোগামী প্লেনে উঠে বসেছিলেন। হতাশ লিরন ভাবলেন, তাদের সব আশা-ভরসা শেষ। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে লिरনের পাশে এসে উপস্থিত হলেন মুনীর। কায়রোগামী প্লেনের যাত্রী গণনাকালে একজন অতিরিক্ত যাত্রীর সন্ধান মেলে। সেই যাত্রীই মুনীর। টিকেট চেক করা হলে দেখা গেল মুনীরের টিকেট তেলআবিবগামী।
মুনীর ইসরাইলে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা অবস্থান করেন। সে সময় তাকে ব্যাপকভাবে ব্রিফ করা হয় এবং ইরাক থেকে কোনো পথে বিমানটি আসবে তারও নির্দেশিকা দেখানো হয়। মোসাদ অফিসে তাকে একটি গোপন কোডও দেয়া হয়। আরও কিছু কর্মসূচী শেষে তাকে জাফার ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়ানো হয়। যাতে মুনীরের মনে প্রত্যয় জাগে যে, তিনি বাড়িতেই আছেন। মুনীর পরিকল্পনা বদল করে এথেন্স হয়ে বাগদাদে ফিরে এলেন। এরপর শুরু হবে তার চূড়ান্ত পর্বের কার্যক্রম।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত পরে বলেছেন, মুনীরের একটি ঘটনায় তার হার্ট এ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মুনীর দেশ ত্যাগের কিছুদিন আগে তার বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ বিমানের একজন পাইলটের এহেন কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবলে গা শিউরে না উঠে পারে না। ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারত যদি তার এসব মালামাল বিক্রির হেতু জানতে চায় নির্ঘাৎ মুনীর ধরা পড়বেন। মুনীরকে গ্রেফতার করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি যাবতীয় ষড়যন্ত্রের কথা বলে দেবেন। ব্যস, কেল্লা ফতে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, মুখাভারত ঐ বেচা-বিক্রি নিয়ে কিছু জানতে পারেনি। গাধা ও কৃপন মুনীর সামান্য টাকার জন্য জীবনটাই খোয়াতে বসেছিলেন।
এরপর আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। পাইলট মুনীরের পরিবারকে কী করে ইরাকের বাইরে আনা যায়- প্রথমে লন্ডন পরে আমেরিকা। মুনীরের অনেকগুলো বোন ও ভগ্নিপতি। যুদ্ধবিমান ছিনতাইয়ের আগেই তাদেরকে ইরাক থেকে সরাতে হবে। পরিবারের কয়েকজন ইসরাইলে চলে আসতে রাজি হলেও পাইলট মুনীর কী সব হতে যাচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গও তার স্ত্রীকে ভয়ে বলেননি। স্ত্রীকে শুধু একটা কথাই বলেছেন তারা ইউরোপে যাবেন এবং সেখানে দীর্ঘদিন থাকবেন। তার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে আমস্টারডামে এলে মোসাদের লোকজন তাদের প্যারিসে নিয়ে এল। লিরন সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলেও এরা যে মোসাদের লোক মিসেস মুনীর তা ধারণা করতে পারেননি।
লিরন পরে বলেছেন, মিসেস মুনীরকে ছোট ফ্ল্যাটে একটা ডাবল বেডের বিছানার ব্যবস্থা করা হল। লিরনের ভাষায়, আমরা তার ডাবল বেডে বসলাম। ঐ দিন রাতেই পাইলট মুনীরের মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইল অভিমুখে ইরাক থেকে ভেগে আসার কথা। লিরন বলেন, এক পর্যায়ে আমি যে ইসরাইলি অফিসার সে কথা তাকে বললাম। তাকে আরও বললাম, আপনার স্বামী আগামীকাল ইসরাইলে ল্যান্ড করবেন এবং আমরা এক পর্যায়ে সেখানেই চলে যাব।
লিরন বলেন, একথায় পাইলট মুনীরের স্ত্রী বেজায় কান্না জুড়ে দেন। সারা রাত চীৎকার করে এই মহিলা কাঁদছিলেন। মিসেস মুনীর তার স্বামীকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রভৃতি বলে গালাগালি দিতে থাকেন। লিরন আবার সে কথা তার সিনিয়রদের জানিয়েও দেন। মিসেস মুনীর আরও বলেন, তার স্বামী ইরাকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার ভাইয়েরা যখনি পাবে মুনীরকে হত্যা করবে। মিসেস মুনীর এখুনি ইরাকী দূতাবাসে যেতে চাইলেন এবং তার স্বামীর কুকীর্তির কথা তাদের জানাবেন।
পাইলট মুনীরের স্ত্রী এভাবেই সারা রাত কাঁদলেন। লিরন তাকে থামাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে লিরন তাকে বললেন, স্বামীকে দেখতে চাইলে আমার সঙ্গে ইসরাইল যেতে হবে। মিসেস মুনীর বুঝলেন, তার কাছে আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। অশ্রুভেজা চোখে মিসেস মুনীর তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ইসরাইলের প্লেনে গিয়ে উঠে বসলেন।
১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই ইউরোপে মোসাদের অফিস একটা সাংকেতিক চিঠি পায় মুনীরের কাছ থেকে। মুনীর তাতে লিখেছেন, তিনি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইসরাইলের পথে যাত্রার কাজ শুরু করেছেন। ১৪ আগস্ট মুনীর যাত্রা শুরু করলেও বিমানের বৈদ্যুতিক সিষ্টেমে গলদের কারণে তিনি ফিরে এসে রশীদ বিমান ঘাঁটিতে ল্যান্ড করেন।
মোসাদ-প্রধান অমিত পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মুনীরের বিমানের ত্রুটি বড় ধরনের ছিল না। মুনীর ইচ্ছে করলে উড়ে আসতে পারতেন। কিন্তু মুনীর কোনো ঝুঁকি না নিয়েই ঘাঁটিতে ফিরে যান। অমিত বলেন, এই ঘটনায় আমি কত যে পাকা চুল ছিঁড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আমার টেবিলটি পাকা চুলে ভরে গিয়েছিল।
দু'দিন পরে মুনীর আবার যুদ্ধবিমানটি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি নির্দেশিত পথেই উড়ে আসছিলেন। এক পর্যায়ে ইসরাইলি রাডারে একটি বিদেশি বিমানের এগিয়ে আসার চিহ্ন উদ্ভাসিত হল। বিমান বাহিনীর নতুন কমান্ডার জেনারেল মোরডেচাই (মোট্টি) হড সামান্য কয়েকজন পাইলটকে এই কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল মুনীরের বিমানটিকে এসকর্ট করে নির্বিঘ্নে ঘাঁটিতে নিয়ে আসা। হড ঐ ঘাঁটির সব কর্মকর্তা, কর্মচারী, পাইলট, স্কোয়াড্রনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমাদের আজ কোনো কাজ নেই। ছুটি। তবে আমার মৌখিক নির্দেশ পেলে জীবন দিতে বললে তাই করতে হবে। এবং তোমরা সবাই তো আমার কণ্ঠস্বর চেনই। ইসরাইলি ভূমিতে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে কতিপয় অতিমাত্রায় হিংসুক প্রকৃতির পাইলট যাতে শত্রু বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত না করে সে কারণেই এই ব্যবস্থা।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান এখন ইসরাইলের আকাশে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর এক দক্ষ কর্মকর্তা রান পেকারকে মুনীরকে এসকর্ট করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেয়া হল। পেকার বিমান ঘাঁটির কন্ট্রোলকে জানালেন, আমাদের মেহমান গতি কমিয়ে আনছেন। মেহমান আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইংগিত করেছেন যে, তিনি ল্যান্ড করতে চাইছেন। তিনি তার বিমানের পাখাও কাত করে দেখিয়েছেন। আর আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বিমানের পাখা কাত করে দেখানোর অর্থ হল তিনি শান্তি চান। শান্তির বার্তা নিয়ে তিনি এসেছেন।
সকাল আটটায় ইরাকী পাইলট মুনীরের বিমান ইসরাইলের বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করল। ৬৫ মিনিট সময় লেগেছে ইরাকের বাগদাদ থেকে ইসরাইলে হাটজোর বিমান ঘাঁটিতে এসে পৌঁছাতে।
১৯৬৭ সালের আগে কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ৬দিন ব্যাপী একক যুদ্ধে ইসরাইল বড় ধরনের জয় পেয়েছিল। আর এই যুদ্ধের আগেই অনৈতিকভাবে ইসরাইল একটি মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমান করায়ত্ত করেছিল। দুটি মিরেজ যুদ্ধবিমান মিগটিকে এসকর্ট করে সীমান্ত ঘাঁটি থেকে উড়িয়ে এনেছিল। মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত এবং তার লোকজন এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ঐ সময় মিগ টুয়েন্টি ওয়ান যুদ্ধবিমানকে সোভিয়েত অস্ত্র ভান্ডারের ক্রাউন জুয়েল বলে অভিহিত করা হত। পশ্চিমা শক্তিও মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের ভয়ে সর্বদা কাঁপত। সেই মিগটি আজ ইসরাইলের দখলে।
ইরাকী পাইলট মুনীর ইসরাইলের ঘাঁটিতে নিরাপদ অবতরণের পরেও বিভ্রান্ত ও হতচকিত ছিলেন। মুনীরকে হাটজোর ঘাঁটির কমান্ডারের বাসায় নেয়া হয়। এখানে সিনিয়র অফিসাররা তার সম্মানে পার্টির আয়োজন করেন।
মুনীর পার্টির বহর দেখে বিস্মিত। প্রথমে তার মনে হয়েছিল অন্য কারো বিয়ের পার্টিতে ভুল করে তিনি ঢুকে পড়েছেন। মেইর অমিত বলেছেন, মুনীর পার্টির এক কোনে জড়সড় ও শান্ত হয়ে বসেছিলেন।
কিছুটা বিশ্রাম শেষে মুনীরকে জানান হল তার স্ত্রী ও শিশুরা বিমানে করে ইসরাইলে আসছে। মুনীরকে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া হল। সাংবাদিক সম্মেলনে পাইলট মুনীর ইরাকে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের কথা বলেন। দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে মুনীর তার ওপর অবিচারের কথা বলেন এবং কুর্দীদের ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণের প্রতিবাদ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে মুনীরকে তেলআবিব সন্নিহিত সমুদ্র তীরবর্তী হারজলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে তার পরিবার অবস্থান করছে।
মোসাদ-প্রধান মেইর অমিত লিখেছেন, পাইলট মুনীরকে স্বাভাবিক ও শান্ত করতে আমরা সবধরনের পদক্ষেপ নেই। আমরা তাকে নানাভাবে উজ্জীবিত করি এবং বড় একটা সফল অভিযানের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। মেইর অমিত আরও লিখেছেন, আমার যত ক্ষমতা রয়েছে তা ব্যবহারের মাধ্যমে মুনীর এবং তার পরিবারের কল্যাণ করা হবে বলে আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে। কেননা মুনীরের পরিবার যে একটা সমস্যা সংকুল পরিবার তা আমি জানতাম।
এর কিছুদিনের মধ্যেই মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইসরাইলে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন সেই বিখ্যাত সেমেশ এবং তার বান্ধবী ক্যামিল্লে। মুনীরের স্ত্রীর ভাই ইরাকী সেনাবাহিনীর অফিসার। ঐ অফিসারটি রাগে গজগজ করছিলেন। সামনা-সামনি হতেই তিনি মুনীরের মাথায় ঘুষি মারেন। ঐ অফিসার বলেন, তার বোন গুরুতর অসুস্থ বিধায় তাকে ইউরোপ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর আজ তিনি তাকে ইসরাইলের মাটিতে দেখে বিস্মিত। ইরাকী অফিসার মুনিরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আক্রমণের এক পর্যায়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তার বোন অর্থাৎ মুনীরের স্ত্রীকেও ভৎসনা করেন। সে কেন সবকিছু জেনেও তাদের জানাল না। মুনীরের স্ত্রী ভাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। কয়েকদিন পর মুনীরের ঐ আত্মীয় ইরাকী সামরিক অফিসার ইসরাইল ত্যাগ করেন।
জালিয়াতি করে ইরাক থেকে আনীত মিগ টুয়েন্টি ওয়ান চালানোর জন্য প্রথম মনোনীত হন ড্যানি সাপিরা। ড্যানিও ইসরাইলি বিমান বাহিনীর পাইলট এবং তাকে সেরা টেষ্ট পাইলট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোট্রি হড তাকে ডেকে বললেন, তুমি প্রথম পশ্চিমা পাইলট হিসেবে মিগটি নিয়ে আকাশে উড়বে। যত খুশী, যত ঘণ্টা খুশী উড়তে থাক এবং এর ভালো-মন্দ দিকগুলো আমাদের জানাও।
ড্যানি পরবর্তীতে বলেছেন, মুনীর আমাকে প্লেনের কোথায় কোনো সুইচ তা দেখিয়ে দেন। সব কমান্ডই আরবি ও রুশ ভাষায় লেখা ছিল। যাহোক এক ঘণ্টার মাথায় আমি মুনীরকে বললাম, এখন মিগটি চালাব। একথা শুনে মুনীর বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন, এখনো তো আপনার কোর্স শেষ হয়নি। আমি তাকে বললাম, আমি একজন টেষ্ট পাইলট। একথা শোনার পরও মুনীরকে খুব চিন্তাযুক্ত মনে হল। তিনি ককপিটে আমার পাশে বসারও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু তার প্রয়োজন নেই বলে তাকে আমি আশ্বস্ত করলাম।
ইসরাইলের বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জেনারেল ওয়েজম্যানকে মনে আছে? তিনিই প্রথম মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ইসরাইলের হস্তগত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পাইলট সাপিরা অতীতের সেই ঘটনা স্মরণ করে বললেন, জেনারেল ওয়েজম্যান আমার কাছে এসে আমাকে বাহবা দিলেন। তারপর বললেন, তুমি আবার কোনো চালাকি কর না। মিগটি নিয়ে আবার ফিরে এস। সাপিরা আরও বলেছেন, বিমানটি চালিয়ে ফিরে আসার পর পাইলট মুনীরও আমাকে বাহবা দেন। তিনি আমাকে যখন জড়িয়ে ধরেন তখন তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। তিনি আরও বললেন, ইসরাইলি বাহিনীতে আমার মতো পাইলট থাকলে আরবরা কিছুই করতে পারবে না।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান ব্যাপকভাবে চালানো ও পরীক্ষার পর ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা বুঝলেন, কেন পশ্চিমারা এরকম একটি বিমান পাওয়ার জন্য ব্যাগ্র। এর বিস্ময়কর বিশেষত্ব হল এটি দ্রুতগতি সম্পন্ন, ওড়ে আংশিক উঁচু দিয়ে এবং ইসরাইলি মিরেজ দুই ও ফরাসি যুদ্ধ বিমানের চেয়ে ওজন এক টন কম।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান আকাশে ওড়ানোর মাধ্যমে ইসরাইল আবার বিশ্বের গণমাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাল। মার্কিনীরা বিস্মিত। কয়েকদিন পরে মার্কিন একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল বিমানটি পরীক্ষা এবং আকাশে উড্ডয়ন করে। মার্কিনীদের মিগের কাছে যাওয়ার আগে ইসরাইল একটা শর্ত দেয়। আর তা হল সোভিয়েত এয়ারক্রাফট ক্ষেপণাস্ত্র সাম-২ এর কাগজপত্রের কপি আগে তাদেরকে মার্কিনীদের দিতে হবে। আমেরিকানরা অবশেষে রাজি হয়। মার্কিন পাইলট ইসরাইলে আসেন, আতিপাতি করে পরীক্ষা করেন এবং সেটি চালিয়ে দেখেন।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের গোপন রহস্য ও শক্তি উদঘাটনের মাধ্যমে আরবদের বিরুদ্ধে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালের জুনে। মিগটি পাওয়া গিয়েছিল এর দশ মাস আগে। আর ঐ যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সফল পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল মিগ টুয়েন্টি ওয়ান। উল্লেখ্য, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরাইল আলোচ্য মিগের সাহায্যে মিসরের বিমান বাহিনীকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিল। বাকি পাঁচটি দেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ানের মাধ্যমে ব্যাপক জয়লাভের প্রেক্ষাপটে ইরাকী পাইলট মুনীর ও তার পরিবারকে ইসরাইল প্রভূত আর্থিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু ইসরাইলে আসার পর মুনীরের জীবন বিষাদময় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
মোসাদের একজন সিনিয়রের ভাষায়, একজন এজেন্টের জন্য দেশের বাইরে নতুন জীবন শুরু অলমোস্ট ইমপসিবল। মুনীর দিনে দিনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তার পরিবারও ভোগান্তিতে পড়ে। আর পুরো পরিবারের কাঠামোই ভেঙে পড়ে।
তিন বছর পরেও মুনীর ইসরাইলকে তার নিজ দেশ ভাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ডাকোটার বিমানে করে ইসরাইলি তেল সিনাই পৌঁছে দেয়ার কাজও তিনি নিয়েছিলেন। তার পরিবার ইরানি শরণার্থী হিসেবে তেলআবিবেই বসবাস করছিল। কিন্তু মুনীরের স্ত্রী নিষ্ঠাবর্তী ক্যাথোলিক হিসেবে বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছিলেন। বলতে গেলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন তিনি। ইসরাইলে তিনি কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন না। পরবর্তীতে জাল পরিচয়ে তারা পশ্চিমা দেশে চলে যান। আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত তাদের ঠিকানা দেয়া হয়নি। যদিও তাদেরকে প্রভূত নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। তবুও তারা সব সময় ইরাকী গোয়েন্দা বাহিনী মুখাভারতের ভয়ে তটস্থ থাকতেন।
ঘটনার ২২ বছর পর ১৯৮৮ সালের আগস্টে নিজ বাড়িতেই আকস্মিক হার্ট এ্যাটাকে ইরাকী পাইলট মুনীর মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মুনীরের স্ত্রী মেইর অমিতকে ফোন করেন। অমিত আর তখন মোসাদের প্রধান নন। মুনীরের স্ত্রী জানান, তার স্বামীর মৃত্যুর সময় তার এক ছেলে পাশেই দাঁড়ানো ছিল। সকাল বেলা তার স্বামী তাদের বাড়ির তিন তলা থেকে নামার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান।
মুনীরের মৃত্যুর পর মোসাদ এক শোকসভার আয়োজন করে। শোকসভায় সিনিয়র কর্মকর্তারা কেঁদে ফেলেন। লিরন বলেন, ইরাকী এক পাইলটের জন্য ইসরাইলের মোসাদ বাহিনী আজ কাঁদছে।
মিগ টুয়েন্টি ওয়ান অধিগত হওয়া ও ছয় আরব দেশের বিরুদ্ধে ইসরাইলের একক যুদ্ধে জয়লাভের পর মোসাদ-প্রধান অমিত আরও উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ল্যাভন এফেয়ার্সের আদলে তিনি ইসরাইলের কয়েকজন বন্দীকে দেশে আনার পরিকল্পনা করেন। তরুণ ল্যাভন ১৩ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জেলে পচছিল। তার মুক্তি কিম্বা ক্ষমা প্রাপ্তির কোনো আশাই ছিল না।
আরব দেশের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরাইল ছিল মিসরের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে। ঐ যুদ্ধে মিসরের ৪ হাজার ৩৩৮ জন মিসরীয় সৈন্য ইসরাইলের হাতে বন্দী ছিল। ৮৩০ জন বেসমারিক মিসরীয় নাগরিকও বন্দী ছিল। ওদিকে মাত্র ১১জন ইসরাইলি সৈন্য মিসরের হাতে বন্দী ছিল। এক্ষেত্রে অমিত লেভন ফর্মুলায় তাদেরকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিলে মিসর দৃঢ়তার সঙ্গে তার বিরোধিতা করে।
কিন্তু মেইর অমিত ছিলেন নাছোড়বান্দা। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান অমিতের ভালো বন্ধু। তিনিও অমিতকে বললেন, মিসরীয়রা কখনোই তাদের মুক্তি দেবে না। প্রধানমন্ত্রী এসকোলেরও অনুরূপ অভিমত। অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরকে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিঠি লিখলেন। এবং বন্দীদের মুক্তি দাবি করলেন।
অমিত সিরিয়য় বন্দী ইসরাইলি মোসাদের জন্যও কাজ শুরু করলেন।
লেবাননে বন্দী মিসেস সুলা কোহেনকে মুক্ত করতে তিনি সিরিয়র সহযোগিতা চাইলেন। সুলার কোড নাম পার্ল। তিনি মোসাদের একজন প্রবাদ প্রতিম গোয়েন্দা। একজন সামান্য গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও সিরিয় ও লেবাননের বিখ্যাত নেতা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ব্যাপক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল। তিনি ইসরাইলের একটা গোয়েন্দা চক্র সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। তার বড় ধরনের একটা সাফল্য হল সিরিয় ও লেবাননের কয়েক হাজার ইহুদিকে তিনি চোরাগুপ্তা পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মেইর অমিত প্রেসিডেন্ট নাসেরের কাছে যে আবেদন করেছিলেন তা কাজে এসেছিল। সিরিয়ও কিছু দিনের মাথায় অনুরূপ আবেদনে সাড়া দিলে অমিতের জয় হয়। লুভন ফর্মূলা প্রয়োগ করে অমিত লুটজ, সুলা কোহেনকে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
বিদেশে থাকা বন্দীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সাফল্য লাভ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং অবশ্যই বড় ধরনের অভিযান।