📄 আজ আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ বাধবে
১৯৭৩ সালের ৫ অক্টোবর গভীর রাতে মোসাদ এজেন্ট যার কোড নাম ডুবি মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে একটি ফোন পায়। সিনিয়র কেস অফিসার ডুবি লন্ডনের সেফ অফিসে বসে তার গোয়েন্দা কার্যক্রম চালায়। এই ফোন কলটি ছিল ভূমিকম্পের ন্যায় মহাআতঙ্ক জাগানোর মতো। ফোনের অপর প্রান্তে যিনি ছিলেন তিনি মোসাদের সবচেয়ে দামী গোপন এজেন্ট। তিনি যে সত্যি সত্যি মোসাদের গোয়েন্দা এই কথাটা ইসরাইল সরকারেরও খুব কম লোক জানত। মোসাদের যারা তাকে জানত তারা এঞ্জেল নামে চিনত। ইতোপূর্বে কোনো কোনো রিপোর্টে তার নাম 'রাশাশ' অথবা 'হোটেল' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফোনে এঞ্জেল মাত্র কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু একটি শব্দ শুনে মোসাদ গোয়েন্দা ডুবি এবং তার চেয়ার কেঁপে উঠেছিল। শব্দটি হল 'কেমিক্যালস'। ডুবি তাৎক্ষণাৎ অবিলম্বে ইসরাইলের মোসাদ সদর দফতরে ফোন করে কোড ওয়ার্ডটি জানাল। এ সময় মোসাদের প্রধান ছিলেন যভি জামির। তার কানেও কথাটি গেল। যভি জামির সঙ্গে সঙ্গে তার স্টাফ অফিসার ফ্রেডিয়ে ইনিকে বললেন, আমি এখুনি লন্ডন যাচ্ছি। রাত তখনো শেষ হয়নি।
যভি জামির জানতেন, এখন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্টের অবকাশ নেই। 'কেমিক্যালস' কোড শব্দটি একটি ভয়ঙ্কর অশুভ বার্তা। আর এর ভাবার্থ হল ইসরাইলের ওপর অবিলম্বে আক্রমণ করা হচ্ছে।
১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের পর থেকেই ইসরাইল প্রতিবেশী আরব দেশগুলো থেকে যে কোনো মুহূর্তে যুদ্ধের আশংকা করে আসছিল। ঐ ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরাইল বেশ কয়েকটি আরব দেশের ভূখণ্ড দখল করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড হল, মিসরের সিনাই বদ্বীপ এবং গাজা প্রণালী, সিরিয়র গোলান হাইটস, জর্ডানের পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী বর্তমানে গোলান হাইটসে মোতায়েন রয়েছে। এটি সুয়েজ খালের পূর্বাঞ্চলীয় কূল। আরব দেশগুলো প্রায়শই এসব অঞ্চলে ইসরাইলের সঙ্গে ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়। তারা প্রতিশোধ নেয়ার কথা সব সময় বলে থাকে। মাঝে-মধ্যে সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করে থাকে। ইসরাইল অবশ্য সুবিধেজনক অবস্থায় রয়েছে। অধিকৃত এসব অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরাইলি প্রস্তাব আরব দেশগুলো সব সময়ই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ইতিমধ্যে মিসরের অগ্নিশর্মা প্রেসিডেন্ট নাসের ইন্তেকাল করেছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আনোয়ার সাদাত। ইসরাইলি পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘ দিনের প্রাপ্ত তথ্যের মতে, আনোয়ার সাদাত ক্যারিশমেটিক নেতা নন, দূর্বল, অস্থিরচিত্ত ও তরলমতি। মিসরের জনগণের পক্ষে একটি যুদ্ধ পরিচালনায় তিনি সমর্থ হবেন না।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এশকলের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ক্যারিশমেটিক নেতা মিসেস গোল্ডা মেয়ার। তিনি একাধারে টাফ এবং ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে রয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান। তাকে বিশ্বখ্যাত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেক্ষেত্রে সহজেই অনুমেয় ইসরাইলের নিরাপত্তা এখন সবচে সুরক্ষিত।
সবচে' দামী গোয়েন্দা এঞ্জেলস- এর ফোনের কিছুদিন আগে জর্ডানের বাদশাহ হোসেইন অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ইসরাইল সফর করেন। এবং গোল্ডা মেয়ারকে সতর্ক করে যান। তার সতর্কবার্তা ছিল মিসর ও সিরিয় ইসরাইলকে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। হোসেইন ইসরাইলের গোপন মিত্রে পরিণত হয়েছিলেন এবং গোল্ডা মেয়ারের দূতের সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক সমঝোতামূলক আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু গোল্ডা মেয়ার বাদশাহ হোসেইনের সতর্কবার্তায় তেমন মনোযোগ দিতে সমর্থ হননি। গোল্ডা মেয়ার আসন্ন নির্বাচন নিয়েই সে সময় অতিশয় ব্যস্ত ছিলেন। তার লেবার পার্টিকে জিতিয়ে আনাই তার ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হয়েছিল এবং তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধানতম শ্লোগানই ছিল 'অল ইজ কোয়াইট অন দ্য সুয়েজ ক্যানেল'।
ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধ শুরুর ১৮ ঘণ্টা আগে অবশ্য বলা সম্ভব ছিল না সুয়েজ ক্যানেলের কোনো কিছুই আর শান্ত নয়। মোসাদ-প্রধান যভি জামির এঞ্জেল-এর সতর্ক বার্তাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। কেননা যে গোপন বার্তাটি তিনি পেয়েছেন, এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো বার্তা আর তার দেশের জন্য হতে পারে না। ফলশ্রুতিতে মোসাদ-প্রধান তার লন্ডনের এজেন্টের সঙ্গে কথা বলাকে সর্বাধিক প্রয়োজনীয় মনে করলেন। আর করলেনও তাই।
প্রথম ফ্লাইটেই মোসাদ-প্রধান জামির লন্ডনে পৌঁছলেন। ব্রিটিশ রাজধানীতে ডরচেস্টার হোটেলের কাছেই একটি ভবনের ছয়তলায় মোসাদের সুরক্ষিত এবং সু-সজ্জিত টিপটপ একটি সেফ হাউসে তিনি উঠলেন। মোসাদ গোয়েন্দারা এই ভবনে তাদের এ্যাপার্টমেন্টটির নিরাপত্তায় সব সময়ই বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এই এ্যাপার্টমেন্টটি নেয়াই হয়েছে শুধুমাত্র এ্যাঞ্জেল-এর সঙ্গে বৈঠক করার জন্য। এ্যাপার্টমেন্টটির ভেতরের আয়োজনও তেমনি সুরক্ষিত। মোসাদ-প্রধান জভি জামির এই ভবনে আসামাত্র দশজন মোসাদ গোয়েন্দা বিচ্ছিন্নভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করল। কায়রো মোসাদ-প্রধানকে অপহরণ কিম্বা আহত করতে পারে এই আশংকায় বাড়তি নিরাপত্তা নেয়া হল। আর এর দায়িত্বে ছিলেন প্রবাদ প্রতিম গোয়েন্দা জভি মালকিন। আর্জেন্টিনায় আইচম্যানকে গ্রেফতারে মালকিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
মোসাদ-প্রধান জামিরের সারাটা দিনই অস্থিরতার মধ্যে কাটল কখন আসবে বিখ্যাত গোয়েন্দা এঞ্জেল। এঞ্জেল অবশ্য কায়রো থেকে রওয়ানা দিয়ে রোমে যাত্রা বিরতি করেন। ফলে লন্ডনে আসতে তার বেশ দেরি হয়ে যায়। দুই দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা অবশেষে আলোচ্য সেফ হাউজে পরদিন রাত ১১টায় তাদের বৈঠক শুরু করেন।
এদিকে ইয়োম কাঞ্জুর হল ইসরাইলিদের জন্য একটি পবিত্র দিন। এদিন ইহুদিরা প্রার্থনা ও প্রায়শ্চিত্ত করে এবং উপবাস করে তাদের দিন কাটায়। এদিন ছুটির দিন। ফলে কেউ কোনো কাজ করবে না। এমনকী রেডিও টেলিভিশনও বন্ধ। রাস্তায় বন্ধ গাড়ি চলাচলও। ইহুদি এই রাষ্ট্রের সীমান্তেও অল্পসংখ্যক সৈন্য প্রহারারত।
মোসাদ-প্রধান জামির ও এঞ্জেলের মধ্যে দু'ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। ডুবি বৈঠকে আলোচিত প্রতিটি শব্দের নোট নেন।
রাত একটায় বৈঠক শেষে ডুবি এঞ্জেলকে পৃথক আরেকটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রথাগত নিয়মানুযায়ী এক লক্ষ মার্কিন ডলার দেয়া হয়। জামির দ্রুততার সঙ্গে একটি টেলিগ্রাম কম্পোজ করে ইসরাইলে পাঠালেন। কিন্তু এই মূল্যবান বার্তাটি দূতাবাসের এনকোডারের মাধ্যমে পাঠাতে তারা ব্যর্থ হন। জামির চটে যাচ্ছিলেন এবং তার স্টাফ অফিসার এইনির বাড়িতে ফোন করতে বাধ্য হন। কিন্তু এইনি ফোন ধরছিল না।
কেউ ফোন না ধরার কথা অপারেটর তাকে জানাল। সে আরও বলল, আজ হয়তো ইসরাইলে বড় কোনো ঘটনায় ছুটি দেয়া হয়েছে। জামির অপারেটরকে ফোন করেই যেতে বললেন।
অবশেষে জামির তার স্টাফ অফিসারকে ফোনে পেলেন। এইনি আধা ঘুমন্ত অবস্থায় ফোন ধরল। জামির তাকে বললেন, আগে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধও। তারপর কাগজ-কলম নাও। ফ্রেডি এইনি তার বসের নির্দেশ মতো ডিকটেশন নিতে প্রস্তুত। জামির সাংকেতিক ভাষায় যে বার্তাটি দিলেন তা এরকমঃ আজ দিনের শেষে কোম্পানি চুক্তি সই করবে।
অতএব মোসাদ-প্রধান জামির তার স্টাফ অফিসারকে কাপড়-চোপড় পরে রেডী হয়ে সদর দফতরে গিয়ে সবাইকে ঘুম থেকে জাগানোর নির্দেশ দিলেন। ফ্রেডি এইনি জামিরের নির্দেশ মোতাবেক ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বৈঠকে ডাকলেন। নেতাদের কাছে জামিরের এই বার্তার মর্মকথা হল, আজ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হবে।
মোসাদ-প্রধান জামিরের টেলিগ্রাম অনুযায়ী মিসর ও সিরিয় আজ অপরাহ্ন ইসরাইল আক্রমণ করতে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত।
কেননা তারা জানে আজ ইসরাইলে ছুটি। ফলে সন্ধ্যার আগেই তারা সুয়েজ ক্যানেলের ইসরাইল প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারবে। এঞ্জেলের ভাষায় মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাতের পক্ষে অপেক্ষা সম্ভব নয়। কেননা তিনি অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে এরকমই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফলে সাদাতের পক্ষে আর পেছানোর সম্ভাবনা নেই। অবশ্য সাদাতের মধ্যে দ্বিধা কাজ করলেও ইসরাইল আক্রমণের সম্ভাবনা ৯৯.৯ ভাগ। কেননা তারা যুদ্ধে জিতবে বলে বিশ্বাস করে। আর রাশিয়া এই অভিযানে অংশ নেবে না।
মোসাদ-প্রধানের এই নাটকীয় বার্তা ফেসভ্যালু হিসেবে ইসরাইলের সব নেতারা মেনে নিয়েছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ইসরাইলের আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থা 'আমান' প্রধান জেনারেল এলি জেইরা নিশ্চিত ছিলেন, যুদ্ধের মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না। সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী এই জেনারেল অবশ্য বিভিন্ন গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টগুলো দিল। সেসব বার্তায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেকোন সময়ই যুদ্ধ শুরুর আশংকা ছিল। জেনারেল এলি জেইরার বিশ্বাস, সুয়েজ ক্যানেলের আফ্রিকার অংশে মিসরীয় সৈন্যদের ব্যাপক সমাবেশ একটা কৌশলমাত্র।
মোসাদ-প্রধান জামির এবং আমান প্রধান জোনারেল জেইরা মুখোমুখি কথাও বলেন। এখানে প্রসঙ্গ উঠে, ৮৪৮ নং ইউনিটের একটি গোপন বার্তা নিয়ে। এই ইউনিটটি এক বার্তায় বলে, সিরিয় ও মিসরে নিযুক্ত রুশ সামরিক উপদেষ্টাদের পরিবারগুলো জরুরি ভিত্তিতে এই দুই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর এই চলে যাওয়া যুদ্ধ শুরুর ইংগিত বহন করে। মোসাদ-প্রধান জামির আমান প্রধানকে এই বার্তার মর্মকথা জিজ্ঞেস করেন। আমান প্রধান জেনারেল এলি বলেন, এর কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। তবে বিষয়টি সন্দেহের।
গোয়েন্দা সংস্থা আমান প্রধানসহ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কর্মকর্তারা উপসংহারে আসেন যে, দুটি কারণে মিসর ইসরাইল আক্রমণ করতে পারে। তাদের এই ধারণা হওয়ার মূলে যে তত্ত্ব তা হল, যদি মিসর সোভিয়েত ইউনিয়নের ফাইটার জেট বিমান পায় যা ইসরাইলি যুদ্ধবিমানকে প্রতিহত করতে সক্ষম তাহলেই মিসর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে। আরেকটি হল, মিসর যুদ্ধে আসতে রাজি হতে পারে যদি অন্য আরব রাষ্ট্রগুলো ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যালীলায় মিসরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। উপরোক্ত দুটি শর্ত যতদিন না পূর্ণ হবে ততদিন মিসর ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে না। আমান প্রধান ও উপরোক্তদের মতে, যুদ্ধে নামা নয়, মিসর ইসরাইলকে ভয় দেখাতে পারে, উস্কানি দিতে পারে, বিপুল সংখ্যক সৈন্য চলাচল করাতে পারে কিন্তু ইসরাইল আক্রমণ করবে না।
সমস্যা হল, মিসরের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব ১৯৬৭ সালে ভুল বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৬৭ সালে মিসরের সেনাবাহিনীর বিশাল একটা অংশ ইয়েমেনে ঢুকে রাজকীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক বছর স্থায়ী যুদ্ধ করে। ইসরাইলের নেতারা নিশ্চিত করে আরও বলেন যে, মিসর কোনো প্রকার উস্কানিমূলক আচরণ অথবা আগ্রাসী রণকৌশল তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবে না। কেননা তাদের সেনাবাহিনীর একটা অংশ ইয়েমেনের জলাশয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। যদিও ১৯৬৭ সালের ১৫ মে মিসরের সেনাবাহিনীর এলিট ইউনিট আকস্মিকভাবে সিনাই অতিক্রম করে ইসরাইলি সীমান্ত পর্যন্ত চলে এসেছিল। এই সময় মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের বহিষ্কার করেছিলেন এবং লোহিত সাগরের সবগুলো প্রণালীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইসরাইলি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ইসরাইলি নেতাদের সেই ব্যর্থতার কথা স্মরণ করা উচিত। প্রকৃতপক্ষে ছয় দিনের সেই ত্রুটি বা ব্যর্থতার কথা সবাই ভুলে গেছে।
মিসর কোনো যুক্তিতেই এই দফায় আক্রমণ করতে পারে না এই ধারণা নিয়েই ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর খুব সকালে ইসরাইলি মন্ত্রিসভার একটা বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গোয়েন্দা সংস্থা আমান প্রধান জেনারেল জেইরসহ মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্য মিসরের আসন্ন আক্রমণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। এবার যেমন স্বনামধন্য গোয়েন্দা এঞ্জেল যুদ্ধের আশংকার কথা বলেছেন, অতীতেও তিনি দু'বার ভুল বার্তা দিয়েছিলেন। তখন তো ইসরাইল আক্রান্ত হয়নি। যেমন এঞ্জেল ১৯৭২ সালের নভেম্বরে এবং ১৯৭১ সালের মে মাসে ইসরাইলের আক্রান্ত হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন। যদিও শেষ মুহূর্তে তিনি তার সতর্ক বার্তা প্রত্যাহার করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মে মাসে ইসরাইলের অসংখ্য রিজার্ভ সৈন্যকে জরুরিভাবে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছিল। আর সেই সময় সৈন্য মোতায়েনসহ অন্যান্য খাতে ইসরাইলের ব্যয় হয়েছিল সাড়ে চৌত্রিশ মিলিয়ন ডলার।
মন্ত্রিসভার সকালের বৈঠকে সকলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতার ব্যাপারে সতর্ক হলেন। তবে, ইসরাইলের রিজার্ভ সৈন্যের একটি অংশকে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হল। মন্ত্রীরা আরও সিদ্ধান্ত নিলেন, মিসর যে বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে তা প্রতিহত করতে ইসরাইল আগ বাড়িয়ে কিম্বা তা ঠেকাতে কোনো অভিযান চালাবে না।
মোসাদ-প্রধান জামির লন্ডন থেকে ইসরাইলে ফিরে বললেন, যুদ্ধ অত্যাসন্ন। তিনি এঞ্জেলের সতর্কবার্তা অনুযায়ী বললেন যে, সূর্যাস্তের আগেই মিসর ও সিরিয় ইসরাইল আক্রমণ করবে।
বেলা দুইটার দিকে আমান প্রধান জেনারেল জেইরা যুদ্ধ বিষয়ক সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন, যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশংকা সামান্যই। তিনি কথা বলেই যাচ্ছিলেন এমন সময় এক অধঃস্তন কর্মী এসে তার হাতে একটি চিরকূট দেয়। জেইরা চিরকূটটি পড়লেন। তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল এবং দ্রুত তিনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিমান আক্রমণের সাইরেন বিলাপের ধ্বনিতে বেজে উঠল। ইয়োম কিন্তুরের নীরবতা উবে গেল। তারপর শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ।
📄 অন্যরকম যুদ্ধ
যুদ্ধ শেষে গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সিনিয়র কর্মকর্তারা গোয়েন্দা এঞ্জেলকে ক্রোধান্বিত স্বরে দোষারোপ করতে লাগল। এঞ্জেল মোসাদ-প্রধান জামিরকে বিভ্রান্ত করেছেন। কেননা যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুপুরে অথচ তার রিপোর্ট বলে যুদ্ধ শুরু হবে সন্ধ্যায়। পরে অবশ্য জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে মিসর যুদ্ধ শুরুর সময় পরিবর্তন করেছে। মিসর ও সিরিয়র প্রেসিডেন্টের মধ্যকার টেলিফোন কথোপকথনের পর এই সময় পরিবর্তিত হয়। ততক্ষণে এঞ্জেলতো লন্ডনের পথে বিমানে।
আমানের প্রধানরা এঞ্জেলের ভুল বার্তায় বিরক্ত হন। তার পূর্ববর্তী সতর্কবার্তায় আমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও প্রতীয়মান হয়। প্রকৃতপক্ষে আমানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এঞ্জেলকে কোনো গোয়েন্দা সূত্র বলতে বা ভাবতে নারাজ। তাদের মনোভাব এঞ্জেল হলেন মিসরের প্রেসিডেন্টের অফিসে মোসাদের প্রতিনিধি। তার কাজ হল, সেখানে যা যা ঘটছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদান। বিস্তারিত। আমান কর্মকর্তারা বিস্মৃত হয়েছেন যে, সিনিয়র পদ মর্যাদার কারণে এঞ্জেল শুধুমাত্র একজন গোয়েন্দা নন, তিনি চমৎকার চমৎকার সব রিপোর্ট দিচ্ছেন। তাছাড়া তিনি সব সময় সব খবর জানবেন এমনটিও ভাবা সংগত নয়।
যেদিন যুদ্ধ শুরু হল সেদিনও গোয়েন্দা এঞ্জেল ইসরাইলকে ভালো ভালো গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে যেতে লাগলেন। মিসর ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ওপর দুটি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। ইসরাইল এর পাল্টা হামলা নিলে পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ হত। কিন্তু গোয়েন্দা এঞ্জেল ইসরাইলকে জানান, মিসর আর হয়তো ইরসাইলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করবে না। একথা শুনে ইসরাইল কিছুটা রাশ টেনে ধরে। এঞ্জেল আরও জানান, মিসর ধীরে ধীরে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটাতে চায় না।
ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধ অক্টোবরের ২৩ তারিখে শেষ হয়। গোলান হাইটে সিরিয় সেনাবাহিনী নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ইসরাইলের কামান দামেস্ক থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। দক্ষিণে মিসর পাঁচ মাইলব্যাপী একটা ইসরাইলি প্রণালী দখল করে বটে কিন্তু ইসরাইল মিসর ভূখণ্ডে আক্রমণের এমন একটা পটভূমি তৈরি করে যা কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মিসরের তৃতীয় সেনাবাহিনী পুরোপুরি ইসরাইলি বাহিনী দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। মিসরের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ে এবং মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দূরত্ব ছিল মাত্র ৬৩ কিলোমিটার। এটিও ছিল ইসরাইলের অনুকূলে এক বিরাট অর্জন। তড়িৎ এই যুদ্ধ জয়ের পরেও বিজয় উৎসব থেকে বিরত থাকে ইসরাইল। কেননা তাদের ২ হাজার ৬৫৬ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত ৭ হাজার ২৫১ জন। একই সাথে ইসরাইলের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা এই যুদ্ধে ভূলুণ্ঠিত হয়।
যুদ্ধ শেষে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক শুরু হয়। প্রথমে আটক ব্যক্তিদের বিনিময় এবং দুই জাতির মধ্যে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে বৈঠক বসে। সিরিয় শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে অসম্মতি জানায়।
মোসাদ-প্রধান যভি জামির সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল হোকি। জামিরের ব্যাপক প্রশংসা হয়। ইসরাইলের গোয়েন্দা ইতিহাসে জামির একমাত্র ব্যক্তি যিনি সিরিয় ও মিসরের আক্রমণের খবর জেনে ইসরাইলের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইসরাইলি নেতারা যদি জামিরের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে আরও সতর্ক হতেন ও যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে যুদ্ধের ফলাফল ইসরাইলের পক্ষে আরও বহুগুণ ভালো হত।
কয়েকজন মন্ত্রী বলেন, ইসরাইল প্রথমে আক্রমণ না করে ভালোই করেছে। ফলে ইসরাইলকে কেউ আর আক্রমণকারী হিসেবে দোষারোপ করছে না।
ইসরাইল প্রথমে আক্রমণের মতলব না করে ভালো করেছে কী না এ প্রশ্নে অনেকে বলেছেন, এটা একটা অদূরদর্শী ভাবনা। ইসরাইল বদনামী না হওয়ার জন্য বসে বসে তামাক খাবে, না তার যথাসাধ্য শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, না নিজেকে প্রতিহত করবে এনিয়ে বিতর্ক ছিল।
ইসরাইলি ঐতিহাসিক ড. ইউরিবার ইয়োসেক বলেন, স্বনামধন্য গোয়েন্দা এঞ্জেলের সতর্ক বার্তার কারণেই ইসরাইল গোলান হাইটস রক্ষা করতে পেরেছে। এই ঐতিহাসিকের মতে, এঞ্জেলের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর জরুরি ভিত্তিতে ট্যাংক বাহিনী অপরাহ্নে গোলানে পৌঁছতে সক্ষম হয় এবং নাকাহ সেক্টরে সিরিয়র আগ্রাসন প্রতিহত করতে সমর্থ হয়।
ইয়োম কাঞ্জুর যুদ্ধের পর জনগণের চাপের মুখে ইসরাইল সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আগরানাটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনে বাধ্য হয়। এই কমিটির কাছে তদন্তাধীন বিষয় ছিল, যুদ্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইসরাইলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক প্রক্রিয়ায় কোনো গলদ ছিল কী না। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবিলম্বে আমান প্রধান জেনারেল জেইরাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়। মোসাদ-প্রধান জামিরের চীফ অব স্টাফ ডেভিডকেও বরখাস্ত করা হয়।
এখন প্রশ্ন হল, কে এই এঞ্জেল? তাকে নিয়ে বই ছাপা হতে লাগল। সারা বছর ধরে পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য গল্প, প্রতিবেদন ছাপা হতে লাগল। তার পরিচয় নিয়ে কত প্রশ্ন। তবে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট, এঞ্জেল যেই হোন, মিসরের নীতিনির্ধারক মহলের একজন কেউ হবেন তিনি। নিশ্চয়ই মিসরের সামরিক বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডেও তার ব্যাপক প্রভাব। এতদসত্ত্বেও তার প্রকৃত পরিচয় কেউ উদঘাটনে সমর্থ হল না। সাংবাদিক ও যুদ্ধবিশারদরা তাকে নানা কোড নামে অভিহিত করতে লাগল। তার প্রবাদ প্রতিম মেধা ও প্রতিভা নিয়ে কল্পকাহিনীতে ইসরাইল ছেয়ে গেল। গোয়েন্দা বাহিনীর নায়ক বানিয়ে এঞ্জেলকে কেন্দ্র করে বহুল প্রচারিত বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশিত হল।
গোয়েন্দা বাহিনী আমান থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর জেনারেল জেইরা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন। তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণের জন্য তিনি একটা বই লিখলেন। বইয়ে তিনি নিজে নিজে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন এবং নিজেই তার উত্তর লিপিবদ্ধ করেন। তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, কেন তিনি স্বনামধন্য গোয়েন্দা এঞ্জেলের রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
জেনারেল জেইরা বইয়ে লেখেন, এঞ্জেল একজন ডাবল এজেন্ট। কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মিসর সরকার ইসরাইলকে নানা বিষয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য তাকে মোসাদ বাহিনীতে কায়দা করে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
কয়েকজন সাংবাদিক জেনারেল জেইরার বক্তব্য প্রসঙ্গে লিখলেন, এঞ্জেল ডাবল এজেন্ট হলেও তার মধ্যে চরম উৎকর্ষতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ইসরাইলকে সত্য ও প্রকৃত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে আসছিলেন। আর এসবই তিনি করছিলেন, মোসাদের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য। মোসাদ এঞ্জেলকে বিশ্বাস করে সব তথ্যই গ্রহণ করে আসছিল। কিন্তু এমন তথ্যও এঞ্জেল দিতে পারতেন যার ফলে ইসরাইল কোনো একদিন সর্বনাশা পদক্ষেপও নিয়ে ফেলতে পারত। যা হত চরম ধ্বংসাত্মক ইসরাইলের।
প্রশ্ন হল, জেনারেল জেইরা এবং তার অনুগামীরা ইনিয়ে-বিনিয়ে যে আঘাতই করার চেষ্টা করুন না কেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এঞ্জেলের তথ্য প্রদান প্রকৃতপক্ষেই নির্ভুল। তাহলে এঞ্জেল মিথ্যাচারটা করলেন কীভাবে!
এঞ্জেলতো সাম্প্রতিক যুদ্ধের ব্যাপারে মোসাদকে উল্টো তথ্য দিতে পারতেন। তিনিই তো কেমিক্যালস শব্দটি উল্লেখ করে ইসরাইলের আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছিলেন। এটা কী কোনো ডাবল এজেন্টের কাজ?
কিন্তু জেনারেল জেইরা থেমে থাকলেন না। ১৯৭৪ সালে তিনি যখন তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ বের করলেন সেখানে তিনি গোয়েন্দা এজেন্টের নাম-ধাম পরিচয় সব পাবলিকের কাছে প্রকাশ করলেন। অসংখ্য সাক্ষাৎকার এবং বিশিষ্ট টিভি সাংবাদিক মারগ্যালিতকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারেও জেনারেল জেইরা এঞ্জেলের বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরলেন।
📄 কে এই যুবক
তার প্রকৃত নাম আশরাফ মারওয়ান। এই নামটা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে মিসরে ঝড় বয়ে গেল। শীর্ষ রাজনীতিকরা পর্যন্ত স্তম্ভিত। অনেকেই বললেন, অসম্ভব! আশরাফ মারওয়ান কিছুতেই ইসরাইলের গুপ্তচর হতে পারেন না।
এখন প্রশ্ন হল, কে এই মাস্টার গোয়েন্দা, কে এই আশরাফ মারওয়ান? কি তার পরিচয়? ১৯৬৫ সালে মিসরে সুইট ও লাজুক একটি মেয়ের সঙ্গে সুদর্শন ও হ্যান্ডসাম এক তরুণের পরিচয় হয় হেলিওপোশি টেনিস কোর্টে। মেয়েটির নাম মোনা এবং সে তার পরিবারের তৃতীয় মেয়ে। প্রকৃতপক্ষে মোনা অতবেশী সুন্দরী নয়। তার বোন হুদ হল প্রকৃত সুন্দরী এবং মিশরের গির্জা হাই স্কুলের এ লেভেলের ছাত্রী। তবে মোনাও কিউট, চার্মি এবং তার পিতার প্রিয় সন্তান। এদিকে তরুণটি স্বচ্ছল ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। তরুণটি সদ্য গ্রাজুয়েট। বিষয় রসায়ন এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছে। এখন এই তরুণের জন্য মোনা মরীয়া। প্রেমে হাবুডুবু।
এই পরিচয় ও প্রণয়ের সূত্র ধরে মোনা তার পরিবারের সঙ্গে তরুণের পরিচয় করিয়ে দেয়। তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় মোনার বাবার।
আর মোনার বাবা হলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদুল নাসের।
প্রেসিডেন্ট নাসের ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে, তার মেয়ের পছন্দ উপযুক্ত ও যথার্থ হচ্ছে কী না। কিন্তু মোনা কিছুতেই অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। অবশেষে প্রেসিডেন্ট নাসের মোনার প্রেমিকের বাবাকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বললেন। তরুণের বাবা প্রেসিডেন্টেরই গার্ড রেজিমেন্টের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। দু'জনে আলোচনা করে মোনা ও তার প্রেমিকের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করলেন। এক বছর পর ১৯৬৬ সালে জুলাইয়ে তাদের বিয়ে হয়।
মোনার তরুণ স্বামীকে রিপাবলিক গার্ডের কেমিক্যাল বিভাগে বদলী করা হয়। ১৯৬৮ সালের শেষার্ধে তাকে প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান বিভাগে বদলী করা হয়।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ের জামাতার নামই আশরাফ মারওয়ান।
প্রেসিডেন্টের জামাতা আশরাফ মারওয়ান তার নতুন কর্মস্থলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। আশরাফ মারওয়ান উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যেতে চেয়ে তার শ্বশুরকে জানাল। শ্বশুর প্রেসিডেন্ট তা অনুমোদন করেন। লন্ডনে অবস্থিত মিসরীয় দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে একাই লন্ডনে সেটেল করেন আশরাফ মারওয়ান। আশরাফ মারওয়ানের ব্যাপারে দূতাবাসের নজরদারি কঠোর ছিল না। আশরাফ মারওয়ান অ্যাভেন্চারপ্রিয় পার্টি টার্টি খুব পছন্দ করেন। আর ষাটের দশকে যার যা চাই তা সরবরাহে লন্ডন ছিল সিদ্ধহস্ত। রাতভর পার্টিতে প্রচুর খরচ হয় মারওয়ানের। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে নতুন একটা আয়ের সংস্থান হয়ে গেল আশরাফ মারওয়ানের।
এ রকম একজন মহিলার নাম সাওদা। কুয়েতী শেখ আবদুল্লাহ মুবারক আল সাবাহ তার স্বামী। আশরাফ সাওদাকে মন্ত্রমুগ্ধ করলে ঐ মহিলা দুই হাতে তাকে টাকা দিকে লাগলেন। কিন্তু এই আয়োজন বেশি দিন চলল না। তাদের ভালোবাসা ও সম্পর্কের কথা মিসরের প্রেসিডেন্টের গোচরীভূত হলে তিনি তার মেয়ের জামাতাকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তার এই ব্যভিচারী জামাতাকে তালাক দিতে মেয়ে মোনাকে নির্দেশ দিলে মোনা তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। নাসের অবশেষে জামাতাকে মিসরেই রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। জামাতা আশরাফ মারওয়ানকে শুধুমাত্র তার কাগজপত্র প্রফেসরকে দেয়ার জন্য লন্ডনে যেতে দিতে নাসের রাজি হন। সাওদ আল সাবাহ'র কাছ থেকে নেয়া সব টাকা-পয়সাও আশরাফ মারওয়ান ফেরত দেন। নাসেরের অফিসেই আশরাফ মারওয়ানের আবার চাকরি হয়। এখানে অবশ্য তার বড় কোনো দায়িত্ব ছিল না।
১৯৬৯ সালে আশরাফ মারওয়ান একটি লেখা জমা দিতে আবার লণ্ডনে যান। কিন্তু এই দফায় তিনি তার শ্বশুরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা শুরু করেন। শ্বশুর প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অমর্যাদাকর আচরণ তাকে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তিনি ইসরাইলি দূতাবাসে ফোন করে মিলিটারী এটাচীর সঙ্গে কথা বলতে চান। এক কর্মকর্তা তার ফোন ধরলে আশরাফ মারওয়ান তাকে তার প্রকৃতই নামটাই বলেন। ইসরাইলের পক্ষে তিনি কাজ করতে চান বলেও জানান। ইসরাইল দূতাবাস থেকে তাকে জানান হয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। প্রকৃতপক্ষে ইসরাইলি দূতাবাসের ঐ কর্মকর্তা বিষয়টি সিরিয়সলি নেননি এবং ঐ কর্মকর্তা দফতরকে তিনি কিছু জানাননি। আশরাফ মারওয়ান আবার যে একই বিষয়ে ফোন করেন তাও কেউ ধরেনি। বিষয়টি কীভাবে যেন মোসাদের লোকজন জেনে ফেলে। মোসাদের ইউরোপীয় বিভাগের প্রধান শমুয়েল গোরেনের সঙ্গে মারওয়ানের ফোনে কথা হয়। গোরেন জানতেন মারওয়ান কে, জানতেন তার গুরুত্বপূর্ণ পজিশনের কথা। গোরেন মারওয়ানকে দূতাবাসে আর ফোন করতে নিষেধ করেন। গোরেন তালিকাহীন একটি নম্বরে আশরাফ মারওয়ানকে ফোন করতে বলেন এবং তার কয়েকজন সহকর্মীকে বিষয়টি জানিয়ে রাখেন।
গোরেনের টপসিক্রেট রিপোর্টটি মোসাদ-প্রধান জামির এবং গোয়েন্দা নিয়োগ সংস্থার প্রধান রেহাভিয়া ভার্দির কাছে গিয়ে পৌঁছে। তারা মারওয়ানের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে একটা বিশেষ টিম গঠন করেন। তবে সহজেই অনুমেয় যে, শত্রু দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ যখন নিজের থেকে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ পেতে আগ্রহ দেখায় তাকে নিতে আপত্তি কোথায়। তবে বিষয়টি সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। তাছাড়া এই পর্যায়ের লোকেরা ডাবল এজেন্টও হয়ে থাকে। দেখা গেল মিসরই প্রলোভন দেখিয়ে তাকে প্ররোচিত করেছে।
আবার এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। শত্রু দেশের সংক্ষুব্ধ কেউ এজেন্ট হতে আগ্রহী হতেই পারে। তবে এই পর্যায়ের লোকদের হাতে অনেক গোপন ও স্পর্শকাতর তথ্যাদি থাকে যা অনেকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আর সারা বিশ্বের গোয়েন্দা বিভাগের লোকদের কাছেই এ ধরনের এজেন্ট সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত।
পাশাপাশি, ভার্দির লোকেরা জেনে গেছে আশরাফ মারওয়ান কে। প্রথমত তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, টাকাটা খুব ভালো করে চেনেন এবং ভালোবাসেন। একই সঙ্গে সবরকম আনন্দময় জীবনই তাকে ব্যাপকভাবে টানে। ফলে মোসাদ তাকে গোয়েন্দা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পেরে যারপরনাই খুশী।
ইসরাইল থেকে লন্ডনে উড়ে এসে গোরেন মারওয়ানকে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আহ্বান জানান। ধীমতি মারওয়ান চমৎকার পোশাকাদি পরে গোরেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি প্রকাশ্যে গোরেনকে বলেন যে, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে মিসরের হেরে যাওয়াটা তার ভালো লাগেনি। এবার তিনি বিজয়ীদের দলে যোগ দিতে আগ্রহী। যাহোক, এই আদর্শিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আশরাফ মারওয়ান প্রতি মিটিংয়ের জন্য এক লক্ষ ডলার দাবি করলেন। এই রকম সভায় আশরাফ মারওয়ান মোসাদকে একটি করে রিপোর্ট দেবেন।
বিশাল অংকের টাকার ব্যাপারটি নিয়ে গোরেন দ্বিধান্বিত ছিলেন। কেননা মোসাদ এতেঠ বেশি পরিমাণ টাকা ইতিপূর্বে আর কোনো গোয়েন্দাকে দেয়নি। কিন্তু মারওয়ানের কথা ও কাজের একটা বাস্তব পরীক্ষা নেয়া গোরেনের কাছে জরুরি। মারওয়ানকে গোয়েন্দা তথ্যের কিছু নমুনা দিতে বললেন গোরেন। যাহোক, অবশেষে মারওয়ান ইসরাইলি গোয়েন্দা হলেন। মিসরের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং শত্রু দেশের গোয়েন্দা। আশরাফ মারওয়ানের রিপোর্ট দেখে মোসাদের খুশীর সীমা রইল না। ১৯৭০ সালের ২২ জানুয়ারি মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসেরের সঙ্গে সাক্ষাতে সোভিয়েত নেতাদের যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয় তা সবিস্তার বিবরণ আশরাফ মারওয়ান ইসরাইলিদের হাতে তুলে দেন। ঐ বৈঠকে নাসের সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আধুনিক ও দূরপাল্লার জেট বিমান চান। কেননা এই বিমান হাতে পেলে ইসরাইলের অনেক ভেতরে ঢুকে বোমা ফেলা সম্ভব হবে।
এই গোপন রিপোর্ট ইসরাইলের যেসব নেতা দেখলেন তারা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এতো গোপনীয় প্রমাণাদি অতীতে তারা কখনো দেখেনি। আর এ সব তথ্যের সত্যাসত্য নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এখন মোসাদের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চিত হলেন যে, তাদের হাতে অগনিত গোপন তথ্যাদি বিদ্যমান। মোসাদ ডুবিকে আশরাফ মারওয়ানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য লন্ডনে নিয়োগ দিল। আশরাফ মারওয়ান নাম বদলে হয়ে গেলো এঞ্জেলা। এঞ্জেলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোসাদের পক্ষ থেকে লন্ডনে অফিস ভাড়া করা হল। সেই অফিস অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো হল। লন্ডনের এই অফিসকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে রাখা হল এই তারকা গোয়েন্দাদের কখন কী প্রয়োজন হয় তার জন্যে।
সিদ্ধান্ত হল, তারকা গোয়েন্দা এঞ্জেল তার সুবিধামত লন্ডনের অফিসে মিটিং করবেন। মিটিং করার সময় হলে এঞ্জেল তৃতীয় কাউকে ফোন করবেন। অনেকের মতে, লন্ডনের ইহুদি এক নারী ছিলেন তৃতীয় ব্যক্তি। অতঃপর তা ডুবিকে জানানো হবে। আর এভাবেই মোসাদকে সতর্ক করা হবে। আশরাফ মারওয়ান মোসাদকে অসংখ্য টপসিক্রেট তথ্য ও সামরিক ডকুমেন্ট দিতে লাগলেন। গোয়েন্দা সংস্থা আমানের মিসরীয় আর্মি বিষয়ক কর্মকর্তা কর্নেল মেইর উল্লেখিত গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেন। কেননা তিনি বেশ কয়েকটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। লন্ডনের উল্লেখিত সেফ হাউসে মারওয়ানের সঙ্গে মেইরের সাক্ষাৎও হয়েছে। মেইর বলেছেন, আশরাফ মারওয়ানকে তার অসুখী মানুষ বলে মনে হয়েছে। আশরাফ তার দিকে প্রথম অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে মারওয়ান মেইরের ব্যাপারে সহনশীল হয়ে উঠেন। কেননা মেইরের পান্ডিত্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। মোসাদের কর্মকর্তারা একবার আশরাফ মারওয়ানকে একটি ব্রিফকেস দিতে বলেন মেইরকে। মেইর জানতে চান এর ভেতর কী আছে। তাকে বলা হয় এর মধ্যে বিপুল অংকের টাকা রয়েছে। মোসাদের হিসাব অনুযায়ী আশরাফ মারওয়ান যতদিন তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই সময়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল তাকে ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার দিয়েছে।
১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নাসের মারা গেলে আনোয়ার সাদাত মিসরের প্রেসিডেন্ট হন। প্রফেসর শিমন সামির ইসরাইলের একজন বিশিষ্টতম ব্যক্তি এবং মিসর বিষয়ে অভিজ্ঞ। মোসাদ তার কাছে আনোয়ার সাদাতের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু তথ্য চায়। শিমন সামির আনোয়ার সাদাতকে অতি দুর্বল ও নিষ্প্রাণ চরিত্রের একজন মানুষ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, আনোয়ার সাদাত খুব বেশি দিন মিসরের সিংহাসনে থাকতে পারবেন না আর পারলেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। সামিরের মতো মিসরের অনেক লোকই সাদাত সামিরের অনুরূপ মনোভাব পোষণ করত। কিন্তু আশরাফ মারওয়ান নিঃশর্তভাবে আনোয়ার সাদাতকে পৃষ্টপোষকতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আশরাফ মারওয়ান তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নাসেরের ব্যক্তিগত কেবিনেটগুলোর চাবি নিয়ে নেন। সেখানে যত গোপন ফাইল ও ডকুমেন্ট ছিল তা আনোয়ার সাদাতকে দিয়ে দেন।
১৯৭১ সালের মে মাসে মিসরের কতিপয় রাজনীতিক মস্কোর লাইনে সাদাতের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করেন। এরা সকলেই মিসরের বিখ্যাত ব্যক্তি। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলি সাবরী, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাহমুদ ফাওজি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুমাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি। তাদের পরিকল্পনা ছিল আলেকজান্ড্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সফরকালে সাদাতকে হত্যার। কিন্তু সাদাত ষড়যন্ত্রকারীদের চেয়েও এগিয়ে। তিনি চক্রান্তকারীদের গ্রেফতার করে ফেলেন। এ সময় আশরাফ মারওয়ান সাদাতের পক্ষাবলম্বন করেন। প্রকৃতপক্ষে আরও আগে থেকেই সাদাতের সঙ্গে ছিলেন মারওয়ান।
ফলশ্রুতিতে মিসরের শীর্ষমহলে আশরাফ মারওয়ানের পদ-পদবি ও মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পায়। তিনি প্রেসিডেন্ট সাদাতের তথ্য বিষয়ক প্রেসিডেন্টের সচিব এবং প্রেসিডেন্টের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। সাদাতের সঙ্গে বিভিন্ন আরব দেশ সফরের সুযোগ ঘটে তার। শুধু তাই নয়, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠকগুলোতেও মারওয়ান উপস্থিত ছিলেন।
মারওয়ানের মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার প্রেরিত রিপোর্টের গুরুত্ব ইসরাইলের কাছে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সাদাত বেশ কয়েকবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। ইসরাইলকে আক্রমণ করে কাবু করার জন্য সাদাত সোভিয়েত ব্রেজনেভকে দাবিকৃত অস্ত্রের একটা তালিকা দেন। এ তালিকার মধ্যে ছিল মিগ ২৫ বিমান। আশরাফ মারওয়ান কিনতে চাওয়া অস্ত্রের পুরো তালিকা মোসাদকে সরবরাহ করেন। মোসাদ অতঃপর সাদাত ও ব্রেজনেভের মধ্যকার বৈঠকের কার্যবিবরণী চান মারওয়ানের কাছে। কয়েকদিনের মধ্যে মারওয়ান তাও ইসরাইলকে সরবরাহ করেন।
মোসাদ-প্রধান যভি জামির মারওয়ানের ব্যাপারে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মারওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতও করেন। মারওয়ানের প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট মোসাদ-প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও গোয়েন্দাদের সরবরাহ করে।
আশরাফ মারওয়ান প্রদত্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ইসরাইলের বাইরের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা প্রধানের হাতেও পৌঁছে যায়। মারওয়ান ইটালীর গোয়েন্দা বিভাগের হয়েও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। একটি সূত্র মতে, মারওয়ান ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম সিক্সটিনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ৫ অক্টোবর যেদিন ইসরাইল আক্রমণের খবর দিতে মারওয়ান লন্ডনে যাচ্ছিলেন মাঝে তিনি রোমে যাত্রাবিরতি করেন। ইটালীর গোয়েন্দাদেরও তিনি ইসরাইল মিসর আসন্ন যুদ্ধের কথা জানিয়ে ছিলেন।
আশরাফ মারওয়ানের একটি রিপোর্ট ইটালী কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেছিল। প্রকৃতপক্ষে এটি মোসাদের জন্যই হয়তো তিনি পাঠিয়েছিলেন। ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধের এক মাস আগে লিবিয়া মিসরের কাছে একটা ক্ষেত্রে সহযোগিতা চায়। ফিলিস্তিনীরা লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফীর অনুকূলে ইআই আল বিমান বন্দর থেকে টেকঅফ করার সময় এটি ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন। বিষয়টি যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। যা হোক, ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুল করে একটি বেসামরিক বিমানকে বিধ্বস্ত করা হয় সিনাই অঞ্চলে। মোসাদের কাছে খবর ছিল ফিলিস্তিনীরা একটি বিমান ছিনতাই করে তাতে ব্যাপক বিস্ফোরক ভর্তি করে ইসরাইলের কোনো বড় শহরে বিধ্বস্ত করবে। সিনাই থেকে লিবিয়ার একটি বিমান উড্ডয়ন করে ইসরাইলের আকাশে উড়তে থাকে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রকরা মনে করল এটি একটি আত্মঘাতী বিমান। ইসরাইলের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান লিবিয়ার বিমানটিকে আকাশে ঘিরে ধরল। এক পর্যায়ে ঐ বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করল। পরে বলা হল, বিমানটি পথভ্রষ্ট হয়ে ইসরাইলে ঢুকে পড়েছিল। কেননা সিনাইতে ঐ সময় ব্যাপক ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। যাহোক ইসরাইলি চিকিৎসকরা ঐ বিধ্বস্ত ধূমায়িত বিমান থেকে ১০৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করে।
গাদ্দাফী এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে শপথ করলেন। ফাতাহর পাঁচ কর্মীকে নিয়ে একটি অপারেশন টিম করা হল। এর প্রধান হলেন আমিন আল সিদ্দিকী। মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত লিবিয়াকে সাহায্য করতে মনস্থ করলেন। তিনি মারওয়ানকে, ফাতাহ'র লোকদের রুশ নির্মিত স্ট্রেলা ক্ষেপণাস্ত্র দিতে বললেন।
মারওয়ান ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য দুটি ক্ষেপণাস্ত্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রোমে পাঠালেন। রোমে মারওয়ান ক্ষেপণাস্ত্র দুটি তার গাড়িতে তোলেন। তিনি সেখানে আল হিন্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং বিশ্বখ্যাত কার্পেটের দোকানে ঢুকলেন। সেখান থেকে বিশাল আকারের দুটি কার্পেট কিনলেন। অতঃপর সেই কার্পেটে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি মুড়িয়ে সাবওয়ের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের সেফ হাউজে পাঠালেন। ফাতাহ'র লোকজন সেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার প্রস্তুতি সমাপ্ত করেছে। কিন্তু মারওয়ান এই তথ্য মোসাদকে জানিয়ে দেন। ইটালী কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি তিনি অবহিত করেন। সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ রোমের সন্ত্রাস বিরোধী পুলিশ তাদের বিমান বন্দর সন্নিহিত একটি ফ্লাটের দরজা ভেঙে ঐ ক্ষেপণাস্ত্র আটক করে। এই দফায় বেশ কয়েকজন ফাতাহ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ফাতাহ'র আরও কয়েক সদস্য হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ধারের পর রোমের গণমাধ্যম মোসাদের সতর্কতার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র দুটির উদ্ধার সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করে। অনেকের মতে, ঐ অভিযানকালে মোসাদ-প্রধান জামির এই সময় রোমে অবস্থান করছিলে। এক মাস পর...
📄 ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ
এই যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা মারওয়ান প্রেসিডেন্ট সাদাতকে প্রয়োজনীয় মূল্যবান সব গোয়েন্দা তথ্য দেন। আশরাফ মারওয়ানকে সাদাত আরব দেশসমূহে তার দূত হিসেবে পাঠান। সিরিয় ও মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের সেনাদের পৃথকীকরণে মারওয়ান সক্রিয় ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও জর্ডানের বাদশা হোসেইনের মধ্যে আম্মানে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মারওয়ান উপস্থিত ছিলেন। সৈন্য পৃথকীকরণের সময় মারওয়ান বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র সংস্পর্শে আসেন। সিআইএ ব্যাকুলভাবে মিসরের পলিসি অবগত হতে একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা খুঁজছিল। কেননা আমেরিকা ইতিমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে একটা ইন্টেরিয়াম চুক্তি করে ফেলেছিল। মার্কিন সূত্র অনুযায়ী মারওয়ান ও সিআইএ'র সম্পর্ক সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য মারওয়ান বহুবার আমেরিকা সফর করেন। সিআইএ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিত। সিনিয়র পদ মর্যাদার কারণে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে তার চাহিদা কিছুটা কমে গেলে মারওয়ান ব্যবসা শুরু করেন। লন্ডনের ২৪ কার্লটন হাউজে তিনি একটা বিলাসবহুল এ্যাপার্টমেন্ট কেনেন এবং তার অগুনতি টাকা বিভিন্নভাবে লগ্নি করেন।
১৯৭৫ সালে আশরাফ মারওয়ান আরব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। মিসর, সৌদি আরব এবং উপ-সাগরীয় আমিরাতের দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য। মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা ধাচেই তাদের প্রচলিত অস্ত্রগুলো তৈরির। প্রকল্পটি ব্যর্থ হলেও ব্যবসায়ী মহলের এবং তাদের লোকদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। যাহোক, কিছুদিন পর অস্ত্র নবায়নের কোম্পানি থেকে বাদ পড়লে মারওয়ান ১৯৭৯ সালে প্যারিসে চলে যান। দু'বছর পর ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের হাতে মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত নিহত হলে মারওয়ান লন্ডনে গিয়ে বিশাল ব্যবসার মাধ্যমে মস্ত ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ব্যালোরক দ্বীপে তার মালিকানাধীন হোটেলে তিনি মোসাদের শীর্ষ গোয়েন্দা ডুবিকে দাওয়াত করেন। তাকে মারওয়ান জানান যে, গোয়েন্দাবৃত্তি থেকে তিনি অবসর নিতে চাইছেন। ওদিকে মিসরের মাটি তার জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সত্তর দশকের শেষার্ধে মারওয়ান উপলব্ধি করেন যে, মিসরের শীর্ষ পর্যায়ে ইসরাইলের সঙ্গে তার সখ্যতার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে আশরাফ মারওয়ান ইসরাইলের পক্ষে গোয়েন্দাগিরিও ছেড়ে দিলেন।
ইতিমধ্যে সফল ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী হিসেবে চারদিকে মারওয়ানের ব্যাপক পরিচিতি। এর ফলে তিনি ভালো ভালো প্রকল্পে লগ্নি করতে সমর্থ হন। তিনি ফুটবল ক্লাব চেলসির অন্যতম অংশিদার হন। লন্ডনের বিখ্যাত এবং অভিজাত হ্যারোডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর কিনতে মনস্থ করেন। এজন্য তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় প্রিন্সেস ডায়নার প্রেমিক ডোদীর বাবা মোহাম্মদ আল ডায়েদের সঙ্গে। এদিকে তার বিলাসী জীবনের ধরন-ধারণ আরও বৃদ্ধি পেল। প্রেম, ভালোবাসা, পরকীয়া, মেয়ে পটানোতে তিনি বরাবরই পটু। এসব কাজে মারওয়ানের নাম সমার্থক হয়ে উঠে। একবার সিআইএ'র লোকজন তার নিউইয়র্ক হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করেছিল।
আশির দশকে গাদ্দাফীর আমলে বেশ কয়েকটি অস্ত্র কেনা-বেচার ডিলের সঙ্গে মারওয়ান যুক্ত ছিলেন। লেবাননে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহের ব্যবসায়ও তিনি যুক্ত ছিলেন। একবার সিআইএ'র এক এজেন্টকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেন তিনি। বারান্দা থেকে তাকে একটি ঝকঝকে রোলস রয়েস গাড়ি দেখান। আশরাফ মারওয়ান। পার্ক করা গাড়িটি গাদ্দাফী তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা আশরাফ মারওয়ানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের বিষয়টি হয়তো সত্যের অপলাপ। কেননা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক করলে, ব্যবসা করলে মোসাদ তাকে ছেড়ে দেবে না। মোসাদ তার পিছু নিলে ইসরাইলি এজেন্ট হিসেবে তার অতীত প্রকাশিত হবে। একই সাথে মোসাদ নিশ্চিত তাকে হত্যা করবে। মারওয়ান যদি লিবিয়া কিম্বা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক তৈরিই করে থাকেন তা করেছেন মোসাদের পূর্ণ সম্মতিতে।
২০০২ সালে ইসরাইলের ইতিহাস শীর্ষক পুস্তক প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। বইয়ের লেখক ইসরাইলের বিশেষ পন্ডিত আহরন ব্রেগসান। সেখানে ইয়োম কিন্তুর যুদ্ধের ব্যাপারে ইসরাইলকে এক জামাতা সতর্ক করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। আর ঐ গোয়েন্দা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এঞ্জেল হলেন প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা। ব্রেগম্যান ঐ গোয়েন্দাকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন ঐ ডাবল এজেন্ট ইসরাইলকে মিথ্যা তথ্য দিতেন। ঐ বইয়ে মারওয়ানের নাম ছিল না। মারওয়ান মিসরের আল আহরাম পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রেগম্যানের গবেষণাকে একটা স্টুপিড গোয়েন্দা গল্প বলে অভিহিত করেন।
ব্রেগম্যান এতে খুবই দুঃখ পান। তিনি তার সম্মান বাঁচাতে একই পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। এই সাক্ষাৎকারে 'জামাতা' হিসেবে আশরাফ মারওয়ানের নাম উল্লেখ করেন।
অভিযোগটি গুরুতর। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু সাবেক আমান প্রধান জেনারেল জেইরা যখন মুখ খোলেন তখন ব্রেগম্যানের কথার সত্যতার প্রমাণ মেলে। জেইরা ঘোষণা দেন ঐ জামাতা ছিলেন ডাবল এজেন্ট। ইসরাইলকে তিনি বোকা বানিয়েছেন। এবং তার নাম আশরাফ মারওয়ান।
ইসরাইলের মাটিতে অতীতে কখনোই এমন ঘটনা ঘটেনি। ইসরাইল কখনোই তাদের সাবেক গুপ্তচরদের পরিচয় প্রকাশ করেনি; এমনকী সে যদি জীবিতও না থাকে। এদিকে আশরাফ মারওয়ান তো জীবিত। সাবেক মোসাদ-প্রধান জামির ত্রিশ বছর আগে অবসরে গেছেন। তিনি মারওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু এঞ্জেল জামিরের সাথে গলা মিলিয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। জামির বলেছেন, মারওয়ান হয়তো মনে করেছেন, আমি তাকে রক্ষা করতে পারব না। তবে আমি তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি সফল হইনি।
জেনারেল জেইরা যে তথ্য প্রকাশ করলেন তার কঠোর বিরোধিতা করলেন মোসাদের সাবেক প্রধান জামির। তিনি বললেন, জেইরা রাষ্ট্রের গোপনীয়তা বিনষ্ট করছেন। জেইরা পাল্টা আক্রমণ করে বললেন, মোসাদ-প্রধান জামির যাকে রক্ষা করতে চাইছেন তিনি একজন ডাবল এজেন্ট।
ইসরাইলি সাংবাদিক রোনেন মিসরের একটি টিভি অনুষ্ঠান সরাসরি দেখছিলেন। এটি ঐ সরকারের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে দেখা গেল মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসাইনী মোবারক মারওয়ানের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করছেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিক রোনেন আশরাফ মারওয়ানকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে অভিহিত করেন।
ইসরাইলে মারওয়ানের সত্যিকার পরিচিতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্কের মধ্যে মোসাদ ও আমান সত্য উদঘাটনে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করল। কিন্তু দুটি কমিটির রিপোর্টের উপসংহার ছিল একই। সেখানে বলা হল, মারওয়ান ডাবল এজেন্ট ছিলেন না এবং ইসরাইলের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু তিনি করেননি। জেনারেল জেইরা ছাড়বার পাত্র নন। তিনি সাবেক মোসাদ-প্রধান জামিরের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। একজন সাবেক বিচারপতি ঐ মামলার সালিশ নিযুক্ত হন এবং তিনি জামিরের বক্তব্যই সঠিক বলে রায় দেন।
জেইরা এবং তার সমর্থকরা কখনোই এ তথ্য আমলে নিতে চাননি যে, মারওয়ান মিসর সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসেরের জামাতা কিম্বা আনোয়ার সাদাতের একজন উপদেষ্টা। এদিকে গেড়াকলে পড়া মিসর সরকার কখনোই স্বীকার করতে চায়নি, তাদের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা একজন রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন কিম্বা ইহুদিদের হয়ে কাজ করেছেন। এটা স্বীকার করার অর্থ হল মিসরের জনগণ এতে যারপরনাই ব্যথিত হবে এবং মিসরের নেতাদের ব্যাপারে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ফলে তারা ভিন্ন এক প্রক্রিয়া গ্রহণ করল। তারা প্রকাশ্যে মারওয়ানের প্রশংসা করল কিন্তু তাকে আর সরকারের কোনো পদে কোনোক্রমেই জায়গা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
২০০৭ সালে ইসরাইলের উল্লেখিত বিচারক তার রায় প্রকাশ করলেন। ১২ জুন ইসরাইলের একটি আদালত সরকারিভাবে স্বীকার করল যে, জামিরের মাধ্যমে মারওয়ান মোসাদের হয়ে কাজ করেছেন। দুই সপ্তাহ পরে ২৭ জুন মারওয়ানের লাশ তার বারান্দার নিচে রাস্তার পাশে পাওয়া গেল।
ইসরাইলি পর্যবেক্ষকরা এই হত্যার জন্য মিসরের গোয়েন্দা বিভাগকে দায়ী করল। অনেকে জেনারেল জেইরকে দায়ী করল। তার লাগামহীন কথাবার্তা ও আচরণই মারওয়ানের মৃত্যুর কারণ। এদিকে মারওয়ানের বিধবা স্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ে তার স্বামীকে হত্যার জন্য মোসাদকে দায়ী করে বিবৃতি দিলেন। এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলল, মৃত্যুর কিছু আগে মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের চেহারার কিছু লোককে মারওয়ানের সঙ্গে বারান্দায় কথা বলতে দেখা গেছে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও মামলার তদন্ত করল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে বলল, হত্যাকারীকে খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ।
এঞ্জেলের হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা আজও হয়নি। ইচ্ছে করলে কেউ তদন্ত করে দেখতে পারেন।