📄 পারমানবিক গোয়েন্দার জন্য মধুর ফাঁদ
ডিমোনো আনবিক চুল্লীতে সে একজন টেকনিশিয়ানের কাজ করত। এটি ইসরাইলের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত ও গোপনীয় পারমাণবিক চুল্লী। বিদেশি গণমাধ্যম এমনকী বেশ কিছু সরকার মনে করত ইসরাইল 'অতিগোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ডিমোনো পারমাণবিক কেন্দ্রে চাকুরী পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চাকুরি প্রার্থীর যাবতীয় তথ্য কয়েকটি সংস্থা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে। এত সব পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থীর কাছে অসহনীয় মনে হলেও এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় নেই। সবকিছু সন্তোষজনক হলেই কেবল সে ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর গোপন কেন্দ্রে ঢুকতে পারে। আর চাকুরী পেলেই তার উপর নজরদারি শেষ হয়ে যায় না।
মোরদেচাই ভানু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে চাকুরীর আবেদন করে। নিউক্লিয়ার রিসার্চ ফ্যামিলিটি অফিসে সে চাকুরী পেয়ে যায়। জায়গাটি বীরসেবার কাছে অবস্থিত। এই অফিসে রুটিন মাফিক নিরাপত্তার কাজ হত। ফলে সহজেই সে চাকুরী পেয়ে গিয়েছিল।
এতদসত্ত্বেও প্রশ্ন ওঠে যে কী করেই বা এই চাকুরী পেল। কেননা সে একজন গোড়া বামপন্থী। তার বন্ধুরা আবার দেশের কম্যুনিষ্ট এবং ইহুদি বিরোধি রাকাহ পার্টির সদস্য। ভানু নিজে তাদের বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছে। কট্টর ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে তাকে প্লাকার্ড নিয়ে বক্তৃতা করতে দেখা গেছে। এমনকী সংগঠনের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে। সে রাকাহ সন্ত্রাসীদের তার ফ্ল্যাটে দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছে। সেখানে তাদেরকে তাদের সংগঠনে যোগ দিতে বলেছে। আর তাদের সংগঠনটি এককথায় প্রকাশ্যে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধি। তরুণ আরব মৌলবাদীদের সংগটন এটি।
বেন গুরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তালিকাভুক্ত ছাত্র এবং চরভাবাপন্ন মনোভাবের জন্য সে ব্যাপক পরিচিত। ভানুর মধ্যে অনেক গুণেরই সমাহার ঘটেছিল। তবে সে ছিল অস্থির প্রকৃতির রাবাহ সমর্থক হওয়ার সে ছিল উগ্র দক্ষিণপন্থী বর্ণবাদী রাব্বি কাহানের ঘোর সমর্থক। এর পরে সে সমর্থক হয়ে যায় কট্টর ডানপন্থী দল হাটেছিয়ার (সংস্কারবাদী) সমর্থক এবং লিকুদ পার্টিকে ভোট দেয়। আরও পরে সে কট্টর বামপন্থী বনে যায়।
তার দাবি ১৯৮২ সালের বিতর্কিত লেবানন যুদ্ধ তার মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটায়। প্রায় একাকী থাকতে অভ্যস্ত এবং বলতে গেলে প্রায় বন্ধুহীন ভানু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাল করে সে বৈষম্যের শিকার হয়েছে। সে মরক্কো বংশোদ্ভূত বলেই তার এত বঞ্চনা। এয়ারফোর্স একাডেমিতে ভর্তি হতে ব্যর্থতার কারণে তার মনে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। তাকে পোষ্টিং দেয়া হয় ইঞ্জিনিয়ারিং করপাস। আইডি এক থেকে বাদ পড়ার পর তেলআবিবে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করে। মন পরিবর্তন করে সে বারসেবায় চলে যায়। সেখানে সে অর্থনীতি নিয়ে পড়তে শুরু করে। আবার মন পরিবর্তন করে দর্শন নিয়ে পড়তে শুরু করে। সে নিরামিশাশী হয়ে ওঠে; অতপর ভেগান। টাকার প্রতি তার লালসা বা দূর্বলতা তার বন্ধুদের অবাক ও চমৎকৃত করত। সে গর্ব করে বলত সে কাজ করতে অনাগ্রহী।
শেয়ার মার্কেটে স্মার্টলি বিনিয়োগ করতে চায়। সে তার ডাইরিতে শেয়ার মার্কেটকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় বলে উল্লেখ করে। সে লালরংয়ের একটি অডি গাড়ি চালাত এবং টাকা কামানোর জন্য সে ন্যাংটা হয়ে মডেল হয়েছিল। একবার ছাত্রদের এক পার্টিতে পুরস্কার জেতার জন্য সে তার জাঙ্গিয়া খুলে ফেলেছিল। তার জীবনব্যবস্থা তার নিজস্ব। এ নিয়ে কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের সমর্থক ও রাখাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তার ব্যক্তি জীবন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বৈকি। কেননা তার রাজনীতি ও জীবন যাপন বৈপরীত্যে ভরা।
একবার গোয়েন্দা সংস্থা সাবাক কর্মকর্তারা তাকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলে। তাকে সাবাক সতর্ক করেছে এমন একটি কাগজে তাকে সই করতে বলা হয়। কিন্তু ভানু সইতো করেইনি এবং সে যা যা করত তা বন্ধও করেনি।
ভানুর কর্মকাণ্ড নিয়ে সাবাব একটি রুটিন রিপোর্ট প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিরাপত্তা পরিচালকের কাছে পাঠায়। ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর পরিচালককে ভানু সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন মন্ত্রনালয়ের উক্ত কর্মকর্তা। ভানুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হল না। তার পেছনে গোয়েন্দাদেরও লাগানো হল না। বিষয়টি ঘোরতর দায়িত্বে অবহেলা। এক্ষেত্রে সাবাকের স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়, ডিমোনা প্রকল্প, মন্ত্রনালয় সকলেই ভানুর ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল। ফলে ভানু তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলই এবং কাউকে তার পরোয়া করার দরকার পড়ল না।
ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীতে ইনষ্টিটিউট ২ এ ভানু ছিল একজন অপারেটর।
সংস্থার সর্বোচ্চ গোপনীয় বিভাগ এটি। ডিমোনোর ২৭শত কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১৫০ জনেরই প্রবেশাধিকার ছিল ইনষ্টিটিউট-২ এ ঢোকার। ভানুর ছিল দুটি ব্যাজ। একটি ডিমোনাতে প্রবেশের আরেকটি ইনষ্টিটিউট দুই এ ঢোকার।
ইনষ্টিটিউট বাইরে থেকে দেখলে দোতলা একটি ভবন বলে মনে হবে। কিন্তু যারা কৌতূহলী তাদের মনে জাগতেই পারে যে, দোতলা ভবনের আবার লিফট কেন। আসলে ইনষ্টিটিউ-২ এর এই হল এক বিরাট রহস্য। লিফটের অস্তিত্বের মূলে ছিল উপরে ওঠার জন্য নয়, নীচে নামার জন্য। এই ভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে রয়েছে ছয়টি তলা এবং এমনভাবে সাজানো গোছানো যে, নীচে যে তলা আছে তা মালুম করাটা দুঃসাধ্য। ভানু রাতের পালার শিফট ইনচার্জ ছিল এবং ভবন সম্পর্কে তার কিছুই অজানা ছিল না।
এই ভবনের দোতলায় একটি অংশে বিভিন্ন অফিস, আরেক দিকে ক্যাফেটরীয়া রয়েছে। নীচতলার কয়েকটি গেট দিয়ে ইউরেনিয়াম রড ট্রান্সফার করা হত। এগুলো চুল্লীতে ব্যবহৃত হত। কিন্তু প্রথম আন্তারগ্রাউন্ড ফ্লোরে পাইপ ও বাল্ব রাখা হত। আন্ডার গ্রাউন্ডের দ্বিতীয় তলায় ছিল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। বরান্দার নাম ছিল গোল্ডাস ব্যালকনি। খুবই গুরুত্বপূর্ন ভিজিটররা ব্যাপক যাচাই বাছাই শেষে এই ব্যলকনির নীচ দিয়ে প্রোডাকশন হল প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়। ভূগর্ভস্থ তিন তলায় টেকনিশিয়ানরা ইউরেনিয়াম রড দিয়ে কাজ করে। ভূগর্ভস্থ চার তলায় রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড সোর্স।
এর সাথেই যুক্ত উৎপাদন প্লান্ট। এখানে রয়েছে পৃথকীকরণের সুবিধাদি। এই পর্যায়ে চুল্লীতে প্লটোনিয়াম উৎপন্ন হয়। ভূগর্ভস্থ পঞ্চম তলায় বোমার কমপোনেন্টস প্রস্তুত করা হয় এবং ভূগর্ভস্থ সর্বোচ্চ নীচের তলায় একটি বিশেষ পাত্রে রাসায়নিক বর্জ্য জমা করা হয়। ভানু প্রতিটি ভূগর্ভস্থ তলা সম্পর্কেই সম্যক অবহিত ছিল।
ইসরাইলের ডিমোনা পরমাণু কেন্দ্রে ৯ বছর কাজ করার পর ১৯৮৫ সালে তার চাকুরী চলে যায়। চাকুরী যাওয়ার মূলে কোন রাজনৈতিক কারণ ছিল না। ডিমোনার বাজেট হ্রাস করা হলে অন্যদের সাথে তার চাকুরীও চলে যায়। যদিও ডিমোনা থেকে সে ভাল ক্ষতিপূরণ পেয়ে যায়। ভানু আবার ক্রুব্ধ এবং হতাশ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সে বিদেশে যেতে মনস্থ করে। এমনকী তার দেশের ফেরার ইচ্ছাও কম। তার প্রত্যাশা, এক কোটি কুড়ি লক্ষ ইহুদির ইসরাইলের বাইরে বসবাস। সেও যদি এভাবে নিজস্ব একটা থাকার জায়গা পেত। ভানু তার ফ্ল্যাট, গাড়ি বিক্রি করে এবং ব্যাঙ্কের সব টাকা তুলে নেয়। বত্রিশ বছর বয়স্ক ভানু তার ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে বেরিয়ে যায়। এর আগেও সে একবার ইউরোপ, একবার আমেরিকা ঘুরে এসেছে। তার ব্যাগে রয়েছে দুটি ফিল্মও। যা সে ডিমোনায় চুরি করে তুলেছিল।
প্রথমে সে গ্রীস আসে। পরে রাশিয়া, থাইল্যান্ড এবং নেপাল। কাঠমুন্ডুতে তার সাথে ইসরাইলের এক তরুণীর সাক্ষাৎ ঘটে। সে তার নাম বলে মার্ড এবং প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে সে ছিল একজন বামপন্থী। কিন্তু শান্তিবাদী। তবে সম্ভবত সে আর ইসরাইল ফিরবে না।
কাঠমান্ডু শেষে ভানু আরও কতগুলো দেশ ঘুরে অস্ট্রেলিয়া আসে। প্রথমে সে সেখানে কিছুদিন অব জব করে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই সে একাকী ছিল এবং তার আচরণ ছিল রহস্যজনক। এক সন্ধ্যায় সে শহরের সর্বোচ্চ অখ্যাত এলাকায় যায়। এলাকাটি চোর ডাকাত পতিতাদের স্বর্গরাজ্য। এখানেই সে একটি চার্চ দেখতে পায়। অসহায়, পাপী, নাদান, অপরাধী, ভবঘুরে, পতিতাদের জন্য শান্তির আবাসস্থল এটি।
এখানে ভানুর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে চার্চের যাজকের। পরোপকারী যাজক মুহূর্তেই বুঝে ফেলেন ভানুর জন্য একটি বাড়ি চাই, একটা পরিবার চাই। যাজক ভানুর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কয়েক সপ্তাহ ভানু ও যাজকের মধ্যে আন্তরিকতাপূর্ন পরিবেশে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়। অবশেষে ১৯৮৬ সালের ১৭ আগষ্ট ভানু খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে। তার নতুন নাম জন ক্রসম্যান। উক্ত যাজকের সাথে ভানুর পরিচয় না হলে হয়ত সে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করত কিম্বা অন্য কোন ধর্মে দীক্ষিত হত।
চার্চের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে ভানু ইসরাইলে কী কাজ করত সে কথা বলতে গিয়ে ইসরাইলের ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর প্রসঙ্গ তোলে। ডিমোনায় সে গোপনে যে সব দুঃসাহসিক ছবি তুলেছিল তার একটি স্লাইড শো সে করার কথা বলে। চার্চের লোকজন তার কথায় উদাসী দৃষ্টিতে তাকায়। কেননা এ সম্পর্কে তারা কিছু জানেও না আবার কোন ধারণাও নেই। ওই সভায় অস্কার নামে কলম্বিয়ার এক লোক ছিলেন। ঘুরে বেড়ানো ও সৌখিন সাংবাদিকতা করে সে। ভানু ও অস্কার চার্চের একটি কক্ষে একসাথে কিছুদিন ছিল এবং চার্চের সংস্কার কাজেও কিছুটা অংশ নিয়েছিল। অস্কার ভানুর কাছে থাকা ছবিগুলো গুরুত্ব বুঝতে পেরে এ ছবি দিয়ে প্রচুর টাকা কামানো যাবে বলে তাকে উৎসাহ দিতে লাগল।
ভানু পাগলের মত টাকা ভালবাসত। আবার তার মধ্যে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তির পথ উন্মুক্ত করারও একটা বাসনা কাজ করত। শান্তির অন্বেষায় ভানু পরমাণু কেন্দ্রের ছবি নিয়ে ইসরাইল ছাড়েনি। কিন্তু ইসরাইলের আনবিক বোমা থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা ও সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার একটা মহান উদ্দেশ্য তার ভেতর ছিল বৈকি! ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে সে নিজে নিজে এক ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে গেল এবং কালে কালে সে ঐ বোমার বিরুদ্ধে কাজ করা তার প্রধান ধ্যান হয়ে উঠল।
ইসরাইলের পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি প্রকাশে সে ক্রমশ মরীয়া হয়ে উঠল। তবে ভানু একথাও বুঝত, ছবি প্রকাশ মানেই ইসরাইলের দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ইসরাইলে ঢোকামাত্র সে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ভানুর মধ্যে ছবি প্রকাশের ব্যাপারটি এখনো বেশ সক্রিয়। ভানু এবং অস্কার সিডনির একটি ফটো ল্যাবে গিয়ে ইনষ্টিটিউট-২ এ তোলা ছবিগুলো আমেরিকার ম্যাগাজিনের স্থানীয় অফিস এবং অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশনে প্রচারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হল। সংবাদ মাধ্যমগুলোর ধারণা হল, ধাপপাবাজির মাধ্যমে ভানু এবং অস্কার কিছু ডলার কামিয়ে নিতে চায়। তারা বিশ্বাস করল না লাজুক প্রকৃতির ভানুর হাতে ইসরাইলের সবচে সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি।
অস্কার স্পেন ও ইংল্যান্ডে গিয়ে ছবির মূল্য বুঝতে পারল। এ যেন টাকার পাহাড়ের মধ্যে পড়েছে তারা। লন্ডনের সানডে টাইমস ছবিগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারল। ছবির সাথে ভানু পরমাণু কেন্দ্রের কিছু গ্রাফও এঁকেছিল। কিন্তু সানডে টাইমস কোন বিশেষ রিপোর্ট প্রনয়নের ব্যাপারে খুব সতর্ক। কেননা কয়েকদিন আগে তারা হিটলারের ডাইরী নামে যা কিনেছিল তা ছিল ভুয়া ও জাল। ফলে ভানুর ছবিগুলো তারা নানাভাবে পরখ করল।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া টিভির এক কর্মকর্তার সাথে ক্যানবেয়ার ইসরাইলি দূতাবাসের সখ্যতা ছিল। তিনি কথা প্রসঙ্গেই জানালেন যে, রহস্যজনক এক ব্যক্তি তার দেশের পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি বিক্রিতে আগ্রহী। বিষয়টি ইসরাইলের এক সাংবাদিক জানতে পেরে তার দেশের পত্রিকায় নিউজ করে।
উল্লেখিত খবরে ইসরাইলের গোয়েন্দা বিভাগসমূহে যেন ভূমিকম্প হয়। কেননা ডিমোনা কেন্দ্রের সাবেক এক কর্মকর্তা পরমাণু কেন্দ্রের ছবি বিক্রিতে আগ্রহী। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক হেমি কারমন এই ঘটনায় হায় হায় করে ওঠেন। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন যে, সময় মত আমরা কেন ভানুর ব্যাপারে কেন সিদ্ধান্ত নিলাম না।
ভানুর ক্রিয়াকর্ম ইসরাইল প্রাইম মিনিস্টারস ক্লাবে গিয়ে পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রী পেরেজ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবীন ও শামীর এই ক্লাবের সদস্য। তারা সকলেই জাতীয় ঐক্য সরকারের সদস্য। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন অবিলম্বে ভানুকে খুঁজে বের করে ইসরাইলে ফেরত আনতে হবে। তাদের সহযোগিদের কারো কারো মতে, ভানুকে ফেরত না এনে হত্যা করাই শ্রেয়। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ফোন তুলে মোসাদের প্রধানকে ডাকেন।
১৯৮২ সাল থেকেই মোসাদের নতুন পরিচালক রাহুম আদমোনি। তার জন্ম জেরুজালেমে। গোয়েন্দা দফতর আমানে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন আইজাক হাফিসের ডেপুটি। মোসাদের প্রধান ছিলেন তিনি ৭ বছর। কিন্তু গোয়েন্দাদের জন্য এই সময়টা মোটেও সুখকর ছিল না। বহু ঘটনা দুর্ঘটনায় মোসাদ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে যায়। ইহুদি এক নাগরিক বেসামরিক গোয়েন্দাবৃত্তির জন্য ওয়াশিংটনে গ্রেফতার হন। এ সময়ই ঘটে ইরান কন্ট্রার ঘটনা। যার সঙ্গে ইসরাইল জড়িত ছিল। অসর্তকতার জন্য এ সময় বহু ইসরাইলি গোয়েন্দা বিদেশে গ্রেফতার হয়। তবে ইসরাইলের সর্বোচ্চ ক্ষতির কারণ হল মোরদেচাই ভানু। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেই মোসাদ প্রধান ভানুকে আটকের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। কম্পিউটারে এই অভিযানের নাম দেয়া হয় কানিউক। মোসাদ প্রধান অস্ট্রেলিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে একটি দল পাঠালেও কোন লাভ হয়নি। কেননা পাখি উড়ে গেছে লন্ডনে।
এদিকে অস্কারের সাক্ষাৎকার শেষে সানডে টাইমস সম্পাদক পিটার নামে এক তারকা সাংবাদিককে ভানুর সাথে সাক্ষাৎ করতে অস্ট্রেলিয়া পাঠান। বিমানে উঠেই পিটার জানতে পারেন, ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা অস্কারের কাছ থেকে পাওয়া ছবিগুলোর সত্যতা উদঘাটন করেছেন। পিটার হাওনাম সিডনীতে ভানুর সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন ঘটনা সব সত্যি। অস্কার ভানু সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করে।
ভানু জানায় যে, একথা সত্য নয়। সে একজন টেকনিশিয়ান মাত্র।
ভানু এবং পিটার লন্ডনে আসেন। সেখানে সানডে টাইমসের লোকরা ভানুর বিশদ সাক্ষাৎকার নেন। সে যা জানে সবই তাদেরকে অবহিত করে। ব্রিটিশদের সে আরও জানায়, ইসরাইল একটা নিউট্রন বোমাও বানাচ্ছে। এই বোমার বিশেষত্ব হল প্রানী বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না কিন্তু ভবনাদি এবং দালাকোঠার কোন ক্ষতি হবে না। ইনস্টিটিউট-২ এ কীভাবে বোমা বানানো হয় তার পদ্ধতিও ভানু সবাইকে জানায়। এই পর্যায়ে ভানুকে বেশ নার্ভাস লাগছিল। ইসরাইলি গোয়েন্দারা তাকে মেরে ফেলতে পারে কিম্বা অপহরন-এই ভয় তাকে আতঙ্কিত করে। পত্রিকাটি তাদের সব কর্মীকে ভানুর সেবায় নিয়োগ করে। ভানু যাতে একাকী রাস্তা ঘাটে হাঁটাহাটি না করে সে ব্যাপারে তাকে সতর্ক করা হয়।
সানডে টাইমস ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ভানুকে এক লক্ষ ডলার দিতে চায় তার গল্প ও ছবির জন্য। এর মধ্যে ৪০ ভাগ পত্রিকায় ছাপানো বাবদ এবং ২৫ ভাগ বইয়ের স্বত্ব হিসেবে। তবে বই যদি বের হয়। টাইমসের লোকজন জানায় যে, তাদের মালিক হলেন রূপার্ট মারডক। একই সাথে তিনি টুয়েন্টি সেঞ্চুরি ফক্স নামের সিনেমা কোম্পানীর মালিক। এবং তিনি ভানুর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ছবি বানাতে আগ্রহী। রবার্ট ডি নিরো ভানুর চরিত্রে অভিনয় করবেন। লন্ডনে ভানুর মেজবানরা সেখানে তার সেবাযত্নের কোন ত্রুটি রাখেনি। যদিও তাকে কোন মেয়ে মানুষ দেয়া হয়নি। কিন্তু সেক্স করার জন্য পাগল হয়ে ওঠে সে।
কোলে মাথা রাখার জন্য একটা মেয়ে মানুষ তার চাই ই চাই। ইনসাইড স্টাফ রোয়েনা ওয়েবস্টার ভানুর সঙ্গ দিতে বটে কিন্তু সে কিছুতেই ভানুর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে রাজি নয়। সেক্স করার জন্য ভানু শুধু তার পায়ে ধরতে বাকী রেখেছিল। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, সানডে টাইমস কর্তৃপক্ষ ভানুর সব কথা বুঝেছিল, সব আবদার মিটিয়েছিল কিন্তু তার যে একটি মেয়ে মানুষ দরকার এই কথাটা বুঝতে পারেনি। আবার ভানু যে ইসরাইলের গোয়েন্দাদের ভয়ে কাতর এই সহজ সত্যটাও ঐ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পারেনি। সানডে টাইমস তাদের এক সাংবাদিককে ভানুর খোঁজ নিতে ইসরাইলে পাঠায়। এই সাংবাদিক ইসরাইলের এক সাংবাদিকের সাথে ভানুর ব্যাপারে কথা বলেন।
ইসরাইলি সাংবাদিক সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য গোয়েন্দা দল সাবাককে জানিয়ে দেয়। এর কয়েক ঘন্টার মধ্যে মোসাদের একটি টিম লন্ডনে পৌঁছে যায়। এই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন মোসাদ প্রধানের ডেপুটি সাবতাই সাভিত। এই অভিযানের সেকেন্ড ডেপুটি এবং কায়সারেরায়ের প্রধান বেনি জিভি। মোসাদের এজেন্টরা আলোকচিত্র সাংবাদিকের বেশে সানডে টাইমস পত্রিকার ভবনের সামনে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান নেয়। এই সময় ঐ পত্রিকায় ধর্মঘট চলছিল। মোসাদের লোকজন ধর্মঘটিদের ছবি তোলে। কয়েকদিনের মাথায় মোসাদের এজেন্টরা মোটামুটি ভানুকে চিহ্নিত করে ফেলে। এবং তাকে সারাক্ষণ নজরে রাখতে সক্ষম হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ভানু লেইচেস্টার স্কোয়ারে আসে। জায়গাটি পর্যটকদের খুব প্রিয়। একটি নিউজ পেপার স্টান্ডে ভানু ফারাহ ফসেটের মত এক তরুণীকে দেখতে পায়। ফারাহ ফসেট টিভি শো চার্লিস এঞ্জেলসখ্যাত।
ভানুর মন গলে যায়। ভানুর কাছে স্বর্ণকেশী এই মেয়েটি সৌন্দর্যের রানী যেন। ঐ নিউজ স্ট্যান্ডে দু'জনার চোখাচোখি হলে সে চোখ যেন আটকে যায়। এ চোখাচুখি যেন অর্থপূর্ণ। মেয়েটি পত্রিকাটি কিনে তার পথেই যাত্রা করে। ভানু অন্য পথে রওয়ানা হলেও আবার মেয়েটির কাছে ফিরে এসে তার সাথে কথা বলতে চায়। মেয়েটি হাসি দিয়ে তার সম্মতি জানায়। দু'জনের মধ্যে হালকা বিষয়াদি নিয়ে কথাবার্তা হয়। মেয়েটি জানায় তার নাম সিন্ডি। ফিলাডেলফিয়ার এক ইহুদি বিউটিশিয়ান। ছুটি কাটাতে ইউরোপে এসেছে।
ভানু ক্রমশঃ সন্দিগ্ন হয়ে উঠেছে। সানডে টাইমসের লোকেরা তাকে জেরা করে করে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। তার উপর লেখাটাও তারা স্থগিত করেছে। ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ভয় তাকে আরও কাবু করে ফেলেছে। কেননা সানডে টাইমস বলেছে, এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে ইসরাইলের ভাষ্যও তারা জানবে। এর কারণ হিসেবে সানডে টাইমস বলেছে, তাদের পত্রিকাটি অত্যন্ত মর্যাদাকর। অন্য পক্ষের ভাষ্য নেয়া তাদের একটা রেওয়াজ। কিন্তু ভানু এসব কথায় খুশি হতে পারছিলেন না। তার আশংকা ছিল এসব করতে যাওয়া মানে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এদিকে সে একাকী, ক্ষুব্ধ এবং অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আর এই সময়েই সিন্ডির আগমন।
সিন্ডিকে মস্করা করে ভানু জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মোসাদের পক্ষ থেকে এসেছো। সিন্ডি বলে, না না আমি মোসাদের কিছু নই। আচ্ছা মোসাদ কী। সিন্ডি ভানুর নাম জানতে চায়। ভানু জানায় তার নাম জর্জ। আসলে ভানু জর্জ নামেই হোটেলে উঠেছে। সিন্ডি বলে, কাম অন। তুমি জর্জ নও।
ওরা একটা কাফেতে বসল। ভানু তার প্রকৃত নাম মেয়েটিকে বলল। সানডে টাইমসকে ঘিরে সে যে সমস্যায় পড়েছে তাও সিন্ডিকে বলল। সিন্ডি তাকে জানাল যে, সে সহসাই নিউইয়র্কে যাচ্ছে। সেখানে সানডে টাইমসের থেকেও ভাল পত্রিকার ব্যবস্থা সে করে দিতে পারবে। এমনকী ভাল আইনজীবীও সে দিতে পারবে।
ভানু সিন্ডির কোন কথাই আসলে কানে নিচ্ছিল না। আসলে ভানু প্রথম দর্শনেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে ভানু সিন্ডির সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করল। তার মতে, এই দিনগুলিই তার জীবনের সেরা। তারা হাত ধরাধরি করে পার্কে ঘুরল। সিনেমা দেখা, গান শোনা সবই এক সঙ্গে চলত। আর চুমুর বন্যা বইয়ে দিত দু'জনে। এই সুইট কিসের কথা ভানুর পক্ষে কখনোই ভোলা সম্ভব নয়।
সিন্ডি গভীর ও গাঢ়ভাবে ভানুকে চুমু উপহার দিয়ে গেলেও তার সাথে বিছানায় যেতে ঘোরতর আপত্তি জানাল। সিন্ডি বলেন, সে তার হোটেলে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে থাকছে। সে ভানুকে তার হোটেল কক্ষে কখনোই আনবে না এবং ভানুর হোটেল কক্ষেও যাবে না। সিন্ডি বলল, তুমি লন্ডনে অস্থির অবস্থায় আছো লন্ডনে কিছু হবে না। তুমি আমার সাথে রোমে চল। সেখানে আমার বোনের একটা ফ্ল্যাট রয়েছে। সেখানে আমরা চমৎকার দিন কাটাতে পারব। সেখানেই তুমি শান্তি পাবে এবং তোমার কষ্ট ভুলে যাবে।
ভানু রোমে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। কিন্তু সিন্ডি রোমে যেতে বদ্ধপরিকর। একটা বিজনেস ক্লাসের টিকেটও কিনল। ভানু যখন রোমে যেতে রাজি হল তখন তার জন্যও একটা টিকেট কেনা হল। সিন্ডি বলে, এই টিকেটের টাকা তুমি আমাকে পরে দিয়ে দিও। ভানু যদি সিরিয়াস ধরনের লোক হত, যদি রিজনা বল হত তাহলে সে বুঝতে পারত সে প্রেমের ফাঁদে পড়েছে। কেননা একটি মেয়ের সাথে রাস্তায় দেখা হল, পরিচয় হল এবং তার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত-এতো যুক্তির কথা নয়। এমনকি লন্ডনে কোন সেক্স হল না বলে রোমে তাকে তার বোনের বাড়িতে সেক্স করতে নিয়ে যাচ্ছে এসব ভানুর বোঝা উচিত ছিল। এমনকি তাকে টিকেট কিনে দিল বিমানের যাকে সে ভাল করে জানেই না।
ভানুর আশা রোমে গিয়ে অবশ্যই তাদের সেক্স হবে। যে কোন সেন্সসিবল লোক উপসংহার টানবে যে, সিন্ডির পুরো আচরণই সন্দেহজনক। তবে এক্ষেত্রে মোসাদের প্রশংসা করতেই হয়। মোসাদের মনোবিজ্ঞানীরা ঠিকই বুঝেছিল, ভানু এই সময় কী চায়। এই মনোবিজ্ঞানীরা আরও বুঝেছিল, সুইট কিস দিয়েই ভানুকে প্রেমে অন্ধ করে দেয়া যাবে এবং আরও মিষ্টি মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে পটানো যাবে।
সানডে টাইমসের পিটার হাওনাম একজন সংবেদনশীল মানুষ। যখন তিনি সিন্ডির কথা শুনলেন তখন তার মনে হল মস্ত ভুল হয়ে গেছে। তিনি ভানুকে সিন্ডির সাথে দেখা করতে বারবার নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু এতে কোন কাজ হয়নি। ভানু সিন্ডির প্রতি এমনভাবে মজেছে যে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই তাদেরকে পৃথক করে।
ভানু পিটারকে একত্রে গাড়ি চালিয়ে তাকে একটি ক্যাফেতে পৌঁছে দিতে বলে। ঐ ক্যাফেতে অপেক্ষমাণ সিন্ডি। পিটার এদিন সিন্ডিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। পিটার যখন শুনলেন ভানু শহর ত্যাগের কথা ভাবছে কয়েকদিনের জন্য, তখন পিটার তাকে নিষেধ করেও কোন লাভ হয়নি। তারপর পিটার ভানুকে লন্ডন ত্যাগ না করার জন্য বলেন। পিটার তার পাসপোর্ট হোটেল রিসিপশনে না রাখারও পরামর্শ দেন। পিটারও ধারণা করতে পারেননি যে, সিন্ডির সাথে শোয়ার জন্য ভানু রোমে চলে গেছে।
রোমে ভানুর সাথে সিন্ডি শুতে রাজি হয় একেবারেই ভিন্ন একটি কারণে। ইসরাইল ব্রিটিশ মাটিতে ভানুকে অপহরণ করতে আগ্রহী নয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী পেরেস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লৌহমানবী মার্গরেট থ্যাচারের সাথে বিরোধে জড়াতে চাননি। মোসাদ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনে কাজকর্মে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। কেননা কয়েক মাস আগে জার্মান কর্তৃপক্ষ একটি টেলিফোন বুথে ৮টি ব্রিটিশ জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করে। ঐ পাসপোর্টের ট্যাগের মাধ্যমে ইসরাইলি দূতাবাসের যোগসূত্র পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয়। মোসাদকে একটি প্রতিশ্রুতি দিতে হয় যে, ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব নিয়ে সে কখনো ছলচাতুরির আশ্রয় নেবেনা।
এক্ষেত্রে রোম হল সম্ভাব্য সেরা স্থান। মোসাদ এবং ইটালীর সিক্রেট সার্ভিসের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ এবং গভীরে প্রোথিত। মোসাদ প্রধান এবং ইটালীর সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান এডমিরাল ফুলভিও মাটিনির সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এবং ইটালীতে যেভাবে অস্থিরতা বাড়ছে তাতে নিশ্চিত যে ভানুর অপহরণের বিষয়টি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। ১৯৬৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সিন্ডি ও মর্ডি হাতে হাত রেখে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে উঠে বসে। রাত ৯টায় দুই প্রেমিক যখন ল্যাণ্ড করে ইটালীর বহু লোক তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে। ভাল্লু সেই পুষ্পস্তবক গাড়িতে রেখে সিন্ডির বোনের বাড়িতে যাচ্ছে। পথে বিশেষ করে সিন্ডি তার প্রিয় মানুষ ভানুকে বেশ কয়েকবার জড়িয়ে ধরে। ভরিয়ে তোলে চুমুতে চুমুতে।
একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে গাড়িটি থামলে একটি ছোট্ট মেয়ে দরজা খুলে দেয়। ভানুই প্রথমে বাড়িতে ঢোকে। হঠাৎ করেই দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায় এবং দুটি লোক তার উপর জাম্প দেয় এবং দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। ভানু লক্ষ্য করে এদের মধ্যে একজন স্বর্ণকেশী। যখন তার হাত-পা বাঁধা হচ্ছিল তখন মেয়েটি তার হাতে নিডল দিয়ে কিছু পুশ করে। এভাবে নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয় পড়ে ভানু।
একটি কমার্শিয়াল ভ্যান ভানুর অচেতন দেহটা শহরের উত্তরাংশে নিয়ে যায়। ভ্যানটি বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে চলছিল। ভানুর পাশে দুজন পুরুষ এবং এক মহিলা বসা ছিল। কয়েক ঘন্টার মধ্যে ভানুকে আরেকটি ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। এদিকে সিন্ডি লাপাত্তা হয়ে গেছে। ভ্যানটি লা মেনজিয়া বন্দরে পৌছে। ভানুকে একটি স্ট্রেচারে করে দ্রুতগামি একটি স্পীড বোটে তোলা হয়। সেটি উন্মুক্ত সাগরের দিকে এগুতে থাকে। সেখানে অপেক্ষমাণ ছিল ইসরাইলের একটি জাহাজ-নাম তাপুন। আরেকটি সূত্র মতে, এর নাম ছিল এস এস নাগা। জাহাজের ক্রুদের তাদের লাউঞ্জে ঢুকে যেতে নির্দেশ দেয়া হল। কিন্তু যারা ডিউটিরত ছিল তারা স্পিড বোট এগিয়ে আসতে দেখল। ভানুকে অচেতন অবস্থায় জাহাজে তুলে একটি কেবিনে তুলে তালা মেরে দেয়া হল। জাহাজটি অবিলম্বে ইসরাইলের পথে যাত্রা করল।
ভানু পুরো সময়টা ক্ষুদ্র ঐ রুমে তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকল এবং কোথাও সিন্ডিকে দেখতে পেল না। সিন্ডির ব্যাপারে সে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। কোথয় গেল সিন্ডি। ভানুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না যে, সিন্ডি মোসাদ টিমের একজন সদস্য। সম্ভবত সেই রাতেই সে ইরানে চলে গেছে। ভানুর সফর সঙ্গি হিসেবে জাহাজে যে মহিলা রয়েছেন, তিনি একজন ডাক্তার। ভানুকে ইসরাইলের একটি নেভি মিসাইল বোটে তোলা হল। সেখানে সে পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবাক গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হল। তারা ভানুকে গ্রেফতার করে এ্যামকেলনের সিকমা জেলখানায় নিয়ে গেল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সময়ই ভানু বুঝল যে, তাকে ইসরাইল নেয়ার সময়ই লন্ডনের সানডে টাইমস তার উপর ধারাবাহিক ছাপতে শুরু করেছে। ঐ প্রতিবেদনে ছবি এবং ড্রয়িংও ছাপা হয়। সারা বিশ্বে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সানডে টাইমস উল্লেখ করে যে, ইসরাইলের পরমাণু দক্ষতার যে ধারণা ছিল তা ছিল ভুল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তারা মনে করেছিলেন ইসরাইলের হাতে ১০ থেকে ২০টি প্রিমিটিভ আণবিক বোমা রয়েছে। কিন্তু ভানুর তথ্যে প্রমাণিত হয় যে, ইসরাইল পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে এবং তাদের হাতে অত্যাধুনিক ১৫০ থেকে ২০০টির মত পারমাণবিক বোমা রয়েছে।
একই সাথে ইসরাইলের হাইড্রোজেন ও নিউট্রন অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা রয়েছে। ভানু এই স্পর্শকাতর সংবাদ প্রকাশের পর আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে ভয় পেয়ে গেল ইসরাইলিরা তাকে মেরে ফেরবে। সে সিন্ডির জন্যও চিন্তিত ছিল। তাকে যখন বলা হয় সে মোসাদের লোক তখনো সে তা বিশ্বাস করতে চাইছিল না।
চল্লিশ দিন বিশ্ববাসী ভানু সম্পর্কে কিছুই জানতে পারল না। মিডিয়া ছাপতে শুরু করল যে, সত্য নিয়ে কারচুপি করে লাভ নেই। ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকা কী করে ভানুকে লন্ডন থেকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত ছাপতে শুরু করল। অনেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিখল, একটি প্রমোদতরীতে এক তরুণীসহ ভানুকে ইসরাইল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ এমপিরা লন্ডনে পুরো ঘটনার একটি সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করল এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণের দাবি জানাল। ভানুকে মধ্য নভেম্বরে সরকারিভাবে অভিযুক্ত করা হল। তাকে এরপর পুনঃপুনঃ আদালতে নেয়া হচ্ছিল।
সে ভাল করেই জানত জনসমাগমের কোন দিকটায় রিপোর্টার থাকে। একবার ভানু পুলিশের গাড়ির পেছন দিকটায় বসল। রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফারদের ভিড় দেখে সে তার হাত জানালায় রাখল। এর কারণ তার হাতে যা লেখা রয়েছে তা যেন সাংবাদিকরা পড়তে পারে। ভানুর হাতে সংক্ষিপ্তাকারে যা লেখা ছিল তাহল ১৯৬৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে রোমে অপহরণ করে। সে বিমানযোগে রোমে এসেছিল। সব কথা জানাজানির পর জেরুজালেম ও লন্ডনের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। কেননা, এটা পরিষ্কার ভানু লন্ডন ত্যাগ করেছে স্বেচ্ছায় এবং এটি ছিল একটি নিয়মিত ফ্লাইট। এদিকে রোমে গোয়েন্দা প্রধানের মাথায় হাত। তিনি ক্রুব্ধ এবং হতাশ। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে ইসরাইল সে ব্যথায় মলম লাগাতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ভানুর ১৮ বছর জেল হয়। কিন্তু দেশের বাইরে তাকে গোয়েন্দা বা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তার নামে ইউরোপ ও আমেরিকায় বেশ কিছু সংগঠন গজিয়ে ওঠে। ভানুকে শান্তির স্বপক্ষে একজন ঘোরতর সাহসী যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেননা ভানুই একমাত্র ব্যক্তি যে ইসরাইলের পারমাণবিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
ভানুর সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা সঠিক নয়। ভানু কখনোই ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করার সময় ইসরাইলের পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত গঠন বা ধ্বংসে মনোনিবেশ করেনি। যদি ঐ কারখানা বা চুল্লী লে অফ করা না হতো তাহলে হয়ত আজও সে সেখানে কাজ করত। আবার যখন সে দেশ ত্যাগ করে তখনও কিন্তু পবিত্র যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সে কোন তাড়াহুড়ো করেনি। সে বিশ্ব সফর করছিল। অস্ট্রেলিয়ায় সে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। যদি অসকারের সাথে তার যোগাযোগ না হত হয়ত তার কাছে তোলা ছবিগুলো গোল্ডা ব্যালকনিতে রাখত। কিন্তু বিশ্বের মানুষ তাকে একজন ইসরাইলের বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করছে। এক মার্কিন দম্পতি ভানুকে পুত্র হিসেবে দত্তক নিয়েছেন। এদিকে খ্রীষ্টানদের একটি অংশ তাকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
১৮ বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভানু জেরুজালেম চার্চে বসবাস বেছে নেয়। এখনো ইসরাইলের প্রতি তার আকাশচুম্বী ঘৃণা। সেখানে বাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। হিব্রু ভাষায় কথা বলতেও তার আপত্তি। নাম বলে জুন ক্রসম্যান। আগের নাম নয়। আরব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সে আরব বা ফিলিস্তিনি বউ খুঁজছে। বিজ্ঞাপনে ইসরাইলি কোন মেয়ের আবেদনের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ থাকছে।
আর সিন্ডি! কী তার পরিচয়। যেহেতু মোসাদের হাতে বেশী সময় ছিল না ফলে সিন্ডি তার বড় বোনের নাম ব্যবহার করেছে-সিন্ডি হানিন। তার পাসপোর্টও ব্যবহার করেছে। এ কারণেই ব্রিটিশ ও ইসরাইলি সাংবাদিকরা তার প্রকৃত পরিচয় আবিষ্কারে সমর্থ হয়েছে। ঐ সাংবাদিকরা জেনেছে, সিন্ডির আসল নাম চেরিল বেন টভন নী হানিন। তার বাবা একজন মার্কিন বিলিয়নিয়ার। টায়ারের ব্যবসা করে সে কোটি কোটি ডলার বানিয়েছে। একজন নিবেদিতপ্রাণ ইহুদি এবং সতের বছর বয়সে আমেরিকা থেকে ইসরাইলে চলে আসে। সে আইডি এফ এ চাকুরী করত এবং আমান গোয়েন্দা বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তার স্ত্রী।
মোসাদের একজন এজেন্ট তাকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়। তার আইকিউ খুবই উচ্চমানের। উদ্দেশ্য সাধনে সে সফল এবং তার মার্কিন পাসপোর্ট এক্ষেত্রে খুব কার্যকর। সে দু'বছরেরও প্রশিক্ষণকাল শেষ করেছে। তারপরই তাকে তড়িঘড়ি করে অভিযান পরিকল্পনাকারী দল কানিউকের সঙ্গে লন্ডনে চলে যেতে হয়। ভানুর অপহরণের পর পত্রপত্রিকাগুলো সিন্ডিকে নিয়ে মেতে উঠলে সে অপারেশনাল কার্যক্রম থেকে পদত্যাগ করে।
বর্তমানে চেরিল হানিনবেন টভ ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে বসবাস করে। সে আর তার স্বামীর সেখানে রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং ধর্মভীরু ইহুদি মার্কিন পরিবার হিসেবে সেখানে বসবাস করে। ভানুর ঘটনায় মোসাদের গোয়েন্দা হিসেবে চেরিলের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আর তার সহকর্মীদের মনে অনেক দুঃখ। কেননা চেরিলের মত স্মার্ট, সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মহিলা আর আজ তাদের প্রতিষ্ঠানে নেই। কারণটা হল, ইসরাইল যে ভানুকে হাতে পেল তার কৃতিত্ব চেরিলের। এবং ইংল্যান্ড থেকে ভানুকে বের করে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন আইনও ভাঙ্গেনি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট ভানুকে নিয়ে এমপিদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু পরে সকলেই আশ্বস্ত হন যে, ব্রিটিশ মাটিতে কোন অপহরণ সংঘটিত হয়নি ভানুকে নিয়ে। মোসাদ এই নিষ্কৃতি বহু দিন পায়নি। দু'বছর পরে ঘটে আরেক কেলেংকারি। মোসাদ এজেন্ট এরিয়ে রেজেব ও বারাদ এক ফিলিস্তিনিকে লন্ডনে ডাবল এজেন্ট নিয়োগ করেছিল। ফিলিস্তিনি ধরা পড়ে গ্রেফতার হয়। কিন্তু থ্যাচার লন্ডনের মোসাদ কেন্দ্র বন্ধ করে দেন এবং রেজেব ও বারাদকে বহিষ্কার করেন।
মোসাদ আবারও লন্ডনে ভালো থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। সবই ভালো চলছিল কিন্তু মাহবুব আল মাহবুবকে নিয়ে আবার শুরু হয় জটিলতা।