📄 ক্যামেরা চলছে...
২০১০ সালের জানুয়ারির প্রথমার্ধে দুটি কালো অডিমিক্স গাড়ি পার্বত্যঞ্চলের উত্তর তেলআবিবের দেয়াল ঘেরা একটি ভবনে এসে উপস্থিত। এই ভবনটির নাম কলেজ। আসলে এটি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার সদর দফতর। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকে এই ভবনে স্বাগত জানান হল। তাকে স্বাগত জানালেন মোসাদ প্রধান মেয়ার দাগান। এই ঘটনার কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী দাগানের এক্সটেনশন এক বছর বাড়িয়েছেন।
সাম্প্রতিক কিছু সফল অভিযানের পর দাগান এবং মোসাদ বেশ আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে। সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী ধ্বংসও কম সাফল্য নয়। মুগানিয়া ও সুলাইমানকে হত্যা তো বিরাট একটি ঘটনা। মোসাদের সামনে তখন বড় কাজ হল ইরানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হল একটি নাম। তার নাম আল মাবুহ। সাংবাদিক বার্গম্যানের মতে আল মাবুহকে আটক করতে মোসাদ অভিযানের নাম দেয় প্লাজমা স্ক্রীন।
মিটিং রুমে মোসাদ প্রধান দাগান ও সিনিয়র কর্মকর্তারা আল মাবুহকে হত্যায় তাদের পরিকল্পনা পেশ করেন। মাহমুদ রউফ আল মাবুহ হামাসের একজন নেতা এবং ইরান থেকে সিনাই প্রণালী হয়ে গাজায় চোরাচালান অস্ত্র প্রেরণের কারসাজি ও নিয়ন্ত্রণ আল মাবুহের হাতে। মোসাদের লোকজন জানান, আল মাবুহকে দুবাইয়ে হত্যা করা সম্ভব।
ইসরাইল প্রধানমন্ত্রী আল মাবুহের হত্যা পরিকল্পনার অনুমোদন দেন। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। দুবাইয়ের একটি হোটেলে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়।
লন্ডন টাইমস জানায়, হোটেল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে মোসাদ আল মাবুহকে কী ভাবে হত্যা করা হবে তার একটি মহড়া দেয়। আল মাবুহের জন্ম ১৯৬০ সালে উত্তর গাজার জাগানিয়া শরনার্থী ক্যাম্পে। সত্তর দশকের শেষার্ধে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগদান করেন এবং একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে যেসব আরব ক্যাফেতে জুয়াখেলা হত সেগুলো ধ্বংস করেন। ১৯৮৬ সালে একে ফোরটি সেভেন অ্যাসাল্ট রাইফেলসহ ইসরাইলি সেনার হাতে ধরা পড়েন এবং কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে ইজ আদদীন আল কাসেম ব্রিগেডে যোগদান করেন। এটি হামাসের সামরিক শাখা। আল মাবুহের কমান্ডার সালাহ শেহাদেহ আল মাবুহসহ হামাসের সন্ত্রাসীদের এক বিশেষ নির্দেশে যেখানেই পাওয়া যাবে ইসরাইলি সেনাদের হত্যা করতে হবে বলে নির্দেশ দেন।
১৯৮৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আল মাবুহে তার আরেক সঙ্গী নিয়ে একটি গাড়ি চুরি করেন। অতঃপর ঐ গাড়িতে তারা গোড়া ইহুদীর পোশাক পরে অভি সাসপোরটাস নামের এক ইসরাইলি সেনাকে লিফট নিতে প্রলুব্ধ করেন। অভি গাড়িতে ওঠা মাত্র আল মাবুহে পেছনে ফিরেই ইসরাইলি সেনাকে গুলি করে হত্যা করেন। ঐ সেনাকে আল মাবুহে নিজেই সঙ্গীসহ কবর দেন। অভিকে হত্যার তিন মাস পর আল মাবুহে এবং আরও কয়েকজন হামাস সদস্য আরেক ইসরাইলি সৈন্য ইনাম সাধোনকে অপহরণ ও হত্যা করেন।
পরবর্তীতে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল মাবুহে দুই ইসরাইলি সেনা হত্যা ও তাদেরকে কবর দেয়ার সঙ্গে তার সংযুক্তির বিষয়টি প্রকাশ করেন।
ইসরাইলের দ্বিতীয় সেনাকে হত্যার পর আল মুবেহ মিশরে সটকে পড়েন। পরে যান জর্ডানে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বজায় রাখেন। গাজায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান তার প্রধান কাজ হয়ে দাড়ায়। কায়রো ফিরে এলে মিশর কর্তৃপক্ষ তাকে জেলে ঢোকায় এবং ২০০৩ সালের প্রায় পুরোটাই তিনি সে দেশের জেলে ছিলেন। পরে সিরিয়ায় পালিয়ে যান।
বর্তমানে তাকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বলে গন্য করা হয় এবং ইসরাইল, মিশর, জর্ডানের পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। যদিও তার বসরা তাকে একজন বড় ধরনের সংগঠক হিসেবে গন্য করে। কেননা ইরান থেকে গাজায় অস্ত্র সরবরাহের কলাকৌশলে তার জুড়ি মেলা ভার।
আল মাবুহের স্থির বিশ্বাস ছিল যে, মোসাদ তাকে ব্যাপকভাবে খুঁজছে এবং দুই সেনাকে হত্যার ঘটনা ইসরাইল কিছুতেই মেনে নেয়নি। ভুলে যাওয়া কিম্বা ক্ষমা করে দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফরকালে আল মাবুহে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন ভূয়া পরিচয় দিতেন। ব্যবসায়ীর বেশ ও পরিচয়ে তিনি সফর করতেন। এক বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, হোটেলে অবস্থানকালে আরাম চেয়ারে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দরজায় স্থাপন করতেন যাতে কেউ দরজা খুলতে না পারে।
আল জাজিরায় আল মাবুহে যে সাক্ষাৎকার দেন সেখানে তার মুখমন্ডল ও মাথা ঢাকা ছিল। এখানে তিনি তার প্রতি হামলার বিবরণ দিয়ে বলেন, প্রতিপক্ষ তার ওপর তিন তিনবার হামলা চালিয়েছে। তারা প্রায় সফলই হতে যাচ্ছিল। এবং বিভিন্ন দেশে এই হামলা হয়। মুগানিয়াকে হত্যার অব্যবহিত পরে তার উপর হামলার চেষ্টা করা হয়। মাবুহে বলেন, যারা ইসরাইলের বিরোধিতা করে তাদের ভাগ্যে এমনটা ঘটেই চলবে।
মাবুহে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আল জাজিরার ঐ সাক্ষাৎকারটি দেন। তার মনে হয়েছিল, সাক্ষাৎকার দেয়া মানে অনর্থক ঝামেলা বাড়ানো। কিন্তু হামাস নেতৃত্বের স্পষ্ট নির্দেশে তাকে সাক্ষাৎকারটি দিতে হয়। পরবর্তীতে অনেকে বলেছেন এই সাক্ষাৎকার মোসাদের জন্য তাকে খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিল। মাবুহে ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি হয়েছিলেন একটি শর্ত দিয়ে। আর তা হল তার মুখমন্ডল সম্পূর্ণ ঢাকা থাকবে।
সাক্ষাৎকার শেষে ঐ ভিডিও পরীক্ষার জন্য গাজায় পাঠানো হয়। কিন্তু দেখা গেল তিনি যে মুখ ঢাকতে চেয়েছিলেন তা ব্যর্থ হচ্ছে এবং তাকে আবার সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হল। নতুন যে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হল তা প্রচার হল না। (এটি মাবুহের মৃত্যুর পড় প্রচারিত হবে)। মাবুহে তার প্রথম ভিডিওতে কী সামস্যা ছিল জানতে চাইলেন। তাকে জানানো হল, ঐ ভিডিওটি হামাসের আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অনেকের মতে, এই টেপ হাতছাড়া হয়ে গেলে তাকে যারা অনুসন্ধানে ব্যস্ত তারা লাভবান হবে। এই রেকর্ডিংয়ের এক সপ্তাহ পরে হামাসের এক সিনিয়র সদস্য আরবদেশ থেকে ফোন পান। ফোন কলে বলা হয় অস্ত্র চোরাচালন ও মানিলন্ডারিংয়ের কাজে দক্ষ একটি গ্রুপ তাদের সাথে যোগাযোগে আগ্রহী।
অস্ত্র পেতে মরিয়া ঐ হামাস নেতার পক্ষে ঐ প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানানো অসম্ভব ব্যাপার। আলো ঝলমলে দুবাইয়ে আল মাবুহে ইরানীদের সাথে নানা বিষয়ে প্রায়শই বৈঠক করে থাকেন। তবে এই ফোন কলটি যে আল মাবুহের মৃত্যু পরোয়ানা তা বোঝা গেল কিছুদিনের মধ্যেই।
আল মাবুহকে নিয়ে পুরো দৃশ্যাবলী ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও কাজে লাগানো হয়েছিল।
২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারী ২৭ জন মোসাদ এজেন্ট দুবাই আসে। ১২জন আসে ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে, ৪জন করে ফ্রেন্স ও অস্ট্রেলিয়ার এবং ৬জন আইরিশ। তারা দুবাইয়ের বিভিন্ন হোটেলে ওঠে।
পরের দিন বেলা ১২টার দিকে ৪৩ বছর বয়স্ক মোসাদ এজেন্ট মিশেল বোডেন হেইমার জার্মান পাসপোর্ট নিয়ে এবং তার বন্ধু জেমস লিওনার্দ ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে দুবাইতে আসে। স্থানীয় পুলিশের মতে, আল মাবুহকে হত্যার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্তদের মধ্যে এরা আগাম টিমের সদস্য।
এর এক ঘন্টা পরে ঐ দিন গেইল আসে এবং বেশী তারাকাবহুল হোটেলে হুমেরিয়ার এগার তলায় রুম নেয়। রিসিপশনে তাকে তার স্থায়ী ঠিকানা বলতে বলেছিল। মেয়েটি গড়গড় করে যে ঠিকানাটা বলে সেরকম কোন ঠিকানার অস্তিত্বই নেই।
বেলা দেড়টায় আসে কেভিন ড্যানেডরন। সে হল কমান্ডার। এসেই সে তার ডেপুটির সাথে যোগদান করে এবং হুমেরিয়ার হোটেলে ওঠে। এভাবে পৃথকভাবে আরও কয়েকজন মোসাদ এজেন্ট দুবাই চলে আসে।
সকাল সোয়া দশটায় মুবেহ দুবাইর উদ্দেশ্যে দামেস্ক ত্যাগ করে। তিনি সরাসরি এমিরেটসে চলে আসেন। দুবাইয়ে তার কাজ হল ইরানী দূতের সঙ্গে বৈঠক। অস্ত্রের আরেকটি চালান গাজা পাঠানোর লক্ষ্যেই এই বৈঠক। ঐদিন সকাল সাড়ে ১০টায় অভিযানের সমন্বয়কারী পিটার হোটেল ত্যাগ করে এবং একটি বিশাল শপিং সেন্টারে হিট টিমের সাথে দেখা করে। এদিকে মোসাদের গোয়েন্দাদের কেউ গোফ কেটে, কেউ নকল গোফ লাগিয়ে, কেউ সানগ্লাস পরে, কেউ খুলে কেউ উইগ পরে প্রস্তুতি নিতে থাকে।
বিকাল সোয়া তিনটায় আল মাবুহে দুবাই পৌছান। তার সাথে ছিল ইরাকী জাল পাসপোর্ট এবং তিনি নিজেকে টেক্সটাইল আমদানিকারক হিসেবে পরিচয় দেন। ৩টা ২৮ মিনিটে আল মাবুহ আল বাস্টন রোটনা হোটেলে ওঠেন। রিসিপশনে তিনি বদ্ধ জানালা ও বারান্দাবিহীন একটি রুম চান। তিন তলায় তাকে ২৩০ নম্বর রুম দেয়া হয়। লিফটে করে মাবুহ তার রুমে যাচ্ছিলেন সেই লিফটে টেনিস খেলোয়াড়ের পোশাক পরা দু'জন মোসাদ সদস্যও ছিল।
বেলা সাড়ে তিনটায় সোর্স বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জানায় যে, আল মাবুহে যে রুমে ঢুকেছেন তার বিপরীত দিকের রুমটা হল ২৩৭ নম্বর। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ঐ হোটেলে আসেন পিটার যিনি অভিযানের সমন্বয়কারী।
পিটার ২৩৭ নম্বর রুমটি ভাড়া নেয়। মোসাদের প্রথম গ্রুপটি বিদায় নিলে দ্বিতীয় দল আসে এবং আল মাবুহ কখন বাইরে বেরুল তা লক্ষ্য করতে থাকে। এখন হিট টিমের সকল সদস্যই আল বাস্তান রোটানা হোটেলে।
আল মাবুহে তার কক্ষ ত্যাগ করেন এবং লবি পরীক্ষা করে ধারণা পান যে, জায়গাটা কোন ঝুঁকি নেই। অতঃপর তিনি হোটেল ত্যাগ করলে ওয়াচাররা তার পিছু নেয়। যে গাড়িতে চড়ে আল মাবুহ শহরের বাইরে যাচ্ছিলেন সে গাড়ি সম্পর্কে ওয়াচাররা কমান্ডারকে অবহিত করে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সমন্বয়ক পিটার লবীতে প্রবেশ করে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত জিনিসপত্র কেভিনকে দেয়।
পিটার অতঃপর ২৩৭ নম্বর রুমের চাবি সংগ্রহ করে এবং চাবি কেভিনকে দেয়। অতঃপর সে অজানা স্থানে চলে যায়। কেভিন ২৩৭ নম্বর রুমে ঢুকে সবকিছু পরীক্ষা শেষে অপেক্ষায় থাকে কখন আল মাবুহে তার রুমে ঢুকবেন।
এদিকে মুখোশ পরে কিম্বা উইগ লাগিয়ে বেশ কয়েকজন ওয়াচার হোটেলে ঢুকে পড়ে। গেইল নামের তরুণী হোটেলে পার্কিংয়ে গিয়ে হিট টিমের লোকদের হাতে কেভিনকে দেয়া পিটারের কেসটি দিয়ে আসে।
অপরাহ্ন সাড়ে ৬টায়, মোসাদ সদস্য সোর্স ওয়াটার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী লবি, কারিডোরসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। রাত ৮টা ২০ মিনিট, আল মাবুহে হোটেলে ফিরে আসেন। ২৩০ নম্বর রুমে আল মাবুহকে হত্যা করা হয়। চার আততায়ী হোটেল ত্যাগ করে।
তরুণী গেইল এবং আরেক হিট মেম্বারও হোটেল ত্যাগ করে। কেভিন ও গেইল ডাইরেক্ট ফ্লাইটে প্যারিসে চলে যায়। ইত্যবসরে সকল টিম মেম্বার বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যায়। রাত ৮টা ৫১ মিনিটে আল মাবুহকে হত্যার পরে কেভিন একবার ঐ রুমে ঢুকেছিল। বেরিয়ে সে 'ডু নট ডিস্টার্ব' লেখা সাইনটি দরজার হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে রেখে যায়।
রাত দশটা থেকে আল মাবুহের ফোনে একটার পর ফোন আসতে লাগল তার স্ত্রীর। তার এক ঘনিষ্ঠ ফোন করে আল মুবহেকে পেলেন না। টেক্সট ম্যাসেজ- কোন কিছুতেই সাড়া নেই। আল মাবুহের উদ্বিগ্ন স্ত্রী হামাসের বেশ কয়েকজনকে বিষয়টি জানালে তারা হামাসের আবাসিক প্রতিনিধিকে সেখানে পাঠালেন। ভদ্রলোক ঐ হোটেলে গিয়ে ২৩০ নম্বর রুমে ফোন করেও কোন সদুত্তর পেলেন না। অতঃপর মধ্য রাতের পর হোটেল কর্তৃপক্ষ আল মাবুহের রুমে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় পান। এক ডাক্তার দেখে বললেন, হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই মৃত্যু।
হামাস অফিসিয়ালি এক বার্তায় বলে যে আল মাবুহের মৃত্যু মেডিকেল রিজনে হয়েছে। কিন্তু আল মাবুহের স্ত্রী মোটেই একথা মানতে রাজি নন। তিনি বলে চলেছেন, এটি হত্যাকাণ্ড। এবং মোসাদই খুনী। মৃতের রক্তের অংশবিশেষ ফ্রান্সের লেবরেটরীতে পাঠানো হল। ৯দিন পর সেই রিপোর্ট এল। অতঃপর হামাস বলল, মোসাদই আল মাবুহকে হত্যা করেছে। মোসাদের ভাষ্য প্রথমে তাকে কোন ধাতব পদার্থ দিয়ে আঘাত করে শেষে বালিশ চেপে দিয়ে হত্যা করেছে।
দুবাই পুলিশ জানায়, মৃতের শরীরে কোন বিষ পাওয়া যায়নি। দুবাই পুলিশ উপসংহারে জানায়, মোসাদ তাদের ভূখণ্ডে আল মাবুহেকে হত্যা করেছে। আল মাবুহকে হত্যার ১১দিন পর ৩১ জানুয়ারি লন্ডনের সানডে টাইমস এক প্রতিবেদনে বলে যে, মোসাদ বিষক্রিয়ার মাধ্যমে আল মাবুহেকে হত্যা করেছে। ঐ রিপোর্টার লেখেন যে, ইসরাইলের ঘাতকরা আল মাবুহের কক্ষে ঢুকে ইনজেকশনের মাধ্যমে তার শরীরে বিষ ঢুকিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। মোসাদ এজেন্ট অতঃপর রুমের সব জিনিসের ছবি তুলেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারী দুবাই পুলিশের উপপ্রধান সাংবাদিকদের ফরাসী ল্যাবের আরও কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সের ল্যাব আল মাবুহের রক্তে উচ্চমানের হাইপ্রোক্লোরাইড ব্যথানাশকের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সার্জারীর আগে এই ধরনের এ্যানেসথেসিয়া রোগীকে প্রয়োগ করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, এর ফলে পেশী ব্যাপকভাবে শিথিল ও রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। আরও জানায়, হত্যাকারীরা ভিকটিমকে এ্যানেসথেসিয়ার ঔষধ প্রয়োগ করেছে পরে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছে। আর এই ধরনের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই গন্য হয়।
সাংবাদিক গর্ডন থোমাস মোসাদকে গালি দিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন। শিরোনাম ছিল 'মোসাদ লাইসেন্স টু কিল'। থমাস উল্লেখ করে যে, মোসাদ কর্তৃক অতীতের সবগুলো হত্যাকাণ্ড একই প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, হিট টিমের ১১ জনের মধ্যে ৬জন ছিল মহিলা।
হারেটন ডেইলিতে ইয়োসি মেলম্যান তার প্রতিবেদনে লেখেন নিরাপত্তা ক্যামেরাসহ অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্পষ্ট এটা মোসাদের কাজ। তারা বরাবর যেভাবে বিভিন্ন ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে অকুস্থলে এসে জড়ো হয় এবারও তাই করেছে। অতীতের মত তারা বিভিন্ন হোটেলে থাকতে শুরু করে এবং ইন্টারন্যাশনাল অপারেটরের মাধ্যমে ফোন ব্যবহার করে। তারা জেনুইন ব্যবসায়ীর বেশ ধরে কিম্বা পর্যটকের।
পক্ষান্তরে আরও কিছু অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কাজ পশ্চিমা গোয়েন্দাদের। পশ্চিমারা এভাবেই খতম করে। ফলে একথা নির্ধিধায় বলা যাবে না কারা খুনী। এদিকে জার্মান সাপ্তাহিকী লিখেছে, জার্মান গোয়েন্দারা সংসদকে জানিয়েছে মোসাদই আল মাবুহের হত্যাকারী।
আল আরারিয়া সংবাদপত্রে এক সাক্ষাৎকারে দুবাই পুলিশ ঢালী তামিম জানান, মোসাদই হত্যাকারী। তিনি ডিএনএ টেস্ট, হাতের ছাপ, জাল পাসপোর্ট বহন এবং পরবর্তীতে উৎঘাটিত সকলেই ইসরাইলের বাসিন্দা বলে প্রমাণিত হওয়ায় বুঝতে বাকী থাকে না মোসাদই কিলার। অবশ্যই মোসাদ একশ ভাগ কিলার।
দুবাই পুলিশের প্রধান অবশেষে মিডিয়া স্টারে পরিণত হন। সারা বিশ্বের টিভি মিডিয়ায় তাকে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যেতে হয়েছে। দুবাই পুলিশ প্রধান তামিম সাংবাদিকদের যে ভিডিওটি দেখান তাতে মোসাদ সদস্যদের দুবাইজুড়ে কী ধরনের তৎপরতা ছিল তা ধরা পড়েছে।
দুবাই পুলিশ প্রধান তামিমের ভাষ্য অনুযায়ী হিট টিমের মূলে ছিল ১১জন। এর মধ্যে আইরিশ ৩জন, ব্রিটেনের ৬জন, এবং একজন করে ফরাসী ও জার্মান। ৬শত ৪৮ ঘন্টার সিকুরিটি ক্যামেরার টেপ দুবাই পুলিশকে সহায়তা করেছে।
এদিকে দুবাই এয়ারপোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ইমিগ্রেশন জানায়, আগমন নির্গমনের সব ছবিই তাদের কাছে রয়েছে। হত্যাকারী ১১জন নয়, আরও বেশ কয়েকজন মোসাদ সদস্য এতে অংশ নেয়। হয়ত ২৭জন হবে। তামিম পরে স্বীকার করেন যে, হত্যাকারীর সংখ্যা আরও কিছু বেশী হতে পারে।
তামিমের উপসংহারে প্রশ্ন জেগেছে মোসাদ কী জানত না দুবাই জুড়ে ক্যামেরা বসানো রয়েছে। তামিমের মতে এই অপরাশেন সফল করতে মোসাদ একাধিকবার দুবাই এসেছে। সেক্ষেত্রে কেন তাদের চোখে ক্যামেরা ধরা পড়ল না। তাছাড়া কাপড় বদলানো, উইগ পরা, গোফ কাটা ইত্যাদি তারা ক্যামেরাকে সাক্ষী রেখে করল কেন? আরেকটি প্রশ্ন হল, অপারেশনে খুব বেশি লোক লাগেনি।
তাহলে বেশি লোক আনার মূলে কী ধ্রুম্রজাল সৃষ্টি করা? কেননা তারা জানে এই টেপ পরবর্তীতে অবশ্যই দেখা হবে। আরেকটি প্রশ্ন হল, দুবাই এয়ারপোর্টে সকলেরই ছবি তোলা হয়। মোসাদকী এখানকার এই সিস্টেমটা জানত না। আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা হল, ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরায় সব কিছু বন্দী হলেও দুটি ঘটনার কোন আলামত নেই। একটি হল আল মাবুহের রুমে প্রবেশের এবং তাকে হত্যা করে বের হয়ে আসার দৃশ্য।
পুলিশ প্রধান তামিম জানিয়েছেন, হিট টিমের সদস্যরা অস্ট্রিয়ায় একটি ফোনে কথা বলেছে। তামিমের ধারণা ঐ লোকের পরিচয় উদঘাটন সম্ভব এবং তিনি সম্ভবত মোসাদেরই লোক।
প্যারেনিয়ার নামের একটি মাস্টারকার্ড দিয়ে দুবাইয়ের আততায়ীরা লেনদেন কেনাকাটা করেছে। আইওয়া ভিত্তিক কোম্পানীতে রিচার্জ করা যায় এমন কার্ড এটি। তবে একটি ফাক ঠিকই আছে। ঐ কোম্পানীর গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ ইসরাইলে অবস্থিত।
দুবাই পুলিশ আরেকটি মজার তথ্য দিয়েছে। সেটা হল হিট টিমের সদস্যদের অধিকাংশেরই ডুয়াল পাসপোর্ট রয়েছে। সামান্য কয়েকজন মাত্র জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে।
আপাত দৃষ্টিতে আরব দেশগুলো ইসরাইলের শত্রুদেশ। যদি তারা ধরা পড়ত তখন দ্বৈত নাগরিকত্বের দোহাই দিয়ে বৃটেন, জার্মানী, ফ্রান্স অস্ট্রেলিয়াকে তারা তাদের জন্য ফাইট করার আহ্বান জানাতে পারত। সর্বোপরি দুবাইয়ের উল্লেখিত দেশের কনসালরা কম্পিউটারে টিপ দিলেই এরা যে প্রকৃতপক্ষেই তাদের দেশের নাগরিক তা চিহ্নিত করতে পারতেন।
এদিকে যেসব দেশের জাল পাসপোর্ট মোসাদ ব্যবহার করেছে সে দেশগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে। ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং আয়ারল্যান্ড তাদের মাটি থেকে মোসাদ প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে। পোল্যান্ড উরি নামের এক লোককে গ্রেফতার করে জার্মানীতে পাঠিয়ে দেয়।
উরির বিরুদ্ধে অভিযোগ ভুয়া তথ্যাদি দিয়ে দুবাই ঘটনার অন্যতম হোতা মিশেলকে সে জার্মান পাসপোর্ট পাইয়ে দিয়েছেন। উরি অবশ্য ৬০ হাজার ইউরো জরিমানা দিয়ে ছাড়া পায়। উল্লেখ্য গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের নিয়ম নেই।
দুবাই অভিযান মোসাদ কিম্বা ইসরাইলের জন্য একটা বিরাট সাফল্য হলেও মোসাদের নানা ভুল ভ্রান্তি নিয়েও কম সমালোচনা হয়নি। প্রথমত দুবাইকে ইসরাইল আন্ডারএষ্টিমেট করেছে। আবার পাসপোর্টসহ সকল ঘটনায় কয়েকটি দেশকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এতে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে।
দুবাই পুলিশ বলেছে, হিট টিমের সব সদস্যকেই ধরা হবে। কেননা তাদের পরিচিতি বিশ্ববাসী সবার জানা থাকলেও তাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। দুবাই টিমের একজন মোসাদ সদস্যও গ্রেফতার হয়নি।
📄 সাদ্দামের সুপারগান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯১৮ সালের ২৩ মার্চ প্যারিসের প্লেস ডিলা রিপাবলিকে বেশ কিছু কামানের গোলা এসে পড়ছিল। এর এক ঘন্টা পর প্যারিসে আরেকটা সেল বিস্ফোরিত হলে ৮জন লোক মারা যায়। বিস্ফোরণে প্যারিসের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফ্রন্ট লাইনে অর্থাৎ যে অঞ্চলে যুদ্ধ হচ্ছিল সেখান থেকে প্যারিসের দূরত্ব অনেক। সেক্ষেত্রে প্যারিস ছিল শংকামুক্ত। প্যারিস জেলার কমান্ডার রাজধানী সন্নিহিত বনাঞ্চলে সেনা প্রেরণ করলেন। তার আশংকা ছিল সেখানে হয়ত জার্মান বাহিনী আত্মগোপন করে আছে। কিন্তু কোন কিছুই পাওয়া গেল না। ফরাসীরা অনুমান করল, হয়ত কোন এয়ারসিপ থেকে ঐ গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও কোন জেপলীন কোথাও দেখা যায়নি। এর ছয়দিন পর গুড ফ্রাইডের দিন প্যারিসে আরেকটি কামানের গোলা নিক্ষিপ্ত হয়। একটা চার্চে সেই গোলা সরাসরি এসে লাগে। এতে ৯১জন লোক নিহত ও বহু লোক আহত হয়।
প্যারিস জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সারা শহরে সেনা টহল বাড়ানো হয়। কিন্তু কোথাও সন্দেহজনকও কিছু পাওয়া যায় না। এতদূর থেকে কামান ছুঁড়ে প্যারিসে আঘাত হানা সম্ভব এমনটি ইতিপূর্বে কেউ শোনেনি, কল্পনাকেও যেন হার মানায়। পত্রিকাগুলো জনপ্রিয় লেখক জুলভার্নের ফ্রম দ্যা আর্থ টু দ্য মুন বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করে।
ফ্রান্সবাসীর ভাগ্য ভালো। বছর না ঘুরতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।
জার্মানরা পরাজিত হয়। যাইহোক যুদ্ধ শেষে প্যারিস জুড়ে আবার কামানের গুঞ্জন শুরু হয়। অনেকেই আতঙ্কিত সেই কামানের নাম দেয় 'প্যারিস গান'। উইলহেমটু ছিলেন জার্মানির সম্রাট ক্রাপ। হেভী উইপেলস ফ্যাক্টরীতে নাকি একটি রহস্যজনক কামান তৈরী শুরু করা হয়েছিল। ঐ কামান নাকি ১২৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল। গোলাগুলো ছিল ৩ফুট লম্বা। অবশ্য ঐ কামানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে অর্থাৎ রেকর্ড ভাংগে জার্মানি ভিটু রকেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঐ রকেট দেখা যায়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে ক্রাপ কোম্পানী তিনটি সুপারগান তৈরি করেছিল। বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যত্র এই সুপারগানগুলো স্থানান্তরিত করা হত। প্রতিটি সুপারগানের সঙ্গে থাকত ৮০জন পদাতিক সেনা। এ ব্যাপারে কারো সাথে আলাপ করা তাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ।
যুদ্ধ শেষে এই সুপারগানের পরিণতি নিয়ে নানা কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পড়ে। তবে সত্যতা হল একটি সুপারগান নিষ্ক্রিয় করার সময় সংঘটিত বিস্ফোরণে ৫জন সেনা নিহত হয়। বাকী দুটোর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি যুদ্ধ শেষে। কোথায় হারিয়ে গেল এ নিয়ে রয়েছে নানা রহস্য। হয় তাদের কোন গুহায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা অংশ অংশ খুলে ফেলা হয়েছে।
সুপারগানগুলো লিজেন্ডে পরিণত হয়ে গেল। অনেকেই ভাবল সুপারগানের রহস্য কোনকালেই জানা যাবে না। কিন্তু ১৯৬৫ সালে এক বয়স্কা জার্মান মহিলা কানাডায় এলেন। তার উদ্দেশ্য ৩৭বছর বয়স্ক এক বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ লাভ ড. জেরাল্ড বুল মন্ট্রিয়েলের মকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ভদ্রমহিলা রাউসেন বার্জারের আত্মীয়া। রাউসেন বার্জার ইন্ডাস্ট্রিজের নকশা বিভাগের প্রধান ছিলেন।
আগত মহিলা ড. বুলের একটি হারানো পাণ্ডুলিপি তাদের পারিবারিক আর্কাইভে খুঁজে পান। ঐ পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে বিগ গান সম্পর্কিত বিস্তারিত এবং সেই বিগগান কী করে অপারেট করতে হয় তাও।
ড. বুল ছিলেন এককথায় এক জিনিয়াস। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তিনি পিএইচডি করেন। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর কেউ অত কম বয়সে পিএইচডি করেননি। ড. বুল স্বপ্ন দেখেছিলেন সুপার গানের। তিনি এমন গান তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার সাহায্যে বহু বহু দূর থেকে গোলা নিক্ষেপ করা যায়। পাণ্ডুলিপি অবলম্বনে ড. বুল একটা বইও লিখেছিলেন। বই লেখার উদ্দেশ্য আগামী দিনের বিজ্ঞানীরা যাতে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সুপারগান তৈরি করতে পারে।
ড. বুলের বইটি যথেষ্ট না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকার এবং যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বুল শিক্ষকতা করতেন তারা ড. বুলকে সুপারগানের ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বার্বাডোসে ড. বুল তার নির্মিত একটি বিশাল গানের পরীক্ষা চালিয়ে ছিলেন। এর আগে এত বড় হিউজ গান আর বিশ্বে দ্বিতীয়টি তৈরি হয়নি। এই সুপারগানের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৩ মিটার লম্বা। ক্যালিবার ছিল ৪২৪ মিলিমিটার। স্থানীয় শতশত শ্রমিক প্রকৌশলী এই সুপারগান তৈরি এবং এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের সাথে যুক্ত ছিলেন। ড. বুল সাফল্য শেষে আরও দাবি করেন যে, শেলের পরিবর্তে যদি তিনি সলিড ফুয়েলের মিশাইল প্রপেল করতেন, তাহলে তিনি ২০০ পাউন্ড মিসাইল চার হাজার কিলোমিটার দূরত্বে ছুঁড়তে সক্ষম। আর যদি উর্দ্ধকাশে ছোটে তা ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাবে।
ড. বুলের সুপারগান এককথায় একটা বিশাল অর্জন। কিন্তু আমেরিকা ও কানাডা সরকার নানা হিসেব-নিকেশ করে তার প্রকল্পে অর্থায়ন করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৬৮ সালে ড. বুলকে বার্বাডোস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ফলে তিনি খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। অতঃপর প্রচন্ড ঘৃণার সাথে আমলাদের আক্রমণ করেন তার প্রকল্প বানচালের জন্য।
ড. বুল কিছুদিন পর আর্টিলারি শেল নির্মাণ শুরু করেন এবং আমেরিকায় তৈরি বন্দুকের মাধ্যমে ইসরাইলে ৫০হাজার সেল বিক্রি করেন। এমনকী তাকে আমেরিকায় অনারারি নাগরিকত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তার মুখ ভালো ছিল না। তিনি যত সিনিয়র লোকের সাথে কাজ করেছেন তাদের সাথে বিরোধ বাড়িয়েছেন। আর বার্বাডোসে তার প্রকল্প বন্ধ করার জ্বালা ও ক্ষোভ তো এর মধ্যে ছিলই। তবে যে কোন মূল্যে সুপারগান তৈরির জন্য তিনি ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। এটি তার সংকল্প হয়ে দাড়ায় এবং কোন কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে পারবে না- এটাই ছিল তার বিশ্বাস।
প্রথমে তিনি তৈরি করেন জিসিফোরটি ফাইভ গান। ঐ সময় এত অত্যাধুনিক গান আর ছিল না। এর রেঞ্জ ছিল ৪০ কিলোমিটার। বুল যাকে-তাকে এই বন্দুক বিক্রি করতে শুরু করলেন। জাতিসংঘ দক্ষিণ আফ্রিকায় অস্ত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ড. বুল তা অগ্রাহ্য করে সে দেশে অস্ত্র পাঠিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে অস্ত্র তৈরির লাইসেন্সও বিক্রি করেছিলেন বুল-যাতে তারা অস্ত্র বানাতে পারে।
অনেকের মতে সিআইএ গোপনে ড. বুলের অবৈধ কার্যক্রম সমর্থন করত। কিন্তু বিষয়টি যখন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে তখন বুলের সিআইএ বন্ধু লাপাত্তা হয়ে যায়। একা হয়ে যান ড. বুল। ওদিকে জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে। অস্ত্র তৈরি ও গোপনে বিক্রির অভিযোগ আনে জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে। তাকে আমেরিকায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল একটি দুঃসংবাদ।
আমেরিকার একটি আদালক অবৈধ ব্যবসার অভিযোগে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়। জেল খেটে কানাডায় ফিরে এলে তাকে ৫০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। ক্রুব্ধ হতাশ ড. বুল বেলজিয়ামে গিয়ে সেখানে একটি নতুন কোম্পানী খোলেন। এখানে তার সহযোগী ছিল ইউনাইটেড গান পাউডার ওয়ার্কস।
সুপারগান বানানোর স্বপ্ন ড. বুলের মধ্যে সবসময়ই জাগরুক ছিল। জুলভার্ন যে ধরনের সুপার গানের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার চেয়েও বড়। গেট্যে তার উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে শয়তানের কাছে তার আত্মা বিক্রিতেও প্রস্তুত ছিলেন। হ্যাঁ, ডা. বুলও এরকম একটি শয়তানের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ইরাকের স্বৈরশাসক। আর তিনি হলেন সাদ্দাম হোসেন।
আশির দশকে ইরাক ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। বুল সাদ্দামের কাছে দুইশত জিসিফোরটি ফাইভগান বিক্রি করেন। এগুলো তৈরি হয় অস্ট্রিয়ায়। এগুলো জর্ডানের আকাবা বন্দর থেকে চোরাচালান হয়ে ইরাকে আসে। এটা ছিল সাদ্দাম ও ড. বুলের যৌথ প্রকল্পের শুরু।
ড. বুলের মত সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। বিশেষ করে ইসরাইল যখন তামুজ পরমাণু চুল্লী বোমা মেরে ধ্বংস করে তখন সাদ্দাম হোসেন খুবই ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন। তামুজ কেন্দ্রের মাধ্যমেই সাদ্দাম পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সাদ্দাম ইসরাইলের প্রতি ঈর্ষাও অনুভব করতেন। কেননা ইসরাইল মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
ড. বুল সাদ্দামের কাছে অফার করলেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সবচে দূর পাল্লার সুপারগান তাকে বানিয়ে দেবেন। বুল সাদ্দামকে প্রতিশ্রুতি দিলেন ইরাক মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাবেই এবং যে ফায়ারশেল বানিয়ে দেবে তা হাজার মাইলের বেশী অতিক্রম করতে পারবে। সাদ্দাম হোসেন উপলব্ধি করলেন ইসরাইলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমা ফেলার সুযোগ তার হাতের মুঠোয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ড. বুলের অফার গ্রহণ করলেন। ড. বুল তার প্রকল্পের নাম দিলেন প্রজেক্ট ব্যবিলন।
ড. বুল সাদ্দাম হোসেনের ব্যবিলন প্রজেক্টের জন্য একটি সুপারগানের পরিকল্পনা করলেন। এর দৈর্ঘ্য হবে ১৫০ মিটার ওজন ২১০০ টন। ক্যালিবার ১ মিটার। দৈত্যাকার গান বানানোর আগে ড. বুল এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এটি হবে পরীক্ষামূলক। তিনি এর নাম দিলেন বেবী বেবিলন। এই বেবী বেবিলন অতীতের সব গানের চেয়ে বড়। এই গানটির দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ মিটার। সাদ্দামের আর্টিলারী কমান্ডার এর কার্যক্ষমতার ব্যাপারেও সশ্রদ্ধ ছিলেন। কিন্তু আসল গানটির সাথে কোন তুলনাই চলে না। এক কথায় এটা মহাবিস্ময়ে পরিণত হবে। আর ইরাকের মরুভূমিতে জন্ম হবে এর।
ড. বুল তার জায়ান্ট গান বানানোর জন্য ইরাকের একটি দুর্গম পাহাড়ী এলাকা বেছে নিলেন। লোকেশন চূড়ান্ত করে ড. বুল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর সরঞ্জামাদি সংগ্রহের জন্য আদেশ দিলেন। এই বৃহৎ কামানের মূল তো অবশ্যই ব্যারেল। এই ব্যারেলে বুল প্রচুর পরিমাণ স্টীল টিউব ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। তিনি ইংল্যান্ড, স্পেন, হল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডে অর্ডার দিলেন টিউবের জন্য। ঐ সব দেশের সাথে তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন।
সুপারগানের বিষয়টি চেপে গিয়ে তিনি বলেন যে, একটি বড় মাপের তেলের পাইপ লাইনের জন্য এসব স্টীল প্রয়োজন। এই চাতুরীর কারণ কৌশলগত অস্ত্র বানানোর ব্যাপারে ইরাকের ওপর আন্তর্জাতিক কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। আর এসব উপকরণ প্রতিবেশী জর্ডানের নামে আমদানি করা হচ্ছিল।
পাইপ যথারীতি ইরাকে আশা শুরু হল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, অধিকাংশ দেশ এবং রপ্তানিকারক কোম্পানীই বুঝতে পেরেছিল যে, এসব পাইপ তেল উত্তোলনের কাজে নয় বরং মারাত্মক কোন অস্ত্র বানানোর কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের লোভের কারণে তারা প্রায় চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে ঐ সব দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অভিন্ন এবং যেখানে আরও বিরোধ ফেনিয়ে ওঠুক এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে ঐক্যমত্য ছিল। এইসব পাইপের ক্ষেত্রে রপ্তানী লাইসেন্স দেয়া হয় এবং মালবাহী জাহাজে করে ইরাকে পাঠানো শুরু করে। অধিকাংশ পাইপই ইরাকে নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছে।
ড. বুলের টেকনিশিয়ানদের প্রাইভেট আর্মি এবং প্রকৌশলীরা সুপারগানের অংশগুলো জোড়া লাগাতে শুরু করল। এই গানের মুখ নিবদ্ধ করা হল পশ্চিম ও ইসরাইলের দিকে। কিন্তু ড. বুল এখনো সন্তুষ্ট নন। তিনি ইরাকের জন্য সেলফ প্রোপেলড দুটি গান বানালেন। একটির নাম আল মজনুন এবং আল কাও। আল মজনুনকে অবিলম্বে ইরাকে পদাতিক বাহিনীতে যুক্ত করা হল।
ড. বুল একই সাথে ইরাকের স্কাড মিসাইলের উন্নয়নে কাজ শুরু করলেন। তিনি স্কাডের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করলেন। সেগুলো আরও আধুনিক হয়ে উঠল। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কথা।
ড. বুল একে একে সীমা অতিক্রম করতে শুরু করলেন। ড. বুলের ছেলের যে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় তাতে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ইসরাইলের গোয়েন্দারা তার বাবাকে এই ধ্বংসের খেলা থেকে সরে আসার জন্য সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এসব কানে নিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু ইসরাইল এই বিজ্ঞানীকে থামাতে আগ্রহী ছিল তা নয়। সিআইএ, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনী এমসিক্সটিনও এই বিজ্ঞানীকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিল।
একই কথা প্রযোজ্য ইরানীদের ক্ষেত্রেও। ইরাক ইরান যুদ্ধের সময় ইরাকীরা ড. বুল নির্মিত অস্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ফলে বিশ্বের বহু দেশ এই বিজ্ঞানীকে স্তব্ধ করে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
ড. বুল যখন বিদেশিদের সতর্কবার্তার কোন পাত্তাই দিচ্ছিলেন না, তখন তা প্রতিরোধে তারাও নানাপন্থা গ্রহণের কথা ভাবলেন। যেমন ১৯৯০ সালের শীতকালে ব্রাসেলসে বুলের বাড়ি বেশ কয়েকবার ভাংচুর করা হয়। হামলাকারীরা বাড়ি থেকে কোন মালামালই নেয়নি। শুধুমাত্র ফার্নিচার ভাংচুর ও ওলটপালট করেছে। ফলে এই হামলার উদ্দেশ্যে ড. বুলের সম্যক না বোঝার কারণ ছিল না। কেননা এটা ছিল একটা হুমকি, সাবধান হয়ে যাও। তোমাকে আমরা যখন যা খুশি করতে পারি।
আবারও ড. বুল এই হুমকি আমলে নিলেন না। গানের অংশ ঠিকই ইরাকে আসতে লাগল। এবং প্রতিপক্ষের আর বুঝতে বাকী রইল না, ড. বুলকে এই প্রকল্প থেকে সরানো যাবে না।
১৯৯০ সালের ২২ মার্চ। বুল তার ব্রাসেলসের বাসায় ফিরছিলেন। ফ্ল্যাটের চাবি যখন পকেটে হাত ঠুকিয়ে তিনি খুঁছিলেন তখন অন্ধকার থেকে একজন লোক এগিয়ে আসল। এক নিঃশব্দ বন্দুক তার হাতে। লোকটি ড. বুলের মাথার পেছনের দিকে পরপর পাঁচটি গুলি করলেন। বিশালাকার কামানের স্বপ্নপুরুষ ড. বুল কাত হয়ে পড়লেন এবং ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হল।
বিশ্ব গণমাধ্যম আততায়ীর পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করতে লাগল। কেউ বলল সিআইএ এই ঘটনার জন্য দায়ী। কেউ বলল এমসিক্সটিন। এ্যাংগোলা ও ইরানের প্রতিও ইংগিত করল কেউ কেউ। কিন্তু অধিকাংশ পর্যবেক্ষকেরই সন্দেহের তীর ছিল ইসরাইলের দিকে। বেলজিয়াম সরকার তদন্ত শুরু করল বটে কিন্তু কোন সূত্রই পেলো না। আজও ড. জেরাল্ড বুল হত্যাকাণ্ডে কাউকে ধরা হয়নি।
ড. জোরাল্ড বুলের মৃত্যুতে সাদ্দাম হোসেনের সুপারগানের কাজ অবিলম্বে বন্ধ হয়ে গেল। ড. বুলের সহকারী, প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, গবেষক দল, ক্রেতা, সকলেই বিশ্ববাসী ছড়িয়ে পড়ল। এই কর্মীবাহিনী সুপারগানের যন্ত্রাংশগুলোর সাথে সম্যক পরিচিত বটে কিন্তু সুপারগানের মাস্টারপ্ল্যান তালাবদ্ধ ছিল ড. বুলের মস্তিষ্কে। এবং তিনিই একমাত্র ছিলেন পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়াটির। ড. বুলের মধ্য দিয়ে বেবীলন প্রকল্পের মৃত্যু ঘটল।
ড. বুলের মৃত্যুর দু'সপ্তাহ পরে দীর্ঘ নীরবতা ভংগ করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নড়ে উঠল। তারা একটি কাষ্টমস ইউনিটকে বন্দরে পাঠিয়ে আটটি বিশালাকায় শেফিল্ড কোম্পনীর পাইপ আটক করল। চালানে লেখা ছিল ওয়েল পাইপ। ব্রিটিশদের এই কর্মকাণ্ড প্রশংসা কিন্তু দেরি করে ফেলেছিল তারা।
ব্রিটিশ সরকার ৪৪টি পাইপ আটকে ব্যর্থ হয়। কেননা বন্দর থেকে এগুলো তেলের পাইপ হিসেবে রপ্তানি হয়ে গিয়েছিল এবং ইরাকে ইতিমধ্যে তা কাজে লাগানো হয়েছিল। ঐ সময়েই জায়ান্ট গানে ব্যবহার্য বেশ কিছু যন্ত্রাংশ ইউরোপের ৫টি দেশে আটক করা হয়। ইংল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয় দায়িত্বশীল কোম্পানীগুলো বিশেষ করে শেকিন্ড সাদ্দাম হোসেনের বিগগানের জন্য অর্ডারগুলোর বিপরীতে মালামাল সরবরাহ না করলেও পারত। কেননা এর মাধ্যমেই সাদ্দাস হোসেন মানব বিধ্বংসী সুপারগান তৈরি করতে যাচ্ছিলেন।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক দখল করে তখন তারা প্রচুর পরিমাণ ষ্টীল পাইপ স্তূপকৃত অবস্থায় দেখতে পায়।
ড. জেরাল্ড বুলের হত্যাকাণ্ড এমন সময় ঘটল যখন মোসাদ গভীর একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৪৯ সালে মোসাদের প্রধান হয়ে এসেছিলেন সংগঠনের ভ্যাটার্ন এজেন্ট শাবতাই শাবিত। কিন্তু তিনিই প্রত্যক্ষ করলেন কিভাবে মোসাদের কর্মকাণ্ড দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের সঙ্গে যুক্তদের ক্ষেত্রে কিম্বা এবং আশি ও নব্বুই দশকে মোসাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে বিস্তর ফারাক ধরা পড়বে। আগে যেখানে মোসাদ বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে রহস্যের কিনারা করত সেখানে মোসাদ স্পেশাল অপারেশনের পথ বেছে নিতে শুরু করল। ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য যারা হুমকি হয়ে উঠেছিল মোসাদ তাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক ও অস্ত্রচালিত পন্থায় প্রতিশোধ গ্রহণের দিকে এগুতে থাকল।
অতীতের ইসরাইলি রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে সন্ত্রাস দমনে সফলতার মুখ তেমন দেখতে পায়নি। সন্ত্রাসবাদী নেতারা বিদেশে নিরাপদে বাস করতেন এবং আক্রমণের পরিকল্পনা জানাতেন। কিন্তু কাজটা তিনি নিজে করতেন না। সারা বিশ্বব্যাপী তাদের যে লোক বা সমর্থক ছিল তারা অপারেশন পরিকল্পনা করতেন। ইসরাইল ভালো করেই জানত কোন নেতা অন্তর্ঘাতের সাথে যুক্ত। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা কিম্বা বিচারের সম্মুখীন করা কোনভাবেই সম্ভবপর ছিল না। একমাত্র পথ ছিল মোসাদকে বলা তাদের খুঁজে বের কর এবং হত্যার নির্দেশ দেয়া ছাড়া। কাজটা নিষ্ঠুর।
ডেভিড মোলাড এ ধরনের বহু অভিযান পরিচালনা করেছেন বটে। কিন্তু সর্বাত্মক সাফল্য আসে তখনই যখন নেতাকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে তার সংগঠনটি নিশ্চল বা অকেজো হয়ে পড়ে অন্তত কয়েক বছরের জন্য। ব্লাক সেপ্টেম্বর নেতাদের নিধনের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি খুব সফল হয়েছিল। ড. জেরাল্ড বুলকে হত্যার মাধ্যমেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল। ড. বুলের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সরকারি ভাবে কখনোই উদঘাটিত হয়নি। তার মৃত্যু মানেই একটি ভিন্ন চিন্তার পরিসমাপ্তি। ড. বুলের অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল ওয়াদি হাদ্দাদের ক্ষেত্রেও।
ড. ওয়াদি হাদ্দাদকে হত্যার ঘটনাটি শুরু হয়েছিল এক বাক্স চকলেট দিয়ে। ড. ওয়াদি হাদ্দাদ ছিলেন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেষ্টাইনের প্রধান। ইসরাইলের শত্রুদের মধ্যে তিনি শীর্ষ বটে। তার সর্বোচ্চ দুর্ধর্ষ অভিযানের একটি হল ১৯৭৬ সালের ২৭ জুন এয়ার ফ্রান্সের একটি প্লেন ছিনতাই করা। প্লেনটি তেলআবিব থেকে ফ্রান্সে যাচ্ছিল। আরব, জার্মান ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঐ প্লেনের পাইলটকে বাধ্য করে সেটিকে উগান্ডার রাজধানী এনতেব্বেতে নামাতে। তাদের দাবি ছিল ইসরাইলী ও ইহুদী জিম্মিদের তাদের জিম্মায় দিতে হবে। ইসরাইলি কমান্ডোরা হাজার মাইল উড়ে গিয়ে এই দুঃসাহসিক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করে। তারা পৌছে যায় এনতেব্বেতে। কমান্ডোরা বিশ্বের ভয়ংকর এই সন্ত্রাসী গ্রুপকে হত্যা করে জিম্মিদের মুক্ত করতে সক্ষম হয়।
এনতেব্বের ঘটনার পর হাদ্দাদ উপলব্ধি করেন যে, তার জীবন এখন বিপন্ন এবং তার সদর দফতর বাগদাদে স্থানান্তরিত করেন। কেননা বাগদাদে তিনি নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিলেন। ইরাক থেকেই তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে নানা রকম অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন।
ইসরাইলের এই জাত শত্রুকে খতম করতে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? খোঁজ শুরু হল ড. হাদ্দাদের যাবতীয় দুর্বলতার। এভাবে এক বছর অতিক্রান্ত হলে মোসাদ জানতে পারে চকলেটের প্রতি হাদ্দাদের অপরিসীম দুর্বলতা। বিশেষ করে বেলজিয়ামের সেরা চকলেট। আবার এই খবরটি দেয় ফিলিস্তিনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র যাকে মোসাদ হাদ্দাদের পপুলার ফ্রন্টে ঢুকিয়েছিল।
মোসাদ প্রধান চকলেট প্রীতির কথা ইসরাইলের নয়া প্রধানমন্ত্রী বেগিনের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি অবিলম্বে চকলেটের মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। মোসাদ এজেন্টরা হাদ্দাদের বিশ্বস্ত এক অনুচরকে এ কাজে নিয়োগ দেয়। হাদ্দাদের বিশ্বস্ত ঐ সহকর্মী তখন ইউরোপে একটি মিশনে ছিলেন। তিনি তার বস হাদ্দাদের জন্য বিশাল সাইজের গোভিতা নামের চকলেটের একটি বাক্স নিয়ে আসেন। মোসাদ বিশেষজ্ঞরা ঐ চকলেটে প্রাণঘাতী বায়োলজিকাল বিষ ইনজেশন দিয়ে ঢুকায়। মোসাদ এজেন্টরা আশা করে যে, হাদ্দাদ তার এই প্রিয় চকলেট একাই খাবে। কাউকে ভাগ দেবে না।
এজেন্ট বিষমাখা চকলেটের ঐ বাক্স হাদ্দাদকে দেন। তিনি একাই সবগুলো চকলেট খান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাদ্দাদের খাওয়ার রুচি চলে যায় এবং ওজন কমতে শুরু করে। রক্ত পরীক্ষা করে তার ডাক্তাররা জানান যে, হাদ্দাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষিত প্রায়। বাগদাদের কেউ ধারণা করতে পারছিলেন না যে, পপুলার ফ্রন্টের নেতার স্বাস্থ্যের কেন এত অবনতি ঘটছে কোন কারণ ছাড়াই।
হাদ্দাদের স্বাস্থ্য আরও ভেঙে পড়ছে। তিনি খুবই দুর্বল হয়ে পড়লেন। অস্থি চর্ম বেড়িয়ে আসার উপক্রম। একটি বিছানাই তার একমাত্র শয্যা হয়ে উঠল। তাকে জরুরীভিত্তিতে পূর্ব জার্মানীর একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হল। সোভিয়েট ব্লকের অন্যান্য দেশের মত পূর্ব জার্মানী ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু ড. হাদ্দাদের ক্ষেত্রে তাদের কোন সহযোগিতা কাজে আসল না। তারা হাদ্দাদকে বাঁচাতে পারল না।
১৯৭৮ সালের ৩০ মার্চ ড. হাদ্দাদ ইন্তেকাল করেন। ডাক্তাররা বলেন, অজ্ঞাত রোগ। ৪৩ বছর বয়সী এই সন্ত্রাসী নেতার মৃত্যুর পর তার বোনের কাছে লক্ষ লক্ষ ডলার রেখে যান। ফিলিস্তিনিদের জন্য তার পবিত্র যুদ্ধের জন্য বহু লোক বা প্রতিষ্ঠান তাকে টাকা দিত বলে ধারণা।
পূর্ব জার্মান ডাক্তারা বলেন যে, ড. হাদ্দাদ এমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন যে, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ অবশ্য এ ঘটনায় মোসাদকে দায়ী করল না। হাদ্দাদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ইরাককে বিষ প্রয়োগের জন্য দায়ী করল। কেননা ড. হাদ্দাদ এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করছিলেন। বেশ কয়েক বছর পর ইসরাইলি লেখকদের ড. হাদ্দাদ সম্পর্কিত সত্য প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়। এই লেখকরা মনে করতেন ড. হাদ্দাদের অপরিণত বয়সে মৃত্যুর মূলে মোসাদের হাত রয়েছে। এর ত্রিশ বছর পর যখন ইয়াসির আরাফাত মারা যান তখন তার ঘনিষ্ঠজনরা এই মৃত্যুর জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছেন। ঐ অভিযোগ কখনোই প্রমাণিত হয়নি। ইয়াসির আরাফাতকে ব্যাপকভাবে চিকিৎসা ও টেষ্ট করেছিলেন তারই ফ্রান্সের ডাক্তার।
ড. হাদ্দাদের মৃত্যুর পর তার নেতৃত্বাধীন ভয়ংকর সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘটে। হাদ্দাদের লোকজনের ইসরাইল বিরোধি কর্মকাণ্ড চূড়ান্তভাবে নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং ইসরাইলের ঘোরতর ঘৃণিত শত্রু প্রকৃতপক্ষেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
ড. বুল ও ড. হাদ্দাদের পর সাকাকীর পালা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অটোমান সুলতান রাজকীয় নেভীর একজন বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় কমান্ডারকে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ মাল্টা অভিযানে পাঠিয়ে ছিলেন। এডমিরাল পাল তুলে অভিযানে বের হয় এবং কয়েকমাস সমুদ্রে মাল্টা দ্বীপের সন্ধান করতে থাকেন। এক সময় তিনি ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। সুলতানের কাছে দেয়া এক রিপোর্টে তিনি জানান, মাল্টা বলে কোন দ্বীপের অস্তিত্ব নেই।
কিন্তু আমাদের সময় কেউ কেউ ঠিকই মাল্টার সন্ধান পেতে পারেন। শুধু মাল্টা দ্বীপের সন্ধানই মেলেনি সেখানে আগত এক ছদ্মবেশীকেও খুঁজে পেয়েছেন। তিনি খুবই গোপনে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেছিলেন। এই ব্যক্তি হলেন ড. সাকাকী। তিনি ইসলামী জেহাদের প্রধান।
১৯৯৫ সালের ২৬ অক্টোবর সকালে ফাতহি সাকাকী মাল্টার সেলমা শহরের ডিপ্লোম্যাট হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। দামেস্কে ফিরে যাওয়ার আগে কিছু কেনাকাটার জন্য তিনি বেরিয়েছিলেন। তাই হোটেলে তিনি বেশ কয়েকদিন ছিলেন। সাকাকীর মাথায় ছিল পরচুলা। হাতে লিবিয়ার পাসপোর্ট। পাসপোর্টে তার নাম ইব্রাহীম সায়ুশ। এই শহরে তিনি নিজেকে নিরাপদ ভাবতেন। তিনি জানতেন তার এখানে আসার পর থেকেই মোসাদের কিছু লোক তাকে ফলো করে চলেছে। আন্ডার গ্রাউন্ড ফিলিস্তিনি সংস্থাসমূহের এক সম্মেলনে তিনি মাল্টা থেকে লিবিয়া যাবেন।
এই ঘটনার ৯ মাস আগে ২২ জানুয়ারী দুই আত্মঘাতী যারা শাকাকীর ইসলামিক জিহাদের সদস্য নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। নেতান্না বাস স্টেশনের কাছে বেইট লিভ জংশনের অদূরে তারা আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ছিলেন। এই ঘটনায় ২১ জন নিহত হন। এদের মধ্যে অধিকাংশই সৈন্য। আহতের সংখ্যা ৬৮। ইসরাইলের ইতিহাসে এটি একটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ঘটনার পরপরই বেইট লীডে যান এবং বোমাবাজির ঘটনায় খুবই কষ্ট পান। তিনি এই ঘটনার কয়েকদিন পর টাইম ম্যাগাজিন পড়ে অতিশয় ক্রুদ্ধ হন। কেননা সেই পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সাকাকী উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনে আরব ইসরাইল যুদ্ধের ঘটনাগুলো ছাড়া এটাই সর্বোচ্চ বড় সামরিক আক্রমণ।
টাইম ম্যাগাজিন সাকাকীকে প্রশ্ন করে যে, এই ঘটনায় মনে হচ্ছে আপনার মনে শান্তি হচ্ছে। আপনি এই প্রাণহানিতে সন্তুষ্ট। সাকাকী বলেন, এটা আমাদের মানুষদের মনে শান্তি ও সন্তুষ্টি এনে দিয়েছে। ক্রোধান্বিত প্রধানমন্ত্রী রবীন মোসাদ প্রধান সরতাই শাভিতকে নির্দেশ দেন ইসলামিক জিহাদ প্রধানকে হত্যার। শাভিত দীর্ঘদিন ধরে খুঁজতে থাকেন সাকাকীকে।
একটি পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী মোসাদ দামেস্কে সাকাকীর সদর দফতরে হামলা চালানোর অনুমতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যর্থ হয়। কেননা রবীন চান না সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের সঙ্গে গোপনে শান্তির অন্বেষায় যে আলোচনা চালাচ্ছিলেন এক্ষনে ঐ শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাক। কেননা ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে ঐ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী রবীন সাকাকীকে ধরতে বা হত্যায় বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেন। মোসাদ প্রধান বলেন যে, সাকাকী ভালো করেই জানেন যে, তিনি তাদের হিটলিস্টে রয়েছেন। ফলে সিরিয়ার বাইরে তিনি খুব একটা যান না। তারপর রবিন বললেন দামেস্কে কোনভাবেই সাকাকীকে হিট করা যাবে না। করতে হয় সিরীয় সীমান্তের বাইরে গিয়ে কর।
এখন প্রশ্ন, কোথায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে। মাথা খারাপের যোগাড় মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। এরই মধ্যে সিরিয়ার বাইরে একটা সুযোগ এসে গেল। লিবিয়া থেকে দাওয়াত পেলেন সাকাকী। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংগঠন সেখানে সম্মেলন করবে।
প্রথমে সাকাকী ঐ সম্মেলনে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন, তার জাতশত্রু আবু মুসা সংগঠনের আবু মুসা সেখানে যাচ্ছেন তখন তিনিও তাতে শরীক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মোসাদ বিশেষজ্ঞর ধারণা করলেন সাকাকী তার চিরশত্রু মুসাকে এককভাবে ফ্লোর ছেড়ে দেবেন না। সাকাকী লিবিয়া যাচ্ছে বলে সিদ্ধান্ত হল। একটি গোপন সূত্র দামেস্ক থেকে জানাল, লিবিয়ায় যাচ্ছেন সাকাকী। জেরুজালেমে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী অতঃপর তার লোকদের নির্দেশ দিলেন, সেখানেই তাকে হত্যার।
ইউরোপীয় সূত্রগুলোর দাবি, মোসাদের লোকজন অতঃপর সাকাকী কোন পথে লিবিয়া যেতে পারেন তা নিয়ে গবেষণায় বসল। অতীতের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেল সাকাকী বরাবরই লিবিয়া গেছেন মাল্টা হয়ে। মোসাদ প্রধান মাল্টাতেই সাকাকীকে খতমের সিদ্ধান্ত নেন। কেননা লিবিয়ার চেয়ে মাল্টায় এ ধরনের অভিযান পরিচালনা সহজ। লিবিয়ার চেয়ে মাল্টা অনেক বেশী নিরিবিলি শহর।
মোসাদ এজেন্ট সাকাকীর অপেক্ষায় ভ্যলেট্টা বিমান বন্দরে অবস্থান নেন। কেননা তিনি মাল্টায় কিছুটা সময় কাটাবেন বলে তাদের ধারণা। সাকাকী তার পিছু নেয়াদের বোকা বানিয়ে দামেস্ক থেকে সর্বশেষ ফ্লাইটে মাল্টা এসে পৌঁছান। ব্যাপক ছদ্মবেশ ধারণ করে সাকাকী ট্রানজিট লাউঞ্জে কিছু সময় অতিবাহিত করেন এবং কানেকটিং ফ্লাইটে লিবিয়া যান।
২৬ অক্টোবর খুব সকালে সাকাকী আবার মাল্টায় ফিরে আসেন এবং বরাবরের মত ডিপ্লোম্যাট হোটেলে ওঠেন। এবার তার কক্ষ নং ৩১৬। হোটেলে উঠেই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। তিনি যেখানে যেখানে যান মোসাদের দু'জন লোক একটি নীল রঙের মোটর সাইকেলে তাকে অনুসরণ করেন। তিনি কয়েক ঘন্টা দোকানে দোকানে কাটান। কেনাকাটা শেষে যখন তিনি হোটেলে ফিরছিলেন তখন নীল রংয়ের ঐ মোটর সাইকেল তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তাকে থামায়।
পরবর্তীতে মোসাদের এক এজেন্ট জানান, সাকাকী এগিয়ে এলে খুব কাছ থেকে তার উপর ৬টি গুলি ছোঁড়া হয় শব্দহীন বন্দুক দিয়ে। সাকাকী সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। হত্যাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অবশ্য হত্যাকারী ছিল একজনই, অন্যজন মোটর সাইকেল চালু রেখে অপেক্ষা করছিল। আততায়ীরা কাছের একটি বীচের দিকে যায় এবং লাফ দিয়ে একটি স্পীড বোটে ওঠে। স্পীড বোটটি গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায় এবং সেখানে অপেক্ষমাণ একটি জাহাজে গিয়ে ওঠে। ঐ জাহাজটি সরকারিভাবে হাইফা থেকে ইটালীতে সিমেন্ট বহন করছিল।
ঐ জাহাজেই অবস্থান করছিলেন শাবতাই শাভিত নিজে। এই অভিযানের খুঁটি নাটি অত দূর থেকে মনিটর করছিলেন। পুরো রুটই ছিল ওয়েল প্লানড। ফলে কেউই হত্যাকাণ্ডের পর মোসাদের ঐ দুই এজেন্টকে অনুসরণ করতে পারেনি। জাহাজে ওঠার পর মোসাদের ঐ দুই এজেন্ট নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে স্বদেশে ফিরে যান।
সাকাকীর মৃত্যুর পর তার সহকর্মী ইসলামিক জিহাদের লোকজন রহস্যজনক ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করে। কে এই বিশ্বাসঘাতক যে মোসাদের কাছে সাকাকীর সফরের যাবতীয় খুঁটিনাটি পাচার করল?
হত্যাকারীরা সাকাকীর যাবতীয় গতিবিধি জানত - কবে তিনি মাল্টা, কবে লিবিয়া যাবেন ইত্যাদি। এমনকী তার ফ্লাইট নম্বর, তার ভুয়া পরিচয়পত্র, দামেস্কে ও মাল্টায় তার ফেরার দিনক্ষণ পর্যন্ত। পাঁচ মাস অনুসন্ধান শেষে ইলামিক জিহাদ এক ফিলিস্তিনি ছাত্রকে গ্রেফতার করে। এই ছাত্র সাকাকীর খুবই ঘনিষ্ঠ সহকারী ছিল। তাকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য দায়ীও করা হয়। ছাত্রটি প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে সবকিছু স্বীকার করে নেয়। উল্লেখ্য, বুলগোরিয়া পড়ার সময় মোসাদ উক্ত ছাত্রটিকে তাদের দলে ভেড়ায় এবং নিয়োগ দেয়। তার মোসাদ গডফাদাররা তাকে দামেস্কে ফিরে যেতে বলে এবং সাকাকীর দলে যোগাদনের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী চার বছরে ছাত্রটি সাকাকীর আস্থা অর্জন করে এবং সাকাকীর কর্মকাণ্ড জানত মাত্র কয়েকজন - তাদের একজনে পরিণত হয়।
হামাস ও হেজবুল্লাহ তাদের সম্পদের বিশাল একটা অংশ সামরিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করলেও ইসলামিক জিহাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল সন্ত্রাস। এদের একটাই উদ্দেশ্য - ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ। এমনকী ফিলিস্তিনিদের বেশ কিছু সংগঠনও বিশ্বাস করে আত্মঘাতী সন্ত্রাসের আদর্শগত পিতা হলেন সাকাকী। ইসলামের পবিত্র ও মহান শিক্ষাকে সে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও হত্যাকান্ডে উৎসাহিত করে।
সাকাকীর সংগঠনের রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলার তালিকা দীর্ঘ। ১৯৮৯ সালের ৬ জুলাই তেল আবিব থেকে জেরুজালেমগামী বাসে হামলা চালিয়ে সাকাকীর সংগঠন ১৬জন হত্যা করে। ১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কায়রোর সন্নিকটে একটি পর্যটন বাসে বোমা মেরে ঐ সংগঠন ৯ জনকে হত্যা করে। ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর দক্ষিণ ইসরাইলের আরেকটি বাসে বোমা মেরে তারা ৮ জনকে হত্যা করে। ১৯৯৪ সালের ১১ নভেম্বর গাজায় এক আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ঐ সংগঠন তিন সৈন্যকে হত্যা করে। বেইট লাভের লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ শুরুতেই দেয়া হয়েছে। সেখানে ২১জন নিহত হয়। সাকাকীর জন্য মৃত্যুদণ্ড যথার্থই ছিল যা মাল্টায় মোসাদ কার্যকর করেছে। সাকাকীর মৃত্যুর পর ইসলামিক জিহাদের কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। নেতা সাকাকীর মৃত্যুর পর দলের প্রায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে বেশ কয়েকবছর কেটে যায়।
ইসরাইল কখনোই হত্যার কথা স্বীকার করেনি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী রবীন বলেছেন, আমি সাকাকীর হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে যদি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েই থাকে এজন্য আমি দুঃখিত নই।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে আইজাক রবীন নিজে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কিন্তু এই ঘটনা কোন ফিলিস্তিনি ঘটায়নি, ঘটিয়েছে এক ইহুদী ধর্মান্ধ।
📄 পারমানবিক গোয়েন্দার জন্য মধুর ফাঁদ
ডিমোনো আনবিক চুল্লীতে সে একজন টেকনিশিয়ানের কাজ করত। এটি ইসরাইলের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত ও গোপনীয় পারমাণবিক চুল্লী। বিদেশি গণমাধ্যম এমনকী বেশ কিছু সরকার মনে করত ইসরাইল 'অতিগোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ডিমোনো পারমাণবিক কেন্দ্রে চাকুরী পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চাকুরি প্রার্থীর যাবতীয় তথ্য কয়েকটি সংস্থা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে। এত সব পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থীর কাছে অসহনীয় মনে হলেও এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় নেই। সবকিছু সন্তোষজনক হলেই কেবল সে ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর গোপন কেন্দ্রে ঢুকতে পারে। আর চাকুরী পেলেই তার উপর নজরদারি শেষ হয়ে যায় না।
মোরদেচাই ভানু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে চাকুরীর আবেদন করে। নিউক্লিয়ার রিসার্চ ফ্যামিলিটি অফিসে সে চাকুরী পেয়ে যায়। জায়গাটি বীরসেবার কাছে অবস্থিত। এই অফিসে রুটিন মাফিক নিরাপত্তার কাজ হত। ফলে সহজেই সে চাকুরী পেয়ে গিয়েছিল।
এতদসত্ত্বেও প্রশ্ন ওঠে যে কী করেই বা এই চাকুরী পেল। কেননা সে একজন গোড়া বামপন্থী। তার বন্ধুরা আবার দেশের কম্যুনিষ্ট এবং ইহুদি বিরোধি রাকাহ পার্টির সদস্য। ভানু নিজে তাদের বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছে। কট্টর ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে তাকে প্লাকার্ড নিয়ে বক্তৃতা করতে দেখা গেছে। এমনকী সংগঠনের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে। সে রাকাহ সন্ত্রাসীদের তার ফ্ল্যাটে দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছে। সেখানে তাদেরকে তাদের সংগঠনে যোগ দিতে বলেছে। আর তাদের সংগঠনটি এককথায় প্রকাশ্যে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধি। তরুণ আরব মৌলবাদীদের সংগটন এটি।
বেন গুরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তালিকাভুক্ত ছাত্র এবং চরভাবাপন্ন মনোভাবের জন্য সে ব্যাপক পরিচিত। ভানুর মধ্যে অনেক গুণেরই সমাহার ঘটেছিল। তবে সে ছিল অস্থির প্রকৃতির রাবাহ সমর্থক হওয়ার সে ছিল উগ্র দক্ষিণপন্থী বর্ণবাদী রাব্বি কাহানের ঘোর সমর্থক। এর পরে সে সমর্থক হয়ে যায় কট্টর ডানপন্থী দল হাটেছিয়ার (সংস্কারবাদী) সমর্থক এবং লিকুদ পার্টিকে ভোট দেয়। আরও পরে সে কট্টর বামপন্থী বনে যায়।
তার দাবি ১৯৮২ সালের বিতর্কিত লেবানন যুদ্ধ তার মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটায়। প্রায় একাকী থাকতে অভ্যস্ত এবং বলতে গেলে প্রায় বন্ধুহীন ভানু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাল করে সে বৈষম্যের শিকার হয়েছে। সে মরক্কো বংশোদ্ভূত বলেই তার এত বঞ্চনা। এয়ারফোর্স একাডেমিতে ভর্তি হতে ব্যর্থতার কারণে তার মনে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। তাকে পোষ্টিং দেয়া হয় ইঞ্জিনিয়ারিং করপাস। আইডি এক থেকে বাদ পড়ার পর তেলআবিবে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করে। মন পরিবর্তন করে সে বারসেবায় চলে যায়। সেখানে সে অর্থনীতি নিয়ে পড়তে শুরু করে। আবার মন পরিবর্তন করে দর্শন নিয়ে পড়তে শুরু করে। সে নিরামিশাশী হয়ে ওঠে; অতপর ভেগান। টাকার প্রতি তার লালসা বা দূর্বলতা তার বন্ধুদের অবাক ও চমৎকৃত করত। সে গর্ব করে বলত সে কাজ করতে অনাগ্রহী।
শেয়ার মার্কেটে স্মার্টলি বিনিয়োগ করতে চায়। সে তার ডাইরিতে শেয়ার মার্কেটকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় বলে উল্লেখ করে। সে লালরংয়ের একটি অডি গাড়ি চালাত এবং টাকা কামানোর জন্য সে ন্যাংটা হয়ে মডেল হয়েছিল। একবার ছাত্রদের এক পার্টিতে পুরস্কার জেতার জন্য সে তার জাঙ্গিয়া খুলে ফেলেছিল। তার জীবনব্যবস্থা তার নিজস্ব। এ নিয়ে কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের সমর্থক ও রাখাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তার ব্যক্তি জীবন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বৈকি। কেননা তার রাজনীতি ও জীবন যাপন বৈপরীত্যে ভরা।
একবার গোয়েন্দা সংস্থা সাবাক কর্মকর্তারা তাকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলে। তাকে সাবাক সতর্ক করেছে এমন একটি কাগজে তাকে সই করতে বলা হয়। কিন্তু ভানু সইতো করেইনি এবং সে যা যা করত তা বন্ধও করেনি।
ভানুর কর্মকাণ্ড নিয়ে সাবাব একটি রুটিন রিপোর্ট প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিরাপত্তা পরিচালকের কাছে পাঠায়। ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর পরিচালককে ভানু সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন মন্ত্রনালয়ের উক্ত কর্মকর্তা। ভানুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হল না। তার পেছনে গোয়েন্দাদেরও লাগানো হল না। বিষয়টি ঘোরতর দায়িত্বে অবহেলা। এক্ষেত্রে সাবাকের স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়, ডিমোনা প্রকল্প, মন্ত্রনালয় সকলেই ভানুর ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল। ফলে ভানু তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলই এবং কাউকে তার পরোয়া করার দরকার পড়ল না।
ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীতে ইনষ্টিটিউট ২ এ ভানু ছিল একজন অপারেটর।
সংস্থার সর্বোচ্চ গোপনীয় বিভাগ এটি। ডিমোনোর ২৭শত কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১৫০ জনেরই প্রবেশাধিকার ছিল ইনষ্টিটিউট-২ এ ঢোকার। ভানুর ছিল দুটি ব্যাজ। একটি ডিমোনাতে প্রবেশের আরেকটি ইনষ্টিটিউট দুই এ ঢোকার।
ইনষ্টিটিউট বাইরে থেকে দেখলে দোতলা একটি ভবন বলে মনে হবে। কিন্তু যারা কৌতূহলী তাদের মনে জাগতেই পারে যে, দোতলা ভবনের আবার লিফট কেন। আসলে ইনষ্টিটিউ-২ এর এই হল এক বিরাট রহস্য। লিফটের অস্তিত্বের মূলে ছিল উপরে ওঠার জন্য নয়, নীচে নামার জন্য। এই ভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে রয়েছে ছয়টি তলা এবং এমনভাবে সাজানো গোছানো যে, নীচে যে তলা আছে তা মালুম করাটা দুঃসাধ্য। ভানু রাতের পালার শিফট ইনচার্জ ছিল এবং ভবন সম্পর্কে তার কিছুই অজানা ছিল না।
এই ভবনের দোতলায় একটি অংশে বিভিন্ন অফিস, আরেক দিকে ক্যাফেটরীয়া রয়েছে। নীচতলার কয়েকটি গেট দিয়ে ইউরেনিয়াম রড ট্রান্সফার করা হত। এগুলো চুল্লীতে ব্যবহৃত হত। কিন্তু প্রথম আন্তারগ্রাউন্ড ফ্লোরে পাইপ ও বাল্ব রাখা হত। আন্ডার গ্রাউন্ডের দ্বিতীয় তলায় ছিল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। বরান্দার নাম ছিল গোল্ডাস ব্যালকনি। খুবই গুরুত্বপূর্ন ভিজিটররা ব্যাপক যাচাই বাছাই শেষে এই ব্যলকনির নীচ দিয়ে প্রোডাকশন হল প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়। ভূগর্ভস্থ তিন তলায় টেকনিশিয়ানরা ইউরেনিয়াম রড দিয়ে কাজ করে। ভূগর্ভস্থ চার তলায় রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড সোর্স।
এর সাথেই যুক্ত উৎপাদন প্লান্ট। এখানে রয়েছে পৃথকীকরণের সুবিধাদি। এই পর্যায়ে চুল্লীতে প্লটোনিয়াম উৎপন্ন হয়। ভূগর্ভস্থ পঞ্চম তলায় বোমার কমপোনেন্টস প্রস্তুত করা হয় এবং ভূগর্ভস্থ সর্বোচ্চ নীচের তলায় একটি বিশেষ পাত্রে রাসায়নিক বর্জ্য জমা করা হয়। ভানু প্রতিটি ভূগর্ভস্থ তলা সম্পর্কেই সম্যক অবহিত ছিল।
ইসরাইলের ডিমোনা পরমাণু কেন্দ্রে ৯ বছর কাজ করার পর ১৯৮৫ সালে তার চাকুরী চলে যায়। চাকুরী যাওয়ার মূলে কোন রাজনৈতিক কারণ ছিল না। ডিমোনার বাজেট হ্রাস করা হলে অন্যদের সাথে তার চাকুরীও চলে যায়। যদিও ডিমোনা থেকে সে ভাল ক্ষতিপূরণ পেয়ে যায়। ভানু আবার ক্রুব্ধ এবং হতাশ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সে বিদেশে যেতে মনস্থ করে। এমনকী তার দেশের ফেরার ইচ্ছাও কম। তার প্রত্যাশা, এক কোটি কুড়ি লক্ষ ইহুদির ইসরাইলের বাইরে বসবাস। সেও যদি এভাবে নিজস্ব একটা থাকার জায়গা পেত। ভানু তার ফ্ল্যাট, গাড়ি বিক্রি করে এবং ব্যাঙ্কের সব টাকা তুলে নেয়। বত্রিশ বছর বয়স্ক ভানু তার ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে বেরিয়ে যায়। এর আগেও সে একবার ইউরোপ, একবার আমেরিকা ঘুরে এসেছে। তার ব্যাগে রয়েছে দুটি ফিল্মও। যা সে ডিমোনায় চুরি করে তুলেছিল।
প্রথমে সে গ্রীস আসে। পরে রাশিয়া, থাইল্যান্ড এবং নেপাল। কাঠমুন্ডুতে তার সাথে ইসরাইলের এক তরুণীর সাক্ষাৎ ঘটে। সে তার নাম বলে মার্ড এবং প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে সে ছিল একজন বামপন্থী। কিন্তু শান্তিবাদী। তবে সম্ভবত সে আর ইসরাইল ফিরবে না।
কাঠমান্ডু শেষে ভানু আরও কতগুলো দেশ ঘুরে অস্ট্রেলিয়া আসে। প্রথমে সে সেখানে কিছুদিন অব জব করে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই সে একাকী ছিল এবং তার আচরণ ছিল রহস্যজনক। এক সন্ধ্যায় সে শহরের সর্বোচ্চ অখ্যাত এলাকায় যায়। এলাকাটি চোর ডাকাত পতিতাদের স্বর্গরাজ্য। এখানেই সে একটি চার্চ দেখতে পায়। অসহায়, পাপী, নাদান, অপরাধী, ভবঘুরে, পতিতাদের জন্য শান্তির আবাসস্থল এটি।
এখানে ভানুর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে চার্চের যাজকের। পরোপকারী যাজক মুহূর্তেই বুঝে ফেলেন ভানুর জন্য একটি বাড়ি চাই, একটা পরিবার চাই। যাজক ভানুর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কয়েক সপ্তাহ ভানু ও যাজকের মধ্যে আন্তরিকতাপূর্ন পরিবেশে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়। অবশেষে ১৯৮৬ সালের ১৭ আগষ্ট ভানু খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে। তার নতুন নাম জন ক্রসম্যান। উক্ত যাজকের সাথে ভানুর পরিচয় না হলে হয়ত সে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করত কিম্বা অন্য কোন ধর্মে দীক্ষিত হত।
চার্চের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে ভানু ইসরাইলে কী কাজ করত সে কথা বলতে গিয়ে ইসরাইলের ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লীর প্রসঙ্গ তোলে। ডিমোনায় সে গোপনে যে সব দুঃসাহসিক ছবি তুলেছিল তার একটি স্লাইড শো সে করার কথা বলে। চার্চের লোকজন তার কথায় উদাসী দৃষ্টিতে তাকায়। কেননা এ সম্পর্কে তারা কিছু জানেও না আবার কোন ধারণাও নেই। ওই সভায় অস্কার নামে কলম্বিয়ার এক লোক ছিলেন। ঘুরে বেড়ানো ও সৌখিন সাংবাদিকতা করে সে। ভানু ও অস্কার চার্চের একটি কক্ষে একসাথে কিছুদিন ছিল এবং চার্চের সংস্কার কাজেও কিছুটা অংশ নিয়েছিল। অস্কার ভানুর কাছে থাকা ছবিগুলো গুরুত্ব বুঝতে পেরে এ ছবি দিয়ে প্রচুর টাকা কামানো যাবে বলে তাকে উৎসাহ দিতে লাগল।
ভানু পাগলের মত টাকা ভালবাসত। আবার তার মধ্যে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তির পথ উন্মুক্ত করারও একটা বাসনা কাজ করত। শান্তির অন্বেষায় ভানু পরমাণু কেন্দ্রের ছবি নিয়ে ইসরাইল ছাড়েনি। কিন্তু ইসরাইলের আনবিক বোমা থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা ও সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার একটা মহান উদ্দেশ্য তার ভেতর ছিল বৈকি! ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে সে নিজে নিজে এক ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে গেল এবং কালে কালে সে ঐ বোমার বিরুদ্ধে কাজ করা তার প্রধান ধ্যান হয়ে উঠল।
ইসরাইলের পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি প্রকাশে সে ক্রমশ মরীয়া হয়ে উঠল। তবে ভানু একথাও বুঝত, ছবি প্রকাশ মানেই ইসরাইলের দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ইসরাইলে ঢোকামাত্র সে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ভানুর মধ্যে ছবি প্রকাশের ব্যাপারটি এখনো বেশ সক্রিয়। ভানু এবং অস্কার সিডনির একটি ফটো ল্যাবে গিয়ে ইনষ্টিটিউট-২ এ তোলা ছবিগুলো আমেরিকার ম্যাগাজিনের স্থানীয় অফিস এবং অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশনে প্রচারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হল। সংবাদ মাধ্যমগুলোর ধারণা হল, ধাপপাবাজির মাধ্যমে ভানু এবং অস্কার কিছু ডলার কামিয়ে নিতে চায়। তারা বিশ্বাস করল না লাজুক প্রকৃতির ভানুর হাতে ইসরাইলের সবচে সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি।
অস্কার স্পেন ও ইংল্যান্ডে গিয়ে ছবির মূল্য বুঝতে পারল। এ যেন টাকার পাহাড়ের মধ্যে পড়েছে তারা। লন্ডনের সানডে টাইমস ছবিগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারল। ছবির সাথে ভানু পরমাণু কেন্দ্রের কিছু গ্রাফও এঁকেছিল। কিন্তু সানডে টাইমস কোন বিশেষ রিপোর্ট প্রনয়নের ব্যাপারে খুব সতর্ক। কেননা কয়েকদিন আগে তারা হিটলারের ডাইরী নামে যা কিনেছিল তা ছিল ভুয়া ও জাল। ফলে ভানুর ছবিগুলো তারা নানাভাবে পরখ করল।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া টিভির এক কর্মকর্তার সাথে ক্যানবেয়ার ইসরাইলি দূতাবাসের সখ্যতা ছিল। তিনি কথা প্রসঙ্গেই জানালেন যে, রহস্যজনক এক ব্যক্তি তার দেশের পারমাণবিক কেন্দ্রের ছবি বিক্রিতে আগ্রহী। বিষয়টি ইসরাইলের এক সাংবাদিক জানতে পেরে তার দেশের পত্রিকায় নিউজ করে।
উল্লেখিত খবরে ইসরাইলের গোয়েন্দা বিভাগসমূহে যেন ভূমিকম্প হয়। কেননা ডিমোনা কেন্দ্রের সাবেক এক কর্মকর্তা পরমাণু কেন্দ্রের ছবি বিক্রিতে আগ্রহী। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক হেমি কারমন এই ঘটনায় হায় হায় করে ওঠেন। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন যে, সময় মত আমরা কেন ভানুর ব্যাপারে কেন সিদ্ধান্ত নিলাম না।
ভানুর ক্রিয়াকর্ম ইসরাইল প্রাইম মিনিস্টারস ক্লাবে গিয়ে পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রী পেরেজ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবীন ও শামীর এই ক্লাবের সদস্য। তারা সকলেই জাতীয় ঐক্য সরকারের সদস্য। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন অবিলম্বে ভানুকে খুঁজে বের করে ইসরাইলে ফেরত আনতে হবে। তাদের সহযোগিদের কারো কারো মতে, ভানুকে ফেরত না এনে হত্যা করাই শ্রেয়। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ফোন তুলে মোসাদের প্রধানকে ডাকেন।
১৯৮২ সাল থেকেই মোসাদের নতুন পরিচালক রাহুম আদমোনি। তার জন্ম জেরুজালেমে। গোয়েন্দা দফতর আমানে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন আইজাক হাফিসের ডেপুটি। মোসাদের প্রধান ছিলেন তিনি ৭ বছর। কিন্তু গোয়েন্দাদের জন্য এই সময়টা মোটেও সুখকর ছিল না। বহু ঘটনা দুর্ঘটনায় মোসাদ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে যায়। ইহুদি এক নাগরিক বেসামরিক গোয়েন্দাবৃত্তির জন্য ওয়াশিংটনে গ্রেফতার হন। এ সময়ই ঘটে ইরান কন্ট্রার ঘটনা। যার সঙ্গে ইসরাইল জড়িত ছিল। অসর্তকতার জন্য এ সময় বহু ইসরাইলি গোয়েন্দা বিদেশে গ্রেফতার হয়। তবে ইসরাইলের সর্বোচ্চ ক্ষতির কারণ হল মোরদেচাই ভানু। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেই মোসাদ প্রধান ভানুকে আটকের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। কম্পিউটারে এই অভিযানের নাম দেয়া হয় কানিউক। মোসাদ প্রধান অস্ট্রেলিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে একটি দল পাঠালেও কোন লাভ হয়নি। কেননা পাখি উড়ে গেছে লন্ডনে।
এদিকে অস্কারের সাক্ষাৎকার শেষে সানডে টাইমস সম্পাদক পিটার নামে এক তারকা সাংবাদিককে ভানুর সাথে সাক্ষাৎ করতে অস্ট্রেলিয়া পাঠান। বিমানে উঠেই পিটার জানতে পারেন, ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা অস্কারের কাছ থেকে পাওয়া ছবিগুলোর সত্যতা উদঘাটন করেছেন। পিটার হাওনাম সিডনীতে ভানুর সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন ঘটনা সব সত্যি। অস্কার ভানু সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করে।
ভানু জানায় যে, একথা সত্য নয়। সে একজন টেকনিশিয়ান মাত্র।
ভানু এবং পিটার লন্ডনে আসেন। সেখানে সানডে টাইমসের লোকরা ভানুর বিশদ সাক্ষাৎকার নেন। সে যা জানে সবই তাদেরকে অবহিত করে। ব্রিটিশদের সে আরও জানায়, ইসরাইল একটা নিউট্রন বোমাও বানাচ্ছে। এই বোমার বিশেষত্ব হল প্রানী বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না কিন্তু ভবনাদি এবং দালাকোঠার কোন ক্ষতি হবে না। ইনস্টিটিউট-২ এ কীভাবে বোমা বানানো হয় তার পদ্ধতিও ভানু সবাইকে জানায়। এই পর্যায়ে ভানুকে বেশ নার্ভাস লাগছিল। ইসরাইলি গোয়েন্দারা তাকে মেরে ফেলতে পারে কিম্বা অপহরন-এই ভয় তাকে আতঙ্কিত করে। পত্রিকাটি তাদের সব কর্মীকে ভানুর সেবায় নিয়োগ করে। ভানু যাতে একাকী রাস্তা ঘাটে হাঁটাহাটি না করে সে ব্যাপারে তাকে সতর্ক করা হয়।
সানডে টাইমস ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ভানুকে এক লক্ষ ডলার দিতে চায় তার গল্প ও ছবির জন্য। এর মধ্যে ৪০ ভাগ পত্রিকায় ছাপানো বাবদ এবং ২৫ ভাগ বইয়ের স্বত্ব হিসেবে। তবে বই যদি বের হয়। টাইমসের লোকজন জানায় যে, তাদের মালিক হলেন রূপার্ট মারডক। একই সাথে তিনি টুয়েন্টি সেঞ্চুরি ফক্স নামের সিনেমা কোম্পানীর মালিক। এবং তিনি ভানুর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ছবি বানাতে আগ্রহী। রবার্ট ডি নিরো ভানুর চরিত্রে অভিনয় করবেন। লন্ডনে ভানুর মেজবানরা সেখানে তার সেবাযত্নের কোন ত্রুটি রাখেনি। যদিও তাকে কোন মেয়ে মানুষ দেয়া হয়নি। কিন্তু সেক্স করার জন্য পাগল হয়ে ওঠে সে।
কোলে মাথা রাখার জন্য একটা মেয়ে মানুষ তার চাই ই চাই। ইনসাইড স্টাফ রোয়েনা ওয়েবস্টার ভানুর সঙ্গ দিতে বটে কিন্তু সে কিছুতেই ভানুর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে রাজি নয়। সেক্স করার জন্য ভানু শুধু তার পায়ে ধরতে বাকী রেখেছিল। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, সানডে টাইমস কর্তৃপক্ষ ভানুর সব কথা বুঝেছিল, সব আবদার মিটিয়েছিল কিন্তু তার যে একটি মেয়ে মানুষ দরকার এই কথাটা বুঝতে পারেনি। আবার ভানু যে ইসরাইলের গোয়েন্দাদের ভয়ে কাতর এই সহজ সত্যটাও ঐ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পারেনি। সানডে টাইমস তাদের এক সাংবাদিককে ভানুর খোঁজ নিতে ইসরাইলে পাঠায়। এই সাংবাদিক ইসরাইলের এক সাংবাদিকের সাথে ভানুর ব্যাপারে কথা বলেন।
ইসরাইলি সাংবাদিক সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য গোয়েন্দা দল সাবাককে জানিয়ে দেয়। এর কয়েক ঘন্টার মধ্যে মোসাদের একটি টিম লন্ডনে পৌঁছে যায়। এই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন মোসাদ প্রধানের ডেপুটি সাবতাই সাভিত। এই অভিযানের সেকেন্ড ডেপুটি এবং কায়সারেরায়ের প্রধান বেনি জিভি। মোসাদের এজেন্টরা আলোকচিত্র সাংবাদিকের বেশে সানডে টাইমস পত্রিকার ভবনের সামনে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান নেয়। এই সময় ঐ পত্রিকায় ধর্মঘট চলছিল। মোসাদের লোকজন ধর্মঘটিদের ছবি তোলে। কয়েকদিনের মাথায় মোসাদের এজেন্টরা মোটামুটি ভানুকে চিহ্নিত করে ফেলে। এবং তাকে সারাক্ষণ নজরে রাখতে সক্ষম হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ভানু লেইচেস্টার স্কোয়ারে আসে। জায়গাটি পর্যটকদের খুব প্রিয়। একটি নিউজ পেপার স্টান্ডে ভানু ফারাহ ফসেটের মত এক তরুণীকে দেখতে পায়। ফারাহ ফসেট টিভি শো চার্লিস এঞ্জেলসখ্যাত।
ভানুর মন গলে যায়। ভানুর কাছে স্বর্ণকেশী এই মেয়েটি সৌন্দর্যের রানী যেন। ঐ নিউজ স্ট্যান্ডে দু'জনার চোখাচোখি হলে সে চোখ যেন আটকে যায়। এ চোখাচুখি যেন অর্থপূর্ণ। মেয়েটি পত্রিকাটি কিনে তার পথেই যাত্রা করে। ভানু অন্য পথে রওয়ানা হলেও আবার মেয়েটির কাছে ফিরে এসে তার সাথে কথা বলতে চায়। মেয়েটি হাসি দিয়ে তার সম্মতি জানায়। দু'জনের মধ্যে হালকা বিষয়াদি নিয়ে কথাবার্তা হয়। মেয়েটি জানায় তার নাম সিন্ডি। ফিলাডেলফিয়ার এক ইহুদি বিউটিশিয়ান। ছুটি কাটাতে ইউরোপে এসেছে।
ভানু ক্রমশঃ সন্দিগ্ন হয়ে উঠেছে। সানডে টাইমসের লোকেরা তাকে জেরা করে করে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। তার উপর লেখাটাও তারা স্থগিত করেছে। ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ভয় তাকে আরও কাবু করে ফেলেছে। কেননা সানডে টাইমস বলেছে, এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে ইসরাইলের ভাষ্যও তারা জানবে। এর কারণ হিসেবে সানডে টাইমস বলেছে, তাদের পত্রিকাটি অত্যন্ত মর্যাদাকর। অন্য পক্ষের ভাষ্য নেয়া তাদের একটা রেওয়াজ। কিন্তু ভানু এসব কথায় খুশি হতে পারছিলেন না। তার আশংকা ছিল এসব করতে যাওয়া মানে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এদিকে সে একাকী, ক্ষুব্ধ এবং অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আর এই সময়েই সিন্ডির আগমন।
সিন্ডিকে মস্করা করে ভানু জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মোসাদের পক্ষ থেকে এসেছো। সিন্ডি বলে, না না আমি মোসাদের কিছু নই। আচ্ছা মোসাদ কী। সিন্ডি ভানুর নাম জানতে চায়। ভানু জানায় তার নাম জর্জ। আসলে ভানু জর্জ নামেই হোটেলে উঠেছে। সিন্ডি বলে, কাম অন। তুমি জর্জ নও।
ওরা একটা কাফেতে বসল। ভানু তার প্রকৃত নাম মেয়েটিকে বলল। সানডে টাইমসকে ঘিরে সে যে সমস্যায় পড়েছে তাও সিন্ডিকে বলল। সিন্ডি তাকে জানাল যে, সে সহসাই নিউইয়র্কে যাচ্ছে। সেখানে সানডে টাইমসের থেকেও ভাল পত্রিকার ব্যবস্থা সে করে দিতে পারবে। এমনকী ভাল আইনজীবীও সে দিতে পারবে।
ভানু সিন্ডির কোন কথাই আসলে কানে নিচ্ছিল না। আসলে ভানু প্রথম দর্শনেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে ভানু সিন্ডির সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করল। তার মতে, এই দিনগুলিই তার জীবনের সেরা। তারা হাত ধরাধরি করে পার্কে ঘুরল। সিনেমা দেখা, গান শোনা সবই এক সঙ্গে চলত। আর চুমুর বন্যা বইয়ে দিত দু'জনে। এই সুইট কিসের কথা ভানুর পক্ষে কখনোই ভোলা সম্ভব নয়।
সিন্ডি গভীর ও গাঢ়ভাবে ভানুকে চুমু উপহার দিয়ে গেলেও তার সাথে বিছানায় যেতে ঘোরতর আপত্তি জানাল। সিন্ডি বলেন, সে তার হোটেলে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে থাকছে। সে ভানুকে তার হোটেল কক্ষে কখনোই আনবে না এবং ভানুর হোটেল কক্ষেও যাবে না। সিন্ডি বলল, তুমি লন্ডনে অস্থির অবস্থায় আছো লন্ডনে কিছু হবে না। তুমি আমার সাথে রোমে চল। সেখানে আমার বোনের একটা ফ্ল্যাট রয়েছে। সেখানে আমরা চমৎকার দিন কাটাতে পারব। সেখানেই তুমি শান্তি পাবে এবং তোমার কষ্ট ভুলে যাবে।
ভানু রোমে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। কিন্তু সিন্ডি রোমে যেতে বদ্ধপরিকর। একটা বিজনেস ক্লাসের টিকেটও কিনল। ভানু যখন রোমে যেতে রাজি হল তখন তার জন্যও একটা টিকেট কেনা হল। সিন্ডি বলে, এই টিকেটের টাকা তুমি আমাকে পরে দিয়ে দিও। ভানু যদি সিরিয়াস ধরনের লোক হত, যদি রিজনা বল হত তাহলে সে বুঝতে পারত সে প্রেমের ফাঁদে পড়েছে। কেননা একটি মেয়ের সাথে রাস্তায় দেখা হল, পরিচয় হল এবং তার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত-এতো যুক্তির কথা নয়। এমনকি লন্ডনে কোন সেক্স হল না বলে রোমে তাকে তার বোনের বাড়িতে সেক্স করতে নিয়ে যাচ্ছে এসব ভানুর বোঝা উচিত ছিল। এমনকি তাকে টিকেট কিনে দিল বিমানের যাকে সে ভাল করে জানেই না।
ভানুর আশা রোমে গিয়ে অবশ্যই তাদের সেক্স হবে। যে কোন সেন্সসিবল লোক উপসংহার টানবে যে, সিন্ডির পুরো আচরণই সন্দেহজনক। তবে এক্ষেত্রে মোসাদের প্রশংসা করতেই হয়। মোসাদের মনোবিজ্ঞানীরা ঠিকই বুঝেছিল, ভানু এই সময় কী চায়। এই মনোবিজ্ঞানীরা আরও বুঝেছিল, সুইট কিস দিয়েই ভানুকে প্রেমে অন্ধ করে দেয়া যাবে এবং আরও মিষ্টি মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে পটানো যাবে।
সানডে টাইমসের পিটার হাওনাম একজন সংবেদনশীল মানুষ। যখন তিনি সিন্ডির কথা শুনলেন তখন তার মনে হল মস্ত ভুল হয়ে গেছে। তিনি ভানুকে সিন্ডির সাথে দেখা করতে বারবার নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু এতে কোন কাজ হয়নি। ভানু সিন্ডির প্রতি এমনভাবে মজেছে যে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই তাদেরকে পৃথক করে।
ভানু পিটারকে একত্রে গাড়ি চালিয়ে তাকে একটি ক্যাফেতে পৌঁছে দিতে বলে। ঐ ক্যাফেতে অপেক্ষমাণ সিন্ডি। পিটার এদিন সিন্ডিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। পিটার যখন শুনলেন ভানু শহর ত্যাগের কথা ভাবছে কয়েকদিনের জন্য, তখন পিটার তাকে নিষেধ করেও কোন লাভ হয়নি। তারপর পিটার ভানুকে লন্ডন ত্যাগ না করার জন্য বলেন। পিটার তার পাসপোর্ট হোটেল রিসিপশনে না রাখারও পরামর্শ দেন। পিটারও ধারণা করতে পারেননি যে, সিন্ডির সাথে শোয়ার জন্য ভানু রোমে চলে গেছে।
রোমে ভানুর সাথে সিন্ডি শুতে রাজি হয় একেবারেই ভিন্ন একটি কারণে। ইসরাইল ব্রিটিশ মাটিতে ভানুকে অপহরণ করতে আগ্রহী নয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী পেরেস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লৌহমানবী মার্গরেট থ্যাচারের সাথে বিরোধে জড়াতে চাননি। মোসাদ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনে কাজকর্মে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। কেননা কয়েক মাস আগে জার্মান কর্তৃপক্ষ একটি টেলিফোন বুথে ৮টি ব্রিটিশ জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করে। ঐ পাসপোর্টের ট্যাগের মাধ্যমে ইসরাইলি দূতাবাসের যোগসূত্র পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয়। মোসাদকে একটি প্রতিশ্রুতি দিতে হয় যে, ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব নিয়ে সে কখনো ছলচাতুরির আশ্রয় নেবেনা।
এক্ষেত্রে রোম হল সম্ভাব্য সেরা স্থান। মোসাদ এবং ইটালীর সিক্রেট সার্ভিসের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ এবং গভীরে প্রোথিত। মোসাদ প্রধান এবং ইটালীর সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান এডমিরাল ফুলভিও মাটিনির সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এবং ইটালীতে যেভাবে অস্থিরতা বাড়ছে তাতে নিশ্চিত যে ভানুর অপহরণের বিষয়টি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। ১৯৬৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সিন্ডি ও মর্ডি হাতে হাত রেখে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে উঠে বসে। রাত ৯টায় দুই প্রেমিক যখন ল্যাণ্ড করে ইটালীর বহু লোক তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে। ভাল্লু সেই পুষ্পস্তবক গাড়িতে রেখে সিন্ডির বোনের বাড়িতে যাচ্ছে। পথে বিশেষ করে সিন্ডি তার প্রিয় মানুষ ভানুকে বেশ কয়েকবার জড়িয়ে ধরে। ভরিয়ে তোলে চুমুতে চুমুতে।
একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে গাড়িটি থামলে একটি ছোট্ট মেয়ে দরজা খুলে দেয়। ভানুই প্রথমে বাড়িতে ঢোকে। হঠাৎ করেই দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায় এবং দুটি লোক তার উপর জাম্প দেয় এবং দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। ভানু লক্ষ্য করে এদের মধ্যে একজন স্বর্ণকেশী। যখন তার হাত-পা বাঁধা হচ্ছিল তখন মেয়েটি তার হাতে নিডল দিয়ে কিছু পুশ করে। এভাবে নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয় পড়ে ভানু।
একটি কমার্শিয়াল ভ্যান ভানুর অচেতন দেহটা শহরের উত্তরাংশে নিয়ে যায়। ভ্যানটি বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে চলছিল। ভানুর পাশে দুজন পুরুষ এবং এক মহিলা বসা ছিল। কয়েক ঘন্টার মধ্যে ভানুকে আরেকটি ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। এদিকে সিন্ডি লাপাত্তা হয়ে গেছে। ভ্যানটি লা মেনজিয়া বন্দরে পৌছে। ভানুকে একটি স্ট্রেচারে করে দ্রুতগামি একটি স্পীড বোটে তোলা হয়। সেটি উন্মুক্ত সাগরের দিকে এগুতে থাকে। সেখানে অপেক্ষমাণ ছিল ইসরাইলের একটি জাহাজ-নাম তাপুন। আরেকটি সূত্র মতে, এর নাম ছিল এস এস নাগা। জাহাজের ক্রুদের তাদের লাউঞ্জে ঢুকে যেতে নির্দেশ দেয়া হল। কিন্তু যারা ডিউটিরত ছিল তারা স্পিড বোট এগিয়ে আসতে দেখল। ভানুকে অচেতন অবস্থায় জাহাজে তুলে একটি কেবিনে তুলে তালা মেরে দেয়া হল। জাহাজটি অবিলম্বে ইসরাইলের পথে যাত্রা করল।
ভানু পুরো সময়টা ক্ষুদ্র ঐ রুমে তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকল এবং কোথাও সিন্ডিকে দেখতে পেল না। সিন্ডির ব্যাপারে সে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। কোথয় গেল সিন্ডি। ভানুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না যে, সিন্ডি মোসাদ টিমের একজন সদস্য। সম্ভবত সেই রাতেই সে ইরানে চলে গেছে। ভানুর সফর সঙ্গি হিসেবে জাহাজে যে মহিলা রয়েছেন, তিনি একজন ডাক্তার। ভানুকে ইসরাইলের একটি নেভি মিসাইল বোটে তোলা হল। সেখানে সে পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবাক গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হল। তারা ভানুকে গ্রেফতার করে এ্যামকেলনের সিকমা জেলখানায় নিয়ে গেল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সময়ই ভানু বুঝল যে, তাকে ইসরাইল নেয়ার সময়ই লন্ডনের সানডে টাইমস তার উপর ধারাবাহিক ছাপতে শুরু করেছে। ঐ প্রতিবেদনে ছবি এবং ড্রয়িংও ছাপা হয়। সারা বিশ্বে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সানডে টাইমস উল্লেখ করে যে, ইসরাইলের পরমাণু দক্ষতার যে ধারণা ছিল তা ছিল ভুল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তারা মনে করেছিলেন ইসরাইলের হাতে ১০ থেকে ২০টি প্রিমিটিভ আণবিক বোমা রয়েছে। কিন্তু ভানুর তথ্যে প্রমাণিত হয় যে, ইসরাইল পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে এবং তাদের হাতে অত্যাধুনিক ১৫০ থেকে ২০০টির মত পারমাণবিক বোমা রয়েছে।
একই সাথে ইসরাইলের হাইড্রোজেন ও নিউট্রন অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা রয়েছে। ভানু এই স্পর্শকাতর সংবাদ প্রকাশের পর আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে ভয় পেয়ে গেল ইসরাইলিরা তাকে মেরে ফেরবে। সে সিন্ডির জন্যও চিন্তিত ছিল। তাকে যখন বলা হয় সে মোসাদের লোক তখনো সে তা বিশ্বাস করতে চাইছিল না।
চল্লিশ দিন বিশ্ববাসী ভানু সম্পর্কে কিছুই জানতে পারল না। মিডিয়া ছাপতে শুরু করল যে, সত্য নিয়ে কারচুপি করে লাভ নেই। ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকা কী করে ভানুকে লন্ডন থেকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত ছাপতে শুরু করল। অনেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিখল, একটি প্রমোদতরীতে এক তরুণীসহ ভানুকে ইসরাইল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ এমপিরা লন্ডনে পুরো ঘটনার একটি সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করল এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণের দাবি জানাল। ভানুকে মধ্য নভেম্বরে সরকারিভাবে অভিযুক্ত করা হল। তাকে এরপর পুনঃপুনঃ আদালতে নেয়া হচ্ছিল।
সে ভাল করেই জানত জনসমাগমের কোন দিকটায় রিপোর্টার থাকে। একবার ভানু পুলিশের গাড়ির পেছন দিকটায় বসল। রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফারদের ভিড় দেখে সে তার হাত জানালায় রাখল। এর কারণ তার হাতে যা লেখা রয়েছে তা যেন সাংবাদিকরা পড়তে পারে। ভানুর হাতে সংক্ষিপ্তাকারে যা লেখা ছিল তাহল ১৯৬৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে রোমে অপহরণ করে। সে বিমানযোগে রোমে এসেছিল। সব কথা জানাজানির পর জেরুজালেম ও লন্ডনের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। কেননা, এটা পরিষ্কার ভানু লন্ডন ত্যাগ করেছে স্বেচ্ছায় এবং এটি ছিল একটি নিয়মিত ফ্লাইট। এদিকে রোমে গোয়েন্দা প্রধানের মাথায় হাত। তিনি ক্রুব্ধ এবং হতাশ। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে ইসরাইল সে ব্যথায় মলম লাগাতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ভানুর ১৮ বছর জেল হয়। কিন্তু দেশের বাইরে তাকে গোয়েন্দা বা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তার নামে ইউরোপ ও আমেরিকায় বেশ কিছু সংগঠন গজিয়ে ওঠে। ভানুকে শান্তির স্বপক্ষে একজন ঘোরতর সাহসী যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেননা ভানুই একমাত্র ব্যক্তি যে ইসরাইলের পারমাণবিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
ভানুর সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা সঠিক নয়। ভানু কখনোই ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করার সময় ইসরাইলের পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত গঠন বা ধ্বংসে মনোনিবেশ করেনি। যদি ঐ কারখানা বা চুল্লী লে অফ করা না হতো তাহলে হয়ত আজও সে সেখানে কাজ করত। আবার যখন সে দেশ ত্যাগ করে তখনও কিন্তু পবিত্র যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সে কোন তাড়াহুড়ো করেনি। সে বিশ্ব সফর করছিল। অস্ট্রেলিয়ায় সে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। যদি অসকারের সাথে তার যোগাযোগ না হত হয়ত তার কাছে তোলা ছবিগুলো গোল্ডা ব্যালকনিতে রাখত। কিন্তু বিশ্বের মানুষ তাকে একজন ইসরাইলের বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করছে। এক মার্কিন দম্পতি ভানুকে পুত্র হিসেবে দত্তক নিয়েছেন। এদিকে খ্রীষ্টানদের একটি অংশ তাকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
১৮ বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভানু জেরুজালেম চার্চে বসবাস বেছে নেয়। এখনো ইসরাইলের প্রতি তার আকাশচুম্বী ঘৃণা। সেখানে বাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। হিব্রু ভাষায় কথা বলতেও তার আপত্তি। নাম বলে জুন ক্রসম্যান। আগের নাম নয়। আরব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সে আরব বা ফিলিস্তিনি বউ খুঁজছে। বিজ্ঞাপনে ইসরাইলি কোন মেয়ের আবেদনের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ থাকছে।
আর সিন্ডি! কী তার পরিচয়। যেহেতু মোসাদের হাতে বেশী সময় ছিল না ফলে সিন্ডি তার বড় বোনের নাম ব্যবহার করেছে-সিন্ডি হানিন। তার পাসপোর্টও ব্যবহার করেছে। এ কারণেই ব্রিটিশ ও ইসরাইলি সাংবাদিকরা তার প্রকৃত পরিচয় আবিষ্কারে সমর্থ হয়েছে। ঐ সাংবাদিকরা জেনেছে, সিন্ডির আসল নাম চেরিল বেন টভন নী হানিন। তার বাবা একজন মার্কিন বিলিয়নিয়ার। টায়ারের ব্যবসা করে সে কোটি কোটি ডলার বানিয়েছে। একজন নিবেদিতপ্রাণ ইহুদি এবং সতের বছর বয়সে আমেরিকা থেকে ইসরাইলে চলে আসে। সে আইডি এফ এ চাকুরী করত এবং আমান গোয়েন্দা বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তার স্ত্রী।
মোসাদের একজন এজেন্ট তাকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়। তার আইকিউ খুবই উচ্চমানের। উদ্দেশ্য সাধনে সে সফল এবং তার মার্কিন পাসপোর্ট এক্ষেত্রে খুব কার্যকর। সে দু'বছরেরও প্রশিক্ষণকাল শেষ করেছে। তারপরই তাকে তড়িঘড়ি করে অভিযান পরিকল্পনাকারী দল কানিউকের সঙ্গে লন্ডনে চলে যেতে হয়। ভানুর অপহরণের পর পত্রপত্রিকাগুলো সিন্ডিকে নিয়ে মেতে উঠলে সে অপারেশনাল কার্যক্রম থেকে পদত্যাগ করে।
বর্তমানে চেরিল হানিনবেন টভ ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে বসবাস করে। সে আর তার স্বামীর সেখানে রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং ধর্মভীরু ইহুদি মার্কিন পরিবার হিসেবে সেখানে বসবাস করে। ভানুর ঘটনায় মোসাদের গোয়েন্দা হিসেবে চেরিলের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আর তার সহকর্মীদের মনে অনেক দুঃখ। কেননা চেরিলের মত স্মার্ট, সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মহিলা আর আজ তাদের প্রতিষ্ঠানে নেই। কারণটা হল, ইসরাইল যে ভানুকে হাতে পেল তার কৃতিত্ব চেরিলের। এবং ইংল্যান্ড থেকে ভানুকে বের করে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন আইনও ভাঙ্গেনি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট ভানুকে নিয়ে এমপিদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু পরে সকলেই আশ্বস্ত হন যে, ব্রিটিশ মাটিতে কোন অপহরণ সংঘটিত হয়নি ভানুকে নিয়ে। মোসাদ এই নিষ্কৃতি বহু দিন পায়নি। দু'বছর পরে ঘটে আরেক কেলেংকারি। মোসাদ এজেন্ট এরিয়ে রেজেব ও বারাদ এক ফিলিস্তিনিকে লন্ডনে ডাবল এজেন্ট নিয়োগ করেছিল। ফিলিস্তিনি ধরা পড়ে গ্রেফতার হয়। কিন্তু থ্যাচার লন্ডনের মোসাদ কেন্দ্র বন্ধ করে দেন এবং রেজেব ও বারাদকে বহিষ্কার করেন।
মোসাদ আবারও লন্ডনে ভালো থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। সবই ভালো চলছিল কিন্তু মাহবুব আল মাহবুবকে নিয়ে আবার শুরু হয় জটিলতা।