📄 তেহরানে লাশের পাহাড়
২০১১ সালের ২৩ জুলাই ইরানের দক্ষিণ তেহরানের বনি হাশেম স্ট্রীটে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মোটরসাইকেলে এসে দুই বন্দুকধারী এক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তার বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তে গুলি করে হত্যা করে। চামড়ার জ্যাকেট থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বের করে হত্যা শেষে দু'আততায়ীই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহত ব্যক্তির নাম দারিওইউস রেজাই নাজাদ। বয়স ৩৫। তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের একজন প্রফেসর এবং ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তা।
ইরানের রেজাই নাজাদই প্রথম ইরানি বিজ্ঞানী নন যিনি এভাবে আততায়ীর হাতে খুন হলেন। সরকারি তকমা লাগিয়ে ইরান শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু টেকনোলজির উন্নয়নে ব্রতী ছিল। ইরান দাবি করে আসছিল, রাশিয়ার সহযোগিতায় তারা যে বুশহর চুল্লি নির্মাণে ব্রতী ছিল তার লক্ষ্য ছিল সৎ। কিন্তু এই বুশহর চুল্লির আড়ালে গোপনে ইরান পারমাণবিক আরও বেশ কিছু কার্যক্রম চালাচ্ছিল। ঐ চুল্লিতে ইরান শক্তিশালী প্রহরার অধীনে কাজ চালাত এবং সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল এককথায় কঠিন। সময়ের পরিবর্তনে ইরান তাদের আরও বেশ কিছু পরমাণু কর্মসূচির কথা স্বীকার করেছিল।
যদিও শুরুতে তারা পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ ও উন্নয়নের কথা অস্বীকার করেছিল। যদিও পশ্চিমা গোয়েন্দারা এবং ইরানের কিছু আন্ডার গ্রাউন্ড সংস্থা অভিযোগ করে আসছিল যে, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা ইরানের প্রথম পরমাণু বোমা বানানোর কাজে রত। এক্ষেত্রে একটাই পথ ছিল নৃশংস অভিযান চালিয়ে ইরানের গোপন পরমাণু কর্মসূচির কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দেয়া।
২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর। সময় সকাল পৌনে আটটা। স্থান উত্তর তেহরান। ইরানের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মজিদ শাহরিয়ার গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার গাড়ির পেছনের উইনশিন্ডে হেলমেট পরা মোটরসাইকেল আরোহণী ছোট্ট একটি যন্ত্র বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়। মুহূর্তের মধ্যে সে ডিভাইস বিস্ফোরিত হল। ৪৫ বছর বয়সী ড. মজিদ নিহত এবং তার স্ত্রী আহত হন। একই সময় দক্ষিণ তেহরানে আরেক মোটরসাইকেল থেকে ড. ফেরদাউন আব্বাসী দাভানীর গাড়িতে অনুরূপ ডিভাইস প্রতিস্থাপন করা হলে সেটিও বিস্ফোরিত হয় এবং ড. আব্বাসী ও তার স্ত্রী আহত হন। ড. আব্বাসী হলেন আরেকজন পরমাণু বিজ্ঞানী।
এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ইরান সরকার ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে দায়ী করে। উল্লেখ্য, এই দুই বিজ্ঞানী অত্যন্ত গোপনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ইরানের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান আলী আকবর সালেহী নিহত শাহরিয়ারকে 'শহীদ' আখ্যা দিয়ে বলেন, তারা মহৎ কাজের সাথেই যুক্ত ছিলেন। আর তা হল মানব কল্যাণ। সালেহী পারমাণবিক প্রকল্পের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ নিহত দুই বিজ্ঞানীকে অসম্ভব প্রতিভাধর আখ্যায়িত করে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। ইতিমধ্যে ডঃ আব্বাসী আরোগ্য লাভ করলে আহমেদিনেজাদ তাকে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইরানের বিজ্ঞানীদের যারা হত্যা করছিলেন তাদের পরিচয় কখনোই জানা যায়নি।
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি। সকাল সাড়ে ৭টা। উত্তর তেহরানের শরীয়তী স্ট্রীটের বাসা থেকে বের হয়ে গাড়ির লক খুলছিলেন প্রফেসর মামুদ আলী মোহাম্মদী। তার গন্তব্যস্থল ছিল শরীফ কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি।
যখনই তিনি তার গাড়ির লক খুলছিলেন তখন ভয়ংকর এক বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনী এসে দেখতে পায় মোহাম্মদীর গাড়ি বিধ্বস্ত এবং প্রফেসর মোহাম্মদীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে জানা গেল, প্রফেসর মোহাম্মদীর গাড়ির সাথেই লাগোয়া একটি মোটরসাইকেলে ব্যাপক পরিমাণ বিস্ফোরণ রাখা হয়েছিল। ইরানী গণমাধ্যম এবার তারস্বরে বলতে থাকে যে, মোসাদ এজেন্টরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ ঘোষণা করেন যে, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ইহুদিবাদী প্রক্রিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
৫৫ বছর বয়সী প্রফেসর মোহাম্মদী ছিলেন বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী এবং ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের একজন উপদেষ্টা। ইউরোপীয় মিডিয়া তাকে ইরানের রেভ্যুলেশনারী গার্ডের একজন সদস্য হিসেবে অভিহিত করে। এরা সরকারেরই প্যারালাল একটি সামরিক সংগঠন। কিন্তু প্রফেসর মোহাম্মদীর জীবন ও মৃত্যুর রহস্যাবৃত ঘটনার মত পরিচয়ও রহস্যেঘেরা। মোহাম্মদীর বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের ভাষায়, মোহাম্মদী মূলত গবেষণাকর্মে ব্যাপৃত ছিলেন। সামরিক বাহিনীর কোন প্রকল্পে বা সংস্থার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। আবার কেউ কেউ একথাও বলেছেন ইরান সরকারের ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল এবং সরকার বিরোধি কর্মকাণ্ডেও তিনি অংশ নিয়েছেন।
তবে একথা অনস্বীকার্য, প্রফেসর মোহাম্মদীর শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকই ছিলেন রেভ্যুলেশনারি গার্ডের সদস্য। রেভ্যুলেশনারি গার্ডের অফিসাররা তার কফিন বহন করেন। তদন্ত শেষে অবশেষে যা জানা যায় তাহলো প্রফেসর মোহাম্মদী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
২০০৭ সালের জানুয়ারীতে ড. আরদাশির হোসেনপুরকে হত্যা করা হয়। এ সময় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে, তেজস্ক্রিয় বিষ দিয়ে ইসরাইলের গোয়েন্দা বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। লন্ডনের সানডে মেইল টেক্সাসভিত্তিক স্টার্টকর স্টাটেজি এন্ড ইন্টেলিজেন্স থিংক ট্যাংকের বরাত দিয়ে এই খবরটি প্রকাশ করে। ইরান সরকার এই রিপোর্টটিকে নিয়ে উপহাস করে। তাদের ভাষ্য, মোসাদের পক্ষে ইরানের অভ্যন্তরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা অসম্ভব এবং কখনোই সম্ভব নয়। ইরানী কর্মকর্তারা বলেন যে, প্রফেসর হোসেইনপুর তার বাড়িতে এক অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ইরান আরও গুরুত্ব দিয়ে জানায় যে, প্রফেসর হোসেইনপুর কখনোই ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি একজন বিখ্যাত তড়িৎ চুম্বক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, প্রফেসর হোসেইনপুর ইসফাহান সিক্রেট ইনস্টলশেনে কাজ করতেন। সেখানে অপরিশোধিত ইউরোনিয়াম গ্যাসে পরিণত করা হত। এই গ্যাস ইরানের ভূগর্ভস্থ নানতাজ কেন্দ্রে পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যবহৃত হত। এই কেন্দ্রটি শক্তিশালী ও দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। মৃত্যুর দু'বছর আগে হোসেইনপুরকে বিজ্ঞান ও টেকনোলজির ক্ষেত্রে অবদানস্বরূপ ইরানের সর্বোচ্চ খেতাব প্রদান করা হয়েছিল। সামরিক গবেষণায় ব্যাপক সাফল্যের জন্য তাকে এই খেতাব দেয়া হয়েছিল।
ইসরাইল তথা মোসাদের কথিত সমর নীতির ক্ষেত্রে ইরানের দু'চারজন বিজ্ঞানীকে খতম করার বিষয়টি কিঞ্চিৎকর ঘটনাই বটে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার মতে, দাগানের মোসাদ বাহিনী হিট টিম, স্যাকটাস গ্রুপ, ডাবল এজেন্ট নিধন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে ধস নামাতে বছরের পর বছর ধরে সাফল্যের সাথে কাজ করেছে।
স্টার্টফরস এর বিশ্লেষক বিভাগের পরিচালক রেভা ভাল্লা বলেছেন, আমেরিকার সহযোগিতায় ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে মানব সম্পদ ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয় করণের পাশাপাশি ইরানের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে ধ্বংসে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে। রেভা ভাল্লা বলেন, আশির দশকের শুরুতে ইরাকের ক্ষেত্রেও ইসরাইল অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছে। তখন মোসাদ ইরাকের তিনজন পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছিল। বাগদাদ সন্নিহিত অসরিক পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে ইরাককে তখন পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
ইরানের পারমানবিক প্রকল্প বিলম্বিত করতে মোসাদ পরিকল্পনাভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। এক্ষেত্রে দাগানের মোসাদ বাহিনী নৃশংস পন্থা বেছে নিয়েছিল। দাগানের মোসাদ বাহিনী চেয়েছিল ইরান যাতে কোন ভাবেই একটি পারমাণবিক বোমা বানাতে সমর্থ না হয়। জন্মের পর থেকেই ইসরাইল তার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল। ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ এই বলে সতর্কও করেছিলেন যে, ইসরাইলের বিলুপ্তি তিনি ঘটাবেন।
বিজ্ঞানীদের হত্যা করে মোসাদ কিছুটা বিজয়ীর বেশে বটে। কিন্তু মোসাদের প্রায়শ্চিত্ত করার মত উদাহরণও বিদ্যমান। ইরানের গোপন পারমাণবিক প্রকল্প ও এর অবকাঠামো ও পাওনাদির বিস্তারিত উদঘাটনে মোসদের ব্যর্থতার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করা যেতে পারে।
সত্যি বলতে কী, কয়েক বছরের ব্যবধানে ইরান পারমাণবিক প্রকল্পে যে অনেক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে ইসরাইল বা মোসাদ তার হদিশ সামান্যই অবহিত। পারমাণবিক প্রকল্পে ইরান প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যক বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, ইরান গোপন পারমাণবিক বেস প্রতিষ্ঠা করেছে। সফিসটিকেট পরমাণু পরীক্ষা চালাচ্ছে। অথচ ইসরাইল বিস্তারিত বা গভীরের কিছু জানে না। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হল, পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে ইরানের ছলাকলা, কৌশলাদি পশ্চিমা গোয়েন্দাদেরও বোকা বানিয়ে চলেছে। মোসাদতো অবশ্যই তার অন্তর্ভুক্ত।
ইরানের রেজা শাহ পাহলভী ১৯৭০ সালে শান্তিপূর্ণ ও সামরিক প্রয়োজনে দুটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু রেজা শাহের পারমাণবিক প্রকল্প ইসরাইলকে বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তায় ফেলেনি। কেননা ইরান ছিল তখন ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৭৭ সালে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আইজার ওয়েইজম্যান তেলআবীবে ইরানের জেনারেল হাসান তৌকানিনের সম্মানে একটা পার্টিরও আয়োজন করেছিলেন। জেনারেল হাসান ইরানের সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ইরান ও ইসরাইল মিত্র দেশ। ইসরাইল ইরানকে তখন অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করত। দুই দেশের মিত্রতার কারণে ঐ সময় তাদের মধ্যে যে অতিগোপনীয় বৈঠকটি হয় তার বিবরণ পাওয়া গেছে। ইসরাইলের ওয়েইজম্যান তখন ইরানকে বিশেষ ধরনের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অফার করেছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ড. জুমম্যান তখন বলেছিলেন, তারা যে ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে রফতানি করার অফার দিয়েছেন তাতে পারমাণবিক ওয়ারহেড সংযোজন সম্ভব। একথা শুনে ইরানী মন্ত্রী তৌ ফানিয়ান খুবই চমৎকৃত ও উৎসাহিত হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল এই যে, এসব অস্ত্র সরবরাহের আগেই ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হয়ে যায়। ইরানের নতুন রেভ্যুলুশানি সরকার রেজা শাহের সমর্থকদের প্রায় নিশ্চিৎ করে ফেলে। নতুন সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায় ইসরাইলের সর্বাত্মক বিরোধিতা। ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী রেজা শাহ দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং তদস্থলে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। দেশের শাসনভার বর্তায় খোমেনির সমর্থক মোল্লাদের উপর।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেই পারমাণবিক প্রকল্প ইসলাম বিরোধি আখ্যা দিয়ে খোমেনী সবগুলো পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করে দেন। যে ভবনে পারমাণবিক চুল্লী ছিল তা বন্ধ এবং যাবতীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট করে ফেলা হয়। কিন্তু ১৯৮০ সালে ইরান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সাদ্দাম হোসেন ইরানের বিরুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেন। যুদ্ধে ইরানের জাত শত্রু ইরাকের পক্ষে অপ্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার খোমেনীকে মারাত্মক ক্ষুব্ধ করে তোলে।
আয়াতুল্লাহ খোমেনী অবশেষে অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। এমনকী খোমেনীর মৃত্যুর আগেই তার উত্তরসুরী আলী খামেনী তার সামরিক বাহিনীকে নতুন অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণ ও সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তিনি রাসায়নিক এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দেন। আর এসব অস্ত্র বানানোর উদ্দেশ্য ছিল ইরাক যেসব বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে ইরানীদের হত্যা করেছে তার পাল্টা জবাব দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ। ইরানের এই বিপ্লবীরাই এক সময় পারমাণবিক অস্ত্র ইসলাম বিরোধি বলে ফতোয়া দিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প হাতে নিয়ে তারা তাদের ফতোয়াগুলো উল্টে দিলেন।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে অর্থায়ন ও মনোযোগ প্রদর্শনের বিষয়টি আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই খন্ডিতভাবে প্রকাশ হতে শুরু করেছিল।
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়। এ সময় ইউরোপে কান পাতলেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারটি শোনা যেত। বেকার সাবেক সোভিয়েত সেনাদের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা, ওয়ারহেড ইরানীরা কিনেছে বলে বেশ গুজব ছিল। আর অর্থলোলুপ সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা ইরানে নানা অস্ত্রশস্ত্র টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে বলেও ব্যাপক প্রচারণা ছিল। পশ্চিমা পত্র-পত্রিকা প্রায়শই লিখত যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানী ও জেনারেলরা তাদের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে এবং ইরান সরকার তাদের চাকুরী দিচ্ছে। রিপোর্টার তার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত প্রতিবেদনে এও লিখত যে, ইউরোপ থেকে তালাবদ্ধ ট্রাকের পর ট্রাক মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাচ্ছে। এই সময় রাশিয়া ইরানের বুশহারে একটি পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। দুটি ছোট মাপের চুল্লী প্রতিষ্ঠায় চীন ইরানের মধ্যে চুক্তি হয়েছে বলে খবর বেরোয়।
দুটি খবরই আমেরিকা ও ইসরাইলের ঘুমকে হারাম করে দেয়। তারা ইউরোপে গোয়েন্দা পাঠায় এবং নির্দেশ দেয়, সত্যি সত্যি ইরান রুশদের পারমাণবিক বোমা কিনেছে কীনা এবং তাদের বিজ্ঞানীদের এ কাজে নিয়োগ দিয়েছে কিনা। কিন্তু গোয়েন্দারা তা উদঘাটনে ব্যর্থ হলেও রাশিয়া ও চীনের ওপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে আমেরিকা। যাতে তারা ইরানের সাথে চুক্তি বাতিল করে। মার্কিন চাপে চীন ইরানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখে কিন্তু গতি বিলম্বিত করতে শুরু করে। শর্ত হয় ইরানের পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে কুড়ি বছরেরও বেশী সময় লাগবে এবং তা পুরোপুরি রাশিয়া ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থেকে সীমিত আকারে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং আমেরিকার সিআইএ অনুধাবনে ব্যর্থ হল যে, তাদের বোকা বানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। কেননা ইরান ইতিমধ্যে সকলের অজান্তে বিশালাকায় একটি পারমানবিক প্রকল্প চালু করেছে।
১৯৮৭ সালে দুবাইয়ে একটি গোপন সভা হয়। একটি নোংরা অফিসে ৮জন মানুষ বৈঠক করেন। এদের মধ্যে তিনজন ইরানী, ২জন পাকিস্তানী এবং তিনজন ইউরোপের বিশেষজ্ঞ- যাদের মধ্যে দুজন জার্মান। এরা প্রত্যেকেই ইরানের পক্ষে কাজ করছিল।
এ দিনের সভায় ইরান ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন চুক্তি হয়। পাকিস্তানীদের প্রচুর টাকা-পয়সা দেয়া হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান ড. আব্দুল কাদের খান সভাতে উপস্থিত ছিলেন এবং মোটা অংকের টাকা তার হস্তগত হয়।
এই বৈঠকের বেশ কয়েক বছর আগে পাকিস্তান তাদের পারমাণবিক প্রকল্প চালু করে। পাকিস্তানের টার্গেট তাদের চিরশত্রু ভারতকে দমিয়ে রাখা। ড. কাদের একটি পারমাণবিক বোমা বানাতে সহজে বিদারন সম্ভব এমন সামগ্রী পাগলের মত খুঁজছিলেন। তিনি প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করতে চাইছিলেন না। তার কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম।
পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক ড. আবদুল কাদের খান পরমাণু বোমার ব্লুপ্রিন্ট ইউরোপীয় কোম্পানী ইউরেনকো থেকে চুরি করেছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি সেখানে কাজ করতেন। সেই সূত্রেই তিনি পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা বানাতে শুরু করেন। কাদের খান কিছুদিনের মধ্যে আজরাইলে নিজেকে রূপান্তরিত করেন। কেননা তিনি আনবিক বোমার মেথড, ফর্মূলা এবং পরমাণু বোমা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতে শুরু করেন। ইরান তার প্রধান খদ্দেরে পরিণত হয়। লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়া তার খদ্দের ছিল।
ইরানীরা কাদের খান ছাড়াও অন্য সূত্র থেকে পারমাণবিক বোমা বানাতে প্রয়োজন এমন সরঞ্জামাদি কিনতে শুরু করে। ইরানীরা স্থানীয়ভাবে এসব কীভাবে তৈরি করতে হয় তাও শিখে ফেলে। বিশাল পরিমাণ ইউরেনিয়াম, সেন্ট্রিফিউজ, বৈদ্যুতিক সামগ্রী এবং যন্ত্রাংশ নানা পথে ইরানে আসতে শুরু করে। অপরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম কার্যকর করতে বিশালাকার অবকাঠামো নির্মাণ করে ইরান। ইরানী বিজ্ঞানীরা পাকিস্তান এবং পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞরা ইরানে গোপনে ব্যাপক হারে যাতায়াত শুরু করে। ধূর্ত ইরানীরা সব ডিম এক ঝাঁকায় রাখায় ব্যাপারে সতর্ক ছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানের সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও ছদ্মবেশী ল্যাবরেটরী কিম্বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে অবকাঠামো গড়ে তোলে। কয়েকটি স্থাপনা তারা ভূগর্ভে স্থাপন করে। একটি পারমাণবিক প্লান্ট ছিল ইসফাহানে, আরেকটি আরাকে। নানতাজে সেন্ট্রিফিউজ সুবিধাসম্বলিত স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। পবিত্র শহর কোমে আরেকটি প্লান্ট গড়ে তোলা হয়। জানাজানি হলে ইরানীরা প্ল্যান্টগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ধরা পড়া এড়াতে প্রয়োজনে মাটির স্তর চেছে ফেলতেও তারা ভেবে রেখেছিল। ইরানীরা আন্তর্জাতিক আনবিক এনার্জি এজেন্সীকেও দক্ষতার সাথে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকী এই সংস্থার চেয়ারম্যান মিশরের ড. মো. আল বারাদিকেও তারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। ফলে ইরান নির্বিঘ্নে পারমাণবিক কর্মসূচী চালিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ১জুন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মত পারমাণবিক ক্ষেত্রে ইরানী আয়োজনের প্রকৃত ব্যাপ্তি ও বিশালতা অনুধাবনে সক্ষম হয়। নিউইয়র্কে পাকিস্তানের পক্ষত্যাগী এক বিজ্ঞানী এফবিআই অফিসে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বিস্তারিত অবহিত করেন। একই সাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চান। ভদ্রলোক নিজেকে ড. ইফতেখার খান চৌধুরী বলে পরিচয় দেন। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে পাকিস্তান কীভাবে সাহায্য সহযোগিতা করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন বিজ্ঞানী ইফতেখার। ইফতেখার কাদের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অংশ নিয়েছেন বলে এফবিআইকে জানান।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে পাকিস্তানের কোন কোন বিশেষজ্ঞ শরীক হয়েছিলেন সে নামের তালিকাও ড. ইফতেখার এফবিআইকে দেন। ড. ইফতেখারের তথ্য উপাত্ত এফবিআই তদন্ত করে সত্যতা পায়। এফবিআই ড. ইফতেখারকে আমেরিকায় থাকার ব্যবস্থা করে দেয় রাজনৈতিক অভিবাসী হিসেবে। এফবিআই ড. ইফতেখারের তথ্যাদি অবহেলা ভরে ফেলে রাখে। এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ যেমন নেয়নি তেমনি ইসরাইলকেও সতর্ক করেনি। এভাবে চার বছর কেটে যায়। কিন্তু এক সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ হয়ে পড়ে।
২০০২ সালের আগষ্টে ইরানের বিরুদ্ধবাদী আন্ডারগ্রাউন্ড দল মুজাহিদিন আল খালক (এমইকে) আরাক ও নানতাজে ইরানের দুটি পারমাণবিক অবকাঠামোর কথা বিশ্ববাসীর কাছে ফাস করে দেয়। পরবর্তী সময়েও এমইকে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পাদি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে। সিআইএ তখনো এসব খবর নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে। সিআইএর ধারণা ছিল ইসরাইল ও রাশিয়া বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনায় আমেরিকাকে যুক্ত করতে চাইছে। সিআই আরও ধারণা করেছিল যেহেতু মোসাদ এবং ব্রিটিশ এমসিক্সটিন এমইকে নানাভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছে অতএব তাদের দেয়া তথ্য নির্ভুল এবং বিশ্বস্ত। ইসরাইলি সূত্রমতে প্রকৃত সত্য হল মোসাদের একজন অফিসার ইরানের বিশালাকায় চুল্লীর সন্ধান পায় নাতনজেতে। এটি মরুভূমির গভীরে অবস্থিত। একই বছর অর্থাৎ ২০০২ সালে ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ডের এক নেতা সিআইএকে একটি ল্যাপটপ দেয়। এতে ঠাসা ছিল ইরানের পারমাণবিক নানা তথ্য। আন্ডারগ্রাউন্ডের ঐ নেতা অবশ্য কীভাবে এই ল্যাপটপ তার হস্তগত হল তা উল্লেখ করেননি। সিআইএ পরীক্ষা করে দেখল যে, একটি তথ্য স্ক্যান করে সম্প্রতি ল্যাপটপে ঢোকানো হয়েছে। সিআইএ কিছু তথ্য অগোছালো ও অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপনের জন্য মোসাদকে দায়ী করল। যদিও সিআইএ জানত যে, এসব তথ্যাদি মোসাদ তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে পেয়েছে। পরবর্তীতে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন এমইকে তা সরবরাহ করে। উদ্দেশ্য হল পশ্চিমা দুনিয়া যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হতে পারে।
ইতিমধ্যে আমেরিকা ও ব্রিটেনের ডেস্কে ইরানের উল্লেখিত প্রকল্পের ব্যাপারে নানা তথ্য এসে জমা হচ্ছিল। এসব দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। ড. কাদের খানের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবসা নিয়েও বিশ্বব্যাপী নানা গালগল্প ও গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অবশেষে ক্রন্দনরত ড. খান পাকিস্তানী টিভির পর্দায় আবির্ভূত হন। সেখানে তিনি স্বীকারোক্তি দেন যে, তিনি পারমাণবিক বোমার ফর্মুলা ইত্যাদি লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানকে সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।
এক পর্যায়ে ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক তথ্যাদি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত সূত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এখানে মোসাদের মেইর দাগানের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয়।
দাগান মার্কিন গোয়েন্দাদের নিত্য নতুন তথ্য দিতে শুরু করে। এর মধ্যে ছিল কোম নগরীতে ইরান কীভাবে পারমাণবিক প্রকল্প গড়ে তুলছে সে তথ্যও। ইসরাইলি গোয়েন্দারা বেশ কয়েকজন রেভ্যুলেশনারি গার্ড ও পারমাণবিক প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে স্বপক্ষে ত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছিল বলেও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। মোসাদ সংশ্লিষ্ট দেশের গোয়েন্দা ও সরকারকেও ইরানের ব্যাপারে তথ্যাদি দিয়ে অবহিত করে। ঐসব দেশকে মোসাদ সতর্ক করে যে, পারমাণবিক সামগ্রী ইত্যাদি যেন তাদের বন্দর থেকে ইরান অভিমুখে আসতে না পারে। ঐ সব জাহাজকে যেন জব্দ করা হয়।
প্রকৃতপক্ষে উল্লেখিত গোয়েন্দা তথ্য ইসরাইলের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এদিকে মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ ইরান প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধের কয়েকটি দেশকে ধ্বংসের ঘোষণা দিল। এক্ষেত্রে ইরানের পিছু নেওয়া ছাড়া ইসরাইলের আর কোন গত্যন্তর ছিল না। ইসরাইলও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে চোরাগুপ্তা যুদ্ধ ঘোষণা করল ইরানের বিরুদ্ধে। ১৬ বছর ধরে চলা তার পূর্বসূরির অসাবধানতা ও ঔদাসীন্য মোসাদের বস দাগানের জন্য খুবই বিড়ম্বনা ও কষ্টের ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মোসাদের দাগান।
২০০৬ সালে মধ্য ইরানে একটি প্লেন বিধ্বস্ত হয়। সকল যাত্রীই নিহত হন। এদের মধ্যে রেভ্যুলেশনারি গার্ডের সিনিয়র সদস্যরাও ছিলেন। আহমদ কাজামি নামের ঐ সংগঠনের একজন কমান্ডারও নিহত হন। ইরান বলে, খারাপ আবহাওয়ার কবলে পড়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু স্টার্টকর গ্রুপ আভাস দেয়, পশ্চিমা গোয়েন্দারা ঐ বিমান ধ্বংসের নেপথ্যে।
এর ঠিক এক মাস আগে ইরানের একটি সামরিক পরিবহন বিমান তেহরানের একটি বাড়ির উপর ধসে পড়ে। যাত্রী ছিল ৯৯। সকলেই নিহত হন। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন সরকার অনুগত রেভ্যুলেশনারি গার্ডের অফিসার এবং সরকারপন্থি সাংবাদিক। ২০০৬ সালের নভেম্বরে আরেকটি সামরিক বিমান তেহরানে উড্ডয়নকালে বিধ্বস্ত হয়। এতে রেভ্যুলশনারি গার্ডের ৩৬ সদস্য নিহত হয়। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ ঘটনার জন্য আমেরিকা, ব্রিটিশ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেন।
ইতিমধ্যে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মকর্তা দাগান ইরানের ক্ষেত্রে তার দেশের কর্মকৌশল নির্ধারণে প্রধানতম ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যান। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ইরানকে দমাতে সর্বাত্মক যুদ্ধই অনিবার্য। তবে তিনি সেই রণকৌশল শেষ ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন।
নাশকতা শুরু হয় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া ডাইলাম পারমাণবিক কেন্দ্রে একটা বিস্ফোরণের খবর দেয়। ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে এই বিপর্যয় বলে বলা হয়।
একটা অচিহ্নিত বিমান থেকে ঐ মিশাইল ছোঁড়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। একই মাসে বুশহারে আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাশিয়া নির্মিত একটি পারমাণবিক চুল্লীতে এখান থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হত। পরমাণু পরীক্ষা কেন্দ্র পারচীনে আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই কেন্দ্রটি ইরানীদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে সরকার বিরোধি আন্ডারগ্রাউন্ড নেতারা দাবি করেন, বিস্ফোরণে এই গোপন ল্যাবরেটরির মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
২০০৬ সালের এপ্রিলে ইরানের কেন্দ্রীয় পরমাণু কেন্দ্র উৎসবমুখর ছিল একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। বিপুল সংখ্যক বিজ্ঞানী, টেকনিশিয়ান এবং ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রসমূহের প্রধানরা ভূগর্ভস্থ ঐ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই কেন্দ্রে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ চব্বিশ ঘন্টা ধরে মন্থন করা হত। উৎসব মুখর এই অনুষ্ঠানে ইরানীরা পারমাণবিক ক্ষেত্রে আরেকটি সাফল্যের ঘোষণা দিতে যাচ্ছিল।
নতুন আরেকটি পারমাণবিক কাসকেড উদ্বোধনী লগ্নে সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। প্রধান প্রকৌশলী কাসকেড উদ্বোধনের বোতাম টিপলেন। কিন্তু ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ সংঘটিত হল। কেঁপে উঠল বিশালাকায় চেম্বার। পাইপগুলো কানে তালা লাগানো আওয়াজ তুলে খণ্ড বিখণ্ড হতে লাগল। উপসংহার হল পুরো কেন্দ্রই ধ্বংস হয়ে গেল।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান অজানা শত্রুদের কারসাজি উল্লেখ করে এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সাজার আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি বলেন, এই অজানা লোকগুলোই ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার করেছিল কোন জায়গায়। সিবিএস টিভি সেন্ট্রিফিউজ বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে জানায় যে, উদ্বোধনের পূর্বে ক্ষুদ্র মাত্রার একটি বিস্ফোরণে এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সিবিএস আরও জানায়, নানতাজ বিস্ফোরণের নেপথ্যে ছিল ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী। ইসরাইলিরা এক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দাদের সহযোগিতা দিয়েছিল।
২০০৭ সালে জানুয়ারিতে আবার ইরানী সেন্ট্রিফিউজ সফিসটিকেটেড অন্তর্ঘাতের সম্মুখীন হয়। পশ্চিমা গোয়েন্দারা ইস্টার্ন ইউরোপীয়ান কোম্পানী খোলে। এসব কোম্পানির মালামাল কিনতে শুরু করে ইরানীরা। ইরানের সেন্ট্রিফিউজে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় যা রক্তনালীর মত কাজ করে তা এই মার্কেট থেকে কেনা হয়। কেননা ইরানের উপর জাতিসংঘের অবরোধ চলার কারণে খোলাবাজার থেকে তা সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে ইরানকে মালামাল ক্রয়ে বোগাস এবং ভুয়া ইস্টার্ন ইউরোপীয় কোম্পানীর শরনাপন্ন হতে হয়। এসব কোম্পানী রুশ ও ইরানী এক্সাইলরা পরিচালনা করত আর এরা গোপনে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করত। এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের পর ইরানীরা বুঝতে পারে তারা ধোঁকায় পড়েছে। কেননা ঐ সব যন্ত্রপাতি ত্রুটিপূর্ণ এবং ব্যবহার অযোগ্য।
২০০৭ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এক গোপন নির্দেশে সই করেন। ঐ নির্দেশে তিনি সিআইএকে যেকোন মূল্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলম্বিত কিম্বা বিঘ্ন সৃষ্টির কথা বলেন। এই সিদ্ধান্তের পর পশ্চিমা গোয়েন্দারা ইরান যাতে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল না পায় সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়। আগষ্টে মোসাদের দাগান আমেরিকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিকোলাস বার্নসের সাথে সাক্ষাৎ করে ইরানের ব্যাপারে তার কর্মকৌশল তুলে ধরেন। স্যাবোটাজ, বিস্ফোরণ, অন্তর্ঘাত গত সাত বছর ধরে ইরানকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। বুশহার চুল্লীর কুলিং সিস্টেম ঠিকমত কাজ না করার বিষয়টি ছিল রহস্যাবৃত। যে কারণে প্রকল্পটি শেষ করতে দু'বছর দেরি হচ্ছিল। ২০০৮ সালের মে মাসে আরাক কেন্দ্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা প্রাপ্ত ইসকাহান পারমাণবিক কেন্দ্রটিও ভয়ংকরভবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০০৮ ও ২০১০ সালে নিউইংর্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, টিনারস নামের একটি কোম্পানী ইরান ও লিবিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংসে জড়িত। কোম্পানিটি সুইজারল্যান্ডের। এই পরিবারের সকলেই প্রকৌশলী। তারা অন্তর্ঘাতমূলক কাজে সিআইএকে সহযোগিতা করেছে এবং সিআইএ এ কাজে তাদেরকে ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। সুইস সরকার এই পরিবারের প্রতি যাতে কোন মোকদ্দমা না করে সেজন্য সিআইএ নেপথ্য থেকে কাজ করেছে। কেননা পারমাণবিক স্থাপনার জন্য অবৈধ পথে যন্ত্রপাতি সরবরাহের দায়ে ঐ কোম্পানীর বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেত। ঐ প্রকৌশলী পরিবারের পিতা ফ্রেডোরিক টিনার এবং তার দুই ছেলে উরস এবং মার্কো ইরানের নানতাজ পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল। এর ফলেই ৫০টি সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়েছিল।
টিনার পরিবার প্রেসার পাম্প কিনেছিল জার্মানির ফেইফার ভ্যাকুয়াম কোম্পানি থেকে। সর্বশেষ বিক্রি করা হয় ইরানে।
টাইম ম্যাগাজিন দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করে যে, আর্কটিক সাগরের একটি জাহাজ ছিনতাইয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদই জড়িত। ঐ জাহাজটি ফিনল্যান্ড থেকে আলজেরীয়া যাচ্ছিল। রুশ ক্রুরা জাহাজটি চালাচ্ছিল। বলা হচ্ছিল জাহাজটি কাঠ নিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রার দুদিনের মাথায় ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই জাহাজটি ছিনতায়ী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এক মাস পর রাশিয়া দাবি করে যে, ছিনতাই করা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ আবার রুশ কমান্ডোরা গ্রহণ করেছে। লন্ডন টাইম এবং ডেইলি টেলিগ্রাফ উল্লেখ করে যে, মোসাদই এই তথ্য রাশিয়াকে দিয়েছে। দাগানের লোকেরা জানিয়েছে যে, ঐ জাহাজে ইউরোনিয়াম ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার সাবেক এক সামরিক কর্মকর্তা এই ইউরোনিয়াম ইরানীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে পাইরেসির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এডমিরাল কোওটস। তিনি টাইম ম্যাগাজিনকে নিজের থেকেই জানান যে, ঐ জাহাজ মোসাদের লোকজন হাইজ্যাক করেছিল। জাহাজ ভর্তি ইউরেনিয়াম যাতে গন্তব্যে পৌঁছতে না পারে সে লক্ষ্যেই এই ছিনতাই।
ইরানের প্রতি এই অব্যাহত আক্রমণের প্রেক্ষাপটে তারাও নিশ্চুপ বসে ছিল না। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ইরান অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কোমের কাছে নতুন একটি পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরি করে। তারা এখানে তিন হাজার সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনের পরিকল্পনা করে। আর এটি ছিল ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি ইরান উপলব্ধি করে যে, আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরাইল তাদের কোম পারমাণবিক স্থাপনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
ইরান চালাকি এবং তড়িঘড়ি করে আন্তর্জাতিক কেন্দ্রকে তাদের কোম পারমানবিক কেন্দ্রের অস্তিত্ব জানান দেয়। কয়েকটি সূত্র জানায়, ইরান পশ্চিমা এক গোয়েন্দাকে সম্ভবত ব্রিটিশ এমসিক্সটিনের লোক আটক করতে সমর্থ হয়। ঐ গোয়েন্দা কোম সম্পর্কিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিল। ইরান তাদের মর্যাদা রক্ষা ও বদনাম এড়াতে কোম পারমাণবিক কেন্দ্রের অস্তিত্বের জানান দেয়।
ইরানী ঘোষণার এক মাস পর সিআইএর পরিচালক লিয়োন প্যানেটা টাইম পত্রিকাকে জানান যে, তারা তিন বছর ধরেই ইরানের কোম পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পর্কে অবহিত এবং মোসাদই তা উদঘাটনে সমর্থ হয়।
কোম পারমাণবিক কেন্দ্রের অস্তিত্ব উদঘাটনে মোসাদ, সিআইএ এবং এমসিক্সটিন যে জড়িত ছিল, তা বলাই বাহুল্য। ফরাসী সূত্র মতে, উল্লেখিত তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করত এবং ইরানের ভেতরে অভিযান চালাতো মোসাদ।
২০১০ সালের বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের সাথে মোসাদ জড়িত ছিল। এতে একটি প্লান্টের ১৮ ইরানি টেকনিশিয়ান নিহত হন। জাগরোস মাউন্টেনস নামের এই প্লান্টে শোহাব নামের মিসাইল এসেম্বেল করা হত। ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের সাথে নিয়ে মোসাদ ৫জন পরমাণু বিজ্ঞানীকে গুম বা হত্যা করে।
আমেরিকা, ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সাথে মোসাদের অতিরিক্ত সখ্যতা গড়ে ওঠার পেছনের মানুষটিরও মেইন দাগান। মোসাদের পরিচালক হয়েই তিনি বিদেশি গোয়েন্দাদের সাথে সখ্যতা বৃদ্ধির নির্দেশ দেন। দাগানের উপদেষ্টারা অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু দাগান তাদের পরামর্শে কর্ণপাত করেননি। বরং উপদেষ্টাদের তিনি বলতে গেলে শাসন এবং অধীনস্থ গোয়েন্দাদের বিদেশি গোয়েন্দাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার কঠোর নির্দেশ দেন।
ব্রিটিশ ও আমেরিকার গোয়েন্দাদের পাশাপাশি দাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্স ছিলেন ইরানের বিরোধি দলের নেতারা। দাগান তাদের সরবরাহকৃত তথ্যাদি খুবই আস্থায় নিতেন। ইরানের বাইরে ইরানের ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রেসিট্যান্সের নেতারা প্রথা বহির্ভূতভাবে প্রায়শই সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। এসব সাংবাদিক সম্মেলনে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের নাম প্রকাশ করা হত। এরকম এক বিজ্ঞানী হলেন মোহসীন ফখরী জাদেহ।
৪৯ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়র পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাকে রহস্যজনক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে থাকে ইরান সরকারের বিরোধিরা। কিন্তু রেসিট্যান্ট গ্রুপ তার ব্যাপারে বিস্তারিত ফাঁস করে দেয়। এর মধ্যে একটি তথ্য হল ১৮ বছর বয়স থেকেই ফখরী রেভিলুশনারি গার্ডের সদস্য। তার ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, বাসাসহ যাবতীয় ফোন নম্বর ফাস করা হয়। ফখরী যথার্থই একজন নামী বিজ্ঞানী। শেহাব ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে পারমাণবিক বোমা প্রতিস্থাপন, বোমার ক্ষুদ্রতম সংস্করণ উদ্ভাবনে তার টিম খুবই দক্ষ।
উল্লেখিত কারণে ফখরীকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভিসা দিতে অপারগতা জানায়। বিদেশে তার ব্যাংক একাউন্ট ফ্রোজ করা হয়। ইরান সরকার বিরোধীরা ফখরীর সঙ্গে বিজ্ঞানীদের নাম-ধাম যেমন প্রকাশ করে তেমনি তার গোপন ল্যাবরেটরীর অবস্থানও প্রকাশ করে। এর ফলে আর বুঝতে বাকী থাকে না মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় ফখরীর অবস্থান কী। আর এর একটা বিকল্প আছে। তাহল ফখরী যদি নিজ দেশ ও দল ছেড়ে পশ্চিমের কোন দেশে আশ্রয় নেন।
জেনারেল আলী রেজা আসগারী ইরানের সাবেক প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইস্তাম্বুল সফরকালে তিনি গুম হয়ে যান। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে তিনি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ইরানী গোয়েন্দারা পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে তারা খোঁজেনি। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার চার বছর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর সালেহী জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে এই বলে নালিশ করেন যে, জেনারেল আসগারীকে মোসাদ গুম করে ইসরাইলের কারাগারে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু লন্ডনের সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকার রিপোর্ট ভিন্নতর। সেখানে বলা হয়েছে স্বপক্ষ ত্যাগ করে তিনি পশ্চিমে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে স্বপক্ষ ত্যাগে মোসাদ যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে এবং তুরস্কে তার নিরাপত্তায় দায়িত্বেও ছিল মোসাদ।
অন্য একটি সূত্র মতে, জেনারেল ফখরী ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পাদি নিয়ে অনেক মূল্যবান তথ্য সিআইএকে সরবরাহ করেছেন।
জেনারেল আসগারীর অন্তর্ধানের এক মাসের মধ্যে ২০০৭ সালের মার্চে ইরানের আরেক সিনিয়র অফিসার গুম হন। আমীর সিরাজী নামের এই কর্মকর্তা রেভ্যুলেশনারি গার্ডের এলিট ফোর্স হিসেবে পরিচিত আল কুদস ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। ইরানের সীমান্ত এলাকার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ইরানী একটি সূত্র লন্ডন টাইমসকে জানায় যে, আসগারী ও সিরাজী গুম হওয়ার সময়ই মোহাম্মদ সোলতানী নামের আরেক ইরানী কর্মকর্তাকে গুম করা হয়। সোলতানী রেভিলুশনারি গার্ডের একজন কমান্ডার ছিলেন এবং তার কর্মস্থল ছিল পারস্য উপসাগরে।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে পরমাণু বিজ্ঞানী শাহরাম আমিরীও দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। আমিরী কোম পারমাণবিক কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। ইরান সৌদি আরবের কাছে আমিরীর সন্ধান চেয়ে কড়া চিঠি লেখে। কয়েক মাস পরে আমিরী আমেরিকায় উদয় হন।
আমিরী ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ফাঁস করে দেন। এজন্য তাকে ৫০ লক্ষ ডলার, নতুন পরিচয় এবং আমেরিকার আরিজোনায় একটি বাড়ি করে দেয়া হয়। সিআইএ দাবি করে আমিরী তাদেরসহ পশ্চিমাদের পুরনো এজেন্ট এবং আমিরী তাদেরকে ইরানের পরমাণু কেন্দ্র সম্পর্কে অরিজিনাল ও বাস্তবিক নথিপত্র হস্তান্তর করেছেন।
এক বছর আমেরিকার বসবাসের পর আমিরী তার মন পরিবর্তন করেন। আবার তিনি ইরানে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি আসলে আমেরিকায় অস্থিরতার মধ্যে কাটাচ্ছিলেন। বাস্তবতার সাথে তিনি নানা কারণে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলেন না। বাড়িতে একটা ভিডিও বানিয়ে তিনি তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেন।
তাতে তিনি বলেন, সিআইএ তাকে অপহরণ করেছিল। এর কিছু সময় পর তিনি আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি এতে বলেন, প্রথম ভিডিওতে প্রদত্ত তার বক্তব্য সঠিক নয়। কিছু সময়ের ব্যবধানে তিনি তিন নম্বর ভিডিওটি প্রকাশ করে বলেন তার দুই নম্বর ভিডিওর বিষয়বস্তু সঠিক নয়।
আমিরী আমেরিকায় অবস্থিত পাকিস্তানের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং সেখানে ইরানের স্বার্থ পাকিস্তানেই দেখভাল করত। তিনি তাকে ইরানে ফেরত পাঠাতে পাকিস্তানকে বলেন। পাকিস্তান তাকে সহযোগিতা করে।
২০১০ সালের জুলাই মাসে আমিরী তেহরানে ফিরে আসেন। তেহরানে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আমিরী জানান যে, সিআইএ তাকে অপহরণ করেছিল এবং তার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে। এরপর তিনি হাওয়া হয়ে যান। পর্যবেক্ষকরা সিআইয়ের ব্যর্থতার জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু সিআইএ বলে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি আমিরীর কাছ থেকে পেয়েছি আর ইরান পেয়েছে আমিরীকে। এখন আপনারাই বলুন, ইরান না আমেরিকা জিতল!
ইরানও প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরীয়া হয়ে উঠছিল। ২০০৪ সালে ডিসেম্বরে ইরান ইসরাইল ও আমেরিকার পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য ১০ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে তিনজন তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করত। ২০০৮ সালে ইরান ঘোষণা করে যে, তারা মোসাদের ঘাঁটি ধ্বংস করেছে। ইরান আরও জানায় যে, মোসাদ তিন ইরানীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। ২০০৮ সালের নভেম্বরে ইরান ৪৩ বছর বয়স্ক আশতারীকে ফাঁসি দেয়। ইসরাইলের পক্ষে তার গোয়েন্দাগিরি করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। বিচার চলাকালে আশতারী জানান, ইউরোপে তিনজন মোসাদ গুপ্তচরের সাথে তিনি বৈঠক করেছেন। মোসাদ আশতারীকে নগদ অর্থ ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী দেয়।
২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের এডিন কারাগারে সরকার আরেকজন গোয়েন্দাকে ফাঁসি দেয়। তার নাম আলী আকবর সিদাত। সিদাত মোসাদের কাছে ইরানের সামরিক সামর্থ্য এবং রেভুলুশনারি গার্ড কর্তৃক পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যাপারে বিস্তারিত পাচার করে। বিগত ৬ বছর ধরেই সিদাত ইসরাইলের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং তুরস্ক, থাইল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডে মোসাদের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন। এভাবে প্রতিটি মিটিংয়ে সিদাতকে তিন হাজার থেকে সাত হাজার ডলার দেয়া হয়। ইরান ঘোষণা দেয়, এরকম আরও গ্রেফতার করা হবে।
কিন্তু ২০১০ সালে ইরানের পরমাণু প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। এসব কেন্দ্রে যেসব স্পেয়ার পার্টস ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ছিল খুবই নিম্নমানের। মোসাদের পরিকল্পনার জেরেই ইরান মোসাদের নিম্নমানের কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে খুচরা যন্ত্রপাতি কিনেছিল। একে একে প্লেন দুর্ঘটনা, ল্যাবরেটরী পুড়ে যাওয়া, পারমাণবিক কেন্দ্রে ও ক্ষেপণাস্ত্রে বিস্ফোরণ, ইরানী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগ, সিনিয়র বিজ্ঞানীদের মৃত্যু, সংখ্যালঘুদের উত্থান এবং বিদ্রোহের পেছনে ইরান মোসাদকে দায়ী করে আসছিল। ইরানের এই ধারণা সঠিক বা বেঠিক যাই হোক, ইরান কিন্তু সন্দেহের চোখে মোসাদকেই এক নম্বরে রেখেছিল। আর মোসাদ মানেই সেই দাগান।
ইউরোপীয় গণমাধ্যম একটি ঘটনাকে দাগানের অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করে। ২০১০ সালের গ্রীষ্মকালে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের হাজার হাজার কম্পিউটার উল্টা-পাল্টা আচরণ করতে শুরু করে। এই কম্পিউটারগুলো দিয়ে পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত। স্টাক্সনেট নামক এক ভাইরাসে কম্পিউটারগুলো আক্রান্ত হয়। অথচ কম্পিউটারগুলো ছিল খুবই দামী ও অত্যাধুনিক। নাতাজের সেন্ট্রিফিউজ নিয়ন্ত্রণ করত। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। পর্যবেক্ষকরা ক্ষতির পরিমাণ দেখে মন্তব্য করলেন, এ এক ভয়াবহ সাইবার এ্যাটাক এবং আমেরিকা ও ইসরাইল এর সাথে যুক্ত।
প্রেসিডেন্ট আহমদাদিয়ানেজাদ ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখাতে চাইলেন এবং বললেন, তারা নিজেরাই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন। সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু প্রকৃত সত্য ঘটনা জানা গেল ২০১১ সালের শুরুতে। জানা গেল, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের অর্ধেক পরিমাণ সেন্ট্রিফিউজ নিশ্চল হয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের টিম ইরানের পারমাণবিক প্রয়াস পদে পদে বিঘ্ন ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মোসাদ ক্রমাগত নানা ক্ষতির চেষ্টা করে সফলও হয়েছে। এছাড়া কূটনৈতিক চাপ, জাতিসংঘ কর্তৃক অবরোধ, বোমা তৈরির সরঞ্জামাদি ইরানের জন্য দুর্লভ করে তোলা, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া, মুক্ত বিশ্বের ব্যাংকগুলোকে ইরানের সাথে ব্যবসা চালাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, ইরানের মধ্যে জাতি ও গোষ্ঠীগত বিরোধ উসকে দেয়া অন্যতম। ইরানে কুর্দী, আজেরী, বেলোশিস, আরব ও তুর্কমেন জাতিরও বাস। এরা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। এদের মাধ্যমেও ইরানের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এত আয়োজন সত্ত্বেও ইরানীদের আণবিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি। এদিকে ইসরাইলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দাগানকে আলটিমেট জেমস বন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
দাগান মোসাদের প্রধান পদে পদোন্নতি পান। এদিকে পর্যবেক্ষকরা ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ২০০৫ সালের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে। কিন্তু এই তারিখ ক্রমশ পেছাতে থাকে।
২০০৭, ২০০৯, ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারী দাগান যখন চাকুরী থেকে অবসর নেন, তখন তিনি জাতির উদ্দেশে বার্তা দিয়ে যান। আর সেই বার্তাটি হল, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প অন্তত ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা গেছে। দাগান তার উত্তরসূরীর জন্যও বার্তা রেখে যান। আর তা হল, গত আট বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করে রাখা সম্ভব হয়েছে। অনুরূপ কার্যক্রম যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখা হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুতেও তিনি অনুমোদন দিয়ে যাননি।
মোসাদের প্রধান হিসেবে দাগান সাড়ে আট বছর ছিলেন। মোসাদের পরিচালক হিসেবে এত দীর্ঘদিন কেউ দায়িত্ব পালন করেননি।
দাগানের স্থলাভিষিক্ত হন তামির পারদো। তিনিও মোসাদের একজন ভ্যাটার্ন অফিসার। তিনি ইয়োনি নেতানিয়াহুর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। ১৯৭৬ সালের ইসরাইলের এনতেতের অভিযানে তিনি ছিলেন হিরো। পরবর্তীতে নানা সফল অভিযানের মাধ্যমে তামির বিশিষ্টতা অর্জন করেন। একজন দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা, নিউ টেকনোলজির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এবং অপ্রচলিত ও দুর্গম অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তার বিশেষ সুনাম রয়েছে।
দাগান ক্ষমতা ছাড়ার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তৃতাও করেন। সেখানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোসাদ বাহিনীর সাফল্য, ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন। তিনি মোসাদের প্রতিটি সদস্যের গুণগান করেন। তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মোসাদ সদস্যরা কাজ করে থাকেন। তবে তার কার্যকালে একটি বিশেষ ব্যর্থতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। ইসরাইলী সেনা সদস্য গিলাদ শালিতকে হামাস কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সেই স্থান চিহ্নিত করতে তিনি তার ব্যর্থতার কথা বলেন। গিলাদকে পাঁচ বছর ধরে হামাস লুকিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীতে হামাস তাকে মুক্তি দেয় বটে কিন্তু তার বিনিময়ে একশত ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিতে হয় ইসরাইলকে।
উল্লেখিত ব্যর্থতা সত্ত্বেও দাগানকে শ্রেষ্ঠতম মোসাদ কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইহুদি জাতির পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানান। বক্তৃতা শেষে নেতানিয়াহু গভীর আলিঙ্গনে দাগানকে আবদ্ধ করেন। আরেকটি অনন্য সাধারণ ঘটনা হল, ইসরাইলি মন্ত্রিসভা দাগানের প্রতি সম্মান দেখাতে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লেখেন দাগানকে। সেখানে তিনি দাগানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
দাগানের জন্য প্রকৃত প্রশংসাসূচক ঘটনা ঘটেছিল অবসর নেয়ার এক বছর আগে। মিসরীয় পত্রিকা আল আহরাম-এর একটি প্রতিবেদনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। আলী আহরাম পত্রিকা বরাবরই ইসরাইল বিরোধী। ইসরাইলের জন্য তারা বরাবরই ক্ষতিকর এবং উগ্র। এই পত্রিকায় ২০১০ সালের ১৬ই জানুয়ারী সুপরিচিত সাংবাদিক আশরাফ আবু আল হাউল মোসাদ এবং দাগান নিয়ে ঐ নিবন্ধনটি লেখেন। সেখানে তিনি লেখেন, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প বহু আগেই সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। ইরানীরা ভাল করেই জানে তাদের পরমাণু বিজ্ঞানী মাসুদ আলী মোহাম্মদীর মৃত্যুর পেছনে কার হাত বিদ্যমান।
ইরানের প্রতিটি শীর্ষ নেতা ভাল করে একটি নাম জানেন যিনি সকল অঘটনের কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই নামটি হল দাগান। আবার সাধারণ লোকের কাছে মোসাদের প্রধান হিরো দাগানের নামটা তেমন পরিচিত নয়। দাগান কাজ করেন শান্ত পদক্ষেপে, নিবিষ্ট মনে এবং গণমাধ্যম থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। কিন্তু সাত বছর ধরে ইরান সরকারের কাছে ছিলেন বিভীষিকা হিসেবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর অগ্রগতি তিনি রুখে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন।
মিসরীয় পত্রিকার ওই সাংবাদিক আরও লেখেন মধ্যপ্রাচ্যে মোসাদ অনেক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনার জন্য দায়ী। বিশেষ করে সিরিয়া, হেজবুল্লাহ, হামাস এবং ইসলামিক জেহাদের বিরুদ্ধে দাগানের কৌশল ও কৃতিত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। মিসরীয় সাংবাদিক আল হাওল তার লেখার উপসংহার টানেন এভাবে, সব কৃতিত্বের মূলে দাগান। দাগানকে ইসরাইলের সুপারম্যান হিসেবে অভিহিত করা যায়।
১৯৪৮ সালে যখন মোসাদের জন্ম তখন ইসরাইলের এই সিক্রেট সার্ভিসে কোন সুপারম্যান ছিলেন না। তখন গুপ্তচরবৃত্তিতে কিছুটা অভিজ্ঞ লোকদের মোসাদে জড়ো করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই এই ত্যাগ ও চোরাগুপ্তা হামলায় পারদর্শী বর্ধনশীল এই সংস্থাকে নানা রকম সহিংসতা অর্ন্তকোন্দল, নিষ্ঠুরতা এবং হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি মোকাবেলা করতে হয়েছে।
📄 সিরিয়ার কুমারীরা
১৯৭১ সালের বিক্ষুব্ধ একটি রাত। ইসরাইলের একটি নেভী মিসাইল বোট ভূমধ্যসাগরের বিক্ষুব্ধ জলরাশি অতিক্রম করে করে সিরিয়া উপকূলের দিকে যাচ্ছে। বিশালাকায় বন্দর হাইফা ত্যাগ করেছে অপরাহ্নে। লেবানন উপকূল অতিক্রম করে সিরিয়ার জলরাশিতে ঢুকেছে জাহাজটি। বাতিবিহীন জাহাজটি আলো ঝলমল লাতাকিয়া বন্দরটি পাশ কাটিয়ে উত্তরমুখী হয়ে চলছে। অবশেষে জাহাজটি মানবশূন্য একটি বীচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে নোঙ্গর করল। এটি তুরস্কের সীমান্তের কাছেই। ফ্লোটিলা থার্টিনের নেভাল কমান্ডারের আগমন ঘটল এবং তিনি রাবারের কয়েকটি ডিঙি পানিতে নামালেন।
যখন তাদের যাত্রার সময় হল তখনই কয়েকটি কেবিনের দরজা খুলল। তিনজন মানুষ বেসামরিক পোশাকে বেরিয়ে এলেন। তাদের মুখমন্ডল ছককাটা কাপড় দিয়ে আবৃত। ওয়াটারটাইট ব্যাগে তারা রেখেছে জাল পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, গুলিভর্তি রিভলবার। কোন রকম কথা না বলেই তারা ডিঙিতে ঝাঁপ দিল এবং বীচের দিকে যাত্রা শুরু করল। এই কমান্ডোদের বলা হয়নি কেন তাদের সিরিয়া নিয়ে আসা হয়েছে। এদিকে সন্ধ্যা আগত। বরফ জমা পানিতে তারা সাঁতার কেটে বীচের দিকে যাচ্ছিল। তারা উপুড় হয়ে সাঁতার কাটছিল যতক্ষণে না একজন কাঙ্খিত লোকের আবির্ভাব না ঘটল। বাকী পথটুকু সাঁতার কেটে আগন্তুকের সাথে যোগদান করল। আগন্তুকের নাম ইয়োনাটান। কোড নাম 'প্রোসপার'। এ হল দলের নেতা। নেতা ওদের তিনজনের জন্য গরম কাপড় নিয়ে এসেছেন।
কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা তিন লোক সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাপড় পাল্টালো। কাছে থাকা একটি গাড়িতে তাদের তোলা হল। গাড়ি চালাচ্ছিল মোসাদেরই স্থানীয় এক সাহায্যকারী। গাড়ি সুন্দরভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। এক সময় গাড়িটি সিরিয়ার হাইওয়েতে ওঠে গেল। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তারা দামেস্কে গেল।
তারা দুটি হোটেলে উঠল। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাল। অতঃপর তারা সিরিয়ার রাজধানী পরিদর্শনে বেরুল। এরা প্রত্যেকেই সাবেক ফ্লোটিলা থারটিনের কম্যান্ডো। বর্তমানে মোসাদ এজেন্ট। এরা যে ধরনের অভিযানে অংশ নিত এবারেরটি তেমন নয়। অনেকটা অস্বাভাবিক। এদের মধ্যে একজনের নাম ডেভিল মোলাড।
এবারকার এই অভিযানের পরিকল্পনা করা হয় মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মোসাদের সদর দফতর তেলআবিবে। মোসাদ প্রধান জভি জমির, কায়েসায়ের প্রধান মাইক হাসরি প্রমুখ চারজন তরুণের সাথে এই বৈঠক করেন। তরুণদের বয়স ২৩-২৭। এই চারজনই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক সাথে বহু অভিযানে অংশ নিয়েছে। সকলেরই জন্ম উত্তর আফ্রিকায়। চমৎকার ফ্রেঞ্চ ও আরবী বলতে পারে। জমির তাদেরকে ব্রিফ করা শুরু করেন। দু'বছর আগে সিরিয়া থেকে একটা বার্তা আসে। মৃতপ্রায় ইহুদী সম্প্রদায় নেতাদের পাঠানো হাফেজ আল আসাদ সিরিয়ার ইহুদীদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালাচ্ছেন-এই ছিল বার্তা। ১৯৭০ সালে অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় আরোহী হাফেজের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায় আধমরা ইহুদী সম্প্রদায়।
বহু ইহুদী কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সিরিয়া ত্যাগ করেছে বটে কিন্তু কতিপয় পুচকে ও বর্ষীয়ান ইহুদীরা আটকে আছে সিরীয়ায়। তরুণ সম্প্রদায়ও সিরীয়া থেকে পালিয়েছে। ফলে রয়ে গেছে কুমারী তরুণীরা। এখন কে তাদের বিয়ে করবে- এটা একটা বিরাট সমস্যা। এই কুমারী মেয়েগুলো যদি পালিয়ে ইসরাইল যেতে পারে তবে তাদের ঘর সংসার হবে।
জামির ব্রিফিংয়ে কোসা নসট্রাকে জানালেন, কয়েকটি মেয়ে লেবানন হয়ে ইসরাইল যেতে চেষ্টা করেছিল। তারা স্মাগলারদের শরণাপন্ন হয়েছিল তাদের টাকাও দিয়েছিল। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি আবার ধরা পড়ে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কয়েকটি ইহুদী মেয়ে বৈরুতে যেতে পেরেছে বটে কিন্তু তাদেরকে সেখানে একটা সেফজোনে আটক করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় মোসাদ সহযোগীরা তাদের কিছুটা সাহায্য করে বটে। কবে তারা ইসরাইল গিয়ে পৌঁছাবে তারও নিশ্চয়তা নেই। ১৯৭০ সালের শীতের এক রাতে ১২জনের অধিক ইহুদী মেয়েকে স্থানীয় জেলেরা ইসরাইলের একটি জাহাজে তুলে দিয়েছিল। যা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত।
পরিকল্পিত এই উদ্ধার পর্বের জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন কর্ণেল আব্রাহাম। এই উদ্ধার কাজ পরিচালনার আগে কর্ণেল আব্রাহাম এবং তার লোকেরা কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মেয়েগুলোকে যে দক্ষতার সাথে জাহাজে তোলা হয়েছিল তা ছিল অভূতপূর্ব। মেয়েদের জাহাজে তুলেই খুব দ্রুতগতিতে জাহাজ চালিয়ে তিনি ইসরাইলে ফিরে যেতে সক্ষম হয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্বল্প সময়ে জাহাজ নিয়ে ইসরাইলে পৌঁছে কর্নেল আব্রাহাম এক মহিলাকে উপস্থিত দেখে অবাক হন। এই মহিলা হলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার। অকুস্থলে সামরিক বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। গোল্ডা মায়ার উদ্ধারকৃত মেয়েদের জন্য পার্টির আয়োজন করেন। সকলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের জীবন কাহিনী শুনে চমকে যান।
কর্নেল আব্রাহামের অবসরের পরবর্তী কয়েক বছরে আমনোন গোনেন পূর্বসূরীর অনুরূপ বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিকল্পনা করেন। তিনি সিরিয়ার আটকেপড়া বহু ইহুদী মেয়েকে বিভিন্ন রুটে ইসরাইলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তবে সিরীয়া লিবিয়ার সীমান্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে আরব চোরাচালান ও জেলেদের বিশ্বাস করাও কঠিন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার তার গোত্রের মেয়েদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। তিনি মোসাদ প্রধান জামিরকে নির্দেশ দিলেন, যেকোন মূল্যে সিরীয়ায় বসবাসরত ইহুদী মেয়েদের ফিরিয়ে আনার।
কোসা নস্ট্রার চারজনের সাথে মোসাদ প্রধান জমির বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বলেন, ওরা সিরিয়ার নাগরিক কিন্তু ঐ ইহুদী মেয়েদের উদ্ধারের দায়িত্ব তোমাদের। এটাই তোমাদের এসাইনমেন্ট।
জমিরের নির্দেশের পরও প্রবল বিতর্কের সূচনা হয়। কেউ কেউ প্রায় চীৎকার করেন, মোসাদ এজেন্টের জন্য এ কাজ নয়। ইহুদী এজেন্টগুলোকে বরং এই কাজে দায়িত্ব দেয়া হোক। আরেক কর্মকর্তা বেজায় ক্ষ্যাপ্পা হয়ে বলেন, মোসাদ কোন ঘটকালির সংগঠন নয়। একাজে মোসাদ গোয়েন্দারা কেন জীবনের ঝুঁকি নেবে। কেননা আরবরা নিষ্ঠুর জাতি। তাদের মোকাবেলা করা খুবই কঠিন কাজ। কয়েকটি ইহুদী কুমারী মেয়ের পাত্রের অভাবে বিয়ে হচ্ছে না বলে এত বড় ঝুঁকি মোসাদ নিতে পারে না।
মোসাদ প্রধান এতসব বিতণ্ডার পরও ভড়কে গেলেন না। তিনি বললেন, শত্রু দেশে আটক ইহুদী সম্প্রদায়কে রক্ষা এবং তাদের উদ্ধার মোসাদের কার্যতালিকায় রয়েছে। মোসাদের জন্মলগ্ন থেকেই তারা এ ধরনের কাজ করে আসছে।
মোসানসষ্ট্রা সিরিয়ার ভূখণ্ডে পা দেয়ার দ্বিতীয় দিন থেকেই চাঙ্গা। তারা দামেস্কের রাস্তায় গড়গড়িয়ে চলছে, ফ্রেন্স ভাষায় গল্পগাথা করছে। তবে তারা তাদের আশপাশে খেয়াল রাখছে। কেউ তাদের ফলো করছে কীনা সে ব্যাপারেও তারা সতর্ক। বিশেষ করে সিরীয়ার দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা বিভাগ মুখাভারা তাদের পিছু নিয়েছে কীনা তা লক্ষ্য করছে। এরই মধ্যে মোসাদ এজেন্টরা একটা আলো ঝলমল মার্কেটের সোনার দোকানে যায়। তারা দোকানে গিয়ে ফ্রেঞ্চ ভাষায়ই সোনা নিয়ে আলোচনা করছিল। এমন সময় দোকানের মালিক তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হিব্রু ভাষায় বলেন, তোমরা তো আমাদেরই লোক। কথাটা সত্যি কীনা।
এজেন্টরা সোনার দোকানের মালিকের কথায় হকচকিয়ে যায়। তাদের আশংকা হয়, যদি তাদের সাজসজ্জা কথাবার্তায় ছদ্মবেশ ভাবটা ফুটেই না ওঠে, তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত। দোকানির কথায় কান না দিয়ে তারা দ্রুত সটকে পড়ে।
ইহুদী সম্প্রদায়ের কুমারী মেয়েদের কানে একথা চলে যায় যে তাদের উদ্ধারে চেষ্টা চলছে। উদ্ধারকৃত একটি কুমারী মেয়ে পরবর্তীতে জানায় যে, তাদের বিয়ের জন্য খুব চাপ দেয়া হত। কিন্তু তারা কাকে বিয়ে করবে? কোন পাত্রই তো নেই। তার ভাষায়, আমরা বহু গুজব-গুঞ্জন শুনে আসছিলাম। কীভাবে আমাদের ইসরাইল নেয়া হবে। আমরা ইহুদীদের ভূমিতেই চলে যেতে চাই।
ইহুদী মেয়েদের উদ্ধারে ব্যাপৃত দলটির নাম প্রোসপার। গোপনে তাদের হাতে একটি বার্তা পৌছে দেয়া হল। এতে বলা হয়, তোমাদের হোটেলের কাছাকাছি একটা জায়গায় ছোট্ট একটি ট্রাকে বিকেলের দিকে ইহুদী মেয়েরা থাকবে।
পরের দিন অপরাহ্নে কোসানস্ট্রা সেই ছোট্ট ট্রাকটি খুঁজে পায়। একটি অন্ধকার রাস্তায় ছাদটা ক্যানভাসে ঢাকা অবস্থায় মেয়েরা অবস্থান নেয়। মোসাদ এজেন্টরা এর আগেই হোটেল ছেড়ে দিয়ে মালামাল সাথে নিয়ে নেয়। গোয়েন্দারা দু'জন বসে গাড়ির সামনে। দু'জন বসে মেয়েদের সঙ্গে। গাড়িতে বেশ কয়েকটি মেয়ে। বয়স ১৫ থেকে কুড়ির মধ্যে। সঙ্গে একটি ছোট্ট বালকও ছিল। মোসাদ এজেন্টরা আবার তাদের নির্ধারিত পোশাক পরিধান করে। তারা জানত, সিরিয়ার হাইওয়েতে সেনাবাহিনী কিম্বা পুলিশের মুখোমুখি হতে পারে তারা। তখন তারা কী বলবে। সিদ্ধান্ত হয়, তারা বলবে মেয়েদেরকে তারা হাইস্কুলের ফিল্ড ট্রিপে নিয়ে যাচ্ছে।
মোসাদের স্থানীয় সহযোগী যে ট্রাকটি নিয়ে এসেছে সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থান থেকে আরও কয়েকটি মেয়েকে গাড়িতে তোলে এবং উত্তর দিকে গাড়ি চালাতে থাকে। তারা জনমানবশূন্য একটি বীচে চলে আসে। বীচ থেকে কিছু দূরে আইডিএসের একটা মিসাইল বোট অপেক্ষমাণ ছিল। মোসাদ এজেন্টরা ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে বোটটিকে ইংগিত করে। রেডিওয়েতেও তাদের বার্তা পাঠান হয়।
হঠাৎ করেই চারদিক থেকে গোলাগুলির শব্দ হতে থাকে। মোসাদ সদস্যরা প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারে গোলাগুলির লক্ষ্যবস্তু তারা নয়। এখন প্রশ্ন হল, কারা গোলাগুলি করছে? সিরিয়ার পুলিশ কী ইসরাইলের ফ্লোটিলার ডিঙ্গিগুলোকে দেখতে পেয়েছে? ন্যাভাল কমান্ডোর চীফ গাদী ক্রল ইসরাইলকে রেডিও মারফত জানান।
তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। তিনি ফ্লোটিলা ডিঙ্গিতে কল করে উত্তরের দিকে যেতে বললেন। এই বিকল্প বীচটি আগে থেকেই ভেবে রাখা হয়েছিল।
একই সাথে মোসাদের গোয়েন্দারা মেয়েদেরকে ট্রাকে তুলে ফেলল এবং উত্তরাভিমুখে রওয়ানা দিল। আবার যোগাযোগ করল নেভী বোটের সাথে। এই বীচটা ছিল শান্ত। কুমারী মেয়েরা এবং মোসাদের লোকজন ডিঙ্গিতে লাফ দিয়ে উঠল এবং গভীর সাগরের দিকে যেতে থাকল। দীর্ঘ সময় ধরে তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সাগর অতিক্রম করে সকলেই নেভী বোটে উঠতে সক্ষম হল। নেভী বোটটি অতঃপর ইসরাইলের পথে যাত্রা শুরু করল। মোসাদ এজেন্টরা একটা কক্ষে অন্তইত হল, মেয়েদের রাখা হল অন্যত্র। একই সাথে মেয়েদের নির্দেশ দেয়া হল সিরিয়া থেকে ফেরার ব্যাপারে যেন কারো মুখ খোলা না হয়। মেয়েগুলো সিরীয়ার দামেস্কে তাদের পরিবার-পরিজন ফেলে রেখে এসেছে। তারা ইসরাইল যাচ্ছে এই খবর জানাজানি হলে মেয়েদের বাবা মায়ের কপালে অনেক ভোগান্তি রয়েছে। এমনকী প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে। স্থানীয় এজেন্টরা ট্রাক নিয়ে ফিরে গেল দামেস্কে তাদের পরবর্তী অভিযানের লক্ষ্যে।
ইসরাইলের মিসাইল বোট কোন অঘটন ছাড়াই হাইফায় এসে পৌঁছল। মোসাদের লোকজনকে অন্য কাজ দেয়ার আগে মোসাদের যা বোঝা দরকার তা হল ঐ দিন বীচে গোলাগুলি কারা করেছিল পালানোর সময়। ইসরাইলের গোয়েন্দা দফতর গোলাগুলির কারণ তদন্তে সিরিয়ার গোয়েন্দা রিপোর্ট, সেনাবাহিনীর তথ্যাদি যাচাই করে কিছুই পেল না। অতপর মোসাদের অভিমত হল, এটা হতে পারে অপরিকল্পিতভাবে ওঁতপেতে থাকা রক্ষীদের গুলি অথবা পানিতে সন্দেহজনক কোন কিছুর তৎপতা দেখে নার্ভাস হয়ে সিরিয়ার সেনাদের গুলি।
পরের বার মোসাদের লোকজন প্যারিস থেকে দামেস্কে আসে প্লেনে করে। এবার তারা নিজেদের প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। উদ্দেশ্য সিরিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখা। তারা তাদের ভ্রমণ যথার্থ করে তুলতে নানারকম ভুয়া কাগজপত্র সঙ্গে রাখে। কেননা সিরিয়ার মুখাভারতা নামের গোয়েন্দা সংস্থাকে ভয় পাওয়ার মতই। ফলে মোসাদ গোয়েন্দারা ব্যাপকভাবে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে। যদিও প্রথম রাতে তারা খুব টেনশনের মধ্যে কাটায়। কেননা ধরা পড়ে গেলেই প্রাণবধ। তারা তাদের সাহায্যকারীদের একটি স্কোয়ারে নিয়ে যেতে বলে। কয়েক বছর আগে এখানেই শিরচ্ছেদ করা হয় ইসরাইলের সর্বোচ্চ খ্যাতিমান গোয়েন্দা এলিয়ে কোহেনকে। তার মৃত্যুদণ্ড যখন কার্যকর করা হয় কিছু লোক তা দেখে উল্লাস প্রকাশ করেছিল। মোসাদের চার সদস্যের অন্যতম ক্লাউডিয়ে স্কোয়ায়ের কথা ভাবতে গিয়ে ঘুমোতে পারছিল না। মোসাদ বাহিনী ইহুদী মেয়েদের আরেকটি চালান পার করার জন্য এবারও এসেছে। কিন্তু এবারে মেয়েদের নিয়ে যেতে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াল প্রচুর সংখ্যাক নিরাপত্তা রক্ষীর উপস্থিতি। মোসাদ অতঃপর ওখান থেকে মেয়েদের নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করল। মোসাদ জায়গা বদল করল।
মোসাদ মেয়েদেরকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে নিয়ে যেতে বলল। দূরত্ব একশত কিলোমিটার। লেবানন সীমান্ত অতিক্রম করার পর মোসাদ মেয়েদেরকে একটি বীচে নিয়ে যেতে বলল। সমস্যা হল এই এলাকাটি খ্রীষ্টান অধ্যুষিত। সময় নষ্ট না করে মোসাদ একটি ছোটখাট প্রমোদতরী ভাড়া করে ফেলল। মালিককে বলা হল এক বন্ধুকে তার জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য এটি ভাড়া করা হয়েছে। এবং তারা পনের জনের মত নারী-পুরুষ প্রমোদ ভ্রমণে যাবে। বোটের ভাড়া নেয়া চূড়ান্ত হলে মোসাদ তাদের সুপেরিয়ারকে বিষয়টি অবহিত করল। একই চ্যানেলে মোসাদও বার্তার প্রত্যুত্তর পেল।
ইয়াং তরুণীদের মালামালসহ দামেস্কে থেকে ঐ রাতেই ট্রাকটি চলে এল। ক্লডিয়ে গাড়ীটি চালাচ্ছিল। লেবানন সীমান্তে ট্রাকটি থামানো হল এবং ঐসব মালামাল নামানো হল। ক্লডিয়ে তাদের কাগজপত্র দেখিয়ে ট্রাকটি পার করে নিল। ক্লডিয়ে লেবানন সীমান্তে অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে মোসাদের অন্য সদস্যরা মেয়েদের কয়েকঘন্টা অন্ধকারে হাঁটিয়ে তবে লেবানন সীমান্ত অতিক্রমে সমর্থ হল। মেয়েদের সাথে ছিল ভারী ভারী স্যুটকেস। এক পর্যায়ে সকলেই সীমান্ত হয়ে ক্লডিয়ের ট্রাকে উঠতে সমর্থ হল। মেয়েদের তোলা হল সেই প্রমোদতরীতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রমোদতরীটি গভীর সমুদ্রের দিকে যাত্রা করল। সেখানে একটি নেভী বোটে মেয়েদেরকে তুলে দেয়া হল।
মোসাদ বাহিনী সে রাতটা বৈরুতেই কাটালো। রাতে যে পথে তারা বৈরুতে এসেছিল সেই পথেই দামেস্কে রওয়ানা হয়ে গেল। মোসাদের চার গোয়েন্দার মধ্যে শুধুমাত্র ক্লাডিয়েটেরই বৈধ কাগজপত্র ছিল। সে বৈধ পথেই ফিরে গেল।
বাকী তিন গোয়েন্দা মেয়েদের নিয়ে যে পথে এসেছিল সেই পথেই সিরিয়ায় ঢুকে গেল।
পরের দিন তারা প্যারিস ফিরে গেল।
১৯৭৩ সালের এপ্রিলে সিরিয়ার কুমারী ইহুদী মেয়েদের ইসরাইলে আনার প্রক্রিয়া শেষ হয়। অভিযানের সমাপ্তি টানতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামেয়ার হাইফার নৌঘাটিতে এসেছিলেন। গোল্ডা মোসাদের ক্লাডিয়েসহ তার বন্ধুদের ধন্যবাদ দিতেই হাইফা এসেছিলেন। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোসাদ এবং নৌবাহিনী সিরিয়া থেকে কুমারী ইহুদী মেয়েদের আনতে ২০টির মত অভিযান পরিচালনা করেছে। সবগুলো অভিযানই সফল হয়। প্রায় ১২০ জন তরুণকেও ইসরাইলে ফেরত আনা হয়। এই সকল অভিযানের কথা ৩০ বছর গোপন রাখা হয়।
সময় গড়াতে থাকে। ক্লাডিয়ে তার এক আত্মীয়ের বিয়েতে দাওয়াত খেতে যান। বিয়েতে কনের সাথে পরিচয় করানো মাত্র ক্লাডিয়ে তাকে চিনতে পারেন। মোসাদের টিমের কারণে সিরীয় থেকে যেসব ইহুদী মেয়ে ইসরাইলে আসতে পেরেছিল এই মেয়েটি তারই একজন। ক্লাডিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কোত্থেকে এসেছ।
কনের মুখটা বিমর্ষ হয়ে গেল। ক্লাডিয়ে হেসে কনেকে জিজ্ঞেস করল তুমি কী সিরীয় থেকে আসনি? সমুদ্র পথে?
কনের প্রায় বেহুশ হওয়ার অবস্থা। হঠাৎ করেই কনে ক্লাডিয়ের হাতটা টেনে তাতে উষ্ণ চুমু খেতে লাগল। মেয়েটি বলল, তুমি সেই লোক। তুমিই আমাকে সেই নরক থেকে মুক্ত করে এনেছ।
ক্লাডিয়ে পরে বলেছিল, আমরা জীবনের যে ঝুঁকি নিয়েছিলাম আজ তা সার্থক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
📄 ক্যামেরা চলছে...
২০১০ সালের জানুয়ারির প্রথমার্ধে দুটি কালো অডিমিক্স গাড়ি পার্বত্যঞ্চলের উত্তর তেলআবিবের দেয়াল ঘেরা একটি ভবনে এসে উপস্থিত। এই ভবনটির নাম কলেজ। আসলে এটি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার সদর দফতর। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকে এই ভবনে স্বাগত জানান হল। তাকে স্বাগত জানালেন মোসাদ প্রধান মেয়ার দাগান। এই ঘটনার কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী দাগানের এক্সটেনশন এক বছর বাড়িয়েছেন।
সাম্প্রতিক কিছু সফল অভিযানের পর দাগান এবং মোসাদ বেশ আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে। সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী ধ্বংসও কম সাফল্য নয়। মুগানিয়া ও সুলাইমানকে হত্যা তো বিরাট একটি ঘটনা। মোসাদের সামনে তখন বড় কাজ হল ইরানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হল একটি নাম। তার নাম আল মাবুহ। সাংবাদিক বার্গম্যানের মতে আল মাবুহকে আটক করতে মোসাদ অভিযানের নাম দেয় প্লাজমা স্ক্রীন।
মিটিং রুমে মোসাদ প্রধান দাগান ও সিনিয়র কর্মকর্তারা আল মাবুহকে হত্যায় তাদের পরিকল্পনা পেশ করেন। মাহমুদ রউফ আল মাবুহ হামাসের একজন নেতা এবং ইরান থেকে সিনাই প্রণালী হয়ে গাজায় চোরাচালান অস্ত্র প্রেরণের কারসাজি ও নিয়ন্ত্রণ আল মাবুহের হাতে। মোসাদের লোকজন জানান, আল মাবুহকে দুবাইয়ে হত্যা করা সম্ভব।
ইসরাইল প্রধানমন্ত্রী আল মাবুহের হত্যা পরিকল্পনার অনুমোদন দেন। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। দুবাইয়ের একটি হোটেলে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়।
লন্ডন টাইমস জানায়, হোটেল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে মোসাদ আল মাবুহকে কী ভাবে হত্যা করা হবে তার একটি মহড়া দেয়। আল মাবুহের জন্ম ১৯৬০ সালে উত্তর গাজার জাগানিয়া শরনার্থী ক্যাম্পে। সত্তর দশকের শেষার্ধে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগদান করেন এবং একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে যেসব আরব ক্যাফেতে জুয়াখেলা হত সেগুলো ধ্বংস করেন। ১৯৮৬ সালে একে ফোরটি সেভেন অ্যাসাল্ট রাইফেলসহ ইসরাইলি সেনার হাতে ধরা পড়েন এবং কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে ইজ আদদীন আল কাসেম ব্রিগেডে যোগদান করেন। এটি হামাসের সামরিক শাখা। আল মাবুহের কমান্ডার সালাহ শেহাদেহ আল মাবুহসহ হামাসের সন্ত্রাসীদের এক বিশেষ নির্দেশে যেখানেই পাওয়া যাবে ইসরাইলি সেনাদের হত্যা করতে হবে বলে নির্দেশ দেন।
১৯৮৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আল মাবুহে তার আরেক সঙ্গী নিয়ে একটি গাড়ি চুরি করেন। অতঃপর ঐ গাড়িতে তারা গোড়া ইহুদীর পোশাক পরে অভি সাসপোরটাস নামের এক ইসরাইলি সেনাকে লিফট নিতে প্রলুব্ধ করেন। অভি গাড়িতে ওঠা মাত্র আল মাবুহে পেছনে ফিরেই ইসরাইলি সেনাকে গুলি করে হত্যা করেন। ঐ সেনাকে আল মাবুহে নিজেই সঙ্গীসহ কবর দেন। অভিকে হত্যার তিন মাস পর আল মাবুহে এবং আরও কয়েকজন হামাস সদস্য আরেক ইসরাইলি সৈন্য ইনাম সাধোনকে অপহরণ ও হত্যা করেন।
পরবর্তীতে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল মাবুহে দুই ইসরাইলি সেনা হত্যা ও তাদেরকে কবর দেয়ার সঙ্গে তার সংযুক্তির বিষয়টি প্রকাশ করেন।
ইসরাইলের দ্বিতীয় সেনাকে হত্যার পর আল মুবেহ মিশরে সটকে পড়েন। পরে যান জর্ডানে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বজায় রাখেন। গাজায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান তার প্রধান কাজ হয়ে দাড়ায়। কায়রো ফিরে এলে মিশর কর্তৃপক্ষ তাকে জেলে ঢোকায় এবং ২০০৩ সালের প্রায় পুরোটাই তিনি সে দেশের জেলে ছিলেন। পরে সিরিয়ায় পালিয়ে যান।
বর্তমানে তাকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বলে গন্য করা হয় এবং ইসরাইল, মিশর, জর্ডানের পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। যদিও তার বসরা তাকে একজন বড় ধরনের সংগঠক হিসেবে গন্য করে। কেননা ইরান থেকে গাজায় অস্ত্র সরবরাহের কলাকৌশলে তার জুড়ি মেলা ভার।
আল মাবুহের স্থির বিশ্বাস ছিল যে, মোসাদ তাকে ব্যাপকভাবে খুঁজছে এবং দুই সেনাকে হত্যার ঘটনা ইসরাইল কিছুতেই মেনে নেয়নি। ভুলে যাওয়া কিম্বা ক্ষমা করে দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফরকালে আল মাবুহে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন ভূয়া পরিচয় দিতেন। ব্যবসায়ীর বেশ ও পরিচয়ে তিনি সফর করতেন। এক বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, হোটেলে অবস্থানকালে আরাম চেয়ারে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দরজায় স্থাপন করতেন যাতে কেউ দরজা খুলতে না পারে।
আল জাজিরায় আল মাবুহে যে সাক্ষাৎকার দেন সেখানে তার মুখমন্ডল ও মাথা ঢাকা ছিল। এখানে তিনি তার প্রতি হামলার বিবরণ দিয়ে বলেন, প্রতিপক্ষ তার ওপর তিন তিনবার হামলা চালিয়েছে। তারা প্রায় সফলই হতে যাচ্ছিল। এবং বিভিন্ন দেশে এই হামলা হয়। মুগানিয়াকে হত্যার অব্যবহিত পরে তার উপর হামলার চেষ্টা করা হয়। মাবুহে বলেন, যারা ইসরাইলের বিরোধিতা করে তাদের ভাগ্যে এমনটা ঘটেই চলবে।
মাবুহে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আল জাজিরার ঐ সাক্ষাৎকারটি দেন। তার মনে হয়েছিল, সাক্ষাৎকার দেয়া মানে অনর্থক ঝামেলা বাড়ানো। কিন্তু হামাস নেতৃত্বের স্পষ্ট নির্দেশে তাকে সাক্ষাৎকারটি দিতে হয়। পরবর্তীতে অনেকে বলেছেন এই সাক্ষাৎকার মোসাদের জন্য তাকে খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিল। মাবুহে ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি হয়েছিলেন একটি শর্ত দিয়ে। আর তা হল তার মুখমন্ডল সম্পূর্ণ ঢাকা থাকবে।
সাক্ষাৎকার শেষে ঐ ভিডিও পরীক্ষার জন্য গাজায় পাঠানো হয়। কিন্তু দেখা গেল তিনি যে মুখ ঢাকতে চেয়েছিলেন তা ব্যর্থ হচ্ছে এবং তাকে আবার সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হল। নতুন যে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হল তা প্রচার হল না। (এটি মাবুহের মৃত্যুর পড় প্রচারিত হবে)। মাবুহে তার প্রথম ভিডিওতে কী সামস্যা ছিল জানতে চাইলেন। তাকে জানানো হল, ঐ ভিডিওটি হামাসের আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অনেকের মতে, এই টেপ হাতছাড়া হয়ে গেলে তাকে যারা অনুসন্ধানে ব্যস্ত তারা লাভবান হবে। এই রেকর্ডিংয়ের এক সপ্তাহ পরে হামাসের এক সিনিয়র সদস্য আরবদেশ থেকে ফোন পান। ফোন কলে বলা হয় অস্ত্র চোরাচালন ও মানিলন্ডারিংয়ের কাজে দক্ষ একটি গ্রুপ তাদের সাথে যোগাযোগে আগ্রহী।
অস্ত্র পেতে মরিয়া ঐ হামাস নেতার পক্ষে ঐ প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানানো অসম্ভব ব্যাপার। আলো ঝলমলে দুবাইয়ে আল মাবুহে ইরানীদের সাথে নানা বিষয়ে প্রায়শই বৈঠক করে থাকেন। তবে এই ফোন কলটি যে আল মাবুহের মৃত্যু পরোয়ানা তা বোঝা গেল কিছুদিনের মধ্যেই।
আল মাবুহকে নিয়ে পুরো দৃশ্যাবলী ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও কাজে লাগানো হয়েছিল।
২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারী ২৭ জন মোসাদ এজেন্ট দুবাই আসে। ১২জন আসে ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে, ৪জন করে ফ্রেন্স ও অস্ট্রেলিয়ার এবং ৬জন আইরিশ। তারা দুবাইয়ের বিভিন্ন হোটেলে ওঠে।
পরের দিন বেলা ১২টার দিকে ৪৩ বছর বয়স্ক মোসাদ এজেন্ট মিশেল বোডেন হেইমার জার্মান পাসপোর্ট নিয়ে এবং তার বন্ধু জেমস লিওনার্দ ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে দুবাইতে আসে। স্থানীয় পুলিশের মতে, আল মাবুহকে হত্যার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্তদের মধ্যে এরা আগাম টিমের সদস্য।
এর এক ঘন্টা পরে ঐ দিন গেইল আসে এবং বেশী তারাকাবহুল হোটেলে হুমেরিয়ার এগার তলায় রুম নেয়। রিসিপশনে তাকে তার স্থায়ী ঠিকানা বলতে বলেছিল। মেয়েটি গড়গড় করে যে ঠিকানাটা বলে সেরকম কোন ঠিকানার অস্তিত্বই নেই।
বেলা দেড়টায় আসে কেভিন ড্যানেডরন। সে হল কমান্ডার। এসেই সে তার ডেপুটির সাথে যোগদান করে এবং হুমেরিয়ার হোটেলে ওঠে। এভাবে পৃথকভাবে আরও কয়েকজন মোসাদ এজেন্ট দুবাই চলে আসে।
সকাল সোয়া দশটায় মুবেহ দুবাইর উদ্দেশ্যে দামেস্ক ত্যাগ করে। তিনি সরাসরি এমিরেটসে চলে আসেন। দুবাইয়ে তার কাজ হল ইরানী দূতের সঙ্গে বৈঠক। অস্ত্রের আরেকটি চালান গাজা পাঠানোর লক্ষ্যেই এই বৈঠক। ঐদিন সকাল সাড়ে ১০টায় অভিযানের সমন্বয়কারী পিটার হোটেল ত্যাগ করে এবং একটি বিশাল শপিং সেন্টারে হিট টিমের সাথে দেখা করে। এদিকে মোসাদের গোয়েন্দাদের কেউ গোফ কেটে, কেউ নকল গোফ লাগিয়ে, কেউ সানগ্লাস পরে, কেউ খুলে কেউ উইগ পরে প্রস্তুতি নিতে থাকে।
বিকাল সোয়া তিনটায় আল মাবুহে দুবাই পৌছান। তার সাথে ছিল ইরাকী জাল পাসপোর্ট এবং তিনি নিজেকে টেক্সটাইল আমদানিকারক হিসেবে পরিচয় দেন। ৩টা ২৮ মিনিটে আল মাবুহ আল বাস্টন রোটনা হোটেলে ওঠেন। রিসিপশনে তিনি বদ্ধ জানালা ও বারান্দাবিহীন একটি রুম চান। তিন তলায় তাকে ২৩০ নম্বর রুম দেয়া হয়। লিফটে করে মাবুহ তার রুমে যাচ্ছিলেন সেই লিফটে টেনিস খেলোয়াড়ের পোশাক পরা দু'জন মোসাদ সদস্যও ছিল।
বেলা সাড়ে তিনটায় সোর্স বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জানায় যে, আল মাবুহে যে রুমে ঢুকেছেন তার বিপরীত দিকের রুমটা হল ২৩৭ নম্বর। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ঐ হোটেলে আসেন পিটার যিনি অভিযানের সমন্বয়কারী।
পিটার ২৩৭ নম্বর রুমটি ভাড়া নেয়। মোসাদের প্রথম গ্রুপটি বিদায় নিলে দ্বিতীয় দল আসে এবং আল মাবুহ কখন বাইরে বেরুল তা লক্ষ্য করতে থাকে। এখন হিট টিমের সকল সদস্যই আল বাস্তান রোটানা হোটেলে।
আল মাবুহে তার কক্ষ ত্যাগ করেন এবং লবি পরীক্ষা করে ধারণা পান যে, জায়গাটা কোন ঝুঁকি নেই। অতঃপর তিনি হোটেল ত্যাগ করলে ওয়াচাররা তার পিছু নেয়। যে গাড়িতে চড়ে আল মাবুহ শহরের বাইরে যাচ্ছিলেন সে গাড়ি সম্পর্কে ওয়াচাররা কমান্ডারকে অবহিত করে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সমন্বয়ক পিটার লবীতে প্রবেশ করে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত জিনিসপত্র কেভিনকে দেয়।
পিটার অতঃপর ২৩৭ নম্বর রুমের চাবি সংগ্রহ করে এবং চাবি কেভিনকে দেয়। অতঃপর সে অজানা স্থানে চলে যায়। কেভিন ২৩৭ নম্বর রুমে ঢুকে সবকিছু পরীক্ষা শেষে অপেক্ষায় থাকে কখন আল মাবুহে তার রুমে ঢুকবেন।
এদিকে মুখোশ পরে কিম্বা উইগ লাগিয়ে বেশ কয়েকজন ওয়াচার হোটেলে ঢুকে পড়ে। গেইল নামের তরুণী হোটেলে পার্কিংয়ে গিয়ে হিট টিমের লোকদের হাতে কেভিনকে দেয়া পিটারের কেসটি দিয়ে আসে।
অপরাহ্ন সাড়ে ৬টায়, মোসাদ সদস্য সোর্স ওয়াটার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী লবি, কারিডোরসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। রাত ৮টা ২০ মিনিট, আল মাবুহে হোটেলে ফিরে আসেন। ২৩০ নম্বর রুমে আল মাবুহকে হত্যা করা হয়। চার আততায়ী হোটেল ত্যাগ করে।
তরুণী গেইল এবং আরেক হিট মেম্বারও হোটেল ত্যাগ করে। কেভিন ও গেইল ডাইরেক্ট ফ্লাইটে প্যারিসে চলে যায়। ইত্যবসরে সকল টিম মেম্বার বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যায়। রাত ৮টা ৫১ মিনিটে আল মাবুহকে হত্যার পরে কেভিন একবার ঐ রুমে ঢুকেছিল। বেরিয়ে সে 'ডু নট ডিস্টার্ব' লেখা সাইনটি দরজার হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে রেখে যায়।
রাত দশটা থেকে আল মাবুহের ফোনে একটার পর ফোন আসতে লাগল তার স্ত্রীর। তার এক ঘনিষ্ঠ ফোন করে আল মুবহেকে পেলেন না। টেক্সট ম্যাসেজ- কোন কিছুতেই সাড়া নেই। আল মাবুহের উদ্বিগ্ন স্ত্রী হামাসের বেশ কয়েকজনকে বিষয়টি জানালে তারা হামাসের আবাসিক প্রতিনিধিকে সেখানে পাঠালেন। ভদ্রলোক ঐ হোটেলে গিয়ে ২৩০ নম্বর রুমে ফোন করেও কোন সদুত্তর পেলেন না। অতঃপর মধ্য রাতের পর হোটেল কর্তৃপক্ষ আল মাবুহের রুমে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় পান। এক ডাক্তার দেখে বললেন, হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই মৃত্যু।
হামাস অফিসিয়ালি এক বার্তায় বলে যে আল মাবুহের মৃত্যু মেডিকেল রিজনে হয়েছে। কিন্তু আল মাবুহের স্ত্রী মোটেই একথা মানতে রাজি নন। তিনি বলে চলেছেন, এটি হত্যাকাণ্ড। এবং মোসাদই খুনী। মৃতের রক্তের অংশবিশেষ ফ্রান্সের লেবরেটরীতে পাঠানো হল। ৯দিন পর সেই রিপোর্ট এল। অতঃপর হামাস বলল, মোসাদই আল মাবুহকে হত্যা করেছে। মোসাদের ভাষ্য প্রথমে তাকে কোন ধাতব পদার্থ দিয়ে আঘাত করে শেষে বালিশ চেপে দিয়ে হত্যা করেছে।
দুবাই পুলিশ জানায়, মৃতের শরীরে কোন বিষ পাওয়া যায়নি। দুবাই পুলিশ উপসংহারে জানায়, মোসাদ তাদের ভূখণ্ডে আল মাবুহেকে হত্যা করেছে। আল মাবুহকে হত্যার ১১দিন পর ৩১ জানুয়ারি লন্ডনের সানডে টাইমস এক প্রতিবেদনে বলে যে, মোসাদ বিষক্রিয়ার মাধ্যমে আল মাবুহেকে হত্যা করেছে। ঐ রিপোর্টার লেখেন যে, ইসরাইলের ঘাতকরা আল মাবুহের কক্ষে ঢুকে ইনজেকশনের মাধ্যমে তার শরীরে বিষ ঢুকিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। মোসাদ এজেন্ট অতঃপর রুমের সব জিনিসের ছবি তুলেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারী দুবাই পুলিশের উপপ্রধান সাংবাদিকদের ফরাসী ল্যাবের আরও কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সের ল্যাব আল মাবুহের রক্তে উচ্চমানের হাইপ্রোক্লোরাইড ব্যথানাশকের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সার্জারীর আগে এই ধরনের এ্যানেসথেসিয়া রোগীকে প্রয়োগ করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, এর ফলে পেশী ব্যাপকভাবে শিথিল ও রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। আরও জানায়, হত্যাকারীরা ভিকটিমকে এ্যানেসথেসিয়ার ঔষধ প্রয়োগ করেছে পরে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছে। আর এই ধরনের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই গন্য হয়।
সাংবাদিক গর্ডন থোমাস মোসাদকে গালি দিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন। শিরোনাম ছিল 'মোসাদ লাইসেন্স টু কিল'। থমাস উল্লেখ করে যে, মোসাদ কর্তৃক অতীতের সবগুলো হত্যাকাণ্ড একই প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, হিট টিমের ১১ জনের মধ্যে ৬জন ছিল মহিলা।
হারেটন ডেইলিতে ইয়োসি মেলম্যান তার প্রতিবেদনে লেখেন নিরাপত্তা ক্যামেরাসহ অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্পষ্ট এটা মোসাদের কাজ। তারা বরাবর যেভাবে বিভিন্ন ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে অকুস্থলে এসে জড়ো হয় এবারও তাই করেছে। অতীতের মত তারা বিভিন্ন হোটেলে থাকতে শুরু করে এবং ইন্টারন্যাশনাল অপারেটরের মাধ্যমে ফোন ব্যবহার করে। তারা জেনুইন ব্যবসায়ীর বেশ ধরে কিম্বা পর্যটকের।
পক্ষান্তরে আরও কিছু অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কাজ পশ্চিমা গোয়েন্দাদের। পশ্চিমারা এভাবেই খতম করে। ফলে একথা নির্ধিধায় বলা যাবে না কারা খুনী। এদিকে জার্মান সাপ্তাহিকী লিখেছে, জার্মান গোয়েন্দারা সংসদকে জানিয়েছে মোসাদই আল মাবুহের হত্যাকারী।
আল আরারিয়া সংবাদপত্রে এক সাক্ষাৎকারে দুবাই পুলিশ ঢালী তামিম জানান, মোসাদই হত্যাকারী। তিনি ডিএনএ টেস্ট, হাতের ছাপ, জাল পাসপোর্ট বহন এবং পরবর্তীতে উৎঘাটিত সকলেই ইসরাইলের বাসিন্দা বলে প্রমাণিত হওয়ায় বুঝতে বাকী থাকে না মোসাদই কিলার। অবশ্যই মোসাদ একশ ভাগ কিলার।
দুবাই পুলিশের প্রধান অবশেষে মিডিয়া স্টারে পরিণত হন। সারা বিশ্বের টিভি মিডিয়ায় তাকে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যেতে হয়েছে। দুবাই পুলিশ প্রধান তামিম সাংবাদিকদের যে ভিডিওটি দেখান তাতে মোসাদ সদস্যদের দুবাইজুড়ে কী ধরনের তৎপরতা ছিল তা ধরা পড়েছে।
দুবাই পুলিশ প্রধান তামিমের ভাষ্য অনুযায়ী হিট টিমের মূলে ছিল ১১জন। এর মধ্যে আইরিশ ৩জন, ব্রিটেনের ৬জন, এবং একজন করে ফরাসী ও জার্মান। ৬শত ৪৮ ঘন্টার সিকুরিটি ক্যামেরার টেপ দুবাই পুলিশকে সহায়তা করেছে।
এদিকে দুবাই এয়ারপোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ইমিগ্রেশন জানায়, আগমন নির্গমনের সব ছবিই তাদের কাছে রয়েছে। হত্যাকারী ১১জন নয়, আরও বেশ কয়েকজন মোসাদ সদস্য এতে অংশ নেয়। হয়ত ২৭জন হবে। তামিম পরে স্বীকার করেন যে, হত্যাকারীর সংখ্যা আরও কিছু বেশী হতে পারে।
তামিমের উপসংহারে প্রশ্ন জেগেছে মোসাদ কী জানত না দুবাই জুড়ে ক্যামেরা বসানো রয়েছে। তামিমের মতে এই অপরাশেন সফল করতে মোসাদ একাধিকবার দুবাই এসেছে। সেক্ষেত্রে কেন তাদের চোখে ক্যামেরা ধরা পড়ল না। তাছাড়া কাপড় বদলানো, উইগ পরা, গোফ কাটা ইত্যাদি তারা ক্যামেরাকে সাক্ষী রেখে করল কেন? আরেকটি প্রশ্ন হল, অপারেশনে খুব বেশি লোক লাগেনি।
তাহলে বেশি লোক আনার মূলে কী ধ্রুম্রজাল সৃষ্টি করা? কেননা তারা জানে এই টেপ পরবর্তীতে অবশ্যই দেখা হবে। আরেকটি প্রশ্ন হল, দুবাই এয়ারপোর্টে সকলেরই ছবি তোলা হয়। মোসাদকী এখানকার এই সিস্টেমটা জানত না। আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা হল, ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরায় সব কিছু বন্দী হলেও দুটি ঘটনার কোন আলামত নেই। একটি হল আল মাবুহের রুমে প্রবেশের এবং তাকে হত্যা করে বের হয়ে আসার দৃশ্য।
পুলিশ প্রধান তামিম জানিয়েছেন, হিট টিমের সদস্যরা অস্ট্রিয়ায় একটি ফোনে কথা বলেছে। তামিমের ধারণা ঐ লোকের পরিচয় উদঘাটন সম্ভব এবং তিনি সম্ভবত মোসাদেরই লোক।
প্যারেনিয়ার নামের একটি মাস্টারকার্ড দিয়ে দুবাইয়ের আততায়ীরা লেনদেন কেনাকাটা করেছে। আইওয়া ভিত্তিক কোম্পানীতে রিচার্জ করা যায় এমন কার্ড এটি। তবে একটি ফাক ঠিকই আছে। ঐ কোম্পানীর গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ ইসরাইলে অবস্থিত।
দুবাই পুলিশ আরেকটি মজার তথ্য দিয়েছে। সেটা হল হিট টিমের সদস্যদের অধিকাংশেরই ডুয়াল পাসপোর্ট রয়েছে। সামান্য কয়েকজন মাত্র জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে।
আপাত দৃষ্টিতে আরব দেশগুলো ইসরাইলের শত্রুদেশ। যদি তারা ধরা পড়ত তখন দ্বৈত নাগরিকত্বের দোহাই দিয়ে বৃটেন, জার্মানী, ফ্রান্স অস্ট্রেলিয়াকে তারা তাদের জন্য ফাইট করার আহ্বান জানাতে পারত। সর্বোপরি দুবাইয়ের উল্লেখিত দেশের কনসালরা কম্পিউটারে টিপ দিলেই এরা যে প্রকৃতপক্ষেই তাদের দেশের নাগরিক তা চিহ্নিত করতে পারতেন।
এদিকে যেসব দেশের জাল পাসপোর্ট মোসাদ ব্যবহার করেছে সে দেশগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে। ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং আয়ারল্যান্ড তাদের মাটি থেকে মোসাদ প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে। পোল্যান্ড উরি নামের এক লোককে গ্রেফতার করে জার্মানীতে পাঠিয়ে দেয়।
উরির বিরুদ্ধে অভিযোগ ভুয়া তথ্যাদি দিয়ে দুবাই ঘটনার অন্যতম হোতা মিশেলকে সে জার্মান পাসপোর্ট পাইয়ে দিয়েছেন। উরি অবশ্য ৬০ হাজার ইউরো জরিমানা দিয়ে ছাড়া পায়। উল্লেখ্য গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের নিয়ম নেই।
দুবাই অভিযান মোসাদ কিম্বা ইসরাইলের জন্য একটা বিরাট সাফল্য হলেও মোসাদের নানা ভুল ভ্রান্তি নিয়েও কম সমালোচনা হয়নি। প্রথমত দুবাইকে ইসরাইল আন্ডারএষ্টিমেট করেছে। আবার পাসপোর্টসহ সকল ঘটনায় কয়েকটি দেশকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এতে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে।
দুবাই পুলিশ বলেছে, হিট টিমের সব সদস্যকেই ধরা হবে। কেননা তাদের পরিচিতি বিশ্ববাসী সবার জানা থাকলেও তাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। দুবাই টিমের একজন মোসাদ সদস্যও গ্রেফতার হয়নি।
📄 সাদ্দামের সুপারগান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯১৮ সালের ২৩ মার্চ প্যারিসের প্লেস ডিলা রিপাবলিকে বেশ কিছু কামানের গোলা এসে পড়ছিল। এর এক ঘন্টা পর প্যারিসে আরেকটা সেল বিস্ফোরিত হলে ৮জন লোক মারা যায়। বিস্ফোরণে প্যারিসের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফ্রন্ট লাইনে অর্থাৎ যে অঞ্চলে যুদ্ধ হচ্ছিল সেখান থেকে প্যারিসের দূরত্ব অনেক। সেক্ষেত্রে প্যারিস ছিল শংকামুক্ত। প্যারিস জেলার কমান্ডার রাজধানী সন্নিহিত বনাঞ্চলে সেনা প্রেরণ করলেন। তার আশংকা ছিল সেখানে হয়ত জার্মান বাহিনী আত্মগোপন করে আছে। কিন্তু কোন কিছুই পাওয়া গেল না। ফরাসীরা অনুমান করল, হয়ত কোন এয়ারসিপ থেকে ঐ গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও কোন জেপলীন কোথাও দেখা যায়নি। এর ছয়দিন পর গুড ফ্রাইডের দিন প্যারিসে আরেকটি কামানের গোলা নিক্ষিপ্ত হয়। একটা চার্চে সেই গোলা সরাসরি এসে লাগে। এতে ৯১জন লোক নিহত ও বহু লোক আহত হয়।
প্যারিস জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সারা শহরে সেনা টহল বাড়ানো হয়। কিন্তু কোথাও সন্দেহজনকও কিছু পাওয়া যায় না। এতদূর থেকে কামান ছুঁড়ে প্যারিসে আঘাত হানা সম্ভব এমনটি ইতিপূর্বে কেউ শোনেনি, কল্পনাকেও যেন হার মানায়। পত্রিকাগুলো জনপ্রিয় লেখক জুলভার্নের ফ্রম দ্যা আর্থ টু দ্য মুন বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করে।
ফ্রান্সবাসীর ভাগ্য ভালো। বছর না ঘুরতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।
জার্মানরা পরাজিত হয়। যাইহোক যুদ্ধ শেষে প্যারিস জুড়ে আবার কামানের গুঞ্জন শুরু হয়। অনেকেই আতঙ্কিত সেই কামানের নাম দেয় 'প্যারিস গান'। উইলহেমটু ছিলেন জার্মানির সম্রাট ক্রাপ। হেভী উইপেলস ফ্যাক্টরীতে নাকি একটি রহস্যজনক কামান তৈরী শুরু করা হয়েছিল। ঐ কামান নাকি ১২৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল। গোলাগুলো ছিল ৩ফুট লম্বা। অবশ্য ঐ কামানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে অর্থাৎ রেকর্ড ভাংগে জার্মানি ভিটু রকেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঐ রকেট দেখা যায়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে ক্রাপ কোম্পানী তিনটি সুপারগান তৈরি করেছিল। বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যত্র এই সুপারগানগুলো স্থানান্তরিত করা হত। প্রতিটি সুপারগানের সঙ্গে থাকত ৮০জন পদাতিক সেনা। এ ব্যাপারে কারো সাথে আলাপ করা তাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ।
যুদ্ধ শেষে এই সুপারগানের পরিণতি নিয়ে নানা কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পড়ে। তবে সত্যতা হল একটি সুপারগান নিষ্ক্রিয় করার সময় সংঘটিত বিস্ফোরণে ৫জন সেনা নিহত হয়। বাকী দুটোর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি যুদ্ধ শেষে। কোথায় হারিয়ে গেল এ নিয়ে রয়েছে নানা রহস্য। হয় তাদের কোন গুহায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা অংশ অংশ খুলে ফেলা হয়েছে।
সুপারগানগুলো লিজেন্ডে পরিণত হয়ে গেল। অনেকেই ভাবল সুপারগানের রহস্য কোনকালেই জানা যাবে না। কিন্তু ১৯৬৫ সালে এক বয়স্কা জার্মান মহিলা কানাডায় এলেন। তার উদ্দেশ্য ৩৭বছর বয়স্ক এক বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ লাভ ড. জেরাল্ড বুল মন্ট্রিয়েলের মকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ভদ্রমহিলা রাউসেন বার্জারের আত্মীয়া। রাউসেন বার্জার ইন্ডাস্ট্রিজের নকশা বিভাগের প্রধান ছিলেন।
আগত মহিলা ড. বুলের একটি হারানো পাণ্ডুলিপি তাদের পারিবারিক আর্কাইভে খুঁজে পান। ঐ পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে বিগ গান সম্পর্কিত বিস্তারিত এবং সেই বিগগান কী করে অপারেট করতে হয় তাও।
ড. বুল ছিলেন এককথায় এক জিনিয়াস। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তিনি পিএইচডি করেন। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর কেউ অত কম বয়সে পিএইচডি করেননি। ড. বুল স্বপ্ন দেখেছিলেন সুপার গানের। তিনি এমন গান তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার সাহায্যে বহু বহু দূর থেকে গোলা নিক্ষেপ করা যায়। পাণ্ডুলিপি অবলম্বনে ড. বুল একটা বইও লিখেছিলেন। বই লেখার উদ্দেশ্য আগামী দিনের বিজ্ঞানীরা যাতে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সুপারগান তৈরি করতে পারে।
ড. বুলের বইটি যথেষ্ট না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকার এবং যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বুল শিক্ষকতা করতেন তারা ড. বুলকে সুপারগানের ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বার্বাডোসে ড. বুল তার নির্মিত একটি বিশাল গানের পরীক্ষা চালিয়ে ছিলেন। এর আগে এত বড় হিউজ গান আর বিশ্বে দ্বিতীয়টি তৈরি হয়নি। এই সুপারগানের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৩ মিটার লম্বা। ক্যালিবার ছিল ৪২৪ মিলিমিটার। স্থানীয় শতশত শ্রমিক প্রকৌশলী এই সুপারগান তৈরি এবং এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের সাথে যুক্ত ছিলেন। ড. বুল সাফল্য শেষে আরও দাবি করেন যে, শেলের পরিবর্তে যদি তিনি সলিড ফুয়েলের মিশাইল প্রপেল করতেন, তাহলে তিনি ২০০ পাউন্ড মিসাইল চার হাজার কিলোমিটার দূরত্বে ছুঁড়তে সক্ষম। আর যদি উর্দ্ধকাশে ছোটে তা ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাবে।
ড. বুলের সুপারগান এককথায় একটা বিশাল অর্জন। কিন্তু আমেরিকা ও কানাডা সরকার নানা হিসেব-নিকেশ করে তার প্রকল্পে অর্থায়ন করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৬৮ সালে ড. বুলকে বার্বাডোস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ফলে তিনি খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। অতঃপর প্রচন্ড ঘৃণার সাথে আমলাদের আক্রমণ করেন তার প্রকল্প বানচালের জন্য।
ড. বুল কিছুদিন পর আর্টিলারি শেল নির্মাণ শুরু করেন এবং আমেরিকায় তৈরি বন্দুকের মাধ্যমে ইসরাইলে ৫০হাজার সেল বিক্রি করেন। এমনকী তাকে আমেরিকায় অনারারি নাগরিকত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তার মুখ ভালো ছিল না। তিনি যত সিনিয়র লোকের সাথে কাজ করেছেন তাদের সাথে বিরোধ বাড়িয়েছেন। আর বার্বাডোসে তার প্রকল্প বন্ধ করার জ্বালা ও ক্ষোভ তো এর মধ্যে ছিলই। তবে যে কোন মূল্যে সুপারগান তৈরির জন্য তিনি ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। এটি তার সংকল্প হয়ে দাড়ায় এবং কোন কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে পারবে না- এটাই ছিল তার বিশ্বাস।
প্রথমে তিনি তৈরি করেন জিসিফোরটি ফাইভ গান। ঐ সময় এত অত্যাধুনিক গান আর ছিল না। এর রেঞ্জ ছিল ৪০ কিলোমিটার। বুল যাকে-তাকে এই বন্দুক বিক্রি করতে শুরু করলেন। জাতিসংঘ দক্ষিণ আফ্রিকায় অস্ত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ড. বুল তা অগ্রাহ্য করে সে দেশে অস্ত্র পাঠিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে অস্ত্র তৈরির লাইসেন্সও বিক্রি করেছিলেন বুল-যাতে তারা অস্ত্র বানাতে পারে।
অনেকের মতে সিআইএ গোপনে ড. বুলের অবৈধ কার্যক্রম সমর্থন করত। কিন্তু বিষয়টি যখন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে তখন বুলের সিআইএ বন্ধু লাপাত্তা হয়ে যায়। একা হয়ে যান ড. বুল। ওদিকে জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে। অস্ত্র তৈরি ও গোপনে বিক্রির অভিযোগ আনে জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে। তাকে আমেরিকায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল একটি দুঃসংবাদ।
আমেরিকার একটি আদালক অবৈধ ব্যবসার অভিযোগে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়। জেল খেটে কানাডায় ফিরে এলে তাকে ৫০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। ক্রুব্ধ হতাশ ড. বুল বেলজিয়ামে গিয়ে সেখানে একটি নতুন কোম্পানী খোলেন। এখানে তার সহযোগী ছিল ইউনাইটেড গান পাউডার ওয়ার্কস।
সুপারগান বানানোর স্বপ্ন ড. বুলের মধ্যে সবসময়ই জাগরুক ছিল। জুলভার্ন যে ধরনের সুপার গানের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার চেয়েও বড়। গেট্যে তার উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে শয়তানের কাছে তার আত্মা বিক্রিতেও প্রস্তুত ছিলেন। হ্যাঁ, ডা. বুলও এরকম একটি শয়তানের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ইরাকের স্বৈরশাসক। আর তিনি হলেন সাদ্দাম হোসেন।
আশির দশকে ইরাক ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। বুল সাদ্দামের কাছে দুইশত জিসিফোরটি ফাইভগান বিক্রি করেন। এগুলো তৈরি হয় অস্ট্রিয়ায়। এগুলো জর্ডানের আকাবা বন্দর থেকে চোরাচালান হয়ে ইরাকে আসে। এটা ছিল সাদ্দাম ও ড. বুলের যৌথ প্রকল্পের শুরু।
ড. বুলের মত সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। বিশেষ করে ইসরাইল যখন তামুজ পরমাণু চুল্লী বোমা মেরে ধ্বংস করে তখন সাদ্দাম হোসেন খুবই ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন। তামুজ কেন্দ্রের মাধ্যমেই সাদ্দাম পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সাদ্দাম ইসরাইলের প্রতি ঈর্ষাও অনুভব করতেন। কেননা ইসরাইল মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
ড. বুল সাদ্দামের কাছে অফার করলেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সবচে দূর পাল্লার সুপারগান তাকে বানিয়ে দেবেন। বুল সাদ্দামকে প্রতিশ্রুতি দিলেন ইরাক মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাবেই এবং যে ফায়ারশেল বানিয়ে দেবে তা হাজার মাইলের বেশী অতিক্রম করতে পারবে। সাদ্দাম হোসেন উপলব্ধি করলেন ইসরাইলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমা ফেলার সুযোগ তার হাতের মুঠোয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ড. বুলের অফার গ্রহণ করলেন। ড. বুল তার প্রকল্পের নাম দিলেন প্রজেক্ট ব্যবিলন।
ড. বুল সাদ্দাম হোসেনের ব্যবিলন প্রজেক্টের জন্য একটি সুপারগানের পরিকল্পনা করলেন। এর দৈর্ঘ্য হবে ১৫০ মিটার ওজন ২১০০ টন। ক্যালিবার ১ মিটার। দৈত্যাকার গান বানানোর আগে ড. বুল এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এটি হবে পরীক্ষামূলক। তিনি এর নাম দিলেন বেবী বেবিলন। এই বেবী বেবিলন অতীতের সব গানের চেয়ে বড়। এই গানটির দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ মিটার। সাদ্দামের আর্টিলারী কমান্ডার এর কার্যক্ষমতার ব্যাপারেও সশ্রদ্ধ ছিলেন। কিন্তু আসল গানটির সাথে কোন তুলনাই চলে না। এক কথায় এটা মহাবিস্ময়ে পরিণত হবে। আর ইরাকের মরুভূমিতে জন্ম হবে এর।
ড. বুল তার জায়ান্ট গান বানানোর জন্য ইরাকের একটি দুর্গম পাহাড়ী এলাকা বেছে নিলেন। লোকেশন চূড়ান্ত করে ড. বুল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর সরঞ্জামাদি সংগ্রহের জন্য আদেশ দিলেন। এই বৃহৎ কামানের মূল তো অবশ্যই ব্যারেল। এই ব্যারেলে বুল প্রচুর পরিমাণ স্টীল টিউব ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। তিনি ইংল্যান্ড, স্পেন, হল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডে অর্ডার দিলেন টিউবের জন্য। ঐ সব দেশের সাথে তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন।
সুপারগানের বিষয়টি চেপে গিয়ে তিনি বলেন যে, একটি বড় মাপের তেলের পাইপ লাইনের জন্য এসব স্টীল প্রয়োজন। এই চাতুরীর কারণ কৌশলগত অস্ত্র বানানোর ব্যাপারে ইরাকের ওপর আন্তর্জাতিক কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। আর এসব উপকরণ প্রতিবেশী জর্ডানের নামে আমদানি করা হচ্ছিল।
পাইপ যথারীতি ইরাকে আশা শুরু হল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, অধিকাংশ দেশ এবং রপ্তানিকারক কোম্পানীই বুঝতে পেরেছিল যে, এসব পাইপ তেল উত্তোলনের কাজে নয় বরং মারাত্মক কোন অস্ত্র বানানোর কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের লোভের কারণে তারা প্রায় চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে ঐ সব দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অভিন্ন এবং যেখানে আরও বিরোধ ফেনিয়ে ওঠুক এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে ঐক্যমত্য ছিল। এইসব পাইপের ক্ষেত্রে রপ্তানী লাইসেন্স দেয়া হয় এবং মালবাহী জাহাজে করে ইরাকে পাঠানো শুরু করে। অধিকাংশ পাইপই ইরাকে নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছে।
ড. বুলের টেকনিশিয়ানদের প্রাইভেট আর্মি এবং প্রকৌশলীরা সুপারগানের অংশগুলো জোড়া লাগাতে শুরু করল। এই গানের মুখ নিবদ্ধ করা হল পশ্চিম ও ইসরাইলের দিকে। কিন্তু ড. বুল এখনো সন্তুষ্ট নন। তিনি ইরাকের জন্য সেলফ প্রোপেলড দুটি গান বানালেন। একটির নাম আল মজনুন এবং আল কাও। আল মজনুনকে অবিলম্বে ইরাকে পদাতিক বাহিনীতে যুক্ত করা হল।
ড. বুল একই সাথে ইরাকের স্কাড মিসাইলের উন্নয়নে কাজ শুরু করলেন। তিনি স্কাডের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করলেন। সেগুলো আরও আধুনিক হয়ে উঠল। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কথা।
ড. বুল একে একে সীমা অতিক্রম করতে শুরু করলেন। ড. বুলের ছেলের যে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় তাতে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ইসরাইলের গোয়েন্দারা তার বাবাকে এই ধ্বংসের খেলা থেকে সরে আসার জন্য সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এসব কানে নিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু ইসরাইল এই বিজ্ঞানীকে থামাতে আগ্রহী ছিল তা নয়। সিআইএ, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনী এমসিক্সটিনও এই বিজ্ঞানীকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিল।
একই কথা প্রযোজ্য ইরানীদের ক্ষেত্রেও। ইরাক ইরান যুদ্ধের সময় ইরাকীরা ড. বুল নির্মিত অস্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ফলে বিশ্বের বহু দেশ এই বিজ্ঞানীকে স্তব্ধ করে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
ড. বুল যখন বিদেশিদের সতর্কবার্তার কোন পাত্তাই দিচ্ছিলেন না, তখন তা প্রতিরোধে তারাও নানাপন্থা গ্রহণের কথা ভাবলেন। যেমন ১৯৯০ সালের শীতকালে ব্রাসেলসে বুলের বাড়ি বেশ কয়েকবার ভাংচুর করা হয়। হামলাকারীরা বাড়ি থেকে কোন মালামালই নেয়নি। শুধুমাত্র ফার্নিচার ভাংচুর ও ওলটপালট করেছে। ফলে এই হামলার উদ্দেশ্যে ড. বুলের সম্যক না বোঝার কারণ ছিল না। কেননা এটা ছিল একটা হুমকি, সাবধান হয়ে যাও। তোমাকে আমরা যখন যা খুশি করতে পারি।
আবারও ড. বুল এই হুমকি আমলে নিলেন না। গানের অংশ ঠিকই ইরাকে আসতে লাগল। এবং প্রতিপক্ষের আর বুঝতে বাকী রইল না, ড. বুলকে এই প্রকল্প থেকে সরানো যাবে না।
১৯৯০ সালের ২২ মার্চ। বুল তার ব্রাসেলসের বাসায় ফিরছিলেন। ফ্ল্যাটের চাবি যখন পকেটে হাত ঠুকিয়ে তিনি খুঁছিলেন তখন অন্ধকার থেকে একজন লোক এগিয়ে আসল। এক নিঃশব্দ বন্দুক তার হাতে। লোকটি ড. বুলের মাথার পেছনের দিকে পরপর পাঁচটি গুলি করলেন। বিশালাকার কামানের স্বপ্নপুরুষ ড. বুল কাত হয়ে পড়লেন এবং ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হল।
বিশ্ব গণমাধ্যম আততায়ীর পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করতে লাগল। কেউ বলল সিআইএ এই ঘটনার জন্য দায়ী। কেউ বলল এমসিক্সটিন। এ্যাংগোলা ও ইরানের প্রতিও ইংগিত করল কেউ কেউ। কিন্তু অধিকাংশ পর্যবেক্ষকেরই সন্দেহের তীর ছিল ইসরাইলের দিকে। বেলজিয়াম সরকার তদন্ত শুরু করল বটে কিন্তু কোন সূত্রই পেলো না। আজও ড. জেরাল্ড বুল হত্যাকাণ্ডে কাউকে ধরা হয়নি।
ড. জোরাল্ড বুলের মৃত্যুতে সাদ্দাম হোসেনের সুপারগানের কাজ অবিলম্বে বন্ধ হয়ে গেল। ড. বুলের সহকারী, প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, গবেষক দল, ক্রেতা, সকলেই বিশ্ববাসী ছড়িয়ে পড়ল। এই কর্মীবাহিনী সুপারগানের যন্ত্রাংশগুলোর সাথে সম্যক পরিচিত বটে কিন্তু সুপারগানের মাস্টারপ্ল্যান তালাবদ্ধ ছিল ড. বুলের মস্তিষ্কে। এবং তিনিই একমাত্র ছিলেন পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়াটির। ড. বুলের মধ্য দিয়ে বেবীলন প্রকল্পের মৃত্যু ঘটল।
ড. বুলের মৃত্যুর দু'সপ্তাহ পরে দীর্ঘ নীরবতা ভংগ করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নড়ে উঠল। তারা একটি কাষ্টমস ইউনিটকে বন্দরে পাঠিয়ে আটটি বিশালাকায় শেফিল্ড কোম্পনীর পাইপ আটক করল। চালানে লেখা ছিল ওয়েল পাইপ। ব্রিটিশদের এই কর্মকাণ্ড প্রশংসা কিন্তু দেরি করে ফেলেছিল তারা।
ব্রিটিশ সরকার ৪৪টি পাইপ আটকে ব্যর্থ হয়। কেননা বন্দর থেকে এগুলো তেলের পাইপ হিসেবে রপ্তানি হয়ে গিয়েছিল এবং ইরাকে ইতিমধ্যে তা কাজে লাগানো হয়েছিল। ঐ সময়েই জায়ান্ট গানে ব্যবহার্য বেশ কিছু যন্ত্রাংশ ইউরোপের ৫টি দেশে আটক করা হয়। ইংল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয় দায়িত্বশীল কোম্পানীগুলো বিশেষ করে শেকিন্ড সাদ্দাম হোসেনের বিগগানের জন্য অর্ডারগুলোর বিপরীতে মালামাল সরবরাহ না করলেও পারত। কেননা এর মাধ্যমেই সাদ্দাস হোসেন মানব বিধ্বংসী সুপারগান তৈরি করতে যাচ্ছিলেন।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক দখল করে তখন তারা প্রচুর পরিমাণ ষ্টীল পাইপ স্তূপকৃত অবস্থায় দেখতে পায়।
ড. জেরাল্ড বুলের হত্যাকাণ্ড এমন সময় ঘটল যখন মোসাদ গভীর একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৪৯ সালে মোসাদের প্রধান হয়ে এসেছিলেন সংগঠনের ভ্যাটার্ন এজেন্ট শাবতাই শাবিত। কিন্তু তিনিই প্রত্যক্ষ করলেন কিভাবে মোসাদের কর্মকাণ্ড দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের সঙ্গে যুক্তদের ক্ষেত্রে কিম্বা এবং আশি ও নব্বুই দশকে মোসাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে বিস্তর ফারাক ধরা পড়বে। আগে যেখানে মোসাদ বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে রহস্যের কিনারা করত সেখানে মোসাদ স্পেশাল অপারেশনের পথ বেছে নিতে শুরু করল। ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য যারা হুমকি হয়ে উঠেছিল মোসাদ তাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক ও অস্ত্রচালিত পন্থায় প্রতিশোধ গ্রহণের দিকে এগুতে থাকল।
অতীতের ইসরাইলি রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে সন্ত্রাস দমনে সফলতার মুখ তেমন দেখতে পায়নি। সন্ত্রাসবাদী নেতারা বিদেশে নিরাপদে বাস করতেন এবং আক্রমণের পরিকল্পনা জানাতেন। কিন্তু কাজটা তিনি নিজে করতেন না। সারা বিশ্বব্যাপী তাদের যে লোক বা সমর্থক ছিল তারা অপারেশন পরিকল্পনা করতেন। ইসরাইল ভালো করেই জানত কোন নেতা অন্তর্ঘাতের সাথে যুক্ত। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা কিম্বা বিচারের সম্মুখীন করা কোনভাবেই সম্ভবপর ছিল না। একমাত্র পথ ছিল মোসাদকে বলা তাদের খুঁজে বের কর এবং হত্যার নির্দেশ দেয়া ছাড়া। কাজটা নিষ্ঠুর।
ডেভিড মোলাড এ ধরনের বহু অভিযান পরিচালনা করেছেন বটে। কিন্তু সর্বাত্মক সাফল্য আসে তখনই যখন নেতাকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে তার সংগঠনটি নিশ্চল বা অকেজো হয়ে পড়ে অন্তত কয়েক বছরের জন্য। ব্লাক সেপ্টেম্বর নেতাদের নিধনের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি খুব সফল হয়েছিল। ড. জেরাল্ড বুলকে হত্যার মাধ্যমেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল। ড. বুলের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সরকারি ভাবে কখনোই উদঘাটিত হয়নি। তার মৃত্যু মানেই একটি ভিন্ন চিন্তার পরিসমাপ্তি। ড. বুলের অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল ওয়াদি হাদ্দাদের ক্ষেত্রেও।
ড. ওয়াদি হাদ্দাদকে হত্যার ঘটনাটি শুরু হয়েছিল এক বাক্স চকলেট দিয়ে। ড. ওয়াদি হাদ্দাদ ছিলেন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেষ্টাইনের প্রধান। ইসরাইলের শত্রুদের মধ্যে তিনি শীর্ষ বটে। তার সর্বোচ্চ দুর্ধর্ষ অভিযানের একটি হল ১৯৭৬ সালের ২৭ জুন এয়ার ফ্রান্সের একটি প্লেন ছিনতাই করা। প্লেনটি তেলআবিব থেকে ফ্রান্সে যাচ্ছিল। আরব, জার্মান ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঐ প্লেনের পাইলটকে বাধ্য করে সেটিকে উগান্ডার রাজধানী এনতেব্বেতে নামাতে। তাদের দাবি ছিল ইসরাইলী ও ইহুদী জিম্মিদের তাদের জিম্মায় দিতে হবে। ইসরাইলি কমান্ডোরা হাজার মাইল উড়ে গিয়ে এই দুঃসাহসিক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করে। তারা পৌছে যায় এনতেব্বেতে। কমান্ডোরা বিশ্বের ভয়ংকর এই সন্ত্রাসী গ্রুপকে হত্যা করে জিম্মিদের মুক্ত করতে সক্ষম হয়।
এনতেব্বের ঘটনার পর হাদ্দাদ উপলব্ধি করেন যে, তার জীবন এখন বিপন্ন এবং তার সদর দফতর বাগদাদে স্থানান্তরিত করেন। কেননা বাগদাদে তিনি নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিলেন। ইরাক থেকেই তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে নানা রকম অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন।
ইসরাইলের এই জাত শত্রুকে খতম করতে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? খোঁজ শুরু হল ড. হাদ্দাদের যাবতীয় দুর্বলতার। এভাবে এক বছর অতিক্রান্ত হলে মোসাদ জানতে পারে চকলেটের প্রতি হাদ্দাদের অপরিসীম দুর্বলতা। বিশেষ করে বেলজিয়ামের সেরা চকলেট। আবার এই খবরটি দেয় ফিলিস্তিনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র যাকে মোসাদ হাদ্দাদের পপুলার ফ্রন্টে ঢুকিয়েছিল।
মোসাদ প্রধান চকলেট প্রীতির কথা ইসরাইলের নয়া প্রধানমন্ত্রী বেগিনের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি অবিলম্বে চকলেটের মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। মোসাদ এজেন্টরা হাদ্দাদের বিশ্বস্ত এক অনুচরকে এ কাজে নিয়োগ দেয়। হাদ্দাদের বিশ্বস্ত ঐ সহকর্মী তখন ইউরোপে একটি মিশনে ছিলেন। তিনি তার বস হাদ্দাদের জন্য বিশাল সাইজের গোভিতা নামের চকলেটের একটি বাক্স নিয়ে আসেন। মোসাদ বিশেষজ্ঞরা ঐ চকলেটে প্রাণঘাতী বায়োলজিকাল বিষ ইনজেশন দিয়ে ঢুকায়। মোসাদ এজেন্টরা আশা করে যে, হাদ্দাদ তার এই প্রিয় চকলেট একাই খাবে। কাউকে ভাগ দেবে না।
এজেন্ট বিষমাখা চকলেটের ঐ বাক্স হাদ্দাদকে দেন। তিনি একাই সবগুলো চকলেট খান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাদ্দাদের খাওয়ার রুচি চলে যায় এবং ওজন কমতে শুরু করে। রক্ত পরীক্ষা করে তার ডাক্তাররা জানান যে, হাদ্দাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষিত প্রায়। বাগদাদের কেউ ধারণা করতে পারছিলেন না যে, পপুলার ফ্রন্টের নেতার স্বাস্থ্যের কেন এত অবনতি ঘটছে কোন কারণ ছাড়াই।
হাদ্দাদের স্বাস্থ্য আরও ভেঙে পড়ছে। তিনি খুবই দুর্বল হয়ে পড়লেন। অস্থি চর্ম বেড়িয়ে আসার উপক্রম। একটি বিছানাই তার একমাত্র শয্যা হয়ে উঠল। তাকে জরুরীভিত্তিতে পূর্ব জার্মানীর একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হল। সোভিয়েট ব্লকের অন্যান্য দেশের মত পূর্ব জার্মানী ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু ড. হাদ্দাদের ক্ষেত্রে তাদের কোন সহযোগিতা কাজে আসল না। তারা হাদ্দাদকে বাঁচাতে পারল না।
১৯৭৮ সালের ৩০ মার্চ ড. হাদ্দাদ ইন্তেকাল করেন। ডাক্তাররা বলেন, অজ্ঞাত রোগ। ৪৩ বছর বয়সী এই সন্ত্রাসী নেতার মৃত্যুর পর তার বোনের কাছে লক্ষ লক্ষ ডলার রেখে যান। ফিলিস্তিনিদের জন্য তার পবিত্র যুদ্ধের জন্য বহু লোক বা প্রতিষ্ঠান তাকে টাকা দিত বলে ধারণা।
পূর্ব জার্মান ডাক্তারা বলেন যে, ড. হাদ্দাদ এমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন যে, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ অবশ্য এ ঘটনায় মোসাদকে দায়ী করল না। হাদ্দাদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ইরাককে বিষ প্রয়োগের জন্য দায়ী করল। কেননা ড. হাদ্দাদ এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করছিলেন। বেশ কয়েক বছর পর ইসরাইলি লেখকদের ড. হাদ্দাদ সম্পর্কিত সত্য প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়। এই লেখকরা মনে করতেন ড. হাদ্দাদের অপরিণত বয়সে মৃত্যুর মূলে মোসাদের হাত রয়েছে। এর ত্রিশ বছর পর যখন ইয়াসির আরাফাত মারা যান তখন তার ঘনিষ্ঠজনরা এই মৃত্যুর জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছেন। ঐ অভিযোগ কখনোই প্রমাণিত হয়নি। ইয়াসির আরাফাতকে ব্যাপকভাবে চিকিৎসা ও টেষ্ট করেছিলেন তারই ফ্রান্সের ডাক্তার।
ড. হাদ্দাদের মৃত্যুর পর তার নেতৃত্বাধীন ভয়ংকর সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘটে। হাদ্দাদের লোকজনের ইসরাইল বিরোধি কর্মকাণ্ড চূড়ান্তভাবে নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং ইসরাইলের ঘোরতর ঘৃণিত শত্রু প্রকৃতপক্ষেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
ড. বুল ও ড. হাদ্দাদের পর সাকাকীর পালা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অটোমান সুলতান রাজকীয় নেভীর একজন বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় কমান্ডারকে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ মাল্টা অভিযানে পাঠিয়ে ছিলেন। এডমিরাল পাল তুলে অভিযানে বের হয় এবং কয়েকমাস সমুদ্রে মাল্টা দ্বীপের সন্ধান করতে থাকেন। এক সময় তিনি ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। সুলতানের কাছে দেয়া এক রিপোর্টে তিনি জানান, মাল্টা বলে কোন দ্বীপের অস্তিত্ব নেই।
কিন্তু আমাদের সময় কেউ কেউ ঠিকই মাল্টার সন্ধান পেতে পারেন। শুধু মাল্টা দ্বীপের সন্ধানই মেলেনি সেখানে আগত এক ছদ্মবেশীকেও খুঁজে পেয়েছেন। তিনি খুবই গোপনে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেছিলেন। এই ব্যক্তি হলেন ড. সাকাকী। তিনি ইসলামী জেহাদের প্রধান।
১৯৯৫ সালের ২৬ অক্টোবর সকালে ফাতহি সাকাকী মাল্টার সেলমা শহরের ডিপ্লোম্যাট হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। দামেস্কে ফিরে যাওয়ার আগে কিছু কেনাকাটার জন্য তিনি বেরিয়েছিলেন। তাই হোটেলে তিনি বেশ কয়েকদিন ছিলেন। সাকাকীর মাথায় ছিল পরচুলা। হাতে লিবিয়ার পাসপোর্ট। পাসপোর্টে তার নাম ইব্রাহীম সায়ুশ। এই শহরে তিনি নিজেকে নিরাপদ ভাবতেন। তিনি জানতেন তার এখানে আসার পর থেকেই মোসাদের কিছু লোক তাকে ফলো করে চলেছে। আন্ডার গ্রাউন্ড ফিলিস্তিনি সংস্থাসমূহের এক সম্মেলনে তিনি মাল্টা থেকে লিবিয়া যাবেন।
এই ঘটনার ৯ মাস আগে ২২ জানুয়ারী দুই আত্মঘাতী যারা শাকাকীর ইসলামিক জিহাদের সদস্য নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। নেতান্না বাস স্টেশনের কাছে বেইট লিভ জংশনের অদূরে তারা আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ছিলেন। এই ঘটনায় ২১ জন নিহত হন। এদের মধ্যে অধিকাংশই সৈন্য। আহতের সংখ্যা ৬৮। ইসরাইলের ইতিহাসে এটি একটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ঘটনার পরপরই বেইট লীডে যান এবং বোমাবাজির ঘটনায় খুবই কষ্ট পান। তিনি এই ঘটনার কয়েকদিন পর টাইম ম্যাগাজিন পড়ে অতিশয় ক্রুদ্ধ হন। কেননা সেই পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সাকাকী উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনে আরব ইসরাইল যুদ্ধের ঘটনাগুলো ছাড়া এটাই সর্বোচ্চ বড় সামরিক আক্রমণ।
টাইম ম্যাগাজিন সাকাকীকে প্রশ্ন করে যে, এই ঘটনায় মনে হচ্ছে আপনার মনে শান্তি হচ্ছে। আপনি এই প্রাণহানিতে সন্তুষ্ট। সাকাকী বলেন, এটা আমাদের মানুষদের মনে শান্তি ও সন্তুষ্টি এনে দিয়েছে। ক্রোধান্বিত প্রধানমন্ত্রী রবীন মোসাদ প্রধান সরতাই শাভিতকে নির্দেশ দেন ইসলামিক জিহাদ প্রধানকে হত্যার। শাভিত দীর্ঘদিন ধরে খুঁজতে থাকেন সাকাকীকে।
একটি পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী মোসাদ দামেস্কে সাকাকীর সদর দফতরে হামলা চালানোর অনুমতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যর্থ হয়। কেননা রবীন চান না সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের সঙ্গে গোপনে শান্তির অন্বেষায় যে আলোচনা চালাচ্ছিলেন এক্ষনে ঐ শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাক। কেননা ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে ঐ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী রবীন সাকাকীকে ধরতে বা হত্যায় বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেন। মোসাদ প্রধান বলেন যে, সাকাকী ভালো করেই জানেন যে, তিনি তাদের হিটলিস্টে রয়েছেন। ফলে সিরিয়ার বাইরে তিনি খুব একটা যান না। তারপর রবিন বললেন দামেস্কে কোনভাবেই সাকাকীকে হিট করা যাবে না। করতে হয় সিরীয় সীমান্তের বাইরে গিয়ে কর।
এখন প্রশ্ন, কোথায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে। মাথা খারাপের যোগাড় মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। এরই মধ্যে সিরিয়ার বাইরে একটা সুযোগ এসে গেল। লিবিয়া থেকে দাওয়াত পেলেন সাকাকী। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংগঠন সেখানে সম্মেলন করবে।
প্রথমে সাকাকী ঐ সম্মেলনে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন, তার জাতশত্রু আবু মুসা সংগঠনের আবু মুসা সেখানে যাচ্ছেন তখন তিনিও তাতে শরীক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মোসাদ বিশেষজ্ঞর ধারণা করলেন সাকাকী তার চিরশত্রু মুসাকে এককভাবে ফ্লোর ছেড়ে দেবেন না। সাকাকী লিবিয়া যাচ্ছে বলে সিদ্ধান্ত হল। একটি গোপন সূত্র দামেস্ক থেকে জানাল, লিবিয়ায় যাচ্ছেন সাকাকী। জেরুজালেমে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী অতঃপর তার লোকদের নির্দেশ দিলেন, সেখানেই তাকে হত্যার।
ইউরোপীয় সূত্রগুলোর দাবি, মোসাদের লোকজন অতঃপর সাকাকী কোন পথে লিবিয়া যেতে পারেন তা নিয়ে গবেষণায় বসল। অতীতের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেল সাকাকী বরাবরই লিবিয়া গেছেন মাল্টা হয়ে। মোসাদ প্রধান মাল্টাতেই সাকাকীকে খতমের সিদ্ধান্ত নেন। কেননা লিবিয়ার চেয়ে মাল্টায় এ ধরনের অভিযান পরিচালনা সহজ। লিবিয়ার চেয়ে মাল্টা অনেক বেশী নিরিবিলি শহর।
মোসাদ এজেন্ট সাকাকীর অপেক্ষায় ভ্যলেট্টা বিমান বন্দরে অবস্থান নেন। কেননা তিনি মাল্টায় কিছুটা সময় কাটাবেন বলে তাদের ধারণা। সাকাকী তার পিছু নেয়াদের বোকা বানিয়ে দামেস্ক থেকে সর্বশেষ ফ্লাইটে মাল্টা এসে পৌঁছান। ব্যাপক ছদ্মবেশ ধারণ করে সাকাকী ট্রানজিট লাউঞ্জে কিছু সময় অতিবাহিত করেন এবং কানেকটিং ফ্লাইটে লিবিয়া যান।
২৬ অক্টোবর খুব সকালে সাকাকী আবার মাল্টায় ফিরে আসেন এবং বরাবরের মত ডিপ্লোম্যাট হোটেলে ওঠেন। এবার তার কক্ষ নং ৩১৬। হোটেলে উঠেই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। তিনি যেখানে যেখানে যান মোসাদের দু'জন লোক একটি নীল রঙের মোটর সাইকেলে তাকে অনুসরণ করেন। তিনি কয়েক ঘন্টা দোকানে দোকানে কাটান। কেনাকাটা শেষে যখন তিনি হোটেলে ফিরছিলেন তখন নীল রংয়ের ঐ মোটর সাইকেল তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তাকে থামায়।
পরবর্তীতে মোসাদের এক এজেন্ট জানান, সাকাকী এগিয়ে এলে খুব কাছ থেকে তার উপর ৬টি গুলি ছোঁড়া হয় শব্দহীন বন্দুক দিয়ে। সাকাকী সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। হত্যাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অবশ্য হত্যাকারী ছিল একজনই, অন্যজন মোটর সাইকেল চালু রেখে অপেক্ষা করছিল। আততায়ীরা কাছের একটি বীচের দিকে যায় এবং লাফ দিয়ে একটি স্পীড বোটে ওঠে। স্পীড বোটটি গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায় এবং সেখানে অপেক্ষমাণ একটি জাহাজে গিয়ে ওঠে। ঐ জাহাজটি সরকারিভাবে হাইফা থেকে ইটালীতে সিমেন্ট বহন করছিল।
ঐ জাহাজেই অবস্থান করছিলেন শাবতাই শাভিত নিজে। এই অভিযানের খুঁটি নাটি অত দূর থেকে মনিটর করছিলেন। পুরো রুটই ছিল ওয়েল প্লানড। ফলে কেউই হত্যাকাণ্ডের পর মোসাদের ঐ দুই এজেন্টকে অনুসরণ করতে পারেনি। জাহাজে ওঠার পর মোসাদের ঐ দুই এজেন্ট নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে স্বদেশে ফিরে যান।
সাকাকীর মৃত্যুর পর তার সহকর্মী ইসলামিক জিহাদের লোকজন রহস্যজনক ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করে। কে এই বিশ্বাসঘাতক যে মোসাদের কাছে সাকাকীর সফরের যাবতীয় খুঁটিনাটি পাচার করল?
হত্যাকারীরা সাকাকীর যাবতীয় গতিবিধি জানত - কবে তিনি মাল্টা, কবে লিবিয়া যাবেন ইত্যাদি। এমনকী তার ফ্লাইট নম্বর, তার ভুয়া পরিচয়পত্র, দামেস্কে ও মাল্টায় তার ফেরার দিনক্ষণ পর্যন্ত। পাঁচ মাস অনুসন্ধান শেষে ইলামিক জিহাদ এক ফিলিস্তিনি ছাত্রকে গ্রেফতার করে। এই ছাত্র সাকাকীর খুবই ঘনিষ্ঠ সহকারী ছিল। তাকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য দায়ীও করা হয়। ছাত্রটি প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে সবকিছু স্বীকার করে নেয়। উল্লেখ্য, বুলগোরিয়া পড়ার সময় মোসাদ উক্ত ছাত্রটিকে তাদের দলে ভেড়ায় এবং নিয়োগ দেয়। তার মোসাদ গডফাদাররা তাকে দামেস্কে ফিরে যেতে বলে এবং সাকাকীর দলে যোগাদনের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী চার বছরে ছাত্রটি সাকাকীর আস্থা অর্জন করে এবং সাকাকীর কর্মকাণ্ড জানত মাত্র কয়েকজন - তাদের একজনে পরিণত হয়।
হামাস ও হেজবুল্লাহ তাদের সম্পদের বিশাল একটা অংশ সামরিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করলেও ইসলামিক জিহাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল সন্ত্রাস। এদের একটাই উদ্দেশ্য - ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ। এমনকী ফিলিস্তিনিদের বেশ কিছু সংগঠনও বিশ্বাস করে আত্মঘাতী সন্ত্রাসের আদর্শগত পিতা হলেন সাকাকী। ইসলামের পবিত্র ও মহান শিক্ষাকে সে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও হত্যাকান্ডে উৎসাহিত করে।
সাকাকীর সংগঠনের রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলার তালিকা দীর্ঘ। ১৯৮৯ সালের ৬ জুলাই তেল আবিব থেকে জেরুজালেমগামী বাসে হামলা চালিয়ে সাকাকীর সংগঠন ১৬জন হত্যা করে। ১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কায়রোর সন্নিকটে একটি পর্যটন বাসে বোমা মেরে ঐ সংগঠন ৯ জনকে হত্যা করে। ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর দক্ষিণ ইসরাইলের আরেকটি বাসে বোমা মেরে তারা ৮ জনকে হত্যা করে। ১৯৯৪ সালের ১১ নভেম্বর গাজায় এক আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ঐ সংগঠন তিন সৈন্যকে হত্যা করে। বেইট লাভের লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ শুরুতেই দেয়া হয়েছে। সেখানে ২১জন নিহত হয়। সাকাকীর জন্য মৃত্যুদণ্ড যথার্থই ছিল যা মাল্টায় মোসাদ কার্যকর করেছে। সাকাকীর মৃত্যুর পর ইসলামিক জিহাদের কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। নেতা সাকাকীর মৃত্যুর পর দলের প্রায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে বেশ কয়েকবছর কেটে যায়।
ইসরাইল কখনোই হত্যার কথা স্বীকার করেনি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী রবীন বলেছেন, আমি সাকাকীর হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে যদি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েই থাকে এজন্য আমি দুঃখিত নই।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে আইজাক রবীন নিজে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কিন্তু এই ঘটনা কোন ফিলিস্তিনি ঘটায়নি, ঘটিয়েছে এক ইহুদী ধর্মান্ধ।