📘 মোসাদ > 📄 ডাবল এজেন্ট ও ক্রুশ্চেভের ভাষণ

📄 ডাবল এজেন্ট ও ক্রুশ্চেভের ভাষণ


শুরুটা হয়েছিল ভালবাসা দিয়ে। ঘটনার সময় ১৯৫৬। লুসিয়া বারানোভস্কি প্রেমে হাবুডুবু ভিক্টর গ্রায়েভস্কি নামের এক সুদর্শন সংবাদিকের। তার বিয়ে ঠিক কম্যুনিস্ট শাসিত পোল্যান্ডের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু তাদের দেখা সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। লুসিয়া পোলিশ কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদিকা। তার কর্মচারীরা ভিক্টরের এই অফিসে প্রায়শই আসা যাওয়ার কারণে কিছুটা আপন ও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এদিকে লুসিয়া সাংবাদিক ভিক্টরকে যে ভালবাসে তা নিয়ে কোন রাগ ঢাক নেই।
পোলিশ নিউন এজেন্সীতে ভিক্টর সিনিয়র এডিটর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের বিষয়াদি সে দেখাশোনা করে। ভিক্টর মূলত ইহুদী এবং তার প্রকৃত নাম ভিক্টর শাকিলম্যান। কিন্তু বছর খানেক আগে সে নাম পাল্টেছে। কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগদানের সময় সে তার নাম পাল্টায়। তার এক বন্ধু তাকে বলেছিল শাকিলম্যান নাম নিয়ে পোল্যান্ডে বেশী দূর এগোনো যাবে না। ফলে পরবর্তিত হয়ে নাম হল ভিক্টর গ্রায়েভস্কি। এখন নামটা পোলিশ পোলিশ মনে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনী পোল্যান্ড দখলের সময় ভিক্টর ছিল শিশু। তার পরিবার এ সময় রাশিয়া ক্রস করে এবং অল্পের জন্য হলকস্ট এড়াতে সক্ষম হয়। যুদ্ধের পর আবার তারা পোল্যান্ড ফিরে আসে। ১৯৪৯ সালে ভিক্টরের বাবা মা ও ছোট বোন ইসরাইলে চলে যায়। কিন্তু কম্যুনিজমে মগ্ন ভিক্টর থেকে যায়। সে আবার স্টালিনের বেজায় ভক্ত। তার ইচ্ছা শ্রমিক শ্রেণীর জন্য মাটির পৃথিবীতে সে স্বর্গ বানাবে।
কিন্তু ভিক্টরের কলিগ, বন্ধুরা এমনকী তার প্রিয়তমাও জানত না যে, ভিক্টরের মধ্যে এক ধরণের ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ১৯৫৫ সালে ভিক্টর ইসরাইলে তার পরিবারের কাছে গিয়েছিল। এখানে সে পৃথিবীর অন্য একটি রূপ দেখতে পেল। ইসরাইলের সমাজ মুক্ত, প্রগতিশীল। ইহুদীদের এযেন একটা গণতান্ত্রিক জাতি। কম্যুনিস্ট প্রচারণা চালাতে চালাতে ভিক্টর ক্লান্ত। শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। পোল্যান্ড ফিরে ত্রিশ বছর বয়সী ভিক্টর ইসরাইলে স্থায়ী ভাবে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকে।
১৯৫৬ সালে এপ্রিলে ভিক্টর যথারীতি তার সুইট হার্টের অফিসে (পার্টির সেক্রেটারী অফিস) আসে। তার ডেস্কে সে একটি লাল খামে টপ সিক্রেট লেখা একটা ফাইল দেখতে পায়। সে তার সুইট হার্টের কাছে ওটা কী জানতে চায়। সুইট হার্ট বলে, এটা ক্রুশ্চেভের ভাষণ। ভিক্টর পাথর হয়ে যায় যেন। সে ক্রুশ্চেভের ভাষণ সম্পর্কে শুনেছে। কিন্তু এমন একজন লোককে পায়নি যে ক্রুশ্চেভের ভাষণের একটি লাইন কোথায় পড়েছে কিম্বা ভাষণটি দেখেছে। কম্যুনিষ্ট ব্লক ভাষণটি অতিগোপনীয় হিসেবে গন্য করে। ফলে এটি দেখার বা শোনার কোনই সুযোগ নেই।
ভিক্টর সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। সে শুধু জানে সোভিয়েত কম্যুনিষ্ট পার্টির মহাক্ষমতাধর এই মহাসচিব দলের ২০তম কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দিয়েছেন। ক্রেমলিনে ফেব্রুয়ারি মাসে এই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর সকল বিদেশি মেহমান ও বিদেশি কম্যুনিষ্ট পার্টির প্রধানদের হল থেকে বের করে দিয়ে মহাসচিব ক্রুশ্চেভ এই ভাষণ দেন। হলে তখন ১৪শত সোভিয়েত কম্যুনিষ্ট পার্টির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষণ উপস্থিত সকলকে হতভম্ব ও আবেগাপ্লুত করে তোলে। চার ঘন্টা ভাষণ দেন ক্রুশ্চেভ। ভাষণে কী বলেছেন ক্রুশ্চেভ! পশ্চিমে প্রেরিত এক মার্কিন সাংবাদিকের রিপোর্টে বলা হয়, যে সব সোভিয়েত নেতাদের রুশবাসি পুজা করে তারা কী ধরনের পাপাচার ও দুর্নীতি করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়েছেন ক্রুশ্চেভ। লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার দায়ে তিনি পূর্বসুরী নেতা স্টালিনকে তুলোধুনা করেন। তার ভাষণের সময় চারদিকে কিছু কানাঘুষা ও বিস্ময় প্রকাশিত হলেও অনেককে কাঁদতে দেখা যায়। ভাষণকালে অনেককে চুল ছিঁড়তে দেখা যায় এবং কেউ কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরের দিন কয়েকজন আত্মহত্যা করেন।
বিস্ময়কর ঘটনা হল, ক্রুশ্চেভের ভাষণের একটি লাইনও সোভিয়েত পত্র পত্রিকায় ছাপা হল না। মস্কো জুড়ে এই ভাষণকে ঘিরে নানা গুজব গুঞ্জন চলতে থাকে। পার্টির শীর্ষ কমিটির বৈঠকে ভাষণের অংশবিশেষ অবশ্য আলোচিত হয়। কিন্তু ক্রুশ্চেভের বক্তৃতার পুরো অংশ গার্ড দিয়ে রাখা হয়। বিদেশি এক সাংবাদিক ভিক্টরকে জানায় যে ক্রুশ্চেভের পুরো বক্তৃতায় কপি পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলো হা পিত্যেশ করছে। এমনকী সিআইএ ঐ পুরো ভাষনটি পেতে ৫০লক্ষ ডলার পুরস্কার দিতেও রাজি। শীতল যুদ্ধের এই উত্তুঙ্গ মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ক্রশ্চেভের এই ভাষণটা পাওয়া খুবই জরুরী। পশ্চিমাদের বিশ্বাস, ক্রুশ্চেভের এই ভাষণ কম্যুনিষ্ট দেশ সমূহে ভূস্মিকম্প ঘটাবে এবং যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বিশ্বের কমিউনিষ্ট দেশের কোটি কোটি বামপন্থী অন্ধের মত স্ট্যালিনের পূজা করে। ক্রুশ্চেভ তার ভাষণেও তার অপরাধের যে ফিরিস্তি দিয়েছেন তা তার ভক্তদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে।
ফলশ্রুতিতে এক কথায় বলতে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গেও যেতে পারে।
কিন্তু ক্রুশ্চেভের ভাষণের কপি পাওয়া ক্রমশ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল।
পরবর্তীতে ভিক্টর জানতে পারল, ক্রুশ্চেভ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার ভাষণের কিছু কপি তিনি পূর্ব ইউরোপের কম্যুনিষ্ট নেতাদের কাছে পাঠাবেন। সেই পাঠানো কপির একটি কপিই ভিক্টরের গার্ল ফ্রেন্ডের টেবিলে টপ সিক্রেট লিখে জমা পড়েছে।
ভিক্টর তার গার্লফ্রেন্ড ও পোল্যান্ড কম্যুনিষ্ট পার্টির সেক্রেটারী জেনারেল লুসিয়ার কাছে দেখে তা কয়েক ঘন্টার জন্য ধার চাইল। বলল, এখানে গ্যাঞ্জামের মধ্যে পড়া যাবে না। বাসায় গিয়ে পড়বে। ভিক্টরকে অবাক করে দিয়ে লুসিয়া তাকে ভাষণের কপিটি দিল এবং ফেরৎ দেয়ার একটা সময় বেধে দিল। লুসিয়া বলল, তুমি এটা নিতে পার কিন্তু অবশ্যই তোমাকে অতটার মধ্যে ফেরত দিতে হবে। এটা আমি তালাবদ্ধ করে রাখব। আসলে লুসিয়া সব সময়ই ভিক্টরকে খুশি রাখতে চায়। এবারও তাই চাইল।
বাড়িতে এসে ভিক্টর ভাষণটি পড়ল। ভাষণটি রীতিমত বিস্ময়কর। ভাষণে ক্রুশ্চেভ নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে স্ট্যালিনের সমালোচনা করেছেন। এই ভাষণের মাধ্যমে স্ট্যালিনের ইমেজ খান খান হয়ে পড়ে যাবে। ক্রুশ্চেভ বলেন, স্ট্যালিন ক্ষমতায় থাকাকালে দৈত্যের মত আবির্ভূত হয়েছিলেন, হেন অপকর্ম নেই করেননি, এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে তিনি হত্যা করেছেন। তিনি বলেন, বলশেভিক আন্দোলনের জনক লেনিন পার্টিকে স্ট্যালিনের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। ক্রুশ্চেভ স্ট্যালিনকে সান অব দ্য ন্যাশন' হিসেবে অভিহিত করার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, স্ট্যালিন এক ভূয়া লোক এবং তাকে যেভাবে মহান হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে তা দুঃখজনক। তিনি তার ভাষণে আরও বলেন, স্ট্যালিনের শাসনামলে (১৯৩৬-১৯৩৭) ১৫ লক্ষ কম্যুনিষ্টকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬লক্ষ ৮০ হাজার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পার্টির সপ্তদশ কংগ্রেসে শরীক হওয়া ১৯৬৬ জন প্রতিনিধির মধ্যে স্ট্যালিনের নির্দেশে ৮৪৮জনকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির ১৩৮ প্রার্থীর মধ্যে ৯৮জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ক্রুশ্চেভ ডক্টরস প্লট নিয়েও কথা বলেন। এই চক্রান্তের জন্য কয়েকজন ইহুদী ডাক্তারকে দোষারোপের নিন্দা করেন তিনি। বলা হয়ে থাকে স্ট্যালিন এবং কয়েকজন সোভিয়েত নেতাকে হত্যার পেছনে ডাক্তারদের এই দলটি দায়ী। ক্রুশ্চেভ তার ভাষণে স্ট্যালিনকে গণহত্যাকারী হিসেবে অভিহিত করে বলেন, লক্ষ লক্ষ রুশ ও অপরাপর জাতি গোষ্ঠীর মানুষ স্ট্যালিনের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। এদের মধ্যে অনেকেই কম্যুনিষ্ট ভাবধারার প্রতি অনুগত ছিলেন।
ক্রুশ্চেভের ভাষণ সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ভিক্টরের যে মোহ ছিল সেই ধারণা খান খান করে ভেঙ্গে দিল। ভিক্টর বুঝে গেল ভাষণের এই কপিটি একটা বিস্ফোরকের চেয়েও ভয়ংকর বেশী এবং এটি প্রকাশিত হলে সোভিয়েত ব্লকের মূল ভিত্তি ধরে টান পড়বে। সে লুসিয়াকে ভাষণের কপিটি ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু লুসিয়ার কাছে যাওয়ার আগে তার মনটা বেঁকে বসল। তার পা দু'খানা যেন অন্যত্র যেতে চাইছে। কেমন করে জানি ভিক্টর ইসরাইল দূতাবাসে ঢুকে পড়ল। সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইসরাইল দূতাবাসে ঢুকে পড়ল। গেটে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের লোক ছিল। কিন্তু কী করে জানি তারা ভিক্টরকে পথ ছেড়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিক্টরকে দেখা গেল দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারী ইয়াকুব বারমোরের টেবিলে। তিনি আবার পোল্যান্ডে সাবাকের প্রতিনিধিও।
ভিক্টর তার হাতে ক্রুশ্চেভের ভাষণের লাল খামটি তুলে দিল। ভিক্টরকে কয়েক মিনিট বসতে বললেন ইয়াকুব। ভাষণটি পেয়ে তার আত্মা ছাড়ার উপক্রম হয়েছে। ইয়াকুব এক ঘন্টা পর ফিরে এলেন। ভিক্টর বুঝল যে, ইয়াকুব পুরো ভাষণটি ফটোকপি করে রেখেছেন। কিন্তু এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করল না। ভিক্টর খামটি তুলে নিল এবং কোর্টের ভেতরে সেটি লুকিয়ে ফেললো। সে লুসিয়ার অফিসে যথাসময়েই ফিরে গেল এবং লুসিয়া সেটি সাবধানে তুলে রাখল। কেউই ভিক্টরকে জিজ্ঞেস করল না কিম্বা ইসরাইলের দূতাবাসে যাওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করল না।
১৯৫৬ সালের খুব সকালের দিকে সাবাক এর পরিচালক আমোস ম্যানোরের কক্ষে ঢুকলেন জেলিগ কাটজ। কাটজ ম্যানোরের একান্ত সচিব। একটি পুরনো আরবদের ভবনে সাবাক এর সদর দফতর। ম্যানোর কটাজকে জিজ্ঞেস করলেন পূর্ব ইউরোপ থেকে কিছু এসেছে কীনা। শুক্রবারের এটা একটা রুটিন প্রশ্ন। কেননা এদিন ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে করে সাবাক এজেন্টেদের নানা তথ্য ও চিঠিপত্র সুরক্ষিত অবস্থায় আসে। জেলিগ জানালেন কয়েক মিনিট আগে ওয়ারশ থেকে ক্রুশ্চেভের ভাষণের অংশ বিশেষ এসেছে। মানোর একথা শুনে লাফিয়ে উঠলেন এবং এখুনি তা নিয়ে আসার জন্য বললেন।
ম্যানোর মাত্র কয়েক বছর হল ইসরাইলের ইমিগ্রেন্ট হয়েছেন। তার জন্ম রুমানিয়ায়। স্বচ্ছলই ছিলেন তারা। তাকে ইউটজে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে বাবা-মা, দুইবোন অর্থাৎ পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়। তাদের ক্যাম্প মুক্ত হয়ে গেলে তিনি বুখারেস্টে চলে যান। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনে ইহুদী স্বরণার্থীদের চোরাপথে সেখানে প্রেরণে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। যুদ্ধকালে তার পরিচিতি ছিল আমোস নামে। যদিও কাজ চালাতে তাকে বহু নাম ব্যবহার করতে হয়েছে। ইসরাইলে যাওয়ার পালা যখন তার আসে রোমানিয়া তাতে আপত্তি জানায়। তিনি চেক প্রজাতন্ত্রের একটি ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে রুমানিয়া থেকে পালান। নিজের নাম ধারণ করেন অট্টো স্টানেক নামে। তার বন্ধুরা তার সহস্র নাম রয়েছে বলে মজা করতেন। ইসরাইলে ঢোকার পর তার নাম হয় আমোস ম্যানোর। ইসরাইলের গোয়েন্দা দফতরে তিনি অল্প সময়েই নাম করেন। ইসার তার প্রতি দুর্বল ছিলেন। কিন্তু ম্যানোর ছিলেন তার বিপরীত। ইসার ছোট খাট, ম্যানোর লম্বা। ইসার ছিলেন শান্ত। ইসার খেলাধুলা করতেন না কিন্তু ম্যানোর ছিলেন ভাল সাঁতারু। টেনিস, ভলিবল খুব খেলতেন। ইসার মূলত রুশ ভাষায় কথা বলতেন, ম্যানোর জানতেন সাতটি ভাষা। ইসার লেবার পার্টির ভক্ত ও সদস্য কিন্তু ম্যানোর রাজনীতির ধার ধারতেন না। ইসার ভদ্রোচিত পোশাক পরতেন, ম্যানোর পরতেন ফ্যাশনেবল পোশাক। চেহারা ইউরোপীয়দের মত কিন্তু অসম্ভব বুদ্ধিমান ছিলেন। ইসার তাকে ১৯৪৯ সালে সাবাকে নিয়োগ দেন। প্রায় চার বছরের মাথায় ইসারের अनुमोদনে প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ান তাকে পরিচালক করেন। ইসরাইলী গোয়েন্দাদের সিআইএর সাথে গোপন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
বৃষ্টিস্নাত এক শুক্রবারে ম্যানোর ফটোকপিগুলো নিয়ে নিজেই বসলেন। তার পক্ষে বোঝা কোন সমস্যা ছিল না। কেননা রুশসহ সাতটি ভাষা তিনি জানেন। পড়তে পড়তে তার মনে হল, ক্রুশ্চেভের ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। পড়তে পড়তে তিনি লাফ দিয়ে উঠলেন এবং চটজলদি প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়নের বাসভবনে গেলেন। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি বললেন, এটা অবশ্যই আপনার পড়া উচিত। বেন গুরিয়ন রুশ ভাষা জানতেন এবং ভাষণটি তিনি পড়লেন। পরের দিন সকালে তিনি ম্যানোরকে জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠালেন। তাকে বললেন, এটি একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট। এবং এটি পড়ে মনে হয়েছে ভবিষ্যতে রাশিয়া একদিন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ইসার ভাষণটি পান ১৫ এপ্রিল। এবং উপলব্ধি করলেন এটি ইসরাইলের খুবই উপকারে আসবে। বিশেষ করে এই ভাষণের কল্যাণে মোসাদের সঙ্গে সিআইএর সম্পর্ক আরও মধুর ও ঘনিষ্ঠ হবে।
১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে বেনগুরিয়ান জেনারেল ওয়াল্টার বেডেল স্মীথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই জেনারেলের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ইউরোপে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। স্মীথ ছিলেন সিআএইর পরিচালক। বেডেল কোন প্রকার চিন্তা ভাবনা ছাড়াই ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সিআইএর সম্পর্ক সীমিতভাবে গভীর করতে সম্মত হয়েছিলেন। ওদিকে মোসাদের জন্ম মাত্র ১৯৪৭ সালে। সোভিয়েত এবং ইস্টার্ণ ব্লকের অভিবাসীদের সম্পর্কে তথ্যাদি নিতে ইসরাইলের সহযোগিতাকে আমেরিকা খুব গুরুত্ব দিয়েছিল। বহু প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান এমন কী সেনা কর্মকর্তা যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ওয়ারশতে কাজ করেছেন তাদের পক্ষে কম্যুনিষ্ট ব্লকের সেনা ও যন্ত্রপাতি সম্পর্কে জানানো সহজ। ইসরাইল আমেরিকাকে এসব তথ্য প্রকৃতপক্ষেই সরবরাহ করে আসছিল। আমেরিকা এসব খবরে দিনকে দিন চমৎকৃত হচ্ছিল। আমেরিকা তাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের প্রধান প্রবাদ পুরুষ জেসাস এ্যান্থগলেটনকে ইসরাইল তথা মোসাদের সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়নে লিয়াজো অফিসার নিযুক্ত করল। জেসাস ইসরাইল সফর করলেন এবং বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। তিনি আমোস ম্যানোরের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করলেন। এমনকী তার ছোট্ট দুই রুমের বাসায় স্কচ খেয়ে খেয়ে কয়েকটি দিন থাকলেনও।
কিন্তু এবার ইসার এবং আমোস অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমেরিকার হাতে তুলে দিতে উদগ্রীব হলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ক্রুশ্চেভের ভাষণ তারা সরাসরি ওয়াশিংটনে পৌছে দেবেন। তবে তেলআবিবের সিআইএ অফিসের মাধ্যমে নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিযুক্ত মোসাদ প্রতিনিধি ইজি ভোরেটকে ভাষণের কপি এক বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে বাহককে পাঠিয়ে দিলেন। এই কপি দ্রুতগতিতে পৌঁছে গেল জেসাস এ্যাংগ্লেটনের হাতে। ১৭ এপ্রিল জেসাস ক্রুশ্চেভের সেই ভাষণ পৌছে দিলেন এ্যালন দুল্লেমের হাতে এবং সেদিনই ভাষণটি পৌছে গেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ারের টেবিলে। মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানরা এই ভাষণটি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ইসরাইলের ক্ষুদ্র গোয়েন্দা সংস্থা যে বিশাল কাজটি করেছে তার কাছে ব্রিটেন ফ্রান্স তুচ্ছ। সিআইএর সিনিয়ার কর্মকর্তারা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষা করে দেখলেন যে, ভাষণটি জাল নয়।
এর ভিত্তিতে সিআইএ ভাষণটি নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে ফাস করে দিলেন। ১৯৫৬ সালের ৫জুন নিউইয়র্ক টাইমস ক্রুশ্চেভের ভাষণটি প্রথম পাতায় ছেপে দিলে বিশ্বব্যাপী যেন ভূমিকম্প হয়। কম্যুনিষ্ট বিশ্বে আলোড়ন হয়। কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে, এই ঘটনায় পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরীতে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান এবং সভা সমাবেশ হতে শুরু করে।
ইসরাইলের এই ইন্টেলিজেন্স ক্যু মোসাদ ও সিআইএ তথা আমেরিকার সম্পর্ককে আরও গভীর ও মধুর করে তোলে। লুসিয়া যে ফাইলটি ভিক্টরকে প্রায় তাচ্ছিল্য ভরে দিয়েছিলে সেই ফাইলটির কারণে ইসরাইলের মোসাদ হিমালয় সদৃশ মর্যাদা লাভ করে।
ভিক্টর যে, ক্রুশ্চেভের ভাষণ আমেরিকায় পাচারের মূল ব্যক্তি কারো মনে তা নিয়ে কোন সন্দেহের উদ্রেক হল না। ১৯৫৭ সালে ভিক্টর ইসরাইলে স্থায়ী হল। ম্যানোরের কাছে সে কৃতজ্ঞ। কেননা ম্যানোর তাকে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে একটা চাকুরী পাইয়ে দিলেন। পূর্ব ইউরোপের ডেস্কে তাকে বসানো হল। কিছুদিনের মধ্যেই ভিক্টরকে সরকার পরিচালিত রেডিও কোল ইসরাইলের সম্পাদক ও রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হল। রেডিওর পোলিশ সেকশানে তার কাজ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে ভিক্টর তার তিন নম্বর চাকুরীটি পেল। ইসরাইল থেকে আসার পর ভিক্টর একটি স্কুলে জনাকয়েক সোভিয়েত কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ইমিগ্রান্ট ও বিদেশিদের যে স্কুলে হিব্রু ভাষা শেখানো হয় সেখানেই তাদের আলাপ। একজন রুশ কূটনীতিক পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে ভিক্টরের সঙ্গে পরিচিত হন এবং একজন অভিবাসী হিসেবে বড় পদে আছেন জেনে খুব খুশি হন। এদিকে এক কেজিবি এজেন্ট ভিক্টরের পোল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করেন এবং অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কেজিবি এজেন্ট অতঃপর ভিক্টরকে ইসরাইলে তাদের এজেন্ট হওয়ার অফার দেন। ভিক্টর বিষয়টি নিয়ে ভাববেন বলে প্রতিশ্রতি দিয়ে মোসাদের সদর দফতরে সরল মনে উপস্থাপন করেন। ভিক্টর জানতে চান তার এখন কী করণীয়। মোসাদের লোকজন খুশিতে আত্মহারা হয়ে চমৎকার চমৎকার বলে এই প্রস্তাব গ্রহণের অনুমতি দেন। ভিক্টর এখন হলেন ডাবল এজেন্ট অর্থাৎ নিজ দেশ ইসরাইল এবং ভিনদেশ রাশিয়ার। তবে শর্ত হল ভিক্টর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভুয়া তথ্য দেবেন।
দ্বৈত গোয়েন্দাগিরি শুরু করে ভিক্টর দীর্ঘদিন রাশিয়াকে ভুল খবর দিয়ে যেতে লাগল। মোসাদ যেভাবে ব্রিফ করতো রুশদের সেভাবেই খবর দিত ভিক্টর। তার কেজিবি বসরা জেরুজালেম কিম্বা দূতাবাসের রিসিপশনেও গিয়েও সে তথ্য সংগ্রহ করত। ১৪ বছর ধরে ভিক্টর এভাবে দুই দেশের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেছে। রুশরা কোন ঘটনায় তাকে সন্দেহ করেনি এবং নিত্য নতুন খবরে তারা চমৎকৃত হয়েছে এবং ভিক্টরকে বাহবা দিয়েছে। মস্কোর কেজিবি সদর দফতরে বরং এই গুজব চালু ছিল যে তারা খুবই ভাগ্যবান। কেননা ইসরাইলে তারা এমন একজন চর পেয়েছেন যার সঙ্গে ইসরাইল সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বেশ চমকপ্রদ খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দীর্ঘ ১২/১৪ বছরে একবারও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকর্তারা তাকে কোন প্রশ্ন করেনি বা সন্দেহের চোখে দেখেনি। কিন্তু ১৯৬৭ সালে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল। এবার রুশরা ভিক্টরের অভিমত ও উপসংহার উপেক্ষা করল।
মজার ব্যাপার হল এই প্রথমবার সে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সত্য খবর দিয়েছিল। কিন্তু তা পাত্তা পেল না। ১৯৬৭ সালের মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের বিভ্রান্তিমূলকভাবে ভাবতে শুরু করেন যে, মে মাসে ইসরাইল সিরিয়া আক্রমণ করবে। অতঃপর তিনি সিনাই অঞ্চলে সেনা সমাবেশ ঘটান এবং জাতিসংঘের শান্তি রক্ষীদের বহিষ্কার করেন। একই সাথে তিনি সাগরের একটি প্রণালীতে ইসরাইলের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেন। ইসরাইল ধ্বংস করে দেবেন বলেও শাসান। বস্তুতপক্ষে আক্রমণের কোন ইচ্ছা ইসরাইলের ছিল না বরং ইসরাইল মিশরের সাথে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এশকোল মোসাদকে বললেন রাশিয়ার সাথে কথা বলতে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, মিশর যদি তার আগ্রাসী মনোভাব পরিবর্তন না করে ইসরাইল সেক্ষেত্রে যুদ্ধ করবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বললেন, মিশরের উপর রাশিয়ার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ফলে মিশরকে ঠেকানো বা বোঝানো কঠিন হবে না। ভিক্টর কেজিবিকে ইসরাইলের প্রকৃত মনোভাব প্রমাণসহ রাশিয়াকে জানাল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিস্থিতির উল্টো ব্যাখ্যা করে বসল। রাশিয়া ভিক্টরের পরামর্শ আমলে না নিয়ে উল্টো নাসেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করতে বলল।
যুদ্ধের ফলাফল হল, ইসরাইলের স্বতঃ প্রণোদিত যুদ্ধে মিশর, সিরীয়া এবং জর্ডানের সৈন্যদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটল এবং ঐ দেশগুলোর বিশাল ভূখণ্ড ইসরাইলের করায়ত্ত হল। সোভিয়েত ইউনিয়নও ক্ষতিগ্রস্থ হল। এই যুদ্ধে তাদের অস্ত্র নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হল। মিত্রদেশগুলো যেভাবে মার খেল তাতে রাশিয়ার মাথা কাটা যাওয়ার উপক্রম হল এবং বন্ধু দেশকে প্রতিরোধে ব্যর্থতার গ্লানি তার পক্ষে ভোলা কঠিন হল।
এই বছর ভিক্টর ও রাশিয়ার সম্পর্ক মধুর থেকে মধুরতর হল। মধ্য ইসরাইলের এক জংগলে সোভিয়েত কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য তাকে ডাকা হল। কেজিবি গোয়েন্দা গদগদ হয়ে তাকে জানাল, সোভিয়েত সরকার তার উপর দারুন সন্তুষ্ট। কেননা তাদের প্রতি ভিক্টরের উৎসর্গকৃত মনোভাবের কোন তুলনাই হয় না। অত্যন্ত খুশি হয়ে রুশ সরকার তাকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন পদক লেনিন পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। রাশিয়া একই সাথে দুঃখ প্রকাশ করল যে, ইসরাইলের মাটিতে ভিক্টরকে এই পদক দেয়া সম্ভব নয়। তাকে আশ্বস্ত করা হল এই পদক মস্কোতে তার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। রুশরা ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলল, যখনি ভিক্টরের সময় সুযোগ হবে সে যেন এই পদক গ্রহণ করে। ভিক্টর ইসরাইলে থেকে যেতে মনস্থ করল।
কিন্তু ভিক্টরকে কেউ ভুলে যায়নি। ২০০৭ সালে সাবাক অফিসে ভিক্টরকে দাওয়াত দেয়া হল। সাবাক ও মোসাদের বর্তমান ও সাবেক পরিচালকদের একটি গ্রুপ ওই দাওয়াতে শরীক হন। ভিক্টরের স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন সাবাক পরিচালক ডিসকিন কৃতিত্বপূর্ণ চাকুরী জীবনের জন্য ভিক্টরকে অতি সম্মানজনক একটি পদক উপহার দেন। তবে মজার ব্যাপার হল মোসাদের একমাত্র সদস্য হলেন ভিক্টর যিনি দু'বার দুটি বড় ধরনের পদক পেলেন। একটি তার নিজ দেশে- যেখানে উৎসর্গকৃত মানসিকতা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। আরেকটি তার দেশের শত্রু দেশ যাদেরকে ঝুঁকি নিয়েও ভুলেও মিথ্যা তথ্য তিনি দিয়ে যাচ্ছিলেন।
ভিক্টর বলেছেন, তিনি কোন হিরো নন। তিনি কোন ইতিহাসও সৃষ্টি করেননি। ভিক্টরের ভাষায়, ইতিহাস যিনি সৃষ্টি করেচেন তিনি হলে ক্রুশ্চেভ। আমি কয়েকটি মাত্র ঘন্টার জন্য ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এরপর আমাদের দুজনার পথ দুই দিকে বেকে গেছে।
ভিক্টর ৮১ বছর বয়সে মারা যান। ক্রেমলিনের কোথাও হয়ত লাল ভেলভেটে তার পদকটি পড়ে রয়েছে। এই পদকে লেনিনের অংকিত ছবি রয়েছে।

📘 মোসাদ > 📄 অপরাহ্নে মৃত্যু ও ভালোবাসা

📄 অপরাহ্নে মৃত্যু ও ভালোবাসা


২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দামেস্কের একটি অভিজাত বাড়িকে কেন্দ্র করে বহু লোক দাঁড়িয়ে। অপরাহ্নের শেষ পর্যায়ে তারা দেখল যে, একটি মিতসুবিসি পাজেরো সুভ গাড়ি ঐ ভবনটির সামনে পার্ক করা। কালো স্যুটপরা এবং কালো দাড়ি সুন্দর করে কাটা লোকটি গাড়ি থেকে বেরিয়ে ঐ বাড়িতে ঢুকলেন। তার সাথে কোন বডিগার্ড ছিল না। ঐ বাড়ির সামনে দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দারা ক্ষুদ্রাকৃতির ট্রান্সমিটারে বলছে যে, 'ঐ লোকটি' দামেস্কে এসেছে এবং একটি ফ্ল্যাটের দিকে যাচ্ছে। গোয়েন্দারা জানে যে, কালো স্যুট পরা লোকটির প্রেমিকা এই বাড়িতে থাকেন এবং তার সাথে গোপন সাক্ষাতের জন্য তার আগমন। ভদ্রলোকের হাতে একটা গিফট বক্স। মেজবান মহিলা কয়েকদিন আগে তার ত্রিশতম জন্মদিন পালন করেছেন।
প্রেমিক ঐ বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কয়েক ঘন্টা কাটান। এই বাড়ির সাথে সফল ব্যবসায়ী এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের কাজিন রামি মাকলাউফের একটা সম্পর্ক রয়েছে। রাত ১০টা বাজার কিছু আগে কালো কোর্ট পরা আগন্তুক ঐ বাড়ি ত্যাগ করেন এবং নিজের গাড়িতে ওঠেন। তিনি এখন ফরেন একটি হাউজে যেখানে তার সাথে বৈঠক হবে ইরান, সিরীয় এবং ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূতদের সাথে।
লন্ডনের সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকা জানায়, গোয়েন্দারা ঐ দিন ভদ্রলোকের বেশ কয়েকটি ছবি তোলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। কেননা পরবর্তীতে যাচাই ও জবাবদিহিতার জন্য এই ছবির প্রয়োজন হতে পারে। গোয়েন্দারা আগন্তুকের প্রতিটি পদক্ষেপের বলতে গেলে ধারাবিবরনি দিয়ে যাচ্ছিল। মোসাদ গোয়েন্দারা তেল আবিবেও এই খবর প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছিল। দামেস্কে তো বটেই। মোসাদ জুড়ে এই ঘটনায় একটা অস্থিরতা সৃষ্টি হল। তেলআবিবে মোসাদ প্রধান দাগানের অফিসে অন্যান্য বিভাগীয় গোয়েন্দা প্রধানরাও উপস্থিত হন। সেখানে আরও কিছু যন্ত্রপাতি বসিয়ে আগন্তুকের আসা-যাওয়ার প্রকৃত সময় রেকর্ড করা হয়।
ভদ্রলোক গাড়ি চালানো শুরু করলেন। এই খবরও মিনিয়েচার মাইকে করে যথাস্থানে জানিয়ে দিল গোয়েন্দারা।
সিলভার পাজারোর এই ভদ্রলোকের নাম ইসাদ মুগনিয়া। তার জীবনের সাথে বহু আগে থেকেই জড়িয়ে আছে অনেক রক্তাক্ত ইতিহাস। ২০০১ সালের নভেম্বরে সুপরিচিত টুইন টাওয়ার হামলার জের ধরে এফবিআই একটি বিশালকার পোস্টার ছেপেছিল। সেই পোস্টারে বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড ২২জন সন্ত্রাসীর নাম ও ছবি ছাপা হয়েছিল। পোস্টারে এফবিআই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের লোগো ছিল। প্রথম নামটি ছিল সর্বোচ্চ ভয়ানক। তার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয় ৫০ লাখ ডলার। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের আগেই মার্কিনিদের হত্যার ব্যাপারে তার ভূমিকাই ছিল সর্বোচ্চ বেশী। কোন জীবিত সন্ত্রাসী এত বেশী মার্কিন হত্যায় জড়িত ছিল না।
যেমন ইসাদ মুগনিয়ার নেতৃত্বে লেবাননের বৈরুতে মার্কিন দূতাবাসে যে হামলা হয় তাতে ৬৩ জন নিহত হয়। ১৯৮৩ সালের ২৩ অক্টোবর বৈরুতের মেরিন সদর দফতরের হামলায় ২৪১জন নিহত হয়। এটাই ছিল বৈরুতের ফ্রেঞ্চ প্যারাটুপার সদর দফতরের হামলায় ৫৮জন নিহত হয়। সিআইএ কর্মকর্তা উইলিয়াম বাকলেকে অপহরণ ও হত্যার সাথেও মুগনিয়া জড়িত। কুয়েতে বেশ কয়েকবার মার্কিন দূতাবাসে হামলা হয়। বিএডব্লিউট এয়ারলাইনের ও দুটি কুয়েত এয়ারলাইনের দুটি প্লেন ছিনতাই, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক কর্নেল হিংগিসকে হত্যা, সৌদি আরবে ২০জন মার্কিন সৈন্যকে ম্যাসাকারের সঙ্গে ইমাদ মুগনিয়া জড়িত ছিলেন।
মুগনিয়ার অপরাধ কর্মের তালিকা যখন ইসরাইলে পাঠানো হলো, মোসাদ তার সাথে আরও কিছু যোগ করল। ১৯৮৩ সালের ৪ নভেম্বর লেবাননের আইডি এক সদর দফতরের হামলায় ৬০ জন নিহত হয়। ১৯৮৫ সালের ১০ মার্চ আইডিএফ কনভয়ের উপর হামলায় ৮ জন নিহত হয়। মেতুল্লাহ সেই হামলার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি দূতাবাসে বোমা হামলায় নিহত হয় ২৯জন। ১৯৯৪ সালের ১৮ জুলাই বুয়েনস আয়ার্সে ইহুদী কমিউনিটি সেন্টারে হামলায় ৮৬ জন নিহত হয়।
তালিকা আরও দীর্ঘ। হারডোভ সীমান্তে তিনজন ইসরাইলি সৈন্যকে অপহরণ ও হত্যা, ইসরাইলি ব্যবসায়ী এলহানানকে অপহরণ, কিববুটজ মাটজুবায় বোমা হামলা, রেগেট নামে এক ইসরাইল সেনাকে হত্যার সঙ্গে তারা জড়িত। ইসরাইল লেবানন সীমান্তের গোল্ডওয়াসারের ঘটনায় দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের অবতারণা হয়।
ইসাদ মুগানিয়ার উল্লেখিত সবগুলো হামলার সঙ্গেই যুক্ত। তাকে ভূতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কেননা তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে সারাক্ষনই যাতায়াত করে থাকেন। তিনি ফটোগ্রাফারদের সব সময়ই এড়িয়ে চলেন। কোথাও সাক্ষাৎকার দেন না। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবকিছু অবহিত কিন্তু তার অবয়ব, তার অভ্যাস ইত্যাদি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। তারা শুধু জানে, মুগনিয়ার জন্ম দক্ষিণ লেবাননের একটি গ্রামে, ১৯৬২ সালে তার জন্ম। তার সম্পর্কিত টুকরা-টাকরা খবর থেকে জানা যায়, তার বাবা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ শিয়া। কিশোর বয়সে মুগনিয়া বৈরুতে চলে যান এবং দারিদ্রপীড়িত এলাকায় বেড়ে ওঠেন। পিএলও সম্পর্কিত ফিলিস্তিনিদের বসবাস এই এলাকায়। তিনি হাইস্কুলে থাকতেই ঝরে পড়েন এবং পরবর্তীতে ইয়াসির আরাফাতের ডেপুটি আবু আয়াদের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবানন যুদ্ধের সূচনা করে। ইসরাইলের ভাষায় অপারেশন পিসফর গ্যালিলি ছিল এই যুদ্ধ বা অভিযানের নাম। ইসরাইল লেবাননে ঢুকে পিতলকে ধ্বংস করে। ইরাসির আরাফতসহ পিএলএর জীবিত সদস্যরা পালিয়ে তিউনেশিয়া চলে যান। মুগনিয়া কিছুটা পেছনে থাকার ফন্দি করেন এবং হেজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতাদের প্রথম গ্রুপে যোগদান করেন।
হেজবুল্লাহ শব্দের অর্থ হল আল্লাহর দল। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি মূলত শিয়া সন্ত্রাসীদের চরমপন্থি দল। লেবাননে ইসরাইল আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়াতুল্লাহ খামেনীর উৎসাহে এবং ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের অস্ত্র ও অর্থায়নে এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। হিজবুল্লাহ অবশেষে ইসরাইলের জাত শত্রুতে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এবং মুগনিয়ার যোগদান এই বর্ধনশীল গ্রুপের জন্য একটি একটা বিরাট প্রাপ্তি। পর্দার আড়ালে থাকার পক্ষপাতী মুগনিয়া গোপনে অভিযান চালাতেই আগ্রহী। তার সম্পর্কে খণ্ড খণ্ড যে তথ্যাদি পাওয়া তার কিছু আবার স্ববিরোধী। একটি সূত্র মতে, মুগনিয়া হিজবুল্লাহর আধ্যাত্মিক নেতা শেখ ফাদআল্লাহর দেহরক্ষী ছিলেন।
আরেক সূত্রের দাবি, তিনি হিজবুল্লাহর অপরাশেন বিভাগের প্রধান ছিলেন। কারো মতে তিনি হিজবুল্লাহর ব্রেন এবং হিজবুল্লাহর ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানগুলোতে প্রচুর সংখ্যক লোক নিহত হন। এতবড় নেতা হওয়ার সত্ত্বেও মুগনিয়া কখনো টিভিতে আসেনি আবার ঘৃণাভরা বক্তৃতাও দেননি। কিন্তু বাস্তবতা হল মুগনিয়া হেজবুল্লাহর বর্তমান প্রধান শেক নসরুল্লাহ-যিনি বহুভাষী এবং বাকপটু তার চেয়েও অনেক বেশী ভয়ংকর। অত্যল্প সময়েই মুগনিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ এক অধরা নেতায় পরিণত হন। এক সময় কার্লোস যেমন দুর্ধর্ষ ছিলেন এমনকী ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও তিনি ভয়ংকর।
মুগনিয়াকে যেমন নিষ্ঠুর প্রকৃতির বলা হয় তেমনি তিনি একজন সৃজনশীল সন্ত্রাসীও। তার উত্থানটা ঘটে হঠাৎ করেই। বিশেষ করে তার পরিকল্পনা ও কমান্ডেই লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়। আর ইসরাইলের পিস ফর গ্যালিলি অভিযানের পরই তার কার্যক্রম অতিমাত্রায় চোখে পড়ে। তার বয়স যখন মাত্র ২১, অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের অক্টোবর- তখন তিনি বিস্ফোরক বোঝাই ট্রাক পাঠিয়েছিলেন। আত্মঘাতী বোমাবাজরা এই ট্রাক চালিয়েছিল। এই ট্রাক পাঠানো হয়েছিল বৈরুতের আমেরিকার মেরিনে এবং ফ্রান্সের প্যায়াট্রুপের সদর দফতরে। এর কিছুদিন পরেই অনুরূপ ট্রাক তিনি পাঠিয়েছিল টায়ারের আইডি সদর দফতরে।
২২ বছর বয়সে তার নেতৃত্বে কুয়েতের দেয়ালঘেরা মার্কিন দূতাবাসে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এরপরই কুয়েতে তিনি প্রথম বিমান ছিনতাই করেন। প্রতিটি অভিযানের পরই অকুস্থল থেকে তিনি লাপাত্তা হয়ে যান। ২৩ বছর বয়সে মুগানিয়া টিউব্লিউর-এর বিমান ছিনতাই করেন। এথেন্স থেকে বিমানটি রোম যাচ্ছিলো। বিমানের চালককে প্লেনটি বৈরু, বিমান বন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করেছিলেন। তার আঙ্গুলের ছাপ দেখে পরে তা চিহ্নিত হয়। এ রকম আরও বহু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত।
তার ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে জানা যায় খুব কমই। তবে তিনি তার কাজিনকে বিয়ে করেন এবং এক ছেলের এবং এক মেয়ের বাবা। জীবনের শুরুতেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, পশ্চিমা গোয়েন্দারা তার মুণ্ডু নিতে আগ্রহী। ফলে বরাবরেই তিনি ব্যক্তিগত জীবন তেমন প্রকাশ করতেন না। লিবিয়ায় তিনি প্লাস্টিক সার্জারী করেন। দাড়ি রাখেন। মুগনিয়ার ছবিও দুর্লভ। একটি মাত্র নিশ্চিত ছবি পাওয়া গেছে তার।
মোটা, দাড়িওয়ালা, চোখে চশমা এবং মুখোশের মত একটা টুপি পরা। তার পরিচয়ও পশ্চিমা গোয়েন্দারা সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পারেনি। যেমন এফবিআই বলছে তার জন্ম লেবাননে। ভাষা আরবী। চুল ও দাড়ি বাদামি, উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, ওজন ৬০ কেজি ইত্যাদি। তবে মুগানিয়ার ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল তিনি সুচারুভাবে নিজেকে রক্ষায় সক্ষম।
মুগানিয়া বোমাবাজি, ছিনতাইয়ের যত ঘটনা সফলভাবে ঘটিয়েছেন হিজবুল্লাহর মধ্যে তিনি ততবেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাহসিকতা ও সাফিসিটি কেশনের জন্যও তিনি প্রসিদ্ধ। অভিযানে তিনি বরাবর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। ফলশ্রুতিতে হিজবুল্লাহ পশ্চিমাদের কাছে এক মূর্তিমান আতংকে পরিণত হয়েছে। তার ক্ষমতা যত বৃদ্ধি পেয়েছে ততই তিনি ইসরাইল ও পশ্চিমা গোয়েন্দাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। মুগানিয়া তা অনুভব করে সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। এমনকী তার আস্থাভাজনদের উপরও তার নজরদারি রয়েছে। একারণেই বডিগার্ড তিনি প্রায়শই বদলান। পরপর দু'রাত্রি তিনি কোথাও ঘুমান না। বৈরুত দামেস্কে ও তেহরানে তার যাওয়া-আসার ব্যাপারটি গোপনীয়তার মধ্যে প্রতিপালিত হয়।
মোসাদ ও পশ্চিমা গোয়েন্দারা তার যে প্রোফাইল বানিয়েছে তাতে তাকে নিঃসঙ্গ, ক্যারিসমেটিক, আবেগপ্রবণ এবং সর্বশেষ ইলেকট্রনিক সামগ্রী সম্পর্কে সম্যক অবহিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চেহারা ও গেটআপ বদলাতে তার জুড়ি নেই। তাইতো ইসরাইলের গোয়েন্দারা তার প্রাণকে কই মাছের প্রাণ বলে থাকে।
সাবেক গোয়েন্দা ডেভিড বারকাই লন্ডনের সানডে টাইমের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা তাকে আশির দশকের শেষ দিক থেকেই ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি। তার জীবন বৃত্তান্ত প্রতিনিয়তই পাল্টিয়ে চলেছে গোয়েন্দারা। সত্যি বলতে কী, তার কোন দুর্বল জায়গা নেই। মেয়ে মানুষ, টাকা-পয়সা, মাদক কোন ব্যাপারেই কোন দুর্বলতা নেই।
মুগানিয়াকে আটকের অভিযান বেশ পুরানো। ১৯৮৮ সালে প্যারিসে এয়ারপোর্টে স্টপ ওভারের সময় ফ্রেঞ্চ সরকার তাকে আটক করতে পারত। সিআইএ ফ্রান্স সরকারকে প্যারিসে তার অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তার ছবি, তার জাল পাসপোর্ট সম্পর্কেও সিআইএ তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু ফ্রান্স সরকার তাকে গ্রেফতার করতে ভয় পাচ্ছিল। কেননা ঐ সময় লেবাননে ফরাসী জিম্মিদের মুক্ত করা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তাকে আটক করলে জিম্মিদের হত্যা করা হত। ফলে ফ্রান্স সরকার তার প্যারিসে উপস্থিতির বিষয়টি ইগনোর করে। ১৯৮৬ সালে মার্কিন গোয়েন্দারা তাকে ইউরোপে এবং ১৯৯৫ সালে সৌদি আরব তাকে গ্রেফতার চেষ্টা চালালেও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঐ সময়কালে মুগানিয়া আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি ও ইহুদী নিধনে খুব তৎপর ছিলেন। এই দফায় তার নারকীয় কর্মকাণ্ডের বিশাল বর্ণনা দেয়া যায়। এই সময়কালে মুগানিয়া ইরানে দীর্ঘসময় অতিবাহিত করেন। শেখ আল মুসায়িকে হত্যার পর ইসরাইল তাকে ইরানে ঢুকেও হত্যা করতে পারে বলে তার আশংকা হয়। তেহরানে মুগানিয়া একটা অপারেশনাল টিম তৈরি করেন হিজবুল্লা যোদ্ধা ও ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর লোকদের নিয়ে।
রেভুলেশনারি গার্ডের প্রধান এবং মুগানিয়ার বন্ধু মোহসেন রিয়াজী এবং গোয়েন্দা মন্ত্রী আল কাল্লা হিয়ান ছিলেন এইটিম গঠনে তার সহযোগী। এই টিম বুয়েন্স আয়াসে মারাত্মক দুটি অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানের ফলে মুগানিয়া ইসরাইলের প্রধান শত্রুতে পরিণত হন। আসলে কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুগানিয়া তার মৃত্যুকে নিজেই আহ্বান করেন।
১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মুগনিয়াকে বৈরুতে দেখা যায়। এই সময় তিনি এক হামলা থেকে বেঁচে যান। এই হামলায় মুগানিয়ার ভাই ফুয়াদ মুগানিয়া নিহত হন। মুগানিয়ার সেখানে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি তার মত বদলান। ফলে তিনি বেঁচে যান। কই মাছের প্রাণ আর কাকে বলে। এই ঘটনার পর হিজবুল্লাহকে সাথে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বহু লোককে গ্রেফতার করে। মোসাদের সহযোগী মনে করে বহু লোককে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু হামলার মূল নায়ক ছিলেন আহমদ হালেক নামে এক ব্যক্তি।
পুলিশের ভাষ্য মতে, হালেক এবং তার স্ত্রী ফুয়াদ মুগানিয়ার স্টোরের লাগোয়া তাদের গাড়ি পার্ক করেন। হালেক দোকানে ঢোকেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে ফুয়াদ সেখানে রয়েছে কীনা। ফুয়াদ সেখানেই ছিলেন এবং হালেক তার সাথে করমর্দন করেই গাড়িতে ফিরে আসেন। অতপর বোমাটি সক্রিয় করা হয়।
লেবাননের পত্রিকা আল সাকির বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন ছাপে যে, হালেক সাইপ্রাসে মোসাদের পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন। এবং মোসাদের কাছ থেকে এক লক্ষ ডলার গ্রহণ করেন। মোসাদের লোকজন হালেককে শিখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে বোমাটি সক্রিয় করতে হয়। পরবর্তীতে হালেকের প্রাণদণ্ড হয়।
এবারও মুগানিয়া বেঁচে যান। এদিকে গুজব রটে যে, মুগানিয়া হিজবুল্লাহর প্রধান হতে যাচ্ছেন। শেখ নজরুল্লার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন তিনি। তার মূল যোগাযোগ ছিল ইরানের গোয়েন্দা বিভাগ ও আল কুদস ব্রিগেডের সাথে। বিশ্বব্যাপী শিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে আল কুদস যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। ইরান নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথেও তারা যুক্ত। মুগানিয়া উচ্চতর পদে আসীন হওয়ার সম্ভাবনায় তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়। এই সময় গুজব রটে যে, মুগানিয়া আরেকবার প্লাস্টিক সার্জারী করে তার চেহারা বদলেছেন।
ইউরোপের সূত্র মতে, দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধ শেষে লেবাননে বসবাসরত বেশ কিছু ফিলিস্তিনিকে মোসাদ তাদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। এরা ছিল হিজবুল্লাহ বিরোধী। এর মধ্যে মুগানির গ্রামের একজন ছিল। সে আবার মুগানিয়া কাজিন। তার ভাষ্য, মুগানিহ যে চেহারায় ইউরোপে যায় লেবাননে ফিরে আসে ভিন্ন এক চেহারায়। মোসাদের জন্য এটা একটা নতুন চ্যালেঞ্জে পরিণত হল। ইউরোপ জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করল।
অভাবনীয় ঘটনা ঘটে বার্লিনে। ব্রিটিশ লেখক গর্ডন থমাস লিখেছেন: বার্লিনে নিযুক্ত মোসাদের আবাসিক গোয়েন্দা রেওভেনের সাথে এক জার্মান ইনফরমারের সাক্ষাৎ ঘটে। এই সোর্স সাবেক পূর্ব বার্লিনের লোকদের সাথে ব্যাপক যোগাযোগ রাখতেন। ঐ ইনফরমার জানান, মুগানিয়া সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক সার্জারী করেছেন। এর ফলে তাকে আর চেনাই যায় না। এই সার্জারী হয়েছে স্টাসি নাম একটি ক্লিনিকে। এক সময় এর মালিকানা ছিল সাবেক পূর্ব জার্মান গোয়েন্দা বিভাগের হাতে। স্টাসি তাদের নিজস্ব লোকদের প্রয়োজনে চেহারা বদলে দেয়। পূর্ব জার্মানীর বহু গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসীকে এভাবে চেহারা বদল করে পশ্চিমে মিশনে পাঠানো হত।
ব্যাপক দরকষাকষি ও দেন দরবারের পরে মোসাদ গোয়েন্দা রেওভেন ঐ জার্মান সোর্সকে ভাল টাকা দিতে রাজি হন। অতপর জার্মান সোর্স মুগনিয়ার ৩৪টি আপডেট ছবির একটি ফাইল রেওভেনকে দেন।
এরপর এই ছবি নিয়ে মোসাদ প্রধান দাগান তার দলবল নিয়ে গবেষণায় বসেন। ছবিগুলো পরীক্ষাকালে দেখা যায় মুগানিয়া তার চোয়ালের প্লাষ্টিক সার্জারী করেছেন। তার চোয়ালের নীচের অংশ কাটা হয়েছে। তার চেক লাইন সংকীর্ন করা হয়েছে। ফলে তাকে এখন আরও ইয়াং মনে হয়। সামনের দিকের অনেকগুলো দাঁত ফেলে দিয়ে সেখানে কৃত্রিম দাঁত বসিয়েছেন।
সে দাঁত আবার বিভিন্ন শেপের। চোখও বাদ যায়নি। চুল রং করে পাকিয়েছে। আই গ্লাস ফেলে দিয়ে কনট্যাক্ট লেন্স বসিয়েছেন। অর্থাৎ এক নতুন চেহারায় রূপান্তরিত হয়েছেন মুগানিয়ে। জার্মান ইনফরমারের কাছ থেকে ৮০ সালের পরের মুগনিয়ার যত ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল সেগুলো এখন অপাংতেয় হয়ে গেছে।
বিদেশী সূত্র মতে, মোসাদ অতঃপর মুগানিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। দাগান তার সেরা লোকদের একাজে ডাকেন। কায়েসাবেয়ার প্রধান কিডোন টিমের কমান্ডারসহ যারা মুগনিয়ার ফাইল দেখতেন তেমন বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হয় অমুসলিম কোন দেশে মুগনিয়াকে হিট করা যাবে না। কেননা তিনি পশ্চিমের দেশগুলোতে খুব বেশী যাতায়াত করেন না। একমাত্র ইরান ও সিরিয়ায় ভ্রমনে তিনি অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ইরান ও সিরিয়ায় মুগনিয়াকে হিট করা বেশ ঝুঁকিপূর্ন কাজ। একথা সত্য, অতীতে ইসরাইল আরব দেশসমূহে অভিযান পরিচালনা করেছে। বৈরুতে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। ইসরাইলী কমান্ডো তিউনিশিয়া অভিযান চালিয়েছে। তিউনেশিয়ার মাটিতেই তারা নেতা আবু জিহাদকে হত্যা করেছে। সমস্যা হল তেহরান ও দামেস্ক অনেক বেশী সন্দেপ্রবন ও ঝুঁকিপূর্ণ। বৈরুত অথবা তিউনিশিয়ার চেয়ে সিরিয়া ও ইরানের সমর শক্তিও বহু গুন বেশী। এদিকে মোসাদ প্রধান দাগান জানেন। যদি এই অভিযান সফল হয় তার প্রভাব পড়বে সুদূরপ্রসারী। ভয়ংকর সন্ত্রাসী মুগানিয়াকে দামেস্কে হত্যা করা হলে প্রমাণিত হবে মোসাদের হাত খুব লম্বা। এর ফলে ইসরাইল বিরোধি সব নেতারা নিরাপত্তাহীনতায় যেমন ভুগবে তেমনি কনকিউশানও বহুগুন বৃদ্ধি পাবে। ছড়িয়ে পড়বে আতঙ্ক।
লন্ডন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার ভাষ্য হল, মোসাদের সদর দফতরের সবার মাধ্যমে যে পরিকল্পনা গৃহীত হয় তা মূলত ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুগানিয়ার দামেস্কে আসাকে কেন্দ্র করে। যদি তিনি না আসেন? প্রকৃতপক্ষে ঐদিন তার আসার কারণ হল, ইরানের বিপ্লব দিবসকে সামনে রেখে সিরীয়া ও ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রয়েছে। অতঃপর মুগানিয়ার আসার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা পরীক্ষা নিরীক্ষা হল। সিদ্ধান্ত হয় মুগনিয়ার গাড়ির গা ঘেষে একটি সুসজ্জিত গাড়ি রাখা হবে।
মোসাদ অতঃপর দেশ বিদেশের নানা গোয়েন্দা সূত্র থেকে মুগনিয়ার আগমন নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠল। যদি তিনি আসেনই তাহলে কোন পরিচয় তিনি মুখ্য করে দেখাবেন, তার গাড়িটি কেমন হবে, তিনি কোথায় অবস্থান করবেন, তার সফরসঙ্গী কে হবেন-এনিয়ে ভেবে ভেবে মোসাদের লোকজনের গলদঘর্ম হওয়ার উপক্রম হল। সিরিয়া ও ইরানের কর্মকর্তাদের সাথে পূর্বপরিকল্পিত বৈঠকটি কখন শুরু হবে এ নিয়েও মোসাদের কম দুঃশ্চিন্তা ছিল না। তার আগমনের বিষয়টি কী সিরিয়া কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, হিজবুল্লাহ নেতারা কী তার আগমনের ব্যাপারে কিছু জানে; এমনতরো প্রশ্ন আলোচিত হয়।
মুগানিয়াকে একেবারে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি একটি বিশ্বস্ত সূত্রে থেকেও জানা যায়। সূত্রটি মুগানিয়ার দামেস্কে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
এই তথ্য যে সঠিক তারও সত্যতা মিলে যায়। লেবাননের পত্রিকা এল বালাদও সত্যতা নিশ্চিত করে।
গোয়েন্দা সংস্থা কায়েসারেয়ার মেশিনপত্র প্রয়োজনীয় পয়েন্ট বসানো হয়েছে। কিডোন টিম দামেস্কে এসে পৌঁছেছে। সিরিয়ার রাজধানী থেকে ইসরাইলী গোয়েন্দারা ব্যাপক পরিমাণ বিস্ফোরক চোরাই পথে সংগ্রহ করে ফেলেছে।
অবশেষে মোসাদ জানতে পারল মুগানিয়াকে নিয়ে বিস্ফোরক একটি খবর। মোসাদের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জানায়, মুগানিয়া যখনই দামেস্কে আসেন তার মিসট্রেসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই প্রথমবারের মত মোসাদ জানতে পারল মুগানিয়ার একটা গোপন জীবন রয়েছে। এই সুন্দরী রমনী শহরের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে মুগানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। সুন্দরী মুগানিয়ার আগমনের সংবাদ অবশ্যই আগে ভাগে জানেন। বৈরুতে অথবা তেহরান থেকেই এই খবর এসেছে। মুগানিয়া তার প্রিয় বান্ধবীর কাছে যখন যান তখন তার ড্রাইভার বা দেহরক্ষী কিছুই থাকে না। বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বরত গোয়েন্দাদের বার্তা দিয়ে তাদের সতর্ক করা হল। এবারও কী মুগানিয়া তার প্রেমিকার বাড়িতে যাবেন? বাড়ির মালিক কী জানেন যে, মুগানিয়া আসছেন?
অভিযানের প্রাক্কালে হিট টিমের সদস্যরা দামেস্কে আসে। তারা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে আসে ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে। ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী হিট টিমে ছিল তিন জন। একজন এল এয়ার প্যারিস থেকে। দ্বিতীয় জন আসে ব্রিটেন থেকে এবং তৃতীয় জন আসেন আম্মান থেকে রয়‍্যাল জর্ডানিয়ান প্লেনে। কাগজপত্র জাল করে ব্যবসায়ী হিসেবে তারা দামেস্কে ঢোকে। দু'জন গাড়ির ব্যবসায়ী আরেকজন ট্রাভেল এজেন্টের পরিচয় দেয়। আসার সময় তারা ডিক্লারেশন দেয় স্বল্প সময়ের ভ্যাকেশনে তারা সিরীয়া এসেছে।
ফলে ইমিগ্রেশনে তাদের কোন সমস্যা হয়নি। তারা শহরে বিচ্ছিন্ন ভাবেই ছিল। যখন দেখল কেউ তাদের ফলো করছে না তখন তারা একত্রে মিলিত হয়। তারা তাদের কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে। তারা আবার এসেছে বৈরুত থেকে। তাদের একটি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে একটি ভাড়া গাড়ি অপেক্ষমাণ ছিল। এর সাথে ছিল বিস্ফোরক।
তিন গোয়েন্দা ঐ গ্যারেজে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। বিস্ফোরক প্রস্তুত করে ভাড়া করা গাড়িতে তা তোলা হয়। এই বিস্ফোরণের সাথে চার্জ তখনো জুড়ে দেয়া হয়নি।
মোসাদের আরেকটি টিম বৈরুত থেকে মুগানিয়ার আগমনের অপেক্ষায় ছিল। তাদের কাজ ছিল মুগানিয়ার বান্ধবীর বাড়িতে তিনি ঢুকলেন কী না তা লক্ষ্য রাখা এবং তার ঐ গাড়ি ত্যাগের ব্যাপারে রিপোর্ট করা। এই টিমটি মুগানিয়াকে যথার্থভাবে ফলো করে। মুগানিয়া যে মিটিংয়ে গেছেন সে তথ্যও তারা জানায়। যেসব লোকের সাথে মুগানিয়া বৈঠক করেন তাদের মধ্যে ছিলেন দামেস্কে ইরানের নতুন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যবান ব্যক্তি জেনারেল মোহাম্মদ সুলাইমান।
জেনারেল সুলাইমান ইরান ও সিরিয়া থেকে হিজবুল্লাহকে অস্ত্রসরবরাহের ক্ষেত্রে প্রধান ব্যক্তি। সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনেও তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি এই ঘটনার পরে মাত্র ৬মাস বেঁচেছিলেন। এক ডিনার পার্টিতে মোসাদের লোকজন তাকে গুলি করে হত্যা করে।
যে স্থানে মুগানিয়ার ইরান ও সিরিয়ার কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক তার কাছেই ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানে ইরানের বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। মুগানিয়া ঐ উৎসবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং দামেস্ক ছেড়ে যেতে মনস্থ করেন।
১২ ফেব্রুয়ারি মোসাদ টিম পূর্ব পরিকল্পিত অবস্থানেই ছিল। মুগানিয়ার বান্ধবীর বাড়িকে কেন্দ্র করে ওয়াচার টিমও অবস্থান নেয়। এটাই মুগানিয়ার প্রথম গন্তব্য স্থল। অপরাহ্নে গোয়েন্দারা জানায় যে, মুগানিয়া তার প্রেমিকার বাড়িতে। এক পর্যায়ে তারা আরও জানায় মুগানিয়া তার পরবর্তী গন্তব্যের জন্য তৈরি হচ্ছেন। গোয়েন্দারা আশা করছে এটাই হয়ত মুগানিয়ার শেষ যাত্রা।
মুগানিয়ার পাজেরো যেখানে রাখা হতে পারে সেখানে একটি ঝকমকে গাড়ি আগে থেকেই রাখা ছিল। প্রতি মুহূর্তে মুগানিয়ার তথ্যাদি পাঠানো হচ্ছে বহুদূরে সিনিয়র গোয়েন্দাদের কাছে। ঝকমকে গাড়িটি যারা রেখেছিল তারা আর সেখানে নেই বিমানবন্দরের দিকে চলে গেছে। এদিকে ইলেকট্রনিক সেন্সর মুগানিয়ার গাড়ি ফলো করে চলেছে। গাড়িটি থামল। মোসাদের এক সহযোগী মুগানিয়ার গাড়ির পাশে নতুন গাড়িটি নিয়ে রাখল।
রাত ১০টা বাজার সামান্য আগে ককরসৌসা এলাকা কাপিয়ে বিরাট এক বিস্ফোরণ ঘটল। ইরানী স্কুলের কাছেই স্থানটি। স্কুলটি অবশ্য ফাঁকা ছিল। যাহোক যে মুহূর্তে মুগানিয়া গাড়ি থেকে বেরুলেন তখনই তার পাশের গাড়িটি বিস্ফোরিত হয়। মুগানিয়া মারা যান।
তার মৃত্যুতে হিজবুল্লাহর শীর্ষ পর্যায়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সিরিয়ার সরকারের জন্যও এটি একটি বড় ধাক্কা।
মুগানিয়ার মৃত্যুর ছয় মাস পর ২০০৮ সালের নভেম্বরে লেবানন সরকার ঘোষণা করে যে, তার মৃত্যুর নেপথ্যে মোসাদের একটি গোয়েন্দা গ্রুপ কাজ করেছে। এ ঘটনায় ৫৫ বছর বয়স্ক আলী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। সাত হাজার ডলার বেতনে আলী মোসাদের পক্ষে ২০ বছর ধরে গোয়েন্দাগিরি করে আসছিল। সে মোসাদের হয়ে প্রায়ই সিরীয়া আসত মুগানিয়াকে হত্যার কিছু দিন আগে ঐ এলাকায় সে গিয়েছিল বলে অভিযোগ আনা হয়। লেবাননের গোয়েন্দারা আলীর কাছ থেকে অনেক যন্ত্রপাতি, ভিডিও ও ক্যামেরা ইত্যাদি তার গাড়ি থেকে আটক করে।
জিজ্ঞাসাবাদে আলী স্বীকার করে যে, মোসাদের নির্দেশ মত ছবি তোলা, নজরদারি করা, মুগানিয়ার প্রেমিকার বাড়ি ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব সে পালন করেছে। ইসরাইল মুগানিয়ার হত্যার সাথে তাদের যোগসূত্র থাকার কথা অস্বীকার করে। কিন্তু হিজবুল্লাহ মুগানিয়াকে শহীদ হিসেব অভিহিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট হিজবুল্লাহর বক্তব্য খন্ডন করে মুগানিয়াকে একজন ঠান্ডা মাথার খুনী হিসেবে অভিহিত করে। তার বিরুদ্ধে গনহত্যাসহ অসংখ্য হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে।
মককোরামাক মন্তব্য করেন মুগানিয়াকে ছাড়াই বিশ্ব এখন অনেক ভাল আছে।

📘 মোসাদ > 📄 ফ্রম নর্থ কোরিয়া উইথ লাভ

📄 ফ্রম নর্থ কোরিয়া উইথ লাভ


লন্ডনে ২০০৭ সালের চমৎকার একটি দিন। সেখানকার কেনসিংটন হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে এক লোক গেটে অপেক্ষমাণ একটি গাড়িতে উঠলেন। ভদ্রলোককে সিরিয়ার একজন সিনিয়র অফিসার এবং ঐ দিনই তিনি দামেস্ক থেকে লন্ডনে এসেছেন। এখন যাচ্ছেন একটা মিটিংয়ে।
ভদ্রলোক হোটেল ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু'ব্যক্তি যারা কিছুটা দূরে অবস্থান করছিলেন তারা দ্রুত উঠে আসলেন। তারা জানেন কোথায় যেতে হবে। সিরীয় ঐ লোকের রুমে পৌছে গেলেন ঐ দুই যুবক। একটা বিশেষ ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মাধ্যমে তারা সিরিয়া নাগরিকের রুমটি খুলে ফেললেন। তাদের প্রশিক্ষণ হল মেথেডিক্যালি রুম সার্চ করার। কিন্তু এখানে সহজেই সব পাওয়া গেল। ডেস্কে ছিল একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার। দু'যুবক ল্যাপটপ মুহূর্তের মধ্যে চালু করলেন। বিশেষজ্ঞদের মত একটা সফিসটিকেটেড সফটওয়ার তার মধ্যে ঢোকালেন। কম্পিউটারের মেমোরিতে যা ছিল তার সবই কপি হয়ে গেল। যব ডান। অর্থাৎ কাজ শেষ। দু'ব্যক্তিই কাজ শেষে সটকে পড়লেন এবং কেউই তাদের চিনতে পারলেন না। তেলআবিবে মোসাদের বিশেষজ্ঞ কম্পিউটারের ফাইলগুলো দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। ফাইলে তথ্য, ছবি, ম্যাপ ইত্যাদি ছিল। তথ্যাদি থেকে দেখা গেল সিরিয়া সরকার মরুভূমির প্রত্যন্ত এলাকায় পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপন চূড়ান্ত করেছে। উত্তর কোরিয়ার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সিরিয়ার কর্মকর্তাদের বৈঠকের ছবি ও তথ্যাদি ঐ কম্পিউটারে ছিল। যে দু'জন লোকের ছবি এই কম্পিউটারে ছিল তাদের একজন নর্থ কোরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের, আরেকজন সিরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের পরিচালক- ইব্রাহিম ওথাম।
কম্পিউটারের কিছু তথ্য ছিল অসম্পূর্ণ। যেসব তথ্যও ২০০৬-০৭ সালের মধ্যে ইসরাইলের হাতে চলে এল। তথ্য-উপাত্তে দেখা গেল সিরিয়ার সরকার প্রচণ্ড গোপনীয়তার সাথে মরুভূমির দিল আল জুর এলাকায় পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জায়গাটি তুরস্ক সীমান্তের কাছেই। তবে ইরাক থেকে কয়েকশ মাইল দূরে। তথ্যাদি ঘেঁটে সর্বোচ্চ কৌতূহল উদ্দীপক যা পাওয়া গেল তা-হল, সিরিয়ার এই পরমাণু কেন্দ্রের পরিকল্পনাকারী ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া এবং টাকা ঢালছে ইরান।
সিরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার গভীর বন্ধুত্বের শুরু ১৯৯০ সালে। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম উলসুং, ঐ সময় সিরিয়া সফর করেন। তার সফরকালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের আগ্রহে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে সামরিক ও কারিগরি সহায়তার কথাও ছিল। এমনকী দুই সরকার প্রধানের বৈঠকে পারমাণবিক ইস্যুও প্রাধান্য পায়। আসাদ অবশ্য পারমাণবিক প্রকল্পটিকে দুই নম্বর এজেন্ডায় রেখেছিলেন। তার কাছে অগ্রাধিকার ছিল রাসায়নিক ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের। আসাদ রাশিয়ার পারমাণবিক চুল্লী কিনবেন না বলেও উল্লেখ করেন। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডেজার্ট স্ট্রমের অভিযানকালে নর্থ কোরিয়ার স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের একটি চালান প্রথম বারের মত সিরিয়ার পৌঁছায়। এই খবর সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দফতরে। বেশ কয়েকজন জেনারেল স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সচল করার আগে তা ধ্বংসের পক্ষে মত দেন। কিন্তু আপত্তি তোলের ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এই অঞ্চলে আবার এই ঘটনায় অস্থির হয়ে ওঠুক তিনি তা চাইছিলেন না।
২০০০ সালে হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর তার ছেলে বাশার আল আসাদের সাথে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি দলের একটি বৈঠক হয়। সভায় সিরিয়ার পারবাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০০২ সালের জুলাইয়ে সিরিয়ার দামেস্কে সিরিয়ার সিনিয়র কর্মকর্তা, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে অত্যন্ত গোপনে একটি বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তিও সম্পাদিত হয়। পুরো প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয় দুই বিলিয়ন ডলার।
এর পরবর্তী পাঁচ বছর দামেস্কে থেকে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে যে কৌশলপূর্ণ বিক্ষিপ্ত বা ছিটে ফোটা সংবাদ এসেছে তা সিআইএ কিম্বা মোসাদ কারো পক্ষেই হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হয়নি। অনেক বিপজ্জনক বার্তা ঐ দুই সংস্থা আমলে নিতে ব্যর্থ হয়। প্রাপ্ত তথ্যাদির গুরুত্ব আমেরিকার গোয়েন্দারা যেমন উপলব্ধি করতে পারেনি তেমনি মোসাদ এবং আমান তাদের পূর্ববর্তী ধারণার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মোসাদরা মনে করেছিল সিরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর ইচ্ছা যেমন নেই তেমনি তারা এক্ষেত্রে অক্ষম। এমনকী মোসাদের এই ভ্রান্ত ধারণাকেও কেউ পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি। অথচ সিরিয়ার অনেক কার্যক্রমই ছিল সন্দেহজনক। যেমন ২০০৫ সালে সিমেন্টবাহী একটি কার্গো জাহাজ উত্তর কোরিয়া থেকে সিরিয়ায় যাওয়ার পথে ইসরাইলের উপকূলীয় এলাকায় ডুবে যায়। ২০০৬ সালে আরেকটি উত্তর কোরিয়ার কার্গো ভেসেল সাইপ্রাসে আটক হয়। এই জাহাজে ছিল পানামার পতাকা। আরেকটি জাহাজের কর্মকাণ্ডও ছিল অনুরূপ। প্রকৃতপক্ষে সিমেন্টের আড়ালে উত্তর কোরিয়া থেকে সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নেয়া হচ্ছিল। অবশেষে ২০০৬ সালের শেষের দিকে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীরা সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচীর অবকাঠামোগত উন্নতি পরিদর্শনে দামেস্কে যায়। ইসরাইল ও আমেরিকার গোয়েন্দারা ইরানীদের সিরীয় সফর সম্পর্কে জানলেও এর সাথে দামেস্কের দির আলজুর নামের পারমাণবিক প্রকল্পের যোগসূত্র অনুধাবনে ব্যর্থ হয়।
দির আলজুর পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যাপারে সিরিয়া ছিল অতিমাত্রায় সতর্ক। প্রকল্প এলাকায় সকল রাস্তাঘাট তারা বন্ধ করে দিয়েছিল। এখানে কর্মরত স্টাফদের মোবাইল ফোন ও স্যাটেলাইট কর্মকাণ্ড চালানো ছিল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ওই পরমাণু কেন্দ্রের ব্যাপারে স্পেস থেকেও কোন কিছু চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
২০০৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ্যের দাবিদার। তাকে দেখা গেল দামেস্ক বিমান বন্দরে। তার নাম আলী রেজা আসগরী। তিনি একজন ইরানী জেনারেল এবং সাবেক প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। ইরানের রেভিল্যুশনারি গার্ডেরও তিনি একজন নেতা। দামেস্ক এয়াপোর্টে তিনি একটি সংবাদ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। সংবাদটি হল তার পরিবার ইরান ত্যাগ করতে পেরেছে কীনা। পরিবারের ইরান ত্যাগের খবর পাওয়ার পরেই আসগরী তুরস্কের পথে উড়ে যান। ইস্তাম্বুলে পৌঁছেই তিনি গায়েব হয়ে যান।
এক মাস পরে জানা যায়, আসগরী স্বপক্ষ ও স্বদল ত্যাগ করে সিআইএ ও মোসাদের পরিকল্পনুযায়ী পশ্চিমের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। জার্মানীতে একটা মার্কিন ঘাঁটিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তিনি অনেক তথ্য তাদের কাছে ফাঁস ও প্রত্যর্পণ করেন। সেখানে তিনি সিরিয়ার ও ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের খবরাদি দেন এবং উত্তর কোরিয়া যে আলোচ্য পরমাণু কেন্দ্র নির্মাণের সাথে যুক্ত তা জানান। তিনি আরও জানান যে, সিরিয়ার দির আলজুর পরমাণু প্রকল্পে ইরান যে শুধু অর্থায়নই করছে তা নয়, এই প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শেষ হতে পারে সে লক্ষ্যেও ইরান কাজ করছে। আসগরী সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্যাদি সিআইএ ও মোসাদকে সরবরাহ ও ইরানের জড়িতদের নাম-ধামও সরবরাহ করেন।
এই নতুন তথ্য মোসাদের মাথা খারাপ করে দেয়। মোসাদ এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন মোসাদের প্রধান ছিলেন মেইর দাগান। বিদেশি সূত্র থেকে জানা যায়, দাগান আসগারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে তার গোয়েন্দাদের নির্দেশ দেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানসহ সবগুলো গোয়েন্দা বিভাগের সাথে বৈঠক করে সিরিয়ার দির আলজুর পরমাণু কেন্দ্রের ব্যাপারে অভিযান পরিচালনার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিরিয়া সম্পর্কে ইসরাইলের দৃষ্টিভঙ্গি হল, সিরিয়া হল তাদের আগ্রাসী জাতশত্রু; তারা নির্দয় ও নিষ্ঠুর। তাদের পারমাণবিক বোমার মালিক হতে দেয়া যায় না কোনমতেই। আসগারীর দল ত্যাগের ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় মোসাদের হাতে চলে আসে সিরিয়ার সেই অফিসারের ল্যাপটপ। হোটেল থেকে যা চুরি করা হয়েছিল। মোসাদ ও আমান প্রধান এখন সেই ল্যাপটপ প্রধানমন্ত্রী ওলমার্টের সামনে উপস্থাপনে সমর্থ হবেন।
কিছুদিনের মধ্যেই ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ প্রধান দাগন বলতে গেলে আরেকটি অভ্যুত্থানের মত ঘটনা ঘটান। একটি বোল্ড ও সৃজনশীল অপারেশনের মাধ্যমে সিরিয়ার প্রকল্পের যাবতীয় ছবি ও তথ্যাদি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। মোসাদের এক কেস অফিসারকে দিয়ে কাজটি করানো সম্ভব হয়।
কেস অফিসার সিরিয়ার পরমাণু প্রকল্পের এক বিজ্ঞানীর মাধ্যমে নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলান। প্রকৃতপক্ষে এই বাস্তব ছবিগুলোই প্রথমবারের মত মোসাদের হস্তগত হয়।
মোসাদ প্রাপ্ত তথ্যাদি পুরোপুরোই আমেরিকাকে অবহিত করে। এমনকী আমেরিকাকে স্যাটেলাইট ছবি এবং সিরীয় ও উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের মধ্যকার ফোন কলের বিবরণাদিও সরবরাহ করে। অতঃপর ইসরাইলের মরীয়া চাপের মুখে আমেরিকা তার স্যাটেলাইট সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্রের ওপর নিবদ্ধ করে। ইসরাইল ও আমেরিকা অতঃপর সিদ্ধান্তে আসে সিরিয়া যে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিপজ্জনকভাবে পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের কাজ করছে।
২০০৭ সালের জুনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ওলমার্ট উড়ে যান ওয়াশিংটনে। সাথে তার যাবতীয় তথ্যাদি। প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি তাকে জানান, ইসরাইল সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওলমার্ট প্রেসিডেন্ট বুশকে সিরিয়ার পরমাণু স্থাপনার উপর বিমান হামলা চালাতে বলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট এতে আপত্তি জানান। আমেরিকার সূত্র মতে, হোয়াইট হাউজ চুল্লীর উপর আক্রমণ চালাতে অনাগ্রহী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস ইসরাইলকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, সিরিয়ার সাথে কনফ্রন্টে যান কিন্তু আক্রমণ নয়। বুশ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টীভ হ্যাডলি নীতিগতভাবে সামরিক অভিযানের ব্যাপারে ইসরাইলের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেন কিন্তু আরও তথ্য যাচাইপূর্বক হামলার কথা বলেন। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে ইসরাইল সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীর ছবি তুলতে উচ্চমাত্রার স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। এসব ছবি মার্কিন ও ইসরাইল প্রত্যক্ষ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের অনুরূপ হুবহু একটি কেন্দ্র তৈরিতে সিরিয়া হাত দিয়েছে। ইসরাইল আমেরিকাকে আরও দেখায় যে, উত্তর কোরিয়া এবং সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীও একই অবয়ব ও ধাচের। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সিরিয়ার চুল্লীতে উত্তর কোরিয়ার প্রকৌশলীরা কাজ করছে।
ইসরাইলের অপর গোয়েন্দা সংস্থা আমান উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়ার মধ্যকার যাবতীয় কথোপকথনের বিবরণ লিখে জমা দেয়। উল্লেখিত সব তথ্য উপাত্তই ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়। কিন্তু আমেরিকা আরও প্রমাণ চাইছিল। আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে চায় যে, ওগুলো পারমাণবিক চুল্লী কীনা এবং রেডিওএকটিভ সামগ্রী সেখানে আছে কীনা। ইসরাইল অনন্যোপায় হয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ মনোনিবেশ করে।
২০০৭ সালের আগষ্টে ইসরাইল নিশ্চিত হয় যে, সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্রের চুল্লীটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতেই ব্যবহৃত হবে। ইসরাইল তাদের একটি এলিট কমান্ডো বাহিনী পাঠায় সিরিয়ায়। নাম সায়েরেত মাটকাল। এই অভিযানে ইসরাইলী সৈন্যদের ব্যাপক জীবনের ঝুঁকি ছিল। রাতের বেলা এই বাহিনী দুটি হেলিকপ্টারে সিরিয়ায় রওয়ানা হয়। ইসরাইলী সৈন্যদের গায়ে সিরিয়ার সোনাবাহিনীর পোশাক। ইসরাইলী সৈন্যরা জনবহুল এলাকার সামরিক ঘাঁটি, এবং রাডার স্টেশনকে এড়িয়ে দির আলজুর প্রকল্পের কাছাকাছি একটা জায়গায় অবস্থান নেয়। তারা চুল্লী এলাকায় কাছাকাছি যায় এবং চুল্লী এলাকায় মাটি সংগ্রহ করে। ইসরাইলে ফিরে এসে সেই মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায় তা অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয়। এর অর্থ হল তেজস্ক্রিয় পদার্থ ঐ এলাকায় বিদ্যমান।
উল্লেখিত নতুন প্রমাণাদি যুক্তরাষ্ট্রের স্টীভ হ্যাডলিকে দেয়া হয়। তার সহকারীরা এই মাটি পরীক্ষা করে যে রিপোর্ট দেয় তাতে হ্যাডলি তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকার প্রমাণ পেয়ে যান। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় হেডলি ওভাল অফিসে প্রত্যহিক বিফ্রিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিষয়টি অবহিত করবেন। হেডলি অতঃপর দাগানের সাথেও কথা বলেন। উভয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী স্পষ্টতই বর্তমানে বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অতঃপর এই চুল্লী ধ্বংসে রাজি হয় এবং দির আল জুর অভিযানের নাম দেয়া হয় দ্যা অরচার্ড। এ ব্যাপারে জর্জ ডব্লিউ বুশ তার বইয়ে লিখেছেনঃ আমরা সিরিয়ার চুল্লীতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত কিছুদিনের জন্য নিয়েছিলাম। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা টিমের সাথে আলোচনা করে এর বিকল্প নিয়েও কথা হয়। অতঃপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিরিয়ার প্রকল্পে হামলা চালানোর বিরোধিতা করেন। কেননা তিনি মনে করলেন, একটি স্বাধীন দেশে বোমা ফেলা হলে বিশেষ করে সিরিয়াকে সতর্ক না করে এবং বোমা ফেলার যৌক্তিকতা তুলে না ধরলে পাল্টা আঘাতের আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রেসিডেন্ট সিরিয়ার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গোপন অভিযান পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেন।
পরবর্তীতে ইসরাইলী প্রেসিডেন্ট ওলমার্ট প্রেসিডেন্ট বুশকে ফোন করে সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী ধ্বংস করতে বলেন। ওলমার্ট ও বুশের ফোনালাপের সময় ওভাল অফিসে তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস, ভাইস প্রেসিডেন্ট চেনি, হ্যাডলি এবং তার ডেপুটি এলিয়ট আবরামস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কন্ডোলিসা রাইস পরিষদবর্গকে বোঝাতে রাজি হন যে, ইসরাইলের দাবি প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া উপায় নেই।
এই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও ওলমার্টের মধ্যে যে কথা হয়, তা নিম্নরূপঃ ওলমার্ট বলেন, জর্জ আমি আপনাকে সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীতে বোমা ফেলার জন্য বলছি।
বুশঃ আমি একটি স্বাধীন দেশে বোমা ফেলার যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না। যতক্ষণ না আমার গোয়েন্দারা নিশ্চিত না হন যে, ওখানে অস্ত্র উৎপাদনের কর্মসূচী নেয়া হয়েছে।
ওলমার্টঃ আপনার কৌশল আমার কাছে খুব বিরক্তিকর বা ডিসটারবিং মনে হচ্ছে। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ওলমার্ট আরও বলেন, আমি তাই করব, আমি যা বিশ্বাস করি। ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। বুস পরবর্তীতে ওলমার্টের সাহস আছে। এ কারণেই আমি লোকটাকে পছন্দ করি।
লন্ডনের সানডে টাইমস এ নিয়ে রিপোর্ট করে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ওলমার্ট অতঃপর তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপ্লি লিভনির সাথে বৈঠক করেন। গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানেরাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য এবং সামরিক অভিযান নিয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত হতে পারে তা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লী ধ্বংস করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধি দলীয় নেতা নেতানিয়াহুকে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানালে তিনিও কর্মসূচীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
সিরীয় আক্রমণের তারিখ চূড়ান্ত হয় ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে। আনুষ্ঠানিক বোমা ফেলার আগের দিনের কী কী কর্মসূচী পালিত হয় সে নিয়ে রিপোর্ট করেছে সানডে টাইমস। পত্রিকাটি লিখেছে ইসরাইলের কিং ফিশার নামের আরেকটি এলিট কমান্ডো ইউনিট দির আল জুর এলাকায় পৌঁছায়। সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীর কাছাকাছিতে তারা পুরো একটা দিন অতিবাহিত করে। তাদের মিশন ছিল লেসার বীমের সাহায্যে সিরিয়ার চুল্লী ধ্বংস, একই সাথে বিমান বাহিনীর জেটগুলো যাতে টার্গেটে সরাসরি আঘাত হানতে পারে। সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে রাত সাড়ে ১১টায় রামাত ডেভিট বিমানবন্দর থেকে টেন এফ-ফিকটিন জেট বিমান পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে। ত্রিশ মিনিট পরে ৩টি বিমানকে ঘাটিতে ফিরে আসতে বলা হয়। বাকী ৭টি জেট বিমানকে তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তের দিকে যেতে বলা হয়। পরবর্তীতে তারা দক্ষিণ অভিমুখে দির আল জুর যাবে। পথে তারা একটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করে যাতে সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙ্গে পড়ে এবং বিদেশি বিমানের আগমনকে চিহ্নিত করতে না পারে। এক মিনিটের মধ্যে বিমানগুলো দির আল জুর এলাকায় পৌঁছে যায় এবং সতর্কতার সাথে ক্যালকুলেটেড দুরত্বে অবস্থান নেয়। তারা আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে। আধা টন ওজনের বোমা মারে। ইসরাইলকে ধ্বংস করার জন্য সিরিয়া যে আনবিক বোমা বানাচ্ছিল ইসরাইলের হামলার মুখে মুহূর্তের মধ্যে তা ধ্বংস হয়ে গেল।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ওলমার্ট সিরিয়ার পাল্টা আক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি অনতিবিলম্বে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের সাথে যোগাযোগ করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রতি একটা বার্তা পাঠান। ওলমার্ট যে বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে চাইছিলেন তাহলো সিরিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কোন ইচ্ছে ইসরাইলের নেই। কিন্তু তার দ্বারপ্রান্তে তিনি আণবিক বোমার অধিকারী সিরিয়াকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
ওলমার্টের এই পুনঃ প্রতিশ্রুতির কোন দরকার ছিল না বলে প্রমাণিত হয়েছে। বোমা ফেলা শেষে সিরিয়া পুরোপুরি নিশ্চুপ ছিল। সরকারি তরফ থেকে একটি বাক্য পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। ঐ দিন বিকাল ৩টায় সিরিয়ার বার্তা সংস্থা একটা সরকারি ভাষ্য প্রচার করে। এতে বলা হয়, ইসরাইলি যুদ্ধ বিমান রাত একটার দিকে সিরিয়ার আকাশীমায় প্রেনিট্রেড করে। সিরিয়ার বিমান বাহিনী তাদের বাধ্য করে ফিরে যেতে। ইসরাইল একটা মরু এলাকায় বোমাবর্ষণ করে। এতে অবশ্য কোন প্রাণহানি হয়নি এবং কোন যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি সাধিত হয়নি।
বিশ্ব মিডিয়া এই সময় জানার জন্য উদ্যেগী হয়ে ওঠে যে, মোসাদ কী করে সিরিয়ার আনবিক কেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে পারল তা জানতে। এবিসি টেলিভিশন রিপোর্ট করে যে, সিরিয়ার চুল্লীর অভ্যন্তরেই মোসাদ গোয়েন্দা নিয়োগ করেছিল অথবা কোন প্রকৌশলীর মাধ্যমে মোসাদ এই দুর্লভ ছবি-ভিডিও সংগ্রহ করেছে।
২০০৮ সালের এপ্রিলে অর্থাৎ সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীতে ইসরাইলের বোমা ফেলার প্রায় সাত মাস পরে মার্কিন প্রশাসন অবশেষে ঘোষণা করে যে, সিরিয়া উত্তর কোরিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণ করছে এবং এই প্রকল্প শান্তিপূর্ণ কোন কাজে নির্মিত হচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিরিয়ার চুল্লীতে ইসরাইলের বোমাবর্ষণের ঘটনায় ওলমার্টের প্রতি আস্থাশীল হয়ে উঠেছেন বলে প্রতীয়মান হল। কেননা, ২০০৬ সালে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধে ওলমার্টের ব্যাপারে আস্থা হারিয়েছিলেন বুশ। বুশের ধারণা ছিল তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিল ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা কংগ্রেসম্যান সিনটরদের পরমাণু কেন্দ্রের ছবি, স্লাইড ইত্যাদি দেখালে তারা বিস্মিত হন। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কাঠামো ও চুল্লীর সাথে সিরিয়ার প্রকল্পটির শতভাগ মিল।
ইসরাইল সিরিয়ার পরমাণু প্রকল্পে বোমা ফেলার বিষয়টি সপ্তাহ দু'য়েক গোপন রাখতে সক্ষম হলেও এবং চুল্লী ধ্বংসের কথা অস্বীকার করলেও বিরোধি দলীয় নেতা নেতানিয়াহু হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিলেন। এক লাইভ অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত নেয় আমি তাতে পূর্ণ সমর্থন দেই। সিরিয়ার হামলার ব্যাপারে আমি একজন অংশীদার। প্রথম থেকেই আমি সিরিয়ার হামলার ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি।
সিরিয়ার পরমাণু প্রকল্পের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ২০০৮ সালের ২ আগষ্ট। সিরিয়ার তারতাস পোর্ট থেকে সামান্য দূরে একটি বীচ হাউসের প্রশস্ত একটি বারান্দায় ঐ দিন জাঁকজমক ডিনার পার্টি দেয়া হয়েছিল। এই ভবনটি লাগোয়া জলরাশি। এখানকার পরিবেশ অতি মনোরম এবং আরামপ্রদ। এখানে বিশালাকায় টেবিলে অতিথিরা আরাম করে বসেছিলেন। এরা সকলেই বাড়ির মালিকের ঘনিষ্ঠজন। গৃহস্থের নাম জেনারেল মো. সুলইমান।
সুলাইমান প্রেসিডেন্ট আসাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক কাজগুলো তিনি তত্ত্বাবধান করেন। সিরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের চুল্লীসমূহের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বও ছিল তার উপর। সিরিয়ার ক্ষমতাসীনরা সুলাইমানকে প্রেসিডেন্ট আসাদের ছায়া বলেই গণ্য করতেন। প্রেসিডেন্ট আসাদের অফিসের প্রায় লাগোয়া একটি প্রাসাদে তার অফিস।
সিরিয়ার গণমাধ্যম তার নাম খুব একটা চাউর না করলেও মোসাদ ঠিকই জানত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। ফলে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাকে দিবারাত্রি ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করত। সুলাইমান দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র বাসেল আল আসাদের সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব জন্মায়। প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের প্রিয় পুত্র তিনি। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তারই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাসেল মারা যান। আসাদ তার ছোট ছেলে বাশারের সাথে সুলাইমানের পরিচয় করিয়ে দেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আসাদ ২০০০ সালে মারা গেলে বাশার আল আসাদ প্রেসিডেন্ট হন। বাশার সুলাইমানকে তার বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।
কিছুদিনের মধ্যেই সুলাইমান সিরিয়ার শীর্ষ ক্ষমতার ব্যক্তিতে পরিণত হন। প্রেসিডেন্ট বাশার সিরিয়ার স্পর্শকাতর সামরিক বিষয়টি তার উপর ছেড়ে দেন। এক পর্যায়ে সুলাইমান গোয়েন্দা বাহিনী সমূহ ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে লিয়াজোর কাজ করতেন। মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে গোপনে সহযোগিতার কাজটিও সুলাইমানের হাত দিয়ে সম্পন্ন হত। হেজবুল্লাহর সাথে সুলাইমানের সরাসরি যোগাযোগ ছিল এবং হেজবুল্লাহ প্রধান ইমাদ মুগনিয়াহর সাথে প্রায়শই বৈঠক করতেন। ইসরাইল ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের নিরাপত্তা জোন প্রত্যাহার করে নিলে অস্ত্র হস্তান্তরের দায়িত্ব বর্তায় সুলাইমানের হাতে। ইরান ও সিরিয়ার অস্ত্রাদি সুলাইমানই হেজবুল্লাকে দেন। বিশেষ করে দূরপাল্লার রকেটগুলো। ২০০৬ সালের দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের সময় এরকম একটি রকেট ইসরাইলে হাইকার রেলওয়ে ওয়ার্কশপে সরাসরি আঘাত হানলে ৮ জন লেবার নিহত হয়। পরবর্তীতে সুলাইমান হেজবুল্লাহকে সিরিয়ার নির্মিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র সরবরাহ করে। এর ফলে লেবাননে ইসরাইলের বায়ু সেনার কার্যক্রম ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
সুলাইমানের আরেকটি শীর্ষ পদ করায়ত্ত ছিল। সিরিয়ান রিসার্চ কমিটির একশ সিনিয়র সদস্য ছিলেন সুলাইমান। এই কমিটির কাজ ছিল দূরপাল্লার রকেট তৈরির ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র উৎপাদন পরামর্শ দান এবং পারমাণবিক গবেষণায় উত্তর কোরিয়ার সাথে যোগাযোগ তদারকি, সেখানকার পারমাণবিক চুল্লী ও স্পেয়ার পার্টস আমদানি এবং শিপমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে সুলাইমান নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন। সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লীতে কর্মরত উত্তর কোরিয়ার প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের কাজও তদারকি করতেন সুলাইমান।
সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংসের ব্যাপারটি সুলাইমানের জন্য ছিল বড় একটা আঘাত। প্রাথমিক শক কাটিয়ে উঠে সুলাইমান আরেকটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপনে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু সুলাইমানের জীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তার বদ্ধমূল বিশ্বাস জমেছিল যে, ইসরাইল ও মার্কিন গোয়েন্দারা তার মুন্ডু নিতে চাইছে। নতুন কিছু শুরু করার আগে সুলাইমান বেশ কিছুদিন নিজ প্রাসাদেই অবস্থান করেন। অতঃপর বীচের সেই বৃহৎ বারান্দায় তিনি বিশাল ভোজের আয়োজন করেন। এ আয়োজনের মূলে ছিল তার মানসিক চাপ কমানো।
বিশাল টেবিলের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে সুলাইমান বিশাল জলরাশি যে বীচে এসে আছড়ে পড়ছিল তা অবলোকন করছিলেন। কিন্তু দেড়শত গজ দূরে পানিতে ভাসমান নিশ্চল দুটি মানুষকে তিনি দেখতে পাননি। এই জুটির আগমন সাগর থেকে। একটি বোটে করে তাদের সুলাইমানের বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। এরা ইসরাইলি নেভাল কমান্ডো এবং শার্প সুটার। তাদের সাথে পানিতে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র। তারা ভাসতে ভাসতে সুলাইমানের বাড়ির বিপরীতে অবস্থান নেয়। তারা প্রথমে বাড়িটি পরে বারান্দায় পর্যবেক্ষণ করে। একবার টেবিলে বসা লোকদের পর্যবেক্ষণ করে তারা তাদের টার্গেটের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। জেনারেল সুলাইমান মেহমানদের মধ্যেই বসা ছিলেন।
রাত ৯টায় তারা বন্দুকের নিশানা ঠিক করে। বারান্দাটা ছিল কোলাহল পূর্ণ। নিমন্ত্রণ ছাড়া আগতদের কালো ডুবুরির পোশাক। তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছিল একমাত্র জেনারেল সুলাইমানকে যেন হত্যা করা সম্ভব হয়। অন্যদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। দুই আগন্তুক কয়েক কদম এগিয়ে সাইলেন্সার লাগানো অস্ত্র দিয়ে সুলাইমানের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে। তাদের গুলি ছোড়া এত ভয়াবহ ছিল যে, সুলাইমানের মাথা পেছনে হেলে যায় এবং শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে খাবার টেবিলের উপর পড়ে। অতিথিরা প্রথম দিকে কিছুই অনুমান করতে পারেননি। সুলাইমানের মাথা থেকে যখন গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছিল তখন অতিথিরা বুঝতে পারেন যে, সুলাইমানকে গুলি করা হয়েছে। কেউ কেউ সুলাইমানের সাহায্যে এগিয়ে এলেও এসব ক্ষেত্রে যা হয় তাহল অনেকেই আতঙ্কে হুড়োহুড়ি শুরু করে দিলেন। ইত্যাবসরে আগন্তুক দুই আততায়ী লাপাত্তা।
সানডে টাইমস এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন ছেপেছে তা প্রকৃত ঘটনার অনুগামী নয়। পত্রিকাটি লিখেছে শার্প সুটাররা ইসরাইলের নেভাল কমান্ডো ফ্লোটিলা ১৩ এর সদস্য। তারা সিরিয়ার উপকূলে এসেছে ইসরাইলের এক ব্যবসায়ীর প্রমোদ তরীতে করে। তারা সত্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আবার নোঙর তুলে চলে গেছে।
দামেস্কে যখন এই সংবাদটি পৌঁছাল তখন তা অনেকেরই মর্মপীড়ার কারণ হল। সিরিয়া সরকার বিষয়টি নিয়ে নীরবতা পালন করল এবং তেমন একটা প্রচারও পেলনা। সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। তাদের প্রশ্ন, হিট টিম কী করে টারটামে পৌঁছল। কেননা দামেস্ক থেকে তা ১৪০ মাইল দূরে অবস্থিত। তারা পালালো ও বা কী করে? সিরিয়ায় কী এমন একটি জায়গাও নেই যেখানে তাদের নেতারা নিরাপদ নন?
কয়েকদিন পর সিরিয়া সরকার সংক্ষিপ্ততম একটি বিবৃতি পাঠায়। সেখানে বলা হয়, সুলাইমানের হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সরকার তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু আরবের অন্যান্য দেশের গণমাধ্যম সিরিয়ার এই বিবৃতির জন্য কেউ অপেক্ষমাণ ছিল না। তারা সুলাইমানকে নিয়ে লাগাতার বিশাল বিশাল এবং বিস্তারিত নিউজ ছাপতে থাকে। কারা সম্ভাব্য হত্যাকারী সে সম্পর্কেও নানারকম আভাস দেয়। বলতে কী, অধিকাংশ আরব দেশই জেনারেল সুলাইমানকে হত্যার ব্যাপারে ইসরাইলের প্রতি ইংগিত করে। সিরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্র আল জুর এ চুল্লী স্থাপনে সুলাইমানের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে।
পশ্চিমা দেশের গোয়েন্দাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অবশ্য ভিন্নতর।

📘 মোসাদ > 📄 তেহরানে লাশের পাহাড়

📄 তেহরানে লাশের পাহাড়


২০১১ সালের ২৩ জুলাই ইরানের দক্ষিণ তেহরানের বনি হাশেম স্ট্রীটে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মোটরসাইকেলে এসে দুই বন্দুকধারী এক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তার বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তে গুলি করে হত্যা করে। চামড়ার জ্যাকেট থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বের করে হত্যা শেষে দু'আততায়ীই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহত ব্যক্তির নাম দারিওইউস রেজাই নাজাদ। বয়স ৩৫। তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের একজন প্রফেসর এবং ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তা।
ইরানের রেজাই নাজাদই প্রথম ইরানি বিজ্ঞানী নন যিনি এভাবে আততায়ীর হাতে খুন হলেন। সরকারি তকমা লাগিয়ে ইরান শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু টেকনোলজির উন্নয়নে ব্রতী ছিল। ইরান দাবি করে আসছিল, রাশিয়ার সহযোগিতায় তারা যে বুশহর চুল্লি নির্মাণে ব্রতী ছিল তার লক্ষ্য ছিল সৎ। কিন্তু এই বুশহর চুল্লির আড়ালে গোপনে ইরান পারমাণবিক আরও বেশ কিছু কার্যক্রম চালাচ্ছিল। ঐ চুল্লিতে ইরান শক্তিশালী প্রহরার অধীনে কাজ চালাত এবং সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল এককথায় কঠিন। সময়ের পরিবর্তনে ইরান তাদের আরও বেশ কিছু পরমাণু কর্মসূচির কথা স্বীকার করেছিল।
যদিও শুরুতে তারা পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ ও উন্নয়নের কথা অস্বীকার করেছিল। যদিও পশ্চিমা গোয়েন্দারা এবং ইরানের কিছু আন্ডার গ্রাউন্ড সংস্থা অভিযোগ করে আসছিল যে, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা ইরানের প্রথম পরমাণু বোমা বানানোর কাজে রত। এক্ষেত্রে একটাই পথ ছিল নৃশংস অভিযান চালিয়ে ইরানের গোপন পরমাণু কর্মসূচির কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দেয়া।
২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর। সময় সকাল পৌনে আটটা। স্থান উত্তর তেহরান। ইরানের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মজিদ শাহরিয়ার গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার গাড়ির পেছনের উইনশিন্ডে হেলমেট পরা মোটরসাইকেল আরোহণী ছোট্ট একটি যন্ত্র বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়। মুহূর্তের মধ্যে সে ডিভাইস বিস্ফোরিত হল। ৪৫ বছর বয়সী ড. মজিদ নিহত এবং তার স্ত্রী আহত হন। একই সময় দক্ষিণ তেহরানে আরেক মোটরসাইকেল থেকে ড. ফেরদাউন আব্বাসী দাভানীর গাড়িতে অনুরূপ ডিভাইস প্রতিস্থাপন করা হলে সেটিও বিস্ফোরিত হয় এবং ড. আব্বাসী ও তার স্ত্রী আহত হন। ড. আব্বাসী হলেন আরেকজন পরমাণু বিজ্ঞানী।
এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ইরান সরকার ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে দায়ী করে। উল্লেখ্য, এই দুই বিজ্ঞানী অত্যন্ত গোপনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ইরানের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান আলী আকবর সালেহী নিহত শাহরিয়ারকে 'শহীদ' আখ্যা দিয়ে বলেন, তারা মহৎ কাজের সাথেই যুক্ত ছিলেন। আর তা হল মানব কল্যাণ। সালেহী পারমাণবিক প্রকল্পের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ নিহত দুই বিজ্ঞানীকে অসম্ভব প্রতিভাধর আখ্যায়িত করে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। ইতিমধ্যে ডঃ আব্বাসী আরোগ্য লাভ করলে আহমেদিনেজাদ তাকে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইরানের বিজ্ঞানীদের যারা হত্যা করছিলেন তাদের পরিচয় কখনোই জানা যায়নি।
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি। সকাল সাড়ে ৭টা। উত্তর তেহরানের শরীয়তী স্ট্রীটের বাসা থেকে বের হয়ে গাড়ির লক খুলছিলেন প্রফেসর মামুদ আলী মোহাম্মদী। তার গন্তব্যস্থল ছিল শরীফ কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি।
যখনই তিনি তার গাড়ির লক খুলছিলেন তখন ভয়ংকর এক বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনী এসে দেখতে পায় মোহাম্মদীর গাড়ি বিধ্বস্ত এবং প্রফেসর মোহাম্মদীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে জানা গেল, প্রফেসর মোহাম্মদীর গাড়ির সাথেই লাগোয়া একটি মোটরসাইকেলে ব্যাপক পরিমাণ বিস্ফোরণ রাখা হয়েছিল। ইরানী গণমাধ্যম এবার তারস্বরে বলতে থাকে যে, মোসাদ এজেন্টরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ ঘোষণা করেন যে, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ইহুদিবাদী প্রক্রিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
৫৫ বছর বয়সী প্রফেসর মোহাম্মদী ছিলেন বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী এবং ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের একজন উপদেষ্টা। ইউরোপীয় মিডিয়া তাকে ইরানের রেভ্যুলেশনারী গার্ডের একজন সদস্য হিসেবে অভিহিত করে। এরা সরকারেরই প্যারালাল একটি সামরিক সংগঠন। কিন্তু প্রফেসর মোহাম্মদীর জীবন ও মৃত্যুর রহস্যাবৃত ঘটনার মত পরিচয়ও রহস্যেঘেরা। মোহাম্মদীর বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের ভাষায়, মোহাম্মদী মূলত গবেষণাকর্মে ব্যাপৃত ছিলেন। সামরিক বাহিনীর কোন প্রকল্পে বা সংস্থার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। আবার কেউ কেউ একথাও বলেছেন ইরান সরকারের ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল এবং সরকার বিরোধি কর্মকাণ্ডেও তিনি অংশ নিয়েছেন।
তবে একথা অনস্বীকার্য, প্রফেসর মোহাম্মদীর শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকই ছিলেন রেভ্যুলেশনারি গার্ডের সদস্য। রেভ্যুলেশনারি গার্ডের অফিসাররা তার কফিন বহন করেন। তদন্ত শেষে অবশেষে যা জানা যায় তাহলো প্রফেসর মোহাম্মদী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
২০০৭ সালের জানুয়ারীতে ড. আরদাশির হোসেনপুরকে হত্যা করা হয়। এ সময় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে, তেজস্ক্রিয় বিষ দিয়ে ইসরাইলের গোয়েন্দা বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। লন্ডনের সানডে মেইল টেক্সাসভিত্তিক স্টার্টকর স্টাটেজি এন্ড ইন্টেলিজেন্স থিংক ট্যাংকের বরাত দিয়ে এই খবরটি প্রকাশ করে। ইরান সরকার এই রিপোর্টটিকে নিয়ে উপহাস করে। তাদের ভাষ্য, মোসাদের পক্ষে ইরানের অভ্যন্তরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা অসম্ভব এবং কখনোই সম্ভব নয়। ইরানী কর্মকর্তারা বলেন যে, প্রফেসর হোসেইনপুর তার বাড়িতে এক অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ইরান আরও গুরুত্ব দিয়ে জানায় যে, প্রফেসর হোসেইনপুর কখনোই ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি একজন বিখ্যাত তড়িৎ চুম্বক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, প্রফেসর হোসেইনপুর ইসফাহান সিক্রেট ইনস্টলশেনে কাজ করতেন। সেখানে অপরিশোধিত ইউরোনিয়াম গ্যাসে পরিণত করা হত। এই গ্যাস ইরানের ভূগর্ভস্থ নানতাজ কেন্দ্রে পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যবহৃত হত। এই কেন্দ্রটি শক্তিশালী ও দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। মৃত্যুর দু'বছর আগে হোসেইনপুরকে বিজ্ঞান ও টেকনোলজির ক্ষেত্রে অবদানস্বরূপ ইরানের সর্বোচ্চ খেতাব প্রদান করা হয়েছিল। সামরিক গবেষণায় ব্যাপক সাফল্যের জন্য তাকে এই খেতাব দেয়া হয়েছিল।
ইসরাইল তথা মোসাদের কথিত সমর নীতির ক্ষেত্রে ইরানের দু'চারজন বিজ্ঞানীকে খতম করার বিষয়টি কিঞ্চিৎকর ঘটনাই বটে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার মতে, দাগানের মোসাদ বাহিনী হিট টিম, স্যাকটাস গ্রুপ, ডাবল এজেন্ট নিধন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে ধস নামাতে বছরের পর বছর ধরে সাফল্যের সাথে কাজ করেছে।
স্টার্টফরস এর বিশ্লেষক বিভাগের পরিচালক রেভা ভাল্লা বলেছেন, আমেরিকার সহযোগিতায় ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে মানব সম্পদ ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয় করণের পাশাপাশি ইরানের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে ধ্বংসে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে। রেভা ভাল্লা বলেন, আশির দশকের শুরুতে ইরাকের ক্ষেত্রেও ইসরাইল অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছে। তখন মোসাদ ইরাকের তিনজন পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছিল। বাগদাদ সন্নিহিত অসরিক পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে ইরাককে তখন পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
ইরানের পারমানবিক প্রকল্প বিলম্বিত করতে মোসাদ পরিকল্পনাভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। এক্ষেত্রে দাগানের মোসাদ বাহিনী নৃশংস পন্থা বেছে নিয়েছিল। দাগানের মোসাদ বাহিনী চেয়েছিল ইরান যাতে কোন ভাবেই একটি পারমাণবিক বোমা বানাতে সমর্থ না হয়। জন্মের পর থেকেই ইসরাইল তার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল। ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ এই বলে সতর্কও করেছিলেন যে, ইসরাইলের বিলুপ্তি তিনি ঘটাবেন।
বিজ্ঞানীদের হত্যা করে মোসাদ কিছুটা বিজয়ীর বেশে বটে। কিন্তু মোসাদের প্রায়শ্চিত্ত করার মত উদাহরণও বিদ্যমান। ইরানের গোপন পারমাণবিক প্রকল্প ও এর অবকাঠামো ও পাওনাদির বিস্তারিত উদঘাটনে মোসদের ব্যর্থতার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করা যেতে পারে।
সত্যি বলতে কী, কয়েক বছরের ব্যবধানে ইরান পারমাণবিক প্রকল্পে যে অনেক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে ইসরাইল বা মোসাদ তার হদিশ সামান্যই অবহিত। পারমাণবিক প্রকল্পে ইরান প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যক বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, ইরান গোপন পারমাণবিক বেস প্রতিষ্ঠা করেছে। সফিসটিকেট পরমাণু পরীক্ষা চালাচ্ছে। অথচ ইসরাইল বিস্তারিত বা গভীরের কিছু জানে না। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হল, পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে ইরানের ছলাকলা, কৌশলাদি পশ্চিমা গোয়েন্দাদেরও বোকা বানিয়ে চলেছে। মোসাদতো অবশ্যই তার অন্তর্ভুক্ত।
ইরানের রেজা শাহ পাহলভী ১৯৭০ সালে শান্তিপূর্ণ ও সামরিক প্রয়োজনে দুটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু রেজা শাহের পারমাণবিক প্রকল্প ইসরাইলকে বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তায় ফেলেনি। কেননা ইরান ছিল তখন ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৭৭ সালে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আইজার ওয়েইজম্যান তেলআবীবে ইরানের জেনারেল হাসান তৌকানিনের সম্মানে একটা পার্টিরও আয়োজন করেছিলেন। জেনারেল হাসান ইরানের সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ইরান ও ইসরাইল মিত্র দেশ। ইসরাইল ইরানকে তখন অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করত। দুই দেশের মিত্রতার কারণে ঐ সময় তাদের মধ্যে যে অতিগোপনীয় বৈঠকটি হয় তার বিবরণ পাওয়া গেছে। ইসরাইলের ওয়েইজম্যান তখন ইরানকে বিশেষ ধরনের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অফার করেছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ড. জুমম্যান তখন বলেছিলেন, তারা যে ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে রফতানি করার অফার দিয়েছেন তাতে পারমাণবিক ওয়ারহেড সংযোজন সম্ভব। একথা শুনে ইরানী মন্ত্রী তৌ ফানিয়ান খুবই চমৎকৃত ও উৎসাহিত হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল এই যে, এসব অস্ত্র সরবরাহের আগেই ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হয়ে যায়। ইরানের নতুন রেভ্যুলুশানি সরকার রেজা শাহের সমর্থকদের প্রায় নিশ্চিৎ করে ফেলে। নতুন সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায় ইসরাইলের সর্বাত্মক বিরোধিতা। ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী রেজা শাহ দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং তদস্থলে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। দেশের শাসনভার বর্তায় খোমেনির সমর্থক মোল্লাদের উপর।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেই পারমাণবিক প্রকল্প ইসলাম বিরোধি আখ্যা দিয়ে খোমেনী সবগুলো পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করে দেন। যে ভবনে পারমাণবিক চুল্লী ছিল তা বন্ধ এবং যাবতীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট করে ফেলা হয়। কিন্তু ১৯৮০ সালে ইরান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সাদ্দাম হোসেন ইরানের বিরুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেন। যুদ্ধে ইরানের জাত শত্রু ইরাকের পক্ষে অপ্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার খোমেনীকে মারাত্মক ক্ষুব্ধ করে তোলে।
আয়াতুল্লাহ খোমেনী অবশেষে অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। এমনকী খোমেনীর মৃত্যুর আগেই তার উত্তরসুরী আলী খামেনী তার সামরিক বাহিনীকে নতুন অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণ ও সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তিনি রাসায়নিক এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দেন। আর এসব অস্ত্র বানানোর উদ্দেশ্য ছিল ইরাক যেসব বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে ইরানীদের হত্যা করেছে তার পাল্টা জবাব দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ। ইরানের এই বিপ্লবীরাই এক সময় পারমাণবিক অস্ত্র ইসলাম বিরোধি বলে ফতোয়া দিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প হাতে নিয়ে তারা তাদের ফতোয়াগুলো উল্টে দিলেন।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে অর্থায়ন ও মনোযোগ প্রদর্শনের বিষয়টি আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই খন্ডিতভাবে প্রকাশ হতে শুরু করেছিল।
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়। এ সময় ইউরোপে কান পাতলেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারটি শোনা যেত। বেকার সাবেক সোভিয়েত সেনাদের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা, ওয়ারহেড ইরানীরা কিনেছে বলে বেশ গুজব ছিল। আর অর্থলোলুপ সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা ইরানে নানা অস্ত্রশস্ত্র টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে বলেও ব্যাপক প্রচারণা ছিল। পশ্চিমা পত্র-পত্রিকা প্রায়শই লিখত যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানী ও জেনারেলরা তাদের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে এবং ইরান সরকার তাদের চাকুরী দিচ্ছে। রিপোর্টার তার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত প্রতিবেদনে এও লিখত যে, ইউরোপ থেকে তালাবদ্ধ ট্রাকের পর ট্রাক মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাচ্ছে। এই সময় রাশিয়া ইরানের বুশহারে একটি পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। দুটি ছোট মাপের চুল্লী প্রতিষ্ঠায় চীন ইরানের মধ্যে চুক্তি হয়েছে বলে খবর বেরোয়।
দুটি খবরই আমেরিকা ও ইসরাইলের ঘুমকে হারাম করে দেয়। তারা ইউরোপে গোয়েন্দা পাঠায় এবং নির্দেশ দেয়, সত্যি সত্যি ইরান রুশদের পারমাণবিক বোমা কিনেছে কীনা এবং তাদের বিজ্ঞানীদের এ কাজে নিয়োগ দিয়েছে কিনা। কিন্তু গোয়েন্দারা তা উদঘাটনে ব্যর্থ হলেও রাশিয়া ও চীনের ওপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে আমেরিকা। যাতে তারা ইরানের সাথে চুক্তি বাতিল করে। মার্কিন চাপে চীন ইরানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখে কিন্তু গতি বিলম্বিত করতে শুরু করে। শর্ত হয় ইরানের পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণে কুড়ি বছরেরও বেশী সময় লাগবে এবং তা পুরোপুরি রাশিয়া ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থেকে সীমিত আকারে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং আমেরিকার সিআইএ অনুধাবনে ব্যর্থ হল যে, তাদের বোকা বানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। কেননা ইরান ইতিমধ্যে সকলের অজান্তে বিশালাকায় একটি পারমানবিক প্রকল্প চালু করেছে।
১৯৮৭ সালে দুবাইয়ে একটি গোপন সভা হয়। একটি নোংরা অফিসে ৮জন মানুষ বৈঠক করেন। এদের মধ্যে তিনজন ইরানী, ২জন পাকিস্তানী এবং তিনজন ইউরোপের বিশেষজ্ঞ- যাদের মধ্যে দুজন জার্মান। এরা প্রত্যেকেই ইরানের পক্ষে কাজ করছিল।
এ দিনের সভায় ইরান ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন চুক্তি হয়। পাকিস্তানীদের প্রচুর টাকা-পয়সা দেয়া হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান ড. আব্দুল কাদের খান সভাতে উপস্থিত ছিলেন এবং মোটা অংকের টাকা তার হস্তগত হয়।
এই বৈঠকের বেশ কয়েক বছর আগে পাকিস্তান তাদের পারমাণবিক প্রকল্প চালু করে। পাকিস্তানের টার্গেট তাদের চিরশত্রু ভারতকে দমিয়ে রাখা। ড. কাদের একটি পারমাণবিক বোমা বানাতে সহজে বিদারন সম্ভব এমন সামগ্রী পাগলের মত খুঁজছিলেন। তিনি প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করতে চাইছিলেন না। তার কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম।
পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক ড. আবদুল কাদের খান পরমাণু বোমার ব্লুপ্রিন্ট ইউরোপীয় কোম্পানী ইউরেনকো থেকে চুরি করেছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি সেখানে কাজ করতেন। সেই সূত্রেই তিনি পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা বানাতে শুরু করেন। কাদের খান কিছুদিনের মধ্যে আজরাইলে নিজেকে রূপান্তরিত করেন। কেননা তিনি আনবিক বোমার মেথড, ফর্মূলা এবং পরমাণু বোমা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতে শুরু করেন। ইরান তার প্রধান খদ্দেরে পরিণত হয়। লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়া তার খদ্দের ছিল।
ইরানীরা কাদের খান ছাড়াও অন্য সূত্র থেকে পারমাণবিক বোমা বানাতে প্রয়োজন এমন সরঞ্জামাদি কিনতে শুরু করে। ইরানীরা স্থানীয়ভাবে এসব কীভাবে তৈরি করতে হয় তাও শিখে ফেলে। বিশাল পরিমাণ ইউরেনিয়াম, সেন্ট্রিফিউজ, বৈদ্যুতিক সামগ্রী এবং যন্ত্রাংশ নানা পথে ইরানে আসতে শুরু করে। অপরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম কার্যকর করতে বিশালাকার অবকাঠামো নির্মাণ করে ইরান। ইরানী বিজ্ঞানীরা পাকিস্তান এবং পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞরা ইরানে গোপনে ব্যাপক হারে যাতায়াত শুরু করে। ধূর্ত ইরানীরা সব ডিম এক ঝাঁকায় রাখায় ব্যাপারে সতর্ক ছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানের সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও ছদ্মবেশী ল্যাবরেটরী কিম্বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে অবকাঠামো গড়ে তোলে। কয়েকটি স্থাপনা তারা ভূগর্ভে স্থাপন করে। একটি পারমাণবিক প্লান্ট ছিল ইসফাহানে, আরেকটি আরাকে। নানতাজে সেন্ট্রিফিউজ সুবিধাসম্বলিত স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। পবিত্র শহর কোমে আরেকটি প্লান্ট গড়ে তোলা হয়। জানাজানি হলে ইরানীরা প্ল্যান্টগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ধরা পড়া এড়াতে প্রয়োজনে মাটির স্তর চেছে ফেলতেও তারা ভেবে রেখেছিল। ইরানীরা আন্তর্জাতিক আনবিক এনার্জি এজেন্সীকেও দক্ষতার সাথে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকী এই সংস্থার চেয়ারম্যান মিশরের ড. মো. আল বারাদিকেও তারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। ফলে ইরান নির্বিঘ্নে পারমাণবিক কর্মসূচী চালিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ১জুন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মত পারমাণবিক ক্ষেত্রে ইরানী আয়োজনের প্রকৃত ব্যাপ্তি ও বিশালতা অনুধাবনে সক্ষম হয়। নিউইয়র্কে পাকিস্তানের পক্ষত্যাগী এক বিজ্ঞানী এফবিআই অফিসে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বিস্তারিত অবহিত করেন। একই সাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চান। ভদ্রলোক নিজেকে ড. ইফতেখার খান চৌধুরী বলে পরিচয় দেন। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে পাকিস্তান কীভাবে সাহায্য সহযোগিতা করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন বিজ্ঞানী ইফতেখার। ইফতেখার কাদের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অংশ নিয়েছেন বলে এফবিআইকে জানান।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে পাকিস্তানের কোন কোন বিশেষজ্ঞ শরীক হয়েছিলেন সে নামের তালিকাও ড. ইফতেখার এফবিআইকে দেন। ড. ইফতেখারের তথ্য উপাত্ত এফবিআই তদন্ত করে সত্যতা পায়। এফবিআই ড. ইফতেখারকে আমেরিকায় থাকার ব্যবস্থা করে দেয় রাজনৈতিক অভিবাসী হিসেবে। এফবিআই ড. ইফতেখারের তথ্যাদি অবহেলা ভরে ফেলে রাখে। এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ যেমন নেয়নি তেমনি ইসরাইলকেও সতর্ক করেনি। এভাবে চার বছর কেটে যায়। কিন্তু এক সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ হয়ে পড়ে।
২০০২ সালের আগষ্টে ইরানের বিরুদ্ধবাদী আন্ডারগ্রাউন্ড দল মুজাহিদিন আল খালক (এমইকে) আরাক ও নানতাজে ইরানের দুটি পারমাণবিক অবকাঠামোর কথা বিশ্ববাসীর কাছে ফাস করে দেয়। পরবর্তী সময়েও এমইকে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পাদি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে। সিআইএ তখনো এসব খবর নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে। সিআইএর ধারণা ছিল ইসরাইল ও রাশিয়া বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনায় আমেরিকাকে যুক্ত করতে চাইছে। সিআই আরও ধারণা করেছিল যেহেতু মোসাদ এবং ব্রিটিশ এমসিক্সটিন এমইকে নানাভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছে অতএব তাদের দেয়া তথ্য নির্ভুল এবং বিশ্বস্ত। ইসরাইলি সূত্রমতে প্রকৃত সত্য হল মোসাদের একজন অফিসার ইরানের বিশালাকায় চুল্লীর সন্ধান পায় নাতনজেতে। এটি মরুভূমির গভীরে অবস্থিত। একই বছর অর্থাৎ ২০০২ সালে ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ডের এক নেতা সিআইএকে একটি ল্যাপটপ দেয়। এতে ঠাসা ছিল ইরানের পারমাণবিক নানা তথ্য। আন্ডারগ্রাউন্ডের ঐ নেতা অবশ্য কীভাবে এই ল্যাপটপ তার হস্তগত হল তা উল্লেখ করেননি। সিআইএ পরীক্ষা করে দেখল যে, একটি তথ্য স্ক্যান করে সম্প্রতি ল্যাপটপে ঢোকানো হয়েছে। সিআইএ কিছু তথ্য অগোছালো ও অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপনের জন্য মোসাদকে দায়ী করল। যদিও সিআইএ জানত যে, এসব তথ্যাদি মোসাদ তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে পেয়েছে। পরবর্তীতে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন এমইকে তা সরবরাহ করে। উদ্দেশ্য হল পশ্চিমা দুনিয়া যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হতে পারে।
ইতিমধ্যে আমেরিকা ও ব্রিটেনের ডেস্কে ইরানের উল্লেখিত প্রকল্পের ব্যাপারে নানা তথ্য এসে জমা হচ্ছিল। এসব দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। ড. কাদের খানের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবসা নিয়েও বিশ্বব্যাপী নানা গালগল্প ও গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অবশেষে ক্রন্দনরত ড. খান পাকিস্তানী টিভির পর্দায় আবির্ভূত হন। সেখানে তিনি স্বীকারোক্তি দেন যে, তিনি পারমাণবিক বোমার ফর্মুলা ইত্যাদি লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানকে সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।
এক পর্যায়ে ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক তথ্যাদি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত সূত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এখানে মোসাদের মেইর দাগানের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয়।
দাগান মার্কিন গোয়েন্দাদের নিত্য নতুন তথ্য দিতে শুরু করে। এর মধ্যে ছিল কোম নগরীতে ইরান কীভাবে পারমাণবিক প্রকল্প গড়ে তুলছে সে তথ্যও। ইসরাইলি গোয়েন্দারা বেশ কয়েকজন রেভ্যুলেশনারি গার্ড ও পারমাণবিক প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে স্বপক্ষে ত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছিল বলেও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। মোসাদ সংশ্লিষ্ট দেশের গোয়েন্দা ও সরকারকেও ইরানের ব্যাপারে তথ্যাদি দিয়ে অবহিত করে। ঐসব দেশকে মোসাদ সতর্ক করে যে, পারমাণবিক সামগ্রী ইত্যাদি যেন তাদের বন্দর থেকে ইরান অভিমুখে আসতে না পারে। ঐ সব জাহাজকে যেন জব্দ করা হয়।
প্রকৃতপক্ষে উল্লেখিত গোয়েন্দা তথ্য ইসরাইলের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এদিকে মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ ইরান প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধের কয়েকটি দেশকে ধ্বংসের ঘোষণা দিল। এক্ষেত্রে ইরানের পিছু নেওয়া ছাড়া ইসরাইলের আর কোন গত্যন্তর ছিল না। ইসরাইলও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে চোরাগুপ্তা যুদ্ধ ঘোষণা করল ইরানের বিরুদ্ধে। ১৬ বছর ধরে চলা তার পূর্বসূরির অসাবধানতা ও ঔদাসীন্য মোসাদের বস দাগানের জন্য খুবই বিড়ম্বনা ও কষ্টের ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মোসাদের দাগান।
২০০৬ সালে মধ্য ইরানে একটি প্লেন বিধ্বস্ত হয়। সকল যাত্রীই নিহত হন। এদের মধ্যে রেভ্যুলেশনারি গার্ডের সিনিয়র সদস্যরাও ছিলেন। আহমদ কাজামি নামের ঐ সংগঠনের একজন কমান্ডারও নিহত হন। ইরান বলে, খারাপ আবহাওয়ার কবলে পড়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু স্টার্টকর গ্রুপ আভাস দেয়, পশ্চিমা গোয়েন্দারা ঐ বিমান ধ্বংসের নেপথ্যে।
এর ঠিক এক মাস আগে ইরানের একটি সামরিক পরিবহন বিমান তেহরানের একটি বাড়ির উপর ধসে পড়ে। যাত্রী ছিল ৯৯। সকলেই নিহত হন। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন সরকার অনুগত রেভ্যুলেশনারি গার্ডের অফিসার এবং সরকারপন্থি সাংবাদিক। ২০০৬ সালের নভেম্বরে আরেকটি সামরিক বিমান তেহরানে উড্ডয়নকালে বিধ্বস্ত হয়। এতে রেভ্যুলশনারি গার্ডের ৩৬ সদস্য নিহত হয়। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ ঘটনার জন্য আমেরিকা, ব্রিটিশ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেন।
ইতিমধ্যে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মকর্তা দাগান ইরানের ক্ষেত্রে তার দেশের কর্মকৌশল নির্ধারণে প্রধানতম ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যান। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ইরানকে দমাতে সর্বাত্মক যুদ্ধই অনিবার্য। তবে তিনি সেই রণকৌশল শেষ ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন।
নাশকতা শুরু হয় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া ডাইলাম পারমাণবিক কেন্দ্রে একটা বিস্ফোরণের খবর দেয়। ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে এই বিপর্যয় বলে বলা হয়।
একটা অচিহ্নিত বিমান থেকে ঐ মিশাইল ছোঁড়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। একই মাসে বুশহারে আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাশিয়া নির্মিত একটি পারমাণবিক চুল্লীতে এখান থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হত। পরমাণু পরীক্ষা কেন্দ্র পারচীনে আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই কেন্দ্রটি ইরানীদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে সরকার বিরোধি আন্ডারগ্রাউন্ড নেতারা দাবি করেন, বিস্ফোরণে এই গোপন ল্যাবরেটরির মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
২০০৬ সালের এপ্রিলে ইরানের কেন্দ্রীয় পরমাণু কেন্দ্র উৎসবমুখর ছিল একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। বিপুল সংখ্যক বিজ্ঞানী, টেকনিশিয়ান এবং ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রসমূহের প্রধানরা ভূগর্ভস্থ ঐ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই কেন্দ্রে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ চব্বিশ ঘন্টা ধরে মন্থন করা হত। উৎসব মুখর এই অনুষ্ঠানে ইরানীরা পারমাণবিক ক্ষেত্রে আরেকটি সাফল্যের ঘোষণা দিতে যাচ্ছিল।
নতুন আরেকটি পারমাণবিক কাসকেড উদ্বোধনী লগ্নে সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। প্রধান প্রকৌশলী কাসকেড উদ্বোধনের বোতাম টিপলেন। কিন্তু ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ সংঘটিত হল। কেঁপে উঠল বিশালাকায় চেম্বার। পাইপগুলো কানে তালা লাগানো আওয়াজ তুলে খণ্ড বিখণ্ড হতে লাগল। উপসংহার হল পুরো কেন্দ্রই ধ্বংস হয়ে গেল।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান অজানা শত্রুদের কারসাজি উল্লেখ করে এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সাজার আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি বলেন, এই অজানা লোকগুলোই ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার করেছিল কোন জায়গায়। সিবিএস টিভি সেন্ট্রিফিউজ বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে জানায় যে, উদ্বোধনের পূর্বে ক্ষুদ্র মাত্রার একটি বিস্ফোরণে এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সিবিএস আরও জানায়, নানতাজ বিস্ফোরণের নেপথ্যে ছিল ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী। ইসরাইলিরা এক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দাদের সহযোগিতা দিয়েছিল।
২০০৭ সালে জানুয়ারিতে আবার ইরানী সেন্ট্রিফিউজ সফিসটিকেটেড অন্তর্ঘাতের সম্মুখীন হয়। পশ্চিমা গোয়েন্দারা ইস্টার্ন ইউরোপীয়ান কোম্পানী খোলে। এসব কোম্পানির মালামাল কিনতে শুরু করে ইরানীরা। ইরানের সেন্ট্রিফিউজে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় যা রক্তনালীর মত কাজ করে তা এই মার্কেট থেকে কেনা হয়। কেননা ইরানের উপর জাতিসংঘের অবরোধ চলার কারণে খোলাবাজার থেকে তা সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে ইরানকে মালামাল ক্রয়ে বোগাস এবং ভুয়া ইস্টার্ন ইউরোপীয় কোম্পানীর শরনাপন্ন হতে হয়। এসব কোম্পানী রুশ ও ইরানী এক্সাইলরা পরিচালনা করত আর এরা গোপনে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করত। এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের পর ইরানীরা বুঝতে পারে তারা ধোঁকায় পড়েছে। কেননা ঐ সব যন্ত্রপাতি ত্রুটিপূর্ণ এবং ব্যবহার অযোগ্য।
২০০৭ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এক গোপন নির্দেশে সই করেন। ঐ নির্দেশে তিনি সিআইএকে যেকোন মূল্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলম্বিত কিম্বা বিঘ্ন সৃষ্টির কথা বলেন। এই সিদ্ধান্তের পর পশ্চিমা গোয়েন্দারা ইরান যাতে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল না পায় সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়। আগষ্টে মোসাদের দাগান আমেরিকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিকোলাস বার্নসের সাথে সাক্ষাৎ করে ইরানের ব্যাপারে তার কর্মকৌশল তুলে ধরেন। স্যাবোটাজ, বিস্ফোরণ, অন্তর্ঘাত গত সাত বছর ধরে ইরানকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। বুশহার চুল্লীর কুলিং সিস্টেম ঠিকমত কাজ না করার বিষয়টি ছিল রহস্যাবৃত। যে কারণে প্রকল্পটি শেষ করতে দু'বছর দেরি হচ্ছিল। ২০০৮ সালের মে মাসে আরাক কেন্দ্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা প্রাপ্ত ইসকাহান পারমাণবিক কেন্দ্রটিও ভয়ংকরভবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০০৮ ও ২০১০ সালে নিউইংর্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, টিনারস নামের একটি কোম্পানী ইরান ও লিবিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংসে জড়িত। কোম্পানিটি সুইজারল্যান্ডের। এই পরিবারের সকলেই প্রকৌশলী। তারা অন্তর্ঘাতমূলক কাজে সিআইএকে সহযোগিতা করেছে এবং সিআইএ এ কাজে তাদেরকে ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। সুইস সরকার এই পরিবারের প্রতি যাতে কোন মোকদ্দমা না করে সেজন্য সিআইএ নেপথ্য থেকে কাজ করেছে। কেননা পারমাণবিক স্থাপনার জন্য অবৈধ পথে যন্ত্রপাতি সরবরাহের দায়ে ঐ কোম্পানীর বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেত। ঐ প্রকৌশলী পরিবারের পিতা ফ্রেডোরিক টিনার এবং তার দুই ছেলে উরস এবং মার্কো ইরানের নানতাজ পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল। এর ফলেই ৫০টি সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়েছিল।
টিনার পরিবার প্রেসার পাম্প কিনেছিল জার্মানির ফেইফার ভ্যাকুয়াম কোম্পানি থেকে। সর্বশেষ বিক্রি করা হয় ইরানে।
টাইম ম্যাগাজিন দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করে যে, আর্কটিক সাগরের একটি জাহাজ ছিনতাইয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদই জড়িত। ঐ জাহাজটি ফিনল্যান্ড থেকে আলজেরীয়া যাচ্ছিল। রুশ ক্রুরা জাহাজটি চালাচ্ছিল। বলা হচ্ছিল জাহাজটি কাঠ নিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রার দুদিনের মাথায় ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই জাহাজটি ছিনতায়ী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এক মাস পর রাশিয়া দাবি করে যে, ছিনতাই করা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ আবার রুশ কমান্ডোরা গ্রহণ করেছে। লন্ডন টাইম এবং ডেইলি টেলিগ্রাফ উল্লেখ করে যে, মোসাদই এই তথ্য রাশিয়াকে দিয়েছে। দাগানের লোকেরা জানিয়েছে যে, ঐ জাহাজে ইউরোনিয়াম ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার সাবেক এক সামরিক কর্মকর্তা এই ইউরোনিয়াম ইরানীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে পাইরেসির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এডমিরাল কোওটস। তিনি টাইম ম্যাগাজিনকে নিজের থেকেই জানান যে, ঐ জাহাজ মোসাদের লোকজন হাইজ্যাক করেছিল। জাহাজ ভর্তি ইউরেনিয়াম যাতে গন্তব্যে পৌঁছতে না পারে সে লক্ষ্যেই এই ছিনতাই।
ইরানের প্রতি এই অব্যাহত আক্রমণের প্রেক্ষাপটে তারাও নিশ্চুপ বসে ছিল না। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ইরান অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কোমের কাছে নতুন একটি পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরি করে। তারা এখানে তিন হাজার সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনের পরিকল্পনা করে। আর এটি ছিল ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি ইরান উপলব্ধি করে যে, আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরাইল তাদের কোম পারমাণবিক স্থাপনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
ইরান চালাকি এবং তড়িঘড়ি করে আন্তর্জাতিক কেন্দ্রকে তাদের কোম পারমানবিক কেন্দ্রের অস্তিত্ব জানান দেয়। কয়েকটি সূত্র জানায়, ইরান পশ্চিমা এক গোয়েন্দাকে সম্ভবত ব্রিটিশ এমসিক্সটিনের লোক আটক করতে সমর্থ হয়। ঐ গোয়েন্দা কোম সম্পর্কিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিল। ইরান তাদের মর্যাদা রক্ষা ও বদনাম এড়াতে কোম পারমাণবিক কেন্দ্রের অস্তিত্বের জানান দেয়।
ইরানী ঘোষণার এক মাস পর সিআইএর পরিচালক লিয়োন প্যানেটা টাইম পত্রিকাকে জানান যে, তারা তিন বছর ধরেই ইরানের কোম পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পর্কে অবহিত এবং মোসাদই তা উদঘাটনে সমর্থ হয়।
কোম পারমাণবিক কেন্দ্রের অস্তিত্ব উদঘাটনে মোসাদ, সিআইএ এবং এমসিক্সটিন যে জড়িত ছিল, তা বলাই বাহুল্য। ফরাসী সূত্র মতে, উল্লেখিত তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করত এবং ইরানের ভেতরে অভিযান চালাতো মোসাদ।
২০১০ সালের বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের সাথে মোসাদ জড়িত ছিল। এতে একটি প্লান্টের ১৮ ইরানি টেকনিশিয়ান নিহত হন। জাগরোস মাউন্টেনস নামের এই প্লান্টে শোহাব নামের মিসাইল এসেম্বেল করা হত। ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের সাথে নিয়ে মোসাদ ৫জন পরমাণু বিজ্ঞানীকে গুম বা হত্যা করে।
আমেরিকা, ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সাথে মোসাদের অতিরিক্ত সখ্যতা গড়ে ওঠার পেছনের মানুষটিরও মেইন দাগান। মোসাদের পরিচালক হয়েই তিনি বিদেশি গোয়েন্দাদের সাথে সখ্যতা বৃদ্ধির নির্দেশ দেন। দাগানের উপদেষ্টারা অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু দাগান তাদের পরামর্শে কর্ণপাত করেননি। বরং উপদেষ্টাদের তিনি বলতে গেলে শাসন এবং অধীনস্থ গোয়েন্দাদের বিদেশি গোয়েন্দাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার কঠোর নির্দেশ দেন।
ব্রিটিশ ও আমেরিকার গোয়েন্দাদের পাশাপাশি দাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্স ছিলেন ইরানের বিরোধি দলের নেতারা। দাগান তাদের সরবরাহকৃত তথ্যাদি খুবই আস্থায় নিতেন। ইরানের বাইরে ইরানের ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রেসিট্যান্সের নেতারা প্রথা বহির্ভূতভাবে প্রায়শই সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। এসব সাংবাদিক সম্মেলনে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের নাম প্রকাশ করা হত। এরকম এক বিজ্ঞানী হলেন মোহসীন ফখরী জাদেহ।
৪৯ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়র পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাকে রহস্যজনক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে থাকে ইরান সরকারের বিরোধিরা। কিন্তু রেসিট্যান্ট গ্রুপ তার ব্যাপারে বিস্তারিত ফাঁস করে দেয়। এর মধ্যে একটি তথ্য হল ১৮ বছর বয়স থেকেই ফখরী রেভিলুশনারি গার্ডের সদস্য। তার ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, বাসাসহ যাবতীয় ফোন নম্বর ফাস করা হয়। ফখরী যথার্থই একজন নামী বিজ্ঞানী। শেহাব ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে পারমাণবিক বোমা প্রতিস্থাপন, বোমার ক্ষুদ্রতম সংস্করণ উদ্ভাবনে তার টিম খুবই দক্ষ।
উল্লেখিত কারণে ফখরীকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভিসা দিতে অপারগতা জানায়। বিদেশে তার ব্যাংক একাউন্ট ফ্রোজ করা হয়। ইরান সরকার বিরোধীরা ফখরীর সঙ্গে বিজ্ঞানীদের নাম-ধাম যেমন প্রকাশ করে তেমনি তার গোপন ল্যাবরেটরীর অবস্থানও প্রকাশ করে। এর ফলে আর বুঝতে বাকী থাকে না মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় ফখরীর অবস্থান কী। আর এর একটা বিকল্প আছে। তাহল ফখরী যদি নিজ দেশ ও দল ছেড়ে পশ্চিমের কোন দেশে আশ্রয় নেন।
জেনারেল আলী রেজা আসগারী ইরানের সাবেক প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইস্তাম্বুল সফরকালে তিনি গুম হয়ে যান। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে তিনি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ইরানী গোয়েন্দারা পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে তারা খোঁজেনি। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার চার বছর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর সালেহী জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে এই বলে নালিশ করেন যে, জেনারেল আসগারীকে মোসাদ গুম করে ইসরাইলের কারাগারে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু লন্ডনের সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকার রিপোর্ট ভিন্নতর। সেখানে বলা হয়েছে স্বপক্ষ ত্যাগ করে তিনি পশ্চিমে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে স্বপক্ষ ত্যাগে মোসাদ যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে এবং তুরস্কে তার নিরাপত্তায় দায়িত্বেও ছিল মোসাদ।
অন্য একটি সূত্র মতে, জেনারেল ফখরী ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পাদি নিয়ে অনেক মূল্যবান তথ্য সিআইএকে সরবরাহ করেছেন।
জেনারেল আসগারীর অন্তর্ধানের এক মাসের মধ্যে ২০০৭ সালের মার্চে ইরানের আরেক সিনিয়র অফিসার গুম হন। আমীর সিরাজী নামের এই কর্মকর্তা রেভ্যুলেশনারি গার্ডের এলিট ফোর্স হিসেবে পরিচিত আল কুদস ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। ইরানের সীমান্ত এলাকার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ইরানী একটি সূত্র লন্ডন টাইমসকে জানায় যে, আসগারী ও সিরাজী গুম হওয়ার সময়ই মোহাম্মদ সোলতানী নামের আরেক ইরানী কর্মকর্তাকে গুম করা হয়। সোলতানী রেভিলুশনারি গার্ডের একজন কমান্ডার ছিলেন এবং তার কর্মস্থল ছিল পারস্য উপসাগরে।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে পরমাণু বিজ্ঞানী শাহরাম আমিরীও দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। আমিরী কোম পারমাণবিক কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। ইরান সৌদি আরবের কাছে আমিরীর সন্ধান চেয়ে কড়া চিঠি লেখে। কয়েক মাস পরে আমিরী আমেরিকায় উদয় হন।
আমিরী ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ফাঁস করে দেন। এজন্য তাকে ৫০ লক্ষ ডলার, নতুন পরিচয় এবং আমেরিকার আরিজোনায় একটি বাড়ি করে দেয়া হয়। সিআইএ দাবি করে আমিরী তাদেরসহ পশ্চিমাদের পুরনো এজেন্ট এবং আমিরী তাদেরকে ইরানের পরমাণু কেন্দ্র সম্পর্কে অরিজিনাল ও বাস্তবিক নথিপত্র হস্তান্তর করেছেন।
এক বছর আমেরিকার বসবাসের পর আমিরী তার মন পরিবর্তন করেন। আবার তিনি ইরানে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি আসলে আমেরিকায় অস্থিরতার মধ্যে কাটাচ্ছিলেন। বাস্তবতার সাথে তিনি নানা কারণে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলেন না। বাড়িতে একটা ভিডিও বানিয়ে তিনি তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেন।
তাতে তিনি বলেন, সিআইএ তাকে অপহরণ করেছিল। এর কিছু সময় পর তিনি আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি এতে বলেন, প্রথম ভিডিওতে প্রদত্ত তার বক্তব্য সঠিক নয়। কিছু সময়ের ব্যবধানে তিনি তিন নম্বর ভিডিওটি প্রকাশ করে বলেন তার দুই নম্বর ভিডিওর বিষয়বস্তু সঠিক নয়।
আমিরী আমেরিকায় অবস্থিত পাকিস্তানের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং সেখানে ইরানের স্বার্থ পাকিস্তানেই দেখভাল করত। তিনি তাকে ইরানে ফেরত পাঠাতে পাকিস্তানকে বলেন। পাকিস্তান তাকে সহযোগিতা করে।
২০১০ সালের জুলাই মাসে আমিরী তেহরানে ফিরে আসেন। তেহরানে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আমিরী জানান যে, সিআইএ তাকে অপহরণ করেছিল এবং তার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে। এরপর তিনি হাওয়া হয়ে যান। পর্যবেক্ষকরা সিআইয়ের ব্যর্থতার জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু সিআইএ বলে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি আমিরীর কাছ থেকে পেয়েছি আর ইরান পেয়েছে আমিরীকে। এখন আপনারাই বলুন, ইরান না আমেরিকা জিতল!
ইরানও প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরীয়া হয়ে উঠছিল। ২০০৪ সালে ডিসেম্বরে ইরান ইসরাইল ও আমেরিকার পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য ১০ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে তিনজন তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করত। ২০০৮ সালে ইরান ঘোষণা করে যে, তারা মোসাদের ঘাঁটি ধ্বংস করেছে। ইরান আরও জানায় যে, মোসাদ তিন ইরানীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। ২০০৮ সালের নভেম্বরে ইরান ৪৩ বছর বয়স্ক আশতারীকে ফাঁসি দেয়। ইসরাইলের পক্ষে তার গোয়েন্দাগিরি করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। বিচার চলাকালে আশতারী জানান, ইউরোপে তিনজন মোসাদ গুপ্তচরের সাথে তিনি বৈঠক করেছেন। মোসাদ আশতারীকে নগদ অর্থ ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী দেয়।
২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের এডিন কারাগারে সরকার আরেকজন গোয়েন্দাকে ফাঁসি দেয়। তার নাম আলী আকবর সিদাত। সিদাত মোসাদের কাছে ইরানের সামরিক সামর্থ্য এবং রেভুলুশনারি গার্ড কর্তৃক পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যাপারে বিস্তারিত পাচার করে। বিগত ৬ বছর ধরেই সিদাত ইসরাইলের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং তুরস্ক, থাইল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডে মোসাদের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন। এভাবে প্রতিটি মিটিংয়ে সিদাতকে তিন হাজার থেকে সাত হাজার ডলার দেয়া হয়। ইরান ঘোষণা দেয়, এরকম আরও গ্রেফতার করা হবে।
কিন্তু ২০১০ সালে ইরানের পরমাণু প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। এসব কেন্দ্রে যেসব স্পেয়ার পার্টস ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ছিল খুবই নিম্নমানের। মোসাদের পরিকল্পনার জেরেই ইরান মোসাদের নিম্নমানের কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে খুচরা যন্ত্রপাতি কিনেছিল। একে একে প্লেন দুর্ঘটনা, ল্যাবরেটরী পুড়ে যাওয়া, পারমাণবিক কেন্দ্রে ও ক্ষেপণাস্ত্রে বিস্ফোরণ, ইরানী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দেশ ও স্বপক্ষ ত্যাগ, সিনিয়র বিজ্ঞানীদের মৃত্যু, সংখ্যালঘুদের উত্থান এবং বিদ্রোহের পেছনে ইরান মোসাদকে দায়ী করে আসছিল। ইরানের এই ধারণা সঠিক বা বেঠিক যাই হোক, ইরান কিন্তু সন্দেহের চোখে মোসাদকেই এক নম্বরে রেখেছিল। আর মোসাদ মানেই সেই দাগান।
ইউরোপীয় গণমাধ্যম একটি ঘটনাকে দাগানের অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করে। ২০১০ সালের গ্রীষ্মকালে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের হাজার হাজার কম্পিউটার উল্টা-পাল্টা আচরণ করতে শুরু করে। এই কম্পিউটারগুলো দিয়ে পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত। স্টাক্সনেট নামক এক ভাইরাসে কম্পিউটারগুলো আক্রান্ত হয়। অথচ কম্পিউটারগুলো ছিল খুবই দামী ও অত্যাধুনিক। নাতাজের সেন্ট্রিফিউজ নিয়ন্ত্রণ করত। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। পর্যবেক্ষকরা ক্ষতির পরিমাণ দেখে মন্তব্য করলেন, এ এক ভয়াবহ সাইবার এ্যাটাক এবং আমেরিকা ও ইসরাইল এর সাথে যুক্ত।
প্রেসিডেন্ট আহমদাদিয়ানেজাদ ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখাতে চাইলেন এবং বললেন, তারা নিজেরাই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন। সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু প্রকৃত সত্য ঘটনা জানা গেল ২০১১ সালের শুরুতে। জানা গেল, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের অর্ধেক পরিমাণ সেন্ট্রিফিউজ নিশ্চল হয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের টিম ইরানের পারমাণবিক প্রয়াস পদে পদে বিঘ্ন ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মোসাদ ক্রমাগত নানা ক্ষতির চেষ্টা করে সফলও হয়েছে। এছাড়া কূটনৈতিক চাপ, জাতিসংঘ কর্তৃক অবরোধ, বোমা তৈরির সরঞ্জামাদি ইরানের জন্য দুর্লভ করে তোলা, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া, মুক্ত বিশ্বের ব্যাংকগুলোকে ইরানের সাথে ব্যবসা চালাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, ইরানের মধ্যে জাতি ও গোষ্ঠীগত বিরোধ উসকে দেয়া অন্যতম। ইরানে কুর্দী, আজেরী, বেলোশিস, আরব ও তুর্কমেন জাতিরও বাস। এরা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। এদের মাধ্যমেও ইরানের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এত আয়োজন সত্ত্বেও ইরানীদের আণবিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি। এদিকে ইসরাইলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দাগানকে আলটিমেট জেমস বন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
দাগান মোসাদের প্রধান পদে পদোন্নতি পান। এদিকে পর্যবেক্ষকরা ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ২০০৫ সালের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে। কিন্তু এই তারিখ ক্রমশ পেছাতে থাকে।
২০০৭, ২০০৯, ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারী দাগান যখন চাকুরী থেকে অবসর নেন, তখন তিনি জাতির উদ্দেশে বার্তা দিয়ে যান। আর সেই বার্তাটি হল, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প অন্তত ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা গেছে। দাগান তার উত্তরসূরীর জন্যও বার্তা রেখে যান। আর তা হল, গত আট বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করে রাখা সম্ভব হয়েছে। অনুরূপ কার্যক্রম যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখা হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুতেও তিনি অনুমোদন দিয়ে যাননি।
মোসাদের প্রধান হিসেবে দাগান সাড়ে আট বছর ছিলেন। মোসাদের পরিচালক হিসেবে এত দীর্ঘদিন কেউ দায়িত্ব পালন করেননি।
দাগানের স্থলাভিষিক্ত হন তামির পারদো। তিনিও মোসাদের একজন ভ্যাটার্ন অফিসার। তিনি ইয়োনি নেতানিয়াহুর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। ১৯৭৬ সালের ইসরাইলের এনতেতের অভিযানে তিনি ছিলেন হিরো। পরবর্তীতে নানা সফল অভিযানের মাধ্যমে তামির বিশিষ্টতা অর্জন করেন। একজন দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা, নিউ টেকনোলজির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এবং অপ্রচলিত ও দুর্গম অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তার বিশেষ সুনাম রয়েছে।
দাগান ক্ষমতা ছাড়ার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তৃতাও করেন। সেখানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোসাদ বাহিনীর সাফল্য, ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন। তিনি মোসাদের প্রতিটি সদস্যের গুণগান করেন। তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মোসাদ সদস্যরা কাজ করে থাকেন। তবে তার কার্যকালে একটি বিশেষ ব্যর্থতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। ইসরাইলী সেনা সদস্য গিলাদ শালিতকে হামাস কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সেই স্থান চিহ্নিত করতে তিনি তার ব্যর্থতার কথা বলেন। গিলাদকে পাঁচ বছর ধরে হামাস লুকিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীতে হামাস তাকে মুক্তি দেয় বটে কিন্তু তার বিনিময়ে একশত ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিতে হয় ইসরাইলকে।
উল্লেখিত ব্যর্থতা সত্ত্বেও দাগানকে শ্রেষ্ঠতম মোসাদ কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইহুদি জাতির পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানান। বক্তৃতা শেষে নেতানিয়াহু গভীর আলিঙ্গনে দাগানকে আবদ্ধ করেন। আরেকটি অনন্য সাধারণ ঘটনা হল, ইসরাইলি মন্ত্রিসভা দাগানের প্রতি সম্মান দেখাতে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লেখেন দাগানকে। সেখানে তিনি দাগানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
দাগানের জন্য প্রকৃত প্রশংসাসূচক ঘটনা ঘটেছিল অবসর নেয়ার এক বছর আগে। মিসরীয় পত্রিকা আল আহরাম-এর একটি প্রতিবেদনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। আলী আহরাম পত্রিকা বরাবরই ইসরাইল বিরোধী। ইসরাইলের জন্য তারা বরাবরই ক্ষতিকর এবং উগ্র। এই পত্রিকায় ২০১০ সালের ১৬ই জানুয়ারী সুপরিচিত সাংবাদিক আশরাফ আবু আল হাউল মোসাদ এবং দাগান নিয়ে ঐ নিবন্ধনটি লেখেন। সেখানে তিনি লেখেন, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প বহু আগেই সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। ইরানীরা ভাল করেই জানে তাদের পরমাণু বিজ্ঞানী মাসুদ আলী মোহাম্মদীর মৃত্যুর পেছনে কার হাত বিদ্যমান।
ইরানের প্রতিটি শীর্ষ নেতা ভাল করে একটি নাম জানেন যিনি সকল অঘটনের কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই নামটি হল দাগান। আবার সাধারণ লোকের কাছে মোসাদের প্রধান হিরো দাগানের নামটা তেমন পরিচিত নয়। দাগান কাজ করেন শান্ত পদক্ষেপে, নিবিষ্ট মনে এবং গণমাধ্যম থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। কিন্তু সাত বছর ধরে ইরান সরকারের কাছে ছিলেন বিভীষিকা হিসেবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর অগ্রগতি তিনি রুখে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন।
মিসরীয় পত্রিকার ওই সাংবাদিক আরও লেখেন মধ্যপ্রাচ্যে মোসাদ অনেক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনার জন্য দায়ী। বিশেষ করে সিরিয়া, হেজবুল্লাহ, হামাস এবং ইসলামিক জেহাদের বিরুদ্ধে দাগানের কৌশল ও কৃতিত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। মিসরীয় সাংবাদিক আল হাওল তার লেখার উপসংহার টানেন এভাবে, সব কৃতিত্বের মূলে দাগান। দাগানকে ইসরাইলের সুপারম্যান হিসেবে অভিহিত করা যায়।
১৯৪৮ সালে যখন মোসাদের জন্ম তখন ইসরাইলের এই সিক্রেট সার্ভিসে কোন সুপারম্যান ছিলেন না। তখন গুপ্তচরবৃত্তিতে কিছুটা অভিজ্ঞ লোকদের মোসাদে জড়ো করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই এই ত্যাগ ও চোরাগুপ্তা হামলায় পারদর্শী বর্ধনশীল এই সংস্থাকে নানা রকম সহিংসতা অর্ন্তকোন্দল, নিষ্ঠুরতা এবং হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি মোকাবেলা করতে হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00