📄 ওয়াকফ জায়িয হওয়ার প্রমাণ
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: ﴿ لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ﴾ [آل عمران: ۹۲] .
"তোমরা কখনোই কল্যাণের নাগাল পাবে না যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের প্রিয় বস্তুটি আল্লাহ্ তা'আলার রাস্তায় সাদাকা করবে। তোমরা যা কিছুই সাদাকা করো না কেন নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা সে সম্পর্কে সম্যক অবগত”। (আলি 'ইমরান: ৯২)
উক্ত আয়াতে সাদাকার কথাই বলা হয়েছে। আর ওয়াক্ফ তারই একটি ধরন মাত্র। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য কোন কিছু ওয়াক্ফ করা মুস্তাহাব।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন: ﴿ يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾ [الحج : ٧٧] .
“হে ঈমানদারগণ তোমরা রুকূ’ ও সাজদাহ্ করো। আর তোমাদের প্রভুর ইবাদাত ও কল্যাণের কাজ করো। তা হলেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে”। (আল-হাজ্জ: ৭৭)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْ لَهُ .
“যখন কোন মানুষ মারা যায় তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি ক্ষেত্র থেকে এরপরও তার নিকট সাওয়াব পৌঁছায়। সেগুলো হলো, চলমান সাদাকাহ্, লাভজনক জ্ঞান ও নেককার সন্তান যে তার জন্য দো'আ করবে”। (মুসলিম ১৬৩১)
ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: সাদাকায়ে জারিয়াহ্ তথা চলমান সাদাকাহ্ মানে ওয়াক্ফ।
শরীয়তে ওয়াফ্ফের অনেকগুলো মাহাত্ম্যপূর্ণ হিকমত রয়েছে যেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. ওয়াক্ফকে জনমানুষের বিশেষ ও ব্যাপক স্বার্থগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ অর্থায়নের উৎস হিসেবেই ধরে নেয়া হয়। এ হিকতমতের ভিত্তিতে ওয়াক্ফকে একটি পাত্রও বলা যেতে পারে। যাতে মানুষের দান-সাদাকা জমা করা হয়। তেমনিভাবে তা একটি কুয়া সমতুল্য যা মানুষের মাঝে কল্যাণ প্রবাহিত করে। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কল্যাণগুলো মানুষের সম্পদ থেকেই আসে। আর তা হালাল পন্থায় মানুষের পবিত্র মাল থেকেই সংগৃহীত হয়।
২. ওয়াফ্ফ এমন একটি নেক কাজ যার প্রভাব সমাজের উপর অনেক বেশি। বরং তাকে অর্থায়ন ও উন্নয়নের একটি বড় সংস্থাও বলা যেতে পারে। ইসলামের এ দীর্ঘ ইতিহাসের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এটাই প্রমাণ করে যে, মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, জ্ঞান ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়নের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ওয়াফ্ফের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
তেমনিভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের মসজিদ, মাদ্রাসা, লাইব্রেরী ও হাসপাতাল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও ওয়াক্ফের অবদান অনস্বীকার্য। উপরন্তু ব্যবসা, কৃষি ও শিল্পকে গতিশীল করা এবং মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ তথা রাস্তা-ঘাট, পুল ইত্যাদি তৈরিতেও ওয়াফের অবদান কম নয়।
৩. ওয়াক্ফ শার্'য়ী জ্ঞানের স্থায়িত্ব ও তাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এক বিশেষ ভূমিকা রাখে। যা ইসলামী দা'ওয়াতের অতুলনীয় জ্ঞানগত আন্দোলনের একটি বিশেষ ভিত্তিও বটে। যা মূলতঃ মোসলমানদের জন্য এক প্রকাণ্ড জ্ঞানগত ফসল, ইসলামী ঐতিহ্যের এক অবিনশ্বর ভাণ্ডার এবং বড় বড় আলিমেরও যোগান দিয়েছে। যারা পুরো বিশ্বের ইতিহাসে এখনো আলো ছড়াচ্ছে।
৪. ওয়াক্ফ মুসলিম জাতির মাঝে একে অপরের দায়িত্বভার গ্রহণের মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করে। তেমনিভাবে তা সামাজিক ভারসাম্য তৈরিতে বিশেষ অবদানও রাখে। কারণ, ওয়াক্ফ গরীবের সম্মান বাড়ায়, দুর্বলকে সবল ও অক্ষমকে সক্ষম করে তোলে।
৫. ওয়াক্ফ মূলতঃ জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়ন করে। কারণ, সে বস্তুতঃ জাতির প্রয়োজনগুলোরই যোগান দেয়। এমনকি তার উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে সাহায্য করে। আর তা জাতির উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্ত বায়ন ও জ্ঞানগত গবেষণার দ্বার উন্মোচনের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
৬. ওয়াক্ফ মানুষের সম্পদের স্থায়িত্বের গ্যারান্টি দেয়। যা থেকে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বহু প্রজন্ম লাভবান হয়। তেমনিভাবে ওয়াক্ফ মানুষের সম্পদকে অপচয়কারীদের হাত থেকে রক্ষা করে। উপরন্তু তাতে ওয়াক্ফকারীর সাওয়াব তো চলমান থাকছেই।
📄 পরিশিষ্ট
আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَثَلُ أُمَّتِي مَثَلُ الْمَطَرِ؛ لَا يُدْرَى أَوَّلُهُ خَيْرٌ أَمْ آخِرُهُ
"আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত হলো বৃষ্টির ন্যায়। যার ব্যাপারে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, তার শুরুর অংশ ভালো না তার শেষাংশ"।
(আহমাদ ১২০৫২ তিরমিযী ২৮৬৯ সিলসিলাতুল-আ'হাদীসিস্ব-স্বা'হী'হাহ্ ২২৮৬)
উক্ত হাদীসে বৃষ্টি শব্দটি মূলতঃ এ উম্মতের মধ্যকার লুক্কায়িত কল্যাণকেই বুঝায়। কারণ, বৃষ্টি তো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর সৃষ্টির জন্য একটি বিরাট রহমত। যার মাধ্যমে তিনি মৃত জমিনকে জীবন ফিরিয়ে দেন।
আর সর্ব যুগে কল্যাণকামীদের হিম্মত এমনই হয়। তাঁদের কাজকর্ম পরোক্ষভাবে এটাই বুঝায় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে এ দুনিয়ায় তাঁর বান্দাদের মধ্যকার যাকে তিনি চান তাকে মানুষের পূজা থেকে তাদের প্রভুর ইবাদাতের দিকে এবং অন্যান্য ধর্মের যুলুম থেকে ইসলামের ইনসাফের দিকে তেমনিভাবে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে সম্পূর্ণরূপে বের করে নিয়ে আসার জন্যই পাঠিয়েছেন।
বৃষ্টি তো আসে মানুষের চরম নৈরাশ্য ও কঠিনতার সময়। আর এ উম্মত তো সত্যিকার দানশীল উম্মত। তারা দুনিয়ার ইতিহাসে কখনো নিরাশ, নিস্তেজ ও অবদমিত হয় না। ইসলামের এ দীর্ঘ ইতিহাসে ইসলামী ভূখণ্ডের উপর অনেক ধরনের বালা-মুসীবত ও বিপদাপদ এসেছে। এমনকি বিপদাপদের কঠিন ধাক্কায় তাদের পায়ের নিচের জমিনও বার বার কেঁপে উঠেছে। তারপরও তারা প্রতিটি বড় বড় বিপদ থেকে কঠিন ঈমানী শক্তি নিয়ে বের হয়ে এসেছে। প্রতি বারই ষড়যন্ত্রকারী কাফির ও মুনাফিকরা ধারণা করেছে যে, এবার মোসলমানরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। অথচ আল্লাহ্ তা'আলা তো তাদের প্রতি তাঁর রহমতের দৃষ্টি নিবদ্ধই রেখেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ ﴾ [التوبة: ٣٢]
"তারা তাদের মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহ্'র নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তা হতে দিবেন না। বরং তিনি তাঁর নূরকে পরিপূর্ণতা দিয়েই ছাড়বেন। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে”। (আত- তাওবাহ্: ৩২)
যখন সাহাবায়ে কিরাম আল্লাহ্ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীগুলো শুনলেন:
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ﴾ [البقرة: ١٤٨]
"কাজেই তোমরা কল্যাণের দিকে দ্রুত ধাবিত হও”। (আল-বাক্বারাহ্: ১৪৮)
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ) [آل عمران: ١٣٣]
"তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে। যার প্রস্থ হবে আকাশ ও যমিনের সমান। যা একমাত্র আল্লাহভীরুদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে”। (আলি 'ইমরান: ১৩৩)
তাঁরা উক্ত আয়াতগুলো শুনে এ কথাই বুঝেছেন যে, তাঁদের প্রত্যেককেই অবশ্যই এ পথে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যাতে তিনিই সর্ব প্রথম অন্যের আগে এ সম্মানের ভাগী হন। এ উচ্চ আসনে আসীন হন। এ জন্যই তাঁদের কেউ অন্যকে তাঁর চেয়ে বেশি আখিরাতের কাজ করতে দেখলে তিনি তাঁর সাথে এ কাজে প্রতিযোগিতা করতেন। তাঁর সমপর্যায়ের হওয়ার চেষ্টা করতেন। এমনকি তাঁকে ডিঙ্গিয়ে যাওয়ারও। তাই তাঁদের সার্বক্ষণিক প্রতিযোগিতা ছিলো আখিরাতের পদমর্যাদা নিয়ে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
﴿وَفِي ذَٰلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ ٱلْمُتَنَٰفِسُونَ ﴾ [المطففين: ٢٦]
"প্রতিযোগীরা মূলতঃ এ বিষয়েই প্রতিযোগিতা করুক"। (আল-মুত্বাফফিফীন: ২৬)
আমরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সবার জন্য লাভজনক জ্ঞান ও নেক আমলের তাওফীক কামনা করছি। পরিশেষে সকল দরূদ, সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মু'হাম্মাদ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবায়ে কিরামের উপর।
মুহাম্মাদ স্বালিহ আল-মুনাজ্জিদ
সমাপ্ত