📄 বিধবা ও দরিদ্রদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
السَّاعِيْ عَلَى الْأَرْمِلَةِ وَالْمِسْكِيْنِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ .
"বিধবা ও মিসকীনদের ভরণপোষণকারী আল্লাহ্ তা'আলার পথে জিহাদকারী অথবা পুরো রাত নামায পড়ুয়া ও দিনের বেলায় রোযাদারের ন্যায়”। (বুখারী ৫০৩৮)
السَّاعِيُّ عَلَى الْأَرْمِلَةِ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: السَّاعِي মানে, তাদের ভরণপোষণের জন্য যে ব্যক্তি নিরলস কামাই ও কাজ করে যাচ্ছে। الْأَرْمِلَةِ মানে, যার স্বামী নেই। ইতিপূর্বে তার বিবাহ্ হোক বা নাই হোক। কারো কারোর মতে, যে মহিলাকে তার স্বামী পরিত্যাগ করেছে।
ইনু কুতাইবাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ জাতীয় মহিলাদেরকে أَرْمِلَةٌ বলা হয়। কারণ, তাদের স্বামী না থাকার দরুন একদা তাদেরকে إِرْمَالُ তথা দারিদ্র ও সম্বলহীনতা পেয়ে বসে।
وَالْمِسْكِيْنِ মানে, যার নিকট জীবন পরিচালনার জন্য কোন কিছুই নেই। কারো কারোর মতে, যার নিকট জীবন পরিচালনার জন্য সামান্য কিছু রয়েছে। কখনো কখনো দুর্বলকেও মিসকীন বলা হয়। এ দিকে ফকীর শব্দটিও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে কারো কারোর নিকট ফকীর মানে, যার নিকট কিছু রয়েছে।
كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ মানে, যে তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে, তাদের খরচাদি চালাবে ও তাদের সকল বিষয়াদি দেখবে তার সাওয়াব এক জন আল্লাহ্ তা'আলার পথে জিহাদকারীর সমান। কারণ, মাল তো জানের সহোদর। তাই সম্পদ ব্যয়ে মনের বিরোধিতা ও আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। (মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা/নাওয়াওয়ী: ১৮/১১২)
📄 প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করা
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ ) [النساء: ٣٦].
"তোমরা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাত করো। তাঁর সাথে কখনো কোন কিছুকে শরীক করো না। উপরন্তু তোমরা নিজেদের মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সাথী ও মুসাফিরদের সাথে ভালো ব্যবহার করো”। (নিসা': ৩৬)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিবেশীর অধিকারকে তাঁর অধিকার তথা তাঁর ইবাদাত এবং মাতা-পিতা, এতীম ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহারের সাথেই উল্লেখ করেছেন।
'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوْصِيْنِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ .
“জিব্রীল বার বার আমাকে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের ওসিয়ত করছিলেন। যা দেখে আমার ধারণা হলো, নিশ্চয়ই অচিরেই এক জন প্রতিবেশীকে তার প্রতিবেশীর ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হবে”। (বুখারী ৫৬৬৯ মুসলিম ২৬২৫)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ وَفِي رِوَايَةٍ: فَلْيُحْسِنُ إِلَى جَارِه .
"যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলা ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে”। (বুখারী ৫৬৭৩)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সে যেন তার প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করে"। (মুসলিম ৪৭)
সা'ঈদ্ (রাহিমাহুল্লাহ্) আবূ শুরাইহ্ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، قِيْلَ: وَمَنْ يَارَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ: الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ .
"আল্লাহ্ তা'আলার কসম! সে ঈমানদার নয়, আল্লাহ্ তা'আলার কসম! সে ঈমানদার নয়, আল্লাহ্ তা'আলার কসম! সে ঈমানদার নয়, জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহ্'র রাসূল! সে ব্যক্তি কে? তিনি বললেন: যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়”। (বুখারী ৫৬৭০ মুসলিম ৪৬)
ঢ় মানে, যুলুম, অকল্যাণ ও সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড।
প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করা মানে, বিপদের সময় তাকে সান্ত্বনা দেয়া, খুশির সময় তাকে সম্ভাষণ করা, রোগের সময় তার খবারাখবর নেয়া, তাকে দেখলেই সালাম দেয়া, তার সাক্ষাতে হাস্যোজ্জ্বল থাকা, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণের পথ দেখানো ইত্যাদি।
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর ঘরে একটি ছাগল যবাই করা হলে তিনি বললেন: তোমরা কি আমার ইহুদি প্রতিবেশীকে কিছু হাদিয়া দিয়েছো? তোমরা কি আমার ইহুদি প্রতিবেশীকে কিছু হাদিয়া দিয়েছো? আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوْصِيْنِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ .
"জিব্রীল বার বার আমাকে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের ওসিয়ত করছিলেন। যা দেখে আমার ধারণা হলো, নিশ্চয়ই অচিরেই এক জন প্রতিবেশীকে তার প্রতিবেশীর ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হবে"। (আবু দাউদ ৫১৫২ তিরমিযী ১৯৪৩ স্বা'হী'হুত-তারগীবি ওয়াত-তারহীব ২৫৭৪)
📄 স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ করা
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِيْنَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِيْنِ، وَدِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ .
"একটি দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) তুমি আল্লাহ্'র রাস্তায় খরচ করলে, আরেকটি দীনার তুমি কোন গোলাম স্বাধীন করতে খরচ করলে, আরেকটি দীনার তুমি কোন মিসকীনকে সাদাকা করলে, আরেকটি দীনার তুমি নিজ পরিবারের জন্য খরচ করলে। এগুলোর মধ্যকার যে দীনার সাদাকায় সবচেয়ে বেশি সাওয়াব পাওয়া যাবে তা হলো যা তুমি নিজ পরিবারের জন্য খরচ করলে"। (মুসলিম ৯৯৫)
কা'ব বিন্ 'উজরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা জনৈক ব্যক্তি নবী এর পাশ দিয়ে যেতেই সাহাবায়ে কিরাম তার প্রচুর সক্ষমতা ও কর্মতৎপরতা দেখে বললেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল! যদি এর এ সক্ষমতা ও কর্মতৎপরতাটুকু আল্লাহ্ তা'আলার রাস্তায় ব্যয় করা হতো তা হলে কতোই না ভালো হতো। তখন রাসূল বললেন:
إِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى وَلَدِهِ صِغَارًا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى أَبَوَيْنِ شَيْخَيْنِ كَبِيرَيْنِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَإِنْ كَانَ يَسْعَى عَلَى نَفْسِهِ يُعِفُهَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ رِيَاءً وَمُفَاخَرَةً فَهُوَ فِي سَبِيْلِ الشَّيْطَانِ .
"যদি সে নিজ ছোট বাচ্চাদের ভরণপোষণের জন্য কামাই করতে বের হয়ে থাকে তা হলে সে আল্লাহ্ তা'আলার পথেই রয়েছে। আর যদি সে নিজ বয়স্ক ও বৃদ্ধ মাতা-পিতার ভরণপোষণের জন্য কামাই করতে বের হয়ে থাকে তা হলেও সে আল্লাহ্ তা'আলার পথেই রয়েছে। আর যদি সে নিজের ভরণপোষণের জন্য কামাই করতে বের হয়ে থাকে যাতে তাকে অন্য কারোর নিকট হাত পাততে না হয় তা হলেও সে আল্লাহ্ তা'আলার পথেই রয়েছে। আর যদি সে মানুষকে নিজের অহঙ্কার ও গর্ব দেখানোর জন্য বের হয়ে থাকে তা হলে সে সত্যিই শয়তানের পথে রয়েছে"। (ত্বাবারানী: ৭/৫৬ স্বা'হী'হুত-তারগীবি ওয়াত-তারহীব ১৬৯২)
📄 আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ الْخَلْقَ حَتَّى إِذَا فَرَغَ مِنْهُمْ قَامَتِ الرَّحِمُ فَقَالَتْ: هَذَا مَقَامُ الْعَائِذِ مِنَ الْقَطِيْعَةِ، قَالَ: نَعَمْ، أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ؟ قَالَتْ: بَلَى، قَالَ: فَذَاكِ لَكِ، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِقْرَؤُوا إِنْ شِئْتُمْ فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِعُوا أَرْحَامَكُمْ ) أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَتَهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَرَهُمْ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْءَانَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ﴾ [محمد: ٢٢ - ٢٤] .
"আল্লাহ্ তা'আলা যখন সৃষ্টিকুল সৃজন করে শেষ করলেন তখন আত্মীয়তার বন্ধন দাঁড়িয়ে বললো: এটিই হলো সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনাকারীর স্থান। আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: হ্যাঁ, ঠিকই। তুমি কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, আমি ওর সঙ্গেই সম্পর্ক স্থাপন করবো যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে এবং আমি ওর সাথেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবো যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে। তখন সে বললো: আমি এ কথায় অবশ্যই রাজি আছি হে আমার প্রভু! তখন আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: তা হলে তোমার জন্য তাই হোক। এরপর রাসূল বলেন: তোমাদের মনে চাইলে নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়তে পারো যার মর্মার্থ হলো, "ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা এদেরকেই করেন অভিশপ্ত, বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন। তারা কি কুর'আন নিয়ে এতটুকুও চিন্তা করে না। না কি তাদের অন্তরের উপর তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে”। (মুহাম্মাদ: ২২-২৪)
'আব্দুর রহমান বিন্ 'আউফ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি একদা রাসূল কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
قَالَ اللهُ: أَنَا الرَّحْمَنُ وَهِيَ الرَّحِمُ، شَقَقْتُ لَهَا اسْمًا مِنْ اسْمِي، مَنْ وَصَلَهَا وَصَلْتُهُ وَمَنْ قَطَعَهَا بَتَتْهُ .
"আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: আমি রহমান। আর আত্মীয়তার বন্ধনের নাম হলো রাহিম্। আমি নিজের নাম থেকেই আত্মীয়তার বন্ধনের নাম নির্গত করেছি। যে ব্যক্তি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবো। আর যে ব্যক্তি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো”। (আবূ দাউদ ১৬৯৪ স্বা'হী'হুত-তারগীবি ওয়াত-তারহীব ২৫২৮)
ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা মানে, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি যথাসাধ্য দয়া করা। আর তা যিনি দয়া করছেন ও যার প্রতি দয়া করা হচ্ছে তাদের উভয়ের অবস্থার ভিত্তিতেই সম্পাদিত হবে। কখনো তা সম্পদের মাধ্যমে হতে পারে। আবার কখনো তা শারীরিক খিদমাতের মাধ্যমে। আবার কখনো তা সাক্ষাত ও সালাম ইত্যাদির মাধ্যমে। (মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা/নাওয়াওয়ী: ২/২০১)