📘 মরেও অমর হওয়ার চেষ্টা > 📄 মসজিদ নির্মাণ

📄 মসজিদ নির্মাণ


আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَعَاتَى الزَّكَوٰةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَيْكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ ﴾ [التوبة: ١٨] .
"আল্লাহ্'র মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে যারা আল্লাহ্ তা'আলা ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়িম করে, যাকাত দেয় ও আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্ত”। (তাওবাহ্: ১৮)
উসমান বিন আফফান থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنْ بَنَى مَسْجِدًا يَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ الله بَنَى اللَّهُ لَهُ مِثْلَهُ فِي الْجَنَّةِ .
"যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ বানালো আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে সে ধরনের একটি ঘর বানিয়ে দিবেন”। (বুখারী ৪৩৯ মুসলিম ৫৩৩)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ، وَوَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ، وَمُصْحَفًا وَرَّثَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لِابْنِ السَّبِيْلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ .
"এক জন মু'মিনের মৃত্যুর পর যে সাওয়াব ও নেক আমল তার নিকট পৌঁছায় তা হলো যে জ্ঞান সে কাউকে শিখিয়েছে ও প্রচার করেছে। যে নেককার সন্তান সে রেখে গিয়েছে। যে কুর'আন মাজীদ সে মিরাস হিসেবে রেখে গিয়েছে। যে মসজিদ সে বানিয়েছে। যে ঘর বা হোটেল সে মুসাফিরের জন্য বানিয়েছে। যে নদী সে খনন করেছে। এমনকি যে সাদাকাহ্ সে নিজের জীবদ্দশায় ও সুস্থ অবস্থায় নিজ সম্পদ থেকে দিয়েছে তা তার নিকট মৃত্যুর পর পৌঁছাবে”। (ইবনু মাজাহ্ ২৩৮ সা'হী'হুত-তারগীবি ওয়াত-তারহীব ৭৭)
এমনকি রাসূল নিজেই তাঁর সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে মসজিদে নাবাওয়ী তৈরিতে একে অপরের সহযোগিতা করেছেন।
বিশিষ্ট সাহাবী আবূ সা'ঈদ্ মসজিদেনাবাওয়ী তৈরির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: আমরা তখন একটি একটি করে পাথর খণ্ড সবাই বহন করছিলাম। আর 'আম্মার দু'টি করে বহন করছিলেন। নবী তা দেখে তার শরীর থেকে ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন:
وَيْحَ عَمَّارٍ تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ، يَدْعُوهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ وَيَدْعُوْنَهُ إِلَى النَّارِ .
""আম্মারের জন্য দুঃখ! তাকে একদা একটি বিদ্রোহী গ্রুপ হত্যা করবে। সে তাদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকবে। আর তারা তাকে জাহান্নামের দিকে ডাকবে”। (বুখারী ৪৩৬)
তা শুনে 'আম্মার বললেন: "আমি আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিতনা থেকে রক্ষা কামনা করছি"। (বুখারী ৪৩৬)

📘 মরেও অমর হওয়ার চেষ্টা > 📄 অন্যের কল্যাণ কামনা করা

📄 অন্যের কল্যাণ কামনা করা


তামীম আদ্দারী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
الدِّينُ النَّصِيْحَةُ، قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ : اللَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ .
"ধর্ম মানেই অন্যের কল্যাণ কামনা করা। আমরা বললাম: কার কল্যাণ? তিনি বললেন: আল্লাহ্ তা'আলার, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসূলের। উপরন্ত মোসলমানদের নেতৃবর্গের ও সাধারণের"। (মুসলিম ৫৫)
ইবনু 'হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: উক্ত হাদীস সেই হাদীসগুলোর একটি যেগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে, এগুলো ধর্মের এক চতুর্থাংশ। (ফাত্হুল-বারী: ১/১৩৮)
ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: উক্ত হাদীসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যার উপর পুরো ইসলামই নির্ভরশীল। আর যারা এ কথা বলেছেন যে, উক্ত হাদীসটি ইসলামের এক চতুর্থাংশ তথা এ হাদীসটি সে হাদীসগুলোর একটি যে হাদীসগুলো ইসলামের সকল বিষয়ই ধারণ করে আছে তা ঠিক নয়। বরং পুরো ইসলামই উক্ত হাদীসটির উপর নির্ভরশীল। (মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা/নাওয়াওয়ী: ২/৩৭)
আল্লাহ্ তা'আলার কল্যাণ কামনা মানে, তাঁকে এমন বিশেষণে বিশেষিত করা যার উপযুক্ত তিনি স্বয়ং। উপরন্তু প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাঁর নিকট নতি স্বীকার করা। তাঁর পছন্দের বস্তুগুলোতে উৎসাহী হওয়া তথা তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর অপছন্দের বস্তুগুলোকে ভয় পাওয়া তথা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ পরিত্যাগ করা। উপরন্তু তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীদেরকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য সকল প্রকারের জিহাদ তথা সার্বিক প্রচেষ্টা করা।
আল্লাহ্'র কুর'আনের কল্যাণ কামনা মানে, তা নিজে শেখা ও অন্যকে শেখানো। তার অক্ষরগুলো সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করা ও লেখা। তার অর্থগুলো বুঝা ও তার সীমা-পরিসীমাগুলো রক্ষা করা। উপরন্তু তার উপর আমল করা ও বাতিলপন্থীদের বিকৃতি থেকে তাকে রক্ষা করা।
তাঁর রাসূল এর কল্যাণ কামনা মানে, তাঁকে সম্মান করা এবং তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সার্বিক সহযোগিতা করা। তাঁর সুন্নাত সমূহকে নিজে শিখে ও অন্যকে শিখিয়ে সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। তাঁর কথা ও কাজের অনুসরণ করা। উপরন্তু তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে ভালোবাসা।
মোসলমানদের নেতৃস্থানীয়দের কল্যাণ কামনা করা মানে, তাঁদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে তাদেরকে সহযোগিতা করা। তাঁরা কখনো গাফিল হলে তাঁদেরকে তখনই সচেতন করে তোলা। তাঁরা কখনো ভুল করে বসলে তাঁদের সে শূন্যতা পুরণের চেষ্টা করা। তাঁদের ব্যাপারে মানুষের ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করা। তাঁদের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল অন্তরগুলোকে তাঁদের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। পরিশেষে তাঁদের সর্বোত্তম কল্যাণ হবে তাঁদেরকে সুন্দর পন্থায় কারোর প্রতি যুলুম করা থেকে দূরে রাখা।
সাধারণ মোসলমানদের কল্যাণ কামনা করা মানে, তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথ দেখানো। তাদেরকে কোন ধরনের কষ্ট না দেয়া। তারা ধর্মের যে বিষয়গুলো জানে না তাদেরকে তা জানিয়ে দেয়া। কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদেরকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করা। তাদের দোষগুলো প্রচার না করা। তাদের শূন্যতা পূরণ করা। তাদেরকে ক্ষতিকর জিনিসগুলো থেকে দূরে রাখা ও তাদের সার্বিক কল্যাণ করার চেষ্টা করা। নিষ্ঠা ও নম্রতার মাধ্যমে তাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। তাদের প্রতি দয়া করা। তাদের বড়কে সম্মান ও ছোটকে স্নেহ করা। তাদেরকে সদুপদেশ দেয়া। তাদেরকে ধোঁকা না দেয়া ও হিংসে না করা। তাদের জন্য সে কল্যাণকে পছন্দ করা যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে এবং তাদের জন্য সে অকল্যাণকে অপছন্দ করা যা সে নিজের জন্য অপছন্দ করে। উপরন্তু তাদের সম্পদ ও ইজ্জত রক্ষা করা। এমনকি কথা ও কাজের মাধ্যমে যে কোন অবস্থায় তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা। উপরোক্ত সকল গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করা। সকল নেক কাজের প্রতি তাদেরকে সাহস যোগানো। বস্তুতঃ সালাফে সালি'হীনের কেউ কেউ অন্যের কল্যাণ করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করতে এতটুকুও কোতাহী করেননি।

📘 মরেও অমর হওয়ার চেষ্টা > 📄 মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা

📄 মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা


আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّن نَّجْوَتَهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾ [النساء: ١١٤] .
"তাদের অধিকাংশ গোপন সলা-পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই। তবে যে ব্যক্তি দান-খয়রাত, ভালো কাজ ও মানুষের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির আদেশ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজগুলো করবে আমি তাকে অচিরেই মহা পুরস্কারে ভূষিত করবো”। (নিসা': ১১৪)
'আল্লামাহ্ সা'দি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মানুষের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ও আলোচনায় কোন কল্যাণ নেই। যখন তাতে কোন ফায়েদাই নেই তখন তা হয়তো বা জায়িয কোন অযথা কথা হবে কিংবা ক্ষতিকর যে কোন হারাম কথা হবে।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা এ ব্যাপকতা থেকে কিছু জিনিস বাইরে রেখে দেন। তিনি বলেন: তবে যে ব্যক্তি কাউকে সাদাকা-খায়রাত তথা সম্পদ, জ্ঞান ও যে কোন ফায়েদা দেয়ার আদেশ করে। এমনকি এ সাদাকার অধীনে সীমিত ইবাদাতও রয়েছে। যেমন: “সুব্‌হানাল্লাহ্”, "আল্'হামদুলিল্লাহ্” ইত্যাদির যিকির।
নবী ইরশাদ করেন:
إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً، وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلُّ تَحْمِيْدَةٍ صَدَقَةً، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ، وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوْفِ صَدَقَةٌ، وَنَهْيٌّ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ .
"প্রত্যেক তাস্বীহ্ তথা "সুব্‌হানাল্লাহ্” বলা সাদাকাহ্। প্রত্যেক তাব্বীর তথা “আল্লাহু আকবার" বলা সাদাকাহ্। প্রত্যেক তাহমীদ্ তথা "আল্হাম্মদুলিল্লাহ্” বলা সাদাকাহ্। প্রত্যেক তাহ্হ্লীল তথা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” বলা সাদাকাহ্। কাউকে ভালো কাজের আদেশ করা সাদাকাহ্। কাউকে অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদাকাহ্। এমনকি প্রত্যেক যৌন সম্ভোগ তথা স্ত্রী সহবাস সাদাকাহ্। (মুসলিম ২৩৭৬)
উক্ত আয়াতে أَوْ مَعْرُوفٍ বলতে কারো প্রতি দয়া ও আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্যকে বুঝানো হয়েছে। এমনকি শরীয়ত ও বিবেকের দৃষ্টিতে যা সুন্দর তাকেও বুঝানো হয়েছে। যখন الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ তথা সৎ কাজের আদেশের ব্যাপারটি النَّهْيُّ عَنِ الْمُنْكَرِ তথা অসৎ কাজ থেকে নিষেধের ব্যাপারটির সাথে সম্পৃক্ত করা না হয় তখন সৎ কাজের আদেশ বলতে অসৎ কাজ থেকে নিষেধের ব্যাপারটিকেও বুঝানো হয়। কারণ, কাউকে অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করাও একটি ভালো কাজ। উপরন্তু খারাপ কাজগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা ছাড়া কোনভাবেই ভালো কাজের পরিপূর্ণতা আসে না। আর যদি উভয় বিষয়টি একই সাথে উল্লেখ করা হয় তখন মা'রূফ তথা ভালো কাজ বলতে আদিষ্ট কাজ ও মুন্কার বলতে নিষিদ্ধ কাজ পরিত্যাগ করাকেই বুঝানো হয়।
أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ ) এর মধ্যকার বিরোধ মিটানোর উক্ত আয়াতের ব্যাপারটি দু' জন দ্বন্দ্বকারী ও বিরোধী ছাড়া হয় না। আর ঝগড়া, বিবাদ ও রাগারাগি এমন সকল অনিষ্ট ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে যা কখনো বলে শেষ করা যাবে না। এ জন্যই বিধানকর্তা মানুষের রক্ত, সম্পদ, ইজ্জত ও ধর্ম সংক্রান্ত বিরোধ সমূহ দ্রুত মিটানোর প্রতি তাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ) [آل عمران : ١٠٣] .
"তোমরা সবাই আল্লাহ্'র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো। কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না"। (আলি-'ইমরান: ১০৩)
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَتْهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴾ [الحجرات: ٩] .
"মু'মিনদের দু'টি দল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দাও। এরপরও একটি দল অপরটির উপর চড়াও হলে যে দলটি চড়াও হয় তার বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই করো যতক্ষণ না চড়াও হওয়া দলটি আল্লাহ্'র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি দলটি ফিরে আসে তা হলে তাদের মাঝে ইনসাফের ফায়সালা করো। তাদের উপর সুবিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন”। ('হুজুরাত: ৯)
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ ﴾ [النساء: ١٢٨] .
"মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা একটি উত্তম কাজ"। (নিসা': ১২৮)
যিনি মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করতে চেষ্টা করেন তিনি রাতভর নামায পড়ুয়া, দিনভর রোযা রাখা ও সর্বদা সাদাকাকারীর চেয়েও উত্তম। এক জন বিরোধ মীমাংসাকারীর আমল ও প্রচেষ্টাকে আল্লাহ্ তা'আলা অবশ্যই সুন্দর, সঠিক ও সার্থক করবেন। ঠিক এরই বিপরীতে আল্লাহ্ তা'আলা এক জন ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টাকারীর আমলকে বেঠিক ও ব্যর্থ করবেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ ﴾ [يونس: ۸۱] .
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কাজকর্মকে সুন্দর ও সার্থক করেন না”। (ইউনুস: ৮১)
এ কাজগুলো (সাদাকা, নেকির কাজ ও মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা) যখন করা হবে তা অবশ্যই মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে। যা আয়াতের ব্যাপকতাকে বিশেষিত করার দ্বারাই বুঝা যায়। কারণ, তাতে মানুষের ব্যাপক ফায়েদা রয়েছে। তবে সাওয়াবের পরিপূর্ণতা নিয়্যাত ও নিষ্ঠার উপরই নির্ভরশীল। এ জন্যই আল্লাহ্ তা'আলা আয়াতের শেষে বলেন:
وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾ [النساء: ١١٤]
"যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজগুলো করবে আমি তাকে অচিরেই মহা পুরস্কারে ভূষিত করবো"। [(নিসা': ১১৪) (তাইসীরুল-কারীমির-রাহমান: ২০২)]
'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ أَفْضَلَ الصَّدَقَةِ إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ .
“সর্বশ্রেষ্ঠ সাদাকাহ্ হলো মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা”। ('আব্দুবন্ধু 'হুমাইদ ৩৩৫ সিলসিলাতুল-'আ'হাদীসিস্ব-স্বা'হী'হাহ্ ২৬৩৯)
আবৃদ্দারদা' থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরشাদ করেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُوْلَ الله ! قَالَ : إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ .
"আমি কি তোমাদেরকে রোযা, নামায ও সাদাকার চেয়ে আরো শ্রেষ্ঠ কিছুর সংবাদ দেবো না? সাহাবায়ে কিরাম বললেন: অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহ্'র রাসূল! তিনি বললেন: মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা”। (আবু দাউদ ৪৯১৯ তিরমিযী ২৫০৯ স্বা'হী'হুল-জামি' ২৫৯৫)
এ ব্যাপারে কারোর কোন সন্দেহ নেই যে, নামায ও রোযার মর্যাদা ইসলামে অনেক বেশি। কারণ, এ দু'টি ইসলামের দু'টি রুকন বা স্তম্ভ। তবে উক্ত হাদীসে নামায ও রোযা বলতে নফল নামায ও রোযাকেই বুঝানো হয়েছে। তা হলে হাদীসের মর্ম এ দাঁড়ালো যে, মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা نفل নামায ও نفل রোযার চেয়েও উত্তম। কারণ, এ দু'টির সাওয়াব ব্যক্তির উপরই সীমিত। পক্ষান্তরে মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার ফায়েদা অন্যকেও শামিল করে।
সুতরাং যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার জন্য নিজের সময়টুকু ব্যয় করে সে ব্যক্তি ওর চেয়েও উত্তম যে নিজের সময়টুকু নফল নামায ও নফল রোযায় ব্যয় করে।

📘 মরেও অমর হওয়ার চেষ্টা > 📄 কারো জন্য সুপারিশ ও মঙ্গলময় সহযোগিতা করা

📄 কারো জন্য সুপারিশ ও মঙ্গলময় সহযোগিতা করা


এক জন মোসলমানের উচিত তার অন্য কোন মোসলমান ভাইয়ের লাভ করা কিংবা তাকে কোন ক্ষতি থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করা। আর এটি হলো নিজের সামাজিক মর্যাদাকে অন্য মোসলমানের কাজে লাগানো।
আবূ মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন রাসূল এর নিকট কোন ভিক্ষুক কিংবা কেউ কোন প্রয়োজন নিয়ে আসতো তখন তিনি বলতেন:
اشْفَعُوا تُؤْجَرُوا وَيَقْضِي اللَّهُ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِ مَا شَاءَ .
"তোমরা অন্যের জন্য সুপারিশ করো তা হলে তোমাদেরকে সাওয়াব দেয়া হবে। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর মুখ দিয়ে যাই চান তাই ফায়সালা করবেন"। (বুখারী ১৪৩২ মুসলিম ২৬২৭)
ইমাম নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায়, কোন মোসলমানের জায়িয প্রয়োজন পূরণার্থে কারোর নিকট তার জন্য সুপারিশ করা মুস্তাহাব। চাই সে সুপারিশ রাষ্ট্রপতি, গভর্ণর কিংবা যে কোন পদাধিকারী ব্যক্তির নিকট হোক না কেন। চাই সে সুপারিশ কারোর উপর থেকে কোন যুলুম প্রতিরোধ, কোন আদবমূলক শাস্তি মওকুফ কিংবা কোন দরিদ্রের দান-অনুদান ছাড়িয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেই হোক না কেন। তবে কারোর ব্যাপারে শরীয়তের কোন দণ্ডবিধি রহিত করার জন্য সুপারিশ করা হারাম। তেমনিভাবে কোন বাতিলের পরিপূর্ণতা কিংবা কোন সত্যের প্রতিরোধ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও সুপারিশ করা হারাম। (মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা/নাওয়াওয়ী: ১৬/১৭৭)
উক্ত হাদীস এটাও প্রমাণ করে যে, কারোর উপকারের প্রচেষ্টাকারী সে সর্ববস্থায়ই সাওয়াব পাবে। যদিও তার চেষ্টা ব্যর্থ ও নিষ্ফল হোক না কেন। (বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা/ইবনু বাত্তাল: ৩/৪৩৪)
নবী নিজেও নিজের অপূর্ব সম্মানটুকু মানুষের ফায়েদা হাসিলের ক্ষেত্রে অকাতরে ব্যয় করতেন। এমনকি তিনি তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারেও সুপারিশ করতেন।
বারীরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) যখন স্বাধীন হয়ে গেলেন আর তাঁর স্বামী গোলাম ছিলেন তখন তিনি নিজের জন্য তাঁর স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদই পছন্দ করলেন। এ দিকে তাঁর স্বামী এ জন্য খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি সত্যিই তাঁর স্ত্রী বারীরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) কে খুবই ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি মদীনার অলি-গলিতে বারীরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এর পেছনে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে বেড়াতেন। পরিশেষে তিনি এ ব্যাপারে নবী এর সুপারিশও কামনা করেছিলেন। যেন তিনি তাঁর স্ত্রীকেও আবারো নিজের কাছে ফিরে পান। তখন নবী বারীরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) কে বললেন:
لَوْ رَاجَعْتِيْهِ فَإِنَّهُ أَبُوْ وَلَدِكَ .
"তুমি যদি আবারো তার কাছে ফিরে যেতে। সে তো তোমার সন্ত ানেরই পিতা"।
তখন বারীরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল কে উদ্দেশ্য করে বললেন: আপনি কি আমাকে তাঁর নিকট ফিরে যাওয়ার আদেশ করছেন হে আল্লাহ্'র রাসূল! তিনি বললেন: না, আমি কেবল এক জন সুপারিশকারী মাত্র। তখন বারীরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন: তা হলে তার নিকট ফিরে যাওয়ার আমার কোন প্রয়োজনই নেই। (বুখারী ৪৯৭৯)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00